প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label আলোচনা. Show all posts
Showing posts with label আলোচনা. Show all posts

Sunday, September 9, 2012

আবদুল মান্নান সৈয়দ : আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব | মোহাম্মদ সা'দাত আলী

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০; রবিবার। সকাল ১০টা বা তার কিছু পরে। সেল ফোনে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। ‘‘বাংলা দর্পণ : আলাউদ্দিন আল আজাদ সংখ্যা’’ কুরিয়ারে পাঠিয়েছি বাসার ঠিকানায়। পেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হতে ফোন করেছি। বেশিক্ষণ কথা হয়নি। ফোনালাপের ধরন থেকে প্রতীয়মান হচ্ছিল যেন প্রাণচাঞ্চল্যে কমতি কোথাও। তখনও জানি না, তিনি হৃদয়াক্রান্ত। অন্য সময় ফোন করলে স্বতঃস্ফূর্ত কথা হতো। কিন্তু আজ খুবই সামান্য হল। বললেন : ‘‘পত্রিকাটা পেলে তো আমার স্মরণে থাকতো’’ এটুকুই যেন বলতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। কুশলাদি বিনিময় করে রেখে দিলাম। অসুখের কথা কিছুই বললেন না। একটু পরেই তাঁর বাসা থেকে জেনেছি, স্যারের সামনে এখন আর সবকিছু দেয়া হয় না। ডাক্তারের নিষেধ। তিনি হার্টাক্রান্ত। ঘরের লোক ও ডাক্তার ছাড়া কারও সঙ্গে হালকা আলাপ-সালাপ ছাড়া পড়া নিষেধ। দেখাও বারণ। কারণ, তিনি কথা বলতে চাইতে পারেন।
আমারও মনে হয়েছিল, ব্যাপারটা এমন হতে পারে যে, কুরিয়ারে পত্রিকাটি বাসায় ঠিকই গিয়েছে। স্যার হার্টের রোগী। অফুরান বিশ্রাম দরকার। হার্টে চাপ পড়ে তেমন কাজ করা বারণ। সে-কারণেই পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীগণ সংখ্যাটি হাতে দেনই-নি।
যেদিন থেকে তাঁকে সামনাসামনি চিনি, আমার চোখে আবদুল মান্নান সৈয়দ নিরেট একজন ভাল মানুষ। নিরহংকারী। যে কোন ভালকে তিনি কদর করতে জানতেন। কাউকে প্রাপ্য সম্মান দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য ছিল না তাঁর মধ্যে।
১৯৯৫ বা কাছাকাছি সময়কাল। ‘‘এখন’’ নামক একটি সাহিত্য মাসিকের তিনি প্রধান সম্পাদক। খুব সম্ভব, সে-বছরের আগস্ট সংখ্যা হবে। বোধ করি সেটাই শেষ সংখ্যা। সম্পাদকীয় কিয়দংশ লিখেছিলেন আমাকে নিয়ে। ঐ পত্রিকার এক সংখ্যায় তাঁর অনুরোধে, আমি নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের তালিকা করে দিয়েছিলাম। ১৯০১ থেকে হাল অবধি। সংখ্যাটি বর্তমানে আমার কাছে নেই। বার বার বাসা বদলে কোনভাবে খোয়া গেছে। আরও খোয়া গেছে অনেক লেখা ও পত্রিকার সংগ্রহ।
আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর সৃষ্টির জন্য বোদ্ধা পাঠকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ মতিউর রহমান মল্লিক এইমাত্র কিছু দিন আগে প্রয়াত হয়েছেন। মল্লিক তাঁকে একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন। আমিও করেছি আমার ৩য় কাব্য গ্রন্থ ‘‘লালগালিচা সংবর্ধনা’’।
মাটির পৃথিবীর এটা স্বাভাবিকতা যে, সব মানুষ বিদায় নেবে এমনিভাবে। থেকে যাবে কেবল কৃত্য। গুণ ও কৃত্যে যাঁরা অগ্রগামী, প্রতিভায় যাঁরা সব্যসাচী, মনুষ্যগুণে যাঁরা ঋদ্ধ-সর্বকালেই তাঁরা মনুষ্যসমাজে ও গ্রন্থাদিতে বরেণ্য এবং প্রশংসিত হয়ে থাকবেন।
মতিউর রহমান মল্লিক গেছেন, মান্নান সৈয়দও গেছেন। বছর খানেক আগে (৩ জুলাই, ২০০৯) গেলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। আমিও চলে যাব একদিন। একে একে চলে যাবে সবাই। মৃত্যুর কাছে নিষ্কৃতি নেই কারও। এই অনুভূতি নিয়ে কেবল এতটুকু প্রত্যয় ব্যক্ত করা যেতে পারে যে, সামনের দিনগুলি এবং চলমানতা যেন হয় মসৃণ এবং সহজ আর জীবনময় ভালবাসার।
পবিত্রতার মাস রমযানে বিদায় নিলেন মান্নান সৈয়দ। অনেকেরই এমন আগ্রহ পেশ করা থাকে বিধাতার কাছে। মান্নান সৈয়দ তেমন ভাবতেন কিনা জানি না। সৈয়দের ‘‘সকল প্রশংসা তাঁর’’ কাব্যগ্রন্থটি যদিও তেমন কথা বলে না। তবুও আকাঙ্ক্ষা অনেকের, যদি চির বিদায়টা হয় রমযানে! প্রার্থনা থাকলো বিধাতা সমীপে : ‘আমার বিদায় যেন হয় তেমন এক শুভ দিনে যখন মানুষেরা কেবলি বিধাতার কাছে অবনত'।
আবদুল মান্নান সৈয়দ উভয় বাংলায় সমভাবে আদৃত । তাঁর সৃষ্টিরা এমনই যে, সৈয়দ সাহেবকে স্মরণ না করে উপায় নেই। যেমনি মৌলিকত্ব, তেমনি গবেষণা। কত বরেণ্যকে তিনি সম্মানিত করেছেন। গ্রন্থ রচনা করেছেন। সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন। খুঁজে পেতে এনে মলাটভুক্ত করেছেন অসংখ্য লেখা। কেবল তাঁকেই যেন মানিয়েছে এসব কৃত্যের।

Sunday, September 2, 2012

আমার শিক্ষক হুমায়ূন আহমেদ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক | হাসান আলীম


১.
আমার সৌভাগ্য হুমায়ূন আহমেদ আমার সরাসরি স্যার ছিলেন। এম এস সির পলিমার কেমিস্ট্রি তিনি পড়াতেন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি ক্লাস নিতেন। রসায়নের বিশেষত পলিমার কেমিস্ট্রির ফিজিক্যাল প্রপার্টি পড়াতে ক্যালকুলাস ও ফলিত গণিতের জটিল অঙ্ক ও জ্যামিতিক বিষয়াদির সহায়তা নিতে হয়। অঙ্কের জটিল সমাধানের মধ্যদিয়ে পলিমার রসায়নের বিভিন্ন অবস্থার বিষয় ব্যাখ্যা করতে হয়। স্যার এসব বিষয় অনেক সহজ করে বুঝিয়ে পড়াতেন। এর ফলে আমরা এ বিষয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছি।
হুমায়ূন আহমেদ স্যারও এ বিষয়ে আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন। আমাদের ডিপার্টমেন্টে অনেক ডক্টরেটধারী মেধাবী শিক্ষক ছিলেন কিন্তু  তার মতো অত সুন্দর করে অনেকেই শিক্ষাদান করতে সক্ষম হতেন না।
কাসের কোনো এক সময়ে খোঁজ-খবর নিতেন আমাদের। রাশভারী লোক হলেও তিনি ছিলেন মিশুক এবং বেশ সহজ-সরল। অর্থাৎ তিনি গম্ভীরই ছিলেন তবে যখন কথা বলতেন দ্রুত বলতেন এবং অনেক রসিকতাও করতেন।
আমি কবিতা লিখতাম ছাত্রাবস্থায় পত্র-পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়েছে। মাস্টার্সের ছাত্রাবস্থায় আমার একটি কাব্যগ্রন্থ ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ বের হয়। এ জন্য আমার কাস শেষে  অনেকে কৌতূহল বোধ করতো এবং আনন্দ প্রকাশ করতো। স্যার আমার লেখালেখির কথা জেনে খুশি হন। আমাকে একটু স্নেহের চোখে দেখতে থাকেন। একদিন কাস শেষে তিনি আমাকে মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। তাঁর দুটো গ্রন্থ ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘নিশিকাব্য’ আমাকে উপহার দিলেন। এরপর থেকেই স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। বেশকিছু কাল পরে আমার একটি গল্পগ্রন্থ ‘সোনার খাঁচা’ প্রকাশ পায়। এ গ্রন্থটি স্যারের নামে উৎসর্গ করি।
স্যার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়েছেন। নিবিড়ভাবে লেখালেখি, রাতজেগে উপন্যাস রচনা করা খুব কঠিন। আবার একই সাথে শিক্ষকতা করা বড় দুরূহ ব্যাপার। সাহিত্যের প্রেমে ও নেশায় তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিলেন শেষ পর্যন্ত।
তিনি ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী ও জনপ্রিয় শিক্ষক। কাসে তিনি ছাত্রদের মন জয় করেছিলেন কিন্তু তারচেয়ে বেশি মনজয় করেছিলেন তার পাঠক শ্রেণী।
রসায়নের শিক্ষকতাকালে তিনি ড. শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ছিলেন। হল ক্যাম্পাসের মনোরম আবাসনে তিনি অবস্থান করতেন।
ঢাকা ভার্সিটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যানিকেতন। কিন্তু এই শিক্ষায়তনের শিক্ষকবৃন্দ যে বেতন পান তা দিয়ে খুব আরাম আয়েশে চলা যায় না। ভীষণ হিসাব নিকাশ করে চলতে হয়। সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য তিনি উপন্যাস এবং টিভি নাটক লিখতে শুরু করেন। ‘বিচিত্রার’ কোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তার মেয়েরা রঙিন টিভি দেখতে পায় না। এটা খুব বেদনাদায়ক। ভার্সিটির  শিক্ষক হয়েও তিনি রঙিন টিভি ক্রয় করতে পারছেন না এ জন্যই তিনি নাটক লভেল লিখতে শুরু করেন। এরফলে প্রচুর টাকা পাওয়া যায়। পাঠকেরা তার বই কেনে প্রচুর। বইয়ের কাটতির জন্য প্রকাশকরা তাকে অগ্রিম লাখ লাখ টাকা দিয়ে যায়। টাকা অর্জনই কেবলমাত্র লক্ষ্য ছিল, না তার লক্ষ্য ছিল জনপ্রিয় কথা সাহিত্য রচনা করা। মানুষকে আনন্দ দান করা।
এই ঢাকা শহরে প্রায় ৪০ বছর চলছে আমার। ছাত্রজীবন এবং কর্মজীবন এই দুইয়ের ভেতরে করেছি কাব্য চর্চা। সাহিত্য চর্চা। আমার এ পর্যন্ত ত্রিশের অধিক গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থই অর্ধেকের বেশি। বাকি গদ্যগ্রন্থ অর্থাৎ গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থ, কিছু গল্পগ্রন্থ, কল্পকাহিনী ও কিশোরতোষ রচনা।
হুমায়ূন স্যারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল ছাত্রজীবনে অর্থাৎ মধ্য আশির দশক পর্যন্ত। এরপর কর্মজীবনে চলে যাই ঢাকার বাইরে একটি কলেজে। তারপর আবার ঢাকায় তবে শেষ পর্যন্ত তা ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানে। স্যারের সাথে যোগাযোগ কম হয়ে যায়। এক সময় তা আর দীর্ঘতর হয়নি। কিন্তু তার গ্রন্থের সাথে অল্প বিস্তর যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠতর ছিল টিভি নাটকে, সিরিয়ালে।
২.
হুমায়ূন আহমেদ একদিনেই সম্রাট হুমায়ূন নয়, একদিনেই সাহিত্য সম্রাট নয়। নিজেকে গড়েছেন পরম যতেœ। প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকের’ পর বেশ বিরতি এরপর তীব্রতর আনন্দময় প্রস্ফুটন, উদ্ভাসন, দুই শতাধিক গ্রন্থের গর্বিত জনক। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কথা সাহিত্যিক কী রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, সুনীল, সমরেশ, সঞ্জীবন বুদ্ধদেবগুহÑ সবার ওপরে সবাইকে ছাপিয়ে বড় হয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি কোটি কোটি পাঠক হৃদয়ে।
হুমায়ূন আহমেদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, কল্পকাহিনী, নাটক, টিভি নাটক, ধারাবাহিক নাটক, সিনেমা কাহিনী, গান, প্রবন্ধ, বিজ্ঞানগ্রন্থ রচয়িতা। তাঁর প্রকৃত নাম শামসুর রহমান। ডাক নাম কাজল। লেখক নাম হুমায়ূন আহমেদ। তিনি হুমায়ূন আহমেদ নামেই পৃথিবী খ্যাত হয়েছেন।
তাঁর লেখা ‘আমার ছেলেবেলা’ সূত্রে জানা যায়, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নানার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের দৌলতপুরের শেখ বাড়িতে। এ বাড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন। একই জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরের মৌলভী বাড়ি তাঁর পৈতৃক নিবাস। তাঁর দাদা ছিলেন একজন বড় আলেম। পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। এ নন্দিত লেখকের মায়ের নাম আয়েশা আক্তার খাতুন।  বাবার বদলির চাকরির কারণে কুতুবপুর এবং দৌলতপুরÑ এ দু’জায়গাতেই শৈশব-কৈশোরের অনেক দিন কেটেছে হুমায়ূনের। দাদার বাড়ি এবং নানার বাড়ির বিস্তর বর্ণনা দিয়ে ‘আমার ছেলেবেলা’য় তিনি লিখেছেনÑ ‘আমার শৈশবের সবচেয়ে আনন্দময় সময় হচ্ছে এই দু’জায়গায় বেড়াতে যাওয়া। প্রতি দু’বছর পর পর একবার তা ঘটত। আমার মনে হতো, এত আনন্দ, এত উত্তেজনা সহ্য করতে পারব না। অজ্ঞান হয়ে যাব। আমরা ছুটিতে যাচ্ছি। ছুটিতে যাচ্ছি। ছুটি!’ জন্ম সাল ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর। লাকি থার্টিন। আমার জন্মও ১৯৫৭ সালের ১৩ মার্চ লাকি থার্টিনে। লাকি থার্টিন এ কারণে যে মুহম্মদ (সা.) এর আদ্যাক্ষর ইংরেজি ১৩ নম্বর অক্ষর এম (গ) দিয়ে শুরু। এই প্রিয় ১৩ তারিখে তাঁর জন্ম।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছেÑ নন্দিত নরকে শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিন রাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, মন্ত্রসপ্তক, দূরে কোথাও, সৌরভ, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর, জংশন, বহুব্রীহি, লীলাবতী, কবি, নৃপতি, অমানুষ, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, আমার আছে জল, আকাশ ভরা মেঘ, মহাপুরুষ, শূন্য, ওমেগাপয়েন্ট, ইমা, আমি এবং আমরা, কে কথা কয়, অপেক্ষা, পেন্সিলে আঁকা পরী, অয়োময়, কুটুমিয়া, দ্বিতীয় মানব, ইস্টিশন, মধ্যাহ্ন, মাতাল হাওয়া, শুভ্র গেছে বনে, ম্যাজিক মুনসি, ময়ূরাক্ষী, হিমু, হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম, হলুদ হিমু কালো র‌্যাব, আজ হিমুর বিয়ে, হিমু রিমান্ডে, চলে যায় বসন্তে দিন, আমিই মিসির আলি, যখন নামবে আঁধার ইত্যাদি।
আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বলপয়েন্ট, কাঠপেন্সিল, ফাউন্টেইনপেন, রং পেন্সিল, নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ। চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সার্থক সৃষ্টি শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারি, চন্দ্রকথা, আগুনের পরশমণি ও শ্যামল ছায়া।
হুমায়ূন আহমেদ প্রচুর টিভি নাটক লিখেছেন। এরমধ্যে তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়  টিভি সিরিয়াল এইসব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার প্রভৃতি। এছাড়াও তার অনেক খণ্ড নাটক একাঙ্কিকা, একক নাটক টিভিতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ তার ওপরে কেউ নেই বিশেষত কথা সাহিত্য ও নাটক সিনেমায়। অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ নাটক কথসাাহিত্য তিনি রচনা করেছেন। তিনি আমাদের সমাজকে ফাঁকি দেননি। সমাজ সংসার বাস্তবতা নিয়েই তিনি লিখেছেন। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মুসলিম সমাজের বাস্তবজীবন অত্যন্ত রসালো করে জীবননিষ্ঠ করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার গল্প, নাটক ও উপন্যাসে। তার নাটকের গৃহকর্তাকে দেখা যায় কিনশেভ অথচ মাথায় টুৃপি পরা ভদ্রলোক হিসেবে। কখনও কখনও সমাজপতি বা গ্রাম প্রধানের মাথায় টুপিও দাড়ি রয়েছে যা তাঁর গল্পে সুন্দরভাবে সুন্দর চরিত্রে অঙ্কিত হয়েছে। এ কারণেই আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ হুমায়ূনকে  এভাবে বিপুল আনন্দে গ্রহণ করেছে। অপরপক্ষে হুমায়ূনের আগে টিভি নাটক ও সিনেমায় মুসলিম লেবাস পরা লোকদের ভিলেন ও খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা দর্শক ও পাঠকেরা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।
হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের কথা সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা কত ছিল সবারই জানা। আমাদের দেশে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক সময়ের যে জনপ্রিয়তা ছিল তাকেও হুমায়ূন ছাড়িয়ে গেছেন। হুমায়ূন আহমেদ সত্যিই একজন বড় লেখক। বাংলা ভাষার গর্ব আমি তাই মনে করি।’
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হিন্দু সমাজের ভেদনীতি, বিধবা গঞ্জনা, নারী নির্যাতন, শ্রেণী বৈষম্য প্রভৃতি সমাজ বাস্তব বিষয়ে লিখেছেন। হিন্দু সমাজের নারী সমাজের প্রগতির কথা বলেছেন সাধারণ মানুষের সুখদুখের কথা বলেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। হুমায়ূন আহমেদ তদ্রƒপ লেখক সমাজ কর্তৃক অনাদৃত, অনুল্লেখ্য, বিপুল বিশাল মুসলিম সমাজকে প্রধান উপজীব্য করেছেন। মুসলিম সমাজপতির সমাজ পরিবার সংস্কার ভালো কর্ম করা, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সুখদুঃখ তার লেখায় প্রধান হয়ে ওঠেছে। সাধারণ পাঠকেরা তাদের জীবনের কথা তার লেখার মধ্যে খুঁজে পেয়েছে লেখার কথাগুলো বাক্যগুলো অত্যন্ত তীর্যকভাবে বর্ণনা হওয়ায় পাঠকেরা তা সহজে গ্রহণ করেছে। অত্যন্ত সহজ সরলভাবে অথচ রসে ভরা, দর্শনে ভরা তার লেখা পাঠকেরা  দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস, গল্প ও নাটকে ছিল ধর্মপ্রাণ মুসলিম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সুখদুখের সরস বর্ণনা। কোথাও ভাঁড়ামি, নোংরামি, অশ্লীলতা, মিথ্যা ও অবাস্তবতা ছিল না তার গল্পের চরিত্রগুলোতে। ছিল না ধর্মের প্রতি কটাক্ষ বরং কোথাও কোথাও অত্যন্ত বাস্তবভাবে ধর্মজীবনের আলোকপাত রয়েছে। নর-নারীর প্রেম ভালোবাসাও তার গল্পে স্থান পেয়েছে কিন্তু তাতে নেই অযথা সেক্স ভায়োলেন্স।
তাকে কেউ কেউ অতি আধুনিক ধর্মহীন বলার ফালতু প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন আস্তিক লেখক। তিনি নাস্তিক ছিলেন না। ধর্মকে আক্রমণ করে কিছু লেখননি। মুক্তিয্দ্ধু নিয়ে তিনি অতিবাস্তব উপন্যাস রচনা করেছেনÑ সেখানে তিনি ধর্মকে আঘাত করেননি।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অশ্লীল লেখক হুমায়ুন আজাদ আক্রমণের শিকার হলে তখন তিনি ১৮ জুলাই ২০০৮ সালে দৈনিক সমকালের সাথে এক সাাৎকারে বলেছেন, ‘যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সম্পর্কে তিনি বলেন ওনাকে কেউ তো খুন করেনি। উনিতো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ওনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহী কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তার বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহিতা মামলা হয়নি। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটিই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, পুরোটাই ছিল একটা সাজানো খেলা।
‘সমাজ ও রাজনীতি’ অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও রাজাকার বিষয়ক একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছেন তাদের মধ্যে আমার নানাও একজন, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেছেন। আমার এই নানার মতো, মামার মতো ভদ্রলোক পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত এত পরিপূর্ণ ভদ্রলোক এই জীবনে দেখিনি। আমার নানা একটি আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছেন। একটি পূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন। কারণ বড় হওয়ার সময় এই অঞ্চলের হিন্দুদের দ্বারা প্রচণ্ড নির্যাতিত হয়েছিলেন। কোনো মিষ্টির দোকানে গেলে তাদের প্লেটে করে মিষ্টি দেয়া হতো না। তারা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাদের হাতে দেয়া হতো। এটা শুধু মুসলমানদের সঙ্গেই না, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গেও করতো। এটা ছিল হিন্দুদের কাস্ট সিস্টেম। এসব দেখে দেখে সে সময়ের মুসলমানরা বড় হয়েছেন এবং তাদের মনে হয়েছে একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। অনেক যুদ্ধের পর তারা তা পেয়েছেন। যখন তারা দেখলেন চোখের সামনে দিয়ে সেই রাষ্ট্র ভেঙে যাচ্ছে, তখন তারা মনে করেছেন আবার হিন্দু রাজত্ব শুরু হয়ে যাবে। তখন পাকিস্তানকে সাপোর্ট করা শুরু করেন। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির অন্যায়গুলো ক্রমেই চোখে পড়তে থাকে। তারা দেখলেন পাকিস্তানি আর্মিরা তো কেবল হিন্দু মারছে না, সমানে মুসলমানদেরও খুন করছে। আমার নানা দেখলেন, তার অতি আদরের বড় মেয়ের পুলিশ অফিসার স্বামীকে (আমার বাবা) বেঁধে নিয়ে আর্মিরা গুলি করে মেরে ফেলল। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কী হচ্ছে এসব? কোন দিকে যাবেন? তিনি কি পাকিস্তান আর্মির সঙ্গেই থাকবেন , নাকি কমন যে স্রোত আছে তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন? এই নিয়ে কনফিউশন তৈরি হলো তার মধ্যে। তিনি এই কনফিউশন দূর করতে পারলেন না। এ েেত্র তার যেমন দোষ ছিল, আমাদেরও ছিল। কারণ আমরা তাদের বোঝাতে পারিনি, কনফিউশন দূর করাতে পারিনি। তিনি মারা গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। এখন আমরা তাকে মা করব কি করব না সেই প্রশ্ন। শেখ মুজিব সাহেব তাদের মা করে দিয়েছেন। আমি মার পপাতী। (মাহফুজ আহমেদ, ঘরে-বাইরে হুমায়ূন আহমেদ হাজার প্রশ্ন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৯৪. পৃ.৩১-৩২)
হুমায়ূন আহমেদ একজন বিশ্বাসী এবং ঐতিহ্যবাহী ছিলেন। আমার এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যাবে ফিরোজ এহতেশাম, হুমায়ূন আহমেদের সে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তা থেকে।  ফিরোজশাহ এহমেশাম : ঈশ্বর বিষয়ে আপনার ভাবনা কী? আপনি তো ঈশ্বরে বিশ্বাসী, আস্তিক?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ। আচ্ছা বলো ঈশ্বর কি আছে? লজিক বলে যে নেই। তবে লজিকের অসম্ভব ক্ষমতা। যে কোনো লজিকের বিপক্ষে তুমি আরেকটি লজিক দাঁড় করাতে পারো। আমাকে এসে একদিন একজন বলল যে, স্যার, সুনামি হইল, এতোগুলো মানুষ মারা গেল, ছেলেমেয়ে বাচ্চা-শিশু এরা তো কেউ কোনো পাপ বা অপরাধ করে নাই। এরা যে মারা গেল তার দায়দায়িত্ব তো তাহলে সম্পূর্ণ আল্লাহপাকের, যদি আল্লাহ থেকে থাকে, আমাদের তো দায়দায়িত্ব না। লজিক স্ট্রং না?
ফিরোজ এহতেশাম : হ্যাঁ, মোটামুটি স্ট্রং, লজিক ...
হুমায়ূন আহমেদ : এই লজিকের বিপক্ষে আরেকটা লজিক দাঁড় করানো যেতে পারে। আমি তাকে বললাম, মনে করো তুমি একটি বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছো আনমনে তুমি যখন যাচ্ছ, তখন তোমার পায়ের নিচ দিয়ে দুই সারি পিঁপড়া যাচ্ছে, তাদের কারো মুখে ডিম, কারো মুখে বাচ্চা। তুমি তাদের পিষে চলে গেলে, জানলেও না। পিঁপড়াগুলো ভাবল, একি ঘটল। আমাদের তো কোনো দোষ নেই, কে আমাদের শত শত বাচ্চা মেরে চলে গেল। ঘটনা একই।
মনে কর তুমি মঙ্গলগ্রহে গিয়ে পাহাড় পর্বতের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা ক্যামেরা কুড়িয়ে পেলে। পেয়েই তোমার মনে হবে এটার একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। এই আপনাআপনি সৃষ্টি হয়নি। তুমি অবাক হলে। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলে একটি খরগোশ। এই খরগোশের যে চোখ তা ওই ক্যামেরার চোখের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন। তখন তোমাকে এই খরগোশেরও যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছে, তা স্বীকার করতে হবে।
ফিরোজ এহতেশাম : আচ্ছা লজিকের খাতিরেই যদি বলি, আপনি বললেন যেসব সৃষ্টিরই একজন সৃষ্টিকর্তা আছে। লালনের একটা কথা আছে যে সব সৃষ্টি করছে তারে সৃষ্টি কে করেছে? আপনি কী বলবেন?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ, আরজ আলী মাতুব্বরও এমন বলেছে। সব কিছুরই যদি ক্রিয়েটর থাকে, তাহলে বেসিক কোয়েশ্চেন, ক্রিয়েটরের ক্রিয়েটর কে? বিগব্যাং থেকে পৃথিবীর শুরু সব কিছু শুরু। তাহলে বিগ ব্যাংগের আগে কী ছিল?
ফিরোজ এহতেশাম : এটা তো এখনো জানা যায়নি।
হুমায়ূন আহমেদ : লজিক দেই, লজিক দিলে টের পাবে। একটা পিঁপড়া তো যথেষ্ট পরিমাণে জ্ঞানী। এরা চাষ করে, এরা গরু পালে, এদের সোসাইটি আছে, সেনাবাহিনী আছে, এরা বাড়িঘর তৈরি করে। এরা হাইলি ডিসিপ্লিনড, আমরাও তাই। আমাদের পক্ষে কি সম্ভব পিঁপড়াকে আমাদের ফিজিক্স কেমিস্ট্রি, ম্যাথ শেখানো? সম্ভব না। ডিফারেন্সটা হচ্ছে জ্ঞানের লেভেলের। ওরা যে ফিজিক্স  কেমিস্ট্রি, ম্যাথ নিয়ে এসেছে তা নিয়েই ওরা থাকবে। আমরা আমাদেরটা হাজার চেষ্টা করেও তাদের শেখাতে পারব না। যদিও আমরা তাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি উন্নত। তেমনি ঈশ্বরও এতই ওপরের স্তরের যে তার সঙ্গে কোনোক্রমেই কমিউনিকেট করা সম্ভব না। মাঝে মধ্যে উনি শুধু পয়গম্বরদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেটের চেষ্টা করেন।
ফিরোজ এহতেশাম : এই মুহূর্তে আপনার কি কোনো ঘটনা মনে পড়ছে, যা আপনাকে বেশ আনন্দ বা তৃপ্তি দিয়েছিল?
হুমায়ূন আহমেদ : আমি যখন পিএইচডির শেষ পর্যায়ে। তখন আমার কাছে খ্রিস্টান পাদ্রিরা আসতে শুরু করল। তারা মনে করল, একজন বিধর্মীকে ওদের ধর্মে নিয়ে গেলে ওদের জন্য সুবিধা। আমি দেখলাম, ওরা প্রচুর পড়াশোনা করে, জানে। ওদের ধর্ম বিষয়ে যেমন ওরা প্রচুর জানে, আমাদের ধর্মবিষয়ে তেমনি। আমি আমাদের প্রফেটকে হাইলাইট করার জন্য এক পাদ্রিকে বললাম যে, শোন আমাদের প্রফেট ছিলেন এমনই একজন মানুষ, তিনি যখন কারো  সঙ্গে কথা বলতেন, তখন সরাসরি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। তিনি যার সঙ্গে কথা বলতেন, তার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে বলতেন না, তিনি পুরো বডিকে তার দিকে টার্ন করতেন, যাতে সে মনে করে তাকে ফুল অ্যাটেনশন দেয়া হচ্ছে।
 শুনে পাদ্রি বললেন, দেখুন স্পল্ডিলাইটিস বলে একটা ডিজিজ আছে, যে ডিজিজ ঘাড়ের চামড়া শক্ত হয়ে যায়, আপনাদের প্রফেটের ছিল স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ। উনি ঘাড় ফিরাইতে পারতেন না বলে পুরো শরীর অন্যের দিকে ফেরাতেন। তাহলে তোমার একটা ডিজিজকে হাইলাইট করছে কোন দুঃখে? হঠাৎ করে আমার মনটা এমনই খারাপ হলো যে ভাবলাম, আসলেই তো, একটা ডিজিজের জন্য তিনি এটা করতেন বলে আমরা এটাকে মানছি। তখন গড আমাকে হেল্প করলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে একটা লজিক দিয়ে দিলেন এবং লজিকটা আমার তাৎক্ষণিকভাবে আসা। পাদ্রি তখনো ওখানে বসা, চা খাওয়া শেষ করেননি। আমি বললাম, আপনার কথাটা ভুল। আমাদের নামাজ পড়ার একটা সিস্টেম আছে। সিস্টেমে মাথা ফিরাইতে হয়। আমাদের প্রফেটের যদি স্পন্ডিলাইটিস ডিজিজ থাকতো, তাহলে তিনি পুরো শরীর ফেরাবেন, উনি তো তা করেননি। তার এই ডিজিজ ছিল না, তিনি যেটা করতেন, তা শ্রদ্ধার জায়গা থেকে করতেন।
তারপর আমি তাকে বললাম, আমি কিন্তু ঈসা (আ.) সম্পর্কে এ জাতীয় কথা বলিনি। তিনি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং বললেন, তোমার লজিক খুব পরিষ্কার, আসলেই তো তোমরা নামাজের সময় দুই দিকে মাথা ঘোরাও।
ফিরোজ এহতেশাম : আর কোনো ঘটনা?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ, আরেকবার এভাবেই আমি জয়ী হয়েছিলাম নিউইয়র্কে। সেখানে আমাকে একজন বলল, তোমরা তোমাদের মেয়েদের বোরকার ভেতর ঢুকিয়ে হিজাব-টিজাব পরিয়ে ছেড়ে দিয়েছ সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পারনি। আমি বললাম, তোমরা যখন তোমাদের মেয়েগুলোকে হিজাব পরিয়ে বাইরে পাঠাও, তখন অত্যন্ত সম্মান করো। আর আমাদের মেয়েগুলো হিজাব পরলে এত রাগ করো কেন? সে রেগে গেল আমরা আমাদের মেয়েদের হিজাব পরিয়ে পাঠাই মানে! আমি বললাম, কেন, তোমাদের নানদের দিকে তাকিয়ে দেখ। তাদের ড্রেস আর আমাদের হিজাব পরা মেয়েদের ড্রেসের মধ্যে কোনো বেশকম আছে? তাকে একমত হতে হলো যে নানদের ড্রেসের সঙ্গে হিজাব পরা মেয়েদের ড্রেসের কোন পার্থক্য নেই।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস সমূহের প্রধান চরিত্র এবং উপরোক্ত সাক্ষ্যৎকারের মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট যে তিনি আস্তিক্যবাদী প্রগতিশীল কথাশিল্পী।
আস্তিকতা হুমায়ূনের উপন্যাসকে জীবন্ত এবং বাস্তবমুখী করে তুলেছে। কথাসাহিত্যিক এবং আস্তিক্যবাদী অথবা আস্তিক্যবাদী কথাসাহিত্যিক আমাদের দেশে পূর্বেও ছিলেন এবং এখনও আছেন তবে তাঁরা এতটা সুখ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। যতটা হুমায়ূন পেরেছেন। এখানে হুমায়ূনের লেখার যোগ্যতা, পাঠক নন্দিত বাক্যরচনা এবং গল্পলেখার নতুনত্বই তাকে শিখরে তুলেছে।
হুমায়ূন আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ। কলকাতার এক স্মরণসভায় প্রখ্যাত উপন্যাসিক শঙ্কর বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু তার বেশ কয়েকটি লেখা আমি পড়েছি। লেখাগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, তিনি বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তার জীবদ্দশায় তিনি রবীন্দ্র, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎ চন্দ্রের পাশে স্থান করে নিয়েছিলেন’।
হুমায়ূনের মৃত্যুর পর তিনি আরো মহীয়ান আরো বড় হয়ে ওঠেন। তার মৃত্যুতে যে লাখ লাখ লোকের জানাজা তা এ দেশে একমাত্র নজরুলের জানাজা ছাড়া অন্য কোনো লেখকের বেলায় দেখা যায়নি। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় ১৪-১৫ দিন পর্যন্ত অনবরত লিখছে। সব ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে তাকে বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রায় সপ্তাহখানেক স্মরণ করেছে। তাঁকে দেশের পক্ষ থেকে ‘জাতীয় কথাশিল্পী’র মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা উচিত ছিল অন্তত তিনি একজন শহীদ পিতার সন্তান এবং ‘জোছনা জননীর গল্প’-এর মত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাসের স্রষ্টা। এর পিছনে কি হীনম্মন্যতার দেয়াল তা তাঁর পাঠক ভক্তরা জানে না। ভারতের পশ্চিম বাংলার বাংলা পত্র-পাত্রিকা এবং টিভিগুলোতে তার মৃত্যুতে আশ্চর্য নীরবতা পালন করেছে।
কোলকাতার এ আচরণ সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘শরৎচন্দ্রের পর হুমায়ূনের জনপ্রিয়তায় দুই বাংলার সাহিত্যিকরা ভ্রু কোঁচকাবেন। তার বই বের হলে একবারে ২৫ হাজার কপি নিমেষে শেষ হয়ে যেতো। এ জনপ্রিয়তার কারণ, রিকশা চালক থেকে উচ্চপদের আমলা সবার হেঁসেলে প্রবেশ করার ক্ষমতা ছিল তার।
আরেক লেখক বলেছিলেন হুমায়ূনের লেখায় মামি, চাচি, খালা, ফুপু,আম্মা ইত্যাদি শব্দ থাকতো যার কারণে আমাদের এখানের পাঠকরা তাকে অবহেলা করেছে। আমাদের এ দেশের পাঠকেরা অতিমাত্রায় মৌলবাদী। কারণ বাংলাদেশের পাঠকেরা আমাদের লেখা ফেলে রাখে না যদিও আমাদের লেখায় খুড়ো, পিশি, মাসি, কাকাবাবু বৌদি ইত্যাদি শব্দ থাকে।
সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে হুমায়ূন। তিনি বাংলা ভাষাভাষী ৫০ কোটি মানুষের কেবল লেখক নন। তার লেখা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাকে পৃথিবীর মানুষ শ্রদ্ধা করছে তার এ প্রাপ্য দিনে দিনে আরো বাড়তে থাকবে।
হুমায়ূন চলে গেছেন আমাদের কথাসাহিত্যকে উজ্জ্বল করে দিয়ে তবে তার দ্রুত চলে যাওয়ায় আমাদের সাহিত্যে এক বিরাট ঘাটতি দেখা দেবে। গঙ্গার পানি এখানে এতদিন তাঁর জন্য প্লাবন সৃষ্টি করতে পারেনি পদ্মার ফুলে উঠায় পশ্চিমের পানি প্রবেশ সাহিত্যের অনুপ্রবেশ ঠেকে গিয়েছিল।
হাজার বছরের এ শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের অবদান আমাদেরকে মহিমান্বিত করেছে সাহিত্যের রাজধানী ঢাকাকে বিশ্বকেন্দ্রে সংযুক্ত করেছে।                           
লেখক : কবি

Thursday, August 2, 2012

কিশোর কাননে নজরুল | মোশাররফ হোসেন খান

আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ সালে।  তিনি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেছেন। কী অসাধারণ প্রতিভাবান এক উজ্জ্বল পুরুষ। কী কবিতায়, কী গদ্যে, কী শিশুতোষ রচনায়Ñ সকল েেত্রই তিনি ছিলেন সফল। নজরুলের তুলনা এই উপমহাদেশে কেন, গোটা বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। আজকে আমরা এই মহান কবির কিছু শিশুতোষ কবিতার সাথে পরিচিত হব। দেখবো, তিনি কী অপরিসীম দরদ দিয়ে লিখে গেছেন আমাদের জন্য কত বিচিত্র ধরনের কবিতা। নজরুলের এ ধরনের কবিতার নাম করতে গেলেই প্রথমে মনে পড়বে তার ঝিঙে ফুল কবিতাটির কথা। কী চমৎকার শব্দ আর ছন্দে হেলে দুলে চলেছে কবিতাটি। ঠিক যেন নদীর ঢেউয়ের ওপর দিয়ে বয়ে চলা ফিরফিরে বাতাসের দোলা। কখনো মনে হয়, বহুরাঙা একটি আশ্চর্য ক্যানভাস। যেখানে সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক দৃশ্য আছে, আছে আকাশ আর নানা বর্ণের ফুল ও পাখির মেলা। কী চমৎকার উচ্চারণে :

ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল!

সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে কুল

                                 ঝিঙে ফুল।
                    গুল্মে পর্ণে
                    লতিকার কর্ণে
                    ঢলঢল স্বর্ণে
                    ঝলমল দোলে দুল-
                                  ঝিঙে ফুল।


পাতার দেশের পাখি বাঁধা হিয়া বোঁটাতে,
গান তব শুনি সাঁঝে তব ফুটে ওঠাতে।

                     পউষের বেলা শেষ
                     পরি’ জাফরানী বেশ
                     মরা মাচানের দেশ
                     করে তোল মশগুল-
                                    ঝিঙে ফুল।

আবার নজরুল ইসলামের খুকি ও কাঠবেরালি কবিতায় দেখি অন্য রকম মজা। এ যেন কবিতা নয়, নাটকের খেলা। এর প্রতিটি পঙক্তিতে ছড়িয়ে আছে শিশু মনের স্বপ্ন, আকাক্সা আর সংলাপ। আনন্দ, বেদনা, চাওয়া আর শিশু সুলভ খুনসুটিও আছে এখানে। ওই যেÑ

ডাইনী তুমি হোঁৎকা পেটুক,
খাও একা পাও যেথায় যেটুক।
বাতাবি লেবু সকলগুলো
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
কিংবা-
পেয়ারা দেবে? যা তুই ওঁচা!
তাইতে তোর নাকটি বোঁচা!
হুতমো-চোখী! গাপুস গুপুস
একলাই খাও হাপুস হুপুস!

পেটে তোমার পিলে হবে! কুড়ি-কুষ্টি মুখে!
হেই ভগবান! একটা পোকা যাস পেটে ওর ঢুকে!
ইস! খেয়োনা মস্তপানা ঐ সে পাকাটাও!
আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও।

প্রথম, এই প্রথমই আমরা কেবল নজরুলের কবিতাতেই এ ধরনের নতুন শব্দ, উপমা আর নাটকীয় দৃশ্য উপভোগ করলাম। শিশুতোষ কবিতাÑতাও যে কত বিচিত্র ধরনের, বিচিত্র ঢঙ-এর হতে পারে, তা নজরুলের কবিতা পড়লেই কেবল বুঝা যায়। তার কবিতায় রসিকতাও আছে। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপও আছে। দুষ্টুমিও আছে বৈকি! খোকার খুশিটা সামনে রাখি একটু!-
সত্যি, কও না মামা,
আমাদের অমনি জামা
অমনি মাধায় ধামা
               দেবে না বিয়ে দিয়ে?
মামী মা আসলে এ ঘর
মোদেরও করবে আদর?
বাস, কি মজার খবর!
              আমি রোজ করব বিয়ে।
মায়ের সাথেও তার দুষ্টুমির শেষ নেই। যেমন-
 অ মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং?
খ্যাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা-নাক ডেঙাডেং ড্যাং।

 ওঁর নাকটাকে কে কবল খ্যাঁদা র‌্যাঁদা বুলিয়ে?
চামচিকে-ছা বসে যেন ন্যাজুড় ঝুলিয়ে!
বুড়ো গরুর টিকে যেন শুয়ে কোলা ব্যাং!
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙাডেং ড্যাং!
               [ খাদু-দাদু]
আবার এই নজরুলই দিদির বে’তে খোকার চোখের পানি আর বুকের কষ্টকে বাড়িয়ে তুলেছেন শতগুণে। কী অভূতপূর্ব এক হৃদয়স্পর্শী উচ্চারণ :
মনে হয়, মণ্ডা মেঠাই
খেয়ে জোর আয়েশ মেটাই!-
ভাল ছাই লাগছে না ভাই,
           যাবি তুই একেলাটি!

দিদি, তুই সেথায় গিয়ে
যদি ভাই যাস ঘুমিয়ে,
জাগাব পরশ দিয়ে
         রেখে যাস সোনার কাঠি।

যে নজরুল মায়ের সাথে দুষ্টুমি করলেন, সেই নজরুলই আবার মাকে নিয়ে লিখলেন হৃদয় কাঁপানো এক বিখ্যাত কবিতা। নজরুলে ছাড়া এমন উচ্চারণ আর কোথায় আছে?Ñ

যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনখানে কেহ পাইবে না ভাই!

       হেরিলে মায়ের সুখ
      দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
       মায়ের শীতল কোলে
       সকল যাতনা ভোলে
 কতনা সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।
             [মা]

মাকে আমরা প্রচণ্ড ভালোবাসি। ভালোবাসতেন নজরুলও। তাইতো তার কবিতায় ঘুরে-ফিরে মা এসেছেন-একেকভাবে, বিচিত্র অথচ বর্ণাঢ্য ভঙ্গিতে। খোকার বুদ্ধিতে মা আছেন। মা আছেন খোকার গপ্প বলাতেও। কিন্তু লণীয় বিষয় বটে, শিশুতোষ কবিতায় নজরুল যে পরিমাণ নতুন শব্দ, উপমা, সংলাপ আর নটাকীয়তা সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, আর কোনো কবির মধ্যে তেমনটি নেই। তার লিচুচোর, হোঁদল-কুঁৎকুঁতের বিজ্ঞাপন, ব্যাংফুলী, পিলে পটকা, চিঠি, প্রভৃতি কবিতাতেও এর স্বার রয়ে গেছে।

কাজী নজরুল ইসলাম ছোটদেরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তার ছিল ভালোবাসার মত একটি বিশাল হৃদয়। সাগরের মত। উদার আকাশের মত। সেই হৃদয়ে ছোটরা বাস করতো, হাসতো, খেলতো, মজা করতো আর দুলে উঠতো স্বপ্নদোলায়।

হ্যাঁ, নজরুলই তো ছোটদেরকে স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছেন এভাবে :
থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে দেখবো এবার জগৎটাকে,-
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে!
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে,
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ্ব-জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।
কিংবা-
আমরা শক্তি আমরা বল
             আমরা ছাত্রদল,
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
          ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।
                 আমরা ছাত্রদল ॥

মোদের আঁধার রাতে বাধার পথে
                    যাত্রা নাঙ্গা পায়,
আমরা শক্ত মাটি রক্তে রাঙাই
                বিষম চলার ঘায়।
যুগে যুগে রক্তে মোদের
          সিক্ত হল পৃথ্বিতল ॥
          আমরা ছাত্রদল ॥

নজরুল, কবি নজরুল ইসলাম ছোটদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সামনে চলার সাহস দেখিয়েছেন। তাদেরকে বুকে টেনে নিয়েছেন বড় মমতায়। কিশোর কাননে নজরুলের উপস্থিতি আর অবস্থান একজন প্রকৃত দরদী অভিভাবকের মতই। এজন্য তিনিও আমাদের হৃদয়ে মিশে আছেন গভীর শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়। তিনি যে আমাদের কাছের কবি, হৃদয়ের কবি, আপন কবি পরম প্রিয়।

Tuesday, January 10, 2012

বদরুদ্দীন উমর নতুন ও সাহসী চিন্তার লড়াকু পুরোধা || হাসান শান্তনু

কাল মার্কস বলেছিলেন, ‘এতদিন দার্শনিকেরা শুধু জগেক নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো তাকে পরিবর্তন করা।’ মার্কসের চিন্তা-ভাবনার প্রচারক ও প্রয়োগপ্রয়াসী বদরুদ্দীন উমর তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন, ‘জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাকে আমি ফেলে দিইনি। প্রত্যেক অভিজ্ঞতা আমার চিন্তা, চেতনা, উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করেছে। আমি জীবনে দ্রুত পরিবর্তিত হইনি। আমার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে ধীরে ধীরে। মনে হয় পরিবর্তনের এই ধীর গতিই আমার চিন্তা-চেতনার ভিত্তি মজবুত করেছে।’
যাঁর জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ আর মানুষের মুক্তির রাজনীতির মধ্যে কোনো প্রাচীর নেই, বরং একটি অন্যটির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য—তিনি বদরুদ্দীন উমর।
বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন জীবনভর। মার্কসের শ্রেণীসংগ্রামের চিন্তা নিয়ে পার করছেন জীবনের সব দিন। এটাই তাঁর জীবনের অন্যতম দিক। তিনি জানতেন, এ গন্তব্য বন্ধুর ও বিরুদ্ধ। তবে বিশ্বাস করতেন, মেহনতি মানুষ পরিবর্তন চায়। প্রতিভার কাজ এ চাওয়াকে সুসংগঠিত করা। লেনিন যেমন করেছিলেন রাশিয়ায়, মাও করেছিলেন চীনে, ফিদেল ক্যাস্ট্রো করেছিলেন কিউবায়। শোষণ-নিপীড়ন, বৈষম্য, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে বদরুদ্দীন উমরের ক্ষুরধার লেখা সমাজ-অধিপতিদের চিন্তাকে বিরতিহীনভাবে মোকাবিলা করে আসছে সেই ষাটের দশক থেকে। তিনি উপমহাদেশে বাংলা ভাষায় মার্কসবাদী সাহিত্য উপস্থিত করার অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। ইংরেজিতে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রেণীসংগ্রাম আর বাংলাদেশের অভ্যুদয়সহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন উপমহাদেশ তথা বিশ্বের কাছে। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম সেরা কলামিস্ট।
ষাটের দশকে তাঁর অনেক লেখা বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথ দেখিয়েছিল। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজ, শিক্ষিতদের সক্ষম করে তোলে আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে আত্মোপলব্ধিতে। স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি নতুন ও সাহসী চিন্তার পুরোধা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে অসংখ্য কিশোর-তরুণের মধ্যে নতুন দেশ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন ক্রমে ক্রমে ভাঙছিল, যারা নতুন পথ অনুসন্ধান করছিলেন, তাঁর চিন্তা ও সক্রিয়তা সেই তারুণ্যকে দেয় নতুন পথের সন্ধান। তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের একজন। একজন রাজনৈতিক সমালোচকও। দেশ-বিদেশের দৈনিকগুলোতে সাহসী কলাম লিখে অর্জন করেছেন ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবীর বিরল সম্মান।
ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি এদেশের তরুণ সমাজকে নাড়া দেন ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ বই দু’টির মাধ্যমে। তার ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি’ বইটি শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে শ্রেষ্ঠতম গবেষণা। আহমদ ছফা বইটি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আর কিছু দরকার নেই, উমর যদি জীবনে আর কিছু নাও করতেন, তবুও এ বইয়ের জন্যই তিনি বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় থাকবেন।’ তবে এরপর তিনি আরও অনেক কাজ করেছেন। এখনও করছেন। তাঁর লেখা ‘বাঙালী মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ বইটি ভাষা আন্দোলনের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। দুই খণ্ডে লেখা হয় তার ‘ইমারজেন্স অব বাংলাদেশ’ বইটি দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। দেশের ইতিহাস নিয়ে এ পর্যন্ত বেশিরভাগ বই লেখা সংকীর্ণ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, যা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, যার বেশিরভাগই লেখা হয়েছে উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কৃতিত্বকে বড় করে দেখে। বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস সেখানে ভিন্ন। তিনি লিখেছেন সত্যনিষ্ঠ সতর্কতার সঙ্গে। এ ইতিহাসবিদের লেখায় গুরুত্ব পেয়েছে শ্রেণী সম্পর্ক। মার্কস যেমনটা বলেছিলেন, ‘মানবসভ্যতার ইতিহাস হলো মূলত শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস।’ বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন রকমের ব্যাপক মাত্রায় প্রাথমিক উত্স ব্যবহার, যা তাঁর ইতিহাসকে করেছে গ্রহণযোগ্য, সত্যনিষ্ঠ, সমৃদ্ধ। ‘ইমারজেন্স অব বাংলাদেশ’ বইটির প্রথম খণ্ডে চল্লিশটি অধ্যায়ে অছে ১৯৪৭ থেকে ’৫৮, আর দ্বিতীয় খণ্ডের ৫৯টি অধ্যায়ে আছে ’৫৪ থেকে ’৭১ সালের ইতিহাস।
ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখে তিনি পড়েন আইয়ুব-মোনেম সরকারের রোষানলে। তখন উপলব্ধি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে বেশি দূর কাজ করা অসম্ভব। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষু থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রত্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দেন ’৬৮ সালে। যুক্ত হন সক্রিয় রাজনীতিতে। পরে সুযোগ, আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকতা বা অন্য কোনো পেশায় না গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস অনুসন্ধান আর এর ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ভবিষ্যত্ নির্মাণে রাজনৈতিক ভূমিকা পালনে আজীবন একনিষ্ঠ আত্মনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর তিনি এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে ফের সংগঠিত করা আর সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মাসিক ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ‘লেখক শিবির’-এরও নেতৃত্ব দেন। ‘সংস্কৃতি’ প্রথম প্রকাশিত হয় ’৭৪ সালে। কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পরই জরুরি অবস্থা ও সব পত্রিকা নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে ‘সংস্কৃতি’ বন্ধ হয়ে যায় ’৭৪ সালের ডিসেম্বরে। ’৮১ সালে আবারও প্রকাশনা শুরু হয়। তাঁর আরও লেখা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের রোষানলে পড়ে। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতন্ত্রের তথাকথিত পরাজয় আর পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর গোটা বিশ্বের মতো এদেশের বামপন্থী মহলেও চরম হতাশা ও মার্কসবাদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই সময়ে বদরুদ্দীন উমরের তীক্ষষ্ট ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা সেই হতাশাজনক পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। ’৬৯ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে (এমএল) যোগ দেয়ার সময় পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে চলছিল গণআন্দোলন। ওই সময় তাঁর লেখা আন্দোলনের গতিকে আরও তীব্র করে। তত্ত্বের তীক্ষষ্ট বিশ্লেষণ আর বাস্তব অবস্থাকে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। এ প্রয়াস থেকে তিনি বর্তমানে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি।
যে রাষ্ট্রে ক্ষুদ্র, তরল লোকজন সমাজের মাথা হিসেবে বিবেচিত হন, যে সমাজে খলনায়কেরা নায়কের মর্যাদা পান, সেখানে বদরুদ্দীন উমরের মতো পণ্ডিত ও বিপ্লবী তাত্ত্বিকের মূল্যায়ন হবে কতখানি? কমিশন কিংবা ক্ষমতায় থাকার সমর্থনের বিনিময়ে যে রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদের অবস্থান পাকাপোক্ত হয় আর সুবিধাবাদীদের সহাবস্থান ঘটে, সেখানে কোনো সংবেদনশীল, মননশীল, দায়িত্বশীল মানুষ ক্রোধ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন? প্রগতি চিন্তা ও রাজনীতির প্রবল শক্তিকে এখনও আটকে রেখেছে সুবিধাবাদিতা, লেজুড়বৃত্তি, দেউলিয়াত্বের পুরনো বৃত্ত। বদরুদ্দীন উমরের মতো ব্যক্তিদের এরকম সমাজে অস্বস্তির কারণ হওয়ারই কথা। তবে তিনি সফল। কেননা তিনি হার মানেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই উক্তির বাস্তবতা আছে তার জীবনে, ‘তোমরা কমিউনিস্টরা ভুল করো না। ...সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বাসঘাতকতা করবেই।’ পরাজয়, আত্মসমর্পণ আর দাসত্বের শৃঙ্খল প্রত্যাখ্যান করার শক্তিই সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার পূর্বশর্ত। গভীর তৃপ্তি আর প্রবল অহঙ্কার নিয়ে বদরুদ্দীন উমর আজ বলতে পারছেন, তিনি আজীবন বিরামহীনভাবে এ শক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। যথাসাধ্য ভূমিকা পালনে দ্বিধা, ক্লান্তি ছিল না। জাতীয় দুর্দিনে দুর্বৃত্ত সরকারি নীতি ও অবস্থার বিরুদ্ধে কখনোই কথা বলতে ছাড়েননি।
তিনি ইতিহাসের গৌরবময় দু’টি অধ্যায় ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী পুরুষ। ভাষা আন্দোলনের একেবারে চরম মুহূর্ত থেকে পরিণতি পর্যন্ত সব লড়াইয়ের মধ্যে তিনি কাজ করেছেন। আন্দোলনকে তিনি বেগবান করেছিলেন ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ শিরোনামে পুস্তিকা লিখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। তিনি তখন ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্র। ছাত্র আন্দোলনের সব মিছিল-সভায় তিনি উপস্থিত থাকতেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি তাঁর ‘আমাদের ভাষার লড়াই’র দশ হাজার কপি ছাপিয়ে প্রচার করেছিল।
বদরুদ্দীন উমর জীবনভর প্রচারবিমুখ থেকেছেন। পুরস্কার, পদবি, সামাজিক শান-শওকত, অর্থবিত্তকে পরোয়া করেননি। এ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বা সরকারি-বেসরকারি কোনো ধরনের পুরস্কার তিনি নেননি। ’৭২ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার দেয়া হলেও প্রত্যাখ্যান করেন। ’৭৪ সালে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একুশে পদক দেয়ার কথা বলা হলে ওই সময়ও তিনি তা নিতে রাজি হননি। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত, ‘পুরস্কারের আশায় আমি লিখি না। কারো দ্বারা আমার পুরস্কৃত হওয়ার প্রয়োজন নেই।’
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম। বাবা আবুল হাশিম ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। বদরুদ্দীন উমর ’৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এমএ পাস করেন। ’৫৬ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, ১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেন। ’৬১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার কর্মজীবন শুরু করেন। ’৬৩ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠা তাঁর মাধ্যমে হয়। সেখানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও সমাজকর্ম বিভাগ চালুতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ’৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি ‘সোশ্যাল ওয়ার্ক কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রবন্ধ ও গবেষণা মিলিয়ে বাংলা-ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় পঁচাশি। এর মধ্যে ‘সংস্কৃতির সংকট’, ‘পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি’, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত : বাঙলাদেশের কৃষক’, ‘বাঙলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা’, ‘যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ’, ‘ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘বাঙলাদেশে মার্কসবাদ’, ‘বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির চালচিত্র’, ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’, ‘মার্কসীয় দর্শন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘বাঙলাদেশের কৃষক ও কৃষক আন্দোলন’, বাঙলাদেশে ফ্যাসিবাদ’, ‘আমার জীবন’, ‘Politics and Society in East Pakistan and Bangladesh’, ‘Society and Politics in Pakistan’, ‘Towards the Emergency in Bangladesh’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সূত্র : আমার দেশ

Wednesday, October 12, 2011

আলোচিত লেখকরা || শরীফ আতিক-উজ-জামান

দীর্ঘকাল ধরে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত সাহিত্যিকদের নাম গোপন রাখার রীতিটি খুব সতর্কতার সঙ্গে বজায় রেখে চলেছে সুইডিশ একাডেমী। ঘোষণার আগে বিজয়ীর নাম জানার তেমন উপায় নেই, শুধু অনুমান করা ছাড়া। সাহিত্যপ্রেমীদের অনুমান কখনো কখনো মিলে গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সবার ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে অখ্যাত কারো মাথায় উঠে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরস্কারের মুকুটটি। ১৮ সদস্যের কমিটির আনুষ্ঠানিক ভোটের শেষে যে নামটি চূড়ান্তভাবে উঠে আসে, তা সব সময় সাহিত্যরসিকদের মনঃপূত না হলেও অনেক লেখককে নতুন করে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এই মুহূর্তে দীর্ঘ তালিকা থেকে যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচজনের হ্রস্ব তালিকায় স্থান পাওয়া সাহিত্যিকদের সাহিত্যকৃতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ চলছে বিজয়ীর নামটি বেছে নেওয়ার জন্য। গত বছর সিরিয়ার কবি আদোনিস (অলি আহমাদ সা'য়িদ), আমেরিকার ফিলিপ রথ ও জয়েস ক্যারোল ওটস, দক্ষিণ কোরিয়ার কো উন এবং আলজেরিয়ার আসিয়া জেবার তালিকার শীর্ষে থেকেও পুরস্কার পাননি। পেয়েছেন পেরুর মারিও বার্গাস য়োসা, যদিও তাঁর লেখনীক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। এ বছরও উলি্লখিত লেখকরাই আলোচনায়। কিন্তু এই তালিকায় আরো অনেকের নাম আছে, যাঁরা স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। আবার এমন অনেককে নিয়ে হৈচৈ চলছে, যাঁদের কেউ এই সম্মান পেয়ে গেলে তা খানিকটা আশ্চর্যজনক হবে বৈকি। হয়তো ভাগ্যদেবী এতক্ষণে কার গলায় স্বপ্নমাল্য পরিধান করা হবে তা নির্ধারণ করে ফেলেছেন।
গত সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানির সবচেয়ে সম্মানজনক গ্যেটে পুরস্কার পেয়ে যাওয়ার পর অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন, এ মাসে নোবেল পুরস্কারের সম্মাননাও আদোনিসই (অলি আহমাদ সা'য়িদ) পাবেন। ৮১ বছর বয়সী সিরিয়ার এই কবিকে আরববিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিরিয়ায় জন্মালেও দীর্ঘ সময় লেবাননে অভিবাসীজীবন কাটিয়েছেন তিনি। দামেস্ক, ফ্রান্স ও আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি কবিতা বিষয়ে পাঠদানকারী আদোনিসের নাম প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, প্রগতি ও আধুনিকতার সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, যার আরবি প্রতিশব্দ 'হাদাথা'। একসময় মাহমুদ দারবিশ এই পুরস্কারের যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ করেছে। আদোনিস আরবি সাহিত্যের জন্য এই সম্মাননা বয়ে আনতে পারেন। কিন্তু তাঁর ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছেন আরেক অশীতিপর কবি সুইডেনের টমাস ট্রান্সট্রুমার। গত বছর তাঁর নাম খুব জোরেশোরে শোনা গেলেও শেষমেশ তাঁর কপালে শিকে ছেঁড়েনি। জানি না ভাগ্যদেবী এঁদের জন্য এতক্ষণে বরমাল্য প্রস্তুত করেছেন কি না। তবে এ বছর তাঁর ভক্তরা সম্ভাবনার দিক দিয়ে তাঁকেই এগিয়ে রাখেন। ১৯৯০ সালে স্ট্রোকের পর শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে এবং কথা জড়িয়ে গেলেও তাঁর লেখনী থামেনি, এখনো লিখে চলেছেন। প্রকাশবাদী ও পরাবাস্তববাদী ধারায় কবিতা চর্চাকারী ট্রান্সট্রুমার একজন পিয়ানোবাদক ও মনস্তত্ত্ববিদ। আলফ্রেড নোবেলের স্বদেশির প্রতি কমিটির সদস্যরা কতখানি সদয় হবেন, তা এতক্ষণে পাঠক হয়তো জেনে গেছেন। আমেরিকার ফিলিপ রথ ও জয়েস ক্যারোল ওটসের নাম ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার সঙ্গে অনেকে জুড়ে দিয়েছেন টমাস পিঞ্চনের নাম। ৭৮ বছর বয়সী ফিলিপ রথের নামের পাশে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ও পুলিৎজার পুরস্কারের সম্মাননা রয়েছে। আর ৭৩ বছর বয়সী ওটস ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন; এবং তিনি অতিপ্রজ লেখিকা। ৫৬টি উপন্যাস, ৩২টি ছোটগল্পের সংকলন, ৮টি কাব্যগ্রন্থসহ আরো অনেক প্রকাশনা রয়েছে তাঁর। আর পিঞ্চন পুলিৎজারের জন্য মনোনীত হয়েও পুরস্কার পাননি। কারণ জুরিদের কেউ কেউ তাঁর উপন্যাসটিকে অশ্লীল মনে করেছেন। প্রধানত কবি, তবে উপন্যাস, ট্রাভেলগ ও আত্মজীবনী মিলিয়ে ১৪০টির মতো বইয়ের লেখক দক্ষিণ কোরিয়ার কো উন অনেক দিন ধরেই বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল লেখক। তাঁর হাত ধরে এশিয়ায় আবার নোবেল ফিরে আসতে পারে। আলজেরিয়ার সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার আসিয়া জেবার (ফাতিমা জোহরা ইমালাইন) তাঁর সাহিত্যকৃতির স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল জিতে নিলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
অস্ট্রেলিয়ার লেস মারে এবং জাপানের ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির নাম অনেকের মুখে। মুরাকামি মৌলিক রচনার সঙ্গে খ্যাতি কুড়িয়েছেন অনুবাদক হিসেবে। আমেরিকার উপন্যাস জাপানি ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব রচনায় আমেরিকার সামাজিক বৈশিষ্ট্য আমদানি করেছেন বলে সমালোচকরা মন্তব্য করেছেন। তাঁর সম্ভাবনা খারিজ করে দেওয়া যাচ্ছে না। বাদ যাচ্ছে না পাঁচবারের বুকার বিজয়ী আরেক জাপানি কাজুও ইশিগুরোর নামও। হাঙ্গেরির পিটার নাদাসের সঙ্গে নেপালের কবি রাজেন্দ্র ভাণ্ডারি, ভারতের কবি কে সচ্চিদানন্দন ভারতের আরেক লেখক বিজয়ধন দত্তে বিজ্জি এবং রোমানিয়ার মার্সিয়া কার্তারেস্কুর নাম এসেছে। শেষোক্ত নাম চারটি বিস্ময় সৃষ্টি করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তা জমা পড়ার বিষয়টি দায়িত্বশীল সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে দুই বছর আগেই হাঙ্গেরির হার্তা মুল্যার জিতে নিয়েছেন এই পুরস্কার। এক বছরের ব্যবধানে সেই দেশেরই কোনো লেখকের ভাগ্যে এই পুরস্কারের সম্মাননা জুটবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে, যদিও মার্শেল প্রুস্তের সঙ্গে তুলনীয় নাদাসের সম্ভাবনা কম নয়। আর অনেক পুরস্কারের সঙ্গে তাঁর ঝুলিতেও রয়েছে ২০০৩ সালে প্রাপ্ত ফ্রাঞ্জ কাফকা পুরস্কার।
এ বছর মে মাসে ফ্রাঞ্জ কাফকা পুরস্কার জয়ের পর আইরিশ লেখক জন ব্যানভিল সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের একজন হিসেবে বিবেচিত। ফোনে এই পুরস্কারপ্রাপ্তির খবর পেঁৗছানোর সময় তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, 'একটু ধরুন, অন্য ফোনটাও বাজছে, সম্ভবত এটা স্টকহোম থেকে এসেছে।' কিন্তু তাঁর সম্ভাবনা ২৫ ভাগের এক ভাগ বলে মনে করছেন ভাষ্যকাররা। যুক্তরাজ্যের সাহিত্যিক এ এস বায়াতের সম্ভাবনা আয়ান ম্যাকইয়ান ও সালমান রুশদীর ওপর। বুকার অব দ্য বুকারস বিজয়ী রুশদী কি পারবেন ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার জিততে? করম্যাক ম্যাকার্থি ও ডন ডেলিলোর সম্ভাবনার কথাও কেউ কেউ বলছেন। বব ডিলানকে নিয়ে তাঁর ভক্তকুল যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করছেন, তা নিয়ে কেউ কেউ বিদ্রূপ করতেও ছাড়েননি। অ্যালেঙ্ ডোনোহিউ তো বলেই ফেলেছেন, বব এই পুরস্কার পেলে তা হবে অত্যন্ত বেদনার বিষয়।
পর পর দুই বছর লাতিন আমেরিকায় এই পুরস্কার যাবে কি না, সেই সন্দেহ থেকেই মেঙ্েিকার লেখক-কূটনীতিক কার্লোস ফুয়েন্তেসের সম্ভাবনাকে কেউ কেউ শূন্যের কোঠায় বলে ধরে নিয়েছেন। 'স্বৈরতন্ত্রের স্বাভাবিক শত্রু হলেন লেখক'_এই বিশ্বাস থেকে যিনি সাহিত্য রচনা করেন, ৩০টি ভাষায় যাঁর লেখনী অনূদিত হয়ে বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশে সমাদৃত, বুকার বিজয়ী আলবেনিয়ার সেই লেখক ইসমাইল কাদেরের সম্ভাবনাকে তাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কানাডার নারীবাদী লেখিকা ও সমাজকর্মী ৭১ বছর বয়সী মার্গারেট অ্যাটউড রয়েছেন অনেকের পছন্দের তালিকায়। তাঁর লেখনীর অতিপ্রজতা ও বহুমাত্রিকতা তাঁকে নোবেলের জোরালো দাবিদাররূপে দাঁড় করিয়েছে। সোমালিয়ার নূরুদ্দীন ফারাহকেও বাতিল করা যাচ্ছে না। আগেও তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে। কী হবে কেনিয়ার ৭২ বছর বয়সী নাট্যকার-ঔপন্যাসিক-প্রাবন্ধিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো কিংবা নাইজেরিয়ার ৮১ বছর বয়সী লেখক চিনুয়া আচেবের ক্ষেত্রে? ওলে সোয়িংকার পর আবার কি নাইজেরিয়ার কোনো লেখক এই বিরল সম্মাননার অধিকারী হবেন? এখনো ম্যানবুকার, পুলিৎজার, কাফকা বা গ্যেটে পুরস্কারের মতো নামি পুরস্কার কপালে না জুটলেও মরক্কোর সফল উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যিক তাহের বিন জেলুন এই সম্মাননা পেয়ে গেলে আফ্রিকার জন্য তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই।
আমেরিকার ৮৫ বছর বয়সী লেখক রবার্ট ব্লাইয়ের কথাও কেউ কেউ জোরেশোরে বলছেন একই দেশের নারীবাদী লেখিকা অ্যাড্রিয়েন রিচের সঙ্গে। কবি, শিক্ষাবিদ, সমকামী, রাজনৈতিক কর্মী_এমন অজস্র পরিচয়ে পরিচিত এই নারীর নোবেল জয়ের ব্যাপারে অনেকে আশাবাদী। ইসরায়েলের লেখক অ্যামোজ ওজ যদি এ বছর পুরস্কারটি জিতে নেন, তাহলে তা অবাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা হবে না। স্পষ্টবাদী ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন ৭২ বছর বয়সী এই মানুষটির পক্ষেও সমর্থন রয়েছে অনেকের। মনস্তত্ত্বে স্নাতক পর্তুগিজ লেখক অ্যান্তোনিও লোবো অ্যান্তুনাসকে নিয়ে প্রত্যাশা রয়েছে অনেকের। এই তো সেদিন ওরহান পামুক নোবেল পেলেন। এত দ্রুত কি তা আবার তুরস্কে যাবে? তাই যত ভালো লেখকই হন না কেন, হাসান আলী টোপাসের সম্ভাবনাকে জোরালো বলা যাচ্ছে না। তা ছাড়া ৫৩ বছর নোবেল পাওয়ার জন্য খুবই কম বয়স। জার্মানির কবি দারস গ্রুবেনের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। ৪৯ বছর বয়সে নোবেল মেলার কথা নয়। তবে অতিপ্রজ এই কবি নোবেলের যোগ্য দাবিদার। আমেরিকায় অভিবাসী দক্ষিণ কোরিয়ার লেখক চ্যাং রেই লিয়ের নাম শোনা গেলেও তাঁর ক্ষেত্রেও বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ৪৭ বছর বয়সে কি তিনি জিতে নিতে পারবেন এই পুরস্কার? সার্ব লেখক ডোবরিকা কোসিকের ক্ষেত্রে বয়সটা কোনো বাধা নয়, বরং তিনিই বোধ হয় সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ লেখক। ৯০ বছর বয়সী এই লেখককে নিয়ে কেউ কেউ প্রত্যাশার জাল বুনছেন। আর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চেক প্রজাতন্ত্রের মিলন কুন্ডেরা বোধ হয় যারপরনাই হতাশ।
এ ছাড়া অনেকের নামই বিভিন্নভাবে শোনা গেছে। স্কটল্যান্ডের কবি-নাট্যকার ক্যারোল অ্যান ডাফি, আমেরিকায় অভিবাসী যুগোস্লাভ লেখক চার্লস সিমিক, ফরাসি-ইতালীয় বংশোদ্ভূত পল থোরো, মেঙ্েিকার হোমিরিও অ্যারিজিস, আমেরিকার জিম হ্যারিসন, মার্ক স্ট্র্যান্ড, পিটার মেথিসেন, উইলিয়াম টি ভলম্যান, জোয়ান ডিডিয়ন, লিডিয়া ডেভিস ও মেরি অলিভার, ফ্রান্সের রেনা কাম্যু প্রমুখ নোবেল বিজয়ী হিসেবে আলোচনায় আছেন এবং ছিলেন।
গত বছর কমিটির সম্পাদক পিটার ইংল্যান্ড মন্তব্য করেছিলেন, 'কমিটির সদস্যরা ইউরোপীয় হওয়ায় একজন ইউরোপীয় লেখক বেছে নেওয়াটা তাঁদের জন্য সহজ হয়। এটা একটা সমস্যা, কিন্তু এ বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি।' বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীরাও তা কামনা করেন। কারণ, এই সতর্কতা নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ মাসের যেকোনো বৃহস্পতিবার আমরা পেয়ে যাব ২০১১ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম। সেটা যদি হয় ৬ অক্টোবর, তাহলে এতক্ষণে আপনারা জেনে গেছেন স্বপ্নে পাওয়া সেই মানুষের সমস্ত লেখকজীবনের গল্প। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে নানা রকম জল্পনাকল্পনা।

সূত্র : কালের কন্ঠ

Friday, September 30, 2011

পুঁথিসম্রাট আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ || মাহমুদুল বাসার

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মৃত্যুদিন ৩০ সেপ্টেম্বর। ১৯৫৩ সালের এই দিনে তিনি ১০টা ৪৭ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। লিখতে বসেছিলেন ‘চট্টগ্রামের অজানা কাহিনী’। লিখতে বসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বাংলাদেশেই শুধু নয়, ভারত উপমহাদেশের জ্ঞানসাধকদের মধ্যে তিনি একজন। তাঁর নাম ড. সুনীতি কুমার, ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নামের সঙ্গে কৃতী গবেষক হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। গবেষকরা বলেন, মৃত্যুর পরে ড. দীনেশচন্দ্রের ডান হাতের আঙুলে কালির দাগ পাওয়া গেছে। আর সাহিত্যবিশারদ লিখতে বসে মৃত্যুর নীরবতায় শয়ন করেন। তার হাতেও কালির দাগ ছিল।
আজীবন দরিদ্র ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সামান্য কেরানিগিরি করতেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তত্কালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ম্যাট্রিক পাস অবশ্য কম কথা নয়। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণেই আর অগ্রসর হতে পারেননি একাডেমিক শিক্ষায়। তার পরও স্বীয় সাধনার বলে, নিষ্ঠার জোরে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক মনীষীদের কাতারে তাঁর নাম স্থান পেয়েছে।
তিনি যে কাজটি করে খ্যাতির শিখরে আরোহণ করেছিলেন, তা ছিল নিদারুণ কষ্টসাধ্য, এমনকি ব্যয়সাপেক্ষও। এর সঙ্গে প্রতিভা ও মেধার প্রশ্নও জড়িত ছিল, আর ছিল মাতৃভাষার প্রতি গভীর গাঢ় ভালোবাসা। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের হাতেলেখা পাণ্ডুলিপি, যাকে বলে পুঁথি, তার আবিষ্কারক। নিজ খরচে, অদম্য অধ্যবসায়ের সঙ্গে পল্লীগ্রামে ঘুরে ঘুরে অনুসন্ধান করে করে অবহেলায় পড়ে থাকা পুঁথি উদ্ধার করেছেন। সেখানেই ক্ষান্ত হননি, পুঁথির হস্তলিপি পর্বে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন, তার সম্পাদনা করেছেন, তার পর ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় তা পাঠাতেন। সসম্মানে ছাপা হতো।
একথা ভাবতে বিস্ময় লাগে যে, সুরেশচন্দ্র সমাজপতির মতো বিদগ্ধ পত্রিকা সম্পাদকের ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় সাহিত্যবিশারদের প্রবন্ধ ছাপা হতো।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ উনিশ-বিশ শতকের রেনেসাঁর মানসপুত্রদের একজন। তার সময়ে খাঁটি বাঙালির সংখ্যা কমই ছিল। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, তাঁর সময়ে উপমহাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক চেতনায় কণ্টকিত হয়েছিল। কিন্তু আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে ওই পঙ্কিল স্রোত কলুষিত করতে পারেনি। তাই দেখি যে, তিনি পুঁথি অনুসন্ধানে নেমে জাত-পাত মানেননি। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৃজনশীল কবিদের পুঁথি উদ্ধারে ব্রতী হয়েছেন।
মানতেই হবে, সাহিত্যবিশারদের আগে যারা পুঁথি উদ্ধারে নেমেছিলেন তারা খণ্ডিত মনোভাবে সীমাবদ্ধ ছিলেন। তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্যবিশারদ প্রথম পূর্ণাঙ্গ, আদর্শবান পুঁথির আবিষ্কারক।
এ কারণে একটি পুঁথি আবিষ্কার করে, তা সুসম্পাদনা করে, টীকাটিপ্পনীসহ সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকায় পাঠানো মাত্র ছাপা হতো। শুধু তাই নয়, উভয় সম্প্রদায়ের মনীষীদের প্রশংসা পেতেন। তাঁর লেখা পাওয়ার জন্য তারা সাগ্রহে অপেক্ষা করতেন।
এ কথা পরিষ্কার বলা দরকার, সাহিত্যবিশারদ কেবল পুঁথি সংগ্রাহক ছিলেন না, সৃজনশীল, চিন্তাশীল লেখকও ছিলেন। অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ, পরিচিত, অপরিচিত সবগুলো পত্রিকায়। তাঁর লেখা যুক্তিপূর্ণ, তথ্যবহুল। তাঁর মানস আধুনিক, অগ্রসর ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তার দ্বারা পরিপুষ্ট। বাঙালির সেক্যুলার ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় তিনি একজন পথিকৃত্।
সাহিত্যবিশারদকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন স্যার আশুতোষ মুখার্জী, ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, ব্যোমকেশ মুস্তফী এবং জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ এমদাদ আলী প্রমুখ।
তিনি ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্মানিত সদস্য। একসময় তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতিও হয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁকে ভালোবেসে একটি চাকরি দিয়েছিলেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ভালোবেসে তাঁকে প্রবেশিকা ও এফএ পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি বিএ ক্লাসের বাংলা বিষয়ের পরীক্ষার খাতা দেখতেন।
সাহিত্যবিশারদ প্রায় সব পত্রিকা পড়তেন, তা সংগ্রহ করতেন, তাতে লিখতেন। তিনি পত্রিকা সম্পাদনাও করতেন। সম্পাদনা করেছেন ‘নবনূর’, ‘কোহিনূর’, ‘সওগাত,’ ‘পূজারী’ ও ‘সাধনা’ পত্রিকা।
তিনি তাঁর বাড়িতে তাঁর পিতামহ কর্তৃক সংগৃহীত কিছু পুঁথির সঙ্গে পরিচিত হন। এই পুঁথিগুলো পড়ে তিনি পুঁথি সংগ্রহে ও এ নিয়ে লিখতে আগ্রহী হন। এ পুঁথিগুলোর মধ্যেই পেয়ে যান ‘চণ্ডীদাসের পদাবলী’। সেসময় তিনি ছিলেন এফএ ক্লাসের ছাত্র। এ সময় তিনি আচার্য অক্ষয় সরকার সম্পাদিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় ‘প্রাচীন পদাবলী’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধ পাঠ করেই মহাকবি নবীন চন্দ্রসেন সাহিত্যবিশারদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
তিনি যখন কলেজে পড়েন, তখন নলিনী কান্ত সেন ‘আলো’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সাহিত্যবিশারদ এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। এ পত্রিকায় তিনি ‘আলাওল গ্রন্থাবলীর কালনির্ণয়’ নামে একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধ পড়ে একজন বিদ্বান মন্তব্য করেন, ‘কালে এই বালক যশস্বী লেখক হইতে পারিবে।’ (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে নিবেদিত প্রবন্ধ সংকলন, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪, পৃ. ১২৮)।
হ্যাঁ, যশস্বী হয়েছিলেন। বিদ্বত্সমাজ তাকে সাহিত্যবিশারদ উপাধি দিয়েছিলেন। সাহিত্য সাগর উপাধিও পেয়েছিলেন। বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর বলতে যেমন ঈশ্বরচন্দ্রকে বোঝায়, তেমনি সাহিত্যবিশারদ বলতে আবদুল করিমকেই বোঝায়। আমরা কিন্তু মাইকেল, বিদ্যাসাগর, সাহিত্যবিশারদ বলতেই ভালোবাসি।
একজন গবেষকের লেখা থেকে জানা যায়, তিনি যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন কলকাতা থেকে দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত পাক্ষিক ‘অনুসন্ধান’ পত্রিকা তাঁর হাতে আসে। এই পত্রিকা পড়ে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য সংগ্রহে অনুপ্রাণিত হন।
চণ্ডীদাসের পদাবলী পড়ে, গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে পুঁথি পাঠ শুনে, পূর্বপুরুষের সংগৃহীত পুঁথি পাঠ করে সাহিত্যবিশারদ মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
সাহিত্যবিশারদ সম্পাদিত প্রথম বই ‘রাধিকার মান ভঙ্গ’। এই বইয়ের ভূমিকা লেখেন ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি বলেন, “শ্রী আবদুল করিম চট্টগ্রামের একটি বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের পণ্ডিত। তাহার অবস্থা ভাল নহে। তথাপি তিনি সাহিত্যসেবায় অকাতরে পরিশ্রম করিয়া থাকেন। বাঙ্গালা সহিত্যের প্রতি তাহার অনুরাগের প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। তিনি এই দুর্লভ গ্রন্থের সম্পাদনা কার্যে যেরূপ পরিশ্রম, যেরূপ কৌশল, যেরূপ সহায়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা সমস্ত বাঙ্গালায় কেন—সমস্ত ভারতেও বোধ হয় সচরাচর মিলে না। এক একবার মনে হয় যেন কোন ‘জার্মান এডিটর’ এই গ্রন্থ সম্পাদনা করিয়াছেন।” (ঐ-পৃ. ১৬)
‘ইসলামাবাদ’ সাহিত্যবিশারদের একটি মৌলিক গ্রন্থ। চট্টগ্রামকেই তিনি ইসলামাবাদ বলেছেন। কারণ, প্রাচীন ও মধ্যযুগে আউলিয়া, পীর, বুজর্গানেরা চট্টগ্রামে এসে, সেখান থেকে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। উল্লিখিত গ্রন্থের এক জায়গায় বলেছেন তিনি, “আমাদের এই দেশ ধর্মজগতে একটা পরম শ্লাঘ্য স্থান অধিকার করিবার দাবি করিয়া আছে। পৃথিবীর চারিটি মহাধর্ম শক্তি আসিয়া এখানে সম্মিলিত হইয়াছে। ইহা হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ—এই তিন মহাজাতিরই একটা পরম পবিত্র তীর্থরূপে পরিগণিত।... হিন্দুর হিন্দুত্ব ও মুসলমানের মুসলমানত্ব একমাত্র এই দেশেই আজও সম্পূর্ণ বজায় আছে। এক গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বাস করিয়া এক পুকুরের জল খাইয়া আমরা হিন্দু-মুসলমান দুইটি জাতি স্মরণাতীত কাল হইতেই স্ব-স্ব ধর্মের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়া পরম প্রীতিতে চলিয়া আসিতেছি, জাতি-ধর্ম লইয়া এ পর্যন্ত আমাদের দেশে কোনোদিন একটা টুঁ শব্দ পর্যন্তও হয় নাই, ইহা আমাদের চট্টগ্রামের একটা বিশিষ্ট গুণ।” (ঐ-পৃ. ২০)
তার অসাম্প্রদায়িক-উদার মানসের পরিচয় এ উদ্ধৃতিতে বিদ্যমান।
১৯৩৯ সালে সাহিত্য বিশারদ কলকাতা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণে বলেন, “সাহিত্যে জাতি-ধর্মের গণ্ডী আমি কখনও স্বীকার করি নাই, এখনও স্বীকার করি না, কিন্তু ইহার বৈচিত্র্য স্বীকার করি। সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যে জাতিরই হউক, ইহা সাহিত্য পদবাচ্য হইলেই সর্বজনীন হইয়া থাকে। ...মুসলমানের সাহিত্য সর্বজনীন সাহিত্যিক সৌন্দর্য্যের বিচিত্র ভঙ্গীর একদিক মাত্র। হিন্দুর সাহিত্যও তদ্রূপ একদিক। এই জন্যই আধুনিক বঙ্গের সাহিত্যিক জাগরণকে আমি ভীতির চক্ষে দেখি না, বরং প্রীতির নয়নেই নিরীক্ষণ করিয়া থাকি। কারণ অখণ্ড বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি আমার শ্রদ্ধা সুগভীর এবং পরিচয় প্রাচীন।” (ঐ-পৃ. ৩৩)
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ কি কেবল মধ্যযুগের পুঁথিই মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করেছিলেন? অবশ্য পুঁথিগুলো অজানা অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে না আনলে বাংলা সাহিত্য থাকত আধখানা চাঁদের মতো অসম্পূর্ণ। কিন্তু তিনি মূলত পুরো বাঙালি জাতির মননের ইতিহাস পুনরুদ্ধার করেছেন। আবিষ্কৃত উদ্ধারকৃত পুঁথিগুলোতে যেহেতু ইংরেজের কূটপ্রভাব স্পর্শ করেনি, সেহেতু সেসবে আছে ধর্মনিরপেক্ষতার সজীবতা, হিন্দু-মুসলিম মিলনের কথা।
জীবনসায়াহ্নে মানুষ হয় প্রতিক্রিয়াশীল। সাহিত্যবিশারদ হয়েছিলেন প্রগতিশীল। তাঁর সায়াহ্নকালীন অভিভাষণগুলো বিচ্ছিন্নতা, সাম্প্রদায়িকতা, কূপমণ্ডূকতাবিরোধী খরদীপ্ত উচ্চারণে বলিষ্ঠ। এজন্যই তিনি মনীষী, মহাপুরুষ।
সাম্প্রদায়িক চিন্তা তো অনাধুনিক চিন্তা। আর অনাধুনিক চিন্তা দিয়ে সাহিত্য বিশারদ এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষী হওয়া যায় না।
সূত্র : আমার দেশ

Friday, September 23, 2011

বিদ্যাসাগর-মনন || ড. রহমান হাবিব

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) বাঙালির চিন্তাজগতে দুটো কারণে স্মরণীয়। একটি তার সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও দ্বিতীয়টি তার বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মপ্রবণতা। বিধবা-বিবাহ চালু করা এবং বহু বিবাহ প্রথা রোধ করার জন্য তিনি গ্রন্থ লিখেছেন। লেখালেখির ব্যাপারে এটি তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা। ইংরেজি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষা থেকে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ অনুবাদ করে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিকে তিনি উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গেছেন—এটি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মশীলতা। এভাবে বিদ্যাসাগর সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—উভয় ক্ষেত্রে প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেছেন।
বিদ্যাসাগর খুব বাস্তব-সচেতনতাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। সামাজিক কুসংস্কারকে শোধন করে সমাজের মানুষের মধ্যে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণোদনা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চাও ছিল সমাজশোধনকেন্দ্রিক। সাহিত্য ও সমাজ দুটোকেই তিনি সমান্তরালে উপস্থাপিত করে সমাজের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়েছিলেন।
বিধবা-বিবাহ তিনি আপন স্বজনের মধ্যেই প্রবর্তিত করে তাঁর হৃদয়গত উদারতা ও বাস্তবসম্মত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। হিন্দু বিধবা নারীদের পুনরায় বিয়ে না হওয়ায় সমাজে নানা অনাচার ও পতিতাবৃত্তি বেড়ে চলছিল। বিদ্যাসাগর বিধবাদের বিবাহ চালু করার জন্য গ্রন্থ রচনা ও সামাজিক ভূমিকা পালন করে সমাজকে পাপ ও পঙ্কিলতামুক্ত করতে চেয়েছেন।
হিন্দু-ব্রাহ্মণরা বহুসংখ্যক নারীকে বিয়ে করত। সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব প্রবল হয়। নারীদের মানবেতর জীবনযাপনের কষ্টকে অনুভব করে বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ রোধকল্পে গ্রন্থ রচনাই নয় শুধু; সামাজিক আন্দোলনও সংগঠিত করে এই কুপ্রথাকে দূর করে সমাজকে শোধন করেছেন। তাঁর জ্ঞানকে তাই মধুসূদন দত্ত বলেছেন, প্রাচীন ঋষির জ্ঞান, যা মানবিক, উদার ও কল্যাণময় এবং সেই ঋষিদের মতো তিনি ছিলেন প্রতিভাধর। তাঁর কর্মচাঞ্চল্য ছিল ইংরেজের মতো; অথচ নারীদের তথা মানুষের দুঃখ দূরীকরণে তাঁর হৃদয় ছিল বাঙালি মায়ের মতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের মৌল রহস্য ও জীবনসত্তা মধুসূদনের নিম্নোক্ত উদ্ধৃতির মধ্যে প্রাপ্তব্য : ঞযব সধহ ঃড় যিড়স ও যধাব ধঢ়ঢ়বধষবফ যধং ঃযব মবহরঁং ধহফ রিংফড়স ড়ভ ধহ ধহপরবহঃ ঝধমব, ঃযব বহবত্মু ড়ভ ধহ ঊহমষরংযসধহ ধহফ ঃযব যবধত্ঃ ড়ভ ইবহমধষর সড়ঃযবত্. মাইকেল মধুসূদনের এই ভাষ্যটি বিদ্যাসাগরের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ শিশুদের বর্ণমালা শিক্ষা, ভাষা, ব্যাকরণ, মনীষীদের জীবনী, ইতিহাস ইত্যাদি সঠিকভাবে শেখাতে না পারলে জ্ঞান ও ভাষার ওপর তাদের দখল সৃষ্টি হবে না এবং মনীষীদের জীবনবৃত্তান্ত না জানলে মহত্ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রবণতা তাদের মধ্যে সৃষ্টি হবে না। সে জন্য তিনি নিজেও শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থগুলো হলো : বাঙ্গালার ইতিহাস, জীবনচরিত, বোধোদয়, ঋজুপাঠ, বর্ণপরিচয়, কথামালা, চরিতাবলী ও আখ্যানমঞ্জরি। শিশুদের শিক্ষার ভিত্তিকে মজবুত করার উদ্দেশ্যে প্রায় দেড়শ বছর আগে তাঁর এই প্রচেষ্টা যে কত দূরদর্শী প্রাজ্ঞতাপ্রসূত, তা শিক্ষাবিদরা খুবই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমে স্মরণ করেন।
বিদ্যাসাগর শেক্সপিয়র ও কালিদাসের নাটক যথাক্রমে ইংরেজি ও সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করেছিলেন। শেক্সপিয়রের ইংরেজ পাত্রপাত্রীদের তিনি বাঙালিয়ানায় জারিত করে অনুবাদ করেছেন বলে তাঁর অনুবাদ মৌলিকত্ব পেয়েছেন। ভাষা ও সাহিত্যকে তিনি শেক্সপিয়রের মানবচেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।

কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকে তিনি শকুন্তলা নামে সংস্কৃত থেকে বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রায় দেড়শ বছরেরও আগে। তখন বাংলা গদ্য মাত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে। কালিদাসের নাটককে তিনি উপন্যাসোপম ভাষায় বঙ্গানুবাদ করেছেন। বাঙালির উপন্যাস-রচনার সূচনাপর্বের প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর ব্যাপারে প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন তিনি সে জন্য বিদ্যাসাগরকে বাংলা উপন্যাস রচয়িতাদের গুরু হিসেবেও আখ্যায়িত করতে চাই।
বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী—এটি সর্বজনবিদিত কথা। তিনি বিরতি চিহ্ন ও বাংলা ভাষার অভ্যন্তরীণ ছন্দ ও বৈভবের রহস্যকে উদ্ঘাটন করতে পেরেছিলেন বলেই বাংলা ভাষাকে তিনি ভিত্তি দিতে সমর্থ হয়েছেন। বাংলা গদ্যকে তিনি প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন বলেই বাংলা প্রবন্ধ, নাটক ও উপন্যাস রচনার ভিত্তি নির্মিত হয়েছে বলে মনে করি। সে জন্য বাংলা সাহিত্যের প্রবন্ধ, নাটক ও উপন্যাসের ভিত্তি নির্মাতা হিসেবেও তাঁকে চিহ্নিত করা চলে।
বিদ্যাসাগরকে অনেক সাহিত্য-সমালোচক ও চিন্তাবিদ অনুবাদক ও সমাজকর্মী হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। মৌলিক সাহিত্যস্রষ্টার মর্যাদা তাঁকে দিতে চান না। আমি এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে নই। বিদ্যাসাগর চিন্তাবিদ-প্রাবন্ধিক। প্রবন্ধকারও মৌলিক চিন্তা করে থাকেন—সে জন্য তিনিও মৌলিক চিন্তাবিদ ও সাহিত্যস্রষ্টা। তাঁর ‘প্রভাবতী-সম্ভাষণ’ গল্পটি যারা পড়েছেন, তারা স্বীকার করতে বাধ্য যে মৌলিক সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবেও তাঁর মনন কত উচ্চ শ্রেণীর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করে ছিলেন। বিদ্যাসাগর বাংলা-গদ্যকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করেছিলেন বলেই রবীন্দ্রনাথের পক্ষে তা সম্ভব হয়েছে। বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য উদ্ধৃতিযোগ্য : ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব প্রচলিত অনাবশ্যক সমাসাড়ম্বর হইতে মুক্ত করিয়া তাহার পদগুলির মধ্যে অংশ যোজনার সুনিয়ম স্থাপন করিয়া বিদ্যাসাগর যে বাংলা গদ্যকে কেবল সর্বপ্রকার ব্যবহারযোগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন, তাহা নহে। তিনি তাহাকে শোভন করিবার জন্যও সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গদ্যের পদগুলোর মধ্যে একটি ধ্বনি সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, তাহার গতির মধ্যে একটা অনতিলক্ষ্য ছন্দস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য ও সরল শব্দগুলো নির্বাচন করিয়া বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন।’
বিদ্যাসাগরের বিধবা-বিবাহ চালুকরণ, বহু বিবাহ রোধ, শিশু শিক্ষার প্রতি মনোযোগ, ইংরেজি, সংস্কৃত ও হিন্দি থেকে অনুবাদ—সব কিছুই সমাজ-উন্নয়নকেন্দ্রিক। বাংলা ভাষাকে বিরতি-চিহ্ন দিয়ে সুগঠিত করার ক্যারিশমাও তাঁর সাহিত্যিক বুদ্ধিবৃত্তির শ্রেষ্ঠ দিক। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, পাণ্ডিত্য, শিশু মনস্তত্ত্ব বিকাশ প্রচেষ্টা, দয়ার্দ্রচিত্ততা ও তেজস্বিতাময় দূরদর্শী প্রাজ্ঞতা বাঙালি সমাজে তাঁকে বিরল খ্যাতিতে বিভূষিত করেছে নিঃসন্দেহে।

Saturday, September 17, 2011

জসীম উদ্দীনের কবিতায় পল্লী বংলার রূপ || ডক্টর সন্দীপক মল্লিক

১.

ধ্যানসিদ্ধ সাহিত্যবিশেস্নষকের উচ্চারণঃ
‘প্রত্যেক সভ্যজাতির মধ্যেই সাহিত্য সংস্কৃতির দুইটি ধারা আছে-একটি লৌকিক আর একটি শিৰাগত৷ ইহাদের মধ্যে আদান-প্রদান চলিতে থাকে৷ (১)
বস্তুতঃ
ঋড়ষশ সধঃবত্‍রধ রং নবরহম ধনংড়ত্‍নবফ নু ঢ়ড়বঃং ধহফ ধত্‍ঃরংঃং (২)
এমন সত্যানুসরণে আধুনিক যুগে জন্মে আধুনিক শিৰাদীৰাপ্রাপ্ত হয়েও জসীমউদ্দীন লোকসাহিত্যের আকর্ষণে লোককাব্যের ভান্ডার থেকে রস সংগ্রহ করে, লোকজীবন নিয়ে কাব্য সাধনায় অগ্রসর হয়েছেন৷ (৩) আর তার এমন শৈল্পিক আয়োজন সম্পর্কে স্বয়ং কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছেনঃ
‘জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব, ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নূতন ধরনের৷
প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে৷ (৪)
চেক সাহিত্যসমালোচক উঁংধহ তনধাঃবষ জসীমউদ্দীনের কাব্যপ্রতিভার তিনটি উত্‍সের কথা উলেস্নখ করেছেনঃ
ক. বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাহিনী ও সঙ্গীতাশ্রয়ী বিচিত্র কাব্য ঐতিহ্য
খ. বাংলাদেশের গ্রাম্যসাহিত্য ও গ্রাম্যগানের ধারা
গ. জনসাধারণের প্রতি অপরিসীম দরদ যাকে সাহিত্যের ভাষায় বলা হয় ঢ়ড়বঃরপ যঁসধহরংস. (৫)
জসীমউদ্দীনের বাংলা সাহিত্যে পলস্নীরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন৷ তার কবিতার আবহে স্বতঃস্ফূর্ততা৷ আনত্মরিকতা, স্পষ্টতা ও অকৃত্রিম সরলতা (ঁহংঃঁফরবফ ংরসঢ়ষরপরঃু) ঋদ্ধ হয়ে আছে৷ এ বিষয়ে তিনি স্কচ কবি জড়নবত্‍ঃ জঁত্‍হং এর সঙ্গে তুলনীয়৷ বস্তুতঃ পলস্নীবাংলার মাটিতেই তার শিল্প মনস্বিতার মূলটি প্রোথিত থেকে গেছে৷ (৬) তিনি পূর্ববাংলার প্রাণকেন্দ্র গ্রামগুলোর নিঝুম অনত্মঃপুরে আপনাকে স্থাপন করতে পেরেছিলেন৷ (৭) তার কাব্যশরীরে পলস্নীর রূপ সৌন্দর্যের অপরূপ মায়ালোকই সৃজিত হয়েছে৷ (৮) তিনি সুন্দরকে পলস্নীরাখালের হাসিতে গ্রাম্যবালিকার চঞ্চলগতি ভঙ্গিমায় কিংবা প্রকৃতির সনাতন প্রসাধনে সজ্জিত অবস্থায় প্রত্যৰ করেছেন (৯)

জসীমউদ্দীনের স্বকীয় সংলাপঃ
আমাকে সকলে পলস্নী কবি বলেন৷ আমি এজন্য নিজেকে ধন্য মনে করি৷ (১০)
২.
কবি জসীমউদ্দীনের আবির্ভাব ০১ জানুয়ারি ১৯০৩ খ্রিঃ এ ফরিদপুরের তাম্বুলখানা পলস্নীতে তার মামার বাড়িতে৷ তিরোভাব ১৪ মার্চ, ১৯৭৬ খ্রি এ ঢাকায়৷
বিশেষভাবে উলেস্নখ্য যে, কবির পিতা মৌলবী আনসারউদ্দীন ছিলেন স্বভাবজ কবিত্বশক্তির ধারক৷ তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী৷ গ্রামেরই স্কুল শিৰক ছিলেন তিনি৷ মাতা মোসাম্মাত্‍ আমিনা খাতুন ছিলেন সরল স্নেহদাতা৷ তার পলস্নীসৌন্দর্যময় মাতৃহৃদয়ের স্নেহধারায় নিষিক্ত হয়েই জসীমউদ্দীনের কবিপ্রাণ প্রতিভাপ্রদীপ্ত হয়ে উঠেছিলো৷ (১১)
জসীমউদ্দীনের প্রাথমিক শিৰার হাতে খড়ি পাশর্্ববতর্ী গ্রাম শোভারামপুরের অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায়৷ কিন্তু সাঁকো পারাপারের জন্য তার পিতা তাকে নিজের প্রতিষ্ঠা করা ফরিদপুর হিতৈষী এম ই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন৷ তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলে এসডিও বিশ্বেকর ভট্টাচার্যের ছেলে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে৷ মনোরঞ্জনের বাড়িতে শিশুতোষ গ্রন্থের সংখ্যা কম ছিলো না৷ জসীমউদ্দীনের বই পড়ার সখ তখন থেকেই উপ্ত হয়৷ তার শিল্পীসত্তার উন্মেষ ও বিকাশে এ সময়টি গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো৷ (১২)
নিকটতম আত্মীয় অন্ধ চাচা দানু মোলস্নার কেচ্ছা, শেস্নাক, রূপকথা, গ্রাম্যগান ইত্যাদি শুনে শুনেও শিশু জসীমউদ্দীনের প্রাণ পলস্নীকৃষ্টিসমৃদ্ধ হয়েছিলো৷ (১৩)
ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলে জসীমউদ্দীনের পিতা তাকে ফরিদপুর জিলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন৷ এই সময় তিনি ও তার বন্ধু ধীরেন্দ্র মিলিত হয়ে ঊষা নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধানত্ম নেন৷ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় জসীমউদ্দীনের নায়ের মাঝি সম্পর্কিত এই কবিতাটি স্থান পায়৷
নায়ের মাঝি নায়ের মাঝি
এখনো কেন শুয়ে?
বেয়ে চল তোর না খানি ভাই
পাল তুলিয়া দিয়ে৷ (১৪)
জসীমউদ্দীন যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন অসহযোগ আন্দোলন উন্মাতাল হয়ে ওঠে মাতৃভূমি৷ স্কুল ছেড়ে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান৷ এই সময়ে তিনি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র সম্পাদক মোজাম্মেল হক (জন্ম ১৮৮৩ খ্রিঃ-মৃতু্যঃ ১৯৭৬ খ্রি) এর সংস্পর্শে আসেন এবং তার পরামর্শে কবি নজরম্নলের সঙ্গে পরিচিত হন৷ কবির ব্যক্তিত্ব, স্নেহ আর মধুর ব্যবহার জসীম উদ্দীনের কবিসত্তাকে সঞ্জীবিত করে৷(১৫) ১৯২১ খ্রি. ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় তাঁর মিলনগান’ নামক একটি কবিতা প্রকাশিত হয়৷ উলেস্নখ্য, পত্রিকাটির একই সংখ্যায় নজরম্নলের জনমননন্দিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ও প্রকাশিত হয়৷(১৬)

১৯২১ খ্রি. এই জসীমউদ্দীন দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন৷ ১৯২৪ খি.-এ পাস করেন আই এ৷ বিশেষভাবে উলেস্নখ্য যে, ম্যাট্রিক পরীৰায় পাস করবার পূর্বেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটি রচনা করেন৷ ‘কলেস্নাল’ পত্রিকার পিছনের দিকে ছোটো অৰরে প্রায় ছয়মাস পরে কবিতাটি প্রকাশিত হয়৷(১৭) মহাত্মা দীনেশচন্দ্র সেন কবিতাটি পাঠ ক’রে বিমুগ্ধ হন৷

প্রায় এক মাস পরে ডক্টর দীনেশচন্দ্র ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার ‘তিলক’ সংখ্যায় ‘কবর’ কবিতার প্রশংসা ক’রে অহ ুড়ঁহম গড়যধসবফধহ ঢ়ড়বঃ নামে জসীমউদ্দীন-সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখেন তিনি এ প্রবন্ধে নজরম্নলের কবি-কৃতিত্বের পর মুসলমান কবিদের মধ্যে জসীমউদ্দীনের স্থানই নির্দেশ করেন৷(১৮) উলেস্নখ্য, জসীমউদ্দীন যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র, তখনই দীনেশচন্দ্র সেন ‘কবর’ কবিতাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক সিলেকশনে পাঠ্য করেন৷

জসীমউদ্দীনের ছাত্রাবস্থায় ১৯২৭ খ্রি-এ ‘রাখালী’ কাব্য প্রকাশিত হয়৷ ১৯২৯ খ্রি-এ তিনি বি.এ. পাস করেন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে৷ ১৯৩১ খ্রি-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করার পর ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে ‘রামতনু লাহিড়ী গবেষক’ হিসেবে নিযুক্ত পান৷ ১৯৩৮ খ্রি. অব্দি তিনি এই পদে বহাল ছিলেন৷(১৯)
আমরা অনুধাবন করতে পারি- ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনই জসীমউদ্দীনের কবিসত্তার বিকাশে প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করেন পরম যত্নে৷(২০)
দীনেশচন্দ্রের ব্যাকুল উচ্চারণঃ
‘তাঁর কবিতা আমার কাছে শেলী, কীটস, বায়রণ এমনকি
ওয়ার্ডসওযার্থের কবিতার চেয়েও ভালো লাগে৷ঃ তাঁর কবিতায়
ঃ ঃ আম-কাঁঠালের ছায়ায় ঘেরা সেই পলস্নীমায়ের শীতল
স্পর্শ পাই৷ মায়ের চেয়ে আপন বলতে আমি আর
কাউকে জানিনে৷ তার পদ্ম-শালুক ফোটা খালবিল, ভাটিয়ালী
গানে মুখর পদ্মা-যমুনা নদী, অতসী-অপরাজিতা, টগর-চামেলী
ফুলের সুবাস-ভরা আঙিনার কোল মায়ের এই অপরূপ
মূর্তি আমি পাই জসীমের কবিতায়৷(২১)

৩.
পলস্নীপ্রাণ কবি জসীমউদ্দীন সর্বমোট ২০ খানি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা৷ সেগুলি হলোঃ
রাখালী (১৯২৭ খ্রি.), নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯ খ্রি.), বালুচর (১৯৩০ খ্রি.), ধানৰেত (১৯৩২ খ্রি.), সোজনবাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩ খ্রি.), রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫ খ্রি.), হাসু (১৯৩৮ খ্রি.), রূপবতর্ী (১৯৪৬ খ্রি.), এক পয়সার বাঁশী (১৯৪৯ খ্রি.), পদ্মাপার (১৯৫০ খ্রি.), মাটির কান্না (১৯৫১ খ্রি.), গাঙের পার (১৯৫৪ খ্রি.), সকিনা (১৯৫৯ খ্রি.), সুচয়নী (১৯৬১ খ্রি.), মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩ খ্রি.), হলুদবরণী (১৯৬৬ খ্রি.), জলের লেখন (১৯৬৯ খ্রি.), পদ্মানদীর দেশে (রিয়াজ আনোয়ার রচিত উদর্ুকাব্য ‘আওয়াজো কা তাঁওয়ার’-এর বঙ্গানুবাদ-১৯৬৯ খ্রি.), ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৭২ খ্রি.) ও মাগো জ্বালিয়ে রাখিস আলো (১৯৭৬ খ্রি.)৷ উলেস্নখ্য, প্রায় সকল কাব্যেরই ছন্দায়তনে পলস্নীবাংলার রূপ রূপমা, শ্যামলিম ঐশ্বর্য প্রাণসঞ্জীবনী প্রভা, পলস্নীমানব মানবীর দৈনন্দিন জীবনায়োজন, ঐহিক তৃষ্ণাবাহার- প্রীতিসমুজ্জ্বল চিত্রকল্পনা সদ্ধৃত হয়ে আছে বর্ণনাধারায় তা সুবিন্যসত্ম হোক প্রামাণ্য বিভায়ঃ
ক. ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবীরের রাগে৷
(‘কবর’, রাখালী)
খ. সন্ধ্যার পরে দাবায় বসিয়া রূপাই বাজায় বাঁশী,
মহাশূন্যের পথে সে ভাসায় শূন্যের সুররাশি!
(‘নক্সী কাঁথার মাঠ’)
গ. শীতের তাপসী কারে বা স্মরিছে আভরণ গার খুলি?
(‘কাল সে আসিবে’, বালুচর)
ঘ. তপস্যা-রত জল-ভরা মেঘ গগনে ঘোরে,
(‘কল্যাণী’, রূপবতী)
ঙ. শেষ রাত্রের পান্ডুর চাঁদ নামিছে চক্রপলে
রজনীগন্ধা রূপসীর আঁখি জড়াইছে ঘুমজালে৷
(‘রজনীগন্ধার বিদায়’, মাটির কান্না)
এসব ছন্দিত পঙ্ক্তিতে পলস্নীবাংলার রূপশ্রীর সত্যায়িত বর্ণায়োজনই বিধৃত৷ ষড়ঋতুর পরিক্রমায় পলস্নীবাংলা বিচিত্র শৈলীতে রূপমণ্ডিত হয়৷ কবির দৃষ্টিনন্দনায় তা সমুদ্ভাসিত৷
লোকজ বাকভঙ্গি অনুসরণে জসীমউদ্্দীনের কৃতিত্ব অবিসংবাদিত৷ পলস্নী মানব-মানবীর দৈনন্দিন প্রতিকৃতি- প্রীতিময় দিনযাপনা-আনুপূর্বিক সবুজ সৌন্দর্যময় জীবন সুঘ্রাণ জসীমউদ্্দীনের কাব্যায়তনে সঞ্চয়িত৷ সুরসম্পৃক্ত কথামালা উচ্চারণ করা যাক:
ক. রাখালভাবে কলসখানি না থাকলে তার সরম্ন কাঁখে
রূপের ভারেই হয়তো বালা পড়ত ভেঙে পথের বাঁকে৷
(রাখালী)
খ. সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,
সাঁঝ আকাশের ছড়িয়ে পড়া আবির রঙে নাওয়া৷
(‘রাখাল ছেলে’, রাখালী)
গ. নতুন চাষা ও নতুন চাষাণী পাতিল নতুন ঘর
বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর৷
(‘নকসি কাঁথার মাঠ’)
ঘ. কৃষাণী কি বসি সাঁঝের বেলায়
মিহি চাল ঝাড়ে মেঘের কুলায়
ফাগের মতন কুঁড়া উড়ে যায়
আলোক ধারেঃ.
(‘উড়ানীর চর’, বালুচর)
পলস্নীর বিশ্বসত্ম ছবির আবহ-সৃষ্টির নৈপুণ্য কবি জসীমউদ্্দীনের স্বভাবজ৷ মমতাপুণ্যের গরিমায় তাঁর হৃদয়পুর ছিলো পরিপূর্ণ৷ সে কারণেই তিনি গ্রাম্যশব্দের ‘চুমকি’ বসাতে হয়েছিলেন দ্বিধাহীন৷ (২২) উদ্ধৃত হোক ছন্দিত কথামালা:
ক. রাখিও ‘ঢঁ্যাপের মোয়া’ বেঁধে তুমি সাতনরি শিকা ভরে
খেজুড়ে গুড়ের নয়া পাটালিতে ‘হুড়ুমের কোলা ভরে৷’ (‘পলস্নীজননী’, রাখালী)
খ. দশ ‘খান্দা’ জমি রূপার, তিনটা গরম্ন হালে,
ধানের ‘বেড়ী’ ঠেকে তাহার বড় ঘরের চালে৷
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
গ. শেয়াল চলে শ্বশুরবাড়ী ‘খালুই’ মাথায় দিয়ে৷
(‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’)
পলস্নীবাংলার মানব-মানবীর জীবনযাত্রার ছবি অঙ্কনে নিরেট পলস্নীবাসী কবি-গীতিকারদের আঞ্চলিক শব্দ, বাক্যাংশ তথা ভাবসম্পদকেও জসীমউদ্্দীন আত্ম:স্থ করেছেন৷ কিছু উদ্ধৃতি:
ক. ভাটির দ্যাশের কাজলমায়ায়
পরাণডা মোর কাইন্দা বেড়ায় রে৷
(‘রঙিলা নায়ের মাঝি’)
খ. ও বাবু সেলাম বারে বারে
আমার নাম গয়া বাইদ্যা বাবু
বাড়ী পদ্মাপার৷
(‘পদ্মাপার’)
পলস্নীবাংলার মানব-মানবীর অধ্যাত্ম্য সাধনা সম্পর্কিত ভাবমূর্তিকেও জসীমউদ্্দীন ছন্দমণ্ডিত করেছেন৷ আরবী-ফাসর্ী শব্দ সহযোগে তিনি জীবন বাসত্মবতার ভূষণকেই সমুজ্জ্বল করেছেন৷
উদ্ধৃত হোক কিছু পঙ্ক্তি:
ক. মজিদ হইতে আজান হাঁকিছে বড় সকরম্নণ সুর,
মোর জীবনের রোজ কেয়ামত ভাবিতেছি কতদূর!
(‘কবর’, রাখালী)
খ. সামনে লইয়া কোরান শরীফ সুরে-ফাতেহার চরণ পড়ি
সারে জাহানের ক্রন্দনে যে চোখ দুটো্ তার আসিছে ভরি৷
(‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’)
জসীমউদ্্দীন কুশলী শব্দশিল্পী৷ পলস্নী সংবেদ্য অনুভবের সন্দীপনা তার শব্দচয়ন প্রক্রিয়ায় সুস্থিত৷
অলংকৃত কিছু পঙক্তি উচ্চারিত হোক:
ক. গাঙের জল ছল্্ ছল্্ বাহুর বাঁধন সে কি মানে?
(‘রাখালী’)
খ. বাহিরিতে নাচে জোনাকী আলোর থম্্থম্ কাল-রাত৷
(‘পলস্নীজননী’, রাখালী)
গ. আম-কাঁঠালের পিঁড়িখানি ভরি সরম্ন সরম্ন করে লতাফুল আঁকা,
(‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’)
অনুপ্রাস অলঙ্কারের যথার্থ ব্যবহারে জসীমউদ্্দীন পলস্নীবাংলার রূপমাধুর্যের আল্পনা অঙ্কন করেছেন৷ যেমন:
ক. কলমীফুলের নোলক দেব, হিজল ফুলের দেব মালাঃ.
(‘রাখালী’)
খ. বধুর কোলেতে বধূয়া ঘুমায় খোলে না বাহুর বাঁধ৷
(‘তরম্নণ কিশোর’, রাখালী)
পলস্নীর মনোমোহন দৃশ্যপট বর্ণনায় জসীমউদ্দীন ধ্বনু্যক্তি-অলঙ্কারেরও ব্যবহার করেছেন সুকৌশলে৷ যেমনঃ
ক. তেপানত্মরের মাঠেরে ভাই, রোদ ঝিম ঝিম করে
(এক পয়সার বাঁশী)
খ. আরও দূরে সোঁ সোঁ নদী, মধ্যে বালুচর৷ (‘সকিনা’)
উপমা-অলঙ্কারকেও পলস্নীর রূপ-চিত্রণে ব্যবহার করেছেন জসীমউদ্দীন৷ উদ্ধৃতিঃ
ক. কাঁচা ধানের পাতার মতো কচিমুখের মায়া
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
খ. জালি লাউয়ের ডগার মতো বাহু দু’খান সরম্ন
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
সমাসোক্তির ব্যবহারে জসীমউদ্দীন সার্থক৷ পলস্নীর রূপ বর্ণনায় তিনি এ অলঙ্কারের ব্যবহার দেখিয়েছেন এমনি ছন্দ সহযোগেঃ
ক. সরষে ফুলের পাঁপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই
(‘রাখাল ছেলে’, রাখালী)
খ. হেমনত্মের চাঁদ অর্ধেক হেলি জ্যোত্‍স্নার জাল পাতি
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
পলস্নীর শ্রীদীপ্তি চিরনত্মনী স্বরূপ্য লাভ করেছে জসীমউদ্দীনের অপহৃূতি-অলঙ্কারের ব্যবহারশৈলীতে৷ উদাহরণঃ
মেয়ে ত নয়, হলদে পাখীর ছা
(‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
পলস্নীর সবুজ-সংস্থিতির বর্ণনাতে স্বভাবোক্তি অলঙ্কারের বিশুদ্ধ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন জসীমউদ্দীন৷ যেমনঃ
ক. এই এক গাঁও৷ ওই এক গাঁও-মধ্যে ধূ ধূ মাঠ
ধান-কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ৷ (‘নকসী কাঁথার মাঠ’)
খ. ছোট গেঁয়ো নদী, দুই ধারে লিখি নতুন ধানের লেখা (‘বিদায়, বালুচর)
গ. জাগে বনপথে কাননকুমারী ফুলের কৌটা খুলি
(‘আজি পুষ্পের জনমের তিথি’, ধানৰেত)

বিশেষ দৃকপাত্‍
দ্বিধাহীন সংলাপঃ ছন্দ-স্রোত তথা ছন্দ-বিনোদন কবি জসীমউদ্দীনের মত্তাসৌকর্যের নামানত্মর৷ পলস্নীর শ্যামলিম রূপ-মাধুর্য পলস্নী মানব-মানবীর আত্যনত্মিক প্রাণভূষণ, তাদের অনুভবকানত্মি- সকল কিছুরই বিশ্বসত্ম চিত্রার্পিত জসীমউদ্দীনের কাব্যকলায় সংন্যসত্ম হয়েছে৷ তা যে আধুনিক আর্থদলনীক্লিষ্টতা, অস্থির-অব্যবস্থা সমাজক্লিন্নতা-বিদূরণের যত্নময় মাধ্যম, তা বোধ করতে অসুবিধে হয় না৷ জসীমউদ্দীনের কাব্য পলস্নীবাংলার সাত্ব ও শাশ্বত প্রাণ-প্রণোদনারই সংবাহিকাশক্তির অমৃত-অাঁধার৷

তথ্যসূত্রঃ
১. ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসাহিত্যঃ সংজ্ঞা ও প্রকৃতি, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতাঃ ক্যালকাটা বুক হাউস, ১৯৫৪ খ্রিঃ পৃঃ ২৬৷
২. অ. ঐ. কত্‍ধঢ়ঢ়ব, ঝউঋগখ, চ-৪০৪ পুনঃউদ্ধৃতঃ সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, ঢাকাঃ সিটি লাইব্রেরী, ১৯৭৩ খ্রিঃ পৃঃ ৭৷
৩. সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত৷
৪. নকসী কাঁথার মাঠ সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্র থেকে উদ্ধৃত৷ জসীমউদ্দীন, যাদের দেখেছি, ঢাকাঃ প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী, ১৯৫২ খ্রিঃ পৃঃ ৮৪৷ জসীমউদ্দীন, ঠাকুরবাড়ীর আঙিনায়, পঞ্চম সংস্করণ, ঢাকাঃ পলাশ প্রকাশনী, ১৯৭৮ খ্রিঃ পৃঃ ৭৷ পুনঃ উদ্ধৃতঃ সেলিমা খালেক, জসীমউদ্দীনের কবিতাঃ অলঙ্কার ও চিত্রকল্প, প্রথম প্রকাশ, ঢাকাঃ বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩ খ্রিঃ পৃঃ ১২৷
৫. উঁংধহ তনধরত্‍ঃবষ, সোজন বাদিয়ার ঘাট (৭ম সংস্করণ, ১৯৬০ খ্রিঃ) কাব্যের পরিশিষ্টে সংযোজিত জসীমউদ্দীনের কবি-প্রতিভা সম্পর্কিত বক্তব্য দ্রষ্টব্য, পৃঃ ১৫০-৫২৷ পুনঃউদ্ধৃতঃ সেলিমা খালেক, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৮-১৯৷
৬. সুনীল, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৩২৷
৭. মুহম্মদ আব্দুল হাই, কবি জসীমউদ্দীন, ভাষা ও সাহিত্য, ৪৩, ঢাকাঃ বেঙ্গল পাবলিশার্স, ১৩৬৬, বঙ্গাব্দ, পৃঃ ২১৬-১৭৷
৮. মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম, ‘জসীমউদ্দীন ও তার কবিতা-একটি ভূমিকা’, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, দ্বিতীয় সংস্করণ; ঢাকাঃ পাকিসত্মান বুক কর্পোরেশন, ১৯৬৯ খ্রিঃ পৃঃ ১৫১৷
৯. সুনীল, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৩১৷
১০. কবি জসীমউদ্দীনের পত্র, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, স্মৃতিকথা, ঢাকা ডাইজেস্ট, ৫ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, জুন, ১৯৭৭ খ্রিঃ পৃৃঃ ৭১৷
১১. সুনীল, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৩৩৷
১২. জসীমউদ্দীন, জীবনকথা (১ম খণ্ড), তৃতীয় মুদ্রণ; ঢাকাঃ পলাশ প্রকাশনী, ১৯৭৬ খ্রিঃ পৃঃ ৪৯-৫০৷
১৩. জসীমউদ্দীন, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৪৷
১৪. এম, ইয়াসিন, ‘কবি জসীমউদ্দীন’৷ গ্রামের কথা (বিজয় সংখ্যা, ২য় বর্ষ, ১৬শ’ ও ১৭শ’ সংখ্যা, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা, ১লা ফেব্রম্নয়ারি, ১৯৬৫ খ্রিঃ পৃঃ ৮৷ পুনঃউদ্ধৃতঃ সেলিমা খালেক, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৩৷
১৫. জসীমউদ্দীন, যাঁদের দেখেছি, পৃঃ ১৬-২০৷
১৬. জসীমউদ্দীন, ঐ, পৃঃ ২৪৷
১৭. এম, ইয়াসিন, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১০৷
১৮. জসীমউদ্দীন, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৭২৷
১৯. সেলিমা খালেক, পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৮৷
২০. জসীমউদ্দীন, পূর্বোক্ত৷
২১. জসীমউদ্দীন, স্মরণের স্মৃতিবাহি, প্রথম প্রকাশ; ঢাকাঃ পলাশ প্রকাশনী, ১৯৭৮ খ্রিঃ পৃঃ ৫১৷

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ