প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label স্বাধীনতা. Show all posts
Showing posts with label স্বাধীনতা. Show all posts

Tuesday, March 6, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ-৭ : আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ— একাত্তরের এই দিনে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের প্রত্যাশাকে ধারণ করে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন তার ঐতিহাসিক ঘোষণা—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আহূত ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য চারটি দাবি উত্থাপন করেন। রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণাটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। কিন্তু ওই সময় তার এই ভাষণই মুক্তিকামী মানুষকে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করে।
একাত্তরের ৭ মার্চ দুপুরের পর রেসকোর্স ময়দানে ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। লাঠি হাতে প্রতিবাদী মানুষ, শহরের মানুষ, গ্রামের মানুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, বৃদ্ধ-যুবা— সর্বস্তরের মানুষ। এর আগের ঘটনাপ্রবাহে সেদিনের জনসভাটি পরিণত হয় স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের মিলন মোহনায়।
এই দিনে শেখ মুজিব মাত্র ২০ মিনিটের ভাষণে পাকিস্তানি বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশসহ এদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণের দাবি উত্থাপন করেন। সেদিন প্রতিটি মিছিলেরই গন্তব্য ছিল রেসকোর্স ময়দান। পরাধীনতার দীর্ঘ প্রহর শেষে এমন একটি মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যই যেন অধীর অপেক্ষায় ছিল পুরো জাতি।
এই ঐতিহাসিক ভাষণ ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ সম্প্রচার না করায় বাঙালি কর্মচারীরা এ দিন কাজ বন্ধ করে দেন। ফলে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে টেলিভিশনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ সম্প্রচার করা হলেও এ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা বেতার কেন্দ্রের কর্মচারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। ফলে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়। গভীর রাতে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের কর্মচারীদের সঙ্গে সামরিক কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ আলোচনার পর ৮ মার্চ (সোমবার) সকাল ৬টা হতে রেডিও সম্প্রচার শুরু এবং সাড়ে ৮টায় রেসকোর্সের বক্তৃতার পূর্ণ বিবরণী ঢাকাসহ দেশের সকল কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে ‘স্বাধীন বাংলার’ দাবিতে এদিন (৭ মার্চ ) ব্রিটেন প্রবাসী প্রায় ১০ হাজার বাঙালি লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীরা শত শত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডসহ ‘ভুট্টোর বিচার চাই’ বলে সেম্লাগান দেয়।
দিনটি উপলক্ষে রাজধানীতে আজ আওয়ামী লীগের গণর্যালি অনুষ্ঠিত হবে। বিকাল ৩টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানস্থ শিখা চিরন্তনের সামনে থেকে শুরু হয়ে এ গণর্যালিটি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হবে। বিরোধী দলের ১২ মার্চের ঢাকা চলো কর্মসূচির বিপরীতে শো-ডাউন করতে ক্ষমতাসীন দলের গুচ্ছ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ গণর্যালি অনুষ্ঠিত হবে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ কর্মসূরি ডাক দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ কর্মসূচি উদ্বোধনের কথা রয়েছে। বিএনপির ঢাকা চলো কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে আজকের গণর্যালি ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট আগামী ১১ মার্চ ঢাকায় মানববন্ধন ও ১৪ মার্চ জনসভা করবে। এছাড়া আগামী ৯ মার্চ জেলায় জেলায় ১৪ দলের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এক বিবৃতিতে দলের পক্ষ থেকে গৃহীত এ কর্মসূচি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য সংগঠনের সকল শাখাসহ আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী, সর্বস্তরের জনগণ ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান তার বাণীতে বলেন, “১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে বজ্রকন্ঠে যে ভাষণ প্রদান করেন তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এই ভাষণ ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরে ভবিষ্যত্ করণীয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত আহ্বান জানান। ঐতিহাসিক সেই ভাষণ এদেশের জনগণকে বিপুল শক্তি ও সাহস যোগায় এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। এই ভাষণের ধারাবাহিকতায় ২৬শে মার্চ ১৯৭১ জাতির পিতা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ মহান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে তাই ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কেবল বাঙালি জাতিকে নয়, পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণের আশার দিশারী হিসেবে পথ দেখাবে। বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ আমাদের প্রেরণার চিরন্তন উত্স হয়ে থাকবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস”।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, “বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১ মার্চ থেকে সূচিত অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ২৫ মার্চের কালোরাতে পাক হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন”।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামাত অশুভ জোটের অসাংবিধানিক ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রতিবারের ন্যায় এবারও সমগ্র জাতির সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যথাযোগ্য মর্যাদায় ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ দিনটিকে স্মরণ ও পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সূত্র : আমার দেশ

Monday, March 5, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ-৭ : ৭ মার্চের ভাষণের প্রতীক্ষা

৬ মার্চ মঙ্গলবার। একাত্তর সালের এদিনে সংগ্রামী বাংলা ছিল বিক্ষোভে উত্তাল জনসমুদ্র। অন্তহীন মিছিল-সমাবেশের দেশে পরিণত হয়েছিল সারা বাংলা। দিকে দিকে ছিল স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা। তাদের কণ্ঠে ছিল যেন সাগরের ক্ষুব্ধ গর্জন। এদিনেও দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ৬ মার্চে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর খবরেও বিক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভ আরও বাড়ে। বাংলাকে স্বাধীন করার সংকল্প তাদের মধ্যে দৃঢ় হয়ে ওঠে।
৬ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানের জাতীয় অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা হয়।
৬ মার্চ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান ৭ কয়েদি আর আহত হন ৩০ জন। খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ১৮ জন আর আহত হন ৬৪ জন।
৬ মার্চে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর খবরের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত হওয়ার খবরগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এদিন (৬ মার্চ) দৈনিক ইত্তেফাক ৫ মার্চের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের বিবৃতি ‘বাংলার বুকে এ গণহত্যা বন্ধ করো’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৬ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া ইত্তেফাক ‘টঙ্গীতে গুলিবর্ষণে ৪ জন নিহত, ২৫ জন আহত’, ‘শেখ মুজিব সকাশে আসগর খান’, ‘কল্পনার ফানুস-শেখ মুজিব, ‘শেখ মুজিবের ভাষণ রিলে করিতে হইবে-ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি তোফায়েল আহমদ’ শিরোনামে ৫ মার্চের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। দৈনিক আজাদ এদিন ‘অন্যূন ৪ জন নিহত, ৩০ ব্যক্তি আহত : টঙ্গীতে গুলিবর্ষণ’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। আজাদে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল—‘আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীনের বিবৃতি : বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচিতে চায়’, ‘স্বাধিকার আন্দোলনের পঞ্চম দিবস : বাংলাদেশব্যাপী হরতাল’। আর সংবাদ এদিন ‘টঙ্গীতে শ্রমিকদের ওপর সেনাবাহিনীর গুলিতে ২ জন নিহত’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে।
অন্যদিকে দিন যতই গড়াচ্ছিল, অসহযোগ আন্দোলনের গন্তব্যও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপরও চাপ বাড়ছিল। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি কী ভাষণ দেবেন তা শোনার জন্য সারাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৭ মার্চের জনসভায় শেখ মুজিব কী ঘোষণা দেবেন তা ঠিক করতে তিনি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা করা হবে কিনা সেটাই ছিল প্রশ্ন।
সূত্র : আমার দেশ

Sunday, March 4, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ-৫ : দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন, চট্টগ্রামে শহীদ হন ২২২ জন

৫ মার্চ। একাত্তরের এদিন ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে ডাকা লাগাতার হরতাল ও বিক্ষোভে উত্তাল আরেকটি দিন। ১ মার্চ যে আন্দোলন শুরু হয়, গত চারদিনে তা ক্রমান্বয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানিদের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে সব স্তরের মানুষ একাত্তরের ৫ মার্চ রাস্তায় নেমে আসেন। মার্চে আন্দোলন শুরুর পর থেকে প্রতিদিন পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রাণ হারাতে থাকেন। কিন্তু কোনো মানুষ ভয়ে ঘরে ফিরে যাননি। বরং রাজপথে যত রক্ত ঝরেছে, আন্দোলন তত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনে গত ক’দিনে নিহতদের জন্য ৫ মার্চ সারাদেশের মসজিদ ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আরও তীব্র হয়ে ওঠে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য এদিন ঢাকায় একটি কন্ট্রোল রুম চালু হয়।
একাত্তরের এ দিনে হরতাল পালনকালে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে চট্টগ্রামে শহীদ হন ২২২ জন। টঙ্গীতে নিহত হন ৪ শ্রমিক, আহত হন আরও ১৮ জন। যশোরে মারা যান একজন। মুক্তির ঢেউ এদিন আছড়ে পড়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও। একদল স্বাধীনতাকামী মানুষ বেরিয়ে আসেন কারাগারের দেয়াল ভেঙে। দেয়াল ভাঙার সময় কারারক্ষীদের গুলিতে প্রাণ হারান ৭ জন; আহত হন আরও ৩০ জন। বেরিয়ে আসা ৩২৫ বন্দি চলে আসেন শহীদ মিনারে। যোগ দেন আন্দোলনরত জনতার সঙ্গে। টঙ্গীতে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শ্রমিক নিহত হওয়ার প্রতিবাদে নিহত শ্রমিকদের লাশ নিয়ে রাজধানীতে মিছিল বের করা হয়। এদিন বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয় চট্টগ্রামেও। চট্টগ্রামের মিছিলেও গুলি চালায় পাকিস্তানি সেনারা। এতে আহত হন তিনজন। টঙ্গী, চট্টগ্রাম ছাড়াও গুলিতে খুলনায় দুই, রাজশাহীতে একজন মৃত্যুবরণ করেন।
সংহতির ঘটনা ঘটে এদিন পশ্চিম পাকিস্তানেও। পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিগৃহীত বেলুচিস্তানের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগণতান্ত্রিক বলে ঘোষণা করে। আন্দোলনে নিহতদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের লাহোরে। সেখানের বিভিন্ন মসজিদে দেশের সঙ্কটময় মুহূর্তে সংহতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
অন্যদিকে ঢাকা শহর থেকে এদিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। গণহত্যার প্রতিবাদে বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে বিবৃতি দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। আর নিউমার্কেটে মোজাফফর আহমদের সভাপতিত্বে ন্যাপ ওয়ালীর জনসভায় আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। রাতে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার ধানমন্ডির বাসভবনে দেখা করেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দেবেন—তা সরাসরি সম্প্রচার করার জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানান তোফায়েল আহমেদ।
সূত্র : আমার দেশ

Saturday, March 3, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ-৩ : বদলে গেল রেডিও পাকিস্তানের নাম

আজ রক্তঝরা মার্চ মাসের ৪ তারিখ। একাত্তর সালের এ দিন ছিল গণবিক্ষোভে টালমাটাল আর অস্থির। একাত্তরে মার্চের দিন গড়াবার সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অগ্নিঝরা মার্চের প্রতিটি দিনই নতুন ইতিহাসের জন্ম দেয়। সেই ইতিহাস প্রতিরোধের, প্রতিবাদের, অধিকার আদায়ে ইস্পাত দৃঢ়প্রত্যয়ের, প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতির ইতিহাস।
একাত্তরের ৪ মার্চ স্বাধিকার আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে হরতাল পালিত হয় দেশব্যাপী। সারাবাংলায় সেদিন হরতাল ছিল অর্ধদিবস, ভোর ছয়টা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত। দেশজুড়ে চলছিল প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিটি বাঙালি ছিলেন প্রতিবাদমুখর, সংগ্রামে-আন্দোলনে একাত্ম। একাত্তরের এ দিনে ঘটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এদিন ‘রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা’র নাম বদলে রাখা হয় ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’। সেদিনের সেই ঘটনা চলমান আন্দোলনে যোগ করে নতুনমাত্রা। বীর বাঙালি ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে দেশমাতৃকাকে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নিগড় থেকে মুক্ত করার চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে।

Friday, March 2, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ-৩: এদিন স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়

আজ স্বাধীনতার মাস মার্চের ৩ তারিখ। একাত্তর সালে এদিনটি ছিল রক্তঝরা। পাক সেনাদের গুলিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একশ’ ব্যক্তির প্রাণহানি হয় এদিনে। ২ মার্চের গণহত্যার শোক ঘোষণা করা হয় এদিনে। গণহত্যার শোক দিবস আর অর্ধদিবস হরতালের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ৩ মার্চের দিনটি। একদিকে পাক সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠকের আমন্ত্রণ, অন্যদিকে জনতার বিক্ষোভ, হরতাল, উত্তাল মিছিলে পাক সেনাদের
গুলির মধ্য দিয়ে কাটে এদিন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এদিনে নিন্দা ও ব্যঙ্গাত্মক টেলিগ্রাম পাঠান পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খানের কাছে। এদিনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তত্কালীন ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ।
একাত্তরের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেয়ায় বড় ধরনের চক্রান্তের মুখোমুখি হয় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। মার্চের প্রথম দিন থেকেই খুব সতর্ক হয়ে ওঠে তারা। ২ মার্চ ওড়ানো হয় জাতীয় পতাকা। দেশজুড়ে উত্তাল বিক্ষোভ চলে।
এদিনে ঢাকার পল্টনের জনসভায় অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ আহূত এ সভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ। এদিন সকাল থেকেই যথারীতি মিছিলের নগরী হয়ে ওঠে ঢাকা। শান্তিপূর্ণভাবে অর্ধদিবস হরতাল পালনের সঙ্গে সঙ্গে মিছিলে মিছিলে ঢেকে যায় পুরো নগরী। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে এদিন পার্লামেন্টারি গ্রুুপের ১২ জন নির্বাচিত নেতাকে ১০ মার্চ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান ইয়াহিয়া খান। শেখ মুজিবুর রহমান এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। একই দিনে মওলানা ভাসানীর তীব্র নিন্দাসূচক ও ব্যঙ্গাত্মক টেলিগ্রাম পৌঁছে ইয়াহিয়ার কাছে।
নেতাদের বৈঠকের আমন্ত্রণের পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনী জনগণের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে এদিন। পাক সেনাদের গুলিতে এদিন ঢাকায় ২৫ আর চট্টগ্রামে ৭৫ জন নিহত হয়। দেশজুড়ে হতাহতের সংখ্যা ছিল দু’হাজারেরও বেশি। এ আক্রমণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে আরও বড় ধরনের আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত করে তুলে ছিল গোটা জাতিকে। তারা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ডাকের অপেক্ষা করতে থাকে।
সূত্র : আমার দেশ

Thursday, March 1, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ-২ : একাত্তরের এই দিনে প্রথম ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা

আজ ২ মার্চ। ১৯৭১ সালের এদিনে বিক্ষোভে উত্তাল ছিল ঢাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কারফিউ ভঙ্গ করে দিন-রাত চলে আন্দোলন-বিক্ষোভ। বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলি চালালে নিহত হন ২৩ জন দেশপ্রেমিক। এদিন প্রথম ওড়ানো হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। ২ মার্চ সকাল থেকেই দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ঢাকার রাজপথে অবস্থান নেয়। জনসমুদ্র হয়ে ওঠে রাজপথ। আর সব মিছিলের একটিই
লক্ষ্য—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ডাকে এক বিশাল ছাত্রসমাবেশ ছিল সব আয়োজনের কেন্দ্র। সকাল ১০টার মধ্যে এ সমাবেশে উপস্থিত হয় হাজার হাজার মানুষ। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এখানেই বেলা ১১টায় প্রথম উত্তোলিত হয় গাঢ় সবুজ জমিনের মাঝখানে লাল বৃত্তে অঙ্কিত মানচিত্র ‘স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা’। ডাকসুর তত্কালীন সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব সংগ্রামী ছাত্রসমাজের পক্ষে প্রথম বাংলাদেশের মানচিত্রসহ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
আর এরই মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় ছুটে এসে একজন জানান, ফার্মগেট এলাকায় গোলাগুলির কথা। বিক্ষোভ মিছিল বের হয় ক্যাম্পাস থেকে। বিকালে জনসভা অনুষ্ঠিত হয় বায়তুল মোকাররম ও পল্টন ময়দানে।
১ মার্চ বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন অপ্রত্যাশিতভাবেই স্থগিত ঘোষণা করেন পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতা। ইয়াহিয়া খানের বক্তব্যের প্রতিবাদেই মূলত ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১১টায় জমায়েত হয়।
২ মার্চ সন্ধ্যার পর হঠাত্ করেই পুরো শহরে কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়া হয়। রাত ৯টা থেকে পরদিন ৩ মার্চ সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে সামরিক জান্তা এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি থাকবে বলে জানানো হয়।
বেতারে কারফিউ জারির ঘোষণা হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে লোকজন নেমে আসে রাস্তায়। ব্যারিকেড তৈরি করে কারফিউ ভেঙে গভীররাত পর্যন্ত মিছিল বের করে। হাজার মানুষের স্লোগান চূর্ণ করে দেয় রাতের নিস্তব্ধতা। বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় পাকসেনারা এবং সে রাতেই হত্যা করা হয় ২৩ জনকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকসেনাদের এমন বর্বর আচরণকে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেন এবং ৩ মার্চ ‘জাতীয় শোক দিবস’ পালনের আহ্বান জানান।
সুত্র : আমার দেশ

Wednesday, February 29, 2012

অগ্নিঝরা মার্চ -১ : শুরু হলো স্বাধীনতার মাস বিদ্রোহী মার্চ (১মার্চ)

‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলব না...।’ বছর ঘুরে আবার ফিরে এলো রক্তঝরা মার্চ, স্বাধীনতার মাস। গত শতাব্দীর ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হয় স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত লড়াই—সশস্ত্র সংগ্রাম। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর লাল-সবুজ পতাকার দেশ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বিশ্ব মানচিত্রে নতুন একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে অগণিত প্রাণের বিনিময়ে।
এদেশের শোষিত, নিপীড়িত, অধিকারবঞ্চিত মানুষ স্বাধিকারের জন্য লড়াই করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল জাতিসত্তার স্বরূপ অন্বেষার এক একটি মাইলফলক। সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা ষড়যন্ত্র ও টালবাহানা করছিল।
আজ থেকে ৪১ বছর আগে মার্চ মাসের এই দিনে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে কোনো স্বাধীন দেশের অস্তিত্ব ছিল না। তত্কালীন পাকিস্তানের পূর্ব অংশ অর্থাত্ পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনে লালিত একটি স্বপ্ন, একটিমাত্র আকাঙ্ক্ষাই জাগ্রত ছিল—তা হলো পরিপূর্ণ স্বাধীনতা। দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা নিগ্রহ, শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের নাগপাশ ছিঁড়ে সগর্বে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দুর্মর আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল করেন। এ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল ৩ মার্চ। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ গোটা পাকিস্তানেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার হীন, কূট ষড়যন্ত্র হিসেবে অধিবেশন বাতিলের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ক্রোধে, ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, অধিকারহীন মানুষ ফেটে পড়ে বিক্ষোভে। অফিস-আদালত থেকে সব মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এই ষড়যন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ করেন। স্লোগান ওঠে—বীর বাঙালি অস্ত্র ধর/বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
ঐতিহাসিক ১ মার্চ থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে অঘোষিত অসহযোগ শুরু হয়ে যায়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে ও লড়াইয়ের ইস্পাতকঠিন প্রত্যয়ে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে থাকে দেশ। একাত্তরের আগুনঝরা মার্চে বীর বাঙালি সেই যে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফেরেনি। মুক্তিযুদ্ধে অগণিত প্রাণ উত্সর্গ করতে হয়েছে, অগণিত মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম। আহত ও পঙ্গু হতে হয়েছে এদেশের অগণিত মানুষকে। লাখো মানুষের অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
সূত্র : আমার দেশ

Sunday, January 1, 2012

৭১ এর সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডার | মরুভূমির জলদস্যু

মানচিত্রে ১১টি সেক্টর ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাতে বলা হয়ঃ সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হল যে প্রধান সেনাপতি অফিসারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। সেনা কমান্ডকে সমন্বিত করে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। বাংলাদেশ বাহিনীতে প্রশিক্ষণার্থীদের বাছাইপর্বে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পরবর্তীতে ১১ই জুলাই মুজিবনগরে কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডকে ১১টি যুদ্ধক্ষেত্র বা সেক্টরে ভাগ করা হয়। । প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। নিচে সেক্টর নং, সেক্টর আওতা, সেক্টর কমান্ডার ও আরো কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হলো। সর্বাধিনায়ক ও প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী উপ প্রধান সেনাপতি ও বিমানবাহিনী প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার উপ প্রধান সেনাপতি ও সেনাবাহিনী প্রধান (ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি।) লে.কর্নেল আবদুর রব ১নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার : মেজর জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) (এপ্রিল- জুন) সেক্টর কমান্ডার : মেজর রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম) (জুন - ডিসেম্বর) এলাকা : চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার অংশ বিশেষ (মুহুরী নদীর পূর্বপাড় পর্যন্ত)। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২১০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২০,০০০। ২নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর এ.টি.এম হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) এলাকা : কুমিল্লা জেলার অংশ, ঢাকা জেলা ও ফরিদপুর জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৪,০০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৩০,০০০। ৩নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ (বীর উত্তম) (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর), সেক্টর কমান্ডার মেজর এ.এন.এম নুরুজ্জামান (বীর উত্তম) (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) এলাকা : কুমিল্লা জেলার অংশ, ময়মনসিংহ জেলার অংশ, ঢাকা ও সিলেট জেলার অংশ। সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৬৬৯৩ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। ৪নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর জে: চিত্তরঞ্জন দত্ত (বীর উত্তম) এলাকা : সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট-ডাউকি সড়ক পর্যন্ত। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৯৭৫ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০। ৫নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী (বীর উত্তম) এলাকা : সিলেট-ডাউকি সড়ক থেকে সিলেট জেলার সমগ্র উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল ও ময়মনসিংহ জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ১৯৩৬ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০। ৬নং সেক্টর উইং কান্ডার খাদেমুল বাশার এলাকা : সমগ্র রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১১,০০০। ৭নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক ( অগাস্ট পর্যন্ত ) সেক্টর কমান্ডার মেজর কাজী নুরুজ্জামান (বীর উত্তম) এলাকা : রংপুর জেলার অংশ, রাজশাহী জেলার অংশ, পাবনা জেলার অংশ ও দিনাজপুর জেলার অংশ, বগুড়া জেলা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল নয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১২,৫০০। ৮নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী (এপ্রিল- আগস্ট), সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মুঞ্জুর (বীর উত্তম) (আগস্ট-ডিসেম্বর) এলাকা : যশোর জেলা, ফরিদপুর জেলা, কুষ্টিয়া জেলা, খুলনা ও বরিশাল জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ৯নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল মিঞা (এপ্রিল-ডিসেম্বর প্রথমার্ধ), সেক্টর কমান্ডার মেজর জয়নুল আবেদীন ( ডিসেম্বর এর অবশিষ্ট দিন) (ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি।) এলাকা : দৌলতপুর-সাতক্ষীরা সড়ক থেকে খুলনার দক্ষিনাঞ্চল এবং সমগ্র বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল তিনটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ১০নং সেক্টর কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী (সর্বাধিনায়ক ও প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী) এলাকা : প্রধান সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে (নৌ সেক্টর) সমগ্র বাংলাদেশ। এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল নৌ-কমান্ডোদের দিয়ে। বিভিন্ন নদী বন্দর ও শক্র পক্ষের নৌ-যানগুলোতে অভিযান চালানোর জন্য এঁদের বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হতো। যে সেক্টর এলাকায় কমান্ডো অভিযান চালানো হতো, কমান্ডোরা সেই সেক্টর কমান্ডারের অধীনে কাজ করত। নৌ-অভিযান শেষে তারা আবার তাদের মূল সেক্টর- ১০ নম্বর সেক্টরের আওতায় চলে আসত। নৌ-কমান্ডোর সংখ্যা ছিল ৫১৫ জন। ১১নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের (বীর উত্তম) (আগস্ট-নভেম্বর), সেক্টর কমান্ডার স্কেয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ (নভেম্বর-ডিসেম্বর) এলাকা : কিশোরগঞ্জ মহকুমা বাদে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা এবং নগরবাড়ি-আরিচা থকে ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত যমুনা নদী ও তীর অঞ্চল। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। টাংগাইল সেক্টর কাদের সিদ্দিকী। এলাকা : সমগ্র টাংগাইল জেলা ছাড়াও ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার অংশ আকাশ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার এলাকা: বাংলাদেশের সমগ্র আকাশসীমা তথ্য সূত্র : সেক্টর কমান্ডারর্স ফোরাম গুণীজন উইকি গুগল এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের ঝিঁঝি পোকার বাগানে নিমন্ত্রণ।

Friday, December 16, 2011

অন্য এক প্রধান পুরুষ || শাহ আহমদ রেজা

আওয়ামী লীগ সরকার দাপটের সঙ্গেই জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘সঠিক’ ইতিহাস শিখিয়ে চলেছে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, সরকারের এই ‘সঠিক’ ইতিহাসের সবটুকু কৃতিত্ব চলে গেছে একজন মাত্র নেতার দখলে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে ‘সঠিক’ ইতিহাস কিন্তু সরকারের উদ্ভট এ চেষ্টাকে বাতিল করে দেয়। একটি উদাহরণ হিসেবে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা যায়। স্বায়ত্তশাসনের পর্যায়ক্রমিক যে আন্দোলন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল, মওলানা ভাসানী ছিলেন তার প্রধান নির্মাতা। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাকও তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন (৩০ নভেম্বর, ১৯৭০)। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাঁর সন্তোষের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার পর কোনো কোনো নামকরা নেতার মতো গ্রেফতার বরণের নিরাপদ পন্থা নেয়ার পরিবর্তে তিনি ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন (১৫ এপ্রিল, ১৯৭১)। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাঁকে অঘোষিতভাবে নজরবন্দি রাখলেও বিবৃতি ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে তিনি জনগণের প্রতি স্বাধীনতা যুদ্ধ এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বংলাদেশকে সমর্থন করার ও স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে তারবার্তা পাঠিয়েছেন।
কলকাতায় গঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো এবং ওই সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের একটি অংশের ও তত্কালীন মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র নস্যাত্ করে দেয়া ছিল মওলানা ভাসানীর বিশেষ অবদান। মুজিবনগর সরকার তাঁকে উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি বানিয়েছিল এবং সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত পরিষদের একমাত্র সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। অর্থাত্ ১৯৫০-এর দশকে সূচিত স্বায়ত্তশাসনের প্রাথমিক আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ‘সঠিক’ ইতিহাসে তাঁর স্থান হয়নি।
মওলানা ভাসানীর পর দ্বিতীয় একজন প্রধান নেতা হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের কথা উল্লেখ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তাজউদ্দীন আহমদ না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এত সুসংগঠিত হতে এবং এত অল্প সময়ে বিজয় অর্জন করতে পারতো না। স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকার গঠন থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও ভারতের সহযোগিতা নিয়ে দেশকে স্বাধীন করা পর্যন্ত সমগ্র কর্মকাণ্ডে প্রধান এবং সফল নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখার এবং অন্য সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা আদায়ের ক্ষেত্রেও তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। মুক্তিযোদ্ধাদেরও তিনিই সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। এই ভূমিকার জন্যই যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের অবদানের কথা স্মরণ করা দরকার। কারণ ‘সঠিক’ ইতিহাস হলো, স্বাধীনতা কারও ঘোষণা শুনে আসেনি। জনগণও কারও ঘোষণা শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল যে অস্থায়ী ‘মুজিবনগর’ সরকার, সে সরকারও হঠাত্ করে গঠিত হয়নি।
১৯৭১ সালের মার্চের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কম-বেশি সবারই জানা রয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণের একেবারে শেষ বাক্যে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলার পরও প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। ১৬ মার্চ থেকে ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কোনো পর্যায়েও শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করেননি। তিনি বরং তার ৭ মার্চের চার দফা দাবি অনুযায়ী সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জবাবে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, সংবিধান প্রণয়নের আগে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলে আইনগত শূন্যতা ও জটিলতার সৃষ্টি হবে। এই পর্যায়ে শেখ মুজিবের প্রস্তাবে ১৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে মুজিব-ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং ইয়াহিয়া খানের পক্ষে লে. জেনারেল শরীফ উদ্দিন পীরজাদা, বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস ও কর্নেল হাসান এসব বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। প্রথম বৈঠকে আইনগত শূন্যতা ও জটিলতার প্রশ্নে পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা আদেশ জারি করতে পারেন, যা সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং সংবিধান গৃহীত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কে আইনসম্মত করবে।
জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ১৭ মার্চের একান্ত বৈঠকে নতুন এক প্রস্তাবে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের’ জাতীয় পরিষদ সদস্যরা প্রথমে পৃথক পৃথক অধিবেশনে মিলিত হয়ে দুই অঞ্চলের জন্য দু’টি সংবিধান রচনা করবেন এবং পরে এক যৌথ অধিবেশনে ওই দুটির ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হবে। প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছিলেন, যে ঘোষণাকে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও নতুন সংবিধান গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। দু’পক্ষের ১৭ মার্চের বৈঠকে এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া তৈরি করার আগে উভয় পক্ষের আইন উপদেষ্টারা শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক যৌথ বৈঠকে মিলিত হবেন। ১৯ মার্চ আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। শেখ মুজিব নিজেও বলেছিলেন, কোনো ‘অগ্রগতি না হলে’ তিনি কি শুধু শুধু আলোচনা চালাচ্ছেন?
২০ মার্চ শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খান নিজেদের উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ঘোষণায় তিনটি মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হবে—(১) সামরিক আইন প্রত্যাহার, (২) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর
এবং (৩) পূর্বাঞ্চলীয় অংশের (‘পূর্ব পাকিস্তান’) জন্য ব্যাপকভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা। উভয় পক্ষ এ ব্যাপারে বিশিষ্ট আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এ কে ব্রোহীর অভিমত নিতে সম্মত হন। পরদিনই এ কে ব্রোহী এক লিখিত অভিমতে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে ঘোষণা জারি করলে আইনগত শূন্যতার সৃষ্টি হবে না এবং আইনসম্মতভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে।
২১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া আওয়ামী লীগের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এই খসড়ায় ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের’ জাতীয় পরিষদ সদস্যদের পৃথক পৃথক অধিবেশনের প্রস্তাব ছিল। খসড়ার অন্য এক প্রস্তাবে বলা হয়, প্রদেশগুলোতে মন্ত্রিসভা শপথ নেয়ার দিন থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহৃত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। আওয়ামী লীগ খসড়া ঘোষণাটিকে ‘অসম্পূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে দু’টি প্রশ্নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছিল—(১) প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটি অবিলম্বে প্রচার করতে হবে; এবং (২) যেহেতু মন্ত্রিসভা গঠনে বিলম্ব ঘটতে পারে, সেহেতু প্রদেশগুলোতে নতুন গভর্নর নিযুক্তি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অথবা প্রেসিডেন্টের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার সাতদিনের মধ্যে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।
২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউসে আগের দিন ঢাকায় আগত জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে শেখ মুজিবের সাক্ষাত্ হয়েছিল। শেখ মুজিব তার প্রস্তাব মেনে নেয়ার জন্য ভুট্টোকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রের আগে প্রদেশগুলোতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সামরিক আইন প্রত্যাহারের প্রশ্নে ভুট্টো বলেছিলেন, তেমন কোনো আয়োজন বা সমঝোতা অনুমোদনের জন্য হলেও প্রথমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতারা ২২ মার্চ সারাদিন সারারাত প্রেসিডেন্টের ঘোষণা চূড়ান্ত করার কাজে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছিলেন। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া পৌঁছে দিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত উপদেষ্টাদের বৈঠক শেষ হয়েছিল কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া। ২৪ মার্চের সর্বশেষ বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেশের নাম ‘কনফেডারেশন অব পাকিস্তান’ রাখার নতুন এক প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। ইয়াহিয়ার পক্ষ এতে তীব্র আপত্তি জানায়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টারা বিষয়টি শেখ মুজিব এবং ইয়াহিয়া খানের ওপর ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব তোলেন এবং ঘোষণার অন্য দিকগুলো নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দেন। কিন্তু সান্ধ্য বৈঠকে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদের জানানো হয়, ইয়াহিয়ার প্রতিনিধিরা আগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরে আওয়ামী লীগকে অবহিত করবেন। জেনারেল পীরজাদা জানিয়েছিলেন, তিনি পরদিন অর্থাত্ ২৫ মার্চ ‘কোনো এক সময়’ ড. কামাল হোসেনকে টেলিফোনে জানাবেন, কখন তারা আবার বসবেন এবং কবে প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটি প্রচার করা হবে।
এভাবেই মুজিব-ইয়াহিয়া এবং তাদের উপদেষ্টাদের মধ্যকার সমঝোতা অলোচনার সমাপ্তি ঘটেছিল। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতারা ২৫ মার্চ সারাদিন অপেক্ষায় কাটিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল পীরজাদা কোনো টেলিফোন করেননি, প্রচারিত হয়নি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সেই ঘোষণাটিও। অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে ড. কামাল হোসেন লিখেছেন, ‘আমি যখন (২৫ মার্চ) রাত ১০টা ৩০ মিনিটে শেখ মুজিবের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নেই, তখনও তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তেমন কোনো টেলিফোন আমি পেয়েছি কি না। আমি তাকে জানিয়েছি, আমি কোনো টেলিফোন পাইনি।’ (ড. কামাল হোসেনের বিবরণী, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’, ১৫শ খণ্ড, পৃ-২১০-২৭৮)। এখানে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের বিবরণীও উল্লেখযোগ্য। তিনি জানিয়েছেন, শেখ মুজিব তখন রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। জেনারেল পীরজাদার টেলিফোন না আসার কথা জেনে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম অনুরোধ করলেও শেখ মুজিব তাদের সঙ্গে যেতে রাজি হননি। এর পরের ঘটনাক্রম জানাতে গিয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৫ মার্চ রাত ১০টার পর শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে তিনি এবং ড. কামাল হোসেন গিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের ধানমন্ডির বাসভবনে। তারা যাওয়ার পরপর ইপিআরের একজন হাবিলদার এসে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কায় ইপিআরের সব বাঙালি সদস্য পিলখানা থেকে বেরিয়ে পড়েছে। এ কথা শুনেই তাজউদ্দীন আহমদ তাদের দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পথে কামাল হোসেন ধানমন্ডির চার নাম্বার রোডের একটি বাসায় ঢুকেছিলেন দেয়াল টপকে। অন্যদিকে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ পা বাড়িয়েছিলেন ভারতের দিকে। (দেখুন ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’, ১৫শ খণ্ড)। লক্ষণীয়, রাত ১০টার মধ্যে ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার তথ্যটি কিন্তু পিলখানা থেকে ট্রান্সমিটারযোগে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের দাবিকে অসত্য প্রমাণ করে। তাছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকসহ ২৬ মার্চের দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, শেখ মুজিব ২৭ মার্চ হরতালের ডাক দিয়েছেন।
প্রধান নেতা শেখ মুজিবের দিক থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় এর পরের প্রতিটি পদক্ষেপ তাজউদ্দীন আহমদ নিয়েছিলেন একক সিদ্ধান্তে। বিভিন্ন পর্যায়ে রীতিমতো ইন্টারভিউ দিয়ে ভারতীয়দের কাছে তাকে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, তিনিই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়েছিল (৩ এপ্রিল, ১৯৭১)। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং নিজেকে প্রধানমন্ত্রী করে ১০ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছিলেন। জাতির উদ্দেশে তার একটি ভাষণও প্রচার করেছিল ভারত সরকার। ১০ এপ্রিল গঠিত সরকারই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় এসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করেছিল। সেদিন থেকে বৈদ্যনাথতলার নাম হয়েছে মুজিবনগর।
‘সঠিক’ ইতিহাসের মূল্যায়নে সময়োচিত ও দিক-নির্ধারণী হিসেবে প্রমাণিত হলেও ভারতে চলে যাওয়া থেকে সরকার গঠন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেয়াটা তাজউদ্দীন আহমদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। প্রতি পদক্ষেপে তাকে বরং বাধাগ্রস্ত, সমালোচিত এবং প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। একক সিদ্ধান্তে তিনি এমন এক সময়ে সরকার গঠন করেছিলেন, যখন আওয়ামী লীগের সব নেতাই ছিলেন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এবং পলায়নরত। শেখ মুজিবের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তাজউদ্দীন আহমদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন অনেকেই। শেখ ফজলুল হক মনি, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দাবি তুলেছিলেন। তাদের সঙ্গে উস্কানিদাতার ভূমিকায় নেমেছিলেন সেকালের ‘মস্কোপন্থী’রা—মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রমুখ। কিন্তু একদিকে তাজউদ্দীন আহমদের নিজের নিষ্ঠা, সততা ও নিখাদ দেশপ্রেম এবং অন্যদিকে জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীর সমর্থন তাকে রক্ষা করেছিল। এ জন্যই তাজউদ্দীন আহমদের পক্ষে সাফল্যের সঙ্গে সরকার পরিচালনা করা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের ‘সঠিক’ ইতিহাসে স্থান না পেলেও দেশপ্রেমিক নেতা তাজউদ্দীন আহমদেরও ছিল দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস। তাকে শেখ মুজিবের চাটুকারিতা করতে দেখা যায়নি, বাকশালেও যোগ দেননি তিনি। এটাই অবশ্য তাজউদ্দীন আহমদকে ‘সঠিক’ ইতিহাসে স্থান না দেয়ার একমাত্র কারণ নয়। আসল কারণ আওয়ামী লীগের ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোভাব—যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া অন্য কারও অবদানের স্বীকৃতি দেয়ার উপাদান নেই। 
সূত্র : আমার দেশ

বাংলাদেশের চল্লিশ বছর || মাহফুজ উল্লাহ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পূর্তিতে একটি বিষয় সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। বিষয়টি হচ্ছে এই রাষ্ট্রের চল্লিশ বছরের অস্তিত্বে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি। প্রত্যাশার হিসাব মেলানোটা হয়তো সহজ, কিন্তু প্রাপ্তির হিসাবটা অত্যন্ত জটিল। কেননা, বিগত চার দশকে যেসব রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল, তার মধ্যে প্রধান দু’টি দলের অবস্থান প্রায় বিপরীতমুখী। তারা তাদের মতো করে দেশকে নির্মাণ করতে চেয়েছে এবং এই অবস্থানের মধ্যে ঐকমত্য খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম কেন হয়েছিল, সে বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু এ রাষ্ট্রের লক্ষ্য সম্পর্কে সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রত্যাশা সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ঘোষিত হয় সেখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘আমরা আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, জাতিমণ্ডলীর (জাতিসংঘ) সদস্য হিসেবে আমাদের ওপর যে দায় ও দায়িত্ব বর্তাইবে উহা পালন ও বাস্তবায়ন করার এবং জাতিসংঘের সনদ মানিয়া চলার প্রতিশ্রুতি আমরা দিতেছি।’ একই ঘোষণায় তত্কালীন নেতারা বাংলাদেশের জনগণকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও ন্যায়ানুগ সরকার প্রদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অন্য সব কার্য করার অঙ্গীকারও করেছেন। অবশ্য সংবিধান সংশোধনের পর সংশোধিত সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে যা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে জনগণকে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ভিন্ন অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি। এই স্বাধীনতার কথিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার বাইরেও আরও কিছু আকাঙ্ক্ষা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তাদের স্বপ্নের রাজ্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে। অথচ এই জনপদের মানুষেরাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ইংরেজ শাসনে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত মুসলমানরা বিত্তবান হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। এই সুযোগের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্তরা, বৈষম্যের শিকার হয়ে। তাই তাদের ধারণা ছিল, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা বিত্ত প্রাপ্তির সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবেন। এ কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিত্তের সন্ধানে উন্মুখ হয়ে ওঠেন মধ্যবিত্তরা।
কিন্তু মধ্যবিত্তের এই বিত্ত সন্ধানের প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাধীনতার পর পর ক্ষমতাসীন দলের আচরণে। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা জড়িয়ে পড়েন রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনে, প্রতিপক্ষ দমনে এবং নির্বিচার মানবাধিকার লঙ্ঘনে। আইনের শাসনের প্রতি যে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ ছিল না, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখার শিরোনাম হয় ‘আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই।’ স্বৈরাচারী মানসিকতা লালনকারী অবস্থান থেকে প্রতিপক্ষকে দমন করবার জন্য গঠন করতে হয় রক্ষীবাহিনী। ধারণা করা হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। কারণ স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক আনুগত্য সম্পর্কে তত্কালীন সরকার নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। সেনাবাহিনীর অফিসারদের অনেকের ভেতর ছিল এক ধরনের আদর্শবাদ এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবার কারণে সৈনিকদের ভেতরও তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। এ কারণেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী প্রয়োগ করার পর যখন দেখা গেল ক্ষমতাসীন দলের লোকেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তখন এ অভিযান থেকে প্রত্যাহার করতে হয় সেনাবাহিনীকে। আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয় দুর্ভিক্ষ এবং রাজমুকুট মাথায় দিয়ে অতি পরিচিত যুবকের বিয়ে। জীবনের নিরাপত্তার অবসান ঘটে পুলিশি হেফাজতে সিরাজ শিকদারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, যা এ দেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রথম উদাহরণ।
স্বাধীনতার প্রথম তিন বছরে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে যত ঘটনা ঘটেছে, তার কোনোটার সঙ্গেই সাংবিধানিক প্রস্তাবনার কোনো মিল ছিল না। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে জনবিরোধী যত ঘটনা ঘটেছে, তার সূত্রপাত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলোতেই। নির্বাচনে ভোট ডাকাতিরও সূত্রপাত ১৯৭৩ সালে।
এভাবে তালিকা করলে তা অনেক দীর্ঘ হবে। কিন্তু মোটাদাগে বললে স্বাধীনতার চল্লিশ বছরের যে কয়টি প্রাপ্তি চোখে পড়ে, তা হচ্ছে বিত্তবানদের সংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্নীতির প্রসার এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান। রাজধানী ঢাকার চেহারা হয়তো বিগত দিনগুলোতে অনেক আলো ঝলমল হয়েছে। কিন্তু সে আলো ঝলমল রাজধানী যে দেশের বুকে বিরাজমান সর্বপ্রকার অন্ধকারকে মুছে দিতে পারেনি, এ কথা স্বীকার করতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কৃষক এবং বিভিন্ন শ্রেণীর তরুণরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে মানুষের সপক্ষে যেসব আন্দোলন হয়েছিল, সেখানেও এই শক্তির উপস্থিতি ছিল প্রবল। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য এই শক্তির ওপর নির্ভর করেছে প্রবলভাবে। এই শক্তির একটা প্রধান ক্ষমতা ছিল তাদের সাংগঠনিক অবস্থান। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের যে সংগঠন ছিল, তার শক্তি ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন সময়ে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যেমন সাহসী ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও জুগিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতার সফল আন্দোলনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। পূর্ব পাকিস্তানে এই সফলতা ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ভরাডুবি ঘটিয়ে দেয়ার সম্ভাবনায় ১৯৫৮ সালে জারি হয়েছিল সামরিক শাসন। অবশ্য সেই সামরিক শাসনের পেছনে মদদ জুগিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সিআইএর এই ভীতির একটা প্রধান কারণ ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, কমিউনিস্ট সমর্থিত প্রগতিশীল শক্তির ব্যাপক বিকাশ। স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের সংগঠনগুলোর উজ্জ্বল উপস্থিতি মানুষকে সাহস জোগাত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে এ তিনটি ক্ষেত্রেই ঘটেছে
চরম বিপর্যয়। এসব ক্ষেত্রে প্রাপ্তির হিসাব প্রায় শূন্যের কোটায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পর মধ্যবিত্তের মতো ছাত্ররাও হয়ে ওঠে বিত্ত সন্ধানী। তাদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে ঘটে তার প্রতিফলন। পাকিস্তান আমলে যে আদর্শবাদকে নির্ভর করে ছাত্র সংগঠনগুলো পরিচালিত হতো, তা রাতারাতি উবে যায়। ছাত্র সংগঠনের এ বিপর্যয় পুরো দেশের শিক্ষাঙ্গনকে করে তোলে কলুষিত। আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠনের প্রচেষ্টা পরিণত হয় সমুদ্রের বারি বিন্দুর মতো। ছাত্র সংগঠনগুলো ক্রমান্বয়ে পরিণত হয় রাজনৈতিক দলের লেজুড় এবং তাদের সামনে আদর্শবাদের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই ঘটনা ঘটে শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনের বেলায়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাংশের নেতা বাংলাদেশ আমলে অঙ্গীভূত হয়ে যান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে। অন্যরা প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে পুনর্গঠিতই হতে পারছিলেন না।
কৃষক সংগঠনগুলো মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন হলেও ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কৃষক আন্দোলনেও তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতা। শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলো বাংলাদেশের সমাজে পুনর্গঠিত না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ অভিজাত এলাকার মানুষদের শ্রমিক ও কৃষক নেতা বনে যাওয়া। বনানীর কৃষক যদি কৃষক সংগঠনের নেতা হয়ে যান, তাহলে আর যাই হোক তাতে সত্যিকারের কৃষকের কোনো সংগঠন গড়ে উঠবে না। স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের সংগঠন বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে সমাজের যে শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে জন অধিকার সংরক্ষণে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারত, তা নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলেই স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে এসেছে বিভিন্ন পরিবর্তন। স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে মানুষের। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এটিই বড় ব্যবধান।
সূত্র : আমার দেশ

আশা ভেঙেছে তবু স্বপ্নের কথা শোনাবো || আতাউস সামাদ

চল্লিশ বছর আগে এক গ্রামের পাশের মাঠে আমরা ক’জন একটা ট্রানজিস্টর রেডিও ঘিরে গোল হয়ে বসে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম। বাংলাদেশে বেঈমান বর্বর নৃশংস পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর ঢাকায় আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করার খবর শোনার জন্য। ইতোমধ্যে জানা হয়েছে যে, দখলদার পাকিস্তানিদের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছেন এবং রমনা রেস কোর্স ময়দানে প্রকাশ্যে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ চুক্তি সই হবে।
ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের বঙ্গভাষী দোসররা নয়া পল্টনে আমাদের ছেড়ে আসা বাসায় আমার খোঁজে হানা দিয়েছিল ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে। আমার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা আতিকুস সামাদকেও খুঁজছিল পাকিস্তানিরা। বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষী পাড়া-পড়শির মুখে সেইসব খবর পেয়ে আমরা ঢাকা ছেড়েছি সঙ্গে সঙ্গেই। এই শহর থেকে হাজার হাজার মানুষ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে পায়ে হেঁটে বা নৌকা দিয়ে সরু একটা খাল ধরে ধলেশ্বরী তীরে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁরা বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকের থাকার মতো জায়গা ছিল না। তাঁরা চেয়েছেন ঢাকা থেকে প্রাণ নিয়ে বের হতে। তারপর যে কোনো মুক্ত অঞ্চলে পৌঁছে ‘যেখানে রাত সেখানে কাত’ হয়ে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিতে। সবারই বিশ্বাস, কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকায় নিজ গৃহে ফেরত আসা যাবে। কারণ, হানাদার পাকিস্তানিরা যে শিগগিরই পরাজিত হবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ঢাকা ত্যাগ করার তাগিদ ছিল প্রথমত কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানি ও পাকিস্তানপ্রেমী আততায়ীদের লক্ষ্যতে পরিণত হয়েছিলেন অনেকে। আর দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানি সেনারা তাদের রাজাকার-আলবদর-আলশামস স্যাঙ্গাতদের সঙ্গে নিয়ে যদি ঢাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাহলে যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হবে তাতে অনেক বেসামরিক লোকও নিহত হবে। সপরিবারে আমি, আমার ভাই, বিখ্যাত আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক সাহেবের কন্যা সায়েমা হক ও পুত্র আনিসুল হক (যিনি বর্তমানে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিশিষ্ট আইনজীবীতে পরিণত হয়েছেন) এবং আমাদের বন্ধু আজিজুল হক একসঙ্গে চলছিলাম। আমরা যখন ধলেশ্বরী নদীতে নৌকায় উঠছি, তখনও পেছন থেকে কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। তবে ঠিক কোথায় কামানযুদ্ধ, তা নিরূপণ করতে পারিনি। কামানের আওয়াজ বন্ধ হয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ পরে। আমাদের গন্তব্য আজিজুল হকের গ্রামের বাড়ি, শেখরনগর।
আমরা শেখরনগর পৌঁছবার পরও যুদ্ধ হতে দেখেছি। পলায়নপর পাকিস্তানি সৈন্যদের তাড়া করে একদল মুক্তিযোদ্ধা শেখরনগরের ওই মাঠ পার হয়ে ছুটছেন, তা দেখেছি। নৃশংস পাকিস্তানিরা পালাবার সময়ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরাবার চেষ্টা করছিল। আবার কাছেই এক নদীতে একটি লঞ্চ লক্ষ্য করে ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে রকেট নিক্ষেপ করতে দেখেছি। ফলে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে সে জন্য ব্যক্তিগত গভীর উত্কণ্ঠা ছিল। ওদিকে ঢাকায় মা-বোন-ভগ্নিপতি-ভাগিনা-ভাগিনীদের এবং পাকিস্তানি জেলখানায় আমার সম্বন্ধী ডা. আনোয়ারুল হককে ছেড়ে এসেছি। তাদের জন্য উদ্বেগ ছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং শত্রুমুক্ত হয়েছে—এমন আকাঙ্ক্ষা তো ছিলই। নিজেরা বাঁচি কী মরি তার চেয়ে বড় কথা, একমাত্র কথা তখন ছিল যে দেশ স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত হতেই হবে। তাই পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের সংবাদ শোনার জন্য অধীর অপেক্ষা। অবশেষে সেই পরম সুসংবাদটা শুনলাম। আনন্দে আত্মহারা হলাম। নিঃশ্বাস নিলাম বুকভরে। তারপর মাটির সঙ্গে বুক মিশিয়ে দেশমাতৃকার স্নেহধন্য হলাম।
তবে আমাদের সেই আনন্দ সারা বুক ভরে থাকতে পারে নাই বেশিক্ষণ। দুঃখজনক হলেও অনেক শোকের খবর অপেক্ষা করছিল। ঢাকা ছাড়বার আগেই খবর পেয়েছিলাম, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র লে. আশফাকুস সামাদ পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছে ভুরুঙ্গামারীর যুদ্ধে। তার আগে আমাদের পাড়ার
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক নিহত হয়েছে। শেখরনগরের আশপাশে আজিজুল হক সাহেবের পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। ঢাকায় পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে যাবার সময় গোলাগুলিতে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাতুল্য জিল্লুর ভাইয়ের শিশুপুত্র নিহত হয়েছে।
১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন। অনেকেই যাচ্ছিলেন লঞ্চে করে। এরকম একটা লঞ্চ ডুবে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবরও শুনি। আর বিষাদ একেবারে গ্রাস করে ফেলে আমাদের যখন খবর পাই যে, অগ্রজতুল্য সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, এমএ মান্নান ও নিজামুদ্দিন আহমেদ, বন্ধু সাংবাদিক নাজমুল হক ও অনুজতুল্য সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে পাকিস্তানিদের সাহায্যপুষ্ট আলবদররা। ভাগ্যক্রমে বন্ধু এনায়েতুল্লাহ খান ও আমি তাদের থাবা থেকে আত্মরক্ষা করতে পেরেছিলাম। তবে আমাদের কষ্ট বাড়তেই থাকল, যখন আরও খবর পেলাম যে আমার শ্রদ্ধাভাজন অনেক শিক্ষক এবং গুণী চিকিত্সকদেরও হত্যা করেছে তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জিসি দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান এবং সাংবাদিক শহীদ সাবের তো নিহত হন ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানিদের প্রথম আক্রমণেই। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করার পর দিনগুলোতে যতটা না আনন্দিত হয়েছি, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে ততটাই কষ্ট পেয়েছি একের পর এক প্রাণ বিসর্জনের শোকসংবাদ পেয়ে। মোট কথা, বিজয় দিবস ও তার পরের দিনগুলো ছিল হর্ষ ও বিষাদ মেশানো।
আর সে জন্যই তখন দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম ও যেসব চিন্তা এসেছিল, তা এখনও আমার মতো অনেকের কাছেই আজও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দেশটাকে সচল করব, সেটা তো ছিল প্রথম চিন্তা ও ইচ্ছা। তারপরই যে আকাঙ্ক্ষা মনে বাসা বেঁধেছিল তা ছিল এই যে, এদেশে সব মানুষ সত্ হবে, দেশটা চলবে ন্যায়-নীতির ওপর, দেশের রাজনীতির ভিত্তি হবে গণতন্ত্র ও বহুমতের সহাবস্থান। যা আছে দেশে, সবই অর্থাত্ দেশের যে সম্পদ তা সবার বেঁচে থাকার ও মঙ্গলের জন্য কাজে লাগানো হবে। বাংলাদেশ অচিরেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে, এদেশের সব নাগরিক একে অপরকে ভালোবাসবে এবং কেউ কারও জন্য অশান্তি সৃষ্টি করবে না। শহীদদের পবিত্র স্মৃতি বুকে ধরে রাখবে সবাই সর্বকাল এবং বহু প্রাণ ও অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা চির-ভাস্বর থাকবে। আমরা হব একটি সুন্দর, গর্বিত, স্বাধীন দেশের নাগরিক।
এসবের অনেক কিছুই এখন অনুপস্থিত। দেশে ধনবৈষম্য একটি বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবু লোভী লুটেরারা তাদের হীন লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়। দুর্নীতি গ্রাস করেছে সারাদেশ। সঙ্গে এসে জুড়ে বসেছে গুম-খুন। মাঝে মাঝে মনে হয় সন্ত্রাসীরা যেন স্বরাজ পেয়েছে এই বাংলাদেশে। ন্যায়-নীতি ও ন্যায়বিচার এখন খুঁজতে হয় শুধু স্বপ্নে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি আর যে-ই মানুন, বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সেগুলোকে অবজ্ঞাই করছেন। শাসকদের আত্মম্ভরিতা সীমাহীন। চল্লিশ বছর আগে যেসব স্বপ্ন দেখেছিলাম, বর্তমানের রূঢ় বাস্তব সেগুলোর বিপরীত। তবে এও ঠিক যে, একদিনে এই দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় নাই। দেশটা ঠিক পথে চলতে না পারার দায় অনেককেই ভাগ করে নিতে হবে। যদিও তারা মনে করতে পারেন আমাদের এই খেদোক্তি ব্যর্থদের নিষম্ফল আস্ফাালন। তবু আমরা আশা ছাড়ব না। আমরা সুদিনের স্বপ্নের কথা শুনিয়েই যাব। 
সুত্র : আমার দেশ

স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে || আল মাহমুদ

আপনাদের কাছে এ বিজয় দিবসের তাত্পর্য অনেক বেশি, অনেক মূল্যবান; কিন্তু আমি যেহেতু অংশীদার, এ দিবস যারা সৃষ্টি করেছেন তাদের একজন আমি, সে কারণে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যায়, যা ব্যক্ত করা যায় না। অনেক ভালোবাসা, মানবিক বিনিময় এর সঙ্গে জড়িত। অনেক মানুষ এসব ভুলে যেতে পারে; কিন্তু কবিরা বিস্মরণপ্রিয় নয়, তারা ভোলে না।
আমার মনে পড়ছে, আজ তো ষোলো তারিখ; এই ষোলো কিংবা পনেরো, হয়তো ষোলোই হবে, দুপুরে খেতে বসেছি। আমার ভাগ্নি আমাকে বলছে—মামা, আমাদের বোধহয় আর দেশে যাওয়া হবে না। আমি ওকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়ার জন্য বলেছি যে, কী যে বলিস না তুই! খুব উচ্চহাস্য করলাম আমি। বললাম, দেখিস, আমরা খুব তাড়াতাড়ি জয়ী হয়ে ঢাকায় ফিরে যাব। আমি তো একটি কথার কথা বলেছি ভাগ্নিকে; কিন্তু দৈবক্রমে সত্যিই বিজয় দিবস এসে গেল। আমাদের যিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন, জেনারেল এমএজি ওসমানী, তিনি আমার ভগ্নিপতির হাতে একটা স্লিপ দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমি সেটা পড়ে দেখলাম, এই মুহূর্তে আপনি ঢাকায় চলে যান। কী আশ্চর্য, আমি স্লিপ নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছি আমার ভগ্নিপতির মুখের দিকে। বললেন, কীভাবে যাবেন সেটা তো? সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনি প্লেনেই যাবেন। একটা এয়ার ক্যারিয়ারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তো উঠলাম গিয়ে ব্যবস্থামত প্লেনে। একটা মিলিটারি আদান-প্রদানের এয়ার ক্যারিয়ার। সেখানে যাদের দেখলাম তারা সবাই আমার পরিচিত; কিন্তু তাদের মধ্যে দু’জনের নামই আমার মনে পড়ে। একজন হলেন সিকান্দার আবু জাফর ভাই, আরেকজন হলেন কবি আবিদুর রহমান।
ঢাকায় এসে নামলাম তেজগাঁও বিমানবন্দরে। সবাই নেমেই যার যার রাস্তায় চলে গেল। আমি একা। আর আমার স্যুটকেসটা ভারী। অনেক বই-টই নিয়ে এসেছিলাম তো! এখন কী করি? আমি কাঁধে তুলে নিয়ে অনেক কষ্টে গেটে এসে দাঁড়ালাম। এসব স্মৃতি মনে পড়ছে। অনেক স্কুটার আমার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমাকে দেখে ফেলে চলে যাচ্ছে। আমি হা করে তাকিয়ে আছি। কিন্তু এক বৃদ্ধ স্কুটারওয়ালা, আমাকে দেখে চলে গেলেন, অনেক দূর গিয়ে বোধহয় তার হৃদয়ে মমতা জাগায় আবার ফিরে এলেন, ‘উঠুন’। কোথায় যাব সেটা না, উঠুন। আমি স্যুটকেসটা কোনোমতে তুলে নিয়ে উঠে পড়লাম। তারপর বললাম, আমি খিলগাঁও বাগিচায় যাব। তিনি স্টার্ট করে চলে যাচ্ছেন। খিলগাঁও বাগিচায় নামলাম। আমার বাড়ির সামনে—বাড়িতে তো কেউ নেই, আমি জানি। আমি স্কুটারওয়ালাকে টাকা দিতে গেলাম। আমার পকেটে ভারতীয় টাকা। তিনি বললেন, যা খুশি দেন। আমি তাকে টাকা দিলাম। তিনি হেসে নিলেন। বললেন, যান যান ভেতরে যান, গিয়ে দেখেন কেউ আছে কি-না। আমি স্যুটকেসটা টানতে টানতে ভেতরে গিয়ে দেখি দরজা খাঁ খাঁ করছে। তালা ছিল। কোনো কিছু নেই। ঘর খালি। শূন্য খাঁ খাঁ করছে। এই-ই বিজয় দিবস আমার কাছে।
কতগুলো জিনিসের কখনও ক্ষতিপূরণ হয় না। আমারও কোনো ক্ষতিপূরণের কথা আমি বলছি না। আমরা শুধু একটা দিন পেয়েছি। সেটা হলো বিজয় দিবস। আর কোনো কিছু না, আর কিছু না। অনেক হৃদয়বিদারক স্মৃতি অতিক্রম করে এসেছি। আপনাদের কাছে এ বিজয় দিবস একরকম, আমার কাছে অন্যরকম। আমার কাছে অনেক স্মৃতি আছে, যা মেলতে গেলে ডালপালা ছড়িয়ে পড়বে। সেগুলো তো বলা যায় না, বলা যাবে না। আর কেইবা সেগুলো মনে রাখবে! কিছু তো লিখেছি। সব কথা তো লেখা যায় না। সব কথা কি লেখা যায়, সব? না, না, সব কথা লেখা যায় না। অনেক বিস্মৃতি, স্মৃতি এই দিবসের সঙ্গে জড়িত। শুধু একটা কথা মনে রাখবেন, এমনিই এদিনটি আসেনি। এ দিনটির জন্য অনেকের অনেক ত্যাগ আছে। আমার জন্য আমার মামার বাড়িটা কামান দেগে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারা ধনী লোক ছিলেন। আমার মামার বাড়িতে আমি লজ্জায় আর যেতাম না; কিন্তু আমার মামারা ব্যবসায়ী মানুষ। তারা আবার সব বিল্ডিং-টিল্ডিং করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমি যাই না। আমার মামিরা খবর দিয়ে, লোক পাঠিয়ে আমাকে নিয়েছেন। কী রে, তুই আসিস না কেন? আমি বললাম, আমার জন্য এত ক্ষতি হলো! বললেন, এজন্যই তুই আসিস না? দেখ, আবার বিল্ডিং-টিল্ডিং হয়ে যাচ্ছে। তোর মামারা তো ব্যবসায়ী মানুষ, ওরা কি ওসবের তোয়াক্কা করে? খুব আদর করে মামিরা খাওয়ালেন আমাকে। কিন্তু আমি খুব শরম পেয়েছিলাম যে, আমার জন্য এসব মানুষের এত ক্ষতি হলো! এসবের জন্য কে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে? কেউ দেয়নি। যা-ই হোক, আমি এজন্য বলছি যে, বিজয় দিবস আপনাদের কাছে একরকম, আমার কাছে আরেকরকম। আমার কাছে অনেক হৃদয়বিদারক স্মৃতি আছে, অনেক স্মৃতি। এমন অনেক মানুষ আমাকে টেনে টেনে ঘরে নিয়ে গেছে। নিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে রেখেছে। তাদের চেহারাগুলো মনে পড়ছে। হ্যাঁ, যে ক’জনের কথা খুবই মনে পড়ে, তারা জীবিত নেই। এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা বড় অসহনীয়, অনেক কষ্ট আছে বিজয় দিবসের পেছনে।
আপনাদের কাছে একটা কথা বলি, এই যে বিজয় দিবস পালন করছেন, এটা বলা যায় স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে না পারলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তা ঠেকানো মুশকিল হবে। আপনারা শুধু বাংলাদেশকে দেখেন একটা মানচিত্র। তা নয়, এর একটা অন্তর্বর্তী, একটা অদৃশ্য মানচিত্র আছে। সে মানচিত্র কী? এর পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আকরিক লোহা, কয়লা। লোহা আর কয়লা পাশাপাশি থাকলে সেটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার। এটা বাংলাদেশে আছে। বাংলাদেশে গ্যাস আছে। স্তরের পর স্তর গ্যাস আছে। এর পরের স্তরেই আছে পেট্রল। আপনারা জানেন না; কিন্তু পৃথিবীর সব লোভী শকুন, বিদেশি—যারা এখানে আসে তারা জানে এর পেটের মধ্যে কী আছে। এই যে বাংলাদেশের পেটের ভেতরে কী আছে, আমরা জানি না—এটা একটা অপরাধ। আমাদের জানতে হবে, আমাদের দেশের মাটির নিচে কী আছে, উপরে কী আছে, সমতলভূমিতে কী আছে, টিলা-টক্করে কী আছে; সব জানতে হবে। এটা না জানলে দেশপ্রেম যাকে বলে সেটা গড়ে ওঠে না।
এ হলো বিজয় দিবসের কথা। দেশ সম্পর্কে সবসময় বেশি জানতে হবে। আমি এদেশের নদী-নালা, নারী-প্রকৃতি এর মধ্য দিয়ে এসেছি। আমি বাস করেছি। আমি ভালোবেসেছি। সেজন্য আমার কবিতায় তার চিহ্নগুলো ফুটে উঠেছে। এ কবিতাই যেহেতু আমার কর্ম, কবিতাই যেহেতু আমার ভাষা আর যেহেতু কবিতাই হলো মানবজাতির মাতৃভাষা, সেজন্য কাব্যের পেছনেই থাকি। কবি ছাড়া আর তো কিছু নই। কী আমি? কিছু নই। কবি ছাড়া কিছু নই। এই কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করতে হবে। নিজের দেশের, জাতির ভাষা ও কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই যারা করে, তারাই হলো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এটা স্মরণ রাখবেন আপনারা।
অনুলিখন : আহমদ বাসির

Monday, December 12, 2011

একাত্তরে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ || একরামুল হক শামীম

১৯৭১ সালে নারীর বিরুদ্ধে যে বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা মানব ইতিহাসে বিরল। নারীর প্রতি অত্যাচারে সেই বিষয়গুলো কখনোই পুরোপুরি উঠে আসেনি। অনেকের জীবনের করুন ঘটনাগুলো তাই আড়ালেই থেকে গেছে। কখনোই উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি সেই নারীদের দুঃখগুলোকে; যারা রাতের পর রাত নির্মম যৌন নির্যাতন সহ্য করে গেছে, পরনে কাপড় ছিলনা , মাথার চুল প্যাচিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে এই ভেবে যাদের মাথা চুল কেটে ফেলা হয়েছিল, নিজের পরিবারের সদস্যদের সামনে যাদের ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। নারীর বিরুদ্ধে যে বীভৎসতম নির্যাতন চালানো হয়েছিল ১৯৭১ সালে তার বিচার হয় নি। এমনকি এই বিষয়টি যে অন্য অপরাধগুলো থেকে আলাদা মাত্রার সেটিও আলোচিত হয় নি। এমনকি নির্যাতিত নারীর সঠিক সংখ্যাও জানা সম্ভব হয় নি। বরঞ্চ নির্ভর করতে হয়েছে বিভিন্ন সংখ্যার ওপর।
কয়েকটি পরিসংখ্যান
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জনসভায় বলেছিলেন, দুই থেকে আড়াই লাখ নারী যুদ্ধে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে এ সংখ্যাটিকেই সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক বাংলার বানী’র গনহত্যা বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা থেকে জানা যায়, দুই থেকে আড়াই লাখের পরিসংখ্যানটি সে সময়ের সরকারি কর্মকর্তারা অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশের ৪৮০টি থানার ২৭০টিই পাকিস্তানী সেনাদের দখলে ছিল। প্রতিদিন গড়ে ২ জন করে নিখোঁজ মহিলার হিসাব অনুযায়ী লাঞ্ছিত মহিলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ। [১]
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান, ৪ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তিনি আরো জানান, অন্তঃসত্ত্বা মহিলার সংখ্যাই ২ লাখ।
সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় দু’লাখ, তিন লাখ ও চার লাখ- এরকম তিনটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ রয়েছে।
সুসান ব্রাউনমিলার এ সংখ্যাটিকে প্রায় চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন।[২] তিনি লিখেছেন-
During the nine-month terror, terminated by the two week armed intervention of India, a possible three million people lost their lives, ten millions fled across the border to India and 200,000, 300,000 or possible 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. Eighty percent of the raped women were Moslems, reflecting the population of Bangladesh, but Hindu and Christian women were not exempt.
ওয়ারক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি একাত্তরের নারী নির্যাতনের একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে।[৩] এর মাধ্যমে জানা যায়-
১. স্পট ধর্ষণ,স্পট গণধর্ষণ ও বন্দী নির্যাতিতার সম্মিলিত সংখ্যা চার লাখ আটষট্টি হাজার (স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার তিন লাখ সাতা হাজার ছশ এবং বিভিন্নভাবে পাকিস্তানীদের নিকট বন্দী নির্যাতিত নারী এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’ নারী)।
২. চিহ্নিত স্থানে নির্যাতিতা নিহত ও অপহৃতসহ স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার- তিন লাখ ষাট হাজার। এঁদের মধ্যে শুধুমাত্র স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার প্রায় তিন লাখ সাতাশ হাজার যা মোট নির্যাতিতার সত্তরভাগ। এঁদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন প্রায় ত্রিশভাগ অর্থাৎ এক লাখ আট হাজার নারী।
৩. নির্যাতিত বন্দী নারী প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার (এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’) যা মোট নির্যাতিতার প্রায় ত্রিশভাগ। এরমধ্যে কারাগার, ক্যাম্প, বাঙ্কার প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিতার সংখ্যা মোট নির্যাতিদের প্রায় আঠারভাগ।
এছাড়াও বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট, মার্শাল ল’ আদালত এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর, অফিস আদালত, হোটেল, বিনোদন কেন্দ্র প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিত হন বারোভাগ (ক্যাটাগরি দুই-শতকরা পাঁচভাগ এবং ক্যাটাগরি তিন-সাতভাগ)।
৪. বন্দী নির্যাতিত নারীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা আশিভাগ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছিয়াশি হাজার। এঁদের মধ্যে চল্লিশভাগকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তাঁরা নিজেরাই আত্মহত্যা করেছেন।
যৌন নির্যাতন
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ড. জিওফে ডেভিস বলেছেন, পৌনঃপুনিক লালসা চরিতার্থ করবার জন্য হানাদারবাহিনী অনেক তরুণীকে ধরে তাদের শিবিরে নিয়ে যায়। এসব তরুণীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হবার লক্ষণ কিংবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে হয় তাঁদেরকে পরিত্যাগ করা হয়েছে নয়তো হত্যা করা হয়েছে। কোন কোন এলাকায় বারো ও তেরো বছরের বালিকাদের শাড়ি খুলে নগ্ন অবস্থায় রেখে ধর্ষণ করা হয়েছে যাতে তারা পালিয়ে যেতে অথবা আত্মহত্যা করতে না পারে।[৪]
সুসান ব্রাউনমিলার তার Against Our Will: Men, Women and Rape বইয়ে লিখেছেন-[৫]
Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty. Girls of eight and grandmothers of seventy-five had been sexually assaulted during the nine-month repression. Pakistani soldiers had not only violated Bengali women on the spot; they abducted tens of hundreds and held them by force in their military barracks for nightly use. The women were kept naked to prevent their escape.
যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ ৯ মাস সময়ে নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পাকিস্তানী সৈনিকরা নারীদের বন্দি করে নিয়ে গেছে নিজস্ব ক্যাম্পে এবং বাঙ্কারে। দিনের পর দিন সেখানে তাদের আটকে রেখে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। ক্যাম্প পরিবর্তনের সাথে সাথে সেইসব নারীদেরও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্য ক্যাম্পে।
ডা. এম এ হাসান লিখিত “যুদ্ধ ও নারী” গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে এমনই একজনের কাহিনী।[৬]
“একাত্তরের মে মাসে হবিগঞ্জের লস্করপুরে চা বাগান থেকে পাকি আর্মিরা যখন সুপ্রিয়া নায়েককে ধরে নিয়ে যায় তখনও তাঁর বয়স ষোল পেরোয়নি। প্রথম দিন চা বাগানের এক ক্যাম্পে নিয়ে কয়েকজন পাকি আর্মি তাঁর ওপর বীভৎস যৌন নির্যাতন চালায়। সেই ছিল শুরু। তারপর পাকিরা তাঁকে নিয়ে গেছে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে, এক বাগান থেকে অন্য বাগানে। দিনের পর দিন ঐসব ক্যাম্পের আর্মি অফিসাররা তাঁর ওপর নির্দয় নির্যাতন চালিয়েছে। দীর্ঘ আট মাসের প্রতি রাতে চারজন পাঁচজন করে পাকি তাঁকে ধর্ষণ করেছে। একটি রাতের জন্যও নিষ্কৃতি দেয়নি তাঁকে। তাদেরকে বাঁধা দেবার কোন উপায় ছিল না, মুখ বুজে সব সহ্য করে গেছেন তিনি। এরমধ্যে একবার ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এলেও পাকিরা আবার তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সুপ্রিয়া নায়েক সহ্য করেছেন পাকিদের সীমাহীন নির্যাতন। যুদ্ধের ক’মাসে অন্তত পঞ্চাশজন পাকি আর্মি অফিসার তাঁকে নিয়মিত ধর্ষণ করেছে। তাঁকে ঠিকমতো খাবার দেয়নি, অসুস্থ হলেও চিকিৎসা করায়নি। দিনের পর দিন কেবল চালিয়ে গেছে বীভৎস ধর্ষণ।”
১৯৭২ সালে মার্চ থেকে ছয় মাস বাংলাদেশের হয়ে কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক ড. জেফ্রি ডেভিস। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান-[৭] “ধনী ও সুন্দরী মেয়েদেরকে অফিসারদের জন্য রেখে দেয়া হতো আর বাকিদের অন্যান্য র্যাংঙ্কের সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো। আর মেয়েদেরকে দারুণ কষ্টে ফেলে দেয়া হতো। তাদেরকে পর্যাপ্ত খেতে দেয়া হতো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসা দেয়া হতো না। অনেকেই ক্যাম্পের মধ্যে মারা গেছে।”
অপহরণ
যুদ্ধকালীন সময়ে শুধু যৌন নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয় নি পাকবাহিনী। বেশ কিছু সংখ্যক নারীকে ‘কমফোর্ট গার্ল’ হিসেবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা। ১৯৭২ সালের ২০ জুন দৈনিক ইত্তেফাকের তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হইতে অপহৃতা সাড়ে ৭০০ তরুণীর মর্মবেদনার কাহিনী’ শীর্ষক খবরে লেখা হয়, ‘দখলদার পাক বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হইতে অপহরণ করিয়া নেওয়া ৭ শত ৫৫ জন বাঙালি তরুণী করাচি ও কোয়েটার বন্দী শিবিরগুলিতে অমানুষিক দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকারে পরিণত হইয়াছে।’
জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা (forced pregnancy)
অফিসিয়াল ডকুমেন্ট অনুযায়ী যুদ্ধকালীন সময়ে ফোর্সড প্যাগন্যান্সীর (forced pregnancy) শিকার হন কমপক্ষে ২৫০০০ জন।[৮]
অন্যদিকে সুসান ব্রাউনমিলারের লিখেছেন ধর্ষণের পরও বেঁচে থাকা নারীদের মধ্যে ২৫ হাজার জন গর্ভধারন করেছিলেন (ব্রাউনমিলার, ১৯৭৫ : ৮৪)। তিনি লিখেছেন-
The most serious crisis was pregnancy. Accurate statistics on the number of raped women who found themselves with a child were difficult to determine but 25,000 is the generally accepted figure.
তবে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির ডা. এম এ হাসান দাবি করেন, ‘এ ধরনের নারীর সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৮৮ হাজার ২ শ’। ’৭২ সালের মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৬২ হাজার ধর্ষিত নারী এবং আরো ১ লাখ ৩১ হাজার হিন্দু নারী স্রেফ গায়েব হয়ে গিয়েছিল। তারা বিলীন হয়ে গিয়েছিল বিশাল জনসমুদ্রে।’ এদের মধ্যে ৫ হাজার জনের গর্ভপাত সরকারিভাবে ঘটানো হয়েছিল বলে জানান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা দিতে আসা অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস। ১৯৭২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন দৈনিক বাংলায় তার কাজের ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তার মতে, সরকার উদ্যোগ নেওয়ার আগেই ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার নারীর ভ্রুণ স্থানীয় দাই, ক্লিনিকসহ যার পরিবার যেভাবে পেরেছে সেভাবে ‘নষ্ট’ করেছে।[৯]
জেনোসাইডাল রেইপ (গণহত্যা সম্পর্কিত ধর্ষণ) (Genocidal Rape)
জোনোসাইডাল রেইপের সাথে গণহত্যার সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধকালীন সকল ধর্ষণই গণহত্যার সাথে সম্পর্কিত নয়। যদি ধর্ষণের সাথে কোন একটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা থাকে অর্থাৎ গণহত্যার যেসব উপাদান জরুরী তা যদি ধর্ষণের মাধ্যমে করা হয় সেটাই জোনোসাইডাল রেইপ।
জেনোসাইডাল রেইপ বিষয়টি প্রথম আলোচিত হয় রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়। আকায়েসু (Akayesu) মামলায় প্রথমবারের মতো গণহত্যার সাথে ধর্ষণের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। আকায়েসু রুয়ান্ডার একটি কমিউনিটি টাবার মেয়র ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায় প্রমাণিত হয়। ১৯৯৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর International Criminal Tribunal for Rwanda – ICTR আকায়েসুর বিরুদ্ধে রায় দেয়।[১০]
আকায়েসুর মামলাটি বিখ্যাত কারন এটিই প্রথম রায় যেখানে গণহত্যা বিচার হয়েছে, যে গণহত্যার সাথে যৌন নির্যাতনের সম্পর্ক আছে। পাশাপাশি এই মামলার রায়ে ধর্ষণ এবং যৌণ নির্যাতনের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।[১১]
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে জেনোসাইডাল রেইপ সংঘটিত হয়েছিল। এনবিসি নিউজ ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট করে। যাতে জানা যায় ১৩ বছরের মেয়েরাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
পাকিস্তানী সেনাদের স্থানীয় সহযোগী, রাজাকার এবং আল বদর বাহিনী বিশেষত হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনের জন্য ধর্ষণ করতো। বীনা ডি কস্তা লিখেছেন-[১২]
The Pakistan Army’s local militia, known as the Razakaar and al-Badr, used rape to terrorise, in particular the Hindu population, and to gain access to its land and property.
আইনের আলোয় দেখা
ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের ১৭৯ পৃষ্টার রায়ে কোথাও ধর্ষণের বিচারের উল্লেখ নাই। তবে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট চলার সময় ধর্ষণের কিছু অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। টোকিও প্রসেডিং চলার সময় “রেপ অব নানকিং” আলোচিত হয়।
ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে নতুন এক কনসেপ্ট এর উদ্ভব হয় আন্তর্জাতিক আইন পরিমন্ডলে। সেটি হলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের চার্টার অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (Charter of the International Military Tribunal) এর আর্টিকল 6(c) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছে। লক্ষ করি সেই সংজ্ঞাটি-
“(c) Crimes against humanity: namely, murder, extermination, enslavement, deportation, and other inhumane acts committed against any civilian population, before or during the war, or persecutions on political, racial or religious grounds in execution of or in connection with any crime within the jurisdiction of the Tribunal, whether or not in violation of the domestic law of the country where perpetrated.”
লক্ষ্য করা যাক সংজ্ঞাতে হত্যা, দাসত্ব ছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয়ের অবতারনা করা হয়েছে, কিন্তু ধর্ষণের বিষয়টির উল্লেখ নেই। পরবর্তীতে বাংলাদেশ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে আইন প্রণয়ন করে [The International Crimes (Tribunals) Act, 1973] তখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। লক্ষ করি সেই সংজ্ঞায়ন-
দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ধারা 3 (2) (a) অনুযায়ী-
(a) Crimes against Humanity: namely, murder, extermination, enslavement, deportation, imprisonment, abduction, confinement, torture, rape or other inhumane acts committed against any civilian population or persecutions on political, racial, ethnic or religious grounds, whether or not in violation of the domestic law of the country where perpetrated;
“মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ : যথা, হত্যা, নিশ্চিহ্ন করণ, দাসকরণ, নির্বাসিত করা, কারারুদ্ধ করণ, অপহরণ, অবরোধ, নির্যাতন, ধর্ষণ অথবা বেসামরিক নাগরিকদের উপর অন্যান্য অমানবিক কাজ পরিচালনা করা অথবা সংগঠিত হওয়ার স্থানের অভ্যন্তরীন আইন ভঙ্গ করে বা না করে রাজনৈতিক, গোত্রগত, জাতিগত অথবা ধর্মীয় কারনে অভিশংসন করা।”
লক্ষ্য করি বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে ধর্ষণকে যুক্ত করে। আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজন। এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরবর্তী কিছু সিদ্ধান্তে।
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা (International Criminal Tribunal for Rwanda – ICTR) । আইসিটিআর এর স্ট্যাটুট-এর ৩ অনুচ্ছেদে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
Article 3
The International Tribunal for Rwanda shall have the power to prosecute persons responsible for the following crimes when committed as part of a widespread or systematic attack against any civilian population on national, political, ethnic, racial or religious grounds:
(a) Murder; (b) Extermination; (c) Enslavement; (d) Deportation; (e) Imprisonment; (f) Torture;
(g) Rape; (h) Persecutions on political, racial and religious grounds; (i) Other inhumane acts.
এই অনুচ্ছেদের 3(g) তে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ধর্ষণকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। যদিও Dr. Frances T. Pilch তার “Rape as Genocide : The Legal Response to Sexual Voilence” শীর্ষক রচনায় দাবি করেছেন আইসিটিআর এর স্ট্যাটুটে প্রথমবারের মতো ধর্ষণকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারও অনেক আগে ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ ধর্ষণকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে সংযুক্ত করে।
পরবর্তীতে রোম স্ট্যাটুটে (Rome Statute of the International Criminal Court) ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে আরো ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়। লক্ষ্য করি সেই সংজ্ঞায়নটি-
Article 7 : Crimes against humanity
1. For the purpose of this Statute, “crime against humanity” means any of the following acts when committed as part of a widespread or systematic attack directed against any civilian population, with knowledge of the attack:
(a) Murder; (b) Extermination; (c) Enslavement; (d) Deportation or forcible transfer of population; (e) Imprisonment or other severe deprivation of physical liberty in violation of fundamental rules of international law; (f) Torture; (g) Rape, sexual slavery, enforced prostitution, forced pregnancy, enforced sterilization, or any other form of sexual violence of comparable gravity; (h) Persecution against any identifiable group or collectivity on political, racial, national, ethnic, cultural, religious, gender as defined in paragraph 3, or other grounds that are universally recognized as impermissible under international law, in connection with any act referred to in this paragraph or any crime within the jurisdiction of the Court; (i) Enforced disappearance of persons; (j) The crime of apartheid; (k) Other inhumane acts of a similar character intentionally causing great suffering, or serious injury to body or to mental or physical health.
অনুচ্ছেদ 7(1) (g) এর দিকে খেয়াল করি। বলা হয়েছে Rape, sexual slavery, enforced prostitution, forced pregnancy, enforced sterilization, or any other form of sexual violence of comparable gravity মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এটিকে পূর্বের চেয়ে বিস্তৃত সংজ্ঞায়ন। জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা (forced pregnancy) বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে রোম স্ট্যাটুটের আর্টিকল 7(2) (f) এ। সেটি হলো-
(f) “Forced pregnancy” means the unlawful confinement of a woman forcibly made pregnant, with the intent of affecting the ethnic composition of any population or carrying out other grave violations of international law. This definition shall not in any way be interpreted as affecting national laws relating to pregnancy
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা’সহ অন্য বিষয়গুলোর বিচারের ক্ষেত্রে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ কনসেপ্ট এর সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
একটি প্রস্তাবনা
বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে ১৯৭৩ সালে যে আইনটি করে তাতে প্রথমবারের মতো ধর্ষণকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে নারীর ওপর ধর্ষণের বাইরেও আরো অনেক মাত্রার নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এই ধরণের নির্মম নির্যাতনের বিচার হওয়া জরুরী। রোম স্ট্যাটুট অব ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট –এ ধর্ষণ, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করাসহ আরো কিছু বিষয় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তবে এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালে নারীর বিরুদ্ধে যে ধরণের নির্যাতন চালানো হয়েছিল তার পুরোপুরি বিচারের আলোয় রাখা সম্ভব হয় না। তাই প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের উচিত নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ (Crime against Women) নামের নতুন একটি কনসেপ্টকে সংজ্ঞায়িত করে তার অপরাধীদের বিচার করা। ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্যকরা সহ নারীকে যুদ্ধক্যাম্পে আটকে রাখা, শারীরিক এবং মানসিকভাবে আক্রান্ত করা, ঠিকমতো খাবার না দেওয়া, পরিধেয় কাপড়ের ব্যবস্থা না করা এসবই হতে পারে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ।
যুদ্ধক্যাম্পে আটকে রেখে দিনের পর দিন অনাহারে রেখে রেখে, পরিধেয় কাপড় কেড়ে নিয়ে নারীদের উপর মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে যে অত্যাচার করা হয়েছে তার কঠিন বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আইনগতভাবে “নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ” কনসেপ্টটাকে গ্রহণ করা উচিত।
তথ্যসূত্র :
১. মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা কতো?;শামীমা বিনতে রহমান, ভোরের কাগজ, ১৭ মে ২০০২
২. Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 81
৩. একাত্তরের নারী নির্যাতন : ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়; ডা. এম এ হাসান; প্রসঙ্গ ১৯৭১ : মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, পৃষ্টা ৩৯
৪. একাত্তরের নারী নির্যাতন : ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়; ডা. এম এ হাসান; প্রসঙ্গ ১৯৭১ : মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, পৃ. ৩৩
৫. Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 83
৬. যুদ্ধ ও নারী; ডা. এম এ হাসান, পৃ ২৭-২৮
৭. ড. জেফ্রি ডেভিস যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী একজন ডাক্তার, বীণা ডি কস্তা, যুদ্ধাপরাধ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পৃষ্টা ৪৯-৫০
৮. Bangladesh’s erased past; Bina D’costa, find online
৯. সেইসব বীরাঙ্গনা ও তাদের না-পাক শরীর; ফারুক ওয়াসিফ
১০. Prosecutor vs. Jean-Paul Akayesu, Judgment, No. ICTR-96-4-T (September 2, 1998), hereinafter reffered to as Akayesu, Available online at .
১১. When Rapes Become Genocide, New York Times, September 5, 1998 10:1.
১২. Bangladesh’s erased past; Bina D’costa, find online
সূত্র : দ্রোহ

Tuesday, November 15, 2011

স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হল || নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না৷
তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হদৃয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি ,মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত৷ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ … ৷

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প৷
সেই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর৷
না পার্ক না ফুলের বাগান, — এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়৷
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে৷

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক৷
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে৷
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্যে কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: “কখন আসবে কবি?’ “কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের৷

একুশে ফেব্রুয়ারী || আবদুল গাফফার চৌধুরী

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তি লগনে তবু তোরা পার পারি ?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।
সেদিনো এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিলো হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেনো,
এমন সময ঝড় এলো এক, ঝড় এলো ক্ষ্যাপা বুনো।
সেই আঁধারে পশুদের মুখ চেনা
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাংলার বুকে।
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়-
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি-
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে
জাগে মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে
দারুণ ক্রোধের আগুনে জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

Sunday, May 8, 2011

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল ।। আহমেদ খালিদ

মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল (ডিসেম্বর ১৬, ১৯৪৭- এপ্রিল ১৭, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।


সংক্ষিপ্ত জীবনী

মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলা জেলার দৌলতখান থানার পশ্চিম হাজীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাবিবুর রহমান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার ছিলেন। শৈশব থেকেই দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। পড়াশোনা বেশিদূর করতে পারেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর উচচ বিদ্যালয়ে দু-এক বছর অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৭-র ১৬ ডিসেম্বর বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে চাকরি গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। ১৯৭১-এর প্রথম দিকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠানো হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ঘিরে তিনটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে এন্ডারসন খালের পাঁড়ে। আখাউড়ায় অবস্থিত চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট দক্ষিন দিক থেকে নিরাপত্তার জন্য দরুইন গ্রামের দুই নম্বর প্লাটুনকে নির্দেশ দেয়। সিপাহী মোস্তফা কামাল ছিলেন দুই নম্বর প্লাটুনে। কর্মতৎপরতার জন্য যুদ্ধের সময় মৌখিকভাবে তাঁকে ল্যান্স নায়েকের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়।

যেভাবে শহীদ হলেন

১৬ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কুমিল্লা-আখাউড়া রেললাইন ধরে উত্তর দিকে এগুতে থাকে। ১৭ই এপ্রিল পরদিন ভোরবেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দরুইন গ্রামে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের উপর মর্টার ও আর্টিলারীর গোলাবর্ষণ শুরু করলে মেজর শাফায়াত জামিল ১১ নম্বর প্লাটুনকে দরুইন গ্রামে আগের প্লাটুনের সাথে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেন। ১১ নম্বর প্লাটুন নিয়ে হাবিলদার মুনির দরুইনে পৌছেন। সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল তার নিকট থেকে গুলি নিয়ে নিজ পরিখায় অবস্থান গ্রহন করেন। বেলা ১১ টার দিকে শুরু হয় শত্রুর গোলাবর্ষণ। সেই সময়ে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। সাড়ে ১১টার দিকে মোগরা বাজার ও গঙ্গা সাগরের শত্রু অবস্থান থেকে গুলি বর্ষিত হয়।
১২ টার দিকে আসে পশ্চিম দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ। প্রতিরক্ষার সৈন্যরা আক্রমণের তীব্রতায় বিহ্বল হয়ে পড়ে। কয়েক জন শহীদ হন। মোস্তফা কামাল মরিয়া হয়ে পাল্টা গুলি চালাতে থাকেন। তাঁর পূর্ব দিকের সৈন্যরা পেছনে সরে নতুন অবস্থানে সরে যেতে থাকে এবং মোস্তফাকে যাবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তাদের সবাইকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগের জন্য মোস্তফা পূর্ণোদ্যমে এল.এম.জি থেকে গুলি চালাতে থাকেন। তাঁর ৭০ গজের মধ্যে শত্রুপক্ষ চলে এলেও তিনি থামেননি। এতে করে শত্রু রা তাঁর সঙ্গীদের পিছু ধাওয়া করতে সাহস পায়নি। এক সময় গুলি শেষ হয়ে গেলে, শত্রুর আঘাতে তিনিও লুটিয়ে পড়েন। 

সূত্র : http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ।। আহমেদ খালিদ

নূর মোহাম্মদ শেখ(ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৩৬- সেপ্টেম্বর ৫, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেসা। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানকার লেখাপড়া শেষ না করে ১৯৫৯-এর ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এ যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোরে বদলি করা হয়। বদলি স্থানে যোগ দানের আগেই স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন।

যেভাবে শহীদ হলেন

১৯৭১- এর ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্থানি সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষন করতে থাকে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষন করা হয়। তবু পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এক সময়ে সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এল.এম.জি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে।
ধরাশয়ী হওয়া মাত্র আহত নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। হাতের এল.এম.জি সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বললেন এবং মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন যতক্ষণ না তাঁরা নিরাপদ দূরুত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণে ঐ রাইফেল দিয়ে শত্রুসৈন্য ঠেকিয়ে রাখবেন এবং শত্রুর মনোযোগ তাঁর দিকেই কেন্দ্রীভুত করে রাখবেন। অন্য সঙ্গীরা তাদের সাথে অনুরোধ করলেন যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে গেলে সবাই মারা পড়বে এই আশঙ্কায় তিনি রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। বাকিদের অধিনায়োকোচিত আদেশ দিলেন তাঁকে রেখে চলে যেতে। তাঁকে রেখে সন্তর্পণে সরে যেতে পারলেন বাকিরা। এদিকে সমানে গুলি ছুড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ। একদিকে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী, সঙ্গে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে মাত্র অর্ধমৃত সৈনিক (ই.পি.আর.) সম্বল একটি রাইফেল ও সীমিত গুলি। এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে।

সূত্র : http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ।। আহমেদ খালিদ

মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৯৪৮- ডিসেম্বর ১৪, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ১৯৪৮ সালে বাবুগঞ্জ থানার রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল মোতালেব হাওলাদার। জাহাঙ্গীর ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং ১৯৬৬ তে আই.এস.সি পাশ করার পর বিমান বাহিনীতে যোগদানের চেষ্টা করেন, কিন্তু চোখের অসুবিধা থাকায় ব্যর্থ হন। ১৯৬৭ সালে তিনি পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৮-র ২ জুন তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি পাকিস্তানে ১৭৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটেলিয়ানে কর্তব্যরত ছিলেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তিনি ছুটে এসেছিলেন পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা অতিক্রম করে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। ৩ জুলাই পাকিস্তানে আটকে পড়া আরো তিনজন অফিসারসহ তিনি পালিয়ে যান ও পরে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মেহেদীপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগ দেন। বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানোর কারণে তাঁকে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বিজয় সুনিশ্চিত করেই তিনি শহীদ হয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরকে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ আঙিনায় সমাহিত করা হয়।

যেভাবে শহীদ হলেন

১০ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম, লেফটেন্যান্ট আউয়াল ও ৫০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা চাঁপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে বারঘরিয়া এলাকায় অবস্থান গ্রহন করেন। ১৪ ডিসেম্বর ভোরে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বারঘরিয়া এলাকা থেকে ৩/৪ টি দেশী নৌকায় করে রেহাইচর এলাকা থেকে মহানন্দা নদী অতিক্রম করেন। নদী অতিক্রম করার পর উত্তর দিক থেকে একটি একটি করে প্রত্যেকটি শত্রু অবস্থানের দখল নিয়ে দক্ষিণে এগোতে থাকেন।
তিনি এমনভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা করেছিলেন যেন উত্তর দিক থেকে শত্রু নিপাত করার সময় দক্ষিণ দিক থেকে শত্রু কোনকিছু আঁচ করতে না পারে। এভাবে এগুতে থাকার সময় জয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত তখন ঘটে বিপর্যয়। হঠাৎ বাঁধের উপর থেকে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের ৮/১০ জন সৈনিক দৌড়ে চর এলাকায় এসে যোগ দেয়। এরপরই শুরু হয় পাকিস্তান বাহিনীর অবিরাম ধারায় গুলিবর্ষন। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর জীবনের পরোয়া না করে সামনে এগিয়ে যান। ঠিক সেই সময়ে শত্রুর একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় জাহাঙ্গীরের কপালে। শহীদ হন তিনি।

সূত্র :  http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ ।। আহমেদ খালিদ

মুন্সি আব্দুর রউফ (১৯৪৩ - এপ্রিল ৮, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

মুন্সি আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালের মে মাসে ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার (পূর্বে বোয়ালমারী উপজেলার অন্তরগত) সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সি মেহেদী হোসেন এবং মাতার নাম মকিদুন্নেসা। কিশোর বয়সে রউফ-এর পিতা মারা যান। ফলে তিনি উচচশিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তিনি অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৩-র ৮ মে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ ভর্তি হন। তাঁর রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১৩১৮৭। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে ১১ নম্বর উইং এ কর্মরত ছিলেন। সে সময় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন।

যেভাবে শহীদ হলেন

মুন্সি আবদুর রউফ ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পনীর সাথে বুড়িঘাটে অবস্থান নেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি জলপথ প্রতিরোধ করার জন্য ৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের দুই কোম্পানী সৈন্য, সাতটি স্পীড বোট এবং দুটি লঞ্চে করে বুড়িঘাট দখলের জন্য অগ্রসর হয়। তারা প্রতিরক্ষি বূহ্যের সামনে এসে ৩" মর্টার এবং অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে হঠাৎ অবিরাম গোলা বর্ষন শুরু করে। গোলাবৃষ্টির তীব্রতায় প্রতিরক্ষার সৈন্যরা পেছনে সরে বাধ্য হয়। কিন্তু ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ পেছনে হটতে অস্বীকৃতি জানান। নিজ পরিখা থেকে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ শুরু করেন। মেশিনগানের এই পাল্টা আক্রমনের ফলে শত্রুদের স্পীড বোট গুলো ডুবে যায়।
হতাহত হয় এর আরোহীরা। পেছনের দুটো লঞ্চ দ্রুত পেছনে গিয়ে নিরাপদ দুরত্বে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে শুরু করে দুরপাল্লার ভারী গোলাবর্ষণ। মর্টারের ভারী গোলা এসে পরে আব্দুর রউফের উপর। লুটিয়ে পড়েন তিনি, নীরব হয়ে যায় তাঁর মেশিনগান। ততক্ষণে নিরাপদ দূরুত্বে সরে যেতে সক্ষম হন তাঁর সহযোদ্ধারা।

শহীদ ল্যান্স নায়েক বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ার চড়ে। তাঁর অপরিসীম বীরত্ব,সাহসীকতা ও দেশপ্রেমের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্ব্বোচ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে।

সূত্র :  http://www.opest.net/9436.post

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ