প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label বাংলাদেশ. Show all posts
Showing posts with label বাংলাদেশ. Show all posts

Monday, February 20, 2012

২১ ফেব্রুয়ারীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 
[বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এদেশের ছাত্রসমাজ যে এত বড় বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছে ঐতিহাসিকদের মতে সেই ছাত্র রাজনীতির সূত্রপাত ১৮৩০ সালে। রাজনীতির উত্থান-পতনের রেখা ধরেই অদ্যবধি প্রবহমান ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৫২ সাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা নাম, যা নিজ মহিমায় এতই উজ্জ্বল যে বুদ্ধিজীবীদের মতে ২১ ফেব্রুয়ারী আমাদের অঘোষিত স্বাধীনতা দিবস। ২১ ফেব্রুয়ারীর ‘ভাষা আন্দোলন’ এর আবেদন এতই ব্যাপক যে এখনও প্রতিক্রিয়াশীলগোষ্ঠী সোচ্চার এর বিরুদ্ধে। আর আমরা বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা যারা ঘুমিয়ে আছি এই অন্ধকার সময়ের ভিতর কিংবা যারা অর্ধসচেতন বা সচেতনভবে খুঁজে ফিরি মুক্তির পথ তাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে ভাষা আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক গৌরবগাঁথা। ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণে প্রয়োজন সঠিক ইতিহাস জানা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তথা যে কোন আন্দোলনের ইতিহাস জানার জন্য অবশ্যই জানার প্রয়োজন পড়ে আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতি, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং সমসাময়িক অন্যান্য রাজনীতি যা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয। তথাপি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানার মাধ্যমে আমরা জানার চেষ্টা করবো ভাষা আন্দোলনের বিশাল ইতিহাসকে; সে লক্ষ্যেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থানের চেষ্টা। ]

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাতঃ
পাকিস্তানের জন্মের তিন মাস পর করাচীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা গণ্য করার এক সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সংবাদ পরদিন ঢাকার ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তীব্র বিক্ষোভ সঞ্চারিত হয়। ঐদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সাধারণ ছাত্রসভা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আশেপাশের অন্যান্য কলেজের ছাত্রছাত্রী। সমাবেশের পর এক বিরাট মিছিল সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ববাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা বিষয়ে একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন সেখানে বলা হয় উর্দু ও ইংরেজীর সঙ্গে বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হোক। ২৫ ফেব্রুয়ারী আলোচনা শেষে গণপরিষদের মুসলিম লীগের বাঙালি সদস্যরা বাংলাকে পরিষদের রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ভোট দেয়। সেই খবরে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ২৬ ফেব্র“য়ারী ঢাকায় ধর্মঘট পালন হয়। ২ মার্চ ঢাকায় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভায় গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। পরিষদের ডাকে ১১ মার্চ হরতাল পালন হয?। ১১ মার্চে ছাত্র জনতার উপর প্রশাসনিক গুন্ডা বাহিনীর নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদের ১২ মার্চ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ এবং ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন হয়। ১৪ মার্চ সারা পূর্বপাকিস্তানে ধর্মঘট পালন হয়। ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে নাজিম উদ্দীন ৮ দফা চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন।

ঢাকার বাইরে প্রতিক্রিয়াঃ
২৬ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় ধর্মঘট পালনের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সারা দেশে ভাষা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র ফেডারেশন, মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র এসোসিয়েশন, ছাত্র সংঘ, যুবলীগ প্রভৃতি সংগঠনের উদ্যোগে জেলায় জেলায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হতে লাগল।

* ২৮ তারিখ পাবনায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা রাস্তায় মিছিল করে এবং পুলিশের বেয়নেট চার্জে প্রথমবারের মত রঞ্জিত হয় পাবনার রাজপথ।
* ২ মার্চ যশোরে ধর্মঘট পালিত হয়। ১০ মার্চ শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। ১১ মার্চ যশোরে বিশাল মিছিল হয়। ১২ মার্চ কলেজ ছাত্র ধর্মঘট, ১৩ তারিখে মিছিলে পুলিশ প্রথমে লাঠি চার্জ ও পরে গুলি বর্ষণ করে। ঘটনার প্রতিবাদে ১৪ মার্চ আবার হরতাল পালন করা হয়।
* রাজশাহীর নওগাঁতে ২৭ ফেব্রুয়ারী ব্যাপক ছাত্র সমাবেশ ঘটে। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১১ মার্চ বিক্ষোভ চলাকালে মিছিলের উপর হামলা হয়।
* চাঁদপুরে ধর্মঘট ডাকা না হলেও স্বতস্ফূর্তভাবে পালিত হয়।
* মুন্সিগঞ্জে২৮ ফেব্রুয়ারী বিক্ষোভ মিছিল হয়।
* ১১ মার্চ বগুড়ায় বগুড়ায় কলেজ থেকে মিছিল বের হয়।
* খুলনায় ২৮ ফেব্রুয়ারী বি.এল কলেজে প্রতিবাদ সভা হয়। ১১ মার্চ আন্দোলন তীব্র আকার ধারন করে।
* ২৭ ফেব্রুয়ারী বরিশালে বিশাল জনসভা হয়।

জিন্নাহর ঢাকা আগমনঃ
১৬ মার্চ ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জিন্নাহর আগমনে ছাত্র জনতার ভিতর স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। তারা আশা করেছিল জিন্নাহ হয়তোবা পূর্ববাংলার সাম্প্রতিক ঘটনায় জনগণের পক্ষেই থাকবে। ১৯ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ ঘোষণা করেলেন-
“..কিন্তু না আপনাদের পরিষ্কার ভাবে বলে দেয়া দরকার পাকিস্তানের রাষ্টভাষা হবে উর্দু, অন্যকোনো ভাষা নয় । এ ব্যাপারে কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে সে হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু।”
এই বক্তৃতা তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও বিক্ষোভ হয় বিচ্ছিন্নভাবে। এরপর ২৪ মার্চ সকালে জিন্নাহর সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সমাবর্তনে জিন্নাহ যখন আবার বলেন “উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”; তখন মিলনায়তনে উপস্থিত বেশ কিছু ছাত্র একসঙ্গে না, না বলে উঠে। এই দিনে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি দলের সাথে জিন্নাহর নির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাকে অপমান করা হয় এবং আলোচনা আর এগোয়নি।
আরবী হরফে বাংলা লেখার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হলেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডে এক সভায় বলেন-
“সহজ ও দ্রুত যে হরফের মারফত ভাষা পড়া যায় সেই হরফই সবচাইতে ভাল। সুতরাং দ্রুত লিখন ও পঠনের পক্ষে সুবিধাজনক বলিয়া আরবীকেই পাকিস্তানের হরফ করা উচিত।”
এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় প্রথম প্রতিবাদ ওঠে। ১২ মার্চ পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপনা পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় অধিবেশন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবী হরফ চাই না’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত ছাত্র মিছিল পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সেখানে গ্র্রেপ্তার হয় বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা।
১৯৫০ সালের ১১ মার্চ দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সমর্থক প্রতিটি সংগঠন থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সাদামাটা অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্যভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ‘আরবী হরফে বাংলা ভাষা’ নিয়ে বিতর্ক, প্রতিবাদ চলতে থাকে অথচ সরকার তা উপেক্ষা করে ১৮ এপ্রিল ১৯৫০ সাল থেকে পূর্ববাংলার বিভিন্ন জেলায় ২০ টি কেন্দ্রে আরবী হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়ষ্কদের প্রাথমিক শিক্ষার কাজ শুরু করে দেয়। একদিকে শিক্ষাখাতে পূর্বপাকিস্তান ছিল বিশাল বৈষম্যের শিকার অন্যদিকে চলে ভাষা ও বর্ণমালা বিলুপ্তকরণ প্রক্রিয়া।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই পালন করা হয় ১১ মার্চ ও ১২ মার্চ তারিখটি।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারী পল্টনে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, -” পাকিস্তানের ‘একমাত্র’ রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু”.
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ৩০ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এ প্রতিবাদ ধর্মঘটের আয়োজন করে। ৩১ জানয়ারী বিকেলে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সমাবেশে সর্বসম্মতভাবে গঠিত হয় “সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ”। ৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট, শোভাযাত্রা এবং জনসভার আয়োজন এবং অর্থ সংগ্রহের জন্য ১১ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে প্রায় ৪ হাজার ছাত্রছাত্রীর একটি দীর্ঘ বিক্ষোভ মিছিল। ২১ ফেব্রুয়ারী সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালনের ঘোষনা দিয়ে শেষ হয় মিছিল পরবর্তী জনসভা।
১১ ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস পালন হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করা হয়। বের করা হয় দুটি পুস্তিকা, ‘আমাদের ভাষার লড়াই’-বদরুদ্দিন উমর এবং ‘রাষ্ট্রভাষা কি এবং কেন?”-আনিসুজ্জামন।
২১ ফেব্রুয়ারী হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। আর সরকার ২০ তারিখ সন্ধ্যা ৬টায় ক্রমাগত একমাসের জন্য ঢাকায় সকল প্রকার সভা, সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ তারিখ ছিল পূর্ববাংলা সরকারের বাজেট অধিবেশন।
সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে সর্বদলীং সংগ্রাম পরিষদ বৈঠকে মিলিত হয় সভায় তুমুল বাক-বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটে। অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেন এই কারণে যে, এর ফলে সরকার জরুরী অবস্থার অজুহাতে সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্তের জন্য ভোট দেন। মাত্র তিন জন বাদে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সকল সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে ভোট দেয়। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ আরো সিদ্ধান্ত নেয় যে, পরিষদের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার যৌক্তিকতা বুঝানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু ছাত্ররা যদি মেনে না নেয় তবে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি তখন থেকেই বিলুপ্ত হবে।
২১ ফেব্রুয়ারী সকালে ১৪৪ ধারা ও পুলিশের মহড়া উপেক্ষা করে দলে দলে শহরের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে থাকে। ছাত্ররা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে বিক্ষুদ্ধ হয়ে নানা রূপ ধ্বনি দিয়ে শামসুল হককে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্তে ৪ জন, ৭জন, ১০ জন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে জমায়েত হলো মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণে। কমপক্ষে ১০ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী গ্রেপ্তার, লাঠচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ইত্যাদির মধ্যদিয়ে পরিষদ ভবন ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে জমায়েত হয় মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে; বেলা ৩ টায় পরিষদ ভবনের অধিবেশনের পূর্বেই ছাত্র পুলিশ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকবার ছাত্রদের উপর কাঁদুনে গ্যাস ছেড়ে তাড়া করতে করতে পুলিশ মেডিকেল কলেজে ছাত্রাবাসের ভিতর ঢুকে পড়ে। প্রতিরোধকল্পে ছাত্ররাও ইটপাটকেল সমেত ঝটিকা আক্রমন করে। আক্রমনের প্রচণ্ডতায় দিশেহারা হয়ে আনুমানিক বেলা চারটার দিকে পুলিশ মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে গুলি চালায়। এই গুলি জব্বার ও রফিকের প্রাণ কেড়ে নেয়। এই গুলির আওয়াজ শুনে মেডিকেল কলেজ ছাত্রবাসের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন বরকত, একটি বুলেট তার ঊরুদেশ বিদ্ধ করে প্রচুর রক্তপাতের পর রাত আটটায় বরকত মারা যায়।

২১ ফেব্রুয়ারী যাঁরা শহীদ হলেন-
* সালাউদ্দীন (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)
* আব্দুর রাজ্জাক (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)
* আবুল বরকত(বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)
* রফিক উদ্দীন (বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র)

ইতোমধ্যে গুলি চালানোর খবর শহরের আনাচে কানাচে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অফিস আদালত সচিবালয় এমনকি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের কর্মচারীরা পর্যন্ত অফিস বর্জন করে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। ১৪৪ ধারার লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া গেল না। আইন পরিষদের অধিবেশনে ঝড় ওঠে। আন্দোলনের নেতৃত্বে চলে আসে মেডিকেল কলেজ। ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ পুনঃগঠিত হয?। ২২ তারিখ হরতাল ও গায়েবানা জানাযার কর্মসূচী ঘোষিত হয়।
মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ভিতরে গায়েবি জানাযা পড়া হয়। সমস্ত শহর থেকে পুলিশ উঠিয়ে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। রেল কর্মচারীরা ধর্মঘট করে, সচিবালয়ের কর্মচারীরা দলে দলে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে আসে। জানাযা শেষে সর্বস্তরের মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নিলে সেনাবাহিনী বাধা দেয়। বাধা ডিঙ্গিয়ে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হাইকোটের সামনে আবার গুলি হয়। এতে মিছিলে অংশগ্রহনকারী সরকারি কর্মচারী শফিকুর রহমান নিহত হন (তিনি আইনেরও ছাত্র ছিলেন)। জনতা বংশালের দিকে অগ্রসর হলে আবারও গুলি চালানো হয়; এতে একজন নিরীহ রিক্সাওয়ালা নিহত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারী সংবাদ পত্রে ৫জন নিহত, ১২৫ জন আহত, ৩০ জন গ্রেফতার সহ লাশ গায়েব করার নিন্দা করা হয় ঐদিনই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় ২৫ ফেব্রুয়ারী প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
২৫ ফেব্রুয়ারী সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করে। সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য হয়।
১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ২১৪ নং অনুচ্ছেদ ছিল-
২১৪-(১) the state language of Pakistan shall be Urdu and Bengali.


যাঁদের কাছে কৃতজ্ঞঃ
ডঃ মোহাম্মদ হাননান-বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ।
আসাদুজ্জামান আসাদ-স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি।
জহির রায়হান-একুশে ফেব্রুয়ারী।
পোস্ট আকারে সাজিয়েছেনঃ
ইশতিয়াক।
পোস্টটি সাহিত্য.কম এ প্রকাশিত।

Friday, December 16, 2011

অন্য এক প্রধান পুরুষ || শাহ আহমদ রেজা

আওয়ামী লীগ সরকার দাপটের সঙ্গেই জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘সঠিক’ ইতিহাস শিখিয়ে চলেছে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, সরকারের এই ‘সঠিক’ ইতিহাসের সবটুকু কৃতিত্ব চলে গেছে একজন মাত্র নেতার দখলে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে ‘সঠিক’ ইতিহাস কিন্তু সরকারের উদ্ভট এ চেষ্টাকে বাতিল করে দেয়। একটি উদাহরণ হিসেবে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা যায়। স্বায়ত্তশাসনের পর্যায়ক্রমিক যে আন্দোলন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল, মওলানা ভাসানী ছিলেন তার প্রধান নির্মাতা। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাকও তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন (৩০ নভেম্বর, ১৯৭০)। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাঁর সন্তোষের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার পর কোনো কোনো নামকরা নেতার মতো গ্রেফতার বরণের নিরাপদ পন্থা নেয়ার পরিবর্তে তিনি ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন (১৫ এপ্রিল, ১৯৭১)। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাঁকে অঘোষিতভাবে নজরবন্দি রাখলেও বিবৃতি ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে তিনি জনগণের প্রতি স্বাধীনতা যুদ্ধ এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বংলাদেশকে সমর্থন করার ও স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে তারবার্তা পাঠিয়েছেন।
কলকাতায় গঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো এবং ওই সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের একটি অংশের ও তত্কালীন মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র নস্যাত্ করে দেয়া ছিল মওলানা ভাসানীর বিশেষ অবদান। মুজিবনগর সরকার তাঁকে উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি বানিয়েছিল এবং সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত পরিষদের একমাত্র সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। অর্থাত্ ১৯৫০-এর দশকে সূচিত স্বায়ত্তশাসনের প্রাথমিক আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ‘সঠিক’ ইতিহাসে তাঁর স্থান হয়নি।
মওলানা ভাসানীর পর দ্বিতীয় একজন প্রধান নেতা হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের কথা উল্লেখ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তাজউদ্দীন আহমদ না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এত সুসংগঠিত হতে এবং এত অল্প সময়ে বিজয় অর্জন করতে পারতো না। স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকার গঠন থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও ভারতের সহযোগিতা নিয়ে দেশকে স্বাধীন করা পর্যন্ত সমগ্র কর্মকাণ্ডে প্রধান এবং সফল নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখার এবং অন্য সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা আদায়ের ক্ষেত্রেও তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। মুক্তিযোদ্ধাদেরও তিনিই সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। এই ভূমিকার জন্যই যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের অবদানের কথা স্মরণ করা দরকার। কারণ ‘সঠিক’ ইতিহাস হলো, স্বাধীনতা কারও ঘোষণা শুনে আসেনি। জনগণও কারও ঘোষণা শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল যে অস্থায়ী ‘মুজিবনগর’ সরকার, সে সরকারও হঠাত্ করে গঠিত হয়নি।
১৯৭১ সালের মার্চের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কম-বেশি সবারই জানা রয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণের একেবারে শেষ বাক্যে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলার পরও প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। ১৬ মার্চ থেকে ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কোনো পর্যায়েও শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করেননি। তিনি বরং তার ৭ মার্চের চার দফা দাবি অনুযায়ী সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জবাবে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, সংবিধান প্রণয়নের আগে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলে আইনগত শূন্যতা ও জটিলতার সৃষ্টি হবে। এই পর্যায়ে শেখ মুজিবের প্রস্তাবে ১৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে মুজিব-ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং ইয়াহিয়া খানের পক্ষে লে. জেনারেল শরীফ উদ্দিন পীরজাদা, বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস ও কর্নেল হাসান এসব বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। প্রথম বৈঠকে আইনগত শূন্যতা ও জটিলতার প্রশ্নে পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা আদেশ জারি করতে পারেন, যা সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং সংবিধান গৃহীত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কে আইনসম্মত করবে।
জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ১৭ মার্চের একান্ত বৈঠকে নতুন এক প্রস্তাবে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের’ জাতীয় পরিষদ সদস্যরা প্রথমে পৃথক পৃথক অধিবেশনে মিলিত হয়ে দুই অঞ্চলের জন্য দু’টি সংবিধান রচনা করবেন এবং পরে এক যৌথ অধিবেশনে ওই দুটির ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হবে। প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছিলেন, যে ঘোষণাকে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও নতুন সংবিধান গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। দু’পক্ষের ১৭ মার্চের বৈঠকে এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া তৈরি করার আগে উভয় পক্ষের আইন উপদেষ্টারা শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক যৌথ বৈঠকে মিলিত হবেন। ১৯ মার্চ আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। শেখ মুজিব নিজেও বলেছিলেন, কোনো ‘অগ্রগতি না হলে’ তিনি কি শুধু শুধু আলোচনা চালাচ্ছেন?
২০ মার্চ শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খান নিজেদের উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ঘোষণায় তিনটি মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হবে—(১) সামরিক আইন প্রত্যাহার, (২) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর
এবং (৩) পূর্বাঞ্চলীয় অংশের (‘পূর্ব পাকিস্তান’) জন্য ব্যাপকভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা। উভয় পক্ষ এ ব্যাপারে বিশিষ্ট আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এ কে ব্রোহীর অভিমত নিতে সম্মত হন। পরদিনই এ কে ব্রোহী এক লিখিত অভিমতে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে ঘোষণা জারি করলে আইনগত শূন্যতার সৃষ্টি হবে না এবং আইনসম্মতভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে।
২১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া আওয়ামী লীগের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এই খসড়ায় ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের’ জাতীয় পরিষদ সদস্যদের পৃথক পৃথক অধিবেশনের প্রস্তাব ছিল। খসড়ার অন্য এক প্রস্তাবে বলা হয়, প্রদেশগুলোতে মন্ত্রিসভা শপথ নেয়ার দিন থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহৃত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। আওয়ামী লীগ খসড়া ঘোষণাটিকে ‘অসম্পূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে দু’টি প্রশ্নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছিল—(১) প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটি অবিলম্বে প্রচার করতে হবে; এবং (২) যেহেতু মন্ত্রিসভা গঠনে বিলম্ব ঘটতে পারে, সেহেতু প্রদেশগুলোতে নতুন গভর্নর নিযুক্তি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অথবা প্রেসিডেন্টের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার সাতদিনের মধ্যে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।
২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউসে আগের দিন ঢাকায় আগত জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে শেখ মুজিবের সাক্ষাত্ হয়েছিল। শেখ মুজিব তার প্রস্তাব মেনে নেয়ার জন্য ভুট্টোকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রের আগে প্রদেশগুলোতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সামরিক আইন প্রত্যাহারের প্রশ্নে ভুট্টো বলেছিলেন, তেমন কোনো আয়োজন বা সমঝোতা অনুমোদনের জন্য হলেও প্রথমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতারা ২২ মার্চ সারাদিন সারারাত প্রেসিডেন্টের ঘোষণা চূড়ান্ত করার কাজে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছিলেন। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ঘোষণার খসড়া পৌঁছে দিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত উপদেষ্টাদের বৈঠক শেষ হয়েছিল কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া। ২৪ মার্চের সর্বশেষ বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেশের নাম ‘কনফেডারেশন অব পাকিস্তান’ রাখার নতুন এক প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। ইয়াহিয়ার পক্ষ এতে তীব্র আপত্তি জানায়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টারা বিষয়টি শেখ মুজিব এবং ইয়াহিয়া খানের ওপর ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব তোলেন এবং ঘোষণার অন্য দিকগুলো নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দেন। কিন্তু সান্ধ্য বৈঠকে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদের জানানো হয়, ইয়াহিয়ার প্রতিনিধিরা আগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরে আওয়ামী লীগকে অবহিত করবেন। জেনারেল পীরজাদা জানিয়েছিলেন, তিনি পরদিন অর্থাত্ ২৫ মার্চ ‘কোনো এক সময়’ ড. কামাল হোসেনকে টেলিফোনে জানাবেন, কখন তারা আবার বসবেন এবং কবে প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটি প্রচার করা হবে।
এভাবেই মুজিব-ইয়াহিয়া এবং তাদের উপদেষ্টাদের মধ্যকার সমঝোতা অলোচনার সমাপ্তি ঘটেছিল। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতারা ২৫ মার্চ সারাদিন অপেক্ষায় কাটিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল পীরজাদা কোনো টেলিফোন করেননি, প্রচারিত হয়নি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সেই ঘোষণাটিও। অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে ড. কামাল হোসেন লিখেছেন, ‘আমি যখন (২৫ মার্চ) রাত ১০টা ৩০ মিনিটে শেখ মুজিবের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নেই, তখনও তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তেমন কোনো টেলিফোন আমি পেয়েছি কি না। আমি তাকে জানিয়েছি, আমি কোনো টেলিফোন পাইনি।’ (ড. কামাল হোসেনের বিবরণী, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’, ১৫শ খণ্ড, পৃ-২১০-২৭৮)। এখানে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের বিবরণীও উল্লেখযোগ্য। তিনি জানিয়েছেন, শেখ মুজিব তখন রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। জেনারেল পীরজাদার টেলিফোন না আসার কথা জেনে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম অনুরোধ করলেও শেখ মুজিব তাদের সঙ্গে যেতে রাজি হননি। এর পরের ঘটনাক্রম জানাতে গিয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৫ মার্চ রাত ১০টার পর শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে তিনি এবং ড. কামাল হোসেন গিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের ধানমন্ডির বাসভবনে। তারা যাওয়ার পরপর ইপিআরের একজন হাবিলদার এসে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কায় ইপিআরের সব বাঙালি সদস্য পিলখানা থেকে বেরিয়ে পড়েছে। এ কথা শুনেই তাজউদ্দীন আহমদ তাদের দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পথে কামাল হোসেন ধানমন্ডির চার নাম্বার রোডের একটি বাসায় ঢুকেছিলেন দেয়াল টপকে। অন্যদিকে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ পা বাড়িয়েছিলেন ভারতের দিকে। (দেখুন ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’, ১৫শ খণ্ড)। লক্ষণীয়, রাত ১০টার মধ্যে ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার তথ্যটি কিন্তু পিলখানা থেকে ট্রান্সমিটারযোগে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের দাবিকে অসত্য প্রমাণ করে। তাছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকসহ ২৬ মার্চের দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, শেখ মুজিব ২৭ মার্চ হরতালের ডাক দিয়েছেন।
প্রধান নেতা শেখ মুজিবের দিক থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় এর পরের প্রতিটি পদক্ষেপ তাজউদ্দীন আহমদ নিয়েছিলেন একক সিদ্ধান্তে। বিভিন্ন পর্যায়ে রীতিমতো ইন্টারভিউ দিয়ে ভারতীয়দের কাছে তাকে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, তিনিই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়েছিল (৩ এপ্রিল, ১৯৭১)। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং নিজেকে প্রধানমন্ত্রী করে ১০ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছিলেন। জাতির উদ্দেশে তার একটি ভাষণও প্রচার করেছিল ভারত সরকার। ১০ এপ্রিল গঠিত সরকারই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় এসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করেছিল। সেদিন থেকে বৈদ্যনাথতলার নাম হয়েছে মুজিবনগর।
‘সঠিক’ ইতিহাসের মূল্যায়নে সময়োচিত ও দিক-নির্ধারণী হিসেবে প্রমাণিত হলেও ভারতে চলে যাওয়া থেকে সরকার গঠন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেয়াটা তাজউদ্দীন আহমদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। প্রতি পদক্ষেপে তাকে বরং বাধাগ্রস্ত, সমালোচিত এবং প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। একক সিদ্ধান্তে তিনি এমন এক সময়ে সরকার গঠন করেছিলেন, যখন আওয়ামী লীগের সব নেতাই ছিলেন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এবং পলায়নরত। শেখ মুজিবের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তাজউদ্দীন আহমদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন অনেকেই। শেখ ফজলুল হক মনি, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দাবি তুলেছিলেন। তাদের সঙ্গে উস্কানিদাতার ভূমিকায় নেমেছিলেন সেকালের ‘মস্কোপন্থী’রা—মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রমুখ। কিন্তু একদিকে তাজউদ্দীন আহমদের নিজের নিষ্ঠা, সততা ও নিখাদ দেশপ্রেম এবং অন্যদিকে জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীর সমর্থন তাকে রক্ষা করেছিল। এ জন্যই তাজউদ্দীন আহমদের পক্ষে সাফল্যের সঙ্গে সরকার পরিচালনা করা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের ‘সঠিক’ ইতিহাসে স্থান না পেলেও দেশপ্রেমিক নেতা তাজউদ্দীন আহমদেরও ছিল দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস। তাকে শেখ মুজিবের চাটুকারিতা করতে দেখা যায়নি, বাকশালেও যোগ দেননি তিনি। এটাই অবশ্য তাজউদ্দীন আহমদকে ‘সঠিক’ ইতিহাসে স্থান না দেয়ার একমাত্র কারণ নয়। আসল কারণ আওয়ামী লীগের ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোভাব—যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া অন্য কারও অবদানের স্বীকৃতি দেয়ার উপাদান নেই। 
সূত্র : আমার দেশ

বাংলাদেশের চল্লিশ বছর || মাহফুজ উল্লাহ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পূর্তিতে একটি বিষয় সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। বিষয়টি হচ্ছে এই রাষ্ট্রের চল্লিশ বছরের অস্তিত্বে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি। প্রত্যাশার হিসাব মেলানোটা হয়তো সহজ, কিন্তু প্রাপ্তির হিসাবটা অত্যন্ত জটিল। কেননা, বিগত চার দশকে যেসব রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল, তার মধ্যে প্রধান দু’টি দলের অবস্থান প্রায় বিপরীতমুখী। তারা তাদের মতো করে দেশকে নির্মাণ করতে চেয়েছে এবং এই অবস্থানের মধ্যে ঐকমত্য খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম কেন হয়েছিল, সে বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু এ রাষ্ট্রের লক্ষ্য সম্পর্কে সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রত্যাশা সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ঘোষিত হয় সেখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘আমরা আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, জাতিমণ্ডলীর (জাতিসংঘ) সদস্য হিসেবে আমাদের ওপর যে দায় ও দায়িত্ব বর্তাইবে উহা পালন ও বাস্তবায়ন করার এবং জাতিসংঘের সনদ মানিয়া চলার প্রতিশ্রুতি আমরা দিতেছি।’ একই ঘোষণায় তত্কালীন নেতারা বাংলাদেশের জনগণকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও ন্যায়ানুগ সরকার প্রদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অন্য সব কার্য করার অঙ্গীকারও করেছেন। অবশ্য সংবিধান সংশোধনের পর সংশোধিত সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে যা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে জনগণকে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ভিন্ন অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি। এই স্বাধীনতার কথিত ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার বাইরেও আরও কিছু আকাঙ্ক্ষা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তাদের স্বপ্নের রাজ্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে। অথচ এই জনপদের মানুষেরাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ইংরেজ শাসনে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত মুসলমানরা বিত্তবান হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। এই সুযোগের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্তরা, বৈষম্যের শিকার হয়ে। তাই তাদের ধারণা ছিল, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা বিত্ত প্রাপ্তির সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবেন। এ কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিত্তের সন্ধানে উন্মুখ হয়ে ওঠেন মধ্যবিত্তরা।
কিন্তু মধ্যবিত্তের এই বিত্ত সন্ধানের প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাধীনতার পর পর ক্ষমতাসীন দলের আচরণে। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা জড়িয়ে পড়েন রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনে, প্রতিপক্ষ দমনে এবং নির্বিচার মানবাধিকার লঙ্ঘনে। আইনের শাসনের প্রতি যে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ ছিল না, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখার শিরোনাম হয় ‘আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই।’ স্বৈরাচারী মানসিকতা লালনকারী অবস্থান থেকে প্রতিপক্ষকে দমন করবার জন্য গঠন করতে হয় রক্ষীবাহিনী। ধারণা করা হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। কারণ স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক আনুগত্য সম্পর্কে তত্কালীন সরকার নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। সেনাবাহিনীর অফিসারদের অনেকের ভেতর ছিল এক ধরনের আদর্শবাদ এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবার কারণে সৈনিকদের ভেতরও তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। এ কারণেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী প্রয়োগ করার পর যখন দেখা গেল ক্ষমতাসীন দলের লোকেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তখন এ অভিযান থেকে প্রত্যাহার করতে হয় সেনাবাহিনীকে। আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয় দুর্ভিক্ষ এবং রাজমুকুট মাথায় দিয়ে অতি পরিচিত যুবকের বিয়ে। জীবনের নিরাপত্তার অবসান ঘটে পুলিশি হেফাজতে সিরাজ শিকদারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, যা এ দেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রথম উদাহরণ।
স্বাধীনতার প্রথম তিন বছরে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে যত ঘটনা ঘটেছে, তার কোনোটার সঙ্গেই সাংবিধানিক প্রস্তাবনার কোনো মিল ছিল না। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে জনবিরোধী যত ঘটনা ঘটেছে, তার সূত্রপাত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলোতেই। নির্বাচনে ভোট ডাকাতিরও সূত্রপাত ১৯৭৩ সালে।
এভাবে তালিকা করলে তা অনেক দীর্ঘ হবে। কিন্তু মোটাদাগে বললে স্বাধীনতার চল্লিশ বছরের যে কয়টি প্রাপ্তি চোখে পড়ে, তা হচ্ছে বিত্তবানদের সংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্নীতির প্রসার এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান। রাজধানী ঢাকার চেহারা হয়তো বিগত দিনগুলোতে অনেক আলো ঝলমল হয়েছে। কিন্তু সে আলো ঝলমল রাজধানী যে দেশের বুকে বিরাজমান সর্বপ্রকার অন্ধকারকে মুছে দিতে পারেনি, এ কথা স্বীকার করতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কৃষক এবং বিভিন্ন শ্রেণীর তরুণরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে মানুষের সপক্ষে যেসব আন্দোলন হয়েছিল, সেখানেও এই শক্তির উপস্থিতি ছিল প্রবল। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য এই শক্তির ওপর নির্ভর করেছে প্রবলভাবে। এই শক্তির একটা প্রধান ক্ষমতা ছিল তাদের সাংগঠনিক অবস্থান। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের যে সংগঠন ছিল, তার শক্তি ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন সময়ে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যেমন সাহসী ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও জুগিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতার সফল আন্দোলনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। পূর্ব পাকিস্তানে এই সফলতা ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ভরাডুবি ঘটিয়ে দেয়ার সম্ভাবনায় ১৯৫৮ সালে জারি হয়েছিল সামরিক শাসন। অবশ্য সেই সামরিক শাসনের পেছনে মদদ জুগিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সিআইএর এই ভীতির একটা প্রধান কারণ ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, কমিউনিস্ট সমর্থিত প্রগতিশীল শক্তির ব্যাপক বিকাশ। স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের সংগঠনগুলোর উজ্জ্বল উপস্থিতি মানুষকে সাহস জোগাত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে এ তিনটি ক্ষেত্রেই ঘটেছে
চরম বিপর্যয়। এসব ক্ষেত্রে প্রাপ্তির হিসাব প্রায় শূন্যের কোটায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পর মধ্যবিত্তের মতো ছাত্ররাও হয়ে ওঠে বিত্ত সন্ধানী। তাদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে ঘটে তার প্রতিফলন। পাকিস্তান আমলে যে আদর্শবাদকে নির্ভর করে ছাত্র সংগঠনগুলো পরিচালিত হতো, তা রাতারাতি উবে যায়। ছাত্র সংগঠনের এ বিপর্যয় পুরো দেশের শিক্ষাঙ্গনকে করে তোলে কলুষিত। আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠনের প্রচেষ্টা পরিণত হয় সমুদ্রের বারি বিন্দুর মতো। ছাত্র সংগঠনগুলো ক্রমান্বয়ে পরিণত হয় রাজনৈতিক দলের লেজুড় এবং তাদের সামনে আদর্শবাদের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই ঘটনা ঘটে শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনের বেলায়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাংশের নেতা বাংলাদেশ আমলে অঙ্গীভূত হয়ে যান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে। অন্যরা প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে পুনর্গঠিতই হতে পারছিলেন না।
কৃষক সংগঠনগুলো মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন হলেও ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কৃষক আন্দোলনেও তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতা। শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলো বাংলাদেশের সমাজে পুনর্গঠিত না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ অভিজাত এলাকার মানুষদের শ্রমিক ও কৃষক নেতা বনে যাওয়া। বনানীর কৃষক যদি কৃষক সংগঠনের নেতা হয়ে যান, তাহলে আর যাই হোক তাতে সত্যিকারের কৃষকের কোনো সংগঠন গড়ে উঠবে না। স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের সংগঠন বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে সমাজের যে শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে জন অধিকার সংরক্ষণে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারত, তা নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলেই স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে এসেছে বিভিন্ন পরিবর্তন। স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে মানুষের। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এটিই বড় ব্যবধান।
সূত্র : আমার দেশ

আশা ভেঙেছে তবু স্বপ্নের কথা শোনাবো || আতাউস সামাদ

চল্লিশ বছর আগে এক গ্রামের পাশের মাঠে আমরা ক’জন একটা ট্রানজিস্টর রেডিও ঘিরে গোল হয়ে বসে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম। বাংলাদেশে বেঈমান বর্বর নৃশংস পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর ঢাকায় আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করার খবর শোনার জন্য। ইতোমধ্যে জানা হয়েছে যে, দখলদার পাকিস্তানিদের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছেন এবং রমনা রেস কোর্স ময়দানে প্রকাশ্যে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ চুক্তি সই হবে।
ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের বঙ্গভাষী দোসররা নয়া পল্টনে আমাদের ছেড়ে আসা বাসায় আমার খোঁজে হানা দিয়েছিল ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে। আমার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা আতিকুস সামাদকেও খুঁজছিল পাকিস্তানিরা। বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষী পাড়া-পড়শির মুখে সেইসব খবর পেয়ে আমরা ঢাকা ছেড়েছি সঙ্গে সঙ্গেই। এই শহর থেকে হাজার হাজার মানুষ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে পায়ে হেঁটে বা নৌকা দিয়ে সরু একটা খাল ধরে ধলেশ্বরী তীরে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁরা বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকের থাকার মতো জায়গা ছিল না। তাঁরা চেয়েছেন ঢাকা থেকে প্রাণ নিয়ে বের হতে। তারপর যে কোনো মুক্ত অঞ্চলে পৌঁছে ‘যেখানে রাত সেখানে কাত’ হয়ে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিতে। সবারই বিশ্বাস, কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকায় নিজ গৃহে ফেরত আসা যাবে। কারণ, হানাদার পাকিস্তানিরা যে শিগগিরই পরাজিত হবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ঢাকা ত্যাগ করার তাগিদ ছিল প্রথমত কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানি ও পাকিস্তানপ্রেমী আততায়ীদের লক্ষ্যতে পরিণত হয়েছিলেন অনেকে। আর দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানি সেনারা তাদের রাজাকার-আলবদর-আলশামস স্যাঙ্গাতদের সঙ্গে নিয়ে যদি ঢাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাহলে যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হবে তাতে অনেক বেসামরিক লোকও নিহত হবে। সপরিবারে আমি, আমার ভাই, বিখ্যাত আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক সাহেবের কন্যা সায়েমা হক ও পুত্র আনিসুল হক (যিনি বর্তমানে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিশিষ্ট আইনজীবীতে পরিণত হয়েছেন) এবং আমাদের বন্ধু আজিজুল হক একসঙ্গে চলছিলাম। আমরা যখন ধলেশ্বরী নদীতে নৌকায় উঠছি, তখনও পেছন থেকে কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। তবে ঠিক কোথায় কামানযুদ্ধ, তা নিরূপণ করতে পারিনি। কামানের আওয়াজ বন্ধ হয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ পরে। আমাদের গন্তব্য আজিজুল হকের গ্রামের বাড়ি, শেখরনগর।
আমরা শেখরনগর পৌঁছবার পরও যুদ্ধ হতে দেখেছি। পলায়নপর পাকিস্তানি সৈন্যদের তাড়া করে একদল মুক্তিযোদ্ধা শেখরনগরের ওই মাঠ পার হয়ে ছুটছেন, তা দেখেছি। নৃশংস পাকিস্তানিরা পালাবার সময়ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরাবার চেষ্টা করছিল। আবার কাছেই এক নদীতে একটি লঞ্চ লক্ষ্য করে ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে রকেট নিক্ষেপ করতে দেখেছি। ফলে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে সে জন্য ব্যক্তিগত গভীর উত্কণ্ঠা ছিল। ওদিকে ঢাকায় মা-বোন-ভগ্নিপতি-ভাগিনা-ভাগিনীদের এবং পাকিস্তানি জেলখানায় আমার সম্বন্ধী ডা. আনোয়ারুল হককে ছেড়ে এসেছি। তাদের জন্য উদ্বেগ ছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং শত্রুমুক্ত হয়েছে—এমন আকাঙ্ক্ষা তো ছিলই। নিজেরা বাঁচি কী মরি তার চেয়ে বড় কথা, একমাত্র কথা তখন ছিল যে দেশ স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত হতেই হবে। তাই পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের সংবাদ শোনার জন্য অধীর অপেক্ষা। অবশেষে সেই পরম সুসংবাদটা শুনলাম। আনন্দে আত্মহারা হলাম। নিঃশ্বাস নিলাম বুকভরে। তারপর মাটির সঙ্গে বুক মিশিয়ে দেশমাতৃকার স্নেহধন্য হলাম।
তবে আমাদের সেই আনন্দ সারা বুক ভরে থাকতে পারে নাই বেশিক্ষণ। দুঃখজনক হলেও অনেক শোকের খবর অপেক্ষা করছিল। ঢাকা ছাড়বার আগেই খবর পেয়েছিলাম, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র লে. আশফাকুস সামাদ পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছে ভুরুঙ্গামারীর যুদ্ধে। তার আগে আমাদের পাড়ার
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক নিহত হয়েছে। শেখরনগরের আশপাশে আজিজুল হক সাহেবের পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। ঢাকায় পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে যাবার সময় গোলাগুলিতে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাতুল্য জিল্লুর ভাইয়ের শিশুপুত্র নিহত হয়েছে।
১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন। অনেকেই যাচ্ছিলেন লঞ্চে করে। এরকম একটা লঞ্চ ডুবে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবরও শুনি। আর বিষাদ একেবারে গ্রাস করে ফেলে আমাদের যখন খবর পাই যে, অগ্রজতুল্য সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, এমএ মান্নান ও নিজামুদ্দিন আহমেদ, বন্ধু সাংবাদিক নাজমুল হক ও অনুজতুল্য সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে পাকিস্তানিদের সাহায্যপুষ্ট আলবদররা। ভাগ্যক্রমে বন্ধু এনায়েতুল্লাহ খান ও আমি তাদের থাবা থেকে আত্মরক্ষা করতে পেরেছিলাম। তবে আমাদের কষ্ট বাড়তেই থাকল, যখন আরও খবর পেলাম যে আমার শ্রদ্ধাভাজন অনেক শিক্ষক এবং গুণী চিকিত্সকদেরও হত্যা করেছে তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জিসি দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান এবং সাংবাদিক শহীদ সাবের তো নিহত হন ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানিদের প্রথম আক্রমণেই। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করার পর দিনগুলোতে যতটা না আনন্দিত হয়েছি, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে ততটাই কষ্ট পেয়েছি একের পর এক প্রাণ বিসর্জনের শোকসংবাদ পেয়ে। মোট কথা, বিজয় দিবস ও তার পরের দিনগুলো ছিল হর্ষ ও বিষাদ মেশানো।
আর সে জন্যই তখন দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম ও যেসব চিন্তা এসেছিল, তা এখনও আমার মতো অনেকের কাছেই আজও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দেশটাকে সচল করব, সেটা তো ছিল প্রথম চিন্তা ও ইচ্ছা। তারপরই যে আকাঙ্ক্ষা মনে বাসা বেঁধেছিল তা ছিল এই যে, এদেশে সব মানুষ সত্ হবে, দেশটা চলবে ন্যায়-নীতির ওপর, দেশের রাজনীতির ভিত্তি হবে গণতন্ত্র ও বহুমতের সহাবস্থান। যা আছে দেশে, সবই অর্থাত্ দেশের যে সম্পদ তা সবার বেঁচে থাকার ও মঙ্গলের জন্য কাজে লাগানো হবে। বাংলাদেশ অচিরেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে, এদেশের সব নাগরিক একে অপরকে ভালোবাসবে এবং কেউ কারও জন্য অশান্তি সৃষ্টি করবে না। শহীদদের পবিত্র স্মৃতি বুকে ধরে রাখবে সবাই সর্বকাল এবং বহু প্রাণ ও অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা চির-ভাস্বর থাকবে। আমরা হব একটি সুন্দর, গর্বিত, স্বাধীন দেশের নাগরিক।
এসবের অনেক কিছুই এখন অনুপস্থিত। দেশে ধনবৈষম্য একটি বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবু লোভী লুটেরারা তাদের হীন লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়। দুর্নীতি গ্রাস করেছে সারাদেশ। সঙ্গে এসে জুড়ে বসেছে গুম-খুন। মাঝে মাঝে মনে হয় সন্ত্রাসীরা যেন স্বরাজ পেয়েছে এই বাংলাদেশে। ন্যায়-নীতি ও ন্যায়বিচার এখন খুঁজতে হয় শুধু স্বপ্নে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি আর যে-ই মানুন, বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সেগুলোকে অবজ্ঞাই করছেন। শাসকদের আত্মম্ভরিতা সীমাহীন। চল্লিশ বছর আগে যেসব স্বপ্ন দেখেছিলাম, বর্তমানের রূঢ় বাস্তব সেগুলোর বিপরীত। তবে এও ঠিক যে, একদিনে এই দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় নাই। দেশটা ঠিক পথে চলতে না পারার দায় অনেককেই ভাগ করে নিতে হবে। যদিও তারা মনে করতে পারেন আমাদের এই খেদোক্তি ব্যর্থদের নিষম্ফল আস্ফাালন। তবু আমরা আশা ছাড়ব না। আমরা সুদিনের স্বপ্নের কথা শুনিয়েই যাব। 
সুত্র : আমার দেশ

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ