প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label রম্য রচনা. Show all posts
Showing posts with label রম্য রচনা. Show all posts

Monday, July 2, 2012

বঙ্গের নদীখাদক বনাম প্রতিবেশি মাসতুতো দাদাগণ | তৈয়ব খান

আমরা কতিপয় বাঙালি এই মর্মে ঘোষণা করিতেছি যে, সর্বপ্রকার চর্বণ-চুষ্য-লেহ্য-পেয় খাদ্যবস্তু অতিশয় আনন্দের সাথে গ্রহণ করিয়া থাকি। রসনায় আমাদের কান্তি নাই। আমরা খাইব এবং খাইতে থাকিব। সর্বপ্রকার খাবারেই আমাদের অত্যাধিক রুচি রহিয়াছে। বোধ করি সর্বভূক তেলাপোকাও আমাদের রুচির কাছে নতি স্বীকার করিবে। তেলাপোকা সকল কিছু খাইয়া যদি হজম করিতে পারে, আমরা আশরাফুল মাকলুকাত হইয়া উহা পারিব না কেন? আমাদের পারিতেই হইবে, কেননা আমরা তো আর বিধাতার জাত মারিতে পারি না। আমরা পাহাড় খাইয়া রেকর্ড করিয়াছি, বনজঙ্গল খাইয়া সাবাড় করিয়াছি। আমাদের মত এইরূপ আর কেহ পারে নাই। এইবার আমরা নদী খাওয়া শুরু করিয়াছি। নদী খাওয়াতে যে কী পরিমাণ আনন্দ উহা যে না খাইয়াছে, তাহাকে বুঝাইবার মত বিড়ম্বনা আর নাই। তবে তাহাদের জ্ঞাতার্থে শুধু এইটুকুই বলিব, নদী ভক্ষণের সুখ খানিকটা ঘুষ খাওয়ার মতই মজাদার। বলিতে কি, ঘুষ খাওয়ার মধ্যে খানিকটা রিস্ক থাকিয়া যায় কিন্তু নদী খাওয়ায় কোন রিস্ক নাই এবং যেহেতু রিস্ক নাই, সেহেতু ইহা খাইতে ভয় কিসের? ইহা আমরা ১০০% হালাল খাবার মনে করিয়াই খাইতেছি। অবশ্য আমরা এইরূপ খাইতে পারিতাম না, ভারতমাসির কতিপয় সুসন্তান আমাদের খাওয়া সহজ করিয়া দিয়াছে। সম্পর্কে উহারা আমাদের মাসতুতো দাদা, তাই অপর ভাইদের প্রতি উহাদের মমতা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। উহারা আমাদের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র নদী প্রবাহকে খাইয়া ফেলিতেছে। প্রতিবেশি মাসির দেশ ভারতের মাসতুতো ভ্রাতাগণ আন্ত:নদী সংযোগের মাধ্যমে সমস্ত জল নিজেরা পান করিতেছে। এখন উহারা পরিকল্পনা করিতেছে আরও ৫৩টি নদীর জল বাঁধ দিয়া নিজেরা পান করিবে। কেননা, উহাদের একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্যটা হইতেছে, দিনে দিনে বঙ্গমাতাকে সাহারা, গোবি, আতাকামা মরুভূমি করিয়া দেওয়া। যাহার জন্য উহারা ফারাক্কা বাঁধ, গজালডোবা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ করিয়াছে। মাসতুতো দাদাদের আন্ত:নদী সংযোগ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হইলে বঙ্গবালা আর নদীমাতৃক থাকিবে না, মরুমাতৃক হইয়া যাইবে বলিয়া নদীবিশেষজ্ঞগণ আনন্দবার্তা শোনাইয়াছেন। আন্ত:নদী সংযোগ হইতেছে একটি মহান ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। প্রকৃতিকে নিজেদের মতন করিয়া গড়িয়া লইতে পারিলে কতবড় বিজ্ঞান সাধনা হইবে, উহা একটি ভাবিবার বিষয়ও বটে। টেকনোলজিতে চৌকস ভারতমাসি আগামী ৫০ বছরের ক্রমবর্ধমান জল ও খাদ্যের চাহিদা মিটানোর লক্ষ্যে দেশিয় ৩৮টি নদীকে ৩০টি সংযোগকারী খালের মাধ্যমে জুড়িয়া দিয়া এক নদীর বেসিন হইতে অন্য নদীর বেসিনে জল স্থানান্তর করিবার পরিকল্পনা আঁটিয়াছে। সেই জন্য বাঁধ দিয়া নদীর গতিধারা পাল্টাইয়া দিতেছে। উহাদের দেওয়া বাঁধের নামগুলোও কর্ণে মধু ঢালিয়া দেয়। কী সুন্দর সুন্দর একেকটি বাঁধের নাম! আহা মরি মরি! ফারাক্কা হইতেছে নট ফার ফ্রম অক্কা অর্থাৎ মরণ থেকে দূরে নহে। গজলডোবা হইতেছে; গজাল মারিয়া ডুবাইয়া দেওয়া, আর টিপাইমুখ হইতেছে টিপিয়া মুখ বন্ধ করিবার অপূর্ব কৌশল। জাতিসংঘ পানিবিশেষজ্ঞ ড. এসআই খান (আমার জাত ভাই, অর্থাৎ খান ভাই) আনন্দের সাথে জানাইয়াছেন, গঙ্গা পানি চুক্তিতে আমাদের অনেক সফলতা রহিয়াছে। সফলতাগুলি হইতেছে- চুক্তিতে পানি পাওয়ার গ্যারান্টি কজ যেমন নাই, তেমনি পানি না পাইলে আরবিট্রেশনের সুযোগও নাই। হিসাবে নাকি ধরা হইয়াছে ফারাক্কা পয়েন্টের প্রাপ্ত পানি। কী চমৎকার কথার্বার্তা! ফারাক্কা পয়েন্টের পানিপ্রবাহ শূন্য হইলে সেই শূন্যকে তো আর ভাগ করা চলে না। গঙ্গার ৭২% পানি আসে নেপাল থেকে, ১০% আসে চীন থেকে এবং ভারতের অংশ মাত্র ২০%। অথচ তাহারা পুরোটাই নিজের মনে করিয়া হজম করিতেছে। কেননা, নদীর পানি পান করিয়া বঙ্গবালা কি আমাশয়ে ভুগিবে! বাঙালির তো ভাল খাবার খাইয়াই এমনি এমনিই পেট খারাপের অভ্যাস আছে। সুতরাং ভারতমাসি আমাদের এত বড় ক্ষতি নিশ্চয়ই করিতে পারেন না। নদীর জল পান করিয়া বাঙালি মরিবে ইহা কোনক্রমেই মাসির কামনা হইতে পারে না। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির মোস্তফা খান (উনিও আমার জাত ভাই, কেননা আমরা শুধুই খাই। খাই বলিয়াই এত চিন্তা, এইজন্যই আমরা খান) মারাত্মক আনন্দের সাথে জানাইয়াছেন, ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তাবায়ন হইলে; আমরা এখন যে পানি পাই, উহাও পাইব না। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিবে। আর্সেনিক বাড়িয়া যাইবে, বঙ্গপসাগর হইতে নোনা পানি প্রবেশ করিবে, অসুন্দরবন ধ্বংস হইয়া সুন্দরবন হইবে। শষ্য ও পশু সম্পদের উৎপাদন হ্রাস পাইবে (পাইলেই ভাল, এত শষ্য কে খাইবে? পশু বাড়িয়া গেলে গুতা কিংবা কামড় খাইবার ভয় আছে। আশঙ্কা হইতেছে, প্রফেসর সাহেবের কথা ফলিবে তো? নাকি শুধু শুধু আনন্দের সংবাদ দেওয়া! আর্সেনিক শব্দটায় কী চমৎকার একটা রিনিঝিনি বাদ্য আছে। কেমন কাব্যিক একটা শব্দ আ-র্সে-নি-ক। আহাহা! আগের দিনে মানুষের কেমন আজেবাজে রোগ হইত। সবরোগের শেষেই ইয়া ইয়া। যেমন: ডিপথেরিয়া, পাইয়েরিয়া, ডাইয়েরিয়া, ম্যালেরিয়া, গনেরিয়া, লিউকোমিয়া, হার্নিয়া। অথচ এখন মানুষ কতো সুন্দর রোগে আক্রান্ত হয়। নামের কি বাহার! কেমন বিদেশি বিদেশি লাগে। এখনকার রোগগুলির শেষে ‘ইস্’ আর ‘আস্’ যুক্ত থাকে। যেমন: ব্রঙ্কাইটিস, এপেন্ডোসাইটিস, হুপিংকাশ। ধন্য তুমি ভানুবাবু। আর্সেনিকে কোন প্রকারে যদি আক্রান্ত হওয়া যায়, কতই না মধুর সময় কাটিবে! আহহারে! এই রোগে যে তামাম বাঙালি করে আক্রান্ত হইবে! কেমন ‘ইক’ করা একটা শব্দ! অদূর ভবিষ্যতে এই ‘ইক’ নিয়া কাব্য লিখিব বলিয়া এই মুহূর্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলাম)। বঙ্গ সন্তানের অসম্ভব রকমের সুন্দর স্বাস্থ্যহানী হইয়া স্লিম ফিগারে পরিণত হইবে, গ্ল্যামার বাড়িবে। হাড্ডির সাথে চর্মের মিলনে বাঙালি হাড্ডিচর্মসার হইয়া পড়িবে, ভাবিলেই মনে পুলক জাগে! অথচ কী আশ্চর্য! ভারতমাসির এই চমৎকার কর্মকা-ের কেহ কেহ বিরোধিতাও করিতেছে। কত বড় সাহস! ইচ্ছা করে, ওই বিরোধীদের নাসিকায় মুষ্ঠাঘাত, পশ্চাতে পদাঘাত, পৃষ্ঠে বেত্রাঘাত, গ-ে চপেটাঘাতের ন্যায় যত প্রকার আঘাত রহিয়াছে, তাহাই করি, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করিয়া দেই। কেননা, ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন জ্ঞাত করাইয়াছেন যে, ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতমাসির পরিবেশবাদিদের যৌথ আন্দোলনের মুখে ভারত সরকার হিমালয়ভিত্তিক নদীগুলিতে আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখে। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে কয়েকটি সম্মেলন হইয়াছে। যদিচ ভারত আন্তর্জাতিক নদীগুলিতে বাঁধ বন্ধ রাখিলেও নিজস্ব নদীগুলিতে আন্ত:সংযোগের কাজ অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে ভারতমাসি তার নিজের অভ্যন্তরে প্রায় ৭০০ বাঁধ নির্মাণ করিয়াছে। এই প্রকল্পটি মাসির একটি অতি পুরাতন পরিকল্পনা। টিপাইমুখ এই পরিকল্পনারই অংশ। ২০০২ সালে এই প্রকল্প নিয়া তোড়জোড় শুরু হইলে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে আন্দোলন শুরু হয়। কারণ এই প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইবে; তেমনি ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। ইহা বাস্তবায়ন হইলে বাংলাদেশ ও ভারতের ৯টি রাজ্য মরুভূমিতে পরিণত হইবে। ফলে দুই দেশের উদ্যোগে যৌথ প্রতিবাদের মুখে তৎকালীন ভারত সরকার কাপুরুষের মত পিছু হটে। ব্রহ্মপুত্র নদ হইতে পানি নিতে হইলে উত্তর-পূর্ব ভারত ও মধ্য-ভারতে অন্তত দুইটি রাজ্যে পাহাড়ের উঁচু  প্লেটের ওপর দিয়া পানি নিতে হইবে। এইজন্য বিশেষ যন্ত্রচালিত মেশিন ব্যবহার করিতে হইবে। যাহা হইবে খুবই ব্যয়বহুল। ওই পানি দূর-দূরান্তে নেওয়ার সময়ও অনেক অপচয় হইবে। এই কারণে ওই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ প্রকল্পের পানি না নেওয়ার ঘোষণা দিয়াছিলেন। ইহাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের খরা পরিস্থিতির উন্নতি হইয়াছে, সেইখানে বৃষ্টি হইতেছে, এমনকি বন্যাও হইয়াছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওইসব এলাকার পানির সমস্যা দূর হইয়াছে। ফলে ওই অঞ্চলে এই নদী সংযোগ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমিয়া গিয়াছে। ইহারপরও ভারতীয় এবং বিদেশি কিছু বেনিয়াগোষ্ঠী এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাহিতেছে। কারণ সেইখানে বিশাল বিশাল ঠিকাদারি পাওয়া যাইবে, বাঁধ হইবে, খাল খনন হইবে, রাস্তা তৈয়ার হইবে, যাহার সঙ্গে জড়িত রহিয়াছে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য। ফলে বেনিয়াগোষ্ঠী এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাহিতেছে। এই পরিবেশবিদ বলেন, বাংলাদেশের মিঠা পানির তিন ভাগের দুই ভাগই আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হইলে ওই নদীর ৬০ ভাগ পানি উজান হইতে চলিয়া যাইবে। এমনিতেই চীন ব্রহ্মপুত্রের ওপর বাঁধ নির্মাণের পাঁয়তারা করিতেছে। তাহার উপর এই ৬০ ভাগ পানি প্রত্যাহার হইয়া গেলে বাংলাদেশ ও ভারতের ৯টি রাজ্যের জন্য এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
হইলে হইবে। তাহাতে কাহার কি যায় আসে! বঙ্গবালা মরুভূমি হইবে। পৃথিবীর অন্যান্য মরুদেশ কি বাঁচিয়া নাই? যদি কেউ অন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দিয়া প্রতিবেশি দেশভগ্নিকে মরুভূমি বানাইতে চায়, তবে তাই করুক। কেননা, মরু জীবনযাত্রার প্রতি আমাদেরও আকর্ষণ কম নয়। তাই ভারতমাসির এই শুভ উদ্দেশ্যকে আমরা স্বাগত জানাইয়া, মাসতুতো দাদাদের সাথে আমরাও একাত্মতা ঘোষণা করিয়া কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়াছি। তাহার একটি হইতেছে নদীভক্ষণ, আরেকটি নদীদূষণ। অপরাপর আরও কিছু কার্যক্রম আমাদের হাতে আছে, সেসব লইয়া পরে আলোচনা করিলেও চলিবে। মাসতুতো ভাইদের কল্যাণে যে সমস্ত নদী ইতোমধ্যে শুকাইয়া গিয়াছে, আমরা সেইসব নদীর জমি দখল করিয়া লইতেছি। কিছু নদীর নিচুজমি আমরা মাটি দ্বারা ভরাট করিয়া দিতেছি। এইসব জমিগুলিকে আমরা প্লট আকারে বাঙালদের কাছে বিক্রয় করিতেছি। শুধু মাত্র মাসতুতো ভাইয়েরাই ব্যবসা করিবে, ইহা মানিয়া লই কী প্রকারে! উহাদের সাথে আমরা এখন প্রতিযোগিতায় নামিয়াছি, দেখি কে কত লাভ করিতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা দেশের প্রায় সকল নদীর উপরেই দখল প্রতিষ্ঠা করিতে পারিয়াছি। আমরা নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় আগ্রাসন চালাইয়াছি। অবৈধ বালু উত্তোলন করিতেছি এবং ইহা বেসরকারিভাবে। সরকারিভাবেও আমাদের কাজের ইন্ধন পাইতেছি। পর্যটন কর্পোরেশন, মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশন, নৌবাহিনীর জেটি ইত্যাদি সংস্থা আমাদের সাথে হাত মিলাইয়া নদী ভরাট করিতেছে। ইহা ছাড়া শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে মীর সিমেন্ট, সিমেক্স ডকইয়ার্ড, পূবালী সল্ট, মেরিন টেকনোলজি, ডিপিডিসি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ খাদ্য গুদাম, আকিজ সিমেন্ট, পারটেক্স, ড্যানিশ, ক্রাউন সিমেন্ট, শাহ সিমেন্ট ইত্যাদিরা যে যেভাবে পারিতেছি নদীর দখল লইতেছি। আমরা মেঘনা নদীর দখল করিতেছি। বঙ্গদেশে আমাদের এইরূপ রঙ্গ করিয়া নদীর জমি দখল করায় ইতোমধ্যে মিডিয়াতে অনেক খবর প্রচার হইতেছে। কিন্তু আমরা তাহা থোড়াই কেয়ার করি। এত কেয়ার করিয়া চলিলে বাণিজ্য চলে না। তবে মিডিয়াতে আমাদের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ হইলে আমাদের গাত্র জ্বালা করে। এইরূপ জ্বালাময়ী খবরের অন্ত নাই। উহারা কুমিল্লার গোমতী নদীর পাড় কাটিয়া সাবাড় করার খবর প্রকাশ করিয়াছে। নদীর পাড়ের মাটি কাটা দ্রুত বন্ধ না করিলে নদীর ক্ষতি তো হইবেই, পাশের রেলসেতুটিও হুমকির মুখে পড়িবে বলিয়া যে খবর প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাদের আমাদের ভ্রুক্ষেপ নাই। গোমতী নদীর দুই পাড়ের প্রায় ৩৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়িয়া আমাদের মাটি কাটার উৎসব চলিতেছে। কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকা কটক বাজার হইতে বুড়িচং উপজেলার কংসনগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়িয়া শত শত ট্রাক্টরে করিয়া প্রতিদিন পাড়ের মাটি কাটিয়া লইয়া যাইতেছি। এইভাবে কীর্তনখোলা নদী ভরাট করিয়া বিশাল এলাকা লইয়া আমাদের জ্ঞাতিভাই অপসোনিন তাহাদের কারখানা নির্মান করিতেছে। যদিও কীর্তনখোলার জমি দখলের পাশাপাশি নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন মৌজার জমি দখলের অভিযোগে এই পর্যন্ত ৮টি মামলা দায়ের হইয়াছে। আরও দুইটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হইয়াছে। কিন্তু আমাদের জ্ঞাতি ভাই অপসোনিন কোম্পানীর মালিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় তাহারা বহাল তবিয়তেই আছে।
আমরা এইরূপ বহাল তবিয়তেই থাকিব। কেহ আমাদের কিছু করিতে পারিবে না। সরকার আমাদের, বিরোধী দল আমাদের। স্বাধীন দেশে আমরাও সবাই স্বাধীন। এই দেশে যে যেভাবে পারিব মারিয়া কাটিয়া খাইব। তাই বঙ্গবালার প্রায় সব কয়টি নদীর উপরেই আমাদের দখল প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। 
পরিবেশবিদদের প্রতি আমাদের বড়ই ক্রোধ জমিয়া রহিয়াছে। ওই বে-আক্কেল পরিবেশবিদরা কেবলই জীব বৈচিত্র লইয়া লাফালাফি করে। উহাদের জানা উচিত- দেশীয় বৃক্ষ-লতা-পাতা-ফুল-ফসল নিমূল করিয়া আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করিতেছি। তাহা কত্ত বড় আবিষ্কার বিজ্ঞান একদিন উহার মূল্য বুঝিবে। অথচ কী আশ্চর্য, পরিবেশবিদদের কাহারও আমাদের এই আবিষ্কারের প্রাতি মানবিক সমর্থন নাই! ছি! ইহা অতিশয় মন্দ স্বভাব। পরিবেশবিদদের স্বভাব পরিবর্তন করিবার সুযোগ আসিয়াছে কিন্তু উহারা সেই সুযোগ আহাম্মকের ন্যায় হাতছাড়া করিতেছে। উহারা জানে না মরুভূমির কত বৈচিত্র! আহাহা! বঙদেশ মরুভূমি হইলে কত্ত মজা হইবে! এই দেশে ক্যাকটাস জন্মাইবে, ম্যানজানিটার ঝোপঝাড় হইবে, কত্ত ধরনের মরু উদ্ভিদ জন্মাইবে! গরুর বদলে লোকজন উট পুষিবে, ছাগলের পরিবর্তে দুম্বা, আর মহিষের পরিবর্তে ঘোড়া পুষিবে। আর মরুজীবনের স্বাদ যে কত্ত আনন্দের, উহা কী কেহই একবারও ভাবিয়া দেখিবে না! আমরা তাম্বুর নিচে বসবাস করিব, কত্ত মজা হইবে! বঙ্গবালার সাথে রঙ্গলীলা করিতে আমরা নদীমাতৃক বঙভূমিকে মরুমাতৃক করিয়া দিব। পরিবেশবিদরা কবি নজরুলের কবিতা “ভেঙ্গে আবার গড়তে জানে সে বড় সুন্দর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নতুনের কেতন উড়ে......” ভুলিয়া গিয়া অকারণে লাফালাফি করিতেছে। বার্ধক্য উহাদের আকড়াইয়া ধরিয়াছে, তাই নতুন সৃষ্টিতে ভয় পায়। সাহিত্যে ‘কাপুরুষ’ বলিয়া অভিশম্পাত করিলেও এই বে-আক্কেল পরিবেশবিদদের একটুও লজ্জা হয় না। ছি!
বঙ্গবালাকে মরুকরণে একটা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সকলকে জানাইয়া দেওয়ার বাসনা আমরা দীর্ঘকাল বুকের মধ্যে লালন করিয়া চলিয়াছি। কিন্তু সময়ের অভাবে তাহা আর হইয়াই উঠে না। সকলের জানা থাকা দরকার যে, ভারতমাসি পানির মত তুচ্ছ একটা জলজ পদার্থকে আটকাইয়া রাখিয়া বঙ্গবালার নদ-নদীগুলিকে শুকাইয়া দিয়া আমাদের কত কল্যাণ করিয়াছে। এখন ঐ সকল নদ-নদীর জমিসমূহকে আমরা দখল করিয়া লইব। জাতীয় সম্পদ আমাদের ব্যক্তিগত হইয়া যাইবে। কেননা, আমরা তো জাতিরই একটা অংশ। সেই হিসাবে আমরা ঐ জমির নিশ্চয়ই হকদার! দখলিস্বত্বে আমরা সেই জমি বিক্রয় করিব, কল-কারখানা গড়িয়া তুলিব, বাড়ি বানাইব। কৃষিনির্ভর বাংলাকে আমরা শিল্পে সমৃদ্ধ করিব। জমি দখল করিতে আমরা দশের নদ-নদীগুলিতে তিরতির করিয়া বহিয়া যাওয়া জলধারায় প্রথমেই কল-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ দিয়া দূষণ আরম্ভ করিয়া দেখিলাম, তাহাতে বেশ কাজ দিল। বঙ্গভূমির নদ-নদী হইতে ভোজবাজির ন্যায় মৎসকূলের কতক পালাইয়া গেল, কতক মরিয়া ঢোল হইয়া জলে ভাসিতে লাগিল। নদীর জলে সাপ-ব্যাঙ-কুমির-মৎস নির্মূল হইতে না হইতেই পানির স্বাদ ও গন্ধ বিদূরিত হইয়া এমন মনোরম বিটকেলে এবং মোহনীয় দুর্গন্ধ ছড়াইতে লাগিল যে, নাসিকায় ভয়ানক আরামের শিহর অনুভব করিতে লাগিলাম। সুগন্ধি আতরের এমন বিপরীত সুবাসিত দুর্গন্ধে বুঝিয়া গেলাম, কাজ দিবে। আমরা পারিব। এমন বিটকেলে গন্ধজলে স্নান করিয়া যদি কেহ ঈদের জামাতে নামাজে শরিক হয়, তবে সে যে কত কিসিমের পুরস্কার পাইবে, তাহার ভাগ তো কেহ আমাদের দিবে না! নাই বা দিল, আফসোস করিয়া কী লাভ! শেষে পুরস্কারের ভাগ লইতে যাইয়া কোলাকুলির পরিবর্তে কিলাকিলি করিতে আমাদের শখ নাই।
যে সকল উজবুকেরা নদীর জলে মৎস নাই মৎস নাই বলিয়া চেঁচামেচি করে, মৎসের পরিবর্তে আমরা তাহাদের পোল্টির মুরগা খাওয়াইব। ফরেন মুরগার স্বাদ একবার ধরাইয়া দিতে পারিলে পোল্ট্রি করিতে দোষ কোথায়! হাইব্রিড মুরগার মাংশ বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা রূপে আবিভুত হইয়াছে বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস। ঐদিকে, নদীর জমি ভরাট করিয়া কারখানা করিতে সমস্যা কোথায়! যদি বেকার সমস্যার সমাধান হয় তবে ফরেন কান্ট্রি থেকে আমরা মৎস আমদানি করিয়া আনিব। আমিষের অভাব পূরণ হওয়া লইয়াই কথা! মাছ খাইব না; মাংশ খাইব, ভাত খাইব না; পোলাও খাইব। চাইকি বিরিয়ানিও হইতে পারে।
কিন্তু আফসোস! আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য কেহই বুঝিল না। বর্তমান দুনিয়ায় বুঝদার মানুষের বড়ই অভাব। তবে আমরা আশাবাদি, আমাদের ভাবি বংশধরেরা বুঝদার হইবে। শাখামৃগ কিছু পরিবেশবিদদের সাথে আঁতাত করিয়া সরকার আমাদের কল-কারখানায় কয়েকদফা ভ্রাম্যমান আদালত পাঠাইয়া যদিও বেশ কিছু জরিমানা আদায় করিয়া লইয়াছে। তা করুক না, কত আর আদায় করবে! আমরা উসুল তুলিতে জানি।
আমরা আমাদের কার্যক্রম শতভাগ গতিতে চালাইয়া যাইব। কেহই রোধ করিতে পারিবে না। কিছু লোক অবশ্য চেষ্টা করিবে যাহাতে আমাদের ক্ষতি হয়। তাহা করুক। পৃথিবীর সমস্ত ভাল কাজের বিরোধিতা অনেকেই করিয়াছে, ইতিহাস স্বাক্ষী। আমাদের বিরোধিতাও অনেকে করিবে, আমরা জানি। টেলিভিশনে, পত্রিকায়, ইন্টারনেটে আমাদের কর্মকা-ের বিরুদ্ধে নিয়মিত খবর প্রচারিত হইতেছে, তথ্য আদান প্রদান হইতেছে, রাজপথে মানব বন্ধন হইতেছে। হউক, হ্ইবেই  তো। কিন্তু সকলেই একদিন বুঝিবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা আরেকটি কতবড় নতুন মরুভূমি নির্মাণ করিয়া গেলাম। নতুন প্রজন্ম কোনদিন হয়ত আমাদের এই মহৎ কাজের সম্মানে “নদীখাদক” খেতাবে ভূষিত করিয়া মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার জন্য বঙ্গ নামের নতুন মরুর বুকে তিক্তানুষ্ঠান করিবে। কিন্তু ঐ মরণোত্তর পুরস্কার লইয়া আমরা কী করিব, জীবিত থাকিয়াই যদি না পাইলাম! তাই, উহাও আমরা নতুন প্রজন্মকে দান করিয়া দিয়া গেলাম। দানে আমরা হাজি মোহাম্মদ মহসীনকেও ছাড়াইয়া যাইতে চাই, যাহাতে গিনিচ বুকে আমাদের নামও দানবীর হিসাবে লেখা থাকে।
তারিখ: ২৯ জুন, ২০১২

পরিচিতি: কবি, লেখক ও সাংবাদিক এবং  ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, পাক্ষিক সময়ের বিবর্তন
ইমেলঃ auronalok70@yahoo.com

Sunday, December 18, 2011

প্রতিবেশী || আহসান হাবীব

— পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল ভেদ করে দেখা যায়, এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে একজন।
— কে সে? নিশ্চয়ই বড় বিজ্ঞানী?
— তা তো বটেই।
— তা জিনিসটা কি? মানে আবিষ্কারটা?
— কেন জানালা!
ছোটবেলায় এই জোকটা ছিল জালাল সাহেবের প্রিয় একটা জোক। আর বড় বেলায় এসে এই জোকই এখন যেন বিগ ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে! বিষয়টা খুলেই বলা যাক...
জালাল সাহেব অবশেষে একটি ফ্ল্যাটের মালিক হলেন। জমিজমা বেচে, অফিসের গ্র্যাচুইটি, পেনশন, হাবি-জাবি সব মিলিয়ে সবেধন নীলমণি এই ফ্ল্যাট। আটশ’ স্কয়ার ফিটের ফারমের মুরগির খাঁচা বললেই ভালো হতো। কিন্তু যেহেতু মূল্য চল্লিশ লাখ সামথিং... নিয়েছে (বারো কিস্তিতে) কাজেই এটাকে ঠিক মুরগির খাঁচা বলা যাচ্ছে না। ফ্ল্যাটই বলতে হচ্ছে। ভার্সিটিতে পড়ুয়া মেয়ের একটা রুম হয়েছে, কলেজ গোয়িং ছেলের একটা রুম হয়েছে এতেই তিনি খুশি। তাদেরও একটা বেডরুম হয়েছে সঙ্গে এটাচড বাথ। স্ত্রীর ঐ একটাই শখ ছিল, এটাচড বাথ হবে। শেষ জীবনে এসে সে আশা পূর্ণ হলো, তাই বা মন্দ কি? ভালোই চলছিল তাদের। নতুন ফ্ল্যাটে নতুন জীবন। কিন্তু একটা সমস্যা আবিষ্কার করলেন তার স্ত্রী। সমস্যাই বটে, ভয়াবহ সমস্যা। তাদের বেডরুমের একমাত্র জানালাটি খুললেই পাশের ফ্ল্যাটে টয়লেটের একমাত্র জানালা ... দূরত্ব কত হবে, খুব বেশি হলেও দেড় ফিট... সেই যে বিজ্ঞাপনে বলে না দূরত্ব যতই হোক কাছে থাকুন... কিন্তু এই কাছে থাকা সত্যি কঠিন, জানালা খুললেই ... !!
— আমার মনে হয় কি জান? স্ত্রী নাক কুঁচকে বলে।
— কি?
— ওরা যেদিন তোমার মতো পচা বাজার করে আনে, সেদিনই বাজে গন্ধটা নাকে বেশি লাগে...
— কি, আমি পচা বাজার করি?
— এটা নিয়ে আমি তর্ক করতে চাই না। এখন বল এই সমস্যার সমাধান কি? জানালাই যদি খুলতে না পারি, তাহলে ফ্ল্যাট বাড়ির এত বড় জানালা দিয়ে হবেটা কি?
— জানালা আমরা খুলবই খুলব ...
— কিন্তু ঐ টয়লেটের গন্ধ...?
— ঐ যে তুমি বললে ওরা যেদিন পচা বাজার করে সেদিনই...
— হ্যাঁ সেদিনই গন্ধটা বেশি আসে। পচা জিনিস খেয়ে পেট নেমে যায় তখন...
— হ্যাঁ... ওরা যাতে পচা বাজার না করে সে ব্যবস্থাই করতে হবে...
— মানে??

জালাল সাহেব মানে’র ব্যাখ্যায় আর গেলেন না। তিনি নিচে নেমে গেলেন। এই সময়টায় পাশের বাসার ভদ্রলোক সিগারেট খেতে বাইরে বের হোন। তার সঙ্গে একটু আলাপ জমানো দরকার। সিগারেট যারা খায়, তাদের মধ্যে আলাপ জমতে বেশি সময় লাগে না। এ আলাপ সে আলাপ করে খুব দ্রুতই তিনি আসল প্রশ্নে চলে এলেন।
— আচ্ছা আপনার বাসায় বাজার কার হাতে?
— কেন নিজেই করি। হঠাত্ এ প্রশ্ন করলেন যে?
— না, আমার বাসার বাজারও আমি করি কিনা! ভাবছি দু’জন এক সাথে গেলে... গল্পে গল্পে বেশ ... হে হে
— তা মন্দ বলেননি। আচ্ছা আপনি পচা মাছ ভালো মাছ বুঝতে পারেন?
জালাল সাহেব হাতের তালুর মধ্যে যেন চাঁদ পেলেন। এই সুযোগ।
— আমি মনে হয় বুঝতে পারি না। ভদ্রলোক বলতে থাকেন। ‘এইতো গতকাল শোল মাছ কিনলাম। আবার সন্দেহ হলো টাকি মাছও হতে পারে, বাসায় এনে স্ত্রীকে বললাম ‘দেখ তো এটা কি মাছ, শোল না টাকি?’ স্ত্রী কি বলল জানেন?
— কি বললেন ভাবী?
— বলল পচা মাছ!
— হা হা হা।
— আপনি হাসছেন?
— আরে ভাই বাদ দেন... কাল থেকে আমরা দুই ভাই মিলে বাজার করব, নো পচা মাছ...

পরদিন সত্যি সত্যি জালাল সাহেব আর তার টয়লেট জানালা প্রতিবেশী তরফদার সাহেব চললেন এক সঙ্গে বাজারে। জালাল সাহেবের একটাই উদ্দেশ্য তরফদার সাহেবের বাজার করার দিকে নজর রাখতে হবে, যাতে কোনো পচা জিনিস তার বাজারের ব্যাগে না ঢোকে... এ্যাট এনি কস্ট!
— জালাল সাহেব এ মাছটা মনে হচ্ছে তাজা—
— না না খবরদার... ওটা পচা, অবশ্যই পচা।
— কি করে বুঝলেন?
— দেখছেন না, ওটার গায়ে একটা মাছিও বসছে না। ফরমালিন দেয়া, স্রেফ ফরমালিন...
শেষমেষ তারা দেন-দরবার করে একটা মাছ কিনলেন তরফদার সাহেবের জন্য। ভ্যান ভ্যান করছে মাছি। বাজারের সব মাছি যেন এই মাছটার পেছনে লেগেছে। সেটাই কেনা হলো।
— ভাই জালাল সাহেব আপনি শিওর এটা তাজা মাছ?
— অবশ্যই, দেখছেন না এর পিছনে কত মাছি? মানে ফরমালিন দেয়া নেই...

অবশেষে দুই ভাই, মানে দুই প্রতিবেশী বাজার করে ফিরলেন। ভেতরে ভেতরে জালাল সাহেব পুলকিত। যাক শেষ পর্যন্ত বুদ্ধি করে তাজা মাছ গছানো গেছে প্রতিবেশীকে। আজ অন্তত জানালা খুলে ঘুমানো যাবে। স্ত্রীকে কীভাবে সুখবরটা দেবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না।
তবে সত্যি সত্যি সেদিন জানালা খোলার পরও কোনো গন্ধ এলো না, এ পারে। স্বামী-স্ত্রী আরামে চোখ বুজলেন সার্থক জানালা... কিন্তু একি? হঠাত্ ভ্যান ভ্যান করতে করতে শত শত মাছি ঢুকতে শুরু করল তাদের জানালা দিয়ে। স্ত্রী হতভম্ব হয়ে উঠে বসলেন।
—ওগো এত মাছি কোত্থেকে এলো?
— মনে হয়...
— কি মনে হয়?
মনে হয় ... তরফদার সাহেবের তাজা মাছের মাছিগুলো... এত বড় জানালা পেয়ে...!
সূত্র : আমার দেশ

Tuesday, September 20, 2011

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার কৌতুক

তুরস্কের দার্শনিক, জ্ঞানী, বুদ্ধিমান (কখনও কখনও বোকা) ও প্রচন্ড রসবোধে পরিপূর্ণ হোজ্জার কৌতুক সারা দুনিয়ায় জনপ্রিয়। ইউনেস্কো ১৯৯৬-১৯৯৭ সালকে আন্তর্জাতিক নাসিরুদ্দিন দিবস হিসাবে ঘোষণা করে।

আফসোস, সেই ভিন দেশি এক বীরবল বইটা হারিয়ে গেছে। সেই কবে পড়েছি কিন্তু এখনো বেশ কয়েকটা মনে করতে পারি। তার কয়েকটা কৌতুক এখানে দিলাম।

অভিযোগ নাই
বিবির পিড়াপিড়িতে নাসিরুদ্দিন একটা গরু কিনল। কিন্তু গরু ও গাধার জন্য গোয়াল ঘরে পর্যাপ্ত যায়গা না থাকায়, একটা ঘুমালে আরেকটাকে দাড়িয়ে থাকতে হতো।
প্রিয় গাধার এই দুরবস্থা দেখে হোজ্জা একদিন খোদার কাছে প্রার্থনা করছে, "হে আল্লাহ, দয়া করে গরুটাকে মেরে ফেল যাতে আমার গাধাটা একটু আরাম করে ঘুমাইতে পারে" ।
পরদিন সকালে সে গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখে যে গাধাটা মরে পরে আছে।
প্রানপ্রিয় গাধার মৃত্যতুতে হতাশ হয়ে হোজ্জা বিরস বদনে আকাশের দিকে তাকায়ে বলল, "কোন অভিযোগ করবনা, খোদা, কিন্তু তুমি এতদিন ধরে সারা দুনিয়ার মালিক হয়েও, কোনটা গরু কোনটা গাধা এইটা চিনলানা!"

বিবি তোমার কথাই ঠিক
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা তখন কাজী। বিচার আচার করেন। একদিন বিচারে বসেছেন। ফরিয়াদি আসামির সম্পর্কে তার অভিযোগের বয়ান দিতেছে। হোজ্জা মনযোগ দিয়া তার কথা শুনছেন। বাদীর বলা শেষ হয়ে মাথা ঝাকিয়ে বললেন, 'তোমার কথাই ঠিক'।

এইবার আসামি বলে উঠল, 'হুজুর, আমার দুইটা কথা ছিল'। হোজ্জা বললেন, 'ঠিকাছে তুমি তোমার বক্তব্য বল'। আসামির বক্তব্যও মনযোগ দিয়া শোনার পর হোজ্জা বললেন, 'তোমার কথাই ঠিক'।

হোজ্জার স্ত্রী পর্দার আড়ালে এতক্ষণ সব কথা শুনছিলেন। বিরক্ত হয়ে স্বামীকে তিনি বললেন, 'দুইজনই ঠিক হয় কিভাবে? হয় আসামির কথা ঠিক অথবা ফরিয়াদির কথা ঠিক'।

হোজ্জা স্ত্রীর দিকে ফিরে সমর্থনসূচক হাসি দিয়ে বললেন, 'বিবি তোমার কথাই ঠিক'।

কোর্তার ভিতর আমিও ছিলাম
একদিন রাতে হোজ্জার প্রতিবেশি শুনল হোজ্জার সাথে তার স্ত্রীর ঝগড়া চলছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ভারী একটা কিছু পড়ার আওয়াজ হলো তারপর সব চুপচাপ।
পরদিন সকালে প্রতিবেশি হোজ্জা কে জিজ্ঞাস করে, 'কাল রাতে আপনার বাসায় ভারী কিছু একটা পড়ার শব্দ পেলাম'।
'আমার বিবি রাগ করে আমার কোর্তা জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়', হোজ্জা জানায়।
'একটা কোর্তা পড়ায় এত শব্দ হয়', প্রতিবেশি অবাক।
'আরে কোর্তার ভিতর তো আমিও ছিলাম', হোজ্জা বিরস মুখে জানায়।

মহিলা বিচার চায়
একদিন একজন পুরুষ ও একজন মহিলা বিচারক হোজ্জার দরবারে এল।
মহিলাটি ফরিয়াদ জানায়, 'আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, অপরিচিত এই লোকটা হঠাৎ এসে আমাকে চুমু দিয়েছে। আমি বিচার চাই'।
'আমিও মনে করি তোমার বিচার পাওয়া উচিত', হোজ্জা বলে। 'সুতরাং আমি নির্দেশ দিলাম, তুমি লোকটাকে চুমু দাও এবং তোমার প্রতিশোধ নাও'।

আপনি কি ঘুমাচ্ছেন?
একদিন নাসিরউদ্দিন চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল।
তার শালা এসে জিজ্ঞাস করে, ' আপনি কি ঘুমাচ্ছেন?'
'কেন জিজ্ঞাস করছ', নাসিরুদ্দিন বলে।
'আমি ভাবছিলাম আপনি যদি আমাকে কিছু টাকা ধার দিতেন'।
'ওকে, তাইলে তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর, আমি ঘুমাচ্ছি', নাসিরউদ্দিন বলে। ' এখন আমাকে একা থাকতে দেও'

ভাগ্যিস আমি ছিলামনা
এক রাতে হোজ্জা দেখে বাগানে এক লোক দাড়ায় আছে। চোর ভেবে হোজ্জা ধনুক বের করে চোরের দিকে তীর ছুড়ল। পরদিন সকালে গিয়ে দেখে তারই জামা মেলে দেয়া ছিল। যেটাকে হোজ্জা চোর মনে করে তীর ছুড়েছিল এবং সেই তীর জামাতে বিদ্ধ হয়ে আছে।
সাথে সাথে হোজ্জা মোনাজাত করে আল্লার কাছে শুকরিয়া জানায়।
হোজ্জার বিবি অবাক হয়ে বলে, ' তুমি এখন মোনাজাত করছ কেন?'
'ভাগ্যিস জামার ভিতর আমি ছিলামনা', হোজ্জার উত্তর।

Tuesday, June 14, 2011

বাজেটময় এ জীবন ।। সৈয়দ আলমগীর

সরকারি বাজেট বছরে একবার ঘোষণা করা হলেও আমাদের পারিবারিক বাজেট বছরে গুনে গুনে বার বার ঘোষণা করা হয়। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের বড় কর্তারাই প্রত্যেক মাসে বেতন পেয়ে এ বাজেট ঘোষণা করে থাকেন। তেমনি একটি পরিবারের বড় কর্তা আবুল হোসেন তার পরিবারের জন্য বাজেট ঘোষণা করলেন।
জুন মাসের বাজেটে তিনি সিগারেট ও বাস ভাড়ার ওপর বরাদ্দ বাড়িয়েছেন, আর বাসার ডিশ লাইনের ওপর কোনো বরাদ্দ না রাখায় ওনার বেগম সাহেবা এ বাজেট প্রত্যাখ্যান করেছেন।
—অসম্ভব, এ বাজেট আমি মানি না। বাসায় ডিশ লাইন না রাখলে কি সময় কাটানো যায়?
—অবশ্যই যায়। বাসায় বড় বড় বই রাখা আছে, ওগুলো পড়েও সময় কাটাতে পারবে।
—এত মাস কাটিয়ে দিলাম কিন্তু হঠাত্ এ মাসে ডিশ লাইনের ওপর বরাদ্দ রাখনি কেন?
—এ মাসে বাস ভাড়া ও সিগারেটের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। তাই ডিশ লাইনের ওপর বরাদ্দ রাখলে আমাকে হিমশিম খেতে হবে।
—কি! তোমার এতবড় সাহস। তুমি কলিজা পোড়া সিগারেটের জন্য ডিশ লাইনে বরাদ্দ রাখনি?
—আরে রাখ তোমার ডিশ লাইন, তেলের দাম যে বাড়ছে সেদিকে নজর আছে?
—তেলের দামের সঙ্গে ডিশ লাইনের সম্পর্ক কি?
—শুনো, ডিশ সংযোগ ছাড়া টিভিতে যে চ্যানেলটি দেখা যায় সে চ্যানেলে প্রচুর পরিমাণে তেল দেয়া হয়। তাই ওখান থেকে তেলের ঘাটতি কমাতে পারবা। তাছাড়া তোমার এমনিতেই ভালো ঘুম হয় না, ওই চ্যানেল দেখলে ঘুমও ভালো হবে।
—আমাকে পাম দিবা না, যে সিগারেট কলিজা পোড়ায় সে সিগারেট খাবা কেন?
—ওটা তুমি বুঝবা না, টেনশন তাড়াতেই সিগারেট খাই।
—দাম যখন বেড়েছে সিগারেট না খাইয়া বিড়ি খাইলেই তো পারো।
—আচ্ছা তোমার শপিংয়ের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ থাকে, তার থেকে কিছু মাইনাস করে ডিশ সংযোগের খাতে বরাদ্দ রাখতে পারো।
—অসম্ভব। এত ভয়ঙ্কর কথা তোমার মুখ দিয়ে বেরুলো কীভাবে? কলিজা পোড়ার যখন এতই ইচ্ছা, তখন টাকা দিয়ে সিগারেট কেনার কি দরকার, আমাকে বললে আমিই তো ব্যবস্থা করতে পারি।
—তাই নাকি, তা তোমাদের বংশের কেউ বিড়ি-সিগারেটের ব্যবসা করে নাকি?
—এই খুন্তি দেখছ, এইডা গরম কইরা যহন কলিজা বরাবর পেটের মধ্যে চাইপা ধরুম, তহন দেখবা কলিজা পুইড়া ছাই হইয়া যাইব।
—ছি: ছি: এসব অলক্ষুণে কথা বলছ কেন, দেখা যাক ডিশ সংযোগের বাজেট করা যায় কিনা।

বউয়ের সঙ্গে বাজেট আলাপ সেরে মন খারাপ করে ড্রইং রুমে বসে আছেন আবুল হোসেন। এবার কলেজ পড়ুয়া ছেলে তার বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইল।
—আব্বা আমার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ রেখেছো তাতে আমার এ মাস চলা যাবে না।
—কেন, চলা যাবে না কেন?
—আমি এখন থেকে আনলিমিটেড নেট ব্যবহার করব, তাই বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে।
—তা তিন হাজার টাকায় হবে না?
—শুধু নেট নিলেই তো হবে না। একটা প্যান্ট, একটা শু কিনতে হবে। তাছাড়া আমি এখন কলেজে পড়ি, অতএব আগের মতো পকেট খরচে কি আর চলে?
—শুন, তোমার পকেট খরচ ও মোবাইল খরচের ওপর কর বসিয়েছি। অতএব, ওসব খাতে বরাদ্দ রাখিনি।
—কেন রাখনি বাবা?
—তোমার মতো বয়সে আমি এ খাতে গুরুত্ব দিয়ে বাবার অনেক টাকা নষ্ট করেছি ফলাফলে কিছুই পাইনি।

এবারের বাজেটে আবুল হোসেন তার মেয়ের জন্য পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ রেখেছেন। মেয়ের এই বাজেট পছন্দ হয়নি।
—আব্বু, মাত্র পাঁচ হাজার টাকা কীভাবে আমার জন্য বরাদ্দ রাখলে? সবকিছু মিলিয়ে ৮ হাজার টাকা দাও, আমার খরচ আছে।
—এত টাকা দিয়ে করবি কি?
—ড্রেস কিনতে হবে, পার্লারে যাবার খরচ লাগবে, এছাড়া কোচিংয়ের খরচসহ হাত খরচ তো আছেই।
—ঠিক আছে তোর জন্য বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে, তবে গায়ের জামাটা একটু বড়সড় দেখে কিনিস। ছোটখাটো জামা গায়ে দিয়ে চলাফেরা করলে মানুষ মনে করে আমাদের জামা কেনার টাকাটাও নাই।
—হি: হি: হি:, আব্বু এখন হলো ডিজিটাল যুগ। ওই ছোট ড্রেসই আমাকে অনেক টাকা দিয়ে কিনতে হয়।

মাথায় এক বোঝা টেনশন নিয়ে অফিসে গেলেন আবুল হোসেন। তিনি যে বাজেট ঘোষণা করেছেন, তাতে পরিবারের কেউই সন্তুষ্ট নয়। এমন সময় এলেন এক ভদ্রলোক ফাইল ছাড়াতে।
—স্যার আমার ফাইলটা কি হয়েছে?
—জ্বি না এখনও হয়নি, ডেলিভারি অবস্থায় আছে।
—স্যার আর ক’দিন আসব, ফাইলটা এবার দিয়ে দেন।
—আমি তো দিতেই চাচ্ছি, কিন্তু আপনি আপনারটা দিলেই তো ফাইলটা হয়ে যায়।
—স্যার দেব, তবে আপনি যা বলেছেন তা পারব না।
—তাহলে তো হবে না, এমনিতেই পরিবারের বাজেট ঘোষণা করে বেকায়দায় আছি।
—আপনারা আবার বেকায়দায় থাকেন নাকি?
—আপনার সঙ্গে ফাজলামো করছি নাকি? বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ রেখেছি তাতে বউ, ছেলে-মেয়ে কারোই মন ভরাতে পারিনি। তাই আগের রেট বাদ এখন থেকে নতুন রেট না দিলে ফাইল ছাড়ব না।
—স্যার, বরাদ্দটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? তাছাড়া—
—আমার ছেলেমেয়ে আমার ওপর যে টাকা দাবি করছে সেটাও বেশি হয়ে যাচ্ছে।
—তার মানে আপনি আমাদের টাকা দিয়েই সংসারের বাজেট করবেন?
—অবশ্যই, তা না হলে বেতন পাই মাত্র পনের হাজার টাকা। অতএব এত টাকা পাব কই?
—বুঝছি, আপনি কইয়ের তেলে কই ভাজতাছেন।

সূত্র : আমার দেশ

সংসদের বাইরে যদি বাজেট পেশ করা হয় ।। ইকবাল খন্দকার

যদি কখনও সংসদের বাইরে, বিশেষ করে পল্টন ময়দানের মতো খোলামেলা জায়গায় বাজেট পেশ করা হয়, তাহলে বাজেট পেশকারী তথা অর্থমন্ত্রীকে কী ধরনের মন্তব্য শুনতে হতে পারে, আসুন তা জেনে নেয়া যাক—

১. যেদিন বাজেট পেশ করা হতো, সেদিন সকাল থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন হতো। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে আসতে থাকত ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে। অর্থমন্ত্রী বারবার বাজেট পেশ করতে গিয়েও বাধাগ্রস্ত হতেন। কারণ যতবারই মিছিল আসত, ততবারই মাইকে ঘোষণা করা হতো—আমরা দেখতে পাচ্ছি ঢাকা মহানগর উত্তর কিংবা দক্ষিণ থেকে বিশাল একটি মিছিল এসে যোগ দিয়েছে আমাদের এই বাজেট অধিবেশনে। আসুন আমরা তাদের বরণ করে নিই। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যেত গলা ফাটানো স্লোগান—শুভেচ্ছা স্বাগতম, মিছিলের আগমন। এছাড়া নানা ধরনের তেলমারা কথা তো আছেই।

২. একটার পর একটা মিছিল যখন আসতেই থাকত, তখন অর্থমন্ত্রী খুব ভালোভাবেই বুঝে ফেলতেন যে আজ তার বাজেট পেশ করতে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে। কিন্তু তার যেহেতু বয়স হয়েছে, এতক্ষণ বসে থাকলে তো কোমর ব্যথা হয়, তাই না? তিনি পাতি নেতাদের তখন হয়তো বলতেন আমি আর বসে থাকতে পারছি না, মিছিল আসা শেষ হলে আমাকে মিসকল দিও। পাতি নেতারা তখন হায় হায় করে উঠত—এটা আপনি কী বলছেন? আপনি চলে গেলে কেউ যদি আপনার চেয়ারে বসে পড়ে, তখন চেয়ার পাব কই? দেখছেন না কী পরিমাণ নেতা এসেছে! অর্থমন্ত্রী তখন চেয়ার রক্ষার্থে বসবেন ঠিকই, তবে কান ফাটানো স্লোগান সহ্য করতে না পেরে পিএসকে পাঠাবেন তুলা কিনে আনার জন্য।

৩. বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে সরকারি দলের নেতা-পাতি নেতারা মিছিল নিয়ে আসবে ঠিকই, তবে নিজেদের ব্যানার যাতে সোজা থাকে, যাতে ব্যানারের লেখাগুলো টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে, সেই জন্য তাদের থাকবে আপ্রাণ প্রচেষ্টা। এক এলাকার কর্মীরা যদি তাদের ব্যানার দিয়ে অন্য এলাকার নেতাকর্মীদের ব্যানার ঢেকে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে প্রথমে শুরু হবে ঘুষাঘুষি। কিন্তু তারা ঘুষাঘুষিতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ব্যানারের বাঁশ উঠিয়ে মারবে হেঁইয়ো বলে। তারপর এই মারামারির প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে। অল্পক্ষণের মধ্যেই দেখা যাবে অধিকাংশ নেতাকর্মী আহত হয়ে চলে গেছে হাসপাতালে। অর্থমন্ত্রী এবার এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবেন যে, যাক ঝামেলা একটু কমল। এইবার বাজেট পেশ করা যায়।

৪. অর্থমন্ত্রী যখন বাজেট পেশ করার জন্য দাঁড়াবেন, এমনকি পেশ করতে শুরুও করে দেবেন, তখনই শুরু হয়ে যাবে নানামুখী মন্তব্য। কারণ উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা গোছের পাবলিক থাকতেই পারে। তাদের মধ্যে যদি বাউল টাইপের কেউ থেকে থাকে, তাহলে বলবে—মন্ত্রী সাব, একটা কথা। আপনে সরাসরি বাজেট পেশ না কইরা আমরা যেইভাবে পালাগান শুরু করি, সেইভাবে বাজেটটা পেশ করেন। মন্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবেন পালাগানের মতো করে আবার বাজেট পেশ করে কীভাবে? বাউল টাইপের সেই পাবলিকরা তখন দেখিয়ে দেবে সিস্টেমটা। বলবে চারজন মন্ত্রীকে মঞ্চের চার কোণায় দাঁড়াতে। তারপর বলবে বন্দনা গাইতে—উত্তরে বন্দনা করলাম দয়াল বাবার নাম, দক্ষিণে বন্দনা করলাম অমুক পীরের নাম...

৫. বাজেট অধিবেশনটা যেহেতু টেলিভিশনে লাইভ দেখানো হবে, অতএব ততক্ষণে অনেকে অর্থমন্ত্রীকে টিভিতে দেখেও ফেলবে। টিভিতে দেখার পর দূরের লোকজন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঘটনাস্থলে আসতে না পারলেও কাছের লোকজন তাড়াতাড়ি করে চলে আসবে। তাদের মধ্যে যারা রূপসচেতন, তারা এগিয়ে যাবে অর্থমন্ত্রীর কাছে। গিয়ে বলবে—আপনাকে টিভিতে দেখে ছুটে এলাম। আপনি শুনে হয়তো কষ্ট পেতেও পারেন, তবু কথাটা বলি। মেকাপ ছাড়া টিভিতে দেখতে আপনাকে বেশ খানিকটা খারাপ লাগছে। অন্যদিন মেকাপ ছাড়া ক্যামেরার সামনে এলেও আজ যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ একটা অধিবেশন, প্লিজ আপনি একটা বিরতিতে গিয়ে মেকাপটা করে আসুন। তখনই হয়তো উপস্থাপকের মুখে শোনা যাবে—নিচ্ছি ছোট্ট একটা বিরতি।

৬. অনেক চড়াই-উত্রাই পার হয়ে বাজেট অধিবেশন শেষ হলো। এবার সভা থেকে সবার বিদায় নেয়ার পালা। গাড়ি-টাড়ি সব রেডি করা হলো। পুলিশ-র্যাব সবাই রেডি হয়ে গেল অর্থমন্ত্রীকে গার্ড দেয়ার জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো অর্থমন্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিক-ওদিক তালাশ করা হলো। অবশেষে দেখা গেল এক জায়গায় বেশ কিছু লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণ যারা অর্থমন্ত্রীকে খুঁজছিল, তারা এবার সেই গোল চত্বরের দিকে এগিয়ে গেল। গিয়ে দেখে অর্থমন্ত্রী কী যেন লিখছেন। বিষয়টা ভালোভাবে জানার জন্য আরও কাছে এগিয়ে যেতেই জানা গেল সবাই তাকে ধরেছে অটোগ্রাফ দেয়ার জন্য, তিনি অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। কোনো কোনো অটোগ্রাফের সঙ্গে আবার অর্থনীতি বিষয়ক বাণীও লিখে দিচ্ছেন।

সূত্র : আমার দেশ

Saturday, March 26, 2011

প্রেম কত প্রকার ও কি কি, সবিস্তারে বর্ণনা ।। নাফিস ইফতেখার

১. প্রথম প্রেম: জীবনের প্রথম প্রেম সবার কাছেই স্মরনীয় হয়ে থাকে। প্রথম প্রেমের কোন নির্দিষ্ট বয়স নেই তবে অনেকের ক্ষেত্রেই খুব কম বয়সে প্রথম প্রেম এসে থাকে। প্রথম প্রেম বেশিরভাগ সময়ই আদতে প্রেম হয়না, সেটা হয়ে থাকে Infatuation। প্রথম প্রেম হতে পারে কোন বাল্য বন্ধু, হতে পারে গৃহশিক্ষক বা স্কুলের শিক্ষক বা শিক্ষিকা, হতে পারে বয়সে বড় কোন আপু, হতে পারে কোন ফিল্মের নায়ক বা নায়িকা, হতে পারে পাড়ার কোন হ্যান্ডসাম তরুনী বা বড়ভাই। কারো কারো ক্ষেত্রে আবার জীবনের প্রথম প্রেমই একমাত্র প্রেম। ২. প্রথম দেখায় প্রেম/Love at First Site: প্রথম দেখাতেই এই ধরনের প্রেমের সূত্রপাত। এ ধরনের প্রেম অনেক ক্ষেত্রেই একতরফা হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রেম বেশি দেখা যায়। প্রথম দেখাটা হতে পারে কোন বিবাহ অনুষ্ঠানে, শপিং মল, কলেজ, ভার্সিটি, কোচিং সেন্টারে, স্যারের বাসায়, বন্ধু আড্ডায়। এমনকি বন্ধুর মোবাইলে ছবি দেখেও এ ধরনের প্রেমের শুরু হতে পারে। এ ধরনের প্রেমে প্রায় অবধারিতভাবেই তৃতীয় পক্ষের (বন্ধুকূল বা বড়ভাই) সাহায্যের দরকার পড়ে। এ ধরনের প্রেমের সূত্রপাতে রূপ সৌন্দর্য্য ও দৈহিক সৌন্দর্য্যের ভুমিকাই বেশি।

৩. বন্ধুত্ব থেকে প্রেম: এই ধরনের প্রেমের ক্ষেত্রে প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনেই প্রথমে বন্ধু থাকে। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব কালের বিবর্তনে প্রেমে রূপ নিতে থাকে, অনেক সময়ই দুজনেরই অজান্তে। তবে আশেপাশের মানুষ (বিশেষত বন্ধুকূল) কিন্তু ঠিকই খেয়াল করে। দুঃখজনকভাবে এধরনের প্রেম অনেক সময়ই অকালে ঝরে যায় কোন একতরফা সিদ্ধান্ত বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। অনেকে বন্ধুত্বের এই রূপান্তর মেনে নিতে পারেনা বলে অনুশোচনায় ভোগে - বিশেষত মেয়েরা।

৪. একরাতের প্রেম/One Night Stand: এগুলোকে প্রেম বললে পাপ হবে। ৯০% ক্ষেত্রেই ছেলেরাই এ ধরনের প্রেমের আয়োজক। দৈহিক বাসনাকে পূর্ণতা প্রদান করাই এই প্রেমের প্রধান উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য পূরণের পূর্বে কিছু নাম মাত্র ডেটিং হতে পারে। উদ্দেশ্য পূরণের জনপ্রিয় স্থান: কোন হোটেল, খালি ফ্ল্যাট, সমুদ্রতীরবর্তী কোন শহর।
এই ধরনের প্রেমের মূলমন্ত্র হলো:
"আজকে না হয় ভালোবাসো, আর কোনোদিন নয়........"

৫. বিবাহোত্তর প্রেম: এই প্রেম শুধুমাত্র স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দেখা যায়। বিয়ের ঠিক পর পর প্রথম কয়েক মাস এই প্রেম প্রবল থাকে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পূর্বপরিচিত নয় এমন দুজনের মধ্যে এ্যারেন্ঞ্জ বিয়ে হলে এই ধরনের প্রেম প্রবল রূপে পরিলক্ষিত হয়। প্রেম করে বিয়ে হলে সেক্ষেত্রে বিবাহোত্তর প্রেমে ভাঁটা পড়ে বলে একটি মতবাদ প্রচলিত আছে, কবে এর সত্যতা পরীক্ষিত নয়। বিবাহোত্তর প্রেম ফলাতে হানিমুনের জুড়ি নেই।

৬. পরকীয়া প্রেম: বিয়ের পর স্বামী বা স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন পুরুষ বা মহিলার সাথে প্রেমকেই পরকীয়া প্রেম বলে। পরকীয়া প্রেমের মূল কারনগুলো হলো:

ক. সময়ের সাথে সংসার জীবনের প্রতি অনাগ্রহ বা তিক্ততা চলে আসা।
খ. শারীরিক চাহিদা পূরণে স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি একঘেঁয়েমি চলে আসা।
গ. শারীরিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর অক্ষমতা বা অপূর্ণতা।
ঘ. নিতান্তই এ্যাডভেঞ্চার-প্রিয়তা, লুকিয়ে প্রেম করার স্বাদ অনুভব করা।

মহিলাদের মধ্যে পরকীয়া এদেশে এখনো ততোটা জনপ্রিয় নয় যতোটা পুরষদের মধ্যে। পুরুষদের পরকীয়া প্রেমের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যাক্তিটি কম বয়সী কোন অল্প বয়সী মহিলা এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে যুবতীও হয়ে থাকেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যাক্তিটি সাধারণত কোন মধ্যবয়সী পুরুষ হয়ে থাকেন। ৩০-৪৮ বছর বয়সীদের মধ্যে পরকীয়া প্রেম বহুলভাবে পরিলক্ষিত হয়।

৭. অপরিণত প্রেম/কম বয়সে প্রেম/না বুঝেই প্রেম: এ ধরনের প্রেম সাধারণত স্কুলে পড়ুয়া অবস্থায় হয়ে থাকে। মেয়েরাই এ ধরনের প্রেমে বেশি পড়ে। তবে ছেলেরাও পড়ে। প্রেমিক প্রেমিকাদের দুজনই সমবয়সী হতে পারে। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রেমিক তার চেয়ে বয়সে বড়ও হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রেমের সাফল্যের হার কম - অর্থাৎ এ ধরনের প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় খুব কম ক্ষেত্রেই।

৮. কর্মক্ষেত্রে প্রেম: কর্মসূত্রে দুজন মানুষের পরিচয়ের মাধ্যমে এ ধরনের প্রেম গড়ে ওঠে। উক্ত দুজন হতে পারেন কোন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর দুজন কর্মকর্তা অথবা কোন প্রজেক্টে পরস্পরের পার্টনার। অফিসে নতুন জয়েন করেছেন এমন কোন মেয়ের সাথে এরূপ প্রেমের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অফিসের পুরুষ কর্মকর্তাদের মাঝে তাগিদ দেখা যায়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রেম বেশি দেখা যায়।

৯. মোবাইল প্রেম: বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে বা ফোনবুক থেকে চুরি করে, পাড়ার ফ্লেক্সির দোকান থেকে সংগ্রহ করে, অন্য কোন সুত্র থেকে নাস্বার পেয়ে বা নিতান্তই মনের মাধুরী মিশিয়ে কোন নাম্বার বানিয়ে তাতে ফোন করে কোন মেয়ের সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এই ধরনের প্রেমের সূত্রপাত। অনেক সময় মোবাইলে এভাবে কথা বলে ছেলে মেয়ে পরস্পরের সাথে সামনাসামনি দেখা করে। এ ধরনের প্রেমের সফলতার হার খুবই কম। আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলতা এ ধরনের প্রেমের মূল উদ্দেশ্য নয়।

১০. ইন্টারনেটে প্রেম: ইন্টারনেটে চ্যাটিংয়ে বা সোসিয়্যাল মিডিয়া সাইটে (যেমন - ফেইসবুক, মাইস্পেস) দুজনের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে এ ধরনের প্রেমের সূত্রপাত। অনেক ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ের একজন বিদেশে অবস্থান করে। এভাবে পরিচয়ের পর ছেলে মেয়ে পরস্পরের সাথে সামনাসামনি দেখা করে। এ ধরনের প্রেমে উভয়পক্ষেরই ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকে অনেক। অনেক সময়ই কোন ছেলে মেয়ে সেজে অন্য কোন ছেলের সাথে এমন সম্পর্ক চালিয়ে যায়। আর তাই অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের সম্পর্ক প্রতারণায় পরিণত হয়। পূর্বে এ ধরনের প্রেমের সাফল্যের হার বেশি থাকলেও বর্তমান সময়ে এসে সাফল্যের হার কম।

১১. ত্রিভূজ প্রেম: এ ধরনের প্রেমকে বলা যেতে পারে একজন মেয়েকে নিয়ে দুজন ছেলের টাগ-অফ-ওয়ার বা দড়ি টানাটানি। একই মেয়ের প্রতি দুজন ছেলের ভালোবাসা এই প্রেমের মূলকথা। উক্ত মেয়েকে পেতে দুজন ছেলেই মরিয়া থাকে। ত্রিভূজ প্রেমের ক্ষেত্রে প্রায়শঃই মেয়েরা মানসিক দ্বন্দে ভোগে - কাকে পছন্দ করবে এই নিয়ে। অনেক সময়ই ছেলে দুজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা রূপ নেয় মারামরিতে। দুজন মেয়ে আর একজন ছেলের মধ্যেও ত্রিভূজ প্রেম লক্ষিত হয়। তবে সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা মারামারিতে নয় বরং রূপ নেয় চুলোচুলিতে।

১২. বহুভূজ প্রেম/Multi প্রেম: একই মেয়ে বা ছেলের প্রতি ২ এর অধিক ব্যাক্তির অনুরাগই মূলতঃ বহুভূজ প্রেম। এক্ষেত্রে উক্ত মেয়ে বা ছেলেটি স্বভাবতই দৃষ্টিকাড়া সৌন্দর্য্যের অধিকারী হয়ে থাকেন। সবাই তার সাথে প্রেম করতে চায় এই বিষয়টি তাকে ব্যাপক আনন্দ দেয়।

১৩. অসমবয়সী প্রেম: এ ধরনের প্রেমের বৈশিষ্ট্য প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যে বয়সের উল্লেখযোগ্য ব্যবধান। যদিও মেয়ের চাইতে ছেলে কয়েক বছর বড় হলেও তা স্বাভাবিক প্রেম হিসেবে ধরা হয়, তথাপি, যদি পার্থক্য খুব বেশি হয় - যেমন ১২ বছর তবে তা অসমবয়সী প্রেম হিসেবে ধরা হয়। মজার ব্যাপার হলো ছেলের চাইতে মেয়ে এক বছরের বড় হলেও তা অসমবয়সী প্রেম হয়ে হিসেবে ধরা হয়। অসমবয়সী প্রেমকে এ সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়, বিশেষত যদি মেয়ে ছেলের চাইতে বয়সে বড় হয়। অসমবয়সী প্রেম বিয়েতে রূপ নিলে দাম্পত্য জীবন শান্তিপূর্ণ হয় না বলে একটি মতবাদ এদেষে প্রচলিত আছে, কিন্তু এর কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি।

১৪. শারীরিক প্রেম/শরীর সর্বস্ব প্রেম: প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যে শরীরি আকর্ষণই এই প্রেমের মূল উপাদান। আবেগ ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

১৫. দুধের মাছি প্রেম/অর্থসর্বস্ব প্রেম: "যতোদিন টাকা আছে, ততোদিন সম্পর্ক" - অনেকটা এই নীতির বলে এই ধরনের প্রেম গড়ে ওঠে। অবশ্যই ছেলেরাই টাকা ব্যয় করে থাকে এসব ক্ষেত্রে। ধনীর ঘরের ছেলেদের পক্ষে এই ধরনের সম্পর্ক বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। তবে মোটামুটি আয়ের ছেলেরা খরচের ঠেলায় অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠে, সম্পর্কও আর বেশিদিন থাকেনা। তখন ঐসব মেয়েরা অন্য ছেলের খোঁজে বেরোয়।

১৬. ঈর্ষাণ্বিত প্রেম: "অমুক ছেলে প্রেম করে, আমাকেও করতে হবে" বা "অমুকের বয়ফ্রেন্ড আছে,আমারো চাই" - অনেকটা এমনতর মানসিকতা থেকে এসব প্রেমের সূত্রপাত। এ ধরনের প্রেমগুলো অনেক সময়ই সাময়িক হয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়ই বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড মনের মতো না হলেও প্রয়োজনের তাগিদে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া হয়।

১৭. জেদের বশে প্রেম: পূর্ববর্তী বা বর্তমান বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডকে অনেকটা দেখিয়ে দেয়ার ("তুমি ছাড়াও আমার প্রেম করার লোকের অভাব নেই.......") উদ্দেশ্যে যাকে সামনে পাওয়া যাবে ধরে তার সাথে প্রেম করাই এ ধরনের প্রেমের মূল লক্ষ্য। মনের মতো লোক পাওয়ার বিষয়টি এখানে নগণ্য।

১৮. চড়িয়ে খাওয়া প্রেম/গাধাখাটুনি প্রেম/ঘানি টানা প্রেম: প্রেমিক বা প্রেমিকার কাছ থেকে কোন বিশেষ সুবিধা লাভই এ ধরনের প্রেমের উদ্দেশ্য। ক্লাসের ভালো রেজাল্ট করা মেধাবী ছাত্রটি এ ক্ষেত্রে জনপ্রিয় শিকার হিসেবে পরিগণিত হয়। মেয়েদের মধ্যে এ ধরনের প্রেমের প্রচলণ বেশি দেখা গেলেও ছেলেদেরকেও মাঝে মাঝে করতে দেখা যায়।

১৯. অব্যক্ত প্রেম/না বলা প্রেম: নীরবে এক অপরকে ভালোবেসে গেলেও পরিস্থিতি, সময় বা মনোবলের অভাবে প্রেমিক বা প্রেমিকার মধ্যে কেউই একে অপরকে কোনোদিন বলেনি। অব্যক্ত প্রেম হারানোর বেদনা খুব কষ্টদায়ক, জীবনের অন্যতম বড় ভুল হিসেবে মনে থাকে।

২০. সুপ্ত প্রেম: একে অপরকে ভালোবাসে কিন্তু কেউই কাউকে বলছে না, পুরো ব্যাপারটাই লুকিয়ে যাচ্ছে এমন প্রেমই সুপ্ত প্রেম। সুপ্ত প্রেম আজীবন সুপ্ত থেকে গেলে তা পরিণত হয় অব্যক্ত প্রেমে।

২১. চুক্তিবদ্ধ প্রেম: এ ধরনের প্রেম হয় পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে। সাধারণ অর্থে প্রেম বলতে যা বোঝায় তা এই ধরনের প্রেমে অনুপস্থিত থাকে। কোন ভবিষ্যৎ থাকেনা এসব সম্পর্কের। মূল উদ্দেশ্য হলো কোন বিশেষ গোষ্ঠীকে নিজেদের মধ্যে প্রেম দেখিয়ে কোন বিশেষ স্বার্থ চরিতার্থকরণ। শোবিজ ও মিডিয়ার তারকাদের মধ্যে এ ধরনের প্রেম বেশি দেখা যায়।

২২. মিথ্যে প্রেম/অভিনয় প্রেম: এ ধরনের প্রেমে প্রেমিক বা প্রেমিকার দুজনের যেকোন একজন প্রেমের অভিনয় করে যায়। যখন প্রেমিক বা প্রেমিকার কেউ একজন ভবিষ্যতের কথা ভাবতে আরম্ভ করে তখন এই প্রেমের সমাপ্তি ঘটে। এ ধরনের প্রেমের পরিণতিও যেকোন একজনের জন্য খুবই কষ্টদায়ক।

২৩. ২য় ইনিংস প্রেম/Old is Gold প্রেম/Revived প্রেম: পূর্ববর্তী বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের সাথে পুনরায় জুড়ে গিয়ে এই প্রেম করা হয়।

২৪. ব্ল্যাকমেইল প্রেম/অনিচ্ছাপূর্বক প্রেম/জোড় খাটানো প্রেম: এটাকেও প্রেম বললে পাপ হবে। জোড়পূর্বক এসব প্রেম করা হয়ে থাকে। এর শিকার হয়ে থাকে মেয়েরাই। পাড়ার বখাটে ছেলে বা বড় ভাই, কলেজের বখাটে ছাত্র, কর্মক্ষেত্রে উপরস্থ কর্মকর্তা বা বস প্রধানত এরাই এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী হন।

২৫. গায়ে পড়ে প্রেম/নাছোড়বান্দা প্রেম: মেয়ে কোন সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী নয় তবুও ছেলে জোড় চেষ্টা চালিয়ে যায় এমন প্রেমে। অনেক সময়ই এমন পরিস্থিতিতে মেয়েরা সরাসরি না বলতে পারে না যার মাশুল তাদেরকে পরে দিতে হয়।

২৬. বিদেশী প্রেম/পরবাসী প্রেম: এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ের মধ্যে অন্ততঃ একজন বিদেশী হয়।

২৭. অসাম্প্রদায়িক প্রেম: এ ধরনের প্রেমের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে দুজনে দুই ধর্ম বা সম্প্রদায়ের অনুসারী হয়ে থাকে। সমাজ এ ধরনের সম্পর্ককে সমর্থন করেনা। বিশেষতঃ হিন্দু-মুসলমান ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রেম বেশি বিতর্কের সৃষ্টি করে।

২৮. চাঞ্চল্যকর প্রেম/আলোচিত প্রেম: এ ধরনের প্রেমে প্রেমিক ও প্রেমিকা যাই করেন না কন তা মিডিয়ায় চাঞ্চল্যকর তথ্য হিসেবে প্রচার করা হয়। সাধারণত শো-বিজ আর মিডিয়ার তারকা ও সেলিব্রেটিরা এ ধরনের প্রেম করে থাকেন।

২৯. ঐতিহাসিক প্রেম: এইসব প্রেমের কাহিনীর অবসান ঘটেছে অনেক আগেই কিন্তু আজো রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়। এখনো এসব প্রেমকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়।

৩০. ভাড়াটে প্রেম/ভ্রাম্যমাণ প্রেম/Roaming প্রেম: এ ধরনের প্রেমের প্রেমিক বা প্রেমিকারা বলতে গেলে ভাড়া খাটে। তারা সকালে একজনের গার্লফ্রেন্ড তো বিকেলে আরেকজনের। কোন নির্দিষ্ট ঠিক ঠিকানা নেই। ব্যাপারটা অনেকটা মাসে মাসে মোবাইল হ্যান্ডসেট চেন্ঞ্জ করার মতো।

৩১. প্রেমময় প্রেম: এই প্রেমে প্রেমিক আর প্রেমিকা দুজনেই একজন আরেকজনের দিকে প্রেমময় ভঙ্গিতে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকেন, হাত ধরে বসে থাকেন কোন রেস্টুরেন্টের অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশে, সারাক্ষণ I Love You বলে আর শুনেও ক্লান্তি আসে না তাদের। সারাদিন প্রেমের পর মোবাইলে ১২টার পরও কম জান না তারা।

৩২. ঝগড়াটে প্রেম: সারাক্ষণ দুজনের মধ্যে খিটির-পিটির লেগে থাকাটা এই প্রেমের বৈশিষ্ট্য। কিছুক্ষণ হয়তো দুজনে শান্ত থাকে, তারপর আবার কিছু না কিছু একটা নিয়ে একজন শুরু হয়ে যায়। এ ধরনের প্রেমে ঝগড়াগুলো ক্ষণস্থায়ী হয়, কিন্তু খুব ঘনঘন হয়। ঝগড়াগুলো অধিকাংশই হয় ফোনে। বন্ধুকূল সর্বদা দুজনের ঝগড়া মিটাতে ব্যস্ত থাকে। মেয়ে তার সখীদের কাছে এই ঘনঘন ঝগড়ার কথা বলে বেড়ায়।

৩৩. সমলিঙ্গীয় প্রেম: আমাদের দেশে এখনো খুব একটা প্রচলিত না হলেও বাইরের অনেক দেশেই এই ধরনের প্রেমের প্রচলণ আছে। দুজন ছেলের মধ্যে হলে তাদেরকে Gay বলে আর দুজন মেয়ের মধ্যে হলে Lesbian।

৩৪. অমিল প্রেম/দুনিয়াছাড়া প্রেম: এই প্রেমে প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যে কথাবার্তা, মত, পছন্দ, অপছন্দ কোন দিক দিয়েই কোন মিল থাকেনা, তারপরও কিভাবে যেন সম্পর্ক টিকে থাকে।

৩৫. ব্যর্থ প্রেম: এবং সবশেষে আছে ব্যর্থ প্রেম। এ প্রেম শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে যায়। ব্যর্থ প্রেমিকার চাইতে ব্যর্থ প্রেমিকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। ব্যর্থ প্রেমের শেষটা হয় প্রস্তাব প্রত্যাখান দিয়ে। কখনো কখনো ছেলেদের ভাগ্যে জোটে থাপ্পড়, মেয়েদের জুতার বাড়ি আর কখনো কখনো গণধোলাই। অনেক সময়ই ব্যর্থ প্রেমের পরিণতি হয় করুন। কেউ দেবদাস হয়ে যায়, কেউবা মেয়েদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে ও "দুনিয়ার সব মেয়ে এক" এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। দুর্বল মানসিকতার কেউ কেউ আত্মহননের পথও বেছে নেয়।

* প্রেম খুবই পরিবর্তনশীল ও ব্যাক্তিভেদে এর সংজ্ঞা ভিন্ন। আর আমার দেয়া প্রকারভেদগুলোর সাথে কারো কারো দ্বিমত থাকাটা স্বাভাবিক। আমি দাবী করছি না এখানে সব ধরনের প্রেমের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু অনেক ধরনের কথা বলা হয়েছে এটা সত্য। প্রকারভেদগুলো আলোচনার সময় যতোটা সম্ভব নিরপেক্ষতা অবলম্বনের চেষ্টা করা হয়েছে। কারো কারো কাছে এই প্রচেষ্টা ধৃষ্টতা মনে হলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

* আমি জানি আপনাদের কাছেও অনেক ধরনের প্রকারভেদ আছে প্রেমের। তার কোনটি এই পোস্ট অনুপস্থিত থাকলে মন্তব্যতে যোগ করে দিন। আমি পোস্টে যোগ করতে পেরে আনন্দিত বোধ করবো।

Wednesday, February 9, 2011

লাভ স্টোরি :: ম. লিপ্স্কেরভ

নারী: আমি তোমাকে…
পুরুষ: আমিও তোমাকে…
নারী: আমি বহুদিন ধরে স্বপ্ন দেখে এসেছি, এই দিনটির…
পুরুষ: এই জীবনে এর চেয়ে তীব্রভাবে আর কিছু চাইনি আমি…
নারী: তোমার সবাই রাজি হবে তো?
পুরুষ: আমার পক্ষের কাউকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তোমার দিক থেকে কেউ বিরোধিতা না করলেই হলো…
নারী: আমার পক্ষের সবাই বহু আগে থেকেই রাজি…পুরুষ: চমত্কার…
নারী: অবশেষে তুমি আর আমি…
পুরুষ: হ্যাঁ, চলো, যাওয়া যাক…
নারী: চলো…
তারা দুজন চলল ডিভোর্সের কাগজপত্র জমা দিতে।

বই পরিচিতি :: আদনান মুকিত

প্রচ্ছদ
এ অংশে সুন্দর একটা ছবির ওপর বড় করে বইয়ের নাম এবং লেখকের নাম লেখা থাকে। সহজ বাংলায় একে বলা হয় ‘প্রচ্ছদ’। প্রচ্ছদটা দিয়ে বোঝানো হয় যে এটা বইয়ের শুরু, এদিক থেকেই পাতা ওল্টাতে হবে। তা না হলে অনেকেই পেছন দিক থেকে বই শুরু করত।

প্রিন্টার্স লাইন
ভালো-খারাপ যা-ই হোক, প্রচ্ছদ দেখেই সবার মনে হয়, ‘প্রচ্ছদটা কে করেছে?’ এ প্রশ্নের উত্তর থাকে এই পাতায়। যে প্রকাশক বইটি প্রকাশ করেছেন, তাঁর নাম-ঠিকানাও লেখা থাকে এ পাতায়। আর পুরো বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি এখানে লেখা থাকে। সেটি হচ্ছে বইয়ের দাম।

উৎসর্গ
সাধারণত এ পাতায় কিছু ব্যক্তির নাম লেখা থাকে, যাঁদের আমরা চিনি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ পাতার মাধ্যমে লেখকের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পছন্দের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

ভূমিকা
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। পুরো বইটি না পড়েই কেউ একজন বই সম্পর্কে ভালো ভালো কিছু কথা লেখেন এই অংশে। একে ভূমিকা বলা হয়।

পাতা
গাছের পাতা নয়, এটি বইয়ের পাতা। তবে গাছের পাতায় যেমন অসংখ্য শিরা থাকে, বইয়ের পাতায়ও থাকে অসংখ্য কালো কালো অক্ষর। গাছের পাতার মতো বইয়ের পাতায়ও পোকা বাসা বাঁধে। দেশের ঝালমুড়ি সম্প্রদায়ের কাছে বইয়ের পাতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পৃষ্ঠা নম্বর
পাঠকদের সুবিধার জন্য প্রতিটি পাতায় নম্বর দেওয়া থাকে। নম্বর থাকায় বইটি মোট কত পৃষ্ঠার, তা আর কষ্ট করে গুনতে হয় না।

ফিতা
বইয়ের মাঝখানে একটি চিকন ফিতা থাকে। ভাব নেওয়ার জন্য এই ফিতার গুরুত্ব অপরিসীম। বইয়ের পাতার ফাঁকে ফিতাটি রেখে সহজেই বোঝানো যায় যে বইটা পড়া হচ্ছে।

পুট
আলমারিতে কায়দা করে রাখার জন্য এ অংশটি ব্যবহূত হয়। এ অংশে বই ও লেখকের নাম লম্বালম্বিভাবে লেখা থাকে। ফলে পড়ার জন্য বইটি বের করা ঠিক হবে কি না, তা বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায়।

ফ্ল্যাপ
বইয়ের এ অংশটিকে আদর করে ‘ফ্ল্যাপ’ নামে ডাকা হয়। সাধারণত এ অংশে লেখক দূরদিগন্তে বেশ ভাব নিয়ে তাকিয়ে আছেন—এ টাইপের একটি ছবি থাকে। ছবির নিচে ফটোগ্রাফারের নামও থাকে, যাতে ছবি খারাপ হলে লেখক তাঁর ওপর দোষ চাপাতে পারেন। লেখক সম্পর্কে যত ভালো ভালো কথা বলা সম্ভব, তার সবই ফ্ল্যাপে উল্লেখ করা হয়। লেখক কী কী লিখেছেন, কয়টি পুরস্কার পেয়েছেন, বাংলা সাহিত্যকে তিনি কোন জায়গায় নিয়ে গেছেন—এসব ফ্ল্যাপে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। অতিচালাক লেখকেরা ফ্ল্যাপের লেখাগুলো নিজে লিখে ‘কাছের বন্ধুরা’ নাম দিয়ে বোঝাতে চান, লেখাটি তিনি লেখেননি। বর্তমানে এ স্টাইলটি বেশ জনপ্রিয়।

বইরঙ্গ :: শওকত হোসেন

এক বালিকার সঙ্গে অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল। চাণক্য সেনের পুত্র পিতাকে বইটি পড়তে দিয়েছিলাম। সেই বই পড়ে বালিকার পিতাই মুগ্ধ হয়ে গেল। আমার কাছ থেকে কত বই যে পড়তে নিয়েছিলেন! সেই বই একটাও আর ফেরত পাইনি, মেয়েটাকেও দেননি।

লেখাটা আসলে এতটুকুই। এই গল্পে বালিকা আছে, ভিলেন আছে, প্রেম আছে, বিরহও আছে। কিন্তু এইটুকু গল্পে তো পৃষ্ঠা ভরবে না। আরও বড় গল্প লাগবে। তাহলে আরেকটা গল্প বলি। স্মৃতিকথা ধরনের গল্প।
পাঠক হিসেবে আমি সর্বগ্রাসী। চোখ খোলার পর থেকেই আমার সঙ্গে বইয়ের বসবাস। আমার মায়ের ছিল বইয়ের একটা সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালায় বেশির ভাগই ছিল নিমাই, নিহাররঞ্জন, ফাল্গুনী আর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। আমার ফুফাতো ভাই তখন আমাদের সঙ্গে থাকে। তার থাকার মেয়াদ যত বাড়তে লাগল, মায়ের বইয়ের সংগ্রহ তত ছোট হতে লাগল। আর পাশের বাসার মিলি আপার বই পড়ার নেশা তত বাড়তে লাগল। সেই যুগে প্রেমে পতন ঘটাতে বইয়ের বড় ভূমিকা ছিল।
মায়ের বই বেহাত হওয়ার প্রতিশোধ নিয়েছিলাম আরও প্রায় ১০ বছর পর। চাচা মারা যাওয়ায় চাচাতো ভাই পান্না ভাই তখন গ্রাম থেকে শহরে, আমাদের বাসায়। সেই যুগে গ্রাম থেকে এলেও মেয়েরা প্রেমে পড়ত। এই নিয়ম মেনে পান্না ভাইয়ের প্রেমে পড়ল পাশের বাসার লিপি আপা। লিপি আপাদের বই সংগ্রহশালাটি বিশাল। আমি সুযোগের অপচয় করলাম না। বই আনা ও ফেরত দেওয়ার মধ্যে অসংখ্যবার সিস্টেম লস হতে লাগল। আশাপূর্ণার প্রথম প্রতিশ্রুতি এখনো আমার শেলফে শোভা পায়।
এটা আসলে একটা বিরহের গল্প। পান্না ভাইয়ের বউয়ের নাম লিপি না। এই বিশাল বিরহপূর্ণ প্রেমকাহিনির মধ্যে কেবল আমারই লাভ (মুনাফা অর্থে) হয়েছিল।
এবার একটা ঐতিহাসিক প্রেম-বিরহের গল্প। নাতি নানাকে বই পড়তে দেখে জানতে চাইল, নানা, তুমি কী বই পড়ছো?
নানা বলল, ইতিহাসের বই।
নাতি বলল, মিথ্যে কথা। তুমি একটা বড়দের প্রেমের উপন্যাস পড়ছো।
এবার নানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ওটা তো আমার জন্য ইতিহাসই, নানাভাই।

২.
এবার বই লেখার গল্প। কেউ বই যদি না-ই লিখবে, তাহলে পড়ব কী? বড়রা আফসোস করে বলে, আজকালকার ছেলেমেয়েরা বই পড়ে না। কিন্তু বইমেলায় যে পরিমাণ বই প্রকাশিত হয় এবং বিক্রি হয়, তাতে কথাটি ধোপে টেকে না। সুতরাং নতুন নতুন লেখক তৈরি হচ্ছে। এখন তো নতুন লেখক তৈরির নানা সুযোগ। একজন নতুন লেখকের গল্প বলি।
তাঁর সঙ্গে দেখা এক সেমিনারে। পরিচয় হতেই জানালেন তিনিও লেখক। জানতে চাইলাম, কোথায় লেখেন।
—ফ্রিল্যান্স।
—কোন কোন পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে লেখেন।
—ইন ফ্যাক্ট ইন্টারনেটে।
এখন তো ইন্টারনেট ব্লগের মতো লেখালেখির নানা মাধ্যম হয়েছে। খুশি হয়ে জানতে চাইলাম, সেখানে কোথায়?
—অ্যাজ অ্যা ম্যাটার অব ফ্যাক্ট, আমি বাংলায় লিখি না, ইংলিশে।
—তা কোন সাইটে বা ফোরামে বা ব্লগে লিখছেন?
মেয়েটি উত্তর দেয়—ফেসবুকে।
তোমাকে খুঁজছে বাংলাদেশ-টাইপ আয়োজকেরা এসব লেখকদের দিকে এবার একটু তাকাতে পারেন। তবে তার আগে মার্ক টোয়েনের সেই পুরোনো গল্পটা আবার বলা যেতে পারে।
একদিন একজন এসে মার্ক টোয়েনকে এক লেখকের নতুন বই বের হওয়ার খবর দিয়ে জানতে চাইল, বইটা পড়েছেন?
মার্ক টোয়েন বললেন, হ্যাঁ, দেখেছি।
সেই একজন এবার আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, বইটা কেমন?
মার্ক টোয়েন বললেন, সত্যি বলতে কি, বইটা বন্ধ করলে আর খোলা যায় না।

৩.
বই পড়ার গল্প অনেক হলো। এবার বই পাওয়ার গল্প। বই পড়তে এসে ফেরত না দেওয়া পুরোনো তরিকা। সেই মার্ক টোয়েনের আমল থেকেই। তবে বই মেরে বইয়ের শেলফ ভরা যায় না। বই কিনতে হয়। আর বই কেনার সবচেয়ে ভালো জায়গা বইমেলা। আরও কম বয়সে আমার যখন বুদ্ধি বেশি ছিল, তখন বই পাওয়ার একটা উপায় বের করেছিলাম। কপিরাইটের এই যুগেও সেই আইডিয়াটি এখন ফ্রি বলা যেতে পারে।
আমার বাসায় একটা নোটিশ বোর্ড ছিল। সেই নোটিশ বোর্ডে প্রতিদিন জনগুরুত্বপূর্ণ নানা ধরনের নোটিশ টাঙাতাম। যেমন, একদিন হয়তো নোটিশ বোর্ডে ঝুলল, ‘আজকের রান্না ভালো হয়নি, ভাত ছিল ভর্তা’, আরেক দিন হয়তো বিরিয়ানি খাওয়ার অনুরোধের নোটিশ। এক ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে নোটিশ বোর্ডের সর্বোত্তম ব্যবহার করেছিলাম। সামনেই ছিল জন্মদিন। তাই বইমেলা ঘুরে ঘুরে পছন্দের বইগুলোর একটি তালিকা করে ঝুলিয়ে দিলাম নোটিশ বোর্ডে। নিচে লিখলাম, ‘এই বইগুলো আমার নেই। আমার জন্মদিনে এগুলো দিলেই বেশি খুশি হব।’ টার্গেট ছিল মামা, খালু, চাচা ধরনের মানুষেরা। এমন নয় যে আগের জন্মদিনে তারা আমাকে কিছু দিয়েছিল। কিন্তু এইবার পড়ল ফাঁপরে। চক্ষুলজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে। সেবার আমি অনেক বই পেয়েছিলাম।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। সুতরাং, সাবধান! যে কেউ বই না দিয়ে ইন্টারনেটের একটা লিংক বা ওয়েবসাইটের ঠিকানা ধরিয়ে দিতে পারে। আজকাল সবকিছুই নেটে পাওয়া যায়।
ভাইব্রাদার ভাষা, এফএম ভাষার পর নতুন এসেছে ব্লগের ভাষা। সেই ভাষায় বললে বলতে হয়, নেটে বই পড়ে মাইনষে! 

সূত্র : প্রথম আলো

বিল নিয়ে টানাটানি :: সৈয়দ আলমগীর

স্কুলে যখন পড়তাম তখন প্রত্যেক বছরই বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান মন ভরে উপভোগ করতাম। সবচেয়ে মজা লাগত শিক্ষকদের দড়ি টানাটানি খেলাটা। দড়ি টানাটানি খেলায় শুধু শিক্ষকরাই নয়, স্কুল কমিটির সদস্যরাও উপস্থিত থাকতেন। প্রথমে শিক্ষক ও কমিটির লোকজনকে দুই ভাগে ভাগ করা হতো, তারপর শুরু হতো দড়ি টানাটানি। দল ভাগ করা নিয়ে ঘটে যেত অনেক কাণ্ড। বিপত্তিটা লাগত আমাদের প্রধান শিক্ষককে নিয়ে, কারণ ওনার ভুঁড়ি বড় হওয়ায় সবাই দড়ি টানাটানির আগে ওনাকে নিয়েই টানাটানি করত। ওনাকে যে দলে রাখা হতো, সব সময় সে দলই দড়ি টানাটানিতে জিতে যেত। খেলা শুরু হলে দু’পক্ষ থেকেই টানাটানি শুরু হতো। একপর্যায়ে হেড স্যারের পক্ষ কষে টান মারলে বিপক্ষ দলের সদস্যরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ফলাফল, হেড স্যারের দলই জয়ী।
কোনো এক বাংলা সিনেমায় দেখেছি স্বামী নিয়ে দুই নায়িকা অর্থাত্ দুই বউকে টানাটানি করতে, যদিও শেষে প্রমাণিত হয় স্বামীর আসল বউ কে, তবুও টানাটানি নিয়ে তুলকালাম ঘটে যায়।
পাঠক, এতক্ষণ দড়ি টানাটানি ও স্বামী টানাটানির কথা বলছি, এবার আসি বিল টানাটানি প্রসঙ্গে। কিছুদিন থেকেই শুরু হয়েছে আড়িয়ল বিল নিয়ে টানাটানি। রক্তের বিনিময়ে হলেও সেখানকার মানুষ রক্ষা করতে চায় তাদের প্রাণের বিল। অন্যদিকে সরকার সেখানে বিমান উড়াতে চাচ্ছে অর্থাত্ এয়ারপোর্ট বানাতে চাচ্ছে। আমাদের হেড স্যারের ভুঁড়ির কারণে দড়ি টানাটানিতে ওনার দলই জিতে যেত, কিন্তু আড়িয়ল বিল নিয়ে যেভাবে টানাটানি চলছে তাতে শেষতক কারা জেতে, বলা যাচ্ছে না। আড়িয়লবাসী আন্দোলন করছে আর পুলিশ রুখে দিচ্ছে, আন্দোলন রুখতে গিয়ে ঘটছে নিহত আহত হওয়ার মত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
অবশ্য কারও কারও রক্ত ঝরাতে আবার কারও কারো খুব মজা লাগে। এই ধরুন মশা ও আমাদের মধ্যে এত তিক্ত সম্পর্ক যে, আমরা কেউই কাউকে ছাড় দিতে রাজি না। আমাদের রক্ত চুষে পেট ভরাতে পারলে মশা বাহিনীর আনন্দের শেষ থাকে না। আবার মশাদের কষে থাপ্পড় মেরে রক্ত ঝরাতে পারলে আমরা খিলখিলিয়ে দাঁত বের করে হাসি। সোজা কথায় বলা যায় কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ। এবার বলছি মশাবিষয়ক একটা গল্প—
এক লোক মশারি টাঙানোর পর মশারির ভেতরে বসে বসে মশা খুঁজছে, বাইরে মশক দলের এক সদস্য উত্তেজিত হয়ে উঠল।
—মশারির ভেতর তো খুঁজবাই, সাহস থাকলে মশারি ছাড়া ঘুমাও দেখি!
—ক্যান চান্দু রক্ত চুষতে বুঝি খুব টেস্ট লাগে?
—চুপ করো মিয়া, তোমরা ভীতু নাম্বার ওয়ান। সামান্য আমাদের ভয়ে মশারি টাঙাও অথচ গরু-ছাগল পর্যন্ত রাতে মশারি ছাড়া ঘুমায়।
—ভীতু কইলি ক্যান, বের হলে কিন্তু এক থাপ্পড়ে সাইজ কইরা দিমু?
—মশারির ভেতর লাফাস ক্যান, সাহস থাকলে বাইরে আয়। বাইরে এসে আমাকে আঘাত করতে চাইলেই আমাদের গোয়েন্দা টিম ভেতরে ঢুকে পড়বে।
—হ আমি বের হমু আর তোমরা চুপিচুপি আমার মশারির জায়গা দখল করবা, প্রয়োজনে রক্ত দেব তবুও মশারির ভেতর থেকে বের হব না।
পাঠক, যুগে যুগে মশা ও আমাদের মধ্যে যে তিক্ত সম্পর্ক, এ সম্পর্ক আজীবনই নিম পাতার মতো তিতা থাকবে। কারণ, আমরা মশারি টাঙিয়ে একটু নাকে তেল দিয়ে ঘুমাব এটা মশার সহ্য হয় না। তারা মশারির ভেতর জবরদখল করার অপচেষ্টা চালায়। আবার মশা একটু খেয়ে-দেয়ে বাঁচুক এটা আমরা চাই না। যদি চাইতাম তবে থাপ্পড় মেরে রক্তাক্ত করে তাদের আহত কিংবা নিহত করতাম না। এই তিক্ত সম্পর্কের মতো এখন তিক্ত হয়ে উঠেছে আড়িয়লবাসী ও সরকারের সম্পর্ক। আন্দোলন-বিক্ষোভের মধ্যে কাটছে তাদের জীবন। রক্ত দেবে তবুও তারা আড়িয়ল বিলকে এয়ারপোর্ট বানাতে দেবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত আন্দোলনের পরও যেহেতু এ বিল টানাটানির শেষ হচ্ছে না সেহেতু পুলিশ ও আড়িয়লবাসীর রক্ত কি ঝরতেই থাকবে ?
এ তিক্ত সম্পর্ক মশা ও আমাদের সম্পর্কের মতো দীর্ঘস্থায়ী না হোক, এটাই আমাদের কাম্য। দড়ি টানাটানি যেমন কিছুক্ষণ চলে থেমে যায় আবার স্বামী টানাটানিও যেমন এক পর্যায়ে স্থির হয়ে থেমে যায়, তেমন আড়িয়ল বিল টানাটানিও থেমে যাক।

সূত্র : আমার দেশ

বই প্রকাশের তিতা অভিজ্ঞতা :: ইকবাল খন্দকার

আজ থেকে বছর দশেক আগের কথা। ঘাড়ে ভূত চাপার মতো হঠাত্ করেই আমার সাধ চাপল বই বের করার। শুরু করলাম তদবির। আমাদের পাশের গ্রামের এক লোকের বেশ বড় একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল ঢাকায়। এই লোকের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে একদিন তাকে ফোন করলাম। বললাম বই প্রকাশের ইচ্ছের কথা। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো আমি কী করি। যেই না বললাম আমি ইন্টারে পড়ি, সঙ্গে সঙ্গে লাইন কেটে গেল। আমি ভাবলাম লাইনে কোনো সমস্যা তাই আবার ফোন করলাম। একটু আগে যে কণ্ঠটিকে বেশ গুরুগম্ভীর এবং ভদ্রসদ্র মনে হয়েছিল, সেই কণ্ঠটিই খেঁকিয়ে উঠল এবার—ফোন কেটে দিয়েছি আবার ফোন কিসের! আমি মৃদু ভয় পেয়ে গিয়ে বললাম—না, মানে ওই যে বই প্রকাশের কথা বলেছিলাম। এবার মনে হয় লোকটার খেঁকানো ভিন্ন মাত্রা পেল—এই ছেলে তুমি কি করে ভাবলে তোমার মতো ইন্টারের একটা ছেলের বই আমি প্রকাশ করব? তুমি জান আমি কত বড় মাপের প্রকাশক? জান কত বড় বড় লেখক আমার পেছনে ঘুরঘুর করে বই প্রকাশের জন্য? এবার মনে হয় আমি একটু সাহস পেলাম। বললাম—যেহেতু আপনার পেছনে লেখকরা ঘুরঘুর করে, তার মানে আপনার গাড়ি নেই, তাই তো? গাড়ি থাকলে তো ঘুরঘুর করতে পারত না। পেছনে দৌড়াতে হতো। এবার বিকট আওয়াজ করে ফোন রেখে দেয়া হলো ওপাশ থেকে। ফোন রেখে দেয়ার এই আওয়াজে আমার কানের পর্দা বেশ আঘাতপ্রাপ্ত হলো। আঘাতপ্রাপ্ত হলো আমার মনও। একবার তো মনেই হলো আমার মনটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে। আমি মনের এই টুকরোগুলোকে একত্রিত করে আবার নতুন আশায় বুক বাঁধলাম। তবে বুক এত শক্ত করে বাঁধলাম যে, মনে হলো দম বন্ধ হয়ে যাবে। আর দম বন্ধ হওয়ার প্রথম প্রমাণ পেলাম বাবার কাছে গিয়ে। বাবার কাছে গিয়েছিলাম মূলত টাকার জন্য। কারণ, এর মধ্যে আমি জেনে গিয়েছিলাম প্রথম বই প্রকাশ করতে টাকা লাগবেই। টাকার অ্যামাউন্টটাও জেনে নিয়েছিলাম একজনের কাছ থেকে। তারপর যেই না টাকাটা চাইলাম, বাবা হাত বাড়ালেন ডান দিকে। আমি ভাবলাম তিনি বুঝি আলমারি খোলার জন্য চাবি নিচ্ছেন। কিন্তু পাশেই যে একটা বাঁশের গোড়া ছিল, তা আর খেয়াল করিনি। খেয়াল করলাম যখন তিনি এটা হাতে নিয়ে লাফ দিয়ে আমার সামনে এসে পড়লেন। আমি বাংলা ছবির নায়িকাদের মতো বাঁচাও বলে একটা চিত্কার দিয়ে শুরু করলাম দৌড়। বাবাও আমার পেছনে পেছনে দৌড়াতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন—পড়ালেখার নাম-গন্ধ নেই, উনি বই বের করবেন। বের করাচ্ছি বই। আমি দৌড়াচ্ছি, বাবাও দৌড়াচ্ছেন। দৌড়াতে দৌড়াতে আমার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল, বাবা শেষ বয়সে এত অ্যানার্জি কোত্থেকে পেলেন, কীভাবে পেলেন। আমি খালি হাতে দৌড়াচ্ছি, আর বাবা দৌড়াচ্ছেন বাঁশের গোড়া নিয়ে। বাঁশের গোড়াটার ওজন কম করে হলেও পাঁচ কেজি হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, এরপর বাবার সঙ্গে যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, তখন আমি তাকে এই অ্যানার্জির গোপন রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। সম্ভব হলে তার কথাগুলো রেকর্ড করে রাখব। ভবিষ্যতে যদি কেউ কখনও এনার্জি ড্রিংকের বিজ্ঞাপন করতে চায়, আমি মডেল হিসেবে বাবার নাম প্রস্তাব করব। যাক, দৌড়াতে দৌড়াতে যখন আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন কী মনে করে যেন বাবা দৌড়ানি বন্ধ করলেন। তিনি চলে এলেন বাড়িতে, আমি মাঠে বসে হাঁপাতে লাগলাম। রাতে বাড়ি ফিরে বাবার চেহারা দেখে আমি অবাক হলাম। শতভাগ পজিটিভ চেহারা। এক সময় তিনি ডেকে নিয়ে আমার হাতে পনের হাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন। আমি তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তখনও আমি চোখ বড় বড় করে খেয়াল করছিলাম, তিনি বাঁশের গোড়ার জন্য হাত বাড়ান কিনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন তা না করে টাকা দিলেন তখন একজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম আমার অনুপস্থিতিতে মা তাকে সোজা করে ফেলেছেন। আমি এই টাকা নিয়ে পরদিনই মাঠে নেমে পড়লাম। আরেক প্রকাশক খোঁজ করে টাকার বিনিময়ে পাঁচশ কপি বই প্রকাশ করেই ফেললাম। বই প্রকাশ হওয়ার দিন কয়েক আগে থেকেই যখন সবার কাছে বলছিলাম আমার বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, তখন আমার প্রতি সবার সে কী আশ্বাস! আমার বই একেকজন কমপক্ষে দশ কপি করে কিনবে। কেউ আবার এমনও বলল—বই পাঁচশ না, বরং পাঁচ হাজার কপি ছাপাতে। নইলে নাকি সবাই বই পাবে না। একেকজন দশ কপি করে কিনলে যা হয় আর কি। যথাসময়ে বই প্রকাশিত হলো। আমি নিজ উদ্যোগে এলাকার সব লাইব্রেরিতে বই দিলাম। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলাম কবে এসব লাইব্রেরির মালিকরা আমাকে খবর পাঠাবে টাকা নেয়ার জন্য। আর বলতে আরও বই দিতে। মাস ছয়েক অপেক্ষার পরও যখন কোনো খবর টবর হলো না তখন একদিন গেলাম লাইব্রেরির দিকে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম বেস্ট সেলার বইয়ের লেখক হিসেবে তারা আমাকে এমন জোরে জড়িয়ে ধরবে যে, আমি তাদের বুক থেকে সরতেই পারলাম না। তারপর দোকানে যত রকমের খাবার পাওয়া যায় সবই এনে খাওয়াবে। একটা লাইব্রেরির দরজায় পা রাখতেই আমার খানিকটা খটকা লেগে গেল। কারণ মালিকের মুখ হেভি কালো। প্রথম ভাবলাম অনেকদিন হয়তো তিনি রং ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করেন না তাই কালো দেখাচ্ছে। একটু পরেই বুঝে গেলাম পুরো ঘটনা। এই কয় মাসে নাকি তার দোকান থেকে তিন কপি বই বিক্রি হয়েছে। অন্যান্য লাইব্রেরির খবরও একই রকম। এই একই রকম খবরের মধ্যে ব্যতিক্রম কিছু খবরও পাওয়া গেল। তা হলো—বেশ কটি লাইব্রেরিতে এক কপিও বিক্রি হয়নি। এর মধ্যে এক বিক্রেতা আমাকে বলল—বই এখানে সেখানে না দিয়ে একুশে বইমেলায় ছাড়ুন। একমাস পরেই ছিল বইমেলা। প্রকাশককে বলে কয়ে মেলায় তুললাম বই। প্রকাশক বলল কিছু বিজ্ঞাপন দিন, নইলে বই চলবে না। কিছু পোস্টারিংও করতে পারেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম বিজ্ঞাপনের খরচের তুলনায় পোস্টারিংয়ের খরচ অনেক কম। একদিন রাতে কয়েক বন্ধুকে নিয়ে বের হলাম পোস্টার লাগাতে। এক দেয়ালে পোস্টার লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে চারজন লোক এসে ধরে ফেলল আমাদের। পরে জানতে পারলাম ‘পোস্টার লাগানো নিষেধ’ লেখা দেয়ালে নাকি আমরা পোস্টার লাগিয়েছি। অন্ধকারের জন্য আমরা লেখাটা দেখতে পাইনি। লোকগুলো আমাদের ধরে নিয়ে গেল তাদের মনিবের কাছে। হাবভাব দেখে বুঝলাম, আমাদের পুলিশে দেয়া হবে। মনিব থানায় ফোন করার আগে মুখ ভেংচে আমাদের জিজ্ঞেস করল—এই বেটারা, দেয়ালে ‘পোস্টার লাগানো নিষেধ’ লেখা আছে দেখতে পাসনি? তাহলে কোন সাহসে পোস্টার লাগিয়েছিস! হঠাত্ একটা বুদ্ধি এলো আমার মাথায়। বললাম—চাচা, আমরা লেখাটা দেখলেও পড়তে পারিনি। আমরা সবাই অশিক্ষিত তো! ওই প্রকাশনার কর্মচারী। 

সূত্র : আমারদেশ

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ