প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label সাহিত্যিক পরিচিতি. Show all posts
Showing posts with label সাহিত্যিক পরিচিতি. Show all posts

Friday, September 30, 2011

পুঁথিসম্রাট আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ || মাহমুদুল বাসার

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মৃত্যুদিন ৩০ সেপ্টেম্বর। ১৯৫৩ সালের এই দিনে তিনি ১০টা ৪৭ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। লিখতে বসেছিলেন ‘চট্টগ্রামের অজানা কাহিনী’। লিখতে বসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বাংলাদেশেই শুধু নয়, ভারত উপমহাদেশের জ্ঞানসাধকদের মধ্যে তিনি একজন। তাঁর নাম ড. সুনীতি কুমার, ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নামের সঙ্গে কৃতী গবেষক হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। গবেষকরা বলেন, মৃত্যুর পরে ড. দীনেশচন্দ্রের ডান হাতের আঙুলে কালির দাগ পাওয়া গেছে। আর সাহিত্যবিশারদ লিখতে বসে মৃত্যুর নীরবতায় শয়ন করেন। তার হাতেও কালির দাগ ছিল।
আজীবন দরিদ্র ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সামান্য কেরানিগিরি করতেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তত্কালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ম্যাট্রিক পাস অবশ্য কম কথা নয়। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণেই আর অগ্রসর হতে পারেননি একাডেমিক শিক্ষায়। তার পরও স্বীয় সাধনার বলে, নিষ্ঠার জোরে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক মনীষীদের কাতারে তাঁর নাম স্থান পেয়েছে।
তিনি যে কাজটি করে খ্যাতির শিখরে আরোহণ করেছিলেন, তা ছিল নিদারুণ কষ্টসাধ্য, এমনকি ব্যয়সাপেক্ষও। এর সঙ্গে প্রতিভা ও মেধার প্রশ্নও জড়িত ছিল, আর ছিল মাতৃভাষার প্রতি গভীর গাঢ় ভালোবাসা। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের হাতেলেখা পাণ্ডুলিপি, যাকে বলে পুঁথি, তার আবিষ্কারক। নিজ খরচে, অদম্য অধ্যবসায়ের সঙ্গে পল্লীগ্রামে ঘুরে ঘুরে অনুসন্ধান করে করে অবহেলায় পড়ে থাকা পুঁথি উদ্ধার করেছেন। সেখানেই ক্ষান্ত হননি, পুঁথির হস্তলিপি পর্বে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন, তার সম্পাদনা করেছেন, তার পর ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় তা পাঠাতেন। সসম্মানে ছাপা হতো।
একথা ভাবতে বিস্ময় লাগে যে, সুরেশচন্দ্র সমাজপতির মতো বিদগ্ধ পত্রিকা সম্পাদকের ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় সাহিত্যবিশারদের প্রবন্ধ ছাপা হতো।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ উনিশ-বিশ শতকের রেনেসাঁর মানসপুত্রদের একজন। তার সময়ে খাঁটি বাঙালির সংখ্যা কমই ছিল। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, তাঁর সময়ে উপমহাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক চেতনায় কণ্টকিত হয়েছিল। কিন্তু আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে ওই পঙ্কিল স্রোত কলুষিত করতে পারেনি। তাই দেখি যে, তিনি পুঁথি অনুসন্ধানে নেমে জাত-পাত মানেননি। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৃজনশীল কবিদের পুঁথি উদ্ধারে ব্রতী হয়েছেন।
মানতেই হবে, সাহিত্যবিশারদের আগে যারা পুঁথি উদ্ধারে নেমেছিলেন তারা খণ্ডিত মনোভাবে সীমাবদ্ধ ছিলেন। তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্যবিশারদ প্রথম পূর্ণাঙ্গ, আদর্শবান পুঁথির আবিষ্কারক।
এ কারণে একটি পুঁথি আবিষ্কার করে, তা সুসম্পাদনা করে, টীকাটিপ্পনীসহ সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকায় পাঠানো মাত্র ছাপা হতো। শুধু তাই নয়, উভয় সম্প্রদায়ের মনীষীদের প্রশংসা পেতেন। তাঁর লেখা পাওয়ার জন্য তারা সাগ্রহে অপেক্ষা করতেন।
এ কথা পরিষ্কার বলা দরকার, সাহিত্যবিশারদ কেবল পুঁথি সংগ্রাহক ছিলেন না, সৃজনশীল, চিন্তাশীল লেখকও ছিলেন। অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ, পরিচিত, অপরিচিত সবগুলো পত্রিকায়। তাঁর লেখা যুক্তিপূর্ণ, তথ্যবহুল। তাঁর মানস আধুনিক, অগ্রসর ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তার দ্বারা পরিপুষ্ট। বাঙালির সেক্যুলার ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় তিনি একজন পথিকৃত্।
সাহিত্যবিশারদকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন স্যার আশুতোষ মুখার্জী, ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, ব্যোমকেশ মুস্তফী এবং জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ এমদাদ আলী প্রমুখ।
তিনি ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্মানিত সদস্য। একসময় তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতিও হয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁকে ভালোবেসে একটি চাকরি দিয়েছিলেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ভালোবেসে তাঁকে প্রবেশিকা ও এফএ পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি বিএ ক্লাসের বাংলা বিষয়ের পরীক্ষার খাতা দেখতেন।
সাহিত্যবিশারদ প্রায় সব পত্রিকা পড়তেন, তা সংগ্রহ করতেন, তাতে লিখতেন। তিনি পত্রিকা সম্পাদনাও করতেন। সম্পাদনা করেছেন ‘নবনূর’, ‘কোহিনূর’, ‘সওগাত,’ ‘পূজারী’ ও ‘সাধনা’ পত্রিকা।
তিনি তাঁর বাড়িতে তাঁর পিতামহ কর্তৃক সংগৃহীত কিছু পুঁথির সঙ্গে পরিচিত হন। এই পুঁথিগুলো পড়ে তিনি পুঁথি সংগ্রহে ও এ নিয়ে লিখতে আগ্রহী হন। এ পুঁথিগুলোর মধ্যেই পেয়ে যান ‘চণ্ডীদাসের পদাবলী’। সেসময় তিনি ছিলেন এফএ ক্লাসের ছাত্র। এ সময় তিনি আচার্য অক্ষয় সরকার সম্পাদিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় ‘প্রাচীন পদাবলী’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধ পাঠ করেই মহাকবি নবীন চন্দ্রসেন সাহিত্যবিশারদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
তিনি যখন কলেজে পড়েন, তখন নলিনী কান্ত সেন ‘আলো’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সাহিত্যবিশারদ এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। এ পত্রিকায় তিনি ‘আলাওল গ্রন্থাবলীর কালনির্ণয়’ নামে একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধ পড়ে একজন বিদ্বান মন্তব্য করেন, ‘কালে এই বালক যশস্বী লেখক হইতে পারিবে।’ (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে নিবেদিত প্রবন্ধ সংকলন, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪, পৃ. ১২৮)।
হ্যাঁ, যশস্বী হয়েছিলেন। বিদ্বত্সমাজ তাকে সাহিত্যবিশারদ উপাধি দিয়েছিলেন। সাহিত্য সাগর উপাধিও পেয়েছিলেন। বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর বলতে যেমন ঈশ্বরচন্দ্রকে বোঝায়, তেমনি সাহিত্যবিশারদ বলতে আবদুল করিমকেই বোঝায়। আমরা কিন্তু মাইকেল, বিদ্যাসাগর, সাহিত্যবিশারদ বলতেই ভালোবাসি।
একজন গবেষকের লেখা থেকে জানা যায়, তিনি যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র, তখন কলকাতা থেকে দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত পাক্ষিক ‘অনুসন্ধান’ পত্রিকা তাঁর হাতে আসে। এই পত্রিকা পড়ে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য সংগ্রহে অনুপ্রাণিত হন।
চণ্ডীদাসের পদাবলী পড়ে, গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে পুঁথি পাঠ শুনে, পূর্বপুরুষের সংগৃহীত পুঁথি পাঠ করে সাহিত্যবিশারদ মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
সাহিত্যবিশারদ সম্পাদিত প্রথম বই ‘রাধিকার মান ভঙ্গ’। এই বইয়ের ভূমিকা লেখেন ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি বলেন, “শ্রী আবদুল করিম চট্টগ্রামের একটি বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের পণ্ডিত। তাহার অবস্থা ভাল নহে। তথাপি তিনি সাহিত্যসেবায় অকাতরে পরিশ্রম করিয়া থাকেন। বাঙ্গালা সহিত্যের প্রতি তাহার অনুরাগের প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। তিনি এই দুর্লভ গ্রন্থের সম্পাদনা কার্যে যেরূপ পরিশ্রম, যেরূপ কৌশল, যেরূপ সহায়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা সমস্ত বাঙ্গালায় কেন—সমস্ত ভারতেও বোধ হয় সচরাচর মিলে না। এক একবার মনে হয় যেন কোন ‘জার্মান এডিটর’ এই গ্রন্থ সম্পাদনা করিয়াছেন।” (ঐ-পৃ. ১৬)
‘ইসলামাবাদ’ সাহিত্যবিশারদের একটি মৌলিক গ্রন্থ। চট্টগ্রামকেই তিনি ইসলামাবাদ বলেছেন। কারণ, প্রাচীন ও মধ্যযুগে আউলিয়া, পীর, বুজর্গানেরা চট্টগ্রামে এসে, সেখান থেকে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। উল্লিখিত গ্রন্থের এক জায়গায় বলেছেন তিনি, “আমাদের এই দেশ ধর্মজগতে একটা পরম শ্লাঘ্য স্থান অধিকার করিবার দাবি করিয়া আছে। পৃথিবীর চারিটি মহাধর্ম শক্তি আসিয়া এখানে সম্মিলিত হইয়াছে। ইহা হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ—এই তিন মহাজাতিরই একটা পরম পবিত্র তীর্থরূপে পরিগণিত।... হিন্দুর হিন্দুত্ব ও মুসলমানের মুসলমানত্ব একমাত্র এই দেশেই আজও সম্পূর্ণ বজায় আছে। এক গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বাস করিয়া এক পুকুরের জল খাইয়া আমরা হিন্দু-মুসলমান দুইটি জাতি স্মরণাতীত কাল হইতেই স্ব-স্ব ধর্মের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়া পরম প্রীতিতে চলিয়া আসিতেছি, জাতি-ধর্ম লইয়া এ পর্যন্ত আমাদের দেশে কোনোদিন একটা টুঁ শব্দ পর্যন্তও হয় নাই, ইহা আমাদের চট্টগ্রামের একটা বিশিষ্ট গুণ।” (ঐ-পৃ. ২০)
তার অসাম্প্রদায়িক-উদার মানসের পরিচয় এ উদ্ধৃতিতে বিদ্যমান।
১৯৩৯ সালে সাহিত্য বিশারদ কলকাতা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণে বলেন, “সাহিত্যে জাতি-ধর্মের গণ্ডী আমি কখনও স্বীকার করি নাই, এখনও স্বীকার করি না, কিন্তু ইহার বৈচিত্র্য স্বীকার করি। সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যে জাতিরই হউক, ইহা সাহিত্য পদবাচ্য হইলেই সর্বজনীন হইয়া থাকে। ...মুসলমানের সাহিত্য সর্বজনীন সাহিত্যিক সৌন্দর্য্যের বিচিত্র ভঙ্গীর একদিক মাত্র। হিন্দুর সাহিত্যও তদ্রূপ একদিক। এই জন্যই আধুনিক বঙ্গের সাহিত্যিক জাগরণকে আমি ভীতির চক্ষে দেখি না, বরং প্রীতির নয়নেই নিরীক্ষণ করিয়া থাকি। কারণ অখণ্ড বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি আমার শ্রদ্ধা সুগভীর এবং পরিচয় প্রাচীন।” (ঐ-পৃ. ৩৩)
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ কি কেবল মধ্যযুগের পুঁথিই মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করেছিলেন? অবশ্য পুঁথিগুলো অজানা অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে না আনলে বাংলা সাহিত্য থাকত আধখানা চাঁদের মতো অসম্পূর্ণ। কিন্তু তিনি মূলত পুরো বাঙালি জাতির মননের ইতিহাস পুনরুদ্ধার করেছেন। আবিষ্কৃত উদ্ধারকৃত পুঁথিগুলোতে যেহেতু ইংরেজের কূটপ্রভাব স্পর্শ করেনি, সেহেতু সেসবে আছে ধর্মনিরপেক্ষতার সজীবতা, হিন্দু-মুসলিম মিলনের কথা।
জীবনসায়াহ্নে মানুষ হয় প্রতিক্রিয়াশীল। সাহিত্যবিশারদ হয়েছিলেন প্রগতিশীল। তাঁর সায়াহ্নকালীন অভিভাষণগুলো বিচ্ছিন্নতা, সাম্প্রদায়িকতা, কূপমণ্ডূকতাবিরোধী খরদীপ্ত উচ্চারণে বলিষ্ঠ। এজন্যই তিনি মনীষী, মহাপুরুষ।
সাম্প্রদায়িক চিন্তা তো অনাধুনিক চিন্তা। আর অনাধুনিক চিন্তা দিয়ে সাহিত্য বিশারদ এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষী হওয়া যায় না।
সূত্র : আমার দেশ

Tuesday, September 27, 2011

গাজী গিয়াস উদ্দিন

জন্ম : ৩০ অক্টোবর ১৯৬০, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গন্ধর্বপুর গ্রামে। পিতা : মরহুম হারিছ উদ্দিন আহমেদ (ইউপি চেয়ারম্যান), মা মরহুমা সায়েরা খাতুন। বড় ভাই মোঃ সিরাজুল ইসলাম (তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব)। লেখাপড়া এম এম, বি এ অনার্স (বাংলা) এম এ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)। সহকারী অধ্যাপক  (বাংলা) রায়পুর কামিল মাদ্রাসা। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য এবং প্রাক্তন নির্বাচিত সহ- সভাপতি; দৈনিক জনতার স্টাফ রিপোর্টার এবং মাসিক “বাংলা আওয়াজ” সম্পাদক।  সচেতন নাগরিক কমিটি (টিআইবি) লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সদস্য। প্রকাশিত গ্রন্থ হরিৎ পান্ডুলিপি (কাব্য), স্ক্যান্ডাল (গল্প), গোপনে লুকানো (কাব্য), অকথিত (কাব্য), নান্দনিক পৃথিবী (কাব্য- প্রকাশক মিজান পাবলিশার্স, ঢাকা), ব্যভিচার (মিনি উপন্যাস) এবং লক্ষ্মীপুরের স্মরণীয় বরণীয় (জীবনীগ্রন্থ)। এ সব্যসাচী লেখক কবিতার মধ্য দিয়ে মানবতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে কাজ করে যাচ্ছেন।

Sunday, September 18, 2011

আল মাহমুদ

১৯৫৪ সালের এক শীতের সকাল৷ ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ ১৮ বছরের এক যুবক৷ পরনে তাঁর খদ্দরের জামা ও পাজামা, পায়ে রাবারের স্যান্ডেল আর বগলের নিচে ভাঙা টিনের একটা সুটকেস, যার গায়ে গোলাপ ফুল আঁকা৷ এক ঝলক তাকালেই বুঝা যায় নিতান্তই মফস্বলের এক যুবক কোন এক দুর্বিপাকের তাড়া খেয়ে এখানে এসে উঠেছে৷ তাঁর মুখের রেখায় ফুটে উঠেছে শ্রান্তির চিহ্ন কিন্তু চোখ জোড়া সাক্ষ্য দিচ্ছে যুবকের পেছনে কোন সেনাবাহিনী থাকলে তাঁর নির্ভীক দৃষ্টিই ঘোষণা করত বিজয় বার্তা৷
 
তখন ৫২'র ভাষা আন্দোলনের উত্তুঙ্গ সময়৷ এ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলো আপামর বাংলা ভাষাভাষী বিশেষ করে বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি৷ তবে ছাত্ররাই ছিলো এ আন্দোলনের পুরোধা৷ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে যাঁরা জড়িয়ে পড়েছে, পাকিস্তান সরকারের পুলিশ তাঁদেরকে দমিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে, বিভিন্নভাবে মামলা দিয়ে তাঁদেরকে হয়রানি করার চেষ্টা করছে৷ যুবক তাঁদেরই একজন৷ যুবকের অপরাধ তিনি একজন কবি এবং ৫২'র ভাষা আন্দোলনের ঢেউ মফস্বল শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছড়ে পড়লে যুবক এতে নিজেকে জড়িয়ে নেন৷ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও গঠিত হয়েছিলো ভাষা কমিটি এবং ভাষা কমিটির একটি লিফলেটে তাঁর চার লাইন কবিতা উদ্ধৃত করা হয়৷ আর সেই অপরাধে মীর আব্দুশ শাকুর আল মাহমুদের ফেরার হয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ঢাকায় আগমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি৷

ঢাকায় এসে আল মাহমুদ তাঁর এক পূর্ব পরিচিত'র মাধ্যমে পরিচিত হন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের সাথে৷ তারও পূর্বে ঢাকা এবং কলকাতার পত্র পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি কবিতা প্রকাশ হলে তিনি লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন৷ আল মাহমুদের যখন জীবিকার প্রয়োজনে একটি চাকুরি অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে দাদাভাই তখন আল মাহমুদকে ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাত'র প্রুফ সেকশনে প্রুফ রিডারের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেন৷ পরবর্তীতে তিনি নিজের চেষ্টায় সাপ্তাহিক কাফেলায় সহসম্পাদক পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ এরপর দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন৷ স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে মফস্বল বিভাগে বিভাগীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন৷ এর পর আসে ১৯৭১ সাল৷ বাংলাদেশের জন্ম যন্ত্রণার বছর৷ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে, যে স্বল্প সংখ্যক কবি রণাঙ্গণের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, আল মাহমুদ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ ১৯৭১ সালে তিনি শরণার্থী হয়ে কলকাতায় যান৷ সেখানেই তিনি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন৷ তারপর একদিন এই কবি তাঁর চির পরিচিত সুহৃদ কলমকে ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নেন রাইফেল৷ দেশে ফিরে তিনি মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার আশায় রণাঙ্গণের সশস্ত্রযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন৷ দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আসে স্বাধীনতা৷ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন ঢাকায়৷ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে দৈনিক গণকন্ঠ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন৷ ৭১'র পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতি, দুর্ভিক্ষ, সর্বহারা আন্দোলন ও রক্ষীবাহিনী ইত্যাকার পরিস্থিতিতে দেশ যখন বিপর্যস্ত তখন গণকন্ঠের নিঃশঙ্ক সাংবাদিকতা এ দেশের পাঠক সমাজের কাছে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়৷ বিশেষ করে আল মাহমুদের সংবাদ প্রকাশের স্টাইল ও সাহসী সম্পাদকীয় দেশবাসীর হৃদয় স্পর্শ করে৷ বিপরীত দিকে পত্রিকাটি পরিণত হয় শাসক গোষ্ঠীর চক্ষুশূলে৷ ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সালে তিনি কারাবরণ করেন৷ তাঁর আটকাবস্থায় সরকার দৈনিকটিও বন্ধ করে দেয়৷ ১৯৭৫ এ তিনি মুক্তি পান৷ তাঁর কবি খ্যাতি ততদিনে পৌঁছে গিয়েছিলো রাষ্ট্রপতির বাসভবন পর্যন্ত৷ কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে ডেকে শিল্পকলা একাডেমীর প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেন৷ ১৯৯৩ সালে তিনি ওই বিভাগের পরিচালকরূপে অবসর নেন৷ চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে তিনি আবার ফিরে যান সাংবাদিকতা পেশায়৷ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক কর্ণফুলি'র সম্পাদক হিসেবে বেশ কিছুদিন কর্মরত ছিলেন৷ বার্ধক্যে উপনীত কবি বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন৷

আল মাহমুদ জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই এক বর্ষণমুখর রাতে৷ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামের মাতুলালয় মোল্লা বাড়িতে৷ আল মাহমুদের পূর্বপুরুষগণ ১৫০০ খৃষ্টাব্দের দিকে একটি ইসলাম প্রচারক দলের সাথে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাইতলায় আসেন৷ বৃটিশ আমলে কাইতলার মীরবাড়ির মীর মুনশী নোয়াব আলী পরিবারের অসম্মতিতে পিতৃপুরুষের প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি ও খানকার বাইরে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন এবং পড়াশোনা শেষ করে স্থানীয় আদালতে একটি চাকুরী গ্রহণ করেন৷ ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর তাঁর কর্মস্থল অর্থাত্‍ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন হওয়ায় মীর মুনশী নোয়াব আলী স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী মাক্কু মোল্লার এক কন্যাকে বিয়ে করেন৷ যদিও এই বিয়ে প্রাচীন পিতৃপরিবারের সাথে তাঁর বিচ্ছিন্নতাকে চিরস্থায়ী করে দেয়৷ মাত্র পঁচিশ তিরিশ মাইলের ব্যবধানে থেকেও তিনি কাইতলার মীর বাড়ির সাথে, তাঁর পিতৃপুরুষদের সাথে আর সম্পর্ক রাখতে পারেন নি৷ মুনশী নোয়াব আলী তার পিতার মৃত্যুশয্যায় পিতাকে শেষবারের মত দেখতে কাইতলার মীরবাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন৷ কিন্তু অবাধ্য সন্তানের উপর নারাজ পিতা মীর আব্দুল গনি ইংরেজি শিক্ষিত পুত্রের হাতে এক চামচ পানিও গ্রহণে অসম্মতি জানিয়ে মৃত্যুবরণ করেন৷ মুনশী নোয়াব আলী আর কাইতলায় ফিরে যাননি৷ স্ত্রী, পুত্র নিয়ে শ্বশুর বাড়িতেই অবস্থান করেন৷ আর দয়ালু শ্বশুর, কন্যা এবং জামাতাকে তাঁর অন্যান্য পুত্রদের সমান মর্যাদা এবং তাঁর বিপুল সম্পত্তির অংশ দিয়ে মোল্লাবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেন৷ এই হলো আল মাহমুদের প্রপিতামহ মুনশী নোয়াব আলীর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল মোল্লাবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের ইতিহাস৷

পিতা আব্দুর রব মীরের ছিল কাপড়ের ব্যবসা৷ পরবর্তীতে বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসের অফিসার৷ মা রৌশন আরা বেগম ছিলেন গৃহিনী৷ একদিকে ধর্মীয় চেতনার কারণে ইংরেজি ভাষার প্রতি বিদ্বেষ অন্যদিকে পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোকে কবিতার প্রতি অসাধারণ অনুরাগ- এমনি এক দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশে আল মাহমুদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা৷ আল মাহমুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি তাঁর ছেলেবেলার গৃহশিক্ষক শফিউদ্দিন আহমদের হাতে৷ প্রকৃত অর্থে এই শফিউদ্দিন আহমদই তাঁকে নিয়ে যান পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অনাস্বাদিত এক গ্রন্থভূবনে৷ সেই খুব ছোটবেলায় যখন তিনি স্কুলের চৌকাঠ মাড়াননি, এমনকি ঠিকমতো পড়তেও পারেন না, বানান করে করে সবেমাত্র পড়তে শিখছেন, তখনই শফিউদ্দিন আহমদ তাঁকে রাত জেগে জেগে পড়ে শোনাতেন ঠাকুরমার ঝুলি৷ আর আল মাহমুদ ছোটবেলাতেই আস্তে আস্তে উপলব্ধি করেন বাল্যশিক্ষার জঞ্জালের বাইরেও বইয়ের একটি বিশাল জগত্‍ রয়েছে৷ এই উপলব্ধিই পরবর্তীতে তাঁকে বানিয়েছে কবি, ভাবুক, পাখির মতো বন্য৷ ফলে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই শিখে ফেলেছিলেন স্কুল পালানো৷ স্কুল পালিয়ে লোকনাথ পার্কের বিশাল কড়ই গাছের নিচে শুয়ে শুয়ে দেখতেন পাখিদের খুনসুটি, নীলিমার নীল, বৃষ্টির পতন৷ জর্জ হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর অবশ্য তাঁর স্কুল পালিয়ে সময় কাটানোর জায়গা পরিবর্তন হয়ে যায়৷ একদিন তাঁর পাঠতৃষ্ণা তাঁকে পায়ে পায়ে নিয়ে যায় লালমোহন পাঠাগারে৷ এর পেছনেও রয়েছে এক মজাদার ঘটনা৷ আল মাহমুদের বাড়িটি ছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশন লাগোয়া৷ স্টেশনে গভীর রাত অব্দি ট্রেন চলাচল করত৷ আর বালক আল মাহমুদ বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের বেলায় কী এক আকর্ষণে পায়ে পায়ে চলে আসত স্টেশনে৷ রাতের স্টেশনের চাঞ্চল্য, বিচিত্র সব মানুষের আনাগোনা তাঁর মনে এক ধরণের রোমাঞ্চের সঞ্চার করত৷ স্টেশনের চায়ের দোকানে বসে বড়দের মত গম্ভীর ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিতেন৷ একদিন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন দু'জন মহিলা৷ মহিলাদের বেশভূষা আর আচরণ আভিজাত্যের স্বাক্ষ্য দিচ্ছে৷ কিন্তু তাঁদের চোখেমুখে এক ধরণের উত্‍কন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ তাঁদের গন্তব্য স্টেশন থেকে অনেক দূরে এবং সেখানে যাওয়ার জন্য কোন উপযুক্ত বাহনও মিলছে না৷ এখন তাঁরা যাবে কোথায়? এমত উদ্বেগ উত্‍কন্ঠার সময় আল মাহমুদ কিছু না বুঝেই তাঁদেরকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান৷ এই সহোদর দুই মহিলা প্রকৃতপক্ষে ছিলেন তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য৷ তাঁদেরকে থাকতে দেয়া হয়েছিলো আল মাহমুদের শোবার ঘরে৷ আল মাহমুদের ঘরের তাকে রক্ষিত ছিলো ছোটদের অনেক বই৷ তাঁর বইয়ের প্রতি এই আকাঙ্ক্ষা দেখে সহোদরার ছোট বোন শুভা আল মাহমুদকে লালমোহন পাঠাগারের খোঁজ দেন৷ এই পাঠাগারটি আল মাহমুদের জীবনের সত্যিকার শিক্ষা, গবেষণা ও অনুসন্ধিত্‍সা স্বভাব এবং রুচি নির্মাণে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিলো৷ লালমোহন পাঠাগারটি ছিলো মূলত তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির একটি পাঠকেন্দ্র৷ শহরের প্রগতিশীল চিন্তাধারার লোকেরা এই পাঠাগারে এসে ভাব বিনিময় করত৷ আবার মার্কসবাদী আন্দোলনও পরিচালিত হত এখান থেকেই৷ এই পাঠাগারেই আল মাহমুদ কিশোর বয়সেই পড়েন ছোটদের রাজনীতি, ছোটদের অর্থনীতি, ইতিহাসের ধারা ও ডারউইনের বিবর্তনবাদ বিষয়ক বইগুলি৷ এই লাইব্রেরিই আল মাহমুদকে সচেতনভাবে রাজনীতি তথা মার্কসবাদের দিকে নিয়ে যায়৷ ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা রক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে ভাষা কমিটি গঠিত হয়েছিল সেই কমিটির অনেকেই ছিলেন লালমোহন পাঠাগারের সদস্য৷ আর সেই সূত্র ধরেই ভাষা কমিটির লিফলেটে তাঁর চার লাইন কবিতা উদ্ধৃত হয়েছিল৷

তিরিশোত্তর বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন৷ ১৯৫৪ সালে ঢাকা আগমনের পূর্বেই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো কলকাতার সাহিত্য, চতুষ্কোণ, চতুরঙ্গ, ময়ুখ ও কৃত্তিবাসে৷ সেই সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে৷ কবি আল মাহমুদের কবিজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে একটি চিঠি৷ কলকাতার রাসবিহারী এভিন্যুর কবিতাভবনের স্মৃতিচিহ্ন আঁকা শাদা পোস্টকার্ডটির প্রেরক ছিলেন কবিতা পত্রিকার সম্পাদক কবি বুদ্ধদেব বসু৷ কবিতা পত্রিকার জন্য আল মাহমুদ তিনটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন তারই প্রাপ্তি সংবাদ জানিয়েছিলেন বুদ্ধদেব এভাবে- "প্রীতিভাজনেষু, তোমার একটি বা দু'টি কবিতা ছাপা যাবে বলে মনে হচ্ছে৷" একটি মাত্র বাক্য৷ কিন্তু ১৯৫৫ সালে বাংলাভাষার একজন নবীন কবির জন্য এটি ছিলো অসাধারণ প্রেরণা ও স্বীকৃতির বিষয়৷ যেন এক দৈববাণী৷ পরবর্তীতে চৈত্র সংখ্যায় আল মাহমুদের তিনটি কবিতাই ছাপা হয়েছিলো৷ একই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিলো শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, ওমর আলী, শহীদ কাদরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ, পঞ্চাশের শক্তিমান কবিদের কবিতা৷ এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আল মাহমুদকে৷ বাংলা কবিতার ভাঁড়ারে আল মাহমুদ একের পর এক যুক্ত করে গেছেন, যাচ্ছেন অজস্র সোনালি শস্য, সাফল্যের পালক৷ আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি তিরিশ দশকীয় প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীন দৃশ্যপট, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের কর্মমুখর জীবন চাঞ্চল্য ও নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহের বিষয়কে অলম্বন করেন৷ আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের সুন্দর প্রয়োগে আল মাহমুদ কাব্যরসিকদের মধ্যে নতুন পুলক সৃষ্টি করেন৷ সমালোচকগন তাঁকে জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দ দাশ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রধারার এক নতুন কবিপ্রতিভা বলে উল্লেখ করতে থাকেন৷ ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর এবং ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্য কালের কলস৷ এ দু'টি কাব্যের ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ নিজেকে প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ মৌলিক ও নিজস্ব ঘরানার কবি হিসেবে৷ তাঁর কবি জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে- তাঁর প্রথম গ্রন্থ লোক লোকান্তরের প্রকাশ৷ এদেশের প্রকাশকরা সেই সময় তরুণ কবিদের কবিতার বই প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন৷ তখন কয়েকজন তরুণ কবি ও সাংবাদিক নিজেদের পকেট থেকে চাঁদা দিয়ে কপোতাক্ষ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে তাঁর প্রথম গ্রন্থ লোক লোকান্তর প্রকাশ করেছিলেন৷ এটি ছিল একজন কবির জীবনে অনেক বড় প্রাপ্তি৷ তাঁর তৃতীয় কাব্য সোনালী কাবিন প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে৷ সমগ্র বাংলা কবিতার ইতিহাসে সোনালী কাবিন একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে৷ সোনালী কাবিন কাব্যে আল মাহমুদ লোকজ ও আঞ্চলিক শব্দের সমন্বয়ে উদ্ভাবন করেন এক ধরণের শব্দ জাদুময়তার৷ আমার ঘরের পাশে ফেটেছে কি কার্পাশের ফল?/ গলায় গৃঞ্জার মালা পরো বালা, প্রাণের শবরী,/ কোথায় রেখেছো বলো মহুয়ার মাটির বোতল/ নিয়ে এসো চন্দ্রালোকে তৃপ্ত হয়ে আচমন করি৷/ ব্যাধের আদিম সাজে কে বলে যে তোমাকে চিনবো না/ নিষাদ কি কোনদিন পক্ষিণীর গোত্র ভুল করে? এই শব্দ জাদুময়তার ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ তাঁর পাঠকদেরকে চমকিত করে যাচ্ছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে৷ সোনালী কাবিন আল মাহমুদকে এনে দিয়েছে তুমুল কবি খ্যাতি৷ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে পৃথিবীর সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর হৃদয়ে এই কাব্যটি সোনালি হরফে খোদাই করা আছে৷ তাঁর কবি জীবনের সফল উত্তোরণও এই কাব্য দিয়ে৷ এরপর আল মাহমুদের কবিতা একটি ভিন্ন বাঁক নেয় মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো'র ভেতর দিয়ে৷ মূলত আল মাহমুদের আদর্শগত চেতনারও পরিবর্তন হয় এসময়৷ মায়াবি পর্দা দুলে ওঠোতে তিনি মোহামেডানিজম বা ইসলামের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়েন৷ সেই চেতনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই কাব্যে৷ পরবর্তীতে প্রহরান্তের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া প্রভৃতি কাব্যেও তিনি এই চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটান৷ তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাব্য দ্বিতীয় ভাঙন৷ এই কাব্যে কবি আরো একবার নিজেকে পরিবর্তন করেছেন, ভেঙেছেন৷ এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা বিশের অধিক৷

কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব এ দেশের গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়৷ অবশ্য তাঁর সাহিত্য জীবন শুরুই হয়েছিলো গল্প দিয়ে৷ ১৯৫৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক 'সত্যযুগ' পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়৷ তারপর দীর্ঘদিন গল্প লেখায় বিরতি৷ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তীকালে দৈনিক 'গণকন্ঠ' সম্পাদনার সময় তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছিলেন৷ গল্পগুলো প্রকাশিত হলে সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেন তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ কবিই নন, অন্যতম গল্পকারও৷ এ সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর পানকৌড়ির রক্ত, কালোনৌকা, জলবেশ্যা প্রভৃতি গল্পগুলি প্রকাশ পায়৷ ১৯৭৫-এ তাঁর প্রথম ছোটগল্পের সংকলন পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয় এবং বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়৷ আল মাহমুদ গল্প লিখেছেন ধীরে সুস্থে৷ খ্যাতি ও প্রশংসা গল্প রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে টলাতে পারে নি৷ তিনি এ পর্যন্ত যে কয়টি গল্প লিখেছেন সবই পরিকল্পিত ও সুচিন্তিত৷ গল্প হিসেবে সার্থকও বটে৷ পানকৌড়ির রক্ত'র পর তিনি সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, মযূরীর মুখ সহ প্রায় দশটি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন৷ শুধু গল্প নয়, তাঁর স্বাদু গদ্যের ভেতর দিয়ে তিনি আমাদেরকে বেশ কিছু উপন্যাসও উপহার দিয়েছেন৷ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা তাঁর উপন্যাস কাবিলের বোন ও উপমহাদেশ উপন্যাস দু'টি বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে শুধু ঋদ্ধই করেনি সংযোজনও করেছে ভিন্নমাত্রা৷ এছাড়া আল মাহমুদ তাঁর উপন্যাসের ভেতর দিয়ে ফ্রয়েডিয় যৌন চেতনাকে দিয়েছেন শিল্পরূপ৷ আল মাহমুদের উপন্যাসের সংখ্যাও বিশের অধিক৷

কবিতার ডালপালায় চড়ে বেড়াতে ভালোবাসেন আল মাহমুদ৷ কবিতার শব্দরাজি আহরণের জন্য তিনি ডুব সাঁতার দিয়েছেন বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোতে৷ শব্দের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন লোক থেকে লোকান্তরে৷ তেমনি অন্য ভাষার রূপ রস গন্ধ নিতে উড়োজাহাজের বিস্তৃত ডানায় ভর করে উড়ে বেড়িয়েছেন ফ্রান্সের ভার্সাই, প্যারিস, আমেরিকার ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, বেডফোর্ড, ওল্ডহাম, ইরানের তেহরান, ইস্পাহান, মাশহাদ, আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, বনিয়াস, সৌদি আরবের মক্কা, মদিনা, জেদ্দা ভারতসহ আরো নাম না জানা কত কত ক্ষুদ্র নগর জনপদ৷ এই ভ্রমণ, অর্জন, মনন, অভিজ্ঞতা, এইসবের সমন্বয়ে আল মাহমুদ বাংলা কবিতাকে পূর্ণ করে তুলেছেন কানায় কানায়৷

১৯৫৪ সালে যে যুবকটি রাবারের স্যান্ডেল পায়ে ঢাকায় পদার্পণ করেছিলেন কেবল কবিতাকে অবলম্বন করে, সে আজ বার্ধক্যে নুয়ে পড়া এক জ্ঞানবৃদ্ধ৷ জীবনের কত কিছুকে তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন, কত কিছু তাঁকে ফেলে রেখে চলে গেছে৷ কিন্তু কবিতাকে তিনি যেমন ফেলে দেননি তেমনি কবিতাও তাঁকে ফেলে দেয়নি৷ আল মাহমুদ আর কবিতা একই সংসারে বাস করছেন আজ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে ৷ আর সেই সংসারে আরও আছেন কবির স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগম৷ কবি দম্পতির পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা৷ বর্তমানে গুলশানে নিজ বাড়িতে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন৷

এক নজরে আল মাহমুদ

জন্ম : ১১ জুলাই, ১৯৩৬, মোল্লাবাড়ি, মৌড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া৷
পিতা : আব্দুর রব মীর৷
মা : রৌশন আরা বেগম৷
স্ত্রী : সৈয়দা নাদিরা বেগম৷
পুত্রকন্যা : পাঁচ পুত্র, তিন কন্যা৷
পেশা : অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী৷

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :
কবিতা : লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতরে নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, না কোন শূন্যতা মানি না প্রভৃতি৷
ছোটগল্প : পান কৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ুরীর মুখ প্রভৃতি৷
উপন্যাস : কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, পুরুষ সুন্দর, চেহারার চতুরঙ্গ, আগুনের মেয়ে, নিশিন্দা নারী প্রভৃতি৷
শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের কাছে৷
প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন., আল মাহমুদের প্রবন্ধ সমগ্র৷
ভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র প্রভৃতি৷
এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদ রচনাবলী৷

পুরস্কার :
বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরষ্কার (১৯৭৪), সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৭),নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক- ২০০৪ প্রভৃতি৷

লেখক : এহসান হাবীব
সূত্র : গুণীজন

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ