প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label অনু গল্প. Show all posts
Showing posts with label অনু গল্প. Show all posts

Tuesday, October 18, 2011

বন্ধুত্বের পরখ || আহমেদ রিয়াজ অনূদিত

অনেক অনেক বছর আগের কথা। এক গ্রামে বাস করতো দুই বন্ধু। একজন ওলেলে, অন্যজন ওমোটেই। মুখোমুখি বাড়ি দু'জনের। তাদের বন্ধুত্বের কথা জানতো গ্রামের সবাই। আর তাদের প্রতিবেশী ছিলো এক বুড়ো। বুড়ো হলে কী হবে_ অনেক বিষয়ে বেশ জ্ঞান ছিলো তার। একবার ওলেলে আর ওমোটেইয়ের বন্ধুত্ব পরখ করে দেখতে চাইলেন তিনি।
দুই বাড়ির মাঝে পায়ে হাঁটা পথ। এক সকালে ওই পথ দিয়ে হাঁটছিলেন বুড়ো। মাথায় একটা নতুন টুপি। টুপিটার একপাশ লাল, অন্যপাশ সবুজ।
প্রথমেই দেখা হলো ওমোটেইয়ের সঙ্গে। নিজেদের জমিতে লতানো গাছের পরিচর্যা করছিলো সে।
বুড়ো বললেন, 'শুভ সকাল, ওমোটেই।'
ওমোটেই বললো, 'শুভ সকাল। খুব সুন্দর লালটুপি পরেছেন দেখছি।'
বুড়ো বললেন, 'ধন্যবাদ। টুপিটা সুন্দর হয়েছে জেনে খুশি হলাম।'
ওমোটেই বললো, 'সত্যিই খুব সুন্দর টুপিটা।'
টুপিটা ধরে একটু ঠিকঠাক করে আবার হাঁটতে শুরু করলেন বুড়ো। কিছুক্ষণ পর দেখা হয়ে গেলো ওলেলের সঙ্গে। ওলেলে তখন জমির আগাছা পরিষ্কার করছিলো।
জ্ঞানী মানুষ হাঁক দিলেন, 'শুভ সকাল, ওলেলে।'
ওলেলে ঘুরে তাকালো জ্ঞানী মানুষের দিকে। নতুন টুপিটা তারও চোখ এড়ায়নি। বললো, 'ওহ্! কী সুন্দর সবুজ রঙের টুপি পরেছেন। নতুন নাকি?'
মুচকি হেসে বুড়ো বললেন, 'এই আর কি। এমন একটা সুন্দর টুপির শখ অনেকদিন থেকেই ছিলো। সে যাই হোক। তারপর বলো, কেমন আছো তুমি?'
ওলেলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে গেলেন বুড়ো।
একসময় সূর্যটা চলে এলো একেবারে মাথার ওপর। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে। কাজ বন্ধ করে ওলেলেই চললো প্রিয় বন্ধু ওমোটেইয়ের কাছে। প্রতিদিন দু'জন একসঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। খেতে খেতেই ওমোটেই জানতে চাইলো, 'আমাদের প্রতিবেশী বুড়োর নতুন লাল টুপিটা দেখেছো? খুব সুন্দর, তাই না?'
অবাক হয়ে ওলেলে বললো, 'লাল! সবুজ টুপিটাকে তুমি লাল বলছো? টুপিটা তোমার কাছে হয়তো লাল মনে হয়েছে। আসলে সূর্যের ঝকমকে আলো তোমার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে।'
ওমোটেই বললো, 'মানে! তুমি কী বলতে চাইছো?'
বন্ধুর বোকামোতে একটা ব্যঙ্গ হাসি দিলো ওলেলে। বললো, 'আমাদের প্রতিবেশী বুড়োর মাথায় লাল টুপি দেখিনি বন্ধু। সবুজ টুপি দেখেছি।'
ওমোটেই বললো, 'সবুজ টুপি! ওহ্, বন্ধু আমার, উল্টাপাল্টা কী বলছো বুঝতে পারছি না! ওটা সবুজ টুপি ছিলো না। লালই ছিলো। আমি ভালোমতো দেখেছি।'
গলা চড়িয়ে ওলেলে বললো, 'উঁহু। আমিই ঠিক বলছি। ওটা সবুজ ছিলো।'
বন্ধুর চড়া গলা শুনে বিরক্ত হলো ওমোটেই। গলা চড়ালো সে-ও, 'আমিই ঠিক দেখেছি। টুপিটা লালই ছিলো'
এবার রেগে গেলো ওলেলেও। চেঁচিয়ে বললো, 'টুপিটা সবুজই ছিলো।'
তারপর টুপির রঙ নিয়ে শুরু হলো দু'জনের মধ্যে চিৎকার আর চেঁচামেচি। খানিকপর ঝগড়া। আরও খানিকপর বিষয়টা আর ঝগড়াতেই আটকে রইলো না, হাতাহাতিতে গিয়ে ঠেকলো। ওদের হাতাহাতি আর চিৎকার শুনে জড়ো হতে লাগলো অন্য প্রতিবেশীরা। একটু পর ওদের প্রতিবেশী সেই বুড়ো ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন দু'জনের সামনে। জানতে চাইলেন, 'এসব কী হচ্ছে? দুই বন্ধু মারামারি করছো? আমি তো ভেবেছিলাম তোমরা খুব ভালো বন্ধু। তোমাদের বন্ধুত্বের নমুনা এই? ছিঃ ছিঃ ছিঃ!'
মাঝপথে বাধা পেয়ে থেমে গেলো ওলেলে আর ওমোটেই। চোখ বড় বড় করে তাকালো বুড়োর দিকে। ঠিক তখনই টুপিটার সবুজ দিকটা ওমোটেইয়ের আর লাল দিকটা ওলেলের চোখে পড়লো।
সঙ্গে সঙ্গে ওলেলে বললো, 'বন্ধু ওমোটেই, আমি আসলেই দুঃখিত। তুমি ঠিক কথাই বলেছিলে তখন। আমাদের প্রতিবেশীর টুপিটা সত্যিই লাল।'
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো ওমোটেই, 'না, না, তুমি ভুল বলোনি। না জেনে ভুল কথা আমিই বলেছি। সূর্যের চিকচিকে আলোয় আমার চোখে সত্যিই তখন ধাঁধা লেগেছিলো। সে জন্যই আমাদের প্রতিবেশীর সবুজ টুপিটাকে লাল দেখেছিলাম।'
ওলেলে বললো, 'উঁহু। তুমিই ঠিক বলেছিলে। টুপিটা আসলেই লাল।'
ওমোটেই বললো, 'না। তুমিই ঠিক বলেছিলে, সত্যি সত্যি টুপিটা সবুজ।'
তারপর আবার শুরু হলো দু'জনের চেঁচামেচি, হৈচৈ, ঝগড়া। দু'জনের ঝগড়া দেখে না হেসে পারলেন না বুড়ো। হাসতে হাসতেই মাথা থেকে টুপিটা খুলে দেখালেন, 'দেখো এটা। টুপির ব্যাপারে কারোরই ভুল ছিলো না। কিন্তু বন্ধুত্বের ব্যাপারে তোমরা কেউই ঠিক নও। আসলে এখনও তোমরা কেউ কারও সেরা বন্ধু হতে পারোনি। টুপির রঙ নিয়ে দু'জনই হৈচৈ করেছো, চেঁচামেচি করেছো, রাগারাগি করেছো, এমনকি মারামারিও করেছো। তোমরা কেউ ঠাণ্ডা মাথায় যাচাই করে দেখোনি, কার কথাটা ঠিক। নিজের দেখাটাকেই সঠিক হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছো। টুপি, টুপির রঙ এসব কিছুই তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। গুরুত্বপূর্ণ ছিলো নিজের কথা।'
ওলেলে বললো, 'আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে যাচাই ছাড়া কেউই বুঝতে পারে না, কার বন্ধুত্ব কতোখানি। টুপিটা লাল নাকি সবুজ, সেটা এখন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়_ ওমোটেইয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কতোখানি_ সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।'
সঙ্গে সঙ্গে ওমোটেইও সমর্থন জানালো বন্ধু ওলেলের কথায়, 'আমার কাছেও।'
এরপর থেকে তাদের বন্ধুত্ব হয়েছে আরও গভীর।
সূত্র : সমকাল

ইঁদুর দিল ভোঁ-দৌড় || সহীদ সরকার অনূদিত

বিড়াল আর ইঁদুরে বড়ই ভাব। সিদ্ধান্ত নিলো তারা একসঙ্গে এক চালের নিচে বাস করবে। যেই বলা সেই কাজ। শুরু হলো একই বাড়িতে বসবাস। শীতকালে খাবার-দাবারের খুবই অভাব। শীতের জন্য তারা কিনলো একটি চর্বির পাত্র। লুকিয়ে রাখলো দূরের একটি গির্জার পেছনে। যখন খাবারে টান পড়বে তখন এই পাত্রের খাবার খাবে তারা।
একদিন বিড়ালটি বলল, শোনো পুচ্চি ইঁদুর, আমার চাচাতো বোনের চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি ছেলে হয়েছে। তার ছেলেটির উৎসর্গের দিনে আমার সেখানে নিমন্ত্রণ। তাই তোমাকে একাকী এখানে রেখে আমাকে যেতে হবে।
ঠিক আছে, যাও। তবে ভালো খাবার পেলে আমার কথাও একটু ভেবো। কতদিন আমি লাল তেঁতুলের শরবত খাই না, বলল ইঁদুরটি।
বিড়ালটি সোজা চলে গেল গির্জার পেছনে। লুকিয়ে রাখা চর্বির পাত্রের ওপর থেকে খানিকটা চর্বি হাপুস হুপুস করে খেয়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে চলে গেল শহরে। বাড়ি ফিরলো সন্ধ্যার পরে।
নিশ্চয়ই বেশ ভালোই কেটেছে তোমার সময়টা। তা কী নাম রাখলে ভাগ্নের? ইঁদুর জিজ্ঞাসা করলো। টফ-অফ, টফ-অফ নাম রেখেছি ভাগ্নের।
টফ-অফ, ভারি মজার নাম তো! এমন নাম তো আগে কখনো শুনিনি।
কিছুক্ষণ পর আর একটি ফন্দি আঁটলো বিড়ালটি।
সে ইঁদুরটিকে ডেকে বলল, আমাকে আবার দ্বিতীয় ভাগ্নেটির কাছে যেতে হবে। আজ তার হাতে সাদা আংটি পরাতে যেতে হবে। আমি বোনটাকে না বলতে পারিনি। তোমাকে এবারও আমাকে সাহায্য করতে হবে। বাড়িটির দিকে একটু নজর রেখো ভাই।
মাথা নেড়ে সায় দিল ইঁদুরটি। চতুর বিড়াল গির্জার পেছনে গিয়ে চর্বির অর্ধেকটা খেয়ে কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে এলো।
আচ্ছা, তোমার বোনটির নাম তো জানা হলো না। কী নাম তার? ইঁদুর জিজ্ঞাসা করলো।
হাফ-গন!
হাফ-গন! কী বলছো তুমি! এমন নামতো আমি জীবনেও শুনিনি! নামের বইয়েও তো এ রকম নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বিড়ালটির মাথায় তখনো চর্বির কৌটার চিন্তা।
তৃতীয়বারের মতো আমাকে তারা দাওয়াত করেছে। এবারের ভাগ্নেটা কালো। কিন্তু তার পা দুটো সাদা। সারা শরীরে আর কোথাও সাদা রঙ নেই। এমন ঘটনা খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। যাই হোক তুমি আমাকে যাওয়ার জন্য অনুমতি দাও। বিড়ালটি হাসতে হাসতে বলল।
টফ-অফ, হাফ-গন! নামগুলো বেশ রহস্যের মধ্যে ফেলছে আমাকে। ঠিক আছে, যাও_ ইঁদুর বলল। ইঁদুরটি ছিল হাবাগোবা। বাড়ি, ঘরদোর সে সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে রাখে। আর এর মধ্যে চর্বির কৌটা থেকে সবটুকু চর্বি খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে ধূর্ত বিড়াল। রাতে বেশ চনমনে হয়ে বাড়ি ফিরলো বিড়ালটি।
তৃতীয় ভাগ্নেটির নাম কী রাখলে বল্পুব্দ?
অল-গান!
অল-গন! বেশ ভয়ঙ্কর নাম তো! এ নামের অর্থ কী? কোনো বইপত্রে এমন নাম দেখিনি! মাথা নাড়তে নাড়তে ঘুমোতে গেল বেচারা ইঁদুর।
চতুর্থবারের মতো কেউ আর বিড়ালটিকে দাওয়াত করলো না। অবশেষে শীতকাল চলে এলো। খাবার-দাবারের খুবই অভাব।
ইঁদুর বিড়ালকে বলল, চলো গির্জার পেছন থেকে লুকিয়ে রাখা চর্বির কৌটাটি নিয়ে আসি।
দু'জন সেখানে গিয়ে খুঁজে পেল খালি কৌটাটি।
বুঝতে পারলাম তোমার চালাকি। তুমি তাহলে এখানেই এসেছ দাওয়াত খেতে। প্রথমবার টফ-অফ, দ্বিতীয় বার হাফ-গন, আর তৃতীয়বার অল-গন?
চুপ করো। বেশি হম্বিতম্বি করলে আমি তোমাকেই খেয়ে ফেলবো।
ধমক শুনে থমকে গেল বেচারা ইঁদুর।
তৃতীয় ভাগ্নের নাম তাহলে অল-গান। বলেই বিড়াল তাকে ধরে ফেলার পূর্বেই মাথা নিচু করে দিল ভোঁ-দৌড়। পেছনে তার বল্পুব্দরূপী চতুর বিড়াল।
সূত্র : সমকাল

Monday, July 11, 2011

অণুগল্প : বৃষ্টি বিলাস ।। মো. আরিফুজ্জামান আরিফ

মা বলতেন আমার জন্ম বর্ষাকালে। সে কারণেই কি না জানি না, ছোটবেলা থেকে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ আমাকে খুব টানে। স্কুলে না যাওয়া ছাড়াও দল বেঁধে মাছ ধরা, তাল কুড়ানো, নদী-পুকুরে লাফ-ঝাঁপ ছাড়া কম বৃষ্টির দিনই কেটে। বৃষ্টির দিনে টিনের চালার তলে বসে লুডু খেলা, খুিচড়ি খাওয়ার মতো আনন্দের তুলনা হয় না। ঝুম বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা সব আনন্দকে ছাপিয়ে যেত। ছোটবেলায় মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে নেমে পড়তাম বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত রাস্তায়। পড়াশোনার উদ্দেশ্যে গ্রাম থেকে শহরে আসার পরও আমার বৃষ্টিবিলাস কমেনি। ছাতা হাতে নিয়ে নিয়নবাতির মৃদু আলোয় প্রকৃতির কান্নার দৃশ্য অবলোকন করা থেকে রক্ষা পায়নি গভীর রাতও।
গত কয়েক দিনের টানা দাবদাহের পর সেদিন হঠাত্ করেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরতে লাগল। ব্যস্ত নগর জীবন যখন প্রকৃতির রুদ্রতায় চরম বিরক্ত তখন ওই বৃষ্টির স্বস্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিল সবার মনে। বৃষ্টির জলে ভেজার আকাঙ্ক্ষা কম-বেশি সবার থাকে। জানালা দিয়ে দেখলাম আশপাশের প্রতিটি বাড়ির ছাদে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও ভিজতে শুরু করেছেন। সত্যি বলতে কি, সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দিল হঠাত্ পাওয়া ওই বৃষ্টিকে ছুয়ে দেখার আনন্দে। সবার ওই আনন্দ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
আমাদের পাশের বাড়ির ছাদে এক কিশোরী মেয়েকে দেখলাম বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাচছে। মেয়েটার পায়ে নূপুর ছিল আর চুলগুলোও ছিল খুব লম্বা। ওই দৃশ্য কোনো সিনেমার দৃশ্যের চেয়ে কম উপভোগ্য ছিল না।
আসলে বৃষ্টিকে মানুষের মনে কতখানি প্রাণের স্পন্দন জোগায় তা হয়তো ওই দৃশ্য না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। এসব ভাবতে ভাবতেই দেখলাম, বৃষ্টি আরও জোরে পড়তে লাগল। হঠাত্ পাওয়া স্বস্তির ওই বৃষ্টি মিস করতে চাইলাম না। সোজা চলে গেলাম। ছাদে! বৃষ্টি এখনও অঝোর ধারায় নেমে আসছিল পৃথিবীতে। জানালা দিয়ে যে মেয়েটিকে নাচতে দেখেছিলাম সে তখন চোখ বন্ধ করে দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চুলগুলো ভিজে চুপসে গেছে, গলার ওড়নাটা পড়ে আছে অনেক দূরে। ভেজা কাপড়ে তার অসাধারণ দেহসৌষ্ঠব ফুটে উঠেছিল দারুণভাবে। তারপর যখন রুমে ফিরে আসতে চাইলাম তখন একেবারেই নিচের দিকে চোখ পড়ল। দেখলাম, আমাদের গলির ধারে গড়ে ওঠা গিঞ্জি পল্লীতে এক ছাপড়া ঘরে এক নারী তার ছোট্ট দুই শিশুকে নিয়ে নিরুপায় হয়ে ভিজছেন। ওই ঘরের চাল বলতে কিছুই ছিল না। ওপরে কেবল মোটা টাইপের পলিথিন দেয়া আর তা এতো বড় ছিদ্রযুক্ত ছিল যে, ওপর থেকেও নারীর ভাবলেশহীন মুখটা দেখতে আমার মোটেও অসুবিধা হচ্ছিল না। ওই ঘরের ভেতর নগ্ন এক শিশু দাঁড়িয়ে ছিল। সে বৃষ্টির জলে ভিজছিল। কিন্তু ওই বৃষ্টিতে ভেজার মধ্যে সে কোনো আনন্দ পাচ্ছিল না। তারই পাশে নিরুপায় সেই মা তার কোলের শিশুকে বুকে আগলে ধরে বসে মেঝেতে জমে যাওয়া পানির ওপরটায় বসে ছিলেন।
উপরে থেকে ওই দৃশ্য দেখে স্বস্তির এ বৃষ্টি অনেক নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল। আর যে মেয়েটিকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে অভিভূত হয়ে ছিলাম তাকে মনে হচ্ছিল অপরাধী। একই পৃথিবীর বাসিন্দা হলেও এর সব কিছু সবার জন্য নয়। কিছু মানুষের জীবন ভিন্ন, বহু রকমের। কিছু মানুষের কাছে হঠাত্ পাওয়া বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ আকর্ষণীয় কোনো সুর নয় বরং প্রকৃতির এক নিষ্ঠুরতা। পরের দিনও খুব বৃষ্টি হয়েছিল। সেই বৃষ্টিতে আমি শিখেছি, বৃষ্টি শুধু আনন্দই দেয় না, বরং চোখের পানিও ধুয়ে দেয়। 

সূত্র : আমার দেশ

Friday, March 25, 2011

অনু গল্প : প্রথম প্রেমের স্মৃতিটা ফেরত চাই ।। অরুদ্ধ সকাল

প্রকাশদাকে পেলাম না।

আমার কৈশর থেকে কলেজ দিনগুলির স্মৃতিতে যে ব্যক্তিটি জড়িয়ে আছে সেই প্রকাশদা। যার ছোলাবোটের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। প্রতি সন্ধ্যেয় যার হাতের ফোচকা না হলে চলতো না আমার। আমি যার হাতের মাখানো ঝালমুড়িকে পৃথিবীর সেরা ঝালমুড়ি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলাম।ইচ্ছে ছিলো আমার টাকা হলে, প্রকাশদাকে আমাদের বাড়িতে রেখে দেব। তা, আর আমার হয়নি কেননা যে বাড়িতে তাকে রাখতে চেয়েছিলাম, আজ সে বাড়িতে নিজেরইতো ঠাই হয়না।

প্রকাশদার বাড়িটা চিনতাম, রিভার ষ্ট্রিটের পশ্চিম প্রান্তেই একচালা টিনের ঘরের বাসিন্দা ছিলো প্রকাশদা। শহীদপার্কের যে কোন সমাবেশ কিংবা গড়ের মাঠের ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচ তার মিস হবার নয়। তিন চাকাওলা ভ্যানের মতো তার ছোট্ট ঠেলা গাড়িটা নিয়ে সকাল-সন্ধ্যে পথে বেরুত। আমার স্কুল পালানোর বয়সেই তার সাথে পরিচয় ঘটেছিলে। ক্লাস এইটের গেইট পেরুবার আগেই তার কাছে বই রেখে সপ্তাহে একদিন সিনেমাহলটা ধন্য করতে চলে যেতাম।

কলেজ পাশ করবার পর পর্যন্তও প্রকাশদার সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো। যে বছর বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে এলাম তারপর থেকে আর যোগাযোগ করা হয়নি। পুরো ছয়টি বছর পর বাড়ি ফিরে তার খোজেই দু’দিন যাবত তন্ন তন্ন করে চষে বেড়াচ্ছি।



০২.



উইলকিংসন রোডের মাথায় যেসব অফিস দেখতে পেলাম, সেগুলো নতুন মনে হলো। আমার আগের দেখা উইলকিংসন রোডে এ প্রান্তটা তষর কলোনি ছিলো। কিন্তু এখন কলোনি উধাও হয়ে গিয়ে রাজনৈতিক দল গুলোর অফিস উঠেছে, আর তাই লাবন্যদের হদিস পাচ্ছিনা। তাছাড়া পুরো নগরটার সাথে সাথে আমি নিজেও খানিকটা অচেনা পথিক হয়ে গেছি সেটা ভাবতেই অবাক লাগছে। এই তো সেদিন ষ্টেশানে অরিন্দম বাবু দেখে বললে কি,রে অনি চেহারা অমন ফ্যাকাশে হলো কি করে !! বেশি মাত্রায় রোদে ঘোরাফেরা, আহার ঠিকমতো না করা। সবমিলিয়ে যায় দিন পোহায় রাত টাইপের থাকলে চেহারা যে এমন হবে সেটা বোঝাই কি করে।

শিমু দি বা মেজ দি তো উঠতে বসতে টিপ্পনি কাটে সকাল-দুপুর প্রেম একটা করেছিলি অনি; শেষ পর্যন্ত তোকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়লো। জেল-পিটুনি খাবার পর কানে ধরে বলেছি বেচেঁ থাকতে প্রেম আর নয়। নারী যে নাগিনী হতে পারে তাতে সন্দেহ নেই।



০৩.



আমি নিজের মনের আকাশকেই এতো বলি। ওটা আমার প্রেম ছিলেনা। ছিলো প্রতারনা কিন্তু মন সেটা বুঝবে না। সে বলে প্রেম প্রেম আচ্ছা ভালোবাসা না থাকলে ক্ষতিটা কি হতো ওই শালা চন্ডিদাশ,রজকিনী কিংবা শিরি-ফরহাদকে সামনে পেলে ঝাড়ু পেটা করতাম। শালারা খেয়ে দেয়ে কাজ পায়নি আর। প্রেমিষ্ট হয়েছে।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মেন্টাল অবস্থায় হাসপাতালের বেডে যখন ছিলেম; তখন নার্স গুলোকে দেখলেই ইচ্ছে করতো গলাটিপে মেরে ফেলি সবক’টাকে; কিন্তু পরে বুঝেছি ওদের কি দোষ সব নারী তো আর এক নয়। আমার প্রেম হারাবার কান্না আর পুলিশের প্যাদানি; সব মিলিয়ে ভজঘট হয়ে গেলো লাইফটা। দোষ না করেও আমি কষ্ট পেয়েছিলাম; যখন শুনলাম আমি নাকি অপহরন করেছি কৃষ্ণাকে।

আচ্ছা মানুষ নিজেকে নিজে অপহরণ করতে পারেনা। যদি সম্ভব হতো তাহলে একদিন নিজেকে নিজে অপহরণ করতাম।



০৪.



কাচাঁদিনের পাঁকা প্রেম তো আমাকে কম তো ভোগায় নি। ছেলেরা বড্ড চলাক হয় মেয়েরাও কিন্তু কম না। আমি বোকা বা হাদারাম কোনটাই ছিলাম না। তথাপি আমি কিন্তু হার মেনেছি টাকার কাছে।

পৃথিবীতে টাকার কাছে প্রেম কিছুই না। আর সেটা আমার সামনে ভেসেছে সেই ধুমকেতুর মতো; যে ধূমকেতুটা দেখতে গিয়ে ছোট বেলায় সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আমার হাত ভেঙ্গে গিয়েছিলো। সেই ভাঙ্গা হাতে আমি এখনও শক্তি পাই কম।

আমি সেই দিবসে কার মুখ দর্শন করে যে উঠেছিলাম কে জানে। পুরো দিনটাই বিদ্ধস্ত ভাবে কাটিয়েছি সকাল থেকে দুপুর অতপর বিকেল থেকে সন্ধ্যে পার্কের প্রতিটি দূর্বা ঘাস পেরুনো বোধকরি আমার বাকী ছিলোনা। সময় কঠিন তার চেয়ে কঠিন অপেক্ষা করা। আমি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে আর পারিনি। আইন রক্ষার খাকী পোষাকের সদস্যরা আমাকে জেলে নিয়ে পুরেছে।



তারপর মাস ছয়েক চার দেয়ালের কারাগার বাস।

আমি পর্যায়ের এমন স্তরে গিয়েছিলাম প্রায় উন্মাদ যাকে বলে। তা সবটাই প্রেমের জন্য। কোন গাধা নাকি লিখেছিলো ভালোবাসা পেলে কোন বোকা পড়ে থাকে জলে। আমি জলে পড়ে থাকলেই ভালো করতাম পতঙ্গ হয়ে উড়তে গিয়েই যতো কান্ড ঘটালাম। হায়রে প্রেম।

কৃষ্ণা সেদিন পালিয়েছিলো ঠিকই তবে আমার সাথে নয়; অন্য কারো সাথে। সবাই জানতো আমিই তার প্রেম পতঙ্গ তাই জেলে ঠেসে দিতে কেউ কার্পন্য বোধ করেনি।

কৃষ্ণা পুরো ছ’মাস পালিয়ে গিয়ে কারো সাথে যোগাযোগ করেনি; আমাকেও তাই ছমাস কারাভোগ করতে হয়েছে। জেলা শহরের কারাভোগ শেষে আমি আর বাড়ি ফিরিনি ; আর ফিরতামই বা কোন মুখে। তাই শহরেই থেকে গেছি।

সেদিন বই মেলায় ভ্রান্ত পথিকের মতো হাটতে গিয়ে কৃষ্ণার সাথে দেখা। বলে বসলে আমি যে তোমায় ভালোবাসতাম তার কোন নমুনা আছে ? আমি তো হতবাক বলে কি !! তাই তো মনটা খচ্ করে উঠলো। প্রেমের নমুনা বলতে গেলে একটা চিঠি আছে কৃষ্ণার। সেটা আছে প্রকাশদার কাছে।

আজ ছ’বছর পর এসেছি নগরে তাও আবার প্রকাশদার খোজে; যার কাছে রয়েছে আমার সেই প্রেমের নমুনা একটা মাত্র প্রেমের চিঠি সেটা পেলে কৃষ্ণার মুখে ছুড়ে দিয়ে প্রেমটা ফেরত চাইবো।



আজ প্রকাশদাকে অনেক খুজলাম। পেলাম না । লাবন্য ছিলো ওর একমাত্র বান্ধবী ওকে পেলে প্রকাশদার ঠিকানা পেতাম তাও হলোনা। রিভার ষ্ট্রিটের বঙ্কুবাবু বললেন তুমি পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর প্রকাশ চলে গেছে এই নগর ছেড়ে। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারেনা।

তবুও আমি হন্যে হয়ে খুজছি প্রকাশদাকে । তাকে পেলে আমি আমার পুরোনো প্রেমের গন্ধমাখা চিঠিটা পেতাম। প্রেম চাইনা কিন্তু প্রথম প্রেমের স্মৃতিটা ফেরত চাই।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ