প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label অর্ক. Show all posts
Showing posts with label অর্ক. Show all posts

Thursday, March 24, 2011

একটি ভ্রুনহত্যার গল্প ।। অর্ক

আমি আজকাল প্রায় সকালেই দেরী করে ঘুম থেকে উঠি।আজও দিবানিদ্রাতেই থাকার প্রাণপন প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলাম।কিন্তু ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো নোকিয়া ফোনের কড়কড় রিংটোনে।সাধারণত এরকম ক্ষেত্রে আমি ঘুমের ভান করে পরে থাকি।কিন্তু আজকের ঘটনা ভিন্ন।কারণ ফোনটা করেছে মুনিয়া খালা।আমাকে যদি আমার দেখা পৃথিবীর দশজন ভালো মানুষের তালিকা করতে বলা হয় তাহলে আমি উনাকে এই তালিকাতে রাখতে পারবোনা। আমার কাছে উনি কারো সাথেই তুলনীয় নন।খালা আমাকে এতটাই ভালোবাসেন যে আম্মা মাঝে মাঝে উনাকে বলেন,"মুনিয়া আমার ছেলেরে তুই নিয়ে যা,তোকে আমি দিয়ে দিলাম।" মজার ব্যাপার হলো উনি আমার আপন খালা না।বিভিন্ন লতায়-পাতায় পেঁচানো খালা।প্রকৃতির কি অদ্ভুত লীলা যার মনটা এত মায়া দিয়ে গাঁথা,তাকেই খোদা কখনো নিজের সন্তানের মা ডাক শুনতে দেননি।খালার প্রথম সন্তান মারা যাওয়ার পর কি কারণে যেন উনি আর কখনোই মা হতে পারেননি।খালার সেই সন্তানটি ছিলো ছেলে,যে পৃথিবীতে আসার পূর্বে নাম প্রাপ্ত হয়েছিলো অর্ক।এর কিছুদিন পর আমার জন্ম হলে এই খালাই আমাকে তার সন্তানের জন্য রাখা নামটি দেন।শুনেছি জন্মের পর মুনিয়া খালা আমাকে নিয়ে যান কিনা এটা ভেবে আম্মা বেশ ভয়ে ছিলেন।হয়তো তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে আমার মাঝে খুঁজে পান বলেই প্রতিবার বাসা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,"আব্বা গেলাম,তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া কইরো।পড়াশোনা বাদ।"



আসল কথায় ফিরে আসি।আমি খালার ফোন ধরে সালাম দিতেই খালা কান্না কান্না কন্ঠে আমাকে অনেকগুলো কথা একসাথে বলতে লাগলেন।অস্পষ্টভাবে যা বললেন তাতে আমি যা বুঝলাম তা হলো,রিমি হাসপাতালে।আজকে ওর abortion করা হয়েছে।সমস্যা হয়েছে ওর জ্ঞান এখনো ফেরেনি।

রিমির পরিচয় দেয়া দরকার।রিমি আমার খালার পালিত কন্যা।ওকে দত্তক নেয়ার ঘটনাটা খুবই বিচিত্র।খালার সন্তান মারা যাওয়ার পর খালা একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেন।তখন ঘরের কাজের জন্য একজন বুয়া রাখা হয়।বুয়ার মাসখানেক আগে একটা মেয়ে হয়েছিলো।খালা বুয়ার বাচ্চাকে নিজের খাটে শুইয়ে ঘুম পাড়াতেন,কোলে নিয়ে রাখতেন,এমনকি খাইয়েও দিতেন।খালু এই ব্যাপার নিয়ে মহা পেরেশান ছিলেন।আমার আম্মাকে প্রায় বলতেন "আপা বুয়ার বাচ্চার জন্য আমি আজকাল ঘুমাইতে পারিনা,আমাকে আপনার বোন সোফায় ঘুমাইতে বলে নিজে বাচ্চারে আমাদের খাটে রেখে দেয়।বলেনতো এইটা কিছু হইলো?"।

দুঃখজনকভাবে বুয়া কাজ করার দুইমাস পরে তার শরীরে লিউকিমিয়া ধরা পড়ে।খালা শুধু বুয়ার কন্যাসন্তানটির জন্য হলেও বুয়ার অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেন।কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে হঠাৎ করে বুয়া খুব হাসতে শুরু করে।একসময় খালার হাত ধরে বলে,"আপনে কিন্তু ওর মা আছেন,আপনারে কীরা দিয়া গেলাম"। আমার মমতাময়ী খালা এভাবেই রিমিকে পান। রিমি আর আমার বয়স প্রায় সমান।খুব বেশি হলে বছরখানেক ছোট হবে।ওর আপন মা মারা যাওয়ার পর খালা কখনো ওকে এতটুকু কষ্ট দিয়ে মানুষ করেননি।আমরা এবং খালার আত্নীয়স্বজনদেরকে খালা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন,উনাকে যদি কেউ আপন মনে করে তাহলে এই বাচ্চাকেও আপন ভেবে নিতে হবে।একবার আমার এক মামা কিছু একটা বলেছিলেন,মুনিয়া খালা চোখের পানি নাকের পানি এক করে তাকে ত্যাজ্য করেন।ওই মামা পরে রিমির জন্য ১০ কেজি চমচম কিনে খালার বাসায় রওনা হোন।খালা তো তার দরজা খুলেননা কোনভাবেই।পরে খালুজান অনেক কষ্টে খালাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মামার সাথে ভাব করায় দেন।খালা শর্ত দিছিলেন,মামা যেন তার বাসায় কখনো মিষ্টি ছাড়া না আসে।আমরাও মামার বদৌলতে প্রায়ই চমচম খেয়ে তৃপ্তিভরা ঢেঁকুর তুলতাম।উল্লেখ্য রিমির প্রিয় খাবার ছিলো চমচম।

সবই ঠিক ছিলো,শুধু সমস্যা ছিলো খালুজান।খালা মনে করতেন খালুজান রিমিকে আপন মেয়ের মত ভালোবাসেননা।যদিও রিমি কখনো অভিযোগ করেনি,বরং খালুর সাথে দেখতাম তার বেশ ভালোই ভাব।খালু তার এই পালক কন্যাকে কখনো একবারের জন্যও সামান্য ধমক দেয়নি।তবুও খালা রিমিকে নিয়ে খালুজানকে প্রায়ই বকাঝকা করতেন।

সেই রিমির চার মাস আগে আকদ হয়ে গেছে আর আজকে কি ভয়ঙ্কর কথা শুনলাম।আমি খালাকে হাসপাতালের নাম জেনে এখুনি আসছি কথা দিয়ে ফোন রাখলাম।এর এক ঘন্টা পর আমি মনোয়ারা হাসপাতালে রিমির কেবিনের পাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়ানো।আমার পাশে রিমির জামাই মুখ কাঁচুমাঁচু করে বসে আছে।আমি তাকে মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, abortion এর সিদ্ধান্ত কেন নিলো! উনি আমার দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো, "এখনো তো ঘরে তুলে নেইনি।আম্মা বলছে অনুষ্ঠান করে বউ ঘরে নেবেন।তাই অনুষ্ঠানের আগে বাচ্চা হয়ে গেলে সমস্যা।এইজন্যই আর কি..."।আমি এহেন জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম।তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও আর ইচ্ছা হলোনা।খালা আর খালুর পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম। খালা তখন অঝোরে কাঁদছে মেয়ের পাশে বসে।খালু খালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চুপ করে।আমাকে দেখে খালা কাছে টেনে এনে বসালেন।তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, "তোমার খালুজানরে জিজ্ঞেস করো সে কেন কিছু করলোনা।এখন আমার সাথে আহলাদ দেখায় বলে মেয়ের কিছু হবেনা।কোনদিন এই লোক মেয়েটাকে নিজের মেয়ে ভাবেনাই।" খালু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ায় বলে, "আমি কি করবো?তোমার মেয়ের জামাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে ওদের মধ্যে আমি কি কিছু বলার হক রাখি?" খালা এবার রেগে গেলো, "তুমি আমার সামনে থেকে দূর হও।তোমার মুখ দেখাও পাপ"। খালু আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন,তারপর কেবিনের বাহিরে হাঁটা দিলো।খালা আমাকে এরপর জিজ্ঞেস করলো,নাস্তা করছি নাকি।হালকা পাতলা কথা বললো।

এর একটু পর রিমির প্রথমবারের মত সেদিন জ্ঞান ফিরলো।খালা হন্তদন্ত হয়ে রিমির মাথার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, "মা এখন কেমন লাগতেছে?ব্যাথা আছে?"। রিমি একটা কেমন অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে খালার দিকে তাকালো।তারপর খেব মৃদু কন্ঠে বললো, "আম্মু ভাইয়াকে অনেকদিন পর দেখলাম।ও তো বোনের কথা একবারও ভাবেনা।" আমি রিমির দিকে হাসি দিয়ে তাকিয়ে বললাম, "সময় পাইনারে।বাসাতেও আজকাল থাকিনা তেমন"। রিমির চোখ দিয়ে দেখলাম টপ টপ করে পানি পড়ছে।আমাকে কান্না কান্না গলায় বললো, "ভাইয়া জানিস ডাক্তার না মানা করছিলো বাচ্চাটাকে না মারতে,আমি সকালে আসলে ডাক্তার আমাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখায় আমার বাচ্চার ছোট্ট মুখখানা,তার হৃদপিন্ডের ধুক ধুক শুনায়।জানিস ভাইয়া অনেক ছোট্ট ছোট্ট হাত ছিলো।এমন কেন হলো রে?আমার বাচ্চাটা কি কোনদিন আমাকে মাফ করবেরে ভাইয়া?আমি অনেক কাঁদছিলাম যেন বাচ্চাটাকে না মারে,কিন্তু আমার কথা কেউ শুনেনাই।ভাইয়া আমার বাচ্চাটা এখন কই আছে বলতো?বেহেশতে না ভাইয়া?"

আমি চোখের পানি ঢাকার জন্য কেবিনের বাহিরে চলে আসি।পিছনে শুনলাম খালা অঝোরে কাঁদছে।বাহিরে এসে শার্টের কোনা দিয়ে চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ।একটু স্বাভাবিক হলে পিছন ফিরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলাম।আমার খালুজান হাসপাতালের করিডোরের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।আমি উনার কাছে আস্তে আস্তে হেঁটে গেলাম।দেখলাম উনি রিমির আসল বাবা ফরিদ উদ্দিন সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে কান্নাভেজা চোখে এক গাদা কথা বলছেন। "বুঝলা ফরিদ আমার মেয়েটাকে যখন স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম তখন প্রায় সে মিস্টির দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতো।প্রতিদিন আমরা মিস্টির দোকানে যেয়ে একসাথে চমচম খেতাম।ওর জন্য প্রতিরাতে চমচম কিনে আনতাম।ওর মা ঘুমায় থাকতো,তখন আমি ওকে কোলে করে নিয়ে বারান্দায় ঘুরতাম আর মিস্টি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুখে দিতাম।ও আমার কোলেই খেতে খেতে ঘুমায় পড়তো।আজকে আমার এই মামুনীটা এভাবে হাসপাতালে শুয়ে আছে আর আমি ওর জন্য কিছু করতে পারছিনা।" ফরিদ সাহেব মাথা নিচু করে খালুজানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিইয়ে বললো, "কাইন্দেন না।আমাগো মাইয়ার কিছু হইবোনা।"

আমি এই দুই অশ্রসজল পিতার ভালোবাসার দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখলাম।কিছু সময় মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে যায়।আমারো ঠিক এই মুহূর্তে এমনটাই মনে হচ্ছিলো।কত কথা মনে পড়ে গেলো।আমার এস.এস.সি,এইচ.এস.সি পরীক্ষার সময় রিমি প্রতিদিন বাসায় এসে এটা-ওটা রান্না করতো।আমাকে বলতো, "আমার ভাইয়া হলো সবসময় ফাস্ট।তাই এখন পরীক্ষার জন্য ওর খাবারও হবে ফাস্টক্লাস।" আমি এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে বললাম , "বোনরে আমি কোনদিন ফাস্ট হইতে পারিনাই।কিন্তু তুই সবসময় বোন হিসেবে আমার কাছে ফাস্ট ছিলি"।

আরেকবার চোখে পানি মুছতে মুছতে খালার চিৎকার শুনতে পারলাম।আমি হুড়মুড় করে কেবিনের দিকে দৌড় দিলাম।দেখি রিমির শরীর কেমন কুঁকড়িয়ে যাচ্ছে।হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।ডাক্তার ডেকে আনা হলো।রিমির জামাই আফসার সাহেব ছুটাছুটি করতে থাকলেন।ডাক্তার সবাইকে রুম থেকে বাহিরে যেতে বললে আমরা কেবিনের বাহিরে জমায়েত হলাম।আমার খালা অঝোর ধারায় তখন কাঁদছে। "আমার মেয়েটার এমন সর্বনাশ হয়ে গেলো আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম না।কেমন ছেলের কাছে বিয়ে দিলাম।আজকে বিয়ে বাঁচাতে মেয়েটাকে মনে হয় মেরেই ফেললাম।"...খালার এইসব কথা শুনে রিমির জামাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো।আমি উনাকে যেয়ে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে লাগলাম, "বউ বলে কি রিমির সাথে যা ইচ্ছা করার অনুমতি পায়া গেছেন।ওরে মানুষ মনে হয়না?নিজের বাচ্চারে এভাবে মারতে ঘৃনা হলোনা?" আমি এই কথা বলে সোজা হাসপাতালের বাহিরে চলে আসলাম।আমার কিচ্ছু তখন ভালো লাগছিলোনা।কি অসহ্য এই মানব জীবন।আমরা মানুষগুলো দিন দিন কেমন যেন অমানুষ হয়ে যাচ্ছি।আজকে রিমির সাথে যা হয়েছে,সামাজিকতার দায়ে না জানি আর কত মেয়ের সাথে এমন হয়ে চলছে প্রতিদিন।

রাত আটটার দিকে রিমির কেবিনে আমরা সবাই।অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য ওর অবস্থা তখন মুমূর্ষ।সেই সময় পান খেতে খেতে আবির্ভাব ঘটে রিমির শ্বাশুরীর।উনি রিমির কপালে হাত দিয়ে বলেন, "এখুন কিমুন আছে মাইয়া?" খালা কটমট চোখে তাকিয়ে বলেন, "আমি যদি আগে জানতাম আপনারা আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করবেন তাহলে..." ।রিমির শ্বাশুরী খালার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বলেন, "আমি কি জানতাম আপনার বাসায় আমার পোলা যায়া থাকে?আর মাইয়া তো বড় হইছিলো।তার বুদ্ধি থাকলেইতো পোয়াতি হওয়া লাগতোনা।আমার পোলাটাও যে বেকুব এইটাও খাটি সত্য।" রিমির আসল পিতা ফরিদ সাহেব মহিলার দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বললো, "আমার স্যান্ডেলটা কিন্তু চামড়ার না প্লাস্টিকের।মুখে পড়লে দাগ যাইবোনা।আমি যদি বুজতাম আগে,আমার মাইয়ারে বিয়া বইতে দিতামনা।আপনার পোলারে থুতু দিয়া আসতাম।" রিমির শ্বাশুরী এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।তিনি সাথে উঠে উঠে দাঁড়িয়ে গজগজ করতে করতে হাঁটা দিলেন।পিছন থেকে তার ছেলে "আম্মা আম্মা" করে নপুংশকের মত হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে গেলো।

রাত্রি নয়টায় রিমির জ্ঞান কিছুটা ফিরে আসে।সে "আব্বু আব্বু" বলে ডাকা শুরু করে।খালুজান রিমির খাটের পাশে বসে শক্ত করে ওর হাত ধরে আছেন যেন কেউ তার মেয়েকে তার থেকে কেঁড়ে নিতে না পারে।রিমি খালুজানের আঙ্গুলগুলো আস্তে আস্তে দুর্বল ভাবে ধরে মৃদু কন্ঠে খালুকে আরো কাছে আসতে বললো।ওর দুর্বল গলার স্বর আমরা ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলাম।কেমন যেন তীব্র হয়ে তা কানে বিঁধছে। "আব্বু তুমি যে আমাকে মার থেকে বেশি ভালোবাসো এটা আমি কিন্তু জানি।তোমার মনে আছে আমি যখন ছোট্ট কালে টাইফয়েড জ্বরে অজ্ঞান হয়ে ছিলাম,তখন তুমি সব কাজ রেখে সারাদিন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছিলে?যে ভালোবাসা তুমি আর আম্মু আমাকে দিছো আমি হাজার জনমেও এর ঋণ শোধ করতে পারবোনা।আমি মারা গেলে তুমি কিন্তু আম্মুর অনেক খেয়াল নিবা।তুমি আর ভাইয়া ছাড়া আম্মুজানের কেউ নাই।আর আব্বু আমার বাচ্চাটা খুব সুন্দর হইতো জানো।ওর তো বয়স দুই মাস হয়ে গেছিলো।আমার মনে হতো,ও হালকা নড়াচড়াও করতো।আমি ওর সাথে প্রতিদিন রাতে কত কথা বলছি।গতরাতে ও আমাকে স্বপ্নে বলছিলো আম্মু আমার হার্ট ধুকধুক করে।তুমি বেশি নড়াচড়া কইরোনা ঘুমের সময়।"

আমার খালাখালু অসহায় চোখে রিমির পাশে বসে তার কথা শুনছিলো।রিমি শ্বাস টেনে টেনে এতগুলো কথা অনেক কষ্ট করে কিভাবে বললো জানিনা।আমি নিজের চোখের পানি আটাকাতে পারছিলাম না।সবাই রিমিকে বলছিলো ও যেন চুপ করে থাকে।ওর কিচ্ছু হবেনা।কিন্তু আমি জানতাম,অনেক আগেই জানতাম এই নোংরা পৃথিবী ওর জন্য না।

আমার জানাটা মিথ্যা ছিলোনা।রাত তিনটায় রিমি মারা যায়।দিনটি ছিলো ১৯শে অক্টোবর,২০০৮।মারা যাওয়ার আগে সে শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, "ভাইয়া আমার বাবুর কাছে যাচ্ছিরে"। আমি এখনও রিমিকে অনেক মনে করি।আমার বোনটা কোথায় আছে,কেমন আছে জানিনা।কিন্তু আমি সবসময় প্রার্থনা করি যেন আমার সকল পুণ্য ও আর ওর অনাগত সন্তানটি পায়।ওর স্বামীকে আমরা কখনো ক্ষমা করিনি।অবশ্য সেও রিমিকে কবর দেয়ার পর থেকে কখনো আর আমাদের সামনে মুখ দেখায়নি।শুনেছি ভদ্রলোক(?) এখন সুইডেনে আছে।আরেকটা বিয়ে যে করেছে এটা না বললেও চলে। আর আমার মুনিয়া খালা সারাদিন তার বাসার বারান্দায় বসে থাকেন।কারো সাথে তেমন কথা বলেননা।শুধু আমি বাসায় গেলে আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন,"তোরা সব এমন কেন?"।এরপর কান্নাকাটি করেন অনেক, যা আমি সহ্য করতে পারিনা বলে নিজেই দুফোঁটা চোখের জল ফেলে বাসা থেকে বের হয়ে আসি।পিছনে শুনতে পাই আমার খালু গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকেন, "কাইদোনা মুনিয়া।আমার মেয়েটা কষ্ট পাবে"।

[লিখায় বর্ণিত ভ্রুণহত্যার ঘটনাটি কল্পিত নয়।নামগুলো আর কিছু চরিত্র পালটে দিয়েছি।গল্পের রিমি মারা গেলেও বাস্তবের রিমি বেঁচে আছে।কিন্তু যে মানসিক যাতনার সে স্বীকার হয়েছে তাকে বেঁচে থাকা বলে কিনা বলতে পারছিনা।তার গুণধর স্বামীও তাই পার পেয়ে গেছেন এবং আপাতত ইউরোপে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছেন।Abortion এর জন্য আমাদের দেশে অনেক মায়ের মৃত্যু ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।আমার জানামতে ব্যাপারটা খুবই কমন।এই লেখাটা সেই মা আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্য।আরো বলে নিচ্ছি গল্পতে বর্ণিত অর্ক আমি নই।অর্ক সেই মানুষটি যার থেকে পুরো ব্যাপারটি জানা গেছে।রিমি ও তার অনাগত সন্তানের জন্য সবাই আশা করি একবারের জন্য হলেও প্রার্থনা করবেন।লেখার সময় আমার নিজের প্রতি বেশ ঘৃণাবোধ হয়েছে।কারণ এই নোংরা সমাজের আমিও এক অংশ।]

ভ্রুণহত্যা, বিড়ালহত্যা কিংবা মধ্যবিত্ত নিতিদিন ।। অর্ক

তন্দ্রার মনযোগ ভাঙে দূরের একটি ট্রাকের গর্জনে। সে মৃদু আলোর দিকে তাকায়, খানিকটা দূরে, ট্রাকের আলোয় রাস্তার মাঝখানে শুয়ে থাকা একটি বিড়াল স্পষ্ট হয়। সম্ভবত প্রচণ্ড গরমের কারণেই বিড়ালটি এমনভাবে রাস্তায় বসে আছে একটু খোলা হাওয়ায় শীতল হবে বলে। বিড়ালটিকে তন্দ্রার আদর করতে ইচ্ছে করে, ভাবতে ভাবতে ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে আসা দূরের ট্রাকটি মুহূর্তেই বিড়ালটিকে চাকায় পিষ্ট করে আঁধার করে দিয়ে যায়। ল্যাম্পপোস্টের নিচে পড়ে থাকে ২৫০ ভোল্ট বাতির মৃদু আলো। বিড়ালটির মৃত্যু তন্দ্রার ভারাক্রান্ত মনে একটু বড়সড় ধাক্কা দেয়, একি তবে বড় কোন দুর্ঘটনার আভাস।সুপ্ত’র সঙ্গে তন্দ্রার প্রেম করে বিয়ে হয়নি। ওদের বিয়েটা হয়েছিল পারিবারিকভাবেই তবে বিয়ের আগেই তারা একে অপরকে দেখেছিল কয়েকবার। কলেজ ক্যাম্পাসে দু’জনের প্রথম কথা হয়। লেকের ধারে বসে দীর্ঘক্ষণ নিরবতা শেষে তন্দ্রার হাতে সুপ্তর স্পর্শ যেনো একরাশ কথার সজীবতা দিয়ে যায়। তারপর এই সংসার; বিয়ের সময় অবশ্য তার দু’একজন বিবাহিত বান্ধবী পরামর্শ দিয়েছিল দেখিস, পুরুষ মানুষের মন একটু বুঝে শুনে চলিস, সবকথা পুরুষকে বলতে নেই, সবকথা পুরুষের ধাতে সয় না। কথাটি তন্দ্রার মূর্খ সংস্কৃতি মনে হয়, সবকথাই যদি বলা না যায় তবে আর দুয়ের বন্ধন কেন!
ভাবতে ভাবতে রাত্রি দ্বি-প্রহর অতিক্রান্ত হয়েছে, তন্দ্রার চোখে ঘুম নেই, ঘুম আসছেও না। ফলে দোতলার উত্তর দিকের জানালা খুলে দিয়ে সে বড় রাস্তার মৃদু আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এ সময়ও হঠাৎ হঠাৎ মৃদু আলোয় মানুষের আসা-যাওয়া প্রত্যক্ষ হয় আবার কখনও কখনও মালবাহী দু’একটি ট্রাকের গর্জন মনযোগ ভাঙে। এই তো ক্ষাণিক আগে রাস্তার একটি বিড়ালকে চাপা দিয়ে গেছে একটি ট্রাক। ট্রাকের ড্রাইভারটি নিশ্চয়ই একজন মানুষ কিন্তু কেমন মানুষ। এরকম ফাঁকা রাস্তায় কেউ এভাবে বিড়ালটিকে হত্যা করতে পারে, নিজের কাছেই প্রশ্ন করে তন্দ্রা।
সুপ্ত সকালবেলা নাস্তা করে বেরিয়ে গেছে অফিসে, এখনও ফেরেনি। সবেমাত্র তিন-চার মাস অতিক্রান্ত হয়েছে ওদের বিয়েরকাল। এখনি সুপ্তর মন বাইরে চলে গেছে, খুব সাধারণ একজন মেয়ের মতো সেও এইকথা ভাবে। অথচ জীবনটাকে খুব সহজ করে নিয়েছিল সে নিজের মতো। সারাটা জীবন কি তবে এভাবেই কাটাতে হবে, খুব আফসোস হয় তন্দ্রার। তার বিবাহিত বান্ধবীদের কথা মনে পড়ে। ওদের কারও কারও বিয়ের বয়স তিন-চার বছর পেরিয়ে গেছে তবু ওদের স্বামী সম্পর্কে মধুর কথা শোনে নিজেকে দুর্ভাগ্যবতী মনে হয়। তার কষ্টটা বাইরে প্রকাশ করার মতো নয় নিজে কাছে সওয়া ছাড়া। কাকে বলবে সে, সেই একটি ঘটনাই তাকে বারবার অবদমিত করে রাখে। কেন সে এমনটি করেছিল তার আজ কোন যুক্তি খুঁজে পায় না। আজ তো জীবনের মানেই অন্যরকম বোধ হচ্ছে। নিজের কাছেই নিজেকে আরও বেশি অপরাধী মনে হয়। তার কিবা দোষ ওটা তো বয়সজনিত ঘটনা, তাছাড়া সে নিজেও বুঝতে পারেনি কিভাবে ওটা ঘটেছিল। আজ বুঝে, ওরকম আবেগ ও বিশ্বাস কখনও কখনও ভাল নয়। পুরনো স্মৃতি তাকে ভারাক্রান্ত করে, কখন যে অতীতমন্থনে ডুবে যায় তার মন সে নিজেও জানে না। একটি মুখোশ তার দিকে স্পষ্ট হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। সে রাগে, দুঃখে মনে মনে ভাবে মুহূর্তেই আগুন জ্বালিয়ে দেবে মুখোশটির শরীরে, কেন ওভাবে তাকে প্ররোচিত করেছিল।
ক্রমশ মুখোশটি অস্পষ্ট হতে হতে আবার ভেসে ওঠে বান্ধবীদের মুখ। আজ তাদের কথাই সত্যি মনে হয় নইলে সেই ঘটনাটি শোনার পর থেকে সুপ্ত এত মনমরা হয়ে আছে কেন। তন্দ্রার চোখে ঘুম এসে গিয়েছিল, আধোঘুমের লেশলাগা চোখেই সে রাস্তার দিকে তাকায় এবং মুহূর্তেই তন্দ্রালু চোখ ভেঙে দিব্যজগতে ফিরে আসে সে। সুপ্তর আগমন দৃশ্যটি আজ তার কাছে অন্যরকম মনে হয়। সুপ্ত কি আজ মাতাল হয়ে ঘরে ফিরছে। সাধারণত এ অবস্থায় পুরুষরা মদটদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরে। কলিংবেল বেজে ওঠার আগেই সে নিচে গিয়ে দরজা খুলে দেয়, স্বচ্ছ হয়ে ওঠে সুপ্তর মুখ; কান্ত, তন্দ্রালু আর হাজার প্রশ্নের বাণ যেন চোখ বেয়ে নেমে আসে তন্দ্রার দিকে। তার ভীত শরীর হাল্কা গরম আর ভয়ার্ত প্রতিবেশে ঘামতে শুরু করেছে। সুপ্ত কোন কথা না বলে ভেতরে প্রবেশ করে, দরজা বন্ধ করে পেছনে পেছনে দোতলায় ওঠে তন্দ্রা। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে কোট-টাই খুলে সুপ্ত। তন্দ্রার ইচ্ছা হয়, প্রতিদিনের মতো আজো কোট-টাই খুলে দিতে কিন্তু সাহস হয় না। কোন এক অক্টোপাস যেন শীতল করে রেখেছে তার হাত-পা-মুখ। হাল্কা ট্রাউজার পরে বাথরুমে প্রবেশ করে সুপ্ত। ক্ষাণিক পর ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসে কিন্তু তার চোখে-মুখে হাল্কা কান্তির ছাপ রয়ে গেছে, আয়নায় চুল আঁচড়িয়ে বিছানার দিকে যায় এমন সময় কথা ফোটে তন্দ্রার।
টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে, খাবে চল।
খাব না, বলেই সুপ্ত বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। তন্দ্রার রাতের খাবার খাওয়া হয়নি, কথা না বাড়িয়ে সেও বিছানায় গা ছেড়ে দেয়, কিছুক্ষণ ভাবে কিছু জিজ্ঞেস করবে কিনা? তারপর প্রশ্ন করে...
দুপুরে খেতে এলে না যে?
ইচ্ছে হয়নি, সুপ্তর সহজ উত্তর।
ক’দিন যাবত তুমি এমন করছ, কি এমন দোষ করেছি যে...। তন্দ্রার কথা শেষ হতে না হতেই সুপ্তর স্বাভাবিক ঝাঁঝালো স্বর...
দেখ, এই মাঝরাতে কোন সিনক্রিয়েট করতে চাই না। যা হয়েছে তা মামুলি বিষয়, খুবই স্বাভাবিক কিন্তু চেপে রাখা আরও বেশি অস্বাভাবিক। আমাকে তাই করতে হচ্ছে, এরকম বিপাকে পড়তে হবে কোনদিন ভাবিনি আমি। এত রাতে রুমে বাতি জ্বালানো থাকলে, বাবা-মা চলে আসতে পারেন। বাতিটা নিভিয়ে দয়া করে একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও। তন্দ্রা আর কথা বাড়ায় না, ধীরে ধীরে ওঠে বাতিটা নিভিয়ে দেয়। তারপর শেষ রাত্রে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে দু’জন কেউ জানে না।
মন: মনুষ্য ধারাবাহিকতায় একটি জটিল বিষয়। মিরাকল। সে কখন কোথায়-যে যায় তার কোন ঠিকানা নেই। বিড়াল, বারো ঘরের পাতিলের গন্ধ শুঁকে শেষে উগাড়ের ইঁদুর নিয়ে যার রাত্রিবাস। এখানেই জীবনের সম্পর্ক জড়িত, আমাদের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সবখানেই রয়েছে মনোবিত্ত কিংবা নেই। এই আছে ও নেই এর মধ্যে আমাদের আজন্ম বসবাস, এই কথা হয়েছে জানা।
সুপ্ত ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু তন্দ্রার চোখে ঘুম নেই। ঘুম আসছে না। নুসরাত আপুর কথা স্মরণ হয় তার। প্রতিবেশী। বড়বোন শুভ্রার বান্ধবী। বিয়ের কিছুদিন পর হঠাত একদিন বাড়ির বাঁশঝাড়ে গলায় দড়িবেঁধে আত্মহত্যা করলো সে। সবাই অবাক, নুসরাত এরকম করলো কেন? পরে, বাড়ির লোকজনের কানাঘুঁষায় আসল ঘটনাটি জেনেছিল তন্দ্রা। নুসরাত তখন হাইস্কুলের ছাত্রী। ওদের বাড়িতে একজন গৃহশিক্ষক থাকতো। এই শিক্ষকের সাথেই বাড়ির সকলের অজান্তে নুসরাতের প্রেমের সম্পর্ক হয়ে যায়। সম্পর্ক এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একে-অপরের দেহদানে সঠিক হিসেবের অবকাশ হয়নি কারোর। একসময় অসতর্ক নুসরাত সন্তান সম্ভবা হয়ে যায়। ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে বাড়ির লোকজন জেনে গেলে কোন একরাতে নুসরাত-কে স্থানিয় এক হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এবোরশন করিয়ে আনে। ঘটনাটি প্রতিবেশী কেউ বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির লোকজন ওই গৃহশিক্ষক-কে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দেয়।
তার বছর পাঁচেকের মধ্যেই বিয়ে হয় নুসরাতের। বিয়েরাতেই বরের কাছে ঘটনাটি জানিয়ে দিয়েছিল নুসরাত। ঘটনাটি জানার পর ওর বর আর তাকে বউ হিসেবে রাখতে চায়নি। ফিরতি নাইয়রের নামে নুসরাত-কে বাড়ি রেখে গিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয় ওর বর। অসহায় নুসরাত ভেবে কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে শেষমেষ গলায় দড়ি বেধে আত্মহত্যা করে।
শুভ্রাকে মানুষ বলে মনে হয় না তার। ওইরকম সময়েই তো অহনের সাথে তন্দ্রার অনেকটা প্রেমের মতোই ঘটনাটি ঘটেছিল। অহন শুভ্রার ভাসুরের ছেলে। সুদর্শন যুবক। ওইরাতের ঘটনাটি মনে পড়ে তন্দ্রার। শুভ্রার শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। রাতে তন্দ্রা আর অহন একসাথে ছিল। ছেলেটা খুব পাগল, অস্থির আর উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল। তন্দ্রা নিজেও খুব সম্মোহিত আর চড়ম লোভী হয়ে ওঠেছিল সে রাতে। ভাবতে ভাবতে খুবই লজ্জাক্রান্ত হয় তন্দ্রা। ঘুমন্ত স্বামীকে পাশে রেখে এসব ভাবতে ভালো লাগে না তার। তাছাড়া তার চিন্তা ঘুমন্ত সুপ্ত আবার টের পেয়ে যাচ্ছে নাতো! সে রাতের নিজস্ব আলোয় সুপ্তর দিকে তাকায়। সুপ্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। ফ্যানের হালকা বাতাসেও সুপ্তর শরীর মৃদু ঘর্মাক্ত। নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু জলের স্থির সন্তরণ। জনশ্রুতির কথাটি মনে হয় তার। যে পুরুষের নাক বেশি ঘামে সে পুরুষ খুব বউ-আদরের হয়। সুপ্তকে আদর করতে ইচ্ছে হয় তার কিন্তু পারে না। ঘুমন্ত স্বামীকে আদর করে দিতে কেমন যেন গর্হিত অপরাধবোধ আটকে রাখে তাকে। মনে ভাবে, সুপ্তর মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে ওঠলে ওকে ইচ্ছেমতো আদর করে প্রমাণ করবে জনশ্রুতির কথাটি আসলেই ঠিক।
অন্ধকারের আলোতেই মুখোশটির অস্তিত্ব টের পায় তন্দ্রা। মুখোশটি তার চারপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে আর প্ররোচিত করতে থাকে। পালিয়ে যা তন্দ্রা, পালিয়ে যা, দূরে কোথাও। নইলে শান্তি পাবি না। পালাবার এখনই সময়। তন্দ্রা ভাবে সত্যি সত্যি সে পালিয়ে যাবে কিনা। গেলে কেমন হয়? একেবারে অজানায়, দূরে, অনেক দূরে। নুসরাতের কথা মনে হয় তন্দ্রার। তারমতো সেও কী দূরে কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করবে নাকি। আবার ভাবে আত্মহত্যা করবে কেন? সে সুপ্তকে ভালোবাসে আর সুপ্তও তাকে, তাই তার আত্মহত্যা করা ঠিক হবে না। অস্থির হয়ে ওঠে তন্দ্রা, তার শরীরও ঘামতে থাকে। মুহূর্তেই সে মুখোশটিকে ধরে ফেলতে চায় কিন্তু ধরতে পারে না। অন্ধকারেই মুখোশটি একবার তার পাশে আসে... একবার সোফায় গিয়ে বসে... একবার সুপ্তর কম্পিউটার টেবিলে গিয়ে বসে... একবার জানালার পাশে দাঁড়ায়... একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়... মুখোশটিকে সে যেন কিছুতেই ধরতে পারে না। ঘর্মাক্ত তন্দ্রা বিছানা ছেড়ে টেবিলের দিকে যায়। জগভর্তি পানি থেকে একগ্লাস পানি খায় সে। তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। নির্জন রাস্তায় স্ট্রিট লাইটের ২৫০ ভোল্ট বাতির মৃদু আলো আর ট্রাকচাপায় থেতলে যাওয়া বিড়ালটিকে দেখতে থাকে সে।
সকালে নাস্তার টেবিলে দুজনেই চুপচাপ থাকে যেন একে-অপরকে কেউ চেনে না। অন্যান্য দিন তন্দ্রা নিজ হাতে ব্রেড-এ জেলি মেখে খেতে দিয়েছে কিন্তু আজ দিচ্ছে না, নিজেও নিচ্ছে না। হঠাত সুপ্ত উত্তেজিত হয়ে কোনো সিনক্রিয়েট করে ফেলে সেই ভয়। তন্দ্রা কী রাতে ঘুমিয়েছিল? বোধ হয় না, ওর চোখ দেখে বোঝা যায়। হয়তবা রাতে কেঁদেও ছিল। নাস্তা সেরে সুপ্ত রমে ফিরে অফিস যাবে বলে প্রস্তুত হয়েছে, এমন সময় তন্দ্রা এসে সামনে দাঁড়ায়।
তোমার সাথে কথা আছে।
বল, সুপ্ত’র উত্তর।
আমি বাড়ি যাব।
এবার সুপ্ত মনযোগী ভঙ্গিতে আরেকটু সামনে এগিয়ে তন্দ্রার মুখোমুখি হয়।
এখানে কী খারাপ লাগছে? হেভ য়্যু ফিল বোরিং হিয়ার!
এমন একটি সিরিয়াস বিষয়ে সুপ্ত’র হেয়ালিপনার অর্থ তন্দ্রা বুঝতে পারে না, সে উত্তরহীন তাকায়।
ওকে, ওকে ইফ য়্যু ফিল বোরিং অর ডিজগাস্টিং দেন য়্যু কেন গো বাট নট উইদাউট মি। আই ওয়ান্ট টু গো উইথ য়্যু ফর রিচড্ এন্ড এ পিচফুল এরেঞ্জমেন্ট ফর য়্যু দেয়ার। হেভ য়্যু আন্ডারস্ট্যান্ড ডেয়ার অনারেবল মেডাম। এই বলে তন্দ্রার মুখটা দু’হাতে একটু উঁচিয়ে ধরে নিজের খুব কাছাকাছি এনে সম্মোহনের মতো তাকায় সুপ্ত। তন্দ্রা কিছু বুঝতে পারে না, সে সুপ্তর দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথম দিনের মতো, মহাজাগতিক জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে। ফাঁকে, কখন যে সুপ্ত তার ওষ্ঠে একটা চুম্বন দৃশ্য এঁকে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়, ঠাহর হয় না তন্দ্রার।
বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে গ্রামের মেয়েরা যে রকম বৃষ্টিতে ভিজে সজীবতা উপভোগ করে, তন্দ্রাও সেই সজীবতা ফিরে পায়। বুঝতে পারে, কী ভুলটাই না সে করতে বসেছিল। মতিভ্রমে মানুষের এরকমই হয়। তার মুখে তখনও ভাষা ফুটেনি, ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে সুপ্তকেও সে একটি চুম্বন করে আসে কিন্তু পারে না, প্রথম দিনের মতো বহুকালের অচেনা বোধ কাজ করে। আজন্ম নারীজনমের লজ্জাবোধ তাকে আটকে রাখে।
অফিসে ফিরেই সুপ্ত নিশ্চিত টেলিফোন করবে, তন্দ্রা জানে। তাই রুমেই থাকে, এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে, বই পড়ে, টেলিভিশন অন করে কিন্তু ভালো লাগে না, সিডি প্লেয়ার অন করে লোপামুদ্রা মিত্রের গান শোনে ‘ছেলেবেলার বৃষ্টি মানেই আকাশজোড়া...’ গরম পড়েছে তবু এই গান খারাপ লাগে না; স্মৃতিমন্থন হয়। ফ্যানটা ছেড়ে সে উত্তরের জানালাটা পুনরায় খুলে দেয়। খুলতে খুলতে মনে পড়ে বড় রাস্তায় গতকাল রাতে একটি বিড়াল ট্রাকচাপা পড়েছিল। তার থেতলে যাওয়া চিহ্ন এখনও স্পস্ট হয়। বিড়ালটির কোনো দোষ ছিল না, সেই ভ্রুণটিরও... পুনরায় তার সেই ছায়াটির কথা মনে হয় কিন্তু দিনের শ্বেতশুভ্র আলোয় তাকে দেখতে পায় না সে। তন্দ্রা জানে এবার যদি তাকে সামনে পায় সে নিশ্চিত গলাটিপে হত্যা করবে।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ