প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label গদ্যকার্টূন. Show all posts
Showing posts with label গদ্যকার্টূন. Show all posts

Thursday, April 7, 2011

 গদ্যকার্টুন : প্রিয় পাঠক, একটু হাসুন ।। আনিসুর রহমান

একজন অন্ধ বালক। নিউইয়র্কের একটা রাস্তার ধারে একটা সুন্দর ভবনের বাইরের সিঁড়িতে রোদের মধ্যে বসে আছে। তার হাতে তার হ্যাটটা উল্টো করে ধরা। তার আরেক হাতে একটা শক্ত কাগজের টুকরায় লেখা, ‘আমি অন্ধ, আমাকে সাহায্য করুন, প্লিজ।’ তার টুপিতে অল্প কয়টা পয়সা পড়েছে। লোকজন আসছে, যাচ্ছে। বেশির ভাগই তাকে সাহায্য না করেই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। একজন লোক কিন্তু ছেলেটার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি পকেট থেকে খুচরা পয়সা বের করে ছেলেটার টুপিতে রাখলেন। দেখলেন, ছেলেটা খুব কম পয়সাই এ পর্যন্ত অর্জন করতে পেরেছে।
তিনি ছেলেটার হাতের কার্ডটার দিকে তাকালেন। দেখলেন লেখা, ‘আমি অন্ধ, আমাকে সাহায্য করুন, প্লিজ।’ তিনি তখন ওই কাগজটা ছেলেটার হাত থেকে নিলেন। কাগজের উল্টো পিঠে তিনি নতুন দুটো বাক্য লিখলেন। তারপর ছেলেটার হাতে সেই কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেটা লক্ষ করল, এরপর দ্রুত তার টুপিতে টাকা-পয়সা পড়ছে। খুব শিগগির ছেলেটার টুপি ভরে গেল। বিকেলবেলা। অন্ধ ছেলেটা টের পেল, সেই লোকটার পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, যে কিনা তার সাইনবোর্ডটার কথা বদলে দিয়েছিল। সেই ভদ্রলোকও তার ওই কীর্তির ফলটা কী দাঁড়াল, তা দেখতে এসেছেন। এসে দেখলেন, হ্যাঁ, তার নতুন বাণীতে কাজ হয়েছে। ছেলেটার টুপি টাকায় গেছে ভরে। অন্ধ ছেলেটা বলল, ‘আপনি কি সেই ভদ্রলোক, যিনি আমার হাতের কার্ডের লেখা বদলে দিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ। আমি সেই লোক।’
‘আচ্ছা, আপনি কী করলেন যে আমার টুপি ভরে উঠল?’
‘আমি কিছুই করিনি। শুধু সত্যটা প্রকাশ করেছি।’
‘মানে কী?’
‘মানে কিছুই না। তোমার কার্ডে যা লেখা ছিল, সেটাই আমি একটু অন্যভাবে প্রকাশ করেছিলাম। আমি লিখেছিলাম, ‘আজকের দিনটা খুব সুন্দর। কিন্তু আমি তা দেখতে পাচ্ছি না।’
‘তাতেই এত পয়সা এল?’ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেটা বিস্মিত!
‘হ্যাঁ। তোমার কথাটা ছিল, তুমি অন্ধ। আমিও তা-ই লিখেছি। কিন্তু অন্য রকম করে। আমি লিখেছি যে আজকের দিনটা সুন্দর, কিন্তু তুমি তা দেখতে পাচ্ছ না। এতে নতুন কী যুক্ত হলো? এক. আমরা ব্যাপারটা শুরু করলাম ইতিবাচকভাবে। আজকের দিনটা সুন্দর, এই সুন্দর কথাটা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করছি, যাঁরা জানছেন, তাঁদেরও মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। তারপরের কথাটা তোমারই কথা যে তুমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তুমি এটা দেখতে পাচ্ছ না। তাতে যাঁরা এটা পড়ছেন, তাঁরা বুঝতে পারলেন, তাঁরা কত সৌভাগ্যবান। আমাদের প্রত্যেকেরই নিশ্চয়ই এক শ কারণ আছে মন ভার করে থাকার। কিন্তু ভেবে দেখো, এক হাজারটা কারণ আমাদের প্রত্যেকের আছে, মনটা ভালো রাখার। আমরা প্রত্যেকেই কত সৌভাগ্যবান। শোনো, অতীতের দিকে তাকাবে, কোনো দুঃখবোধ ছাড়াই। বর্তমানকে গ্রহণ করবে সাহসিকতার সঙ্গে। ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হবে আত্মবিশ্বাস নিয়ে।’
ইন্টারনেটের এই গল্পটার শেষে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো, কাউকে হাসতে দেখা। তার চেয়েও ভালো লাগবে, যদি আমি জানতে পারি, আমার কারণেই একজনের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
আসলেই তো, অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারার চেয়ে সুখকর কাজ আর কী আছে! আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে আমরা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে পারি, আবার ইতিবাচক দৃষ্টিতেও দেখতে পারি। ইতিবাচকভাবে দেখাই ভালো।
তবে, বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ও রাজনীতিতে যা ঘটছে, তার মধ্যে থেকে ইতিবাচক উপাদান বের করে মুখটাকে হাসি হাসি করে রাখা সত্যি কঠিন। জাতীয় সংসদে মাননীয় সংসদ সদস্যরা যে ভাষায় পরস্পরকে আক্রমণ করছেন, তা নিয়ে স্বয়ং স্পিকার চিন্তিত। সংসদের বাইরেও পরস্পরবিরোধী নেতারা যে ভাষায় পরস্পরকে আক্রমণ করে চলেছেন, তাতে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
‘অতিরিক্ত কথা এবং কাজ বিপদ ডাকিয়া আনে’—রংপুর জিলা স্কুলে আজহার স্যার কোনো ছাত্রকে দুষ্টুমি বা বকাবাজি করতে দেখলে দুই হাত দিয়ে একই সঙ্গে তার দুই গালে দুটো চড় বসিয়ে দিয়ে এই উপদেশ দান করতেন। তাঁর এই উপদেশ ভোলা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আজহার স্যার বলতেন, নীরবতা হীরণ্ময়। আমাদের মুখ একটা, কান দুটো, আমাদের কথা বলা উচিত কম, শোনা উচিত বেশি বেশি। অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করা যায় না। অন্যকে বড় করতে পারলে, বড়কে সম্মান করতে পারলে, প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মানশীল হতে পারলে নিজেরই সম্মান বাড়ে। কাকের কর্কশ স্বর বিষ লাগে কানে, কোকিল অখিল প্রিয় সুমধুর গানে।
বলছিলাম, মানুষের মুখে হাসি ফোটানো হলো মহত্তম কর্ম। আমার উচিত এখন একটা কৌতুক বলে আপনার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা। চড় নিয়েই বলি। দুজন লোক রাস্তা খুঁড়ছে আর তাদের সর্দার গাছের নিচে বসে আছে। একজন পথিক শ্রমিক দুজনকে বলল, ‘তোমরা কষ্ট করে কাজ করছ, আর ও গাছের নিচে আরাম করছে, কারণ কী।’
একজন শ্রমিক বলল, ‘জানি না। আচ্ছা, সরদারকে জিজ্ঞেস করে আসি।’ সে সরদারের কাছে গিয়ে বলল, ‘সরদার, আমরা কাজ করছি আর আপনি বসে আছেন। কারণ কী।’ সরদার বলল, ‘কারণ বুদ্ধি। আমার বুদ্ধি আছে, তোমাদের নাই।’
‘কী রকম?’
‘আচ্ছা, আমি এই গাছে হাত রাখছি। তুমি গায়ের জোরে আমার হাতে চড় মারো।’ শ্রমিকটি চড় মারার আগেই সরদার হাত সরিয়ে নিল। ব্যথাক্লিষ্ট শ্রমিক ফিরে গিয়ে পথিককে বলল, ‘সরদার আরাম করছেন, কারণটা হলো বুদ্ধি।’
পথিক বিস্মিত। ‘কী রকম?’
শ্রমিকটি বলল, ‘আমি আমার মুখে হাত রাখছি। আপনি এখন গায়ের জোরে আমার হাতে একটা চড় বসান।’
আমরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য পাথরের ওপরে হাত রেখে বলতে পারি, গায়ের জোরে চড় মারো। কিন্তু মাথায় যথেষ্ট বুদ্ধি না থাকলে কিন্তু আমরা নিজেদের নাকে হাত রেখে বলে ফেলতে পারি, গায়ের জোরে ঘুষি মারেন।
শাসকদের বুদ্ধিমান হতে হয়। প্রেসিডেন্ট বুশ যখন ব্রিটেনে যান, তখন রানিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা দেশ চালান কীভাবে?’ রানি উত্তর দেন, ‘বুদ্ধি দিয়ে।’ ‘কী রকম?’ রানি টনি ব্লেয়ারকে ডেকে বলেন, ‘আচ্ছা টনি, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার মায়ের ছেলে, সে তোমার বাবার ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নাই, লোকটা কে?’ টনি উত্তর দেন, ‘আমি।’ রানি বলেন, ‘দেখলা বুশ, টনির কী রকম বুদ্ধি। ও বুদ্ধি দিয়েই দেশ চালায়।’
বুশ দেশে ফিরে গিয়ে মন্ত্রীদের ডেকে বলেন, ‘বলো, একটা লোক, সে তোমার মায়ের ছেলে, সে তোমার বাবার ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নাই, লোকটা কে?’ কেউ উত্তর দিতে পারেন না। তখন কলিন পাওয়েল সেখানে আসেন। বুশ তাঁকে একই প্রশ্ন করেন। ‘একটা লোক, সে তোমার মায়ের ছেলে, সে তোমার বাবার ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নাই, লোকটা কে?’ কলিন পাওয়েল বলেন, ‘আমি’।
বুশ বলেন, ‘হয় নাই। সঠিক উত্তর হবে, টনি ব্লেয়ার।’
শাসকদের মাথায় বুদ্ধি থাকতে হয়! আর, বুদ্ধিমানেরা কথা বলেন কম!
প্রিয় পাঠক, একটু হাসুন। আজ একটা সুন্দর দিন। আর আমাদের দেশেও বহু কিছু আছে ইতিবাচক, যেসবের কথা ভেবে আমরা একটা দিন সুন্দরভাবে শুরু করতে পারি। যেমন ধরুন, আমরা বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আটটা খেলা আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পেরেছি। এই আয়োজন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। সেটাই বা কম কী!
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

সূত্র : প্রথম আলো...

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ