প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label ইসলামী সাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label ইসলামী সাহিত্য. Show all posts

Sunday, August 12, 2012

নিয়ামতের অবারিত বারিধারা লায়লাতুল ক্বদর | এম. মুহাম্মদ আব্দুল গাফফার

মু’মিনদের জন্য লায়লাতুল কদর একটি অতি মর্যাদাময় রজনী। শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতদের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর অফুরন্ত নিয়াআমতের ভাণ্ডার থেকে খাতিমুন্নবী (সা.)-এর মিল্লাতকে অত্যাধিক সওয়াব অর্জনের সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যেই মহান স্রষ্টা এ ব্যবস্থা করেছেন বলে মনে করা যেতে পারে। এর কারণ হিসেবে যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো অকাট্য দলিল হিসেবে গ্রহণে অনেকের আপত্তি থাকলেও এর যৌক্তিকতাকে একেবারে অস্বীকার করা যায় না। যেমন বলা হয়েছে পূর্বকালের আম্বিয়ায়ে কেরামের উম্মতগণ দীর্ঘ হায়াত লাভ করতেন। তারা তাদের দীর্ঘ জীবনব্যাপী সালাত, সাওম, জিহাদসহ অন্য ইবাদতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টা চালাতেন। মহানবী (সা.)-এর সাহাবীগণ এসব বর্ণনা শুনে নিজেদের স্বল্পকালীন আয়ুষ্কালে পূর্ববর্তীদের ন্যায় বেশি ইবাদত ও পুণ্য লাভে অপরাগতার  বিষয় চিন্তা করে আফসোস করতেছিলেন তখনই মহান রাব্বুল আলামীন লাইলাতুল ক্বদরের মত মহা মর্যাদাময় রাতের সুসংবাদ আল্লাহর রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে জানিয়ে দেন। এ মর্মে পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিল ক্বাদরি, অমা আদরাকা মা লাইলাতুল ক্বাদরি। লাইলাতুল ক্বাদরি খায়রুম মিন আলফি শাহরি। অর্থাৎ আমি ইহা (কুরআন) ক্বাদরের রাতে নাযিল করেছি। (হে রাসূল) তুমি কি জান ক্বদরের রজনী কি? ক্বদরের রজনী হাজার মাস থেকেও অধিক উত্তম। (সূরা আল ক্বাদর, আয়াত ১, ২, ৩)। এর রাতের মর্যাদা শুধু এ পর্যন্ত বর্ণনা করেই আল্লাহ তায়ালা শেষ করেননি। এ রজনীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরো ঘেষণা করেনÑ তানাযযালুল মালায়িকাতু ওয়াররূহ ফিহা বিজনি রাব্বিহিম মিন কুল্লি আমরি। সালামুন হিয়া হাত্তা মাতুলায়্যিল ফাজর। অর্থাৎ ফিরিশতা ও রূহ এ (রজনীতে) তাদের রবের অণুমতিক্রমে সব আদেশ নিয়ে অবতীর্ণ হয়। সে রাত পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার ফরজ উদয় হওয়া পর্যন্ত (সূরা আল ক্বাদর আয়াত ৪,৫)।
পবিত্র কুরআনুল কারীমে লাইলাতুল ক্বাদরের এ বর্ণনা খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। মহানবী (সা.)কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রিসালাতের শেষ নবী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পৃথিবীতে আম্বিয়ায়েগণের আগমনের ধারাবাহিকতার সমাপ্তি টেনেছেন। এ মর্মে মহানবী (সা.)-এর হাদিস এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ক্বয়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.) লানাবিয়্যা বাআদী ওয়ালা উম্মাতা বাআদা উম্মাতি অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন আমার পর আর কোনো নবী নেই আর আমার উম্মতের পর আর কোনো উম্মত নেই। (বায়হাকি)। স্বভাবতই সর্বশেষ নেতা ও তাঁর অনুসারীদের জন্য পৃথক মর্যাদা তথা পুরস্কার ও অতুলনীয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশ্বনবী (সা.) সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন, অমা আরসালনাকা ইল্লা কাফফাতাললিন্নাছি বাশীরাও ওয়া নাযীরাও অলাকিন্না আকছারান্নাছিলা ইয়ালামুন অর্থাৎ হে নবী, আমি সমগ্র মানব জাতির জন্য তোমাকে সুসংবাদ দানকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে পাঠিয়েছি, কিন্তু অনেক লোক জানে না (সূরা সাবা ২৮)। একমাত্র মহানবী (সা.)কে শেষ নবী হিসেবে গোটা মানব জাতির রাসূল রূপে প্রেরণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে এভাবে বর্ণনা এসেছে কানান্নাবী (আ.) বাআছাইলা কাউমিহি খাসসাতাওয়া বুয়িসতু ইলান্নাছি আম্মাতা অর্থাৎ প্রথমে প্রত্যেক নবীকে বিশেষ জাতির কাছে তাদের জন্য পাঠানো হয়েছে আর আমি প্রেরিত হয়েছি সমগ্র মানবজাতির কাছে (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। বিশ্ব নবী (সা.) রিসালাতের সিলমহর হিসেবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাঁর প্রচলিত শরিআহ তথা নিয়ম পদ্ধতিই বলবত থাকবে এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য মহানবী (সা.)র শরিআতের আইনই মেনে চলা অবধারিত। আল্লাহ রাসূর (সা.) এর শরিয়াতের বিধিবিধানের মূল উৎস পবিত্র কুরআনুল কারিম। যেটা মানুষের জন্য পরিপূর্ণ জীবন বিধান। এ কুরআনুল কারিম অপরিবর্তিনীয়। কুরআনুল কারিম সর্বশেষ আসমানি কিতাব হিসেবে এর মর্যাদা সর্বোচ্চে। দ্বীন ইসলামকে কুরআন নাযিলের মাধ্যমেই পূর্ণতা দান করা হয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মহানবী (সা.)-এর উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, আল ইয়াওমা আকমালতুলাকুম দ্বীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাকুম নিমাতি ওয়া রাদিতুলাকুমুল ইসলামা দ্বীনান। অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের প্রতি পূর্ণ করে দিলাম আর  তোমাদের জন্য ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম (সূরা মায়েদা, আয়াত ৩)।
মূল কথা হলো, দ্বীন ইসলাম ও মানব জাতির গাইড বুক তথা পথ প্রদর্শক। পবিত্র কুরআনুল কারিমের নাযিলের সূচনা হয় এই বরকতময় লাইলাতুল ক্বদরে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের অপরিসীম মর্যাদার কারণেই ক্বদরের রজনীর এ অফুরন্ত ফজিলত। এ মর্মে মহান রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেনÑ ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিম মুবারাকাতিন ইন্না কুন্না মুনজিবীন। অর্থাৎ আমি উহাকে এক বড় কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ রাতে অবতীর্ণ করেছি। কেননা আমি মানুষদেরকে সাবধান করবার ইচ্ছা করেছিলাম (সূরা দুখান, আয়াত ৩)। মূলত পবিত্র কুরআনুল কারিম নাযিলের এ রজনী বিশ্বাসীদের জন্য বিশাল প্রাপ্তির একটা মাধ্যম তৈরি করে দিয়েছেন মহান রাব্বুল আ’লামীন। লাইলাতুল ক্বদরের  নে’আমতে পূর্ণ রজনী যে রমজান মাসেই রয়েছে তা জোর দিয়েই বলা যেতে পারে, কারণ পবিত্র কুরআনুল কারিম এ মাসেই নাজিল হয়। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন শাহরু রামাদানাল্লাজী উনযিলা ফীহিল কুরআনু, হুদাল লিন্নাছি, অবাইয়েনাতি মিনাল হুদা ওয়াল ফুরক্বান। অর্থাৎ রমজান মাস, এ মাসেই কুরআন মাজিদ নাজিল হয়েছে, তা গোটা মানব জাতির জন্য জীবন যাপনের বিধান এবং তা এমন সুস্পষ্ট উপদেশ সমূহে পরিপূর্ণ যা সঠিক ও সত্যপথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫)। পবিত্র কুরআনুল কারিমের এ ভাষণে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, কুরআন নাজিলের এ মাসেই লাইলাতুল ক্বদর রয়েছে। লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাস থেকেও যে উত্তম তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই ঘোষণা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর উম্মতের জন্য এতবড় নেআমত কেন দান করা হয়েছে তা পূর্বে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি বানিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তারা সত্যের সাক্ষ্যদাতা হবেন আর আল্লাহর রাসূল (সা.) ও সত্যের পতাকাবাহী উম্মতদের জন্য সাক্ষ্যদানকারী। হবেন। এ মর্মে পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, কাজালিকা জাআলনাকুম উম্মাতাউ ওসাতালিতাকুনু শূহাদাআ আলান্নাছি অইকুনার রাসূলু আলাইকুম শাহিদা অমা জাআলনাল ক্বিবলাতাল্লাতী কুনতা আলাইহা ইল্লালিনা’লামা মাই ইত্তাবিউর রাছূলা ... অর্থাৎ আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যম পন্থা অনুসারী উম্মাৎ বানিয়েছি। যেন তোমরা দুনিয়ার লোকদের জন্য সাক্ষী হও আর রাসূল যেন সাক্ষ্য হয় তোমাদের ওপর (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৪৩)। পৃথিবীর সকল মানুষের ওপর মহানবী (সা.)-এর উম্মতদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কর্তৃক সাক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়া একটা শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার ভিন্ন আর কি হতে পারে? এ মর্যাদার দাবিদার জাতিকে অবশ্যই গোটা মানবগোষ্ঠীকে সঠিক পথে আহ্বানের দায়িত্ব বহন করতে হবে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন কুনতুম খায়রা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্নাছি তামুরুনা বিলমারুফি অতান হাওনা আনিল মুনকার অতুমিনুনা বিল্লাহি ... অর্থাৎ এখন পৃথিবীর সর্বোত্তম দল তোমরা, যাদেরকে মানুষের হেদায়াত ও সংস্কার বিধানের জন্য কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত করা হয়েছে তোমরা ভালো কাজের আদেশ কর, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে লোকদের বিরত রাখ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রক্ষা করে চলো ... (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১১০)। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এ ঘোষণার দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, বিশ্বনবী (সা.) এর উম্মতদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল বিষয় হলো তাদেরকে সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য দৃষ্টান্তমূলক আদর্শের নমুনা হতে হবে। সমগ্র মানব জাতির পথ প্রদর্শন ও নেতৃত্বদানের যোগ্যতা মুসলমানদেরকেই অর্জন করতে হবে। এ জন্য তাদেরকে কঠোর পরিশ্রমী ও নিরলসভাবে কাজ করার প্রশিক্ষণ গ্রহণ জরুরি। পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা মুসলমানদেরকে তাকওয়া অর্জনের সাথে সাথে ভোগবিলাস তথা অলসতা বর্জনের শিক্ষাও দান করে থাকে। পবিত্র লাইলাতুল ক্বদরের শিক্ষা ও এরই পরিপূরক। বরকতপূর্ণ ক্বদরের রজনীর সওয়াব লাভ করতে হলেও নিরলস প্রচেষ্টা একাগ্র সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার কাছে নিজকে সমর্পণ করে দিয়ে তাঁর দয়া ও রহমতের ভিখারি হতে হবে। লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস এভাবে বর্ণিত আছে, আন আবিহুরাইরাতা অনিন্নাবী (সা.) ক্য়ালা মানক্বানা লাইলাতাল ক্বাদরে ঈমানা উ অইহতে সাবান গুফিরা লাহু মাতাক্বাদ্দামা মিন জান্বিহী অমান সামা রামাদানা ঈমানাউ অইহতে সাবান গুফিরালাহু মাতাক্বাদ্দামা মিন জান্বিহী অর্থাৎ আবু হুরাইরা (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি শবে ক্বদরে ঈমানসহ সওয়াবের আশায় সালাত আদায় করল তার অতীতের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, আর যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় ঈমান সহ রমজানের সিয়াম পালন করে তারও অতীতের গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (সহিহ আল বুখারি, হাদিস ১৭৬৭)। লাইলাতুল ক্বদরে যে রকম অতি বরকতময় তেমনি এটাকে লাভ করাও শ্রমসাধ্য ব্যাপার। যে বিষয় অতি মূল্যবান বা মর্যাদাময় তা লাভ করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপারও বটে। ক্বদরের এ পুণ্যময় রাতের তারিখ স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এর উদ্দেশ্য একটাই যে, বান্দাহ মহান রাব্বুল আ’লামীনের সন্তুষ্টি লাভের আশায় তাঁর এ অবারিত নেআমতকে অর্জনের জন্য নিরলসভাবে ইবাদত করে যাবে। এর দ্বারা মুমিনগণ কষ্টসহিষ্ণু ও আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজের উদ্দেশ্যে কঠোর পরিশ্রমী হয়ে গড়ে উঠবে এটাই হলো এসব আনুষ্ঠানিক ইবাদতের লক্ষ্য। লাইলাতুল ক্বদরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূল (সা.)কে জানিয়েও তার তারিখ ভুলিয়ে দিয়েছেন। এর দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর একনিষ্ঠ তথা রিলস ইবাদতকারী বান্দাদেরকে পরীক্ষা করতে চান।
মাহে রমজানের শেষ দশকের ইতেকাফের উদ্দেশ্য লাইলাতুল ক্বদরের অফুরন্ত সওয়াব অর্জন করা। মহানবী (সা.) প্রাথমিক অবস্থায় সাহাবীয়ে কেরামসহ মধ্য রমজানের দশদিন দশরাত ইতেকাফ করতেন। মহানবী রাব্বুল আলামীন যখন তাকে অবহিত করলেন যে, লাইলাতুল ক্বদর রমজানুল মুবারকের শেষ দশকেই রয়েছে, তখন থেকে তিনি রমজানুল মুবারকের শেষ দশকে মসজিদে ইতেকাফ শুরু করেন। এ মর্মে একটি হাদিস এভাবে বর্ণিত আছেÑ আন সালামা বিন আব্দুর রহমান ক্বয়ালা সালতু আবা সাঈদিনিল খুদরী ক্বূলতুহাল সামীতা রাসূলুল্লাহ (সা.) ইয়াজকুরা লাইলাতাল ক্বাদরি ক্বয়ালা নাআম, ইতাকাফনা মাআ রাসূলুল্লাহ (সা.) আল আশরালআওসাতিমিন রামাদানা, ক্য়ালা ফাখাবাজনা সাবহাতা ইশরিনা ক্বয়ালা ফাখাতাবনা রাসূলুল্লাহ (সা.) সাবহাতা ইশরিনা ফাক্বয়ালা উরিতু লাইলাতাল ক্বাদরে অইন্নী নুসিতুহা ফালতা মিসুহাফিল আশরিল আওয়াখিরি ফিল বিতরি ... অর্থাৎ আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি আবু সাঈদ খুদরী (রা.)কে জিজ্ঞেস করলঅম, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে লাইলাতুল ক্বদর সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ করতে শুনেছেন? তিনি জবাব দিলেন হ্যাঁ, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে রমজানের মধ্যের দশদিনে ইতেকাফে বসেছিলাম। আমরা বিশ তারিখের ভোরে বেরিয়ে আসলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশ তারিখের ভোরেই আমাদের সামনে ভাষণ দান করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, আমাকে ক্বদরের রজনী দেখানো হয়েছে এবং আমাকে তা ভুলিয়েও দেয়া হয়েছে।  তাই তোমরা তা শেষ দশদিনের বেজোড় রাত্রে তালাশ কর (সহিহ আল বুখারি, হাদিস ১৮৯৩)। বর্ণিত হাদিস থেকে লাইলাতুল ক্বদরের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা গেল যে, মাহে রমজানের শেষ দশ রজনীর যে কোনো বেজোড় রাত্রে লাইলাতুল ক্বদর আল্লাহর নৈকট্য অর্জন প্রত্যাশী মুমিনগণের সামনে এসে হাজির হয়। এ রজনীতে আল্লাহপ্রেমিক বান্দাগণ নিজেদের অপরাধসমূহের জন্য অনুতাপ ও আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টা করে থাকেন।
মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে এই অতুলনীয় মর্যাদাময় রজনীর ফায়দা লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : প্রভাষক, দারুল ইসলাম একাডেমি, সিরাজগঞ্জ।

Tuesday, July 31, 2012

ইসলামী শিল্পকলা ও ক্যালিগ্রাফি | ইব্রাহীম মণ্ডল

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের এক চরম সময়ে রাসুল (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটে। তিনি মানবজাতিকে ডাক দিয়েছিলেন অগ্নি, পাথর, মূর্তিপূজা, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও অন্যান্য পাপাচার ছেড়ে এক আল্লাহর পথে আসার জন্য। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকেই শান্তির পতাকাতলে হাজির হলেন। একত্ববাদে বিশ্বাসী এই জনসমষ্টিই মুসলমান। শান্তির ছায়াতলে ইসলামে দীক্ষিত এই জনসমষ্টির মাধ্যমে নতুন এক সভ্যতার জন্ম হয়, যা পৃথিবীর আশীর্বাদস্বরূপ। এই একত্ববাদে বিশ্বাসীদের মধ্যে যে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাই ইসলামী সংস্কৃতি। জাহেলিয়াতের যুগে সাহিত্য, সংস্কৃতি দ্বারা গোত্রে গোত্রে হিংসার আগুন জ্বালানো, পরস্পর শত্রুতা সৃষ্টি, প্রতিশোধের স্পৃহা, হানাহানি, কাটাকাটি করতে উদ্বুদ্ধ করত। অপরাধীকে ক্ষমা করা ছিল তখনকার সময়ে কল্পনাতীত। একত্ববাদে বিশ্বাসীদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রোধ সংযত করা অপরাধীদের ক্ষমা করতে শেখায়। মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও সদ্ব্যবহার সম্প্রীতি শিক্ষা দেয়, জীবনকে সম্মানিত করে তোলে, অনাদর্শকে আদর্শবাদী, অজ্ঞ মূর্খকে নির্ভুল জ্ঞান এবং সাহসহীন মানুষকে সাহসী ও নির্ভীক করে তোলে।
আমরা জানি, মুসলিম শিল্পকলা ও ইসলামী শিল্পকলার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
মুসলিম শিল্পকলা : মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমান শাসক, বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় যে শিল্প উত্কর্ষ ও বিকাশ লাভ করে, তা-ই মুসলিম শিল্পকলা।
খোলাফায়ে রাশেদার পর উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমি, সেলজুক, মামলুক, উসমানীয় খেলাফতের আমলে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতবর্ষে মোগল আমলে মুসলিম শিল্পকলা ব্যাপক বিকাশ লাভ করে।
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে তাদের প্রাসাদে হাম্মাম খানায়, রংমহল, দরবারগৃহ ও হেরেম নৃত্যরত নারী, নারীর শরাব পরিবেশন ও বিভিন্ন প্রাণীর চিত্র, দেয়ালচিত্র ফ্রেস্কো মাধ্যমে মুসলিম শিল্পীরা অঙ্কন করছে।
বাদশা হুমায়ুন ছিলেন সংস্কৃতিমান ও শিল্পরসিক। রাজ্য হারিয়ে পারস্যে কুড়িটি বছর কাটিয়ে দেশে ফেরার সময় তাব্রিজ থেকে মীর সাঈদ আলী ও খাজা আবদুস সামাদ শিরাজী নামক দু’জন খ্যাতিমান শিল্পীকে দিল্লিতে নিয়ে আসেন এবং এরা স্কুল স্থাপন করে এক শিল্পী তৈরি করে। এদের মাধ্যমে ভারত এবং ইরানি রীতির সংমিশ্রণে ইন্দু-মুসলিম রীতি গড়ে ওঠে। শিল্পীরা রাজদরবারে চিত্র, যুদ্ধচিত্র, রাজাদের প্রতিকৃতি, জীবজন্তু, পশুপাখি ইত্যাদিকে বিষয়বস্তু করে প্রচুর মিনিয়েচার ছবি অঙ্কন করে। মোগল আমলেই কাগজের ওপর ছবি আঁকা শুরু হয়। কাগজ বানাতে শেখা, ছবি আঁকা থেকে বই লেখা বিশেষভাবে প্রচলিত হয় মোগল আমলেই, তার আগে এ দেশে তালপাতার ওপর লেখা হতো এবং ছোট ছোট ছবিও আঁকা হতো।
বাদশা আকবর শিল্প অনুরাগী ছিলেন। তার সময়ও বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি চিত্রে শোভিত হয়।
জাহাঙ্গীর নিজেই শিল্পী এবং শিল্প সমালোচক ছিলেন। তার সময়ই ইংরেজ রাষ্ট্রদূত স্যার টমাস রো এদেশে আসেন। এই সময় প্রতিকৃতি ও মিনিয়েচার পেইন্টিং করা হয়। ছবিতে আলোছায়া ও পরিপ্রেক্ষিত বোঝাতে সমর্থ হয়। ছবিগুলো খুব বাস্তবধর্মী হয়ে ওঠে। তারা প্রাণীর চিত্র বাস্তবভাবে আঁকতে থাকে, যা বিস্ময়কর। এই সময় স্থাপত্য শিল্পের অসাধারণ নিদর্শন তৈরি করা হয়। বিকাশ ঘটে ইসলামী শিল্প ও ক্যালিগ্রাফির। এখানে আমরা ইসলামী শিল্প নিয়েই আলোচনা করব।
ইসলামী শিল্প : ‘আল্লাহ সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন’ (আল হাদিস)। যে শিল্পে আল্লাহর মনোনীত ধর্মের অনুশাসনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ ও তার সৃষ্টির সৌন্দর্য, মহিমা, আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ পায়, তা-ই ইসলামী শিল্পকলা। এ শিল্প মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখায়, আহ্বান করে। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নির্দেশনা দেয়।
ইসলামের প্রথম যুগেই প্রাণীর চিত্রাঙ্কন নিষিদ্ধ করে হাদিস।
এর মধ্যে কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হলো :
‘হজরত হুজাইফা (রা.) আবু তালহা থেকে নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ফেরেস্তারা এমন ঘরে প্রবেশ করেন না, যেখানে কুকুর বা ছবি (প্রতিকৃতি) রয়েছে।’
‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি (প্রতিকৃতি) অঙ্কনকারী লোক।’
‘হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) নবী করীম (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন, আর যে ব্যক্তি ছবি (প্রতিকৃতি) বানালো, তাকে আজাব দেয়া হবে এবং তাকে প্রাণ দেয়ার জন্য বাধ্য করা হবে, অথচ সে তা দিতে পারবে না।’
‘হজরত ওমর (রা.) বলেছেন, আমরা তোমাদের গির্জায় প্রবেশ করি না এ কারণে যে, সেখানে ছবি রক্ষিত রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস গির্জায় নামাজ পড়তেন, কিন্তু যে গির্জায় ছবি রক্ষিত রয়েছে, সেখানে নামাজ পড়তেন না।’
হজরত মালেক ইবনে আবদুল্লাহর বর্ণনা এই যে, নিষেধ করা হয়েছে সেই ছবি সম্পর্কে, যা প্রকাশ্য স্থানে সংস্থাপন করা হয়। বিছানায় বিছানো ছবির ব্যাপারে কোনো নিষেধ নেই।
তখন শিল্পীরা রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা এখন কী করব? রাসুল (সা.) তাদের নিষ্প্রাণ বস্তু , ফুল, লতা-পাতা আঁকার নির্দেশ দিলেন। মরুভূমিতে খেজুর আর আঙুর গাছ হচ্ছে প্রধান উদ্ভিদ। শিল্পীরা আঙুর, লতা-পাতা দিয়েই ডিজাইন করা শুরু করল। তারা প্রাণিচিত্র আঁকা বর্জন করল। তারা প্রাণিচিত্র বর্জন করে ৪টি উপাদান দিয়ে কাজ শুরু করল :
১. উদ্ভিদীয় পরিকল্পনা বা ফুল-লতা-পাতা।
২. জ্যামিতিক আকার, আকৃতি ও রেখা।
৩. আরবি বর্ণমালা বা ক্যালিগ্রাফি।
৪. বিশুদ্ধ বা অবিমিশ্র রঙের ব্যবহার।
এ বিষয়ে উপমহাদেশের প্রখ্যাত পণ্ডিত শিল্প সমালোচক সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘ইসলামী শিল্প পূর্ণ বিকাশ লাভ করে ৮০০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।’ এই শতাব্দী যে দীপ্তি এবং ঔজ্জ্বল্য এই আধুনিক সভ্য পৃথিবীর কাছে উপস্থিত করেছে, তা পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং পৃথিবীর যে কোনো সভ্যতার সঙ্গে বিচার করলে অতুলনীয় বিবেচিত হয়। মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপে যখন সংস্কৃতি এবং সভ্যতার আড়ষ্ট সীমা বন্ধন ছিল, একটি দুরন্ত নির্জনতায় পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল তখন ইসলামী সভ্যতা একটি স্বতন্ত্র উন্মুক্ততায় পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে। মূলত মুসলমানদের কারণেই পাশ্চাত্য শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছিল। অর্থাত্ বর্তমানে যা ইউরোপীয় রেনেসাঁ নামে অভিহিত। ইসলামের সংস্পর্শে না এলে তা কোনোক্রমেই সম্ভব হতো না। মুসলমানরা স্পেন বিজয় করার ফলেই ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে নতুন সাড়া পড়েছিল। শিল্প সংস্কৃতির জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি ঘটেছিল।
স্থাপত্য শিল্পে রাসূল (সা.)-এর তৈরি ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘মদিনা মসজিদ’ আজ আধুনিক স্থাপত্যবিদদের কাছে বিস্ময়। বিংশ শতাব্দীর আধুনিক স্থাপত্যবিদরা গবেষণা করে মদিনা মসজিদকে আধুনিক স্থাপত্যের মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (চলবে)
ইসলামের সঙ্গে যেমন অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য আছে, তেমনি পার্থক্য আছে শিল্প ও সংস্কৃতিরও। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মন্দির সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, যারা ধর্ম প্রচার করেন শুধু তাদের অধিকার রয়েছে সেখানে উপাসনা করার। তাই মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রকোষ্ঠ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে বাইরের আলো-বাতাসের শব্দ প্রবেশ করতে না পারে। পৃথিবীর কর্ম-কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে উপাসনার স্থান হিসেবে নির্জন পাহাড় অজান্তেই বেছে নিয়েছে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা, যেখানে পৃথিবীর কোলাহল স্পর্শ করতে পারেনি।
ইসলামে সম্পূর্ণ ভূখণ্ড আল্লাহর। একজন মুসলমান যে কোনো স্থানে নামাজ আদায় করতে পারেন। ইবাদতের কোনো অন্তরায় নেই। উন্মুক্ততা ইসলামের একটি অংশ। যে কোনো অমুসলিম অতি সহজে কালেমা পড়েই মুসলমান হতে পারেন। মসজিদ নির্মাণ কাঠামোর ও প্রশস্ততায় সহজেই আলো-বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। ভেতরের স্পেসের সঙ্গে বাইরের স্পেসের একটা সঙ্গতি আছে। সহজেই প্রবেশ করা যায়। কোথাও কোনো বাধা নেই। সবার জন্য উন্মুক্ত। ইসলামের এই উদারতা তার স্থাপত্যে ব্যক্ত হয়েছে।
রাসূল (সা.)-এর যুগে আরব উপদ্বীপে দুই ধরনের লোক বাস করত। এক দলকে বলা হতো বেদুঈন—এরা নিছক মরুচারী যাযাবর ছিল। আর অন্য দলের লোকরা থাকত শহরে। এই শহরের লোকসংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ২০ হাজারের মতো। দেশে দেশে ব্যবসা করত এরা। ইসলামী শিল্পকলা প্রথম বিস্তার লাভ করে মরুময় অঞ্চলে—তাঁবুতে থাকা মানুষের মধ্যে। তাঁবুতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আসবাবপত্র বেশি থাকে না। যাযাবর জীবনে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হলে বেশি জিনিসপত্র নিয়ে চলাফেরা কষ্টকর। তাঁবুতে বসবাসকারী মানুষ প্রধানত তার শিল্পবোধের তৃপ্তি খুঁজছে বয়ন শিল্পের মধ্যে। তাঁবুতে মানুষ গোড়া থেকেই সুন্দর গালিচা বুনতে চেয়েছে। এইসব গালিচা তাঁবুর মধ্যে বিছিয়ে পূরণ করতে চেয়েছে চাদরের অভাব। মরুভূমিতে পানির অভাব থাকায় পানি জোগাড় করে হিসাব করে খরচ করতে না পারলে জীবন চলত না। এই প্রয়োজনে মৃত্পাত্র গড়ার দিকেও তাদের ঝোঁক ছিল। গালিচা, কাপড় ও মৃত্পাত্রের ওপর ফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা এঁকেছে এরা। আল্লাহর শাস্তির ভয়ে তারা প্রাণীর ছবি অঙ্কন পুরোপুরি বর্জন করেন। আঙুর, লতাপাতা-ফুল দিয়ে নকশা করে মনের সৌন্দর্যবোধকে প্রকাশ করে তৃপ্তি খুঁজেছেন। ইসলামী শিল্পকলা বিকাশ লাভ করেছে মরুচারী যাযাবর জীবনের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই। আরবদের আঙুর লতার নকশাকলা বিশেষ জটিল হয়ে ওঠে। ফুল, লতা- পাতা ও জ্যামিতিক আকার আকৃতি দিয়ে করা ইসলামী বিশ্বের বৈশিষ্ট্যসূচক নকশা সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্পকলা।
ইসলামে মানুষ ও জীব-জন্তুর ছবি আঁকা নিষিদ্ধ। তাই কোরআনে উল্লিখিত কোনো ঘটনাবলীকে চিত্রিত অথবা মূর্তি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়নি। খ্রিস্টীয় চিত্রকলা ও ভাস্কর্য সম্যকভাবে বুঝতে হলে পড়তে হয় অথবা জানতে হয় ইঞ্জিল কিতাবে (বাইবেল) বর্ণিত ঘটনাবলী। বৌদ্ধ ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পকে বুঝতে হলে জানতে হয় বুদ্ধের জীবনকথা, পড়তে হয় বৌদ্ধ জাতকের কাহিনী। হিন্দু ধর্মকে কেন্দ্র করে যে শিল্পকলা গড়ে উঠেছে তাকে যথাযথভাবে বুঝতে পৌরাণিক উপাখ্যান জানতে হয়।
উদ্ভিদীয় পরিকল্পনায় বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ফুল ও লতাপাতা। জ্যামিতিক আকার-আকৃতির মধ্যে বৃত্ত, ঘনক, সরল ও বক্র রেখা বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্ভিদীয় ও জ্যামিতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখা আরবি লিপি দিয়ে যে কোনোভাবে নকশা করা যায়। আরবি অক্ষরের সংখ্যা ২৯টি। এই অক্ষরগুলো আঁকাবাঁকা, খাড়া ও সমান্তরাল। এই অক্ষরগুলো সহজেই ফুল-লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অলঙ্করণের কাজে ব্যবহার করা যায়।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে জিবরাঈল (আ) প্রথম বাণী নিয়ে এসেছিলেন—‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক।’ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি (মানুষকে) সৃষ্টি করেছেন; ঘনীভূত রক্তপিণ্ড থেকে। পড় তাঁর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও দয়ালু। যিনি মানুষকে শিখিয়েছেন কলমের ব্যবহার, আর দান করেছেন সেই জ্ঞান যা ছিল মানুষের অজানা।’ (সূরা আলাক : আয়াত ১,২,৩,৪)
রাসুল (সা,) লিখতে পারতেন না, সাহাবীরা আল্লাহর বাণী পাথরের গায়ে, দেয়ালে, গাছের ছালে লিখে রাখতেন। যারা এই আল্লাহর বাণী সুন্দর মনোরম করে লিখতেন, তারাই কাতিব। কাতিবদের মর্যাদা ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। রাসুল (সা.) কাতিবদের ভালোবাসতেন। তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। রাসুল (সা.)-এর জামাতা হজরত আলী (রা.) স্বয়ং ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। তিনি কোরআনের আয়াতকে চমত্কার করে লিখে রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘সুন্দর হস্তাক্ষর সত্যকে স্বচ্ছ করে তোলে।’ আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। যারা সুন্দরের চর্চা করেন তাদেরকেও পছন্দ করেন।
রাসুল (সা.) ক্যালিগ্রাফি শিল্প এবং শিল্পীদের পছন্দ করতেন ও এই শিল্পের প্রচার প্রসারে কাজ করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বদরের যুদ্ধে যেসব বন্দি মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল তাদের প্রত্যেককে দশজন মুসলমানকে লেখাপড়া শিক্ষা দেয়ার শর্তে মুক্তি দেয়া হয়। এই শিক্ষাদানের মধ্যে ক্যালিগ্রাফিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ থেকেই ক্যালিগ্রাফির প্রতি মুসলমানদের প্রতি রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসার গভীরতা নিরূপণ করা যায়। সে সময়ে শুধু রাসুল (সা.)-এর কাছে নয়, মুসলমান সমাজে সর্বস্তরে ক্যালিগ্রাফি এবং ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের কদর ছিল। মুসলিম শাসকরা শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান ছাড়াও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করতেন। আব্বাসীয় আমলে রাষ্ট্রনায়করা ক্যালিগ্রাফি চর্চা ও প্রসারে সহায়তা করেছেন। অক্ষরকে বিশেষভাবে বিন্যাসের মাধ্যমে সুন্দর আকর্ষণীয় রূপ দেয়া এবং ইসলামী আদর্শকে সামনে রেখেই অতীতে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ক্যালিগ্রাফি চর্চা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারার ৩১ নং আয়াতের আলোকেই বিশ্বাস করা হয়। যেহেতু প্রত্যেক বস্তু সম্পর্কে আদম (আ)-কে অবহিত করা হয়েছে সেহেতু তাঁকে আরবি সম্পর্কেও অবগত করানো হয়েছে। এই বিশ্বাসের আলোকেই বিভিন্ন তথ্যে বলা হয়েছে যে আদম (আ) এরপর তার পুত্র শীষ (আ) আরবি বর্ণ ও বিন্যাসের উত্কর্ষ সাধন করেন। এমনিভাবেই বংশানুক্রমে তাঁরাই আরবি ভাষার বিকাশ সাধন করেছেন। আব্বাসীয় আমলে মুসলিম সভ্যতার যখন স্বর্ণযুগ, তখন আরবি ভাষা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছিল বলে জানা যায়।
গ্রিক কধষষড়ং এবং এত্ধঢ়যবরহ শব্দ দু’টির মিলিত রূপ ‘ক্যালিগ্রাফিয়া’ থেকে ইংরেজি ‘ক্যালিগ্রাফি’ যার অর্থ ‘সুন্দর লেখা’ হস্তলিখন শিল্প।
পৃথিবীর আরও অনেক ভাষায় ক্যালিগ্রাফি হয়েছে। যেমন- চীন, জাপানে ছবি আঁকা শুরু করতে হয় ক্যালিগ্রাফি দিয়েই। অন্য কোনো দেশের বর্ণমালা এত সুন্দর করে আঁকা সম্ভব হয় না। তাই আরবি ক্যালিগ্রাফি ব্যাপক বিকাশ লাভ করেছে। মানব মুখে প্রথম উচ্চারিত ভাষা আরবি, বেহেশতের ভাষা আরবি পৃথিবীর প্রথম ভাষা আরবি, পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনের ভাষা আরবি। আরবি অক্ষর ইসলামী শিল্পকলাকে দিয়েছে বিশিষ্ট রূপ ও শিল্পগত ঐক্য। আরবি লিপিকলা ইসলামে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। চিত্রের স্থান দখল করে রয়েছে আরবি ক্যালিগ্রাফি। সুন্দর লিপিই হচ্ছে শিল্পের মাধ্যমে ইসলামের বাণী প্রচারের উপায়। কোরআনের বাণী হচ্ছে আল্লাহর বাণী, যা মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে। আল্লাহকে আমরা দেখি না, কিন্তু তাঁর বাণী তিলাওয়াতের সময় আমরা দেখি। কাজেই শিল্পীরা অক্ষরগুলোকে হৃদয়গ্রাহী করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন এবং তারা এ কাজকে আল্লাহর ইবাদত মনে করেছেন। এ জন্যই ক্যালিগ্রাফি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র। কোরআনের এই ভাষাকে অবলম্বন করে যে লিখন শিল্প মুসলিম দেশগুলোতে গড়ে উঠেছিল, তা সারা বিশ্বের জন্য অতুলনীয় শিল্প সম্পদ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত সুন্দর হস্তাক্ষরের মাধ্যমে বিশেষভাবে গেঁথে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কাজেই এ ভাষার একটা অলৌকিকতা আছে। তাই যুগ যুগ ধরে কোরআনের বাণীকে সুন্দর লিখন পদ্ধতিতে ধারণ করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। সুতরাং এক অর্থে হস্তলিখিত কোরআন অলৌকিকতা ধারণ করে রাখার চেষ্টা করেছে। হস্তলিখিত কোরআনের বাণী হচ্ছে অলৌকিক বাণী শৈল্পিক রূপব্যঞ্জনা। মুসলমানরা একে উচ্চাঙ্গ শিল্পে পরিণত করেছে। এই লিখন পদ্ধতির প্রকৃতি একক নয়, বহুবিধ। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে একটি শৈল্পিক রূপ লক্ষ করা যায়। তা হচ্ছে অক্ষরগুলো লম্বা এবং সমান্তরাল স্বভাবের। এই দুই বৈপরীত্যের মাধ্যমে শিল্পীরা লিপিকর্মে সৌন্দর্য নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন আল্লাহ শব্দটিতে যে কয়টি অক্ষর আছে, সে কয়টি লম্বা স্বভাবের। এই লম্বা স্বভাবটি সমান্তরাল স্বভাবের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে যে বিচিত্র রূপ-দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে, তা লিপিকর্মে অতুলনীয়। ফুল, লতাপাতা ও জিওমেট্রিক্যাল ফর্মের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যে কোনোভাবে এই লিপিকে উপস্থাপন করা যায়, যা অন্য কোনো ভাষার লিপি দ্বারা সম্ভবপর নয়। তাই আরবি ক্যালিগ্রাফি এত ব্যাপকভাবে বিকাশ লাভ করেছে।
মুঘল লিপিকলা : মুঘল সম্রাটরা লিপিকলার মহান পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের মধ্যে অনেকেই নিপুণ লিপিকারও ছিলেন। ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে ‘খত্তেতবই বাবুরি’ বা বাবুরি লিপি নামে একপ্রকার হস্তলিপি প্রচলন করেন। ঐতিহাসিক বাদায়ুনীর মতে, তিনি নিজ হাতে বাবুরি লিপিতে এক জিলদ কোরআন শরীফ নকল করে মক্কা শরীফে পাঠান। তাঁর পৌত্র সম্রাট আকবর ছিলেন শিল্পের পরম সমঝদার ও জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। বহু চিত্রকর ও লিপিকার তার দরবার অলঙ্কৃত করতেন। তাদের তিনি গুণ ও নৈপুণ্যের জন্য অকাতরে পুরস্কৃত করতেন আর সম্মানজনক খেতাব দান করতেন। জায়গীর রূপে ভূ-সম্পত্তি এবং মাঝে মাঝে উচ্চ সরকারি পদও দান করতেন। আকবরের রাজত্বকালে যেসব বিখ্যাত লিপিকারের আবির্ভাব হয়েছিল (তাবকিয়া-ই-খুশ নবীশান বা লিপিকার স্মৃতি নামক পুস্তকে এদের প্রায় সবারই উল্লেখ আছে)। আবুল ফজল উল্লেখ করেছেন, কাশ্মীরবাসী মুহাম্মদ হুমায়ুনের নাম (মৃত্যু ১০২০ হিজরি)। তিনি ‘বরবীন কলম’ বা ‘স্বর্ণ কলমধারী’ নামে পরিচিত। বাদশাহ আকবর তাকে এই সম্মানজনক খেতাবটি দিয়েছিলেন। মনোজ্ঞ লিপিকলায় আইন-ই-আকবরীর মনোরম চিত্রশোভিত এমন একটি চমত্কার পাণ্ডুলিপি উজ্জয়িনীতে ছিল। পরে লন্ডনে নিয়ে রাখা হয়। অন্য লিপি শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন মোল্লা মীর আলী ও তার শিষ্য মাওলানা বাকী মাশহাদের মুহাম্মদ আমীন মীর হুসাইনী কুলানকী, মাওলানা আবদুল হাই, মাওলানা দাত্তরী, সুলতান বায়যীদ (আকবর তাকে কাতিবুল মূলক বা রাজ্যের লিপিকার খেতাবে ভূষিত করেছিলেন)। মাওলানা আবদুর রহীম আমবরীন কলম। তিনি প্রসিদ্ধ নামতালীফ লেখক ছিলেন এবং পারস্য কবি নিযামীর খামসা (পঞ্চমী) নকল করেছিলেন। কাশ্মীরের আলী চমন, নূরুল্লাহ কাসিম আরমালান, শিরাজের খাজা আবদুস সামাদ মুয়াফ্ফর আলী, কান্দাহারের মীর মাসুদ (তিনি ফতেহপুর সিক্রির অট্টালিকার শিলালিপিগুলো নিজ হাতে লিখেছেন)। আশরাফ খান নামে পরিচিত মুহাম্মদ আসগর। তিনি নাসতালিফ লিপির বিশেষজ্ঞ এবং হস্তলিপিতে পারদর্শী ছিলেন। অর্থাত্ নসথ লিপির ছয় প্রকার রীতি নাসতালিফ লিপিতে বুত্পত্তিসম্পন্ন ছিলেন। (ওই ছয়টি রীতি সাধারণত ইবনমুকলা দ্বারা প্রচলিত হয়েছিল বলে কথিত হয়) সেই সময় কয়েকজন প্রসিদ্ধ হিন্দু লিপিকারও ছিলেন। যথা- রাও মনোহর, পণ্ডিত জগনাথ এবং লিপিকলার প্রতি সম্রাট জাহাঙ্গীরের আকর্ষণ তার কৃতী পিতার চেয়ে কম ছিল না। তার আত্মজীবনী থেকে প্রতীয়মান হয় যে তিনি ফরাসি ভাষায় সুলেখক ছিলেন। তার পূর্ববর্তীদের মতো তিনিও লিপিকারদের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
এই লিপিকারের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন তরবীয়ের মীর আবদুল্লাহ। তিনি মুশকীন কলম (কস্তুরী গন্ধী কলমধারী) নামে পরিচিত। আকবর তাকে এই খেতাব দিয়েছিলেন। তিনি হস্তলিপি রীতিতে পারদর্শী ছিলেন। অন্য লিপিকারদের মধ্যে ছিলেন আবদুস সামাদ শিরিন কলমের পুত্র মুহাম্মদ শরীফ। শিকাসতা লিখনরীতিতে পারদর্শী মিরযা মুহাম্মদ হুমায়ুন। হিরাতের মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক। তিনি মিরযা কামরানের দীওয়ান নকল করেছিলেন এবং সবশেষে তগরারীতি লেখক আহমদ আলী আরশাদ। তিনি ফতেহপুর সিক্রির বিরাট ফটকের পশ্চিম দিকের শিলালিপিগুলো লিখেছিলেন। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালের প্রথমদিকে তিনি ‘নাসতালীফ’ লিখনরীতির প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে যারা তার অনুসরণ করত তিনি তাদের পুরস্কৃত করতেন। তাযফিয়া-ই খুশনবীশান পুস্তকে লিখিত আছে যে সম্রাট এই অনুকরণকারীদের একশ’ ঘোড়সওয়ারের পরিচালনার পদে নিযুক্ত করতেন। তার সময়ে অনেক অভিজ্ঞ লিপিকার ছিলেন শিরাযের আবদুল হাই ওরফে আমানত খান মীর আবদুল্লাহ মুশকীন রকমের পুত্র তররীযের মীর সালিহ, নমখ লিপিতে পারদর্শী এবং শাহজাদা আওরঙ্গজেবের গৃহশিক্ষক আবদুল বাকী। তিনি তিরিশ পাতায় সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ নকল করে সম্রাটকে উপহার দেয়ায় ‘য়াকুত রকম’ (রত্ন লেখনি ধারক) খেতাব পেয়েছিলেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন ঈমান আকিদার দিক দিয়ে প্রকৃত মুসলমান। প্রাণী চিত্রাঙ্কনের যে ধারা চলছিল, তিনি এগুলো বন্ধ করেছিলেন কিন্তু লিপিকলার একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি এই কলাটি শিখেছিলেন তার গ্রন্থাগারিক ও দরবারী লিপিকার মীর ইযাদের কাছ থেকে সাইদ আলী খান জওহর রকমের (হীরক লেখনী ধারক) কাছে। শাহানশাহ নমখ ও নাসতালীফ উভয় লিপিতেই পারদর্শী ছিলেন। তবু তিনি আর একজন সমসাময়িক লিপিকার ও দরবারী গ্রন্থানিক কমল হিদায়িতুল্লাহ খানের লিপির তারিফ করতেন। সম্রাটের পত্রাবলীতে এর উল্লেখ আছে। এই সময়ে আর একজন জওহর রকম ছিলেন শামছুদ্দীন আলী খান। আওরঙ্গজেবের সময়েও কয়েকজন হিন্দু লিপিকার ছিলেন, যথা পণ্ডিত লক্ষ্মীরাম লাল, সুখরাম মুনশী, মাহবুব রায়ম, মুনশী কমল রায়। মুঘল সাম্র্রাজ্যের অবনতির দিনেও লিপিকলার উন্নতি অব্যাহত থাকে। ফর্রুখ শিয়রের আমলে হাজী নামদার ও মিরযা খাতিম বেগ সুপরিচিত লিপিকার ছিলেন।
দ্বিতীয়ত : আকবরের সময় যে কয়জন লিপিকার খ্যাতিলাভ করেন, তাদের মধ্যে আছেন মীর মোহাম্মদ হুমায়ুন, গুলাম আলী খান, হাফিজ ইব্রাহিম, হাফিজ বরকতুল্লাহ, মীর আবুল হামায, মীর যয়নুল আবেদীন, মীর মাহদী এবং খাজা গুলাম নকশাবন্দ খান। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহও একজন শিল্পী, কবি ও লিপিকার ছিলেন। দিল্লিতে যীনত মহলের এবং হামীম আহসানুল্লাহ খানের হামমামের শিলালিপিতে রক্ষিত আছে। এগুলো তার অপূর্ব নৈপুণ্যের স্বাক্ষর দিল্লির জাদুঘরেও তাঁর লিপির নিদর্শন রক্ষিত আছে। তার সময় নিপুণ লিপিকার ছিলেন মুহাম্মদ জান, মীর ইমাদ আলী ও তার পুত্র মীর জালালুদ্দীন।
মুসলিম কৃষ্টিধারায় লিপিবিদ্যার স্থান অতি উচ্চে। বিভিন্ন মুসলিম রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় লিপিকলা ছিল পাঠ্যসূচির একটি অপরিহার্য অঙ্গ। আরব ও পারস্যবাসী লিপিকলার উদ্ভাবন করেন।
লিপিকলার কিছু রূপ ও রীতির নাম—খততই আনিফা, খততই যুলফ, খততই পায়চান, খততই নাখুন, খততই তাওয়াম। এর অধিকাংশই লিপিকারের নৈপুণ্য প্রদর্শনে ও অলঙ্কারের উদ্দেশে ব্যবহৃত হতো।
একদানা চালের ওপর কোরআন শরীফের একটি সম্পূর্ণ আয়াত অঙ্কিত করতে পারা শিল্পের এবং লিপিকারের নৈপুণ্য প্রদর্শনের প্রকৃষ্ট পন্থা ছিল।
মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙনের পরে বহু বিখ্যাত আলিম ও গুণী কবি লখনৌতে চলে যান। তখন সেখানে সর্বপ্রকার শিল্প, সাহিত্য ও কৃষ্টি কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৭৯২ খ্রি. দিল্লিতে যে ওরিয়েন্টাল কলেজ স্থাপিত হয় এর পাঠ্যসূচির লিপিকলা অন্যতম শিক্ষনীয় বিষয় বলে নির্দিষ্ট হয়েছিল। সাঈদ মুহাম্মদ নামক একজন বিখ্যাত লিপিকারকে এই কলাবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত করা হয়েছিল।
আধুনিক কালেও আমরা দেখি ইরান, পাকিস্তান, সুদান ও নাইজেরিয়ার এই লিপিশিল্প অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।
ইরানের জলিল রাসুলী, সৌদি শিল্পী আহম্মদ মোস্তফা আরবি লিপিকলাগুলোকে ক্যানভাসে চমত্কার অনুজ্জ্বল রঙে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন একান্তই নিজের। তার ছবিটির নাম ‘দি ওয়ারিয়র অব বদর’।
ইরাকের বিখ্যাত শিল্পী জামিল হামদি আরবি লিপিকে জ্যামিতিক ফর্মে উপস্থাপন করেছেন নিজস্ব রীতিতে। শিল্পী যুুদা মালাম তার ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে লিপির সমন্বয় ঘটিয়েছেন। শিল্পী শাকের হাসান তার ফর্মের সঙ্গে ক্যালিগ্রাফি উপস্থাপন করেছেন।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চারুকলা প্রদর্শনীতে স্বর্ণ পেয়েছিলেন ইরাকের বিখ্যাত শিল্পী ‘সাদী আল কাবী’। তার ছবির বিষয়বস্তু ছিল ক্যালিগ্রাফি ‘মরুভূমির শিলালিপি’। গত ১৯৯১ সালে এশিয়ান চারুকলা প্রদর্শনীতে পাকিস্তানের বিখ্যাত শিল্পী গুলজীর লিপিশৈলী-১,২,৩,৪ নামে ৪টি ছবি প্রদর্শিত হয় এবং দর্শকের দৃষ্টি কাড়ে। ক্যানভাসে স্পেচুলা ও কোথাও ব্রাশ দিয়ে মোটা তেল রঙে তাঁর যে ব্রাশিং, তা দর্শকদের মুগ্ধ করে। তার ছবি মনে হয় আরবি লেখা কিন্তু কি লেখা বোঝা দুরূহ অর্থাত্ একটা ইলিউশন তৈরি করেছেন। ২০০১ সালে জানুয়ারি মাসে রিয়াদে অনুষ্ঠিত হয় আধুনিক ক্যালিগ্রাফি শিরোনামে একটি প্রদর্শনী। মিসরের সাইয়েদ ইব্রাহীম মো. সাব্বির আল হিলালী, তিউনিসের মো. ছালেহ আল খুমসি, ইরাকের হাশেম বাগদাদে অংশগ্রহণ করেন। প্রদর্শিত ক্যালিগ্রাফিগুলো চিত্রায়ণ হয় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। চমত্কার কম্পোজিশন রঙ ও রেখায় বিমূর্ত শিল্পে উন্নীত করা হয়েছে।
এই লিখন পদ্ধতি পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্পকলায় প্রভাব বিস্তার করেছে। তার প্রমাণ আমরা পাই বিখ্যাত শিল্পী পল ক্লী’র বিভিন্ন চিত্রকর্মে। তার ‘ডকুমেন্ট’ বা দলিল নামে ছবিটির কতগুলো আরবি বর্ণমালা ছাড়া আর কিছু নয়। রেখাঙ্কনেও আমরা আরবি লিখন পদ্ধতির প্রভাব লক্ষ্য করি। আরবি ক্যালিগ্রাফি ইউরোপীয় শিল্পেও প্রভাব বিস্তার করেছে। আরবি না জেনেও ইউরোপীয়রা আরবি লেখার অনুকরণে নকশা করেছে। কাপড়ের বুননে ও নকশায় আরবি লিপিকলার অনুসরণ করার চেষ্ট করা হয়েছে।
আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম দিকপাল পাবলো পিকাসোর জন্ম স্পেনের আনদানুমিয়া অঞ্চলে। এই অঞ্চল আরবদের অধীন ছিল প্রায় ৭শ’ বছর। এখানকার নকশায় ইসলামী জ্যামিতিক মণ্ডনকলার প্রভাব খুবই স্পষ্ট। পিকাসোর ছবিতেও একসময় জ্যামিতিক নকশার প্রভাব দেখা যায়।
আধুনিক শিল্প আন্দোলনের বিখ্যাত শিল্পী আঁরি মাতিস তার ছবির অনুপ্রেরণা পান ইরানি গালিচা থেকে। তার ছবির রঙ ও ফর্ম গালিচা থেকে নেয়া। তিনি তার শিল্পে অবিমিশ্র রঙের পাশাপাশি সংস্থাপনের মাধ্যমে রঙের আবেদন ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিংশ শতাব্দীর চিত্রশিল্পে ইসলামী শিল্পের বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রভাব পড়েছে। বিমূর্ত শিল্পের জনক মন্ডিয়ন ক্যালিগ্রাফি শিল্পে মুগ্ধ হয়ে বিমূর্ত শিল্পের জন্ম দিয়েছেন। বিমূর্ত শিল্পের ফিগার নেই, ফর্ম আছে। শিল্পীরা ক্যালিগ্রাফির আদলে ফর্ম ব্যবহার করেছেন তাদের চিত্রকর্মে। বলা যেতে পারে পৃথিবীর শিল্পের বিমূর্ততার উদ্ভব এখান থেকেই।
পৃথিবীর সব দেশেই আজ ইসলামী শিল্প নিয়ে নিরীক্ষা চলছে, ধর্মগত কারণে নয়, শিল্পের বৈশিষ্ট্যগত কারণে। কাজেই ইসলামী শিল্পধারা একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী শিল্পধারা হিসেবে আজ পরিগণিত। অর্থাত্ কোরআনিক কালচারাল ক্যালিগ্রাফি নিয়ে বাংলাদেশেও ৭০ থেকে ৮০ দশক পর্যন্ত অনেক খ্যাতিমান শিল্পী কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে মুর্তজা বশীর, শামসুল ইসলাম নিজামী, খুরশিদ আলম, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, সাইফুল ইসলামসহ আরও অনেকেই। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তেমন বিকাশ ঘটেনি। ৯০’র দশক থেকে বাংলাদেশেও কোরআনিক কালচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয় অবশ্য এর সাহিত্য ও শিল্পের বিভিন্ন শাখায়। দেশের একদল তরুণ এই ধারা পুনর্জাগরণের আন্দোলনে নিয়োজিত। তারা শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে কাজ করতে থাকে। ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র নামক সংগঠন গড়ে ওঠে, যার রয়েছে শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের ১৭টি শাখা। তাদের উদ্দেশ্য ইসলামী কালচার তথা কোরআনিক কালচারকে সমৃদ্ধ করে ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য করা।
দেশের ক্যালিগ্রাফারদের নিয়ে গঠিত হয় ‘ক্যালিগ্রাফি সোসাইটি বাংলাদেশ’। পবিত্র সিরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ১০টি ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী জাতীয় জাদুঘর গ্যালারিতে পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। প্রচুর দর্শক-সমালোচকের মধ্যে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়, দেশের শীর্ষ পর্যায়ের শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন, মিডিয়াগুলোতে সাড়া পড়ে। এর ফলে সামাজিকভাবেই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ক্যালেন্ডার, ভিউকার্ড, গৃহসজ্জাসহ মসজিদ ডেকোরেশনে ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে এই শিল্পমাধ্যমটি নিয়ে এখন যারা কাজ করছেন তারা হচ্ছেন—মর্তু বশীর, ড. আবদুস সাত্তার, সৈয়দ এনায়েত হোসেন, বশীরউল্লাহ, রেজাউল করীম, ফরেজ আলী, সাইফুল ইসলাম, ইব্রাহীম মণ্ডল, আরিফুর রহমান, জাহাঙ্গীর হোসেন, আমিনুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম, শহীদুল এফ বারী, মাহবুব মোর্শেদ, কৃষান মুশাররফ, বশীর মেজবা, আবদুর রহীম, মুবাশ্বির মজুমদার, আমিনুল হক, মুস্তফা মারুফ, আবু দারদা, নিশার জামিল, ফেরদৌস আরা আহমদ ও ফেরদৌসী বেগম। প্রদর্শনীগুলোতে দর্শকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীর সংখ্যাও। শিল্পীরা শুধুু দেশে নয়, বিদেশি প্রদর্শনী ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করছে, পুরস্কারও পাচ্ছে। এতে বাংলাদেশে একটা সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে।
কোরআনিক কালচার এবং ইসলামী শিল্পের এই মাধ্যম ক্যালিগ্রাফি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে।
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে শিল্পীরা প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছেন। বিভিন্ন দেশের আমন্ত্রণে প্রদর্শনী ও সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইসলামিক কালচারের একটা সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে।
আজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বে সংস্কৃতির নামে চলছে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা। চলছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মুসলমানরা হচ্ছে জুলুম নির্যাতনের শিকার। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের কোরআনিক কালচারকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করি শিল্প শুধু শিল্পের জন্য নয়। শিল্প সত্যের জন্য, শিল্প সুন্দরের জন্য। ইসলামী শিল্প বিশেষ করে ‘ক্যালিগ্রাফি’ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, সুনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, শুভ চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে, মানব চরিত্র উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইসলাম মানুষকে শুদ্ধ করে এবং শুভ কাজে অনুপ্রাণিত করে। সুতরাং ইসলামের সঙ্গে যে শিল্পের সম্পর্ক সে শিল্প কল্যাণকর হবেই। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমান বিশ্বে ইসলামের পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় উত্সাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশেও ইসলামী কালচার ক্যালিগ্রাফি শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
তথ্যপঞ্জি
১. Civilization Past and Present.
২. ইন্দো মুসলিম আর্ট—ড. এনামারী সিমেল
৩. শিল্প, সাহিত্য, সাংহমলধতি—মাওলানা আবদুর রহীম
৪. মুসলিম শিল্পকলা—সৈয়দ আলী আহসান
৫. ইসলাম ও শিল্পকলা—সৈয়দ আলী আহসান
৬. ইসলামী শিল্পকলা—এবনে গোলাম সামাদ

Tuesday, July 24, 2012

রমজানের গুরুত্ব ও তাত্পর্য | শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক

রমজানুল মুবারক প্রতি বছর আসে উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য রহমত, মাগফেরাত ও কবর আজাব মুক্তির সুমহান বার্তা নিয়ে। এ মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় বান্দাদের জন্য খুলে দেন ফজিলতের অগণিত দ্বার। এ জন্য আমাদের সবার উচিত মহিমান্বিত এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।
রমজান মাসের ফজিলত ও বরকত সম্পর্কে রাসূলে করিম (স.)-এর অসংখ্য মহান বাণী তথা হাদিস ইরশাদ রয়েছে। যেমন বুখারি শরীফে ‘সওম’ তথা রোজা অধ্যায়ে প্রসিদ্ধ। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বরাতে বর্ণিত হয় : ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাস আরম্ভ হয়, তখন থেকে ঊর্ধ্ব জগতের (তথা রহমতের) দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয় (সে মতে বেহেশতের দরজাগুলোও খুলে দেয়া হয়) এবং জাহান্নামের সমুদয় দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় (অধিক দুষ্ট-ক্ষতিকর, নেতৃস্থানীয়)। শয়তানগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।
বক্ষমাণ হাদিসের এই বর্ণনায় ঊর্ধ্ব জগতের দরজাগুলো খুলে দেয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় রহমতের দরজা খোলার উল্লেখ আছে এবং আরেক বর্ণনায় বেহেশতের দরজা খোলার উল্লেখ আছে। সব বর্ণনার মূল তাত্পর্য একই। রমজান মাসে বিশেষরূপে অতিমাত্রায় এবং কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বিশেষত্ব লক্ষ্য না করে সর্বদা আল্লাহর রহমত ও নেয়ামতের প্রধান কেন্দ্র বেহেশতের দরজাগুলোও রমজান মাসের সম্মানার্থে খুলে রাখা হয়।
রমজান মাসের বিশেষত্ব হিসেবে বিশ্ববাসীর প্রতি যেমন রহমত অবতীর্ণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়, তেমনি রহমতের বিপরীত আল্লাহতায়ালার গজব ও আজাবের কারণ তথা শয়তানি আন্দোলন ও কার্যকলাপ কম করার ব্যবস্থাও করা হয়, বড় শয়তানগুলোকে বন্দি করে রাখা হয়।
আল্লাহতায়ালা সর্বশক্তিমান। শয়তানি আন্দোলন ও কার্যকলাপ সমূলে উচ্ছেদ করার ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে তিনি তা করতে পারেন। কিন্তু এতে জাগতিক জীবনের পরীক্ষার উদ্দেশ্য পণ্ড হয়, তাই আল্লাহতায়ালা তা করেন না। এ জন্যই ইবলিসের সাধারণ অনুচররা এবং মানুষের আকৃতিতে শয়তান প্রকৃতির ব্যক্তি ও মানুষের নফসে আম্মারা তদুপরি ১১ মাস শয়তানি আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া প্রভৃতির সক্রিয়তা বন্ধ করা হয় না। অবশ্য আল্লাহতায়ালা রমজান মাসের সম্মানার্থে স্বীয় বান্দাদের বিশেষ সুযোগ প্রদানার্থে নেতৃস্থানীয় বড় শয়তানগুলোকে বন্দি করেছেন। ফলে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়ার পথ ধরা সহজ হয়ে যায়। মানুষ যেন এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় না হারায়, সে জন্য করুণাময় আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে একজন ফেরেস্তা পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহর বান্দাদের প্রতিদিন এই আহ্বান জানাতে থাকে : ‘হে সত্যান্বেষী! সুপথের পথিক দ্রুত সম্মুখ পানে অগ্রসর হও; উন্নতি লাভ কর। হে কুপথগামী (হেলায় এ সুযোগ হারিও না)। এ পবিত্র রমজান মাসে স্বীয় আত্মসংশোধন ও পবিত্রতা লাভে সচেষ্ট হও এবং কুকার্য থেকে ক্ষান্ত হও, সতর্ক হও অর্থাত্ যেহেতু পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহতায়ালার রহমতের দরজাগুলো সর্বদা খোলা থাকে, রহমত লাভ করা সহজ-সুলভ হয়, তাই এ সুযোগের প্রতিটি মুহূর্তকে স্বীয় উন্নতির সম্বলরূপে গ্রহণ কর। আপন জীবনের উন্নতি সাধনে অগ্রসর হও, অগ্রণী হওয়ার চেষ্টা কর, যেরূপ কোনো ব্যবসায়ী স্বীয় ব্যবসার জন্য মৌসুম-সুযোগ ও মার্কেট, মেলা বা প্রদর্শনীকে উন্নতির বিশেষ সহায়ক ও সম্বলরূপে গ্রহণ করে থাকে।
পক্ষান্তরে রমজান মাসে অসত্যের ও কুপথের বড় আন্দোলনকারীরা আবদ্ধ রয়েছে, কুপথ থেকে ফিরে আসা ও কুকার্যকে ত্যাগ করা অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য হয়েছে। অসংখ্য বাধা-বিপত্তির উপশম হয়েছে ফেরার পথের বেড়াজালগুলোর লাঘব ঘটেছে। এই সুবর্ণ সুযোগকে হেলায় হারিও না। এই সোনালি সময়কে চৈতন্যহীন অবস্থায় অতিবাহিত কর না। সুযোগের সদ্ব্যবহার কর, অতীত জীবনের অন্ধকারময় পথে আর অগ্রসর হয়ো না! থামো। এই সুযোগে পেছনে ফেলে আসা আলোর পথে ফিরে আস।
আল্লাহতায়ালা কত মেহেরবান, করুণাময়! স্বীয় বান্দাদের সুযোগ দান করে সেই সুযোগের ঘোষণা এবং আহ্বান জানাচ্ছেন। শুধু এক দু’বার নয়, বরং সুযোগের প্রতিটি দিনই এই আহ্বান আসতে থাকে। যাদের রুহানি শ্রবণশক্তি আছে, তারা সরাসরি সেই আহ্বান শুনতে পারেন। যারা সেই স্তরে পৌঁছতে পারেননি, আল্লাহতায়ালা তাদের সত্য রাসুলের মারফত সেই আহ্বানের সংবাদ পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও ফজিলতপূর্ণ। তাই এ মাসের প্রতিটি ক্ষণ যাতে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। রমজান মাসে যাতে অবশ্যই কোনো ফরজ ইবাদত নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে যেমনি সচেতন থাকতে হবে, তেমনি নফল ইবাদতগুলোও বেশি বেশি আদায় করতে হবে।
নফল ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে মহত্তম ইবাদত হলো আল-কোরআন তেলাওয়াত, যে সব ফাজায়েলের কারণে রমজান মাস এত বরকতপূর্ণ মাসে পরিণত হয়েছে, তার মাঝে অন্যতম একটি কারণ এই যে, এই মাসে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তার প্রিয় রাসুল (সা.)-এর ওপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআন নাজিলের মাস এই রমজানে সবার উচিত বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে রমজানের পালিত ইবাদতের সওয়াব ও প্রতিদান অনেক অনেক বেশি। হাদিস শরীফে এসেছে—অন্য যে কোনো সময়ের ফরজের যে সওয়াব রমজানের নফল পালনে সে সওয়াব পাওয়া যায়। সুতরাং ফরজ আদায়ের পাশাপাশি অধিক পরিমাণে নফলও আদায় করা দরকার।
এবাদত পালনের পাশাপাশি সব প্রকার পাপাচার ও গুনাহ থেকেও আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এ মাসে যাতে একটি গুনাহও না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, বিশেষত রোজা অবস্থায় যাতে কোনো গুনাহ না হয় এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আল্লাহপাক আমাদের রমজানের বরকত ও ফজিলত পরিপূর্ণ নসিব করুন এবং রোজাকে যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন ছুম্মা আমিন। 
অনুলিখন : মাওঃ গাজী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ
সূত্র : আমার দেশ

শ্রমিকের শ্রম কমিয়ে দিন রমজানে | মাওলানা মুহাম্মাদ

 খোদাভীতি ও তাকওয়া অর্জনের অপূর্ব সুযোগের মাস রমজান। আমাদের মুত্তাকি হওয়ার জন্যই আল্লাহতায়ালা আমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। কালামে পাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন—“হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পার” (বাকারা-১৮৪)। মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের অত্যন্ত কার্যকরী ও সহজ মাধ্যম হলো রোজা। রহমত, বরকত ও নাজাতের এ মাসে বড় বড় আমলের পাশাপাশি ছোট ছোট বহু আমলের মাধ্যমে আমাদের নাজাতের পথ সহজ করে দিয়েছেন। খুলে দিয়েছেন দুর্বল মানুষের মুক্তির অসংখ্য পথ। ঘোষণা করেছেন, ছোট ও সহজ একটি আমলও আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং নাজাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। একটি আমল হচ্ছে, কাজের লোক ও অধীনস্থদের প্রতি সদয় হওয়া। হজরত সালমান ফার্সি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে দাস,-দাসীদের, কাজের লোকদের কাজের বোঝা হালকা করে দেয়; আল্লাহ তাদের মাফ করে দেন এবং দোজখের আজাব থেকে নাজাত দান করেন।’ (মেশকাত, বায়হাকি)। ছোট্ট এই আমলটা ইচ্ছা করলে সহজেই আমরা করতে পারি। একটু লক্ষ্য করলেই হয়, আমার বাড়ির কাজের ছেলেটি বা মেয়েটির কাজ যদি সামান্য কমিয়ে দিই, তার প্রতি একটু সদয় হই; অফিসে কিংবা দোকানে যে লোকটি আমার অধীনে কাজ করে ইচ্ছা করলেই তার মাধ্যমে আমি নিশ্চিত দুটি পুরস্কার লাভ করতে পারি। ১. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ২. জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি। কত সহজ এ আমল! আমলের জন্য আপনার ইচ্ছেই যথেষ্ট। কাজের তাগিদে রমজানেও আমাদের যথারীতি ঘরের বাইরে যেতে হয়; সব সময়ের রুটিনের কাজ আনজাম দিতে হয়। নিজেদের দুর্বলতার দরুন অন্যের সহযোগিতা নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি এ হাদিসের কথা মনে রাখি তবে আমল করা খুবই সহজ। ধরুন, রিকশায় উঠে রোজাদার রিকশাচালকের প্রতি সদয় হয়ে একটু আস্তে চালাতে বললাম, সম্ভব হলে ভাড়াটাও একটু বাড়িয়ে দিলাম, এ মাসে কাজের লোকদের বেতনের প্রতি যথাসম্ভব বাড়তি খেয়াল রাখলাম। এভাবে কেউ যদি রাসুলে আরাবির এ হাদিস স্মরণ রাখেন এবং আমলের সুযোগ খুঁজতে থাকেন, দেখা যাবে নিজের অজান্তেই মাহে রমজানের এক একটি দিনের ছোট ছোট আমল তার জন্য বয়ে নিয়ে আসবে চূড়ান্ত সফলতা। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা অন্যের বেলায় এ কাজগুলো করি কিন্তু নিজের খুব কাছের-ঘরের মানুষের বেলায় তা ভুলে যাই। নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আচরণে সাধারণ সৌজন্যটুকুর কথাও মনে থাকে না। এদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি কাম্য।
মাহে রমজান আমাদের সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও সহমর্মী জীবনযাপনের মাধ্যমে সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাকওয়া হাসিলের পথ সহজ ও সুগম করে তুলুক। আমীন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষক
সূত্র : আমার দেশ

Thursday, June 14, 2012

বাবা-মা বৃদ্ধ হলে তাঁদের প্রতি কেমন আচরণ করা উচিত | সালেহ আহমদ


আজকে যারা মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান কালকে তারাই হবে সন্তানের মাতা-পিতা। সুতরাং আজকের অবাধ্য সন্তান কালকে কখনও বাধ্য, অনুগত ও সৎ সন্তান নিজেদের জন্য কামনা করতে পারে না। আজকের অধিকাংশ সন্তানই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে জ্ঞান আহরণ করছে। ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করছে; তথাপি দেখা যায় তারা তাদের মাতা-পিতার প্রতি যথার্থ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইউরোপ আমেরিকায় দেখা যায় বৃদ্ধ মাতা-পিতার জন্য সরকারি আশ্রম খোলা হয়েছে। মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের অনীহা অযত্ন ও ভালোবাসার অভাবে ওই দেশের সরকার বৃদ্ধদের জন্য এরকম আশ্রম খুলতে বাধ্য হয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এরকম আশ্রম রয়েছে। আমাদের দেশেও দেখা যায় অনেক ছেলে বিয়ে করার পর মাতা-পিতাকে ফেলে নিজের সংসার নিয়ে আলাদা বসবাস করছে। কোন মুসলমান সন্তানের আচরণ এমন হতে পারে না! অথচ আমরা মুসলমান হয়েও এরকম আচরণ করছি। মাতা-পিতার অবাধ্য হচ্ছি, তাদের অযত্ন অবহেলা করছি। শুধু টাকা-পয়সা দিয়ে মাতা-পিতাকে সাহায্য করলেই তাদের প্রতি দায়িত্ব সম্পন্ন হয় না। এখন আমরা পবিত্র কোরআনের আলোকে এ বিষয়ের ওপর আলোচনা করব।
সুরা বনি ইসরাইলে ২৪নং আয়াতে আল্লাহপাক নির্দেশ দিচ্ছেন,
‘তোমাদের পিতা-মাতা বার্ধক্যে পৌঁছলে তাদের প্রতি সদাচরণ করবে। (এমনকি) তাদের উদ্দেশ্যে উহ্ শব্দটি পর্যন্ত করবে না। তাদের ধমক দেবে না বরং কথা বলবে আদবের সঙ্গে বিনয়, নম্র ও অনুকম্পিত থেকে। তাদের জন্যে আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর এভাবে, ওহে আমার প্রতিপালক তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর সেভাবে যেভাবে তারা শিশু ও শৈশবে আমাদেরকে লালন পালন করেছেন।’ মাতা-পিতার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা, তাদের হুকুম মান্য করা, তাদের যত্ন করা, তাদের ভালোবাসা, তাদের প্রতি শোকর ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ইত্যাদি বিষয়কে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ফরজ করে দিয়েছেন। (দেখুন- আনকাবুত- ৮, আহ্কাফ-১৫, বাকারা- ৮৩, নিসা- ৩৬, আনয়াম- ১৫১, লুকমান - ১৪, মরিয়ম- ১২, ১৩, ১৪, ৩০, ৩১, ৩২ ইত্যাদি)। পবিত্র কোরআন দৃষ্টে নবীদের (আ.) জীবনীতে দেখা যায় তাঁরা তাঁদের মাতা-পিতার অনুগত এবং বাধ্য ছিলেন এবং তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মাতা-পিতার আদব, সম্মান এবং তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করাকে প্রতিটি মুসলমানের এবাদতের সঙ্গে শামিল করে ফরজ করে দিয়েছেন। যেমন সুরা লোকমানের ১৪নং আয়াতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের সঙ্গে মাতা-পিতার শুকরিয়া আদায় করাকেও আল্লাহতালা ফরজ ঘোষণা করেছেন। মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ না হলে শত এবাদত করেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া যায় না একথা পবিত্র কোরআন এবং হাদিস শরিফ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। মাতা-পিতা যদি কাফের মুশরিকও হয় তবুও আল্লাহপাক এ দায়িত্ব থেকে কোন মুসলমান তথা মানব সন্তানকে রেহাই দেননি। যেমন কুরতুবি এ বিষয়ের সমর্থনে বোখারির একটি হাদিস উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন- হজরত আসমা (রা.) রাসূলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, আমার জননী মুশরিকা। তিনি আমাকে দেখতে আসেন। তাকে আদর-আপ্যায়ন করা জায়েজ হবে কি? প্রিয়নবী (সা.) বললেন, অবশ্যই তুমি তোমার মাকে আদর-যত্ন করবে। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে নির্দেশ আছে, পিতা-মাতা যদি তোমাদের কাফের হতে আদেশ করে তা তোমাদের পালন করা জায়েজ নয়। তবে দুনিয়াবি যাবতীয় সদ্ব্যবহার তাদের সঙ্গে বজায় রাখবে। জেহাদে অংশগ্রহণ করার চেয়েও মাতা-পিতার সেবাযত্নে অংশগ্রহণ করা উত্তম। বুখারিতে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এক ব্যক্তি জেহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে বললেন, তোমার ঘরে কি তোমার মাতা-পিতা আছে? সে বলল, জি হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে তুমি তোমার মাতা-পিতার সেবাযত্ন করেই জেহাদে অংশগ্রহণ কর। সুলতানুল আরেফিন হজরত বায়েজিদ বোস্তামির (রা.) মাতৃভক্তির কথা আমরা অনেকেই জানি, এক রাতে জননী নিদ্রারত অবস্থায় পানি চাইলে বায়েজিদ দেখলেন ঘরে পানি নেই। তিনি কলসি নিয়ে ঝরনায় পানি আনতে গেলেন। এসে দেখলেন মা জননী ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি পানির পাত্র নিয়ে মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলেন। কখন মা জননী আবার পানি চাইবেন এবং তৎক্ষণাৎ তাকে পানি দিতে হবে। এভাবে সারারাত দাঁড়িয়ে রইলেন। সকাল হলে মা জননী দেখলেন তার আদরের সন্তান তার শিয়রে পানি হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছেলের মাতৃভক্তির কথা মাতার জানতে আর বাকি রইল না। হাত তুলে পুত্রের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। আল্লাহপাক মায়ের দোয়া কবুল করলেন। বায়েজিদ হয়ে গেলেন জগৎ বিখ্যাত অলি আল্লাহ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথাও আমরা জানি। তিনি মায়ের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সাঁতরিয়ে উত্তাল নদী উত্তরণ করে মায়ের কাছে হাজির হয়েছিলেন। আমাদের সন্তানদের এসব দৃষ্টান্ত স্মরণ রাখা উচিত। এভাবেই একজন মানুষ আদর্শ মানুষ হতে পারে।

Friday, June 8, 2012

পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের দিকনির্দেশনা | মুহাম্মদ আমিনুল হক

বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ চলছে। প্রত্যেক বছর পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে চলছে অনেক প্রোগ্রাম। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক দেশই এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। অনেকেই আতঙ্কে আছেন ভবিষ্যত্ বিপর্যয়ের কথা ভেবে। ২০০৯ সালের ১৭ অক্টোবর মালদ্বীপে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে সাগরের তলদেশে ব্যতিক্রমধর্মী মন্ত্রিসভার বৈঠকের আয়োজন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে মালদ্বীপ রাষ্ট্রটি পানির নিচে হারিয়ে যেতে পারে, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা যদি কোরআন-হাদিস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই পরিবেশ সংরক্ষণকে বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চৌদ্দশ’ বছর আগে এ ব্যাপারে ইসলাম যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে তা আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি।
পরিবেশ কী : পরিবেশ হলো কোনো স্থান বা অঞ্চলের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, যার মধ্যে বসবাস করে মানুষ জীবনধারণ করে। অর্থাত্, পরিবেশ বলতে একটি এলাকার সামগ্রিক প্রাকৃতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থানকে বোঝায়, যার মধ্যে বসবাস করে ওই স্থানের জনগণ জীবিকা নির্বাহ করে। জলবায়ু, ভূ-প্রকৃতি, নদ-নদী, জলাশয়, বনভূমি, ভূমির উর্বরতা, প্রাকৃতিক অবস্থা এবং সরকার, রাজনীতি, জাতি, ধর্ম, জনসংখ্যা, শিক্ষাদীক্ষা, প্রভৃতি অপ্রাকৃতিক অবস্থা নিয়ে গঠিত হয় কোনো স্থানের পরিবেশ। আমরা এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
ইসলামে পরিবেশের গুরুত্ব : ইসলাম পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মিসরের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা সাইয়েদ তানতাবী তাঁর এক বইতে লিখেছেন যে, আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের মধ্যে পাঁচ শতবার পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য উত্সাহিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে বলেছেন, এই পৃথিবী তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা একে আবাদ কর। তিনি বলেন : ‘তিনিই যমীন হতে তোমাদেরকে পয়দা করেছেন এবং তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন’ (সুরা হুদ : ৬১)। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবী আবাদ হতে পারে; মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে পারে। আর পরিবেশ যখন সংরক্ষণ করা হবে না তখন এই দুনিয়া বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
জলবায়ু : পৃথিবী মানুষের বসবাসযোগ্য থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বস্তু হচ্ছে পানি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ষাটটি আয়াতে পানির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : ‘সারা পৃথিবীর যত বস্তু সবগুলো আমি তৈরি করেছি পানি হতে’ (সুরা আল আম্বিয়া : ৩০)। দুনিয়ায় যা কিছু প্রাণ পেয়েছে তা কেবল পানি থেকেই পেয়েছে। তাই পানি আমাদের জীবনে মহামূল্যবান সম্পদ। বর্তমান বিজ্ঞান কোরআনের তত্ত্বকে গ্রহণ করেছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় প্লাটাপ্লাজম থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের সৃষ্টি। আর প্লাটাপ্লাজমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি এমন একটি উপাদান যাতে রয়েছে কিছুটা আর্দ্রতা ও কিছুটা পানি। পানি একটি মৌলিক উপাদান। এই উপাদানকে সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (স.) পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে বলেছেন।
পাহাড়-পর্বত : আল্লাহতায়ালা পাহাড়-পর্বতকে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে পাহাড়-পর্বতের কথা বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা পাহাড়-পর্বত সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন : ‘আর পাহাড়কে আমি পেরেক হিসেবে সৃষ্টি করেছি’ (সুরা আন নাবা : ৭)।
পাহাড়-পর্বত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। জমিনকে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচানোর জন্যই এই পাহাড়ের সৃষ্টি। আল্লাহতায়ালা গোটা দুনিয়াকে হেফাজতের জন্য যেখানে যতটুকু পাহাড় তৈরি করা দরকার সেখানে ততটুকু তৈরি করেছেন। বর্তমানে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পাহাড় কাটাকে পরিবেশের জন্য হুমকি মনে করছেন। সব দেশেই পাহাড়-পর্বত কাটা নিষিদ্ধ।
গাছপালা : গাছপালা ও বনজঙ্গল আমাদের জীবনে আল্লাহর বড় দান। আল্লাহতায়ালা এগুলো দান করে আমাদের জীবনকে ধন্য করেছেন। গাছপালা, বনজঙ্গল, তরুলতা ও উদ্ভিদ মানুষের জীবনের বড় অনুষঙ্গ। মানুষের জীবন এগুলো ছাড়া কল্পনা করা যায় না। প্রাণীকূল অক্সিজেন ছাড়া বাঁচে না। আর এ অক্সিজেনের সম্পূর্ণটাই আসে গাছপালা থেকে। গাছ ছাড়া মানুষের জীবন তাই অর্থহীন। মানুষের পরম বন্ধু এ গাছ সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসুল (স.) আমাদেরকে বৃক্ষরোপণ ও এর যত্ন নিতে বলেছেন।
জীববৈচিত্র্য : আল্লাহপাক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পাখ-পাখালী, পশু, হিংস্র জন্তু, বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছু সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়। যেই এলাকার জন্য যতটুকু বিষাক্ত জন্তু সৃষ্টি করা প্রয়োজন আল্লাহ ততটুকুই সৃষ্টি করেছেন। এরা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ধ্বংস করে। এজন্য নবী (স.) বিষাক্ত সাপকেও বিনা কারণে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। অতএব, আমরা যদি পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা মানতে পারি তাহলে আমাদেরই কল্যাণ হবে। অন্যথায় আমরা নিজেরাই আমাদের মরণ ডেকে আনব। আমাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পতিত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

সুত্র : আমার দেশ

ইখলাস : সৎকর্মেরর প্রাণ | কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক

প্রতিটি কাজের ধারণা অথবা আদেশ অথবা প্রারম্ভ প্রক্রিয়া যেখান থেকেই আসুক না কেন, সিদ্ধান্ত নিতে হয় ব্যক্তিকেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে এ নিয়ে ভাবতে হয়, ভালো-মন্দ ফলাফলেরও একটা অগ্রিম রূপ দেখে নেয় মনে মনে। এঁকে নেয় কর্মনীতি ও কর্মপন্থার রূপরেখা। তবে সবকিছুই নির্ভর করে এমন এক মৌলিক গুণের ওপর, যার নাম নিয়ত বা সংকল্প অথবা ইচ্ছা। এই নিয়ত বা ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতেই মোড় নেয় কাজের ধরন, গতি, ধারা এবং ফলাফল। ভালো ও মন্দ কাজের শুরুটা মূলত নিয়তের দ্বারাই হয় এবং ইচ্ছার প্রভাবেই বিভাজিত হয়।
ইখলাস বলতে যা বোঝায় তা হলো ইচ্ছার স্বচ্ছতা বা একনিষ্ঠতা। পৃথিবীর যে কোনো আদর্শে, যে কোনো কাজে—চাই তা ভালো হোক কিংবা মন্দ, ইখলাসই পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের দোরগোড়ায়। দোরগোড়ায় এ জন্য যে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো কার্যের সফলতা ভাগ্যে না থাকলে সঠিক ইখলাস ও কর্মতত্পরতা সত্ত্বেও ব্যক্তি ব্যর্থ হয়। এটা একান্তই তাকদিরের বিষয়। কিন্তু ব্যক্তির উচিত যে কর্ম সাধন করার ইচ্ছা বা নিয়ত করেছে, তাতে পরিপূর্ণ আন্তরিক হওয়া, বিশুদ্ধতা পোষণ করা। আর সত্ কার্যাবলীর ক্ষেত্রে তো এর কোনো বিকল্প নেই। কেননা, সত্ কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার প্রধান শর্তই হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, সব কাজের প্রতিফল কেবল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিয়ত অনুসারে তার কাজের প্রতিফল পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সন্তুষ্টির) জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ ও রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। পক্ষান্তরে যার হিজরত দুনিয়া হাসিল করা কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হবে, তার হিজরত সে লক্ষ্যেই নিবেদিত হবে। [বুখারি : ১/২(১), মুসলিম : ৬/৪৮(১৯০৭)] পবিত্র কোরআনে ইখলাস সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। যথা—বলো, ‘তোমরা কি আমাদের সঙ্গে আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করছ অথচ তিনি আমাদের রব ও তোমাদের রব? আর আমাদের জন্য রয়েছে আমাদের আমলগুলো এবং তোমাদের জন্য তোমাদের আমলগুলো এবং আমরা তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ। ( সূরা বাকারা : ১৩৯ ) অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন—জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদত—আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে, আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। (সূরা আয-যুমার : ৩) ‘নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না। (১৪৫) তবে যারা তাওবা করে নিজদের শুধরে নেয়, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং আল্লাহর জন্য নিজেদের দীনকে খালেস করে, তারা মুমিনদের সঙ্গে থাকবে। আর অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের মহাপুরস্কার দান করবেন। (১৪৬) ( সূরা আন-নিসা : ১৪৫-১৪৬)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—‘তুমি কি দেখনি যে, নৌযানগুলো আল্লাহর অনুগ্রহে সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তাঁর কিছু নিদর্শন তোমাদের দেখাতে পারেন। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। আর যখন ঢেউ তাদের ছায়ার মতো আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদের উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ (ঈমান ও কুফরির) মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফির ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না। (সূরা লুকমান : ৩১-৩২)
কর্মের সঙ্গে ইখলাসের সংযোজন যে কত বড় মহা সাফল্য এনে দিতে পারে মুমিনের ইহ ও পরজীবনে, তা নিম্নের হাদিস থেকে অনুধাবন করা যাবে : ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : (রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রব থেকে বর্ণনা করেছেন : তিনি বলেন, আল্লাহ্ ভালো এবং মন্দ লিখে দিয়েছেন, তারপর তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। অতএব, যে কেউ কোনো সত্কাজের ইচ্ছা করে তা না করলেও আল্লাহ তাকে পূর্ণ কাজের সওয়াব দেবেন। আর যদি সে সত্ কাজের ইচ্ছা করে এবং বাস্তবে তা করেও ফেলে, আল্লাহ্ তার জন্য দশ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত; এমনকি এর চেয়েও অধিক সওয়াব লিখে দেন। আর যে কেউ কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছা করার পর যদি তা না করে, তবে আল্লাহ্ তার বিনিময়ে তাকে পূর্ণ কাজের সওয়াব দেন। পক্ষান্তরে যদি সে মন্দ কাজের ইচ্ছা করে এবং কাজটা করেই ফেলে, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য একটি মাত্র গোনাহ্ লেখেন।) [বুখারি : ৬৪৯১, মুসলিম : ১৩১]
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—একটি সেনাদল কাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আক্রমণ চালাতে যাবে। তারা যখন সমতলভূমিতে পৌঁছবে, তখন তাদের সামনের ও পেছনের সব লোকসহ ভূমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে। হজরত আয়েশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন : হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে আগের ও পরের সব লোকসহ তাদের ধসিয়ে দেয়া হবে? যখন তাদের মধ্যে অনেক শহরবাসী থাকবে এবং অনেকে স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে তাদের সঙ্গে শামিল হবে না? রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আগের ও পরের সব লোককেই ভূমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর লোকদের নিয়ত অনুসারে তাদের পুনরুত্থিত করা হবে। [বুখারি : ৩/৮৬(২১১৮) ও মুসলিম : ৮/১৬৮ (২৮৮৪)] এখানে শব্দাবলী শুধু বুখারি থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক যুদ্ধে শরিক হলাম, তখন তিনি বলেন, মদিনায় এমন কিছু লোক রয়েছে, তোমরা যেখানেই সফর কর এবং যে উপত্যকা অতিক্রম কর, সেখানেই তারা তোমাদের সঙ্গে থাকে। রোগ-ব্যাধি তাদের আটকে রেখেছে। (মুসলিম) অন্য বর্ণনা মতে, তারা সওয়াবে তোমাদের সঙ্গেই শরিক থাকবে। ইমাম বুখারি এই হাদিসটি হজরত আনাস (রা.) থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : আমরা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তিনি বলেন : আমরা মদিনায় আমাদের পেছনে এমন কিছু লোক রেখে গিয়েছিলাম, আমরা যে গিরিপথ এবং যে ময়দানই অতিক্রম করেছি, তারা (যেন) আমাদের সঙ্গেই ছিল। এক ধরনের ওজর তাদের আটকে রেখেছে।
হজরত আবু ইসহাক সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্ আস (রা.) বর্ণনা করেন : “আমি বিদায় হজের বছরে খুব কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজখবর নিতে এলেন। আমি নিবেদন করলাম : হে আল্লাহর রাসুল! আমার রোগের তীব্রতা আপনি লক্ষ্য করছেন। আমি অনেক ধন-মালের অধিকারী। কিন্তু আমার উত্তরাধিকারী শুধু আমার মেয়েই। এ অবস্থায় আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদকা করে দিতে পারি? রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘না’। আমি নিবেদন করলাম : ‘তাহলে অর্ধেক পরিমাণ (দান করে দেই)? তিনি বলেন : না। আমি আবার নিবেদন করলাম, ‘তাহলে এক-তৃতীয়াংশ (দান করে দেই)? তিনি বলেন : ‘হ্যাঁ, এক-তৃতীয়াংশ দান করতে পার।’ অবশ্য এটাও অনেক বেশি অথবা বড়। তোমাদের উত্তরাধিকারীদের একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় না রেখে তাদের বিত্তবান অবস্থায় রেখে যাওয়াই শ্রেয়, যেন তাদের মানুষের সামনে হাত পাততে না হয়। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছুই ব্যয় করবে, এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে খাবার তুলে দেবে, তার সবকিছুরই সওয়াব (প্রতিদান) তোমাকে দেয়া হবে। এরপর আমি (বর্ণনাকারী আবু ইসহাক) বললাম : হে আল্লাহর রাসুল! আমার সঙ্গী-সাথীদের (মদিনায়) চলে যাওয়ার পর আমি কি পেছনে (মক্কায়) থেকে যাব? তিনি বললেন: পেছনে থেকে গেলে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কাজই করবে, তাতে তোমার সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত বেড়ে যাবে। আশা করা যায়, তুমি দীর্ঘ জীবন লাভ করবে। ফলে কিছু লোক তোমার দ্বারা উপকৃত হবে, আবার অন্য কিছু লোক তোমার দ্বারা কষ্ট পাবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবিদের হিজরত পূর্ণ করে দাও এবং তাদের ব্যর্থতার কবল থেকে রক্ষা কর।” তবে সা’দ ইবনে খাওলা যথার্থই কৃপার পাত্র। মক্কায় তার মৃত্যু ঘটলে রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মর্মে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন যে, তিনি হিজরতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। [বুখারি : ১/২২(৫৬) ও মুসলিম : ৫/৭১(১৬২৮)(৫)]
ভালো কাজ কমবেশি সব মানুষই করে থাকে। যারা দুনিয়ার জীবনকেই একমাত্র জীবন মনে করে, মৃত্যুকেই মানবের নিঃশেষ বলে বিশ্বাস করে কিংবা সত্য দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের সত্কর্মের ফলাফল কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ্ দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। কেননা, আখেরাতে প্রতিদান পেতে হলে শর্ত হলো সত্কর্মের সঙ্গে ঈমানের সংযুক্তি। অতএব, যারা সত্কর্ম শুধু জনকল্যাণ, সততার বহিঃপ্রকাশ কিংবা একান্ত নিজস্ব প্রয়োজনে সম্পাদন করে থাকে তারা পার্থিবতায় যা পায় একজন ঈমানদার ব্যক্তিও তা থেকে বঞ্চিত হন না। পার্থক্য হলো মুমিন ব্যক্তি তার ঈমানের দাবি হিসেবে, তার প্রভুর আদেশ হিসেবে এবং তার আখিরাতের পুঁজির অতিরিক্ত কিছু হিসেব করেই সত্কর্মের নিয়ত বা ইচ্ছা করে থাকে। তাই উভয়ের কর্ম এক হলেও প্রতিদানের পার্থক্য ব্যাপক। তদুপরি মুমিনদের মধ্য থেকে কেউ যদি সত্কর্মের জন্য অসত্ নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ না করে, কপটতা করে, কূটকৌশল সম্পাদনের জন্যই সত্কর্ম করে কিংবা ইত্যকার যাবতীয় ইখলাস পরিপন্থী ইচ্ছার ফলে সত্কর্ম সম্পাদন করে, তবে তার এই সত্কর্ম দুনিয়ার উদ্দেশ্য সফল করতে পারলেও আখেরাতে তা কোনোই কাজে আসবে না; বরং অসত্ উদ্দেশ্যে সাধিত সত্কর্মই তার জন্য পাপ বয়ে আনবে ও জাহান্নামের কারণ হয়ে যাবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

সূত্র : আমার দেশ

Thursday, January 26, 2012

ইসলামে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন || শাহ আব্দুল হান্নান

সমাজে নারীর অবস্থান এবং অধিকার নিয়ে আমরা নানা কথা শুনে থাকি৷ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বর্তমানে যে কথাগুলো বলা হয় , তার মধ্যে অনেকগুলোই গ্রহণযোগ্য৷ আবার কিছু কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ আছে৷ নারী-পুরুষ সকলেরই অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া অনস্বীকার্য৷ কারণ সমাজ দিনে দিনে সামনে এগুচ্ছে৷ তাই শুধু নারী বা পুরুষের নয়, বরং সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে৷
গত পঞ্চাশ বছরে সমাজ অনেকটা এগিয়েছে৷ এ সময়ে পুরুষের সাথে নারীরাও সমান-সমান না হলেও, এগিয়ে এসেছে৷ বেগম রোকেয়ার সময়ে যে সমাজ ছিল , সে সমাজকে আমরা অনেক পেছনে ফেলে এসেছি৷ তিনি দেখেছিলেন যে, সে সময়ে মেয়েরা লেখাপড়ার কোন সুযোগই পেতনা৷ সে সময়ে বেগম রোকেয়া জন্ম না নিলে এবং নারী শিক্ষার ব্যাপারে সাহসী উদ্যোগ না নিলে আজ আপনারা, নারীরা কেউই কিন্তু পড়ালেখা শিখতে পারতেন না৷ অবশ্য আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই তখন অন্য কোন নারীকে পৃথিবীতে পাঠাতেন যিনি এই কাজটি করতেন৷ যা হোক, আমি সেদিকে গেলাম না৷ কারণ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমার আলোচনা শেষ করতে চাই৷
সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে আমাদের দেশে মানুষের উপর, বিশেষ করে নারীর উপর যে অত্যাচার চলছে তার একটা ফাউন্ডেশন আছে , ভিত্তি আছে৷ অত্যাচারটা আকাশ থেকে আসছে না৷ নারীর উপরে পুরুষের , কোন কোন ক্ষেত্রে নারীর যে অত্যাচার তার 'আইডিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশন' টা হলোঃ সাধারণভাবে মানুষ বিশ্বাস করে- বিশেষ করে পুরুষরা বিশ্বাস করে যে- নারী পুরুষের চেয়ে ছোট , তাদের কোয়ালিটি খারাপ এবং তারা নিচু৷ এই বিশ্বাস অবশ্য নারীর মধ্যেও কিছুটা বিদ্যমান৷ মানুষের মধ্যে কতগুলো বিভ্রান্তি থেকে এ বিশ্বাসের জন্ম৷ আর এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে নারীর উপর অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন৷
এখন আমাদের দেশ থেকে যদি নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হয়, তবে ইসলামকে বাদ দিয়ে তা করা যাবে না৷ আমি এটা খুব পরিষ্কারভাবে আপনাদের বলতে চাই যে , ইসলামকে বাদ দিয়ে আমাদের মত দেশে (যে দেশে মূলত নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম) চলা যাবে না৷ যারা ইসলাম থেকে বিদ্রোহ করেছে তারা কিন্তু টিকতে পারেনি , পারছে না৷ এক মহিলা বিদ্রোহ করেছিলেন-আমি নাম বলবো না- তার পরিণতি ভাল হয়নি৷ খারাপ হয়েছে৷ বিনীতভাবে বলতে চাই যে , ইসলামের 'ফ্রেমওয়ার্ক'- এর মধ্যে আমরা যদি এগুতে পারি, তবে তা সব চাইতে ভাল হবে৷ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ইসলামে এরকম একটি 'ফ্রেমওয়ার্ক' আছে, যা নারীদের সামনে এগিয়ে দিতে পারে৷
আমি ইসলামকে বিকৃত করতে চাইনা, বিকৃত করার পক্ষেও নই এবং ইসলামের কোনো টেম্পোরারী ব্যাখ্যা দেয়ার পক্ষে নই৷ সত্যিকার অর্থেই ইসলাম নারীকে ক্ষমতায়িত করেছে এবং নারীকে সম্মানিত করেছে৷ নারীকে অধিকার দিয়েছে৷ সেগুলো ব্যাখ্যা করার আগে আমি আইডিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশন-এর নতুন ভিত্তি যেটা হতে পারে সেটা বলতে চাই৷
কি সেই ভিত্তি? যে ভিত্তির ওপর নারী-পুরুষের মৌলিক সাম্য বিদ্যমান? আল্লাহ মানুষের চেহারা এক রকম করেন নাই৷ সকল দিক থেকে রহ in every dot যে কোনো দু'টি মানুষ সমান নয়৷ ওজন, উচ্চতা, রঙ, শিক্ষা ইত্যাদি সবকিছুতে একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ আলাদা৷ কিন্তু মৌলিকভাবে প্রতিটি মানুষ সমান৷ আল্লাহ্র কাছে সমান৷ তার চারটি প্রমাণ আমি আপনাদের দিচ্ছি৷
১. আল্লাহ তায়ালা এ কথা খুব স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, মূল মানুষ হচ্ছে ' রূহ' ৷ যাকে আমরা ' আত্মা' বলি৷ মূল মানুষ কিন্তু শরীর না৷ দেহ তো কবরে পঁচে যাবে৷ আমরা যারা ইসলাম বিশ্বাস করি তারা জানি , মূল মানুষ হচ্ছে ' রূহ' ৷ আল্লাহ সকল মানুষকে, তার রূহকে একত্রে সৃষ্টি করেন, একই রকম করে সৃষ্টি করেন এবং একটিই প্রশ্ন করেন৷ আল্লাহর প্রশ্নের উত্তরও নারী-পুরুষ সকলে একই দিয়েছিল৷ আমি সূরা আরাফের একটি আয়াত বলিঃ ( বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) ' ওয়া ইজা আখাজা রাব্বুকা' ( যখন আল্লাহ তায়ালা বের করলেন), ' মিম বানি আদামা' ( আদমের সন্তানদের থেকে), ' মিন জুহুরিহিম' ( তাদের পৃষ্ঠদেশ থেকে-এটা একটা রূপক কথা) ' জুররিয়াতাহুম' ( তাদের সন্তানদেরকে৷ অর্থাত্‍ সকল আত্মাকে) এবং সাক্ষ্য নিলেন তাদের ওপরে , 'আমি কি তোমাদের প্রভু নই?' তারা সকলে বললো- সকল পুরুষ এবং নারী বললো, ' বালা' ( হ্যাঁ), ' সাহেদনা' ( আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আমাদের প্রভু)৷ ( আয়াত নং-১৭২, সূরা আরাফ) তার মানে আল্লাহ্র সঙ্গে একটি পয়েন্টে সকল নারী এবং পুরুষের একটি চুক্তি হলো যে, আপনি আমাদের প্রভু; আমরা আপনাকে মেনে চলবো৷ এক্ষেত্রে পুরুষের চুক্তি আলাদা হয়নি৷ নারীর চুক্তি আলাদা হয়নি৷ সুতরাং আমরা দেখলাম , আমাদের Ideological foundation এর প্রথম কথা হচ্ছে এই যে, মূল মানুষ হচ্ছে ' রূহ' এবং তা সমান৷ এই সাম্যের পরে যদি কোনো অসাম্য থেকে থাকে তাহলে তা অত্যন নগন্য Insignificant, Very Small ; তার মানে হচ্ছে , মানুষের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এক এবং সে মানুষ হিসেবে এক৷ এটি হলো নারী-পুরুষের সাম্যের প্রথম ভিত্তি৷
২. আমরা পুরুষরা গর্ব করি যে, আমাদের শারীরিক গঠন বোধহয় নারীর তুলনায় ভালো, আল্লাহ বোধহয় আমাদেরকে তুলনামূলকভাবে শ্রেষ্ঠ করে বানিয়েছেন এবং মেয়েরা আনকোয়ালিফায়েড৷ কিন্তু আল্লাহ একটি কথা কোরআনে খুব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে , সকল মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু প্রতিটি মানুষ ফার্ষ্ট ক্লাশ৷ যারা নামাজ পড়েন তারা এই আয়াতটা জানেন , সূরা ' ত্বীন'- এ আল্লাহ বলছেন (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) ' লাকাদ খালাক্বনাল ইনছানা ফি আহছানি তাক্বওয়ীম' ( নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামোতে-পুরুষকে বলেন নাই)৷ তার মানে আমাদের গঠনে পার্থক্য আছে , আমরা এক না, আমরা ভিন্ন কাঠামোর৷ কিন্তু সবাই ফার্ষ্ট ক্লাস, স-বা-ই ফার্ষ্ট ক্লাস ৷ সুতরাং নারী-পুরুষের মৌলিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য, নতুন নারী আন্দোলনের জন্য অথবা নতুন মানব আন্দোলনের জন্য পুরুষদের এ কথা বলা ঠিক না যে , মেয়েদের স্ট্রাকচার খারাপ৷ আল্লাহ্ তাতে অসন্তুষ্ট হবেন৷ আপনারা যারা মোমেন, যারা বিশ্বাসী-তারা এ কথা বলবেন না৷ সুতরাং নারী-পুরুষের মৌলিক সাম্যের এটা হলো দ্বিতীয় প্রমাণ৷ মৌলিক এ কারণে বলছি যে , নারী-পুরুষের মধে ছোটোখাটো পার্থক্য বিদ্যমান৷
৩. আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলছেন যে, সকল মানুষ এক পরিবারের৷ আদম এবং হাওয়া পরিবারের৷ সূরা নিসার প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলছেন , "হে মানব জাতি , সেই রবকে তুমি মানো যিনি তোমাদেরকে একটি মূল সত্ত্বা (নফস) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সত্ত্বা থেকে তার সাথীকে সৃষ্টি করেছেন এবং এই দুই জন থেকে তিনি অসংখ্য নারী ও পুরুষ সৃষ্টি করেছেন"৷ তার মানে আমরা এক পরিবারের৷
আমরা হচ্ছি বনি আদম৷ আদমের সন্তান৷ আল্লাহ পাক কোরআন শরীফে অন্ততঃ ২০/৩০ বার বলেছেন , ' ইয়া বনি আদামা' ( হে আদমের সন্তানেরা)৷ বাপ-মা এবং সন্তানেরা মিলে যেমন পরিবার তৈরী হয়, তেমনি ইসলামের দৃষ্টিতে মানব জাতি একটি পরিবার৷ সব পরিবারের ওপর হলো মানব জাতির পরিবার৷ তার মানে আমাদের মৌলিক সম্মান ও মর্যাদা , তা সমান৷ ছোট খাটো কারণে আমাদের মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়৷ তবে জাগতিক মর্যাদা আসল মর্যাদা না৷
আইনের ভাষায় যেমন বলা হয়, আইনের চোখে সকল মানুষ সমান, তেমনি আল্লাহর কাছেও সবাই সমান৷ আল্লাহ্র কাছে সম্মানের একমাত্র ভিত্তি হলো ' তাক্বওয়া' ৷ আল্লাহ বলেন নাই যে, তার কাছে পুরুষ সম্মানিত বা নারী সম্মানিত৷ আল্লাহ বলছেন, ' ইন্না আকরামাকুম ইন্দাল্লাহি (আল্লাহর কাছে), ' আতক্বাকুম' ( যে মেনে চলে আল্লাহকে)৷ আল্লাহ্র কাছে যদি মর্যাদার এই ভিত্তি হয়, তাহলে মানুষের পার্থক্যে কি কিছু যায় আসে? আল্লাহ বলছেন তিনি ' তাক্বওয়া' ছাড়া (আল্লাহকে কে মানে আর কে মানেনা) কোনো পার্থক্য করেন না৷ অতঃপর আমরা এক পরিবারের সন্তান, আমাদের মৌলিক মর্যাদা সমান৷ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-১৩) আরেকটি কথা, কোরআনের সূরা নিসার একটি আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ বলছেন "এবং ভয় পাও সেই আল্লাহকে বা মান্য করো সেই আল্লাহকে , যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার দাবী করে থাক৷ এবং ভয় পাও ' গর্ভ'- কে বা ' মা'- কে৷ আল্লাহ বলছেন ' গর্ভ'- কে ভয় পাও৷ কোরআন শরীফের এই আয়াতটির তফসিরে সৈয়দ কুতুব নামে মিশরের একজন বিখ্যাত আলেম লেখেন , এই ভাষা পৃথিবীর কোনো সাহিত্যে কোরআনের আগে লেখা হয় নাই৷ আল্লাহ ' গর্ভ '-কে ভয় করতে বলে মা '- কে সম্মান করার কথা বলেছেন, নারী জাতিকে সম্মান করার কথা বলেছেন৷ সুতরাং আমাদের মৌলিক সামাজিক মর্যাদা এক্ষেত্রেও সমান বলে প্রতীয়মান হলো৷ এটা আমাদের নতুন আইডিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশনের তৃতীয় প্রমাণ৷
৪. আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সময় বলে দিলেন যে, " তোমরা সবাই খলিফা"৷ তিনি বললেন, " ইন্নি জায়লুন ফিল আরদে খলিফা"৷ আল্লাহ বলেন নাই যে, নারী পাঠাচ্ছেন বা পুরুষ পাঠাচ্ছেন৷ এমনকি তিনি বলেন নাই যে , তিনি মানুষ পাঠাচ্ছেন; আল্লাহ বললেন, তিনি খলিফা পাঠাচ্ছেন৷ পাঠালেন মানুষ, বললেন খলিফা৷ মানুষকে তিনি খলিফা নামে অভিহিত করলেন৷ খলিফা মানে প্রতিনিধি৷ আমরা পুরো মানব জাতি হচ্ছি আল্লাহর প্রতিনিধি৷ পুরুষ , নারী নির্বিশেষে আমরা প্রত্যেকে তাঁর প্রতিনিধি-আল্লাহর প্রতিনিধি৷ তবে এ কথা ঠিক যে , যদি আমরা গুণাহ্ করি, অন্যায় করি, খুন করি, অত্যাচার করি, জুলুম করি, ঈমান হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের খলিফার মর্যাদা থাকে না৷ কিন্তু মূলতঃ আমরা আল্লাহ পাকের খলিফা৷ (কুরআন ২:৩০; ৩৫:৩৯)
এই খলিফার মর্যাদার মধ্যেই রয়েছে সকল ক্ষমতায়ন; যে ক্ষমতায়নের কথা আমরা বলি৷ ক্ষমতা ছাড়া কেউ কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারে না৷ খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে গেলে প্রত্যেক নারী এবং পুরুষের কিছু ক্ষমতা লাগবে৷ নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি এই খেলাফতের মধ্যে রয়েছে৷ শুধু নারী নয়, ' খেলাফত' শব্দের মধ্যে নারী, পুরুষ, গরিব, দুর্বল সকলের ক্ষমতায়নের ভিত্তি রয়েছে৷ সুতরাং নারী পুরুষ মৌলিক সাম্যের এটি হলো চতুর্থ প্রমাণ৷
ইসলাম চায় every man, every woman, every person should be empowered ; কিন্তু এই মুহ র্তে যদি নারীরা বঞ্চিত থেকে যায়, তবে তাদেরকে ক্ষমতায়িত করতে হবে৷ পুরুষরা কোনোদিন বঞ্চিত হলে তাদেরকে ক্ষমতায়িত করতে হবে৷ তবে যে বঞ্চিত তার কথা আমাদের আগে ভাবতে হবে ; নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য বর্তমানে আমাদের আগে কাজ করতে হবে৷
আজকে আপনাদের আলোচনায় মেয়েদের আসল কাজ কি, তা নিয়ে কথা উঠেছে৷ তারা কি ঘরে বসে থাকবে? এমন প্রশ্ন উঠেছে৷ কোনো মেয়ে যদি তার স্বাধীন সিদ্ধানে ঘরে থাকতে চায়, তার সেটা করার অধিকার আছে৷ পুরুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য৷ কিন্তু আল্লাহ কোথাও বলেন নাই যে, নারীদের ঘরে বসে থাকতে হবে , বাইরের কাজ নারীরা করতে পারবে না৷ বরং আল্লাহ মূল দায়িত্ব নারী-পুরুষের একই দিয়েছেন৷ সূরা ' তওবা' র ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, নারী পুরুষের দায়িত্ব ৬টি৷ আয়াতটি এরকম: মোমেন পুরুষ এবং মোমেন নারী একে অপরের অভিভাবক (ওয়ালী) , একে অপরের বন্ধু, একে অপরের সাহায্যকারী (এই আয়াত কোরআন শরীফের সর্বশেষ সূরাসম হের একটি৷ উল্লেখিত বিষয়ে আগে যে সকল আয়াত আছে সেগুলোকে এই আয়াতের আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে)৷ এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, নারী পুরুষ একে অপরের অভিভাবক, গার্জিয়ান৷ অনেকে বলে যে, নারী গার্জিয়ান হতে পারে না৷ কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, নারী গার্জিয়ান হতে পারবে৷ মূল কোরআনে এ ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই৷ নারী-পুরুষের নির্ধারিত ৬টি ডিউটি হলোঃ
ক. তারা ভালো কাজের আদেশ দিবে৷
খ. মন্দ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করবে৷
গ. উভয়ে নামাজ কায়েম করবে৷
ঘ. যাকাত দিবে৷
ঙ. আল্লাহকে মানবে৷
চ. রসুলকে মানবে৷
এসব কথার মাধ্যমে আল্লাহ নারীদের সকল ভাল কাজে অংশগ্রহণের কথা বলেছেন৷ এটাই ইসলামের নীতি৷ এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন যে , যারা এই ৬টি দায়িত্ব পালন করবে তাদের ওপর আল্লাহ তায়ালা রহমত করবেন৷ কোরআনের বেশ কয়েকটি তফসির পড়ে এবং পবিত্র কোরআন ও সুন্নাতে রাসুলে পুরোপুরি বিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে আমি বিশ্বাস করি যে, এই ছয়টি দায়িত্বের মধ্যে নারী পুরুষ সবাই সমান৷ রাজনীতি , সমাজসেবা ইত্যাদি সব কাজই এ ৬টির আওতায় পড়ে৷
আমার মনে হয় আমরা ইসলামের মূল জিনিস পরিত্যাগ করে ছোট-খাটো জিনিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি৷ মানুষের তৈরী বিভিন্ন কিতাবের ওপর নির্ভর করছি৷ আল্লাহর মূল কিতাবকে আমরা সেই তুলনায় গুরুত্ব দিচ্ছি বলে মনে হচ্ছে না৷ শেষে একটি কথা বলি , ইসলামকে যদি আপনারা অন্যের মাধ্যমে শেখেন , তবে আপনারা কখনোও মুক্তি পাবেন না৷ আপনাদেরকে কোরআনের পাঁচ-ছয়টি তাফসির নিজে পড়তে হবে৷ অনেকে অনুবাদের মধ্যে তাদের নিজেদের কথা ঢুকিয়ে দেয়৷ ফলে পাঁচ-ছয়টি বই পড়লে আপনারা বুঝতে পারবেন কোথায় মানুষের কথা ঢুকছে; আর আল্লাহর কথাটা কি৷ কয়েক রকম ব্যাখ্যা পড়লে আপনি ঠিক করতে পারবেন কোন ব্যাখ্যাটা ঠিক৷ মেয়েদের মধ্যে বড় তাফসিরকারক হয়নি৷ এটা মেয়েদের ব্যর্থতা , মেয়ে তাফসিরকারকদের থাকলে হয়তো gender bias হতো না৷ তবে কোরআন শরীফের কিছু তাফসীর আছে যেগুলো free from gender bias ; যেমন মোহাম্মদ আসাদের "দি ম্যাসেজ অব কোরআন"৷
লেখক সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর ২৩তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে দেয়া শাহ্ আব্দুল হান্নানের বক্তব্যের সংকলিত অংশ৷ 



প্রকাশ সূত্র : ইসলাম ডট নেট ডট বিডি

Thursday, December 29, 2011

রাসুলের ওপর ধর্মনিরপেক্ষতা আরোপ এবংকিছু কথা || খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ্

বিখ্যাত সাহাবী, শীর্ষ মুফাসসিরে কোরআন হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ওলীদ ইবিন মুগীরা, আস ইবনে ওয়ায়েল, আসওয়াদ ইবনে আবদুল মোত্তালিব ও উমাইয়া ইবনে খাল্ফ প্রমুখ মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একবার রাসুলের কাছে এসে বলল, আসুন আমরা পরস্পরের মধ্যে এই শান্তিচুক্তি করি যে, এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের ইবাদত করবেন এবং এক বছর আমরা আপনার উপাস্যের ইবাদত করব (কুরতুবী)। তিবরানির সূত্রে ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, কাফিররা প্রথমে পারস্পরিক শান্তিচুক্তির স্বার্থে রাসুলুল্লাহর সামনে এই প্রস্তাব রাখল যে, আমরা আপনাকে বিপুল পরিমাণে ধন-ঐশ্বর্য দেব, ফলে আপনি মক্কার সর্বাধিক ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে যাবেন। আপনি যে মহিলাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারবেন। বিনিময়ে আপনি শুধু আমাদের উপাস্যদের মন্দ বলবেন না। যদি আপনি এটাও মেনে না নেন, তবে এক বছর আমরা আপনার উপাস্যের ইবাদত করব এবং এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যের ইবাদত করবেন (তাফসিরে মাযহারি)। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর দূত জিবরাঈল সুরা কাফিরুন নিয়ে আগমন করলেন। এতে কাফিরদের ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ এবং আল্লাহতায়ালার অকৃত্রিম ইবাদতের আদেশ আছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, সুরাটিতে ‘আমি ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা করো’—কথাটির পৌনঃপুনিক উল্লেখ রয়েছে। তাফসিরবিদরা বর্ণনা করেছেন, একই বাক্য একবার বর্তমানের জন্য এবং একবার ভবিষ্যত্কালের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাত্ বর্তমানে যেমন আমি তোমাদের উপাস্যের ইবাদত করি না, ভবিষ্যতেও এরূপ হবে না। মজার ব্যাপার হলো, এই একটি সুরা যার একটি আয়াত—‘তোমাদের জন্য তোমাদের কর্মফল এবং আমার জন্য আমার কর্মফল’ নিয়ে কিছু লোক কোরআন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (যদিও সেক্যুলারিজম মতবাদের বাংলা তরজমা হলো—ইহজাগতিকতা) এর প্রমাণ পেশ করতে চেষ্টা করেন—প্রকৃতপক্ষে পুরো সুরাটিই কথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিপক্ষে ইসলামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ও জোরালো অবস্থানের ঋজু অভিব্যক্তি।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ইসলামের জুড়ি নেই। ভিন্নধর্মের অনুসারীর ওপর জোর-জবরদস্তি তো দূরের কথা, নির্বিঘ্নে তাদের ধর্ম পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ যাবতীয় নাগরিক অধিকার প্রদানে ইসলাম অকুণ্ঠচিত্ত। তবে এর অর্থ এমন ভাবা ঠিক নয় যে, ইসলামের জন্য স্বাতন্ত্র্যের সীমারেখা বলতে কিছু থাকবে না। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভুল ব্যাখ্যা সমাজে সমপ্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নয়, বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি উত্পাদন করবে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সামাজিক সৌহার্দের পরিবর্তে নির্মূল ভাবনাকেই উসকে দেবে। এতে আমাদের উদারমুসলিম চরিত্র যেমন ম্লান হতে পারে, তেমনি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও ভিত নড়ে উঠতে বাধ্য।
বিষয়টির অবতারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কারণ হলো, ১১ ডিসেম্বর ২০১১ শনিবার বায়তুল মোকাররমের ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে মসজিদের ইমাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান প্রতিনিধি এবং ইফার কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এক সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি ও ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর এ সম্পর্কিত একটি বক্তব্য। ‘মানব সম্পদ উন্নয়নে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্তকরণ প্রকল্পের দুই দিনব্যাপী বার্ষিক সভা ও কর্মশালা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের লোকদের সঙ্গে সমপ্রীতি বজায় রাখতে দেশের ইমামদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘রাসুল (সা). মসজিদের অর্ধেক হিন্দুদের পুজার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সব ধর্মের লোকদের মধ্যে সেই ধরনের সমপ্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।’ অন্যদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মুহাম্মদ আফজাল বলেন, রাসুল ইহুদিদের ইবাদতের জন্য মসজিদের অর্ধেক দিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা সেই নবীর উম্মত (দেখুন, দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক আমার দেশ, ১২.১২.২০১১ খ্রি. রবিবার)।’ প্রতিবাদকারী উপস্থিত ইমামদের মধ্যে অনেকেই প্রতিমন্ত্রী এবং ডিজিকে তাদের দাবির সপক্ষে কোরআন-হাদিসের কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের প্রমাণ পেশ করতে বললে একজন অপারগতা প্রকাশ ও অন্যজন প্রসঙ্গান্তরে চলে যান। এতে করে তাত্ক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও এ ধরনের অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক কথাবার্তা সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্টের ইন্ধন জোগাবে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন মৌলিক গবেষণাকর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থাদি মুদ্রণ ও ইসলামী প্রকাশনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। সমপ্রতি প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকাণ্ড ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে বিতর্কিত ও নিন্দিত হচ্ছে। কোনো বিশেষজ্ঞ আলিম এমনকি ইসলাম সম্পর্কে যাদের অল্প-বিস্তর পড়াশোনা রয়েছে তাদের পক্ষে ধর্মীয় উদারতার এমন সরলীকরণ মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে একই অনুষ্ঠানে বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাসুলের আদর্শ বলে অভিমত দিয়ে রীতিমত ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলের কণ্ঠে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও মানবাধিকারের সনদ ঘোষিত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার দলিল নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ইসলামে ধর্মনিরপেক্ষতারূপী কোনো গোঁজামিল বিশ্বাসের স্থান নেই। ইসলাম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও প্রকৃতিসম্মত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান।
মুসলিমপ্রধান সমাজে মুসলমানরা যেমন সংখ্যালঘু ভিন্নধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে নিজেদের স্বত্ব দাবি করে না, তেমনি কোনো সুস্থ বুদ্ধির হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ইসলামের উদারতার দোহাই দিয়ে তাঁদের পুজা-পার্বণের জন্য মসজিদের অর্ধেক জায়গা ছেড়ে দেয়ার মতো উদ্ভট আবদার কখনও করবেন বলে মনে হয় না।
সূত্র : আমার দেশ

Monday, December 19, 2011

ভাঙ্গা ও গড়া || সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী

প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা সবই আল্লাহর জন্য। তিনি আমাদেরকে সূষ্টি করেছেন। আমাদেরকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও বুঝবার শক্তি এবং ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতাও দিয়েছেন। আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন ও নেতৃত্ব দানের জন্য তিনি তাঁর সর্বোত্তম বান্দাদেরকে পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে মানবতা শিক্ষা দিয়েছেন, সৎলোকের মতো জীবনযাপন করা শিখিয়েছেন এবং মানব জীবনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করেছেন। যে সমস্ত নিয়ম-নীতি অনুযায়ী জীবন যাপন করলে মানুষ দুনিয়ায় সুখ-শান্তি ও পরকালে মুক্তি লাভ করতে পারে তাও তারা বলে এবং করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের সবার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

সমবেত ভদ্রমন্ডলী ও মহিলাবৃন্দ!

যে আল্লাহ্ এই দুনিয়াকে সৃষ্টি করে পৃথিবী পৃষ্ঠকে বিছানার মতো করে তৈরী করেছেন এবং তার উপর মানুষের বসবাস করার সুব্যবস্থা করেছেন, তিনি অন্ধের মতো আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কোন কাজ করেন না। কোন কিছু না দেখেশুনে অন্ধকারে হাতড়িয়ে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেবার মতো বাদশাহ তিনি নন। তাঁর নিজস্ব আইন-কানুন, বলিষ্ঠ নিয়ম-নীতি, সুদৃঢ় ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু কর্মপদ্ধতি রয়েছে। তদনুযায়ী তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের উপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব করছেন। পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পানি, বাতাস, বৃক্ষ, পশু-পাখি ইত্যাদির মতো আমরা গোটা মানব জাতিও তাঁর প্রাকৃতিক আইন ও নিয়মের অধীনে সুসংবদ্ধ। আমাদের জন্ম ও মৃতু্য, আমাদের শৈশব, আমাদের যৌবন ও বার্ধক্য, আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, আমাদের পাকস্থলী ও রক্ত চলাচল, আমাদের সুস্থতা ও অসুস্থা ইত্যাদি সব কিছুর উপরই তাঁর চিরন্তন প্রাকৃতিক আইন ও নিয়মের কর্তৃত্ব একটানাভাবে রীতিমত চলছে। এছাড়া তাঁর আর একটা আইনও রয়েছে। সেটা তাঁর প্রাকৃতিক আইনের মতই আমাদের ইতিহাসে উঠা-নামা, আমাদের উত্থান-পতন, আমাদের উন্নতি-অবনতি এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত -তথা দেশ ও জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের উপর কর্তৃত্ব করছে। আল্লাহর প্রাকৃতিক আইন অনুযায়ী নাকের বদলে চোখের সাহয্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ করা এবং পেটের বদলে হৃদয়ে খাদ্য হজম করা যদি মানুষের পক্ষে সম্ভব না হয়ে থাকে, তাহলে যে পথে চললে আল্লাহর আইন অনুযায়ী কোন জাতির অধপতন হওয়া উচিত, সেই পথে তার উন্নতি হওয়া সম্বব নয়। আগুন যেমন একজনের জন্য গরম এবং আরেক জনের জন্য ঠান্ডা নয়, তেমনি আল্লাহর আইন অনুযায়ী যে সমস্ত কাজ খারাপ তা একজনকে অবনত এবং অন্য জনকে উন্নত করতে পারে না। মানুষের ভাল-মন্দের জন্য আল্লাহ্ যে নিয়ম-নীতি নির্ধারিত করেছেন, তা কারোর চেষ্টায় পরিবর্তিত ও বাতিল হতে পারে না। তার ভেতর কারো সঙ্গে শত্রুতা এবং কারো সঙ্গে স্বজনপ্রীতিও নেই। আল্লাহর এই আইনের সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে এই যে, তিনি গড়া পছন্দ করেন এবং ভাঙ্গা পছন্দ করেন না। সব কিছুর মালিক হিসেবে তিনি তাঁর দুনিয়াকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে চান। একে অতিমাত্রায় সুসজ্জিত করতে চান। তাঁর যাবতীয় উপায় উপাদান এবং শক্তি ও যোগ্যতাকে সুষ্ঠু পন্থায় সদ্ব্যবহার করতে চান। তিনি কখনও তাঁর দুনিয়ার ধ্বংস ও অনিষ্ট সাধন করেন না। বিশৃংখলা, কুকর্ম, অত্যাচার ও অনাচার করে তাঁর দুনিয়াকে শ্রীহীন সৃষ্টিতে পরিণত করাকে তিনি কোনদিন পছন্দ করবেন বলে আশাও করা যেতে পারে না। যে সমস্ত লোক দুনিয়া পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করতে চায় তাদের ভেতর থেকে কেবলমাত্র তারাই আল্লাহর দৃষ্টিতে যোগ্যতাসম্পন্ন হয়; যারা এ দুনিয়াকে গড়বার যোগ্যতা অন্যদের চেয়ে বেশী রাখে। এরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদেরকেই তিনি দুনিয়া পরিচালার দায়িত্ব অর্পণ করে থাকেন।

অতঃপর এসব ক্ষমতাসীন লোকেরা কতটুকু ভাঙ্গে এবং কতটুকু গড়ে -সেদিকে তিনি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ভাঙ্গার চেয়ে গড়তে থাকে বেশী এবং তাদের চেয়ে বেশী গড়ে কম ভাঙ্গে -এমন কেউ কর্মক্ষেত্রে থাকে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদের সমস্ত দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও দুনিয়া পরিচালনার ক্ষমতা তাদের হাতেই রাখেন। কিন্তু যখন তারা গড়ে কম এবং ভাঙ্গে বেশী, তখন আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমতাচু্যত করে অন্য লোকদেরকে ঐ একই শর্তে ক্ষমতা দিয়ে থাকেন।

এটা একটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আইন। আপনাদের বিচার বুদ্ধিও প্রমাণ করবে যে, আইনটি এমনই হওয়া উচিত। যদি আপনাদের কারোর একটি বাগান থাকে এবং তিনি একজন মালীকে তার রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করেন, তাহলে আপনি নিজেই বলুন, তিনি ঐ মালীর নিকট সর্বাগ্রে কি আশা করতে পারেন? তিনি অবশ্যি নিজের বাগানের ক্রমোন্নতি চাইবেন। তার শ্রীবৃদ্ধি ও উন্নতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শোভা-সৌন্দর্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধিই হবে তার কাম্য। যে মালীকে তিনি দেখবেন অত্যন্ত প্ররিশ্রম, যোগ্যতা ও মনোযোগ সহকারে সুনিপুণভাবে বাগানের সেবা যত্ন করছে, বাগানের সাজসজ্জার দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখছে, তার চেষ্টা ও যত্নে ভাল দরকারী গাছগুলো বেশ সতেজ ও সুন্দর হচ্ছে, সে আগাছা, আবর্জনা ও বন-জঙ্গল পরিষ্কার করছে তার সুরুচি ও শিল্প শক্তি দিয়ে উৎকৃষ্ট ও নতুন ফল-মূল এবং ফুলের উৎপাদন বৃদ্ধি করছে- তার উপর তিনি অবশ্যই সন্তুষ্ট হবেন। তিনি তাকে ভালবাসবেন এবং উচ্চ মর্যাদা দেবেন। এমন উপযুক্ত, কর্তব্যপরায়ণ, পরিশ্রমী, অনুগত ও সুযোগ্য মালীকে তাড়িয়ে দেয়া তিনি কোন দিনই পছন্দ করবেন না। কিন্তু এ না হয়ে যদি ঠিক এর উল্টোঁাই হয় অর্থাৎ, যদি তিনি দেখেন যে, মালী অযোগ্য-অপদার্থ, আলসে ও ফাঁকিবাজ, সে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে বাগানের ক্ষতি করছে, গোটা বাগানটা আবর্জনা ও বন-জঙ্গলে ভরে গিয়েছে, গাছের পাতা ও ডালগুলো ভেঙে পড়েছে, কোথাও বিনা প্রয়োজনে পানি বয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানির অভাবে মাটি ও গাছপালা সব শুকিয়ে যাচ্ছে, ঘাস, আগাছা, বনজঙ্গল ও আবর্জনা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, ফুল ও ফলবান গাছগুলোকে অকাতরে কেটে কেটে ফেলে দেয়া হচ্ছে, ভাল ভাল গাছগুলো মরে গিয়ে আগাছায় বাগান ভরে যাচ্ছে, তাহলে বলুন, বাগানের মালিক এমনতর মালীকে কি করে পছন্দ করতে পারে? কোন সুপারিশ, কাকুতি-মিনতি, সবিনয় নিবেদন ও প্রার্থনা এবং উত্তরাধিকার ও মনগড়া অধিকারের দরুন মালিক তার বাগানের দায়িত্বভার এমন অযোগ্য মালীর উপরই ন্যস্ত রাখবে? বড় জোর এতটুকু হতে পারে যে, সে মালীকে শাসিয়ে দিয়ে আর একবার তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেবে। কিন্তু যে মালীর কোন শাসনেই চৈতন্য হয় না এবং ক্রমাগত বাগানের ক্ষতিই করতে থাকে, তাকে কান ধরে বের করে দিয়ে অন্য কোনো ভাল মালী নিযুক্ত করা ছাড়া মালিকের পক্ষে এ সমস্যার আর কি সমাধান হতে পারে?

যদি নিজের সামান্য একটা বাগান পরিচালনার ব্যাপারেও আপনি অনুরূপ পন্থা অবলম্বন করে থাকেন। তাহলে চিন্তা করে দেখুন যে, আল্লাহ্ তাঁর এতবড় ভূমন্ডলটা এত সব উপায়-উপকরণসহ মানুষের কর্তৃত্বাধীনে রেখে দুনিয়া ও তার সমস্ত বস্তুর উপর তাকে এত ক্ষমতা ও অধিকার দিয়েছেন, এক্ষেত্রে মানুষ তাঁর দুনিয়াকে সুন্দর করে গড়ে তুলছে, না ধ্বংস করছে, এ বিষয়টা তিনি কি করে উপেক্ষা করতে পারেন? আপনি যদি তাঁর দুনিয়াকে সুন্দর করে গড়তে থাকেন তবুও তিনি আপনাকে ক্ষমতা থেকে অযথা সরিয়ে দেবেন- এমনতর হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু যদি আপনি গঠনমূলক কোন কিছু না করেন এবং আল্লাহর এ বিরাট বাগানখানাকে একেবারে উজাড় ধ্বংস করতেই থাকেন তাহলে আপনার দাবীকে নিজের বুদ্ধি-বিবেক অনুযায়ী যতই জোরদার মনে করুন না কেন তিনি তাঁর বাগানে আপনার কোন অধিকারই স্বীকার করবেন না। প্রথমে তিনি আপনাকে শাসিয়ে হুঁশিয়ার করে দেবেন এবং সংশোধনের দু'চারটে সুযোগ দেবেন। পরিশেষে আপানাকে পরিচালকের মর্যাদা থেকে পদচু্যত করেই ছাড়বেন।
এ ব্যাপারে একটা বাগানের মালিকের দৃষ্টিকোণ ও মালীর দৃষ্টিকোণ যেমন বিভিন্ন তেমনি আল্লাহর দৃষ্টিকোণ ও মানুষের দৃষ্টিকোণের মধ্যেও বিভিন্নতা রয়েছে। ধরুন, মালীদের এক পরিবার বংশানুক্রমে একজন লোকের বাগানে কাজ করে আসছে। তাদের পূর্ব পুরুষের কাউকে হয়তো তার যোগ্যতা ও জ্ঞান বুদ্ধির দরুন বাগানে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তার সন্তান-সন্ততিও বাগানের কাজ সুন্দরভাবে করেছিল, তাই বাগানের মালিক চিন্তাকরে দেখলো যে, অযথা এদেরেকে সরিয়ে অন্য মালী নিযুক্ত করার কি দরকার? এরা ও যখন ভালভাবেই কাজ করছে, তখন এদের অধিকার অন্যের চেয়ে বেশী। এভাবে মালীদের এই বংশ স্থায়ীভাবে বাগানে কাজ করতে লাগলো। কিন্তু কিছু কাল পরে এই বংশের মালীরা একেবারে অযোগ্য, অপদার্থ, ফাঁকিবাজ, আলসে, কুঁড়ে ও অবাধ্য হয়ে পড়ল। বাগান পরিচালনার কোন যোগ্যতাই তাদের রইল না। এখন তারা গোটা বাগানটার সর্বনাশ করতে শুরু করেছে, তবুও তদের দাবী এই যে তারা তাদের বাপদাদার আমল থেকে পুরুষানুক্রমে এ বাগানে বাস করে আসছে, তাদের পূর্ব পুরুষদের কারুর দ্বারা এ বাগান গড়ে উঠেছিল, কাজেই এতে তাদের জন্মগত অধিকার রয়েছে এবং তাদেরকে সরিয়ে অন্য কাউকে এ বাগানের পরিচালনার জন্য মালী নিযুক্ত করা কোনক্রমেই সংগত হতে পারে না। এটিই ঐ অযোগ্য ও অপদার্থ মালীদের দৃষ্টিকোণ। কিন্তু বাগানের মালিকের দৃষ্টিকোণও কি অনুরূপ হতে পারে? সে কি একথাই বলবে না_ আমার কাছে তো বাগানের সুন্দর ও সুষ্ঠ পরিচালনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তো মালীদের কোন পূর্ব পুরুষের জন্য এ বাগান করিনি। বরং তাদের পূর্ব পুরুষের কাউকে আমার বাগানের কাজের জন্য চাকর রেখেছিলাম। বাগানে তাদের যা কিছু অধিকার আছে তা যোগ্যতা ও কাজের শর্তাধীন। তারা বাগানকে ঠিকমত গড়ে তুললে তাদের সমস্ত অধিকার বিবেচনা করা হবে। নিজের পুরানো মালীদের সংগে আমার এমন কি শক্রতা থাকতে পারে যে, তারা ভালভাবে কাজ করলেও আমি অযথা তাদেরকে তাড়িয়ে অন্য মালীদেরকে নিযুক্ত করবো? কিন্তু যে বাগানের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য তোমাদেরকে নিযুক্ত করা হয়েছিল সেটিকেই যদি তোমরা নষ্ট ও উজাড় করে ফেল, তাহলে তোমাদের কোন অধিকারই আমি স্বীকার করবো না। অন্য যারা এ কাজ ঠিকমত করতে চায় আমি তাদেরকে বাগান পরিচালনার দায়িত্ব ও ক্ষমতা দান করবো এবং তাদের অধীনে তোমাদের চাকুরি করতে হবে। এতেও যদি তোমরা ঠিক না হও এবং অধীনস্ত হিসেবেও যদি তোমরা অকেজো প্রমাণিত হও; বরং শুধু নষ্ট করতেই থাক, তাহলে আমি তোমাদেরকে এ বাগান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্য মালীদেরকে এখানে নিযুক্ত করবো।

দৃষ্টিকোণের এই পার্থক্য যেমন একটা বাগানের মালিক ও মালীর মধ্যে রয়েছে, তেমনি রয়েছে দুনিয়ার মালিক ও দুনিয়াবাসীদের মধ্যেও। দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন জাতি তাদের আপন আপন এলাকাকে স্বদেশ ভূমি বলে দাবী করে। বংশানুক্রমে তারা এবং তাদের পূর্ব-পুরুষগণ সেখানে বসবাস করে আসছে। তাদের দেশের উপর তাদের কর্তৃত্ব করার জন্মগত অধিকার রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করে। কাজেই তাদের মতে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা একমাত্র তাদেরই প্রাপ্য। বাইরের আর কারুর সেখানে কর্তৃত্ব করার কোন অধিকার নেই। এ হচ্ছে দুনিয়াবাসীদের দৃষ্টিকোণ। কিন্তু দুনিয়ার আসল মালিক আল্লাহর দৃষ্টকোণ এটা নয়। তিনি কখনো এ সব জাতীয় অধিকার স্বীকার করেননি। প্রত্যেক দেশের উপর তার অধিবাসীদের জন্মগত অধিকার রয়েছে এবং সে অধিকার থেকে তাদেরকে কোনক্রমেই বঞ্চিত করা চলবে না- এমন কোন কথা তিনি স্বীকার করেন না। তিনি তো দেখেন, কোন্ দেশে কোন্ জাতি কি কাজ করছে। যদি কোন জাতি তার দেশে গঠনমূলক কাজে লিপ্ত থাকে, তার সমস্ত শক্তিসামর্থ দুনিয়ার সংশোধন ও উন্নতির জন্য নিয়োগ করে থাকে, সব রকমের মন্দ কাজ প্রতিরোধ করে এবং ভাল কাজের ক্ষেত্র প্রশস্ত করতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে দুনিয়ার মালিক বলেন, অবশ্য তোমরা দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার অধিকারী। তোমরা পূর্ব থেকেই এ দেশে বসবাস করে আসছো এবং দেশ পরিচালনারও যোগ্যতা রাখ। কাজেই অন্যান্য জাতির চেয়ে তোমাদের অধিকারই অগ্রগণ্য। কিন্তু যদি ব্যাপারটা উল্টো হয় অর্থাৎ, যদি গড়ার পরিবর্তে শুধু ভাঙ্গার কাজই হতে থাকে, সৎ কাজের বদলে দেশ জুড়ে কেবল অসৎ ও অবৈধ কাজই সংঘটিত হয় এবং আল্লাহ্ দুনিয়ায় যা সৃষ্টি করেছেন তাকে কোন ভাল কাজে না লাগিয়ে বেপরোয়া ভাবে নষ্ট করা হয়- এক কথায় দেশকে গড়ার বদলে ভেঙ্গে ফেলা হয়- তাহলে আল্লাহ্ এহেন জাতিকে প্রথমে কিছুটা হালকা এবং কিছুটা কঠিন আঘাত দেন, যাতে করে তারা সতর্ক হয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করতে পারে। এতেও যে জাতি ঠিক না হয়, তার কাছ থেকে দেশের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অন্তত এর চেয়ে যোগ্যতর জাতিকে দেয়া হয়।

এখানেই শেষ নয়। যদি পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা পরাধীন হওয়ার পরও কোন যোগ্যতা ও গুণবৈশিষ্ট্যের প্রমাণ না দেয় এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণ করে যে, বিকৃতি করা ছাড়া তাদের দ্বারা আর কোন কাজই হবে না, তাহলে এহেন জাতিকে আল্লাহ্ নিশ্চিহ্ন করে দেন। তারপর তাদের স্থানে অন্য কোন জাতিকে আনেন। এ ব্যাপারে সব সময়ই মালিকের যে দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত, আল্লাহরও তাই হয়ে থাকে। তিনি তাঁর দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে দাবীদার ও প্রার্থীদের উত্তরাধিকার অথবা জন্মগত অধিকার দেখেন না। তিনি দেখেন কার গড়ার যোগ্যতা বেশী এবং ভাঙ্গার দিকে ঝোঁক প্রবনতা কম রয়েছে। একই সময়ের প্রার্থীদের মধ্যে যারা এ দিক দিয়ে যোগ্যতর বলে প্রমাণিত হয়, তাদেরকেই দেশ পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়। যতদিন এদের ধ্বংসাত্মক কাজের চেয়ে গঠনমূলক কাজ বেশী হতে থাকে অথবা এদের তুলনায় বেশী ভাল করে গঠনমূলক কাজ করে এবং ধ্বংসাত্মক কাজও কম করে- এমন কেউ এগিয়ে না আসে- ততদিন দেশ পরিচালনার ক্ষমতা এদের হাতেই রাখা হয়।
এসব যা কিছু আমি বলছি, ইতিহাসে এর জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ্ চিরকালই এ নীতি অনুযায়ী তাঁর দুনিয়া পরিচালনার ব্যবস্থা করছেন। দূর দেশের কথা না হয় ছেড়েই দিন। নিজেদের এ দেশের ইতিহাসটাই পর্যালোচনা করুন। এ দেশে যে সব জাতি প্রথমে বাস করতো, তাদের গঠনমূলক যোগ্যতা ও কর্ম ক্ষমতা যখন শেষ হয়ে গেল, তখন আল্লাহ্ আর্য জাতিকে এ দেশ পরিচালনার সুযোগ দিলেন। সে সময় অন্যান্য জাতি গুলোর মধ্যে যোগ্যতম ছিল আর্যজাতি। তারা এখানে এসে এক উন্নত তামাদ্দুন ও সভ্যতা গড়ে তুললো। বহু জ্ঞান ও শিল্প আবিস্কার করল। ভূগর্ভের গোপন সম্পদ উদ্ধার করে তাকে ভাল কাজে ব্যবহার করল। ধ্বংসাত্মক কাজের তুলনায় গঠনমূলক কাজই তারা বেশী করেছিল। এসব যোগ্যতা যতদিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছিল ততদিন ইতিহাসের সমস্ত উত্থান-পতন সত্ত্বেও তারাই ছিল এদেশের পরিচালক। অন্যান্য জাতি ক্ষমতা দখলের জন্য বার বার এগিয়ে এসেছে কিন্তু তাদেরকে হটিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, আর্যদের মতো যোগ্য জাতি ক্ষমতাসীন থাকা কালে অন্যকোন পরিচালকের প্রয়োজন ছিল না। আর্যরা যখন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে বিপথে চলা শুরু করে, তখন তাদের উপর যেসব বৈদেশিক আক্রমন হয়, সেগুলোকে তাদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে সতর্ককারী দূত স্বরূপ বলা যায়। কিন্তু তারা সতর্ক না হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজেই লিপ্ত থাকে। গঠনমূলক কাজের তুলনায় তারা ধ্বংসাত্মক কাজ করতে থাকে অনেক বেশী। তাদের নৈতিক অধঃপতন এমন চরমে পৌঁছে যে, বামমার্গ আন্দোলনে আজো তার চিহ্ন আপনারা সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ করতে পারেন। মানবতাকে বিভক্ত করে তারা নিজেদেরই সমাজকে বর্ণ ও গোত্রে খণ্ডিত করল। সমাজ জীবনকে একটি সিঁড়ির মতো করে গঠন করল। এ সিঁড়ির প্রত্যেক ধাপের লোকেরা তাদের উপরের ধাপের লোকদের বান্দা বা দাস এবং নীচু ধাপের লোকদের খোদা বনে বসল। তারা আল্লাহর লাখো লাখো বান্দার উপর নির্মম যুলুম নির্যাতন চালাতে লাগল। এ যুলুম আজো অচ্ছুত শ্রেণীর আকারে বিদ্যমান রয়েছে।

তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দিল। তাদের পন্ডিত ও পুরোহিতরা সাপের মত জ্ঞান ভাণ্ডারের চারদিক বেষ্টন করে বসে রইল। তাদের উপরের তলার কর্তারা দেশের জনসাধারণের উপর নিজেদের বহু অন্যায় অধিকার চাপিয়ে দিল। এ অধিকার আদায় করা এবং আরাম কেদারায় বসে বসে অন্যের পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে বিলাসী জীবন যাপন করা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ রইলো না। এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তাদের কাছ থেকে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মধ্য এশিয়ার কতিপয় জাতিকে এখানে পরিচালনার সুযোগ দিলেন। এ জাতিগুলো সে সময় ইসলামী আন্দালনের সংস্পর্শে এসে জীবন যুদ্ধের উন্নততর যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

কয়েক'শ বছর তারা এদেশ পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিল। এ দেশেরও বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে তাদের সাথে মিশে গিয়েছিল। অবশ্যি তারাও অনেক কিছু ধ্বংস করেছে। কিন্তু যে পরিমাণ ধ্বংস করেছে, তার চেয়ে বেশী সৃষ্টি করেছে। কয়েক'শ বছর পর্যন্ত ভারতবর্ষে যত গঠনমূলক কাজ হয়েছে তা সবই তাদের দ্বারা অথবা তাদের প্রভাবে সম্পাদিত হয়েছে। তারা দেশে জ্ঞানের আলো বিতরন করেছে। চিন্তা ও ভাবধারা পরিশুদ্ধ করেছে। সমাজ, তামাদ্দুন ও সভ্যতার অনেক কিছু সংশোধন করেছে, দেশের উপায়-উপাদানকে সে যুগের উপযোগী করে কল্যাণের পথে ব্যবহার করেছে। সর্বোপরি তারা শান্তি ও সুবিচারের এমন সুষ্ঠু ব্যবস্থা কায়েম করেছিল যা ইসলামের সত্যিকার শান্তি ও সুবিচার থেকে অনেক নিন্মমানের হলেও ইতিপূর্বেকার এবং আশপাশের দেশগুলোর অবস্থার তুলনায় অনেক খানি ঊঁচুস্তরের ছিল। অতঃপর তারাও পূর্ববর্তীদের ন্যায় পথভ্রষ্ট হতে লাগল এবং তাদের মধ্যেও গঠনমূলক কাজের যোগ্যতা কমে যেতে লাগল এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের প্রতি ঝোঁক প্রবণতা বেড়ে চলল। তারাও উঁচু-নীচু, বংশ মর্যাদার শ্রেণী বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের সমাজ ও জাতিকে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলল। এজন্য চারিত্রিক, রাজনৈতিক, তামাদ্দুনিক ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। তারাও ইনসাফের তুলনায় যুলুম, নির্যাতন অনেক বেশী করতে লাগল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে গিয়ে তারা শুধু তাত্থেকে স্বার্থসিদ্ধি এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টায় মেতে উঠল। উন্নতি ও সংস্কারমূলক কাজ ছেড়ে দিয়ে তারাও আল্লাহ্ প্রদত্ত শক্তি ও উপায় উপাদান নষ্ট করতে এবং সেগুলোকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যবহার করতে লাগল। দৈহিক আরাম ও ভোগ লালসায় তারা এতই মত্ত হয়ে গেল যে, তাদের শাসন কর্তাদেরকে যখন দিল্লীর লাল কেল্লা থেকে পলায়ন করতে হয়েছিল, তখন তাদের শাহজাদারা-যারা গতকাল পর্যন্ত সিংহাসনের দাবীদার ছিল-নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য পলায়ন করতেও পারেনি। কেননা মাটির উপর দিয়ে চলার অভ্যাস তারা পরিত্যাগ করেছিল। মুসলমানদের সাধারণ নৈতিক চরিত্রের চরম অধঃপতন হয়েছিল। একেবারে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় হোমরা চোমরা দায়িত্বশীল লোকদের পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুরই পরোয়া ছিল না। ফলে ধর্ম, জাতি ও দেশকে অন্যের হাতে বিকিয়ে দেয়ার পথে তাদেরকে বাধা দেয়ার মতো আর কিছুই রইল না। তাদের মধ্যে জন্ম নিলো লাখো লাখো পেশাদার সিপাই। এদের নৈতিক চরিত্র ছিল পোষা কুকুরের মতো। যে কেউ খাবার দিয়ে এদেরকে পুষতে পারত এবং তারপর এদের দিয়ে ইচ্ছামত শিকার করাতে পারত। এদের মধ্যে এই অনুভূতি ছিলনা যে, এই ঘৃণ্য পেশার বদৌলতেই শত্রুরা তাদের সাহায্যে তাদেরই জয় করেছে -এর একটি জঘন্যতম দিক আছে। গালিবের মতো কবিও এ সম্পর্কে গর্ব করে বলেছনঃ "শত পুরুষ থেকে বাপ দাদার পেশা হলো সৈনিক বৃত্তি।" এতবড় একজন কবি একথা বলার সময় এতটুকুও ভাবতে পারেননি যে, পেশাধারী সৈনিকবৃত্তি গর্বের বিষয় নয়; লজ্জায়মরে যাবার জিনিস।

মুসলমানেরা যখন এহেন অবস্থায় পৌঁছল, তখন আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমতাচু্যত করার সিদ্ধান্ত করলেন এবং গোটা ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা আবার নতুন প্রার্থীদের হাতে যাওয়ার সুযোগ এলো। এ সময় দেশে মারাঠা, শিখ, ইংরেজ ও কতিপয় মুসলমান নেতা এই চারজন প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছিল। জাতীয়তাবাদের নেশা ও স্বজাতির প্রতি অন্যায় পক্ষপাতিত্ব থেকে মন ও মগযকে মুক্ত ও পবিত্র রেখে ন্যায়ভাবে তখনকার ইতিহাস ও পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনা করলে আপনার বিবেক একথা স্বীকার করবে যে, তখন গঠনমূলক কাজের যে যোগ্যতা ইংরেজদের ছিল তা অন্যকোন প্রার্থীর ছিল না এবং ইংরেজদের ভেতর যে পরিমাণ ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ছিল তার চেয়ে ঢের বেশী ছিল মারাঠা, শিখ ও মুসলমান প্রার্থীর ভেতর। ইংরেজরা যা কিছু গঠনমূলক কাজ করেছে তা অন্যান্য জাতিরা করত না। তারা যা কিছু নষ্ট করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশী অন্যেরা নষ্ট করত। সাধারণভাবে দেখলে ইংরেজদের ভেতর বহু দিক দিয়ে অগণিত দোষ ও অন্যায় পাওয়া যাবে। কিন্তু তুলনা মূলকভাবে বিচার করলে তাদের সমকালীন প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তাদের অন্যায় অত্যাচার অনেক কম এবং গুণ-গরিমা বেশী পাওয়া যাবে। এই জন্যই তো আল্লাহর আইন আরেকবার মানুষের মনগড়া নীতির মূলোচ্ছেদ করলো। মানুষ বিনা অধিকারে এই নীতি রচনা করেছিল যে- "প্রত্যেক দেশের অধিবাসীগণ সে দেশের মালিক, তারা তাদের ইচ্ছামত দেশকে গড়তেও পারে, ভাঙ্গতেও পারে।" আল্লাহর আইন ইতিহাসের এই চিরন্তন ফয়সালা থেকে প্রমাণ করেছে যে- না, দেশ এক মাত্র আল্লাহর, এর পরিচালনার ভার কাকে দেয়া হবে এ ফয়সালা তিনিই করবেন, এ ফয়সালা কোন বংশ, জাতি অথবা পিতা-প্রপিতার অধিকারের ভিত্তিতে হয় না। বরং কোন্ কোন্ পরিচালনায় সামগ্রিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে, সে দিকে নজর রেখেই এ ফয়সালা গৃহীত হয়।

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاء وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاء وَتُعِزُّ مَن تَشَاء وَتُذِلُّ مَن تَشَاء بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. - سورة آل عمران26

"বলুন, হে আল্লাহ্! দেশের মালিক! তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে রাজ্য দিয়ে থাক এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে থাক এবং যাকে চাও তাকে সম্মান এবং যাকে চাও লাঞ্ছনা দিয়ে থাক। তোমারই হাতে রয়েছে সব মঙ্গল। তুমি নিঃসন্দেহে সব কিছু করার ক্ষমতা রাখ।" [সূরা আলে ইমরানঃ ২৬]

এভাবেই হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে একটি জাতিকে আল্লাহ্ এ দেশে নিয়ে এলেন। এরা এ দেশে সংখ্যায় তিন চার লাখের বেশী কোন সময়ই ছিল না। কিন্তু এরা এখানকার উপায়-উপাদান ও মানুষ দিয়ে এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, শিখ ইত্যাদি সমস্ত শক্তিকে পরাজিত করে দেশের শাসন ক্ষমতা দখল করল। এ দেশের কোটি কোটি অধিবাসী এ মুষ্টিমেয় ইংরেজদের অধীন হয়ে রইল। একজন ইংরেজ একাই একটি জেলা শাসন করেছে। তাও এমন অবস্থায় যে, এ কাজে তার হাত শক্তিশালী করার মতো তার জাতির কোন লোক এখানে ছিল না। এসময় এ দেশের লোকেরা যা কিছু করেছে তা সবই চাকর হিসেবে করেছে- কার্যকারক হিসেবে নয়। ইংরেজদের শাসনামলে এ দেশে যেসব গঠনমূলক ও উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছে, তা তাদের দ্বারা এবং তাদের প্রভাবেই হয়েছে- এ কথা আমাদের সবাইকে স্বীকার করতে হবে। অস্বীকার করলে সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে। তারা যে অবস্থায় এদেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়েছিল, তার তুলনায় আজকের অবস্থা দেখলে এ কথা স্বীকার করার জো নেই যে, তাদের অনিষ্টকারিতা সত্ত্বেও অনেক গঠনমূলক ও উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছে। এসব কাজ এদেশবাসীর দ্বারা সম্পন্ন হওয়ার কোন আশাই ছিল না। এ জন্যই তো আল্লাহ্ আঠার'শ শতাব্দীর মাঝখানে এ দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, তা মোটেই ভুল ছিল না।

এখন দেখুন, ইংরেজরা যা কিছু গড়তে পারত তা গড়েছে আর বিশেষ কিছু তাদের দ্বারা গড়ে উঠতে পারে না। এখন তারা যা গড়তে পারে তা অন্যের দ্বারাও সম্ভব। ওদিকে তাদের ধ্বংসকারিতার বহর খুব বেড়ে গেছে। আর যতদিন তারা এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে, ততদিন গড়ার চেয়ে ভাঙ্গবেই বেশী। তাদের অন্যায় ও অপরাধের ফিরিস্তি এত দীর্ঘ হয়েছে যে, তা এক বৈঠকে বর্ণনা করা মুশকিল। আর সেগুলো বর্ণনা করার কোন প্রয়োজনও নেই। কারণ, সেসব সবার চোখের সামনেই রয়েছে। তাদেরকে এখন এ দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে বেদখল করাই আল্লাহর সিদ্ধান্ত। তারা নিজেরাই সোজাভাবে এ দেশ থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত হয়ে বেশ বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।

সোজাভাবে না গেলে বাঁকাভাবে তাড়িয়ে দেয়া হতো। কারণ, আল্লাহর চিরন্তন আইন এখন আর তাদের হাতে এ দেশের শাসন ক্ষমতা রাখার পক্ষপাতি নয়।

দুনিয়ার প্রকৃত মালিক কোন দেশে এক প্রকার পরিচালনা ব্যবস্থা খতম করে অন্য প্রকার ব্যবস্থা কায়েম করার ব্যবস্থা করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আমরা এখন তারই দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে আছি। এটা ইতিহাসের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাহ্যদৃষ্টিতে এ দেশে যেভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে দেখা যাচ্ছে তাতে কেউ যেন এ প্রতারণায় না পড়েন যে, দেশের শাসনক্ষমতা দেশবাসীর হাতে দেয়ার এই যে সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা একেবারে চূড়ান্ত ও চিরন্তন। বর্তমান পরিস্থিতির একটা সহজসাধ্য রূপ হয়তো আপনারা অনায়াসেই অনুধাবন করতে পারছেন যে, বিদেশ থেকে এসে যারা এ দেশ শাসন করছিল, এখন তারা নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। কাজেই এখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের ক্ষমতা দেশবাসীর হাতে আসাই উচিত। আসলে কিন্তু তা নয়। আল্লাহর সিদ্ধান্ত এরূপ হয় না। তিনি এই বিদেশীদেরকে পূর্বেও অকারণে আনেননি, আবার এখনো বিনা কারণে সরিয়ে দিচ্ছেন না। পূর্বে যেমন তিনি আপনাদের কাছ থেকে খামখেয়ালীভাবে শাসনক্ষমতা কেড়ে নেননি, তেমনি এখনো আপনাদেরকে খামখেয়ালীভাবে এ ক্ষমতা দেবেন না। আসল ব্যাপার এই যে, বর্তমানে ভারতবাসীরা ক্ষমতার প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছে; হিন্দু, মুসলমান, শিখ সবাই প্রার্থী। যেহেতু এরাই দেশে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছে, কাজেই তাদেরকেই প্রথম ক্ষমতা লাভের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা স্থায়ী নিযুক্তি নয়, বরং তাদের পরীক্ষার জন্যই এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যদি তারা নিজেদের কার্যকলাপে প্রমাণ করে যে, ভাঙ্গার চেয়ে গড়ার যোগ্যতাই বেশী, তাহলে তাদেরকে এ দেশের শাসন ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে নিযুক্ত করা হবে। আর যদি তারা গঠনমূলক কাজের চেয়ে ধ্বংসাত্মক কাজই বেশী করে, তবে তার পরিণাম খুব শিগগিরই ভোগ করবে। এ অবস্থায় তাদের কাছ থেকে এ দেশের শাসনক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অন্য কোন জাতিকে এ কাজের জন্য নির্বাচিত করা হবে। অতঃপর আর তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই করতে পারবে না। সমগ্র দুনিয়ার সম্মুখে নিজেদের অযোগ্যতার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়ার পর তারা কোন মুখে অভিযোগ করবে ? নাছোড়বান্দা হয়ে অনুনয় বিনয় করলেও তা শুনবেই বা কে ?

এখন আপনারা একটু পর্যালোচনা করে দেখুন যে, এ দেশের হিন্দু-মুসলমান ও শিখ এ পরীক্ষায় আল্লাহর সামনে নিজেদের এমন কি যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, গুণ-গরিমা এবং কার্যকলাপ পেশ করেছেন যে, তার ফলে আল্লাহ্ তাঁর দেশের শাসন ক্ষমতা আবার তাদের হাতে সোপর্দ করবেন বলে তারা আশা করতে পারেন। হিন্দু, মুসলমান ও শিখদের অপরাধগুলো নৈতিকতার আদালতে পেশ করলে তারা সবাই দোষী সাব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি যদি এখন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে সেগুলো বলে দেই, তাহলে আশা করি আপনারা খারাপ মনে করবেন না। নিজের জাতি ও স্বদেশী ভাইদের দোষ বর্ণনা করা আমারও ভাল লাগে না। আসলে আমার হৃদয় এতে কাঁদে। কারণ, আমি তাদের এ সমস্ত দোষ ও অপরাধের মারাত্নক পরিণাম যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। তাদেরকে শিগ্গিরই এ পরিণামের সম্মুখীণ হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এসব দোষ ও অপরাধ তাদেরকে ধ্বংস করবে বলে আমার আশংকা হচ্ছে। আমি, আপনি কেউই এ মারাত্মক পরিণাম থেকে বাঁচতে পারবো না। এজন্য আমি অন্তরের বেদনা নিয়ে এগুলো বিবৃত করছি। এর ফলে যার কান আছে সে শুনে সংশোধনের কিছুটা চিন্তা করতে পারবে।

আমাদের দেশবাসীর সাধারণ নৈতিক চরিত্রের অবস্থা যে রকম হয়েছে তা আপনারা নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অনুযায়ী অনুমান করে দেখুন। আমাদের ভেতর শতকরা ক'জন সত্যিকার চরিত্রবান লোক আছে ? কারোর অধিকার হরণ করা, কোন অবৈধ স্বার্থসিদ্ধি, কোন 'লাভজনক' মিথ্যা বলা এবং কোন 'লাভজনক' বিশ্বাস-ঘাতকতা করা নৈতিক দৃষ্টিতে খারাপ -শুধু এই কারণে আমাদের ক'জন এসব কাজ করতে ইতস্তত করে থাকে? যেখানে আইনের বাঁধন নেই অথবা যেখানে আইনের আওতা থেকে বাঁচবার আশা ও পথ আছে, সেখানে শতকরা ক'জন শুধু নিজের নৈতিক অনুভূতির বলে অন্যায় ও অপরাধ থেকে বিরত থাকে? যেখানে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের আশা না থাকে, সেখানে ক'জন অন্যের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে। এরূপ ক্ষেত্রে ক'জন অপরের দুঃখে-দৈন্যে মনে ব্যাথা পায় এবং স্বার্থ ত্যাগ করে? নিস্বার্থভাবে ক'জন অপরের হক আদায় করে? ক' জন ব্যবসায়ী ধোঁকা-ফাঁকি, মিথ্যা, মুনাফাখোরী, অন্যায়ভাবে উপার্জন করা থেকে বিরত থাকে? ক'জন শিল্পপতি নিজের স্বার্থের সঙ্গে ক্রেতাদের স্বার্থ এবং নিজের জাতি ও দেশের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখে? খাদ্যশস্য মজুদ রেখে অত্যাধিক চড়া দরে বিক্রি করতে গিয়ে ক'জন জমিদার একটু ভেবে দেখে যে, তারা এ মুনাফাকারীর দ্বারা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষকে ভূখা রেখে অসহ্য যন্ত্রনা দিচ্ছে? ক'জন ধনী ব্যক্তি ধন উপার্জনে অন্যায়, অত্যাচার, অধিকার হরণ ও বিশ্বাস ঘাতকতা থেকে মুক্ত রয়েছে? আমাদের দেশের শ্রমজীবি দের মধ্যে ক'জন সঠিকভাবে কর্তব্য পালন করে তাদের বেতন ও পারিশ্রমিক গ্রহণ করে? ক'জন সরকারী কর্মচারী ঘুষ, আমানত খেয়ানত, অত্যাচার, উৎপীড়ন, কর্তব্যে অবহেলা, হারাম খাওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে? উকিল, চিকিৎসক, সাংবাদিক, গ্রন্থকার, প্রকাশক, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক ও নেতৃবৃন্দের ক'জন নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য অসৎ ও ঘৃন্য পন্থা অবলম্বন করে না? এদের ক'জন মানুষের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আর্থিক ক্ষতি সাধনে কিছু মাত্র লজ্জা বোধ করে? বড় জোর দেশের শতকরা মাত্র পাঁচজন এসব নৈতিক রোগ থেকে মুক্ত রয়েছে, আমার মনে হয় একথা মোটেই অতু্যক্তি নয়। বাকী পঁচানব্বই জনই এই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত। এ ব্যাপারে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খৃষ্টান প্রভৃতির ভেতর কোন পার্থক্য নেই। সবাই সমানভাবে রোগাক্রান্ত। সবারই নৈতিক অবস্থার চরম ও ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। কোন জাতির অবস্থাই অন্য জাতির চেয়ে ভাল নয়।

অধিকাংশ লোক এরূপ নৈতিক অধঃপতনের কবলে পড়ায় সমষ্টিগত ভাবে এই নৈতিক রোগের ব্যাপক প্রসার হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। গত মহাযুদ্ধের কারণে যখন রেল গাড়ীতে যাত্রীদের ভীড় হতে লাগলো তখন এই সম্ভাব্য তুফানের প্রথম লক্ষণ দেখা দিল। সেখানে একই জাতির ও একই দেশের লোকেরা পরস্পরের সঙ্গে যে স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা ও কঠোরতামূলক ব্যবহার করেছে, তা থেকেই টের পাওয়া গিয়েছিল যে, কেবল দ্রুতগতিতে আমাদের সাধারণ নৈতিক চরিত্রের অবনতি ঘটেছে। এরপর প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের অভাব ও উচ্চমূল্যের সময় মাল মজুদ রাখা এবং চোরাবাজারী ব্যাপক ভাবে শুরু হয়। অতঃপর দেখা দিল বাংলাদেশের সেই ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। এই দুরাবস্থার সময় দেশের এক সমপ্রদায় নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য নিজেদের দেশের লাখো লাখো মানুষকে ভূখা রেখে তিলে তিলে মৃতু্যর দিকে এগিয়ে দিয়েছে। এসব ছিল প্রাথমিক লক্ষণ, এরপর নোংরামি, বর্বরতা, নীচতা, পশুসুলভ আচরণ ইত্যাদির অগি্নকাণ্ড হঠাৎ ফেটে পড়লো। এগুলো এখানকার গভীরে বহুদিন হতে উত্তপ্ত হচ্ছিল। বর্তমানে একটি সামপ্রদায়িক দাঙ্গারূপে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সবকিছু জ্বালিয়ে ছাই করে দিচ্ছে। কলকাতার গোলযোগের পর থেকে হিন্দু, মুসলমান ও শিখদের জাতীয় বিরোধের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনটি জাতিই তাদের জঘন্য চরিত্রের প্রদর্শনী করে বেড়াচ্ছে।

যে সমস্ত কাজ কোন মানুষ করতে পারে বলে ধারণাও করা যেত না, তা আজ আমাদের দেশবাসীরা প্রকাশ্যে করে যাচ্ছে। বড় বড় অঞ্চলের প্রায় সমস্ত লোক গুন্ডায় পরিণত হয়েছে। গুন্ডারা যে কাজ করার ধারণাও কোন দিন করেনি তাও এখন তারা করছে। দুগ্ধ-পোষ্য শিশুদের মায়ের বুকের উপর রেখে জবাই করা হয়েছে, জীবন্ত মানুষদেরকে আগুনে জ্বালানো হয়েছে। ভদ্র মহিলাদের হাজার হাজার লোকের সামনে উলঙ্গ করে তাদের উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছে। পিতা, ভাই ও স্বামীর সামনে তাদের মেয়ে, বোন ও স্ত্রীর শ্লীলতা হানি করা হয়েছে। মসজিদ, মন্দির ও ধর্মীয় গ্রন্থরাজির উপর ক্রোধ প্রকাশ করতে গিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিক উপায় অবলম্বন করা হয়েছে। রুগ্ন, আহত ও বৃদ্ধাদেরকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। পথিক যাত্রীদেরকে চলন্ত গাড়ী থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করা হয়েছে। নিরীহ ও অক্ষম লোকদেরকে জন্তু-জানোয়ারের মতো শিকার করা হয়েছে। প্রতিবেশী ও প্রতিবেশীর গৃহ লুট-তরায করেছে। বন্ধুর প্রতি বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আশ্রয় দাতা আশ্রয় দিয়ে নিরাশ্রয় করেছে। শান্তি ও নিরাপত্তার রক্ষকগণ (পুলিশ, সৈন্য ও ম্যাজিষ্ট্রেটগণ) প্রকাশ্যে দাঙ্গায় অংশ গ্রহণ করেছে এমনকি তারা নিজেরাই দাঙ্গা করেছে এবং নিজেদের সাহায্য সহানুভূতি ও তত্ত্বাবধানে দাঙ্গা বাধিয়েছে। মোটকথা, অত্যাচার, অনাচার, নিষ্ঠুর ও নির্দয় ব্যবহার, বর্বরতা ও জঘন্য কার্যকলাপ ইত্যাদির কোন কিছু আর বাকী নেই, যা এ কয়েক মাসের ভেতর আমাদের দেশের লোকেরা সমষ্টিগতভাবে করেনি। তবুও মনের জ্বালা মেটেনি। আলামত যা দেখা যাচ্ছে, মনে হয় এর চেয়ে অনেক বেশী ভয়াবহ ও বিরাট আকারে দাংগা এখন দেখা দেবে।

আপনারা কি মনে করেন, এসব কিছুই একটা আকস্মিক উত্তেজনার ফল মাত্র। এরূপ ধারনা করে থাকলে আপনারা বিরাট ভুলের মধ্যে আছেন বলতে হবে। এই মাত্র আমি আপনাদের বলেছি যে, এ দেশের শতকরা পঁচানব্বই জন নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। দেশের জন সমষ্টির এত বিরাট অংশ যদি অসৎ চরিত্রের হয়ে পড়ে তা হলে জাতির সমষ্টিগত স্বভাব চরিত্র কেমন করে ঠিক থাকতে পারে? এই জন্যই তো হিন্দু-মুসলমান ও শিখ জাতির কাছে সত্যবাদিতা, সুবিচার ও সততার কোন দামই এখন নেই। সত্যপন্থী, সৎ এবং ভদ্রস্বভাব বিশিষ্ট লোকেরা তাদের ভিতর কোনঠাসা ও দুর্বল হয়ে রয়েছে। মন্দ কাজে বাধা দান এবং ভাল কাজ করার জন্য উপদেশ দেয়া তাদের সমাজে অসহনীয় অপরাধে পরিণত হয়েছে, সত্য ও ন্যায় কথা শুনতে তারা প্রস্তুত নয়।

তাদের মধ্যে একটি জাতিই এমন লোকদেরকে পছন্দ করে যারা তার সীমাহীন লোভ লালসা ও স্বার্থের পক্ষে ওকালতি করে এবং অন্যের বিরুদ্ধে তাকে উত্তেজিত করে তার ন্যায় ও অন্যায় সবরকম স্বার্থোদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করতে প্রস্তুত হয়। এজন্যই এরা নিজেদের ভিতর থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে দুষ্ট প্রকৃতির লোকদেরকে নিজেদের নেতা নির্বাচন করেছে। তারা নিজেদের জঘন্যতম অপরাধীদেরকে খুঁজে বের করে তাদেরকে নিজেদের নেতৃত্ব পদে বরণ করে নিয়েছে। তাদের সমাজে সবচেয়ে দুশ্চরিত্র, দূর্নীতিবাজ, বিবেকহীন লোকেরা তাদের মুখপাত্র সেজে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অত্যাধিক বরণীয় হয়েছে। অতঃপর এসব লোকেরা নিজ নিজ পথভ্রষ্ট জাতিকে নিয়ে ধ্বংসের পথে দ্রুত গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। তারা জাতির পরস্পর বিরোধী আশা-আকাংখাকে কোন ইনসাফের কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিত না করে তাকে এতখানি বাড়িয়ে দিয়েছে যে, তা অবশেষে সংঘর্ষের সীমান্তে পৌঁছেছে। তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘর্ষে ক্রোধ, ঘৃণা, শত্রুতার বিষ মিশিয়ে একে নিত্য অগ্রবর্তী করেছে। বহু বছর ধরে নিজেদের প্রভাবাধীন জাতিগুলোকে উত্তেজনামূলক বক্তৃতা ও রচনার ইনজেকশন দিয়ে এতখানি উত্তেজিত করে তুলেছে যে, এখন উত্তেৎনাবশতঃ কুকুর ও হিংস্র পশুর মত লড়াই করবার জন্য খড়গ উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসাধারণ ও শিক্ষিত সমাজের মনকে পৈশাচিক আবেগ ও উচ্ছাসে দূর্গন্ধময় এবং অন্ধ শত্রুতার চুল্লীবানিয়ে ফেলেছে। আপনাদের সামনে এখন যে তুফান প্রবাহিত হচ্ছে তা মোটেই সাময়িক ও আকস্মিক নয়। বহুদিন থেকে বিকৃতির যেসব বেশুমার কার্যকারণ আমাদের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে এ হলো তারই স্বাভাবিক পরণতি। এটা একবার দেখা দিয়েই ক্ষান্ত হবে না; বরং যতদিন পর্যন্ত এসব কার্যকারণ সক্রিয় থাকবে, ততদিন এ বিকৃতি ক্রমশ বাড়তে থাকবে। এটা একটা শস্যপূর্ণ ক্ষেতের মত। বহু বছরের বীজ বপন ও জল সেচের পর এ ফসল খাবার উপযুক্ত হয়েছে। এখন আপনাকে এবং আপনার বংশধরদেরকে কতদিন পর্যন্ত এ ফসল কাটতে হবে তা বলা যায় না।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ