প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label জীবনানন্দ দাশ. Show all posts
Showing posts with label জীবনানন্দ দাশ. Show all posts

Tuesday, October 25, 2011

কবিতা নিয়ে || জীবনানন্দ দাশ

তোমার সঙ্গে যখন কথা বলবে হাত ছুঁড়ে, মাথা ঘুরিয়ে, চোখ-দু’টোকে কপাল ভেদ করে আকাশের দিকে চিলের মতো উড়িয়ে দিয়ে কঠিন ধাতুর গায়ে কঠিন ধাতুর নিক্ষেপের মতো হাসি ও আওয়াজের সৃষ্টি করে, বাঘের মতন থাবায় টেবিলটাকে একবার আক্রমণ করে এক-একটা বইর টুঁটি ধরে সেটাকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে নলিনাক্ষ একখণ্ড বৈশাখের সমুদ্রের মতো রক্তের অকুতোভয় পরস্ফুিরণ নিয়ে তোমার ঘরের ভেতর বর্তমান থাকবে। আমি একটু নির্জন ধরনের মানুষ, দরজায় নলিনাক্ষর ছায়া দেখলে আমার সুবিধার মনে হয় না।
পাঁচ হাত লম্বা মানুষ, অশ্বত্থের মতো কঠিন মাংস দিয়ে সে তার শরীরের প্রসার তৈরি করেছে যেন। মাথায় ফলন্ত চুলের অবিরাম আনন্দ পৃথিবীর ঘাস পাতা ও পাখির কথা মনে করিয়ে দেয়। থুতনিতে তিন ইঞ্চি মাফিক দাড়ি রেখেছে সে, সেটুকুও পৃথিবীর ঘাস, পাতা, পাখির পালকের মতো নিঃসঙ্কোচ প্রাণের আস্বাদ নিয়ে জন্মেছে, কিন্তু তবুও এই চুল ও দাড়িকে নলিনাক্ষ অরণ্যের মতো বাড়তে দেয়নি; কেটে-ছেঁটে শৌখিন করে সাজিয়ে রেখেছে। রক্তের অদ্ভুত পরিস্পন্দনও চিত্কার সত্ত্বেও নলিনাক্ষ আমার মতন মানুষ পর্যন্ত নয়, সে নিতান্ত সাধারণের মতোই। জীবনের কাঁটা তার ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায়ই হাজির হয়। কখনও ভুল করে না, অনাবশ্যক অবান্তর প্রসঙ্গ [...] না তার। মানুষের জীবন কি এবং কি নয় তা সে বুঝছে, মাঠের ঘাস নিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে সে কোনোদিন বসে থাকেনি।
নলিনাক্ষর উদ্যোগে একটি সাঁতার সমিতি তৈরি হয়েছে। সে তার সম্পাদক, নিজে একজন ভালো ক্রিকেট খেলোয়াড় না হলেও ক্রিকেট ক্লাবের সে একজন বড় মাতব্বর। ফুটবল খেলার সময় তাকে অনেকদিন রেফারি হয়ে কাজ করতে হয়। ফুটবল সিজনে নলিনাক্ষ একটা স্তম্ভের মতো। সে না থাকলে কি যে হতো, এ জীবনে কোনোদিন ফুটবল গ্রাউন্ডে না গিয়েও আমার ঘরে বসেই আমি তা ভেবে ঠিক করতে পারি না। ডিস্ট্রিক্ট অফিসের প্রিয়পাত্র সে, [...] বাংলাতে গিয়ে মাঝে মাঝে বিকেলবেলা চা খায়, অফিসারদের ক্লাবে গিয়ে ব্রিজ খেলে সন্ধ্যার সময়। ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি রয়েছে। কয়েকটা চমত্কার স্যুট আছে তার, পরার কায়দা সাহেবদের মতো। বাংলা কবিতা গল্প কোনোদিন পড়ে না সে, এজন্য মনে মনে আমি তাকে গভীর প্রশংসা করি। বাংলাদেশে সাহিত্য বলে কোনো জিনিস আছে তাও সে জানে না, ইংরেজি সাহিত্য, ঠিক বলতে গেলে ইংরেজি রচনা তার কাছে খবরের কাগজ ও নিতান্ত দুঃসময়ে [...] ইত্যাদি নিয়ে কয়েকটি বইয়ের মধ্যে পর্যবসিত। বাপের জমিদারি পড়ে গেছে অনেকটা, কিন্তু তবুও যা আছে তা দিয়ে এ জীবনটা নিজের মনের স্বাধীনতাকে খর্ব না করে কাটিয়ে যেতে পারবে নলিনাক্ষ।
নলিনাক্ষর তো সবই রয়েছে—এমনকি আইনের ডিগ্রি পর্যন্ত। একসময়ে অবাক হয়ে ভাবতাম সে কেন মফস্বলের ধারে পড়ে রয়েছে, দু-চারটা বক্তৃতা দিয়ে সেখানেও-বা আগুন জ্বালিয়ে দেয় না কেন? [লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে] অনায়াসে সে যেতে পারে। নাম করতে পারে। নলিনাক্ষর চেয়ে কত রদ্দি লোক কাউন্সিলে গিয়ে বক্তৃতা দিয়ে সাহেবদের [...] মুচকি হাসির অবতারণা করল। গেল তো তবু তো বক্তৃতা দিল। কিন্তু বাঙালির প্রতিনিধি হিসেবে নলিনাক্ষর জোর এদের চেয়ে ঢের বেশি; কিন্তু আড্ডায় আড্ডায় টেবিল ভেঙে ফুটবল ফিল্ডে রেফারিগিরি করে—করল কি সে?
নলিনাক্ষ যখন তোমাদের আড্ডা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, দাঁত দিয়ে একটা চুরুট কামড়ে ধরে, বিরাট গোল চশমার ফাঁক দিয়ে বাঘের মতো চোখে তোমার দিকে তাকায়—বাঘের ভুক্তাবশিষ্ট মহিষের হাড় ক’খানার মতো কতকগুলো দাঁতে ছড়াছড়ি মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে তার, কেমন একটা অস্ফুট পরিতৃপ্ত গর্জনের সঙ্গে তখন আর একবার পরিমাপ পাও তার, বুঝতে পার এই পৃথিবীতে তুমি নিজে কি রকম অবাস্তব। বস্তুর শক্তি নলিনাক্ষ কেমন বৈষয়িক কেমন জান্তব গৌরবে ধারণা করে আছে। সংসারের সবচেয়ে বড় বড় সফলতা কেন সে পাবে না?
নলিনাক্ষ আমার কাছে আগে প্রায়ই আসত, কিন্তু যতই সে বুঝতে পারছিল আমার এখানে আড্ডা প্রায়ই একা আমাকে নিয়ে এবং আমি বরং একজন অদ্ভুত জীব, আমার এখানে আসবার আকর্ষণ কমে গেল তার।
তবুও মাঝে মাঝে আমার এখানে ইদানীংও পাওয়া যেত তাকে। এসেছে, এসে বসেছে আমার টেবিলের কাছে, চুরুট টানছে, কথা বলছে, একসঙ্গে দাঁত আর ঘুষি খিঁচিয়ে ঘুষির পর ঘুষি মেরে কাঁঠাল কাঠের টেবিলটার ভেতর থেকে জখমের আর্তনাদ বের করে আনছে সে।
—‘কেন বেরোও না বলতে পার? কেন মানুষের সঙ্গে মেশ না? না আমাদের দেশের সব মানুষ ফুরিয়ে গেছে। আমাদের ফুটবল ক্লাবের বীরেশ ঠ্যাং ভেঙে এই সাত দিন ধরে বিছানায় পড়ে আছে খবর রাখ? খবর রাখ তুমি! সমস্ত শহরের মানুষ ভেঙে পড়েছে সেখানে মায় [...] পর্যন্ত, ডিস্ট্রিক্ট অফিসার সহানুভূতি জানিয়ে খবর নিচ্ছে, বার বার লোক পাঠিয়ে খবর জানার জন্য ওফ্ তাঁর আগ্রহ—আর তুমি, তুমি কোন নবাবের ছেলে, একবার গিয়ে তাকে দেখে আসার মতো সময় তোমার—’ আঘাতের পর আঘাতে টেবিল চৌচির হয়ে যাচ্ছে দেখে নলিনাক্ষকে বাধা দিয়ে বললাম—‘কোন বীরেশ?’
—‘কোন বীরেশ?’
নলিনাক্ষর চোখের দিকে তার উদ্যত হাতের বড় মুষ্ঠির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, হলোই-বা কাঁঠাল কাঠের টেবিল, রঘুগঞ্জের সেই নামজাদা কাঁঠাল গাছটার কাঠ দিয়ে অবিনাশ মিস্ত্রিকে লাগিয়ে তৈরি করিয়েছিলাম, আহা তার দিন শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্য টেবিল স্থির হয়ে রইল, অনেকক্ষণ স্থির হয়ে রইল, নলিনাক্ষর চোখের দিকে ততক্ষণ আমি তাকাতে পারছিলাম না, কিন্তু অনেকক্ষণ পরে একটা আকস্মিক সাহসে হঠাত্ চোখ চেয়ে দেখি নলিনাক্ষর মুখ জানালার দিকে ফেরানো, সে চোখ বুজে আছে। আস্তে আস্তে শুরু করলাম—
—‘বীরেশের কি করে পা ভাঙল?
নলিনাক্ষ কোনো জবাব দিল না, জেগে আছে না ঘুমিয়ে গেছে তাও বোঝার জো নেই।
—‘বীরেশ? কোন বীরেশই-বা? কত বীরেশই তো রয়েছে।’
—‘কত বীরেশ রয়েছে?’ একটা হুঙ্কার ছেড়ে টেবিলটাকে সর্ষেফুলের অন্ধকারের ভেতর পাঠিয়ে দিয়ে নলিনাক্ষ [...] [...] টেবিলের ওপর আবার দামামা বেজে গেল, —‘বীরেশ সব, বীরেশকে ব্যাকে দাও এক একটা বল।’
বাধা দিয়ে।—‘ও সেই ফুটবলিস্ট বীরেশ—’
—‘ফুটবলিস্ট। ও ফুটবলিস্ট! ও সেই ফুটবলিস্ট বীরেশ—উফ্ কি অনুকম্পা তোমার। আহা! আহা! যেন ইসবগুলের শরবত্ দিয়ে প্রাণ ঠাণ্ডা করে দিলেন। ফুটবলার বটে, যেন ফুটবল খেলা পুতুল খেলার মতো—ফুটবলাররা! যেন টিকটিকির ডিম নিয়ে আণ্ডাবাচ্চার পুতুলখেলা হচ্ছে।’
নলিনাক্ষর চুরুট নিভে গিয়েছিল, বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্রতায় চুরুট জ্বালিয়ে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললে—‘আই চ্যালেঞ্জ ইউ, কোন ডিকশনারিতে তুমি ওই জঘন্য শব্দ পেয়েছ।’
—‘কি জানি, ডিকশনারিতে আছে কি না বলতে পারি না।’
—‘তোমরা মানুষ নও, তোমরা সরীসৃপ, সেইজন্য [স্পোর্টসম্যানকে] ফুটবলিস্ট বলে তোমাদের নারীত্বের পরিচয় দাও।
—আমরা সরীসৃপ এবং নারী? কিন্তু—’
—‘তোমরা তার চেয়েও অধম, ফুটবলিস্ট! ওঃ সেই ফুটবলিস্ট! ও ফুটবলিস্ট বীরেশ! ওফ্! তোমার সরীসৃপের চেয়ে অধম—নারীর চেয়েও। আমি ভেবে পাই না কোন জাতের জীবের সঙ্গে তোমাদের তুলনা করব।’
—‘সেরকম জীব পৃথিবীতে জন্মায়নি আজও।’
—‘তা নিশ্চয়ই না, কোনোদিন জন্মাবে বলে মনে হয় না।’
—‘এতক্ষণ চিনেছ বীরেশ মুখুয্যে, সেই যে সরকারের দিঘি চল্লিশবার সাঁতরেছিল’—
—‘দেখতে গিয়েছিলে—তুমিও দেখতে গিয়েছিলে—তাহলে তো আমি ভারি অন্যায় করে ফেলেছি প্রথম।’
—‘আ নলিনাক্ষ তুমি এরই মধ্যে ভুলে গেলে সব, প্রায় হাজার তিনেক লোক হয়েছিল।’
—‘দশ হাজারের একটা মাথাও কম না।’
—‘তা হবে, হাজার বিশেক হয়েছিল হয়তো।’
—‘তা হতে পারে, হাজার বিশেক, তা হবে বইকি— হলোইও-বা মফস্বল শহর, শহর তো দিঘির পাড়ে ভেঙে পড়েছিল সেদিন।’
—‘তুমি যে জিনিসে হাত দাও, আ নলিনাক্ষ! কিন্তু এরই মধ্যে কি করে নলিনাক্ষ তুমি সব কথা ভুলে গেলে—’
—‘কেন? কী ভুললাম? ডিস্ট্রিক্ট অফিসার চারু মুখুয্যে আমাকে—’
—‘না, না, সে কথা নয়, সাঁতার শেষ হয়ে গেলে ভিড়ের ভেতর থেকে ছোঁ মেরে তুমি বেছে নিলে যাকে, তোমার যা চিলের মতো চোখ, ঘাড় ধরে একেবারে টেনে নিয়ে গেলে প্যান্ডেলের ভেতর।’
নলিনাক্ষ একটু সন্দিগ্ধভাবে—‘কি জানি, মনে পড়ছে না তো ঠিক, তোমাকে টেনে নিয়ে গিছলাম—’
—‘বাঃ একেবারে প্যান্ডেলের ভেতর টেনে নিয়ে—’
—‘প্যান্ডেল তৈরি করেছিলাম? কী রকম প্যান্ডেল?’
—‘যে কোনো কংগ্রেসের প্যান্ডেলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’
—‘ইস্ কুয়াশার মতো আমার মনে পড়ছে প্রমথ, কিন্তু বীরেশ যা সাঁতার কেটেছিল সেদিন—’
—‘আশ্চর্য। অত চেয়ার পেলে কোথায়?’
—‘চেয়ার! শ’ পাঁচেক এনেছিলাম বোধহয়।’
—‘বলো কি? কিছুই মনে নেই তোমার? হেসেখেলে হাজার তিনেক—’
নলিনাক্ষর চোখ আস্তে আস্তে জুড়িয়ে এলো, চুরুট টানতে টানতে সে চুপ করে রইল।
—‘আর চায়ের পেয়ালা ভেঙেছিল তো হাজার দেড় হাজার। দাম দিল কে?’
নলিনাক্ষ আধ সেকেন্ডের জন্য একবার চুরুটটা মুখের থেকে বের করে—‘ওসব দাম দিয়েই দিতে হয়।’
—‘এত টাকা সমিতি পায় কোত্থেকে?’
—‘জোগাড় করতে হয়।’
—‘তোমার নিজের তফিল থেকে কত দিলে?
—‘সেসব প্রাইভেট—সাঁতারের কথা বলো।’
—‘বেশ সাঁতার হয়েছিল।’
—‘না, না, খুলে বলো।’
—‘ছ’বছর আগের ব্যাপার—আজ সেসব কথা... হয়তো দশ হাজার লোক হয়েছিল, হয়তো হাজার খানেকের বেশি হয়নি, হয়তো হাজার দেড়েক পেয়ালা ভেঙেছিল, হয়তো দুইশ’ পেয়ালার বেশি আমদানিই হয়নি। আমি অবাক হয়ে ভাবি চা-ও কি খাওয়া হয়েছিল সেদিন?’
নলিনাক্ষ নিস্তব্ধভাবে চুরুট টানছিল, টেনে যেতে লাগল।
—‘কই আমি তো কাউকে চা খেতে দেখিনি।’
—‘কাউকে সাঁতার কাটতে দেখেছিলে?’
—‘আমি গিয়েছিলাম ভিড় দেখতে।’
—‘ভিড় দেখতে! কেন? নলিনাক্ষ মহালনবিশ যে কাজে হাত দেয় তাতে লোক হয় না, এই তো বলতে চাও তুমি? এর প্রমাণ করতে গিয়েছিলে তো? আই চ্যালেঞ্জ ইউ দশ হাজার গুঁফো হাজির ছিল সেদিন দ-শ-হা-জা-র গুঁফো’ টেবিলে বিকট শব্দ করে—‘একটা মেয়েমানুষ কিংবা প্রমথ ভট্টাচায্যিকে আমি মানুষের মধ্যেই ধরি না—বিধাতা তোমাকে গোঁফ দিয়েছিলেন তা কামিয়ে তুমি শ্রীমতী সেজেছ—কিন্তু না কামালেই-বা কি, একটা আরশোলা একটা শুঁয়োপোকারও অধম। মেয়েমানুষদের ভেতরেও পুরুষ আছে, কিন্তু তুমি প্রমথ ভট্টাচায্যি তোমার মায়ের চেয়ে বোনের চেয়ে বউয়ের চেয়েও নির্ঘাত্ মেয়েমানুষ তুমি, মেয়েমানুষদের ভেতরেও তোমার মতন মেয়েমানুষ আমি দেখিনি। এই রইল চুরুট, তোমার মাথায় ঘোমটা না টেনে দিয়ে আমি একটানও দিচ্ছি না। আর—আজ বেরুচ্ছি না এখান থেকে’—বলে নলিনাক্ষ তার থাবা বাড়িয়ে দিল।
—‘সাঁতার হয়ে গেল, আমাকে তুমি বক্তৃতা করতে ডাকলে। আমি সভাপতি বাড়ুয্যে সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে—’
—‘তুমি কি বক্তৃতা দিয়েছিলে সেদিন?’
—‘টানাহেঁচড়া করে আমাকে প্যান্ডেলে নিয়ে গিয়ে এখন এই কথা বলছ?’
নলিনাক্ষ গলা নামিয়ে আস্তে আস্তে—‘কি জানি আমার তখন মনে হতো, তুমি একটু-আধটু বলতে পার।’
—‘আমি কি বলেছিলাম মনে নেই তোমার।’
নলিনাক্ষ সহৃদয়ভাবে ভ্রূকুটি করে বললে—‘আমার মনেই নেই তুমি বলেছিলে কিনা।’
—‘তোমাদের বড় মানুষের এই দোষ।’
—‘মুখ ভার করলে কেন? বক্তৃতা দিয়েছিলে তো দশজনের জন্য, কর্মকর্তার জন্য নয় প্রমথ, স্পিচ শুনবার সময় কোথায় আমার, হয়তো চায়ের তদারক করছিলাম।’
—‘চা? তোমার কাছে আজ একটা নালিশ জানাব আমি নলিনাক্ষ, বক্তৃতা পর্যন্ত দিলাম, তবু গলা ভেজাবার জন্য এক চুমুক চা পর্যন্ত সেদিন কপালে জুটল না।’
—‘এতদিন একথা বলোনি কেন আমাকে? চলো আজই রেস্টুরেন্টে যাই, তোমাকে দস্তুরমতো খাইয়ে দিচ্ছি আমি, চপ কাটলেট, কিমার কারি, স্যান্ডউইচ।’
—‘না না এসব খেতে চাই না আমি।’
—‘পানীয়? বেশ [...] হুইস্কি [...] বাধা দিয়ে—‘ওসব আমি খাই না কিছু।’
—‘তাহলে কি কফি খাবে?’
—‘কিছু না নলিনাক্ষ, আমি শুধু বলছিলাম সেদিন অমন ডামিশ বক্তৃতার পর দেড় হাজার পেয়ালাও যখন ভাঙল, এক কাপ চা না পেয়ে নিজের অদৃষ্টকে খুব ধিক্কার দিয়েছি।’
—‘বাস্তবিক আমাদের সভাসমিতির ভেতর কোথায় যেন দোষ আছে।’
—‘কি রকম?’
—‘কিংবা দোষ আমারই, তিন হাজার চায়ের কারবারে এক পেয়ালাও পেলাম না। অথচ আমি বক্তৃতা দিয়েছিলাম।’
—‘আমাকে স্নব বলতে চাও?’
—‘না, না, তুমি কোথায় তখন? তোমাকে পেলে তো হাতের কাছে আকাশ পেতাম। কিন্তু হাতের কাছে মানুষ কোনোদিন আকাশ পায় না, আকাশের এই বিশেষত্ব।’
—‘অর্থাত্ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হচ্ছে নলিনাক্ষ মহালনবিশ একটা স্নব’ দুই ঘুষিতে টেবিল দমদম করে বেজে উঠল। নলিনাক্ষ জোর চুরুট টেনে যেতে লাগল, অনেকক্ষণ, টানল। আমার দিকে তাকিয়ে—‘আমি দেখাব তাদের।’
—‘কাদের?’
—‘সেইদিন সেই মিটিঙের ব্যবস্থা যারা করেছিল।’
—‘তাদের কী করবে?’
—‘সমস্ত হিসেব-নিকেশ চাই। ক’পেয়ালা চা হয়েছিল, ক’পেয়ালা ভেঙেছিল, আমার জমিদারির থেকে এসবের জন্য টাকা দিতে আমি কেন বাধ্য, চাঁদার টাকা যায় কোথায়? যায় কোথায় চাঁদার টাকা? চাঁদার টাকা কোথায় যায়? চ্যালেঞ্জ দ্যাট রাশকেল হরেন সরখেল আই সে চাঁদার টাকা সব কার পিণ্ডি চটকাতে যায়? কোন শালার গুষ্টির পিণ্ডি—’
ভেবেছিলাম নলিনাক্ষ এইবার উঠবে, কিন্তু উঠল না, চুপ করে আরও অনেকক্ষণ বসে চুরুট টানল।
অনেকক্ষণ পরে আমি—‘আমার মনে হয়—’ থামলাম, নলিনাক্ষকে সব কথা বলতে সহসা সাহস হয় না।
—‘কী মনে হয়? কী মনে হয় তোমার?
—‘তুমি এসব ছেড়ে দাও।’
—‘কী ছেড়ে দেব?’
—‘হরেন সরখেলকে [...] করে কি আর হবে, কিন্তু সে হলো অবান্তর কথা, আমি কি বলতে চাই জান?’ দেখলাম বাঘের মতো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
—‘কী ছেড়ে দেব আমি শুনতে চাই। টু দি পয়েন্ট বলবে, না হলে ঘুষিয়ে তোমার মাথা উড়িয়ে দেব।’
—‘বরং বলতে ইচ্ছে করে, বলা উচিত কয়েকটা নতুন জিনিস যদি তুমি ধর, তাহলে ভালো হয়।’
—‘যথা?’
—‘ক্রিকেট ক্লাবের সেক্রেটারি, ফুটবল ফিল্ডের রেফারি চমত্কার নলিনাক্ষ, চমত্কার, কিন্তু তোমার পাঁচহাত লম্বা দারুণ চেহারা শরীর ও মনে আশ্চর্য শক্তি, আশ্চর্য মনের শক্তি তোমার, আমার মনে হয় দেশকে তুমি একটা কিছু দাও।’
—‘অর্থাত্ বায়স্কোপে নামতে হবে?’
—‘না।’
—‘তবে?’
—‘সেদিন দেখলাম একজন ফিরিঙ্গি মোটর ড্রাইভ ও রেফারিগিরি করছে, চমত্কার রেফারি, তুমি হয়তো একজন ভালো মোটর ড্রাইভার, কিন্তু তোমার কাছ থেকে আমরা’—
—‘অতএব আমাকে কবিতা লিখতে হবে?’
—‘তুমি কবিতা বোঝ না, লিখবে কেমন করে?’
—‘উঠি, অনেকটা সময় নষ্ট করে গেলাম, একজন মেয়েমানুষের সঙ্গে কাটালেও ঢের ভালো ছিল। আজ বিকেলে [...] ওখানে চা খেতে যাব। তাকে বলব সকালবেলা একটা গাধার পাল্লায় পড়েছিলাম।’
—‘বোলো শীত রাতের পেঁচার পাল্লায়।’
—‘না না, গাধার পাল্লায়, কিংবা শুয়োরের পাল্লায় পড়েছিলাম, শুয়োরটা বলে একটা ড্রাইভারও যখন রেফারি হতে পারে তখন নলিনাক্ষ মহালনবিশ তুমি কবিতা লেখ—কি আকাট গাধা।’ নলিনাক্ষর সমস্ত শরীরটার উপর দিয়ে একটা প্রবল ধিক্কারের ঝড় বয়ে গেল।
নলিনাক্ষ—‘চায়ের টেবিলে মেমসাহেব থাকবে।’
—‘হাসি জমবে বেশ। কিন্তু—’
টেবিলের ওপর দড়াম করে একটা ঘুষি মেরে নলিনাক্ষ ‘ভটচাজ, তুমি যে তোমার কবিতা খুব বড় মনে করো, আর বড় মনে করো তোমার দেশকে। তোমার লেখা কয়েকটা পয়ার নিয়ে দেশের পথে তুমিও নেমো, আর ফুটবল ফিল্ডের রেফারি হয়ো। আমিও নামব, না হয় সেই ড্রাইভারটাই নামবে, দেখি দেশের লোক কাকেই-বা বাহবা দেয়, কার গায়েই-বা থুথু ফেলে।’ চুরুট জ্বালিয়ে উঠে দাঁড়াল নলিনাক্ষ। বললে—‘তোমার কবিতা নিয়ে ভিজে বিড়ালের মতো ঘরের কোণে পড়ে আছ, কিন্তু সেই ড্রাইভারটার রেফারিগিরি দেখার জন্য এ মুলুকের হাজার স্কুল-কলেজের ছেলে, হাজার হাজার মানুষ কাদাবৃষ্টি ঠেলে মাঠে ভেঙে পড়ছে রোজ।’
সূত্র : আমার দেশ

জীবনানন্দ দাশের 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থ থেকে

১৫.
যদি আমি ঝ’রে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়
যখন ঝরিছে ধান বাংলার খেতে-খেতে ম্লান চোখ বুজে
যখন চড়াই পাখি কাঁঠালিচাঁপার নীড়ে ঠোঁট আছে গুঁজে
যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে উঠানের খয়েরি পাতায়
যখন পুকুরে হাঁস সোঁদাজলে শিশিরের গন্ধ শুধু পায়
শামুক গুগলিগুলো প’ড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে
তখন আমারে যদি পাও নাকো লালশাক ছাওয়া মাঠে খুঁজে
ঠেস দিয়ে ব’সে আর থাকি নাকো যদি বুনো চালতার গায়

তাহলে জানিও তুমি আসিয়াছে অন্ধকারে মৃত্যুর আহ্বান
যার ডাক শুনে রাঙা রৌদ্রেরো চিল আর শালিখের ভিড়
একদিন ছেড়ে যাবে আম জাম বনে নীল বাংলার তীর
যার ডাক শুনে আজ খেতে-খেতে ঝরিতেছে খই আর মৌরীর ধান
কবে যে আসিবে মৃত্যু : বাসমতী চালে ভেজা শাদা হাতখান
রাখো বুকে, হে কিশোরী, গোরচনারূপে আমি করিবো যে স্নান—

১৬.
মনে হয় একদিন আকাশের শুকতারা দেখিবো না আর
দেখিবো না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে একঝাড় জোনাকি কখন
নিভে যায়—দেখিবো না আর আমি পরিচিত এই বাঁশবন
শুকনো বাঁশের পাতা-ছাওয়া মাটি হ’য়ে যাবে গভীর আঁধার
আমার চোখের কাছে—লক্ষ্মীপূর্ণিমার রাতে সে কবে আবার
পেঁচা ডাকে জ্যোত্স্নায়—হিজলের বাঁকা ডাল করে গুঞ্জরণ
সারারাত কিশোরীর লালপাড় চাঁদে ভাসে—হাতের কাঁকন
বেজে ওঠে : বুঝি না—গঙ্গাজল, নারকোলনাড়ুগুলো তার

জানি না সে কারে দেবে—জানি না সে চিনি আর শাদা তালশাঁস
হাতে ল’য়ে পলাশের দিকে চেয়ে দুয়ারে দাঁড়ায়ে রবে কি না...
আবার কাহার সাথে ভালোবাসা হবে তার—আমি তা জানি না
মৃত্যুরে কে মনে রাখে?... কীর্তিনাশা খুঁড়ে খুঁড়ে চলে বারোমাস
নতুন ডাঙার দিকে—পিছনের অবিরল মৃত চর বিনা
দিন তার কেটে যায়—শুকতারা নিভে গেলে কাঁদে কি আকাশ?

তোমাকে || জীবনানন্দ দাশ

একদিন মনে হ’তো জলের মতন তুমি।
সকালবেলার রোদে তোমার মুখের থেকে বিভা—
অথবা দুপুরবেলা—বিকেলের আসন্ন আলোয়—
চেয়ে আছে—চ’লে যায়—জলের প্রতিভা।

মনে হ’তো তীরের উপরে ব’সে থেকে।
আবিষ্ট পুকুর থেকে সিঙাড়ার ফল
কেউ কেউ তুলে নিয়ে চ’লে গেলে-নিচে
তোমার মুখের মতন অবিকল

নির্জন জলের রং তাকায়ে রয়েছে;
স্থানান্তরিত হ’য়ে দিবসের আলোর ভিতরে
নিজের মুখের ঠাণ্ডা জলরেখা নিয়ে
পুনরায় শ্যাম পরগাছা সৃষ্টি করে;

এক পৃথিবীর রক্ত নিপতিত হ’য়ে গেছে জেনে
এক পৃথিবীর আলো সবদিকে নিভে যায় ব’লে
রঙিন সাপকে তার বুকের ভিতরে টেনে নেয় :
অপরাহ্নে আকাশের রং ফিকে হ’লে।

তোমার বুকের ’পরে আমাদের পৃথিবীর অমোঘ সকাল;
তোমার বুকের ’পরে আমাদের বিকেলের রক্তিম বিন্যাস;
তোমার বুকের ’পরে আমাদের পৃথিবীর রাত :
নদীর সাপিনী, লতা, বিলীন বিশ্বাস।

সবিতা || জীবনানন্দ দাশ

সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি
মনে হয় কোনো এক বসন্তের রাতে:
ভূমধ্যসাগর ঘিরে যেইসব জাতি,
তাহাদের সাথে
সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন;
মনে পড়ে নিবিড় মেরুন আলো, মুক্তার শিকারী,
রেশম, মদের সার্থবাহ,
দুধের মতন শাদা নারী।

অনন্ত রৌদ্রের থেকে তারা
শাশ্বত রাত্রির দিকে তবে
সহসা বিকেলবেলা শেষ হ’য়ে গেলে
চ’লে যেতো কেমন নীরবে।
চারিদিকে ছায়া ঘুম সপ্তর্ষি নক্ষত্র;
মধ্যযুগের অবসান
স্থির ক’রে দিতে গিয়ে ইওরোপ গ্রিস
হতেছে উজ্জ্বল খ্রিস্টান।

তবুও অতীত থেকে উঠে এসে তুমি আমি ওরা—
সিন্ধুর রাত্রির জল জানে—
আধেক যেতাম নব পৃথিবীর দিকে;
কেমন অনন্যোপায় হাওয়ার আহ্বানে
আমরা অকূল হ’য়ে উঠে
মানুষকে মানুষের প্রয়াসকে শ্রদ্ধা করা হবে
জেনে তবু পৃথিবীর মৃত সভ্যতায়
যেতাম তো সাগরের স্নিগ্ধ কলরবে।

এখন অপর আলো পৃথিবীতে জ্বলে :
কী এক অপব্যয়ী অক্লান্ত আগুন!
তোমার নিবিড় কালো চুলের ভিতরে
কবেকার সমুদ্রের নুন;
তোমার মুখের রেখা আজো
মৃত কতো পৌত্তলিক খ্রিস্টান সিন্ধুর
অন্ধকার থেকে এসে নব সূর্যে জাগার মতন;
কতো কাছে—তবু কতো দূর।

বুনো হাঁস || জীবনানন্দ দাশ

পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে—
জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহ্বানে
বুনো হাঁস পাখা মেলে—সাঁই-সাঁই শব্দ শুনি তার;
এক-দুই-তিন-চার অজস্র-অপার—

রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া
এঞ্জিনের মতো শব্দে; ছুটিতেছে—ছুটিতেছে তা’রা।
তারপর প’ড়ে থাকে নক্ষত্রের বিশাল আকাশ,
হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ—দু-একটা কল্পনার হাঁস;

মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ;
উড়ুক-উড়ুক তা’রা পউষের জ্যোত্স্নায় নীরবে উড়ুক
কল্পনার হাঁস সব; পৃথিবীর সব ধ্বনি সব রং মুছে গেলে পর
উড়ুক উড়ুক তা’রা হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোত্স্নার ভিতর।

Sunday, September 18, 2011

আকাশে সাতটি তারা || জীবনানন্দ দাশ

আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে
ব’সে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মর্তো
গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে- আসিয়াছে শান্ত অনুগত
বাংলার নীল সন্ধ্যা- কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে;
আমার চোখের ’পরে আমার মুখের ‘পরে চুল তার ভাসে;
পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখেনিকো- দেখি নাই অত
অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে জামে ঝরে অবিরত,
জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে রূপসীর চুলের বিন্যাসে

পৃথিবীর কোনো পথে: নরম ধানের গন্ধ- কলমীর ঘ্রাণ,
হাঁসের পালক, শর, পুকুরের জল, চাঁদা সরপুটিদের
মৃদু ঘ্রাণ, কিশোরীর চাল-ধোয়া ভিজে হাত- শীত হাতখান,
কিশোরের পায়ে-দলা মুথাঘাস, -লাল লাল বটের ফলের
ব্যথিত গন্ধের ক্লান্ত নীরবতা- এরি মাঝে বাংলার প্রাণ:
আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি পাই টের।

Friday, September 9, 2011

স্মৃতি ।। জীবনানন্দ দাশ

থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি-
বললে, আমি অতীত ক্ষুধা-তোমার অতীত স্মৃতি!
-যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়বাদলের জলে,
শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে,
ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে;
তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে!
কাঁদছে তোমার মনের খাকে, চাপা ছাইয়ের তলে,
কাঁদছে তোমার স্যাঁত্সেঁতে শ্বাস-ভিজা চোখের জলে,
কাঁদছে তোমার মূক মমতার রিক্ত পাথার ব্যেপে,
তোমার বুকের খাড়ার কোপে, খুনের বিষে ক্ষেপে!
আজকে রাতে কোন্ সে সুদূর ডাক দিয়েছে তারে,-
থাকবে না সে ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে!
মুক্তি আমি দিলেম তারে-উল্লাসেতে দুলে
স্মৃতি আমার পালিয়ে গেল বুকের কপাট খুলে
নবালোকে-নবীন উষার নহবতের মাঝে।
ঘুমিয়েছিলাম, দোরে আমার কার করাঘাত বাজে!
-আবার আমায় ডাকলে কেন স্বপনঘোরের থেকে!
অই লোকালোক-শৈলচূড়ায় চরণখানা রেখে
রয়েছিলাম মেঘের রাঙা মুখের পানে চেয়ে,
কোথার থেকে এলে তুমি হিম সরণি বেয়ে!
ঝিম্‌ঝিমে চোখ, জটা তোমার ভাসছে হাওয়ার ঝড়ে,
শ্মশানশিঙা বাজল তোমার প্রেতের গলার স্বরে!
আমার চোখের তারার সনে তোমার আঁখির তারা
মিলে গেল, তোমার মাঝে আবার হলেম হারা!
-হারিয়ে গেলাম ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে;
কাঁদছে স্মৃতি-কে দেবে গো-মুক্তি দেবে তারে!

অস্তচাঁদে ।। জীবনানন্দ দাশ

ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী!
-অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী,
নিঝ্ঝুম বিছানার পরে
মেঘবৌ'র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,-
চেয়ে থাকি চোখ তুলে'-যেন মোর পলাতকা প্রিয়া
মেঘের ঘোমটা তুলে' প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া!
সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে' ফিরে' ফিরে'
মাঠে ঘাটে একা একা, -বুনোহাঁস-জোনাকির ভিড়ে!
দুশ্চর দেউলে কোন্-কোন্ যক্ষ-প্রাসাদের তটে,
দূর উর-ব্যাবিলোন-মিশরের মরুভূ-সঙ্কটে,
কোথা পিরামিড তলে, ঈসিসের বেদিকার মূলে,
কেউটের মতো নীলা যেইখানে ফণা তুলে উঠিয়াছে ফুলে,
কোন্ মনভুলানিয়া পথচাওয়া দুলালীর মনে
আমারে দেখেছে জোছনা-চোর চোখে-অলস নয়নে!
আমারে দেখেছে সে যে আসরীয় সম্রাটের বেশে
প্রাসাদ-অলিন্দে যবে মহিমায় দাঁড়ায়েছি এসে-
হাতে তার হাত, পায়ে হাতিয়ার রাখি
কুমারীর পানে আমি তুলিয়াছি আনন্দের আরক্তিম আঁখি!
ভোরগেলাসের সুরা-তহুরা, ক'রেছি মোরা চুপে চুপে পান,
চকোরজুড়ির মতো কুহরিয়া গাহিয়াছি চাঁদিনীর গান!
পেয়ালায়-পায়েলায় সেই নিশি হয় নি উতলা,
নীল নিচোলের কোলে নাচে নাই আকাশের তলা!
নটীরা ঘুমায়েছিল পুরে পুরে, ঘুমের রাজবধূ-
চুরি করে পিয়েছিনু ক্রীতদাসী বালিকার যৌবনের মধু!
সম্রাজ্ঞীর নির্দয় আঁখির দর্প বিদ্রূপ ভুলিয়া
কৃষ্ণাতিথি-চাঁদিনীর তলে আমি ষোড়শীর উরু পরশিয়া
লভেছিনু উল্লাস-উতরোল!-আজ পড়ে মনে
সাধ-বিষাদের খেদ কত জন্মজন্মান্তের, রাতের নির্জনে!

আমি ছিনু 'ক্রবেদুর' কোন্ দূর 'প্রভেন্স্'-প্রান্তরে!
-দেউলিয়া পায়দল্-অগোচর মনচোর-মানিনীর তরে
সারেঙের সুর মোর এমনি উদাস রাত্রে উঠিত ঝঙ্কারি!
আঙুরতলায় ঘেরা ঘুমঘোর ঘরখানা ছাড়ি
ঘুঘুর পাখনা মেলি মোর পানে আসিল পিয়ারা;
মেঘের ময়ূরপাখে জেগেছিল এলোমেলো তারা!
-'অলিভ' পাতার ফাঁকে চুন চোখে চেয়েছিল চাঁদ,
মিলননিশার শেষে-বৃশ্চিক, গোক্ষুরাফণা, বিষের বিস্বাদ!

স্পেইনের 'সিয়েরা'য় ছিনু আমি দস্যু-অশ্বারোহী-
নির্মম-কৃতান্ত-কাল-তবু কী যে কাতর, বিরহী!
কোন্ রাজনন্দিনীর ঠোঁটে আমি এঁকেছিনু বর্বর চুম্বন!
অন্দরে পশিয়াছিনু অবেলার ঝড়ের মতন!
তখন রতনশেজে গিয়েছিল নিভে মধুরাতি,
নীল জানালার পাশে-ভাঙা হাটে-চাঁদের বেসাতি।
চুপে চুপে মুখে কার পড়েছিনু ঝুঁকে!
ব্যাধের মতন আমি টেনেছিনু বুকে
কোন্ ভীরু কপোতীর উড়ু-উড়ু ডানা!
-কালো মেঘে কেঁদেছিল অস্তচাঁদ-আলোর মোহানা!

বাংলার মাঠে ঘাটে ফিরেছিনু বেণু হাতে একা,
গঙ্গার তীরে কবে কার সাথে হয়েছিল দেখা!
'ফুলটি ফুটিলে চাঁদিনী উঠিলে' এমনই রূপালি রাতে
কদমতলায় দাঁড়াতাম গিয়ে বাঁশের বাঁশিটি হাতে!
অপরাজিতার ঝাড়ে- নদীপারে কিশোরী লুকায়ে বুঝি!-
মদনমোহন নয়ন আমার পেয়েছিল তারে খুঁজি!
তারই লাগি বেঁধেছিনু বাঁকা চুলে ময়ূরপাখার চূড়া,
তাহারই লাগিয়া শুঁড়ি সেজেছিনু-ঢেলে দিয়েছিনু সুরা!
তাহারই নধর অধর নিঙাড়ি উথলিল বুকে মধু,
জোনাকির সাথে ভেসে শেষরাতে দাঁড়াতাম দোরে বঁধু!
মনে পড়ে কি তা!-চাঁদ জানে যাহা, জানে যা কৃষ্ণাতিথির শশী,
বুকের আগুনে খুন চড়ে-মুখ চুন হয়ে যায় একেলা বসি!

বেদিয়া ।। জীবনানন্দ দাশ

চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি!
পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি?
উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে,
গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে;
নয় সে বান্দা রংমহলের, মোতিমহলের বাঁদী,
ঝোড়ো হাওয়া সে যে, গৃহপ্রাঙ্গণে কে তারে রাখিবে বাঁধি!
কোন্ সুদূরের বেনামী পথের নিশানা নেছে সে চিনে,
ব্যর্থ ব্যথিত প্রান্তর তার চরণচিহ্ন বিনে!
যুগযুগান্ত কত কান্তার তার পানে আছে চেয়ে,
কবে সে আসিবে ঊষর ধূসর বালুকা-পথটি বেয়ে
তারই প্রতীক্ষা মেগে ব'সে আছে ব্যাকুল বিজন মরু!
দিকে দিকে কত নদী-নির্ঝর কত গিরিচূড়া-তরু
ঐ বাঞ্ছিত বন্ধুর তরে আসন রেখেছে পেতে
কালো মৃত্তিকা ঝরা কুসুমের বন্দনা-মালা গেঁথে
ছড়ায়ে পড়িছে দিগ্‌দিগন্তে ক্ষ্যাপা পথিকের লাগি!
বাবলা বনের মৃদুল গন্ধে বন্ধুর দেখা মাগি
লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস!
ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস
নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে ফিরে
বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে!
তারই লাগি ভায় ইন্দ্রধনুক নিবিড় মেঘের কূলে,
তারই লাগি আসে জোনাকি নামিয়া গিরিকন্দরমূলে।
ঝিনুক-নুড়ির অঞ্জলি ল'য়ে কলরব ক'রে ছুটে
নাচিয়া আসিছে অগাধ সিন্ধু তারই দুটি করপুটে।
তারই লাগি কোথা বালুপথে দেখা দেয় হীরকের কোণা,
তাহারই লাগিয়া উজানী নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে সোনা!
চকিতে পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে
ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন্ সে নিরুদ্দেশে!
যত্ন করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল,
চাহে না রতন-মণিমঞ্জুষা হীরে-মাণিকের দুল,
-তার চেয়ে ভালো অমল উষার কনক-রোদের সীঁথি,
তার চেয়ে ভালো আলো-ঝল্মল্ শীতল শিশিরবীথি,
তার চেয়ে ভালো সুদূর গিরির গোধূলি-রঙিন জটা,
তার চেয়ে ভালো বেদিয়া বালার ক্ষিপ্র হাসির ছটা!
কী ভাষা বলে সে, কী বাণী জানায়, কিসের বারতা বহে!
মনে হয় যেন তারই তরে তবু দুটি কান পেতে রহে
আকাশ-বাতাস-আলোক-আঁধার মৌন স্বপ্নভরে,
মনে হয় যেন নিখিল বিশ্ব কোল পেতে তার তরে!

বনের চাতক-মনের চাতক ।। জীবনানন্দ দাশ

বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়-
মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়!
ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে-
সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে
বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়!

পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে, আগুনদানা ফাটে!
কোন্ ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে!
বাদল-বৌয়ের চুমার মৌয়ের সোয়াদ চেয়ে চেয়ে
বনের চাতক-মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে,
ঘাটের ভরা কলসি ও-কার কাঁদছে মাঠে মাঠে!

ওরে চাতক, বনের চাতক, আয় রে নেমে ধীরে
নিঝুম ছায়া-বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে,
"দে জল!" ব'লে ফোঁপাস কেন? মাটির কোলে জল
খবর-খোঁজা সোজা চোখের সোহাগে ছল্‌ছল্ !
মজিস নে রে আকাশ-মরুর মরীচিকার তীরে!
মনের চাতক, হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি
কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি?
ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে,
আতার ক্ষীরের মতো সোহাগ সেথায় ঘিরে আছে!
আয় রে ফিরে দানোয়-পাওয়া, আয় রে তাড়াতাড়ি।

বনের চাতক, মনের চাতক আসে না আর ফিরে,
কপোত-ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে!
সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ-শুঁড়িখানায় বাজে!
চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে
লুকিয়ে আছে সে-কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে!

নাবিক ।। জীবনানন্দ দাশ

কবে তব হৃদয়ের নদী
বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি!
সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে
দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে
বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন!
পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন!
কারাগার-মর্মরের তলে
নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে
ভ'রে যায় বসুধার আহত আকাশ!
অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস!
-সহস্রের অঙুলিতর্জন
নিত্য সহিতেছি মোরা-বারিধির বিপ্লব-গর্জন
বরিয়া লয়েছ তুমি, তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো;
তোমার পক্ষরতলে টগ্‌বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!-
তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার,
অবগুণ্ঠিতার
হিমকৃষ্ণ অঙুলির কঙ্কাল-পরশ
পরিহরি গেলে তুমি-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস
তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা
চকিতে চূর্ণিয়া গেলে-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা
বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট,
তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট
তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি!
নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি!
প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি!
ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,-
অগাধের সাধ
তোমারে সাজায়ে দেছে ঘরছাড়া ক্ষ্যাপা সিন্দবাদ!
মণিময় তোরণের তীরে
মৃত্তিকায় প্রমোদ-মন্দিরে
নৃত্য-গীত-হাসি-অশ্রু-উৎসবের ফাঁদে
হে দুরন্ত দুর্নিবার-প্রাণ তব কাঁদে!
ছেড়ে গেলে মর্মন্তুদ মর্মর বেষ্টন,
সমুদ্রের যৌবন-গর্জন
তোমারে ক্ষ্যাপায়ে দেছে, ওহে বীর শের!
টাইফুন্-ডঙ্কার হর্ষে ভুলে গেছ অতীত-আখের
হে জলধি পাখি!
পে তব নাচিতেছে ল্যহারা দামিনী-বৈশাখী!
ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রতœচূড় ময়ূখের টিপ,
কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ
করিতেছে বিভ্রান্ত তোমারে!
বিচিত্র বিহঙ্গ কোন্ মণিময় তোরণের দ্বারে
সহর্ষ নয়ন মেলি হেরিয়াছ কবে!
কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে-
স্তম্ভিত নয়নে
নীল বাতায়নে
তাকায়েছ তুমি!
অতি দূর আকাশের সন্ধ্যারাগ-প্রতিবিম্বে প্রস্ফুটিত সমুদ্রের
আচম্বিত ইন্দ্রজাল চুমি
সাজিয়াছ বিচিত্র মায়াবী!
সৃজনের জাদুঘর-রহস্যের চাবি
আনিয়াছ কবে উন্মোচিয়া
হে জল-বেদিয়া!
অল্য বন্দর পানে ছুটিতেছ তুমি নিশিদিন
সিন্ধু বেদুঈন!
নাহি গৃহ, নাহি পান্থশালা-
লক্ষ লক্ষ ঊর্মি-নাগবালা
তোমারে নিতেছে ডেকে রহস্যপাতালে-
বারুণী যেথায় তার মণিদীপ জ্বালে!
প্রবাল-পালঙ্ক-পাশে মীননারী ঢুলায় চামর!
সেই দুরাশার মোহে ভুলে গেছ পিছুডাকা স্বর
ভুলেছ নোঙর!
কোন্ দূর কুহকের কূল
লক্ষ্য করি ছুটিতেছে নাবিকের হৃদয়-মাস্তুল
কে বা তাহা জানে!
অচিন আকাশ তারে কোন্ কথা কয় কানে কানে।

নীলিমা ।। জীবনানন্দ দাশ

রৌদ্র ঝিল্‌মিল,
উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল,
অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে
নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে!
-উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী,
উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি,
আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা,
মরীচিকা-ঢাকা!
অগণন যাত্রিকের প্রাণ
খুঁজে মরে অনিবার, পায় নাকো পথের সন্ধান;
চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল-
হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল
তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী।
জনতার কোলাহলে একা ব'সে ভাবি
কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি
বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী!
স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা
মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা!
চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধ ধরণীর রুধির-লিপিকা
জ্বলে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা!
বসুধার অশ্রু-পাংশু আতপ্ত সৈকত,
ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল, নিষ্করুণ এই রাজপথ,
লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,
এই ধূলি-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার
ডুবে যায় নীলিমায়-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে,
-শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে;
ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক,
তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!

আমি কবি-সেই কবি ।। জীবনানন্দ দাশ

আমি কবি-সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আন্‌মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে!
বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে!
দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি!

স্বপন-সুরার ঘোরে
আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা ক'রে!
জন্ম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল না আমার সাধা-
পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা!
-নিমেষে পাসরি এই বসুধার নিয়তি-মানার বাধা
সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভ'রে!

ভুঁয়ের চাঁপাটি চুমি
শিশুর মতন, শিরীষের বুকে নীরবে পড়ি গো নুমি!
ঝাউয়ের কাননে মিঠা মাঠে মাঠে মটর-ক্ষেতের শেষে
তোতার মতন চকিতে কখন আমি আসিয়াছি ভেসে!
-ভাটিয়াল সুর সাঁঝের আঁধারে দরিয়ার পারে মেশে,-
বালুর ফরাশে ঢালু নদীটির জলে ধোঁয়া ওঠে ধূমি!

বিজন তারার সাঁঝে
আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে!
প'ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়!
হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়!
কোন্ যেন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর
কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে অকাজের মাঝে!

Tuesday, May 3, 2011

আকাশলীনা ।। জীবনানন্দ দাশ

সুরন্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা অই যুবকের সাথে
ফিরে এসো সুরন্জনা :
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে ;

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে ;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার ;
দূর থেকে দূরে-----আরো দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর ।
কী কথা তাহার সাথে? তার সথে!
আকাশের আড়ালে আকাশ
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ :
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে ।

সুরন্জনা,
তোমার হৃদয় আজ ঘাস :
বাতাসের ওপারে বাতাস
আকাশের ওপারে আকাশ ।

Friday, February 11, 2011

তোমায় আমি :: জীবনানন্দ দাশ

তোমায় আমি দেখেছিলাম ব’লে
তুমি আমার পদ্মপাতা হলে;
শিশির কণার মতন শূন্যে ঘুরে
শুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরে
খুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে।

নদী সাগর কোথায় চলে ব’য়ে
পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হ’য়ে
জানি না কিছু-দেখি না কিছু আর
এতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমার
পদ্মপাতার বুকের ভিতর এসে।

তোমায় ভালোবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মেশে।

জানি আমি তুমি রবে-আমার হবে ক্ষয়
পদ্মপাতা একটি শুধু জলের বিন্দু নয়।
এই আছে, নেই-এই আছে নেই-জীবন চঞ্চল;
তা তাকাতেই ফুরিয়ে যায় রে পদ্মপাতার জল
বুঝেছি আমি তোমায় ভালোবেসে।

বনলতা সেন ।। জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের’পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‌‌‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ