প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label তৈয়ব খান. Show all posts
Showing posts with label তৈয়ব খান. Show all posts

Sunday, September 2, 2012

নেশাখোর | তৈয়ব খান

ধরণীর বুকে বিস্ময়কর মানুষের রূপ লয়ে
এসেছি আমি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ; মহাগৌরব হয়ে।
কী সে স্বপ্ন-সম্ভাবনা কী সে আশার আলো
দেখেছেন প্রভু আমার ভেতর তিনিই জানেন ভালো।
মানব জমিনে কোন প্রয়োজনে এসেছি জানি না তা
শুধু জানি এই, আর কেউ নেই তিনি ছাড়া বিধাতা।
আমি আল্লাহর প্রতিনিধি-
শ্রেষ্ঠত্বের এ ঋণ আমি কেমন করে শুধি?
জানি তা হবে না শোধা-
আমার ভেতরের এ আকূলতা জানেন কেবল খোদা।
উপভোগের যতো উপকরণ তাঁর দেয়া উপহার
তাপ-আলো-বায়ু-জল-অন্ন ভোগ করে বেশুমার-
আজ প্রাণ ভরি’ শুকরিয়া করি আর ঝরে আঁখি লোর।
শূন্য হাতে একা ফিরে যাবো ! আমি তাই নেশাখোর।।

কোটি শুকরিয়া জানাই তোমায় হে মালিকুল মুলক
সৃষ্টি জগৎ দেখে গো তোমার এ বুকে জাগে যে পুলক!
বর্ণালী রঙ মাখা সবখানে!
কখনো প্রকাশে কখনো গোপনে-
আপনা প্রকাশ হয়েছো তুমি স্রষ্টা হে সু-চতুর।
আমি দেখে হাসি নেশার পিয়াসী  অনন্ত নেশাখোর।

সব কি গো জানি কোনখানে আমি দেহ হৃদে কার বাস
আপনারে চষি আর জিজ্ঞাসি ; এ কার মাঝে কারাবাস?
সহসা সহসা কে যে ভেতরে-, প্রশ্ন করে আর গুতো মারে
তারে থামাতে সে আর আমাতে বাঁধে সংঘাত জোর।
আর পারি না আপনা ভোলাতে, আমি তাই নেশাখোর।।

হৃদয়ে বসানো দর্পণে দেখি আলো ছায়া মাখামাখি
যতন করে কে যে ভেতরে কারে যেন রাখে ঢাকি’
ঢাকনা সরায়ে আৎকে উঠি আপন আর্শিতে আলো হয়ে ফুটি
আধেক আলো আধেক আঁধার তাড়া করে খুব জোর।
আমাকে আমি ছাড়াতে পারি না, আমি তাই নেশাখোর।।

মহাসাগরের মহাজলরাশি মহানাদে মহাব্যাপে-
মহা আক্রোশে আছড়ে পড়ে নিজের ‘পরেই ক্ষেপে
কী যেন ছিলো, কী যেন নেই! পেয়ে হারানোর সে ব্যথাতেই
হাহাকার করে, আর খোঁজে ফেরে হৃদয়ের মণি চোর।
আমি তার সাথে দাঁড়িয়ে তফাতে সতীর্থ নেশাখোর।।

গহীন সাগর কী আছে ধরায়? প্রশান্ত.....! দূর ছাই
মনের সাগরে মহাগভীরতা, তার চেয়ে বড়ো নাই
হৃদি সমুদ্র চষে ফিরি তাই, মুক্তা মাণিক যদি কিছু পাই
এ কোন গহনে লীন হয়ে থাকি নিজ থেকে বহুদূর...।
আপনারে খুঁজি আপনার মাঝে, আমি এক নেশাখোর।।

বিশ্ব নিখিলে সৃষ্টি জুড়ে একী ভারি বিস্ময়!
সোনালী পাতার নির্বাক তেজ করেছে সকল জয়।
জেগে থেকে শুধু পেয়েছি ব্যথা, তাই আড়াল করে খাই ঘুমের পাতা,
সব ভুলে আছি তারে পেয়ে আজ, কাটেনি সে ঘুম ঘোর।
আয় ভাই কাছে, কে ঘুমাবি বল? ডাকে এক নেশাখোর।।

আমি দেখেছি দুনিয়ার মানুষে মানুষে বিস্তর ব্যবধান,
কেউ কারো নয়, নিজেই নিজের গাহে স্বার্থের গান।
বহু ব্যাভিচারী প্রাসাদে নগরে, লোভের মোহে কাড়াকাড়ি করে,
সুর ফেলে দিয়ে মত্ত্ব হয়েছে মানুষের দেহে অসুর।
দেখে শুনে সব ক্ষেপে গেছি আর হয়েছি গো নেশাখোর।।

আমি দেখেছি এখানে মানুষের বনে একা হয়ে বহুকিছু
অমানুষ যারা তাদের দম্ভে মানুষের মাথা নিচু
ফেরারী হয়ে বিপ্লবী ফেরে ডাকাতেরা নিরাপদ
শান্তিবাণী মুখে ফেরি করে অন্তরে কু-বদ।
অধার্মিক সব একতাবদ্ধ, ধার্মিকেরা ছাড়া
ধর্ম এখানে বর্মে মোড়া, বাইবেল-আমপাড়া।
কোরআন ভগবতে আসে নাই পথে মৌলবী-ঠাকুরে
পারে নি ফেরাতে লোভ পাপ হতে নির্দোষ আমিরে।
ধর্মযুদ্ধে দুনিয়াটা আজও বেদনায় ভারাতুর
পৃথিবীর সে ব্যথা সয়েছি; ছুঁয়েছি, আমি সেই নেশাখোর।।

আমি দেখেছি অনেক মানবদেহ শুয়ে আছে ফুটপাতে,
কাঁদে মানবতা চটে মুড়ি দিয়ে দেহ লয়ে দুনিয়াতে।
যৌতুক মাখা বিয়ে শাদি দিনে কাঁদে বাবা-মা মেয়ের কারণে,
সত্যিকারের নিষেধ-বারণে কবে হবে নিশিভোর?
বড়ো ব্যথা পাই সইতে পারি না, আমি তাই নেশাখোর।।

সবলেরা দেখি ডামাডোল করে দুর্বল ঘাড়ে চেপে,
দুর্জন আজ ঐক্যবদ্ধ, সুজনেরা ভয়ে কাঁপে।
শতধা হয়েছে যারা নাগরিক, পিশাচ হাসে লোভী রাজনীতিক,
মানুষ মানুষে ব্যবধান রচে, আজ মানবতা বহুদূর।
দেখি একতাবিহীন ঐক্যে ফাটল, আমি তাই নেশাখোর।।

মদে ডুবে আছে সমগ্র জাতি দেয় কষে গাঁজা দম,
অন্যায় পথে অর্থ উড়ায় অবিরাম-হর্দম।
বেশ্যা পাড়ায় যায় পুরুষে বেশ করে সিনা টান
পতিতা নারী গন্ধ বিলায়, করে’ নারীত্ব কোরবান।
মানবতা, তুমি একী খেলা খেলো!
অবিরাম কাঁদিয়ে কেন কাঁদো বলো?
মানুষ মানুষের খুনি হয়ে ফেরে অনন্ত লোভাতুর!
শত ধিক দিই, এই বেশ আছি হর্দম নেশাখোর।।

আমি শুনেছি অনেক বেকার মানুষের করুণ দীর্ঘশ্বাস,
কেউ বুঝেনি ওদের বেদনা, করেছে গো উপহাস।
হাতে ঝুড়ি, কাঁধে কোদাল-শাবল,
অনাহারী ওরা ঘুরেছে কেবল!
পারি নাই হাতে ভাত তুলে দিতে কব্জিতে নাই জোর।
অসহায় আমি নিরালা কেঁদেছি, আর তাই নেশাখোর।।

আমি দেখেছি অনেক রাজপথপাশে কোরান পঠনকারী,
সম্মুখে শিশুর লাশ ঢাকা আছে, ভিক্ষা মাগিছে তার-ই।
কাফনের টাকা জুটিয়ে এভাবে,
সন্তান তার কবরে যাবে!
দেশের নেতা চাপাবাজি করে,‘অভাব করবো দূর..’।
আমি আঁখিল নিযাসে শরাব বানাই, তাই পিয়ে নেশাখোর।।

আমি দেখেছি এখানে ঠগ ধোকাবাজি দুর্নীতি পলে পলে,
এখানে ভদ্রবেশে মুখোশধারী আর শয়তান কথা বলে।
দিনে সাধু সেজে রাতে লুট করে,
তাই নাগরিক না খেয়ে মরে।
করের বোঝা কাঁধে চেপে কেউ কেঁদে করে রাত ভোর।
সইতে পারি না এই জ্বালাতন, আমি তাই নেশাখোর।।

সুনীল গগণে ডানা মেলে দিয়ে পাখিদের উড়াউড়ি,
শ্বেতশাড়ি মেঘ-পরী মেয়ে করে উল্লাসে জড়াজড়ি।
ধুলির ধরায় তুচ্ছ আমি, চির মুক্তি স্বাধীনতাকামী,
দু’চোখ মেলে দেখেছি চেয়ে স্বাধীন স্বর্গদোর।
 যে স্বাধীন আশা জাগিয়েছে নেশা, তাই আমি নেশাখোর।।

আমি দেখেছি কখনো আসমানে ঘন এলোকেশী মেঘপরী,
মুচকি হাসি বিদ্যুতে তার, ডাকে ইঙ্গিতে মনোহরী।
ছুঁয়ে দিতে বলে আবেশে আবেশী, বিদ্যুৎ নারী মেঘ-কালোকেশী,
স্বর্ণাদেহী সে উর্বসী, পায়ে বজ্রের ঘুঙুর।
নেচে গেয়ে যায়, শরাব বিলায়, তাই পিয়ে নেশাখোর।।

আমি চাতুরি সয়েছি প্রেমের বাজারে প্রেমের সওদা চেয়ে,
খুব ভাল প্রেম দেবে বলে ওরা ঘুরিয়েছে পায়ে পায়ে।
কান্ত হয়েছি পিপাসা পেয়েছে....
ওরা শূন্য পেয়ালা হাজির করেছে।
পানির খোঁজে পথহারা আমি দুই চোখে লাগা ঘোর।
সে ঘোর কাটাতে পথ হাঁটি আর নেশাচূর নেশাখোর।।

ভরা মধুতে মৌ-রাণী ওরা, হুরী নাকি বলে এরে!
রাত দুপুরে এ কী জ্বালাতন! ঘরের ভেতর কে রে?
আমার ঘরে সিঁদ কেটে ঢুকে
সংকোচে মরে, লাজ নাকে মুখে।
অযথাই আসা রূপ পাল্টিয়ে, নবরূপা, সেজে চোর।
ঠকাও কারে! এসে বারে বারে! আমি সবদর্শী নেশাখোর।।

পিরামিড চূড়ার পরশে আমি শিহরিত হয়ে ফের
কী আছে ভেতরে! মরা মমি দেখে আৎকে উঠেছি ঢের
পিছল পথে ধীর গতি খুব
ফেনার সাগরে দিয়ে গেছি ডুব
প্রাণ মেলেনি সাগরের তলে জাগেনিকো অঙ্কুর
পীড়ন কেবলই সে ব্যথা ভোলা আমি তাই নেশাখোর।।

আমি দেখেছি এখানে কামনা কাতর উভয়-ই নর-নারী
কাম যাতনায় ভেঙেছে এখানে সংসার ঘর-বাড়ি
কী ব্যাভিচার! কোনটা আচার! না বুঝে কেঁদেছি শুধু
ঝাঁপসা নয়নে পার হয়ে গেছি সাগর মরু ধু ধু
আমারও অনেক পিপাসা ছিল কোথায় জলের ক্রোড়?
সুপেয় জলের অভাবে আমি হয়েছি গো নেশাখোর।।

তীব্র খরায় উড়ে গেছে কী গো সু-মধুর নদীজল
এতটুকু জল চাইতে গেলেই তারই এত কোলাহল
বেশ, তবে বেশÑ, দারুণ তিয়াসে ফিরে যাবে পথচারী
মরুদ্যানের প্রয়োজন নেই, নেই কোন আহাজারি
ধরণী কুমারীÑ, জেনে রেখো শুধু পিপাসাও সু-মধুর।
তাই আছে বলে চির যাযাবর হয়েছি গো নেশাখোর।।

হাজার লোকের ভীড়ে আমি খুঁজি সেই প্রিয় মুখ
হঠাৎ দেখায় আৎকে উঠি ভরে যায় সারা বুক
.....রচনা করি কবিতা যে তার
দেখা দিয়ে সে পালায় আবার
কাছে এসে নীবিড় জড়িয়ে বুকে করে না এ ব্যথা দূর
ফের তারে খুঁজে একাকী নিতি আমি এক নেশাখোর।।

আমি লিখে যাই নেশার কলমে নেশা মাখা কাগজে
চির নেশা নিয়ে সারা দেহ-মনে, নেশাভরা মগজে
আমার লেখায় নেশা ভরা থাকে
চির সত্য যে, তারে শুধু ডাকে
মহা আঁধারে যে জ্বেলে যায় বর্ণীল কোহিনুর।
যে আলো তৃষা জাগিয়েছে নেশা আমি তাই নেশাখোর।।

যে জন নিল না কোনদিন তুলে নেশার পেয়ালা হাতে
সে কী বুঝবে নেশার জ্বালা! ভরপুর মৌতাতে!
এ যে মুছে দেয় হৃদয়ের যতো রক্তক্ষরণ ব্যথা
আঁকুপাকু করা বুকের ভেতরে ফুটায় মুখে কথা।
মৌতাত কী শুধুই আনন্দ! আর কিছু নয় ভাই?
চির নেশাখোর তার সে কথা মুখ বুজে লিখে যাই।
না-ই বা জুটুক ফুলের মালা না-ই বা জুটুক ঘর
তবু লিখে যাবো আমি নেশাখোর আজীবন যাযাবর।
আমার বেদনায় নেশা, আনন্দে নেশা, নেশা করে কাটে দিন
নেশাতুর চোখে আজও চেয়ে দেখি রয়ে গেছি অমলিন।
আমার চলার সবটুকু পথ কাঁটাঘেরা বন্ধুর।
আমি সয়েছি পথের দারুণ বেদনা আমি তাই নেশাখোর।।

আমার স্নায়ুর প্রতি তারে আজ ভরপুর নেশা ভাই
নেশামাখা মনে মানব জমিনে পদচ্ছাপ রেখে যাই।
দেখি চোখ মেলে অনিলে সলিলে উৎসব উৎসব
মহা উচ্ছ্বাসে সবখানে হাসে জীবনের কলরব।
এখানের ঘাসে শিশির নারীরা মুক্তা হয়েছে আজ
অরুণালোকের ছোঁয়া পেয়ে ওরা সেজেছে অরূপ সাজ
ভোরের পাখিরা প্রভাতীয়া গানে কলরবে মেতে আছে
প্রেম মালা নিয়ে ঘুরছে মলয় মেঘ ললনার পাছে।
সবখানে আজ বিস্ময়কর মধুমাখা বাজে সুর
সে সুধা সুরে নেশা যায় বেড়ে করে তোলে নেশাখোর।।

বোম ভোলানাথ হয়ে ফিরি আমি পৃথিবীর পথে পথে
চির মুসাফির হৃদয় আমার চলি অসীমের সাথে
হতবাক হই বিস্ময়ে মরি আহ! এ কী সুন্দর!
এতো রূপ-রস পৃথিবীর মাঝে জীবনের পাতা ঘর
ধন্য হে প্রভূ, সৃষ্টি তোমার রঙে রঙে কথা কয়
শব্দ গন্ধ সবই অপরূপ! সুরে সুরে হাওয়া বয়!
নোনা সাগরের ঝর্ণা ধারায় নদীভরা মিঠে জল
চারিদিকে এ কী জয়ধ্বনী তোলা জীবনের কোলাহল
যতো দেখি আরো তৃষা জাগে মনে বিন্দুর সিন্ধুর
আরো ‘ভুত্তানা’ পেতে চায় মন, আমি তাই নেশাখোর।।
কলমের শেষ আঁচড় ঃ ৩০ অক্টোবর ২০০৫, পাঠানটোলা, ধামরাই, ঢাকা।

Thursday, July 26, 2012

মুসলমানের খোঁজে... | তৈয়ব খান

“আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা’ সে মুসলমান.....” নজরুল গীতির এ লাইটা আজ ক’দিন হলো মনের ভেতর গুনগুনিয়ে বাজছে হুমায়ূন কবিরের। কিছুতেই ভুলে যেতে পারছেন না, বহু চেষ্টা করেও। উঠতে বসতে, নাইতে, পড়তে-পড়াতে, খেতে বসে সবসময়েই শুধু ঐ ক’টি লাইনই উনি গুনগুনিয়ে ফিরছেন। ক্ষেত্র বিশেষ এ গুনগুনানোর আওয়াজটাই কেবল বাড়ে কমে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গানের বাকি লাইনগুলো উনার মন থেকে বেমালুম ডিলিট হয়ে গেছে। কসরত করেও গাইতে পারছেন না, তাতে একটু অস্বস্তিও লাগছে।
হুমায়ুন সাহেব শিক্ষিত মানুষ। জীবনে অনেক বড়ো কিছু হওয়ার ইচ্ছে ছিলো, হতে পারতেনও, কিন্তু পারেন নি। এর কারণও অনেক। কর্মজীবনে নীতির সাথে আপোষ করতে পারেন নি বলে একের পর এক বেশ ক’টা চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই কিছু একটা করতে চেয়েছেন। ঢাকা শহরে ব্যবসা করতে গিয়ে পুঁজির অভাব বোধ করেছেন প্রচ-ভাবে। পুঁজির যোগান পেতে বন্ধুর সাথে পার্টনারশিপ ব্যবসা করতে গিয়েও হোঁচট খেয়েছেন। শেষে টিকতে না পেরে ফিরে এসেছেন নিজ এলাকা- বাহ্মণবাড়িয়ায়। সম্বলগুলো একত্র করে ছোট একটা মনোহরী দোকান দিয়েছেন রসুল্লাবাদ বাজারে। গড় পড়তায় দৈনিক বিক্রি তেমন না হলেও টিকে থাকা যায় কোন মতে। খরচ তো আর কম নয়! বড়ো ছেলেমেয়ে দু’টি ঢাকায় থেকে ওখানকার দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, ছোট মেয়েটিও স্থানীয় স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সংসারের চারদিক সামলাতে হীমসীম খেতে হয় মারাত্মক। জমির ফসল থেকে খানিকটা সাপোর্ট পান বলেই রক্ষে। তা নইলে, টানাপোড়েন কাকে বলে; হাড়ে হাড়ে টের পেতেন। দোকানটা সাজাতে আরও পুঁজির দরকার কিন্তু পুঁজির যোগান দেবে এমন কাউকে উনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন না। এদিকে রোজা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের রমজান মাস মানেই কারও কারও পোয়াবারো, এটা তিনি বেশ টের পান। উনি ভাবতেই পারেন না, জেনে-শুনে-বুঝে একটা শ্রেণি অকস্মাৎই জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এরা এমনভাবে হঠাৎ করেই পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেয় যে, হতবাক হয়ে যেতে হয়। উনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পাইকারদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। রোজা শুরু হতে না হতেই নিত্য প্রয়োজনীয় চাল-ডাল-তেল-নুন-রসুন-পেঁয়াজ কিনতে গিয়েই হোঁচট খান। সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে কেজি প্রতি দু’তিন টাকা। এখন বাড়তি টাকা দিয়ে পণ্য কিনে, ওগুলো আনতে গিয়ে খান আরেক ধাক্কা। পরিবহণ খরচও কেমন করে রাতারাতি যেন বেড়ে গেছে। এতকিছু করে যখন মালগুলো দোকানে সাজিয়ে হিসেব করে দেখলেন; কেজিপ্রতি অন্তত পাঁচ টাকা বাড়তি না ধরলে চালানই উঠবে না। তাহলে গ্রাহক! গ্রাহকের কথা মনে হতেই চমকে উঠেন। কী জবাব দেবেন তিনি গ্রাহকদের? ওরা তো মানতেই চাইবে না এ উচ্চমূল্য! এখন উপায়?
উপায় খুঁজতে গিয়ে বোবা হয়ে যান তিনি। ঠিক তখনই উনার মনের সেতারে নজরুল গীতির ঐ লাইনটি বেজে উঠে। প্রথমে গানটি খুব মিহি করে বেজে উঠেছিলো। তারপরই সুর চরতে থাকে। একসময় মনের সেতারটার জোশ এসে যায়, তাই সুরটা উনার কণ্ঠনালী বেয়ে দমকা হাওয়ার মতো জোরে বেরিয়ে আসে- “আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা’ সে মুসলমান....।” গানের কলিটা গলা ছেড়ে জোরে বেরিয়ে আসতেই উনার মনে পড়ে বাসায় বাজার পাঠানো দরকার। বাবা মায়ের সাথে রমজানের প্রথম সেহেরি খেতে ঢাকা থেকে রিক্তা আর রাকিব দু’ভাইবোনই বাড়ি আসবে আজ। কী কী লাগবে জানার জন্য বাসায় ফোন করতেই ছোট মেয়ে শান্তা কল রিসিভ করে জানান দেয়, ‘হ্যালো আব্বু, আম্মু তো রান্না করছে। আম্মুকে দেবো?’
‘-হ্যাঁ মা, তোমার আম্মুকে একটু দাও’ বলে মোবাইল নিয়ে মেয়ের রান্নাঘর অব্দি দৌঁড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি কল্পনায় দেখে নেন হুমায়ুন কবির। স্ত্রী সাদিয়ার কণ্ঠ কানে যেতেই বলেন, ‘কই, কী কী লাগবে কিছু তো বললে না?’ সাদিয়া বলেন, ‘তেমন কিছু লাগবে না বলে, তোমাকে আর বলি নি। পোষা মোরগটাকে জবাই করে নিয়েছি, তুমি একটু চিনি আর কিসমিস নিয়ে এসো।’ ‘-আচ্ছা’ বলে লাইন কেটে দেন হুমায়ুন কবির। তারপরে ভাবতে বসেন চিনির কেজি কতো টাকায় পাইকারি দরে কিনেছেন। নিজের দোকান বলে উনি পাইকারি দরেই চিনি খরচ করতে পারবেন, কিন্তু বাকি জনতা!
আজ রাতে রমজানের প্রথম সেহেরি। ছেলেমেয়ে দু’টির চেহারাটা উনার মনের পর্দায় ভেসে উঠে। রিক্তা আর রাকিব প্রায় ছ’মাস বাদে ঢাকা থেকে বাড়ি আসছে। কতো স্নেহের সন্তান ওরা, অথচ সে তুলনায় কী-ইবা দিতে পারেন তিনি ওদের? হুমায়ুন কবিরের মনের অজান্তেই চোখজোড়া ছলছল করে উঠে। হঠাৎ চলে আসা কোন খদ্দেরের নজরে পড়ে গেলে লজ্জা পেতে হবে ভেবে চট-জলদি পাঞ্জাবির আস্তিনে চোখ মোছেন। এশার আজান শুরু হয়েছে। মনোযোগ দিয়ে আজানের সবক’টি লাইন শুনেন তিনি, জবাবও দেন। নাহ্! আজ আর কিচ্ছু ভাল লাগছে না। বাসায় গিয়েই নামাজ পড়বেন ভেবে দোকানের শাটার বন্ধ করেন, তারপর নেমে আসেন রাস্তায়।
বাড়ির গেটের কাছে আসতেই মোবালেই রিং টোন বেজে উঠে হুমায়ুন কবিরের। চিনি, কিসমিস আর টুকিটাকি বাজার সমেত বাঁ হাতটা বাড়িয়ে গেট মেলে ধরে ডান হাতে পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইল বের করেই দেখেন রিক্তার নম্বর। হা করে মেলে ধরা গেটের ভেতর দিয়ে উনার চোখ পড়ে উঠানে সাদিয়াকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়ানো তিন ছেলেমেয়ের দিকে। ওদের পায়ের কাছে দু’টি ট্রাভেল ব্যাগ নামানো আছে। তার মানে রাকিব আর রিক্তা সম্ভবত এই মাত্রই এসে পৌঁছেছে, ঘরে ঢোকা হয় নি। তিনি কল রিসিভ না করে ক্যানসেল করে দেন। এদিকে কানের অনতিদূরে গেটের দিকে পরিচিত রিং টোন শুনে চারজনেই গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে হুমায়ুন কবিরকে। রিক্তা দৌঁড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আব্বুর বুকে। মুঠোয় মোবাইল ধরা ডান হাতটা মেয়ের মাথায় আদর করে ঘঁষে দেন হুমায়ুন। সাদিয়া দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে স্বামীর বাঁ হাতটার ভারমুক্ত করেন। এদিকে রাকিব আর শান্তা এসে আব্বুর দু’পাশে দাঁড়ায়। সদ্য ভারমুক্ত বাঁ হাতে শান্তাকে জড়িয়ে নেন হুমায়ুন কবির। মোবাইলটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে ডান হাত তুলে রাকিবকে আদর করতে গিয়ে দেখেন, ছেলে তারচে’ ইঞ্চি চারেক লম্বা হয়ে গেছে। সেদিনের পুঁচকে ছেলে- বাপকে ছাড়িয়ে লম্বা হয়ে যাওয়ায় ডান হাতের চেটো দিয়ে রাকিবের মাথায় একটা আদুরে চাটি মারেন। মাথায় আব্বুর হাতের মিষ্টি চাটি খেয়ে রাকিবের মনে হলো, এ চাটিটা যদি তবলায় পড়তো, তবে ‘তাক’ করে একটা মিষ্টি বোল ফোটতো। ভাবনাটা মাথায় আসতেই হো হো করে হেসে ফেলে রাকিব।
হুমায়ুন কবির তিন ছেলেমেয়েকে জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই আবারও গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠলেন- ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা’ সে মুসলমান...... কোথা’ সে মুসলমান।’
শান্তা, রিক্তা এবং রাকিব অবাক চোখে ওদের আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইলো। সাদিয়া অবাক হলেন না, কেননা তিনি বেশ ক’দিন ধরেই স্বামীর মুখে নজরুল সঙ্গীতের নির্দিষ্ট এ লাইনটা শুনছেন। তাই মুখটিপে হেসে বাজারের ব্যাগ নিয়ে কিচেনে ঢুকলেন। ছেলেমেয়েদের অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে হুমায়ুন কবিরের চোখজোড়া উদাসী হয়ে গেলো। তিনি ওদের বাঁধন কাটিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্তাকে বললেন, ‘মাগো, আমাকে একটু ওজুর পানি দে তো।’
রাত সাড়ে ন’টার দিকে খাওয়া দাওয়া সেরে হুমায়ুন কবির নিজের রুমের খাটে গিয়ে বসলেন। হাতের কাজ গুছিয়ে সাদিয়া এসে স্বামীর সামনে এসে ডান পায়ে দেহের আংশিক ভার চাপিয়ে কোমরের দু’পাশে দু’হাত রেখে গ্রীবা বাঁকিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বাঁ পায়ের গোড়ালির উপর দেহের বাকি ভারটুকু দিয়ে একবার সামনে আরেকবার পেছনে দোল খেতে থাকলেন। স্ত্রীর এ মোহনীয় ভঙ্গিটি হুমায়ুনের খুব চেনা। সাদিয়ার এ ভঙ্গিটি দেখলে ওঁর মনে হয়, টলমলে ঝিলের জলে কোন রাজহংসী ভাসছে। রিক্তাটাও ঠিক এভাবেই দাঁড়ায়। মায়ের অনেক অভ্যাস বুঝি মেয়েরা এমনিতেই পেয়ে যায়। আচ্ছা, উনি না হয় মায়ের এমন মোহনীয় ভঙ্গি দেখে আকৃষ্ট হন, কিন্তু মেয়ের একই রকম ভঙ্গি দেখে কোন ছেলে এমন আকৃষ্ট হবে, এমন ছেলের খোঁজ তো করা হলো না! কেননা, প্রত্যেক বাবাই চায়; তার মেয়ের জামাই যেন ঠিক তার নিজের মতো হয়, আর মায়েরা চায়; তাদের ছেলের বউ যেন তার নিজের মতো হয়। কিন্তু বাস্তবে তা সবসময় সম্ভব হয়ে উঠে না। ভাবনাটা মাথায় আসতেই উনি হো হো হেসে উঠেন। স্বামীকে অনেকক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ এমন প্রাণখোলা হাসি শুনে সাদিয়া দুলুনি থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। তারপর মিটিমিটি হেসে প্রশ্ন করেনÑ, ‘আচ্ছা তোমার হলো কী বলো তো! ক’দিন ধরেই লক্ষ্য করছি, তোমার মনের আকাশে শেষ শ্রাবণের ঘন মেঘ, আবার ঠিক সেই মেঘের ফাঁকেই রোদেল ঝিলিক! সেই সাথে হঠাৎ হঠাৎই গেয়ে ফিরছো নির্দিষ্ট একটা গানের কলি?
স্ত্রীর কথা শুনে হুমায়ুন খানিকটা ঝিম মেরে গেলেন। তারপরই উনার কণ্ঠ বেয়ে বোতল থেকে তেল চুঁইয়ে পড়ার মতো গানটার ওই নির্দিষ্ট কলিটাই নেমে এলো। ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান.........। গানের কলিটা কানে যাওয়া মাত্রই পাশের রুম থেকে তিন ভাইবোন মিলে হল্লা করতে করতে মা-বাবার রুমে গিয়ে গোল হয়ে বসলো। শান্তা আবদার করলো, ‘পুরো গানটা গাও না আব্বু, কতোদিন তোমার গান শুনি না।’ ওর প্রস্তাব শোনা মাত্রই রাকিব উঠে গিয়ে খাটের নিচ থেকে একটা ব্যাগ টেনে তার ভেতর থেকে ডুগি-তবলা বের করে আনলো। ভাইয়ার দেখাদেখি রিক্তা নেমে গিয়ে হারমনিয়াম বের করলো, ওটাও খাটের নিচেই রাখা ছিলো। কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হারমনিয়ামটা অনেকদিন বাজানো হয় না, ফলে ধুলির একটা আস্তর বসে গেছে। ওরা দু’ভাইবোন ডুগি-তবলা আর হারমনির গা থেকে আলগা ধূলো ময়লা মুছে ফেললো। তারপর রিক্তা গানের কলিটা হারমনিতে তুলতে লাগলো আর রাকিব তবলাটায় চাটি মেরে দেখলো টিউন ঠিক আছে কি না। সব কিছু ঠিকঠাক করে আব্বুর দিকে তাকাতেই হুমায়ুন কবির বললেন, ‘পুরো গানটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না রে। স্মৃতি বিভ্রাট হচ্ছে ইদানিং। কেবল এ লাইনটাই ক’দিন যাবত জ্বালিয়ে মারছে।’ আব্বুর অপারগতায় শান্তা মায়ের দিকে তাকালো। ওরা জানে মা-ও একসময় খুব ভাল গান করতেন। সাদিয়া স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে সমর্থনের আভাস পেলেন। তারপর গাইতে শুরু করলেনÑ
আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান।
কোথা সে আরি অভেদ যাহার জীবন-মৃত্যু-জ্ঞান।।
যার মুখে শুনি তওহিদের কালাম
ভয়ে মৃত্যুও করিত সালাম।
যার দ্বীন দ্বীন রবে কাঁপিত দুনিয়া জ্বীন পরী ইনসান।।
স্ত্রী-পুত্ররে আল্লাহরে সঁপি জেহাদে যে নির্ভীক
 সেহে কোরবানী দিত প্রাণ হায়! আজ তারা মাগে ভিখ।
কোথা সে শিক্ষা আল্লাহ ছাড়া
ত্রিভুবনে ভয় করিত না যারা।
আজাদ করিতে এসেছিল যারা সাথে ল’য়ে কোরআন।।

রাকিব ভালোই তবলা বাজায়। চমৎকার দাদরা বাজালো ও। ‘ধা ধি না না তুন না’ বোলগুলো যেন ওর আঙ্গুলের আঘাতে কথা বলে উঠলো। আর প্রথম অন্তরা গেয়ে সঞ্চারিতে ফিরে যাবার সময় মায়ের সাথে রিক্তাও এমনভাবে গলা মেলালো যে বোঝাই গেলো না, একজন নাকি দু’জনে গাইছে। গানটা থেমে গেলেও সুরের রেশটা রয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ। শান্তার হঠাৎ হাততালি ওদের বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। হাততালি দিয়ে শান্তা ঘোষণা দিলো ‘মারহাবা মারহাবা’। ‘দারুণ গেয়েছো আম্মু’ বলে রিক্তা গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলো। রাকিব বললো, ‘আম্মু, তোমার কণ্ঠ সেই আগের মতোই আছে।’ স্বামীর সামনে ছেলেমেয়েদের উচ্চকিত প্রশংসা শুনে সাদিয়া একটু লজ্জাই পেলেন। লজ্জা লজ্জা চেহারা নিয়ে তিনি স্বামীর দিকে তাকালেন। কিন্তু তাকায়েই একটা ধাক্কা খেলেন সাদিয়া। আম্মুর লাজুক হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তেই ছাই বর্ণ হয়ে যেতে তিন ভাইবোনই মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে অবাক হয়ে দেখলো, হুমায়ুন কবিরের চোখ দিয়ে নিরবে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে নামছে। এ কী! উনি কাঁদছেন কেন?
সাদিয়া আক্তার তাঁর চব্বিশ বছরের বিবাহিত জীবনে স্বামীকে কখনও কাঁদতে দেখেন নি। কিন্তু আজ ওঁর কী হলো, উনি কাঁদছেন কেন? তবে কী তিনি স্বামীর মনে কোন ব্যথা দিয়েছেন? সাদিয়া নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। তাঁর ডানপাশে বসা স্বামীর বাঁ হাতটি তিনি ডানহাতে খপ করে চেপে ধরে ব্যাকূল কণ্ঠে জানতে চাইলেনÑ, ‘এ্যাই, কী হয়েছে তোমার! হ্যাঁ, কাঁদছো কেন?
হুমায়ুন অনেক কষ্টে কোনমতে নিজেকে সংযত করে বললেন, ‘না না, তেমন কিছু না।’
‘Ñতবে কাঁদছো কেন?’ ব্যাকূল হয়ে জানতে চাইলেন সাদিয়া।
হুমায়ুন কবির জানালেন, ‘Ñসত্যিকারের মুসলমানের খোঁজে আমার এ কান্না।’
সাদিয়া বললেন, ‘মানে?’
হুমায়ুন কবির বললেন, ‘তার আগে বলো- এদেশে মুসলমানরা কতো শতাংশ?’
‘-তা, প্রায় আশি শতাংশ।’ মায়ের হয়ে রিক্তাই আব্বুর প্রশ্নের জবাব দিলো।
হুমায়ুন কবির খেদ ভরা কণ্ঠে বললেনÑ, ‘তা হলে ধরে নেওয়া যায় যে, এদেশের ব্যবসায়ীদের প্রায় আশি শতাংশ ব্যবসাদার, অন্তত তোমার শুমারী যদি সঠিক হয়। এবং এ বিষয়টিই আমাকে আজ ক’দিন ধরে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।’
রিক্তা কিছুই বুঝতে না পেরে আব্বুর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
‘Ñআব্বু, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না’ প্রশ্নটা করে হুমায়ুন কবিরের দিকে চেয়ে রইলো রাকিব।
হুমায়ুন কবির বললেন, ‘এটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ, এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ব্যবসায়ীরা। আর আমরা এমন একটা দেশে বসবাস করছি, যারা সম্পূর্ণভাবে এসব ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি।’
‘-জিম্মি হয়ে পড়েছি মানে?’ জানতে চাইলেন সাদিয়া।
‘মানেটা খুব সহজ। এদেশের এই সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছে মতো নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ এলে তো কথাই নেই। এই যে রমজান শুরু হয়েছে; বাজারে গিয়ে দেখে এসো জিনিসপত্রের কী পরিমাণ দাম বেড়েছে। যে যেভাবে সুযোগ পাচ্ছে, ফায়দা তুলে নিচ্ছে। প্রতিদিনই হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে পণ্যমূল্য। এদেশের প্রায় সত্তর পার্সেন্ট লোক দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। পণ্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের আয় বাড়ছে না। ফলে আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য করতে সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। ইচ্ছে করলেই এখানে কেউ ভাল থাকতে পারছে না। দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারী কোন পদক্ষেপও চোখে পড়ছে না। দায়সারা গোছের একটা বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েই সরকার জনগণকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে আর মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করছে, আমার সরকার হ্যান করেছে, আমার সরকার ত্যান করেছে। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার কী জানো, যে সরকার এসব দরিদ্র-অনাহার কিষ্ট জনগণের কর আদায় করে দেশ চালাতে কর্তৃত্ব তুলে নিচ্ছে, তারা কিন্তু কেউ-ই খারাপ অবস্থানে নেই। তাঁদের গাড়ির অভাব নেই, বাড়ির অভাব নেই, চাকর-বাকর, আরদালি-পিয়ন, মালি-ধোপা-নাপিত ইত্যাদির সুযোগ সুবিধা পেয়ে তারা বেশ বহাল তবিয়তেই আছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানোÑ; সরকার বলো, বিরোধী দল বলো অর্থাৎ রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রত্যেকেই নামে বেনামে ব্যবসার সাথে জড়িত। তো, তারা কেমন করে সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা অনুভব করবে, বলতে পারো?” কথা ক’টি একনাগাড়ে বলে একটু দম নেন হুমায়ুন কবির।
স্বামীর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে একটু বোঝার চেষ্টা করলেন সাদিয়া। তারপর বললেন, ‘কে বলেছে সরকার জনগণের দুঃখ-দুর্দশার কথা ভাবছে না, বা পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে না? এই তো সেদিন পত্রিকায় পড়লামÑ, বেগুন, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ ও রসুন এই চারটি পণ্যের রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, ঈদুল ফিতরের পরের সপ্তাহ পর্যন্ত এই চার পণ্য রপ্তানি করা যাবে না। রমজানে দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন স্থিতিশীল থাকে, সেজন্য জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের কাছে আহ্বান জানায় দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই।
স্ত্রীর কথা শুনে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন হুমায়ুন কবির। বললেন, ‘যার কোন গুণই নেই, সেই বেগুন রপ্তানি বন্ধ করে সরকার কী দেশের আমজনতাকে শুধু বে-গুণ(ন) বানাতে চায়?’
আব্বুর এ কথাটায় ফোড়ন কাটে পিচ্চি শান্তা। ও’ খুব ভাব-গম্ভির হয়ে বলে, ‘কে বলেছে আব্বু যে, বেগুনের গুণ নেই? বেদানায় (ডালিম জাতীয় ফল) যদি দানা থাকে, তবে নিশ্চয়ই বেগুনেরও গুণ আছে।’ ওর কথা শুনে হুমায়ুন কবির ছাড়া বাদবাকি সবাই হো হো করে হেসে উঠে।
শান্তার কথার রেশ ধরে রিক্তা বললোÑ, ‘সত্যিই তো, বেগুনের যদি গুণই না থাকতো তবে কাজী নজরুল তার কবিতায় বেগুন নিয়ে রসিকতা করতেন না। এই যেমন, “গুণিরা খান বেগুন পোড়া, বেগুন চড়ে গাড়ি-ঘোড়া।” ওর কথা শুনে আরেকবার হাসির তুফান উঠে।
ওদের হাসি থামলে হুমায়ুন কবির বলেনÑ, শোন সাদিয়া। পত্রিকার কথাই যখন তুললে, তখন শোনÑ, রমজানে কম দামে পণ্য খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। কিন্তু কোনো নিত্যপণ্যের দামই ক্রেতার হাতের নাগালে নেই। শবে বরাতের ঠিক আগে এক দফা বাড়ানোর পর চার দিনের মধ্যে আরেক দফা বেড়েছে পণ্যের দাম। কয়েক বছর ধরেই দাম বাড়ানোর কাজটি রমজানের আগেই সেরে নেওয়ার কৌশলে ব্যবসায়ীরা এবারও সফল হলেন। আর এর সত্যতা নিশ্চিত করছে সরকারি বিপণন সংস্থা  ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ওয়েবসাইট। সেখানে দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় থাকা পণ্যের দীর্ঘ সারি। ব্যবসায়ীরা একদিকে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে দাম বাড়ানো হবে না বলে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন সরকারকে। বাজারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং নামেই শুধু আছে, এর কোনো কার্যকারিতা নেই। এ যেন কাজীর গরু; হিসেবের খাতায় আছে কিন্তু গোয়াল শূন্য। কী বুঝলে? পেঁয়াজ-রসুনের বাজারে আগুন, ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে, শাক-সব্জির বাজার অস্থির, ডাল জাতীয় শষ্যের মূল্য বেড়েছে কয়েক দফা। মাছ-মাংশ তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ডিমের দাম হাতের নাগাল থেকে বাইরে চলে গেছে। কী খেয়ে রোজা পালন করবে এদেশের মানুষ? তবে কি ধরে নেবো, রমজান শুধু বাংলাদেশের বাঙালিদের কষ্ট দিতেই আসে?’
রাকিব এতোক্ষণ চুপচাপ বাবা-মায়ের কথা শুনছিলো। এবারে ও-ও আলোচনায় অংশ নেয়। বলে-, ‘আব্বু, রমজান তো সিয়াম সাধনার মাস। এ মাসে যদিও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য বেড়ে যায়, তবে এর একটা সুফলও আছে।’
ওর কথা শেষ হতেই রিক্তা কৌতুহলী হয়ে জানতে চায়, কী রকম ভাইয়া?’
রাকিব বলে, ‘রমজান আসে- সংযম শিক্ষা দিতে। এ মাসে ভোগ্য বস্তু থেকে সংযমী হতে হয়। যেমন কম খাওয়া, কম আরাম করা, কম কথা বলা, পারলে প্রাত্যাহিক প্রাকৃতিক কাজ-কাম ছাড়া আল্লাহর বেশি এবাদত করা। তাই রমজানে যদি জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়েই থাকে, তবে আমাদের উচিৎ কম কম জিনিস-পত্র কেনা ও ভোগ করা। তাতে দুই দিকে লাভ। এক. সংযমের অভ্যাস গড়ে উঠলো আর দুই. ব্যয় কম হলো।’
হুমায়ুন কবির তাঁর সন্তানদের বুদ্ধিমান হিসেবেই জানেন, ছাত্রছাত্রী হিসেবেও ওরা এলাকার সেরা। কিন্তু রাকিবের মন্তব্য শুনে তিনি বুঝতে পারলেন না, কথাগুলোতে শ্লেষ মেশানো আছে, নাকি সত্যিই ও’ সংযমী হতে আহ্বান জানাচ্ছে। তিনি তাঁর অপারগতা মনে মনে স্বীকার করে নিয়ে প্রকাশে বললেন, ‘তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। একটু পরিষ্কার করে বলো তো দেখি।’
রাকিব বললো, ‘পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে রমজানে আমরা কম খাবো। শুধু আমরা কেন, দেশের সব মুসলিম সম্প্রদায় কম খেয়ে, কম ভোগ করে সংযমের শিক্ষা লাভ করবে। ব্যাস।’
‘Ñতোমার কথা যদি তাই হয়ে থাকে, তবে.......’ এটুকু বলে ছেলের দিকে তাকান হুমায়ুন কবির। রাকিব আব্বুর চোখের দিকে চেয়েই হকচকিয়ে যায়। আমতা আমতা করে বলে, ‘তবে?’
ছেলের চোখে চোখ রেখেই হুমায়ুন কবির বলেনÑ, ‘তবে তোমার জানা উচিৎ, এদেশে বারো জাতির মানুষের বসবাস। ধরে নাও, ব্যবসায়ীদের অতি লোভের চক্করে পড়ে মুসলমানরা খাওয়া কমিয়ে দিয়ে সংযমী হলো। কিন্তু তাতে করে সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কেননা, এদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, মার্মা, চাকমা, রাখাইনরা সংখ্যালঘু এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম করে। তো, মুসলমানদের সাথে সাথে তুমি তাদেরও কষ্ট করার কথা বলতে পার না। তুমি এ কথা বলতে পারো না যে, ওরাও রোজা রাখুক, কম খাক। আমি তো মনে করি, রমজান এলে ওরা যে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করে, তাতে আমাদের উপর অভিশাপ নেমে আসে। ওরা সম্ভাবত বিধাতার দরবারে ফরিয়াদ জানায় এই বলে যে, হে প্রভু, বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর রমজানটা তুমি ফরজ না করলেই পারতে, ঈদ উৎসব না দিলেই পারতে। এদেশে ব্যবসায়ীদের জন্য আমাদের বড়ো কষ্ট হচ্ছে প্রভু, বড়ো কষ্ট।’ একটু থেমে তিনি আবার শুরু করেনÑ, দুঃখজনক কথা কি জানো! বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে রমজান এলে পণ্যমূল্য কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে জনগণের কোন কষ্ট না হয়। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের দেশে বড়দিনের উৎসব কিংবা অন্যান্য পূজা-পার্বণ উপলক্ষে পণ্যমূল্য ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়, যেন সর্বস্তরের জনগণ আনন্দের সাথে উৎসব উদ্যাপন করতে পারে। অথচ আমাদের দেশে.................।
ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে আমাদের দেশের ব্যবসায়ী সমাজ। অতি মুনাফা ওদের আজ অন্ধ করে দিয়েছে, তাই আজ সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট ওরা দেখতে পায় না। ওরা বধির হয়ে গেছে, তাই গরীব-দুঃখি খেটে খাওয়া মানুষের কান্না ওদের কানে পৌঁছুয় না। এদেশের গরীব-দুঃখি অভাবী মানুষের মুখের ভাষাও ওরা কেড়ে নিতে বসেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমুল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার উপায় নেই। প্রতিবাদ করতে গেলেও বিপদ আছে, সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার ভয় আছে। তাই আমার মনে হয়, বাঙালি এসব ব্যবসায়ীরা মুসলমান না, ওদের পরিচয়; ওরা মুনাফাখোর। তা না হলে ওরা খাদ্য মওজুত করে ক্রিতিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিতো না। কম মূল্যে উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য এনে উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে পারতো না।’ আবেগের উত্তেজনার উনার গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। কথা বলতে কষ্ট হয়। তাই কথা শেষ না করে তিনি শান্তাকে একগ্লাস পানি আনতে বলেন, গলা শুকিয়ে গেছে উনার। খাটের কিনারায় বসা রাকিব উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে আব্বুর হাতে তুলে দেয়। হুমায়ুন কবির ঢকঢক করে পান করে শূন্য গ্লাসটা হাতে নিয়েই বলতে থাকেনÑ, শুধু কি তাই! গুদামজাত এসব পণ্যসামগ্রী তরতাজা রাখতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে এরা জনস্বাস্থ্যকে হুমকীর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চালের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে কাঁকর, বালি। ইরির মোটা চালকে মেশিনে কেটে এমনভাবে চিকন করে মিনিকেট বানিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে গ্রাহকদের ঠকানো হচ্ছে। খোলা আটার মধ্যে বালুর কণা মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বেশি দামে প্যাকেটজাত আটা বেশি দামে বিক্রি করা যায়। পোকা খাওয়া ছোলা, কীট যুক্ত বেসন, তেল মাখানো খেজুর, কার্বাইডে পাকানো কলা, পোড়া তেলে ভাজা পিঁয়াজু-বেগুনি-চপ, মবিলে ভাজা জিলিপি গেলানো হচ্ছে আমাদের। তাহলে নৈতিকতা কোথায়! ধর্ম কোথায়! সত্য কোথায় হারিয়ে গেলো বলতে পারো? দাড়ি রেখে টুপি পড়ে, হজ্ব করে এসেও এসব ব্যবসায়ীদের ভেতর ধর্মের ছিটেফোটাও চোখে পড়ে না।’ আবেগ আপ্লুত হয়ে তিনি আবারও গাইতে শুরু করেনÑ ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান....।’
দীর্ঘ সংসার জীবনে সাদিয়া তাঁর স্বামীকে চেনেন। তিনি জানেন, হুমায়ুন কোন অন্যায় সইতে পারেন না। জীবনের প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেন। ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট হলেও উনি অন্যান্যদের মতো নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতে পারেন নি, পারেন নি মিথ্যা, ছলনার আশ্রয় নিতে। স্বামীর আদর্শকে তিনি দারুণ রকম শ্রদ্ধা করেন। তাই বলেনÑ ‘আচ্ছা, যেসব ব্যবসায়ীরা এসব দুর্নীতি করে লোক ঠকাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় না?’
মায়ের কথা শুনে রাকিব বলে, ‘কেন নেওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই নেওয়া যায়। আইন আছেও। এখন শুধু এসব দুর্নীতিবাজ, মওজুদদার,  খাদ্যে ভেজাল মিশেলকারী, মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া যায়। আব্বু, তুমি কী বলো?’
হুমায়ুন কবির চুপচাপ ওদের কথা শুনছিলেন। রাকিব উনার মন্তব্য জানতে চাইলে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের অনৈতিক কাজ থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করতেই বিভিন্ন আইন করা হয়। ভোক্তার অধিকার রক্ষায় শাস্তির বিধান রেখে তাই সম্প্রতি প্রতিযোগিতা আইন করেছে সরকার। হলে কী হবে! এদিকে রাজস্ব আদায়ের অন্যতম খাত মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (মূসক) খাতে প্রতিবছরই আদায় বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। পরোক্ষ এই কর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই সময়ে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। কিন্তুু এ খাতে শৃঙ্খলা না থাকায় ক্রেতাদের পকেট কাটা যাচ্ছে। সাধারণের কাছ থেকে আদায় করা টাকা ঠিকমত সরকারের তহবিলে জমা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ সহায়তার অর্থ পেতে সরকার সম্প্রতি ভ্যাট আইন যুগোপযোগী করারও উদ্যোগ নিয়েছে। সংশোধিত ভ্যাট আইন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে রয়েছে। তবে সংশোধিত ভ্যাট আইনটিও প্রকৃত অর্থে  ভোক্তা বান্ধব হয় নি। বাংলাদেশের মত এত বেশি হারে কোথাও ভ্যাট আরোপিত নেই। অন্যান্য দেশে জেনারেল সেলস ট্যাক্স বা জিএসটি নামেও খুচরা বিক্রির ওপর কর নিয়ে থাকে। তবে তা তিন থেকে পাঁচ শতাংশের বেশি নয়। কিন্তুু বাংলাদেশে পনের শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে গিয়ে অন্যান্য করের সঙ্গে মিলিয়ে পণ্যের দামও বেড়ে যায়। আবার পণ্য ও  সেবার বিপরীতে আদায়কৃত এই ভ্যাট সরকারের কাছেও যাচ্ছে না। ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার বা ইসিআর চালু করা হলেও সুকৌশলে এই মেশিন টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেও ফাঁকির মহোৎসব চলছে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপিত না হলেও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট কেটে রাখা হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে ভ্যাটের নামে জনগণের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের সুযোগ করে দেওয়ায় পণ্য মূল্য বৃদ্ধির এই দিনে ক্রেতারা মারাত্মক ঠকা ঠকছে।
রক্ষকই যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন আইন কেবলমাত্র কাগুজে হয়ে যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন নিজেরাই দুর্নীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন বলার আর কিছুই থাকে না। প্রবল চাপে পড়লে এরা ভেজালকারী, ক্রিতিম সংকট সৃষ্টিকারী অনেককেই ধরে, ধরে জরিমানা করে। কিন্তু সত্যটা হলো, এসব ব্যবসায়ীরা জরিমানার টাকা দিয়ে খালাস পেয়ে আবার পুরোদমে আগের মতোই সব শুরু করে।’
রিক্তা বাবার কথায় ভীত হয়ে পড়ে। ব্যাকূল হয়ে জানতে চায়Ñ, ‘তাহলে উপায়?’
মেয়ের প্রশ্ন শুনে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘-হ্যাঁ মা, উপায় নিশ্চয়ই আছে। উপায়টা হচ্ছে ব্যক্তির ভেতর সত্যিকারের ধর্মীয় বোধকে জাগিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলা। নামকাওয়াস্তে মুসলমান হয়ে কোন লাভ নেই। এদেশের মসজিদ ভর্তি মুসুল্লি অথচ মনের মসজিদ শূন্য পড়েই রইলো, আবাদ হলো না। যে কলেমা-নামাজ-রোজা-হজ্ব-যাকাত মনের মাঝে আল্লাহর প্রেম জাগায় না, সে ধর্ম কর্মে কোন ফায়দা নেই। নামের আগে মোহাম্মাদ শব্দ জুড়ে দিয়ে, দাড়ি রেখে, টুপি পড়ে, ইসলামি লেবাস ধরে বাইরে মুসলমানের রূপ ফুটিয়ে তোলে কোন লাভ নেই। লাভ তখনই হবে, যখন নিজের বুকের ভেতর সত্যটা উপলব্দি করার ক্ষমতা জন্মাবে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। অথচ সেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষগুলো মুসলমান নাম ধারণ করে সেই বিধানের মর্যাদা রক্ষা করছে না। বিশ্বের অন্যান্য ধর্মের লোকেরা তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিধানকে যেভাবে মেনে চলে, ভয় পায়; মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ততোটা মেনে চলে না বলেই এই অরাজকতা।
ধর্ম মানুষকে কী শিক্ষা দেয়! ধর্ম শিক্ষা দেয় সৎ জীবন যাপন করতে, অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে, কাউকে ঠকিয়ে নিজে লাভবান না হতে। জাগতিক ও পরকালীন মুক্তির জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। কিন্তু বাংলাদেশে তা হচ্ছে কই? এখানে তো ঠিক এর উল্টো চিত্র চোখে পড়ে। বড়ো দুঃখের সাথেই বলতে হয়, এদেশে মজুরেরও ন্যায্য মজুরি দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। এদেশে সবাই ব্যবসায়ী, শুধুই ব্যবসায়ী। তাই আমি বড়ো বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন। বিভ্রান্ত আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলও হয়েছিলেন। তাই তাঁকে খুঁজতে হয়েছিলোÑ ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা’ সে মুসলমান।’ নজরুলের মতোই এখন আমার মনের অবস্থা। আমিও সেই পূর্ণ ঈমানদার মুসলমানের খোঁজ করছি, অথচ পাচ্ছি না। যদিওবা কাউকে কাউকে পাচ্ছি, তাঁরা কেউ এক হতে পারছে না। থাক এসব কথা। রাত অনেক হলো, তোমরা অনেক পথ জার্নি করে এসেছো। যাও বিশ্রাম নাও।’
সাদিয়া দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখেন রাত দু’টো। রমজানের প্রথম সেহেরি শুরু হবে আর ঘণ্টাখানেক পর। বাবার নির্দেশ পেয়ে শান্তা, রিক্তা এবং পাশের রুমে বিশ্রাম নিতে যায়। ওরা চলে গেলে সাদিয়া এসে হুমায়ুন কবিরের সামনে পা ভাঁজ করে বসে স্বামীর হাত দু’টো কোলে টেনে নেন। স্ত্রীর ছোঁয়া পেয়ে হুমায়ুন কবিরের থমথমে মুখে খানিক হাসির রেখা ফোটে উঠে। কিন্তু এ হাসি বড়ো কিষ্ট, বড়ো বেদনার, সাদিয়া তা টের পান। পরম মমতায় নিজের দু’হাতে ধরা স্বামীর হাত দু’টোতে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন-, কী হলো! ঘুমাবে না!!
‘-কী হবে ঘুমিয়ে, একটু পরেই তো সেহেরি খেতে উঠতে হবে। তারচে’ বরং এ ঘণ্টা খানেক মুখোমুখি বসে থাকি। আর মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকি, মহান প্রভু যেন আমাদের মনে সতত বিরাজ করেন, আমরা যেন অন্তত আর সবার মতো ¯্রােতে গা না ভাসিয়ে দিই।’ কথা ক’টি বলে সাদিয়ার দু’হাত নিজের দু’হাতের মুঠোয় চেপে ধরেন। সাদিয়া হুমায়ুন কবিরের হাতে প্রশান্তি আর নির্ভরতার ছোঁয়া খোঁজে পান। হাতটি তিনি ধরেই থাকেন ঘোষণা স্থানীয় মসজিদ থেকে সেহেরির ঘোষণা না হওয়া অব্দি।
বি:দ্র: লিখতে গেলে প্রায়ই নাম নির্বাচনের বিভ্রাটে ভোগতে হয়। তাই এ লেখার পাঁচটি চরিত্রের মধ্যে যদি কোন ব্যক্তি বা পরিবারের নামের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তিনি বা তারা যেন ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন। -লেখক।

Monday, July 2, 2012

বঙ্গের নদীখাদক বনাম প্রতিবেশি মাসতুতো দাদাগণ | তৈয়ব খান

আমরা কতিপয় বাঙালি এই মর্মে ঘোষণা করিতেছি যে, সর্বপ্রকার চর্বণ-চুষ্য-লেহ্য-পেয় খাদ্যবস্তু অতিশয় আনন্দের সাথে গ্রহণ করিয়া থাকি। রসনায় আমাদের কান্তি নাই। আমরা খাইব এবং খাইতে থাকিব। সর্বপ্রকার খাবারেই আমাদের অত্যাধিক রুচি রহিয়াছে। বোধ করি সর্বভূক তেলাপোকাও আমাদের রুচির কাছে নতি স্বীকার করিবে। তেলাপোকা সকল কিছু খাইয়া যদি হজম করিতে পারে, আমরা আশরাফুল মাকলুকাত হইয়া উহা পারিব না কেন? আমাদের পারিতেই হইবে, কেননা আমরা তো আর বিধাতার জাত মারিতে পারি না। আমরা পাহাড় খাইয়া রেকর্ড করিয়াছি, বনজঙ্গল খাইয়া সাবাড় করিয়াছি। আমাদের মত এইরূপ আর কেহ পারে নাই। এইবার আমরা নদী খাওয়া শুরু করিয়াছি। নদী খাওয়াতে যে কী পরিমাণ আনন্দ উহা যে না খাইয়াছে, তাহাকে বুঝাইবার মত বিড়ম্বনা আর নাই। তবে তাহাদের জ্ঞাতার্থে শুধু এইটুকুই বলিব, নদী ভক্ষণের সুখ খানিকটা ঘুষ খাওয়ার মতই মজাদার। বলিতে কি, ঘুষ খাওয়ার মধ্যে খানিকটা রিস্ক থাকিয়া যায় কিন্তু নদী খাওয়ায় কোন রিস্ক নাই এবং যেহেতু রিস্ক নাই, সেহেতু ইহা খাইতে ভয় কিসের? ইহা আমরা ১০০% হালাল খাবার মনে করিয়াই খাইতেছি। অবশ্য আমরা এইরূপ খাইতে পারিতাম না, ভারতমাসির কতিপয় সুসন্তান আমাদের খাওয়া সহজ করিয়া দিয়াছে। সম্পর্কে উহারা আমাদের মাসতুতো দাদা, তাই অপর ভাইদের প্রতি উহাদের মমতা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। উহারা আমাদের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র নদী প্রবাহকে খাইয়া ফেলিতেছে। প্রতিবেশি মাসির দেশ ভারতের মাসতুতো ভ্রাতাগণ আন্ত:নদী সংযোগের মাধ্যমে সমস্ত জল নিজেরা পান করিতেছে। এখন উহারা পরিকল্পনা করিতেছে আরও ৫৩টি নদীর জল বাঁধ দিয়া নিজেরা পান করিবে। কেননা, উহাদের একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্যটা হইতেছে, দিনে দিনে বঙ্গমাতাকে সাহারা, গোবি, আতাকামা মরুভূমি করিয়া দেওয়া। যাহার জন্য উহারা ফারাক্কা বাঁধ, গজালডোবা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ করিয়াছে। মাসতুতো দাদাদের আন্ত:নদী সংযোগ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হইলে বঙ্গবালা আর নদীমাতৃক থাকিবে না, মরুমাতৃক হইয়া যাইবে বলিয়া নদীবিশেষজ্ঞগণ আনন্দবার্তা শোনাইয়াছেন। আন্ত:নদী সংযোগ হইতেছে একটি মহান ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। প্রকৃতিকে নিজেদের মতন করিয়া গড়িয়া লইতে পারিলে কতবড় বিজ্ঞান সাধনা হইবে, উহা একটি ভাবিবার বিষয়ও বটে। টেকনোলজিতে চৌকস ভারতমাসি আগামী ৫০ বছরের ক্রমবর্ধমান জল ও খাদ্যের চাহিদা মিটানোর লক্ষ্যে দেশিয় ৩৮টি নদীকে ৩০টি সংযোগকারী খালের মাধ্যমে জুড়িয়া দিয়া এক নদীর বেসিন হইতে অন্য নদীর বেসিনে জল স্থানান্তর করিবার পরিকল্পনা আঁটিয়াছে। সেই জন্য বাঁধ দিয়া নদীর গতিধারা পাল্টাইয়া দিতেছে। উহাদের দেওয়া বাঁধের নামগুলোও কর্ণে মধু ঢালিয়া দেয়। কী সুন্দর সুন্দর একেকটি বাঁধের নাম! আহা মরি মরি! ফারাক্কা হইতেছে নট ফার ফ্রম অক্কা অর্থাৎ মরণ থেকে দূরে নহে। গজলডোবা হইতেছে; গজাল মারিয়া ডুবাইয়া দেওয়া, আর টিপাইমুখ হইতেছে টিপিয়া মুখ বন্ধ করিবার অপূর্ব কৌশল। জাতিসংঘ পানিবিশেষজ্ঞ ড. এসআই খান (আমার জাত ভাই, অর্থাৎ খান ভাই) আনন্দের সাথে জানাইয়াছেন, গঙ্গা পানি চুক্তিতে আমাদের অনেক সফলতা রহিয়াছে। সফলতাগুলি হইতেছে- চুক্তিতে পানি পাওয়ার গ্যারান্টি কজ যেমন নাই, তেমনি পানি না পাইলে আরবিট্রেশনের সুযোগও নাই। হিসাবে নাকি ধরা হইয়াছে ফারাক্কা পয়েন্টের প্রাপ্ত পানি। কী চমৎকার কথার্বার্তা! ফারাক্কা পয়েন্টের পানিপ্রবাহ শূন্য হইলে সেই শূন্যকে তো আর ভাগ করা চলে না। গঙ্গার ৭২% পানি আসে নেপাল থেকে, ১০% আসে চীন থেকে এবং ভারতের অংশ মাত্র ২০%। অথচ তাহারা পুরোটাই নিজের মনে করিয়া হজম করিতেছে। কেননা, নদীর পানি পান করিয়া বঙ্গবালা কি আমাশয়ে ভুগিবে! বাঙালির তো ভাল খাবার খাইয়াই এমনি এমনিই পেট খারাপের অভ্যাস আছে। সুতরাং ভারতমাসি আমাদের এত বড় ক্ষতি নিশ্চয়ই করিতে পারেন না। নদীর জল পান করিয়া বাঙালি মরিবে ইহা কোনক্রমেই মাসির কামনা হইতে পারে না। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির মোস্তফা খান (উনিও আমার জাত ভাই, কেননা আমরা শুধুই খাই। খাই বলিয়াই এত চিন্তা, এইজন্যই আমরা খান) মারাত্মক আনন্দের সাথে জানাইয়াছেন, ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তাবায়ন হইলে; আমরা এখন যে পানি পাই, উহাও পাইব না। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিবে। আর্সেনিক বাড়িয়া যাইবে, বঙ্গপসাগর হইতে নোনা পানি প্রবেশ করিবে, অসুন্দরবন ধ্বংস হইয়া সুন্দরবন হইবে। শষ্য ও পশু সম্পদের উৎপাদন হ্রাস পাইবে (পাইলেই ভাল, এত শষ্য কে খাইবে? পশু বাড়িয়া গেলে গুতা কিংবা কামড় খাইবার ভয় আছে। আশঙ্কা হইতেছে, প্রফেসর সাহেবের কথা ফলিবে তো? নাকি শুধু শুধু আনন্দের সংবাদ দেওয়া! আর্সেনিক শব্দটায় কী চমৎকার একটা রিনিঝিনি বাদ্য আছে। কেমন কাব্যিক একটা শব্দ আ-র্সে-নি-ক। আহাহা! আগের দিনে মানুষের কেমন আজেবাজে রোগ হইত। সবরোগের শেষেই ইয়া ইয়া। যেমন: ডিপথেরিয়া, পাইয়েরিয়া, ডাইয়েরিয়া, ম্যালেরিয়া, গনেরিয়া, লিউকোমিয়া, হার্নিয়া। অথচ এখন মানুষ কতো সুন্দর রোগে আক্রান্ত হয়। নামের কি বাহার! কেমন বিদেশি বিদেশি লাগে। এখনকার রোগগুলির শেষে ‘ইস্’ আর ‘আস্’ যুক্ত থাকে। যেমন: ব্রঙ্কাইটিস, এপেন্ডোসাইটিস, হুপিংকাশ। ধন্য তুমি ভানুবাবু। আর্সেনিকে কোন প্রকারে যদি আক্রান্ত হওয়া যায়, কতই না মধুর সময় কাটিবে! আহহারে! এই রোগে যে তামাম বাঙালি করে আক্রান্ত হইবে! কেমন ‘ইক’ করা একটা শব্দ! অদূর ভবিষ্যতে এই ‘ইক’ নিয়া কাব্য লিখিব বলিয়া এই মুহূর্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলাম)। বঙ্গ সন্তানের অসম্ভব রকমের সুন্দর স্বাস্থ্যহানী হইয়া স্লিম ফিগারে পরিণত হইবে, গ্ল্যামার বাড়িবে। হাড্ডির সাথে চর্মের মিলনে বাঙালি হাড্ডিচর্মসার হইয়া পড়িবে, ভাবিলেই মনে পুলক জাগে! অথচ কী আশ্চর্য! ভারতমাসির এই চমৎকার কর্মকা-ের কেহ কেহ বিরোধিতাও করিতেছে। কত বড় সাহস! ইচ্ছা করে, ওই বিরোধীদের নাসিকায় মুষ্ঠাঘাত, পশ্চাতে পদাঘাত, পৃষ্ঠে বেত্রাঘাত, গ-ে চপেটাঘাতের ন্যায় যত প্রকার আঘাত রহিয়াছে, তাহাই করি, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করিয়া দেই। কেননা, ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন জ্ঞাত করাইয়াছেন যে, ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতমাসির পরিবেশবাদিদের যৌথ আন্দোলনের মুখে ভারত সরকার হিমালয়ভিত্তিক নদীগুলিতে আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখে। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে কয়েকটি সম্মেলন হইয়াছে। যদিচ ভারত আন্তর্জাতিক নদীগুলিতে বাঁধ বন্ধ রাখিলেও নিজস্ব নদীগুলিতে আন্ত:সংযোগের কাজ অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে ভারতমাসি তার নিজের অভ্যন্তরে প্রায় ৭০০ বাঁধ নির্মাণ করিয়াছে। এই প্রকল্পটি মাসির একটি অতি পুরাতন পরিকল্পনা। টিপাইমুখ এই পরিকল্পনারই অংশ। ২০০২ সালে এই প্রকল্প নিয়া তোড়জোড় শুরু হইলে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে আন্দোলন শুরু হয়। কারণ এই প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইবে; তেমনি ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। ইহা বাস্তবায়ন হইলে বাংলাদেশ ও ভারতের ৯টি রাজ্য মরুভূমিতে পরিণত হইবে। ফলে দুই দেশের উদ্যোগে যৌথ প্রতিবাদের মুখে তৎকালীন ভারত সরকার কাপুরুষের মত পিছু হটে। ব্রহ্মপুত্র নদ হইতে পানি নিতে হইলে উত্তর-পূর্ব ভারত ও মধ্য-ভারতে অন্তত দুইটি রাজ্যে পাহাড়ের উঁচু  প্লেটের ওপর দিয়া পানি নিতে হইবে। এইজন্য বিশেষ যন্ত্রচালিত মেশিন ব্যবহার করিতে হইবে। যাহা হইবে খুবই ব্যয়বহুল। ওই পানি দূর-দূরান্তে নেওয়ার সময়ও অনেক অপচয় হইবে। এই কারণে ওই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ প্রকল্পের পানি না নেওয়ার ঘোষণা দিয়াছিলেন। ইহাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের খরা পরিস্থিতির উন্নতি হইয়াছে, সেইখানে বৃষ্টি হইতেছে, এমনকি বন্যাও হইয়াছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওইসব এলাকার পানির সমস্যা দূর হইয়াছে। ফলে ওই অঞ্চলে এই নদী সংযোগ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমিয়া গিয়াছে। ইহারপরও ভারতীয় এবং বিদেশি কিছু বেনিয়াগোষ্ঠী এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাহিতেছে। কারণ সেইখানে বিশাল বিশাল ঠিকাদারি পাওয়া যাইবে, বাঁধ হইবে, খাল খনন হইবে, রাস্তা তৈয়ার হইবে, যাহার সঙ্গে জড়িত রহিয়াছে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য। ফলে বেনিয়াগোষ্ঠী এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাহিতেছে। এই পরিবেশবিদ বলেন, বাংলাদেশের মিঠা পানির তিন ভাগের দুই ভাগই আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হইলে ওই নদীর ৬০ ভাগ পানি উজান হইতে চলিয়া যাইবে। এমনিতেই চীন ব্রহ্মপুত্রের ওপর বাঁধ নির্মাণের পাঁয়তারা করিতেছে। তাহার উপর এই ৬০ ভাগ পানি প্রত্যাহার হইয়া গেলে বাংলাদেশ ও ভারতের ৯টি রাজ্যের জন্য এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
হইলে হইবে। তাহাতে কাহার কি যায় আসে! বঙ্গবালা মরুভূমি হইবে। পৃথিবীর অন্যান্য মরুদেশ কি বাঁচিয়া নাই? যদি কেউ অন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দিয়া প্রতিবেশি দেশভগ্নিকে মরুভূমি বানাইতে চায়, তবে তাই করুক। কেননা, মরু জীবনযাত্রার প্রতি আমাদেরও আকর্ষণ কম নয়। তাই ভারতমাসির এই শুভ উদ্দেশ্যকে আমরা স্বাগত জানাইয়া, মাসতুতো দাদাদের সাথে আমরাও একাত্মতা ঘোষণা করিয়া কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়াছি। তাহার একটি হইতেছে নদীভক্ষণ, আরেকটি নদীদূষণ। অপরাপর আরও কিছু কার্যক্রম আমাদের হাতে আছে, সেসব লইয়া পরে আলোচনা করিলেও চলিবে। মাসতুতো ভাইদের কল্যাণে যে সমস্ত নদী ইতোমধ্যে শুকাইয়া গিয়াছে, আমরা সেইসব নদীর জমি দখল করিয়া লইতেছি। কিছু নদীর নিচুজমি আমরা মাটি দ্বারা ভরাট করিয়া দিতেছি। এইসব জমিগুলিকে আমরা প্লট আকারে বাঙালদের কাছে বিক্রয় করিতেছি। শুধু মাত্র মাসতুতো ভাইয়েরাই ব্যবসা করিবে, ইহা মানিয়া লই কী প্রকারে! উহাদের সাথে আমরা এখন প্রতিযোগিতায় নামিয়াছি, দেখি কে কত লাভ করিতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা দেশের প্রায় সকল নদীর উপরেই দখল প্রতিষ্ঠা করিতে পারিয়াছি। আমরা নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় আগ্রাসন চালাইয়াছি। অবৈধ বালু উত্তোলন করিতেছি এবং ইহা বেসরকারিভাবে। সরকারিভাবেও আমাদের কাজের ইন্ধন পাইতেছি। পর্যটন কর্পোরেশন, মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশন, নৌবাহিনীর জেটি ইত্যাদি সংস্থা আমাদের সাথে হাত মিলাইয়া নদী ভরাট করিতেছে। ইহা ছাড়া শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে মীর সিমেন্ট, সিমেক্স ডকইয়ার্ড, পূবালী সল্ট, মেরিন টেকনোলজি, ডিপিডিসি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ খাদ্য গুদাম, আকিজ সিমেন্ট, পারটেক্স, ড্যানিশ, ক্রাউন সিমেন্ট, শাহ সিমেন্ট ইত্যাদিরা যে যেভাবে পারিতেছি নদীর দখল লইতেছি। আমরা মেঘনা নদীর দখল করিতেছি। বঙ্গদেশে আমাদের এইরূপ রঙ্গ করিয়া নদীর জমি দখল করায় ইতোমধ্যে মিডিয়াতে অনেক খবর প্রচার হইতেছে। কিন্তু আমরা তাহা থোড়াই কেয়ার করি। এত কেয়ার করিয়া চলিলে বাণিজ্য চলে না। তবে মিডিয়াতে আমাদের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ হইলে আমাদের গাত্র জ্বালা করে। এইরূপ জ্বালাময়ী খবরের অন্ত নাই। উহারা কুমিল্লার গোমতী নদীর পাড় কাটিয়া সাবাড় করার খবর প্রকাশ করিয়াছে। নদীর পাড়ের মাটি কাটা দ্রুত বন্ধ না করিলে নদীর ক্ষতি তো হইবেই, পাশের রেলসেতুটিও হুমকির মুখে পড়িবে বলিয়া যে খবর প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাদের আমাদের ভ্রুক্ষেপ নাই। গোমতী নদীর দুই পাড়ের প্রায় ৩৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়িয়া আমাদের মাটি কাটার উৎসব চলিতেছে। কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকা কটক বাজার হইতে বুড়িচং উপজেলার কংসনগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়িয়া শত শত ট্রাক্টরে করিয়া প্রতিদিন পাড়ের মাটি কাটিয়া লইয়া যাইতেছি। এইভাবে কীর্তনখোলা নদী ভরাট করিয়া বিশাল এলাকা লইয়া আমাদের জ্ঞাতিভাই অপসোনিন তাহাদের কারখানা নির্মান করিতেছে। যদিও কীর্তনখোলার জমি দখলের পাশাপাশি নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন মৌজার জমি দখলের অভিযোগে এই পর্যন্ত ৮টি মামলা দায়ের হইয়াছে। আরও দুইটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হইয়াছে। কিন্তু আমাদের জ্ঞাতি ভাই অপসোনিন কোম্পানীর মালিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় তাহারা বহাল তবিয়তেই আছে।
আমরা এইরূপ বহাল তবিয়তেই থাকিব। কেহ আমাদের কিছু করিতে পারিবে না। সরকার আমাদের, বিরোধী দল আমাদের। স্বাধীন দেশে আমরাও সবাই স্বাধীন। এই দেশে যে যেভাবে পারিব মারিয়া কাটিয়া খাইব। তাই বঙ্গবালার প্রায় সব কয়টি নদীর উপরেই আমাদের দখল প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। 
পরিবেশবিদদের প্রতি আমাদের বড়ই ক্রোধ জমিয়া রহিয়াছে। ওই বে-আক্কেল পরিবেশবিদরা কেবলই জীব বৈচিত্র লইয়া লাফালাফি করে। উহাদের জানা উচিত- দেশীয় বৃক্ষ-লতা-পাতা-ফুল-ফসল নিমূল করিয়া আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করিতেছি। তাহা কত্ত বড় আবিষ্কার বিজ্ঞান একদিন উহার মূল্য বুঝিবে। অথচ কী আশ্চর্য, পরিবেশবিদদের কাহারও আমাদের এই আবিষ্কারের প্রাতি মানবিক সমর্থন নাই! ছি! ইহা অতিশয় মন্দ স্বভাব। পরিবেশবিদদের স্বভাব পরিবর্তন করিবার সুযোগ আসিয়াছে কিন্তু উহারা সেই সুযোগ আহাম্মকের ন্যায় হাতছাড়া করিতেছে। উহারা জানে না মরুভূমির কত বৈচিত্র! আহাহা! বঙদেশ মরুভূমি হইলে কত্ত মজা হইবে! এই দেশে ক্যাকটাস জন্মাইবে, ম্যানজানিটার ঝোপঝাড় হইবে, কত্ত ধরনের মরু উদ্ভিদ জন্মাইবে! গরুর বদলে লোকজন উট পুষিবে, ছাগলের পরিবর্তে দুম্বা, আর মহিষের পরিবর্তে ঘোড়া পুষিবে। আর মরুজীবনের স্বাদ যে কত্ত আনন্দের, উহা কী কেহই একবারও ভাবিয়া দেখিবে না! আমরা তাম্বুর নিচে বসবাস করিব, কত্ত মজা হইবে! বঙ্গবালার সাথে রঙ্গলীলা করিতে আমরা নদীমাতৃক বঙভূমিকে মরুমাতৃক করিয়া দিব। পরিবেশবিদরা কবি নজরুলের কবিতা “ভেঙ্গে আবার গড়তে জানে সে বড় সুন্দর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নতুনের কেতন উড়ে......” ভুলিয়া গিয়া অকারণে লাফালাফি করিতেছে। বার্ধক্য উহাদের আকড়াইয়া ধরিয়াছে, তাই নতুন সৃষ্টিতে ভয় পায়। সাহিত্যে ‘কাপুরুষ’ বলিয়া অভিশম্পাত করিলেও এই বে-আক্কেল পরিবেশবিদদের একটুও লজ্জা হয় না। ছি!
বঙ্গবালাকে মরুকরণে একটা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সকলকে জানাইয়া দেওয়ার বাসনা আমরা দীর্ঘকাল বুকের মধ্যে লালন করিয়া চলিয়াছি। কিন্তু সময়ের অভাবে তাহা আর হইয়াই উঠে না। সকলের জানা থাকা দরকার যে, ভারতমাসি পানির মত তুচ্ছ একটা জলজ পদার্থকে আটকাইয়া রাখিয়া বঙ্গবালার নদ-নদীগুলিকে শুকাইয়া দিয়া আমাদের কত কল্যাণ করিয়াছে। এখন ঐ সকল নদ-নদীর জমিসমূহকে আমরা দখল করিয়া লইব। জাতীয় সম্পদ আমাদের ব্যক্তিগত হইয়া যাইবে। কেননা, আমরা তো জাতিরই একটা অংশ। সেই হিসাবে আমরা ঐ জমির নিশ্চয়ই হকদার! দখলিস্বত্বে আমরা সেই জমি বিক্রয় করিব, কল-কারখানা গড়িয়া তুলিব, বাড়ি বানাইব। কৃষিনির্ভর বাংলাকে আমরা শিল্পে সমৃদ্ধ করিব। জমি দখল করিতে আমরা দশের নদ-নদীগুলিতে তিরতির করিয়া বহিয়া যাওয়া জলধারায় প্রথমেই কল-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ দিয়া দূষণ আরম্ভ করিয়া দেখিলাম, তাহাতে বেশ কাজ দিল। বঙ্গভূমির নদ-নদী হইতে ভোজবাজির ন্যায় মৎসকূলের কতক পালাইয়া গেল, কতক মরিয়া ঢোল হইয়া জলে ভাসিতে লাগিল। নদীর জলে সাপ-ব্যাঙ-কুমির-মৎস নির্মূল হইতে না হইতেই পানির স্বাদ ও গন্ধ বিদূরিত হইয়া এমন মনোরম বিটকেলে এবং মোহনীয় দুর্গন্ধ ছড়াইতে লাগিল যে, নাসিকায় ভয়ানক আরামের শিহর অনুভব করিতে লাগিলাম। সুগন্ধি আতরের এমন বিপরীত সুবাসিত দুর্গন্ধে বুঝিয়া গেলাম, কাজ দিবে। আমরা পারিব। এমন বিটকেলে গন্ধজলে স্নান করিয়া যদি কেহ ঈদের জামাতে নামাজে শরিক হয়, তবে সে যে কত কিসিমের পুরস্কার পাইবে, তাহার ভাগ তো কেহ আমাদের দিবে না! নাই বা দিল, আফসোস করিয়া কী লাভ! শেষে পুরস্কারের ভাগ লইতে যাইয়া কোলাকুলির পরিবর্তে কিলাকিলি করিতে আমাদের শখ নাই।
যে সকল উজবুকেরা নদীর জলে মৎস নাই মৎস নাই বলিয়া চেঁচামেচি করে, মৎসের পরিবর্তে আমরা তাহাদের পোল্টির মুরগা খাওয়াইব। ফরেন মুরগার স্বাদ একবার ধরাইয়া দিতে পারিলে পোল্ট্রি করিতে দোষ কোথায়! হাইব্রিড মুরগার মাংশ বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা রূপে আবিভুত হইয়াছে বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। ঐদিকে, নদীর জমি ভরাট করিয়া কারখানা করিতে সমস্যা কোথায়! যদি বেকার সমস্যার সমাধান হয় তবে ফরেন কান্ট্রি থেকে আমরা মৎস আমদানি করিয়া আনিব। আমিষের অভাব পূরণ হওয়া লইয়াই কথা! মাছ খাইব না; মাংশ খাইব, ভাত খাইব না; পোলাও খাইব। চাইকি বিরিয়ানিও হইতে পারে।
কিন্তু আফসোস! আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য কেহই বুঝিল না। বর্তমান দুনিয়ায় বুঝদার মানুষের বড়ই অভাব। তবে আমরা আশাবাদি, আমাদের ভাবি বংশধরেরা বুঝদার হইবে। শাখামৃগ কিছু পরিবেশবিদদের সাথে আঁতাত করিয়া সরকার আমাদের কল-কারখানায় কয়েকদফা ভ্রাম্যমান আদালত পাঠাইয়া যদিও বেশ কিছু জরিমানা আদায় করিয়া লইয়াছে। তা করুক না, কত আর আদায় করবে! আমরা উসুল তুলিতে জানি।
আমরা আমাদের কার্যক্রম শতভাগ গতিতে চালাইয়া যাইব। কেহই রোধ করিতে পারিবে না। কিছু লোক অবশ্য চেষ্টা করিবে যাহাতে আমাদের ক্ষতি হয়। তাহা করুক। পৃথিবীর সমস্ত ভাল কাজের বিরোধিতা অনেকেই করিয়াছে, ইতিহাস স্বাক্ষী। আমাদের বিরোধিতাও অনেকে করিবে, আমরা জানি। টেলিভিশনে, পত্রিকায়, ইন্টারনেটে আমাদের কর্মকা-ের বিরুদ্ধে নিয়মিত খবর প্রচারিত হইতেছে, তথ্য আদান প্রদান হইতেছে, রাজপথে মানব বন্ধন হইতেছে। হউক, হ্ইবেই  তো। কিন্তু সকলেই একদিন বুঝিবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা আরেকটি কতবড় নতুন মরুভূমি নির্মাণ করিয়া গেলাম। নতুন প্রজন্ম কোনদিন হয়ত আমাদের এই মহৎ কাজের সম্মানে “নদীখাদক” খেতাবে ভূষিত করিয়া মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার জন্য বঙ্গ নামের নতুন মরুর বুকে তিক্তানুষ্ঠান করিবে। কিন্তু ঐ মরণোত্তর পুরস্কার লইয়া আমরা কী করিব, জীবিত থাকিয়াই যদি না পাইলাম! তাই, উহাও আমরা নতুন প্রজন্মকে দান করিয়া দিয়া গেলাম। দানে আমরা হাজি মোহাম্মদ মহসীনকেও ছাড়াইয়া যাইতে চাই, যাহাতে গিনিচ বুকে আমাদের নামও দানবীর হিসাবে লেখা থাকে।
তারিখ: ২৯ জুন, ২০১২

পরিচিতি: কবি, লেখক ও সাংবাদিক এবং  ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, পাক্ষিক সময়ের বিবর্তন
ইমেলঃ auronalok70@yahoo.com

Tuesday, May 3, 2011

বসন্তের গান ।। তৈয়ব খান

ফাগুন এলো আগুন নিয়ে শিমুল কৃষ্ণচূঁড়ায়
বাতাবী ফুল মাতাল হয়ে মধুর সুবাস ছড়ায়
ঐ এলো ঐ এলো বসন্ত
মুগ্ধ হওয়ার দিলো সে মন্ত্র।।
আমের মুকুল দিলো উঁকি
লাজুক বধূ রাঙামূখী;

অশোক পলাশ লাল শাড়িতে
সাজলো ভীষণ সোহাগ পেতে
প্রজাপতি চুমোয় চুমোয় প্রণয় পরাগ জড়ায়।
ঐ এলো ঐ এলো বসন্ত
প্রেমিক হওয়ার দিলো সে মন্ত্র।।

কোকিলেরা পাতার ফাঁকে গায় বিরহী গান
চির প্রেমিক যে জন, শুধু ভরায় যে তার প্রাণ
এমন দিনে কে ভাই একা!
পাওনি হৃদয় সাথীর দেখা?
হারালে কে দূর অজানায়
তাই কি ও’ গান হৃদয় বীণায়
সপ্ত সুরে বেজে উঠে রাগ বিরহী গড়ায়?
ঐ এলো ঐ এলো বসন্ত
উদাস হওয়ার দিলো সে মন্ত্র।।

সূত্র : নতুন দেশ

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ