প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label সৈয়দ মুজতবা আলী. Show all posts
Showing posts with label সৈয়দ মুজতবা আলী. Show all posts

Friday, September 14, 2012

বঙ্গে মুসলিম সংস্কৃতি | সৈয়দ মুজতবা আলী

আজ যদি শুধুমাত্র সংস্কৃত পুস্তকপত্র থেকে ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে হয় তাহলে এদেশে মুসলমান ধর্ম আদৌ প্রবেশ করেছিল কি না সে নিয়ে বিলক্ষণ তর্কের অবকাশ থাকবে। অথচ আমরা ভালো করেই জানি, মুসলমান-আগমনের পরও প্রচুর সংস্কৃত পুস্তক লেখা হয়েছে, ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণ রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা পাননি সত্য, কিন্তু তাদের ব্রহ্মোত্তর দেবোত্তর জমিজমার উপর হস্তক্ষেপ না হওয়ার ফলে তাদের ঐতিহ্যগত বিদ্যাচর্চা বিশেষ মন্দীভূত হয়নি। কিন্তু এইসব পণ্ডিতগণ পার্শ্ববর্তী মুসলমানদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন থেকেই আপন আপন লেখনি সঞ্চালনা করেছেন।১ অল্পোপনিষদ্ জাতীয় দু-চারখানা পুস্তক নিতান্তই প্রক্ষিপ্ত। বরঞ্চ এরা সত্যানুসন্ধানকারীকে পথভ্রষ্ট করে।
এ এক চরম বিস্ময়ের বস্তু। দশম, একাদশ শতাব্দীতে গজনীর মাহমুদ বাদশার সভাপতিত্বে আবু-র-বইহান মুহম্মদ আল বীরুনী ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তাঁর প্রামাণিক পুস্তকে একাধিকবার সবিনয়ে বলেছেন, ‘আমরা (অর্থাত্ আরবীতে) যাঁরা জ্ঞানচর্চা করি, দার্শনিক চিন্তা আমাদের মজ্জাগত নয়। দর্শন নির্মাণ করতে পারে একমাত্র গ্রিক ও ভারতীয়রা।’
সেই ষড়দর্শননির্মাতা আর্য মনীষীগণের ঐতিহ্যগর্বিত পুত্রপৌত্রেরা মুসলমান-আগমনের পর সাত শত বত্সর ধরে আপন আপন চতুষ্পাঠীতে দর্শনচর্চা করলেন, কিন্তু পার্শ্ববর্তী গ্রামের মাদ্রাসায় ঐ সাত শত বত্সর ধরে যে আরবীতে প্লাতো থেকে আরম্ভ করে নিওপ্লাতনিজম তথা কিন্দী, ফারাবী, বু আলীসিনা (লাতিনে আভিসেনা), অল-গজ্জালী২ (লাতিনে অল-গাজেল), আবু রুশদ্ (লাতিনে আভেরস) ইত্যাদি মনীষীগণের দর্শনচর্চা হল তার কোন সন্ধান পেলেন না। এবং মুসলমান মৌলানারাও কম গাফিলী করলেন না। যে মৌলানা অমুসলমান প্লাতো-আরিস্ততলের দর্শনচর্চায় সোত্সাহে সানন্দে জীবন কাটালেন তিনি একেবারের তরেও সন্ধান করলেন না, পাশের চতুষ্পাঠীতে কিসের চর্চা হচ্ছে। তিনিও জানতে পেলেন না যে, তিনি প্লাতোর আদর্শবাদ দৃঢ়ভূমিতে নির্মাণ করার জন্য যেসব যুক্তি আকাশ-পাতাল থেকে আহরণ করেছেন তাঁর পাশের চতুষ্পাঠীতেই হিন্দু দার্শনিক শঙ্করাচার্যের আদর্শবাদ সমর্থনার্থে সেইসব যুক্তিই খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনি ‘গুলাত’ নাস্তিকদের জড়বাদ যেভাবে খণ্ডন করছেন, ব্রাহ্মণও চার্বাকের নাস্তিকতা সেইভাবেই খণ্ডন করছেন। এবং সবচেয়ে পরমাশ্চর্য, তিনি যে চরক-সুশ্রুতের আরবি অনুবাদে পুষ্ট বু আলীসিনার চিকিত্সাশাস্ত্র-‘য়ুনানী’ নামে প্রচলিত (কারণ তার গোড়াপত্তন গ্রিক [আইওনিয়ান=‘য়ুনানী’] চিকিত্সাশাস্ত্রের উপর)-আপন মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন, সুলতান বাদশার চিকিত্সার্থে প্রয়োগ করছেন, সেই চরক-সুশ্রুতের মূল পাশের টোলে পড়ানো হচ্ছে। সিনা উল্লিখিত যে-ভেষজ কি, তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না, কিংবা সিনা বলেছেন, ফলানা ওষুধিবনস্পতি এদেশে (অর্থাত্ আরবে) জন্মে না, সেগুলো যে তাঁর বাড়ির পিছনে আঁস্তাকুড়ে গজাচ্ছে তারও সন্ধান তিনি পেলেন না। কিঞ্চিত্ কল্পনাবিলাস করলে, এ পরিস্থিতিও অনুমান করা অসম্ভব নয় যে মৌলানার বেগমসায়েবা সিনা-উল্লিখিত কোন শাক তাঁকে পাক করে খাওয়ালেন, আর তিনি সেটি চিনতেই পারলেন না।
পক্ষান্তরে ভারতীয় আয়ুর্বেদ মুসলমানদের ইউনানী চিকিত্সাশাস্ত্র থেকে বিশেষ কিছু নিয়েছে বলে আমার জানা নেই।
এই দুস্তর মরুভূমির মাঝখানে মাত্র একটি লোক দেখতে পাই। আওরঙ্গজেবের অগ্রজ যুবরাজ মুহম্মদ দারাশীকূহ্। ইনিই সর্বপ্রথম দুই ধর্মের সমন্বয় সম্বন্ধে বহুতর পুস্তক লেখেন। তার অন্যতম মজমা-উল্-বহরেন, অর্থাত্ দ্বিসিন্ধুসঙ্গম। দারাশীকূহ্ বহু বত্সর
অনাদৃত থাকার পর তাঁর সম্বন্ধে প্রামাণিক গবেষণা বিশ্বভারতীতেই হয়। শ্রীযুত বিক্রমজিত্ হস্রত্ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘দারাশীকূহ্ : লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্কস নামক একখানি অত্যুত্তম গ্রন্থ লেখেন এবং বিশ্বভারতী কর্তৃক সেটি প্রকাশিত হয়। প্রয়োজনমত আমরা এই পুস্তকখানি সদ্ব্যবহার করব।
আরও তিন শত বত্সর পর প্রাতঃস্মরণীয় রাজা রামমোহন রায় ফার্সীতে রচনা করেন তাঁর সর্বপ্রথম পুস্তক, ‘তুহাফতু অল্-মূওয়াহিহদীন:‘একেশ্বরবাদীদের প্রতি উত্সর্গ’। রাজা খ্রিস্টধর্মের সঙ্গেও সুপরিচিত ছিলেন বলে তাঁর পুস্তককে ‘ত্রিরত্ন’ধারী বা ত্রিপিটক বললে অত্যুক্তি হয় না। ব্রাহ্মধর্মের উত্পত্তি সম্বন্ধে যাঁরা সামান্যতম অনুসন্ধান করেছেন তাঁরাই জানেন রাজার শিক্ষাদীক্ষা ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতির নিকট কতখানি ঋণী এবং পরবর্তী জীবনে যদিও তিনি উপনিষদের উপর তাঁর ধর্মসংস্কারসৌধের দৃঢ়ভূমি নির্মাণ করেছিলেন তবু শেষদিন পর্যন্ত ইসলামের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কণামাত্র হ্রাস পায়নি। প্রয়োজনমত আমরা তাঁর রচনাবলীরও সদ্ব্যবহার করব।
প্রায় ছশ’ বত্সর ধরে এদেশে ফার্সীচর্চা হল। হিন্দুরা না হয় বিদেশাগত ধর্ম ও ঐতিহ্যের প্রতি কৌতূহল না দেখাতে পারেন, কিন্তু যাদের রাজ্যচালনা করতে হয়েছে তাদের বাধ্য হয়ে এদেশের ভাষা রীতিনীতি অল্পবিস্তর শিখতে হয়েছে। উত্তম সরকারী কর্ম পাবার জন্য বহু হিন্দুও ফার্সী শিখেছিলেন। মাত্র একটি উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে : এদেশে বহু হিন্দুর পদবী মুনশী। আমরা বাঙলায় বলি, লোকটির ভাষায় মুন্সিয়ানা বা মুন্শীয়ানা আছে, অর্থাত্ সে নাগরিক বিদগ্ধ চতুর (স্কিলফুল) ভাষা লেখে। এর থেকেই বোঝা যায়, কতখানি ফার্সী জানা থাকলে তবে মানুষ বিদেশী ভাষায় এ রকম একটা উপাধি পায়। তুলনা দিয়ে বলা যেতে পারে : আমরা প্রচুর ইংরেজি চর্চা করেছি, কিন্তু ইংরেজ মুনশী-জাতীয় কোনো উপাধি আমাদের কাউকে দেয়নি-বরঞ্চ আমাদের ‘ব্যাবু-ইংলিশ’ নিয়ে ব্যঙ্গই করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে সবিস্তর আলোচনা পরে হবে, উপস্থিত এইটুকু উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এই মুন্শী-শ্রেণীর যাঁরা উত্তম ফার্সী শিখেছিলেন তাঁদের অধিকাংশই কায়স্থ, সংস্কৃতের পটভূমি তাঁদের ছিল না, কাজেই উভয় ধর্মশাস্ত্রের সম্মেলন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। উপরন্তু এঁরা ফার্সী শিখেছিলেন অর্থোপার্জনের জন্য—জ্ঞানান্বেষণে নয়। তুলনা দিয়ে বলা যেতে পারে, আমরা প্রায় দুই শত বত্সর ইংরেজি বিদ্যাভ্যাস করেছি বটে, তথাপি খ্রিস্টধর্মগ্রন্থ বাঙলায় অনুবাদ করার প্রয়োজন অতি অল্পই অনুভব করেছি।
শ্রীচৈতন্যদেব নাকি ইসলামের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন। কথিত আছে বৃন্দাবন থেকে সশিষ্য বাংলাদেশে আসার সময় পথিমধ্যে এক মোল্লার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই মোল্লা নাকি তাঁকে প্রশ্ন করেন, তিনি তাঁর শিষ্যদের ভ্রান্ত ধর্মপথে চালনা করছেন কেন? শ্রীচৈতন্যদেব নাকি তখন মুসলমান শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে তিনি ভ্রান্ত ধর্মপ্রচার করছেন না। মুসলমান ধর্মে বলা হয়, যে লোক আর্তের সেবা করে, মিথ্যাচরণ বর্জন করে সত্পথে চলে—অর্থাত্ কুরান-শরীফ-বর্ণিত নীতিপথে চলে—তাকে ‘পয়গম্বরহীন’ মুসলমান বলা যেতে পারে, হজরত্ মুহম্মদকে পয়গম্বররূপে স্বীকার করেনি বলেই সে ধর্মহীন নয়। (আমরা এস্থলে ‘কাফির’ না বলে ‘ধর্মহীন’ শব্দ ইচ্ছা করেই ব্যবহার করছি; পরে এর বিস্তৃত আলোচনায় প্রয়োজন হবে। অতএব অনুমান করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয় যে, বোধ হয় চৈতন্যদেবের শর্ত উদার প্রকৃতিবান ব্যক্তির পক্ষে হজরত্ মুহম্মদকে অন্যতম মহাপরুষ বা পয়গম্বররূপেও স্বীকার করে নিতে আপত্তি থাকার কথা নয়। বস্তুত সে যুগে এবং এ যুগেও বহু হিন্দু সজ্জন মহাপুরুষ মুহম্মদকে আল্লার প্রেরিত পুরুষরূপে স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।
দ্বিতীয় ঘটনা, কাজী-কর্তৃক সংকীর্তন বন্ধ করা নিয়ে। কথিত আছে, সেবারেও তিনি যুক্তিতর্কে কাজীকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিলেন। পূর্বের অনুমান এস্থলেও প্রযোজ্য।
কিন্তু চৈতন্যদেব উভয় ধর্মের শাস্ত্রীয় সম্মেলন করার চেষ্টা করেছিলেন বলে আমাদের জানা নেই। বস্তুত তাঁর জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, হিন্দুধর্মের সংগঠন ও সংস্কার এবং তাকে ধ্বংসের পথ থেকে নবযৌবনের পথে নিয়ে যাবার।
তবুও এ বিষয় নিয়ে সবিস্তর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
এ যাবত্ আমাদের মূল বক্তব্য ছিল, মুসলমান যে জ্ঞানবিজ্ঞান ধর্মদর্শন সঙ্গে এনেছিলেন, এবং পরবর্তী যুগে, বিশেষ করে মোগল আমলে আকবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত মঙ্গোল-জর্জরিত ইরান-তুরান থেকে যেসব সহস্র সহস্র কবি পণ্ডিত ধর্মজ্ঞ দার্শনিক এদেশে এসে মোগল রাজসভায় আপন আপন কবিত্ব পাণ্ডিত্য নিঃশেষে উজাড় করে দিলেন তার থেকে এ দেশের হিন্দু ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ, পণ্ডিত, দার্শনিকরা কণামাত্র লাভবান হননি। এবং বিদেশাগত পণ্ডিত দার্শনিক এ দেশে এসেছিলেন একমাত্র অর্থলাভের উদ্দেশ্যে—কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, স্বদেশ-প্রত্যাবর্তনের পর এঁদের অধিকাংশ তাঁদের চরম নিমকহারামির পরিচয় দিয়েছেন পঞ্চমুখে এদেশের নিন্দাবাদ করে। নিন্দা করেছেন মুসলমান রাজা এবং আমীর ওমরাহরাই—হিন্দু পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁদের কোন যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি।
ফার্সী সাহিত্যের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্রাউন উপরে উল্লিখিত যুগকে ফার্সী সাহিত্যের ইন্ডিয়ান সামার পুনরুচ্ছলিত যৌবন নাম দিয়েছেন। বস্তুত বর্বর মঙ্গোল অভিযানে ফলস্বরূপ ফার্সী সাহিত্যের যে অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল সে তখন অন্নজল পায় মোগল-দরবারে। ইরান আজকের দিনে ভারতের কাছে কতখানি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সে খবর আমাদের কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু ভারতবর্ষে ফার্সী সাহিত্যের এই যুগ নিয়ে অতিঅল্প আলোচনাই হয়েছে, তাও উর্দুতে, বাঙলাতে কিছুই হয়নি।
এ তো প্রধানত সাহিত্য ও অন্যান্য বাঙ্ময়ের কথা, কিন্তু আমাদের কাছে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি বলে মনে হয় এই দেখে যে, ভুবনবিখ্যাত ষড়দর্শনের দেশের লোক মুসলমান মারফতে প্লাতো-আরিস্ততল, সিনা রুশ্দ্ নিয়ে সপ্তম দর্শন নির্মাণ করল না। কল্পনা করতে এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার হয়—ভারতবর্ষ তাহলে দর্শনের ক্ষেত্রে কত না দিক্চক্রবাল উত্তীর্ণ হয়ে যেত—দেকার্ত কান্টের অগ্রগামী পথপ্রদর্শক এ দেশেই জন্মাতেন!
পক্ষান্তরে মুসলমান যে-আরবি দর্শন সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাই নিয়ে পড়ে রইলেন। মঙ্গোল কর্তৃক বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হওয়ার পর, এবং স্পেন থেকে মুররা বিতাড়িত হওয়ার ফলে আরব-জগতে দর্শনের অপমৃত্যু ঘটে। এদেশের মুসলমান দার্শনিককে অনুপ্রাণিত করার জন্য বাইরের সব উত্স সম্পূর্ণ শুষ্ক হল। হায়, এঁরা যদি পাকে-চক্রে কোন গতিকে ষড়যদর্শনের সন্ধান পেতেন।
এ তো কিছু অসম্ভব কল্পনা-বিলাস নয়। আজকের দিনের হিন্দু দার্শনিক এক দিকে নব্যন্যায় চর্চা করেন, অন্য দিকে দেকার্ত অধ্যয়ন করেন। ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁদের পথ-প্রদর্শক। কবি ইক্বালের ঐতিহ্যভূমি আভেরস-আভেচেন্নার উপর—তাঁর সৌধনির্মাণে তিনি সাহায্য নিয়েছেন কান্ট-হেগেলের।
আমরা এতক্ষণ যে অবস্থার বর্ণনা করলেম তার থেকে আপাতদৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত করা সম্পূর্ণ অনুচিত নয় যে, ভারতবর্ষে তাহলে হিন্দু-মুসলমানের মিলন হয়নি। যেহেতু ব্রাহ্মণের দেবোত্তর বাদশা কেড়ে নেননি তাই তিনি নিশ্চিন্ত মনে আপন শাস্ত্রচর্চা করে যেতে লাগলেন, এবং যেহেতু আলিম-ফাজিলরা ওয়াক্ফ্-সম্পত্তি পেয়ে গেলেন তাই তাঁরাই পরমানন্দে তাঁদের মক্তব-মাদ্রাসায় কোরান-হাদীসের চর্চা করে যেতে লাগলেন। একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করার কোন প্রয়োজন অনুভব করলেন না।
কিন্তু দেশের সকলের তো লাখেরাজ ব্রহ্মোত্তর ওয়াক্ফ্-সম্পত্তি নেই। চাষা তিলি জোলা কাঁসারি মাঝি চিত্রকর কলাবত্ বৈদ্য কারকুন এবং অন্যান্য শত শত ধান্দার লোককে অর্থোপার্জন করে জীবনধারণ করতে হয়। সে স্থলে হিন্দু মুসলমানকে বর্জন করে চলতে পারে না, মুসলমানকেও হিন্দুর সংস্পর্শে আসতে হয়। তদুপরি উচ্চাঙ্গের চিত্রকলা সঙ্গীত স্থাপত্য বাদশা ও তাঁর অর্থশালী আমীর-ওমরাহের সাহায্য বিনা হয় না। বাদশারও দরকার হিন্দু রাজকর্মচারীর। কোনো দেশ জয় করা এক কর্ম, সে দেশ শাসন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন শিরঃপীড়া। বাদশা ইরান-তুরান থেকে দিগ্বিজয় করার সময় রাজকর্মচারী সঙ্গে আনেননি। আর আনবেনই বা কি? তারা এ-দেশের ভাষা জানে না, রাজস্বব্যবস্থা বোঝে না, কোন্ দণ্ডনীতি কঠোর আর কোন্টাই বা অতি সদয় বলে দেশের লোকের মনে হবে—এ সম্বন্ধে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বখ্শী (চীফ পে-মাস্টার, অ্যাকাউন্টেন্ট-কাম্-অডিটার জেনারেল), কানুনগো (লিগেল রিমেমব্রেন্সার), সরকার (চীফ সেক্রেটারি), মুন্শী (হুজুরের ফরমান লিখনেওলা, নূতন আইন নির্মাণের খসড়া প্রস্তুতকারী), ওয়াকে-নওয়ীস্ (যার থেকে ডধয়হরং), পর্চা-নওয়ীস্ (রাজকর্মচারীর আচরণ তথা দেশের জনসাধারণ সম্বন্ধে রিপোর্ট তৈরি করনেওলা) এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ করবে কারা?
আমরা জানি, কায়স্থরা স্মরণাতীতকাল থেকে এসব কাজ করে আসছেন। এঁরাই এগিয়ে এলেন। মুসলমানপ্রাধান্য প্রায় দুশ’ বত্সর হল লোপ পেয়েছে, কিন্তু আজও এসব পদবী—প্রধানত কায়স্থদের ভিতর—সম্পূর্ণ লোপ পায়নি।
এ দেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, উর্দু ভাষা এবং অন্যান্য বহু জিনিস যে হিন্দু-মুসলমানের অনিবার্য মেলামেশার ফলে হয়েছিল সে কথা সকলেই জানেন।
শুধু ভাস্কর্য ও নাট্যকলা বাদশা-আমীর-ওমরার কোনো সাহায্য পায়নি। তার কারণ, ইসলামে মূর্তি নির্মাণ নিষিদ্ধ এবং নাট্যকলা ভারতের বাইরে মুসলিম জগতে সম্পূর্ণ অজানা।
হিন্দুধর্ম ভিন্নধর্মাবলম্বীকে আপন ধর্মে গ্রহণ করে না। কাজেই অন্য ধর্ম সম্বন্ধে তার ঔত্সুক্য নেই। মুসলমান বিধর্মীকে মুসলমান করতে চায়। উভয়ের মিলনের চিন্তা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কিংবা মুসলমান মৌলবী কেউ করেন না হিন্দু পণ্ডিত মুসলমানকে বলেন, ‘তুমি দূরে থাকো’। মুসলমান মৌলবী হিন্দুকে বলেন, ‘এসো, তুমি মুসলমান হবে’। তৃতীয় পন্থাও যে থাকতে পারে সেটা কারও মনে উদয় হয় না। হিন্দু হিন্দু থাকবে, মুসলমান মুসলমান থাকবে অথচ উভয়ের মধ্যে মিলন হবে, হৃদ্যতা হবে।
এ পন্থার চিন্তা করেছিল জনগণ। এটাতে ছিল তাদের প্রয়োজন। তাই এলেন ধর্মের জগতে জননেতা, জনাবতার কবীর দাদু নানক ইত্যাদি। পরম শ্লাঘার বিষয়, শান্তিনিকেতনেই এঁদের সম্বন্ধে অনুসন্ধান আরম্ভ হয়। এতদিন ধরে ভারতের হিন্দু-মুসলমান গুণী-জ্ঞানীরা যেসব মহাপুরুষদের সম্পূর্ণ অবহেলা করেছিলেন, শান্তিনিকেতনেই সে সময়ের ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রী তাঁদের নিয়ে সমস্ত জীবন ব্যয়িত করেন। তাঁর ‘দাদু’ ‘কবীরে’র পরিচয় এস্থলে নূতন করে দেবার প্রয়োজন নেই।
সে পুণ্যকর্ম এখনো বিশ্বভারতীতে পূর্ণোদ্যমে অগ্রগামী। ক্ষিতিমোহনের বৃদ্ধ বয়সের সহকর্মী বিশ্বভারতীর অধ্যাপক শ্রীযুত রামপুজন তিওয়ারীর ‘সুফীমত-সাধনা ঔর সাহিত্য’ সুচিন্তিত স্বয়ং-সম্পূর্ণ পুস্তক হিন্দি সাহিত্য তথা মধ্যযুগীয় লোকায়ত ধর্ম-চর্চার গৌরব বৃদ্ধি করেছে। পাণ্ডিত্যপূর্ণ অথচ সরল ভাষায় লিখিত এ ধরনের গ্রন্থ সর্ব ভাষায়ই বিরল।
কিন্তু চিন্তাজগতে—দর্শন-ধর্মশাস্ত্র-জ্ঞানবিজ্ঞানে—হিন্দু-মুসলমানের মিলনভাব অথচ অনুভূতির ক্ষেত্রে—চারুকলা সঙ্গীত লোকসাহিত্যে গণধর্মে—আশাতীত মিলন। এ বিষয়ে অধ্যয়ন এবং চর্চা করতে হলে উভয় জনসমাজের মূল ধর্ম, সামাজিক আচার-ব্যবহার গোড়া থেকে অধ্যয়ন করতে হয়। হিন্দুধর্ম ও সমাজ সম্বন্ধে আমাদের যথেষ্ট জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু মুসলমান ধর্মের উত্পত্তি ও বিকাশ সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় প্রায় কিছুই নেই। যা-কিছু আছে তা সরল ধর্মোচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ এবং স্বধর্মবিশ্বাসীর হৃদয়-মনে উত্সাহ-উদ্দীপনা সঞ্চার করার জন্য-বিধর্মীর সম্মুখে আপন ধর্ম যুক্তিবিচারের উপর নির্মাণ করে তাকে আকর্ষণ করার কোনো প্রচেষ্টা তাতে নেই, আপন ধর্মের স্বতঃসিদ্ধ নীতিও যে বিধর্মীর কাছে প্রামাণ্যভাবে অসিদ্ধ হতে পারে সে দুশ্চিন্তাও এ-সাহিত্যকে বিক্ষুব্ধ করেনি। উপরন্তু ইংরেজ-আগমনের পর এদেশের ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দুরা ইংরেজির মারফতে পেলেন ইসলামের এক বিকট বিকৃত রূপ। সরল হিন্দু জানত না, খ্রিস্টান এবং মুসলিমে স্বার্থসংঘাত লেগে যায় মহাপুরুষের মৃত্যুর অল্প দিন পরেই, শত শত বত্সর ক্রুসেডের নামে একে অন্যের মরণালিঙ্গনে তারা সম্পিষ্ট; ফলে খ্রিস্টান কর্তৃক ইসলাম ও হজরত্ মুহম্মদের বিরুদ্ধে অকথ্য কটুবাক্য এদেশে এসেছে ‘নিরপেক্ষ গবেষণা’র ছদ্মবেশ ধরে। সাধারণ সরল হিন্দু এ ছদ্মবেশ বুঝতে পারেনি। (এস্থলে বলে রাখা ভালো, মুসলমান কিন্তু খ্রিস্টানকে প্রাণভরে ‘জাত তুলে’ গালাগাল দিতে পারেনি, কারণ কুরান-শরীফ যীশুখ্রিস্টকে অন্যান্য মহাপরুষদের একজন বলে যে স্বীকার করে নিয়েছে তাই নয়, তিনি মুহম্মদের পূর্বে সর্বপ্রধান পয়গম্বর বলে তাঁকে বিশেষ করে ‘রূহুল্লা’ ‘আল্লাহ আত্মা’ ‘পরমাত্মার খণ্ডাত্মা’ উপাধি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। পক্ষান্তরে খ্রিস্টান যুগ যুগ ধরে হজরত্ মুহম্মদকে ‘ফলস ‘প্রফেট’ ‘শ্যালট্যান ইত্যাদি আখ্যায় বিভূষিত করেছে। প্রায় চল্লিশ বত্সর পূর্বেও ঐতিহাসিক ওয়েলস তাঁর ‘বিশ্ব-ইতিহাসে’ মুহম্মদ যে ঐশী অনুপ্রেরণার সময় স্বেদাসক্ত বেপথুমান হতেন তাকে মৃগারুগীর লক্ষণ বলে মহাপুরুষকে উভয়ার্থে লাঞ্ছিত করেছেন)।
রামমোহন রামকৃষ্ণ রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ সর্বদেশেই বিরল। এদেশে তো অবশ্যই।
ইতিমধ্যে আর-একটি নূতন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
এতদিন যে হিন্দু পণ্ডিত দার্শনিক মুসলমানের ধর্ম আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করেননি তাতে হয়তো তাঁদের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি, কিন্তু স্বরাজলাভের পর তাঁদের সে দৃষ্টিবিন্দু পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তান ইরান ইরাক সিরিয়া সউদি আরব ইয়েমেন মিশর তুনিস আলজিরিয়া মরক্কো তথা মুসলমানপ্রধান ইন্দোনেশিয়া ও নবজাগ্রত মুসলিম অধ্যুষিত আফ্রিকার একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতা স্থাপন করতে হবে। মুসলিমপ্রধান পাকিস্তানও এ ফিরিস্তির অন্তর্ভুক্ত। এদের ধর্ম, তার উত্পত্তি ও ক্রমবিকাশ, রাজনৈতিক তথা অর্থনৈতিক বাতাবরণ-পার্থক্যে তাদের ভিন্ন ভিন্ন রূপ-পরিবর্তন— এসব এখন অল্পবিস্তর অধ্যয়ন না করে গত্যন্তর নেই। সত্য, আমাদের ইস্কুল-কলেজে এখনো আরবী-ফার্সীর চর্চা সম্পূর্ণ লোপ পায়নি, কিন্তু এই নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়াটা সমীচীন হবে না। কিছু কিছু হিন্দুদেরও আরবী-ফার্সী শিখতে হবে। এবং এই সাতশ’ বত্সরের প্রাচীন আরবী-ফার্সীর শিক্ষাপদ্ধতিও পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু সে প্রসঙ্গ যতই প্রয়োজনীয় হোক, এ স্থানে কিঞ্চিত্ অবান্তর।
আমরা যে মূল উেসর সন্ধানে বেরুচ্ছি তার জন্য আজ আর প্রাচীন মানচিত্র কাজে লাগবে না। ভাবোচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ অথবা সন্দেহে কণ্টাকাকীর্ণ প্রাচীন কোনো পদ্ধতির অনুসরণ করলে আজ আর চলে না। ধর্মকেও আজ রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতির কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই করতে হয়।
কিন্তু অনুসন্ধিত্সু মনের সঙ্গে থাকবে সহানুভূতিশীল হৃদয়।

[১ টয়িনবি সাহেব যে রীতিতে পৃথিবীর সর্বত্র একই প্যাটার্নের অনুসন্ধান করেন বর্তমান লেখক সে নীতি অনুসরণে বিরত থাকবে। শুধু যেখানে প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি দেখিয়ে দিলে আলোচ্য বিষয়বস্তু স্পষ্টতর হবে সেখানেই এই নীতি মানা হবে। এস্থলে তাই শুধু উল্লেখ করি, যখনই কোন জাতি বৈদেশিক কোন ভিন্নধর্মাবলম্বী দ্বারা পরাজিত হয় তখন নূতন রাজা এঁদের পণ্ডিতমণ্ডলীকে কোন প্রধানকর্মে আমন্ত্রণ জানান না বলে এঁদের এক মানসিক পরিবর্তন হয়। এঁদের চিন্তাধারা তখন মোটামুটি এই : ‘আমাদের ধর্ম সত্য এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে আমরা ম্লেচ্ছ বা যবন কর্তৃক পরাজিত হলুম কেন? এর একমাত্র কারণ এই হতে পারে যে, আমরা আমাদের ধর্মের প্রকৃত রূপ বুঝতে পারিনি। ধর্মের অর্থকরণে (ইন্টারপ্রিটেশনে) নিশ্চয়ই আমাদের ভুল রয়ে গিয়েছে। আমরা তা হলে নূতন করে ব্যাখ্যা করে দেখি, ত্রুটি কোন্ স্থলে হয়েছে।’ ফলে পরাজয়ের পরবর্তী যুগে তাবত্ সৃষ্টশক্তি টীকাটিপ্পনী রচনায় ব্যয় হয়।]
[২ ইসলামের অন্যতম প্রখ্যাত পথপ্রদর্শক বা ইমাম। ইনি দার্শনিক-কিয়ত্কালের জন্য নাস্তিক- এবং পরিণত-বয়সে সূফী (মিস্টিক, ভক্তিমার্গ ও যোগের সমন্বয়কারী) হয়ে যান। এঁর জনপ্রিয় পুস্তক ‘কিমিয়া সাদত্’ এই শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলায় অনূদিত হয়ে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হয়। বিশ্বভারতীর সর্বপ্রথম অধ্যক্ষ স্বর্গত বিধুশেখর শাস্ত্রী এই পুস্তকের বড়ই অনুরাগী ছিলেন এবং আমাদের মন্দিরের উপাসনায় একাধিকবার ব্যবহার করেছেন। বিধুশেখর অত্যন্ত আচারনিষ্ঠ ‘টোলো পণ্ডিত’ ছিলেন। স্মরণ রাখবার সুবিধার জন্য উল্লেখযোগ্য-গজ্জালীর মৃত্যু ১১১১ খিস্টাব্দে।] 
সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী থেকে পুনর্মুদ্রিত

সূত্র : আমার দেশ

Saturday, December 18, 2010

বেঁচে থাকো সর্দিকাশি by সৈয়দ মুজতবা আলী

য়ঙ্কর সর্দি হয়েছে। নাক দিয়ে যা জল বেরম্নচ্ছে তা সামলানো রম্নমালের কর্ম নয়। ডবল সাইজ বিছানার চাদর নিয়ে আগুনের কাছে বসেছি। হাঁচছি আর নাক ঝাড়ছি, নাক ঝাড়ছি আর হাঁচছি। বিছানার চাদরের অর্ধেকখানা হয়ে এসেছে, এখন বেছে বেছে শুকনো জায়গা বের করতে হচ্ছে। শীতের দেশ, দোর জানালা বন্ধ, কিচ্ছু খোলার উপায় নেই। জানলা খুললে মনে হয় গৌরীশঙ্করের চূড়োটি যেন হিমালয় ত্যাগ করে আমার ঘরে নাক গলাবার তালে আছেন।

জানি, একই রম্নমালে বারবার নাক ঝাড়লে সর্দি বেড়েই চলে, কিন’ উপায় কি? দেশে হলে রকে বসে বাইরে গলা বাড়িয়ে দিয়ে সশব্দে নাক ঝাড়তুম, এ নোংরামির হাত থেকে রক্ষা তো পেতুমই, নাকটাও কাপড়ের ঘষায় ছড়ে যেতো না।
হঠাৎ মনে পড়ল পরশু দিন এক ডাক্তারের সঙ্গে অপেরাতে আলাপ হয়েছে। ডাকসাঁইটে ডাক্তার- ম্যুনিক শহরে নাম করতে পারাটা চাট্টিখানি কথা নয়। যদিও জানি ডাক্তার করবে কচু, কারণ জর্মন ভাষাতেই প্রবাদ আছে ওষুধ খেলে সর্দি সারে সাত দিনে, না খেলে এক সপ্তায়।
তবু গেলুম তাঁর বাড়ী। আমার চেহারা দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা কি। আমি শুধালাম, সর্দির ওষুধ আছে? আপনার প্রথম এবং খুব সম্ভব শেষ ভারতীয় রোগীর একটা ব্যবস্থা করে দিন। আমার এক নাক দিয়ে বেরম্নচ্ছে রাইন, অন্য নাক দিয়ে ওডার।
ডাক্তার যদিও জর্মন তবু হাত দু’খানি আকাশের দিকে তুলে ধরলেন ফরাসিস্‌ কায়দায়। বললেন, ‘অবাক করলেন, স্যার! সর্দির ওষুধ নেই? কত চান? সর্দির ওষুধ হয় হাজারো রকমের।’
বলে আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে খুললেন লাল কেল্লার সদর দরজা পরিমাণ এক আলমারি। চৌকো, গোল, কোমর-মোটা, পেট-ভারী বাহান্ন রকমের বোতল-শিশিতে ভর্তি। নানা রঙের লেবেল আর সেগুলোর উপর লেখা রয়েছে বিকট বিকট সব লাতিন নাম।
এবারে খানদানী ভিয়েনীজ কায়দায় কোমরে দু’ভাঁজ হয়ে বাও করে বাঁ হাতটা পেটের ওপর রেখে ডান হাত দিয়ে তলোয়ার চালানোর কায়দায় দেরাজের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি দেখিয়ে বললেন, ‘বেছে নিন, মহারাজ (কথাটা জর্মন ভাষায় চালু আছে) সব সর্দির দাওয়াই।’
আমি সন্দিগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে তাকালুম। ডাক্তার মুখব্যাদন করে পরিতোষের ঈষৎ হাস্য দিয়ে গালের দুটি টোল খোলতাই করে দিয়েছেন- হা’ টা লেগে দিয়েছে দু’কানের ডগায়।
একটা ওষুধের কটমটে লাতিন নাম অতি কষ্টে উচ্চারণ করে বললুম, ‘এর মানে তো জানিনে।’
সদয় হাসি হেসে বললেন, ‘আমিও জানিনে, তবে এটুকু জানি, ঠাকুরমা মার্কা কচু-ঘেঁচু মেশানো দিশী দাওয়াই মাত্রেরই লম্বা লম্বা লাতিন নাম হয়।’
আমি শুধালাম, ‘খেলে সর্দি সারে?’
বললেন, ‘গলায় একটু আরাম বোধ হয়, নাকের সুড়সুড়িটা হয়ত একটু আধটু কমে। আমি কখনো পরখ করে দেখিনি। সব পেটেন্ট ওষুধ-নমুনা হিসাবে বিনা পয়সায় পাওয়া। তবে সর্দি সারে না, এ কথা জানি।’
আমি শুধালুম, ‘তবে যে বললেন সর্দির ওষুধ আছে?’
বললেন, ‘এখনো বলছি আছে কিন্তু সর্দি সারে সে কথা বলিনি।’
বুঝলুম, জর্মনি কান্ট হেগেলের দেশ। বললুম, ‘অ’।
ফিসফিস করে ডাক্তার বললেন, ‘আরেকটা তত্ত্বকথা এই বেলা শিখে নিন। যে ব্যামোর দেখবেন সাতান্ন রকমের ওষুধ, বুঝে নেবেন, সে ব্যামো ওষুধে সারে না।’
ততক্ষণে আবার আমি হাঁচ্ছো হাঁচ্ছো আরম্ভ করে দিয়েছি। নাক-চোখ দিয়ে এবার রাইন-ওড়ার না এবারে পদ্মা-মেঘনা। ডাক্তার ডজন দুই কাগজের রম্নমাল আর একটা ওয়েস্ট-পেপার বাক্সেট আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
ধাক্‌কাটা সামলে ওঠে প্রাণভরে জর্মন সর্দিকে অভিসম্পাত দিলুম।
দেখি, ডাক্তার আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসছেন।
আমার মুখে হয়ত একটু বিরক্তি ফুটে উঠেছিল। বললেন, ‘সর্দি-কাশির গুণও আছে।’
আমি বললুম, ‘কচু, হাতী, ঘণ্টা!’
বললেন, ‘তর্জমা করে বলুন।’
আমি বললুম, ‘কচুর’ লাতিন নাম জানিনে; ‘হাতী’ হল ‘এলেফান্ট’ আর ‘ঘণ্টা’ মানে ‘গস্নকে’।
‘মানে! আর বুঝে দরকার নেই; এগুলো কটুবাক্য।’
আকাশ পানে হানি যুগলভুরম্ন বললেন, ‘অদ্ভুত ভাষা! হাতি আর ঘণ্টা গালাগালি হয় কি করে! একটা গল্প শুনবেন? সঙ্গে গরম ব্রান্ডি?’
আমি বললুম, ‘প্রথমটাই চলুক। মিক্‌স্‌ করা ভালো নয়।’
ডাক্তার বললেন, আমি ডাক্তারি শিখেছি বার্লিনে। বছর তিনেক প্র্যাকটিস করার পর একদিন গিয়েছি স্টেশনে, বন্ধুকে বিদেয় দিতে। ফেরার সময় স্টেশন-রেস্তোরাঁয় ঢুকেছি একটা ব্রান্ডি খাব বলে!
ঢুকেই থমকে দাঁড়ালুম। দেখি, এক কোণে এক অপরূপ সুন্দরী। অত্যন্ত সাদা সিদে বেশভূষা-গরীব বললেও চলে- আর তাই বোধ হয় সৌন্দর্যটা পেয়েছে তার চরম খোলতাই। নর্থসী দেখেছেন? তবে বুঝতেন হব-হব সন্ধ্যায় তার জল কি রকম নীল হয়-তারই মত সুন্দরীর চোখ। দক্ষিণ ইটালীতে কখনো গিয়েছেন? না? তবে বুঝতেন সেখানে সোনালি রোদে রূপালী প্রজাপতির কি রাগিণী। তাই মত তাঁর ব্লন্ড চুল। ডানয়ুব নদী দেখছেন? না? তা হলে আমার সব বর্ণনাই বৃথা।
আমি বললুম, ‘বলে যান, রসগ্রহণে আমার কণামাত্র অসুবিধে হচ্ছে না।’
‘না, থাক। ওরকম বেয়ারিং পোস্টের বর্ণনা দিতে আমার মন মানে না। আমরা ডাক্তার-বদ্যি মানুষ, ভাষা বাবদে মুখ্য-সুখ্যু। অনেক মেহনত করে যে একটি মাত্র বর্ণনা কব্জায় এনেছি সেইটেও যদি না বোঝেন তবে আমার শোকটা কোথায় রাখি বলুন তো।’
কাতর হয়ে বললুম, ‘নিরাশ করবেন না।’
‘তবে চলুক ত্রিলেগেড্‌ রেস। ডানয়ুব নদীর শান্ত-প্রশান্ত ভাবখানা তাঁর মুখের উপর। অথচ জানেন, ডানয়ুব অগভীর নদী নয়। আর ডানয়ুবের উৎপত্তিস’ল দেখেছেন। না। তাহলে বুঝতেন সেখানে তন্বঈ ডানয়ুব যে রকম লাজুক মেয়ের মত এঁকে বেঁকে আপন শরীর ঢাকতে ব্যস্ত, এ-মেয়ের মুখে তেমনি ছড়ানো রয়েছে লজ্জার কেমন যেন একটা আঁকুবাঁকু ভাব।
‘এই লজ্জা ভাবটার উপরই আমি বিশেষ করে জোর দিতে চাই। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, লজ্জা-শরম বলতে আমরা যা কিছু বুঝি সে সব মধ্যযুগের পুরম্ননো গল্প থেকে। বেয়াত্রিচে দানেত্মকে দেখে লাজুক হাসি হেসেছিলেন- আমরা তাই নিয়ে কল্পনার জাল বুনি। আজকের দিনে এসব তো আর বার্লিন শহরে পাওয়া যায় না। মধ্যযুগের নাইটদের শিভালরি গেছে আর যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে মেয়েদের মুখ থেকে সব লজ্জা সব ব্রীড়া।
‘কিন’ আপনাদের দেশে নিশ্চয়ই এখনো এই মধুর জিনিসটি দেখতে পাওয়া যায় আর তার চেয়েও নিশ্চয়, আপনাদের দেশের লোক এখানো অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে।
‘তাই আপনি বিশ্বাস করবেন, কিন’ আমি নিজে এখনো ঠিক করতে পারিনি, কি করে যে আমার তখন মনে হ’ল এ-মেয়েকে না পেলে আমার চলবে না।
‘হাসলেন না যে? তার থেকেই বুঝলুম, আপনি ওয়াকিবহাল, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পেরেছেন; কিন’ জর্মনরা আমার এ-অবস্থার কথা শুনে হাসে। আর হাসবেই বা না কেন? চেনা নেই, শোনা নেই, বিদ্যাবুদ্ধিতে মেয়েটা হয়ত অফিসবয়ের চেয়েও আকাট, হয়ত মাতালদের আড্ডায় বিয়ার বিক্রি করে পয়সা কামায়, কিম্বা এও তো হতে পারে যে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এ সব কোনো কিছুর তত্ত্ব-তাবাশ না করে এক ঝটকায় মনস্থির করে ফেলা, এ-মেয়ে না হলে আমার চলবে না! আমি কি খামখেয়ালির চেঙ্গিসখান, না হাজারো প্রেমের ডন্‌ জুয়ান্‌?
‘ভাবছি আর মাথার চুল ছিঁড়ছি-কোন্‌ অজুহাতে কোন্‌ অছিলায় এঁর সঙ্গে আলাপ করা যায়।
‘কিছুতেই কোনো হদিশ পাচ্ছিনে, আমাদের মাঝখানে তিনখানা মাত্র ছোট্ট টেবিলের যে উত্তাল সমুদ্র সেটা পেরিয়ে ওঁর কাছে পৌঁছই কি প্রকারে। প্রবাদ আছে, প্রেমে পড়লে বোকা নাকি বুদ্ধিমান হয়ে যায়- প্রিয়াকে পাওয়ার জন্য তখন তার ফন্দি-ফিকির আর আবিষ্কার কৌশল দেখে পাঁচজনের তাক লেগে যায়, আর বুদ্ধিমান নাকি প্রেমে পড়লে হয়ে যায় একদম গবেট-এমন সব কা- তখন করে বসে যে দশজন তাজ্জব না মেনে যায়না, এ লোকটা এ-সব পাগলামি করছে কি করে!
‘এ জীবনে সেই সেদিন আমি প্রথম আবিষ্কার করলুম যে আমি বুদ্ধিমান, কারণ পূর্ণ একঘণ্টা ধরে ভেবেও আমি সামান্যতম কৌশল আবিষ্কার করতে পারলুম না, আলাপ করি কোন্‌ কায়দায়। কিন’ এহেন হৃদয়াভিরাম তত্ত্ব আবিষ্কার করেও মন কিছুমাত্র উল্লাসিত হল না। তখন বরঞ্চ বোকা বনতে পারলেই হয়ত কোনো একটা কৌশল বেরিয়ে যেত।
‘ফ্রলাইন উঠে দাঁড়ালেন। কি আর করি। পিছু নিলুম। তিনি গিয়ে উঠলেন ম্যুনিকের গাড়িতে। আমিও ছুটে গিয়ে টিকিট কাটলুম ম্যুনিকের। কিন’ এসে দেখি সে কামরার আটটা সিটই ভর্তি হয়ে গিয়েছে। আরো প্রমাণ হয়ে গেল, আমি বুদ্ধিমান, কারণ এ কথা সবাই জানে, বুদ্ধিমানকে ভগবান সাহায্য করলে এ-পৃথিবীতে বোকাদের আর বাঁচতে হত না। আমি ভগবানের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পেলুম না।’
আমি বললুম, ‘ভগবানকে দোষ দিচ্ছেন কেন? এতো কন্দর্প ঠাকুরের ডিপার্টমেন্ট।’
বললেন, ‘তাতেই বা কি লাভ? তিনি তো অন্ধ। মেয়েটাকে বানিয়ে দিয়েছেন তাঁরই মত অন্ধ। এই যে আমি একটা এত বড় অ্যাপলো, আমার দিকে একবারের তরে ফিরেও তাকালো না। ওঁকে ডেকে হবে-’
আমি বললুম, ‘কচু’, ‘হাতী’, ‘ঘণ্টা’।
এবার ডাক্তার বাঙলা কটুকাটব্যের কদর বুঝলেন। বললেন, ‘আহা-হা-হা।’ তারপর জর্মন উচ্চারণে বললেন, ‘কশু, হাটি, গণ্টা! খাসা গালাগাল।’
আমি বললুম, কোমরাতে আটজনের সিট ছিল তো রয়েই গেল। প্রবাসে নিয়ম নাসিত্ম। আপনি কোনো গতিকে ধাক্‌কা ধাক্‌কি করে-’
বললেন, ‘তাজ্জব করলেন। একি আপনার ইন্ডিয়ান ট্রেন, না সাইবেরিয়াগামী প্রিজনার-ভ্যান! চেকার পত্রপাঠ কামরা থেকে বের করে দেবে না?’
‘দাঁড়িয়ে রইলুম বাইরের করিডরে ঠায়। দেখি মেয়েটি যদি খানাকামরায় যায়। স্টেশনে তো খেয়েছে শুধু কফি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটল, কত লোক কত কামরা থেকে উঠলো নামলো কিন’ আমার স্বর্গপুরী থেকে কোনো- (কটুবাক্য)- নামলো না। সব ব্যাটা নিশ্চয়ই যাচ্ছে ম্যুনিক। আর কোথাও যেতে পারে না? ম্যুনিক কি পরীস্থান না ম্যুনিকের ফুটপথ সোনা দিয়ে গড়া? অবাক করলে এই ইডিয়টগুলো।
‘প্রেমে পড়লে নাকি ক্ষুধাতৃষ্ণা লোপপায়। একবেলার জন্য হয়ত পায়। আমি লাঞ্চ খাইনি, ওদিকে ডিনারের সময় হয়ে গিয়েছে- আমার পেটের ভিতর হুলুধ্বনি জেগে উঠেছে। এমন সময় মা মেরির করম্নণা হল। মেয়েটি চলল খানা-কামরার দিকে। আমি চললুম ঠিক পিছনে পিছনে। আহা, যদি একটা হোঁচট খেয়ে আমার ওপর পড়ে যায়। দুত্তোর, তারও উপায় নেই- উঁচু হিলের জুতো হলে গাড়ির কাঁপুনিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে- এ পরেছে ক্রেপসোল্‌।
‘ঠিক পিছনে পিছনে গিয়ে খানা-কামরায় ঢুকলুম। ওয়েটারটা ভাবলে স্বামী-স্ত্রী। না হলে তরম্নণ তরম্নণী এ রকম মুখ গুমসো করে খানা-কামরায় ঢুকবে কেন? বসলো গিয়ে একই টেবিলে- মুখোমুখি। হে মা মেরী, নত্রদাম গির্জেয় তোমার জন্য আমি একশ’টা মোমবাতি মানত করলুম। দয়া করো, মা একটা কিছু ফিকির বাৎলাও আলাপ করবার।
‘বুদ্ধিমান, বুদ্ধিমান, কোনো সন্দেহ নেই আমি বুদ্ধিমান! কোনো ফিকিরই জুটলো না, অথচ মেয়েটি বসে আছে আমার থেকে দু’হাত দূরে এবং মুখোমুখি! দু’হাত না হয়ে দু’লক্ষ যোজনও হতে পারত- কোনো ফারাক হ’ত না।
‘জানালা দিয়ে এক ঝটকা কয়লার গুঁড়ো এসে টেবিলের উপর পড়ল। মেয়েটি ভুরম্ন কুচকে সেদিকে তাকাতেই আমি ঝটিতি জানালা বন্ধ করতে গিয়ে করে ফেললুম আরেক কান্ড। ঠাস করে জানালাটা বুড়ো আঙুলের উপর পড়ে সেটাকে দিল থেৎলে। ফিনকি দিয়ে রক্ত।
‘মা-মেরীর অসীম দয়া কান্ডটা যে ঘটলো। মেয়েটি তড়াক করে লাফ দিয়ে বসল, “দাঁড়ান আমি ব্যান্ডেজ নিয়ে আসছি।”
‘আমি নিজে ডাক্তার, বিবেচনা করম্নন অবস্থাটা। রম্নমাল দিয়ে চেপে ধরলুম আঙুলটাকে। মেয়েটি ছুটে নিয়ে এল কামরা থেকে ফার্স্ট এডের ব্যান্ডেজ। তারপর আঙুলটার তদারকি করল শাস্ত্রসম্মত ডাক্তারি পদ্ধতিতে। বুঝলুম মেডিকেল কলেজে পড়ে! ঝানু ডাক্তার ফার্স্ট এডের ব্যান্ডেজ বয়ে বেড়ায় না আর আনাড়ি লোক এরকম ব্যান্ডেজ বাঁধতে পারে না।
‘আমি তো, ‘না, না’ ‘আপনি কেন মিছে মিছে’, ‘ধন্যবাদ, ধন্যবাদ’, ‘উঃ, বড্ড লাগছে’, ‘এতেই হবে’, ‘ব্যস বাস’ করেই যাচ্ছি আর সেই লিলির মতো সাদা হাতের পরশ পাচ্ছি। সে কি রকম মখমলের হাত জানেন? বলছি, আপনি কখনো রাইল্যান্ডে গিয়েছেন? না? থাক, ভুলেই গিয়েছিলুম, প্রতিজ্ঞা করছি, আপনাকে কোনো বর্ণনা দেব না।
‘প্রথম পরশে সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে যায়, বলে না? বড় খাঁটি কথা। আমি ডাক্তার মানুষ, আমার হাতে কোনো প্রকারের স্পর্শ কাতরতা থাকার কথা নয় তবু আমার কী অবস্থাটা হয়েছিল আপনাকে সেটা বোঝাই কী করে? মেয়েটি বোধহয় টের পেয়েছিল, কারণ একবার চকিতের তরে ব্যান্ডেজ বাঁধা বন্ধ করে আমার দিকে মাথা তুলে তাকিয়েছিল।
তাতে ছিল বিস্ময়, প্রশ্ন এবং হয়ত বা একটুখানি, অতি সামান্য খুশীর ঝিলিমিলি। তবে কি আমার হাতের স্পর্শ-? কোন্‌ সাহসে এ বিশ্বাস মনের কোণে ঠাঁই দিই, বলুন।’
আমি গুন্‌ গুন্‌ করে বললুম,
“জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না,
হায় ভীরম্নপ্রেম হায় রে।”
ডাক্তার বললেন, ‘খোশা মেলডি তো। মানেটাও বলুন।’
বললুম, ‘আফ্‌টার ইউ। আপনি গল্পটা শেষ করম্নন।’
বললেন, ‘গল্প নয়, স্যার, জীবনমরণের কথা হচ্ছে।’
আমি শুধালুম, ‘কেন, সেপ্টিকের ভয় ছিল নাকি?’
রাগের ভাব করে বললেন, ‘ইয়োরোপে এসে আপনার কি সব রসকস শুকিয়ে গিয়েছে? আমাকে হেনেছে প্রেমের বাণ আর আপনি বলছেন আন্টিসেপ্টিক্‌ আন।’
আমি বললুম, ‘অপরাধ নেবেন না।’
বললেন, তারপর আমি সুযোগ পেয়ে আরম্ভ করলুম নানা রকমের কথা কইতে। গোল গোল। আমি যে পরিচয় করার জন্য জান কবুল সেটা ঢেকে চেপে। সঙ্গে সঙ্গে কখনো নূনটা এগিয়ে দি, কখনো ক্রুয়েটটা সরিয়ে নি, কখনো বা বলি, ‘মাছটা খাসা ভেজেছে, আপনি একটা খান না’; ওহে খানসামা, এদিকে-, ইত্যাদি।
‘করে করে সুন্দরীর মনটা একটু মোলায়েম করতে পেরেছি বলে মনে একটু ক্ষীণ আশার সঞ্চার হল।
মেয়েটি লাজুক বটে কিন্তু ভারী ভদ্র! আমার ভ্যাজর ভ্যাজর কান পেতে শুনলো, দু’একবার বস্নাশ্‌ করলো, সে যা গোলাপি- আপনি কখনো, না থাক।
‘কিন’ খেল মাত্র একটি অমলেট আর দু’স্লাইট রম্নটি। নিশ্চয়ই গরীব। ক্ষীণ আশাটার গায়ে একটু গত্তি লাগল।’ এমন সময় ডাক্তারের অ্যাসিস্টান্ট এসে জানলো রম্নগী এসেছে। ডাক্তার বললেন, ‘এখখুনি আসছি।’
ফিরে এসে কোনো ভূমিকা না দিয়েই বললেন, ‘ম্যুনিকে নাবলুম এক বস্ত্রে। এমন ভান করে কেটে পড়লুম যাতে মেয়েটি মনে করে আমি ভ্যান থেকে মাল নামাতে গেলুম। যখন ‘গুড্‌ বাই’ বলে হাত বাড়ালুম তখন সে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। প্রেমে পড়লে নাকি মানুষের পাখা গজায়- হবেও বা, কিন্তু এ কথা নিশ্চয় জানি মানুষ তখন চোখে মুখে এমন সব নতুন ভাষা পড়তে পারে যার জন্য কোনো শব্দরূপ মুখস্থ করতে হয় না। তবে সে পড়াতে ভুল থাকে বিস্তর, কাকতলীয় এনত্মার।
“আমি দেখলুম লেখা রয়েছে ‘বিষাদ’ কিন্তু পড়লুম, ‘এই কি শেষ?”
আমিও অবাক হয়ে শুধালুম, ‘বার্লিন থেকে ম্যুনিক অবধি হামলা করে স্টেশনে খেই ছেড়ে দিলেন?’
ডাক্তারদের বাঁকা হাসি হেসে বললেন, আদপেই না। কিন্তু কি আর দরকার পিছু নিয়ে? মেডিকেল কলেজে পড়ে, ওতেই ব্যস্‌।
সেদিনই গেলুম মেডিকেল কলেজের রেস্তোরাঁয়। লাঞ্চ খেতে নিশ্চয়ই আসবে। এবারে মেয়েটি আর লজ্জা দিয়ে মনের ভাবঢাকতে পারল না। আমাকে দেখা মাত্র আপন অজানাতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালো, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মুখে যে খুশি ছড়িয়ে পড়ল তা দেখে আমার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না, ভগবান মাঝে মাঝে বুদ্ধিমানকেও সাহায্য করেন।
‘ততক্ষণে মেয়েটি তার আপন-হারা আচরণটাকে সামলে নিয়েছে- লজ্জা এসে আবার সমস্ত মুখ ঢেকে ফেলেছে।’
ডাক্তার খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, এখানেই যদি শেষ করা যেত তবে মন্দ হত না কিন্তু সর্দি-কাশির তো তা হলে কোনো হিল্লে হয় না। তাই কমিয়েসমিয়ে তাড়াতাড়ি শেষ করে দি।’
আমি বললুম, ‘কমাবেন না! তালটা একটু দ্রম্নত করে দিন। আমাদের দেশের ওস্তাদরা প্রথম খানিকটে গান করেন বিলম্বিত একতালে, শেষ করেন দ্রম্নত তালে।’
ডাক্তার বললেন, ‘দুঃখিনী মেয়ে, বাপ-মা নেই! এক খান্ডার পিসির বাড়ীতে মানুষ হয়েছে। দু’মুঠো খেতে দেয় পরতে দেয়, ব্যস্‌। কলেজের ফিজটি পর্যন্ত বেচারী যোগাড় করে মাস্টারি করে।
‘তাতে আমার কিছু বলার নেই। কিন’ আমার ঘোরতর আপত্তি এভাবে বুড়ী এমনি নজরবন্দী করে রেখেছে যে, চকিতা হরিণীর মত সমস্তক্ষণ সে ডাইনে বাঁয়ে তাকায়, ঐ বুঝি পিসি দেখে ফেললে, সে পরপুরম্নষের সঙ্গে কথা কইছে। আমি তো বিদ্রোহ করে বললুম, ‘একি বুখারার হারেম, না তুর্কী পাশার জেনানা? এ অত্যাচার আমি কিছুতেই সইব না।’ এভা শুধু আমার হাত ধরে বলে, ‘পস্নীজ, প্লীজ, তুমি একটু বরদাস্ত করে নাও, আমি তোমাকে হারাতে চাইনে।’ এর বেশী সে কক্‌খনো কিছু বলেনি।
এই মোকামে পৌঁছতে আমার লেগেছিল ঝাড়া একটি মাস। বিবেচনা করম্নন। সাত দিন লেগেছিল প্রেম নিবেদন করতে। পনেরো দিন লেগেছিল হাতখানি ছুঁতে। তারো এক সপ্তাহ পরে সে আমায় বললে কেন সে এমন ভয়ে ভয়ে ডাইনে বাঁয়ে তাকায়।
‘থিয়েটার সিনেমা মাথায় থাকুক, আমার সঙ্গে রাস্তায় পর্যন্ত বেরতে রাজী হয় না- পাছে পিসি দেখে ফেলে। আমি একদিন থাকতে না পেরে বললুম তোমার পিসির কুইনটুপ্লেট আছে নাকি যে তারা ম্যুনিকের সব স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে তোমার উপর নজর রাখছে? উত্তরে শুধু কাতর স্বরে বলে, প্লীজ, প্লীজ।’
যা-কিছু আলাপ পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা আত্মীয়তা সব ঐ কলেজ রেস্তোরাঁয় বসে। সেখানে সার্ডিন-টিনের ভিতর মাছের মত। চেয়ারে চেয়ারে ঠাসাঠাসি কিন’ তার হাতে যে হাতখানা রাখব তারও উপায় নেই। কেউ যদি দেখে ফেলে।’ আমি বললুম,
‘সমুখে রয়েছে সুধা পারাবার
নাগাল না পায় তবু আঁখি তার
কেমনে সরাব কুহেলিকার এই বাধা রে।’
ডাক্তার বললেন, ‘মানে বলুন।’
আমি বললুম, ‘আপ যাইয়ে, পরে বলবো।’
ডাক্তার বললেন, ‘সেই ভিড়ের মাঝখানে, কিম্বা করিডরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলাপচারি। করিডরে কথা কওয়া যায় প্রাণ খুলে, কিন’ তবু আমি রেস্তোরাঁর ভিড়ই পছন্দ করতুম বেশী, কারণ সেখানে দৈবাৎ, ক্বচিৎ কখনো এভা তার ছোট্ট জুতোটি দিয়ে আমার পায়ের উপর দিত চাপ।’
‘তার মাধুর্য আপনাকে কি করে বোঝাই? এভাকে পরে নিবিড়তর করে চিনেছি কিন’ সেই পায়ের চাপ যে আমাকে কত কথা বলেছে, কত আশ্বাস দিয়েছে সেটা কি করে বোঝাই?’
‘হয়ত তার চেনা কোনো এক ছোকরা স্টুডেন্ট এসে হাসিমুখে তাকে দুটি কথা বললে। অত্যন্ত হার্মলেস আমি কিন’ হিংসেয় জরজর। টেবিলের উপর রাখা আমার হাত দুটো কাঁপতে আরম্ভ করছে, আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছিনে-
‘এমন সময় সেই পায়ের মৃদু চাপ।
সব সংশয়ের অবসান, সব দুঃখ অন্তর্ধান।’
ডাক্তার বললেন, ‘তাই আমার দুঃখ আর বেদনার অবধি রইল না। এই বিরাট ম্যুনিক শহরের লক্ষ লক্ষ নরনারী নিভৃতে মনের ভার নামাচ্ছে, নিষ্ঠুর সংসারে লড়বার শক্তি একে অন্যের সঙ্গসুখ স্পর্শসুখ থেকে আহরণ করে নিচ্ছে, আর আমি তারই মাঝখানে এমন কিছুই করে উঠতে পারছিনে যাতে করে এভাকে অন্তত একবারের মত কাছে টেনে আনতে পারি!
‘শেষটায় আর সইতে না পেরে একদিন এভাকে কিছু না বলে ফিরে গেলুম বার্লিন। সেখান থেকে লিখে জানলুম, ‘ওরকম কাছে থেকে না পাওয়ার দুঃখ আমার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে- আমার নার্ভস একদম গেছে। তোমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা আমার কিছুতেই হয়ে উঠত না- তোমার মুখের কাতর ছবি আমার চলে আসার সব শক্তি নষ্ট করে ফেলত।’
আমি বললুম, ‘আপনি তো দারম্নণ লোক মশাই। তবে, হ্যাঁ, আপনাদের নীচশেই বলেছেন, কড়া না হলে প্রেম মেলে না।’
ডাক্তার বললেন, ‘ঠিক উল্টো! কড়া হতে পারলে আমি ম্যুনিক থেকে পালাতুম না। পলায়ন জিনিসটা কি বীরের লক্ষণ? তা সে কথা থাক।
‘উত্তর পেলুম সঙ্গে সঙ্গেই। সে চিঠিটি আমি এতবার পড়েছি যে তার ফুলস্টপ কমা পর্যন্ত আমার মুখসত্ম হয়ে গিয়েছে। এবং তার চেয়েও বড় কথা, সে চিঠিটির বক্তব্য আমার কাছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ঠেকলো।’
আপনাদের দেশে অবিশ্বাস্য বলে কোনো জিনিস নেই- ভিখিরিকে মাথায় তুলে নিয়ে আপনাদের দেশে হাতী হামেশাই রাজা বানায়। কিন’ জর্মনিতে তো সে রকম ঐতিহ্য নেই। চিঠিতে লেখা ছিল-
বেশী লিখব না- আমারও অসহ্য হয়ে উঠেছে। তাই স্থির করেছি, তোমার ইচ্ছামত তোমায় আমায় একবার নিভৃতে দেখা হবে। তারপর বিদায়। যত দিন পিসি আছেন ততদিন আমি আর কোনো পন্থা খুঁজে পাচ্ছিনে। তুমি আসছে বুধবার দিন আমাদের বাড়ীর সামনে ফুটপাতে অপেক্ষা করো। আমি তোমাকে আমার ঘরে নিয়ে আসব।”
ডাক্তার বললেন, ‘বিশ্বাস হয় আপনার! যে মেয়ে পিসির ভয়ে আমার সঙ্গে কলেজ রেসেত্মারাঁয় বাইরে পর্যন্ত যেতে রাজী হত না, সে আমাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে আপন ঘরে?’
আমি বললুম, পীরিতী-সায়রে ডোবার পূর্বে যে রাধা সাপের ছবিমাত্র দেখেই অজ্ঞান হতেন সেই রাধাই অভিসারে যাওয়ার সময় আপন হাত দিয়ে পথের পাশের সাপের ফণা চেপে ধরেছেন পাছে সাপের মাথার মণির আলোকে কেউ কেউ তাঁকে দেখে ফেলে।’
ডাক্তার বললেন, ‘তাই বটে। তবে কি না আমি রাধার প্রেমকাহিনী কখনো পড়িনি। সে কথা থাক।
‘আমি ম্যুনিকে পৌঁছলুম বুধবার সন্ধ্যের দিকে। কয়লার গুঁড়োয় সর্বাঙ্গ ঢেকে গিয়েছিল বলে ঢুকলুম একটা পাবলিক বাথে স্নান করতে। টাবে বসে সর্বশরীর ডলাই-মলাই করে আর গরম জলে সেদ্ধ হয়ে চিংরিটার মত লাল হয়ে যখন বেরলুম তখন আর হাতে বেশী সময় নেই। অথচ টাব থেকে ওরকম হুট করে ঠান্ডায় বেরলে যে সঙ্গে সঙ্গে ঝপ্‌ করে সর্দি হয় সে কথাও জানি। চানটা না করলেও যে হত সে তত্ত্বটা বুঝতে পারলুম রাসত্মায় বেরিয়ে কিন’ তখন আর আফসোস করে কোনো ফায়দা নেই। সেই ডিসেম্বরের শীতে চললুম এভার বাড়ির দিকে- মা-মেরীর উপর ভরসা করে, যে এ যাত্রায় সর্দিটা নাও হতে পারে।
আমি বললুম, ‘আমরা বাঙলায় বলি, ‘দুর্গগা বলে ঝুলে পড়লুম’।’
ডাক্তার বললেন, ‘সাড়ে এগারোটার সময় গিয়ে দাঁড়ালুম এবার বাড়ির সামনের রাসত্মায়। টেম্পারেচার তখন শূন্যেরও নীচে- আপনাদের পাগলা ফারন্‌হাইটের হিসেবে বত্রিশের ঢের নীচে! রাস্তায় এক ফুট বরফ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, আর আমার চতুর্দিকে যে হিম ঘনাতে লাগলো তার সঙ্গে তুলনা দিয়ে বলতে পারি আমাকে যেন কেউ একটা বিরাট ফ্রিজিডেরের ভিতর তালাবন্ধ করে রেখে দিল।
তিন মিনিট যেতে না যেতে নামল মুষলধারে…বৃষ্টি নয়-সর্দ্দি। সঙ্গে সঙ্গে ডাইনামাইট ফাটার হাঁচি-হাঁচ্চো, হাঁচ্চো, হাঁচ্চো। আপনার আজকের সর্দি তার তুলনায় নস্যি, অর্থাৎ নস্যির খোঁচায় নামানো আড়াই ফোঁটা জল। হাঁচি আর জল, জল আর হাঁচি।
‘কি করি, কি করি ভাবছি, এমন সময় এভা এসে নিঃশব্দে আমার হাত ধরলো- বরফের গুঁড়োর উপর পায়ের শব্দ শোনা যায় না। তার উপর সে পরেছে সেই ক্রেপসোলের জুতো- বেচারীর মাত্র ঐ এক জোড়াই সম্বল!
‘কোনো কথা না বলে আমাকে নিয়ে চলল তার সঙ্গে। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে, করিডরের খানিকটে পেরিয়েই তার কামরা। নিঃশব্দে আমাকে সে ঢুকিয়ে দরজায় খিল দিয়ে মাথা নিচু করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
‘ওভার গোলাপি মুখ ডাচ্‌ পনিরের মত হলদে, টুকটুকে লাল ঠোঁট দুটি বলু ডানয়ুবের মত ঘন বেগুনি- নীল- ভয়ে, উত্তেজনায়।
‘আর সঙ্গে সঙ্গে শুরম্ন হল আবার আমার সেই ডাইনামাইট ফাটানো হ্যাঁচ্চো, হাঁচ্চো।
‘এভা আমাকে ধরে নিয়ে আমার মাথা গুঁজে দিল বিছানায়। মাথার উপর চাপালো বালিশ আর সব ক’খানা লেপ-কম্বল। বুঝতে পারলুম কেন, পাশের ঘরে পিসি যদি শুনতে পান তবেই হয়েছে। আমি প্রাণপণ হাঁচি চাপাবার চেষ্টা করছি আর লেপ-কম্বলের ভিতর বম্‌-শেল্‌ ফাটাচ্ছি।
‘কতক্ষণ এ রকম কেটেছিল বলতে পারব না। হাঁচির শব্দ কিছুতেই থামছে না। এভা শুধু কম্বল চাপাচ্ছে, আমার দম বন্ধ হবার উপক্রম কিন’ নিবিড় পুলকে বার বার আমার সর্বশরীর শিহরিত হচ্ছে- এভার হাতের চাপ পেয়ে।
‘এমন সময় দরজায় ধাক্কা আর নারীকণ্ঠের তীব্র চীৎকার, ‘দরজা খোল।’
‘পিসি!’
‘আর লুকিয়ে থেকে লাভ নেই। আমি লেপের ভিতর থেকে বেরলুম। এভা ভয়ে ভিরমি গিয়েছে, খাটের উপর নেতিয়ে পড়েছে।
‘আমি দরজা খুলে দিলুম। সাক্ষাৎ শকুনির মত বীভৎস এক বুড়ী ঘরে ঢুকে আমার দিকে না তাকিয়েই এভাকে বললো, ‘কাল সকালেই তুই এ-বাড়ি ছাড়বি’।
‘সঙ্গে সঙ্গে আর কি সব বকুনি দিয়েছিল, ঘেন্না, কেলেঙ্কারি, শোবার ঘরে পরপুরম্নষ’, ‘রাসত্মার মেয়ের ব্যাভার’, এই সব, সে আমার আর মনে নেই। বুড়ী আমার দিকে তাকায় না, গালের উপর গাল চড়ছে যেন ছ’ গজি পিয়ানোর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি কেউ আঙ্গুল চালাচ্ছে। ‘আমি থাকতে পারলুম না। বুড়ীর দুই বাহু দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে বললুম, ‘আমার নাম পেটার সেল্‌বাখ। বার্লিনে ডাক্তারি করি। ভদ্রঘরের ছেলে। আপনার ভাইঝিকে বিয়ে করতে চাই’।’
ডাক্তার বললেন, মামেরী সাক্ষী আমি এভাকে বিয়ে করার প্রসত্মাব এতদিন করিনি পাছে সে ‘না’ বলে বসে। আমি অপেক্ষা করেছিলুম পরিচয়টা ঘনাবার জন্য। বিয়ের প্রসত্মাবটা আমার মুখ দিয়ে যে তখন কি করে বেরিয়ে গেল আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি।
‘পিসি আমার দিকে হাবার মতো তাকালো- এক বিঘৎ চওড়া হা করে। পাকা দু’মিনিট তার লেগেছিল ব্যাপারটা বুঝতে। তারপর ফুটে উঠল মুখের উপর খুশীর পয়লা ঝলক। সেটা দেখতে আরো বীভৎস! মুখের কুঁচকানো এবড়ো থেবড়ো গাল, ভাঙা-চোরা-নাক-মুখ-ঠোঁট যেন আরও বিকৃত হয়ে গেল।
‘আমাকে জড়িয়ে ধরে কি যেন বললে ঠিক বুঝতে পারলুম না। তারপর হঠাৎ আমাকে ছেড়ে দিয়ে ছুটল করিডরের দিকে। চীৎকার করে কাকে যেন ডাকছে।
‘এভা তখনো অচৈতন্য।’
‘বুড়ী ফিরে এল বুড়োকে নিয়ে। বুড়ো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে চট করে। তার চেহারাটা খুশীর পিছনে দেখলুম সেই ভীত ভাব-এভার মুখে যেটা অষ্টপ্রহর লেপা থাকে। বুঝলুম, পিসির দাপটে এ বাড়ির সকলেরই কণ্ঠশ্বাস।
‘মনে হল বুড়ো খুশী হয়েছে, এভা যে এ বাড়ির অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে তার জন্য। হায়, তার তো নিষ্কৃতি নেই।’
ডাক্তার বললেন, ‘সেই দুপুর রাতে ওয়াইন এল, শ্যাম্পেন এল। হোটেল থেকে সসেজ্‌ কট্‌লেট্‌ এল। হৈ হৈ রৈ রৈ। এভা সম্বিতে ফিরেছে। বুড়ো শ্যাম্পেন টানছে জলের মতো। বুড়ী এক গেলাসেই টং। আমাকে জড়িয়ে শুধু কাঁদে আর এভার বাপের কথা স্মরণ করে বলে, ভাই বেঁচে থাকলে আজ সে কী খুশীটাই না হত।
‘আর এভা? আমাকে একবার শুধু কানে কানে বলল, ‘জীবনে এই প্রথম শ্যাম্পেন খাচ্ছি। তুমি আমার উপর একটু নজর রেখো।’
ডাক্তার উৎসাহিত হয়ে আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় আস্তে আস্তে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন এক সুন্দরী- হাঁ, সুন্দরী বটে।
এক লহমায় আমি নর্থ সীর ঘন নীল জল, দক্ষিণ ইটালির সোনালি রোদে রূপালি প্রজাপতি, ডানয়ুবের শান্ত-প্রশান্ত ছবি, সেই ডানয়ুবেরই লজ্জাশীল দেহচ্ছন্দ রাইল্যান্ডের শ্যামলিয়া মোহনীয়া ইন্দ্রজাল সব কিছুই দেখতে পেলুম। আর সে কী লাজুক হাসি হেসে আমার দিকে তিনি হাত বাড়ালেন।
আমি মাথা নীচু করে ফরাসিস কায়দায় তাঁর চম্পক করাঙ্গুলি-প্রান্তে ওষ্ঠ স্পর্শ করে মনে মনে বললুম,
‘বেঁচে থাকো সর্দি-কাশি
চিরজীবী হয়ে তুমি।’

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ