প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label গ্রহ. Show all posts
Showing posts with label গ্রহ. Show all posts

Friday, March 18, 2011

গ্রহ রাজ বৃহস্পতি

বৃহস্পতি গ্রহ





রাতের আকাশে এখন চাঁদের পাশেই যে বড় আলোক বিন্দুটি উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিচ্ছে সেদিকে টেলিস্কোপে চোখ রেখেই দেখা যাবে চারটি বিন্দু, একটি বড় আর তিনটি ছোট। বড় বিন্দুটিই হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহ আর ছোটো তিনটি বিন্দু হচ্ছে বৃহস্পতির তিনটি বৃহৎ উপগ্রহ।

আসুন সামান্য কিছু জানি বৃহস্পতি গ্রহ সম্পর্কে
গ্রহরাজ বৃহস্পতিকে প্রকৃত পক্ষেই গ্রহদের রাজা বলা চলে। বৃহস্পতি গ্রহকে ইংরেজীতে বলা হয় Jupiter (জুপিটার)। রোমানরা গ্রহটির নাম রেখেছিল পৌরাণিক চরিত্র জুপিচারের নামে। জুপিটার রোমান পুরাণের প্রধান দেবতা। জুপিটার অর্থ হচ্ছে "আকাশের পিতা"।

সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পঞ্চম এবং আকার আয়তনের দিক দিয়ে সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ হচ্চছ আমার বৃহস্পতি। বৃহস্পতি ব্যতিত সৌর জগতের বাকি সবগুলো গ্রহের ভরকে একত্র করলেও বৃহস্পতির ভর তা থেকে প্রায় আড়াই গুণ বেশি হবে। সূর্যের সব কটি গ্রহের ভর সমস্টির প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ ভরই হচ্ছে বৃহস্পতির। বৃহস্পতিসহ আরও তিনটি গ্রহ শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকে একসাথে গ্যাস দানব গ্রহ বলা হয়। বৃহস্পতি গ্রহ এতোই বড় যে এর ভিতরে চাইলেই ১০০০টি পৃথিবী অনায়াশে পুরে রাখা যাবে।

বৃহস্পতি সূর্য থেকে ৭৭.৮৪ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আর পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮০ কোটি কিলোমিটার। এর ভর পৃথিবীর ৩১৭.৮ গুণ আর ব্যাস ১১.২ গুণ। এর গড় ঘনত্ব পানির ১.৩ গুণ। নিজ অক্ষের চারপাশে এর ঘূর্ণনকাল ৯.৮ ঘণ্টা আর সূর্যের চারপাশে আবর্তন করতে এর সময় লাগে ১১.৮৬ বছর। অর্থাৎ পৃথিবীর হিসেবে মাত্র ৯.৮ঘন্টায় বৃহস্পতিতে এক দিন হয়, কিন্তু বৃহস্পতির একবছর হতে সময় রাগে পৃথিবীর হিসেবে মাত্র ১১.৮৬ বছর। এতো বেশী সময় লাগার একমাত্র কারণ হচ্ছে সূর্য থেকে এর দূরুত্বজনিত বিশাল বড় অরবিট বা কক্ষপথ। বিশাল বতুলাকার বা ডিম্বাকার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বৃহস্পতি পৃথিবীর অনেকটাই কাছে চলে আসে। এই বছর সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখে ৪৭ বছর পর পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে বৃহস্পতি। এর আগে সর্বশেষ ১৯৬৩ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল আর আবার ২০২২ সালের পর পুনরায় একে একই অবস্থানে পাওয়া যাবে।


বৃহস্পতি গ্রহের বায়ুমণ্ডল গ্যাসের মেঘে ছাওয়া। মেঘ ছাড়া বৃহস্পতির আর কিছুই বাইরে থেকে দেখা যায় না, কারণ এই মেঘ প্রায় ১০০ কি.মি পূরু। এই মেঘের তাপমাত্রা -১২০ডিগ্রী সে. এরও কম। পৃথিবী থেকে দেখলে বৃহস্পতির আপাত উজ্জ্বলতার মান পাওয়া যায় ২.৮। এটি পৃথিবীর আকাশে দৃশ্যমান তৃতীয় উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। কেবল চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের উজ্জ্বলতা এর থেকে বেশি। অবশ্য কক্ষপথের কিছু বিন্দুতে মঙ্গল গ্রহের উজ্জ্বলতা বৃহস্পতির চেয়ে বেশি হয়ে থাকে।

যদিও বৃহস্পতি গ্যাসিয় গ্রহ তবুও ধারনা করা হয় গলিত সিলিকেট ও ধাতুর দ্বারা বৃহস্পতির একটি কঠিন কেন্দ্রকণা গঠিতো হয়েছে। এই কেন্দ্রকণার আকার প্রায় পৃথিবীর আকারের সমান। এ ছাড়া বৃহস্পতি, সূর্যেরই মতো হাইড্রজেন ও হিলিয়ামে গঠিতো। বৃহস্পতির মেঘের উপরি ভাগের তাপমাত্রা -১২০ডিগ্রী সে. এরও কম হলে কিহবে, এর কেন্দ্রের তাপমাত্রা ৩০০০০ ডিগ্রী সে.। অর্থাৎ এই তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্টদেশের প্রায় ৫গুণ বেশী। তাই বলা যায় বৃহস্পতির অভ্যন্তরে নিজস্ব তেজের উৎস রয়েছে।

আগেই বলেছি বৃহস্পতি গ্রহের প্রাথমিক উপাদান হচ্ছে হাইড্রোজেন এবং সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম। খুব দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে এর আকৃতি হয়েছে কমলাকৃতির গোলকের মত। এই বিশাস গ্রহের বাইরের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন অক্ষাংশে ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে। এ ধরণের পরিবেশের একটি অন্যতম ফলাফল হচ্ছে মহা লাল দাগ (great red spot)।

এটি মূলত একটি অতি শক্তিশালী ঝড় যা সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলেছে বলে ধারণা করা হয়। গ্রহটিকে ঘিরে একটি দুর্বল বা ক্ষীন বলয় এবং শক্তিশালী চৌম্বোকক্ষেত্র রয়েছে।

উপগ্রহ
বৃহষ্পতির ৬৩টি নামকরণকৃত উপগ্রহ বা চাঁদ রয়েছে। এদের মধ্যে ৪৭টির ব্যাস ১০কিলোমিটারের চেয়েও কম এবং ১৯৭৫ সালের পর আবিষ্কৃত । বৃহষ্পতির সবচেয়ে বড় চারটি উপগ্রহ হল আয়ো, ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টো, এদেরকে গ্যালিলীয় উপগ্রহ বলা হয়। কারণ ১৬১০ সালে গ্যালিলিও প্রথম এই চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন।

সেদিন ছিলো ১৬১০ সালের জানুয়ারি মাসের ৭ তারিখ। বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তার তৈরি দূরবীন দিয়ে চোখ রাখলেন রাতের আকাশের সবচে উজ্জ্বল বস্তু, বৃহস্পতি গ্রহের দিকে।

বৃহস্পতির দুপাশে একই সরলরেখায় কয়েকটি ছোট ছোট আলোক বিন্দু দেখতে পেলেন গ্যালিলিও। বৃহস্পতির বামে দুটি ছোট আলোক বিন্দু আর ডানে একটি। পরের রাতে গ্যালিলিও একরাশ বিস্ময় নিয়ে খেয়াল করলেন, তিনটি নক্ষত্রই চলে এসেছে বৃহস্পতির ডানে। দৃশ্যটা দেখে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন গ্যালিলিও। আরও বোকা বনে গেলেন গ্যালিলিও, এর পরের রাতে এবার দেখা গেল দুটো নক্ষত্র বৃহস্পতির বামে চলে গেছে এবং একটা নক্ষত্র উধাও। এর পরের দুই রাতে দেখা গেল, নক্ষত্র তিনটা বৃহস্পতির এপাশ থেকে ওপাশে নড়াচড়া করছে। শেষমেষ তিনি বুঝলেন, নক্ষত্রগুলো বৃহস্পতির চার পাশে ঘুরছে এবং এরা নক্ষত্র নয়, চাঁদ। বৃহস্পতির চাঁদ। জানুয়ারির ১৩ তারিখ গ্যালিলিও বৃহস্পতির চতুর্থ চাঁদটিকেও দেখতে পেলেন। এটি গ্যালিলিও যে ক’দিন ধরে বৃহস্পতি দেখছেন ততোদিন বৃহস্পতির আড়ালেই ছিলো।
এরাই গ্যালিলিও আবিস্কার করা চারটি উপগ্রহ বা বৃহস্পতির চাঁদ। । এই চার উপগ্রহ বা চাঁদকে একত্রে গ্যালিলিও সম্মানে বলা হয় গ্যালিলিওউপগ্রহ বা চাঁদ।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, বৃহস্পতির সর্ববৃহৎ উপগ্রহ গ্যানিমেডের আকৃতি বুধ গ্রহের চেয়েও বড় আর সেই সাথে সৌরজগতে সবচেয়ে বড় উপগ্রহও বটে।

বৃহস্পতির উপগ্রহগুলি
1. Io
2. Europa
3. Ganymede
4. Callisto
5. Amalthea
6. Himalia
7. Elara
8. Pasiphae
9. Sinope
10. Lysithea
11. Carme
12. Ananke
13. Leda
14. Thebe
15. Adrastea
16. Metis
17. Callirrhoe
18. Themisto
19. Megaclite
20. Taygete
21. Chaldene
22. Harpalyke
23. Kalyke
24. Iocaste
25. Erinome
26. Isonoe
27. Praxidike
28. Autonoe
29. Thyone
30. Hermippe
31. Aitne
32. Eurydome
33. Euanthe
34. Euporie
35. Orthosie
36. Sponde
37. Kale
38. Pasithee
39. Hegemone
40. Mneme
41. Aoede
42. Thelxinoe
43. Arche
44. Kallichore
45. Helike
46. Carpo
47. Eukelade
48. Cyllene
49. Kore
50. Herse
সংখ্যাদ্বারা পরিচিত উপগ্রহগুলি-
1. S/2003 J2
2. S/2003 J3
3. S/2003 J4
4. S/2003 J5
5. S/2003 J9
6. S/2003 J10
7. S/2003 J12
8. S/2003 J15
9. S/2003 J16
10. S/2003 J18
11. S/2003 J19
12. S/2003 J23

বৃহস্পতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযান
পাইওনিয়ার-১০ : যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে পাইওনিয়ার-১০ উৎক্ষেপণ করে। এটি বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে প্রথম মনুষ্যবিহীন মহাশূন্যযান। ১৯৭৩ সালের ৩ ডিসেম্বর পাইওনিয়ার-১০ বৃহস্পতির কক্ষে প্রবেশ করে প্রায় ১৩০.০০০ কিলোমিটার দূরত্বে বৃহস্পতিকে পরিক্রমণ করে। এটি বৃহস্পতির বিকিরণ বলয় নিরূপণ করে এবং হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সন্ধান লাভ করে। এছাড়া এটি বৃহস্পতির চুম্বক ক্ষেত্র আবিষ্কার করে। এ চুম্বক ক্ষেত্র লম্বা লেজের মতো যেটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার লম্বা।

পাইওনিয়ার-১১ : ১৯৭৩ সালের ৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র মনুষ্যবিহীন মহাশূন্যযান পাইওনিয়ার-১১ বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করে। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে এটি বৃহস্পতির কক্ষপথে পরিক্রমণ করে।

পাইওনিয়ার-১২ : ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র মনুষ্যবিহীন মহাশূন্যযান পাইওনিয়ার-১২ বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করে। এটি ১৯৭৫ সালের নভেম্বর বৃহস্পতি কক্ষপথে পৌঁছে।

পাইওনিয়ার সের্টান : ১৯৭৪ সালের ২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র পাইওনিয়ার সের্টান নামে মনুষ্যবিহীন মহাশূন্যযান বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করে। এটি বৃহস্পতির প্রায় ৪২.০০০ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

ভয়েজার-১ : ১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র মনুষ্যবিহীন মহাশূন্যযান ভয়েজার-১ বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করে। এটি ১৯৭৯ সালের ৫ মার্চ বৃহস্পতির কক্ষ পরিক্রমণ করে। এ মহাশূন্যযান বৃহস্পতির চারদিকে বেষ্টনকৃত পাতলা বলয় আবিষ্কার করে।

ভয়েজার-২ : ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট ভয়েজার-২ বৃহস্পতির উদ্দেশ্যে উৎক্ষিপ্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ মনুষ্যবিহীন মহাশূন্যযানটি ১৯৭৯ সালের ১০ জুলাই বৃহস্পতির কক্ষপথ পরিক্রমণ করে। এটি বৃহস্পতির ৪টি বড় উপগ্রহের বিস্তারিত বিভিন্ন প্রকার ছবি প্রেরণ করে।



এক ঝলকে বৃহস্পতি গ্রহ



অপসূর দূরত্ব: ৮১৬,৬২০,০০০ কিমি বা ৫.৪৬ এ ইউ বা ৫০৭,০০০,০০০ মাইল।
অনুসূর দূরত্ব: ৭৪০,৫২০,০০০ কিমি বা ৪.৯৫ এ ইউ বা ৪৬০,২৮০,০০০ মাইল।
অর্ধ-মুখ্য অক্ষ: ৭৭৮,৩০০,০০০ কিমি বা ৫.২০৩৩৬৩০১ এ ইউ বা ৪৮৩,৬৮০,০০০ মাইল ।
কক্ষীয় পরিধি: ৩২.৬৭৫ এইউ
কক্ষীয় উৎকেন্দ্রিকতা: ০.০৪৮৩৯২৬৬
নাক্ষত্রিক পর্যায়: ৪,৩৩২.৫৮৯ দিন বা (১১.৮৬২ বছর)
যুতিকাল: ৩৯৮.৮৮ দিন গড়
কক্ষীয় দ্রুতি: ১৩.০৭ কিমি/সে সর্বোচ্চ
কক্ষীয় দ্রুতি: ১৩.৭২ কিমি/সে সর্বনিম্ন
কক্ষীয় দ্রুতি: ১২.৪৪ কিমি/সে
নতি: ১.৩০৫৩০° (৬.০৯° সূর্যের বিষুবের সাথে)
উদ্বিন্দুর দ্রাঘিমা: ১০০.৫৫৬১৫°
অনুসূর কোণ: ১৪.৭৫৩৮৫°
উপগ্রহসমূহ: ৬৩

ভৌত বৈশিষ্ট্যসমূহ
বিষুবীয় ব্যাসার্ধ্য: ৭১,৪৯২ কিমি (পৃথিবীর ১১.২০৯ গুণ)
মেরু ব্যাসার্ধ্য: ৬৬,৮৫৪ কিমি (পৃথিবীর ১০.৫১৭ গুণ)
কমলাকৃতি: ০.০৬৪৮৭
পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল: ৬.১৪×১০১০ কিমি২ (পৃথিবীর ১২০.৫ গুণ)
আয়তন: ১.৪৩১২৮×১০১৫ কিমি৩ (পৃথিবীর ১৩২১.৩ গুণ)
ভর: ১.৮৯৮৬×১০২৭ কেজি (পৃথিবীর ৩১৭.৮ গুণ)
গড় ঘনত্ব: ১.৩২৬ g/cm৩
বিষুবীয় পৃষ্ঠের অভিকর্ষ: ২৪.৭৯ মি/সে২ (২.৩৫৮ g)
মুক্তি বেগ: ৫৯.৫ কিমি/সে
নাক্ষত্রিক ঘূর্ণনকাল: ৯.৯২৫০ h[৩]
বিষুবীয় অঞ্চলে ঘূর্ণন বেগ: ১২.৬ কিমি/সে = ৪৫,৩০০ কিমি/ঘ
এক্সিয়াল টিল্ট: ৩.১৩°
উত্তর মেরুর বিষুবাংশ: ২৬৮.০৫° (১৭ ঘ ৫২ মিন ১২ সে)
বিষুবলম্ব: ৬৪.৪৯°
প্রতিফলন অনুপাত: ০.৫২
পৃষ্ঠের তাপমাত্রা: সর্বনিম্ন ১১০ K, গড় ১৫২ K কেলভিন
বিশেষণসমূহ: Jovian
বায়ুমণ্ডল পৃষ্ঠের চাপ: ২০–২০০ কিলোপ্যাসকেল[৪]

(মেঘের আস্তর) গাঠনিক উপাদান:
~৮৬% H2
~১৩% হিলিয়াম
০.১% মিথেন
০.১% পানি বাষ্প
০.০২% অ্যামোনিয়া
০.০০০২% ইথেন
০.০০০১% ফসফিন
০.০০০১০% হাইড্রোজেন সালফাইড

(বিভিন্ন বই পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, ফলে তথ্যের কোনো গড়মিল থাকলে তা আমারই ভুল হিসেবে ধরে নিয়ে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।)

গ্রন্থপূঞ্জিকাঃ
১। বিশ্ব ও সৌরজগৎ ---- মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।
২। খগোল-পরিচয় ---- - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।

নেট সূত্রঃ
সূত্র ১ , সূত্র ২ , সূত্র ৩ , সূত্র ৪ , সূত্র ৫ , সূত্র ৬
সূত্র ৭ 


পূর্ব ঝিঁঝিঁ পোকায় প্রকাশিত 

বুধ গ্রহের আদি অন্ত

বুধ গ্রহ

বুধ গ্রহের ইংরেজী Mercury বা মার্কিউরী। বুধ হচ্ছে সূর্যের নিকটতম গ্রহ। সূর্যের খুব কাছে হওয়ার ফলে বুধ পৃষ্ঠ থেকে সূর্যের দিকে তাকালে সূর্যকে পৃথিবীতে যত বড় দেখায় তার চেয়ে আড়াইগুণ বড় দেখা যাবে। সেই সাথে সৌরজগতের সবচাইতে ক্ষুদ্রতম গ্রহ হচ্ছে এই বুধ গ্রহ। এই কারণে বুধের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও অনেক কম, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে পৃথিবীতে যদি আপনার ওজন ৭০ কেজি হয় তাহলে বুধে আপনার ওজন হবে প্রায় ২৩ কেজি। বুধগ্রহের কোনো উপগ্রহ নেই। গ্রহটির কোনও স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডলও নেই। এটি সূর্যকে প্রতি ৮৮ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে অর্থাৎ পৃথিবীর হিসাবে মাত্র ৮৮দিনেই বুধের ১বছর পূর্ন হয়ে যায়, যেখানে পৃথিবীর লাগে ৩৬৫দিন। বুধ দীর্ঘ ১৭৬ দিনে একবার নিজ অক্ষে আবর্তন করে, অর্থাৎ পৃথিবীর ১৭৬দিনে বুধের ১দিন সম্পন্ন হয়, যখানে পৃথিবীর সময় লাগে মাত্র ২৪ ঘন্টা।। অন্যদিকে এর উজ্জ্বলতার আপাত মান ২.০ থেকে ৫.৫ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর আয়তন অন্যাতন্ত ক্ষুদ্র ও সূর্যের খুব নিকটে হওযায় পৃথিবী থেকে একে খালি চোখে অত্যান্ত কঠিন। সুর্যের সাথে এর বৃহত্তম কৌণিক দূরত্ব হচ্ছে মাত্র ২৮.৩ ডিগ্রী। তাই শুধু মাত্র সকাল ও সন্ধ্যায় একে দেখাতে পাওয়ার ক্ষিন সম্ভাবনা থাকে। বুধ গ্রহটি সম্বন্ধে তুলনামূলক অনেক কম তথ্য জানা গেছে। কারণ এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র দুটি অভিযান চালানো হয়েছে বুধের দিকে। এই দুটি অভিজানের একটি হচ্ছে- নভোযান “মেরিনার ১০”, যা ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে অভিযান চালায়। আর আরেকটি হচ্ছে- “মেসেঞ্জার” যা ২০০৪ সালের আগস্টের ৩ তারিখে প্রেরিত হয়। অপর আরেকটি অভিজানের প্রস্তুতি চলছে, জাপান ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সাথে যৌথভাবে একটি অভিযানের পরিকল্পনা করছে যা বেপিকলম্বো নামে পরিচিত। এটি ২০১৩ সালে প্রেরন করা হবে বুধের উদ্দেশ্যে। 
“মেরিনার ১০” কর্তৃক তোলা বুধের ছবি

বুধের নামকরণ
সেই আদিকাল থেকেই এই গ্রহের ভারতীয় নাম “বুধ” -ই ছিল। ভারতীয় পুরান অনুযায়ী বুধ হল চন্দ্রের ছেলের নাম। অন্যদিকে রোমানরা এই গ্রহের নামকরণ করেছিল তাদের ক্ষীপ্রগতি বিশিষ্ট বার্তাবাহক দেবতা মার্কিউরির নামানুসারে। পৌরাণিক কাহিনীতে মার্কারি হল জুপিটার ও মেইয়ার পুত্র। ভেরের আকাশে ও গোধূলি লগ্নের আকাশে বুধকে অতি দ্রুত গতিতে চলতে দেখা যায় বলেই সম্ভবত এই নামকরণ করা হয়েছে।  

বুধ গ্রহের পৃষ্ঠ দেশ
বুধের ভূ-ত্বকের পুরুত্ব ১০০ - ২০০ কিমি-এর মধ্যে। সৌরজগতের সমস্ত গ্রহের মধ্যে এর আকার সবচেয়ে ছোট; বিষুবীয় অঞ্চলে এর ব্যাস মাত্র ৪৮৭৯ কিমি। এখন পর্যন্ত প্রপ্ত সমস্ত তথ্য প্রমাণ আর চিত্রের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে বুধ গ্রহের পৃষ্ঠদেশ অনেকাংশেই আমাদের চাঁদের মত। বুধ গ্রহের পৃষ্টদেশ চাঁদের মতোই সাগর এবং খাঁদের অস্তিত্য রয়েছে। ধারনা করা হয় বুধ বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে ভূতাত্ত্বিকভাবে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবে আদিতে এই গ্রহটিতেও আগ্নায়গিরী সক্রিয় ছিলো। ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন সেই আগ্নায়গিরীর লাফা স্রতের পথটিকে।

আরো ধারোনা করা হয় চাঁদের মতোই সৃষ্টির পরপরই বুধ গ্রহে বিপুল পরিমাণ ধূমকেতু এবং গ্রহাণু আঘাত হানে। আজ থেকে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে সেই আঘাতের ঘনঘটার সমাপ্তি ঘটে ঠিকই কিন্তু আঘাতের এই সময়টিতে বুধের সমগ্র পৃষ্ঠদেশ আক্রান্ত হয় আর সেই ক্ষত চিহ্ন আজও রয়ে গেছে বুধের পৃষ্ঠ দেশে।

বড় কোনো ধুমকেতুর আঘাতে তৈরি হয়েছে বুধের এই ক্ষত, যেকান থেকে চারপাশে ছড়িয়েপরেছে বস্তুপিণ্ড। বুধ গ্রহে রয়েছে অনেক খাঁদ। এই খাঁদ গুলি কয়েক কিলোমিটার থেকে কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হয়।

এখন পর্যন্ত জানা মতে সর্ববৃহৎ খাঁদটির ব্যাস প্রায় ১৩০০ কিমি।

বুধ গ্রহের বায়ুমণ্ডল
আগেই বলেছি বুধ গ্রহ খুবই ক্ষুদ্র। তাই বুধ গ্রহের পক্ষে কোন দীর্ঘ মেয়াদের বায়ুমণ্ডল গঠন ও তা ধরে রাখা সম্ভব নয়। গ্রহটি ক্ষুদ্র হওয়ার কারণে এর অভিকর্ষ বল খুবই কম। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় বুধেরও অতি সূক্ষ্ণ ও হালকা দুর্বল একটি বায়ুমণ্ডল রয়েছে যার প্রধান উপাদান হচ্ছে: হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, অক্সিজেন, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং পটাসিয়াম। দুর্বল বায়ুমণ্ডলের কারণে বুধের আকাশ প্রায় সবসময়ই কালো দেখা যাবে। আর তাই দিনের বেলাতেও বুধের আকাশের দিকে তাকালে অসংখ্য তারা দেখা যাবে। তাছাড়া এই বায়ুমণ্ডলটি সুস্থিত নয়। বায়ু মণ্ডলের পরমাণুগুলো নিরন্তরভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এবং আবার বিভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্টি হয়ে শূন্যস্থান পূরণ করে নিচ্ছে। হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমাণু সম্ভবত সৌর বায়ু থেকে উৎপন্ন হয়ে বুধের চুম্বক গোলকে আটকে যায়। কিন্তু পরে আবার এগুলো মহাশূন্যে হারিয়েও যায়। বুধের ভূ-ত্বকে বিদ্যমান পদার্থগুলোর তেজস্ক্রিয় ভাঙন হিলিয়ামের একটি উৎস। আবার এই ভাঙন থেকেই সোডিয়াম এবং পটাসিয়ামও সৃষ্টি হয়। বুধে সম্ভবত বাষ্পও রয়েছে। এর পৃষ্ঠের সাথে ধূমকেতুগুলোর সংঘর্ষের কারণে এই বাষ্পের সৃষ্টি হয়।
 
বুধ গ্রহের তাপমাত্রা
বুধগ্রহের তাপমাত্র আমাদের পৃথিবীর মতো স্থিতিশীল নয়। কারণ পৃথিবীর মতো বুধে কোনো বায়ু মণ্ডল নেই। বুধ গ্রহের পৃষ্ঠদেশের গড় তাপমাত্রা ৪৫২ কেলভিন বা ৩৫৩.৯ডিগ্রী ফারেনহাইট বা ১৭৮.৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় টিন ও সীসা পর্যন্ত গরে যেতে পারে। তবে এই মান স্থানভেদে ৯০ কেলভিন থেকে ৭০০ কেলভিনের পর্যন্ত উঠানামা করে থাকে। এই হিসাব থেকে বুঝা যায় বুধ পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৬১০ কেলভিন পর্যন্ত উঠানামা করে যেখানে পৃথিবী পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৮০ কে পর্যন্ত উঠানামা করতে পারে। একেতো বুধের কোন বায়ুমণ্ডল নেই, তার উপর আবার পৃথিবীর তুলনায় বুধ পৃষ্ঠে সূর্য রশ্মির তীব্রতা ৬.৫ গুণ বেশী। তবে এই সমানুপাতিক সম্পর্কের মধ্যে একটি সৌর ধ্রুবক রয়েছে যার মান ৯.১৩ কিলোওয়াট/বর্গমি.। বুধের বায়ুমণ্ডরের অভাবে এই তাপমাত্রা রাতে মাইনাস ১৭০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত নেমে যায়। সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান হচ্ছে অর্ধসৌর বিন্দু এবং শীতলতম স্থান হল এর মেরুর নিকটে অবস্থিত খাদসমূহের নিম্ন বিন্দু।

মজার বিষয় হচ্ছে বুধ পৃষ্ঠের এত উচ্চ তাপমাত্রা থাকা স্বত্তেও বুধ গ্রহে বরফ থাকতে পারে। বুধের মেরুর নিকটে অবস্থিত কিছু গভীর খাঁদের সমতলে সূর্য রশ্মি কখনও সরাসরি পৌছায় না। এতে সেখানকার খাঁদগুলির তাপমাত্রা সবসময়ই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার চেয়ে কম থাকে। এর ফলে সেখানে বরফের সৃষ্টি হয়। পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানীদের প্রেরিতো রাডার সংকেত বুধ গ্রহের মেরুর সন্নিকটে অবস্থিত বরফ খণ্ড থেকে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। তবে এই সংতেক প্রতিফলনের কারণ বরফ ছাড়া অন্য কিছুও হতে পারে। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে এটি বরফ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। ধারনা করা হয় বুধ গ্রহের মেরুর সন্নিকটে অবস্থিত খাঁদগুলিতে বরফের আবরণের পুরুত্ব মাত্র কয়েক মিটার। আশা করা হচ্ছে সেখানে ১০^১৪ থেকে ১০^১৫ কেজির মত বরফ রয়েছে। পৃথিবীর ও মঙ্গলের সাথে এই বরফের পরিমাণের তুলনা করলে দেখা যাবে- পৃথিবীর এন্টার্কটিকায় বরফের পরিমাণ ৪×১০^১৮ কেজি আর মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে বরফের পরিমাণ প্রায় ১০^১৬ কেজি। বুধ গ্রহে বরফের উৎপত্তির কারণ এখনো অজানা, তবে দুইটি সম্ভাব্য কারণ ব্যথ্যা করা হয়।
১। গ্রহের অভ্যন্তরভাগ থেকে পানির চুয়িয়ে চুয়িয়ে বেরিয়ে আসা এবং ঠান্ডায় জমে বরফে পরিন্ত হওয়।
২। ধূমকেতুর সাথে সংঘর্ষের ফলে জমা হওয়া পানি ও অন্যান্য বস্তু থেকে বরফের উপাদান। 

সৌর জগতের গ্রহগুলির মধ্যে চারটি গ্রহ কঠিন বস্তু দ্বার গঠিত, এদেরকে পার্থিব গ্রহ বলা হয়।

পার্থিব গ্রহগুলির আকারের তুলনা, বাম দিক থেকে বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মোঙ্গল গ্রহ


বুধ চারটি পার্থিব গ্রহের একটি অর্থাৎ এরও পৃথিবীর মত কঠিন পৃষ্ঠদেশ রয়েছে। বুধের যেসমস্ত উপাদান দিয়ে গঠিত তার মধ্যে ৭০ ভাগ ধাতব আর বাকি ৩০ ভাগ সিলিকেট জাতীয়। বুধের ঘনত্ব সৌর জাগতিক বস্তসমূহের ঘনত্বের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ৫.৪৩ গ্রাম/সেমি; পৃথিবী থেকে সামান্য কম। আমাদের সৌর জগতের অন্যান্য বৃহৎ গ্রহগুলোর যে কোনটির তুলনায় বুধে লৌহের পরিমাণ অনেক বেশী। বুধ যদিও ছোট একটি গ্রহ তথাপিও এর কেন্দ্রকণা পৃথিবী বা অন্য যে কোনো বড় গ্রহের তুলনার অনেক বড়। এই কেন্দ্রটি লৌহ কেন্দ্র । 

 
কক্ষপথ ও ঘূর্ণন
প্রধান গ্রহগুলোর মধ্যে বুধের কক্ষপথ সবচেয়ে উৎকেন্দ্রিক। সূর্য থেকে এর দূরত্ব ৪৬,০০০,০০০ থেকে ৭০,০০০,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে। নিজের কক্ষপথে চারদিকে একবার ঘুরে আসতে এর সময় লাগে ৮৮ দিন। চিত্রটিতে বুধের কক্ষপথের উপর উৎকেন্দ্রিকতার প্রভাব দেখানো হয়েছে।




অনুসূরের অগ্রগমন
আমরা জানি বুধের আবর্তন কাল ৮৮ দিন। কিন্তু পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা যায়, এর কক্ষপথের ধীর পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনটির ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে বুধের অনুসূর বিন্দুর পরিবর্তনের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি বুধের অনুসূরের অগ্রগমন নামে চিহ্নিত। এর পরিমাণ প্রতি ১০০ বছরে ১ডিগ্রী৩৩'২০''। এই অগ্রগমনের একটি কারণ হচ্ছে ভূ-কক্ষের বিষুবন বিন্দুর অগ্রগমন। এই কারণটিই মুখ্য। এছাড়া শতকরা ৭ থেকে ১০ ভাগ অগ্রগমনের কারণ হচ্ছে অন্যান্য গ্রহের আকর্ষণ। প্রতি একশ বছরে বুধের অনুসূর বিন্দু ৪৩ পরিমাণ অগ্রসর হয়। নিউটনীয় বলবিজ্ঞানের সাহায্যে এর কোন ব্যাখ্যা প্রদান সম্ভব হয় নি। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করতেন বুধ ও সূর্যের মাঝখানে অন্য কোন গ্রহ আছে। পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে বলেন, সূর্যের অবস্থিতির জন্য স্থান-কাল মহাশূন্যে একটি বক্রতার সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ নিউটনীয় নীতি এই বক্রতারই ফল। সূর্যের চারদিকে উক্ত বক্রপথে যেতে বুধের কক্ষের পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে এর অনুসূর বিন্দুর অগ্রগমন ঘটে। এই তত্ত্ব অনুসারে অগ্রগমনের পরিমাণ প্রতি ১০০ বছরে ৪৩.০৩ যা মূল পরিমাণের সাথে সুন্দরভাবে মিলে যায়। তাই বুধের অনুসূরের অগ্রগমন বর্তমানে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের একটি প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।




বুধ গ্রহ পর্যবেক্ষণ
বুধ গ্রহের আপাত মান ২.০ (লুব্ধক-এর চেয়ে বেশী) থেকে ৫.৫ এর মধ্যে থাকে। সূর্যের অতি নিকঠে অবস্থিত বলে একে পর্যবেক্ষণ করা বেশ দুঃসাধ্য। কারণ সূর্যের অত্যুজ্জ্বল আলোর কারণে অনেকটা সময় বুধকে দেখাই যায় না। ভোর বা সন্ধ্যার ক্ষীণ আলোতেই কেবল বুধকে দেখা যায়। হাবল মহাশূন্য দূরবীন বুধ গ্রহকে কখনই পর্যবেক্ষন করতে পারে না। নিরাপত্তার কারণেই হাবল দূরবীনকে সূর্যের দিকে ফোকাস করা হয়না। পৃথিবী থেকে যেমন চাঁদের কলা দেখা যায়, তেমনি বুধেরও কলা রয়েছে।

কিন্তু নবীন এবং পূর্ণ থাকা অবস্থায় বুধকে দেখা যায় না। কারণ এ সময় এই গ্রহটি সূর্যের সাথেই উদিত হয় এবং অস্ত যায়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের তুলনায় দক্ষিণ গোলার্ধে বুধ গ্রহকে ভালভাবে দেখা যায়। দক্ষিণ গোলার্ধের যে দেশগুলো থেকে বুধ গ্রহকে স্পষ্ট দেখা যায়ৱএর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা এবং নিউজিল্যান্ডের মত দেশগুলো। অবশ্য একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় অন্যান্য কয়েকটি গ্রহ এবং উজ্জ্বল তারার মত বুধ গ্রহকেও স্পষ্ট দেখা যায়।

বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি সর্বপ্রথম পৃথিবী থেকে দূরবীনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, সপ্তদশ শতাব্দীতে। তিনি শুক্র গ্রহের কলা পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন; কিন্তু তার দূরবীনটি বুধের কলা দেখার মত শক্তিশালী ছিল না।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে একটি অতি বিরল ঘটনা হচ্ছে পৃথিবীর সাপেক্ষে একটি গ্রহ অন্য একটি গ্রহের সামনে এসে পড়ে এবং এর ফলে একটি গ্রহ অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনাটিকে অদৃশ্যকরণ বলে। কিন্তু বুধ এবং শুক্র গ্রহ কয়েক শতাব্দী পরপরই একে অপরকে অদৃশ্য করে দেয়। শুক্র কর্তৃক বুধ গ্রহের পরবর্তী অদৃশ্যকরণের ঘটনা ঘটবে ২১৩৩ সালে।


বুধের উদ্দেশ্যে প্রেরিত সন্ধানী যান সমূহঃ
বুধের উদ্দেশ্যে পৃথিবী থেকে প্রেরিত একটি মহাকাশযানকে সূর্যের মহাকর্ষীয় বিভব উৎসের দিকে অবশ্যই ৯১ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হবে। বুধের নিকট দিয়ে অতিক্রমকারী একটি Hohmann transfer orbit-এর ভিতর প্রবেশ করতে হলে সন্ধানী যানটিকে একটি নির্দিষ্ট গতিবেগ অর্জন করতে হবে।

পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরোবার সময় এর বেগ থাকে পৃথিবীর কক্ষীয় বেগের সমান অর্থাৎ প্রায় ৩০ কিমি/সে। বুধের পাশের Hohmann transfer orbit-এ প্রবেশ করতে যে বেগ প্রয়োজন তা অর্জনের জন্য এক্ষেত্রে বেগের প্রচুর পরিবর্তন করতে হয়, যতটা অন্য কোন গ্রহে অভিযানের ক্ষেত্রে করতে হয়না। এজন্যই বুধ অভিযান অন্যান্য অভিযানের তুলনায় বেশি কষ্টকর। প্রকৃতপক্ষে পুরো সৌর জগৎ অতিক্রম করতে একটি মহাকাশযানকে যে পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করতে হয় তার চেয়ে বুধে অবতরণ করাতে হলে বেশি শক্তি দিতে হয়। বুধ গ্রহের উদ্দেশ্যে এখন পর্যন্ত দুটি মহাশূন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, আর তৃতীয় একটি অভিযানর প্রস্ততি চলছে। অভিজান গুলি হচ্ছে-



মেরিনার ১০

বুধ গ্রহ অভিযানে প্রেরিত প্রথম মাজাগতিক সন্ধানী যানের নাম “মেরিনার ১০”। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা ১৯৭৩ সালের ৮ই নভেম্বর এই যান প্রেরণ করে। এটি ১৯৭৪ সালের ১৯শে মার্চ বুধের৭৫০ কিমি দূরত্বে গিয়ে পৌছায়। পরে ২১শে সেপ্টম্বর ১৯৭৪ এবং ১৬ই মার্চ ১৯৭৫ সালে বুধে সবচেয়ে কাছে পৌছায়। এজন্য “মেরিনার ১০” শুক্র গ্রহের অভিকর্ষকে কাজে লাগিয়েছে। মূলত শুক্রের অভিকর্ষকে কাজে লাগিয়ে “মেরিনার ১০” তার কক্ষীয় বেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বুধের দিকে অগ্রসর হতে পেরেছে।

মহাকর্ষীয় স্লিংশট নামক এই প্রভাব “মেরিনার ১০”ই প্রথমবারের মত ব্যবহার করেছে। “মেরিনার ১০” প্রথমবারের মত বুধের অতি কাছ থেকে প্রচুর ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত মেরিনার ১০এর কক্ষীয় পর্যায় ঠিক বুধের ৩ নাক্ষত্রিক দিনের সমান ছিল। এর কারণে “মেরিনার ১০” যখনই বুধের কাছাকাছি হতে পেরেছে তখন সবসময়ই বুধের একটিমাত্র পৃষ্ঠ মহাকাশযানটির সামনে আসতে পেরেছে। ফলস্বরুপ বুধের সমগ্র পৃষ্ঠের মাত্র ৪৫% মানচিত্রের মাধ্যমে চিত্রিত করা সম্ভব হয়েছে।

সন্ধানী যানটি তিন তিনবার বুধের খুব সন্নিকটে যেতে পেরেছিল। এর মধ্যে নিকটতম ছিল বুধ পৃষ্ঠের ৩২৭ কিমি দূর পর্যন্ত। প্রথমবার কাছে যাওয়ার মাধ্যমে “মেরিনার ১০” বুধে একটি অভাবনীয় চৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে। দ্বিতীয়বার যখন মেরিনার ১০ বুধ এর খুব সন্নিকটে যায় তখন বুধ পৃষ্ঠের প্রচুর ছবি তোলা সম্ভব হয়। কিন্তু তৃতীয়বার নিকটবর্তী হওয়াটা ছিল আরও কার্যকরী। কারণ তখন গ্রহটির চৌম্বক ধর্ম সম্বন্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত জানা সম্ভব হয়। উপাত্তগুলো থেকে বোঝা যায়, গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্র অনেকটা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের মত যা গ্রহের চারপাশের সৌর বায়ুকে পথচ্যুত করতে পারে। শেষবারের মত বুধের সন্নিকটে যাওয়ার পর “মেরিনার ১০”-এর জ্বালানী প্রায় ফুরিয়ে যায়। এর ফলে পৃথিবী থেকে এই অভিযানের নিয়ন্ত্রণ রক্ষা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে। অবশেষে পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অভিযানের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। মূলত পৃথিবী থেকে সংকেত দেয়া হয়েছিল যেন, “মেরিনার ১০” নিজেই নিজের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। ধারণা করা হয় “মেরিনার ১০” এখনও সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এবং প্রতি কয়েকমাসে একবার করে বুধ গ্রহের সন্নিকটে যাচ্ছে।




মেসেঞ্জার
[img]http://cdn.wn.com/pd/20/15/0c209e3aaa8c783d5df1d987c602_grande.jpg" alt="" />
বুধের উদ্দেশ্যে নাসা কর্তৃক প্রেরিত দ্বিতীয় অভিযান ছিল মেসেঞ্জার। “MESSENGER” শব্দটি এসেছে - MErcury Surface, Space ENvironment, GEochemistry, and Ranging থেকে। এটি ২০০৪ সালের আগস্টের ৩ তারিখে প্রেরিত হয়। এই সন্ধানী যানটি বেশ কয়েকবার বুধের সন্নিকটে যেতে সমর্থ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি বুধের চারদিকে নিজস্ব একটি কক্ষপথ তৈরীতে সমর্থ হয়। ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে এটি পৃথিবীর কাছ দিয়ে উড়ে যায় এবং ২০০৭ সালের অক্টোবর ও জুন মাসে শুক্র গ্রহের কাছ দিয়ে উড়ে যায়। এই যানটি বুধের নিকট দিয়ে তিন তিনবার উড়ে যাবে বলে শিডিউল করা হয়েছে। এই উড়ে যাওয়ার সময়গুলো হবে জানুয়ারি ২০০৮, অক্টোবর ২০০৮ এবং সেপ্টেম্বর ২০০৯। এর পর তা ২০১১ সালের মার্চ মাসে বুধ গ্রহের চারপাশে কক্ষপথে প্রবেশ করবে।

মেসেঞ্জারের ভ্রমণ পথ
মেসেঞ্জারকে পাঠানো হয়েছে মূলত বুধের ছয়টি মৌলিক বিষয়ে অনুসন্ধান করার জন্য। এগুলো হচ্ছে:
১। বুধের উচ্চ ঘনত্ব,
২। এর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস,
৩। এর চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রকৃতি,
৪। এর কেন্দ্রের গঠন,
৫। এর মেরু অঞ্চলসমূহে আসলেই বরফ রয়েছে কিনা,
৬। এবং এর পাতলা বায়ুমণ্ডল কোথা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে।

মেসেঞ্জার যখন বুধ গ্রহের চারপাশে দ্বিতীয়বারের মত প্রদক্ষিণ করে সে সময় অনেক কাছ থেকে বুধ গ্রহের ১২০০ এরও বেশী ছবি তোলা হয়৷ এসব ছবি থেকে বিজ্ঞানীরা বুধ গ্রহ সম্পর্কে আরো অজানা তথ্য জানতে পারছেন৷ তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বুধ গ্রহের ৬৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ গর্ত।




বেপিকলম্বো

জাপান ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সাথে যৌথভাবে একটি অভিযানের পরিকল্পনা করছে যা বেপিকলম্বো নামে পরিচিত। এই অভিযানে দুই সন্ধানী যান ব্যবহৃত হবে যারা বুধের কক্ষপথ পরিভ্রমণ করবে। দুটি সন্ধানী যানের একটি বুধের মানচিত্র প্রণয়নের কাজ করবে এবং অপরটি এর ম্যাগনেটোস্ফিয়ার নিয়ে গবেষণায় ব্যবহৃত হবে। একটি ল্যান্ডার সহ মূল পরিকল্পনাটি করা হয়ে গেছে। ২০১৩ সালে রাশিয়ার সয়ুজ রকেটসমূহ এই সন্ধানী যানটি বহনের কাজ করবে। মেসেঞ্জারের সাথেই বেপিকলম্বো বেশ কয়েকবার বুধের অতি সন্নিকটে যাবে। একইভাবে এটি চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের নিকট দিয়ে উড়ে গিয়ে বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করার পূর্ব বেশ কয়েকবার এর নিকটবর্তী হবে। আনুমানিক ২০১৯ সালের দিকে এটি বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করবে এবং প্রায় এক বছর ধরে একে অধ্যয়ন করবে। এই অভিযানটির নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী গিউসেপ (বেপি) কলম্বোর (Giuseppe Colombo) নামানুসারে। তিনিই প্রথম সূর্যের সাথে বুধের কক্ষীয় রেজোন্যান্স নির্ণয় করেছিলেন।

আজকের মতো এখানেই শেষ করছি বুধ গ্রহের ইতিহাস, আগামীতে অন্য কোনো গ্রহে আবার দেখা হবে আশা করি।

গ্রন্থপুঞ্জিঃ
খগোল পরিচয় - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।
বিশ্ব ও সৌরজগৎ - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।
মহাকাশ বার্তা পত্রিকার কয়েকটি ইসু।

ওয়েব সাইট লিংক সমূহঃ
নাসা, উইকি-১, daviddarling, geology, উইকি-২, উইকি-৩, মেরিনার-১০, মেসেঞ্জার, বেপিকলম্বো।

(সকল প্রকারের অনিচ্ছাকৃত ভুল ও অপারদর্শিতা হেতু অস্বচ্ছতার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। গুণীজন নিজ গুণেই আমার ভুলগুলি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এ আশাই রইলো। ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন সকলে।) 


নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ