প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label এস এম নাজমুল হক ইমন. Show all posts
Showing posts with label এস এম নাজমুল হক ইমন. Show all posts

Tuesday, March 8, 2011

এক দৌড়ে অফিস ।। এস এম নাজমুল হক ইমন

কেউ দৌড়ায় বিপদে, আর কেউ জীবিকার তাগিদে। রাজ্জাক দৌড়ান অফিসে যেতে। শখের বসে এক-দুই দিন নয়, প্রতিদিনই দৌড়ান তিনি। কারণটা কী? পয়সা বাঁচাতে কি আর কেউ ৮৪ কিলোমিটার দৌড়াবে! মোটেই না। আসলে আবদুর রাজ্জাক একজন দৌড়বিদ। ম্যারাথনের প্র্যাকটিস করতেই কঠিনতর এ নিয়ম বেছে নিয়েছেন তিনি। নওগাঁর সদর উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে তাঁর বাস।
সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় দৌড়। ফজরের নামাজ পড়ে হালকা নাস্তা সেরে ঠিক ৬টায় ফাইল বগলদাবা করে শুরু করেন ম্যারাথন। প্রথমে ধীর লয়ে, পরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গতি। ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যেই পেঁৗছে যান অফিস। ব্যতিক্রম হয়নি কোনো দিন। প্রায়ই দেখা যায়, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই হাজির হন অফিসে। আর এভাবেই কেটেছে চার বছর!একদিন হলো কি, যথারীতি অফিসের উদ্দেশে দৌড়াচ্ছিলেন রাজ্জাক। পথে এক টমটম চালক (বিদ্যুৎচালিত স্কুটার) টিপ্পনী কাটল তাঁকে। রাগ হলো রাজ্জাকের। ধুম করে বাজি ধরে বসলেন। ঠিক হলো, যে আগে ভূমি অফিসে পেঁৗছাতে পারবে সে পাবে এক হাজার টাকা। বিচারক হিসেবে থাকবেন টমটমের যাত্রীরা। শুরু হলো প্রতিযোগিতা। দৌড়ে অফিসে পেঁৗছানোর প্রায় ৫ মিনিট পর টমটম চালকের দেখা পেলেন রাজ্জাক। জিতলেন বাজি। পুরস্কারের এক হাজার টাকায় ছোটখাটো আয়োজন করলেন অফিসে। প্রতিদিন এতটা পথ যিনি দৌড়ান, তাঁর ঝুলিতে আছে এমন আরো অনেক মজার ঘটনা।
মাঝেমধ্যে বিপদেও পড়ে যান। একবার দৌড়াতে গিয়ে জুতা প্রায় ছিঁড়েই গেল। দেরি না করে জুতা জোড়া হাতে নিয়েই দৌড়াতে লাগলেন। ব্যাপারটা কী জানতে চাইলে হাসিমুখে বললেন, প্রতিদিনই তো জুতা পায়ে দৌড়াই, তাই একটু জুতা ছাড়া দৌড়ে দেখছি আর কি। কষ্ট কিন্তু ঠিকই পাচ্ছিলেন। এ তো আর অলিম্পিক দৌড়ের মসৃণ ট্র্যাক নয়! এবড়োখেবড়ো, পাথর আর ইটের খোয়া বিছানো রাস্তা বলে কথা!
আরেক বিপদের নাম 'কুকুর'। নিজেই বললেন, 'রাস্তার গাড়িঘোড়া ভয় পাই না, কুকুরই আমার একমাত্র ভয়। আমাকে দৌড়াতে দেখে ওরাও মাঝেমধ্যে পিছু নেয়। আত্মা শুকিয়ে যায় আমার।' একদিন ভালোমতোই পিছু নিয়েছিল কুকুরের পাল। রাজ্জাককে বেশ কিছুদূর ধাওয়া করে ওরা। জীবনে সেরা দৌড় দৌড়েছিলেন সেদিন। নির্দিষ্ট সময়ের ২০ মিনিট আগেই অফিসে পেঁৗছে গিয়েছিলেন রাজ্জাক!
এর মাঝে দুঃখের ঘটনাও আছে। একদিন মাঝরাস্তায় পায়ের রগে টান পড়ে রাজ্জাকের। এদিকে পকেটে নেই টাকা। আশপাশে আর কোনো গাড়িও নেই। অনেকক্ষণ খুঁড়িয়ে চলার পর শেষে একটা অটোরিকশা পেয়ে যান বলে রক্ষা।
ব্যথা পান না পায়ে? বললেন, 'ব্যথা পাই না যে তা নয়। তবে পেলে আরো বেশি দৌড়াই। প্রথম প্রথম বেশি ব্যথা লাগত। এখন সহ্য হয়ে গেছে। আর বছরে দু-তিন জোড়া কেডস লাগে।' ভালো কথা, হলিউডের ফরেস্ট গাম্প ছবিটা দেখেছেন নাকি? ওই ছবিতে ফরেস্ট নামের লোকটাও তো আপনার মতো দৌড়ায়। 'হুম, অফিসের একজন ছবিটার কথা বলেছিল। তবে দেখা হয়নি। একই ব্যাপার, তাই না? দেখতে হবে ছবিটা।' আপনার আসল লক্ষ্যটা কী? দৌড়ে অফিস করেন কেন? রাজ্জাকের উত্তর, 'নিজেকে একজন ক্রীড়াবিদ ভাবি। এজন্য শরীরটা ফিট রাখতেই হবে। দেখা যাক, কোনো রেকর্ড গড়তে পারি কিনা।'
এ দৌড়ই কিন্তু রাজ্জাককে দিয়েছে চাকরি। জানালেন, 'এক সময় চাকরির জন্য অনেক ঘুরেছি। ২০০৭ সালের ১ জুলাই কঙ্বাজার মেরিন ড্রাইভ রোডে বাংলা ম্যারাথন আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় ৪২ কিলোমিটার দৌড়ে প্রথম হই। এই জয়ই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। জয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে আমি অফিসপাড়ায় ঘুরতে থাকি। শেষে একদিন তৎকালীন নওগাঁর জেলা প্রশাসক শেফাউল করিম আমাকে রাজস্ব বিভাগে এমএলএসএস পদে চাকরির ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখার ভূমি অফিসে আছি।'
সাফল্যের ইতিহাসটা শোনা যাক রাজ্জাকের মুখেই_'১৯৯৩ সালের কথা। নাটোর থাকতে নিয়মিত ফুটবল খেলতাম। খেলতে গিয়ে একদিন পরিচয় হয় এক ম্যারাথন ট্রেনারের সঙ্গে। তাঁর কাছেই দৌড়ের প্রথম পাঠ নেই। পরের বছর নাটোরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে ২৫ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিই। বিশ্বাস ছিল জিতব। প্রতিযোগিতায় প্রথম হলাম। একই প্রতিযোগিতায় ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রথম হই। পরে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক ডে উপলক্ষে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি আয়োজিত ম্যারাথন প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিতে থাকি। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ ও এরপর ২০০৭ সালে ওই প্রতিযোগিতায় প্রথম হই। ১৯৯৯ এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতার ম্যারাথনে ষষ্ঠ, চতুর্থ, তৃতীয়, পঞ্চম ও চতুর্থ স্থান লাভ করি। এর পর চাকরিটা হয়ে যায়। তাই বলে চর্চা বন্ধ রাখিনি। অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আসা-যাওয়ার সময়টাতেই প্র্যাকটিস সেরে নেই। ইচ্ছে আছে জাতীয় দলের হয়ে ম্যারাথনে অংশ নেব।'
রাজ্জাকের স্ত্রী রুনা বেগম বলেন, প্রথম প্রথম খারাপ লাগত। কিন্তু দৌড়ের পর ও যখন চাকরিটা পেল, তখন বুঝলাম দৌড়টাই আমাদের ভাগ্যের চাকা। দৌড়ের কারণে সবাই তাঁকে এক নামে চেনে।' প্রতিবেশী আজাহার বলেন, 'ম্যারাথন রাজ্জাক নামে সবাই তাঁকে চেনে। উনি আমাদের জন্য বিশাল পাওয়া, আমাদের গর্ব।'
মাস ছয়েক আগেও আবদুর রাজ্জাক ধামইরহাট উপজেলার পলাশবাড়ীর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যেতেন ৪২ কিলোমিটার দৌড়ে। এখন তাঁকে অফিস করতে হয় ১০ কিলোমিটার দূরের কীর্তিপুর ইউনিয়নে। আগের মতো অতটা দৌড়াতে না হলেও ২০ কিলোমিটারই বা কম কী! তাঁর দেখাদেখি যদি রাজধানীর অফিসগামীদের কেউ কেউ এ অভ্যাস চালু করেন, তবে কি আর লোকাল বাসে বাদুরঝোলা হতে হয়! দেখা গেল যানজটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাসের আগেই পেঁৗছে গেলেন মিরপুর থেকে মতিঝিল।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ