প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label মুক্তিযুদ্ধ. Show all posts
Showing posts with label মুক্তিযুদ্ধ. Show all posts

Sunday, January 1, 2012

৭১ এর সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডার | মরুভূমির জলদস্যু

মানচিত্রে ১১টি সেক্টর ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাতে বলা হয়ঃ সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হল যে প্রধান সেনাপতি অফিসারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। সেনা কমান্ডকে সমন্বিত করে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। বাংলাদেশ বাহিনীতে প্রশিক্ষণার্থীদের বাছাইপর্বে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পরবর্তীতে ১১ই জুলাই মুজিবনগরে কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডকে ১১টি যুদ্ধক্ষেত্র বা সেক্টরে ভাগ করা হয়। । প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। নিচে সেক্টর নং, সেক্টর আওতা, সেক্টর কমান্ডার ও আরো কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হলো। সর্বাধিনায়ক ও প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী উপ প্রধান সেনাপতি ও বিমানবাহিনী প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার উপ প্রধান সেনাপতি ও সেনাবাহিনী প্রধান (ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি।) লে.কর্নেল আবদুর রব ১নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার : মেজর জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) (এপ্রিল- জুন) সেক্টর কমান্ডার : মেজর রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম) (জুন - ডিসেম্বর) এলাকা : চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার অংশ বিশেষ (মুহুরী নদীর পূর্বপাড় পর্যন্ত)। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২১০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২০,০০০। ২নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর এ.টি.এম হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) এলাকা : কুমিল্লা জেলার অংশ, ঢাকা জেলা ও ফরিদপুর জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৪,০০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৩০,০০০। ৩নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ (বীর উত্তম) (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর), সেক্টর কমান্ডার মেজর এ.এন.এম নুরুজ্জামান (বীর উত্তম) (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) এলাকা : কুমিল্লা জেলার অংশ, ময়মনসিংহ জেলার অংশ, ঢাকা ও সিলেট জেলার অংশ। সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৬৬৯৩ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। ৪নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর জে: চিত্তরঞ্জন দত্ত (বীর উত্তম) এলাকা : সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট-ডাউকি সড়ক পর্যন্ত। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৯৭৫ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০। ৫নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী (বীর উত্তম) এলাকা : সিলেট-ডাউকি সড়ক থেকে সিলেট জেলার সমগ্র উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল ও ময়মনসিংহ জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ১৯৩৬ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০। ৬নং সেক্টর উইং কান্ডার খাদেমুল বাশার এলাকা : সমগ্র রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১১,০০০। ৭নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক ( অগাস্ট পর্যন্ত ) সেক্টর কমান্ডার মেজর কাজী নুরুজ্জামান (বীর উত্তম) এলাকা : রংপুর জেলার অংশ, রাজশাহী জেলার অংশ, পাবনা জেলার অংশ ও দিনাজপুর জেলার অংশ, বগুড়া জেলা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল নয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১২,৫০০। ৮নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী (এপ্রিল- আগস্ট), সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মুঞ্জুর (বীর উত্তম) (আগস্ট-ডিসেম্বর) এলাকা : যশোর জেলা, ফরিদপুর জেলা, কুষ্টিয়া জেলা, খুলনা ও বরিশাল জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ৯নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল মিঞা (এপ্রিল-ডিসেম্বর প্রথমার্ধ), সেক্টর কমান্ডার মেজর জয়নুল আবেদীন ( ডিসেম্বর এর অবশিষ্ট দিন) (ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি।) এলাকা : দৌলতপুর-সাতক্ষীরা সড়ক থেকে খুলনার দক্ষিনাঞ্চল এবং সমগ্র বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল তিনটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ১০নং সেক্টর কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী (সর্বাধিনায়ক ও প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী) এলাকা : প্রধান সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে (নৌ সেক্টর) সমগ্র বাংলাদেশ। এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল নৌ-কমান্ডোদের দিয়ে। বিভিন্ন নদী বন্দর ও শক্র পক্ষের নৌ-যানগুলোতে অভিযান চালানোর জন্য এঁদের বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হতো। যে সেক্টর এলাকায় কমান্ডো অভিযান চালানো হতো, কমান্ডোরা সেই সেক্টর কমান্ডারের অধীনে কাজ করত। নৌ-অভিযান শেষে তারা আবার তাদের মূল সেক্টর- ১০ নম্বর সেক্টরের আওতায় চলে আসত। নৌ-কমান্ডোর সংখ্যা ছিল ৫১৫ জন। ১১নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের (বীর উত্তম) (আগস্ট-নভেম্বর), সেক্টর কমান্ডার স্কেয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ (নভেম্বর-ডিসেম্বর) এলাকা : কিশোরগঞ্জ মহকুমা বাদে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা এবং নগরবাড়ি-আরিচা থকে ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত যমুনা নদী ও তীর অঞ্চল। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। টাংগাইল সেক্টর কাদের সিদ্দিকী। এলাকা : সমগ্র টাংগাইল জেলা ছাড়াও ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার অংশ আকাশ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার এলাকা: বাংলাদেশের সমগ্র আকাশসীমা তথ্য সূত্র : সেক্টর কমান্ডারর্স ফোরাম গুণীজন উইকি গুগল এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের ঝিঁঝি পোকার বাগানে নিমন্ত্রণ।

Monday, December 12, 2011

একাত্তরে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ || একরামুল হক শামীম

১৯৭১ সালে নারীর বিরুদ্ধে যে বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা মানব ইতিহাসে বিরল। নারীর প্রতি অত্যাচারে সেই বিষয়গুলো কখনোই পুরোপুরি উঠে আসেনি। অনেকের জীবনের করুন ঘটনাগুলো তাই আড়ালেই থেকে গেছে। কখনোই উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি সেই নারীদের দুঃখগুলোকে; যারা রাতের পর রাত নির্মম যৌন নির্যাতন সহ্য করে গেছে, পরনে কাপড় ছিলনা , মাথার চুল প্যাচিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে এই ভেবে যাদের মাথা চুল কেটে ফেলা হয়েছিল, নিজের পরিবারের সদস্যদের সামনে যাদের ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। নারীর বিরুদ্ধে যে বীভৎসতম নির্যাতন চালানো হয়েছিল ১৯৭১ সালে তার বিচার হয় নি। এমনকি এই বিষয়টি যে অন্য অপরাধগুলো থেকে আলাদা মাত্রার সেটিও আলোচিত হয় নি। এমনকি নির্যাতিত নারীর সঠিক সংখ্যাও জানা সম্ভব হয় নি। বরঞ্চ নির্ভর করতে হয়েছে বিভিন্ন সংখ্যার ওপর।
কয়েকটি পরিসংখ্যান
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জনসভায় বলেছিলেন, দুই থেকে আড়াই লাখ নারী যুদ্ধে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে এ সংখ্যাটিকেই সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক বাংলার বানী’র গনহত্যা বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা থেকে জানা যায়, দুই থেকে আড়াই লাখের পরিসংখ্যানটি সে সময়ের সরকারি কর্মকর্তারা অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশের ৪৮০টি থানার ২৭০টিই পাকিস্তানী সেনাদের দখলে ছিল। প্রতিদিন গড়ে ২ জন করে নিখোঁজ মহিলার হিসাব অনুযায়ী লাঞ্ছিত মহিলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ। [১]
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান, ৪ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তিনি আরো জানান, অন্তঃসত্ত্বা মহিলার সংখ্যাই ২ লাখ।
সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় দু’লাখ, তিন লাখ ও চার লাখ- এরকম তিনটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ রয়েছে।
সুসান ব্রাউনমিলার এ সংখ্যাটিকে প্রায় চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন।[২] তিনি লিখেছেন-
During the nine-month terror, terminated by the two week armed intervention of India, a possible three million people lost their lives, ten millions fled across the border to India and 200,000, 300,000 or possible 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. Eighty percent of the raped women were Moslems, reflecting the population of Bangladesh, but Hindu and Christian women were not exempt.
ওয়ারক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি একাত্তরের নারী নির্যাতনের একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে।[৩] এর মাধ্যমে জানা যায়-
১. স্পট ধর্ষণ,স্পট গণধর্ষণ ও বন্দী নির্যাতিতার সম্মিলিত সংখ্যা চার লাখ আটষট্টি হাজার (স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার তিন লাখ সাতা হাজার ছশ এবং বিভিন্নভাবে পাকিস্তানীদের নিকট বন্দী নির্যাতিত নারী এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’ নারী)।
২. চিহ্নিত স্থানে নির্যাতিতা নিহত ও অপহৃতসহ স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার- তিন লাখ ষাট হাজার। এঁদের মধ্যে শুধুমাত্র স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার প্রায় তিন লাখ সাতাশ হাজার যা মোট নির্যাতিতার সত্তরভাগ। এঁদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন প্রায় ত্রিশভাগ অর্থাৎ এক লাখ আট হাজার নারী।
৩. নির্যাতিত বন্দী নারী প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার (এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’) যা মোট নির্যাতিতার প্রায় ত্রিশভাগ। এরমধ্যে কারাগার, ক্যাম্প, বাঙ্কার প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিতার সংখ্যা মোট নির্যাতিদের প্রায় আঠারভাগ।
এছাড়াও বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট, মার্শাল ল’ আদালত এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর, অফিস আদালত, হোটেল, বিনোদন কেন্দ্র প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিত হন বারোভাগ (ক্যাটাগরি দুই-শতকরা পাঁচভাগ এবং ক্যাটাগরি তিন-সাতভাগ)।
৪. বন্দী নির্যাতিত নারীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা আশিভাগ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছিয়াশি হাজার। এঁদের মধ্যে চল্লিশভাগকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তাঁরা নিজেরাই আত্মহত্যা করেছেন।
যৌন নির্যাতন
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ড. জিওফে ডেভিস বলেছেন, পৌনঃপুনিক লালসা চরিতার্থ করবার জন্য হানাদারবাহিনী অনেক তরুণীকে ধরে তাদের শিবিরে নিয়ে যায়। এসব তরুণীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হবার লক্ষণ কিংবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে হয় তাঁদেরকে পরিত্যাগ করা হয়েছে নয়তো হত্যা করা হয়েছে। কোন কোন এলাকায় বারো ও তেরো বছরের বালিকাদের শাড়ি খুলে নগ্ন অবস্থায় রেখে ধর্ষণ করা হয়েছে যাতে তারা পালিয়ে যেতে অথবা আত্মহত্যা করতে না পারে।[৪]
সুসান ব্রাউনমিলার তার Against Our Will: Men, Women and Rape বইয়ে লিখেছেন-[৫]
Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty. Girls of eight and grandmothers of seventy-five had been sexually assaulted during the nine-month repression. Pakistani soldiers had not only violated Bengali women on the spot; they abducted tens of hundreds and held them by force in their military barracks for nightly use. The women were kept naked to prevent their escape.
যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ ৯ মাস সময়ে নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পাকিস্তানী সৈনিকরা নারীদের বন্দি করে নিয়ে গেছে নিজস্ব ক্যাম্পে এবং বাঙ্কারে। দিনের পর দিন সেখানে তাদের আটকে রেখে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। ক্যাম্প পরিবর্তনের সাথে সাথে সেইসব নারীদেরও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্য ক্যাম্পে।
ডা. এম এ হাসান লিখিত “যুদ্ধ ও নারী” গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে এমনই একজনের কাহিনী।[৬]
“একাত্তরের মে মাসে হবিগঞ্জের লস্করপুরে চা বাগান থেকে পাকি আর্মিরা যখন সুপ্রিয়া নায়েককে ধরে নিয়ে যায় তখনও তাঁর বয়স ষোল পেরোয়নি। প্রথম দিন চা বাগানের এক ক্যাম্পে নিয়ে কয়েকজন পাকি আর্মি তাঁর ওপর বীভৎস যৌন নির্যাতন চালায়। সেই ছিল শুরু। তারপর পাকিরা তাঁকে নিয়ে গেছে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে, এক বাগান থেকে অন্য বাগানে। দিনের পর দিন ঐসব ক্যাম্পের আর্মি অফিসাররা তাঁর ওপর নির্দয় নির্যাতন চালিয়েছে। দীর্ঘ আট মাসের প্রতি রাতে চারজন পাঁচজন করে পাকি তাঁকে ধর্ষণ করেছে। একটি রাতের জন্যও নিষ্কৃতি দেয়নি তাঁকে। তাদেরকে বাঁধা দেবার কোন উপায় ছিল না, মুখ বুজে সব সহ্য করে গেছেন তিনি। এরমধ্যে একবার ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এলেও পাকিরা আবার তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সুপ্রিয়া নায়েক সহ্য করেছেন পাকিদের সীমাহীন নির্যাতন। যুদ্ধের ক’মাসে অন্তত পঞ্চাশজন পাকি আর্মি অফিসার তাঁকে নিয়মিত ধর্ষণ করেছে। তাঁকে ঠিকমতো খাবার দেয়নি, অসুস্থ হলেও চিকিৎসা করায়নি। দিনের পর দিন কেবল চালিয়ে গেছে বীভৎস ধর্ষণ।”
১৯৭২ সালে মার্চ থেকে ছয় মাস বাংলাদেশের হয়ে কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক ড. জেফ্রি ডেভিস। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান-[৭] “ধনী ও সুন্দরী মেয়েদেরকে অফিসারদের জন্য রেখে দেয়া হতো আর বাকিদের অন্যান্য র্যাংঙ্কের সৈন্যদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো। আর মেয়েদেরকে দারুণ কষ্টে ফেলে দেয়া হতো। তাদেরকে পর্যাপ্ত খেতে দেয়া হতো না। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসা দেয়া হতো না। অনেকেই ক্যাম্পের মধ্যে মারা গেছে।”
অপহরণ
যুদ্ধকালীন সময়ে শুধু যৌন নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয় নি পাকবাহিনী। বেশ কিছু সংখ্যক নারীকে ‘কমফোর্ট গার্ল’ হিসেবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা। ১৯৭২ সালের ২০ জুন দৈনিক ইত্তেফাকের তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হইতে অপহৃতা সাড়ে ৭০০ তরুণীর মর্মবেদনার কাহিনী’ শীর্ষক খবরে লেখা হয়, ‘দখলদার পাক বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হইতে অপহরণ করিয়া নেওয়া ৭ শত ৫৫ জন বাঙালি তরুণী করাচি ও কোয়েটার বন্দী শিবিরগুলিতে অমানুষিক দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকারে পরিণত হইয়াছে।’
জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা (forced pregnancy)
অফিসিয়াল ডকুমেন্ট অনুযায়ী যুদ্ধকালীন সময়ে ফোর্সড প্যাগন্যান্সীর (forced pregnancy) শিকার হন কমপক্ষে ২৫০০০ জন।[৮]
অন্যদিকে সুসান ব্রাউনমিলারের লিখেছেন ধর্ষণের পরও বেঁচে থাকা নারীদের মধ্যে ২৫ হাজার জন গর্ভধারন করেছিলেন (ব্রাউনমিলার, ১৯৭৫ : ৮৪)। তিনি লিখেছেন-
The most serious crisis was pregnancy. Accurate statistics on the number of raped women who found themselves with a child were difficult to determine but 25,000 is the generally accepted figure.
তবে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির ডা. এম এ হাসান দাবি করেন, ‘এ ধরনের নারীর সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৮৮ হাজার ২ শ’। ’৭২ সালের মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৬২ হাজার ধর্ষিত নারী এবং আরো ১ লাখ ৩১ হাজার হিন্দু নারী স্রেফ গায়েব হয়ে গিয়েছিল। তারা বিলীন হয়ে গিয়েছিল বিশাল জনসমুদ্রে।’ এদের মধ্যে ৫ হাজার জনের গর্ভপাত সরকারিভাবে ঘটানো হয়েছিল বলে জানান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা দিতে আসা অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস। ১৯৭২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন দৈনিক বাংলায় তার কাজের ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তার মতে, সরকার উদ্যোগ নেওয়ার আগেই ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার নারীর ভ্রুণ স্থানীয় দাই, ক্লিনিকসহ যার পরিবার যেভাবে পেরেছে সেভাবে ‘নষ্ট’ করেছে।[৯]
জেনোসাইডাল রেইপ (গণহত্যা সম্পর্কিত ধর্ষণ) (Genocidal Rape)
জোনোসাইডাল রেইপের সাথে গণহত্যার সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধকালীন সকল ধর্ষণই গণহত্যার সাথে সম্পর্কিত নয়। যদি ধর্ষণের সাথে কোন একটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা থাকে অর্থাৎ গণহত্যার যেসব উপাদান জরুরী তা যদি ধর্ষণের মাধ্যমে করা হয় সেটাই জোনোসাইডাল রেইপ।
জেনোসাইডাল রেইপ বিষয়টি প্রথম আলোচিত হয় রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়। আকায়েসু (Akayesu) মামলায় প্রথমবারের মতো গণহত্যার সাথে ধর্ষণের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। আকায়েসু রুয়ান্ডার একটি কমিউনিটি টাবার মেয়র ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায় প্রমাণিত হয়। ১৯৯৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর International Criminal Tribunal for Rwanda – ICTR আকায়েসুর বিরুদ্ধে রায় দেয়।[১০]
আকায়েসুর মামলাটি বিখ্যাত কারন এটিই প্রথম রায় যেখানে গণহত্যা বিচার হয়েছে, যে গণহত্যার সাথে যৌন নির্যাতনের সম্পর্ক আছে। পাশাপাশি এই মামলার রায়ে ধর্ষণ এবং যৌণ নির্যাতনের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।[১১]
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে জেনোসাইডাল রেইপ সংঘটিত হয়েছিল। এনবিসি নিউজ ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট করে। যাতে জানা যায় ১৩ বছরের মেয়েরাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
পাকিস্তানী সেনাদের স্থানীয় সহযোগী, রাজাকার এবং আল বদর বাহিনী বিশেষত হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনের জন্য ধর্ষণ করতো। বীনা ডি কস্তা লিখেছেন-[১২]
The Pakistan Army’s local militia, known as the Razakaar and al-Badr, used rape to terrorise, in particular the Hindu population, and to gain access to its land and property.
আইনের আলোয় দেখা
ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের ১৭৯ পৃষ্টার রায়ে কোথাও ধর্ষণের বিচারের উল্লেখ নাই। তবে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট চলার সময় ধর্ষণের কিছু অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। টোকিও প্রসেডিং চলার সময় “রেপ অব নানকিং” আলোচিত হয়।
ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে নতুন এক কনসেপ্ট এর উদ্ভব হয় আন্তর্জাতিক আইন পরিমন্ডলে। সেটি হলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের চার্টার অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (Charter of the International Military Tribunal) এর আর্টিকল 6(c) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছে। লক্ষ করি সেই সংজ্ঞাটি-
“(c) Crimes against humanity: namely, murder, extermination, enslavement, deportation, and other inhumane acts committed against any civilian population, before or during the war, or persecutions on political, racial or religious grounds in execution of or in connection with any crime within the jurisdiction of the Tribunal, whether or not in violation of the domestic law of the country where perpetrated.”
লক্ষ্য করা যাক সংজ্ঞাতে হত্যা, দাসত্ব ছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয়ের অবতারনা করা হয়েছে, কিন্তু ধর্ষণের বিষয়টির উল্লেখ নেই। পরবর্তীতে বাংলাদেশ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে আইন প্রণয়ন করে [The International Crimes (Tribunals) Act, 1973] তখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। লক্ষ করি সেই সংজ্ঞায়ন-
দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ধারা 3 (2) (a) অনুযায়ী-
(a) Crimes against Humanity: namely, murder, extermination, enslavement, deportation, imprisonment, abduction, confinement, torture, rape or other inhumane acts committed against any civilian population or persecutions on political, racial, ethnic or religious grounds, whether or not in violation of the domestic law of the country where perpetrated;
“মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ : যথা, হত্যা, নিশ্চিহ্ন করণ, দাসকরণ, নির্বাসিত করা, কারারুদ্ধ করণ, অপহরণ, অবরোধ, নির্যাতন, ধর্ষণ অথবা বেসামরিক নাগরিকদের উপর অন্যান্য অমানবিক কাজ পরিচালনা করা অথবা সংগঠিত হওয়ার স্থানের অভ্যন্তরীন আইন ভঙ্গ করে বা না করে রাজনৈতিক, গোত্রগত, জাতিগত অথবা ধর্মীয় কারনে অভিশংসন করা।”
লক্ষ্য করি বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে ধর্ষণকে যুক্ত করে। আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজন। এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরবর্তী কিছু সিদ্ধান্তে।
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা (International Criminal Tribunal for Rwanda – ICTR) । আইসিটিআর এর স্ট্যাটুট-এর ৩ অনুচ্ছেদে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
Article 3
The International Tribunal for Rwanda shall have the power to prosecute persons responsible for the following crimes when committed as part of a widespread or systematic attack against any civilian population on national, political, ethnic, racial or religious grounds:
(a) Murder; (b) Extermination; (c) Enslavement; (d) Deportation; (e) Imprisonment; (f) Torture;
(g) Rape; (h) Persecutions on political, racial and religious grounds; (i) Other inhumane acts.
এই অনুচ্ছেদের 3(g) তে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ধর্ষণকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। যদিও Dr. Frances T. Pilch তার “Rape as Genocide : The Legal Response to Sexual Voilence” শীর্ষক রচনায় দাবি করেছেন আইসিটিআর এর স্ট্যাটুটে প্রথমবারের মতো ধর্ষণকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারও অনেক আগে ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ ধর্ষণকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে সংযুক্ত করে।
পরবর্তীতে রোম স্ট্যাটুটে (Rome Statute of the International Criminal Court) ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে আরো ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়। লক্ষ্য করি সেই সংজ্ঞায়নটি-
Article 7 : Crimes against humanity
1. For the purpose of this Statute, “crime against humanity” means any of the following acts when committed as part of a widespread or systematic attack directed against any civilian population, with knowledge of the attack:
(a) Murder; (b) Extermination; (c) Enslavement; (d) Deportation or forcible transfer of population; (e) Imprisonment or other severe deprivation of physical liberty in violation of fundamental rules of international law; (f) Torture; (g) Rape, sexual slavery, enforced prostitution, forced pregnancy, enforced sterilization, or any other form of sexual violence of comparable gravity; (h) Persecution against any identifiable group or collectivity on political, racial, national, ethnic, cultural, religious, gender as defined in paragraph 3, or other grounds that are universally recognized as impermissible under international law, in connection with any act referred to in this paragraph or any crime within the jurisdiction of the Court; (i) Enforced disappearance of persons; (j) The crime of apartheid; (k) Other inhumane acts of a similar character intentionally causing great suffering, or serious injury to body or to mental or physical health.
অনুচ্ছেদ 7(1) (g) এর দিকে খেয়াল করি। বলা হয়েছে Rape, sexual slavery, enforced prostitution, forced pregnancy, enforced sterilization, or any other form of sexual violence of comparable gravity মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এটিকে পূর্বের চেয়ে বিস্তৃত সংজ্ঞায়ন। জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা (forced pregnancy) বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে রোম স্ট্যাটুটের আর্টিকল 7(2) (f) এ। সেটি হলো-
(f) “Forced pregnancy” means the unlawful confinement of a woman forcibly made pregnant, with the intent of affecting the ethnic composition of any population or carrying out other grave violations of international law. This definition shall not in any way be interpreted as affecting national laws relating to pregnancy
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা’সহ অন্য বিষয়গুলোর বিচারের ক্ষেত্রে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ কনসেপ্ট এর সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
একটি প্রস্তাবনা
বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে ১৯৭৩ সালে যে আইনটি করে তাতে প্রথমবারের মতো ধর্ষণকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে নারীর ওপর ধর্ষণের বাইরেও আরো অনেক মাত্রার নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এই ধরণের নির্মম নির্যাতনের বিচার হওয়া জরুরী। রোম স্ট্যাটুট অব ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট –এ ধর্ষণ, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করাসহ আরো কিছু বিষয় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তবে এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালে নারীর বিরুদ্ধে যে ধরণের নির্যাতন চালানো হয়েছিল তার পুরোপুরি বিচারের আলোয় রাখা সম্ভব হয় না। তাই প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের উচিত নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ (Crime against Women) নামের নতুন একটি কনসেপ্টকে সংজ্ঞায়িত করে তার অপরাধীদের বিচার করা। ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্যকরা সহ নারীকে যুদ্ধক্যাম্পে আটকে রাখা, শারীরিক এবং মানসিকভাবে আক্রান্ত করা, ঠিকমতো খাবার না দেওয়া, পরিধেয় কাপড়ের ব্যবস্থা না করা এসবই হতে পারে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ।
যুদ্ধক্যাম্পে আটকে রেখে দিনের পর দিন অনাহারে রেখে রেখে, পরিধেয় কাপড় কেড়ে নিয়ে নারীদের উপর মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে যে অত্যাচার করা হয়েছে তার কঠিন বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আইনগতভাবে “নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ” কনসেপ্টটাকে গ্রহণ করা উচিত।
তথ্যসূত্র :
১. মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা কতো?;শামীমা বিনতে রহমান, ভোরের কাগজ, ১৭ মে ২০০২
২. Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 81
৩. একাত্তরের নারী নির্যাতন : ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়; ডা. এম এ হাসান; প্রসঙ্গ ১৯৭১ : মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, পৃষ্টা ৩৯
৪. একাত্তরের নারী নির্যাতন : ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়; ডা. এম এ হাসান; প্রসঙ্গ ১৯৭১ : মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, পৃ. ৩৩
৫. Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 83
৬. যুদ্ধ ও নারী; ডা. এম এ হাসান, পৃ ২৭-২৮
৭. ড. জেফ্রি ডেভিস যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী একজন ডাক্তার, বীণা ডি কস্তা, যুদ্ধাপরাধ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পৃষ্টা ৪৯-৫০
৮. Bangladesh’s erased past; Bina D’costa, find online
৯. সেইসব বীরাঙ্গনা ও তাদের না-পাক শরীর; ফারুক ওয়াসিফ
১০. Prosecutor vs. Jean-Paul Akayesu, Judgment, No. ICTR-96-4-T (September 2, 1998), hereinafter reffered to as Akayesu, Available online at .
১১. When Rapes Become Genocide, New York Times, September 5, 1998 10:1.
১২. Bangladesh’s erased past; Bina D’costa, find online
সূত্র : দ্রোহ

Sunday, May 8, 2011

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল ।। আহমেদ খালিদ

মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল (ডিসেম্বর ১৬, ১৯৪৭- এপ্রিল ১৭, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।


সংক্ষিপ্ত জীবনী

মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলা জেলার দৌলতখান থানার পশ্চিম হাজীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাবিবুর রহমান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার ছিলেন। শৈশব থেকেই দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। পড়াশোনা বেশিদূর করতে পারেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর উচচ বিদ্যালয়ে দু-এক বছর অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৭-র ১৬ ডিসেম্বর বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীতে চাকরি গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। ১৯৭১-এর প্রথম দিকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠানো হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ঘিরে তিনটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে এন্ডারসন খালের পাঁড়ে। আখাউড়ায় অবস্থিত চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট দক্ষিন দিক থেকে নিরাপত্তার জন্য দরুইন গ্রামের দুই নম্বর প্লাটুনকে নির্দেশ দেয়। সিপাহী মোস্তফা কামাল ছিলেন দুই নম্বর প্লাটুনে। কর্মতৎপরতার জন্য যুদ্ধের সময় মৌখিকভাবে তাঁকে ল্যান্স নায়েকের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়।

যেভাবে শহীদ হলেন

১৬ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কুমিল্লা-আখাউড়া রেললাইন ধরে উত্তর দিকে এগুতে থাকে। ১৭ই এপ্রিল পরদিন ভোরবেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দরুইন গ্রামে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের উপর মর্টার ও আর্টিলারীর গোলাবর্ষণ শুরু করলে মেজর শাফায়াত জামিল ১১ নম্বর প্লাটুনকে দরুইন গ্রামে আগের প্লাটুনের সাথে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেন। ১১ নম্বর প্লাটুন নিয়ে হাবিলদার মুনির দরুইনে পৌছেন। সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল তার নিকট থেকে গুলি নিয়ে নিজ পরিখায় অবস্থান গ্রহন করেন। বেলা ১১ টার দিকে শুরু হয় শত্রুর গোলাবর্ষণ। সেই সময়ে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। সাড়ে ১১টার দিকে মোগরা বাজার ও গঙ্গা সাগরের শত্রু অবস্থান থেকে গুলি বর্ষিত হয়।
১২ টার দিকে আসে পশ্চিম দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ। প্রতিরক্ষার সৈন্যরা আক্রমণের তীব্রতায় বিহ্বল হয়ে পড়ে। কয়েক জন শহীদ হন। মোস্তফা কামাল মরিয়া হয়ে পাল্টা গুলি চালাতে থাকেন। তাঁর পূর্ব দিকের সৈন্যরা পেছনে সরে নতুন অবস্থানে সরে যেতে থাকে এবং মোস্তফাকে যাবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তাদের সবাইকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগের জন্য মোস্তফা পূর্ণোদ্যমে এল.এম.জি থেকে গুলি চালাতে থাকেন। তাঁর ৭০ গজের মধ্যে শত্রুপক্ষ চলে এলেও তিনি থামেননি। এতে করে শত্রু রা তাঁর সঙ্গীদের পিছু ধাওয়া করতে সাহস পায়নি। এক সময় গুলি শেষ হয়ে গেলে, শত্রুর আঘাতে তিনিও লুটিয়ে পড়েন। 

সূত্র : http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ।। আহমেদ খালিদ

নূর মোহাম্মদ শেখ(ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৯৩৬- সেপ্টেম্বর ৫, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেসা। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানকার লেখাপড়া শেষ না করে ১৯৫৯-এর ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এ যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোরে বদলি করা হয়। বদলি স্থানে যোগ দানের আগেই স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন।

যেভাবে শহীদ হলেন

১৯৭১- এর ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্থানি সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষন করতে থাকে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষন করা হয়। তবু পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এক সময়ে সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এল.এম.জি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে।
ধরাশয়ী হওয়া মাত্র আহত নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। হাতের এল.এম.জি সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বললেন এবং মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন যতক্ষণ না তাঁরা নিরাপদ দূরুত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণে ঐ রাইফেল দিয়ে শত্রুসৈন্য ঠেকিয়ে রাখবেন এবং শত্রুর মনোযোগ তাঁর দিকেই কেন্দ্রীভুত করে রাখবেন। অন্য সঙ্গীরা তাদের সাথে অনুরোধ করলেন যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে গেলে সবাই মারা পড়বে এই আশঙ্কায় তিনি রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। বাকিদের অধিনায়োকোচিত আদেশ দিলেন তাঁকে রেখে চলে যেতে। তাঁকে রেখে সন্তর্পণে সরে যেতে পারলেন বাকিরা। এদিকে সমানে গুলি ছুড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ। একদিকে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী, সঙ্গে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে মাত্র অর্ধমৃত সৈনিক (ই.পি.আর.) সম্বল একটি রাইফেল ও সীমিত গুলি। এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে।

সূত্র : http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ।। আহমেদ খালিদ

মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৯৪৮- ডিসেম্বর ১৪, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ১৯৪৮ সালে বাবুগঞ্জ থানার রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল মোতালেব হাওলাদার। জাহাঙ্গীর ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং ১৯৬৬ তে আই.এস.সি পাশ করার পর বিমান বাহিনীতে যোগদানের চেষ্টা করেন, কিন্তু চোখের অসুবিধা থাকায় ব্যর্থ হন। ১৯৬৭ সালে তিনি পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৮-র ২ জুন তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি পাকিস্তানে ১৭৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটেলিয়ানে কর্তব্যরত ছিলেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তিনি ছুটে এসেছিলেন পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা অতিক্রম করে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। ৩ জুলাই পাকিস্তানে আটকে পড়া আরো তিনজন অফিসারসহ তিনি পালিয়ে যান ও পরে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মেহেদীপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগ দেন। বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানোর কারণে তাঁকে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বিজয় সুনিশ্চিত করেই তিনি শহীদ হয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরকে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ আঙিনায় সমাহিত করা হয়।

যেভাবে শহীদ হলেন

১০ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম, লেফটেন্যান্ট আউয়াল ও ৫০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা চাঁপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে বারঘরিয়া এলাকায় অবস্থান গ্রহন করেন। ১৪ ডিসেম্বর ভোরে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বারঘরিয়া এলাকা থেকে ৩/৪ টি দেশী নৌকায় করে রেহাইচর এলাকা থেকে মহানন্দা নদী অতিক্রম করেন। নদী অতিক্রম করার পর উত্তর দিক থেকে একটি একটি করে প্রত্যেকটি শত্রু অবস্থানের দখল নিয়ে দক্ষিণে এগোতে থাকেন।
তিনি এমনভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা করেছিলেন যেন উত্তর দিক থেকে শত্রু নিপাত করার সময় দক্ষিণ দিক থেকে শত্রু কোনকিছু আঁচ করতে না পারে। এভাবে এগুতে থাকার সময় জয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত তখন ঘটে বিপর্যয়। হঠাৎ বাঁধের উপর থেকে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের ৮/১০ জন সৈনিক দৌড়ে চর এলাকায় এসে যোগ দেয়। এরপরই শুরু হয় পাকিস্তান বাহিনীর অবিরাম ধারায় গুলিবর্ষন। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর জীবনের পরোয়া না করে সামনে এগিয়ে যান। ঠিক সেই সময়ে শত্রুর একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় জাহাঙ্গীরের কপালে। শহীদ হন তিনি।

সূত্র :  http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ ।। আহমেদ খালিদ

মুন্সি আব্দুর রউফ (১৯৪৩ - এপ্রিল ৮, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

মুন্সি আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালের মে মাসে ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার (পূর্বে বোয়ালমারী উপজেলার অন্তরগত) সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সি মেহেদী হোসেন এবং মাতার নাম মকিদুন্নেসা। কিশোর বয়সে রউফ-এর পিতা মারা যান। ফলে তিনি উচচশিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তিনি অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৩-র ৮ মে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ ভর্তি হন। তাঁর রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১৩১৮৭। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে ১১ নম্বর উইং এ কর্মরত ছিলেন। সে সময় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন।

যেভাবে শহীদ হলেন

মুন্সি আবদুর রউফ ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পনীর সাথে বুড়িঘাটে অবস্থান নেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি জলপথ প্রতিরোধ করার জন্য ৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের দুই কোম্পানী সৈন্য, সাতটি স্পীড বোট এবং দুটি লঞ্চে করে বুড়িঘাট দখলের জন্য অগ্রসর হয়। তারা প্রতিরক্ষি বূহ্যের সামনে এসে ৩" মর্টার এবং অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে হঠাৎ অবিরাম গোলা বর্ষন শুরু করে। গোলাবৃষ্টির তীব্রতায় প্রতিরক্ষার সৈন্যরা পেছনে সরে বাধ্য হয়। কিন্তু ল্যান্সনায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ পেছনে হটতে অস্বীকৃতি জানান। নিজ পরিখা থেকে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ শুরু করেন। মেশিনগানের এই পাল্টা আক্রমনের ফলে শত্রুদের স্পীড বোট গুলো ডুবে যায়।
হতাহত হয় এর আরোহীরা। পেছনের দুটো লঞ্চ দ্রুত পেছনে গিয়ে নিরাপদ দুরত্বে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে শুরু করে দুরপাল্লার ভারী গোলাবর্ষণ। মর্টারের ভারী গোলা এসে পরে আব্দুর রউফের উপর। লুটিয়ে পড়েন তিনি, নীরব হয়ে যায় তাঁর মেশিনগান। ততক্ষণে নিরাপদ দূরুত্বে সরে যেতে সক্ষম হন তাঁর সহযোদ্ধারা।

শহীদ ল্যান্স নায়েক বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ার চড়ে। তাঁর অপরিসীম বীরত্ব,সাহসীকতা ও দেশপ্রেমের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্ব্বোচ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে।

সূত্র :  http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিন আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন।। আহমেদ খালিদ

মোহাম্মদ রুহুল আমিন (১৯৩৫ - ডিসেম্বর ১০, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

মোহাম্মদ রুহুল আমিন ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলার বাঘচাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আজহার পাটোয়ারী, মাতা জোলখা খাতুন। রুহুল আমিন বাঘচাপড়া প্রাইমারী স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে আমিষাপাড়া হাই স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৩-তে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পাকিস্তান নৌ-বাহিনীতে যোগদান করেন। আরব সাগরে অবস্থিত মানোরা দ্বীপে পি.এন.এস বাহাদুর-এ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর পি.এন.এস. কারসাজে যোগদান করেন। ১৯৫৮-তে পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করেন। ১৯৬৫ -তে মেকানিসিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। পি.এন.এস. কারসাজে কোর্স সমাপ্ত করার পর আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ -তে চট্টগ্রাম পি.এন.এস. বখতিয়ার নৌ-ঘাটিঁতে বদলি হয়ে যান। ১৯৭১-এর এপ্রিলে ঘাটিঁ থেকে পালিয়ে যান। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। বাংলাদেশ নৌ বাহিনী গঠিত হলে কলকাতায় চলে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী কে দুটি গানবোট উপহার দেয়। গানবোটের নামকরণ করা হয় 'পদ্মা' ও 'পলাশ'। রুহুল আমিন পলাশের প্রধান ইঞ্জিনরুমে আর্টিফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যেভাবে শহীদ হলেন

৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলের পর পদ্মা, পলাশ' এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি গানবোট পানভেল খুলনার মংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌ-ঘাটিঁ পি.এন.এস. তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ-এ প্রবেশ করে। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উচুঁতে তিনটি জঙ্গি বিমানকে উড়তে দেখা যায়। শত্রুর বিমান অনুধাবন করে পদ্মা ও পলাশ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পরে বিমানগুলো অপ্রত্যাশিত ভাবে নিচে নেমে আসে এবং আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। গোলা সরাসরি 'পদ্মা' এর ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে। হতাহত হয় অনেক নাবিক। 'পদ্মা-র পরিণতিতে পলাশের অধিনায়ক লে. কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান করেন। কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুড়ঁতে বলে ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। কিন্তু অধিনায়কের আদেশ অমান্য করে বিমানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। বিমানগুলো উপূর্যপুরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। শহীদ হন রুহুল আমিন। রূপসা নদীর পারে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

সূত্র  : http://www.opest.net/9436.post

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ।। আহমেদ খালিদ

মোহাম্মদ হামিদুর রহমান (ফেব্রুয়ারি ২, ১৯৫৩- অক্টোবর ২৮, ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে শহীদ হওয়া হামিদুর রহমান সাত জন বীর শ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।


সংক্ষিপ্ত জীবনী

মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যশোরের মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। (১) তাঁর পিতা আব্বাস আলী মন্ডল, মাতা মোসাম্মাৎ কায়সুন্নেসা। খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে স্থানীয় নাইট স্কুলে সামান্য লেখাপড়া করেন। ১৯৭১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন। যোগদানের পরই চট্টগ্রামের সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে প্রশিক্ষণের জন্য যান। ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমনের মুখে চাকরীস্থল থেকে নিজ গ্রামে চলে আসেন। বাড়ীতে একদিন থেকে পরদিনই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য চলে যান সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই চা বাগানের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ধলই বর্ডার আউটপোস্টে।


২ যেভাবে শহীদ হলেন

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষভাগে হামিদুর রহমান ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির হয়ে ধলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন। ভোর চারটায় মুক্তিবাহিনী লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌছে অবস্থান নেয়। সামনে দু প্লাটুন ও পেছনে এক প্লাটুন সৈন্য অবস্থান নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে শত্রু অভিমুখে। শত্রু অবস্থানের কাছাকাছি এলে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছে পৌছে গেলেও ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত হতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণের জন্য আর অগ্রসর হতে পারছিলো না। অক্টোবরের ২৮ তারিখে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান বাহিনীর ৩০এ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাধে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশ নেয়। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান বাহিনীর মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রেনেড ছোড়ার দায়িত্ব দেয়া হয় হামিদুর রহমানকে। তিনি পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। দুটি গ্রেনেড সফল ভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে, কিন্তু তার পরপরই হামিদুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। (২) সে অবস্থাতেই তিনি মেশিনগান পোস্টে গিয়ে সেখানকার দুই জন পাকিস্তানী সৈন্যের সাথে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেন। এভাবে আক্রণের মাধ্যমে হামিদুর রহমান এক সময় মেশিনগান পোস্টকে অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন। এই সুযোগে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল উদ্যমে এগিয়ে যান, এবং শত্রু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে সীমানা ফাঁড়িটি দখল করতে সমর্থ হন। কিন্তু হামিদুর রহমান বিজয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি, ফাঁড়ি দখলের পরে মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হামিদুর রহমানের লাশ উদ্ধার করে। (২)

হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখন্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। (৩) নীচু স্থানে অবস্থিত কবরটি এক সময় পানির তলায় তলিয়ে যায়।
২০০৭ সালের ২৭শে অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। (৪)। সেই অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহন করে, এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে শহীদের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। (৫)।

৩ তথ্যসূত্র

১. "Birshreshtha Hamidur Rahman Laid To Rest", The Daily Star, ১২ই ডিসেম্বর, ২০০৭।

২. "বীর হামিদুরের ঘরে ফেরা", ছুটির দিনে, প্রথম আলো, ১৫ই ডিসেম্বর ২০০৭ ।

৩."Bangladesh takes home teenage war hero", রয়টার্স, Dec 10 2007।

৪. "বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের দেহাবশেষ দেশে এনে সমাহিত করা হবে", প্রথম আলো, ২৮শে অক্টোবর, ২০০৭।

৫. "Home they brought warrior dead: Bir Shreshtha Hamidur to be buried at Martyred Intellectuals Graveyard today", The New Nation, ১১ই ডিসেম্বর, ২০০৭।

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ।। আহমেদ খালিদ


বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান (২৯শে অক্টোবর, ১৯৪১—২০শে আগস্ট, ১৯৭১) একজন বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত হন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে সর্বোচ্চ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম।

জীবনী

মতিউর ১৯৪১ সালের ২৯শে অক্টোবর পুরান ঢাকার ১০৯ আগা সাদেক রোডের পৈত্রিক বাড়ি "মোবারক লজ"-এ জন্মগ্রহণ করেন। ৯ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে মতিউর ৬ষ্ঠ। তাঁর বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ, মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন।


ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেনী পাস করার পর সারগোদায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ডিস্টিংকসহ মেট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৬৩ সালের জুন মাসে রিসালপুর পি,এ,এফ কলেজ থেকে কমিশন লাভ করেন এবং জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসাবে নিযুক্ত হন। এরপর করাচির মৌরীপুরে জেট কনভার্সন কোর্স সমাপ্তি করে পেশোয়ারে গিয়ে জেটপাইলট হন। ১৯৬৫তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ফ্লাইং অফিসার অবস্থায় কর্মরত ছিলেন। এরপর মিগ কনভার্সন কোর্সের জন্য পুনরায় সারগোদায় যান। সেখানে ১৯৬৭ সালের ২১ জুলাই তারিখে একটি মিগ-১৯ বিমান চালানোর সময় আকাশে সেটা হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে দক্ষতার সাথে প্যারাসুট যোগে মাটিতে অবতরণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ইরানের রানী ফারাহ দিবার সম্মানে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত বিমান মহড়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি পাইলট। রিসালপুরে দু'বছর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসাবে কাজ করার পর ১৯৭০ এ বদলি হয়ে আসেন জেট ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হয়ে।১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় ছুটিতে আসেন।


২ যেভাবে শহীদ হলেন

২৫ মার্চের ঘটনায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। পরে তিনি দৌলতকান্দিতে জনসভা করেন এবং বিরাট মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজারে যান। পাক-সৈন্যরা ভৈরব আক্রমণ করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টে ই,পি,আর-এর সঙ্গে থেকে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরি করেন। এর পরই কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ২০ই আগস্ট সকালে করাচির মৌরিপুর বিমান ঘাঁটিতে তারই এক ছাত্র রশীদ মিনহাজের কাছ থেকে একটি জঙ্গি বিমান ছিনতাই করেন। কিন্তু রাশেদ এ ঘটনা কন্ট্রোল টাওয়ারে জানিয়ে দিলে, অপর চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশিদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশিদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পরেন এবং বিমান উড্ডয়নের উচ্চতা কম থাকায় রাশেদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। মতিউরের সাথে প্যারাসুট না থাকাতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃতদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়। রশিদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে এবং মতিউরকে করাচির মাসর"র বেসের চতুর্থ শ্রেনীর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট মতিউর রহমান শহীদ হবার সময় পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। পাকিস্তানিরা তাঁকে এক অন্ধকার কক্ষে তাঁর শিশু বাচ্চা ও কাজের পরিচারিকাসহ দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখে ও অত্যাচার করে। মুক্তি পাবার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

২০০৬ সালের ২৩ জুন মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান হতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁকে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫শে জুন শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়। 

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ