প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label ইসলাম. Show all posts

Tuesday, July 24, 2012

রমজানের গুরুত্ব ও তাত্পর্য | শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক

রমজানুল মুবারক প্রতি বছর আসে উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য রহমত, মাগফেরাত ও কবর আজাব মুক্তির সুমহান বার্তা নিয়ে। এ মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় বান্দাদের জন্য খুলে দেন ফজিলতের অগণিত দ্বার। এ জন্য আমাদের সবার উচিত মহিমান্বিত এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।
রমজান মাসের ফজিলত ও বরকত সম্পর্কে রাসূলে করিম (স.)-এর অসংখ্য মহান বাণী তথা হাদিস ইরশাদ রয়েছে। যেমন বুখারি শরীফে ‘সওম’ তথা রোজা অধ্যায়ে প্রসিদ্ধ। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বরাতে বর্ণিত হয় : ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাস আরম্ভ হয়, তখন থেকে ঊর্ধ্ব জগতের (তথা রহমতের) দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয় (সে মতে বেহেশতের দরজাগুলোও খুলে দেয়া হয়) এবং জাহান্নামের সমুদয় দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় (অধিক দুষ্ট-ক্ষতিকর, নেতৃস্থানীয়)। শয়তানগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।
বক্ষমাণ হাদিসের এই বর্ণনায় ঊর্ধ্ব জগতের দরজাগুলো খুলে দেয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় রহমতের দরজা খোলার উল্লেখ আছে এবং আরেক বর্ণনায় বেহেশতের দরজা খোলার উল্লেখ আছে। সব বর্ণনার মূল তাত্পর্য একই। রমজান মাসে বিশেষরূপে অতিমাত্রায় এবং কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বিশেষত্ব লক্ষ্য না করে সর্বদা আল্লাহর রহমত ও নেয়ামতের প্রধান কেন্দ্র বেহেশতের দরজাগুলোও রমজান মাসের সম্মানার্থে খুলে রাখা হয়।
রমজান মাসের বিশেষত্ব হিসেবে বিশ্ববাসীর প্রতি যেমন রহমত অবতীর্ণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়, তেমনি রহমতের বিপরীত আল্লাহতায়ালার গজব ও আজাবের কারণ তথা শয়তানি আন্দোলন ও কার্যকলাপ কম করার ব্যবস্থাও করা হয়, বড় শয়তানগুলোকে বন্দি করে রাখা হয়।
আল্লাহতায়ালা সর্বশক্তিমান। শয়তানি আন্দোলন ও কার্যকলাপ সমূলে উচ্ছেদ করার ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে তিনি তা করতে পারেন। কিন্তু এতে জাগতিক জীবনের পরীক্ষার উদ্দেশ্য পণ্ড হয়, তাই আল্লাহতায়ালা তা করেন না। এ জন্যই ইবলিসের সাধারণ অনুচররা এবং মানুষের আকৃতিতে শয়তান প্রকৃতির ব্যক্তি ও মানুষের নফসে আম্মারা তদুপরি ১১ মাস শয়তানি আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া প্রভৃতির সক্রিয়তা বন্ধ করা হয় না। অবশ্য আল্লাহতায়ালা রমজান মাসের সম্মানার্থে স্বীয় বান্দাদের বিশেষ সুযোগ প্রদানার্থে নেতৃস্থানীয় বড় শয়তানগুলোকে বন্দি করেছেন। ফলে আল্লাহর প্রতি ধাবিত হওয়ার পথ ধরা সহজ হয়ে যায়। মানুষ যেন এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় না হারায়, সে জন্য করুণাময় আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে একজন ফেরেস্তা পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহর বান্দাদের প্রতিদিন এই আহ্বান জানাতে থাকে : ‘হে সত্যান্বেষী! সুপথের পথিক দ্রুত সম্মুখ পানে অগ্রসর হও; উন্নতি লাভ কর। হে কুপথগামী (হেলায় এ সুযোগ হারিও না)। এ পবিত্র রমজান মাসে স্বীয় আত্মসংশোধন ও পবিত্রতা লাভে সচেষ্ট হও এবং কুকার্য থেকে ক্ষান্ত হও, সতর্ক হও অর্থাত্ যেহেতু পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহতায়ালার রহমতের দরজাগুলো সর্বদা খোলা থাকে, রহমত লাভ করা সহজ-সুলভ হয়, তাই এ সুযোগের প্রতিটি মুহূর্তকে স্বীয় উন্নতির সম্বলরূপে গ্রহণ কর। আপন জীবনের উন্নতি সাধনে অগ্রসর হও, অগ্রণী হওয়ার চেষ্টা কর, যেরূপ কোনো ব্যবসায়ী স্বীয় ব্যবসার জন্য মৌসুম-সুযোগ ও মার্কেট, মেলা বা প্রদর্শনীকে উন্নতির বিশেষ সহায়ক ও সম্বলরূপে গ্রহণ করে থাকে।
পক্ষান্তরে রমজান মাসে অসত্যের ও কুপথের বড় আন্দোলনকারীরা আবদ্ধ রয়েছে, কুপথ থেকে ফিরে আসা ও কুকার্যকে ত্যাগ করা অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য হয়েছে। অসংখ্য বাধা-বিপত্তির উপশম হয়েছে ফেরার পথের বেড়াজালগুলোর লাঘব ঘটেছে। এই সুবর্ণ সুযোগকে হেলায় হারিও না। এই সোনালি সময়কে চৈতন্যহীন অবস্থায় অতিবাহিত কর না। সুযোগের সদ্ব্যবহার কর, অতীত জীবনের অন্ধকারময় পথে আর অগ্রসর হয়ো না! থামো। এই সুযোগে পেছনে ফেলে আসা আলোর পথে ফিরে আস।
আল্লাহতায়ালা কত মেহেরবান, করুণাময়! স্বীয় বান্দাদের সুযোগ দান করে সেই সুযোগের ঘোষণা এবং আহ্বান জানাচ্ছেন। শুধু এক দু’বার নয়, বরং সুযোগের প্রতিটি দিনই এই আহ্বান আসতে থাকে। যাদের রুহানি শ্রবণশক্তি আছে, তারা সরাসরি সেই আহ্বান শুনতে পারেন। যারা সেই স্তরে পৌঁছতে পারেননি, আল্লাহতায়ালা তাদের সত্য রাসুলের মারফত সেই আহ্বানের সংবাদ পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও ফজিলতপূর্ণ। তাই এ মাসের প্রতিটি ক্ষণ যাতে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। রমজান মাসে যাতে অবশ্যই কোনো ফরজ ইবাদত নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে যেমনি সচেতন থাকতে হবে, তেমনি নফল ইবাদতগুলোও বেশি বেশি আদায় করতে হবে।
নফল ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে মহত্তম ইবাদত হলো আল-কোরআন তেলাওয়াত, যে সব ফাজায়েলের কারণে রমজান মাস এত বরকতপূর্ণ মাসে পরিণত হয়েছে, তার মাঝে অন্যতম একটি কারণ এই যে, এই মাসে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে তার প্রিয় রাসুল (সা.)-এর ওপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআন নাজিলের মাস এই রমজানে সবার উচিত বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে রমজানের পালিত ইবাদতের সওয়াব ও প্রতিদান অনেক অনেক বেশি। হাদিস শরীফে এসেছে—অন্য যে কোনো সময়ের ফরজের যে সওয়াব রমজানের নফল পালনে সে সওয়াব পাওয়া যায়। সুতরাং ফরজ আদায়ের পাশাপাশি অধিক পরিমাণে নফলও আদায় করা দরকার।
এবাদত পালনের পাশাপাশি সব প্রকার পাপাচার ও গুনাহ থেকেও আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এ মাসে যাতে একটি গুনাহও না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, বিশেষত রোজা অবস্থায় যাতে কোনো গুনাহ না হয় এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আল্লাহপাক আমাদের রমজানের বরকত ও ফজিলত পরিপূর্ণ নসিব করুন এবং রোজাকে যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন ছুম্মা আমিন। 
অনুলিখন : মাওঃ গাজী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ
সূত্র : আমার দেশ

শ্রমিকের শ্রম কমিয়ে দিন রমজানে | মাওলানা মুহাম্মাদ

 খোদাভীতি ও তাকওয়া অর্জনের অপূর্ব সুযোগের মাস রমজান। আমাদের মুত্তাকি হওয়ার জন্যই আল্লাহতায়ালা আমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। কালামে পাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন—“হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পার” (বাকারা-১৮৪)। মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের অত্যন্ত কার্যকরী ও সহজ মাধ্যম হলো রোজা। রহমত, বরকত ও নাজাতের এ মাসে বড় বড় আমলের পাশাপাশি ছোট ছোট বহু আমলের মাধ্যমে আমাদের নাজাতের পথ সহজ করে দিয়েছেন। খুলে দিয়েছেন দুর্বল মানুষের মুক্তির অসংখ্য পথ। ঘোষণা করেছেন, ছোট ও সহজ একটি আমলও আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং নাজাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। একটি আমল হচ্ছে, কাজের লোক ও অধীনস্থদের প্রতি সদয় হওয়া। হজরত সালমান ফার্সি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে দাস,-দাসীদের, কাজের লোকদের কাজের বোঝা হালকা করে দেয়; আল্লাহ তাদের মাফ করে দেন এবং দোজখের আজাব থেকে নাজাত দান করেন।’ (মেশকাত, বায়হাকি)। ছোট্ট এই আমলটা ইচ্ছা করলে সহজেই আমরা করতে পারি। একটু লক্ষ্য করলেই হয়, আমার বাড়ির কাজের ছেলেটি বা মেয়েটির কাজ যদি সামান্য কমিয়ে দিই, তার প্রতি একটু সদয় হই; অফিসে কিংবা দোকানে যে লোকটি আমার অধীনে কাজ করে ইচ্ছা করলেই তার মাধ্যমে আমি নিশ্চিত দুটি পুরস্কার লাভ করতে পারি। ১. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ২. জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি। কত সহজ এ আমল! আমলের জন্য আপনার ইচ্ছেই যথেষ্ট। কাজের তাগিদে রমজানেও আমাদের যথারীতি ঘরের বাইরে যেতে হয়; সব সময়ের রুটিনের কাজ আনজাম দিতে হয়। নিজেদের দুর্বলতার দরুন অন্যের সহযোগিতা নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি এ হাদিসের কথা মনে রাখি তবে আমল করা খুবই সহজ। ধরুন, রিকশায় উঠে রোজাদার রিকশাচালকের প্রতি সদয় হয়ে একটু আস্তে চালাতে বললাম, সম্ভব হলে ভাড়াটাও একটু বাড়িয়ে দিলাম, এ মাসে কাজের লোকদের বেতনের প্রতি যথাসম্ভব বাড়তি খেয়াল রাখলাম। এভাবে কেউ যদি রাসুলে আরাবির এ হাদিস স্মরণ রাখেন এবং আমলের সুযোগ খুঁজতে থাকেন, দেখা যাবে নিজের অজান্তেই মাহে রমজানের এক একটি দিনের ছোট ছোট আমল তার জন্য বয়ে নিয়ে আসবে চূড়ান্ত সফলতা। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা অন্যের বেলায় এ কাজগুলো করি কিন্তু নিজের খুব কাছের-ঘরের মানুষের বেলায় তা ভুলে যাই। নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আচরণে সাধারণ সৌজন্যটুকুর কথাও মনে থাকে না। এদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি কাম্য।
মাহে রমজান আমাদের সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও সহমর্মী জীবনযাপনের মাধ্যমে সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাকওয়া হাসিলের পথ সহজ ও সুগম করে তুলুক। আমীন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষক
সূত্র : আমার দেশ

রমজান ও সিয়াম সাধনা | মুহিউদ্দীন খান


রোজা ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ এবং সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ ইবাদত। মানবদেহ জড় উপাদানে সৃষ্ট। এর চাহিদাও বিচিত্র। সে কারণে পাওয়া এবং ভোগ করার নেশা সর্বক্ষণ মানুষের সূক্ষ্ম আত্মিক অনুভূতিগুলোকে বিপর্যস্ত করে রাখে এবং আত্মাকে অনুভূতিহীন করে দেয়। ফলে উন্নততর মানবিক গুণগুলো দুর্বল এমনকি প্রাণহীন হয়ে পড়ে। মনুষ্যত্বের এ স্বভাবজাত পতন প্রতিহত করে বিবেক এবং হৃদয়-বৃত্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যেই বছরে এক মাস সিয়াম সাধনা অপরিহার্য করা হয়েছে। সিয়ামের সর্বপ্রথম শিক্ষা ভোগস্পৃহা নিয়ন্ত্রণ করে দেহমনকে ত্যাগের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। সুবহে সাদিকের আগমুহূর্ত থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও সম্ভোগ থেকে পরিপূর্ণরূপে বিরত থাকার নাম সিয়াম সাধনা। একই সঙ্গে শরীর এবং মনকেও আল্লাহতায়ালার নাফরমানি থেকে সচেতনভাবে দূরে রাখা সিয়াম পরিপূর্ণতা লাভ করার শর্ত।
সিয়াম ফরজ হয়েছে হিজরতের প্রায় দু’বছর পর, যখন মুসলমানরা মক্কার বৈরী পরিবেশ থেকে সরে এসে শঙ্কামুক্ত ও অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল জীবনে প্রবেশ লাভ করেছিলেন। তাদের ওপর তখন নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পিত হচ্ছিল। সমগ্র মানবজাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তখন তাদের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছে। এ গুরুভার পালন করার জন্য যে নৈতিক বল এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন, তা অর্জন করার পন্থারূপে আল্লাহপাক তাকওয়ার গুণ অর্জন বিধিবদ্ধ করেছেন। আর সে তাকওয়া অর্জনের প্রকৃষ্ট মাধ্যমরূপে চিহ্নিত করেছেন রমজানের রোজাকে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মুমিনরা! তোমাদের জন্য সিয়াম বিধিবদ্ধ করা হলো, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার (আল-বাকারা)।
নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোয় তাকওয়া শব্দের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, সহজ কথায় তা হচ্ছে এমন একটা চারিত্রিক শক্তি, যার মাধ্যমে নিজেকে সর্বক্ষণ মহাপরাক্রান্ত সৃষ্টিকর্তার সামনে সমুপস্থিত থাকার অনুভূতি জাগ্রত থাকে। আর এ অনুভূতির আলোকেই সর্বপ্রকার অনাচার থেকে আত্মরক্ষা সম্ভবপর হয়। আগের যুগেও যেসব নির্বাচিত জনগোষ্ঠীকে আল্লাহপাক মানবজাতির নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেছিলেন, তাদের জন্যও সিয়ামের সাধনা বিধিবদ্ধ ছিল বলে উপরোক্ত আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বস্তুত সিয়াম ফরজ করা সম্পর্কিত আয়াতটি এমনভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে, যাদ্বারা বোঝা যায়, এটি কোনো শাস্তি কিংবা চাপিয়ে দেয়া কঠিন কোনো পরীক্ষা নয়। বরং একটি বৃহত্তর কল্যাণ লাভ করার একটা সোপান মাত্র। ফলে আগের জমানার অনুগ্রহপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর মতোই আমাদের জন্যও এটি একটি বিশেষ অনুগ্রহের দান ছাড়া আর কিছু নয়।
রমজান এমন একটা মাসের নাম, যে মাসে আল্লাহতায়ালা মানবজাতির জন্য সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অনুগ্রহরাজি বর্ষণ করেছেন। এ মাসেই কোরআন নাজিল হয়েছে। বলা হয়েছে, রমজানই সেই তাত্পর্যপূর্ণ মাস, যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানবজাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য (আল-বাকারা)।
এ মাসের মধ্যেই এমন একটি রাত লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এখানে হাজার মাস বলতে এমন এক অনন্তকাল বোঝানো হয়েছে, যা গণনা করা সম্ভব নয়। এ রাতের সন্ধান লাভ এবং পূর্ণ আদবের সঙ্গে তা উদযাপন করার ফজিলতও এত ব্যাপক যা বর্ণনা করার ভাষা কারও জানা নেই। চার ধরনের পাপে লিপ্ত ব্যক্তি ছাড়া বাকি সবাইকে আল্লাহপাক এ রাতে ক্ষমা করে দেন। যারা শরাব পানে অভ্যস্ত, যারা মাতা-পিতার অবাধ্য ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে রয়েছে এবং যাদের অন্তরে অপরের প্রতিহিংসা-বিদ্বেষ ক্রিয়াশীল।
হাদিস শরিফে রমজান মাসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর প্রথম দশ দিন রহমতের, দ্বিতীয় দশ দিন ক্ষমার এবং তৃতীয় দশ দিন দোজখের আগুন থেকে মুক্তির। তত্ত্বজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী রোজাদাররা সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, যারা পাপ থেকে মুক্ত এবং অধীর আগ্রহে রমজানের জন্য অপেক্ষমাণ থাকে। রমজান এদের জন্য অফুরন্ত রহমতের বার্তা নিয়ে উপনীত হয়। দ্বিতীয়ত, যারা পাপে লিপ্ত, তবে রমজানের আগমন উপলক্ষে তওবা করতে থাকেন এবং পাপ থেকে দূরে সরার জন্য আল্লাহর কাছে তৌফিক ভিক্ষা করতে থাকেন। রমজানের প্রথম দশ দিন রোজা রাখার পর দ্বিতীয় দশ দিন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য ক্ষমার ঘোষণা শোনানো হয়।
তৃতীয়, ওইসব লোক, যাদের পাপের বোঝা অত্যন্ত ভারি। কিন্তু রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা তওবা করেন ও ভক্তিভরে রোজা রাখতে শুরু করেন। শেষ দশ দিনে উপনীত হওয়ার পর এসব লোকের জন্যও জাহান্নাম থেকে মুক্তি নছিব হয়ে যায়। সহিহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজানুল মোবারককে আল্লাহপাক নিজের মাসরূপে আখ্যায়িত করেছেন। ব্যাখ্যাকারদের ভাষায়, এ মাসে আল্লাহতায়ালার রহমত ও বরকত বৃষ্টি ধারার ন্যায় বর্ষিত হতে থাকে। এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তেই এমন মূল্যবান, যার বিকল্প চিন্তাও করা যায় না।
সাহাবি হজরত আবু হোরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একখানা হাদিসে রয়েছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়া যদি কেউ রমজান মাসের একটা রোজাও ভঙ্গ করে, তবে অবশিষ্ট সমগ্র জীবন রোজা রেখেও তার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হবে না (তিরমিযি, আবু দাউদ)। কারণ রমজান মাসে রহমতের যে প্লাবনধারা প্রবাহিত হয়, বছরের অন্য কোনো সময় তা কল্পনাও করা যায় না।
রোজাদার ব্যক্তির অনুভূতিতে সর্বক্ষণ আল্লাহপাকের সজাগ অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে। দারুণ তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েও সে নির্জন গৃহকোণে এক ফোঁটা পানিও গলাধঃকরণ করে না। অন্য কোনো ইবাদতের মধ্যে এমন সার্বক্ষণিক ও সতর্ক আত্মনিবেদন লক্ষ্য করা যায় না। অপরপক্ষে রোজা এমন একটা ইবাদত, যা রোজাদার ব্যক্তি নিজে প্রকাশ না করা পর্যন্ত অন্য কারও পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। এজন্যই বোধহয় আল্লাহপাকের তরফ থেকে বলা হয়েছে, রমজান আমার মাস এবং এর প্রতিদান আমি নিজের হাতেই দিব (বোখারি)।
রমজান আমল করার মাস। এর প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহপাকের বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করার এক মহা মৌসুম। হজরত সালমান ফারেসি (রা.) বর্ণিত একখানা হাদিসে বলা হয়েছে, রমজান মাসে প্রতিটি নফল ইবাদতের সওয়াব ফরজ আদায়ের সমান হয়ে যায়। আর প্রতিটি ফরজ ইবাদতের সওয়াব সত্তর গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয় (মেশকাত শরিফ)।
হজরত আবু হোরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে মকবুল (সা.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের একিনসহ রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি রমজানের রাত জাগরণ করে ইবাদতে লিপ্ত থাকে তারও পূর্ববর্তী সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি শবে কদরে ঈমান ও একিনের সঙ্গে ইবাদত করে তারও সব গোনাহ আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করে দেন (বোখারি ও মুসলিম)।
হজরত আবু হোরায়রা (রা.) আরও বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, মানুষের সব নেক কাজের সওয়াব ১০ থেকে ২৭ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। রমজানের এবাদত তার ব্যতিক্রম। আল্লাহতায়ালা বলেন, রোজা একান্তভাবে আমারই জন্য রাখা হয়। এ জন্য আমিই তার বদলা দেব। বান্দা আমার সন্তুষ্টির আশাতেই খাদ্য, পানীয় এবং সম্ভোগ বর্জন করে থাকে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। একটা ইফতার করার সময় এবং অন্যটা যখন সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত্ করবে। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও সুগন্ধযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। সবপ্রকার পাপ এবং অনাচার থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য রোজা ঢালস্বরূপ। তোমরা রোজা রেখে অশালীন এবং অপ্রয়োজনীয় বাক্যালাপ থেকে বিরত থাকবে। বকাঝকা করবে না। কাউকে গালি দেবে না। কেউ যদি গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে তবে তাকে এই বলে বিরত করবে যে, আমি রোজা রেখেছি (বোখারি মুসলিম)। লেখক : সম্পাদক, মাসিক মদীনা
সূত্র : আমার দেশ

নৈতিকতা নির্মাণে রোজা | মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী


রমজান মাস ইবাদতের বসন্তকাল। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগাতে এই মাসে ইবাদতে মত্ত হয়ে থাকেন। রমজান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই সারা মাসের জন্য শয়তানকে বেড়িবদ্ধ করা হয়। সে কারণে রমজানের বরকতস্বরূপ দ্বীনি পরিবেশের সৌন্দর্য পরিলক্ষিত হয়। আর এজন্যই রমজান মাস মানুষের মন ও আত্মাকে পরিশোধন করার শ্রেষ্ঠ সময়।
মানুষ তার পেট ও লজ্জাস্থানের চাহিদা মেটানোর তাড়নায় গোনাহ করে। তাই তাকওয়া অর্জনের নিমিত্তে এই দুই ধরনের গোনাহের উত্সকে দুর্বল করতে আল্লাহপাক রোজার বিধান দিয়েছেন। রোজার দাবি তাকওয়া অর্জন। আর এজন্য সব ধরনের গোনাহ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। এতে আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটবে, চারিত্রিক গুণাবলী উন্নত হবে, নিজেকে রক্ষা করতে পারবে অশুভের বিরুদ্ধে।
একজন রোজাদার রমজান মাসে তার প্রতিটি অঙ্গ বিশেষ করে হাত, পা, চোখ, মুখ, উদরকে অবৈধ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রেখে সংযমী হয়। ইচ্ছাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার শিক্ষা পায়। রোজা ধৈর্য, সংযম ও নৈতিক উত্কর্ষের জন্ম দেয়। শিষ্টাচারের মাধ্যমে নৈতিক চরিত্র গঠন রমজানের সিয়াম সাধনার একটি মৌলিক শিক্ষা। রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিন বান্দা হিংসা-বিদ্বেষ, কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা প্রভৃতি অন্যায় আচরণ পরিহার কর থাকে। ফলে কুপ্রবৃত্তির সব দেয়াল ভেঙে যায়। খারাপের ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায়। অন্তর নির্মল ও সুন্দর হয়।
রোজার মাসে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের দরজা খুলে দেন, জাহান্নামের দরজা বন্ধ রাখেন এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করে রাখেন। যার ফলে ইবাদত, জিকির-আজকার, কোরআন তেলাওয়াত, কৃচ্ছ্রতা সাধন ও আল্লাহর একনিষ্ঠ আনুগত্যের স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি হয়। রোজার মাধ্যমে মানুষের আত্মিক, দৈহিক, নৈতিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধি ঘটে। আসলে আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান রয়েছে, যারা খোদাভীরু, শুধু তারাই রোজা রাখতে সক্ষম হন। এভাবে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণেই রোজাদার খাঁটি মুমিন বান্দায় পরিণত হন। তাই রমজানের বড় প্রাপ্তি তাকওয়া। একজন আল্লাহপ্রেমিকের সওম হয় সব ধরনের পাপাচার থেকে মুক্ত।
প্রকৃত রোজাদার পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ছাড়াও শিরক, কুফর, বিদা’ত, হিংসা-লোভ, পরচর্চা ও পরনিন্দা থেকেও আত্মাকে পবিত্র রাখে, আল্লাহর প্রেমরঙে হৃদয় রাঙায়। কেবল তখনই একজন রোজাদার খুঁজে পায় নিজেকে, নিজের সত্তা ও আত্মপরিচয়কে।
রমজান চরিত্র মাধুর্যমণ্ডিত করার সময়, আত্মাকে শাণিত করার সময়, কুপ্রবৃত্তিকে দমন করার সময়, অন্তরকে ধূয়ে-মুছে পূত-পবিত্র করে আধ্যাত্মিকতার নূর জ্বালানোর সর্বোত্তম সময়। এ মাসে আমাদের চলার পথ ও পদ্ধতি কোরআন ও সুন্নাহর ছাঁচে গড়ে তোলার এবং সালফে সালেহিনদের নমুনায় ঢেলে সাজানোর মোক্ষম সময়। তাই হেনরি সুর বলেছেন, মানুষের চরিত্র গঠনে রোজা খুবই ফলদায়ক ব্যবস্থা। বিখ্যাত চিকিত্সক ডা. এমারসন বলেন, রোজা মানুষের মনের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। যেমন—কর্মে মনোযোগ আসে, পশুত্ব দূরীভূত হয়, সমাজ গঠনে সহায়তা করে। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন, সিয়াম মুসলমানদের কেবল পরকালের মুক্তির পথ দেখায় না, নৈতিক চরিত্র গঠনেও এর দারুণ ভূমিকা রয়েছে। রোজা ভালো মনের ভালো মানের মানুষ গঠনে অবিশ্বাস্য ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের সুস্থ, সুন্দর দেহ-মন ও স্বাস্থ্য নিয়ে অতি সহজ ও শান্তিময় জীবন গড়ার ব্যবস্থা হিসেবে মহান আল্লাহ তায়ালা রোজা ফরজ করেছেন। ‘তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে... যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পার।’ (সূরা বাকারা-১৮৩)। মূলত ভালো মনের ভালো মানের মানুষ গঠনে খোদাভীরুতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

সূত্র : আমার দেশ

Friday, June 8, 2012

পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের দিকনির্দেশনা | মুহাম্মদ আমিনুল হক

বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ চলছে। প্রত্যেক বছর পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে চলছে অনেক প্রোগ্রাম। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক দেশই এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। অনেকেই আতঙ্কে আছেন ভবিষ্যত্ বিপর্যয়ের কথা ভেবে। ২০০৯ সালের ১৭ অক্টোবর মালদ্বীপে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে সাগরের তলদেশে ব্যতিক্রমধর্মী মন্ত্রিসভার বৈঠকের আয়োজন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে মালদ্বীপ রাষ্ট্রটি পানির নিচে হারিয়ে যেতে পারে, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা যদি কোরআন-হাদিস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই পরিবেশ সংরক্ষণকে বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চৌদ্দশ’ বছর আগে এ ব্যাপারে ইসলাম যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে তা আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি।
পরিবেশ কী : পরিবেশ হলো কোনো স্থান বা অঞ্চলের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, যার মধ্যে বসবাস করে মানুষ জীবনধারণ করে। অর্থাত্, পরিবেশ বলতে একটি এলাকার সামগ্রিক প্রাকৃতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থানকে বোঝায়, যার মধ্যে বসবাস করে ওই স্থানের জনগণ জীবিকা নির্বাহ করে। জলবায়ু, ভূ-প্রকৃতি, নদ-নদী, জলাশয়, বনভূমি, ভূমির উর্বরতা, প্রাকৃতিক অবস্থা এবং সরকার, রাজনীতি, জাতি, ধর্ম, জনসংখ্যা, শিক্ষাদীক্ষা, প্রভৃতি অপ্রাকৃতিক অবস্থা নিয়ে গঠিত হয় কোনো স্থানের পরিবেশ। আমরা এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
ইসলামে পরিবেশের গুরুত্ব : ইসলাম পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মিসরের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা সাইয়েদ তানতাবী তাঁর এক বইতে লিখেছেন যে, আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের মধ্যে পাঁচ শতবার পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য উত্সাহিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে বলেছেন, এই পৃথিবী তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা একে আবাদ কর। তিনি বলেন : ‘তিনিই যমীন হতে তোমাদেরকে পয়দা করেছেন এবং তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন’ (সুরা হুদ : ৬১)। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবী আবাদ হতে পারে; মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে পারে। আর পরিবেশ যখন সংরক্ষণ করা হবে না তখন এই দুনিয়া বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
জলবায়ু : পৃথিবী মানুষের বসবাসযোগ্য থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বস্তু হচ্ছে পানি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ষাটটি আয়াতে পানির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : ‘সারা পৃথিবীর যত বস্তু সবগুলো আমি তৈরি করেছি পানি হতে’ (সুরা আল আম্বিয়া : ৩০)। দুনিয়ায় যা কিছু প্রাণ পেয়েছে তা কেবল পানি থেকেই পেয়েছে। তাই পানি আমাদের জীবনে মহামূল্যবান সম্পদ। বর্তমান বিজ্ঞান কোরআনের তত্ত্বকে গ্রহণ করেছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় প্লাটাপ্লাজম থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের সৃষ্টি। আর প্লাটাপ্লাজমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি এমন একটি উপাদান যাতে রয়েছে কিছুটা আর্দ্রতা ও কিছুটা পানি। পানি একটি মৌলিক উপাদান। এই উপাদানকে সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (স.) পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে বলেছেন।
পাহাড়-পর্বত : আল্লাহতায়ালা পাহাড়-পর্বতকে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে পাহাড়-পর্বতের কথা বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা পাহাড়-পর্বত সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন : ‘আর পাহাড়কে আমি পেরেক হিসেবে সৃষ্টি করেছি’ (সুরা আন নাবা : ৭)।
পাহাড়-পর্বত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। জমিনকে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচানোর জন্যই এই পাহাড়ের সৃষ্টি। আল্লাহতায়ালা গোটা দুনিয়াকে হেফাজতের জন্য যেখানে যতটুকু পাহাড় তৈরি করা দরকার সেখানে ততটুকু তৈরি করেছেন। বর্তমানে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পাহাড় কাটাকে পরিবেশের জন্য হুমকি মনে করছেন। সব দেশেই পাহাড়-পর্বত কাটা নিষিদ্ধ।
গাছপালা : গাছপালা ও বনজঙ্গল আমাদের জীবনে আল্লাহর বড় দান। আল্লাহতায়ালা এগুলো দান করে আমাদের জীবনকে ধন্য করেছেন। গাছপালা, বনজঙ্গল, তরুলতা ও উদ্ভিদ মানুষের জীবনের বড় অনুষঙ্গ। মানুষের জীবন এগুলো ছাড়া কল্পনা করা যায় না। প্রাণীকূল অক্সিজেন ছাড়া বাঁচে না। আর এ অক্সিজেনের সম্পূর্ণটাই আসে গাছপালা থেকে। গাছ ছাড়া মানুষের জীবন তাই অর্থহীন। মানুষের পরম বন্ধু এ গাছ সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসুল (স.) আমাদেরকে বৃক্ষরোপণ ও এর যত্ন নিতে বলেছেন।
জীববৈচিত্র্য : আল্লাহপাক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পাখ-পাখালী, পশু, হিংস্র জন্তু, বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছু সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়। যেই এলাকার জন্য যতটুকু বিষাক্ত জন্তু সৃষ্টি করা প্রয়োজন আল্লাহ ততটুকুই সৃষ্টি করেছেন। এরা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ধ্বংস করে। এজন্য নবী (স.) বিষাক্ত সাপকেও বিনা কারণে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। অতএব, আমরা যদি পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা মানতে পারি তাহলে আমাদেরই কল্যাণ হবে। অন্যথায় আমরা নিজেরাই আমাদের মরণ ডেকে আনব। আমাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পতিত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

সুত্র : আমার দেশ

ইখলাস : সৎকর্মেরর প্রাণ | কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক

প্রতিটি কাজের ধারণা অথবা আদেশ অথবা প্রারম্ভ প্রক্রিয়া যেখান থেকেই আসুক না কেন, সিদ্ধান্ত নিতে হয় ব্যক্তিকেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে এ নিয়ে ভাবতে হয়, ভালো-মন্দ ফলাফলেরও একটা অগ্রিম রূপ দেখে নেয় মনে মনে। এঁকে নেয় কর্মনীতি ও কর্মপন্থার রূপরেখা। তবে সবকিছুই নির্ভর করে এমন এক মৌলিক গুণের ওপর, যার নাম নিয়ত বা সংকল্প অথবা ইচ্ছা। এই নিয়ত বা ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতেই মোড় নেয় কাজের ধরন, গতি, ধারা এবং ফলাফল। ভালো ও মন্দ কাজের শুরুটা মূলত নিয়তের দ্বারাই হয় এবং ইচ্ছার প্রভাবেই বিভাজিত হয়।
ইখলাস বলতে যা বোঝায় তা হলো ইচ্ছার স্বচ্ছতা বা একনিষ্ঠতা। পৃথিবীর যে কোনো আদর্শে, যে কোনো কাজে—চাই তা ভালো হোক কিংবা মন্দ, ইখলাসই পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের দোরগোড়ায়। দোরগোড়ায় এ জন্য যে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো কার্যের সফলতা ভাগ্যে না থাকলে সঠিক ইখলাস ও কর্মতত্পরতা সত্ত্বেও ব্যক্তি ব্যর্থ হয়। এটা একান্তই তাকদিরের বিষয়। কিন্তু ব্যক্তির উচিত যে কর্ম সাধন করার ইচ্ছা বা নিয়ত করেছে, তাতে পরিপূর্ণ আন্তরিক হওয়া, বিশুদ্ধতা পোষণ করা। আর সত্ কার্যাবলীর ক্ষেত্রে তো এর কোনো বিকল্প নেই। কেননা, সত্ কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার প্রধান শর্তই হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, সব কাজের প্রতিফল কেবল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিয়ত অনুসারে তার কাজের প্রতিফল পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সন্তুষ্টির) জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ ও রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। পক্ষান্তরে যার হিজরত দুনিয়া হাসিল করা কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হবে, তার হিজরত সে লক্ষ্যেই নিবেদিত হবে। [বুখারি : ১/২(১), মুসলিম : ৬/৪৮(১৯০৭)] পবিত্র কোরআনে ইখলাস সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। যথা—বলো, ‘তোমরা কি আমাদের সঙ্গে আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করছ অথচ তিনি আমাদের রব ও তোমাদের রব? আর আমাদের জন্য রয়েছে আমাদের আমলগুলো এবং তোমাদের জন্য তোমাদের আমলগুলো এবং আমরা তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ। ( সূরা বাকারা : ১৩৯ ) অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন—জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদত—আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদত করি যে, তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে, আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। (সূরা আয-যুমার : ৩) ‘নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না। (১৪৫) তবে যারা তাওবা করে নিজদের শুধরে নেয়, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং আল্লাহর জন্য নিজেদের দীনকে খালেস করে, তারা মুমিনদের সঙ্গে থাকবে। আর অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের মহাপুরস্কার দান করবেন। (১৪৬) ( সূরা আন-নিসা : ১৪৫-১৪৬)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—‘তুমি কি দেখনি যে, নৌযানগুলো আল্লাহর অনুগ্রহে সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তাঁর কিছু নিদর্শন তোমাদের দেখাতে পারেন। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। আর যখন ঢেউ তাদের ছায়ার মতো আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদের উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ (ঈমান ও কুফরির) মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফির ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না। (সূরা লুকমান : ৩১-৩২)
কর্মের সঙ্গে ইখলাসের সংযোজন যে কত বড় মহা সাফল্য এনে দিতে পারে মুমিনের ইহ ও পরজীবনে, তা নিম্নের হাদিস থেকে অনুধাবন করা যাবে : ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : (রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রব থেকে বর্ণনা করেছেন : তিনি বলেন, আল্লাহ্ ভালো এবং মন্দ লিখে দিয়েছেন, তারপর তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। অতএব, যে কেউ কোনো সত্কাজের ইচ্ছা করে তা না করলেও আল্লাহ তাকে পূর্ণ কাজের সওয়াব দেবেন। আর যদি সে সত্ কাজের ইচ্ছা করে এবং বাস্তবে তা করেও ফেলে, আল্লাহ্ তার জন্য দশ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত; এমনকি এর চেয়েও অধিক সওয়াব লিখে দেন। আর যে কেউ কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছা করার পর যদি তা না করে, তবে আল্লাহ্ তার বিনিময়ে তাকে পূর্ণ কাজের সওয়াব দেন। পক্ষান্তরে যদি সে মন্দ কাজের ইচ্ছা করে এবং কাজটা করেই ফেলে, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য একটি মাত্র গোনাহ্ লেখেন।) [বুখারি : ৬৪৯১, মুসলিম : ১৩১]
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—একটি সেনাদল কাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আক্রমণ চালাতে যাবে। তারা যখন সমতলভূমিতে পৌঁছবে, তখন তাদের সামনের ও পেছনের সব লোকসহ ভূমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে। হজরত আয়েশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন : হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে আগের ও পরের সব লোকসহ তাদের ধসিয়ে দেয়া হবে? যখন তাদের মধ্যে অনেক শহরবাসী থাকবে এবং অনেকে স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে তাদের সঙ্গে শামিল হবে না? রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আগের ও পরের সব লোককেই ভূমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর লোকদের নিয়ত অনুসারে তাদের পুনরুত্থিত করা হবে। [বুখারি : ৩/৮৬(২১১৮) ও মুসলিম : ৮/১৬৮ (২৮৮৪)] এখানে শব্দাবলী শুধু বুখারি থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক যুদ্ধে শরিক হলাম, তখন তিনি বলেন, মদিনায় এমন কিছু লোক রয়েছে, তোমরা যেখানেই সফর কর এবং যে উপত্যকা অতিক্রম কর, সেখানেই তারা তোমাদের সঙ্গে থাকে। রোগ-ব্যাধি তাদের আটকে রেখেছে। (মুসলিম) অন্য বর্ণনা মতে, তারা সওয়াবে তোমাদের সঙ্গেই শরিক থাকবে। ইমাম বুখারি এই হাদিসটি হজরত আনাস (রা.) থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : আমরা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তিনি বলেন : আমরা মদিনায় আমাদের পেছনে এমন কিছু লোক রেখে গিয়েছিলাম, আমরা যে গিরিপথ এবং যে ময়দানই অতিক্রম করেছি, তারা (যেন) আমাদের সঙ্গেই ছিল। এক ধরনের ওজর তাদের আটকে রেখেছে।
হজরত আবু ইসহাক সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্ আস (রা.) বর্ণনা করেন : “আমি বিদায় হজের বছরে খুব কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজখবর নিতে এলেন। আমি নিবেদন করলাম : হে আল্লাহর রাসুল! আমার রোগের তীব্রতা আপনি লক্ষ্য করছেন। আমি অনেক ধন-মালের অধিকারী। কিন্তু আমার উত্তরাধিকারী শুধু আমার মেয়েই। এ অবস্থায় আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদকা করে দিতে পারি? রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘না’। আমি নিবেদন করলাম : ‘তাহলে অর্ধেক পরিমাণ (দান করে দেই)? তিনি বলেন : না। আমি আবার নিবেদন করলাম, ‘তাহলে এক-তৃতীয়াংশ (দান করে দেই)? তিনি বলেন : ‘হ্যাঁ, এক-তৃতীয়াংশ দান করতে পার।’ অবশ্য এটাও অনেক বেশি অথবা বড়। তোমাদের উত্তরাধিকারীদের একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় না রেখে তাদের বিত্তবান অবস্থায় রেখে যাওয়াই শ্রেয়, যেন তাদের মানুষের সামনে হাত পাততে না হয়। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছুই ব্যয় করবে, এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে খাবার তুলে দেবে, তার সবকিছুরই সওয়াব (প্রতিদান) তোমাকে দেয়া হবে। এরপর আমি (বর্ণনাকারী আবু ইসহাক) বললাম : হে আল্লাহর রাসুল! আমার সঙ্গী-সাথীদের (মদিনায়) চলে যাওয়ার পর আমি কি পেছনে (মক্কায়) থেকে যাব? তিনি বললেন: পেছনে থেকে গেলে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কাজই করবে, তাতে তোমার সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত বেড়ে যাবে। আশা করা যায়, তুমি দীর্ঘ জীবন লাভ করবে। ফলে কিছু লোক তোমার দ্বারা উপকৃত হবে, আবার অন্য কিছু লোক তোমার দ্বারা কষ্ট পাবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবিদের হিজরত পূর্ণ করে দাও এবং তাদের ব্যর্থতার কবল থেকে রক্ষা কর।” তবে সা’দ ইবনে খাওলা যথার্থই কৃপার পাত্র। মক্কায় তার মৃত্যু ঘটলে রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মর্মে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন যে, তিনি হিজরতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। [বুখারি : ১/২২(৫৬) ও মুসলিম : ৫/৭১(১৬২৮)(৫)]
ভালো কাজ কমবেশি সব মানুষই করে থাকে। যারা দুনিয়ার জীবনকেই একমাত্র জীবন মনে করে, মৃত্যুকেই মানবের নিঃশেষ বলে বিশ্বাস করে কিংবা সত্য দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের সত্কর্মের ফলাফল কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ্ দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। কেননা, আখেরাতে প্রতিদান পেতে হলে শর্ত হলো সত্কর্মের সঙ্গে ঈমানের সংযুক্তি। অতএব, যারা সত্কর্ম শুধু জনকল্যাণ, সততার বহিঃপ্রকাশ কিংবা একান্ত নিজস্ব প্রয়োজনে সম্পাদন করে থাকে তারা পার্থিবতায় যা পায় একজন ঈমানদার ব্যক্তিও তা থেকে বঞ্চিত হন না। পার্থক্য হলো মুমিন ব্যক্তি তার ঈমানের দাবি হিসেবে, তার প্রভুর আদেশ হিসেবে এবং তার আখিরাতের পুঁজির অতিরিক্ত কিছু হিসেব করেই সত্কর্মের নিয়ত বা ইচ্ছা করে থাকে। তাই উভয়ের কর্ম এক হলেও প্রতিদানের পার্থক্য ব্যাপক। তদুপরি মুমিনদের মধ্য থেকে কেউ যদি সত্কর্মের জন্য অসত্ নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ না করে, কপটতা করে, কূটকৌশল সম্পাদনের জন্যই সত্কর্ম করে কিংবা ইত্যকার যাবতীয় ইখলাস পরিপন্থী ইচ্ছার ফলে সত্কর্ম সম্পাদন করে, তবে তার এই সত্কর্ম দুনিয়ার উদ্দেশ্য সফল করতে পারলেও আখেরাতে তা কোনোই কাজে আসবে না; বরং অসত্ উদ্দেশ্যে সাধিত সত্কর্মই তার জন্য পাপ বয়ে আনবে ও জাহান্নামের কারণ হয়ে যাবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

সূত্র : আমার দেশ

Thursday, January 26, 2012

ইসলামে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন || শাহ আব্দুল হান্নান

সমাজে নারীর অবস্থান এবং অধিকার নিয়ে আমরা নানা কথা শুনে থাকি৷ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে বর্তমানে যে কথাগুলো বলা হয় , তার মধ্যে অনেকগুলোই গ্রহণযোগ্য৷ আবার কিছু কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ আছে৷ নারী-পুরুষ সকলেরই অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া অনস্বীকার্য৷ কারণ সমাজ দিনে দিনে সামনে এগুচ্ছে৷ তাই শুধু নারী বা পুরুষের নয়, বরং সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে৷
গত পঞ্চাশ বছরে সমাজ অনেকটা এগিয়েছে৷ এ সময়ে পুরুষের সাথে নারীরাও সমান-সমান না হলেও, এগিয়ে এসেছে৷ বেগম রোকেয়ার সময়ে যে সমাজ ছিল , সে সমাজকে আমরা অনেক পেছনে ফেলে এসেছি৷ তিনি দেখেছিলেন যে, সে সময়ে মেয়েরা লেখাপড়ার কোন সুযোগই পেতনা৷ সে সময়ে বেগম রোকেয়া জন্ম না নিলে এবং নারী শিক্ষার ব্যাপারে সাহসী উদ্যোগ না নিলে আজ আপনারা, নারীরা কেউই কিন্তু পড়ালেখা শিখতে পারতেন না৷ অবশ্য আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই তখন অন্য কোন নারীকে পৃথিবীতে পাঠাতেন যিনি এই কাজটি করতেন৷ যা হোক, আমি সেদিকে গেলাম না৷ কারণ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমার আলোচনা শেষ করতে চাই৷
সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে আমাদের দেশে মানুষের উপর, বিশেষ করে নারীর উপর যে অত্যাচার চলছে তার একটা ফাউন্ডেশন আছে , ভিত্তি আছে৷ অত্যাচারটা আকাশ থেকে আসছে না৷ নারীর উপরে পুরুষের , কোন কোন ক্ষেত্রে নারীর যে অত্যাচার তার 'আইডিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশন' টা হলোঃ সাধারণভাবে মানুষ বিশ্বাস করে- বিশেষ করে পুরুষরা বিশ্বাস করে যে- নারী পুরুষের চেয়ে ছোট , তাদের কোয়ালিটি খারাপ এবং তারা নিচু৷ এই বিশ্বাস অবশ্য নারীর মধ্যেও কিছুটা বিদ্যমান৷ মানুষের মধ্যে কতগুলো বিভ্রান্তি থেকে এ বিশ্বাসের জন্ম৷ আর এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে নারীর উপর অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন৷
এখন আমাদের দেশ থেকে যদি নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হয়, তবে ইসলামকে বাদ দিয়ে তা করা যাবে না৷ আমি এটা খুব পরিষ্কারভাবে আপনাদের বলতে চাই যে , ইসলামকে বাদ দিয়ে আমাদের মত দেশে (যে দেশে মূলত নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম) চলা যাবে না৷ যারা ইসলাম থেকে বিদ্রোহ করেছে তারা কিন্তু টিকতে পারেনি , পারছে না৷ এক মহিলা বিদ্রোহ করেছিলেন-আমি নাম বলবো না- তার পরিণতি ভাল হয়নি৷ খারাপ হয়েছে৷ বিনীতভাবে বলতে চাই যে , ইসলামের 'ফ্রেমওয়ার্ক'- এর মধ্যে আমরা যদি এগুতে পারি, তবে তা সব চাইতে ভাল হবে৷ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ইসলামে এরকম একটি 'ফ্রেমওয়ার্ক' আছে, যা নারীদের সামনে এগিয়ে দিতে পারে৷
আমি ইসলামকে বিকৃত করতে চাইনা, বিকৃত করার পক্ষেও নই এবং ইসলামের কোনো টেম্পোরারী ব্যাখ্যা দেয়ার পক্ষে নই৷ সত্যিকার অর্থেই ইসলাম নারীকে ক্ষমতায়িত করেছে এবং নারীকে সম্মানিত করেছে৷ নারীকে অধিকার দিয়েছে৷ সেগুলো ব্যাখ্যা করার আগে আমি আইডিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশন-এর নতুন ভিত্তি যেটা হতে পারে সেটা বলতে চাই৷
কি সেই ভিত্তি? যে ভিত্তির ওপর নারী-পুরুষের মৌলিক সাম্য বিদ্যমান? আল্লাহ মানুষের চেহারা এক রকম করেন নাই৷ সকল দিক থেকে রহ in every dot যে কোনো দু'টি মানুষ সমান নয়৷ ওজন, উচ্চতা, রঙ, শিক্ষা ইত্যাদি সবকিছুতে একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ আলাদা৷ কিন্তু মৌলিকভাবে প্রতিটি মানুষ সমান৷ আল্লাহ্র কাছে সমান৷ তার চারটি প্রমাণ আমি আপনাদের দিচ্ছি৷
১. আল্লাহ তায়ালা এ কথা খুব স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, মূল মানুষ হচ্ছে ' রূহ' ৷ যাকে আমরা ' আত্মা' বলি৷ মূল মানুষ কিন্তু শরীর না৷ দেহ তো কবরে পঁচে যাবে৷ আমরা যারা ইসলাম বিশ্বাস করি তারা জানি , মূল মানুষ হচ্ছে ' রূহ' ৷ আল্লাহ সকল মানুষকে, তার রূহকে একত্রে সৃষ্টি করেন, একই রকম করে সৃষ্টি করেন এবং একটিই প্রশ্ন করেন৷ আল্লাহর প্রশ্নের উত্তরও নারী-পুরুষ সকলে একই দিয়েছিল৷ আমি সূরা আরাফের একটি আয়াত বলিঃ ( বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) ' ওয়া ইজা আখাজা রাব্বুকা' ( যখন আল্লাহ তায়ালা বের করলেন), ' মিম বানি আদামা' ( আদমের সন্তানদের থেকে), ' মিন জুহুরিহিম' ( তাদের পৃষ্ঠদেশ থেকে-এটা একটা রূপক কথা) ' জুররিয়াতাহুম' ( তাদের সন্তানদেরকে৷ অর্থাত্‍ সকল আত্মাকে) এবং সাক্ষ্য নিলেন তাদের ওপরে , 'আমি কি তোমাদের প্রভু নই?' তারা সকলে বললো- সকল পুরুষ এবং নারী বললো, ' বালা' ( হ্যাঁ), ' সাহেদনা' ( আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আমাদের প্রভু)৷ ( আয়াত নং-১৭২, সূরা আরাফ) তার মানে আল্লাহ্র সঙ্গে একটি পয়েন্টে সকল নারী এবং পুরুষের একটি চুক্তি হলো যে, আপনি আমাদের প্রভু; আমরা আপনাকে মেনে চলবো৷ এক্ষেত্রে পুরুষের চুক্তি আলাদা হয়নি৷ নারীর চুক্তি আলাদা হয়নি৷ সুতরাং আমরা দেখলাম , আমাদের Ideological foundation এর প্রথম কথা হচ্ছে এই যে, মূল মানুষ হচ্ছে ' রূহ' এবং তা সমান৷ এই সাম্যের পরে যদি কোনো অসাম্য থেকে থাকে তাহলে তা অত্যন নগন্য Insignificant, Very Small ; তার মানে হচ্ছে , মানুষের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এক এবং সে মানুষ হিসেবে এক৷ এটি হলো নারী-পুরুষের সাম্যের প্রথম ভিত্তি৷
২. আমরা পুরুষরা গর্ব করি যে, আমাদের শারীরিক গঠন বোধহয় নারীর তুলনায় ভালো, আল্লাহ বোধহয় আমাদেরকে তুলনামূলকভাবে শ্রেষ্ঠ করে বানিয়েছেন এবং মেয়েরা আনকোয়ালিফায়েড৷ কিন্তু আল্লাহ একটি কথা কোরআনে খুব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে , সকল মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু প্রতিটি মানুষ ফার্ষ্ট ক্লাশ৷ যারা নামাজ পড়েন তারা এই আয়াতটা জানেন , সূরা ' ত্বীন'- এ আল্লাহ বলছেন (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) ' লাকাদ খালাক্বনাল ইনছানা ফি আহছানি তাক্বওয়ীম' ( নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামোতে-পুরুষকে বলেন নাই)৷ তার মানে আমাদের গঠনে পার্থক্য আছে , আমরা এক না, আমরা ভিন্ন কাঠামোর৷ কিন্তু সবাই ফার্ষ্ট ক্লাস, স-বা-ই ফার্ষ্ট ক্লাস ৷ সুতরাং নারী-পুরুষের মৌলিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য, নতুন নারী আন্দোলনের জন্য অথবা নতুন মানব আন্দোলনের জন্য পুরুষদের এ কথা বলা ঠিক না যে , মেয়েদের স্ট্রাকচার খারাপ৷ আল্লাহ্ তাতে অসন্তুষ্ট হবেন৷ আপনারা যারা মোমেন, যারা বিশ্বাসী-তারা এ কথা বলবেন না৷ সুতরাং নারী-পুরুষের মৌলিক সাম্যের এটা হলো দ্বিতীয় প্রমাণ৷ মৌলিক এ কারণে বলছি যে , নারী-পুরুষের মধে ছোটোখাটো পার্থক্য বিদ্যমান৷
৩. আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলছেন যে, সকল মানুষ এক পরিবারের৷ আদম এবং হাওয়া পরিবারের৷ সূরা নিসার প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলছেন , "হে মানব জাতি , সেই রবকে তুমি মানো যিনি তোমাদেরকে একটি মূল সত্ত্বা (নফস) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সত্ত্বা থেকে তার সাথীকে সৃষ্টি করেছেন এবং এই দুই জন থেকে তিনি অসংখ্য নারী ও পুরুষ সৃষ্টি করেছেন"৷ তার মানে আমরা এক পরিবারের৷
আমরা হচ্ছি বনি আদম৷ আদমের সন্তান৷ আল্লাহ পাক কোরআন শরীফে অন্ততঃ ২০/৩০ বার বলেছেন , ' ইয়া বনি আদামা' ( হে আদমের সন্তানেরা)৷ বাপ-মা এবং সন্তানেরা মিলে যেমন পরিবার তৈরী হয়, তেমনি ইসলামের দৃষ্টিতে মানব জাতি একটি পরিবার৷ সব পরিবারের ওপর হলো মানব জাতির পরিবার৷ তার মানে আমাদের মৌলিক সম্মান ও মর্যাদা , তা সমান৷ ছোট খাটো কারণে আমাদের মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়৷ তবে জাগতিক মর্যাদা আসল মর্যাদা না৷
আইনের ভাষায় যেমন বলা হয়, আইনের চোখে সকল মানুষ সমান, তেমনি আল্লাহর কাছেও সবাই সমান৷ আল্লাহ্র কাছে সম্মানের একমাত্র ভিত্তি হলো ' তাক্বওয়া' ৷ আল্লাহ বলেন নাই যে, তার কাছে পুরুষ সম্মানিত বা নারী সম্মানিত৷ আল্লাহ বলছেন, ' ইন্না আকরামাকুম ইন্দাল্লাহি (আল্লাহর কাছে), ' আতক্বাকুম' ( যে মেনে চলে আল্লাহকে)৷ আল্লাহ্র কাছে যদি মর্যাদার এই ভিত্তি হয়, তাহলে মানুষের পার্থক্যে কি কিছু যায় আসে? আল্লাহ বলছেন তিনি ' তাক্বওয়া' ছাড়া (আল্লাহকে কে মানে আর কে মানেনা) কোনো পার্থক্য করেন না৷ অতঃপর আমরা এক পরিবারের সন্তান, আমাদের মৌলিক মর্যাদা সমান৷ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-১৩) আরেকটি কথা, কোরআনের সূরা নিসার একটি আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ বলছেন "এবং ভয় পাও সেই আল্লাহকে বা মান্য করো সেই আল্লাহকে , যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার দাবী করে থাক৷ এবং ভয় পাও ' গর্ভ'- কে বা ' মা'- কে৷ আল্লাহ বলছেন ' গর্ভ'- কে ভয় পাও৷ কোরআন শরীফের এই আয়াতটির তফসিরে সৈয়দ কুতুব নামে মিশরের একজন বিখ্যাত আলেম লেখেন , এই ভাষা পৃথিবীর কোনো সাহিত্যে কোরআনের আগে লেখা হয় নাই৷ আল্লাহ ' গর্ভ '-কে ভয় করতে বলে মা '- কে সম্মান করার কথা বলেছেন, নারী জাতিকে সম্মান করার কথা বলেছেন৷ সুতরাং আমাদের মৌলিক সামাজিক মর্যাদা এক্ষেত্রেও সমান বলে প্রতীয়মান হলো৷ এটা আমাদের নতুন আইডিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশনের তৃতীয় প্রমাণ৷
৪. আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সময় বলে দিলেন যে, " তোমরা সবাই খলিফা"৷ তিনি বললেন, " ইন্নি জায়লুন ফিল আরদে খলিফা"৷ আল্লাহ বলেন নাই যে, নারী পাঠাচ্ছেন বা পুরুষ পাঠাচ্ছেন৷ এমনকি তিনি বলেন নাই যে , তিনি মানুষ পাঠাচ্ছেন; আল্লাহ বললেন, তিনি খলিফা পাঠাচ্ছেন৷ পাঠালেন মানুষ, বললেন খলিফা৷ মানুষকে তিনি খলিফা নামে অভিহিত করলেন৷ খলিফা মানে প্রতিনিধি৷ আমরা পুরো মানব জাতি হচ্ছি আল্লাহর প্রতিনিধি৷ পুরুষ , নারী নির্বিশেষে আমরা প্রত্যেকে তাঁর প্রতিনিধি-আল্লাহর প্রতিনিধি৷ তবে এ কথা ঠিক যে , যদি আমরা গুণাহ্ করি, অন্যায় করি, খুন করি, অত্যাচার করি, জুলুম করি, ঈমান হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের খলিফার মর্যাদা থাকে না৷ কিন্তু মূলতঃ আমরা আল্লাহ পাকের খলিফা৷ (কুরআন ২:৩০; ৩৫:৩৯)
এই খলিফার মর্যাদার মধ্যেই রয়েছে সকল ক্ষমতায়ন; যে ক্ষমতায়নের কথা আমরা বলি৷ ক্ষমতা ছাড়া কেউ কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারে না৷ খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে গেলে প্রত্যেক নারী এবং পুরুষের কিছু ক্ষমতা লাগবে৷ নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি এই খেলাফতের মধ্যে রয়েছে৷ শুধু নারী নয়, ' খেলাফত' শব্দের মধ্যে নারী, পুরুষ, গরিব, দুর্বল সকলের ক্ষমতায়নের ভিত্তি রয়েছে৷ সুতরাং নারী পুরুষ মৌলিক সাম্যের এটি হলো চতুর্থ প্রমাণ৷
ইসলাম চায় every man, every woman, every person should be empowered ; কিন্তু এই মুহ র্তে যদি নারীরা বঞ্চিত থেকে যায়, তবে তাদেরকে ক্ষমতায়িত করতে হবে৷ পুরুষরা কোনোদিন বঞ্চিত হলে তাদেরকে ক্ষমতায়িত করতে হবে৷ তবে যে বঞ্চিত তার কথা আমাদের আগে ভাবতে হবে ; নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য বর্তমানে আমাদের আগে কাজ করতে হবে৷
আজকে আপনাদের আলোচনায় মেয়েদের আসল কাজ কি, তা নিয়ে কথা উঠেছে৷ তারা কি ঘরে বসে থাকবে? এমন প্রশ্ন উঠেছে৷ কোনো মেয়ে যদি তার স্বাধীন সিদ্ধানে ঘরে থাকতে চায়, তার সেটা করার অধিকার আছে৷ পুরুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য৷ কিন্তু আল্লাহ কোথাও বলেন নাই যে, নারীদের ঘরে বসে থাকতে হবে , বাইরের কাজ নারীরা করতে পারবে না৷ বরং আল্লাহ মূল দায়িত্ব নারী-পুরুষের একই দিয়েছেন৷ সূরা ' তওবা' র ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, নারী পুরুষের দায়িত্ব ৬টি৷ আয়াতটি এরকম: মোমেন পুরুষ এবং মোমেন নারী একে অপরের অভিভাবক (ওয়ালী) , একে অপরের বন্ধু, একে অপরের সাহায্যকারী (এই আয়াত কোরআন শরীফের সর্বশেষ সূরাসম হের একটি৷ উল্লেখিত বিষয়ে আগে যে সকল আয়াত আছে সেগুলোকে এই আয়াতের আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে)৷ এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, নারী পুরুষ একে অপরের অভিভাবক, গার্জিয়ান৷ অনেকে বলে যে, নারী গার্জিয়ান হতে পারে না৷ কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, নারী গার্জিয়ান হতে পারবে৷ মূল কোরআনে এ ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই৷ নারী-পুরুষের নির্ধারিত ৬টি ডিউটি হলোঃ
ক. তারা ভালো কাজের আদেশ দিবে৷
খ. মন্দ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করবে৷
গ. উভয়ে নামাজ কায়েম করবে৷
ঘ. যাকাত দিবে৷
ঙ. আল্লাহকে মানবে৷
চ. রসুলকে মানবে৷
এসব কথার মাধ্যমে আল্লাহ নারীদের সকল ভাল কাজে অংশগ্রহণের কথা বলেছেন৷ এটাই ইসলামের নীতি৷ এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন যে , যারা এই ৬টি দায়িত্ব পালন করবে তাদের ওপর আল্লাহ তায়ালা রহমত করবেন৷ কোরআনের বেশ কয়েকটি তফসির পড়ে এবং পবিত্র কোরআন ও সুন্নাতে রাসুলে পুরোপুরি বিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে আমি বিশ্বাস করি যে, এই ছয়টি দায়িত্বের মধ্যে নারী পুরুষ সবাই সমান৷ রাজনীতি , সমাজসেবা ইত্যাদি সব কাজই এ ৬টির আওতায় পড়ে৷
আমার মনে হয় আমরা ইসলামের মূল জিনিস পরিত্যাগ করে ছোট-খাটো জিনিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি৷ মানুষের তৈরী বিভিন্ন কিতাবের ওপর নির্ভর করছি৷ আল্লাহর মূল কিতাবকে আমরা সেই তুলনায় গুরুত্ব দিচ্ছি বলে মনে হচ্ছে না৷ শেষে একটি কথা বলি , ইসলামকে যদি আপনারা অন্যের মাধ্যমে শেখেন , তবে আপনারা কখনোও মুক্তি পাবেন না৷ আপনাদেরকে কোরআনের পাঁচ-ছয়টি তাফসির নিজে পড়তে হবে৷ অনেকে অনুবাদের মধ্যে তাদের নিজেদের কথা ঢুকিয়ে দেয়৷ ফলে পাঁচ-ছয়টি বই পড়লে আপনারা বুঝতে পারবেন কোথায় মানুষের কথা ঢুকছে; আর আল্লাহর কথাটা কি৷ কয়েক রকম ব্যাখ্যা পড়লে আপনি ঠিক করতে পারবেন কোন ব্যাখ্যাটা ঠিক৷ মেয়েদের মধ্যে বড় তাফসিরকারক হয়নি৷ এটা মেয়েদের ব্যর্থতা , মেয়ে তাফসিরকারকদের থাকলে হয়তো gender bias হতো না৷ তবে কোরআন শরীফের কিছু তাফসীর আছে যেগুলো free from gender bias ; যেমন মোহাম্মদ আসাদের "দি ম্যাসেজ অব কোরআন"৷
লেখক সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর ২৩তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে দেয়া শাহ্ আব্দুল হান্নানের বক্তব্যের সংকলিত অংশ৷ 



প্রকাশ সূত্র : ইসলাম ডট নেট ডট বিডি

Thursday, December 29, 2011

রাসুলের ওপর ধর্মনিরপেক্ষতা আরোপ এবংকিছু কথা || খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ্

বিখ্যাত সাহাবী, শীর্ষ মুফাসসিরে কোরআন হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ওলীদ ইবিন মুগীরা, আস ইবনে ওয়ায়েল, আসওয়াদ ইবনে আবদুল মোত্তালিব ও উমাইয়া ইবনে খাল্ফ প্রমুখ মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একবার রাসুলের কাছে এসে বলল, আসুন আমরা পরস্পরের মধ্যে এই শান্তিচুক্তি করি যে, এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের ইবাদত করবেন এবং এক বছর আমরা আপনার উপাস্যের ইবাদত করব (কুরতুবী)। তিবরানির সূত্রে ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, কাফিররা প্রথমে পারস্পরিক শান্তিচুক্তির স্বার্থে রাসুলুল্লাহর সামনে এই প্রস্তাব রাখল যে, আমরা আপনাকে বিপুল পরিমাণে ধন-ঐশ্বর্য দেব, ফলে আপনি মক্কার সর্বাধিক ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে যাবেন। আপনি যে মহিলাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারবেন। বিনিময়ে আপনি শুধু আমাদের উপাস্যদের মন্দ বলবেন না। যদি আপনি এটাও মেনে না নেন, তবে এক বছর আমরা আপনার উপাস্যের ইবাদত করব এবং এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যের ইবাদত করবেন (তাফসিরে মাযহারি)। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর দূত জিবরাঈল সুরা কাফিরুন নিয়ে আগমন করলেন। এতে কাফিরদের ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ এবং আল্লাহতায়ালার অকৃত্রিম ইবাদতের আদেশ আছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, সুরাটিতে ‘আমি ইবাদত করি না যার ইবাদত তোমরা করো’—কথাটির পৌনঃপুনিক উল্লেখ রয়েছে। তাফসিরবিদরা বর্ণনা করেছেন, একই বাক্য একবার বর্তমানের জন্য এবং একবার ভবিষ্যত্কালের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাত্ বর্তমানে যেমন আমি তোমাদের উপাস্যের ইবাদত করি না, ভবিষ্যতেও এরূপ হবে না। মজার ব্যাপার হলো, এই একটি সুরা যার একটি আয়াত—‘তোমাদের জন্য তোমাদের কর্মফল এবং আমার জন্য আমার কর্মফল’ নিয়ে কিছু লোক কোরআন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (যদিও সেক্যুলারিজম মতবাদের বাংলা তরজমা হলো—ইহজাগতিকতা) এর প্রমাণ পেশ করতে চেষ্টা করেন—প্রকৃতপক্ষে পুরো সুরাটিই কথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিপক্ষে ইসলামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ও জোরালো অবস্থানের ঋজু অভিব্যক্তি।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ইসলামের জুড়ি নেই। ভিন্নধর্মের অনুসারীর ওপর জোর-জবরদস্তি তো দূরের কথা, নির্বিঘ্নে তাদের ধর্ম পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ যাবতীয় নাগরিক অধিকার প্রদানে ইসলাম অকুণ্ঠচিত্ত। তবে এর অর্থ এমন ভাবা ঠিক নয় যে, ইসলামের জন্য স্বাতন্ত্র্যের সীমারেখা বলতে কিছু থাকবে না। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভুল ব্যাখ্যা সমাজে সমপ্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নয়, বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি উত্পাদন করবে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সামাজিক সৌহার্দের পরিবর্তে নির্মূল ভাবনাকেই উসকে দেবে। এতে আমাদের উদারমুসলিম চরিত্র যেমন ম্লান হতে পারে, তেমনি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও ভিত নড়ে উঠতে বাধ্য।
বিষয়টির অবতারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কারণ হলো, ১১ ডিসেম্বর ২০১১ শনিবার বায়তুল মোকাররমের ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে মসজিদের ইমাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান প্রতিনিধি এবং ইফার কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এক সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি ও ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর এ সম্পর্কিত একটি বক্তব্য। ‘মানব সম্পদ উন্নয়নে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্তকরণ প্রকল্পের দুই দিনব্যাপী বার্ষিক সভা ও কর্মশালা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের লোকদের সঙ্গে সমপ্রীতি বজায় রাখতে দেশের ইমামদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘রাসুল (সা). মসজিদের অর্ধেক হিন্দুদের পুজার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সব ধর্মের লোকদের মধ্যে সেই ধরনের সমপ্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।’ অন্যদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মুহাম্মদ আফজাল বলেন, রাসুল ইহুদিদের ইবাদতের জন্য মসজিদের অর্ধেক দিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা সেই নবীর উম্মত (দেখুন, দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক আমার দেশ, ১২.১২.২০১১ খ্রি. রবিবার)।’ প্রতিবাদকারী উপস্থিত ইমামদের মধ্যে অনেকেই প্রতিমন্ত্রী এবং ডিজিকে তাদের দাবির সপক্ষে কোরআন-হাদিসের কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের প্রমাণ পেশ করতে বললে একজন অপারগতা প্রকাশ ও অন্যজন প্রসঙ্গান্তরে চলে যান। এতে করে তাত্ক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও এ ধরনের অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক কথাবার্তা সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্টের ইন্ধন জোগাবে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন মৌলিক গবেষণাকর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থাদি মুদ্রণ ও ইসলামী প্রকাশনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। সমপ্রতি প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকাণ্ড ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে বিতর্কিত ও নিন্দিত হচ্ছে। কোনো বিশেষজ্ঞ আলিম এমনকি ইসলাম সম্পর্কে যাদের অল্প-বিস্তর পড়াশোনা রয়েছে তাদের পক্ষে ধর্মীয় উদারতার এমন সরলীকরণ মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে একই অনুষ্ঠানে বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাসুলের আদর্শ বলে অভিমত দিয়ে রীতিমত ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলের কণ্ঠে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও মানবাধিকারের সনদ ঘোষিত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার দলিল নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ইসলামে ধর্মনিরপেক্ষতারূপী কোনো গোঁজামিল বিশ্বাসের স্থান নেই। ইসলাম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও প্রকৃতিসম্মত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান।
মুসলিমপ্রধান সমাজে মুসলমানরা যেমন সংখ্যালঘু ভিন্নধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে নিজেদের স্বত্ব দাবি করে না, তেমনি কোনো সুস্থ বুদ্ধির হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ইসলামের উদারতার দোহাই দিয়ে তাঁদের পুজা-পার্বণের জন্য মসজিদের অর্ধেক জায়গা ছেড়ে দেয়ার মতো উদ্ভট আবদার কখনও করবেন বলে মনে হয় না।
সূত্র : আমার দেশ

Monday, December 19, 2011

ভাঙ্গা ও গড়া || সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী

প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা সবই আল্লাহর জন্য। তিনি আমাদেরকে সূষ্টি করেছেন। আমাদেরকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও বুঝবার শক্তি এবং ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতাও দিয়েছেন। আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন ও নেতৃত্ব দানের জন্য তিনি তাঁর সর্বোত্তম বান্দাদেরকে পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে মানবতা শিক্ষা দিয়েছেন, সৎলোকের মতো জীবনযাপন করা শিখিয়েছেন এবং মানব জীবনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করেছেন। যে সমস্ত নিয়ম-নীতি অনুযায়ী জীবন যাপন করলে মানুষ দুনিয়ায় সুখ-শান্তি ও পরকালে মুক্তি লাভ করতে পারে তাও তারা বলে এবং করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের সবার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

সমবেত ভদ্রমন্ডলী ও মহিলাবৃন্দ!

যে আল্লাহ্ এই দুনিয়াকে সৃষ্টি করে পৃথিবী পৃষ্ঠকে বিছানার মতো করে তৈরী করেছেন এবং তার উপর মানুষের বসবাস করার সুব্যবস্থা করেছেন, তিনি অন্ধের মতো আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কোন কাজ করেন না। কোন কিছু না দেখেশুনে অন্ধকারে হাতড়িয়ে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেবার মতো বাদশাহ তিনি নন। তাঁর নিজস্ব আইন-কানুন, বলিষ্ঠ নিয়ম-নীতি, সুদৃঢ় ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু কর্মপদ্ধতি রয়েছে। তদনুযায়ী তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের উপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব করছেন। পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পানি, বাতাস, বৃক্ষ, পশু-পাখি ইত্যাদির মতো আমরা গোটা মানব জাতিও তাঁর প্রাকৃতিক আইন ও নিয়মের অধীনে সুসংবদ্ধ। আমাদের জন্ম ও মৃতু্য, আমাদের শৈশব, আমাদের যৌবন ও বার্ধক্য, আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, আমাদের পাকস্থলী ও রক্ত চলাচল, আমাদের সুস্থতা ও অসুস্থা ইত্যাদি সব কিছুর উপরই তাঁর চিরন্তন প্রাকৃতিক আইন ও নিয়মের কর্তৃত্ব একটানাভাবে রীতিমত চলছে। এছাড়া তাঁর আর একটা আইনও রয়েছে। সেটা তাঁর প্রাকৃতিক আইনের মতই আমাদের ইতিহাসে উঠা-নামা, আমাদের উত্থান-পতন, আমাদের উন্নতি-অবনতি এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত -তথা দেশ ও জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের উপর কর্তৃত্ব করছে। আল্লাহর প্রাকৃতিক আইন অনুযায়ী নাকের বদলে চোখের সাহয্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ করা এবং পেটের বদলে হৃদয়ে খাদ্য হজম করা যদি মানুষের পক্ষে সম্ভব না হয়ে থাকে, তাহলে যে পথে চললে আল্লাহর আইন অনুযায়ী কোন জাতির অধপতন হওয়া উচিত, সেই পথে তার উন্নতি হওয়া সম্বব নয়। আগুন যেমন একজনের জন্য গরম এবং আরেক জনের জন্য ঠান্ডা নয়, তেমনি আল্লাহর আইন অনুযায়ী যে সমস্ত কাজ খারাপ তা একজনকে অবনত এবং অন্য জনকে উন্নত করতে পারে না। মানুষের ভাল-মন্দের জন্য আল্লাহ্ যে নিয়ম-নীতি নির্ধারিত করেছেন, তা কারোর চেষ্টায় পরিবর্তিত ও বাতিল হতে পারে না। তার ভেতর কারো সঙ্গে শত্রুতা এবং কারো সঙ্গে স্বজনপ্রীতিও নেই। আল্লাহর এই আইনের সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে এই যে, তিনি গড়া পছন্দ করেন এবং ভাঙ্গা পছন্দ করেন না। সব কিছুর মালিক হিসেবে তিনি তাঁর দুনিয়াকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে চান। একে অতিমাত্রায় সুসজ্জিত করতে চান। তাঁর যাবতীয় উপায় উপাদান এবং শক্তি ও যোগ্যতাকে সুষ্ঠু পন্থায় সদ্ব্যবহার করতে চান। তিনি কখনও তাঁর দুনিয়ার ধ্বংস ও অনিষ্ট সাধন করেন না। বিশৃংখলা, কুকর্ম, অত্যাচার ও অনাচার করে তাঁর দুনিয়াকে শ্রীহীন সৃষ্টিতে পরিণত করাকে তিনি কোনদিন পছন্দ করবেন বলে আশাও করা যেতে পারে না। যে সমস্ত লোক দুনিয়া পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করতে চায় তাদের ভেতর থেকে কেবলমাত্র তারাই আল্লাহর দৃষ্টিতে যোগ্যতাসম্পন্ন হয়; যারা এ দুনিয়াকে গড়বার যোগ্যতা অন্যদের চেয়ে বেশী রাখে। এরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদেরকেই তিনি দুনিয়া পরিচালার দায়িত্ব অর্পণ করে থাকেন।

অতঃপর এসব ক্ষমতাসীন লোকেরা কতটুকু ভাঙ্গে এবং কতটুকু গড়ে -সেদিকে তিনি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ভাঙ্গার চেয়ে গড়তে থাকে বেশী এবং তাদের চেয়ে বেশী গড়ে কম ভাঙ্গে -এমন কেউ কর্মক্ষেত্রে থাকে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদের সমস্ত দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও দুনিয়া পরিচালনার ক্ষমতা তাদের হাতেই রাখেন। কিন্তু যখন তারা গড়ে কম এবং ভাঙ্গে বেশী, তখন আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমতাচু্যত করে অন্য লোকদেরকে ঐ একই শর্তে ক্ষমতা দিয়ে থাকেন।

এটা একটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আইন। আপনাদের বিচার বুদ্ধিও প্রমাণ করবে যে, আইনটি এমনই হওয়া উচিত। যদি আপনাদের কারোর একটি বাগান থাকে এবং তিনি একজন মালীকে তার রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করেন, তাহলে আপনি নিজেই বলুন, তিনি ঐ মালীর নিকট সর্বাগ্রে কি আশা করতে পারেন? তিনি অবশ্যি নিজের বাগানের ক্রমোন্নতি চাইবেন। তার শ্রীবৃদ্ধি ও উন্নতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শোভা-সৌন্দর্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধিই হবে তার কাম্য। যে মালীকে তিনি দেখবেন অত্যন্ত প্ররিশ্রম, যোগ্যতা ও মনোযোগ সহকারে সুনিপুণভাবে বাগানের সেবা যত্ন করছে, বাগানের সাজসজ্জার দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখছে, তার চেষ্টা ও যত্নে ভাল দরকারী গাছগুলো বেশ সতেজ ও সুন্দর হচ্ছে, সে আগাছা, আবর্জনা ও বন-জঙ্গল পরিষ্কার করছে তার সুরুচি ও শিল্প শক্তি দিয়ে উৎকৃষ্ট ও নতুন ফল-মূল এবং ফুলের উৎপাদন বৃদ্ধি করছে- তার উপর তিনি অবশ্যই সন্তুষ্ট হবেন। তিনি তাকে ভালবাসবেন এবং উচ্চ মর্যাদা দেবেন। এমন উপযুক্ত, কর্তব্যপরায়ণ, পরিশ্রমী, অনুগত ও সুযোগ্য মালীকে তাড়িয়ে দেয়া তিনি কোন দিনই পছন্দ করবেন না। কিন্তু এ না হয়ে যদি ঠিক এর উল্টোঁাই হয় অর্থাৎ, যদি তিনি দেখেন যে, মালী অযোগ্য-অপদার্থ, আলসে ও ফাঁকিবাজ, সে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে বাগানের ক্ষতি করছে, গোটা বাগানটা আবর্জনা ও বন-জঙ্গলে ভরে গিয়েছে, গাছের পাতা ও ডালগুলো ভেঙে পড়েছে, কোথাও বিনা প্রয়োজনে পানি বয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানির অভাবে মাটি ও গাছপালা সব শুকিয়ে যাচ্ছে, ঘাস, আগাছা, বনজঙ্গল ও আবর্জনা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, ফুল ও ফলবান গাছগুলোকে অকাতরে কেটে কেটে ফেলে দেয়া হচ্ছে, ভাল ভাল গাছগুলো মরে গিয়ে আগাছায় বাগান ভরে যাচ্ছে, তাহলে বলুন, বাগানের মালিক এমনতর মালীকে কি করে পছন্দ করতে পারে? কোন সুপারিশ, কাকুতি-মিনতি, সবিনয় নিবেদন ও প্রার্থনা এবং উত্তরাধিকার ও মনগড়া অধিকারের দরুন মালিক তার বাগানের দায়িত্বভার এমন অযোগ্য মালীর উপরই ন্যস্ত রাখবে? বড় জোর এতটুকু হতে পারে যে, সে মালীকে শাসিয়ে দিয়ে আর একবার তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেবে। কিন্তু যে মালীর কোন শাসনেই চৈতন্য হয় না এবং ক্রমাগত বাগানের ক্ষতিই করতে থাকে, তাকে কান ধরে বের করে দিয়ে অন্য কোনো ভাল মালী নিযুক্ত করা ছাড়া মালিকের পক্ষে এ সমস্যার আর কি সমাধান হতে পারে?

যদি নিজের সামান্য একটা বাগান পরিচালনার ব্যাপারেও আপনি অনুরূপ পন্থা অবলম্বন করে থাকেন। তাহলে চিন্তা করে দেখুন যে, আল্লাহ্ তাঁর এতবড় ভূমন্ডলটা এত সব উপায়-উপকরণসহ মানুষের কর্তৃত্বাধীনে রেখে দুনিয়া ও তার সমস্ত বস্তুর উপর তাকে এত ক্ষমতা ও অধিকার দিয়েছেন, এক্ষেত্রে মানুষ তাঁর দুনিয়াকে সুন্দর করে গড়ে তুলছে, না ধ্বংস করছে, এ বিষয়টা তিনি কি করে উপেক্ষা করতে পারেন? আপনি যদি তাঁর দুনিয়াকে সুন্দর করে গড়তে থাকেন তবুও তিনি আপনাকে ক্ষমতা থেকে অযথা সরিয়ে দেবেন- এমনতর হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু যদি আপনি গঠনমূলক কোন কিছু না করেন এবং আল্লাহর এ বিরাট বাগানখানাকে একেবারে উজাড় ধ্বংস করতেই থাকেন তাহলে আপনার দাবীকে নিজের বুদ্ধি-বিবেক অনুযায়ী যতই জোরদার মনে করুন না কেন তিনি তাঁর বাগানে আপনার কোন অধিকারই স্বীকার করবেন না। প্রথমে তিনি আপনাকে শাসিয়ে হুঁশিয়ার করে দেবেন এবং সংশোধনের দু'চারটে সুযোগ দেবেন। পরিশেষে আপানাকে পরিচালকের মর্যাদা থেকে পদচু্যত করেই ছাড়বেন।
এ ব্যাপারে একটা বাগানের মালিকের দৃষ্টিকোণ ও মালীর দৃষ্টিকোণ যেমন বিভিন্ন তেমনি আল্লাহর দৃষ্টিকোণ ও মানুষের দৃষ্টিকোণের মধ্যেও বিভিন্নতা রয়েছে। ধরুন, মালীদের এক পরিবার বংশানুক্রমে একজন লোকের বাগানে কাজ করে আসছে। তাদের পূর্ব পুরুষের কাউকে হয়তো তার যোগ্যতা ও জ্ঞান বুদ্ধির দরুন বাগানে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তার সন্তান-সন্ততিও বাগানের কাজ সুন্দরভাবে করেছিল, তাই বাগানের মালিক চিন্তাকরে দেখলো যে, অযথা এদেরেকে সরিয়ে অন্য মালী নিযুক্ত করার কি দরকার? এরা ও যখন ভালভাবেই কাজ করছে, তখন এদের অধিকার অন্যের চেয়ে বেশী। এভাবে মালীদের এই বংশ স্থায়ীভাবে বাগানে কাজ করতে লাগলো। কিন্তু কিছু কাল পরে এই বংশের মালীরা একেবারে অযোগ্য, অপদার্থ, ফাঁকিবাজ, আলসে, কুঁড়ে ও অবাধ্য হয়ে পড়ল। বাগান পরিচালনার কোন যোগ্যতাই তাদের রইল না। এখন তারা গোটা বাগানটার সর্বনাশ করতে শুরু করেছে, তবুও তদের দাবী এই যে তারা তাদের বাপদাদার আমল থেকে পুরুষানুক্রমে এ বাগানে বাস করে আসছে, তাদের পূর্ব পুরুষদের কারুর দ্বারা এ বাগান গড়ে উঠেছিল, কাজেই এতে তাদের জন্মগত অধিকার রয়েছে এবং তাদেরকে সরিয়ে অন্য কাউকে এ বাগানের পরিচালনার জন্য মালী নিযুক্ত করা কোনক্রমেই সংগত হতে পারে না। এটিই ঐ অযোগ্য ও অপদার্থ মালীদের দৃষ্টিকোণ। কিন্তু বাগানের মালিকের দৃষ্টিকোণও কি অনুরূপ হতে পারে? সে কি একথাই বলবে না_ আমার কাছে তো বাগানের সুন্দর ও সুষ্ঠ পরিচালনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তো মালীদের কোন পূর্ব পুরুষের জন্য এ বাগান করিনি। বরং তাদের পূর্ব পুরুষের কাউকে আমার বাগানের কাজের জন্য চাকর রেখেছিলাম। বাগানে তাদের যা কিছু অধিকার আছে তা যোগ্যতা ও কাজের শর্তাধীন। তারা বাগানকে ঠিকমত গড়ে তুললে তাদের সমস্ত অধিকার বিবেচনা করা হবে। নিজের পুরানো মালীদের সংগে আমার এমন কি শক্রতা থাকতে পারে যে, তারা ভালভাবে কাজ করলেও আমি অযথা তাদেরকে তাড়িয়ে অন্য মালীদেরকে নিযুক্ত করবো? কিন্তু যে বাগানের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য তোমাদেরকে নিযুক্ত করা হয়েছিল সেটিকেই যদি তোমরা নষ্ট ও উজাড় করে ফেল, তাহলে তোমাদের কোন অধিকারই আমি স্বীকার করবো না। অন্য যারা এ কাজ ঠিকমত করতে চায় আমি তাদেরকে বাগান পরিচালনার দায়িত্ব ও ক্ষমতা দান করবো এবং তাদের অধীনে তোমাদের চাকুরি করতে হবে। এতেও যদি তোমরা ঠিক না হও এবং অধীনস্ত হিসেবেও যদি তোমরা অকেজো প্রমাণিত হও; বরং শুধু নষ্ট করতেই থাক, তাহলে আমি তোমাদেরকে এ বাগান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্য মালীদেরকে এখানে নিযুক্ত করবো।

দৃষ্টিকোণের এই পার্থক্য যেমন একটা বাগানের মালিক ও মালীর মধ্যে রয়েছে, তেমনি রয়েছে দুনিয়ার মালিক ও দুনিয়াবাসীদের মধ্যেও। দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন জাতি তাদের আপন আপন এলাকাকে স্বদেশ ভূমি বলে দাবী করে। বংশানুক্রমে তারা এবং তাদের পূর্ব-পুরুষগণ সেখানে বসবাস করে আসছে। তাদের দেশের উপর তাদের কর্তৃত্ব করার জন্মগত অধিকার রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করে। কাজেই তাদের মতে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা একমাত্র তাদেরই প্রাপ্য। বাইরের আর কারুর সেখানে কর্তৃত্ব করার কোন অধিকার নেই। এ হচ্ছে দুনিয়াবাসীদের দৃষ্টিকোণ। কিন্তু দুনিয়ার আসল মালিক আল্লাহর দৃষ্টকোণ এটা নয়। তিনি কখনো এ সব জাতীয় অধিকার স্বীকার করেননি। প্রত্যেক দেশের উপর তার অধিবাসীদের জন্মগত অধিকার রয়েছে এবং সে অধিকার থেকে তাদেরকে কোনক্রমেই বঞ্চিত করা চলবে না- এমন কোন কথা তিনি স্বীকার করেন না। তিনি তো দেখেন, কোন্ দেশে কোন্ জাতি কি কাজ করছে। যদি কোন জাতি তার দেশে গঠনমূলক কাজে লিপ্ত থাকে, তার সমস্ত শক্তিসামর্থ দুনিয়ার সংশোধন ও উন্নতির জন্য নিয়োগ করে থাকে, সব রকমের মন্দ কাজ প্রতিরোধ করে এবং ভাল কাজের ক্ষেত্র প্রশস্ত করতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে দুনিয়ার মালিক বলেন, অবশ্য তোমরা দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার অধিকারী। তোমরা পূর্ব থেকেই এ দেশে বসবাস করে আসছো এবং দেশ পরিচালনারও যোগ্যতা রাখ। কাজেই অন্যান্য জাতির চেয়ে তোমাদের অধিকারই অগ্রগণ্য। কিন্তু যদি ব্যাপারটা উল্টো হয় অর্থাৎ, যদি গড়ার পরিবর্তে শুধু ভাঙ্গার কাজই হতে থাকে, সৎ কাজের বদলে দেশ জুড়ে কেবল অসৎ ও অবৈধ কাজই সংঘটিত হয় এবং আল্লাহ্ দুনিয়ায় যা সৃষ্টি করেছেন তাকে কোন ভাল কাজে না লাগিয়ে বেপরোয়া ভাবে নষ্ট করা হয়- এক কথায় দেশকে গড়ার বদলে ভেঙ্গে ফেলা হয়- তাহলে আল্লাহ্ এহেন জাতিকে প্রথমে কিছুটা হালকা এবং কিছুটা কঠিন আঘাত দেন, যাতে করে তারা সতর্ক হয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করতে পারে। এতেও যে জাতি ঠিক না হয়, তার কাছ থেকে দেশের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অন্তত এর চেয়ে যোগ্যতর জাতিকে দেয়া হয়।

এখানেই শেষ নয়। যদি পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা পরাধীন হওয়ার পরও কোন যোগ্যতা ও গুণবৈশিষ্ট্যের প্রমাণ না দেয় এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণ করে যে, বিকৃতি করা ছাড়া তাদের দ্বারা আর কোন কাজই হবে না, তাহলে এহেন জাতিকে আল্লাহ্ নিশ্চিহ্ন করে দেন। তারপর তাদের স্থানে অন্য কোন জাতিকে আনেন। এ ব্যাপারে সব সময়ই মালিকের যে দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত, আল্লাহরও তাই হয়ে থাকে। তিনি তাঁর দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে দাবীদার ও প্রার্থীদের উত্তরাধিকার অথবা জন্মগত অধিকার দেখেন না। তিনি দেখেন কার গড়ার যোগ্যতা বেশী এবং ভাঙ্গার দিকে ঝোঁক প্রবনতা কম রয়েছে। একই সময়ের প্রার্থীদের মধ্যে যারা এ দিক দিয়ে যোগ্যতর বলে প্রমাণিত হয়, তাদেরকেই দেশ পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়। যতদিন এদের ধ্বংসাত্মক কাজের চেয়ে গঠনমূলক কাজ বেশী হতে থাকে অথবা এদের তুলনায় বেশী ভাল করে গঠনমূলক কাজ করে এবং ধ্বংসাত্মক কাজও কম করে- এমন কেউ এগিয়ে না আসে- ততদিন দেশ পরিচালনার ক্ষমতা এদের হাতেই রাখা হয়।
এসব যা কিছু আমি বলছি, ইতিহাসে এর জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ্ চিরকালই এ নীতি অনুযায়ী তাঁর দুনিয়া পরিচালনার ব্যবস্থা করছেন। দূর দেশের কথা না হয় ছেড়েই দিন। নিজেদের এ দেশের ইতিহাসটাই পর্যালোচনা করুন। এ দেশে যে সব জাতি প্রথমে বাস করতো, তাদের গঠনমূলক যোগ্যতা ও কর্ম ক্ষমতা যখন শেষ হয়ে গেল, তখন আল্লাহ্ আর্য জাতিকে এ দেশ পরিচালনার সুযোগ দিলেন। সে সময় অন্যান্য জাতি গুলোর মধ্যে যোগ্যতম ছিল আর্যজাতি। তারা এখানে এসে এক উন্নত তামাদ্দুন ও সভ্যতা গড়ে তুললো। বহু জ্ঞান ও শিল্প আবিস্কার করল। ভূগর্ভের গোপন সম্পদ উদ্ধার করে তাকে ভাল কাজে ব্যবহার করল। ধ্বংসাত্মক কাজের তুলনায় গঠনমূলক কাজই তারা বেশী করেছিল। এসব যোগ্যতা যতদিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছিল ততদিন ইতিহাসের সমস্ত উত্থান-পতন সত্ত্বেও তারাই ছিল এদেশের পরিচালক। অন্যান্য জাতি ক্ষমতা দখলের জন্য বার বার এগিয়ে এসেছে কিন্তু তাদেরকে হটিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, আর্যদের মতো যোগ্য জাতি ক্ষমতাসীন থাকা কালে অন্যকোন পরিচালকের প্রয়োজন ছিল না। আর্যরা যখন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে বিপথে চলা শুরু করে, তখন তাদের উপর যেসব বৈদেশিক আক্রমন হয়, সেগুলোকে তাদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে সতর্ককারী দূত স্বরূপ বলা যায়। কিন্তু তারা সতর্ক না হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজেই লিপ্ত থাকে। গঠনমূলক কাজের তুলনায় তারা ধ্বংসাত্মক কাজ করতে থাকে অনেক বেশী। তাদের নৈতিক অধঃপতন এমন চরমে পৌঁছে যে, বামমার্গ আন্দোলনে আজো তার চিহ্ন আপনারা সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ করতে পারেন। মানবতাকে বিভক্ত করে তারা নিজেদেরই সমাজকে বর্ণ ও গোত্রে খণ্ডিত করল। সমাজ জীবনকে একটি সিঁড়ির মতো করে গঠন করল। এ সিঁড়ির প্রত্যেক ধাপের লোকেরা তাদের উপরের ধাপের লোকদের বান্দা বা দাস এবং নীচু ধাপের লোকদের খোদা বনে বসল। তারা আল্লাহর লাখো লাখো বান্দার উপর নির্মম যুলুম নির্যাতন চালাতে লাগল। এ যুলুম আজো অচ্ছুত শ্রেণীর আকারে বিদ্যমান রয়েছে।

তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দিল। তাদের পন্ডিত ও পুরোহিতরা সাপের মত জ্ঞান ভাণ্ডারের চারদিক বেষ্টন করে বসে রইল। তাদের উপরের তলার কর্তারা দেশের জনসাধারণের উপর নিজেদের বহু অন্যায় অধিকার চাপিয়ে দিল। এ অধিকার আদায় করা এবং আরাম কেদারায় বসে বসে অন্যের পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে বিলাসী জীবন যাপন করা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ রইলো না। এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তাদের কাছ থেকে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মধ্য এশিয়ার কতিপয় জাতিকে এখানে পরিচালনার সুযোগ দিলেন। এ জাতিগুলো সে সময় ইসলামী আন্দালনের সংস্পর্শে এসে জীবন যুদ্ধের উন্নততর যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

কয়েক'শ বছর তারা এদেশ পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিল। এ দেশেরও বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে তাদের সাথে মিশে গিয়েছিল। অবশ্যি তারাও অনেক কিছু ধ্বংস করেছে। কিন্তু যে পরিমাণ ধ্বংস করেছে, তার চেয়ে বেশী সৃষ্টি করেছে। কয়েক'শ বছর পর্যন্ত ভারতবর্ষে যত গঠনমূলক কাজ হয়েছে তা সবই তাদের দ্বারা অথবা তাদের প্রভাবে সম্পাদিত হয়েছে। তারা দেশে জ্ঞানের আলো বিতরন করেছে। চিন্তা ও ভাবধারা পরিশুদ্ধ করেছে। সমাজ, তামাদ্দুন ও সভ্যতার অনেক কিছু সংশোধন করেছে, দেশের উপায়-উপাদানকে সে যুগের উপযোগী করে কল্যাণের পথে ব্যবহার করেছে। সর্বোপরি তারা শান্তি ও সুবিচারের এমন সুষ্ঠু ব্যবস্থা কায়েম করেছিল যা ইসলামের সত্যিকার শান্তি ও সুবিচার থেকে অনেক নিন্মমানের হলেও ইতিপূর্বেকার এবং আশপাশের দেশগুলোর অবস্থার তুলনায় অনেক খানি ঊঁচুস্তরের ছিল। অতঃপর তারাও পূর্ববর্তীদের ন্যায় পথভ্রষ্ট হতে লাগল এবং তাদের মধ্যেও গঠনমূলক কাজের যোগ্যতা কমে যেতে লাগল এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের প্রতি ঝোঁক প্রবণতা বেড়ে চলল। তারাও উঁচু-নীচু, বংশ মর্যাদার শ্রেণী বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের সমাজ ও জাতিকে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলল। এজন্য চারিত্রিক, রাজনৈতিক, তামাদ্দুনিক ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। তারাও ইনসাফের তুলনায় যুলুম, নির্যাতন অনেক বেশী করতে লাগল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে গিয়ে তারা শুধু তাত্থেকে স্বার্থসিদ্ধি এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টায় মেতে উঠল। উন্নতি ও সংস্কারমূলক কাজ ছেড়ে দিয়ে তারাও আল্লাহ্ প্রদত্ত শক্তি ও উপায় উপাদান নষ্ট করতে এবং সেগুলোকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যবহার করতে লাগল। দৈহিক আরাম ও ভোগ লালসায় তারা এতই মত্ত হয়ে গেল যে, তাদের শাসন কর্তাদেরকে যখন দিল্লীর লাল কেল্লা থেকে পলায়ন করতে হয়েছিল, তখন তাদের শাহজাদারা-যারা গতকাল পর্যন্ত সিংহাসনের দাবীদার ছিল-নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য পলায়ন করতেও পারেনি। কেননা মাটির উপর দিয়ে চলার অভ্যাস তারা পরিত্যাগ করেছিল। মুসলমানদের সাধারণ নৈতিক চরিত্রের চরম অধঃপতন হয়েছিল। একেবারে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় হোমরা চোমরা দায়িত্বশীল লোকদের পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুরই পরোয়া ছিল না। ফলে ধর্ম, জাতি ও দেশকে অন্যের হাতে বিকিয়ে দেয়ার পথে তাদেরকে বাধা দেয়ার মতো আর কিছুই রইল না। তাদের মধ্যে জন্ম নিলো লাখো লাখো পেশাদার সিপাই। এদের নৈতিক চরিত্র ছিল পোষা কুকুরের মতো। যে কেউ খাবার দিয়ে এদেরকে পুষতে পারত এবং তারপর এদের দিয়ে ইচ্ছামত শিকার করাতে পারত। এদের মধ্যে এই অনুভূতি ছিলনা যে, এই ঘৃণ্য পেশার বদৌলতেই শত্রুরা তাদের সাহায্যে তাদেরই জয় করেছে -এর একটি জঘন্যতম দিক আছে। গালিবের মতো কবিও এ সম্পর্কে গর্ব করে বলেছনঃ "শত পুরুষ থেকে বাপ দাদার পেশা হলো সৈনিক বৃত্তি।" এতবড় একজন কবি একথা বলার সময় এতটুকুও ভাবতে পারেননি যে, পেশাধারী সৈনিকবৃত্তি গর্বের বিষয় নয়; লজ্জায়মরে যাবার জিনিস।

মুসলমানেরা যখন এহেন অবস্থায় পৌঁছল, তখন আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমতাচু্যত করার সিদ্ধান্ত করলেন এবং গোটা ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা আবার নতুন প্রার্থীদের হাতে যাওয়ার সুযোগ এলো। এ সময় দেশে মারাঠা, শিখ, ইংরেজ ও কতিপয় মুসলমান নেতা এই চারজন প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছিল। জাতীয়তাবাদের নেশা ও স্বজাতির প্রতি অন্যায় পক্ষপাতিত্ব থেকে মন ও মগযকে মুক্ত ও পবিত্র রেখে ন্যায়ভাবে তখনকার ইতিহাস ও পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনা করলে আপনার বিবেক একথা স্বীকার করবে যে, তখন গঠনমূলক কাজের যে যোগ্যতা ইংরেজদের ছিল তা অন্যকোন প্রার্থীর ছিল না এবং ইংরেজদের ভেতর যে পরিমাণ ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ছিল তার চেয়ে ঢের বেশী ছিল মারাঠা, শিখ ও মুসলমান প্রার্থীর ভেতর। ইংরেজরা যা কিছু গঠনমূলক কাজ করেছে তা অন্যান্য জাতিরা করত না। তারা যা কিছু নষ্ট করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশী অন্যেরা নষ্ট করত। সাধারণভাবে দেখলে ইংরেজদের ভেতর বহু দিক দিয়ে অগণিত দোষ ও অন্যায় পাওয়া যাবে। কিন্তু তুলনা মূলকভাবে বিচার করলে তাদের সমকালীন প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তাদের অন্যায় অত্যাচার অনেক কম এবং গুণ-গরিমা বেশী পাওয়া যাবে। এই জন্যই তো আল্লাহর আইন আরেকবার মানুষের মনগড়া নীতির মূলোচ্ছেদ করলো। মানুষ বিনা অধিকারে এই নীতি রচনা করেছিল যে- "প্রত্যেক দেশের অধিবাসীগণ সে দেশের মালিক, তারা তাদের ইচ্ছামত দেশকে গড়তেও পারে, ভাঙ্গতেও পারে।" আল্লাহর আইন ইতিহাসের এই চিরন্তন ফয়সালা থেকে প্রমাণ করেছে যে- না, দেশ এক মাত্র আল্লাহর, এর পরিচালনার ভার কাকে দেয়া হবে এ ফয়সালা তিনিই করবেন, এ ফয়সালা কোন বংশ, জাতি অথবা পিতা-প্রপিতার অধিকারের ভিত্তিতে হয় না। বরং কোন্ কোন্ পরিচালনায় সামগ্রিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে, সে দিকে নজর রেখেই এ ফয়সালা গৃহীত হয়।

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاء وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاء وَتُعِزُّ مَن تَشَاء وَتُذِلُّ مَن تَشَاء بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. - سورة آل عمران26

"বলুন, হে আল্লাহ্! দেশের মালিক! তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে রাজ্য দিয়ে থাক এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে থাক এবং যাকে চাও তাকে সম্মান এবং যাকে চাও লাঞ্ছনা দিয়ে থাক। তোমারই হাতে রয়েছে সব মঙ্গল। তুমি নিঃসন্দেহে সব কিছু করার ক্ষমতা রাখ।" [সূরা আলে ইমরানঃ ২৬]

এভাবেই হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে একটি জাতিকে আল্লাহ্ এ দেশে নিয়ে এলেন। এরা এ দেশে সংখ্যায় তিন চার লাখের বেশী কোন সময়ই ছিল না। কিন্তু এরা এখানকার উপায়-উপাদান ও মানুষ দিয়ে এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, শিখ ইত্যাদি সমস্ত শক্তিকে পরাজিত করে দেশের শাসন ক্ষমতা দখল করল। এ দেশের কোটি কোটি অধিবাসী এ মুষ্টিমেয় ইংরেজদের অধীন হয়ে রইল। একজন ইংরেজ একাই একটি জেলা শাসন করেছে। তাও এমন অবস্থায় যে, এ কাজে তার হাত শক্তিশালী করার মতো তার জাতির কোন লোক এখানে ছিল না। এসময় এ দেশের লোকেরা যা কিছু করেছে তা সবই চাকর হিসেবে করেছে- কার্যকারক হিসেবে নয়। ইংরেজদের শাসনামলে এ দেশে যেসব গঠনমূলক ও উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছে, তা তাদের দ্বারা এবং তাদের প্রভাবেই হয়েছে- এ কথা আমাদের সবাইকে স্বীকার করতে হবে। অস্বীকার করলে সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে। তারা যে অবস্থায় এদেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়েছিল, তার তুলনায় আজকের অবস্থা দেখলে এ কথা স্বীকার করার জো নেই যে, তাদের অনিষ্টকারিতা সত্ত্বেও অনেক গঠনমূলক ও উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছে। এসব কাজ এদেশবাসীর দ্বারা সম্পন্ন হওয়ার কোন আশাই ছিল না। এ জন্যই তো আল্লাহ্ আঠার'শ শতাব্দীর মাঝখানে এ দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, তা মোটেই ভুল ছিল না।

এখন দেখুন, ইংরেজরা যা কিছু গড়তে পারত তা গড়েছে আর বিশেষ কিছু তাদের দ্বারা গড়ে উঠতে পারে না। এখন তারা যা গড়তে পারে তা অন্যের দ্বারাও সম্ভব। ওদিকে তাদের ধ্বংসকারিতার বহর খুব বেড়ে গেছে। আর যতদিন তারা এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে, ততদিন গড়ার চেয়ে ভাঙ্গবেই বেশী। তাদের অন্যায় ও অপরাধের ফিরিস্তি এত দীর্ঘ হয়েছে যে, তা এক বৈঠকে বর্ণনা করা মুশকিল। আর সেগুলো বর্ণনা করার কোন প্রয়োজনও নেই। কারণ, সেসব সবার চোখের সামনেই রয়েছে। তাদেরকে এখন এ দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে বেদখল করাই আল্লাহর সিদ্ধান্ত। তারা নিজেরাই সোজাভাবে এ দেশ থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত হয়ে বেশ বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।

সোজাভাবে না গেলে বাঁকাভাবে তাড়িয়ে দেয়া হতো। কারণ, আল্লাহর চিরন্তন আইন এখন আর তাদের হাতে এ দেশের শাসন ক্ষমতা রাখার পক্ষপাতি নয়।

দুনিয়ার প্রকৃত মালিক কোন দেশে এক প্রকার পরিচালনা ব্যবস্থা খতম করে অন্য প্রকার ব্যবস্থা কায়েম করার ব্যবস্থা করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আমরা এখন তারই দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে আছি। এটা ইতিহাসের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাহ্যদৃষ্টিতে এ দেশে যেভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে দেখা যাচ্ছে তাতে কেউ যেন এ প্রতারণায় না পড়েন যে, দেশের শাসনক্ষমতা দেশবাসীর হাতে দেয়ার এই যে সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা একেবারে চূড়ান্ত ও চিরন্তন। বর্তমান পরিস্থিতির একটা সহজসাধ্য রূপ হয়তো আপনারা অনায়াসেই অনুধাবন করতে পারছেন যে, বিদেশ থেকে এসে যারা এ দেশ শাসন করছিল, এখন তারা নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। কাজেই এখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের ক্ষমতা দেশবাসীর হাতে আসাই উচিত। আসলে কিন্তু তা নয়। আল্লাহর সিদ্ধান্ত এরূপ হয় না। তিনি এই বিদেশীদেরকে পূর্বেও অকারণে আনেননি, আবার এখনো বিনা কারণে সরিয়ে দিচ্ছেন না। পূর্বে যেমন তিনি আপনাদের কাছ থেকে খামখেয়ালীভাবে শাসনক্ষমতা কেড়ে নেননি, তেমনি এখনো আপনাদেরকে খামখেয়ালীভাবে এ ক্ষমতা দেবেন না। আসল ব্যাপার এই যে, বর্তমানে ভারতবাসীরা ক্ষমতার প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছে; হিন্দু, মুসলমান, শিখ সবাই প্রার্থী। যেহেতু এরাই দেশে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছে, কাজেই তাদেরকেই প্রথম ক্ষমতা লাভের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা স্থায়ী নিযুক্তি নয়, বরং তাদের পরীক্ষার জন্যই এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যদি তারা নিজেদের কার্যকলাপে প্রমাণ করে যে, ভাঙ্গার চেয়ে গড়ার যোগ্যতাই বেশী, তাহলে তাদেরকে এ দেশের শাসন ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে নিযুক্ত করা হবে। আর যদি তারা গঠনমূলক কাজের চেয়ে ধ্বংসাত্মক কাজই বেশী করে, তবে তার পরিণাম খুব শিগগিরই ভোগ করবে। এ অবস্থায় তাদের কাছ থেকে এ দেশের শাসনক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অন্য কোন জাতিকে এ কাজের জন্য নির্বাচিত করা হবে। অতঃপর আর তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই করতে পারবে না। সমগ্র দুনিয়ার সম্মুখে নিজেদের অযোগ্যতার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়ার পর তারা কোন মুখে অভিযোগ করবে ? নাছোড়বান্দা হয়ে অনুনয় বিনয় করলেও তা শুনবেই বা কে ?

এখন আপনারা একটু পর্যালোচনা করে দেখুন যে, এ দেশের হিন্দু-মুসলমান ও শিখ এ পরীক্ষায় আল্লাহর সামনে নিজেদের এমন কি যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, গুণ-গরিমা এবং কার্যকলাপ পেশ করেছেন যে, তার ফলে আল্লাহ্ তাঁর দেশের শাসন ক্ষমতা আবার তাদের হাতে সোপর্দ করবেন বলে তারা আশা করতে পারেন। হিন্দু, মুসলমান ও শিখদের অপরাধগুলো নৈতিকতার আদালতে পেশ করলে তারা সবাই দোষী সাব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি যদি এখন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে সেগুলো বলে দেই, তাহলে আশা করি আপনারা খারাপ মনে করবেন না। নিজের জাতি ও স্বদেশী ভাইদের দোষ বর্ণনা করা আমারও ভাল লাগে না। আসলে আমার হৃদয় এতে কাঁদে। কারণ, আমি তাদের এ সমস্ত দোষ ও অপরাধের মারাত্নক পরিণাম যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। তাদেরকে শিগ্গিরই এ পরিণামের সম্মুখীণ হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এসব দোষ ও অপরাধ তাদেরকে ধ্বংস করবে বলে আমার আশংকা হচ্ছে। আমি, আপনি কেউই এ মারাত্মক পরিণাম থেকে বাঁচতে পারবো না। এজন্য আমি অন্তরের বেদনা নিয়ে এগুলো বিবৃত করছি। এর ফলে যার কান আছে সে শুনে সংশোধনের কিছুটা চিন্তা করতে পারবে।

আমাদের দেশবাসীর সাধারণ নৈতিক চরিত্রের অবস্থা যে রকম হয়েছে তা আপনারা নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অনুযায়ী অনুমান করে দেখুন। আমাদের ভেতর শতকরা ক'জন সত্যিকার চরিত্রবান লোক আছে ? কারোর অধিকার হরণ করা, কোন অবৈধ স্বার্থসিদ্ধি, কোন 'লাভজনক' মিথ্যা বলা এবং কোন 'লাভজনক' বিশ্বাস-ঘাতকতা করা নৈতিক দৃষ্টিতে খারাপ -শুধু এই কারণে আমাদের ক'জন এসব কাজ করতে ইতস্তত করে থাকে? যেখানে আইনের বাঁধন নেই অথবা যেখানে আইনের আওতা থেকে বাঁচবার আশা ও পথ আছে, সেখানে শতকরা ক'জন শুধু নিজের নৈতিক অনুভূতির বলে অন্যায় ও অপরাধ থেকে বিরত থাকে? যেখানে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের আশা না থাকে, সেখানে ক'জন অন্যের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে। এরূপ ক্ষেত্রে ক'জন অপরের দুঃখে-দৈন্যে মনে ব্যাথা পায় এবং স্বার্থ ত্যাগ করে? নিস্বার্থভাবে ক'জন অপরের হক আদায় করে? ক' জন ব্যবসায়ী ধোঁকা-ফাঁকি, মিথ্যা, মুনাফাখোরী, অন্যায়ভাবে উপার্জন করা থেকে বিরত থাকে? ক'জন শিল্পপতি নিজের স্বার্থের সঙ্গে ক্রেতাদের স্বার্থ এবং নিজের জাতি ও দেশের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখে? খাদ্যশস্য মজুদ রেখে অত্যাধিক চড়া দরে বিক্রি করতে গিয়ে ক'জন জমিদার একটু ভেবে দেখে যে, তারা এ মুনাফাকারীর দ্বারা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষকে ভূখা রেখে অসহ্য যন্ত্রনা দিচ্ছে? ক'জন ধনী ব্যক্তি ধন উপার্জনে অন্যায়, অত্যাচার, অধিকার হরণ ও বিশ্বাস ঘাতকতা থেকে মুক্ত রয়েছে? আমাদের দেশের শ্রমজীবি দের মধ্যে ক'জন সঠিকভাবে কর্তব্য পালন করে তাদের বেতন ও পারিশ্রমিক গ্রহণ করে? ক'জন সরকারী কর্মচারী ঘুষ, আমানত খেয়ানত, অত্যাচার, উৎপীড়ন, কর্তব্যে অবহেলা, হারাম খাওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে? উকিল, চিকিৎসক, সাংবাদিক, গ্রন্থকার, প্রকাশক, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক ও নেতৃবৃন্দের ক'জন নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য অসৎ ও ঘৃন্য পন্থা অবলম্বন করে না? এদের ক'জন মানুষের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আর্থিক ক্ষতি সাধনে কিছু মাত্র লজ্জা বোধ করে? বড় জোর দেশের শতকরা মাত্র পাঁচজন এসব নৈতিক রোগ থেকে মুক্ত রয়েছে, আমার মনে হয় একথা মোটেই অতু্যক্তি নয়। বাকী পঁচানব্বই জনই এই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত। এ ব্যাপারে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খৃষ্টান প্রভৃতির ভেতর কোন পার্থক্য নেই। সবাই সমানভাবে রোগাক্রান্ত। সবারই নৈতিক অবস্থার চরম ও ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। কোন জাতির অবস্থাই অন্য জাতির চেয়ে ভাল নয়।

অধিকাংশ লোক এরূপ নৈতিক অধঃপতনের কবলে পড়ায় সমষ্টিগত ভাবে এই নৈতিক রোগের ব্যাপক প্রসার হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। গত মহাযুদ্ধের কারণে যখন রেল গাড়ীতে যাত্রীদের ভীড় হতে লাগলো তখন এই সম্ভাব্য তুফানের প্রথম লক্ষণ দেখা দিল। সেখানে একই জাতির ও একই দেশের লোকেরা পরস্পরের সঙ্গে যে স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা ও কঠোরতামূলক ব্যবহার করেছে, তা থেকেই টের পাওয়া গিয়েছিল যে, কেবল দ্রুতগতিতে আমাদের সাধারণ নৈতিক চরিত্রের অবনতি ঘটেছে। এরপর প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের অভাব ও উচ্চমূল্যের সময় মাল মজুদ রাখা এবং চোরাবাজারী ব্যাপক ভাবে শুরু হয়। অতঃপর দেখা দিল বাংলাদেশের সেই ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। এই দুরাবস্থার সময় দেশের এক সমপ্রদায় নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য নিজেদের দেশের লাখো লাখো মানুষকে ভূখা রেখে তিলে তিলে মৃতু্যর দিকে এগিয়ে দিয়েছে। এসব ছিল প্রাথমিক লক্ষণ, এরপর নোংরামি, বর্বরতা, নীচতা, পশুসুলভ আচরণ ইত্যাদির অগি্নকাণ্ড হঠাৎ ফেটে পড়লো। এগুলো এখানকার গভীরে বহুদিন হতে উত্তপ্ত হচ্ছিল। বর্তমানে একটি সামপ্রদায়িক দাঙ্গারূপে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সবকিছু জ্বালিয়ে ছাই করে দিচ্ছে। কলকাতার গোলযোগের পর থেকে হিন্দু, মুসলমান ও শিখদের জাতীয় বিরোধের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনটি জাতিই তাদের জঘন্য চরিত্রের প্রদর্শনী করে বেড়াচ্ছে।

যে সমস্ত কাজ কোন মানুষ করতে পারে বলে ধারণাও করা যেত না, তা আজ আমাদের দেশবাসীরা প্রকাশ্যে করে যাচ্ছে। বড় বড় অঞ্চলের প্রায় সমস্ত লোক গুন্ডায় পরিণত হয়েছে। গুন্ডারা যে কাজ করার ধারণাও কোন দিন করেনি তাও এখন তারা করছে। দুগ্ধ-পোষ্য শিশুদের মায়ের বুকের উপর রেখে জবাই করা হয়েছে, জীবন্ত মানুষদেরকে আগুনে জ্বালানো হয়েছে। ভদ্র মহিলাদের হাজার হাজার লোকের সামনে উলঙ্গ করে তাদের উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছে। পিতা, ভাই ও স্বামীর সামনে তাদের মেয়ে, বোন ও স্ত্রীর শ্লীলতা হানি করা হয়েছে। মসজিদ, মন্দির ও ধর্মীয় গ্রন্থরাজির উপর ক্রোধ প্রকাশ করতে গিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিক উপায় অবলম্বন করা হয়েছে। রুগ্ন, আহত ও বৃদ্ধাদেরকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। পথিক যাত্রীদেরকে চলন্ত গাড়ী থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করা হয়েছে। নিরীহ ও অক্ষম লোকদেরকে জন্তু-জানোয়ারের মতো শিকার করা হয়েছে। প্রতিবেশী ও প্রতিবেশীর গৃহ লুট-তরায করেছে। বন্ধুর প্রতি বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আশ্রয় দাতা আশ্রয় দিয়ে নিরাশ্রয় করেছে। শান্তি ও নিরাপত্তার রক্ষকগণ (পুলিশ, সৈন্য ও ম্যাজিষ্ট্রেটগণ) প্রকাশ্যে দাঙ্গায় অংশ গ্রহণ করেছে এমনকি তারা নিজেরাই দাঙ্গা করেছে এবং নিজেদের সাহায্য সহানুভূতি ও তত্ত্বাবধানে দাঙ্গা বাধিয়েছে। মোটকথা, অত্যাচার, অনাচার, নিষ্ঠুর ও নির্দয় ব্যবহার, বর্বরতা ও জঘন্য কার্যকলাপ ইত্যাদির কোন কিছু আর বাকী নেই, যা এ কয়েক মাসের ভেতর আমাদের দেশের লোকেরা সমষ্টিগতভাবে করেনি। তবুও মনের জ্বালা মেটেনি। আলামত যা দেখা যাচ্ছে, মনে হয় এর চেয়ে অনেক বেশী ভয়াবহ ও বিরাট আকারে দাংগা এখন দেখা দেবে।

আপনারা কি মনে করেন, এসব কিছুই একটা আকস্মিক উত্তেজনার ফল মাত্র। এরূপ ধারনা করে থাকলে আপনারা বিরাট ভুলের মধ্যে আছেন বলতে হবে। এই মাত্র আমি আপনাদের বলেছি যে, এ দেশের শতকরা পঁচানব্বই জন নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। দেশের জন সমষ্টির এত বিরাট অংশ যদি অসৎ চরিত্রের হয়ে পড়ে তা হলে জাতির সমষ্টিগত স্বভাব চরিত্র কেমন করে ঠিক থাকতে পারে? এই জন্যই তো হিন্দু-মুসলমান ও শিখ জাতির কাছে সত্যবাদিতা, সুবিচার ও সততার কোন দামই এখন নেই। সত্যপন্থী, সৎ এবং ভদ্রস্বভাব বিশিষ্ট লোকেরা তাদের ভিতর কোনঠাসা ও দুর্বল হয়ে রয়েছে। মন্দ কাজে বাধা দান এবং ভাল কাজ করার জন্য উপদেশ দেয়া তাদের সমাজে অসহনীয় অপরাধে পরিণত হয়েছে, সত্য ও ন্যায় কথা শুনতে তারা প্রস্তুত নয়।

তাদের মধ্যে একটি জাতিই এমন লোকদেরকে পছন্দ করে যারা তার সীমাহীন লোভ লালসা ও স্বার্থের পক্ষে ওকালতি করে এবং অন্যের বিরুদ্ধে তাকে উত্তেজিত করে তার ন্যায় ও অন্যায় সবরকম স্বার্থোদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করতে প্রস্তুত হয়। এজন্যই এরা নিজেদের ভিতর থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে দুষ্ট প্রকৃতির লোকদেরকে নিজেদের নেতা নির্বাচন করেছে। তারা নিজেদের জঘন্যতম অপরাধীদেরকে খুঁজে বের করে তাদেরকে নিজেদের নেতৃত্ব পদে বরণ করে নিয়েছে। তাদের সমাজে সবচেয়ে দুশ্চরিত্র, দূর্নীতিবাজ, বিবেকহীন লোকেরা তাদের মুখপাত্র সেজে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অত্যাধিক বরণীয় হয়েছে। অতঃপর এসব লোকেরা নিজ নিজ পথভ্রষ্ট জাতিকে নিয়ে ধ্বংসের পথে দ্রুত গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। তারা জাতির পরস্পর বিরোধী আশা-আকাংখাকে কোন ইনসাফের কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিত না করে তাকে এতখানি বাড়িয়ে দিয়েছে যে, তা অবশেষে সংঘর্ষের সীমান্তে পৌঁছেছে। তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘর্ষে ক্রোধ, ঘৃণা, শত্রুতার বিষ মিশিয়ে একে নিত্য অগ্রবর্তী করেছে। বহু বছর ধরে নিজেদের প্রভাবাধীন জাতিগুলোকে উত্তেজনামূলক বক্তৃতা ও রচনার ইনজেকশন দিয়ে এতখানি উত্তেজিত করে তুলেছে যে, এখন উত্তেৎনাবশতঃ কুকুর ও হিংস্র পশুর মত লড়াই করবার জন্য খড়গ উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসাধারণ ও শিক্ষিত সমাজের মনকে পৈশাচিক আবেগ ও উচ্ছাসে দূর্গন্ধময় এবং অন্ধ শত্রুতার চুল্লীবানিয়ে ফেলেছে। আপনাদের সামনে এখন যে তুফান প্রবাহিত হচ্ছে তা মোটেই সাময়িক ও আকস্মিক নয়। বহুদিন থেকে বিকৃতির যেসব বেশুমার কার্যকারণ আমাদের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে এ হলো তারই স্বাভাবিক পরণতি। এটা একবার দেখা দিয়েই ক্ষান্ত হবে না; বরং যতদিন পর্যন্ত এসব কার্যকারণ সক্রিয় থাকবে, ততদিন এ বিকৃতি ক্রমশ বাড়তে থাকবে। এটা একটা শস্যপূর্ণ ক্ষেতের মত। বহু বছরের বীজ বপন ও জল সেচের পর এ ফসল খাবার উপযুক্ত হয়েছে। এখন আপনাকে এবং আপনার বংশধরদেরকে কতদিন পর্যন্ত এ ফসল কাটতে হবে তা বলা যায় না।

Friday, September 30, 2011

পরিবেশ সংরক্ষণে বিশ্ব নবীর (সা.) আদর্শ || ড. মুহা. বিলাল হুসাইন

মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান হলো পরিবেশ। মানুষসহ সব প্রাণীকুলের জন্য সুস্থ পরিবেশ আবশ্যক। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিত্সা—সবই কোনো না কোনো পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ভাষায়, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে ওজোনস্তর পর্যন্ত বিস্তৃত পরিমণ্ডলে বিদ্যমান আলো, বাতাস, পানি, মাটি, বন, পাহাড়, নদী, সাগর মোটকথা উদ্ভিদ ও জীবজগত সমন্বয়ে যা সৃষ্টি তাই পরিবেশ। পরিবেশের সব উপাদান মহান আল্লাহতায়ালার অপার অনুগ্রহ। মানুষের কল্যাণ ও স্বাভাবিক প্রয়োজনের তাগিদে এগুলো তৈরি করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এভাবে বর্ণনা করেছেন—‘তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহতায়ালা তোমাদের কলাণে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিয়ামতগুলো পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন’ (সূরা-লোকমান : আয়াত-২০)। নিশ্চয় আমি সব জিনিস সৃষ্টি করেছি সুস্পষ্টভাবে ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ অনুযায়ী (আল-কামার : আয়াত-৪৯)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, তাদের জন্য একটি নির্দশন মৃতভূমি। আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উত্পন্ন করি শস্য, তা তারা ভক্ষণ করে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর এবং প্রবাহিত করি ঝরনা, যাতে তারা ফল পায় (সূরা-ইয়সিন : আয়াত-৩৩)।
এ থেকে বোঝা যায়, পরিবেশের যথাযথ সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক না রাখি তাহলে বিপর্যয় অনিবার্য। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য মহানবী (সা.) কর্তৃক পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি ও ব্যবস্থা আমাদের দৃঢ়ভাবে ধারণ করা উচিত।
পরিবেশ আল্লাহর সৃষ্ট রহস্যাবৃত নেয়ামতগুলোর অন্যতম। জীব ও জড় উপাদানগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলই হলো পরিবেশ। এ উপাদানগুলোর মধ্যে প্রাণী, উদ্ভিদ, আলো, বাতাস, মাটি, উত্তাপ প্রভৃতি অন্যতম। পরিবেশ হলো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে ওজোনস্তর পর্যন্ত বিস্তৃত পরিমণ্ডলে বিদ্যমান আলো, বাতাস, পানি, মাটি, বন-পাহাড়, নদী, সাগরসহ গোটা উদ্ভিদ ও জীবজগত সমন্বয়ে যা সৃষ্টি তাই পরিবেশ।
পরিবেশ আল্লাহর অস্তিত্ব বহন করে। সত্যান্বেষী ও অনুসন্ধানকারীদের জন্য হেদায়াতের দিকনির্দেশনা দেয়। যেমন আল্লাহ যদি সূর্যের আলো কমিয়ে দিতেন তাহলে পৃথিবী হয়ে উঠত বরফে আচ্ছাদিত। আর যদি সূর্যের আলো তীব্র করে দিতেন, তাহলে পৃথিবী হয়ে উঠত উত্তপ্তময় ও অগ্নিকুণ্ডের মতো, যা কোনোক্রমেই জীবজগতের অস্তিত্বের উপযোগী নয়। কিন্তু আল্লাহতায়ালা পরিবশেকে সব জীবের উপযোগী করে সুষম ভারসাম্যে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি প্রত্যেক বস্তুকে, সুষমভাবে ও পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি (সূরা-আল কাসার : আয়াত-৪৯)। পরিবেশ দু’ধরনের। একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ, অন্যটি সামাজিক পরিবেশ।
প্রাকৃতিক পরিবেশ : প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার দাবিতে পৃথিবীব্যাপী সব শ্রেণীর মানুষ খুবই সোচ্চার। মানুষের খেয়ালিপনা ও অদূরদর্শিতার কারণে প্রাকৃতিক যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে তা বিশ্ববাসীর ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে বায়ুতে বেড়েছে দূষণ, বেড়েছে তাপমাত্রা, আরও বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ-শোক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তাই এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানীরা বন রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণকে অন্যতম উপায় বলে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ গাছপালা, লতাপাতা, মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে, মানুষ ও জীবের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত করে। এই বাস্তবতা বা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) চৌদ্দশ’ বছর আগেই অনুভব করেছিলেন এবং সাহাবিদের সেই আলোকে দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার জন্য মলমূত্র, পচা-গন্ধ, নোংরা ও ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি এগুলোকে নাজাসাত বা নাপাকি বলে আখ্যায়িত করে ঘোষণা করেছেন পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ (আল-হাদিস)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, যারা পবিত্র আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন (সূরা-আত তওবাহ : আয়াত-১০৮)। এছাড়া হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কেয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায় তবে সে চারাটি লাগাবে (আল-হাদিস)।
সামাজিক পরিবেশ : মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করবে—এটা পৃথিবীর একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটা সম্ভব হবে সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সমতা, সাম্য, দয়ামায়া, ভালোবাসার সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করার ফলে। অন্যায়, অবিচার, জুলুম, মিথ্যা ও হানাহানিমুক্ত পরিবেশই সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার জন্য সহায়ক। সমাজের নানা অসঙ্গতি, জুলুম, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, সুদ, জুয়া, মিথ্যাচার সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে খুবই ক্ষতিকর। এসবের বিরুদ্ধে রাসুল (সা.) মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন। কখনও আবার কঠোর ভাষায় হুশিয়ার করেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিনরা যখন দোজখের আগুন থেকে নাজাত পাবে, তখন দুনিয়াতে একে অপরের প্রতি যে জুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন, মজুলমের বদ দোয়াকে ভয় কর। কেননা তার বদ দোয়াও আল্লাহর মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।
পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে রাখতে হলে পরিবেশকে অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। মহান আল্লাহতায়ালা ও প্রিয় নবী (সা.) এ ব্যাপারে কখনও সতর্কবার্তা আবার কঠোর ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও তার হেফাজত যেহেতু মুসলমানদের ঈমান-আকিদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধায় ঈমান রক্ষার তাগিদে প্রতিটি মুসলমান সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য সব শ্রেণীর মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এ পৃথিবী সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের শান্তিপূর্ণ আবাসস্থল হয়ে উঠুক—এ কামনা করছি। 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ সূত্র : আমার দেশ

Friday, September 23, 2011

মৃত্যুচিন্তা জীবন ও কর্মে আনে পরিশুদ্ধি || মুহাম্মদ আনছারুল্লাহ হাসান

মানুষের জীবনে মৃত্যুর আগমন সুনিশ্চিত। ‘মৃত্যু অবশ্যই আসবে’ এই চিরসত্য বিষয়ে কেউ দ্বিমত প্রকাশ করেনি বা মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করেনি। এমনকি কাফের সম্প্রদায় আল্লাহর একত্ববাদ অস্বীকার করেছে, আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলদের অমান্য করেছে। আসমানি কিতাবকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে। কিন্তু মৃত্যু যে সবার জন্য অবধারিত তা অস্বীকার করতে পারেনি। তাই বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী প্রত্যেকেই এ কথায় বিশ্বাসী যে, দুনিয়ায় যে ব্যক্তির আগমন হয়েছে, একদিন না একদিন সে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। মৃত্যু-বিশ্বাসী প্রত্যেকেই এ বিষয়েও একমত। এই মৃত্যু কখন কোথায় কীভাবে আসবে তা কেউ জানে না। যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যুর ডাক এসে যেতে পারে। শিশু- যুবক-বৃদ্ধ সবার তরে এ বাস্তবতা চিরসত্য, মৃত্যুর সমন কোনো অনুমতি চেয়ে এবং সময়সূচি বলে দিয়ে আসবে না। বরং মৃত্যুর খোদায়ি হুকুম সুনির্ধারিত সময়ে অতর্কিতে এসে যাবে। সুতরাং কার মৃত্যু কখন হবে, এ সম্পর্কে কোনো সঙ্কেত বা সতর্কবাণী কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিতে পারেনি এবং কোনো অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীও বলতে পারেনি।
মানুষ কত মৃত্যু সংবাদ পড়ে ও শোনে। কত মানুষের লাশ দেখে, কতজনকে চোখের সামনে দিয়ে কবরে নিয়ে যেতে দেখে। তবুও মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে নিজের করণীয় সম্পর্কে, ভালো-মন্দ পরিণতি সম্পর্কে চরম উদাসীন ও বেখবর থাকে। হজরত উসমান (রা.) বলেন, মানুষ প্রতিদিন তার মতো মানুষকে মৃত্যুবরণ করতে দেখে কিন্তু নিজের মৃত্যুর কথা ভুলে যায়। হজরত ঈসা (আ.) বলেন, দুনিয়াদারের পরিণতি দেখলে আমার কষ্ট লাগে। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, না খেয়ে না পরে সম্পদ জমা করে অথচ একসময় সবকিছু ফেলে খালি হাতে চলে যায়। দুনিয়া মানুষকে একের পর এক ধোঁকা দিতেই থাকে। অথচ মানুষ তাকে আপন থেকে আপন মনে করে। যারা দুনিয়ার ধোঁকার শিকার, তাদের জন্য শত আফসোস। ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য অনিবার্য, দুনিয়া হয় যার চিন্তা-চেতনা, গুনাহ এবং বদ আমল হয় যার পুঁজি। এমন ব্যক্তি কিয়ামতের ময়দানে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হবে।
পৃথিবীতে মানুষ যেসব জুলুম-অত্যাচার, নাফরমানি ও সীমালঙ্ঘন করে, বেপরোয়াভাবে গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, তার কারণ হলো মানুষ নিজের মৃত্যুর কথা ভুলে যায়। মৃত্যুপরবর্তী জীবনের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করে না।
শরীরে যতক্ষণ সুস্থতা ও শক্তি থাকে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গও সচল থাকে ততক্ষণ মানুষ ভাবে—আমি তো দুর্বার মহাক্ষমতাশালী, কোনোকিছুই আমার সামনে বাধা নয়, নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে আনন্দ-ফুর্তির ভোগ-বিলাসিতার শ্রেষ্ঠ উপজীব্য সময় এখন। তখন মানুষ আল্লাহর নিষিদ্ধ সব শাখা-প্রশাখায়, অনৈতিক ও গর্হিত সব অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ায়। অন্যের হক লুণ্ঠন করে। অহঙ্কার ও ক্ষমতার দাপটে অন্যের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায়। মোট কথা, অন্যায়-অপরাধের সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
মৃত্যুর চিন্তা ও স্মরণ থেকে মানুষের চরম উদাসীনতার মূল কারণ হলো দুনিয়ার ভালোবাসা ও পার্থিব জীবনের আসক্তি, দুনিয়া ও দুনিয়াবি বিষয়াবলী, পার্থিব বস্তুসামগ্রীকে মানুষের সম্মুখে মুগ্ধকর ও সুশোভিত করে দেয়া হয়েছে। জীবনোপকরণ হিসেবে পার্থিব বস্তুসামগ্রীর চাহিদা থাকা শরিয়তসম্মত, কিন্তু দুনিয়া ও ভোগের সামগ্রীর আসক্ত হওয়া, পার্থিব জগত্ ও আকর্ষণীয় বিষয়ে মোহগ্রস্ত হওয়া খুবই নিন্দনীয় এবং ধ্বংসের মূল কারণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : দুনিয়ার ভালোবাসা সব পাপের মূল। দুনিয়ার আসক্তি মানুষকে কুপ্রবৃত্তির পূজারী বানায়, কামনা-বাসনার অনুগামী করে। পরিশেষে কুপ্রবৃত্তির চাহিদা ও ভোগবাদী মানসিকতা মানুষকে বহুমুখী কর্মতত্পরতায় নিমগ্ন করে এবং তার পার্থিব চাহিদার পরিধি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। ফলে সীমাহীন লোভ-লালসা ও সর্বগ্রাসী ক্ষুধা মেটানোর অনবরত সাধনার মধ্য দিযে মৃত্যুভাবনাহীনভাবে দিন-রাত অতিবাহিত করে। একপর্যায়ে হালাল ও বৈধ আয়-উপার্জনের গণ্ডি পেরিয়ে অবৈধ-অন্যায় পথেও অতিরিক্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে করতে আরও নানামুখী তত্পরতায় লিপ্ত হয় এবং নির্ভাবনায় কেবল অর্থবিত্তের নেশায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, কলকারখানা, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনা, অন্যায়-অনাচারের যে মহোত্সব চলছে তার মৌলিক কারণ হলো দুনিয়া লাভের তীব্র প্রতিযোগিতা ও মৃত্যুচিন্তা থেকে চরম উদাসীনতা। এক হাদিসে রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার ভয় করি না কিন্তু আমি ভয় করি যে, তোমাদের ওপর দুনিয়াকে প্রশস্ত করে দেয়া হবে। যেমনি প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, তোমরা তা লাভ করার জন্য এরূপ প্রতিযোগিতা করবে। যেরূপ তারা করেছিল। ফলে তা তোমাদের ধ্বংস করবে, যেরূপ তাদের ধ্বংস করেছিল। (বুখারি-মুসলিম)
তাহলে ইসলাম কি মানুষকে দুনিয়াবি কর্মকাণ্ড থেকে বিমুখ হতে বলেছে? আয়-উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি করতে নিষেধ করেছে? না, এক্ষেত্রে ইসলামের মূল বক্তব্য হলো, দুনিয়ার ভালোবাসা যেন তোমাদের অন্তরে প্রবিষ্ট না হয়, দুনিয়ার অর্থবিত্ত, ধন-সম্পদ, ভোগ-বিলাস, আনন্দ-সুখই যেন তোমাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু না হয়। ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন ও তার সব চাওয়া-পাওয়াই যেন মূল উদ্দেশ্য না হয়, দুনিয়াবি কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, আয়-উপার্জন সবই কর। তবে তা যেন ইসলামসম্মত উপায়ে হয়। দুনিয়াবি জীবনযাপন, যাবতীয় কর্মকাণ্ড যেন পরকাল থেকে গাফেল ও উদাসীন করে না দেয়। দুনিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন আখেরাত থাকে। এর প্রকৃষ্ট নিয়ামক হলো মৃত্যুচিন্তা, মৃত্যুস্মরণ।
কোরআন-হাদিসে বার বার মৃত্যুর কথা আলোচনা করা হয়েছে। মৃত্যুচিন্তাকে অন্তরে জাগ্রত করতে বলা হয়েছে। অধিক হারে মৃত্যুকে স্মরণ করতে আদেশ করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সমস্ত স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ কর।’
মৃত্যুচিন্তার প্রথম স্তর বা একটা দিক হলো, মাঝে-মধ্যে বিশেষ রাতে নবীর নির্জনতায় মওতের মোরাকাবা করা, এ চিন্তা ও ধ্যান করা—আমাকে একদিন এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। মনের মাধুর্যতায় ভরা জীবন পরম সুখ-শান্তির অঙ্গন ছেড়ে অন্য জগতে পাড়ি দিতে হবে। ছেলে-সন্তান, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা ছাড়তে হবে। সব মায়া-মমতার বন্ধন ছাড়তে হবে। চিরচেনা পরিবেশ, পরিচিত মানুষজন, পরিতৃপ্তির খাদ্য, আরামের সাজশয্যা, ধরিত্রীর আলো-বাতাস ছেড়ে অন্ধকার কবরে থাকতে হবে। সঞ্চিত সম্পদ, ঘর-বাড়ি সবকিছু ছেড়ে একাকী শূন্যহাতে বিদায় নিতে হবে। এরপর কঠিন জগতের সূচনা হবে। ফেরেশতা আসবে। সওয়াল জওয়াব হবে। হাশর-জান্নাত-জাহান্নামের অসহ্য যন্ত্রণা ও অন্তহীন দুর্ভোগের চিত্র অন্তরে বসানো ও কল্পনা করা।
মৃত্যুচিন্তার আরেকটি দিক বা দ্বিতীয় স্তর হলো—মানুষ যখন এভাবে মৃত্যুর কথা ভাবে, কবরের যিন্দেগীর কথা চিন্তা করে, হিসাব-নিকাশের কথা হাশর-ময়দানের অবস্থা অন্তরে জাগ্রত করে তখন তার অন্তর অতীত গুনাহের কথা ভেবে কেঁপে ওঠে। সে সচেতন হয়ে ওঠে। সে সবাইকে অন্ধকার জগত্ থেকে আলোর দিকে দৌড়াতে থাকে। অনুতাপ-অনুশোচনায় সে পুড়তে থাকে। এভাবেই আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের মহৌষধ সে পেয়ে গেল। ইসলাহের উত্তম ব্যবস্থা হয়ে গেল।
মৃত্যুচিন্তার এই প্রেসক্রিপশনের ফলে মানুষের অন্তরে সদা আল্লাহর ভয় এবং আখেরাতের ফিকির জাগ্রত থাকে। এখন কোনো ধরনের গুনাহর কাজ, হারাম ও অবৈধ আয়-উপার্জনের চিন্তা, আল্লাহ পাকের নাফরমানী এবং তার হুকুমের বিরোধী যেসব চাহিদা অন্তরে সৃষ্টি হতো তার চিন্তা ও কল্পনাও তার মনে আসে না। পাপের জগতে পা বাড়ায় না, দুনিয়াবী চাহিদার স্বাদ জাগে না। এজন্য উলামায়ে কেরাম বলেন, মৃত্যুচিন্তা হলো নফসের গোলামীর বিরুদ্ধে, কুপ্রবৃত্তির চাহিদার বিরুদ্ধে, দুষ্টু মন-মানসিকতার বিরুদ্ধে এবং শয়তানী ধোঁকা ও প্ররোচনার বিরুদ্ধে একটি বড় হাতিয়ার। কারণ মৃত্যুচিন্তা মানুষের অন্তরকে খোদামুখী করে এবং ইখলাস ও হিল্লাহিয়াত সৃষ্টি করে। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তুমি এমনভাবে নামাজ আদায় কর যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ নামাজ। এভাবে যে নামাজ আদায় করা হবে তা সুন্দর হবে এবং একনিষ্ঠতায় পূর্ণ হবে। শুধু নামাজ নয়, প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র, প্রতিটি অঙ্গন সৌকর্যমণ্ডিত হবে, সততা ও নিষ্ঠায় ভরে উঠবে প্রতিটি কর্মকাণ্ড। অন্তরে মৃত্যুচিন্তা জাগ্রত ব্যক্তির দ্বারা দুর্নীতি হবে না, সুদ-ঘুষের লেনদেন হবে না, মিথ্যা- প্রতারণামূলক আচরণ হবে না। অফিস-আদালতের কর্মকাণ্ডে ফাঁকি হবে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে চুরি বাটপারি হবে না। প্রতিটি কাজে দেখা যাবে যথাযথ কর্তব্যপরায়ণতা।
মোট কথা, মৃত্যুচিন্তা হলো প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব পাহারাদার, যা তাকে সব ধরনের অন্যায়-অনাচার থেকে রক্ষা করবে। তাই মানুষ যদি যথার্থভাবে মৃত্যুচিন্তা জাগ্রত করতে পারে, তবে তা তার জীবনে আমূল পরিবর্তন সাধন করবে। তার নফসকে পরিশুদ্ধ করবে। তার কর্ম ও চিন্তা-চেতনাকে মহত্ ও শুদ্ধ করবে। তার চরিত্রকে সুন্দর করবে। আল্লাহতাআলা সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন।

Tuesday, September 20, 2011

দায়ী‌’ ইলাল্লাহ - দা’ওয়াত ইলাল্লাহ

দুটি কথা
ইসলামই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মানব জীবনের এমন কোন বিভাগ নেই, যে সম্পর্কে ইসলাম সঠিক সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ দান করেনি। পূর্ণাংগ মানব জীবনকে খোদায়ী হেদায়াতের অধীন করে দেওয়ার জন্যেই ইসলামের আগমন। তাই, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ আন্দোলন, একটি সর্বাত্বক বিপ্লব। মানব সসমাজকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার দিকে দাওয়াত দানই এ আন্দোলন ও বিপ্লবের প্রধান কর্মধারা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকেও দা’য়ী ইলাল্লাহর দায়িত্ব দিয়েই দুনিয়াতে দ্বীনের দাওয়অত দান করতে হয়। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীর প্রকৃত পরিচয়ই হচ্ছে তিনি দা’য়ী ইলাল্লাহ’।
শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অগ্রনায়ক মওলানা সাইয়েধ আবুল আ’লা মওদূদীর (মৃত্যু ১৯৭৯ ইং) সীরাতে সরওয়ারে আলম’ ও Ôখোতবাতে ইউরোপ’ গ্রন্থটি সংকলন করা হয়েছে। একজন দা’য়ী ইলাল্লাহর কি কি গুণাবলী থাকতে হবে এবং দাওয়াতে দ্বীনের সঠিক কর্মপন্থাই বা কি কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ গ্রন্থে তার পরিপূর্ণ রূপরেখা চিত্রিত হয়েছে।
আবদুস শহীদ নাসিম


আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর গুণাবলী
(মুসলিম ষ্টুডেন্টস এসোসিয়েশন অব আমেরিকা এণ্ড ক্যানাডার প্রতিনিধি জনাব আনিস আহমদ ১৯৭৯ সালের ৮ই এপ্রিল বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের চিন্তানায়ক, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর (রঃ) একটি ইন্টারভিউ গ্রহণ করেন। মূলতঃ এটি এম, এস, এর বার্ষিক সম্মেলনের জন্যে শুভেচ্ছাবাণী হিসেবে রেকর্ড করা হয়, যদিও তা প্রশোত্তরের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে।
এম, এস, এর প্রতিনিধি
মাওলানা! দারুণ অসুস্থতা সত্ত্বেও আমাদের দাওয়াত কবুল করায় এবং আমাদের বার্ষিক সম্মেলন’৭৯ এর জন্যে এ বিশেষ ইন্টারভিউ দিতে রাজী হওয়ায় আমি দক্ষিণ আমরিকা ও ক্যানাডার মুসলমানদের এবং এম.এস.এর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি আন্তরিক শুকরিয়া জানাই। এটা একান্তই আল্লাহর মেহেরবানী ও অনুগ্রহ যে, দক্ষিণ আমেরিকায় আপনার ও ইখওয়ানুল মুসলেমুনের নেতৃবৃন্দের লিখনী ইসলামী আন্দোলনের চিন্তাকে দ্রূত প্রসারিত করে চলেছে। আজ আমেরিকায় অগণিত লোক আপনাকে এক নযর দেখার জন্যে এবং আপনার পক্ষ থেকে কিছু উপদেশবাণী শুনার জন্যে অপেক্ষামান। তাদেরই প্রবল আগ্রহ ও দাবীর পেক্ষিতে আমি আপনার খেদমতে হাযির হয়েছি।
প্রশ্নঃ মুহতারাম মাওলানা! কুরআনে করীম রাসূলে খোদা (সঃ)-কে ‘দা’য়ী ইলাল্লাহ’ বলে আখ্যায়িত করে। কুরআন এবং সীরাতে পাকের আলোকে একজন দা’য়ীয়ে হকের জন্যে কোন্ সব গুণাবলীকে আপনি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
জবাবঃ আমেরিকা এবং ক্যানাডায় আল্লাহর যেসব বান্দাহ ইসলামী আন্দোলনের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের সকলকে আমার পক্ষ থেকে সালাম পৌছে দেবেন। (অসুস্থতার কারণে) আমি বেশীক্ষণ কথা বলতে পারিনা। তাই সংক্ষিপ্তভাবে আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিঃ
আরবী হবে-------------
‘ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো আর ঘোষণা করলো: ‘আমি একজন মুসলমান’ (হামীমুস সাজদাহ-৩৩)
এ আয়াতের পূর্ণ গুরুত্ব অনুধাবনের জন্যে একথা মনে রাখতে হবে যে, এ আয়াত মক্কার কঠিন বিরোধিতার পরিবেশে নাযিল হয়েছে। এটা ছিল সেই মর্মান্তিক অধ্যায়, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের উপর নির্মম নির্য়াতন চালানো হচ্ছিল। সে পরিবেশে একথা বলা এবং ঘোষণা করা কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না যে, ‘আমি একজন মুসলমান’। এরূপ অবস্থা ও পরিবেশে প্রথম কথা এটা বলা হলো যে, সে ব্যক্তির কথাই সর্বোত্তম, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে। অন্য কথায় একজন সত্যপথের দাওয়াত দানকারীর বৈশিষ্ট্যই এটা যে তার দাওয়াত হবে আল্লাহর দিকে। তার সামনে কোননো প্রকার পার্থিব উদ্দেশ্য থাকবে না। দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্যই তার মনের কোণে স্থান পেতে পারবে না। যে ব্যাক্তি খালেছভাবে আল্লাহর দিকে আহবান করেন, কুরআন মজীদের শিক্ষা অনুযায়ী এমন আহ্বানকারীর প্রথম বৈশিষ্ট্য এটাই হতে হবে যে, তিনি আল্লাহর একত্বের (তাওহীদের) প্রতি দাওয়াত দেবেন। তাকে এ ভাবে আহ্বান করতে হবেঃ হে মানুষ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব, আনুগত্য বা উপাসনা করবে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে না। তিনি ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু পাওয়ার লোভ ও কামনা করবে না। কেবলমাত্র আল্লাহর হুকুম ও নির্দেশ সমূহের আনুগত্য করো। কেবলমাত্র তাঁর বিধানেরই অনুসরণ করো।
পৃথিবীতে মানুষ যে কাজই করে। সে একথা চিন্তা করেই করে যে, আমি কার গোলামী ও আনুগত্য কারছি এবং কার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। মানুষের সমস্ত তৎপরতা ও চেষ্টা সাধনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হওয়া চাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন গঠনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তোষ লাভ।
দ্বিতীয় কথা বলা হয়েছে। হক পথের দাওয়াত দানকারীকে আমলে সালেহর সৌন্দর্যে সুশোভিত হতে হবে। তাকে নেক আমল করতে হবে। একটু চিন্তা করলে এ পরমানটার তাৎপর্য পরিস্কার হয়ে যাবে। ব্যাপারটা হচ্ছে দাওয়াত দানকারীর নিজের আমলই যদি দুরন্ত না হয়, তবে তার দাওয়াতের আর কোন প্রভাবই থাকে না। তা সম্পূর্ণ বেকার হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি যে জিনিসের প্রতি লোকদেরকে দাওয়াত দেবেন তার নিজেকেই প্রথমে সে জিনিসের প্রতিমূর্তি হতে হবে। তার নিজের জীবনে আল্লাহর নাফরমানীর এতটুকু বির্চুতিও যেনো পাওয়া না যায়। তার নৈতিক চরিত্র এমন হতে হবে যেনো কোন ব্যক্তি তাতে একটি দাহও খুজেঁ না পায় । তার আশপাশের পরিবেশ, তার সমাজ, তার বন্ধু বান্ধব, তার আপনজন ও আত্মীয় স্বজন যেনো একথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে এক উচ্চ ও পবিত্র চরিত্রের ব্যক্তি রয়েছেন।
কুরআন পাকের সাথে সাথে সীরাত পাকেও আমরা হুবহু এ একই শিক্ষা পাই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হায়াতে তাইয়েবা সাক্ষ্য দেয় যে, যখন তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনে হকের দাওয়াত দিতে আরম্ভ করেন, তখন সেই সমাজ যাদের মধ্যে তিনি জীবনের চল্লিশটি বছর অতিবাহিত করেন, তাদের মধ্যে এমন একজন লোকও ছিল না, যে তাঁর উন্নত নৈতিক চরিত্রের প্রবক্তা এবং প্রশংসাকারী ছিলো না। যে ব্যক্তি তাঁর যত নিকটে অবস্থান করছিলো, সে ততো বেশী তাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিলো। যে লোকগুলো থেকে তাঁর জীবনের কোনো একটি দিকও গোপন ছিলো না, তারাই সর্বপ্রথম তাঁর নবুওয়াতের স্বীকৃতি দান করেন।
হযরত খাদীজা (রাঃ)
হযরত খাদীজা (রাঃ) বিগত পনরটি বছর হুজুর (সঃ)-এর দাম্পত্য জীবনের একান্ত সঙ্গী ছিলেন। তিনি কোনো কমবয়েসী মহিলা ছিলেন না। বরঞ্চ বয়েসে হুজুর (সঃ) থেকে ছিলেন অনক বড়। হুজুর (সঃ)-এর নবুওয়াত লাভের কালে তাঁর বয়েস ছিল পঞ্চান্ন বছর। এরূপ একজন বয়স্কা, অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারীণী মহিলা যিনি বিগত পনেরটি বছর স্বামী হিসেবে আড়ালবিহীন নিকট থেকে তাঁকে দেখেছেন, স্বামীর কোনো দোষক্রটি তাঁর কাছে গোপন থাকতে পারে না। কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে স্ত্রী স্বামীর না-জায়েয কাজে শরীক হতে পারে বটে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই একথা মানতে পারেন না যে, ইনি নবী হতে পারেন কিংবা তাঁর নবী হওয়া উচিত। পক্ষান্তরে হযরত খাদীজা (রাঃ) হুজুর (সঃ) -এর প্রতি এতো অধিক বিশ্বাসী ও মুতাকিদ ছিলেন যে, তিনি যখন নবুওয়াত লাভের ঘটনা তাঁর নিকট বর্ণনা করেন, তখন একটি মুহূর্ত পর্যন্ত চিন্তা না করে দ্বিধাহীন চিত্তে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর প্রতি ঈমান আনেন এবং তাঁর নবুওয়াতকে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
হযরত যায়েদ (রাঃ)
একেবারে নিকট থেকে যারা তাঁকে জানতেন, তাদেঁর দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা (রাঃ) । একজন গোলাম হিসেবেন হুজুর (সঃ) এর সংসারে তাঁর আগমন ঘটে। পনের বছর বয়েসে তিনি এ ঘরে আসেন। হুজুর (সঃ) -এর নবুওয়াত প্রাপ্তিকালে তাঁর বয়স ছিলো ত্রিশ বছর । অর্থাৎ গোটা পনেরটি বছর হুজুর (সঃ) এর ঘরে থেকে জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগ থেকে হুজুর (সঃ) কে দেখার ও বুঝার সুযোগ তাঁর হয়েছে। হুজুর (সঃ) সম্পর্কে তাঁর ধারণা একটা ঘটনার মাধ্যমে আরো পরিস্কার হয়ে ওঠে। ঘটনাটা হচ্ছে, ছোট বেলায় পিতা-মাতা থেকে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। ভাগ্য তাকেঁ হুজুর (সঃ) পর্যন্ত পৌছে দেয়। তাঁর বাপ-চাচারা যখন জানতে পারলো আমাদের সন্তান অমুক স্থানে গোলামীর জীবন যাপন করছে, তখন তারা মক্কায় এলো। এটা হচ্ছে হুজুর (সঃ) –এর নবুওয়াত লাভের আগেকার ঘটনা। তারা এসে হুজুর (সঃ)–কে বললোঃ
‘আমাদের ছেলেটাকে যদি আযাদ করে দেন, তবে এটা আমাদের প্রতি বড়ই মেহেরবাণী হবে’।
তিনি বললেনঃ ‘আমি ছেলেকে ডাকছি। সে যদি আপনাদের সাথে যেতে চায় তবে আমি তাকে আপনাদের সাথে রওয়ানা করিয়ে দেবো। আর সে যদি আমার কাছে থাককত চায়, তবে আমি এমন লোক নই যে, কেউ আমার কাছে থাকতে চাইবে আর আমি জোরপূর্বক তাকেঁ দূরে ঠেলে দেবো’।
তাঁর এ জবাবে তারা বললো, আপনি বড়ই ইনসাফের কথা বলছেন। আপনি যায়েদকে ডেকে ব্যাপারটা জেনে নিন। তিনি যায়েদকে ডেকে পাঠালেন। যায়েদ যখন সামনে উপস্থিত হলো, হুজুর আরাম (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ
এ লোকদের চেনোঃ
যায়েদ বললেনঃ ‘জী-হ্যাঁ! এরা আমার আব্বা এবং চাচা’।
হুজুর (সঃ) বললেনঃ ‘এরা তোমাকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। তুমি যতদ যেতে চাও আনন্দের সাথে যেতে পারো’।
তাঁর পিতা এবং চাচাও একই কথা বললঃ আমরা তোমাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। জবাবে হযরত যায়েদ বিন হারেছা বলণলনঃ ‘আমি এ ব্যক্তির মধ্যে এমন সব সুন্দর গুণাবলী দেখেছি, যা দেখার পর আমি তাকেঁ ছেড়ে বাপ-চাচা এবং আত্মীয় স্বজনের নিকট ফিরে যেতে চাই না’।
হুজুর (সঃ) –এর সম্পর্কে এ ছিলো তাঁর খাদেমের সাক্ষ। একজন মনিবের প্রতি তার খাদেম কৃতজ্ঞ হয়ে থাকে। কিন্তু এতো বেশী ভক্ত ও অনুরক্ত হতে পারে না যে মনিবের প্রতি ঈমান আনবে। ঈমান আনার জন্যে মনিবের মধ্যে এমন উন্নত স্বভাব, সদাচার, পবিত্রতা এবং উচ্চ নৈতিক পরিত্রের প্রকাশ ঘটতে হবে, যা দেখে খাদেম যেনো দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয় যে, আমার মনিব সত্যিই নবী। একথাও মনে রাখতে হবে যে, হযরত যায়েদ কোনো মামুলী যোগ্যতার অধিকারী লোক ছিলেন না। মদীনায় রাষ্ট্র-ব্যবস্থা কায়েম হবার পর তাকেঁ বহু যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। হুজুর (সঃ) –এর চরিত্র সম্পর্কে এসাক্ষ্য এমন যোগ্য ব্যক্তিরই সাক্ষ্য।
হযরত আলী (রাঃ)
হযরত আবুবকর (রাঃ) নবুওয়াত লাভের বিশ বছর পূর্ব থেকে একজন প্রগাঢ় বন্ধু হিসেবে হুজুর (সঃ)–কে দেখার এবং জানার সুযোগ পেয়েছেন। তাদেঁর বন্ধুত্ব ছিলো, তাদেঁর একজন ছিলেন মুহাম্মদ (সঃ) এবং অপরজন আবুবকর (রাঃ) । একজন বন্ধু আর একজন বন্ধুকে খুবই পসন্দ করে থাকেন। মনের কথা তার কাছে বললেন, কিন্তু এমন ভক্ত কখনো হতে পারে না যে, তাকেঁ নবী বলে মেনে নেবেন। হযরত আবুবকর (রাঃ) কর্তৃক নির্দ্বিধায় তাঁর নবুওয়াতের স্বীকৃতি দান একথার প্রমাণ করে যে, কুড়ি বছরের সুদীর্ঘ সময়ে তিনি হুজুর (সঃ) –কে পবিত্র চরিত্র, সুউচ্চ স্বভাব ও আচরণের প্রতিচ্ছবি হিসেবে পেয়েছিলেন। তবেই তো তিনি নির্দ্বিধায় তাঁর নবুওয়াতের স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং ঘোষণা করেন, এমন উন্নত স্বভাব চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি অবশ্যই নবী হইতে পারেন এবং তাঁর নবী হওয়া উচিতও বটে।
হযরত আলী (রাঃ)
হযরত আলী (রাঃ) –এর নাম আমি প্রথমে এজন্যে উল্লেখ করিনি যে, তখন তাঁর বয়স ছিল দশ বছর। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) –এর ঘরেই প্রতিপালিত হয়েছেন। কিন্তু দশ বছরের বালকও যে ঘরে থাকে, যার কাছে থাকে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সেও ওয়াকিফহাল থাকে। বিশেষ করে হযরত আলীর মতো মেধাশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি কম বয়সে হলেও তাঁর নবুওয়াতকে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ হচ্ছে এই যে, তিনি তাঁর স্নেহ, সীমাহীন পবিত্র চরিত্র এবং সুউচ্চ স্বভাব ও মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিফ ছিলেন।
আমলে সালেহ সম্পর্কে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সমূহ দ্বারা একথা পরিষ্কার হলো যে, কোনো ব্যক্তি যে জিনিসের প্রতি মানুষকে আহ্বান করবে, তার জীবনটাকেও হুবহু সে দাওয়াতের মাপকাঠিতে তৈরী করতে হবে, তার ব্যক্তি জীবন হতে হবে তার দাওয়াতের বাস্তব সাক্ষ্য ও প্রতিচ্ছবি। তাকে এমন পূত চরিত্র, উচ্চ সআবভাব ও আচরণের অধিকারী হতে হবে-দাওয়াত ইলাল্লাহর আওয়াজ নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হলে যেনো তার কথায় লোকেরা প্রভাবিত হয় এবং তার আমল যেনো তার দাওয়াতের সাক্ষ্য বহন করে আর মানুষ যেনো একথা স্বীকার করে নেয় যে, এ ব্যক্তি কথা সত্য না হয়ে পারে না। লোকেরা তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করুক আর না-ই করুক, কিন্তু তারা যেনো একথা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, এ ব্যক্তি যা কিছু বলছে, আন্তরিকতার সাথেই বলছে, এ মতবাদ, এ নীতি ও দাওয়াতই তার জীবন বিধান। এ জন্যেই রাসূলে করিম (সঃ) –এর নিকটতম দুশমন আবু জেহেলও একবার বলেছিলোঃ
“হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমরা তো তোমাকে মিথ্যা বলছি না। আমরা তো ঐ দাওয়াতকে মিথ্যা বলছি যা তুমি নিয়ে এসেছো”।অর্থাৎ নিকৃষ্টতম দুশমনও তাঁর সত্যবাদিতার প্রবক্তা ছিলো। এটাই হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের পবিত্রতা, স্বভাব ও আচরণের উচ্চতা।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছেঃ
...এবং সে ঘোষণা করে আমি একজন মুসলামান।
একথার তাৎপর্য বুঝার জন্যে মক্কার মুয়াযযমার সেই পরিবেশকে সম্মুখে রাখতে হবে যা আমি প্রথমে উল্লেখ করেছি। নবুওয়াতের সে অধ্যায়ে কোনো ব্যক্তিরি এ ঘোষণা দেয়া যে ‘আমি একজন মুসলমান’ সহজ ও মামুলি ব্যাপার ছিলো না। বরং এটা ছিল হিংস্র পশুদেরকে নিজের উপর হামলা করার আহ্বানের নামান্তর। বাস, এখেন সত্য দ্বীনের দাওয়াত দানকারীর এ বৈশিষ্ট্য পরিস্কার হলো যে, তিনি কেবলমাত্র আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীই নন, কেবলমাত্র পবিত্র আমলের অধিকারীই নন, বরং তিনি নিকৃষ্টতম শত্রুদের সম্মুখে এবং চরম বিরুদ্ধবাদী পরিবেশেও নিজের মুসলমান হবার কথা অস্বীকার করেন না, লুকিয়ে রাখেন না। নিজের মুসলমান হবার কথা স্বীকার করতে এবং তার ঘোষণা দিতে কোনো লজ্জা, সংকোচ ও ভয় ভীতির পোয়া করেন না। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে দেন, ‘হ্যাঁ, আমি মুসলমান, যার যা ইচ্ছা করুক’। অন্য কথায় দ্বীনে হকের দাওয়াত দাকারীর একটি দুরুত্বপূর্ণ গুণ এটা হতে হবে যে, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও বাহাদুর ব্যক্তি হবেন। আল্লাহর পথে ডাকা কোনো ভীরু কাপুরুষের কাজ নয়। সামান্য চোটেই যে ভেঙ্গে পড়ে, এমন ব্যক্তি কখনো মানুষকে আল্লাহর পথি ডাকতে পারে না। ঐ ব্যক্তি খোদার পথে মানুষকে ডাকার যোগ্যতা রাখে, যে কঠিনতম শত্রুতার পরিবেশ, বিরুদ্ধতার পরিবেশ এবং মারাত্মক বিপজ্জনক পরিবেশেও ইসলামের ঝান্ডা নিয়ে দণ্ডায়মান হবার সৎসাহস রাখে এবং পরিনামের কোন পরোয়াই করে না। হুজুর (সঃ) স্বয়ং এরূপ বাহাদূরীর বাস্তব ও পরিপূর্ণ নমুনা ছিলেন। মক্কার ঘোরতর পরিবেশে তিনি প্রকাশ্যে দাওয়ত পেশ করেছেন। সত্যের সাক্ষ্যর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেই সব লোকদের মধ্যেই এ আন্দোলনকে জারী রেখেছিলেন, যারা ছিলো তাঁর খুনের পিয়াসী এবং যারা তাকেঁ , তাঁর সাহাবীদেরকে চরম অত্যাচার ও নির্যাতনে কোনো প্রকার কার্পণ্য করেনি। এ ঘোরতম বিরুদ্ধতা, নির্যাতন ও মুসীবতের পরিবেশেও তিনি একাধারে তের বছর যাবত দাওয়াত পেশ করেছিলেন। অতঃপর মদীনায় পৌঁছার পর যে পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যেসব ভয়াবহ লড়াইর সম্মুখীন হতে হয়, তাতেও তাঁর কদম কখনো পিছে হটেনি। হুনাইনের যুদ্ধে মুসলমানরা যখন পরাজয়ের যখন পরাজয়ের প্রায় মুখোমুখি হয়ে পড়ে, হুজুর (সঃ) স্বয়ং তখন যুদ্ধের ময়দানে কেবল নিজস্থানে শুধু অটলই ছিলেন না বরং সম্মুখে শত্রুদের সারির দিকে অগ্রসর হছ্চিলেন এবং তিনি যে কে সে কথাও গোপন রাখেন নি। তিনি বলছিলেনঃ
আরবী হবে------------------
“মিথ্যার লেশ নেই আমি নবী মহা-সত্য জেনে রাখো আমি আদুল মুত্তালিবের পৌত্র”।
এ ঘোষণা তিনি ময়দানে জং-এর এমন পরিবেশে দিচ্ছিলেন, যখন তিনি শত্রুদের ছোবলের আওতায় অবস্থান করছিলেন এবং সাথে মাত্র ২/৩ জন সাথীই বাকী ছিলো। সে সময়ও তাঁর ‘আমি নবী’ এ ঘোষণা দ্বারা পরিস্কাভাবে বুঝা যায়-দা’য়ী ইলাল্লাহকে এমনিই সাহসী ও বাহাদুর হতে হবে। যদি দাওয়াত দানকারী হিম্মৎ দৃঢ়তা ও বাহাদুরীর মতো গুণাবলীর অলংকারে ভূষিত না হয়, তবে সে এ পথে পা বাড়াবার যোগ্যতাই রাখে না। যদি পা বাড়ায়ও তবে সে তার ভীতি ও দুর্বতার কারণে উল্টো গোটা আন্দোলনেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ কথাকটাই আমি আপনাদের সামনে রাখলাম। এ কথাগুলো সম্পর্কে যদি চিন্তা করা হয়, তবে পরিস্কারভাবে বুঝা যাবে যে, স্বয়ং এ কথাকটাই আল্লাহর পথে দাওয়াত দানের একটা গোটা কর্মসূচী। এ অনুযায়ী যে কোনো স্থানে যে কোনো পরিবেশে কাজ করা সম্ভব।

দাওয়াতের প্রাথমিক অবস্থার সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ
আল্লাহ তায়ালা আরবের বিখ্যাত কেন্দ্রীয় শহর মক্কায় তাঁর এ বান্দা (মুহাম্মদ সঃ) –কে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য নিযক্তি করেন এবং তাঁর নিজ শহর ও নিজ গোত্র কোরাইশদের মধ্যেই এ দাওয়াতী কাজের সূচনা করতে নির্দেশ দেন। এ কাজের সূচনাতেই যে সব হেদায়েতের প্রজোজন ছিলো তা তাকেঁ প্রদান করা হয় এবং সেগুলো ছিলো প্রধান তিন প্রকারের বিষয়বস্তু সমন্বিতঃ
একঃ এ বিরাট গুরুদায়িত্ব পালন করার জন্যে নবী নিজেকে নিজে কিভাবে তৈরি করবেন এবং তিনি কোন্ পন্থা ও পদ্ধতিতে কাজ করবেন সেসব বিষয়ে তাকেঁ শিক্ষা দেয়া হয়।
দুইঃ প্রকৃত তত্ত্ব ও রহস্য সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য এবং নিগূঢ় সত্য সম্পর্কে সমাজে সাধঅরণভাবে প্রাচলিত ভুল ধারণা সমূহের প্রতিবাদ করা হয়, যেসব ভুল ধারণার কারণে তাদের জীবন যাত্রা অত্যন্ত ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়েছিলো।
তিনঃ প্রকৃত জীবন-যাপন পন্থার প্রতি আহ্বান এবং খোদায়ী হেদায়াতের সে সব মৌলিক চরিত্র-নীতির বিশ্লেষণ, যেগুলোর অনুসরণে বিশ্বামানবতার চিরন্তন কল্যাণ ও সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে।
দাওয়াতের সূচনা হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ের এসব পথ নির্দেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংক্ষপ্তি বাণীতে সমন্বিত ছিলো স্বচ্ছ ঝরঝর-অত্যন্ত মিষ্টি মধুর, অতিশয় প্রভাব বিস্তারকারী এবং যাদের লক্ষ্য করে তা বলা হচ্ছিল-তাদের রুচি অনুযায়ী উন্নত সাহিত্যিক ভুষণে সজ্জিত। ফলে তা শ্রোতাদের হৃদয়-মনে তীর শলাকারমতো বিদ্ধ হতো; সুমধুর ভাব সামঞ্জস্যের কারণে লোকেরা আত্মহারা হয়ে তা উচ্চারণ ও আবুতি করতে শুরু করতো।
সর্বোপরি তাতে স্থানীয় ভাবধারার বিশেষ প্রভাব বিদ্যমান ছিলো। যদিও আলোচনা করা হতো চিরন্তন সত্যের কিন্তু তার সত্যতা প্রমাণের জন্যে যুক্তি-প্রমাণ, সাক্ষ্য ও উদাহরণ গৃহীত হতো নিকটস্থ পারিপার্শ্বিক সমাজ তেকেই, যে সবের সাথে শ্রোতৃমণ্ডলীর ছিলো নিগূঢ় পরিচিতি। তাদেরই ইতিহাস,তাদের জাতীয় ঐতিহ্য, তাদেরই দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণাধীন নিদর্শণ সমূহ এবং তাদেরই আকীদা বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র এবং সামজিক ক্রটিবিচ্যুতি সম্পর্কে তাতে আলোচনা হতো, যাতে করে তারা এর দ্বারা তীব্রভাবে প্রভাবিত হয়।
দাওয়াতের এ প্রাথমিক অধ্যায় প্রায় তিন চার বছর পযন্ত দীর্ঘায়িত হয়। (এর মধ্যে তিন বছর ছিলো গোপন দাওয়াতের পর্যায়)। এ অধ্যায় নবী করীমের (সঃ) দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া তিন ভাবে প্রকাশিত হয়ঃ
১) কতিপয় সৎ ও সত্যপন্থী লোক এ দাওয়াত কবুল করে মুসলিম উম্মায় সংঘবদ্ধ হবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায়।
২) একটা বিরাট সংখ্যাক লোক মূর্খতা কিংবা স্বার্থপরতা অথবা বংশানুক্রমিক প্রচলিত প্রথার অন্ধ-প্রেমে মশগুল হয়ে তার বিরোধিতা করতে বদ্ধপরিকর হয়।
৩) কুরাইশ ও মক্কার পরিসীমা অতিত্রম করে এ নতুন দাওয়াতের আওয়ায অপেক্ষাকৃত বিশাল ক্ষেত্রে পদার্পণ করে।
এরপর থেকেই আরম্ভ হয় এ দাওয়াতের দ্বিতীয় অধ্যায়। এ অধ্যায়ে ইসলামী আন্দোলনের সাথে প্রাচীন জাহেলিয়অতের এক তীব্র প্রাণান্তকর দ্বন্দ্বের সূচনা হয়, যার জের আট ন’বছর কাল পর্যন্ত চলতে থাকে। শুধু মক্কাতে নয়, শুধু কুরাইশ গোত্রে নয়, আরবের অধিকাংশ অঞ্চলেই প্রাচীন জাহেলিয়াতের সমর্থকরা এ আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এ আন্দোলনকে নিস্তেজ ও নিস্তনাবুদ করে দেবার জন্যে তারা সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে শুরু করে। মিথ্যা প্রোপাগাণ্ড, অপবাদ, দোষারোপ, সন্দেহ-সংশয় ও নানাবিধ কুট প্রশ্নের তীব্র আক্রমণ চালাতে থাকে। জনগণের অন্তরে বিবিধ-প্রকার প্রচারণ ও প্ররোচনা সৃস্টি করতে থাকে। অপরিচিত লোকদেরকে নবী করীম (সঃ) –এর কথা শোনা থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর চরম পাশবিক অত্যাচার নির্যাতন চালাতে থাকে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁদের সাথে যাবতীয় সর্ম্পক ছিন্ন করে। এভাবে তাঁদের উপর এতো অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালানো হয় যে, তাদের অনেক লোকই নিজেদের ঘর বাড়ী পরিত্যাগ করে দু’দুবার হাবশায় হিজরত করতে বাধ্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত তৃতীয়বার তাঁদের সকলকেই মদীনায় হিজরত করতে হয় কিন্তু এ তীব্র বিরোধিতা ও ক্রমবর্ধমান প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এ আন্দোলন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হতে থাকে। মক্কায় এমন কোন বংশ ও পরিবার ছিল না, যেখান থেকে অন্তত এক ব্যক্তিও ইসলাম গ্রহণ করেনি। ইসলামের অধিকাংশ দুশমনের কঠিন দুশমনীর কারণ এ ছিলো যে, তাদের নিজেদেরই ভাই, ভাতিজা, পুত্র, জামাই, কন্যা, বোন এবং ভগ্নিপতির ইসলামী দাওয়াত শুধু কবুলই করেনি; বরং তারা ইসলামের আত্মোৎসর্গী, সাহায্যকারী হয়ে গিয়েছিলো। তাদের নিজেদের কলিজার টুকরো সন্তানরাই তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী হয়ে উঠেছিলো। সর্বোপরি মজার ব্যাপার ছিলো যে, যারাই প্রাচীন জাহেলিয়াতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এ নতুন আন্দোলনে যোগদান করছিলো, তারা জাহেলী সমাজেও সর্বাপেক্ষা উত্তম লোক হিসাবে স্বীকৃতি ছিলো। আর এ আন্দোলনে যোগদানের ফলে তারা এত বেশী সৎ ও সত্যপন্হী এবং পবিত্র নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হয়ে উঠেছিলো যে,এ বিপ্লবী কাজটাই বিশ্ববাসীর দৃস্টিতে এ আন্দোলনের শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশিষ্টতা সুস্পষ্ট করে তুললো। এ সুদীর্ঘ ও কঠিন দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম চলাকালে আল্লাহ তায়ালা সময়, সুযোগ ও প্রয়োজনমতো তাঁর নবীর প্রতি এমন সব আবেগময়ী ভাষণ নাযিল করতে থাকেন, যেগুলোতে বর্তমান ছিলো দরিয়ার উচ্ছ্বসিত শ্রোতবেগ, সয়লাবের দুর্নিবার শক্তি আর আগুনের তীক্ষ্ম তেজস্বীতা। এসব ভাষণে একদিকে ঈমানদারদেরকে তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব ও কর্তব্যসমুহের কথা বলে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে জামায়াতী যিন্দেগীর চেতনা পয়দা করা হয় এবং তাদেরকে তাক য়া, চারিত্রিকমাহাত্ন্য, পবিত্র স্বভাব ও পবিত্র জীবন যাপনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সত্য দীন প্রচারের কর্মপন্থা তাদেরকে শিখিয়ে দেয়া হয়। সাফল্যের ওয়াদা ও জান্নাতের সুসংবাদ দ্বারা তাদের সাহস যোগানো হয়। ধৈর্য্য, দৃঢ়তা ও উচ্চ সাহসিকতার সাথে আল্লাহর পথে জেহাদ ও সংগ্রাম করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয় । ত্যাগ, কোরবানী ও আত্মোৎসগের্র এমন দুর্বার জজবা তাদের মধ্যে সৃষ্টি করে দেয়া হয় যে, যাবতীয় বিপদ মুসীবত ও বিরুদ্ধতার গগণচুম্বী তরঙ্গমালার সঙ্গে মুকাবিলা করার জন্যে তারা তৈরী হয়ে যায়। অন্যদিকে বিরুদ্ধবাদী, সত্যবিমুখ ও গাফলতের ঘুমোঘোরে নিমজ্জিত লোকদের সেসব জাতির ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়, যাদের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের ভালভাবে জনা ছিলো। দিনরাত যেসব ধ্বংসাবশেষ অঞ্চলের উপর দিয়ে সফর ব্যাপদেশে তারা যাতায়াত করতো সেসব নিদর্শনের উল্লেখ করে তারেদকে উপদেশ দেয়া হয়। আসমান ও জমিনের যেসব সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী দিনরাত চোখের সামনে প্রতিভাত হতো, যেগুলো তাদের যিন্দেগীতে তারা প্রতিটি মুহূর্তে অবলোকন করতো ও অনুভব করতো, সেসব প্রকাম্য নিদর্শনাবলী দ্বারাই তৌহিদ ও আখিরাতের প্রমাণ পেশ করা হয়। শিরক, সেচ্ছাচারিতা, পরকালের প্রতি অস্বীকৃতি এবং পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণের ভ্রান্তি মন-মগজে প্রভাব বিস্তারকারী সুস্পষ্ট দলীল ও যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করা হয়। অতঃপর তাদের যাবতীয় সন্দেহ সংশয় বিদূরিত করা হয়। তাদের প্রতিটি প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত জবাব দেয়া হয়। যেসব জটিল সমস্যায় মন জর্জরিত ছিল অথবা অন্যদের মনকে সংশায়িত করছিল সেগুলোর সুস্পষ্ট সমাধান পেশ করা হয়। চতুর্দিক থেকে অন্দ জাহেলিয়াতকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করা হয় যে, বুদ্ধি ও বিবেকের জগতে অবস্থানের জন্যে তার বিন্দু পরিমান স্থঅন থাকল না। এর সাথে তাদেরকে আল্লাহর গজব ও অভিশাপ, কিয়ামতের ভয়ঙ্কর রূপ এবং জাহান্নামের কঠিন আযাব সম্পর্কে বয় প্রদর্শন করা হয়। তাদের খারাপ চরিত্র, ভ্রান্ত জীবন-যাপন পদ্ধতি, জাহেলী রসম রেওয়ায, সত্য বিরোধিতা এবং মুমিনদেরকে নির্যাতনের কারণে তাদেরকে র্ভৎসনা ও তিরস্কার করা হয়। নৈতিক চরিত্র ও সমাব্যবস্থার যেসব বড় বড় মূলনীতি আল্লাহর মনোনীত সত্যভিত্তিক সভ্যতার ভিত্তি সেগুলো বিস্তারিত ভাবে তাদের সামনে পেশ করে দেয়া হয়।
এ অধ্যয়টি এককভাবে বিভিন্ন মনযিল দ্বারা সমন্বিত, যার প্রতিটি মনযিলেই দাওয়াতী কাজ অত্যন্ত ব্যাপক ও প্রশস্ত হয়ে উঠে। চেষ্টা সাধনা এবং বিরুদ্ধতাও তীব্রতর হতে থাকে। আন্দোলন বিভিন্ন মতাবলম্বী ও পরস্পর বিরোধী কর্মতৎপর অসংখ্য দল উপদলের সম্মুখীন হয়। তদনুযায়ী আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বাণী সমুহের বিষয় বৈচিত্রও ব্যাপকতর হতে থাকে। ইসলামী দাওয়াতের এ বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্যে নবী (স)-কে যে বিস্তারিত পথ নির্দেশ প্রদান করা হয় তার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, মক্কার ঘোর বিরোধীতার যুগে কোন মহান চারিত্রিক শক্তি সম্মুখে অগ্রসর হবার পথ পরিস্কার করে এবং কোন প্রভাবশালী এ আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারী লোকদেরকে সকল শক্তির সাথে টক্কর লাগাতে এবং সকল মুসীবত অকাতরে সহ্য করতে উদ্বুদ্ব্দ করে। নিম্নে এক একটি করে সেসব পথ নির্দেশ আমরা বর্ণনা করছিঃ
দাওয়াত দানে হিকমত ও মাওয়েযাগত পদ্ধতি
আরবী হবে--------------------------
‘হে নবী তোমার রবের পথে লোকদেরকে ডাকো ‘হেকমত’ এবং মাওয়েযায়ে হাসানার মাধ্যমে’। (আন নহল ১২৫)
এখানে বলা হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াত দানে দুটো পদ্ধতি খুব কড়াকড়ি ভাবে মেনে চলতে হবে। এক, হিকমাত। দুই, মাওয়েযায়ে হাসান।
“দাওয়াতে হিকমাত প্রয়োগের মানে হচ্ছে-বেওকুফদের মতে বোকামীর সাথ যেনো দাওয়াত দেয়া না হয়। বরং বুদ্ধিমত্তার সাথে শ্রোতার মানসিকতা ও সামর্থ এবং তার ধারণ ক্ষমতা বুঝে উপযুক্ত স্থান, সময় ও সুযোগ অনুযায়ী কথা বলতে হবে। সব ধরনের লোকদেরকে একই ডাণ্ডা দিয়ে সোজা করার চেষ্টা করা ঠিক নয়। যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হবে-প্রথমে তার রেগ নির্ণয় করতে হবে। অতঃপর এমন সব যুক্তি ও প্রমাণের সাহয্যে তার চিকিৎসা করতে হবে-যা তার মন-মানসিকতার গভীর থেকে সমস্ত রোগের উৎস মূর উপড়ে ফেলতে সমর্থ হবে।
‘মাওয়েযায়ে হাসানা’ বা উত্তম উপদেশের দুটি অর্থ রয়েছে। এক শ্রোতাকে শুধুমাত্র যুক্তি প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টাকে যথেষ্ট মনে করা যাবে না ;বরং তার অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। অন্যায় ও ভ্রান্তিকে শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করে দিলেই চলবে না; বরং মানুষের মধ্যে জন্মগত ভাবে অন্যায়ের প্রতি যে র্ঘণঅ ও নফরত রয়েছে তাকে জাগ্রত করে তুলতে হবে এবং গেসুলোর অশুভ পরিণতি সম্পর্কে তাকে সতর্ক করে দিতে হবে। হেদায়াত ও আমলে সালেহর সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতা যুক্তি ও বুদ্ধিগত প্রমাণই যথেষ্ট নয়-সাথে সাথে এগুলোর প্রতি শ্রোতার আকর্ষণ ও মহব্বত পয়দা করে দিতে হবে। দুই সহানুভূতি, আন্তরিকতা ও একান্ত দরদের সাথে উপদেশ দান করতে হবে। শ্রোতা যেনো কখনো এমনটি মনে করতে না পারে যে, উপদেশদানকারী তাকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করছে এবং নিজেকে বিরাট কিছু মনে করে তার সাথে বিদ্রুপ করছে। বরং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেনো শ্রোতা অনুভব করতে পারে যে-তার সংশোধনের জন্য উপদেশ দানকারীর অন্তরে সত্যিই দরদ ও সানুভূতিপূর্ণ আকুতি রয়েছে এবং প্রকৃত পক্ষে তিনি তার কল্যাণ কামান করেছেন”।
কথা ও আলোচনা ধরন তর্ক বহছ ও জ্ঞান বুদ্ধির দাপট দেখানোর প্রয়োজন হবে না। একাজে উগ্র আলোচনা, অপবাদ দেয়া ও চোট লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে। আলোচনা বা কথা বলার উদ্দেশ্যে যেনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে জব্দ করা কিংবা নিজের বাচালতার ঢাকঢোল পেটানো না হয়। বরং দাওয়াতী কাজে আলোচনা ও কথা-বার্তা হতে হবে সুমধুর। দাওয়াত দানকারীর চরিত্র হতে হবে উচ্চমানের ভদ্রতা ও শালীনতাপূর্ণ। নিজের কথাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যুক্তিপূর্ণ ও প্রানাকর্ষিত দলিল প্রমাণ দিয়ে। কোনো অবস্থাতেই শ্রোতাদের মনে জিদ, গোস্বা ও উগ্রতা পয়দা হতে দেয়া যাবে না। অত্যন্ত সরল সোজাভাবে তাকে নিজের বক্তব্য-বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে। যখন অনুভূত হবে, শ্রোতা বক্রতর্কে অগ্রসর হচ্ছে তখন তখনই তার সাথে আলোচনা বন্ধ করে দিতে হবে। যেনো সে ভ্রান্ত পথে আরো অধিক অগ্রসর হতে না পারে।
সত্যপথের ডাকার জন্যে প্রয়োজন ঠাণ্ডা মাথা ও পরিবেশগত উত্তমপন্থাঃ
আরবী হবে------------
‘হে মুহাম্মদ! আমার বান্দাদের বলে দাও, তারা যেনো সর্বোত্তম ভাবে কথা বলে। আসলে শয়তান তাদের মধ্যে ঝগড়া ফাসাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। তোমাদের রব তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক জানেন । তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অনুগ্রহ করতে পারেন। আর তিনি চাইলে তোমাদের আযাবাও দিতে পারেন। আর হে নবী, আমরা তোমাকে লোকদের উপর উকীল বানিয়ে পাঠাইনি’। (বনী ইসরাঈল :৫৩-৫৪)
অর্থাৎ-ঈমানদার লোকেরা কাফির মুশরিক এবং তাদের দ্বীনের বিরুদ্ধেবাদীদের সাথে আলোচনা ও কথা বলার সময় মিথ্যা, অতিরঞ্জিত ও দ্রুত কথা বলবে না। বিরুদ্ধবাদীরা যতই অন্যায় অপসন্দনীয় কথা বলুকনা কেনো মুসলমানদেরকে কোনো অবস্থাতেই কোনো না-হক ও অন্যায় কথা মুখ দিয়ে বের করা যাবে না এবং রাগের মাথায় কোনো বাজে কথার প্রতি উত্তরে বাজে কথা বলা যাবে না। তাদের ঠাণ্ডা মাথায় পরিবেশ অনুযায়ী তুলাদণ্ডে মেপে কথা বলতে হবে। তাদের প্রতিটি কথা ন্যায় ও সত্য এবং তাদের মহান দাওয়াতের মর্যাদাসূচক।
আর কখনো যদি বিরুদ্ধবাদীদের কথার জবাব দিতে গিয়ে তোমাদের মধ্যে ক্রোধাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে বলে অনুভব করো এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করো- তখনই বুঝে নেবে যে, এ হচ্ছে শয়তানের কাজ। সে তোমাকে উস্কিয়ে দিচ্ছে যেনো দাওয়াতে দ্বীনের কাজটা বিনষ্ট হয়ে যায়। সে চায় তোমরাও তোমাদের বিরুদ্ধবাদীদের মত সংস্কার সংশোধনের কাজ ত্যাগ করে সেরূপ ঝগড়া ফাসাদে লিপ্ত হয়ে যাও যেরূপ ঝগড়া ফাসাদে সে গোটা মানব জাতিকে লিপ্ত রাখতে চায়।
ঈমানদার লোকদের মুখ দিয়ে এমন দাবী কখনো বেরোতে পারবে না যে আমরা বেহেশতী আর অমুক লোক বা লোকেরা দোযখী। এ কাজের ফায়সালা তো আল্লাহর হাতে। স্বয়ং নবীর কাজও দাওয়াত দান পর্যন্ত সীমিত। লোকদের ভাগ্যের চাবিকাঠি তাঁর হাতে অর্পণ করা হয়নি যে, তিনি কারো জন্যে রহমতের আর কারো জন্যে আযাবের ফায়সালা করে দেবেন।
দাওয়াত দানকারীর মর্যাদা ও দায়িত্বঃ
আরবী হবে----------
‘দেখো তোমাদের কাছে তোমাদের রবের নিকট থেকে অন্তর্দৃষ্টির আলো এসে পৌঁছেছে। এমন যে লোক নিজের দৃষ্টি শক্তির সাহায্যে কাজ করবে সে নিজেরই কল্যাণ সাধন করবে। আর যে অন্ধত্ব গ্রহণ করবে সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমি তোমাদের উপর পাহারাদার নই’। (আনয়াম-১০৪)
‘আমি তোমাদের উপর পাহারাদার নই’ মানে আমার দায়িত্ব তো শুধু এতটুকু যে তোমাদের কাছে সে রৌশনী পেশ করে দেবো যা তোমাদের পরওয়ারদেগারের নিকট থেকে এসেছে। অতঃপর চোখ খুলে দেখা না দেখা তো তোমাদের কাজ। যারা চোখ বন্ধ করে রাখবে জোর পূর্বক তাদের চোখ খুলে দেবো এবং তারা যা দেখবে না তাদেরকে তা দেখিয়ে ছাড়বো-এমন দায়িত্ব আমাকে দেয় হয়নি।
আরবী হবে---------
‘হে নবী! আপনার রবের নিকট থেকে অবতীর্ণ অহীর অনুসরণ করুন। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুশরিকদের জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না। যদি আল্লাহর ইচ্ছা হতো (এরা শিরক না করার) তবে এরা শিরক করতো না। আমি আপনাকে এদের উপর পাহারাদার নিযুক্ত করিনি। আপনি তাদের উপর কোনো হাবিলদারও নন’। (আনয়াম ১০৬-১০৭।)
এ কথার তাৎপর্য যে, আপনাকে দা’য়ী ও প্রচাররক বানানো হয়েছে, কোতোয়াল বানানো হয়নি। তাদের পিছে লেগে থাকার কোনো প্রয়োজন আপনার নেই। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে লোকদের সামনে এ রৌশনী আপনি পেশ করে দেবেন, সাধ্যানুযায়ী সত্য প্রকাশের হক আদায় করতে কোনো ক্রটি করবেন না। অতঃপর কেউ যদি এ সত্য কবুল করতে না চায়-তবে তা না করুক। লোকদের সত্যপন্থী বানিয় ছাড়ার দায়িত্ব আপনাকে অর্পন করা হয়নি। আর এমন কথা আপনার দায়িত্ব ও জবাবদিহির অন্তর্ভুক্তও নয় যে, আপনার নবুওয়াতের সীমানায় কোনো বাতিল পন্থীর অস্তিত্ব থাকতে পারবে না। সুতরাং এ চিন্তায় আপনার মনকে পেরেশান করে তুলবেন না যে, অন্ধ লোকদেরকে কী করে দৃষ্টি শক্তি দেয়া যাবে যারা চোখ খুলে দেখতে চায় না-তাদেরকে কি করে দেখানো যাবে। যদি আল্লাহর ইচ্ছাই এ রকম হতো যে দুনিয়ায় কোনো বাতিল পন্থীর অস্তিত্ব থাকতে পারবে না তবে একাজ আপনার দ্বারা করানো আল্লাহর কি প্রয়োজন ছিল? তাঁর একটা তাকভীনি () ইশারাই কি সমস্ত মানুষকে সত্যপন্থী বানাতে পারতো না? কিন্তু শুরু থেকেই সেখানে উদ্দেশ্য এরূপ নয়। উদ্দেশ্য তো হচ্ছে মানুষকে হক ও বাতিল নির্বাচনের আযাদী দেয়া হবে। অতঃপর হকের রৌশনী তার সামনে পেশ করে তাকে পরীক্ষা করা হবে এ দুয়ের মাঝে সে কোনটা নির্বাচন করে। তাই আপনার জন্যে সঠিক কর্মপন্থা হচ্ছে যে রৌশনী আপনাকে দেখিয়ে দেয়া হলো, তার আলোকে আপনি সঠিক সোজা পথে চলতে থাকুন এবং যারা এ দাওয়াত কবুল করে নেবে তাদেরকে বুকে মিলিয়ে নিন এবং কখনো তাদের সঙ্গদান ত্যাগ করবেন না। পার্থিব দৃষ্টিতে তারা যতই নগণ্য মূল্যহীন হোক না কেনো। আর যারা এ দাওয়াত কবুল করবে না তাদের পিছে লেগে থাকবেন না। যে অশুভ পরিণতির দিকে তারা নিজেরাই যেতে চায়, যাওয়ার জন্যে চরম গোঁড়ামী অবলম্বন করে তাদেরকে সেদিকে যাবার জন্যে ছেড়ে দিন।
দ্বীন প্রচারের সহজ পন্থা
আরবী হবে---------
‘আর হে নবী! আমি তোমাকে সহজ পন্থার সুবিধে দিচ্ছি। কাজেই তুমি উপদেশ দিয়ে যাও। যদি উপদেশ ফলপ্রসু হয়’।
অর্থাৎ হে নবী! দ্বীন প্রচারের ব্যাপারে আমি তোমাকে কোনো অসুবিধেয় ফেলতে চাইনে। বধিরদেরকে শুনানো আর অন্ধদেরকে পথ দেখানোর দায়িত্ব তোমার নয়। তোমাকে একটা সহজ পন্থা দিয়ে দিচ্ছি। তা হচ্ছে, তুমি উপদেশ দান করতে থাকো যতক্ষণ তুমি অনুভব করতে থাকবে যে, কেউ না কেউ এর দ্বারা উপকৃত হতে প্রস্তুত নয়। বাকী থাকলো এ কথা যে, এর দ্বারা উপকৃত হতে কে প্রস্তুত আর কে প্রস্তুত নয়? বস্তুত সাধারণ দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমেই এ প্রশ্নের জবাব প্রকাশিত হয়ে যাবে। তাই সাধারণ তাবলীগ ও প্রচার কাজ অবশ্যই জারি রাখতে হবে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে ঐ সমস্ত লোকদেরকে খুঁজে বের করা যারা এ নসীহতের দ্বারা উপকৃত হয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করবে। বস্তুত এ সমস্ত লোকেরাই তোমার আন্তরিক লক্ষ্যস্থল হবার অধিকারী, আর শুধুমাত্র এ লোকদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রতিই তোমার দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। এদের ছেড়ে ঐ সমস্ত লোকদের পিছে ব্যস্ত হবার কোনো প্রয়োজন নেই, অভিজ্ঞতার আলোকে যাদের সম্পর্কে জানতে পারবে যে, তারা এ নসীহত কবুল করতে ইচ্ছুক নয়।
দ্বীন প্রচারের দৃষ্টিকোণ গুরুত্বপূর্ণ লোক কারা
আরবী হবে-------------
‘আর হে নবী! যারা রাতদিন তাদের পরওয়ারদিগারকে ডাকতে থাকে আর তাঁর সন্তোষ অনুসন্ধান নিরত থাকে, তুমি তাদেরকে দূরে সরিয়ে দিওনা। তোমার উপর তাদের হিসাবের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই আর তাদের উপরও তোমার হিসাবের কোনো যিম্মাদারী নেই। তা সত্ত্বেও যদি তুমি তাদেরকে দূরে সরিয়ে দাও, তবে তুমি যালেমদের মধ্যে গণ্য হবে’। (আনয়াম-৫২)
প্রথম দিকে যারা হুজুর (সঃ)-এর প্রতি ঈমান এনছিলেন তাদের বহুসংখ্যক লোক দরিদ্র ও শ্রমজীবি ছিলেন। হুজুর (সঃ)-এর প্রতি কুরাইশদের বড় বড় সরদার ও স্বচ্ছল অবস্থার লোকদের অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে এ প্রশ্নটিও ছিল যে-তাঁর চতুরপার্শ্বে তো কেবল আমাদের কওমের দাস, মুক্তদাস ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই একত্রিত হয়েছে। তারা টিপ্পনী কেটে বলতো-এ লোকের সঙ্গী-সাথী ও মিছিলে কেমন সম্মানিত লোকেরা! বেলাল, আম্মার, সোহাইব, খাব্বাব বাস্ এ লোকদেরকেই আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে মনোনীত করার মত খুঁজে পেলেন। অতপর তারা ঈমানদারদের অসচ্ছল অবস্থঅ নিয়ে বিদ্রূপ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং ঈমান আনার পূর্বে তাদের কারো কোন চারিত্রিক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকলে তা নিয়েও তারা বিদ্রূপের ঢেউ তুলতো যে, কালকে পর্যন্ত যার চরিত্র এমন ছিল, এমন এমন কাজ যে করেছে সেও দেখি এ মনোনীত দলের অন্তর্ভুক্ত। সূরা আনয়ামেরই ৫৩ আয়াতে তাদের একথার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছেঃ এরাই কি সেসব লোক, আমাদের মধ্য থেকে যাদের প্রতি আল্লাহর কৃপা ও অনুগ্রহ হয়েছে? এ আয়াতে এসব কথারই জবাব দেয়া হয়েছে। আয়াতটির তাৎপর্য হচ্ছে, যেসব লোক সত্যানুসন্ধিৎসু হয়ে তোমার নিকট আসে- বড় বড় লোকদেরকে খাতির করতে গিয়ে তারেকে দূরে ঠেলে দিওনা। ইসলাম কবুল করার পূর্বে কেউ কোনো অপরাধ করে থাকলেও তার দায়-দায়িত্ব তো তোমার উপর বর্তাবে না।
হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনা
হুজুর (সঃ) -এর মজলিসে একবার মক্কার কতিপয় সরদার, সমাজপতি উপবিষ্ট ছিল। হুজুর (সঃ) তাদের ইসলাম কবুল করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।১ এরি মধ্যে ইবনে উম্মে মাকতুম নামক একজন অন্ধ হুজুর (সঃ)-এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেন। এ সময় ব্যাঘাত সৃষ্টি করাটা হুজুর (সঃ)-এর অপসন্দ হওয়ায় তিনি তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সূরা আবাসা নাযিল হয়ঃ
আরবী হবে---------
‘বেজার হলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ সে অন্ধ তাঁর নিকট এসেছে’। (আবাসা ১-২)
ভাষণের সূচনাভঙ্গি দেখে বাহ্যত মনে হয়, অন্ধ ব্যক্তির প্রতি অনাগ্রহ এবং বড় বড় সরদারদের প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ প্রদর্শন করায় নবী করীম (সঃ)-এর প্রতি এ সূরায় শাসন ও তিরস্কার করা হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে গোটা সূরাটির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে জানা যায় যে, এ সূরায় মূলতঃ কাফের কুরাইশ সরদারের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে-যারা অহংকার ও আত্মম্ভরিতা এবং সত্য বিমুখতার কারণে নবী করীম (সঃ)-এর সত্য দাওয়াতকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছিল। আর হুজুর (সঃ) –কে দ্বীন প্রচারের সঠিক পন্থা শিক্ষা দেয়ার সাথে রেসালাতের দায়িত্ব পালনের প্রাথমিক অবস্থায় তিনি যেসব পন্থা অবলম্বন করছিলেন-তার ভ্রান্তিও বুঝিয়ে দেয়া হলো। তিনি যে একজন অন্ধ ব্যক্তির প্রতি অনাগ্রহ এবং কুরইশ সরদারদের প্রতি মনোযোগ আরোপ করেছিলেন-তার কারণ এ নয় যে-তিনি এসব বড় লোককে সম্মানিত ও মর্যাদাবান এবং বেচারা অন্ধ ব্যক্কিকে নগণ্য ভাবছিলেন। এর কারণ এও নয় যে, মায়যাল্লাহ তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার নৈতিক বক্রতা বিদ্যমান ছিল-যার কারণ আল্লাহ তায়ালা এখানে তাঁকে শাসন ও তিনস্কার করেছেন। না এ ব্যাপার এসব কিছুই নয়; বরং প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে যে, কোনো আদর্শের আহবায়ক বা দা’য়ী যখন তাঁর দাওয়তী কাজের সূচনা করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার লক্ষ্য তাকে যেনো সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা এ দাওয়াত কবুল করে নেয়; যার ফলে প্র্রচার কাজ সহজতর হয়ে যায়। নতুবা সাধারণ প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন, দুর্বল ও অক্ষম লোকদের মধ্যেও যদি দাওয়ত ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েও যায়-তবু মূল ব্যাপারে তেমন কোনো পার্থক্য সূচিত হয় না। দাওয়াতের সূচনাকালে হুজুর (সঃ) প্রায় এ রকম কর্মনীতিই গ্রহণ করেছিলেন। ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও দ্বীনি দাওয়াতের উৎকর্য়ের প্রতি গভীর আন্তরিকতাই ছিল এর মূল কারণ। বড় লোকের সম্মান প্রদর্শন এবং ছোট লোকদের ঘৃণা করা তাঁর লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালঅ তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইসলামী দাওয়াতের সঠিক ও নির্ভুল পন্থা এটা নয়। বরং এ দাওয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে ঐসব লোকেরাই গুরুত্বের অধিকারী যারা সত্যানুসন্ধিৎসু-তারা যতই দুর্বল, প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন ও অক্ষমই হোক না কেনো। পক্ষান্তরে যাদের মধ্যে সত্যানুরাগ নেই, সমাজে তারা যতই উচ্চমর্যাদার অধিকারী হোক না কেনো-এ আন্দোলনের দৃষ্টিতে তারা একেবারেই গুরুত্বহীন। সুতরাং ইসলামের আহ্বান্আপনি সকলের নিকটই পৌঁছাবেন বটে; কিন্তু আপনার লক্ষ্য ও আগ্রহের অধিকারী হবে সেসব লোক-যাদের মধ্যে এ মহাসত্য গ্রহণের সম্মতি পাওয়া যাবে। আর যারা নিজেদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতার কারণে মনে করে যে, তারা আপনার মুখাপেক্ষী নয়; বরং আপনিই তাদের মুক্ষাপেক্ষী কেবল এসব দাম্ভিক ও অহংকারী লোকদের নিকটই দাওয়াত পেশ করতে থাকা আপনার এ সুমহান দাওয়াতের উচ্চ মর্যাদার পক্ষে নিতান্তই অপমানকর। তার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ
আরবী হবে--------
‘হে নবী! তুমি কেমন করে জানবে! সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো কিংবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশদান তার জন্যে কল্যাণকর হতো। যেলোক বেপরোয়া ভাব দেখায়, তুমি তার প্রতি লক্ষ্যারোপ করছো। অথচ সে যদি পরিশুদ্ধ না হয়, তবে তোমার উপর তার দায়িত্ব কি? আর যেলোক তোমার নিকট দৌড়ে আসে আর সে ভয়ও করে, তুমি তো তার প্রতি অনীহা প্রদর্শন করছো। কক্ষণও নয়। এটা তো একটা উপদেশ। যার ইচ্ছা সে এটা গ্রহণ করবে’।
এ সময় দ্বীন প্রচারের ব্যাপারে নবী করীম (সঃ) যে মূল তত্ত্বটাকে উপেক্ষা করছিলেন; এখানে তারই উল্লেখ করা হয়েছে এবং একথা বুজানোর জন্যেই আল্লাহ তায়ালা প্রথমে ইবনে উম্মে মাকতুমের সাথে নবী করীম (সঃ) –এর কৃত আচরণের তিরস্কার করেছেন। অতঃপর সত্য দ্বীনের প্রচারকদের নিকট প্রকৃত গুরুত্ব কোন জিনিসের হওয়া উচিত আর কোন জিনিসের নয়-তাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এক ব্যক্তির পরিচয় হচ্ছেঃ এই তার বাহ্যিক অবস্থা সুস্পষ্ট ভাবে বলে দেয় যে, সে সত্যানুসন্ধিৎসু, বাতিলের অনুসরণ করে খোদার রোষে নিপতিত হবার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত। তাই সত্য পথের জ্ঞান লাভ করার জন্যে সে নিজেই নবীল নিকট এসে উপস্থিত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে আর এক ব্যক্তির পরিচয় হচ্ছেঃ তার বাহ্যিক চাল-চলন ও আচরণই বলে দেয় যে, তার মধ্যে সত্যের প্রতি কোনো প্রকার অনুরাগ নেই। তাকে সত্য পথের পথনির্দেশ দেয়া হোক এমন প্রয়োজন থেকে সে নিজেকে অনেক উর্ধ্বে মনে করে। এ দুপ্রকার লোকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে তাতে লক্ষ্যণীয় বিষয় এটা নয় যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনলে দ্বীনের অনেক ফায়দা হতে পারে আর কারো ঈমান আনায় দ্বীনের উল্লেখযোগ্যা ফায়দা হতে পারে না। বরং লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে কোন ব্যক্তি হেদায়ত কবুল করে নিজেকে শোধরানোর জন্যে প্রস্তুত আর কোন ব্যক্তি এ অমূল্য সম্পদের মর্যাদাদানে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত এবং এর মর্যাদা সম্পর্কে বিলকুল অনবহিত। প্রথম ব্যক্তি যদি অন্ধ, খঞ্জ, শক্তিহীন, নিঃস্ব-দরিদ্রও হয়ে এবং বাহ্যিক দৃষ্টিতে দ্বীনের উৎকর্ষ লাভের ব্যাপারে বড় কোনো দায়িত্ব পালনেও যদি যোগ্য বলে বিবেচিত না হয়; তা সত্ত্বেও সত্য প্রচারকের জন্যে সেই হবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার প্রতিই তাঁকে লক্ষ্যারোপ করতে হবে। কারণ এ দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্যই তো হচ্ছে খোদার বান্দাদের সংশোধন। আর এ ব্যক্তির অবস্থা দৃষ্টে পরিস্কার বুঝা যায় যে, তাকে যদি নসীহত করা হয় তবে সে নিজেকে সংশোধন ও পরিবর্ত করে নেবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারের মানুষ সমাজে যতোই প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হোক না কেনো সত্য দ্বীনের প্রচারককে তার পিছে পিছে দৌড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তার বাহ্য আচরণ থেকে একথা সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা গ্রহণে তার কোনো প্রকার ইচ্ছা ও আগ্রহ নেই। সুতরাং তাকে সংশোধন করার চেষ্টা করা সময়ই নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সে যদি নিজেকে শোধরাতে না চায়-তাতে সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে সত্য দ্বীন প্রচারকের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই।
এখানে যে অন্ধ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তিনি হচ্ছেন-প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) হাফেয ইবনে আবদুল বার ‘আল ইসতিয়ার’ গ্রন্থে এবং হাফেজ ইবনে হাজার ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি ছিলেন হযরত খাদিজার (রাঃ) ফুফাতো ভাই। তার মা উম্মে মাকতুম এবং হযরত খাদীজার পিতা খুয়াইলিদ পরস্পর ভাই-বোন ছিলেন। হুজর (সঃ)-এর সাথে তাঁর এই আত্মীয়তার সম্পর্ক জানার পর তাকে তিনি দরিদ্র কিংবা কম মর্যাদার লোক মনে করে বিরক্তির সাথে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সম্মুখে উপস্থিত বড় লোকদের প্রতি লক্ষ্যারোপ করেছেন বলে সন্দেহ করার কোনোই অবকাশ নেই। কারণ, সম্পর্কের দিক থেকে তিনি তো নবী করীম (সঃ)-এর ভাই (ম্যালক) ছিলেন। বংশীয় লোক ছিলেন তিনি। কোনো প্রকার মর্যাদাহীন লোক তিনি ছিলেন না। বস্তুতঃ যে কারণে নবী করীম (সঃ) তার প্রতি উক্তরূপ আচরণ গ্রহণ করেছিলেন, তা কুরআনের ( ) (অন্ধ ব্যক্তি) শব্দ দ্বারা পরিস্কারভাবে বুঝা যায়। নবী করীম (সঃ) -এর অনাগ্রহ প্রকাশের মূল কারণ স্বরূপই স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এখানে এ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ এমুহূর্তে হুজুর (সঃ) -এর মনোভাব এরূপ ছিলো যে, এ সময় যে লোকগুলোকে আমি ইসলামের দিকে আনবার চেষ্টা করছি, তাদের একজন লোকও যদি হেদায়াত কবুল করে তবে তা ইসলামের শক্তিশালী হয়ে উঠার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পক্ষান্তরে ইবনে উম্মে মাকতুম একজন অন্ধ ব্যক্তি। নিজ অক্ষমতার কারণে তিনি ইসলামের জন্যে ততোটা কল্যাণকর হতে পারেন না-যতোটা এ সরদারদের মধ্যে থেকে কেউ ইসলাম কবুল করলে আশা করা যায়। কাজেই এ সময়কার কথাবার্তায় ব্যাঘাত ঘটানো তার ঠিক নয়। তিনি যা কিছু জানতে ও বুঝতে চান তা পরেও কোনো একসময় জেনে নিতে পারেন।
দ্বীন প্রচারের হিকমত
আরবী হবে-----
‘আর আহলে কিতাবের লোকদের সাথে উত্তম-পন্থা ছাড়া তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয়েঅনো’। (আনকাবুত-৪৬)
অর্থাৎ এ বিতর্ক যুক্তিসঙ্গত দলিল-প্রমাণ, সভ্য ও শালীন ভাষা এবং বুঝা ও বুঝানোর মাধ্যমে হতে হবে। যোনো যে ব্যক্তির সাথে কথা হচ্ছে তার চিন্তধারা সংশেঅধিত হতে পারে। শ্রোতার দিলের দরজা খুলে তাতে হক কথা প্রবেশ করিয়ে দেয়অ এবং তাক সত্য পথে নিয়ে আসার চেষ্টাই হতে হবে দ্বীন প্রচারকের মূল চিন্তা। প্রতিদ্বন্দ্বীকে খাটো করে দেখানোর উদ্দেশ্যে পাহলোয়ানের মতো লড়াই করা তার চলবে না। বরং তাকে এমন একজন বিজ্ঞ ডাক্তারের ন্যায় কাজ করতে হবে যিনি রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকেন যেনো তার কোনো ভুলের কারণে রোগীর রোগ আরো বেড়ে না যায় এবং তিনি চেষ্টা করেন যেনো ন্যূন কষ্ট পেয়ে রোগী আরোগ্য লাভ করেন। অবস্থানুযায়ী এখানে আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্কের সময় কিরূপ আচরণ করতে হবে-তার হেদায়াত দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ হেদায়ত বিশেষ ভাবে কেবল আহলে কিতাবদের ব্যাপারেই নয়; বরং দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে এ হচ্ছে এক সাধারণ হেদায়াত যা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে প্রদত্ত হয়েছে। যেমনঃ
আরবী হবে----
‘তোমার রবের দিকে ডাকো হিকমাত ও উত্তম নসীহতের সাথে, আর লোকদের সাথে বিতর্ক করবে উত্তম পন্থায়।’ (আন নহল-১২৫)
আরবী হবে---
‘ভাল আর মন্দ এক নয় (বিরুদ্ধবাদীদের হামলা) সর্বোত্তম পন্থায় দফা করো। তাহলে দেখবে-জানের দুশমনও প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।‌’
আরবী হবে----
‘মন্দ ও অন্যায়কে সর্বোত্তম পন্থায় দফা করো (তোমাদের বিরুদ্ধে) তারা যেসব কথা রটনা করছে-তা আমরা জানি।’ (আল মুমেনুন-৯২)
দাওয়াতে হকের সঠিক কর্মপন্থা
আরবী হবে-------
‘হে নবী, কোমল ও ক্ষমা সুন্দর নীতি অবলম্বন কর। ‘মারূফ’ কাজের নিদের্শ দিয়ে যাও এবং মুর্খদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না। শয়তান কখনো যদি তোমাকে উস্কানী দেয়-তবে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। তিনি সব জানেন, সব শুনেন। প্রকৃত পক্ষে যারা মুত্তাকী, তাদের অবস্থা তো এরূপ যে, শয়তানের প্ররোচনায় কোনো খারাপ খেয়াল যদি তাদের স্পর্শ করেও তারা সাথে সাথে সাবধান ও সতর্ক হয়ে যায়। অতঃপর (তাদের সঠিক করণীয় কি) তা তারা সুস্পষ্টভঅবে দেখতে পায়। বাকী থাকলো তাদের (শয়তানের) ভাই বন্ধুদের কথা। এদের তো শয়তান বক্র পথে টেনে নিয়ে যায়। এবং এদের বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে তার কোনো ত্রুটিই করে না’। (আরাফ ১৯৯-২০২)
এ আয়াত সমূহে নবী করীম (সঃ) দাওয়াত ও তাবলীগ এবং হেদায়ত ও সংস্কার সংশোধনের হিকমাত সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট শিক্ষা দেয়া হয়েছে; এর উদ্দেশ্য শুধু হুজুর (সঃ)-কে শিক্ষা দেয়ই নয়; বরং যেসব লোক হুজুর (সঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধি হয়ে দুনিয়াবাসীদের সরল সঠিক পথ দেখঅতে প্রস্তুত হবে হুজুর (সঃ)-এর মাধ্যমে এমন সকল মানষকেই এ হিকমাত শিক্ষা দেওয়অ উদ্দেশ্য। ক্রমানুসারে এ শিক্ষা ও মূলনীতিগুলো নিম্নে পদত্ত হলোঃ
১। দা’য়ীয়ে হকের জন্যে সবচাইতে জরুরী গুণাবলীর একটি হচ্ছে তাকে কোমল, বিনয়ী, ধৈর্যশীল ও উদারচিত্ত সম্পন্ন হতে হবে। নিজ সহকর্মীদের বেলায় তাকে কোমল ও প্রেমময় সাধঅরণ মানুষের বেলায় দরদী ও সহানুভূতিশীল এবং বিরোধীদের বেলায় অতিশয় সহিষ্ণু হতে হবে। কঠিন উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশেও তার মন মেজাজকে ঠাণ্ডা রাখতে হবে। কঠিন বিরুদ্ধবাদীদের কঠিন বিরোধিতা এবং নিজ সহকর্মীদের দুর্বলতা সমূহ বরদাশত করার মতো সহিষ্ণু হতে হবে। সম্পূর্ণ অসহনীয় কথাকেও উদারচিত্তে এড়িয়ে যেতে হবে। বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে যতোই শক্ত কথা, মিথ্যা, অপবাদ, জ্বালা যন্ত্রণা এবং নিতান্ত দুষ্কৃতিমূলক বাধা বিপত্তি আসুক না কেনো এ সবকিছুই তাকে উদার ও ক্ষমার দৃষ্টিতে হজম করতে হবে। কঠোরতা, কড়া ব্যবহার, তিক্ত কথা-বার্তা এবং প্রতিশোধ মূলক উত্তেজনা এ মহান কাজের পক্ষে বিষের মতো কাজ করে। এতে কাজ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে য়অয়, গড়ে উঠে না। এ জিনিসটাকে নবী করীম (সঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ আমার রব আমাকে আদেশ দিয়েছেন যে, ‘আমি ক্রোধ সন্তোষ উভয় অবস্থাতেই ইনসাফের কথা বলবো। যে আমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে আমি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবো। যে আমাকে আমার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে, আমি তাকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করবো। যে আমার প্রতি যুলুম করবে, আমি তাকে মাফ করে দেবো’। নিজের পক্ষ থেকে তিনি যাদেরকে দ্বীন প্রচার করতে পাঠাতেন, তাদেরকেও তিনি এরূপ হেদায়াতই দিতেনঃ
আরবী হবে-----
মানে-‘তোমরা যেখানেই যাবে, তোমাদের আগমন যেনো লোকদের কাছে সুসংবাদের বিষয় হয়-ঘৃণা ও অসন্তোষের ষিয় নয়। তোমরা লোকদের জন্যে সহজতা বিধানকারী হবে-কাঠিন্য ও কঠোরতা বিধানকারী নয়’। আর আল্লাহ তায়ালাও নবী করীমের (সঃ) এ গুণটারই প্রশংসা করে এরশাদ করেছেনঃ
আরবী হবে-----
‘অর্থাৎ-এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ যে, তুমি লোকদের প্রতি খুবই বিনম্র। নতুবা তুমি যদি পাষাণাত্মা ও রূঢ় ব্যবহারকারী হতে তবে এসব লোক তোমার চতুস্পার্শ্ব থেকে সরে যেতো’। (আল ইমরান-১৫৯)
২। দাওয়াতে হকের কামিয়াবী এ পন্থায় নিহিত রয়েছে যে, দাওয়াত দানকারী বড় বড়[ দর্শন ও সূক্ষ্মতত্ত্বের পরিবর্তে লোকদের সরাসরি মারূফ’ মানে-সোজা ও সুস্পষ্ট কল্যাণের শিক্ষা দেবে,যেসব কথাকে সাধারণ মানুষ ভাল কথা বলে জানে কিংবা যা ভাল কথা বলে মনে করার জন্যে-তাদের সাধারণ বুদ্ধিই(Common sence) যথেষ্ট হতে পারে। এ পন্থা গ্রহণের ফলে সত্য পথের দাওয়াত দানকারীর আবেদন সাধারণ ও সুধী সবাইকে প্রভাবিত করে। শ্রোতার কর্ণকুহ ভেদ করে দাওয়াত আপনিতেই তার মর্মে গিয়ে পৌঁছায়। এমন ‘মারূফ’ দাওয়াতের বিরুদ্ধে যারা চিৎকার ও হাঙ্গামা করে-তার নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতা এবং এ দাওয়াতের কামীয়াবীর ক্ষেত্র তৈরি করে। কারণ সাধারণত মানুষ যতোই হিংসা বিদ্বেষে নিমজ্জিত থাকুক না কেনো-তারা যখন দেখে যে একদিকে একজন ভদ্র ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী মানুষ সরল সঠিক কল্যাণের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন-অপরদিকে অনেকগুলো লোক তার বিরোধিতায় সর্বপ্রকার নৈতিকতা ও মানবিকতাকে বিসর্জন দিয়ে হীণ কার্যক্রম গ্রহণ করছে-তখন আপনিতেই তারা ধীরে ধীরে সত্যবিরোধীদের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে উঠে এবং সত্যের দাওয়াত দানকারীদের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। শেষ পযন্ত কেবল বাতিল সমাজ ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই মুকাবিলার ময়দানে থেকে যায়, অথবা সেসব লোকেরাই বিরোধীতা করতে থাকে, যাদের অন্তরে অতীত লোকদের অন্ধ অসুসরণ কিংবা জাহেলী হিংসা বিদ্বেষ কোনো প্রকার সত্যপথ গ্রহণের যোগ্যতা ও সামর্থ্যই বাকী রাখেনি। এটাই হচ্ছে সে হিকমাত যা অনুসরণের ফলে আরবে নবী করীম (সঃ)-এর কামিয়াবী হাসিল হয়েছিল। এবং তার পরবর্তীতে অল্পকালের মধ্যে পার্শ্ববতী দেশসমূহে ইসলামের শ্রোতাধারা এমনভাবে প্রবাহিত হতে থাকলে যে, কোথাও শতকরা ১০০জন, কোথাও ৮০জন আবার কোথাও ৯০ জন অধিবাসী মুসলমান হয়ে যায়।
৩। দাওয়াতী কাজে সত্যানুসন্ধিৎসু লোকদের মারূফের প্রশিক্ষণ দেয়া যতোটা জরুরী । এ ক্ষেত্রে তারা যতোই তর্ক বিবাদে জড়িয়ে ফেলতে চেষ্টা করুক না কেনো-দাওয়াত দানকারীকে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেবল এমন লোকদের সম্বোধন করে কথা বলাই তার উচিত-যারা যুক্তি ও বুদ্ধির সাথে এ দাওয়াতকে বুঝার জন্যে প্রস্তুত হবে। কোনো জাহেল ব্যক্তি যদি কখনো জাহেলী আচররণ করতে শুরু করে এবং অর্থহীন তর্ক, ঝগড়া ও তিক্ত কথা-বার্ত বলতে আরম্ভ করে, তখন দা’য়ীয়ে হককে তার প্রতিপক্ষ সাজতে অস্বীকার করতে হবে। কারণ এ ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ার লাভ কিছুই নেই। আর তাতে লোকসান হচ্ছে এই যে দাওয়াত দানকারীর যে শক্তি দ্বীনের প্রচার, প্রসার ও সংশোধনের জন্যে ব্যয় হওয়া উচিত ছিল-তা অর্থহীন কাজে বিনষ্ট হয়ে যায়।
৪। তিন নম্বরে যে হেদায়ত দেয়া হলো,সে প্রসঙ্গে আরো অধিক হেদায়াত হচ্ছে যে, দা’য়ীয়ে হক যখন বিরুদ্ধবাদীদের যুলুম, অত্যাচার, দুস্কৃতি ও মূর্খতা ব্যাঞ্জক প্রশ্ন ও অভিযোগের কারণে নিজের মন মেজাজ উত্তেজিত হচ্ছে বলে অনুভব করবে তখনই তাকে বুঝতে হবে-এটা শয়তানের প্ররোচনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তখনই তাকে খোদার পানাহ চাইতে হবে যেন তিনি নিজের বান্দাকে এ উত্তেজনায় সীমা লংঘন থেকে রক্ষা করেন এবং এমন বেসামাল হতে না দেন-যাতে দওয়াতে হকের ক্ষতি সাধিত হবার মতো কোনো তৎপরতা তার দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে। দাওয়াতের হকের কাজ সর্বাবস্থায় ঠাণ্ডা দিলেই হওয়া সম্ভব। সে পদক্ষেপই সঠিক হওয়া সম্ভব-যা উত্তেজনায় পরাজিত হতে নয়, বরং স্থান পরিবেশ ও সময় সুযোগ অনুযায়ী খুব বুঝে শুনে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু শয়তান যে, কখনো এ কাজের প্রসার চায় না ও সহ্য করে না সব সময়ই আপন ভাই-বন্ধুদের দ্বারা দাওয়াত দানকারীর উপর হামলা চালাবার চেষ্টা করে এবং এ হামলার জবাব দেবার জন্যে তাকে প্ররোচিত করতে থাকে যে, এ হামলার অবশ্যই জবাব দেয়অ চাই। শয়তানের এ প্ররোচনা যা সে দাওয়াত দানকারীর অন্তরে সৃষ্টি করে দেয়-অনেক সময় বড় বড় ধোকা ও ধর্মীয় পরিভাষার আবরণে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এর অভ্যন্তরে নিছক আত্মম্ভরিতা ছাড়া আর কিছু্ই থাকে না। এ জন্যে শেষ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে মুত্তাকী লোকেরা তো নিজেদের অন্তরে কোনো শয়তানী তৎপরতা ও প্রভাব এবং খারাপ চিন্তা অনভব করতেই সাবধান ও সতর্ক হয়ে যায়। অতঃপর তারা পরিস্কারভাবে দেখতে ও বুঝতে পারে এমতাবস্থায় কোন নীতি ও কর্মপন্থা অবলম্বনে দাওয়াতে দ্বীনের পক্ষে কল্যাণকর হবে আর এমতাবস্থায় দাওয়াত দ্বীনের দাবীই বা কি। যারা আত্মপূজার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে এবং এ কারণে শয়তানদের সাথে যাদের ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক তারা কখনো শয়তানী প্ররোচনায় সম্মুখে টিকে থাকতে পারে না। তারা শয়তানী প্ররোচনায় পরাজিত হয়ে ভ্রান্ত পথে চলতে শুরু করে। অতঃপর শয়তান তার ইচ্ছা মাফিক তাদেরকে সর্বত্র তাড়িয়ে বেড়ায় এবং কোথাও তাদের এ চলার গতি বন্ধ হয় না। বিরোধিদের প্রতিটি গালির মুকাবিলায় তাদের কাছেও একটা গালি এবং বিরোধিদের প্রতিটি য়ড়যন্ত্র ও দুস্কৃতির মুকাবেলায় তাদের কাছেও একটা য়ড়যন্ত্র ও দুস্কৃতি মওজুদ থাকে।
এ আলোচনায় একটি সাধারণ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও আছে। তা হচ্ছে এই যে, তাকওয় সম্পন্ন লোকেরা সাধারণত নিজেদের জীবন পদ্ধতিতে অমুত্তাকী লোকদের চাইতে ভিন্নতর হয়ে থাকে। যারা প্রকৃতই আল্লাহকে ভঅ করেন এবং আন্তরিকভঅবে অন্যায় ও পাপ থেকে বাঁচতে চান তাদের অবস্থা তো এরূপ হয়ে থাকে যে, তাদের চিন্তার কোণে সামান্য বদখেয়ালও যদি ছায়া ফেলে-তখনই তাদের খটকা অনুভূত হয় ও কষ।ট লাগে। যেমন কষ।ট অনুভূত হয়েথাকে আঙ্গুলে কাঁটা বিধলে অথবা চোখে ধুলকণা পড়লে। যেহেতু তারা এসব বদখেয়াল, অন্যায় বাসনা ও খায়েশ এবং বদনিয়তে অব্যস্ত নয়-তাই এসব জিনিস তাদের স্বভাববিরোধী হয়ে থাকে। যেমন পায়ে কাটা ফুটলে, চোখে আবর্জনা প্রবেশ করলে কিংবা পরিচ্ছন্ন কাপড়ে ময়লার ছিটা লাগলে লাগলে পরিচ্ছন্ন মানসিকতার লোকদের অসুবিধা হয়ে থাকে। এ খটকা ও অসুবিধা অনুভূত হবার সাথে সাথে তাদের চোখ খুলে য়ায়, মন সতর্ক হয়ে উঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা এ ক্ষতিকর আবর্জনা ঝেড়ে ফেলতে লেগে যায়। এরা সেসব লোকদের মতো নয়, যারা না খোদাকে ভয় করে আর না অন্যায় ও পাপ থেকে বাঁচতে চয় এবং শয়তানের সাথে মনের মিল রয়েছে। এদের মনে বদখেয়াল খারাপ বাসনা ও অসৎ উদ্দেশ্য ঘুরপাক খেতে থাকে। কিন্তু এসব নোংরামিতে নিমজ্জিত থেকেও তারা কোনো প্রকার অসুবিধা ও অস্বাভাবিকতা নিজেদের মধ্যে অনুভব করে না। যেমন কোনো ডেগচীতে শুয়োরের মাংস রান্না হচ্ছে-কিন্তু তাদের চিন্তাতেই আসে না যে এতে কি রান্না হচ্ছে। অথবা কোনো মেথর, যার সারাটা দেহে ময়লা লেগে লতপত হয়ে আছেঠ, কিন্তু তার অনুভূতিই নেই যে তার দেহে কি জিনিস লেগে আছে।
তীব্র বিরুদ্ধতার পরিবেশে আল্লাহর পথে দাওয়াত
আরবী হবে--------
“এবং সে ব্যক্তির কথার চাইতে ভাল কথা কার হবে, যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো এবং বললোঃ আমি মুসলমান?”
পূবের আয়াতে ঈমানদার লোকদের সান্ত্বনা দেয়া হয়েছিল এবং তাদের সাহস বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, অতঃপর এ আয়াতে সে প্রকৃত দায়িত্বের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষন ও উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে,যে উদ্দেশ্যে তারা মুসলমান হয়েছিল। পূর্বের আয়াতে তাদেরকে বলা হয় যে,আল্লাহর বন্দেগীল পথ গ্রহণ করা ও পথে দৃঢ় পতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর, তা থেকে বিভ্রান্ত না হওয়া এমন একটা নেক কাজ-যা মানুষকে ফেরেশতাদের বন্ধু ও জান্নাতের অধিকারী বানিয়ে দেয়। এখন তাদের পরবর্তী স্তরের কথা বলা হচ্ছে যার চাইতে উন্নত স্তর আর হতে পারে না। তা হচ্ছে-তোমরা নিজেরা নেক আমল করো এবং অন্যান্য লোকদের আল্লাহর বন্দেগী ও দাসত্ব গ্রহণের আহ্বান জানাও। তীব্র বিরুদ্ধতার পরিবেশ এবং যেখানে ইসলামের কথা বলা ও প্রকাশ করা নিজের উপর বিপদ ডেকে আনার শামিল সেখানেও বুক ফুলিয়ে বলোঃ ‘আমি মুসলমান’। আল্লাহ তায়ালার এ কথাটির পূর্ণ গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্যে সে পরিবেশ পরিস্থিতিকে চোখের সামনে রাখা জরুরী, যে পরিবেশে এ কথাগুলো বলা হয়েছিল। তখনকার পরিবেশ এইরূপ ছিল যে, ব্যক্তিই নিজের মুসলমান হবার কথা প্রকাশ করত সহসাই তার মনে হতো সে যোনো হিংস্র জন্তুদের জঙ্গলে প্রবেশ করছে, সেখানে প্রতিটি পশু তাকে ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে ফেলবার জন্যে ছুটাছুটি করছে। তার চাইতে অগ্রসর হয়ে যে লোক ইসলাম প্রচারের জন্যে মুখ খুলতো সেতো যেনো হিংস্র পশুগুলোকে ডেকে বলতোঃ ‘এসো আমাকে ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে ফেলো’। এ কঠিন অবস্থাতেই বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির আল্লাহকে নিজের রব হিসেবে মেনে নিয়ে সোজা পথ অবলম্বন করা নিঃসন্দেহে অতি বড় মৌলিক নেক কাজ। কিন্তু সর্বোচ্চ স্তরের নেক কাজ হচ্ছে, এ পরিবেশে ঘোষণা করে দেয়া যে, ‘আমি মুসলমান’ এবং ফলাফলের পোয়অ না করে খোদার বান্দাদের তাঁরই দাসত্ব গ্রহণের প্রতি দাওয়াত দান করা এবং কাজ করতে গিয়ে নিজের আমলকে এতটুকু পবিত্র রাখা, যেনো ইসলাম ও ইসলামের পতাকাবহীদের কোনো খূঁৎ বের করা সম্ভব না হয়।
উত্তম নেকী দ্বারা মন্দের মুকাবিলা করা
সামনে অগ্রসর হয়ে বলা হয়েছেঃ
আরবী হবে-----------
‘হ নবী ভাল আর মন্দ সমান নয়। মন্দের মুকাবিলা করো সে নকী দিয়ে-যা অতীব উত্তম। তাহলে দেখতে পাবে-তোমার সাথে যাদের ছিল চরম শত্রুতা তারা হয়ে গেছে তোমার পরম বন্ধু’।
এ আয়াতের পূর্ণ তাৎপর্য বুঝতে হলে সে পরিবেশ পরিস্থিতিকে চোখের সামনে রাখতে হবে-যে পরিবেশ পরিস্থিতিতে নবী করীম (সঃ)-কে এবং তাঁর মাধ্যমে তাঁর অনুসারীদের এ হেদায়াত দেয়া হয়েছিল। তখন অবস্থা এরূপ ছিল যে, দাওয়াত হকের বিরুদ্ধতা চরম হটকারিতা ও কঠিন আক্রমণাত্মক ভূমিকা দ্বারা করা হচ্ছিল। তার বিরুদ্ধে নান হাতিয়অর ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিটি ফৌজই তাঁর বিরুদ্ধে জনমনে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করার কাজে নিরত ছিল। তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের নানা প্রকার কষ্ট, নির্যাতন ও পীড়া দেয়অ হচ্ছিল। যাতে অতিষ্ট হয়ে বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান দেশ ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ সময় হুজুর (সঃ)-এর প্রচার কাজ বন্ধ করে দেবার জন্যে এরূপ কর্মসূচী তৈরী করা হয় যে, গণ্ডগোল ও হট্টগোলকারীদের একটা দল সব সময় তাঁর পিছে লাগিয়ে রাখা হতো। যখনই তিনি দাওয়াতে হকের জন্যে মুখ খুলতেন তখন তারা এমন হৈ-হট্টগোল ও চীৎকার শুরু করতো যে তাঁর কথাই কেউ শুনতে পেত না বস্তুত এটা ছিল খুবই নাজুক পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতিতে বাহ্যত দ্বীন প্রচারের সমস্ত পথই বন্ধ দেখা যাচ্ছিল। ঠিক এরূপ অবস্থায়ই বিরদ্ধবাদীদের দাঁত চূর্ণ করার জন্যে হুজুর (সঃ)-কে এ হেদায়ত দেয়া হয়।
প্রথম কথাতেই বলা হয়েছে নেকী ও বদী তথঅ ভঅল ও মন্দ এক নয়। মানে বাহ্যথ তোমাদের বিরুদ্ধবাদীরা পাপ ও অন্যায়ের যতবড় তুফানই সৃষ্টি করুক না কেনো,তার মুকাবিলায় নেকী যতই দুর্বল, অসহায় অক্ষমই মনে হোক না কেনো;কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বদী ও অন্যায় তার নিজ সত্তার দিক থেকেই দুর্বল ও অসহায় । আর এ জন্যেই শেষ পর্যন্ত মানুষ থাকে তার স্বভাব প্রকৃত অন্যায় ও পাপকে ঘৃণা না করে পারে না। পাপ ও অন্যায়ের সঙ্গী সাথীরাই শুধু নয়, তার পতাকাবাহীরা পর্যন্ত মনে মনে একথঅ অনুভব করে যে, তারা মিথ্যাবাদী, যালেম ও নিজেদের স্বার্থের জন্যে অন্যায়ভাবে হঠকারিতা করছে। এ জিনিসটাই অন্যদের মনে তাদের প্রতি আস্থা জন্মানোর পরিবর্তে তাদের নিজেদের দৃষ্টিতে নিজেদের মর্যাদা বিনষ্ট করে। আর তাদের দিলের উপর একটা চোর বসে যায়-যা প্রতিটি বিরুদ্ধবাদী পদক্ষেপের সময়ই তাদের সাহস ও সংকলপকে ভিতরগত ভঅবে দলন করতে থাকে। এ অন্যায় ও পাপের মুকাবিলায় যদি সে নেকী দ্বারা যা বাহ্যিকভঅবে সম্পূর্ণ অসহায় অক্ষম বলে পরিলক্ষিত হয়-নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে থাকে তবে শেষ পর্যন্ত তা জয়ী হবে। কারণ একে তো নেকীর মধ্যে এক বিরাট শক্তি নিহিত রয়েছে যা মানুষের দিলকে প্রভাবিত ও মোহময় করে তোলে। মানুষের নৈতিক চরিত্র যতোই খারপি ও বিকৃত হয়ে যাক না নেনো সে নিজের অন্তরে নেকীর মর্যাদা অনুভব না করে পারে না। আর নেকী ও বদী যখন সম্মুখে সমরে লিপ্ত হয়ে এবং উভয়েরই আচ্ছাদিত মনিমুক্ত সর্ব সাধঅরণেল সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে তখন দীর্ঘকালীন দ্বন্দ্ব সংগ্রামের পর খুব কম লোকই এমন থাকতে পারে যারা অন্যঅয় ও পাপের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ও নেকীর প্রতি আসক্ত ও উৎসর্গীকৃত না হবে।
দ্বিতীয় কথা বলা হয়েছে, পাপের মুকাবিলা মুধুমাত্র নেকী দ্বারা নয়; বরং এমন নেকী দ্বারা করতে হবে যা অতি উত্তম ও উচ্চ মানের। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি তোমাদের সাথে অন্যায় আচরণ করলে তোমরা তাকে ক্ষমা করে দাও। এটা হবে নেক কাজ। আর উচ্চতম মানের নেকজাক হবে, যে ব্যক্তি তোমার অসদাচরণ করবে সুযোগ পেলেই তোমরা তার ইহসান ও উপকার করবে।
এর সুফল সম্পর্কে বলঅ হয়েছে, নিকৃষ্টতম শত্রুও শেষ পর্যন্ত প্রাণের বন্ধু হয়ে যাবে। কারণ এটাই মানব স্বভাব। কেউ গালি দিলে আপনি চুপ থাকুন। নিঃসন্দেহে এটা একটা নেকীর কাজ হবে। কিন্তু গালী দানকারী র মুখ এতে বন্ধ হবে না । আর তার গালাগালের জবাবে যদি আপনি তার কল্যাণ কামনা করেন তবে যতবড় নির্লজ্জ বিরুদ্ধবাদীই হোক না কেনো তাকে লজ্জিত হতেই হবে। অতঃপর আপনার বিরুদ্ধে খারাপ কথা তার জন্যে আর সহজ ব্যাপার হবে না। এক ব্যক্তি আপনার ক্ষতি করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে না, অথচ আপনি তার সমস্ত বাড়াবাড়ি সহ্য করে যাচ্ছেন। এত হয়তো সে নিজের দুস্কৃতির কাজে আরো সাহসী হবে। কিন্তু যদি এমন হয় যে কখনো তার কোনো ক্ষতি হতে যাচ্ছে আর আপনি সে ক্ষতি হতে তাকে রক্ষ করলেন, তবে সে আপনার পায়ের উপর পড়ে থাকতে বাধ্য। কারণ এরূপ নেকীর মুকাবিলায় কোনো প্রকার দুস্কৃতি টিকে থাকাই সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও এ নিয়মটাকেই কোনো স্থায়ী বা সাধারণ নিয়মে পরিণত করে নেয়া ঠিক নয় যে এ উচ্চস্তরের নেকী প্রত্যেক জানের দুশমনকেই প্রাণের বন্ধু বানিয়ে দেবে। দুনিয়তে এমন নিকৃষ্ট আত্মার লোকও হয়ে থাকে যে, আপনি তাদের বাড়াবাড়ির জবাবে ক্ষমা এবং তাদের দুর্ব্যবহারের বিনিময়ে সদাচরণ করে যতোই পূর্ণতার মানবিকতা দেখান না কেনো তাতে তাদের দংশনের বিষ বিন্দুমাত্র কম হয় না। কিন্তু এরূপ চরম নিকৃষ্ট মানুষ এতই কম পাওয়া পায়-যতটা কম পাওয়া যায় পরম কল্যাণ-কামী মানুষ।
হকের দাওয়াতের সবরের গুরুত্ব
অতঃপর বলা হয়ঃ
আরবী হবে--------
‘এ গুণ কেবল তাদের ভাগ্যেই জুটে, যারা ধৈর্যধারণ করে। আর এ মর্যাদা লাভ করতে পারে কেবল তারাই যারা বড়ই ভাগ্যবান’।
মানে এ প্রেসক্রিপশান যদিও খুবই কার্যকর; কিন্তু এর ব্যবহার ও প্রয়োগের কোনো হাসি-তামাশা ও খেলার ব্যাপার নয়। এ জন্যে বিরাট মনোবল ও বলিষ্ঠ আত্মার-প্রয়োজন। দৃঢ় সংকল্প বিরাট সাহসিকতা,ধৈর্য্যশক্তি ও আত্মসংযমের। সাময়িক ভাবে কেউ হয়তো অন্যায়ের মুকাবিলায় বিরাট কোনো নেকী করেও ফেলতে পারে। এটা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়; কিন্তু যেখানে কোনো ব্যক্তিকে বছরের পর বছর ধরে এসব বাতিলপন্থী দুষ্কৃতিকারীদের মুকাবিলায় দ্বীনে হকের খাতিরে ক্রমাগত ভাবে লড়ে যেতে হয়-যারা যে কোনো নৈতিকসীমা লংঘন করতে কোন প্রকার দ্বিধাবোধ করে না। এবং শক্তি ও ক্ষমতার নেশায় থাকে মত্ত হয়ে, সেখানে নিরন্তর পাপের মুকাবিলায় নেকী তথা উচ্চ মানের নেকী এবং একবারের জন্যেও সংযমের বাধ ভেঙ্গে না যাওয়া কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভবপর ব্যাপার নয়। এ কাজ সে ব্যক্তিই করতে পারে, যে প্রশান্ত মনে সত্য দ্বীনের উন্নতি ও প্রতিষ্ঠার জন্যে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করছে; যে নিজের আত্মাকে জ্ঞান ও বুদ্ধি বিবেকের অনুগত করে নিয়েছে যে বিরুদ্ধবাদীদের কোনো দুস্কৃতি ও নোংরা আচরণই তাঁকে তাঁর এ মহান মর্যাদা থেকে নীচে নামাতে ও ধৈর্যহীন করতে কামিয়াব হতে পারে না।
আর এ যে বলা হলোঃ ‘এ মর্যাদা কেবল তারাই লাভ করতে পারে, যারা বড় ভাগ্যবান’। এটা হচ্ছে প্রকৃতিরই নিয়ম। অতি বড় উচ্চ মর্যাদার মানুষই এসব গুণাবলিতে গুণান্বিত হয়। আর যিনি এসব গুণের অধিকারী হয়ে থঅকেন, দুনিয়অর কোনো শক্তিই তাক সফলতার মনযিলে পৌঁছা থেকে বিরত রাখতে পারে না। নিকৃষ্টস্তরের লোকদের হীন আচরণ, জঘন্য ষড়যন্ত্র ও অমানুষিক কার্যকলাপ তাকে পরাস্ত করবে-এটা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়।
শয়তানের প্ররোচনা থেকে খোদার আশ্রয়
অবশেষে বলা হয়েছেঃ
আরবী হবে------
‘তোমরা যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্ররোচনা অনুভব করো, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো’। (ঐ আয়াত-৩৬)
শয়তান যখন দেখে হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বে হীনতার মুকাবিলায় ভদ্র ও শালীন আচরণ এবং অন্যায় ও বদীর মুকাবিলায় ন্যায় ও নেকীর আচরণ গ্রহণ করা হচ্ছে তখন সে কঠিন দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। সে চায় একবার হলেও কোনো ক্রমে সত্য পথের মুজাহিদরা, বিশেষ করে তাদের নেতৃস্থানীয় লোকেরা সর্বোপরি তাদের নেতা এমন কিছু ভুল করে বসুক, যার ভিত্তিতে জনগনেকে বলা যেতে পারে, দেখুন-অন্যায় এক তরফা হচ্ছে না। একপক্ষ থেকে অন্যায় কিছু খারাপ আচরণ হয়ে থাকলেও অপর পক্ষের লোকেরাও তো তেমন উচ্চমানের লোক নয়। অমুক অন্যঅয় কাজটি তো শেষ পর্যন্ত তারাও করে বসেছে।
সাধারণত মানুষের তো আর এতটুকু ক্ষমতা নেই যে, তারা এক পক্ষের বাড়াবাড়ি ও অপর পক্ষের জবাবী কাজের মাঝে তুলনা করে দেখবে। তারা যতক্ষণ দেখতে পাবে যে বিরুদ্ধবাদীদের সর্বপ্রকার হীন, নিকৃষ।ট ও অন্যায় আচরণের মুকাবিলায় এসব লোকেরা শালীনতা, ভদ্রতা, নেকী ও ন্যায়পরায়ণাতর পথ থেকে বিন্দু পরিমাণ সরছে না, ততক্ষণ তারা এদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হতে থাকবে। কিন্তু এদের দ্বারা যদি কোনে রূপ অন্যায় আচরণ হয়ে বসে কিংবা তাদের মর্যাদার তুলনায় কোন নীচু কাজ হয়ে যায়-তা অতিবড় কোনো বাড়াবাড়ির মুকাবিলায়ই হোক না কেনো, তখন তাদের দৃষ্টিতে উভয় পক্ষই সামান হয়ে য়ায়। এবং বিরুদ্ধবাদীরাও একটা শক্ত কথার জবাবে হাজারো গালি দেবার বাহানা পেয়ে যায়। এ নাজুক ব্যাপারটির ভিত্তিতেই এরশাদ হয়েছে যে, ‘শয়তানের ধোকা ও প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকো’। সে তোমার খুবই খঅয়েরখা ও দরদী বন্ধু সেজে তোমাকে প্ররোচিত ও উত্তেজিত করবে যে, অমুক বাড়াবাড়ি তো কিছুতেই সহ্য করা যেতে পারে না, ‘অমুক কথার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে হবে’। ‘এ হামলার মুকাবিলায় তো লড়ে যাওয়া উচিত নতুবা তো তোমাদের কাপুরুষ বলা যাবে’। এমন প্রতিটি অবস্থঅয় তোমারা যখন নিজেদের মধ্যে অবাঞ্চিত-উত্তেজনা ও প্ররোচনা অনুভব করবে তখনই সতর্ক হয়ে যাবে যে, নিশ্চই এটা শয়তারেনর কাজ। সে তোমাদের ক্রোধান্ধ করে তোমাদের দ্বারা কোনো ভ্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে চায়। সতর্ক হয়ে যাবার পর এমন ধঅরণ করে বসোনা যে, ‘আমি আমার উত্তেজন কন্ট্রোল করতে সক্ষম, শয়তান আমাকে দিয়ে কোনো ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে পারে না’। নিজের এরূপ বিচার ক্ষমতা এবাং সংকল্প শক্তির ধঅরণ শয়তানের আর একটা অতি ভয়ানক ধোকা । এ সবের পরিবর্তে তোমাদেরকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। কারণ তিনি যদি তৌফিক দেন এবং হেফাযত করেন তবেই মানুষ ভুল ভ্রান্তি থেকে রক্ষ পেতে পারে।
এ আয়াতের সর্বোত্তম তাফসীর হচ্ছে সে ঘটনা, যা ইমাম আহমদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে উদ্ধৃত করেছেন, তিনি বলেনঃ একবার নবী (সঃ)-এর উপস্থিতিতেই এক ব্যক্তি হযরত আবু বকরকে (রাঃ) অকথ্য ভাষায় গালি দিতে থাকলো। হযরত আববকর (রাঃ) চুপচাপ তার গালাগাল শুনতে থাকলেন এবং নবী (সঃ) তা দেখে মুচকি হাসছিলেন। শেষ পর্যন্ত হযরত সিদ্দীক (রাঃ)-এর ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যায়। জবাব তিনিও একটা শক্ত কথ তাকে বলে দিলেন। তাঁর মুখ থেকে সে কথাটা বের হতেই নবী করীম (সঃ) দারুন অসন্তোষ পয়ে পড়লেন যা তাঁর চেহারা মুবারকে পরিস্ফুট হয়ে উঠলো এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন। হযরত আবুবকরও উঠে তাঁর পিছু নিলেন এবাং পথিমধ্যে এ ঘটনার কারণ জিজ্ঞেস করে আরয করলেনঃ ‘লোকটা আমাকে গালি দিতে থাকলে আপনি চুপচাপ মুচকি হাসছিলেন, আর আমি তার জবাব দিলে আপনি অসন্তউষ।ট হলেন’। হুজুর (সঃ) বললেন, যতক্ষণ তুমি চুপচাপ ছিলে, ততক্ষণ তোমার সাথে একজন ফেরেশতা ছিলো এবং তোমার পক্ষ থেকে লোকটাকে জবাব দিচ্ছিল। কিন্তু তুমি নিজেই যখন কথা বলে উঠেলে, তখন ফেরেশতার স্থলে শয়তান এসে বসলো। আমি তো শয়তানের সঙ্গে বসতে পারি না।
সত্যের দাওয়াত দানকারীকে নিঃস্বার্থ হওয়া
দাওয়াতে হকের ব্যাপারে দাওয়াত দানকারীর সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হওয়া তার আন্তরিকতা ও সত্য পরায়ণতার এক সুস্পষ্ট দলীল। কুরআন মজীদে বার বার বলা হয়েছে নবী আল্লাহর দিকে ডাকার যে কাজ করছেন তাতে তাঁর নিজের কোন স্বার্থ নেই; বরং তিনি তো নিজে আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণের জন্যেই নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিচ্ছেন।
সূরা আনআমে এরশঅদ হয়েছেঃ
আরবী হবে------
‘হে নবী, আপনি বলে দিনঃ এ দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের জন্যে আমি তো তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাচ্ছিনা। এ তো গোটা জগদ্বাসীল জণ্যে সাধারণ উপদেশ ও নসীহত মাত্র’। (আয়াত-৯০)
সূরা ইউসুফে বলা হয়েছেঃ
আরবী হবে----
আর হে নবী এ কাজের জন্যে তো আপনি তাদের নিকট কোনো পারিশ্রমিক দাবী করছেন না। এতো গোটা জগদ্বাসীর জন্যে এক সাধারণ নসীহত মাত্র’। (আয়াত-১০৪)
বাহ্যত এ ভাষণে নবী করীশ (সঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সম্বোধন কাফেরদের সমষ্টির প্রতিই করা হয়েছে। তাদের একথা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, হে আল্লাহর বান্দারা এ হঠকারিতা কতইনা অন্যায়। নবী যদি নিজের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থের জন্যে দাওয়াত ও তাবলীগের একাজ চালু করতেন কিংবা তিনি যদি নিজের জন্যে কিছু চাইতেন তাহলে তোমাদের অবশ্যই একথা বলার সুযোগ ছিলেঅ যে, আমরা কেনো এ মতলবী ব্যক্তি কথা মেনে নেবো ? কিন্তু তোমরা দেখতে পাচ্ছ যে, তিন একান্তই নিঃস্বার্থপর। তোমাদের এবং গোটা দুনিয়ার কল্যাণের জন্যে তিনি নিঃস্বার্থভাবে একটা কথা পেশ করছেন, তার সাথে কোনো খামাখা কেউ জিদ করবে ? খোলা মনমানসিকতা নিয়ে তাঁর কথা শুনো, মনে লাগলে তা মেনে নাও আর মনে না চাইলে মনে নিওনা।
সূরা মুমিনুনে বলা হয়েছেঃ
আরবী হবে---------
‘হে নবী, আপনি কি তাদের কাছে কিছু চাচ্ছেন ? আপনার জন্যে আপনার রবের দানই উত্তম। আর তিনিই উত্তম রিযিক দানকারী’। (আয়াত-৭২)
অর্থাৎ ঈমানদারীর সাথে কোনো ব্যক্তি আপনার প্রতি এ অপবাদ দিতে পারবে না যে, আপনি কোন আত্ম-স্মর্থ হাসিল করার জন্যে এ তৎপরতা চালাচ্ছেন। আপনার চমৎকার ব্যবসায় ছিলো; অথচ এখন আপনি দারিদ্রে নিমজ্জিত। গোটা কওম আপনাকে সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখতো, সকলেই ইযযত ও সম্মান করতো। এখন গালাগাল শুনছেন, পাথর নিক্ষেপ হচ্ছে এমনকি আপনার জীবন পযন্ত মারত্মক সংকটাবর্তে নিমজ্জিত। শান্তিতে বিবি-বাচ্চাদের সাথে আনন্দময় দিনাতিপাত করছিলেন। আর এখন এমন কঠিন দ্বন্দ্ব-সংঘাতে আপতিত হয়েছ্নে যে, এক মুহূর্ত বিশ্রাম নেবার সময় নেই। সর্বোপরি এমন কথ নিয়ে ময়দানে নেমেছেন যার কারণে গোটা দেশ আপনার শত্রু হয়ে গেছে। কে বলবে এটা একজন স্বার্থপর মানুষের কাজ ? স্বার্থপর ব্যক্তি তো কওম ও কবিলার পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করে তোড়ে-জোড়ে নেতৃত্ব লাভের কোশেশ করে। আপনার মতো তারা এমন কথা নিয়ে ময়দানে নামে না, যা আপনার কওমের স্বার্থর বিরুদ্ধে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ; আর আপনি তো শুরু থেকেই সে জিনিসের শিকড় কেটে আসছেন যার ভিত্তিতে আরব মুশরিকদের উপর কুরাইশ কবিলার জমিদারী প্রতিষ্ঠিত।
সূরা সাবায় বলা হয়েছেঃ
আরবী হবে------
‘হে নবী, আপনি বলে দিন ; আমি যদি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চেয়েই থাকি ; তবে তা তোমাদেরই জন্যে। আমার পারিশ্রমিকের যিম্মাদার তো আল্লাহ। আর তিনি প্রতিটি ব্যাপারের সাক্ষ্য’।
প্রথম বাক্যাংশের দুটি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হচ্ছে, আমি যদি সত্যিই কোনো প্রতিফল চেয়ে থাকি তবে তা তো তোমাদেরই জন্যে। আর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, আমি যদি সত্যিই কোনো প্রতিফল চেয়েই থাকি, তবে তা তোমাদেরই কল্যাণ ছঅড়া আর কিছু নয়। বাক্যের শেষাংশের তাৎপর্য হচ্ছে অভিযোগ ও অপবাদ দানকারীর যে অপবাদ ইচ্ছা দিতে থাকুক। আল্লাহই সব কিছু জানেন। আমি যে একজন নিঃস্বার্থ মানুষ, ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে একাজ করছিনে-এ ব্যাপারে আল্লাহই সাক্ষ্য।
সূরা সোয়াদে বলা হয়েছেঃ
আরবী হবে---
‘হে নবী আপনি বলে দিন, এ দ্বীন প্রচারের জন্যে আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না আর না আমি বানোয়াটকারীদের অন্তর্ভুক্ত’। (আয়ায়-৮৬)
মানে আমি সে সমস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত নই, যারা নিজেরদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে মিথ্যা দাবী নিয়ে উথিত হয় এবং তারা যা নয় তা হয়ে বসার চেষ্টা করে। নবী কমীম (সঃ) এর মুখ দিয়ে একথাটা কেবল মক্কার কাফেরদের জানানোর জন্যেই বলা হয়নি ; বরং এ কাফেরদের মধ্যে অতিবাহিত তাঁর নবুওয়াত পূর্ববর্তী চল্লিশটি বছরের যিন্দেগীই এর সাক্ষ্য হিসেবে মওজুদ রয়েছে। মক্কার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও জানতো নবী করীম (সঃ) কোনো বানোয়অট লোক নন। গোটা কওমের একজন ব্যক্তিও তাঁর মুখ দিয়ে এমন কথা কখনো শুনেনি যাতে তিনি কিছু একটা হতে চান এবং নিজেকে প্রভাবশালী করবার চেষ্টা করছেন বলে সন্দেহ করবার কোনো অবকাশ থাকতে পারে।
সূরা আততুর এবং সূরা ক্কলম-এ বলঅ হয়েছেঃ
আরবী হবে—
‘হে নবী, আপনি কি এদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাচ্ছেন যে এরা জোর পূর্বক আদায় করা জরিমানার বোঝার তলায় পড়ে নিস্পেসিত হচ্ছে?’ (তুর-৪০,ক্কলম-৪৬)
হুজুর (সঃ)-এর প্রতি নয় ; মূলত কাফেরদের প্রতিই প্রশ্নটি করা হয়েছে। এর তাৎপর্য হচ্ছে যে, রসূল (সঃ) তোমাদের কাছ থেকে যদি পারিশ্রমিক চাইতেন কিংবা ব্যক্তিগত কোনো ফায়দা হাসিল করবার জন্যে এসব তৎপরতা চালাতেন, তবে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যাবার ব্যাপারে তোমাদের নিকট অন্তত একটা যুকিআতসঙ্গত কারণ থাকতো। কিন্তু তোমরা নিজেরাই জানো যে, তিনি তাঁর এ দাওয়াতের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ এবং কেবলমাত্র তোমাদের কল্যাণেল জন্যেই তিনি প্রাণপাত করছেন। তাহলে তোমরা যে শান্ত মনে তাঁর কথাও শুনতে প্রস্তুত নও, এর কি কারণ থাকতে পারে ? এ প্রশ্নটাতে একটা সূক্ষ্ম বিদ্রুপও নিহিত রয়েছে। সারা দুনিয়ার কৃত্রিম ধর্মনেতা এবং ধর্মীয় আস্তানাসমূহের সেবায়েতদের মতো আরবেও মুশরিকদের ধর্মীয় নেতা ও পণ্ডিত পুরোহিতরা প্রকাশ্যভাবে ধর্মীয় ব্যবসা চালাতো। এ প্রসঙ্গেই তাদের সামনে এ প্রশ্ন রাখা হয় যে, একদিকে এসব ধর্মীয় ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যভাবে তোমাদের নিকট নযর-নিয়ায এবং প্রতিটি ধর্মীয় কাজ পালন করার জন্যে পারিশ্রমিক আদায় করে থাকে। অপরদিকে এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে উপরন্তু নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য বরবাদ করে তোমাদেরকে অত্যন্ত যুক্তি প্রমাণ সহকারে দ্বীনের সোজা সঠিক পথ প্রদশর্ন করবার চেষ্টা করছেন। এখন বল, এটা তোমাদের সুস্পষ্ট বেআকলী ছাড়া আর কি যে, তোমরা এ মহান ব্যক্তি প্রষ্ঠ প্রদর্শন করছো এবং ঐসব ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতি দৌড়ে যাচ্ছো ?
এ প্রসঙ্গে একটি মাত্র আয়াত আছে যেটি নিয়ে কিছুটা তর্কের অবকাশ আছে । আয়াতটি হচ্ছেঃ
আরবী হবে----
‘হে নবী এ লোকদের বলে দিনঃ এখানে আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রকার পারিশ্রমিকের দাবীদার নই। তবে নৈকট্যের ভালবাস অবশ্যই পেতে চাই’। (আশশূরা-২৩)
এখানে (নৈকট্য) শব্দটির সত্যিকার তাৎপর্য নিয়ে মুফাসরিদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
একদল এর অর্থ আত্মীয়তার সম্পর্ক বুঝেছেন। এবং আয়াতটির তাৎপর্য এরূপ বলে বর্ণনা করেছেন যে, এ কাজে আমি তোমাদের নিকট কোনো পারিশ্রমিক চাইনা। কিন্তু এটা অবশ্যই চাই যে, ‘তোমরা (কুরাইশরা) তোমাদের ও আমার মধ্য্যকার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে। তোমাদের তো কর্তব্য ছিলো আমার কথা মেনে নেয়া। কিন্তু তা যদি না-ই মানো তবে অন্তুত সারা আরবের মধ্যে তোমরাই আমার দুশমনির জন্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করো না’। -এ হচ্ছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের তাফসীল যা বহু সংখ্যক রাবীর সূত্রে ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি, ইবনে জরীর, তাবরানী, বায়হাকী এবং এবনে সায়দ প্রমুখ উদ্ধৃত করেছেন। মুজাহিদ,ইকরামা, কাতাদা, সুদ্দি, আবু মালেক, আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম, দাহাক, আতা ইবনে দীনার এবং অন্যান্য বড় মুফাসসীরগণও এ তাফসীরই করেছেন।
দ্বিতীয় দল কে (নৈকট্য) ও(নিকটত্ব) অর্থে গ্রহণ করেছেন। তাদের দৃষ্টিতে আয়াতটির তাৎপর্য হচ্ছে একাজে আমি তোমাদের কাছে এতটুকু ছাড়া আর কিছুই চাই না যে, ‘তোমাদের মাঝে আল্লাহর নৈকট্যের ভঅব জাগ্রত হোক’ অর্থাৎ-তোমরা ঠিক হয়ে যাও। ব্যস এটাই আমার পুরস্কার। এ তাফসীল হযরত হাসান বসরী (রঃ) থেকে বর্ণিত। এর সমর্থনে কাতাদা থেকেও একটি কথার উদ্ধৃতি রয়েছে। এমনকি তাবরানীল বর্ণনায় এর সমর্থনে হযরত ইবনে আব্বাসেরও একটা মত উদ্ধৃত হয়েছে। কুরআনে মজীদেরই অন্য জায়গায় এ বিষয়টা নিম্নোক্ত ভাষায় এরশাদ হয়েছেঃ
আরবী হবে----
‘এ লোকদের বলে দাও এ কাজে আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাইনা। আমার পারিশ্যমিক হচ্ছে এ যে, যার ইচ্ছ সে নিজের খোদার পথ গ্রহণ করবে’। (ফোরকান-৫৭)
তৃতীয় দল শব্দের অর্থ করেছেন (আত্মীয়-স্বজন)। তাদের দৃষ্টিতে আয়াতটির তাৎপর্য হচ্ছে-‘তোমরা আমার নিকটাত্মীয়দের ভালবাসবে-এছাড়া এ কাজের আর কোনো পুরস্কারই আমি তোমাদের কাছে চাই না’। অতঃপর এ দলের কেউ কেউ মনে করেন। নিকটাত্মীয় বলতে আবদুল মুত্তালিবের গোটা বংশধরদেরই বুঝায়। আর কেউ কেউ কেবলমাত্র হযরত আলী, ফাতেমা (রাঃ) এবং তাঁদের সন্তানদের পর্যন্ত এটাকে সীমাবদ্ধ মনে করেন, হযরত সায়ীদ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) ও আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) থেকে এ তাফসীরই বর্ণিত হয়েছে। আবার কোনো কোন বর্ণনায় এ তাফসীল ইবনে আব্বাস ও হযরত আলী ইবনে হুসাইন (যয়নুল আবেদীন) এর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি কারণে এ তাফসীল কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমতঃ মক্কায় যখন সূরা আশ-শূরা নাযিল হয়, তখন হযরত আলী ও ফাতেমার বিয়েই হয়নি, সন্তান হওয়ার তো দূরের কথা। আর আবদুল মুত্তালিবের বংশধররাও সকলেই তখনো নবী (সঃ) এর সঙ্গী-সাথী হয়নি, বরং তাদের অনেকেই প্রকাশ্যভাবে দুশমনদের সঙ্গী-সাথী ছিলো। আবু লাহাবের দুশমনী তো গোটা দুনিয়া জানে। দ্বিতীয়তঃ নবী (সঃ)-এর আত্মীয় কেবল আবদুল মুত্তালিবের বংশধররাই ছিল না। তাঁর মাতা, তাঁর পিতা ও সম্মানিতা স্ত্রীর (হযরত খাদীজা) সূত্রে কুরাইশদের সব ঘরেই তাঁর আত্মীয় এগানা ছিলো। এমনি করে কুরাইশদের সকল ঘরেই তাঁর মহোত্তম সাহাবিরা যেমন বর্তমান ছিলেন, তেমনি নিকৃষ্টতম দুশমনরাও বর্তমান ছিলো। এসব নিকৃষ্টতম লোকদের মধ্যে কেবল আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদেরকেই নিজেরআত্মীয় বলে আখ্যা দেয়া এবং তাদের জন্যে বিশেষ ভালবাসা পাবার আবেদন জানানো নবী করীম (সঃ) এর পক্ষে কি করে সম্ভব ছিলো ? এ ব্যাপারে তৃতীয় কথাটি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে একজন নবী যিনি অতি উন্নত মর্যঅদায় অবস্থান করে মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দান করেন, সে উচ্চতম মর্যাদায় অভিষিক্ত থেকে এ মহান কাজের জন্যে পারিশ্রমিক চাওয়া যে, তোরা আমার আত্মীয়-স্বজনকে মহব্বত করো-নিতান্তই নীচু স্তরের কাজ। কোনো সুরুচিসম্পন্ন ব্যাক্তি এমনকি কল্পনাও করতে পারে না যে, আল্লাহ তাঁর নবীকে এমন কথা শিক্ষা দেবেন আর নবী কুরাইশদের সামনে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলবেন। কুরআন মজীদে আম্বিয়ায়ে কেরামের যে সব কাহিনী আলোচিত হয়েছে, তাতে আমরা দেখতে প্ই প্রথ্যেক নবীই তাঁর জাতির লোকদের পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাইনা, আমার পারিশ্রমিক তো মহান্আল্লাহর দায়িত্ব রয়েছে। (ইউনুস-৭,২,হুদ-২৯,৫১,আশশূয়ারা ১০৯,১২৭,১৪৫,১৬৪,১৮০)। সূরা ইয়াসীনে নবীর সত্যতা যাচাইর মানদণ্ড হিসেবে বলা হয়েছে নবী তাঁর দাওয়াতী কাজে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হয়ে থঅকেন (আয়াত-২১)। স্বয়ং নবী (সঃ)-এর মুখ দিয়ে কুরআন মজিদে বার বার বলানো হয়েছেঃ আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাইনা, এ সম্পর্কে উপরে উদ্ধৃত হয়েছে। অতঃপর এ কথা বলার কি অবকাশ আছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াত দানের যে কাজ আমি করছি তার বিনিময়ে তোমরা আমার আত্মীয়-স্বজনকে ভালবাসো। এরপর যাখন আমরা দেখি এ ভাষণ্ঈমানদারদের নয় বরং কাফেরদের সম্বোধান করা হয়েছে, তখন এমন বক্তব্য আরো অধিক অযাচিত বলে দৃষ্টিগোচর হয়। উপর থেকে গোটা ভাষণেই কাফেরদের সম্বোধন করা হয়েছে আর সম্মুখের সম্বোধনও তাদেরই প্রতি। কথার এ প্রাসঙ্গিকতায় বিরুদ্ধবাদীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার পারিশ্রমিক চাওয়ার প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত কেমন করে সৃষ্টি হতে পারে ? পারিশ্রমিক ঐসব লোকদের কছেই চাওয়া যায় যাদের দৃষ্টিতে কাজটা খুবই মূল্যবান এবং যাদের জন্যে তিনি তাদের এ মূল্যবান কাজটির সুব্যবস্থা করেছেন। কাফেররা হুজুর (সঃ) এর এ মহান কাজের কি মূল্যটা দিচ্ছিল যে, তিন তাদের বলতে পারেনঃআমি যে তোমাদের এ বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছি এর বিনেময়ে তোমরা আমার আত্মীয়-স্বজনকে ভালোবাসো ? বরং তারা তো উল্টা এ কাজটাকে বিরাট দোষ ও অপরাধ মনে করছিল, যার কারণে তার তাঁর প্রাণ পযন্ত নাশ করতে চেয়েছিল।
দাওয়াতী কাজের সূচনায় পরকালীন ধারণা বিশ্বাসের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান
মক্কা মুয়অযযমায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ইসলাম প্রচারের কাজ আরম্ভ করেন, তখন তাঁর এ কাজের ভিত্তি ছিলো ৩টি। প্রথমতঃ খোদয়ীর ব্যাপারে আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরীক মানা যাবে না। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ তায়ালা তাঁকে স্বীয় রাসূল মনোনীত করেছেন। তৃতীয়তঃ একদিন এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, অতঃপর আর একটি পৃথিবী বানানো হবে। তখন আদি থেকে অন্ত পর্যন্তকার সমস্ত মানুষকে পুনরুন্খিত করা হবে এবং ঠিক সে দেহ ও শরীর সহ হাশরের ময়দানে উপস্থিত করানো হবে, যে দেহ ও শরীল নিয়ে কাজ করছিল। অতঃপর তাদের আকীদা বিশ্বাস ও যাবতীয় কাজ-কর্মের হিসেব নেয়া হবে। এ হিসেব-নিকেষে যারা ঈমানদার ও সৎ প্রমাণিত হবে-তারা চিরদিনের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে যারা কাফের ও ফাসেক প্রমাণিত হবে, তারা চিরকালে জন্যে জাহান্নামবাসী হবে।
এ তিনটি কথার প্রথম কখাটি মেনে নেয়া যদিও মক্কাবাসীদের জন্যে কঠিন ব্যাপার ছিলো, কিন্তু অথাপি তারা আলআলাহর অস্তিত্বের অস্বীকারকারী ছিল না। আল্লাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ রব, সৃষ্টিকর্তা এবং রেযেকদাতা হিসেবেও তারর মানত এবং আল্লাহকে ছাড়া অন্য যাদের তারা উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, সেগুলোকেও আল্লাহর সৃষ্টি বলেই তারা স্বীকার করতো। সুতরাং তাদের সাথে কেবলমাত্র বিরোধ ছিলো খোদার গুণাবলী ক্ষমতা ইখতিয়ার ও ইলাহর মূল সত্তায় ঐসব উপাস্যদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি নেই-এ বিষয় নিয়ে।
দ্বিতীয় কথাটা মক্কার লোকেরা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলো না। কিন্তু তাদের পক্ষে একথঅ স্বীকার করা অসম্ভব ছিলো যে, নবী করীম (সঃ) নবুওয়াতের দাবী করার পূর্বে সুদীর্ঘ চল্লিশটি বছর তাদের মাঝেই জীবন যাপন করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময়ে তারা তাঁকে খখনো মিথ্যাবাদী, ধোকাবজ, কিংবা আত্মস্বার্থরক্ষার জন্যে অবৈধ পন্থা অবলম্বনকারী হিসেবে দেখতে পায়নি। তারা তো সব সময় র্তাঁর বুদ্ধিমত্তা; বিচক্ষণতা, সুস্থমস্তিস্ক এবং উন্নত নৈতিক চরিত্রের সমর্থক ও প্রশংসাকারী ছিলো। এ কারণে হাজারো টালবাহানা ও অভিযোগ রচনা সত্ত্বেও তা অন্য লোকদের বিশ্বাস করানো তো দূরের কথা স্বয়ং তাদের পক্ষেও তাদের এসব কথা সত্য বলে মেনে নেয়া সম্ভবপর ছিল না। কারণ, নবী করীম (সঃ) যখন সব ব্যাপারেই সত্যবাদী ও সত্যপন্থী তখন কেবলমাত্র রেসালাতের দাবীর ব্যাপারে মায়াযাল্লাহ! মিথ্যাবাদী কেমন করে হতে পারেন ?
এমনি করে প্রথম দুটি কথা মক্কাবাসীদের এতো বেমী আপত্তিকর ছিল না। যতটা আপত্তিকর ছিল তৃতীয় কথাটি। একথাটি তাদের সম্মুখে পেশ করা হলে এটা নিয়েই তারা সর্বাধিক বিদ্রূপ করে। এ ব্যাপারটা শুনে তারা সবচাইতে বেশী বিস্ময় ও হয়রানী প্রকাশ করলো এবং তার এটাকে অযৌক্তিক ও অসম্ভব মনে করে বিভিন্ন স্থানে তা ধারণার অতীত, গ্রহণ অযোগ্য বলে প্রচার করতে লাগলো। অথচ ইসলামে আনার জন্যে তাদেরকে পরকালের প্রতি বিশ্বাসী বানানো ছিলো অপরিহার্য কারণ পরকালের সম্ভাব্যতা স্বীকার করে না নিলে হক ও বাতিলের নির্ভু চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ, ভাল-মন্দ নির্বাচনের মেরুদণ্ড পরিবর্তন ও দুনিয়া পূজার পথ পরিহার করে ইসলাম প্রদর্শিত পথে চলঅ তাদের পক্ষে একান্তিই অসম্ভব ছিলো। এ জন্যে মক্কা মুয়াযযমায় অবতীর্ণ প্রাথমিক যুগের সূরাগুলোতে সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে পরকাল বিশ্বাসকে মানষের অন্তরে পতিষ্ঠিত করে দেবার জন্যে। অবশ্য সেজন্যে দলিল প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রেও এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়-যাতে লোকদেরকেমনে তৌহিদের ধারণা আপনাতেই বসে যায়। মাঝে মধ্যে রাসূলে করীম (সঃ) ও কুরআন মজীদের সত্যতা প্রমাণের যুক্তি প্রমাণও সংক্ষেপে আলাচনা করা হয়েছে।

গোপন দাওয়াতের তিন বছর
আল্লাহ তাঁর নবীকে রিসালাতের পয়গাম পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশেষ হিকমত শিক্ষা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী তিনি নিজ কর্মতৎপরতার সূচনাতেই নবুওয়াতের ঘোষণঅ এবং সাধারণ দাওয়াত দেয়ার কাজ শুরু করেননি বরং যেসব কৎকর্মশীল ব্যক্তি নিছক দলিল-প্রমাণ ও বুদ্ধি যুক্তির মাধ্যমে তৌহিদকে গ্রহণ ও শিরককে পরিত্যাগ করতে সম্মত ছিলেন প্রাথমিক তিন বছরে তিনি গোপন পদ্ধতিতে তাদের নিকট ইসলামকে পৌঁছে দেয়ার কজা করছিলেন্ এ ছাড়া এমন কিছু বিশ্বস্ত লোকের নিকটও এ কাজরে কথঅ প্রকাশ করা হতো, যাদের ব্যাপারে নির্ভর করা যেতো যে, তারা সে সময় পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশে রসূলুল্লঅহ (সঃ) সাধারণ ঘোষণা ও প্রকাশ্যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে শুরু করার সিদ্ধান্ত না দেন। এ কাজে হযরত আবুবকর¬১ (রাঃ) এর প্রভাব সবচাইতে বেশী কার্যকর প্রমাণিত হয়।
এ কারণেই তাবারী ও ইবনে হিশাম লিখেছেন, তিনি ছিলেন খুবই মিশুকে ও প্রফুল্ল চিত্ত। সুন্দুর সুকুমার গুণাবলীর কারণে তার কওমের মধ্যে তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। কুরাইদের মধ্যে তাঁর চাইতে বড় বংশ-বিশারদ আর কেউ ছিলনা। কুরাইশদের ভাল ও মন্দ লোদের পরিচয় এবং লোকদের দোষগুণ সম্পর্কে আবুবকর (রাঃ)-এর চাইতে বেশী।
ওয়অকিফহাল আর কেউ ছিলনা। ব্যবসায় ছিলো তাঁর পেশা। সুন্দর পরিচ্ছন্ন লেনদেনে তিনি চিলৈন খ্যাতিমান। কওমের লোকেরা তাঁর জ্ঞান, ব্যবসায় এবং উত্তম আচরণের কারণের তাঁর সাথে অধিক মেলা-মেশা ও উঠা-বসা করতো। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এ সময় তিনি নির্ভরযোগ্য ও আস্থাবান লোকদের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেন। তাঁর দাওয়াতে আকৃষ্ট হয়ে বেশ কিছু সংখ্যক লোক মুসলমান হয়ে যান। অতঃপর যে যে ব্যক্তিই মুসলমান হচ্ছিলেন, তার তাদের বন্ধু মহলের সৎ লোকদের নিকট ইসলামের বাণী পৌঁছে দিচ্ছিলেন। এ সময় মুসলিমগণ মক্কার নির্জণ আস্তানা সমূহে চুপিসারে নামায পড়তেন যেন তাঁদের ধর্ম পরিবর্তন কেউ জানতে না পারে।
দ্বারে আরকামে দাওয়াতের কেন্দ্র ও ইজতেমা কায়েম
মাত্র আড়াই বছর অতীত হয়েছে। এ সময় এমন এক ঘটনা ঘটে, যাতে মক্কার কাফেরদের সাথে সময় হওয়ার পূর্বেই-সংঘর্ঘ বাধঅর আশংকা দেখা দেয়। ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিতঃ একদিন মক্কার মুশরিকরা মুসলামানদেরকে কোনো একটি ঘাটিতে নামযরত অসস্থায় দেখে ফেলে এবং দুর্বল-কাপুরুষ বলে গালি দিতে আরম্ভ করে। কথা বাড়তে বাড়তে উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ঘ বাধে। হযরত সা’আদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) এক ব্যক্তির প্রতি উটের হাড় নিক্ষেপ করলে তার মাথঅ ফেটে যায়। ইবনে জরীর এবং ইবনে হিশাম সংক্ষিপ্ত আকারে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাফেয উমাভী তাঁর মাগাযী গ্রন্থে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করে বলেছেন, যে ব্যক্তির মাথা কেটে গিয়েছিল সে ছিল বনী তাইমের আবদুল।লাহ ইবনে কাতাল । এ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর হুজুর (সঃ) অবিলম্বে সাফা পর্বতের সন্নিকটে অবসিথত হযরত আরকামের বাড়ীতে মুসলমানদের ইজতিমা এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কেন্দ্র বানিয়ে নেন। মুসলমানরা এখানে একত্রিত হয়ে নামায এবং যেসব লোক গোপনে মুসলমানরা এখঅনে একত্রিত হয়ে নামায পড়ত এবং যেসব লোক গোপনে মুসলমান হতে চায় তারাও এখানে আসতে থাকে। ইসলামের ইতিহাসে এই দ্বারে আকাম চির খ্যাতিমান। গোপন দাওয়াতের তিন বছর পরসমাপ্তির পর প্রকাশ্যে সাধঅরণ দাওয়াত শুরু হবার পরও এই দ্বারে আরকামই মুসলামানদের কেন্দ্র ছিলো। এখানেই হুজুর (সঃ) আসেতন। এখানে এসেই মুসলমানরা তাঁর কাছে একত্রিত হতো এবং শেবে আবু তালিবে অন্তরীণ হওয়া পযন্ত এ বাড়ীই ইসলামী দাওয়াতের কেন্দ্রীয় মর্যাদার অভিষিক্ত ছিলো।
তিন বছর গোপন দাওয়াতের খতিয়ান
প্রকাশ্য দাওয়াত সংক্রান্ত আলাচনার পূর্বে তিন বছরের গোপন দাওয়াতে কি পরিমাণ কাজ হলো, তার প্রতিবেদন দেখে নেয়া যাক। কুরাইশদের কোন কোন কবিলার কোন কোন ব্যক্তি মুসলমান হলেন, কুরআশি, মাওলা১ ক্রীতদাস আবং ক্রীতদাসীদের মধ্যে কারা কারা ইসলাম কবুল করলেন-তাও খতিয়ে দেখা যাক। ব্যাপক গবেষণঅ ও অনুসন্ধানের পর সংগ্রহ করা নাম সমহের তালিকা আমরা নিম্নে লিপিবদ্ধ করলাম যা আর কোথাও একত্রে লিপিবদ্ধ নেই।২
বনি হাশিমঃ (১) জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ) (২) তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস খাসআমী। ইনি ছিলেন অকুরাইশ৩ (৩) সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (হুযুর (সঃ) এর ফুফু এবং হযরত যুবায়েরের মা)। (৪) আরওয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) (হুযুর (সঃ) এর ফুফু এবং তুলাইব ইবনে উমাইর (রাঃ)-এর মা)।
বনি আবদুল মুত্তালিবঃ (৫) উবাইদা ইবনে হারেসে ইবনে মুত্তালিব (রাঃ)।
বনি আবদে শামস ইবনে আবদে মান্নাফঃ (৬) আবু হুযাইফা ইবনে উৎবা ইবনে রাবিআ (রাঃ) (৭) তাঁর স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাই ইবনে আমর (রাঃ)।
বনি উমাইয়াঃ (৮) উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) (৯) তাঁর মাতা আরওয়া বিনতে কুরাইয (রাঃ) (১০) কালিদ ইবনে সাঈদ ইবনে আস ইবনে উমায়া (রাঃ) (তার পিতা সায়ীদের কুনিয়াত ছিলোঃ আবু উহাইহা) (১১) তাঁর স্ত্রী উমাইমা বিনতে খালফ খোজায়ীয়া (রাঃ) কেউ কেউ এর নাম উমাইনা লিখেছেন) (১২) উম্মে হাবীবা বিনতে আবু সফিয়া (রাঃ) (প্রথমে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের স্ত্রী ছিলেন। পরে উম্মুল মু’মিনীনের মর্যাদা লাভ করেন)।
বনি উমাইয়ার মিত্র গোত্রসমূহ থেকেঃ (১৩) আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ইবনে রিয়াব (১৪) আবু আহমদ ইবনে জাহাশ (১৫) উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহাশ১। এরা ছিলেন বনি গণম বিন দুদানের লোক, হুযুরের ফুফু উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র এবং উম্মুল মুমিনীন যয়নব বিনতে জাহাশের ভ্রাতৃবৃন্দ।
বনি তাইমঃ (১৬) আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) (১৭) উম্মে রুমান (রাঃ) (হযরত আবুবকরের স্ত্রী এবং হযরত আয়েশা ও আবদুর রহমান ইবনে আবুবকরের মা) (১৮) তালহা আবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ) (১৯) তাঁর মাত সা’বা বিনতে হাজরামী (রাঃ) (২০) হারেস ইবনে খালদ (রাঃ)।
বনি তাইমের মিত্র গোত্র থেকেঃ (২১) সুহাইব ইবনে সিনান রুমী (রাঃ)।
বনি আসাদ ইবনে আদুল উজ্জাঃ (২২) যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ) (হযরত খাদীজার ভাতিজা এবং হুযুর (সঃ)-এর ফুফাতো ভাই) (২৩) খালেদ ইবনে হেযাম (রাঃ) (হাকীম ইবনে হেযামের ভাই এবং হযরত খাদীজার ভাতিজা) (২৪) আসওয়াদ ইবনে নওফেল (রাঃ) (২৫) অমর ইবনে উমাইয়অ (রাঃ)।
বনি আবদুল উজ্জা ইবনে কুসাইঃ (২৬) ইয়াযীদ ইবনে যামআ ইবনে আসওয়াদ (রাঃ)।
বনি যুহরাঃ (২৭) আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) (২৮) তাঁর মাতা শেফা বিনতে আওফ (রাঃ) (২৯) সাআদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) (তাঁর আসল নাম ছিল মালেক ইবনে উহাইব) (৩০) তাঁর ভ্রাতা উমাইর ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) (৩১) তাঁর ভ্রাতা আরে ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) (৩২) মুত্তালিব ইবনে আযহার (রাঃ) (আঃ রহমান ইবনে আওফের চাচাতো ভাই) (৩৩) তাঁর স্ত্রী রামলা বিনেত আবি আওফ সাহমীয়া (রাঃ) (৩৪) তুলাইব ইবনে আযহার (রাঃ) (৩৫) আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব (রাঃ) (মায়ের দিক থেকে ইনি ইমাম যুহরীর নানা ছিলেন)।
বনি যুহরার মিত্রদের মধ্যে থেকেঃ (৩৬) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) (ইন হুযাইল গোত্রের লোক। বনি যুহরার মিত্র হিসেবে মক্কায় বসবাস করতেন)। (৩৭) উৎবা ইবনে মাসউদ (রাঃ) (আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের ভাই) (৩৮) মিকদাদ ইবনে আমরুল কিন্দি (রাঃ) (আসাওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুছ তাঁকে মিত্রকরে রেখেছিলেন। (৩৯) খাব্বাব ইবনে ইরত (রাঃ) (৪০) শুরাহ বিল ইবনে হাসনা আল-কিন্দি (রাঃ) (৪১) জাবির ইবনে হাসনা আল কিন্দি (রাঃ) (মুবারহবিলের ভ্রাতা) (৪২) জুনাদা ইবনো হাসনা (রাঃ) (শুরাহবিলের ভাই)।
বনি আদীঃ (৪৩) সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল (রাঃ) (হযরত উমর (রাঃ) এর ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই) (৪৪) যায়েদ ইবনে খাত্তাব (রাঃ) (হযরত উমরের বোন) (৪৫) যায়েদ ইবনে খাত্তাব (রাঃ) (হযরত উমরের বড় ভাই) (৪৬) আমের ইবনে রবীয়া আল আনাযী (রাঃ) (ইনি ছিলেন বনি আদির মিত্র। খাত্তাব তাঁকে পুত্র বানিয়ে রেখেছিলেন। আবু আবদুল্লাহ আনাসী ছিলো তার কুনিয়াত) (৪৭) তাঁর স্ত্রী লাইলা বিনতে আবু হাসমা (রাঃ) (৪৮) মা’মার ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে নাদমা (রাঃ) (৪৯) নুয়াইম ইবনে আবদুল্লাহ আননাহহম (রাঃ) (৫০) আদী ইবনে নাদলা (রাঃ) (৫১) উরওয়া ইবনে আবু উসাসা (রাঃ) (আরম ইবনে আসের মায়ের পক্ষের ভাই) (৫২) মাসউদ (রাঃ) ইবনে সুয়াইদ ইবনে হারেসা ইবনে নাদালা।
বনি আদীর মিত্রদের মধ্য থেকেঃ (৫৩) ওয়াকিদ ইবনে আবদুল্লাহ (একে খাত্তাব চুক্তিবদ্ধ করে আশ্রয় দিয়ে রেখেছিলেন) (৫৪) খালেদ ইবনে বুকাইর ইবনে আবদে ইয়ালিল লাইছী (রাঃ) (৫৫) ইয়াস (রাঃ) (৫৬) আমের (রাঃ) (৫৭) আকিল (রাঃ)।
বনি আবদুদ দারঃ (৫৮) মুসয়াব ইবনে উমায়ের (রাঃ) (৫৯) আবু রুম উবনে উমায়ের (রাঃ) (মুসআবের ভ্রাতা) (৬০) ফিরাস ইবনে নদর (রাঃ) (৬১) জহম ইবনে কায়েস (রাঃ)।
বনি জুমাহঃ (৬২) উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ) (৬৩) তাঁর ভাই কুদামা ইবনে মাযউন (রাঃ) (৬৪) তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে মাযউন (রাঃ) (৬৫) সায়েম ইবনে উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ) (৬৬) মা’মার ইবনে হারেস ইবনে মা’মার (রাঃ) (৬৭) তাঁর ভাই হাতেব ইবনে হারেস (রাঃ) (৬৮) তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বিনতে মুজাললাল আমেরী (রাঃ) (৬৯) মা’মারের ভাই খাত্তাব ইবনে হারেস (রাঃ) (৭০) তাঁর স্ত্রী ফুকাইহা বিনতে ইয়াসার (রাঃ) (৭১) সুফিয়ান ইবনে মা’মার (রাঃ) (৭২) নুবাইহ ইবনে উসমান (রাঃ)।
বনি সাহামঃ (৭৩) আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা (রাঃ) (৭৪) খুনাইস ইবনে হুযাফা (রাঃ) হযরত উমরের জামাই (উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রাঃ)-র প্রথম স্বামী (৭৫) হিশাম ইবনে আস ইবনে ওয়ায়েল (রাঃ) (৭৬) হারেস ইবনে কায়েস (রাঃ) (৭৭) তাঁর পুত্র বশীল ইবনে হারেস (রাঃ) (৭৮) তাঁর অপর পুত্র মা’মার ইবনে হারেস (রাঃ) (৭৯) কায়েস ইবনে হুযাফা (রাঃ) (আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফার ভাই) (৮০) আবু কায়েস ইবনে হারেস (রাঃ) (৮১) আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রাঃ) (৮২) সায়েব ইবনে হারেস (রাঃ) (৮৩) হাজ্জাজ ইবনে হারেস (রাঃ) (৮৪) বেশর ইবনে হারেস (রাঃ) (৮৫) সা’ঈদ ইবনে হারেস (রাঃ)।
বনি সাহমের মিত্রদের মধ্য থেকেঃ (৮৬) উমায়ের ইবনে রিযাব (রাঃ) (৮৭) মাহমিয়া ইবনে জাযউ (রাঃ) (ইন ছিলেন হযরত আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফদলের মায়ের পক্ষের ভাই)।
বনি মাখজুমঃ (৮৮) আবু সালমা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদ (রাঃ) (হুজুর (সঃ) এর ফুফাতো ভাই এবং দুধ ভাই। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমার প্রথম স্বামী) (৮৯) তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা (রাঃ)। (ইনি এবং তাঁর স্বামী আবু সালমা আবু জেহেলের নিকটাত্মীয় ছিলেন) (৯০) আরকাম ইবনে আবুল আরকাম (রাঃ) (এর দ্বারে আরকামের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে) (৯১) আইয়াস ইবনে আবু রাবিয়া (রাঃ) (আবু জেহেলের মায়ের পক্ষের ভাই ও হযরত খালেদ ইবনে অলীদের চাচাতো ভাই) (৯২) তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে সালামা তামিমী (রাঃ) (৯৩) অলীদ ইবনে অলীদ ইবনে মুগীরা (রাঃ) (৯৪) হিশাম ইবনে আবু হুজাইফা (রাঃ) (৯৫) সালামা ইবনে হিশাম (রাঃ) (৯৬) হাশেম ইবনে আবু হুজাইফা (রাঃ) (৯৭) হাববার ইবনে সুফিয়ান (রাঃ) (৯৮) তাঁর ভ্রাতা আবদুল্লাহ ইবনে সুফিয়ান (রাঃ)।
বনি মাখযুমের মিত্রদের মধ্য থেকেঃ (৯৯) ইয়াসির (রাঃ) (আম্মার ইবনে ইয়াসিরের পিতা) (১০০) আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) (১০১) তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াসির (রাঃ)।
বনি আমের ইবনে লুওয়াইঃ (১০২) আবু সাবরা ইবনে রুহম (রাঃ) (হুজুর (সঃ) এর ফুফু বাররাহ বিনতে আবুল মুত্তালিবের পুত্র) (১০৩) তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুম বিনতে সুহাইল ইবনে আমর (রাঃ) (আবু জান্দালের ভগ্নি) (১০৪) আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল ইবনে আমর (রাঃ) (১০৫) হাতেম ইবনে আমর (রাঃ) (সুহাইল ইবনে আমরের ভাই) (১০৬) সালিম ইবনে আমর (রাঃ) সুহাইল ইবনে আমরের ভাই)। ইসাবা গ্রন্থে তাঁকে সুহাইল ইবনে আমরের ভাতিজা বলা হয়েছে) (১০৭) সাকরান ইবনে আমর (রাঃ) (সুহাইল ইবনে আমরের ভাই এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদা বিনতে যাময়ার প্রথম স্বামী) (১০৮) তাঁর স্ত্রী সওদা বিনতে যাময়া (রাঃ) (সুকরানের মুত্যুর পর তিনি উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ করেন) (১০৯) সালিত উবনে আমরের স্ত্রী ইয়াকাযা বিনতে আলকামা (ইসাবা গ্রন্থে উম্মে ইয়াকাযা লেখা হয়েছে এবং ইবনে সাআদ তার নাম ফাতেমা বিনতে আলকামা বলেছেন) (১১০) মালিক ইবনে যাময়া (রাঃ) (হযরত সওদার ভাই) (১১১) ইবনে উম্মে মাকতুম(রাঃ)।
বনি ফিহর ইবনে মালিকঃ (১১২) আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রাঃ) (১১৩) সুহাইল ইবনে বাইদা (রাঃ) (১১৪) সা’ঈদ ইবনে কাসে (রাঃ) (১১৫) আমর ইবনে হারেস ইবনে যুহাইর (রাঃ) (১১৬) উসমান ইবনে আবদে গানাম ইবনে যুহাইর (রাঃ) (হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের ফুফাতো ভাই) (১১৭) হারেস ইবনে সা’ঈদ (রাঃ)।
বনি আবদে কুসাইঃ (১১৮) তুলাইব উমাইর (রাঃ) (হুজুর (সঃ) এর ফুফু আরওয়া বিতে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র)।
এ পর্যন্ত উল্লেখিত ব্যক্তিরা সবাআ কোরাইশের বড় বড় খান্দানের সাথে সম্পর্কিত। এছাড়াও বেশ কিছু সংখ্যক মাওলা, দাস ও দাসী গোপন দাওয়াতের তিন বছরে ইসলাম কবুল করেন। তাঁদের নাম নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ (১১৯) উম্মে আয়মান বারকা বিনতে সালাবা (ইন শৈশব থেকে হুজুর (সঃ)-কে কোলে করে লালন পালন করেন। (১২০) যিন্নিরা, রূমীয়া, (আমর ইবনে মুয়াম্মিল এর মুক্ত দাসী) (১২১) বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ), (ইনি উমাইয়া ইবনে খালফের দাস ছিলেন) (১২২) তাঁর মাতা হামামা (রাঃ) (১২৩) আবু ফুকাইয়া ইয়াসার জাহমী (রাঃ) সুফওয়ান ইবনে উমাইয়ার আযাদকৃত গোলাম। (১২৪) লবিবা-মুয়াম্মিল ইবনে হাবীবের দাসী। (১২৫) উম্মে উবাইস (রাঃ) বনি তাইম ইবনে মুররাহ অথবা বনি যুহরার দাসী। (পথশ মত যুবাইর ইবনে বাককারের এবং দ্বিতীয় মত বালাজুরীর) (১২৬) আমের ইবনে ফুহাইরা (রাঃ) (তোফায়েল ইবনে আবদুল্লাহর গোলাম)। (১২৭) সুমাইয়া (রাঃ) (হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসারের মাতা এবং আবু হুযাইফা ইবনে মুগীরা মাখযুমীর দাসী)।
এ ছাড়া অকুরাইশদের মধ্যে যারা মক্কার এই প্রাথমিক অধ্যায়ে ইসলাম কবুল করেন, তাঁরা হচ্ছেনঃ (১২৮) মেহজান (রাঃ) ইবনে আদরা আসলমী। (১২৯) মাসউদ (রাঃ) ইবনে রবীয়া ইবনে আমর। ইনি ছিলেন বনি উলুহুন ইবনে খুযাইমার কাররাহ কবিলার লোক।
এভাবে প্রথম চারজন মুসলামানদের সাথে এ ১২৯ জন মিলিত হওয়ায় তাঁদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৩। সাধারণ দাওয়াত আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এরা হুজুর (সঃ)-এর প্রতি ঈমান এনে মুসলিম জামায়াতে শরীক হয়েছিলেন।১
এরা ছিলেন স্থির স্বভাব, প্রশান্তি চিত্ত ও বিশুদ্ধ চিন্তার অধিকারী। এরা কেবল যুক্তি ও সাধারণ জ্ঞানের মাধ্যমেই শিরকের অনিষ্টতা বুঝতে পেরছিলেন। এরা মেনে নিয়েছিলেন তৌহিদের তাৎপর্য ও সত্যতা। মুহাম্মদ (সঃ)-কে স্বীকৃতি দান করেছিলেন, কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে নিজেদের হেদায়েতের একমাত্র পথ এবং আখেরাতের যিন্দেগীকে অবশ্যম্ভাবী মহাসত্য বলে বুঝে নিয়েছেলেন। এই মুখলিস ও দ্বীনের যথার্থ জ্ঞান সম্পন্ন কর্মী বাহিনী তৈরী করে নেয়অর পর আল্লাহর নির্দেশে হুজুর (সঃ) প্রকাশ্যভাবে ইসলামী দাওয়াতের কাজ আরম্ভ করেন।
আরবী হবে------
“হে আমাদের প্রতিপালক! সবরের পথ অবলম্বন কর। বাতিলপন্থিদের মোকাবিলায় দৃঢ়তা দেখাও। হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে”। (আলে-ইমরান-২০০)
১। আল ইসতিয়াব গ্রন্থে ইবনে আবদুল বার এবং উসদুলগাবা গ্রন্থে ইবনে আসীর লিখেছেনঃ “বলা হয়ে থাকে হযরত আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফদল প্রথম মহিলা, যিনি হযরত খাদীজার পরে মুসলমান হন”। এ কথা যদি সঠিক হয়ে থাকে তবে এই প্রাথমিক অধ্যায়ের মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৪। এ মহিলার আসল নাম হচ্ছে লুবাবা বিনতে হারেস। ইন উম্মুল মুমিনীন হযরত মাইমুনার বোন, হযরত খালেদ ইবনে অলীদের খালা এবং হযরত জাফর ইবনে আবু তালিবের স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইসের মায়ের পক্ষের বোন ছিলেন। তার প্রসঙ্গে “বলা হয়ে থাকে” তার মতে দুর্বল বাক্য ব্যবহূহ হওয়ায় আমরা তালিকায় তার নাম উল্লেখ করিনি। -গ্রন্থকার

সূত্র : আমার বই

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ