প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label হুমায়ূন আহমেদ. Show all posts
Showing posts with label হুমায়ূন আহমেদ. Show all posts

Tuesday, September 4, 2012

রহস্য | হুমায়ুন আহমেদ

রহস্য জাতীয় ব্যাপারগুলিতে আমার তেমন বিশ্বাস নেই। তবু প্রায়ই এ রকম কিছু গল্প-টল্প শুনতে হয়। গত মাসে ঝিকাতলার এক ভদ্রলোক আমাকে এসে বললেন, তার ঘরে একটি তক্ষক আছে – সেটি রোজ রাত ১টা ২৫ মিনিটে তিনবার ডাকে। আমি বহু কষ্টে হাসি থামালাম। এ রকম সময়নিষ্ঠ তক্ষক আছে নাকি এ যুগে? ভদ্রলোক আমার নির্বিকার ভঙ্গি দেখে বললেন, কি ভাই বিশ্বাস করলেন না?
জ্বি না।
এক রাত থাকেন আমার বাসায়। নিজের চোখে দেখেন তক্ষকটা। ঘড়ি ধরে বসে থাকবেন। দেখবেন ঠিক ১টা ২৫ মিনিটে তিনবার ডাকবে।
আরে দুর! কি যে বলেন?

ভদ্রলোক মুখ কালো করে উঠে গেলেন। চারদিন পর তার সঙ্গে আবার দেখা। পৃথিবীটা এরকম, যার সঙ্গে দেখা হবার তার সঙ্গে দেখা হয় না। ভুল মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। আমাকে দেখেই ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বললেন, আপনি কি দৈনিক বাংলার সালেহ সাহেবকে চেনেন?
হ্যাঁ চিনি।
তাকে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি নিজের কানে শুনেছেন। বলেছেন একটা নিউজ করবেন।
ভালই তো। নিউজ হবার মতই খবর।
আপনি আসেন না ভাই, থাকেন এক রাত।
আমাকে শোনালে কি হবে?
আরে ভাই আপনারা ইউনিভার্সিটির টিচার। আপনাদের কথার একটা আলাদা দাম।
তাই নাকি?
আপনারা একটা কথা বললে কেউ ফেলবে না।
এই জিনিসটা নিয়ে খুব হৈ-চৈ করছেন মনে হচ্ছে?
না, হৈ-চৈ কোথায়? অনেকেই অবশ্যি শুনে গেছেন। বাংলাদেশ টিভির ক্যামেরাম্যান নাজমুল হুদাকে চেনেন?
জ্বি না।
উনিও এসেছিলেন। খুব মাইডিয়ার লোক। আপনি আসুন না।
আচ্ছা ঠিক আছে, একদিন যাওয়া যাবে।

ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি মুখভর্তি করে হাসলেন। টেনে-টেনে বললেন, চলেন চা খাই।
না, চা খাব না।
আরে ভাই আসেন না। প্রফেসর মানুষ, আপনাদের সঙ্গে থাকাটা ভাগ্যের ব্যাপার।
ভদ্রলোক হা হা করে হাসতে লাগলেন। যেতে হল চায়ের দোকানে।
চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন? চপ?
না।
আরে ভাই খান না। এই এদিকে দু’টো চা দে তো। এখন ভাই বলেন, কবে যাবেন?
আপনার সঙ্গে তো প্রায়ই দেখা হয়, বলে দেব একদিন।

চা খেতে খেতে ভদ্রলোক দ্বিতীয় একটা রহস্যের কথা শুরু করলেন। নাইনটিন সিক্সটিতে তিনি বরিশালের পিরোজপুরে থাকতেন। তার বাসার কাছে বড় একটা কাঁঠাল গাছ ছিল। অমাবস্যার রাতে নাকি সেই কাঁঠাল গাছ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসত। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, সেই কান্নারও কি কোন টাইম ছিল? নির্দিষ্ট সময়ে কাঁদত? আপনার তক্ষকের মত?
ভদ্রলোক আহত স্বরে বললেন, আমার কথা বিশ্বাস করলেন না?
বিশ্বাস করব না কেন?
আমি কান্নার শব্দ গোটাটা টেপ করে রেখেছি। একদিন শোনাব আপনাকে।
ঠিক আছে।

বরিশালের ডিসি সাহেবও শুনেছেন। চেনেন উনাকে? আসগর সাহেব। সি এস পি। খুব খান্দানী ফ্যামিলি।
না, চিনি না।
ডিসি সাহেবের এক ভাই আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। বিরাট অফিসার।
তাই বুঝি?
জ্বি। উনার বাসায় একদিন গিয়েছিলাম। খুব খাতির-যত্ন করলেন। গুলশানের বাসা। তিন তলা। উনি থাকেন এক তলায়। ওপরের দুটো তলা ভাড়া দিয়েছেন।
ভদ্রলোক আমার প্রায় এক ঘন্টা সময় নষ্ট করে বিদায় হলেন। আমার মায়াই লাগলো। ইন্ডেন্টিং ফার্মে সামান্য একটা চাকরি করেন। দেখেই বুঝা যায় অভাবে পর্যুদস্ত। চোখের দুষ্টি ভরসাহারা। বয়স এখনো হয়তো ত্রিশ হয়নি কিন্তু বুড়োটে দেখায়। বিচিত্র চরিত্র।

মাস খানেক তার সঙ্গে আমার দেখা হল না। তার প্রধান কারণ, যে সব জায়গায় তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা সে সব জায়গা আমি এড়িয়ে চলতে শুরু করেছি। নিউমার্কেটে আড্ডার জায়গাটিতে যাই না। কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে? এই লোকটি পিচ্ছিল পদার্থ, সে গায়ের সঙ্গে সেঁটে যাবে। আর ছাড়ানো যাবে না। কিন্তু তবু দেখা হল। একদিন শুনলাম সে ইউনিভার্সিটি ক্লাবে এসে খোঁজ নিচ্ছে। ক্লাবের বেয়ারা বলল, গত কিছুদিন ধরে নাকি সে নিয়মিতই আসছে। কি মুসিবত।

একদিন আর এড়ানো গেল না। ভদ্রলোক বাসায় এসে হাজির।
কি ভাই আপনি তো আর এলেন না?
কাজের ব্যস্ততা …
আজকে আপনাকে নিতে এসেছি।
সে কি?
কবি শামসুল আলম সাহেবও আসবেন।
তাই বুঝি?
জ্বি। চিনেত তো শামসুল আলম সাহেব কে? দু’টো কবিতার বই বেরিয়েছে। পাখির পালক আর অন্ধকার জ্যোত্স্না।
তাই বুঝি?
জ্বি। আমাকে দু’টো বই-ই দিয়েছেন। খুবই বন্ধু মানুষ। বাড়ি হচ্ছে আপনার ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা।
ও।
উনার ছোট ভাইও গল্প টল্প লেখেন। আরিফুল আলম।

গেলাম তার বাসায়। ঝিকাতলার এক গলিতে ঘুপসি মত দু’কামরার বাড়ি। মেজাজ খুবই খারাপ। রাত দেড়টা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে সময়নিষ্ঠ তক্ষকের ডাক শোনার জন্য। কত রকম যন্ত্রণা যে আছে পৃথিবীতে!

ভদ্রলোক আমাকে বসার ঘরে বসিয়ে অতি ব্যস্ততার সঙ্গে ভেতরে চলে গেলেন। বসার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। মহিলার হাতের সযত্ন স্পর্শ আছে। ভদ্রলোক বিবাহিত জানতাম না। এ নিয়ে তার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্ত্রী ঘরে এসে ঢুকলেন। খুবই অল্প বয়েসী তরুণী এবং অসম্ভব রূপসী। আমি প্রায় হকচকিয়ে গেলাম।

আমার স্ত্রী লীনা। আর লীনা, উনি হুমায়ূন আহমেদ। এর কথা তো তোমাকে বলেছি।
লীনা হাসি মুখে বললো, জ্বি আপনার কথা প্রায়ই বলে।
লীনা একটু চায়ের ব্যবস্থা কর।

লীনা চলে গেল ভেতরে। ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, লীনার গল্প-উপন্যাস লেখার শখ আছে। কয়েক দিন আগে সাপ নিয়ে একটা গল্প লিখেছে। মারাত্মক গল্প ভাই। আপনাকে পড়ে শোনাতে বলবো। আমি বললে পড়বে না। আপনিও কাইন্ডলি একটু বলবেন।
আমি বললাম, গুণী মহিলাতো!
ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
তা ভাই, কথাটা অস্বীকার করব না। গানও জানে। নজরুল গীতি। ভালো গায়। বাড়িতে টিচার রেখে শিখেছে।
তাই নাকি?
জ্বি, শোনাবে আপনাকে। একটু প্রেসার দিতে হবে আর কি। আপনি একটু রিকোয়েস্ট করলেই শোনাবে। কাইন্ডলি একটু রিকোয়েস্ট করবেন।
ঠিক আছে, করব।

চা এসে পড়ল। চায়ের সঙ্গে বড়া জাতীয় জিনিস। বেশ খেতে। আমি বললাম, কিসের বড়া এগুলি? ডালের নাকি?
ভদ্রলোক উচ্চস্বরে হাসলেন, নারে ভাই, কুলের বড়া। হা-হা-হা। কত রকম অদ্ভুত রান্না যে জানে! মাঝে মাঝে এত সারপ্রাইজ হই। খেতে কেমন হয়েছে বলেন? চমত্কার না?
ভাল, বেশ ভাল।
আরেক দিন আসবেন, চাইনীজ সুপ খাওয়াবো। চিকেন কর্ন সুপ। চাইনীজ রেস্তোরাঁর চেয়ে যদি ভালো না হয় তাহলে কান কেটে ফেলবেন। হা-হা-হা।

আমি মেয়েটার লেখা একটা ছোট গল্প শুনলাম, দু’টি কবিতা শুনলাম। ভদ্রলোক মুগ্ধ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। বার বার বললেন, ইস শামসুল আলম সাহেব আসলেন না। দারুণ মিস্ করলেন, কি বলেন ভাই?
রাত এগারোটার দিকে বললাম, তা হলে আজ উঠি?
তক্ষকের ডাক শুনবেন না?
আরেক দিন শুনব।
আচ্ছা, ঠিক আছে। ভুলবেন না যেন ভাই। আসতেই হবে।

ভদ্রলোক আমাকে এগিয়ে দিতে এলেন। রাস্তায় নেমেই বললেন, আমার স্ত্রীকে কেমন দেখলেন ভাই?
ভাল, গুণী মহিলা।
ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ধরা গলায় বললেন, বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা। ঠিক না ভাই?
আমি কিছু বললাম না। ভদ্রলোক কাঁপা গলায় বললেন, গরীব মানুষ, স্ত্রীর জন্যে কিছুই করতে পারি না। কিন্তু এই সব নিয়ে লীনা মোটেই মাথা ঘামায় না। বড় ফ্যামিলির মেয়ে তো। ওদের চাল চলনই অন্য রকম।

আমি রিকশায় উঠতে উঠতে বললাম, খুব ভাগ্যবান আপনি।
ভদ্রলোক আমার হাত চেপে ধরলেন। যেন আবেগে কেঁদে ফেলবেন।
ভাই, আরেকদিন কিন্তু আসতে হবে। তক্ষকের ডাক শুনতে হবে। আসবেন তো? প্লীজ।

তক্ষকের ডাকের মত কত রহস্যময় ব্যাপারই না আছে পৃথিবীতে!

Sunday, September 2, 2012

আমার শিক্ষক হুমায়ূন আহমেদ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক | হাসান আলীম


১.
আমার সৌভাগ্য হুমায়ূন আহমেদ আমার সরাসরি স্যার ছিলেন। এম এস সির পলিমার কেমিস্ট্রি তিনি পড়াতেন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি ক্লাস নিতেন। রসায়নের বিশেষত পলিমার কেমিস্ট্রির ফিজিক্যাল প্রপার্টি পড়াতে ক্যালকুলাস ও ফলিত গণিতের জটিল অঙ্ক ও জ্যামিতিক বিষয়াদির সহায়তা নিতে হয়। অঙ্কের জটিল সমাধানের মধ্যদিয়ে পলিমার রসায়নের বিভিন্ন অবস্থার বিষয় ব্যাখ্যা করতে হয়। স্যার এসব বিষয় অনেক সহজ করে বুঝিয়ে পড়াতেন। এর ফলে আমরা এ বিষয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছি।
হুমায়ূন আহমেদ স্যারও এ বিষয়ে আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন। আমাদের ডিপার্টমেন্টে অনেক ডক্টরেটধারী মেধাবী শিক্ষক ছিলেন কিন্তু  তার মতো অত সুন্দর করে অনেকেই শিক্ষাদান করতে সক্ষম হতেন না।
কাসের কোনো এক সময়ে খোঁজ-খবর নিতেন আমাদের। রাশভারী লোক হলেও তিনি ছিলেন মিশুক এবং বেশ সহজ-সরল। অর্থাৎ তিনি গম্ভীরই ছিলেন তবে যখন কথা বলতেন দ্রুত বলতেন এবং অনেক রসিকতাও করতেন।
আমি কবিতা লিখতাম ছাত্রাবস্থায় পত্র-পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়েছে। মাস্টার্সের ছাত্রাবস্থায় আমার একটি কাব্যগ্রন্থ ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ বের হয়। এ জন্য আমার কাস শেষে  অনেকে কৌতূহল বোধ করতো এবং আনন্দ প্রকাশ করতো। স্যার আমার লেখালেখির কথা জেনে খুশি হন। আমাকে একটু স্নেহের চোখে দেখতে থাকেন। একদিন কাস শেষে তিনি আমাকে মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। তাঁর দুটো গ্রন্থ ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘নিশিকাব্য’ আমাকে উপহার দিলেন। এরপর থেকেই স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। বেশকিছু কাল পরে আমার একটি গল্পগ্রন্থ ‘সোনার খাঁচা’ প্রকাশ পায়। এ গ্রন্থটি স্যারের নামে উৎসর্গ করি।
স্যার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়েছেন। নিবিড়ভাবে লেখালেখি, রাতজেগে উপন্যাস রচনা করা খুব কঠিন। আবার একই সাথে শিক্ষকতা করা বড় দুরূহ ব্যাপার। সাহিত্যের প্রেমে ও নেশায় তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিলেন শেষ পর্যন্ত।
তিনি ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী ও জনপ্রিয় শিক্ষক। কাসে তিনি ছাত্রদের মন জয় করেছিলেন কিন্তু তারচেয়ে বেশি মনজয় করেছিলেন তার পাঠক শ্রেণী।
রসায়নের শিক্ষকতাকালে তিনি ড. শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ছিলেন। হল ক্যাম্পাসের মনোরম আবাসনে তিনি অবস্থান করতেন।
ঢাকা ভার্সিটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যানিকেতন। কিন্তু এই শিক্ষায়তনের শিক্ষকবৃন্দ যে বেতন পান তা দিয়ে খুব আরাম আয়েশে চলা যায় না। ভীষণ হিসাব নিকাশ করে চলতে হয়। সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য তিনি উপন্যাস এবং টিভি নাটক লিখতে শুরু করেন। ‘বিচিত্রার’ কোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তার মেয়েরা রঙিন টিভি দেখতে পায় না। এটা খুব বেদনাদায়ক। ভার্সিটির  শিক্ষক হয়েও তিনি রঙিন টিভি ক্রয় করতে পারছেন না এ জন্যই তিনি নাটক লভেল লিখতে শুরু করেন। এরফলে প্রচুর টাকা পাওয়া যায়। পাঠকেরা তার বই কেনে প্রচুর। বইয়ের কাটতির জন্য প্রকাশকরা তাকে অগ্রিম লাখ লাখ টাকা দিয়ে যায়। টাকা অর্জনই কেবলমাত্র লক্ষ্য ছিল, না তার লক্ষ্য ছিল জনপ্রিয় কথা সাহিত্য রচনা করা। মানুষকে আনন্দ দান করা।
এই ঢাকা শহরে প্রায় ৪০ বছর চলছে আমার। ছাত্রজীবন এবং কর্মজীবন এই দুইয়ের ভেতরে করেছি কাব্য চর্চা। সাহিত্য চর্চা। আমার এ পর্যন্ত ত্রিশের অধিক গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থই অর্ধেকের বেশি। বাকি গদ্যগ্রন্থ অর্থাৎ গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ, কিছু গল্পগ্রন্থ, কল্পকাহিনী ও কিশোরতোষ রচনা।
হুমায়ূন স্যারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল ছাত্রজীবনে অর্থাৎ মধ্য আশির দশক পর্যন্ত। এরপর কর্মজীবনে চলে যাই ঢাকার বাইরে একটি কলেজে। তারপর আবার ঢাকায় তবে শেষ পর্যন্ত তা ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে। স্যারের সাথে যোগাযোগ কম হয়ে যায়। এক সময় তা আর দীর্ঘতর হয়নি। কিন্তু তার গ্রন্থের সাথে অল্প বিস্তর যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠতর ছিল টিভি নাটকে, সিরিয়ালে।
২.
হুমায়ূন আহমেদ একদিনেই সম্রাট হুমায়ূন নয়, একদিনেই সাহিত্য সম্রাট নয়। নিজেকে গড়েছেন পরম যতেœ। প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকের’ পর বেশ বিরতি এরপর তীব্রতর আনন্দময় প্রস্ফুটন, উদ্ভাসন, দুই শতাধিক গ্রন্থের গর্বিত জনক। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কথা সাহিত্যিক কী রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, সুনীল, সমরেশ, সঞ্জীবন বুদ্ধদেবগুহÑ সবার ওপরে সবাইকে ছাপিয়ে বড় হয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি কোটি কোটি পাঠক হৃদয়ে।
হুমায়ূন আহমেদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, কল্পকাহিনী, নাটক, টিভি নাটক, ধারাবাহিক নাটক, সিনেমা কাহিনী, গান, প্রবন্ধ, বিজ্ঞানগ্রন্থ রচয়িতা। তাঁর প্রকৃত নাম শামসুর রহমান। ডাক নাম কাজল। লেখক নাম হুমায়ূন আহমেদ। তিনি হুমায়ূন আহমেদ নামেই পৃথিবী খ্যাত হয়েছেন।
তাঁর লেখা ‘আমার ছেলেবেলা’ সূত্রে জানা যায়, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নানার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের দৌলতপুরের শেখ বাড়িতে। এ বাড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন। একই জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরের মৌলভী বাড়ি তাঁর পৈতৃক নিবাস। তাঁর দাদা ছিলেন একজন বড় আলেম। পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। এ নন্দিত লেখকের মায়ের নাম আয়েশা আক্তার খাতুন।  বাবার বদলির চাকরির কারণে কুতুবপুর এবং দৌলতপুরÑ এ দু’জায়গাতেই শৈশব-কৈশোরের অনেক দিন কেটেছে হুমায়ূনের। দাদার বাড়ি এবং নানার বাড়ির বিস্তর বর্ণনা দিয়ে ‘আমার ছেলেবেলা’য় তিনি লিখেছেনÑ ‘আমার শৈশবের সবচেয়ে আনন্দময় সময় হচ্ছে এই দু’জায়গায় বেড়াতে যাওয়া। প্রতি দু’বছর পর পর একবার তা ঘটত। আমার মনে হতো, এত আনন্দ, এত উত্তেজনা সহ্য করতে পারব না। অজ্ঞান হয়ে যাব। আমরা ছুটিতে যাচ্ছি। ছুটিতে যাচ্ছি। ছুটি!’ জন্ম সাল ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর। লাকি থার্টিন। আমার জন্মও ১৯৫৭ সালের ১৩ মার্চ লাকি থার্টিনে। লাকি থার্টিন এ কারণে যে মুহম্মদ (সা.) এর আদ্যাক্ষর ইংরেজি ১৩ নম্বর অক্ষর এম (গ) দিয়ে শুরু। এই প্রিয় ১৩ তারিখে তাঁর জন্ম।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছেÑ নন্দিত নরকে শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিন রাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, মন্ত্রসপ্তক, দূরে কোথাও, সৌরভ, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর, জংশন, বহুব্রীহি, লীলাবতী, কবি, নৃপতি, অমানুষ, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, আমার আছে জল, আকাশ ভরা মেঘ, মহাপুরুষ, শূন্য, ওমেগাপয়েন্ট, ইমা, আমি এবং আমরা, কে কথা কয়, অপেক্ষা, পেন্সিলে আঁকা পরী, অয়োময়, কুটুমিয়া, দ্বিতীয় মানব, ইস্টিশন, মধ্যাহ্ন, মাতাল হাওয়া, শুভ্র গেছে বনে, ম্যাজিক মুনসি, ময়ূরাক্ষী, হিমু, হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম, হলুদ হিমু কালো র‌্যাব, আজ হিমুর বিয়ে, হিমু রিমান্ডে, চলে যায় বসন্তে দিন, আমিই মিসির আলি, যখন নামবে আঁধার ইত্যাদি।
আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বলপয়েন্ট, কাঠপেন্সিল, ফাউন্টেইনপেন, রং পেন্সিল, নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ। চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সার্থক সৃষ্টি শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারি, চন্দ্রকথা, আগুনের পরশমণি ও শ্যামল ছায়া।
হুমায়ূন আহমেদ প্রচুর টিভি নাটক লিখেছেন। এরমধ্যে তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়  টিভি সিরিয়াল এইসব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার প্রভৃতি। এছাড়াও তার অনেক খণ্ড নাটক একাঙ্কিকা, একক নাটক টিভিতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ তার ওপরে কেউ নেই বিশেষত কথা সাহিত্য ও নাটক সিনেমায়। অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ নাটক কথসাাহিত্য তিনি রচনা করেছেন। তিনি আমাদের সমাজকে ফাঁকি দেননি। সমাজ সংসার বাস্তবতা নিয়েই তিনি লিখেছেন। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মুসলিম সমাজের বাস্তবজীবন অত্যন্ত রসালো করে জীবননিষ্ঠ করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার গল্প, নাটক ও উপন্যাসে। তার নাটকের গৃহকর্তাকে দেখা যায় কিনশেভ অথচ মাথায় টুৃপি পরা ভদ্রলোক হিসেবে। কখনও কখনও সমাজপতি বা গ্রাম প্রধানের মাথায় টুপিও দাড়ি রয়েছে যা তাঁর গল্পে সুন্দরভাবে সুন্দর চরিত্রে অঙ্কিত হয়েছে। এ কারণেই আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ হুমায়ূনকে  এভাবে বিপুল আনন্দে গ্রহণ করেছে। অপরপক্ষে হুমায়ূনের আগে টিভি নাটক ও সিনেমায় মুসলিম লেবাস পরা লোকদের ভিলেন ও খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা দর্শক ও পাঠকেরা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।
হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের কথা সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা কত ছিল সবারই জানা। আমাদের দেশে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক সময়ের যে জনপ্রিয়তা ছিল তাকেও হুমায়ূন ছাড়িয়ে গেছেন। হুমায়ূন আহমেদ সত্যিই একজন বড় লেখক। বাংলা ভাষার গর্ব আমি তাই মনে করি।’
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হিন্দু সমাজের ভেদনীতি, বিধবা গঞ্জনা, নারী নির্যাতন, শ্রেণী বৈষম্য প্রভৃতি সমাজ বাস্তব বিষয়ে লিখেছেন। হিন্দু সমাজের নারী সমাজের প্রগতির কথা বলেছেন সাধারণ মানুষের সুখদুখের কথা বলেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। হুমায়ূন আহমেদ তদ্রƒপ লেখক সমাজ কর্তৃক অনাদৃত, অনুল্লেখ্য, বিপুল বিশাল মুসলিম সমাজকে প্রধান উপজীব্য করেছেন। মুসলিম সমাজপতির সমাজ পরিবার সংস্কার ভালো কর্ম করা, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সুখদুঃখ তার লেখায় প্রধান হয়ে ওঠেছে। সাধারণ পাঠকেরা তাদের জীবনের কথা তার লেখার মধ্যে খুঁজে পেয়েছে লেখার কথাগুলো বাক্যগুলো অত্যন্ত তীর্যকভাবে বর্ণনা হওয়ায় পাঠকেরা তা সহজে গ্রহণ করেছে। অত্যন্ত সহজ সরলভাবে অথচ রসে ভরা, দর্শনে ভরা তার লেখা পাঠকেরা  দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস, গল্প ও নাটকে ছিল ধর্মপ্রাণ মুসলিম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সুখদুখের সরস বর্ণনা। কোথাও ভাঁড়ামি, নোংরামি, অশ্লীলতা, মিথ্যা ও অবাস্তবতা ছিল না তার গল্পের চরিত্রগুলোতে। ছিল না ধর্মের প্রতি কটাক্ষ বরং কোথাও কোথাও অত্যন্ত বাস্তবভাবে ধর্মজীবনের আলোকপাত রয়েছে। নর-নারীর প্রেম ভালোবাসাও তার গল্পে স্থান পেয়েছে কিন্তু তাতে নেই অযথা সেক্স ভায়োলেন্স।
তাকে কেউ কেউ অতি আধুনিক ধর্মহীন বলার ফালতু প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন আস্তিক লেখক। তিনি নাস্তিক ছিলেন না। ধর্মকে আক্রমণ করে কিছু লেখননি। মুক্তিয্দ্ধু নিয়ে তিনি অতিবাস্তব উপন্যাস রচনা করেছেনÑ সেখানে তিনি ধর্মকে আঘাত করেননি।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অশ্লীল লেখক হুমায়ুন আজাদ আক্রমণের শিকার হলে তখন তিনি ১৮ জুলাই ২০০৮ সালে দৈনিক সমকালের সাথে এক সাাৎকারে বলেছেন, ‘যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সম্পর্কে তিনি বলেন ওনাকে কেউ তো খুন করেনি। উনিতো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ওনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহী কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তার বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহিতা মামলা হয়নি। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটিই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, পুরোটাই ছিল একটা সাজানো খেলা।
‘সমাজ ও রাজনীতি’ অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও রাজাকার বিষয়ক একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছেন তাদের মধ্যে আমার নানাও একজন, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেছেন। আমার এই নানার মতো, মামার মতো ভদ্রলোক পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত এত পরিপূর্ণ ভদ্রলোক এই জীবনে দেখিনি। আমার নানা একটি আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছেন। একটি পূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন। কারণ বড় হওয়ার সময় এই অঞ্চলের হিন্দুদের দ্বারা প্রচণ্ড নির্যাতিত হয়েছিলেন। কোনো মিষ্টির দোকানে গেলে তাদের প্লেটে করে মিষ্টি দেয়া হতো না। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাদের হাতে দেয়া হতো। এটা শুধু মুসলমানদের সঙ্গেই না, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গেও করতো। এটা ছিল হিন্দুদের কাস্ট সিস্টেম। এসব দেখে দেখে সে সময়ের মুসলমানরা বড় হয়েছেন এবং তাদের মনে হয়েছে একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। অনেক যুদ্ধের পর তারা তা পেয়েছেন। যখন তারা দেখলেন চোখের সামনে দিয়ে সেই রাষ্ট্র ভেঙে যাচ্ছে, তখন তারা মনে করেছেন আবার হিন্দু রাজত্ব শুরু হয়ে যাবে। তখন পাকিস্তানকে সাপোর্ট করা শুরু করেন। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির অন্যায়গুলো ক্রমেই চোখে পড়তে থাকে। তারা দেখলেন পাকিস্তানি আর্মিরা তো কেবল হিন্দু মারছে না, সমানে মুসলমানদেরও খুন করছে। আমার নানা দেখলেন, তার অতি আদরের বড় মেয়ের পুলিশ অফিসার স্বামীকে (আমার বাবা) বেঁধে নিয়ে আর্মিরা গুলি করে মেরে ফেলল। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কী হচ্ছে এসব? কোন দিকে যাবেন? তিনি কি পাকিস্তান আর্মির সঙ্গেই থাকবেন , নাকি কমন যে স্রোত আছে তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন? এই নিয়ে কনফিউশন তৈরি হলো তার মধ্যে। তিনি এই কনফিউশন দূর করতে পারলেন না। এ েেত্র তার যেমন দোষ ছিল, আমাদেরও ছিল। কারণ আমরা তাদের বোঝাতে পারিনি, কনফিউশন দূর করাতে পারিনি। তিনি মারা গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। এখন আমরা তাকে মা করব কি করব না সেই প্রশ্ন। শেখ মুজিব সাহেব তাদের মা করে দিয়েছেন। আমি মার পপাতী। (মাহফুজ আহমেদ, ঘরে-বাইরে হুমায়ূন আহমেদ হাজার প্রশ্ন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৯৪. পৃ.৩১-৩২)
হুমায়ূন আহমেদ একজন বিশ্বাসী এবং ঐতিহ্যবাহী ছিলেন। আমার এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যাবে ফিরোজ এহতেশাম, হুমায়ূন আহমেদের সে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তা থেকে।  ফিরোজশাহ এহমেশাম : ঈশ্বর বিষয়ে আপনার ভাবনা কী? আপনি তো ঈশ্বরে বিশ্বাসী, আস্তিক?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ। আচ্ছা বলো ঈশ্বর কি আছে? লজিক বলে যে নেই। তবে লজিকের অসম্ভব ক্ষমতা। যে কোনো লজিকের বিপক্ষে তুমি আরেকটি লজিক দাঁড় করাতে পারো। আমাকে এসে একদিন একজন বলল যে, স্যার, সুনামি হইল, এতোগুলো মানুষ মারা গেল, ছেলেমেয়ে বাচ্চা-শিশু এরা তো কেউ কোনো পাপ বা অপরাধ করে নাই। এরা যে মারা গেল তার দায়দায়িত্ব তো তাহলে সম্পূর্ণ আল্লাহপাকের, যদি আল্লাহ থেকে থাকে, আমাদের তো দায়দায়িত্ব না। লজিক স্ট্রং না?
ফিরোজ এহতেশাম : হ্যাঁ, মোটামুটি স্ট্রং, লজিক ...
হুমায়ূন আহমেদ : এই লজিকের বিপক্ষে আরেকটা লজিক দাঁড় করানো যেতে পারে। আমি তাকে বললাম, মনে করো তুমি একটি বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছো আনমনে তুমি যখন যাচ্ছ, তখন তোমার পায়ের নিচ দিয়ে দুই সারি পিঁপড়া যাচ্ছে, তাদের কারো মুখে ডিম, কারো মুখে বাচ্চা। তুমি তাদের পিষে চলে গেলে, জানলেও না। পিঁপড়াগুলো ভাবল, একি ঘটল। আমাদের তো কোনো দোষ নেই, কে আমাদের শত শত বাচ্চা মেরে চলে গেল। ঘটনা একই।
মনে কর তুমি মঙ্গলগ্রহে গিয়ে পাহাড় পর্বতের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা ক্যামেরা কুড়িয়ে পেলে। পেয়েই তোমার মনে হবে এটার একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। এই আপনাআপনি সৃষ্টি হয়নি। তুমি অবাক হলে। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলে একটি খরগোশ। এই খরগোশের যে চোখ তা ওই ক্যামেরার চোখের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন। তখন তোমাকে এই খরগোশেরও যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছে, তা স্বীকার করতে হবে।
ফিরোজ এহতেশাম : আচ্ছা লজিকের খাতিরেই যদি বলি, আপনি বললেন যেসব সৃষ্টিরই একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। লালনের একটা কথা আছে যে সব সৃষ্টি করছে তারে সৃষ্টি কে করেছে? আপনি কী বলবেন?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ, আরজ আলী মাতুব্বরও এমন বলেছে। সব কিছুরই যদি ক্রিয়েটর থাকে, তাহলে বেসিক কোয়েশ্চেন, ক্রিয়েটরের ক্রিয়েটর কে? বিগব্যাং থেকে পৃথিবীর শুরু সব কিছু শুরু। তাহলে বিগ ব্যাংগের আগে কী ছিল?
ফিরোজ এহতেশাম : এটা তো এখনো জানা যায়নি।
হুমায়ূন আহমেদ : লজিক দেই, লজিক দিলে টের পাবে। একটা পিঁপড়া তো যথেষ্ট পরিমাণে জ্ঞানী। এরা চাষ করে, এরা গরু পালে, এদের সোসাইটি আছে, সেনাবাহিনী আছে, এরা বাড়িঘর তৈরি করে। এরা হাইলি ডিসিপ্লিনড, আমরাও তাই। আমাদের পক্ষে কি সম্ভব পিঁপড়াকে আমাদের ফিজিক্স কেমিস্ট্রি, ম্যাথ শেখানো? সম্ভব না। ডিফারেন্সটা হচ্ছে জ্ঞানের লেভেলের। ওরা যে ফিজিক্স  কেমিস্ট্রি, ম্যাথ নিয়ে এসেছে তা নিয়েই ওরা থাকবে। আমরা আমাদেরটা হাজার চেষ্টা করেও তাদের শেখাতে পারব না। যদিও আমরা তাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি উন্নত। তেমনি ঈশ্বরও এতই ওপরের স্তরের যে তার সঙ্গে কোনোক্রমেই কমিউনিকেট করা সম্ভব না। মাঝে মধ্যে উনি শুধু পয়গম্বরদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেটের চেষ্টা করেন।
ফিরোজ এহতেশাম : এই মুহূর্তে আপনার কি কোনো ঘটনা মনে পড়ছে, যা আপনাকে বেশ আনন্দ বা তৃপ্তি দিয়েছিল?
হুমায়ূন আহমেদ : আমি যখন পিএইচডির শেষ পর্যায়ে। তখন আমার কাছে খ্রিস্টান পাদ্রিরা আসতে শুরু করল। তারা মনে করল, একজন বিধর্মীকে ওদের ধর্মে নিয়ে গেলে ওদের জন্য সুবিধা। আমি দেখলাম, ওরা প্রচুর পড়াশোনা করে, জানে। ওদের ধর্ম বিষয়ে যেমন ওরা প্রচুর জানে, আমাদের ধর্মবিষয়ে তেমনি। আমি আমাদের প্রফেটকে হাইলাইট করার জন্য এক পাদ্রিকে বললাম যে, শোন আমাদের প্রফেট ছিলেন এমনই একজন মানুষ, তিনি যখন কারো  সঙ্গে কথা বলতেন, তখন সরাসরি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। তিনি যার সঙ্গে কথা বলতেন, তার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে বলতেন না, তিনি পুরো বডিকে তার দিকে টার্ন করতেন, যাতে সে মনে করে তাকে ফুল অ্যাটেনশন দেয়া হচ্ছে।
 শুনে পাদ্রি বললেন, দেখুন স্পল্ডিলাইটিস বলে একটা ডিজিজ আছে, যে ডিজিজ ঘাড়ের চামড়া শক্ত হয়ে যায়, আপনাদের প্রফেটের ছিল স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ। উনি ঘাড় ফিরাইতে পারতেন না বলে পুরো শরীর অন্যের দিকে ফেরাতেন। তাহলে তোমার একটা ডিজিজকে হাইলাইট করছে কোন দুঃখে? হঠাৎ করে আমার মনটা এমনই খারাপ হলো যে ভাবলাম, আসলেই তো, একটা ডিজিজের জন্য তিনি এটা করতেন বলে আমরা এটাকে মানছি। তখন গড আমাকে হেল্প করলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে একটা লজিক দিয়ে দিলেন এবং লজিকটা আমার তাৎক্ষণিকভাবে আসা। পাদ্রি তখনো ওখানে বসা, চা খাওয়া শেষ করেননি। আমি বললাম, আপনার কথাটা ভুল। আমাদের নামাজ পড়ার একটা সিস্টেম আছে। সিস্টেমে মাথা ফিরাইতে হয়। আমাদের প্রফেটের যদি স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ থাকতো, তাহলে তিনি পুরো শরীর ফেরাবেন, উনি তো তা করেননি। তার এই ডিজিজ ছিল না, তিনি যেটা করতেন, তা শ্রদ্ধার জায়গা থেকে করতেন।
তারপর আমি তাকে বললাম, আমি কিন্তু ঈসা (আ.) সম্পর্কে এ জাতীয় কথা বলিনি। তিনি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং বললেন, তোমার লজিক খুব পরিষ্কার, আসলেই তো তোমরা নামাজের সময় দুই দিকে মাথা ঘোরাও।
ফিরোজ এহতেশাম : আর কোনো ঘটনা?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ, আরেকবার এভাবেই আমি জয়ী হয়েছিলাম নিউইয়র্কে। সেখানে আমাকে একজন বলল, তোমরা তোমাদের মেয়েদের বোরকার ভেতর ঢুকিয়ে হিজাব-টিজাব পরিয়ে ছেড়ে দিয়েছ সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পারনি। আমি বললাম, তোমরা যখন তোমাদের মেয়েগুলোকে হিজাব পরিয়ে বাইরে পাঠাও, তখন অত্যন্ত সম্মান করো। আর আমাদের মেয়েগুলো হিজাব পরলে এত রাগ করো কেন? সে রেগে গেল আমরা আমাদের মেয়েদের হিজাব পরিয়ে পাঠাই মানে! আমি বললাম, কেন, তোমাদের নানদের দিকে তাকিয়ে দেখ। তাদের ড্রেস আর আমাদের হিজাব পরা মেয়েদের ড্রেসের মধ্যে কোনো বেশকম আছে? তাকে একমত হতে হলো যে নানদের ড্রেসের সঙ্গে হিজাব পরা মেয়েদের ড্রেসের কোন পার্থক্য নেই।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস সমূহের প্রধান চরিত্র এবং উপরোক্ত সাক্ষ্যৎকারের মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট যে তিনি আস্তিক্যবাদী প্রগতিশীল কথাশিল্পী।
আস্তিকতা হুমায়ূনের উপন্যাসকে জীবন্ত এবং বাস্তবমুখী করে তুলেছে। কথাসাহিত্যিক এবং আস্তিক্যবাদী অথবা আস্তিক্যবাদী কথাসাহিত্যিক আমাদের দেশে পূর্বেও ছিলেন এবং এখনও আছেন তবে তাঁরা এতটা সুখ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। যতটা হুমায়ূন পেরেছেন। এখানে হুমায়ূনের লেখার যোগ্যতা, পাঠক নন্দিত বাক্যরচনা এবং গল্পলেখার নতুনত্বই তাকে শিখরে তুলেছে।
হুমায়ূন আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ। কলকাতার এক স্মরণসভায় প্রখ্যাত উপন্যাসিক শঙ্কর বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু তার বেশ কয়েকটি লেখা আমি পড়েছি। লেখাগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, তিনি বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তার জীবদ্দশায় তিনি রবীন্দ্র, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎ চন্দ্রের পাশে স্থান করে নিয়েছিলেন’।
হুমায়ূনের মৃত্যুর পর তিনি আরো মহীয়ান আরো বড় হয়ে ওঠেন। তার মৃত্যুতে যে লাখ লাখ লোকের জানাজা তা এ দেশে একমাত্র নজরুলের জানাজা ছাড়া অন্য কোনো লেখকের বেলায় দেখা যায়নি। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় ১৪-১৫ দিন পর্যন্ত অনবরত লিখছে। সব ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে তাকে বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রায় সপ্তাহখানেক স্মরণ করেছে। তাঁকে দেশের পক্ষ থেকে ‘জাতীয় কথাশিল্পী’র মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা উচিত ছিল অন্তত তিনি একজন শহীদ পিতার সন্তান এবং ‘জোছনা জননীর গল্প’-এর মত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাসের স্রষ্টা। এর পিছনে কি হীনম্মন্যতার দেয়াল তা তাঁর পাঠক ভক্তরা জানে না। ভারতের পশ্চিম বাংলার বাংলা পত্র-পাত্রিকা এবং টিভিগুলোতে তার মৃত্যুতে আশ্চর্য নীরবতা পালন করেছে।
কোলকাতার এ আচরণ সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘শরৎচন্দ্রের পর হুমায়ূনের জনপ্রিয়তায় দুই বাংলার সাহিত্যিকরা ভ্রু কোঁচকাবেন। তার বই বের হলে একবারে ২৫ হাজার কপি নিমেষে শেষ হয়ে যেতো। এ জনপ্রিয়তার কারণ, রিকশা চালক থেকে উচ্চপদের আমলা সবার হেঁসেলে প্রবেশ করার ক্ষমতা ছিল তার।
আরেক লেখক বলেছিলেন হুমায়ূনের লেখায় মামি, চাচি, খালা, ফুপু,আম্মা ইত্যাদি শব্দ থাকতো যার কারণে আমাদের এখানের পাঠকরা তাকে অবহেলা করেছে। আমাদের এ দেশের পাঠকেরা অতিমাত্রায় মৌলবাদী। কারণ বাংলাদেশের পাঠকেরা আমাদের লেখা ফেলে রাখে না যদিও আমাদের লেখায় খুড়ো, পিশি, মাসি, কাকাবাবু বৌদি ইত্যাদি শব্দ থাকে।
সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে হুমায়ূন। তিনি বাংলা ভাষাভাষী ৫০ কোটি মানুষের কেবল লেখক নন। তার লেখা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাকে পৃথিবীর মানুষ শ্রদ্ধা করছে তার এ প্রাপ্য দিনে দিনে আরো বাড়তে থাকবে।
হুমায়ূন চলে গেছেন আমাদের কথাসাহিত্যকে উজ্জ্বল করে দিয়ে তবে তার দ্রুত চলে যাওয়ায় আমাদের সাহিত্যে এক বিরাট ঘাটতি দেখা দেবে। গঙ্গার পানি এখানে এতদিন তাঁর জন্য প্লাবন সৃষ্টি করতে পারেনি পদ্মার ফুলে উঠায় পশ্চিমের পানি প্রবেশ সাহিত্যের অনুপ্রবেশ ঠেকে গিয়েছিল।
হাজার বছরের এ শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের অবদান আমাদেরকে মহিমান্বিত করেছে সাহিত্যের রাজধানী ঢাকাকে বিশ্বকেন্দ্রে সংযুক্ত করেছে।                           
লেখক : কবি

Friday, July 27, 2012

ফ্রাংকেনস্টাইন | হুমায়ূন আহমেদ

আমি কি করে এক দানব তৈরি করলাম, সেই গল্প আপনাদের বলি। অয়োময়ের পর দু’বছর কেটে গেছে। হাতে কিছু সময় আছে। ভাবলাম সময়টা কাজে লাগানো যাক। টিভির বরকতউল্লাহ সাহেব অনেক দিন থেকেই তাঁকে একটা নাটক দেয়ার কথা বলছেন। ভাবলাম ছয়-সাত এপিসোডের একটা সিরিজ নাটক তাঁকে দিয়ে আবার শুরু করা যাক। এক সকালবেলা তাঁর সঙ্গে চা খেতে খেতে সব ঠিক করে ফেললাম। নাটক লেখা হবে ভূতপ্রেত নিয়ে। নাম ছায়াসঙ্গী। দেখলাম নাটকের বিষয়বস্তু শুনে তিনি তেমন ভরসা পাচ্ছেন না। আমি বললাম, ভাই আপনি কিছু ভাববেন না। এই নাটক দিয়ে আমরা লোকজনদের এমন ভয় পাইয়ে দেব যে, তারা রাতে বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে পারবে না।
বরকতউল্লাহ সাহেব বিরস গলায় বললেন, মানুষদের ভয় দেখিয়ে লাভ কি?
অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। যেভাবে তিনি প্রশ্ন করলেন, তাতে যে কেউ ঘাবড়ে যাবে। আমি অবশ্যি দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে, ভয় পাবার মধ্যেও আনন্দ আছে। কে না জানে সুকুমার কলার মূল ব্যাপারটাই হলো আনন্দ। বরকতউল্লাহ সাহেব নিমরাজি হলেন। আমি পরদিনই গা ছমছমানো এক ভূতের নাটক নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত। নাটক পড়ে শোনালাম। নিজের নাটক পড়ে আমার নিজেরই গা ছমছম করতে লাগলো। বরকতউল্লাহ সাহেব বললেন, অসম্ভব! এই নাটক বানানোর মতো টেকনিক্যাল সাপোর্ট আমাদের নেই। আপনি সহজ কোনো নাটক দিন।
আমার মনটাই গেল খারাপ হয়ে। আমি বললাম, দেখি।
‘দেখাদেখি না। আপনাকে আজই নাটকের নাম দিতে হবে। টিভি গাইডে নাম ছাপা হবে।’
আমি একটা কাগজ টেনে লিখলাম, কোথাও কেউ নেই।
বরকত সাহেব বললেন, কোথাও কেউ নেই মানে কি? আমি তো আপনার সামনেই বসে আছি।
আমি বললাম, এটাই আমার নাটকের নাম। এই নামে আমার একটা উপন্যাস আছে। উপন্যাসটাই আমি নাটকে রূপান্তরিত করে দেব।
বরকত সাহেব আঁেক উঠে বললেন, না না, নতুন কিছু দিন। উপন্যাস তো অনেকের পড়া থাকবে। গল্প আগেই পত্রিকায় ছাপা হয়ে যাবে।
আমি বললাম, এটা আমার খুব প্রিয় লেখার একটি। আপনি দেখুন সুবর্ণাকে পাওয়া যায় কি-না। সুবর্ণাকে যদি পাওয়া যায়, তাহলে কম পরিশ্রমে সুন্দর একটা নাটক দাঁড়া হবে।
‘সুবর্ণাকে যদি না পাওয়া যায়, তাহলে কি আপনি নতুন নাটক লিখবেন?’
‘হ্যাঁ লিখব।’
সুবর্ণাকে পাওয়া গেল। আসাদুজ্জামান নূর বললেন, তিনি বাকেরের চরিত্রটি করতে চান। বাকেরের চরিত্রটি তাঁকেই দেয়া হলো। ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ তৈরির দিকে আমি খানিকটা এগিয়ে গেলাম। বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাংকেনস্টাইনের দানবটা তো মানুষ এক নামে চেনে। বাকের হলো সেই ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’।
নাটকটির সপ্তম পর্ব প্রচারের পর থেকে আমি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। সবাই জানতে চাচ্ছে, বাকেরের ফাঁসি হবে কি-না। রোজ গাদা-গাদা চিঠি। টেলিফোনের পর টেলিফোন। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এই ব্যাকুলতার মানেটা কি? আমি নাটক লিখতে গিয়ে মূল বই অনুসরণ করছি। বই-এ বাকেরের ফাঁসি আছে। নাটকেও তাই হবে। যারা আমাকে চিঠি লিখেছেন তাদের সবাইকেই আমি জানালাম, হ্যাঁ ফাঁসি হবে। আমার কিছু বক্তব্য আছে। বাকেরকে ফাঁসিতে না ঝুলালে সেই বক্তব্য আমি দিতে পারব না। তাছাড়া আমাকে মূল বই অনুসরণ করতে হবে।
এক অধ্যাপিকা আমাকে জানালেন- ‘শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট বিয়োগান্তক লেখা। কিন্তু যখন রোমিও জুলিয়েট ছবি করা হলো তখন নায়ক-নায়িকার মিল দেখানো হলো। আপনি কেন দেখাবেন না? আপনাকে দেখাতেই হবে’।
এ কি যন্ত্রণা!
তবে এটা যন্ত্রণার শুধু শুরু। তবলার ঠুকঠাক। মূল বাদ্য শুরু হলো নবম পর্ব প্রচারের পর। আমি দশ বছর ধরে টিভিতে নাটক লিখছি, এই ব্যাপার আগে দেখিনি। পোস্টার, মিটিং, মিছিল—‘হুমায়ূনের চামড়া তুলে নেব আমরা।’ রাতে ঘুমুতে পারি না, দু’টা তিনটায় টেলিফোন। কিছু টেলিফোন তো রীতিমতো ভয়াবহ— ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে রাস্তায় লাশ পড়ে যাবে।’ আপাতদৃষ্টিতে এইসব কাণ্ডকারখানা আমার খারাপ লাগার কথা নয়, বরং ভালো লাগাই স্বাভাবিক। আমার একটি নাটক নিয়ে এতসব হচ্ছে এতে অহংবোধ তৃপ্ত হওয়ারই কথা। আমার তেমন ভালো লাগলো না। আমার মনে হলো একটা কিছু ব্যাপার আমি ধরতে পারছি। দর্শক রূপকথা দেখতে চাচ্ছে কেন? তারা কেন তাদের মতামত আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে? আমি কি লিখব বা না লিখব, সেটা তো আমি ঠিক করব। অন্য কেউ আমাকে বলে দেবে কেন?
বাকেরের মতো মানুষদের কি ফাঁসি হচ্ছে না?
এ দেশে কি সাজানো মামলা হয় না?
নিরপরাধ মানুষ কি ফাঁসির দড়িতে ঝোলে না?
ঐ তো সেদিনই পত্রিকায় দেখলাম ৯০ বছর পর প্রমাণিত হলো লোকটি নির্দোষ। অথচ হত্যার দায়ে ৪০ বছর আগেই তার ফাঁসি হয়ে গেছে।
সাহিত্যের একটি প্রচলিত ধারা আছে, যেখানে সত্যের জয় দেখানো হয়। অত্যাচারী মোড়ল শেষ পর্যায়ে এসে মৃত্যুবরণ করেন জাগ্রত জনতার কাছে। বাস্তব কিন্তু সেরকম নয়। বাস্তবে অধিকাংশ সময়েই মোড়লরা মৃত্যুবরণ করেন না। বরং বেশ সুখে-শান্তিতেই থাকেন। ’৭১-এর রাজাকাররা এখন কি খুব খারাপ আছেন? আমার তো মনে হয় না। কুত্তাওয়ালীরা মরেন না, তাদের কেউ মারতে পারে না। ক্ষমতাবান লোকদের নিয়ে তারা মচ্ছব বসান। দূর থেকে আমাদের তারা নিয়ন্ত্রণ করেন।
আমি আমার নাটকে কুত্তাওয়ালীর প্রতি ঘৃণা তৈরি করতে চেয়েছি। তৈরি করেছিও। কুত্তাওয়ালীকে মেরে ফেলে কিন্তু সেই ঘৃণা আবার কমিয়েও দিয়েছি। আমরা হাঁফ ছেড়ে ভেবেছি— যাক দুষ্ট শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু কুত্তাওয়ালী যদি বেঁচে থাকতো, তাহলে আমাদের ঘৃণা থেমে যেত না, প্রবহমান থাকতো। দর্শকরা এক ধরনের চাপ নিয়ে ঘুমুতে যেতেন।
আমার মূল উপন্যাসে কুত্তাওয়ালীর মৃত্যু হয়নি, নাটকে হয়েছে। কেন হয়েছে? হয়েছে, কারণ মানুষের দাবির কাছে আমি মাথা নত করেছি। কেনইবা করব না? মানুষই তো সব, তাদের জন্যই তো আমার লেখালেখি। তাদের তীব্র আবেগকে আমি মূল্য দেব না, তা তো হয় না। তবে তাদের আবেগকে মূল্য দিতে গিয়ে আমার কষ্ট হয়েছে। কারণ আমি জানি, আমি যা করছি তা ভুল। আমার লক্ষ্য মানুষের বিবেকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। সেই চাপ সৃষ্টি করতে হলে দেখাতে হবে যে কুত্তাওয়ালীরা বেঁচে থাকে। মারা যায় বাকেররা।
যে কারণে নাটকে কুত্তাওয়ালীর বেঁচে থাকা প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই কারণেই বাকেরের মৃত্যুরও প্রয়োজন ছিল। বাকেরের মৃত্যু না হলে আমি কিছুতেই দেখাতে পারতাম না যে এই সমাজে কত ভয়াবহ অন্যায় হয়। আপনাদের কি মনে আছে যে একজন মানুষ (?) পনেরো বছর জেলে ছিল যার কোনো বিচারই হয়নি। কোর্টে তার মামলাই ওঠেনি। ভিন দেশের কোনো কথা না। আমাদের দেশেরই কথা।
ভয়াবহ অন্যায়গুলো আমরাই করি। আমাদের মতো মানুষরাই করে এবং করায়। কিছু কিছু মামলায় দেখা গেছে পুলিশ অন্যায় করে, পোস্টমর্টেম যে ডাক্তার করেন তিনি অন্যায় করেন, ধুরন্ধর উকিলরা করেন। রহিমের গামছা চলে যায় করিমের কাঁধে।
পত্রিকায় দেখলাম, ১৮০ জন আইনজীবী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন আমি নাকি এই নাটকে খারাপ উকিল দেখিয়ে তাঁদের মর্যাদাহানি করেছি। আমি ক্ষমা প্রার্থনা না করলে তারা আদালতের আশ্রয় নেবেন। উকিল সাহেবদের অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলছি, এই নাটকে একজন অসম্ভব ভালো উকিলও ছিলেন। মুনার উকিল। যিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সত্য প্রতিষ্ঠার। একশত আশিজন আইনজীবী নিজেদের সেই উকিলের সঙ্গে সম্পর্কিত না করে বদ উকিলের সঙ্গে করলেন। কেন?
আমাদের সমাজে কি কুত্তাওয়ালীর উকিলের মতো উকিল নেই? এমন আইনজীবী কি একজনও নেই যারা দিনকে রাত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন না? মিথ্যা সাক্ষী কি আইনজীবীদেরই কেউ কেউ তৈরি করে দেন না? যদি না দেন, তা হলে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেন কাঁদে?
অতি অল্পতেই দেখা যাচ্ছে সবার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা কি করি না করি তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের ভাবমূর্তি বজায় থাকলেই হলো। হায়রে ভাবমূর্তি!
আমি মনে হয় মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি। মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। নাটকটির শেষ পর্যায়ে আমি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন করলাম। শেষ পর্বের জন্য আমি দু’ঘণ্টা সময় চাইলাম। আমার পরিকল্পনা ছিল প্রথম এক ঘণ্টায় শুধু কোর্ট দেখাব, পরের এক ঘণ্টা যাবে বাকি নাটক। কোর্ট দৃশ্যের পর পনেরো দিন অপেক্ষা করা দর্শকের জন্য কষ্টকর, নাটকের জন্যও শুভ নয়। যে টেনশান কোর্ট দৃশ্যে তৈরি হবে, পনেরো দিনের বিরতিতে তা নিচে নেমে যাবে। টেনশান তৈরি করতে হবে আবার গোড়া থেকে। আমার বিশ্বাস ছিল টেলিভিশন আমার যুক্তি মেনে নেবে। অতীতে আমার ‘অয়োময়’ নাটকের শেষ পর্বের জন্য দু’ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া আমার সবসময় মনে হয়েছে, টেলিভিশনের ওপর আমার খানিকটা দাবি আছে। গত দশ বছরে টিভির জন্য কম সময় তো দেইনি। আবেদনে লাভ হলো না। টিভি জানিয়ে দিলো— এই নাটকের জন্য বাড়তি সময় দেয়া হবে না।
দর্শকদের জন্য টিভি, টিভির জন্য দর্শক নয়— এই কথাটা টিভির কর্তাব্যক্তিরা কবে বুঝবেন কে জানে। আমি ৭০ মিনিটে গল্পের শেষ অংশ বলার প্রস্তুতি নিলাম। কোর্টের দৃশ্য, কুত্তাওয়ালীর হত্যা দৃশ্য, বাকেরের ফাঁসি সব এর মধ্যেই দেখাতে হবে। শুধু দেখালেই হবে না— সুন্দর করে দেখাতে হবে। দর্শকদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে গভীর বেদনাবোধ।
সন্ধ্যাবেলা হাত-মুখ ধুয়ে লিখতে বসলাম, রাতে ভাত খেতে গেলাম না। পুরোটা এক বৈঠকে বসে শেষ করতে হবে। রাত তিনটায় লেখা শেষ হলো। আমি পড়তে দিলাম আমার স্ত্রী গুলতেকিনকে। সে বলল, তোমার কোনো একটা সমস্যা আছে। মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। আমি লক্ষ্য করেছি, তুমি অনেকখানি মমতা দিয়ে একটি চরিত্র তৈরি কর, তারপর তাকে মেরে ফেল। তুমি এইসব দিনরাত্রি’তে টুনিকে মেরেছ। এবার মারলে বাকেরকে।
আমি তাকে কোনো যুক্তি দিলাম না। ক্লান্ত হয়ে ঘুমুতে গেলাম। ঘুম হলো না। আবার উঠে এসে বারান্দায় বসলাম। অনেকদিন পর ভোর হওয়া দেখলাম। ভোরের প্রথম আলো মনের অস্পষ্টতা কাটাতে সাহায্য করে। আমার বেলাতেও করলো। আমার মন বলল, আমি যা করেছি ঠিকই করেছি। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বাকেরকে মরতেই হবে।
যেদিন নাটক প্রচারিত হবে তার আগের দিন রাতে দৈনিক বাংলার আমার সাংবাদিক বন্ধু হাসান হাফিজ ব্যস্ত হয়ে টেলিফোন করলেন। আমাকে বললেন, আগামীকাল প্রেস ক্লাবের সামনে বাকের ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ হবে। সেখান থেকে তারা আপনার এবং বরকতউল্লাহ সাহেবের বাড়ি ঘেরাও করবে। পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। আপনি সরে যান।
নিজের ঘরে বসে সবাইকে নিয়ে আমার নাটক দেখার অভ্যাস। এই প্রথমবার নাটক প্রচারের দিন বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হলো। খবর নিয়ে জানলাম, বাড়ির সামনের রাস্তায় কয়েকটা ককটেল ফাটানো হয়েছে। রাগী কিছু ছেলে ঘোরাফেরা করছে। পুলিশ চলে এসেছে। বাসায় ফিরলাম রাত একটায়। দরজার ফাঁক দিয়ে কারা যেন দু’টা চিঠি রেখে গেছে। একটা চিঠিতে লেখা, ‘বাকেরের যেভাবে মৃত্যু হলো আপনার মৃত্যুও ঠিক সেইভাবেই হবে। আমরা আপনাকে ক্ষমা করলেও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।’ রাত দু’টার সময় ধানমন্ডি থানার একজন সাব ইন্সপেক্টর সাহেব আমাকে জানালেন, আপনি কোনো ভয় পাবেন না। আমরা আছি।
প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে রাতে ঘুমুতে গেলাম। এপাশ-ওপাশ করছি। কিছুতেই ঘুম আসছে না। আমার ছোট মেয়েটাও জেগে আছে। সেও ঘুমুতে পারছে না। তার নাকি বাকের ভাইয়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি মেয়েকে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম। মেয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বাবা তুমি উনাকে কেন মেরে ফেললে? আমি মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, গল্পের একজন বাকের মারা গেছে যাতে সত্যিকার বাকেররা কখনও না মারা যায়।
কথাটা হয়তো আমার ক্লাস ফোরে পড়া মেয়ের জন্য একটু ভারী হয়ে গেল। ভারী হলেও এটাই আমার কথা। এই কথা নাটকের ভেতর দিয়ে যদি বুঝাতে না পেরে থাকি তবে তা আমার ব্যর্থতা। আমি আমার সীমাবদ্ধ ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করেছি। আমার চেষ্টায় কোনো খাদ ছিল না। এইটুকু আমি আপনাদের বলতে চাই। বাকেরের মৃত্যুতে আপনারা যেমন ব্যথিত, আমিও ব্যথিত। আমার ব্যথা আপনাদের ব্যথার চেয়েও অনেক অনেক তীব্র। বিজ্ঞানী ড. ফ্রাংকেনস্টাইন নিজের তৈরি দানবটাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে নিজেই ধ্বংস হলেন নিজের সৃষ্টির হাতে। আমি বেঁচে আছি। কিন্তু বাকের নামের একটি চরিত্রও তৈরি করেছিলাম। আজ সে নেই। মুনা আছে, সে কোনোদিনই বাকেরকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে পারবে না। মুনার এই কষ্ট আমি বুকে ধারণ করে আছি। আপনারা ভুলে যাবেন। আমি তো ভুলব না। আমাকে বেঁচে থাকতে হবে মুনার কষ্ট হৃদয়ে ধারণ করে।
* হুমায়ূন আহমেদের ‘আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই’ (কাকলী প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ১৯৯৪) গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত
সূত্র : আমার দেশ

হুমায়ূন তীর্থ, নুহাশ পল্লী বাংলাদেশ ডট কম | আবদুল হাই শিকদার

জীবনানন্দ দাশের কবিতার নায়িকা শঙ্খমালার শিয়রে হিজল কাঠের চিতা জ্বলে। সে আগুনে সব কিছু পুড়ে যাওয়ার পর কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয়—‘এ পৃথিবী একবার পায় তাকে পায় না কো আর।’ হুমায়ূন আহমেদের অনন্ত যাত্রার পরও এ কথাটিই ঘুরে ফিরে বারবার প্রাণে বাজছে আমার। হয়তো আমার মতো অনেকেই এ রকমভাবে ভেবেছেন। হয়তো ভাবেননি। কিন্তু কথা তো সত্য, হুমায়ূন আহমেদের মতো শিল্পীরা প্রতিদিন জন্মায় না। যুগে যুগেও জন্মায় না। এমনকি শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও না।
বাংলা সাহিত্যের এক হাজার চারশ’ বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, কথাসাহিত্যে হুমায়ূনের চেয়ে জনপ্রিয়তা নিয়ে আর কোনো লেখকের আবির্ভাব হয়নি। আবার একথাও ঠিক, জনপ্রিয়তার মাপকাঠি যা-ই হোক, বাংলা ভাষার সাহিত্যাকাশে প্রথম ‘তারকা’ বা সুপারস্টার নজরুল। নজরুলের আগে-পরে সুপারস্টার শব্দটি আর ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায়নি— যতদিন না হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব ঘটেছে।
নজরুলের সময় মিডিয়ার এত প্রকোপ ছিল না। থাকলে হয়তো আমাদের হাতে প্রত্যক্ষ ভিজ্যুয়াল নজির পৌঁছত। আমাদের নির্ভর করতে হয় বিভিন্ন স্মৃতিচারণের ওপর। এ রকম এক স্মৃতিচারণ আমরা পেয়েছি চট্টগ্রামের রাউজানের জলিলনগরের আবদুল কুদ্দুচ মাস্টার এবং দৈনিক পূর্বকোণের চেয়ারম্যান মরহুম ইউসুফ চৌধুরীর কাছ থেকে। তাদের বর্ণনামতে, ঘটনার সময় ১৯২৮ সাল। জলিলনগরের হাজীবাড়ীর সামনে আয়োজিত চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন কবি নজরুল। আশপাশের গ্রামগঞ্জে সাড়া পড়ে গেছে। দলে দলে মানুষ ছুটছে সমাবেশস্থলের দিকে। হাজার হাজার মানুষ পাগলের মতো ছুটে এসেছে নজরুলকে একনজর দেখার জন্য। লক্ষাধিক মানুষের সেই চাপ সামলানোর জন্য শেষ পর্যন্ত টিকিটের ব্যবস্থা করা হলো। টিকিটের দাম, ৫০০, ১০০, ৫০, ১০ ও ১ টাকা। তা-ই সই। টিকিট কেটে প্যান্ডেলে ঢুকে কবিকে দেখার জন্য হুলুস্থুল পড়ে গেল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সেই প্রথম টিকিট কেটে কবিদর্শনের ব্যবস্থা।
নজরুল দলবল নিয়ে রাস্তায় নামলে অনেক সময় কলকাতার ট্রাফিক জ্যাম লেগে যেত।
নজরুলের আগে কিংবা পরে অনেকে এসেছেন। কিন্তু নজরুল জাতির অন্তরে যে জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেখানে আর কেউ যেতে পারেননি। যেতে পারেননি বলেই একজন কবিকে নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড আমাদের জেনারেশনের দেখা হয়নি। আমাদের সামনে প্রকৃতি সেজন্যই তার সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়ে পাঠালেন হুমায়ূন আহমেদকে। তা-ও আবার পশ্চিম বাংলার রুক্ষ ধূসরতার মধ্যে নয়; তিনি এলেন বাংলাদেশের সহজ সুন্দর সাবলীল শ্যামল কোমল নদীমাতৃক পাললিক মৃত্তিকায়। যে বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি হওয়ার উপকরণ জুগিয়েছে, যে বাংলাদেশ নজরুলকে করেছে জাতীয় কবি, দিয়েছে ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হওয়ার প্রেরণা, দিয়েছে অগ্নিবীণা বাজানোর অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্য, সেই বাংলাদেশ মধ্যবিত্ত জীবনের অব্যক্ত কথাকে বাণীময় করার অনন্যসাধারণ শিল্পশক্তি দিয়ে যেন নিজ হাতে গড়ে উপস্থাপন করেছে হুমায়ূন আহমেদকে।
তাঁর আবির্ভাব যেন হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো। অসাধারণ তার মাদকতা এবং চুম্বক শক্তি। তাঁর আগমন যেন দক্ষিণ থেকে বয়ে আসা বাতাসের মতো পুষ্পল। তিনি ব্যক্তিজীবনে যেমন ছিলেন প্রো-অ্যাক্টিভ, তেমনি তাঁর সাহিত্যকর্মও সেই পজিটিভনেসের তরজমা। তিনি নিজের অজান্তেই বাংলাদেশের সাহিত্যের পক্ষে যেন দাঁড়িয়ে গেলেন বটবৃক্ষ হয়ে। ভারতের পশ্চিম বাংলার সাহিত্যকে বিদায় জানিয়ে তিনি যেন উদ্বোধন ঘটালেন ভিন্ন এক বাংলাদেশের—যে বাংলাদেশ স্নিগ্ধ, কোমল, মানবিক, মমতাময়, প্রেমময়, সহজ কিন্তু আন্তরিক। চালটা হালকা, কিন্তু ব্যঞ্জনা বড় গভীর। হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে মধ্যবিত্তের দায়হীন দায়িত্বহীন আনন্দ বিতরণে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তাঁর প্রতিটি কাজের অন্তরেই ছিল মঙ্গলবোধ এবং দেশপ্রেম। তিনি তাঁর নিজের প্রজন্ম এবং পরের প্রজন্মকে যে আবিষ্ট করে রেখেছেন, সে তো এই কারণে নয় যে তিনি ভালো গল্প বলতে পারেন; বরং সত্য হলো, তিনি মধ্যবিত্তের ছোট ছোট দুঃখ-ব্যথা, কান্না-হাসিকে বাঙ্ময় করেছেন অননুকরণীয় মাধুর্যে। তাঁকে তিনি ঘরে ফিরিয়ে এনেছেন অশিক্ষিত আবেগ দিয়ে নয়; যুক্তি ও সৌন্দর্য দিয়ে, নিরাভরণ সত্যের সহজ-সরল মমতা দিয়ে। একই রকমভাবে বলা যায় আধিপত্যবাদী থাবার নিচ থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যকে উদ্ধার করে তাকে দান করে গেছেন প্রাণপ্রাচুর্য ও নিজস্বতা। আর আমাদের প্রকাশনা শিল্পকে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠা।
কলকাতাকেন্দ্রিক ভাষাভঙ্গিকে বাতিল করে দিয়ে বাংলাদেশের জনজীবনের ভাষাকে শিল্পরূপ দিয়ে যে অসামান্য কাজটি তিনি করে গেলেন, তার মূল্যায়ন হতে সময় লাগবে। তিনি নিজের জন্য নতুন ভাষাশৈলী নির্মাণ করে আমাদের আক্কেল-হুঁশ হারিয়ে ফেলা, কেঁচোর মতো ঘিনঘিনে, পরমুখাপেক্ষী লেখক-কবিদের আঁতলামির জ্বালা সয়েছেন বটে; কিন্তু তাদেরও খানিকটা মানুষ করে দিয়ে গেছেন। এ প্রজন্মের লেখক-কবিরা সেজন্য পরবর্তীকালে গর্ববোধ করবেন যে, আমরা হুমায়ূনযুগে বাস করতাম।
হুমায়ূন তাঁর বিষয়বৈচিত্র্যের মতোই বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকেও সম্মান দান করে গেছেন। মধ্যবিত্ত নাগরিক, সাদামাঠা জীবনের কাহিনী বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি রোপণ করে গেছেন লোকসংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল নানা দিক। তাঁর নাটক, উপন্যাস, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত—সব কিছুই এর প্রমাণ হিসেবে আমাদের সামনে আছে। এর মাধ্যমে বিরাজমান হীনম্মন্যতার শিকড় তিনি উপড়ে ফেলেছেন। লজিক এবং অ্যান্টি-লজিক, ফ্যান্টাসি এবং সায়েন্স ফিকশন—এসবের পরতে পরতে তিনি গেঁথে দিয়েছেন বাংলাদেশকে।
হুমায়ূন আহমদের মিসির আলি, হিমু, শুভ্র, রূপা, বাকের ভাই এজন্যই হয়তো হয়ে উঠেছে আমাদের আত্মার আত্মীয়। বাংলা সাহিত্যে একসঙ্গে এতগুলো সফল এবং জনপ্রিয় চরিত্র নির্মাণের একক কৃতিত্ব আসলেই হুমায়ূনের।
হুমায়ূনের আরেকটি অস্ত্র তাঁর পরিচ্ছন্নতা। জীবনের ক্লেদ, গ্লানি, হিংসা, ঘৃণা—এসবের বাইরে গিয়ে মানুষকে তিনি বড় করে তুলেছেন সবসময়। একই পরিবারের মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা, দাদি—সবাই হুমায়ূনের অনুরক্ত হয়েছেন এ পরিচ্ছন্নতার জোছনায় অবগাহন করে। মানুষকে তিনি সুপারম্যান হিসেবে দেখেননি কখনও, দেখেছেন দোষে-গুণের ভেতরে সন্তরণশীল। এজন্যই শ্রাবণ মেঘের দিনের দাদা, বহুব্রীহির এমদাদ খোন্দকার কিংবা নান্দাইলের ইউনুসের জন্যও চোখে পানি আসে আমাদের। তাঁর মানুষ কেউই সম্পূর্ণ খারাপ মানুষ নয়, কেউ পরিপূর্ণ মানুষ নয়—সব মিলিয়ে বলা যায় অসাধারণ এক জীবনশিল্পী হুমায়ূন। হুমায়ূনের মৃত্যু নেই। তিনি আমাদের সাহিত্যের অজর-অমরদের তালিকায় নাম লিখিয়ে গেছেন জীবদ্দশায়ই।
দুই.
হুমায়ূন আহমেদকে সাহিত্যসম্রাট সামনাসামনি বললে হয়তো তিনি হেসে উঠতেন। কারণ এসব সম্রাট-রাজা, রায় বাহাদুর, মন্ত্রী, আমলা, শিল্পপতিদের লেখক তো ছিলেন না তিনি। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের মনোনায়ক।
এই মনোনায়কদের ইতিহাসে আমাদের সাহিত্যে প্রথম নাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সাম্প্রদায়িকতার নোংরামিটুকু বাদ দিলে তিনি অসাধারণ। জনপ্রিয়তার কাতারে প্রথম নাম।
বঙ্কিমের পরে নাম আসে মীর মশাররফ হোসেনের। মীরের বিষাদ-সিন্ধু পাঠ করেননি, এমন মানুষ একসময় এদেশে বিরল ছিল। একটু বিরতি দিয়ে এর পরের নাম শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। এরপর জনপ্রিয়তার কাতারে, বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন। একদা এমন ছিল— মেয়েদের বিয়ে হলে এদেশের মায়েরা, মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় স্যুটকেসে দু’টি বই দিয়ে দিতেন। এর একটি ছিল মকসুদুল মুমেনীন অন্যটি নজিবর রহমানের আনোয়ারা। আনোয়ারা দীর্ঘদিন বাংলার মুসলমান সংসারজীবনে অবশ্যপাঠ্য হয়ে ছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকে আমাদের উপন্যাস, জনপ্রিয় ধারার উপন্যাস বলে আমরা মানতাম আকবর হোসেনকে। কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের সাহিত্যের লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়ার সত্ সাহস প্রথম দেখিয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের যৌবনের বিরাট অংশ দখল করে ছিল কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ থ্রিলার সিরিজ। মাসুদ রানা ছিল দুর্ধর্ষ স্পাই। আমরা সে রকম হতে চাইতাম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ, মধ্যবিত্ত শ্রেণী অপেক্ষায় ছিল এমন একজনের যে, তাদের প্রাণের পাশে আসন পেতে বসে তার সমস্যাজর্জরিত জীবনের দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে তাকে নিয়ে যাবে আনন্দের অলকাপুরীতে—তার ভাঙা ঘরের জীর্ণ উঠানের জোছনা দিয়েও যে আলিফ লায়লার রোমান্টিক পৃথিবী নির্মাণ করবে—সেই কাঙ্ক্ষিত প্রতিভার নামই হুমায়ূন আহমেদ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম এবং সফলতম প্রতিনিধি। সত্যিই তো, হুমায়ূনের লেখক জীবনের বয়স বাংলাদেশের সমান। সেদিক থেকেও তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যের সত্যিকার নায়ক। তাঁর লেখালেখির শুরু এবং শেষ তো খাঁটি বাংলাদেশেই। আবার তিনিই বাংলাদেশের লেখালেখির জগতের প্রথম পেশাদার ও সার্বক্ষণিক লেখক। প্রথম এবং সুপারস্টার। তিনিই তো সেই লেখক, যাঁর বই বাংলা ভাষার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।
তিন.
নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের দাফন সব বিবেচনায়ই যথার্থ হয়েছে। সেদিক থেকে হুমায়ূনের ছেলেমেয়ে ও ভাইবোনদের প্রতি সহানুভূতি রেখেও বলব, শাওনের সিদ্ধান্তই সঠিক। এই সঠিকত্ব বুঝতে আরেকটু সময় লাগবে। সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই এর গুরুত্ব ও তাত্পর্য অনুধাবন করবে আশা করি।
বাংলা সাহিত্যের শেষ একশ’ বছরে দেখা যায়, মাত্র দু’জন লেখক ব্যাপকভিত্তিক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেছেন। আগের জন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরের জন হুমায়ূন আহমেদ। মাঝে কাজী নজরুলও চেয়েছিলেন বড় ধরনের কিছু একটা করার। কিন্তু তিনি সময় পাননি।
রবীন্দ্রনাথ পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছিলেন বোলপুরের আশ্রম। সেখানেই তিনি তাঁর মেধা, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে বাস্তব রূপ দেন স্বপ্নের। গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন। যে শান্তিনিকেতন আজ যেমন কবিতীর্থ-রবিতীর্থ, তেমনি ভারতের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্রও বটে। শান্তিনিকেতনের যে কনসেপ্ট, সেই কনসেপ্ট কলকাতার কোলাহলে রূপ দেয়া সম্ভব হতো না। এর জন্য দরকার ছিল কোলাহলবর্জিত, প্রকৃতিঘনিষ্ঠ পরিবেশ। আজকের শান্তিনিকেতন তাই শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার প্রধান পীঠস্থানই শুধু নয়, এর পর্যটন ভ্যালুও অনেক। শান্তিনিকেতনের পরতে পরতে, পাতায় পাতায়, তৃণে-স্থাপত্যে সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথ। সেজন্য শান্তিনিকেতনে না গেলে রবীন্দ্রদর্শন ও চর্চা অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে।
এ আলোকেই দেখতে অনুরোধ করি নুহাশ পল্লীকে। বাংলাদেশের আর কোনো লেখক হুমায়ূনের মতো ভাগ্য নিয়ে জন্মায়নি। শুধু বাংলাদেশ কেন, ভারতের পশ্চিম বাংলায়ও হুমায়ূনের মতো এত বিশাল জনপ্রিয়তা নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। এমন সুযোগও এদেশের আর লেখকের জীবনে আসেনি। রবীন্দ্রনাথ যেখানে পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছিলেন, হুমায়ূন সেখানে নিজে অর্জন করেছেন। নিজস্ব অর্থ, ঘাম, মেধা আর স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তুলেছেন নুহাশ পল্লী।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ লেখকই অতিসাধারণ মানের জীবনযাপন করেন। তাদের বেশিরভাগই জনপ্রিয়তা ও বিত্তের বিচারে ফকির। দিন এনে দিন খায়। এদের মধ্যেও স্বপ্নহীন সবাই, তা নয়। কিন্তু মুশকিলটা হলো, হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয়তা ও বিত্তশালী হওয়া তাদের একজীবনে সম্ভব নয়—তারা নুহাশ পল্লীর মতো স্বপ্নভূমি রচনা করবে, কীভাবে?
আবার যাদের সাধ্য ছিল, তাদের মধ্যে বড় কোনো স্বপ্ন নেই। এদের বেশিরভাগই পার্টটাইম লেখক। এরা অর্থ-বিত্তের দৌড়ে ব্যর্থ হয়ে লেখক হিসেবে নাম কামানোর ফিকিরে ঘুরছেন। কেউ সাবেক অতিচতুর আমলা, কেউবা ক্ষুদ্রবুদ্ধির সাংবাদিক। এদের স্বার্থপর জীবনের ক্যানভাসও অতিক্ষুদ্র। সবকিছু দেখেন নিজেদের আত্মার সাইজে। বড় স্বপ্ন বড় কল্পনা ধারণ করার মতো মাথাও এদের নেই। অনেকটা বন্য বরাহের মতো। আত্মপরতার যে কাদাটুকু এরা নাগরিক কোলাহলে পেয়েছেন, সেই কাদা ঘেঁটেই এরা জীবন ধন্য মনে করেন। এদের মাথায় কীভাবে আসবে নাগরিক কোলাহলের বাইরে গভীর নিবিড় প্রকৃতির মধ্যে মমতার রেণুমাখা একটি নুহাশ পল্লী সৃষ্টির।
চার.
শেক্সপিয়র দর্শনের জন্য যারা স্ট্র্যাটফোর্ড আপন অ্যাভন গেছেন, তারা দেখে থাকবেন কীভাবে ছোট একটা শহরের পুরোটাই গড়ে উঠেছে শেক্সপিয়রকে নিয়ে। কী নেই সেখানে? আছে শেক্সপিয়রের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, আছে সোয়ান থিয়েটার, আছে প্রেক্ষাগৃহ, আছে শপিংমল, আছে মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, পর্যটন অফিস, গাইড, আরও কত কি! সারাবছরই চলছে নানা উত্সব। সেয়ান থিয়েটারে চলছে বিরতিহীন শেক্সপিয়রের বিভিন্ন নাটকের বিরতিহীন পরিবেশনা, চলছে আবৃত্তির অনুষ্ঠান। মোট কথা, সে এক এলাহি কাণ্ড। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, কীভাবে শেক্সপিয়রকে নিয়ে মেতে আছে ব্রিটিশরা। দেশি পর্যটকের পাশাপাশি দেশ-দেশান্তর থেকে প্রতিদিন গাড়ি ভরে ভরে পর্যটক যাচ্ছে স্ট্র্র্র্র্যাটফোর্ডে।
শান্তিনিকেতন যারা দেখেছেন, তারা আমার কথার সারবত্তা কিছুটা আঁচ করতে পারবেন।
ভারত বা ব্রিটেনের মতো ইরানও তাদের বিভিন্ন শহরকে অনুপম করে সাজিয়ে রেখেছে বিভিন্ন কবির নামে। এক্ষেত্রে সিরাজনগরীর হাফিজ এভিনিউতে হাফিজ এবং সাদিয়ার শেখ সাদীকে নিয়ে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার আছে অনেক কিছু।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আলোকে হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের ও প্রিয় স্থান নুহাশ পল্লীকে গড়ে তোলার দারুণ একটা সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। এই সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তার পরিবার যদি সহযোগিতা করে, তাহলে নুহাশ হয়ে উঠতে পারে ‘হুমায়ূন তীর্থ’; হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যরকম এক স্ট্র্যাটফোর্ড আপন অ্যাভন; হয়ে উঠতে পারে একটা খাঁটি বাংলাদেশী শান্তিনিকেতন।
একটা চমত্কার মাস্টার প্ল্যানের আওতায় হুমায়ূনের এই প্রিয় নুহাশ পল্লীকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে হুমায়ূন আহমেদ মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, উন্মুক্ত থিয়েটার হল, প্রেক্ষাগৃহ, অ্যান্টিক শপ, গবেষণা কেন্দ্র, এমনকি একটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।
ঢাকা থেকে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার জন্য থাকবে চমত্কার কোচ সার্ভিস। থাকবে পেশাদার গাইড। এই পর্যটকরা গিয়ে দেখবেন সেখানে দিনরাত চলছে নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। অমাবস্যার রাতে যেখানে মঞ্চস্থ হবে মিসির আলি বিষয়ক নাটক অথবা চলচ্চিত্র। পূর্ণিমার রাতে বিশেষ ব্যবস্থায় চলবে হিমুকে নিয়ে নানা কাণ্ড। শরতে কিংবা চৈত্রের চন্দ্রিমা রাতে হবে সঙ্গীতের আসর। এভাবে মাসের প্রতিটি দিন কবে কী হবে, তার আগাম রুটিন জানিয়ে দেয়া হবে সবাইকে। সেই মোতাবেক ট্যুরিস্টরা যাবেন নুহাশ পল্লীতে। আবার এমনও হতে পারে নুহাশ পল্লীর হুমায়ূন তীর্থের প্রতিটি দিন হুমায়ূনের এক একটি বইয়ের নামে অথবা চরিত্রের নামে হবে। যেমন- শঙ্খনীল কারাগার দিবস, মিসির আলি দিবস ইত্যাদি। সেদিনের পল্লী সাজবে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ বা চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে। এতে পর্যটন ভ্যালুও বাড়বে অনেকখানি। ঢাকার কোলাহল থেকে ক্ষণিক নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য নানা বয়সের নরনারীরা ছুটে যাবে নুহাশ পল্লীর হুমায়ূন তীর্থে। নির্মল আনন্দের মধ্যে একটি দিন কাটিয়ে তারা ফিরে যাবেন কর্মজীবনে। বিদেশী ট্যুরিস্টরা ঢাকায় এসে বলবেন ‘হুমায়ূন তীর্থ নুহাশ পল্লী, বাংলাদেশ’ এ যাব।
একই সঙ্গে হুমায়ূনকে নিয়ে গবেষণার জন্য জমা হবেন গবেষকরা, গ্রন্থাগারে থাকবে হুমায়ূনের বই এবং হুমায়ূনকে নিয়ে লিখিত গ্রন্থাদি। বাংলাদেশের সমাজ জীবন ও সংস্কৃতির উপর গ্রন্থরাজি। অর্থাত্ হুমায়ূনকে ঘিরে শিক্ষা-সংস্কৃতির একটি পজিটিভ চর্চা যদি নুহাশ পল্লীতে শুরু হয়, তাহলে বাংলাদেশ যেমন পাবে ঘুরে দাঁড়ানো ও বেড়ানোর নতুন মাত্রা, তেমনি শান্তি পাবে হুমায়ূন আহমেদের আত্মাও।
শাওন, শীলা, নোভা, বিপাশা, নুহাশ, নিষাদ, নিনিতরা কি এই লেখাটি পড়বে—আমি জানি না। যদি পড়ে এবং ছিটেফোঁটাও যদি বাস্তাবায়ন হয়, ধন্য মানব নিজেকে। আর এই যে কথাগুলো বললাম, সে আলোকে যদি বিচার করা যায়, তাহলে দেখা যাবে হুমায়ূনকে দাফন করার জন্য নুহাশ পল্লীই যথার্থ স্থান। এখন স্বাপ্নিক ও স্বপ্ন আমাদের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতের দিকে।
সূত্র : আমার দেশ

হুমায়ূন আহমেদ, স্মৃতিতে সতত | সাযযাদ কাদির

হুমায়ূন আহমেদ গুরুতর অসুস্থ—ন’মাস আগে এ খবর পাওয়ার পর থেকে ১৯শে জুলাই রাত ১১-৩০টার পরে ফেসবুকে তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগ পর্যন্ত—একবারও আমার মনে হয় নি যে সেরে উঠবেন না তিনি। নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে তাঁর চিকিত্সা চলছে জেনে আরও নিশ্চিত ছিলাম এ ব্যাপারে। কিন্তু সবাইকে শোকস্তব্ধ করে অকালে অকস্মাত্ বিদায় নিলেন তিনি, এই বিমূঢ় স্তব্ধতা সহসা ঘুচবে না কারও।
হুমায়ূন আহমেদকে চিনি ১৯৭০ সাল থেকে। সেটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের শেষ বছর। থাকতাম মুহসিন হলে। সেখানেই দেখেছি তাঁকে। ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সখ্য ছিল মাহফুজউল্লাহর সঙ্গে। আহমদ ছফার সঙ্গে একবার এসেছিলেন আমার ২১১ নম্বর রুমে। তেমন কোনও কথা হয় নি তখন, লেখালেখি নিয়েও না। ছফা ভাইয়ের সঙ্গে কোনও না কোনও অনুরাগী থাকতেন সব সময়, ভেবেছি তাদেরই একজন। স্বাধীনতার পর এক দিন তাঁকে দেখি আহমদ ছফার সঙ্গে। এবার জানা গেল হুমায়ূনের লেখালেখির খবর। ছফা ভাই বললেন, ও দারুণ উপন্যাস লিখেছে একটা। প্রকাশক পাচ্ছি না। শরীফ স্যরের কাছে যাচ্ছি...যদি একটা ভূমিকা লিখে দেন।
পরে উপন্যাস পড়ে আহমদ শরীফ স্যর ভূমিকা লিখে দেন ওই উপন্যাসের। এরপর রাজি হন প্রকাশক। ছাপা হয় ‘নন্দিত নরকে’। প্রকাশের পর-পরই নানাভাবে আলোচিত হয় উপন্যাসটি, পাঠকপ্রিয়ও হয়। ওই সময় লেখক শিবির ও বহুবচন নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত আমি। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। লেখক শিবির উপন্যাসটিকে পুরস্কৃত করে ১৯৭৩ সালে, ১৯৭৫ সালে বহুবচন মঞ্চস্থ এর নাট্যরূপ। বহুবচন ১৯৯০ সালে তাঁর ‘দেবী’ নাটকটিও মঞ্চস্থ করে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, কৃষ্ণনগর ও চাকদহ-এও এ নাটকের প্রদর্শনী করেছেন তাঁরা। ‘নন্দিত নরকে’র পর হুমায়ূন লেখেন ‘শঙ্খনীল কারাগার’। এ উপন্যাসটিও পাঠকপ্রিয় হয় ‘নন্দিত নরকে’র মতোই।
লেখালেখিতে হুমায়ূনের ছেদ পড়ে যখন তিনি পিএইচডি গবেষণার জন্য যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভারসিটিতে। সেখানে দু’ বছর তিনি পড়াশোনা করেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি নিয়ে, পরে পিএইচডি করেন পলিমার কেমিস্ট্রিতে। ফাঁকে-ফাঁকে অবশ্য কিছু লেখালেখি করেছেন তিনি। মনে আছে, প্রবাস-জীবনের টুকরো-টুকরো নানা কিছু লিখে পাঠাতেন ‘বিচিত্রা’য়, সেগুলো একসঙ্গে ছাপতাম ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে’ শিরোনামের একটি বিভাগে।
দেশে ফিরে দৈনিক বাংলা-বিচিত্রা বলয় ঘিরে পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে হুমায়ূনের গল্প-উপন্যাস। ওই বলয়ে প্রধান ছিলেন সালেহ চৌধুরী, আলমগীর রহমান ও হাসান হাফিজ। আলমগীর তাঁর বই প্রকাশনায় (অবসর প্রকাশনীর মাধ্যমে), সালেহ চৌধুরী ও হাসান হাফিজ তাঁকে নিয়ে লেখালেখিতে রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা (বিশেষ করে দৈনিক বাংলা-বিচিত্রা’য়)। কাজী আনোয়ার হোসেনের সেবা প্রকাশনীর জন্যও লিখেছেন হুমায়ূন। তবে উইলিয়াম পিটার ব্লেটি’র ‘দি এক্সরসিস্ট’ (১৯৭১) অনুবাদ নিয়ে মতান্তর ঘটার পর আর লেখেন নি সেখানে। ওই অনুবাদ সম্পাদনার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিস্তর খাটতে হয় আমাকে। দেখে কাজী আনোয়ার হোসেন খুশি হন, অন্যান্য বই সম্পাদনা করে যত সম্মানী পেয়েছি, তার দ্বিগুণ বরাদ্দ করেন সেবার। কিন্তু সেই সম্পাদিত পাণ্ডুলিপি দেখে হুমায়ূন ক্ষুব্ধ হন খুব। এত কাটাকুটি? রাগ আর সামলাতে পারেন না তিনি। তখন তাঁকে শান্ত করতে কোথায় কেন কি পরিবর্তন-পরিমার্জন-পুনর্লিখন করতে হয়েছে তা বোঝাবার চেষ্টা করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। জানিয়ে দেন, সম্পাদিত রূপটিই শুধু ছাপতে রাজি আছেন তিনি। কিন্তু মানতে পারেন না হুমায়ূন, রাগে দুঃখে ক্ষেপে গিয়ে চলে যান পাণ্ডুলিপি নিয়ে। পরে অবশ্য ফিরে আসেন, বলেন, খুব রেগে গিয়েছিলাম। মাথা ঠিক ছিল না। আপনি সংশোধিত রূপটিই ছাপুন।
পরে সেই সম্পাদিত রূপেই ছাপা হয় ‘এক্সরসিস্ট’। পরে এ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখি নি তাঁর। দেখা হলে কখনও বুঝতে দেন নি সেই রেগে যাওয়ার বিষয়টি। তাঁর এই মেনে নেয়ার ক্ষমতার উচ্চ মূল্যায়ন করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। গত ১৯শে জুলাই ছিল তাঁর ৭৬তম জন্মদিন। সেদিন সকালে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করি আমরা। রাতে হুমায়ূনের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে পরদিন সকালে আবারও ফোনে কথা বলি কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তখন কথায়-কথায় ওঠে ‘এক্সরসিস্ট’-এর অনুবাদ ও সম্পাদনার সেই প্রসঙ্গ। বললেন, হুমায়ূন বড় মাপের মানুষ ছিলেন। ওই বইয়ের ঘটনা তো বটেই, অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যবহারে বুঝেছি তা।
দুঃখ করে বললেন, আমার জন্মদিনের তারিখটা তাঁর মৃত্যুদিনের তারিখ হয়ে গেল!
মনে পড়ে, ওই ঘটনার কয়েক বছর পর হুমায়ূন আমাকে উপহার দেন তাঁর ‘সৌরভ’ নামের উপন্যাসটি, লেখেন ‘সাযযাদ কাদির প্রিয়বরেষু...’। সেদিন ছিল ২০শে জুলাই, ১৯৮৫। কাকতালীয়, কিন্তু কি বিচিত্র!
আসলেই অত্যন্ত সহৃদয় মানুষ ছিলেন হুমায়ূন, মনটা ছিল বড়। এক সময় তাঁর কড়া সমালোচনা করতেন হুমায়ুন আজাদ। তাঁর উপন্যাসকে বলতেন ‘অপন্যাস’, টিভি নাটককে বলতেন ‘ওয়ান-টাইমার’। কিন্তু এ নিয়ে কখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখান নি হুমায়ূন আহমেদ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দু’জনের অন্তরঙ্গতাই লক্ষ্য করেছি বেশি।
একবার ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিভাগে। সেখান থেকে তিনি নিয়ে যান তাঁর বাসায়। টিভি নাটক নিয়ে কথা হয় অনেকক্ষণ। বলি, তাঁর নাটকে ব্ল্যাক হিউমারের লক্ষণ আছে। এ কথায় উত্সুক হন তিনি। পরে ‘বহুব্রীহি’র পাণ্ডুলিপি দিয়ে বলেন, ঈদ সংখ্যায় ছাপুন। কোনও সম্মানী দিতে হবে না।
তখন আমি ‘তারকালোকে’র সম্পাদক।
ওই সময় হুমায়ূনের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে নানা বিড়ম্বনায় পড়ছিলাম এখানে সেখানে। বইমেলায় তাঁর ভক্ত, টিভির শিল্পী, এমনকি তাঁর ছাত্র-ছাত্রী পর্যন্ত ভুল করে বসতো মাঝেমধ্যে। সেদিন এ নিয়ে বেশ হাসাহাসি করি আমরা। হুমায়ূন স্ত্রীকে ডেকে বলেন, আছে কোনও মিল সাযযাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার? তিনি একবার তাকিয়েই বলেন, না।
পরে দু’জনে হাঁটতে-হাঁটতে আসি এলিফ্যান্ট রোডে। পথে জিজ্ঞেস করেন, আপনার লেখা দেখি না। আর গল্প লেখেন না? আপনাদের লেখা পড়ে-পড়ে আমরা লিখতে শুরু করলাম...
আমার অনূদিত ‘লাভ স্টোরি’ সম্পর্কে বললেন, ওটা পড়ার পর থেকে বেস্টসেলার লিখতে চাইছি। তবে হাতের লেখা নিয়ে সমস্যা। বানান, দাড়ি কমা ড্যাশ...! বাক্য অসমাপ্ত থাকে। আমার দরকার ভাল একজন কমপোজার (ওয়ার্ড প্রসেসর), আর ভাল একজন প্রুফ রিডার।
পরে শুনেছি অমন দু’একজন পেয়েছেন তিনি।
তখন ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘অয়োময়’ টিভি সিরিজ। ওই প্রসঙ্গে হুমায়ূন বলেন প্রযোজক নওয়াজিশ আলি খান ও মুস্তাফিজুর রহমান এবং শিল্পী-কলাকুশলীদের কৃতিত্ব ও অবদানের কথা। বলেন, ওদের ইমপ্রোভাইজেশন দারুণ। একটা সাজেশন থেকে দারুণ কিছু করে ফেলতে পারেন তাঁরা।
তবে হুমায়ূনের ‘কোথাও কেউ নেই’ ও ‘নক্ষত্রের রাত’ সিরিয়াল দু’টি বেশি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে আগের সিরিয়াল তিনটির চেয়ে। চলচ্চিত্রে অবশ্য অত সাফল্য আসে নি তাঁর। পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমানের অনুরোধে, ইসকাটনের মহিলা সমিতিতে গিয়ে, তাঁর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ছবির ছোট্ট একটি দৃশ্যে অভিনয়ের মতো কিছু একটা করতে হয়েছিল আমার। পরে সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে ছবিটি যখন দেখি, তখন খেয়াল করি সে দৃশ্যটি নেই ছবিতে।
বলেছিলাম, হাঁটতে-হাঁটতে এলিফ্যান্ট রোডে আসার কথা। সেদিন হুমায়ূন আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন জিগজ্যাগ ভিডিওতে। গিয়ে বলেন, আমাকে কিছু ইংরেজি সিচুয়েশন কমেডি (সিটকম) বেছে দিন তো!
জানালেন সারা রাত ছবি দেখেন তিনি। দেখে-দেখে আইডিয়া পান নানা রকম। হুমায়ূন সেদিন নিয়ে যান ১৮টি ক্যাসেট। দোকানের মালিক জানান, কিছু দিন পর-পর এসে তিনি ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে যান ২০-২২টি করে।
টিভি’র মাধ্যমে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার পর বইমেলায় বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পান হুমায়ূন। এ উদাহরণ কাজে লাগাতে চেয়েছেন অনেকে। এটা হচ্ছে অগস্ট-সেপটেম্বর থেকে টিভিতে একটা সিরিজ শুরু করে জানুয়ারি পর্যন্ত চালিয়ে গিয়ে ফেবরুয়ারির বইমেলায় ভিড় সৃষ্টি করার ফরমুলা। এ ফন্দি বা ধান্দা করে অবশ্য কিছুটা সাফল্য পেয়েছেন কেউ-কেউ। অন্যেরা পান নি সেই স্বর্গের সিঁড়ি।
হুমায়ূনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা ইসকাটনের এক ডুপ্লেক্স কমপ্লেক্সের চত্বরে, এক শুক্রবার দুপুরে। আমি গিয়েছিলাম সেখানকার বাসিন্দা জামিল আখতার বীনু আপার কাছে। হঠাত্ ঝড়ো বেগে ঝকঝকে নতুন একটি গাড়ি ঢুকে দু’জন নারীকে নামিয়ে দিয়েই আবার বেরিয়ে যায় সাঁত্ করে। ওই দু’জনকে মা ও মেয়ে মনে হয় আমার। আসা ও যাওয়ার দু’বারই আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয় গাড়ির অপর আরোহী হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। তিনি বোধহয় চিনতে পারেন না আমাকে, অথবা চিনলেও হয়তো বুঝে উঠতে পারেন নি—ওই সময় আমি কেন ওখানে থাকবো!
কিছু দিন পর হুমায়ূনের সঙ্গে গুলতেকিনের বিচ্ছেদ এবং শাওনকে বিয়ের খবর আসে পত্রিকায়। তখন বুঝতে পারি, ওই দুই নারীর একজন ছিলেন কিশোরী শাওন।
হুমায়ূনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে অনেক বিতর্ক। এর আগে, টিভিতে ‘অয়োময়’ সিরিজ চলাকালে, এক বন্ধুর কিশোরী কন্যার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে নানা কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি ছাপা হয়েছিল পত্রপত্রিকায়। এসব ঘটনায় আমার মনে পড়েছিল বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার চারলি চ্যাপলিন-এর কথা। ৫৪ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার ইউজিন ও’নিল-এর অষ্টাদশী কন্যা উনা-কে। ভদ্মাদিমির নবোকভ-এর ‘লোলিটা’ উপন্যাসটির কথাও মনে পড়েছে। ওই উপন্যাসের প্রৌঢ় প্রফেসর হামবার্ট হামবার্ট আকৃষ্ট হন ১২ বছরের এক বালিকার প্রতি।
হুমায়ূনের এ ব্যাপারটি নিয়ে চর্চা শেষ হয় নি এখনও। তাঁর মৃত্যুর পরও তা প্রকাশ পেয়েছে দুঃখজনক রূপে। এ নিয়ে অন্তত একটি সাড়াজাগানো উপন্যাস লেখা হয়েছে বলে জানি। ‘তালাক’ নামের সে উপন্যাসটি লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক-সাহিত্যিক মিলান ফারাবী।
প্রশ্ন জাগে, নিজের জীবনকে নিজের মতো করে কি সাজিয়ে নিতে পারে না কেউ?
অবশ্য ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের ঘটনা-রটনা হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের কাটতিতে প্রভাব ফেলে নি কোনও। যারা কট্টর সমালোচক, ঘোরতর নিন্দুক তাদেরও দেখেছি বইমেলায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁর বই কিনতে। এটা নিঃসন্দেহে এক জাদু-ক্ষমতা।
নব্বই দশকের শেষ দিকে হুমায়ূনের সাহিত্যিক কৃতিত্ব সম্পর্কে আমাকে লিখতে বলা হয়েছিল পাক্ষিক ‘শৈলী’র পক্ষ থেকে। তাঁর তিনটি বড় সাফল্য নিয়ে তখন আলোচনা করেছিলাম সে লেখায়। প্রথমত, বাংলা বেস্টসেলারে কলকাতার প্রাধান্যকে ছাড়িয়ে তিনি ঢাকার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম। এর আগে নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন থেকে আকবর হোসেন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ থাকলেও বিশেষ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন একমাত্র কাজী আনোয়ার হোসেন। তবে হুমায়ূন অবদান রেখেছেন সামগ্রিক পরিসরে। দ্বিতীয়ত, বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানকে স্থায়ী আসন দিয়েছেন তিনি। এর আগের ১৫০ বছরের উপন্যাস পড়ে তেমন করে বোঝা যায় না যে বাঙালিদের ৬০ ভাগ মুসলমান। তৃতীয়ত, উপন্যাসের কাটতি বাড়াতে তিনি সেক্স বা ভায়োলেন্সের আশ্রয় নেন নি কখনও।
এর পর কেটেছে প্রায় দুই দশক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম বেস্টসেলার লেখক বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁকে ছাড়িয়ে যান শরত্চন্দ্র। সেকালের জনসংখ্যা ও শিক্ষার হারের কথা মনে রেখেও বলা যায়, কাটতিতে হুমায়ূন ছাড়িয়ে গিয়েছেন তাঁকেও। হয়তো বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সেরা বেস্টসেলার লেখক তিনিই। অবশ্য গুণ, মান ও শৈলীর বিচার আসছে না এখানে। সে বিচারের জন্য কিছু দিন দেরি করতে হবে আমাদের।
হুমায়ূন সাফল্য দেখিয়েছেন আরও নানা ক্ষেত্রে। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ‘দেশ’-এর পূজা সংখ্যায় তিনি করে নিয়েছেন স্থায়ী আসন। বাংলাদেশের কোনও লেখকের জন্য এ এক বিরল প্রতিষ্ঠা। এতে এই আশা জেগেছিল আমাদের, বাংলাদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের বাজারেও হয়তো বেস্টসেলার হবে তাঁর বই। সে হওয়াটা অসম্ভব কিছু ছিল না, কিন্তু তার আগেই আমরা হারালাম তাঁকে। ফলে এই বিশাল সম্ভাবনা এখন সুদূরপরাহত হয়ে রইলো আমাদের কাছে। কারণ তাঁর শূন্য স্থান আর পূরণ হবে না সহজে।

জননন্দিত হুমায়ূন আহমেদ | মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ্

জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ইন্তেকালে আমি গভীরভাবে শোকাহত। সমগ্র জাতির শোকের সঙ্গে আমার শোক ও অশ্রু মিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যের এক অনন্যসাধারণ দক্ষ রূপকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন গভীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। দুর্ভাগ্য আমার, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় এবং আমার দৃষ্টিশক্তি ও চলত্শক্তি প্রায় রহিত হওয়ায় আমি আমার পরম প্রিয় হুমায়ূন আহমেদের তাঁর শেষ বিদায়ের সময় শোকযাত্রা ও জানাজায় শামিল হতে পারিনি। বাধ্য হয়েই আমাকে গৃহবন্দি অবস্থায় রোগশয্যায় বসে টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁর শেষ যাত্রার দৃশ্যাদি দেখতে এবং শোকাশ্রু বিসর্জন করতে হয়েছে। এদিক থেকে আমি একজন হতভাগ্য ব্যক্তি।
এই শোকবিধুর পরিবেশেও আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠেছে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এবং তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ পাঠ করে আমার অভিভূত হওয়ার এবং গ্রন্থটিকে ‘হৃদয় দিয়ে লেখা’ বলে অভিহিত করার কথা। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রতিভার স্পর্শে এবং সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বহু গ্রন্থের প্রণেতা হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের মনোহরণ করেছেন এবং হৃদয় জয় করেছেন। তিনি হয়েছেন সাহিত্য-শিল্পের একজন অসাধারণ স্রষ্টা; জনপ্রিয় ও জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর এই জনপ্রিয়তা এবং অভাবনীয় সাফল্যের বিষয়ে তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই বোদ্ধা সাহিত্য পাঠক, চলচ্চিত্র দর্শক অনেক কথা বলেছেন। তারা বিভিন্নভাবে হুমায়ূন আহমেদের মূল্যায়ন করেছেন। আমার বিশ্বাস, তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও মূল্যায়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমার পক্ষে হুমায়ূনের সার্বিক মূল্যায়ন বর্তমানে সম্ভব নয়।
আমার কেবলই মনে হচ্ছে, তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘নন্দিত নরকে’র বিষয়ে আমার মূল্যায়নের কথা। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত গ্রন্থটির আলোচনায় আমি শিরোনাম দিয়েছিলাম ‘নন্দিত নরকে হৃদয় দিয়ে লেখা’। আজ মনে হচ্ছে শুধু নন্দিত নরকেই নয়, তিনি তাঁর সব উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটক হৃদয় দিয়েই লিখেছেন। এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি ঢেলে দিয়েছেন তাঁর হৃদয়। লেখা যত কঠিন, হৃদয় দিয়ে লেখা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। তিনি হৃদয় দিয়ে লিখেছেন বলেই পাঠক-দর্শক এবং শ্রোতার হৃদয় হরণ করতে পেরেছেন। কথায় বলে, ‘কলম, কাগজ, মন লেখে তিনজন’ কিন্তু শুধু মন দিয়ে লিখলেই হয় না, হৃদয় দিয়েও লিখতে হয়। হুমায়ূন আহমেদ এ ব্যাপারে অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। ‘নন্দিত নরকে’ গ্রন্থটির আলোচনায় আমি যা লিখেছিলাম তার কিছু এখানে উদ্ধৃত করছি, ‘উপন্যাসের আরেকটি আকর্ষণীয় গুণ এখানে যে মনোবিশ্লেষণের নামে, কিংবা আত্ম-অন্তর্মুখীনতার অজুহাতে বর্ণনায় অতিরেক ঘটিয়ে কাহিনীকে বোরিং করে তোলা হয়নি। সহজ, সাবলীল অথচ প্রাণময় ভাষায় তিনি যথার্থ দ্রষ্টা এবং স্রষ্টার মতো নির্লিপ্ত চেতনায় কাহিনী বিন্যাস করে গেছেন। তাঁর রচনায় এবং কাহিনী বিন্যাসে এমন একটি অন্তর্গত আকর্ষণ আছে, যা মনকে কখনও ক্লান্ত করে না, বরং একাধিক পাঠেও অপরিসীম আনন্দ দেয়। এই হৃদয়বান দক্ষ কথাশিল্পীকে আমরা স্বাগত জানাই।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছি এবং কেবলই মনে পড়ছে হুমায়ূন আহমেদের রচনার কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা। তিনি শুধু একজন সৃষ্টিধর্মী লেখকই নন, বিশেষ করে কথাসাহিত্যে ও নাটকে জনমনের এবং সমগ্র জাতির হৃদয় স্পর্শ করতে হলে কী ধরনের জিনিস রচনায় দেয়া দরকার, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রূপায়ণ ঘটানো অপরিহার্য, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন এবং জাগ্রত সত্তা। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, সাধারণভাবে মানুষ এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের মানুষ স্বদেশপ্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী ও সঙ্গীতপ্রেমী এবং পারলৌকিক জীবন ও সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে অভ্যস্ত। তারা যেমন বর্তমান জীবন সম্পর্কে ভাবেন, তেমনি পরকালের জীবন তথা পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে ভাবতেও অভ্যস্ত। এর পরিচয় প্রায়ই আমরা পাই লোকসাহিত্যে, লোকসঙ্গীতে এবং বিশেষ করে মরমী গানে। হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের সঙ্গে যারা পরিচিত তারা লক্ষ্য করেছেন, এই অসাধারণ কথাশিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার যেমন তাঁর উপন্যাসে নাটকের কাহিনী ও চরিত্রসৃজনের মাধ্যমে পাঠকের মনোহরণ করেছেন, তেমনি তিনি লোকসঙ্গীত, মরমী গান সৃষ্টিকর্মে ব্যবহার করেছেন অনন্যসাধারণ দক্ষতায়। তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচারিত নাটক এবং চলচ্চিত্র, যেগুলো আমি রোগশয্যায় বসে দেখেছি, সেগুলোর জীবনবাস্তবতা এবং সৃষ্টিধর্মিতা যেমন আমাকে কাঁদিয়েছে, তেমনি কাঁদিয়েছে সিনেমায়, নাটকে ব্যবহৃত লোকসঙ্গীত বিশেষ করে মরমী সঙ্গীত। আরেকটি কথা অনেকেই বলেছেন, কিন্তু আমি বিশেষভাবে বলতে চাই যে, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অসাধারণ দক্ষতায় এবং সৃষ্টিধর্মী প্রেরণায় মিডিয়াকে বিশেষ করে টেলিভিশনকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর নাটক ও টেলিফিল্ম প্রচারে প্রায় বাধ্য করে অসাধারণ সাফল্যের পরিচিতি দিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিধর্মিতা যেমন তাঁকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে, তেমনি তাঁর বিশাল জনপ্রিয়তার পেছনে কাজ করেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ব্যবহারের ক্ষমতা। শুধু শিক্ষিত লোকেরাই নয়, শিক্ষাবঞ্চিত লোকেরাও যে তাঁর সৃষ্টিকর্মে মুগ্ধ হয়েছেন, তার একটা বড় কারণ ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অর্থাত্ টেলিভিশন ও সিনেমার মাধ্যমে প্রচারিত তাঁর গল্প-উপন্যাসের কাহিনী।
শিক্ষার অভাবে অর্থাত্ পড়তে না জানার কারণে যারা তাঁর গল্প, উপন্যাস কিংবা নাটক পড়তে পারেননি, তারা টেলিভিশনে এবং চলচ্চিত্রে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং বাস্তবজীবনের রূপায়ণ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ শুধু তাঁর লেখায় দক্ষতার পরিচয় দিয়ে পাঠকের হৃদয় হরণ করেননি, তিনি তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্ম দিয়ে পাঠকহৃদয় হরণ করেছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক তথ্যে জানলাম, তার গ্রন্থসংখ্যা ৩২২টি, বলাবাহুল্য এর বেশিরভাগই উপন্যাস ও নাটক। এই সংখ্যা থেকে তাঁর সৃষ্টিধর্মিতা এবং লেখার সাবলীল ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি সহজেই অনুমেয়। তিনি যে লেখাকে সমগ্র হৃদয় দিয়ে ধারণ করেছিলেন এবং সেই ধারণক্ষমতাকে রচনার মাধ্যমে উত্সারিত করেছেন, তার পরিচয় এই সংখ্যতত্ত্বেও পাওয়া যায়। ৩২২টি গ্রন্থ রচনা এক অসাধারণ সৃজনক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে।
অনেকে বলেন, যারা বেশি লেখেন, তারা খারাপ লেখেন। এ কথা হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি বেশি লিখলেও একটি মান বজায় রেখেছেন। বেশি লেখা, কম লেখা সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি-প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, অনেকের ধারণা, যারা বেশি লেখেন তারা খারাপ লেখেন, কিন্তু আমি বলতে চাই, আমরা যে প্রতিভা নিয়ে জন্মাই তাতে বেশি লিখি বলেই আমরা সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করি। তিনি প্রশ্ন করেছেন—রবীন্দ্রনাথ কি বেশি লেখেননি? তার রচনাবলি তো ২৭ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর এই বক্তব্য স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত। বাংলাসাহিত্যে বহু প্রতিভাবান লেখক আছেন, যারা বেশি লিখেছেন এবং সৃষ্টিক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু সবাই কি হুমায়ূন আহমেদের মতো তিন শতাধিক বই লিখেছেন? এই প্রশ্নের জবাব সাহিত্য সমালোচকরাই দিতে পারেন।
এসব কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিপটে ভেসে উঠল হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুসংবাদের পরবর্তী একটি ঘটনা। সেদিন রাতে দিগন্ত টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছিল মিউজিক আওয়ার নামে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান। তাতে লালনসঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন। সেই সময় এলো হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুসংবাদ। অনুষ্ঠানটি থামিয়ে দিয়ে এর উপস্থাপক মৃত্যুসংবাদটি প্রচার করলেন। কিন্তু তিনি আবেগে এবং শোকে কথা ভালোভাবে সাজিয়ে বলতে পারছিলেন না। তিনি ফরিদা পারভীনকে একটি সঙ্গীত পরিবেশনের অনুরোধ জানালেন। ফরিদা পারভীন লালনসঙ্গীতের একজন প্রখ্যাত গায়িকা। তিনি শোকাহত কণ্ঠে পরিবেশন করলেন জীবন-মৃত্যু সম্পর্কিত একটি লালনসঙ্গীত। শ্রোতাদের তরফ থেকে অনুরোধ এলো একটি বিশেষ লালনসঙ্গীত পরিবেশনের জন্য। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদা গাইলেন লালনের সেই বিখ্যাত গান—খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ‘কমনে আসে-যায়/ ধরতে পারলে মনও বেড়ি দিতাম পাখির পায়। গানটি শুনে আমিও শোকাহত হয়ে গেলাম। আমার দুই চোখ হয়ে উঠল অশ্রুসিক্ত। বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর ভাবনাই তো আমার নিত্যদিনের ভাবনা। কোন দিন আমার জীবনখাঁচার পাখি উড়াল দিয়ে চলে যাবে, তা কি আমি জানি?
ওই দিনের একটি অনুষ্ঠানে জনৈক অধ্যাপককে (দুঃখের বিষয় তার নামটি আমি শুনতে পাইনি) প্রশ্ন করা হয়েছিল—অনেকেই বলেন, হুমায়ূন আহমেদের রচনা কালজয়ী হবে না। আপনি স্যার কী বলেন? অধ্যাপক মহোদয় একটি চমত্কার উত্তর দিলেন—হুমায়ূন আহমেদ কালজয়ী হবেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখন কী করে দেব। এখনও তো হুময়ূনের কাল অতিক্রান্ত হয়নি। আমি তার উত্তরে মুগ্ধ হলাম। তিনি আরও বলেছিলেন, হুমায়ূনের কাল অতিক্রান্ত হলে তবেই বোঝা যাবে, তিনি কালজয়ী কিনা। এখন এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবান্তর।
আমি স্মৃতি থেকে কথাগুলো বললাম। এতে হয়তো সামান্য হেরফের ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু অধ্যাপক মহোদয়ের মূল কথা ছিল এই। হুমায়ূনের জন্যে টেলিভিশনে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে নাটক ও সিনেমার কোনো কোনো শিল্পী বলেছেন, বর্তমানে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘হুমায়ূনের যুগ’ চলছে। কেউ কেউ বলেছেন যেমন রবীন্দ্রযুগ, তেমনি বর্তমান কালটি হুমায়ূনের যুগ।
তাঁর মৃত্যুর পর অগণিত শিক্ষিত ও নিরক্ষর লোক শোকমিছিলে এবং জানাজায় শরিক হয়েছেন। এর পেছনে তাঁর রচনা ও চলচ্চিত্রের স্বাতন্ত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যই কাজ করেছে। হুমায়ূন আহমেদ যে জনপ্রিয় ও জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। বলা আবশ্যক যে, জনপ্রিয় লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা আর জননন্দিত লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে অনেক জনপ্রিয় শিল্পী-সাহিত্যিক আছেন, কিন্তু তারা সবাই জননন্দিত নন। জননন্দিত সেই শিল্পী-সাহিত্যিকই হন, যিনি সর্বস্তরের জনসাধারণের হৃদয় হরণ করেন। নিরক্ষর লোকেরাও যার রচনার দ্বারা মুগ্ধ ও আবিষ্ট হন। এটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের ম্যাজিক। কথাশিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ যেন এই ম্যাজিক করায়ত্ত করেছিলেন। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।
শ্রুতিলিখন : আহমদ বাসির
সূত্র : আমার দেশ

Monday, December 19, 2011

উনিশ শ’ একাত্তর || হুমায়ূন আহমেদ

তারা এসে পড়ল সন্ধ্যার আগে আগে। বিরাট একটা দল। মার্চ-টার্চ কিছু না। এলোমেলোভাবে হেঁটে আসা। সম্ভবত বহুদূর থেকে আসছে। ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ছে একেক জন। ঘামে মুখ ভেজা। ধূলি ধূসরিত খাকি পোশাক।
গ্রামের লোকজন প্রায় সবাই লুকিয়ে পড়ল। শুধু বদি পাগলা হাসিমুখে এগিয়ে গেল। মহানন্দে চেঁচিয়ে উঠল, বিষয় কি গো?
পুরো দল থমকে দাঁড়াল মুহূর্তে। বদি পাগলার হাতে একটা লাল গামছা। সে গামছা নিশানের মত উড়িয়ে চেঁচাল, কই যান গো আপনেরা? এমন অদ্ভুত ব্যাপার সে আগে কখনো দেখেনি।
মেজর সাহেবের চোখে সানগ্লাস। তিনি সানগ্লাস খুলে ফেলে ইংরেজিতে বললেন, লোকটা কি বলছে? রফিকউদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে বলল, লোকটা মনে হচ্ছে পাগল। আমাদের সব গ্রামে একটা করে পাগল থাকে।
তাই নাকি?
জ্বি স্যার।
বুঝলে কি করে এ পাগল?
রফিকউদ্দীন চুপ করে গেল। মেজর সাহেবের খুব পেঁচানো স্বভাব। একটি কথার দশটি অর্থ করেন। বদি পাগলাকে দেখা গেল ছুটতে ছুটতে আসছে। তার মুখ ভর্তি হাসি। রফিক ধমকে উঠল, ‘এ্যাই, কি চাস তুই?’ বদি পাগলার হাসি আরো বিস্তৃত হল। রফিক কপালের ঘাম মুছল। সরু গলায় বলল, লোকটা স্যার পাগল। আমাদের সব গ্রামে একটা করে... ।
এই কথা তুমি আগে একবার বলেছ। একই কথা দু’তিনবার বলার প্রয়োজন নেই।
রফিক ঢোঁক গিলল। মেজর সাহেব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, এ জায়গাটা আমার পছন্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করা যাক। সবাই টায়ার্ড।
মাইল পাঁচেক গেলেই স্যার নবীনগর। খুব বড় বাজার, পুলিশ ফাঁড়ি আছে। সন্ধ্যা নামার আগে আগে স্যার নবীনগর চলে যাওয়া ভাল।
কেন? তুমি কি ভয় পাচ্ছ?
জ্বি না স্যার, ভয় পাব কেন?
মেজর সাহেব দলটির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বললেন। মৃদু সাড়া জাগল। নিমেষের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পড়ল সবাই। মাথা থেকে ভারী হেলমেট খুলে ফেলতে লাগল। মেজর সাহেব নিচু সুরে বললেন, পাগলটাকে বেঁধে ফেলতে হবে।
তিনি কাঠের একটি বাক্সের ওপর বসে পাইপ ধরালেন। খাকি পোশাক পরা কারো মুখে পাইপ মানায় না। কিন্তু মেজর সাহেব অসম্ভব সুপুরুষ। তাঁর মুখে সবকিছুই মানায়।
পাগলটাকে আম গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হল। তার কোনো আপত্তি দেখা গেল না। বরং কাছাকাছি থাকতে পারার সৌভাগ্যে তাকে আনন্দিত মনে হল। কেউ তার দিকে তেমন নজর দিল না। এরা অসম্ভব ক্লান্ত। এদের দৃষ্টি নিরাসক্ত ও ভাবলেশহীন।
মেজর সাহেব পানির বোতল থেকে কয়েক চুমুক পানি খেলেন। বুটজুতা জোড়া খুলে ফেললেন। তার বাঁ পায়ের গোড়ালিতে ফোসকা পড়েছে। রফিক বলল, ডাব খাবেন স্যার? মেজর সাহেব সে কথার জবাব না দিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, আগে আমরা কোনো গ্রামে গেলেই ছোটখাটো একটা দল পাকিস্তানি পতাকা হাতে নিয়ে আসত। এখন আর আসে না। এর কারণ কি জান?
জানি না স্যার।
ভয়ে আসে না। এই গ্রামের সব ক’টি লোক এখন জঙ্গলে লুকিয়ে আছে। ঠিক না?
রফিক জবাব দিল না। বদি পাগলা বলল, এট্টু বোতলের পানি খাইতে মন চায়।
ও কি চায়?
ওয়াটার বটল থেকে পানি খেতে চায় স্যার।
গ্রামের সবাই পালিয়ে গেলেও আজীজ মাস্টার যেতে পারেনি। কারণ সোনাপোতা থেকে তার ছোট বোন এসেছিল। আজ সকাল থেকেই তার প্রসব ব্যথা শুরু হয়েছে। এ রকম একজন মানুষকে নিয়ে টানাটানি করা যায় না। তবু আজীজ মাস্টার দু’বার বলল, ধরাধরি কইরা নাওডাত তুললে শ্যামগঞ্জ লইয়া যাওন যায়। তার জবাবে আজীজ মাস্টারের মা তার কাপুরুষতা নিয়ে কুিসত একটা গাল দিয়েছেন। পা ভাঙা বিড়ালের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আজীজ মাস্টার প্রতিবাদ করেনি। কারণ কথাটি সত্যি। সে বড়ই ভীতু। গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে শোনার পর থেকে তার ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হচ্ছে। সে বসে আছে উঠোনে এবং সামান্য শব্দেও দারুণভাবে চমকে উঠছে।
মাস্টার বাড়িতে আছে?
কেডা?
আমরা। খবর হুনছ? বদি পাগলারে বাইন্দা রাখছে আম গাছে।
হুনছি।
নীলগঞ্জের মুরব্বিদের কয়েকজন শংকিত ভঙ্গিতে উঠে এল উঠোনে।
তোমার তো একটু যাওন লাগে মাস্টার।
কই যাওন লাগে?
দবীর মিয়া তার উত্তর না দিয়ে নিচু গলায় বলল, তুমি ছাড়া কে যাইব? তুমি ইংরেজি জান। শুদ্ধ ভাষা জান।
মিলিটারির কাছে যাইতে কন?
হ।
আমি গিয়া কি করতাম?
গিয়া কইবা এই গেরামে কোনো অসুবিধা নাই। পাকিস্তানের নিশানটা হাতে লইয়া যাইবা। ভয়ের কিছু নাই।
মাস্টার অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। দবীর মিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, কথা কও না যে?
আমি যাই ক্যামনে? বাড়িতে অত বড় বিপদ। পুতির বাচ্চা অইব।
তোমার তো কিছু করনের নাই মাস্টার। তুমি ডাক্তারও না, কবিরাজও না।
মাস্টার ক্ষীণস্বরে বলল, পাকিস্তানের পতাকা পাইয়াম কই?
ক্যান ইস্কুলের পতাকা কি করলা?
ফালাইয়া দিছি।
ফালাইয়া দিছ? ক্যান?
মাস্টার জবাব দেয় না। দবীর মিয়া রাগী গলায় বলে, আইএ পাশ করলে কি হইব মাস্টার, তোমার জ্ঞান-বুদ্ধি অয় নাই। পতাকাটি তুমি ফালাইলা কোন আক্কেলে? অখন কি আর করবা? যাও খালি হাতে।
আমার ডর লাগে চাচাজী।
ডরের কিছু নাই। এরা বাঘও না, ভল্লুকও না। তুমি গিয়া খাতির-যত্ন কইরা দুইটা কথা কইবা। এক মিনিটের মামলা। কি কও আসমত?
নেয্য কথা।
দেরি কইরো না। আন্ধাইর হওনের আগেই যাও।
একলা?
একলা যাওনই বালা। একলাই যাও। তিনবার কুলহু আল্লাহ কইয়া ডাইন পাওডা আগে ফেলবা। পাঁচবার মনে মনে কইবা ‘ইয়া মুকাদ্দেমু’ ভয়-ডরের কিছুই নাই মাস্টার। আল্লাহর পাক কালাম। এর মরতবাই অন্যরকম।
আজীজ মাস্টার মাথা নিচু করে বসে রইল। তার আবার প্রস্রাবের বেগ হয়েছে। ঘরের ভেতর থেকে পুতি কুঁ কুঁ করছে। প্রথম পোয়াতি, খুব ভোগাবে।
ভইনটারে এমুন অবস্থায় ফালাইয়া ক্যামনে যাই?
এইটা কি কথা? তুমি ঘরে থাইক্যা করবাটা কি? বেকুবের মত কথা কও খালি। উঠ দেহি।
আজীজ মাস্টার উঠল।
মেজর সাহেব দীর্ঘ সময় তার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন। অন্ধকার হয়ে আসছে। তার মুখের ভাব ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বসে আছেন কাঠের একটি বড় বাক্সের ওপর। পা দু’টি ছড়ানো। মেজর সাহেব পরিষ্কার বাংলায় বললেন, কি চাও?
আজীজ মাস্টার থতমত খেয়ে গেল। এ বাংলা জানে নাকি? কি আশ্চর্য!
কি চাও তুমি?
জ্বি, কিছু চাই না।
মেজর সাহেব এবার ইংরেজিতে বললেন, কিছু না চাইলে এসেছ কেন?
তামাশা দেখতে? সার্কাস হচ্ছে?
আজীজ মাস্টার ঘামতে শুরু করল। মেজর সাহেবের পরবর্তী সমস্ত কথোপকথন হল ইংরেজিতে। আজীজ মাস্টার বেশিরভাগ জবাবই দিল বাংলায়। তাতে অসুবিধা হল না। মেজর সাহেব বাংলা বুঝতে পারেন।
তুমি কি কর?
আমি এখানকার প্রাইমারি স্কুলের টিচার।
এখানে আবার স্কুলও আছে নাকি?
জ্বি স্যার।
আর কি আছে?
একটা মসজিদ আছে।
শুধু মসজিদ? মন্দির নেই? পূজা হয় যেখানে?
জ্বি না স্যার।
ঠিক করে বল মন্দির আছে কিনা?
নাই স্যার।
মেজর সাহেব পাইপ ধরালেন। ঠাণ্ডা গলায় কাকে যেন পাঞ্জাবি বা অন্য কোনো ভাষায় কি বললেন। সেই লোকটি উঠে এসে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিল আজীজ মাস্টারের গালে। আজীজ মাস্টার চিত্ হয়ে পড়ে গেল। আম গাছের সঙ্গে বাঁধা বদি পাগলা দারুণ অবাক হয়ে বলল, ও মাস্টার উঠ উঠ। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে মেজর সাহেব বললেন, তোমার নাম কি?
আজীজুর রহমান।
আজীজুর রহমান, তোমাদের এদিকে মুক্তিবাহিনী আছে?
জ্বি না।
সবাই পাকিস্তানি?
জ্বি।
বাহ, খুব ভাল। তুমি নিজেও একজন খাঁটি পাকিস্তানি, ঠিক?
জ্বি স্যার।
সবাই পাকিস্তানি হলে এত ভয় কিসের? আমার তো মনে হয়, এ গ্রামের সবাই ভয়ে পালিয়েছে। মেয়েগুলি লুকিয়ে আছে জঙ্গলে, ঠিক না?
আজীজ মাস্টার জবাব দিল না। তার মাথা ঘুরছে। বমি আসছে। বহু কষ্টে সে বমির বেগ সামলাতে লাগল।
তোমাদের কি ধারণা, আমরা তোমাদের মেয়েদের ধরে নিয়ে যাব?
আজীজ মাস্টার চুপ করে রইল।
কি, কথা বলছ না যে? তোমার স্ত্রীও কি জঙ্গলে লুকিয়েছে?
স্যার আমি বিয়ে করিনি।
বিয়ে করনি? বয়স কত তোমার?
চল্লিশ।
চল্লিশ, এখনো বিয়ে করনি? তাহলে চালাও কিভাবে? মাস্টারবেট কর?
আজীজ মাস্টার কপালের ঘাম মুছল। মেজর সাহেব হুংকার দিয়ে উঠলেন, কথার জবাব দাও। রফিকউদ্দীন ক্ষীণ সুরে বলল, স্যার জানতে চাচ্ছেন আপনি হস্তমৈথুন করেন কিনা? বলে ফেলেন ভাই। স্যার রেগে যাচ্ছেন।
করি না।
বল কি? তোমার যন্ত্রপাতি ঠিক আছে? দেখি, পায়জামা খুলে সবাইকে দেখাও তো।
স্যার কি বললেন?
পায়জামা খুলে তোমার যন্ত্রটা সবাইকে দেখাতে বললাম। ঝটপট কর। দেরি করবে না। আমার হাতে বেশি সময় নেই।
আজীজ মাস্টার অবাক হয়ে তাকাল রফিকের দিকে। রফিকউদ্দীন অস্পষ্ট স্বরে বলল, খুলে ফেলেন ভাই। ব্যাটা ছেলেদের মধ্যে আবার লজ্জা কি? খুলে ফেলেন, স্যার রাগ করছেন। মেজর সাহেব নিচু গলায় কি একটা বললেন, একজন এসে হ্যাঁচকা টানে আজীজ মাস্টারের পায়জামা নামিয়ে ফেলল। মেজর সাহেব বললেন, জামাটাও খুলে নাও।
আজীজ মাস্টার দু’হাতে তার লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করতে লাগল। একটা মৃদু হাসির গুঞ্জন উঠল চারদিকে। একজন কে যেন কাগজের দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে মারল আজীজ মাস্টারের দিকে। মেজর সাহেব বললেন, তুমি পাকিস্তানিদের ভালবাস?
জ্বি স্যার।
ভেরি গুড। আমাকেও নিশ্চয়ই ভালবাস। বাস না? বল, বলে ফেল।
বাসি স্যার।
যে তোমাকে নেংটা করে দাঁড়া করিয়ে রেখেছে, তাকেও তুমি ভালবাসছ। তুমি তো বিশ্বপ্রেমিক দেখছি।
মেজর সাহেব অনুচ্চ স্বরে কি একটা বলতেই চারদিকে হাসির বান ডেকে গেল। বদি পাগলা চোখ বড় করে বলল, মাস্টার, তোমার কাপড় কই? এ্যাই মাস্টার।
আজীজ মাস্টার ঘোলা চোখে তাকাল তার দিকে। তার বমি বমি ভাবটা কেটে গেছে। শুধু মাথার পিছন দিকটায় তীব্র ও তীক্ষষ্ট একটি যন্ত্রণা। মেজর সাহেব বললেন, আজীজুর রহমান, তুমি ভয়ে মিথ্যা কথা বলছ প্রাণে বাঁচবার জন্যে। সত্যি কথা বল তোমাকে ছেড়ে দেব, তুমি কি আমাকে পছন্দ কর?
না।
এই তো আসল কথা বেরুচ্ছে। তুমি কি চাও এটা বাংলাদেশ হোক?
জ্বি স্যার।
তুমি তাহলে একজন দেশদ্রোহী। দেশদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। আমি সেই ব্যবস্থাই করতে চাই। নাকি তুমি বাঁচতে চাও?
আজীজ মাস্টার জবাব দিল না।
দেরি করবে না। বলে ফেল বাঁচতে চাও কি-না।
রফিকউদ্দীন ভয়-পাওয়া গলায় বলল, বলেন ভাই বাঁচতে চাই। এ রকম করছেন কেন? শুধু শুধু নিজের বিপদ ডেকে আনছেন।
বদি পাগলা আবার কথা বলে উঠল, ও মাস্টার কাপড় পিন্দ! তুমি নেংটা।
আজীজ মাস্টার নড়ল না। মেজর সাহেব বললেন, কাপড় পর। কাপড় পরে আমার সামনে থেকে বিদেয় হয়ে যাও। ক্লিয়ার আউট।
আজীজ মাস্টার কাপড় পরল না। হঠাত্ একদলা থুথু ফেলল। সেই থুথু মেজর সাহেবের ডান হাঁটুর কাছে এসে পড়ল। মেজর সাহেব চোখ তুলে তাকালেন। চারদিকে কোনো শব্দ নেই। আজীজ মাস্টার এগিয়ে এসে আরেক দলা থুথু ফেলল। সেই থুথু মেজর সাহেবের শার্টে এসে পড়ল। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, যথেষ্ট বিশ্রাম হয়েছে। এবার আমরা রওয়ানা হব।
সৈন্যদল মার্চ করে এগুচ্ছে। মেজর সাহেবের মুখ অসম্ভব বিবর্ণ। পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একজন নগ্ন মানুষ।
সূত্র : আমার দেশ

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ