প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label সায়েন্স ফিকশান. Show all posts
Showing posts with label সায়েন্স ফিকশান. Show all posts

Friday, March 25, 2011

ত্রিমাত্রিক সমীকরণ

ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল অভি। মুখে সব পেয়েছির একটা হাসি। ভীষণ খুশি লাগছে। লুবনা রাগ করেনি, একটুও না। বলছিল কাজটা একদম ঠিক হয়নি। কিন্তু গলা শুনে মোটেই তা মনে হচ্ছিল না। বরং ওর গলায় একটা খুশি খুশি সুর লুকানো ছিল। একটা চাপা উত্তেজনা, এপাশ থেকেও খুব স্পষ্ট অভি বুঝতে পারছিল। বুঝতে পারছিল লুবনার ফর্সা গাল দুটো লালচে হয়ে গেছে, চকচক করছে। আজ লুবনাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছিল, এত আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল অভি কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না। কাছে যাবো না, যাবো না করেও কখন কিভাবে যে অতখানি ঝুঁকে পড়েছিল অভি টেরই পায়নি। লুবনা সরে যায়নি, আবার কাছেও টেনে নেয়নি। শুধু প্রচ্ছন্ন একটা প্রশ্রয় দিয়েছে। ওর এই প্রশ্রয়ের কারণেই অভি এতদূর পর্যন্ত আসতে পেরেছে। এমনকি ঠিক হচ্ছে না, এই অনুভূতিটুকুও ওর মধ্যে কাজ করে না।মাত্রই মাস্টার্স শেষ করে বের হয়েছে অভি। বেরুনোর সাথে সাথেই কাজ পেয়ে গেছে একটা প্রোজেক্টে, ছয় মাসের চুক্তি। হয়তো পরে আরো বাড়ানো হবে। এখানে এসেই পরিচয় লুবনার সাথে। ওরা দুজন একটা টিম হিসেবে কাজ করে। লুবনা ওর দু’বছরের বড়। এ কাজে আছে বহদিন ধরে। তাই ওকে হাতে-কলমে শেখানোর দায়িত্বও লুবনার। প্রথম দেখার পর থেকেই অভি লুবনার প্রতি একটা অসম্ভব রকম আকর্ষণ বোধ করে আসছে। লুবনা অনেক সুন্দর দেখতে আর তারচেয়েও বেশি আকর্ষণীয়। ওর চেহারায়, কথায়, হাসিতে, চোখের তারায়, শরীরের প্রতিটা বাঁকে, অঙ্গভঙ্গিতে চুম্বকের মত একটা আকর্ষণ। লুবনার গায়ের রঙ একদম টুকটুকে, গোলাপের মত। যে রঙের জামা পড়ে তাতেই ওকে ভাল লাগে। যেভাবে সাজে তাতেই অভি মুগ্ধ হয়ে যায়, এমনকি না সাজলেও!

অভি হয়তো ভাবে না, কিন্তু ওর মনের অনেক ভিতরে একটা তুলনা এসে যায়। মুনিরা তো এমন না। এত বছর ধরে মুনিরাকে ও দেখে আসছে, মুনিরা কখনো নিজেকে এইভাবে সাজায় না, পরিপাটি হয়ে অভির সামনে আসে না, এইভাবে চোখে চোখে কথা বলতে পারে না, বড্ড আনস্মার্ট মুনিরা, বড্ড সেকেলে.......লুবনার চার বছরের ছোট হলেও মুনিরাকে বুড়ি বুড়ি লাগে। ও কখনো অভিকে এইভাবে আকর্ষণ করেনি। ওর কাছে অভি গেছে আট বছরের অভ্যস্ততায়, কিন্তু মুনিরা সবটুকু দিয়েও ওকে কখনো জাগিয়ে তুলতে পারেনি। যা লুবনা পারে শুধু একটু চোখের তাকানোতে বা মুচকি একটু হাসিতে। অভি ভাবে আর কেমন একটা আবেশে ওর চোখ জড়িয়ে আসে।

প্রায় সারাদিন লুবনার সাথে থাকতে হয় ওকে। একদিন কি কাজে যেন একটু বেশি রাতেই অভি ফোন করেছিল লুবনাকে। ঘুমভাঙা গলায় আধো আধো কথা বলেছিল লুবনা। এত অ™ভুত ছিল ওর গলাটা, অভির গা সিরসির করে উঠেছিল। ওই গলাটা শোনার জন্য অভি এখন কোন না কোন ছুতোয় রোজ রাতে ফোন করে। লুবনা কখনো রাগ করে না। বরং কথা বলে ওর সাথে ঘন্টা পার করে। কত কথা যে বলে ও, কতভাবে যে বলে! মুনিরার সাথে রোজকার একঘেয়ে রুটিন কথার পর লুবনা যেন ওকে কল্পনার একটা জগতে নিয়ে যায়। কথায় কথায় ওদের সম্পর্কটা এখন অনেক গভীর। যদিও মুনিরার কথা কেউ ভোলে না, কিন্তু কেউ তুলেও না ওই প্রসঙ্গ। মুনিরা উহ্য থেকে যায়।

প্রথমদিকে অভির একটু একটু খারাপ লাগতো। মনে হতো ঠিক হচ্ছে না। এভাবে মুনিরাকে এড়িয়ে, ওকে ঠকিয়ে। কিন্তু এখন ও যেন লুবনার মধ্যে ডুবে গেছে। কোন কিছুই ওর আর মনে হয় না। বরং মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যায় মুনিরার ওপর। ওর খুঁতগুলো বেশি বেশি চোখে পড়ে আর তাই নিয়ে হইচই করে। যেটা কখনোই আগে করতোনা।

আজ লুবনা একটা টকটকে লাল জামা পরেছিল। তারসাথে মিলিয়ে লাল টিপ কপালে, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। সন্ধ্যায় ফেরার পথে রিকশায় বসে কি কথায় যেন ভীষণ হাসছিল, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল। মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে হঠাৎ করে কি যে হল, এক হাতে জড়িয়ে ধরল লুবনাকে আর গালে টুক করে একটা চুমু। কিছুক্ষণ ওইভাবেই বসে থেকে লুবনা আস্তে করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর আবার স্বাভাবিক। কাজটা করেই অভি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। সারাক্ষণ অস্বস্তি। বাসায় ফিরে, মুনিরার সাথে কথাও বলেছে অভ্যাসমত। কিন্তু সারাক্ষণই অপেক্ষা করেছে কখন রাত হবে, কখন লুবনার সাথে কথা বলবে। না, লুবনা রাগ করেনি। একবার শুধু বলেছে ‘এটা কিন্তু ঠিক না’। তারপরই আবার স্বাভাবিক। আজ কথাগুলো আরো ভাল লাগছিল শুনতে, একটা ভাল লাগায় আচ্ছন্ন অভি।

ফোন হাতে নিয়ে ভাবছে লুবনার কথা। এরই ফাঁকে একবার মুনিরাকে মনে পড়ল। মুনিরাকে ভালবাসে অভি, মুনিরার সাথে এত বছরের অভ্যস্ত জীবন ছাড়া সম্ভব না। আবার লুবনার জন্যও তারমধ্যে অসম্ভব একটা আকর্ষণ। কোনটাই এড়ানো সম্ভব না অভির পক্ষে।

*****

লুবনা হাসছে। এই হাসিটা অভি কোনদিন দেখেনি। ভীষণ নিষ্ঠুর, ক্রুর একটা হাসি লুবনার ঠোঁটে। অভির জন্য ওর করুণা হচ্ছে। বেচারা!

অভিকে দেখে বেচারা শব্দটাই লুবনার মাথায় প্রথম এসেছিল। ভোলা-ভালা, বোকা-সোকা একটা ছেলে, মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডির বাইরে পা রেখেছে। বুঝতে শেখার পর থেকেই একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিল বলে জীবনের অনেকগুলো দিক, হরেক রকম মানুষ ও দেখেনি। মুনিরার কথা ও প্রথম থেকেই বলেছে। আর শুনতে শুনতেই লুবনার মনে হয়েছে এতদিনের সম্পর্ক হলেও কোথাও একটা বড় ফাঁক আছে। ওদের সম্পর্কে একটা অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে, নির্ভরতা তৈরি হয়েছে কিন্তু কোন নতুনত্ব নেই। একঘেয়ে হয়ে গেছে। অভির চোখ তাই লুবনাকে দেখে ধাঁধায় পড়ে গেছে। ধীরে ধীরে অভির দৃষ্টির পরিবর্তন দেখেছে লুবনাকে, আর নিজেকে সেভাবেই ওর সামনে তুলে ধরেছে। অভির মুগ্ধ দৃষ্টি, প্রশংসা, তোষামোদ খুব উপভোগ করে লুবনা। ছেলেগুলো যে কি! এত বছরের একটা সম্পর্ককে তুচ্ছ করে, অবহেলা করে অভি কি করে পারে লুবনার সাথে এইসব তোষামোদী করতে। এমন তো না যে অভি বোঝে না এটা অন্যায়। লুবনার ভালই লাগে। ‘তুমি যদি নাচতে চাও, কেন আমি ঢোলে বাড়ি দিবো না?’

আসিফ চলে যাওয়ার পর থেকে লুবনা কোন ছেলেকেই বিশ্বাস করে না। কারো কথাই সত্যি বলে মানতে পারেনা। অভি যখন বলেছিল মুনিরার সাথে ওর এতদিনের সম্পর্ক, ওদের গভীর ভালবাসা, ওদের মধ্যে কখনো কোন সমস্যা বা ভুল বোঝাবুঝি হয় না, ওরা অনেক সুখী তখন অবহেলায় মনে মনে ঠো^ট বাঁকিয়েছিল লুবনা। দেখতে চাইছিল কতটা গভীর অভির ভালবাসা। আস্তে আস্তে জাল বিছিয়েছে যেভাবে অভি চেয়েছে। যাতে অভি পা দিতে চেয়েছে, নিজের অজান্তে।

আর আজকে তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটল। লুবনার এই হাসিটা অভি খুব পছন্দ করে। মুগ্ধ হয়ে দেখে, আজকেও তাই ঘটল। লুবনা শুধু অনিচ্ছার ভান করে করা স্পর্শটুকু অভিকে দিয়েছে। আর অভি বাধ্য হয়েছে শেষ পথটুকু অতিক্রম করতে। হাহ্ প্রেম! এত বছরের এত ভালবাসা, কই চলে গেল। সেই তো ডুবল। আপনি অন্নেক সুন্দর! অনেক এ্যাট্রাকটিভ! আপনাকে মিস করছি ভীষণ! কত কত এসএমএস। ছেলেগুলো এমন কেন? বিতৃষ্ণায় ঠোঁটের কোণাটা বেঁকে গেল লুবনার।

“সব শালা হারামি!” লুবনার খুব পছন্দের একটা কথা। যখনই েেকান ছেলের ভেতরের চেহারাটা বের হয়ে পড়ে তখনই লুবনা এই কথাটা বিড়বিড় করতে থাকে। অসহ্য লাগে সব।

আসিফের চলে যাওয়াটা লুবনার জন্য একটা ভয়াবহ আঘাত ছিল। আসিফের মধ্যে ছিল প্রচন্ড সন্দেহ। ও প্রতিটা ব্যাপারেই লুবনাকে সন্দেহ করতো। প্রথমদিকে লুবনার ভালই লাগতো। ভাবতো, ও আমার এত কেয়ার করে, সারাক্ষণ আমি কি করলাম, কই গেলাম তাই নিয়ে অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু এক পর্যায়ে আসিফের সন্দেহ সব সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে। লুবনা আর সহ্য করতে পারেনা। প্রচন্ড ভালবাসা ফিকে হয়ে আসে, সে জায়গায় জন্ম নেয় ঘৃণা। তারা দূরে সরতে থাকে একজন অন্যজনের থেকে। আর একসময় আসিফ ওকে মিথ্যে সব অপবাদ দিয়ে চলে যায় একা ফেলে। আসিফের অভিযোগগুলো শুনলে লুবনা হতভম্ব হয়ে যেতো। এইসব কখনো সে কল্পনাও করতে পারতো না। অনেক আঘাত পেয়েছিল লুবনা। সেটা কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল প্রচুর। সেই দু:সহ সময়টা একা একা নিজের সাথে যুদ্ধ করে পার করেছে। আর একলা পথ চলতে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছে অভির মত এইসব মুখোশ পরা ভাল মানুষগুলোর। ঘেন্না করে লুবনা এদের, প্রচন্ড ঘেন্না। “সব শালা হারামি!”

*******

অনেকক্ষণ ধরে জেগে আছে মুনিরা। ঘুম আসছে না। মনটা ভীষণ খারাপ। অভি আজকাল এত দূরে সরে গেছে! চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই ওর এই পরিবর্তন। এই চাকরিটা নিয়ে ওরা দুজনেই এত খুশি ছিল, অথচ এই চাকরিটাই একটা কাল পর্দার মত ওদের মাঝখানে আড়াল তৈরি করেছে। অভিকে ও বুঝতেই পারে না এখন। কথায় কথায় রেগে যায়, বকাবকি করে, এটা এমন কেন, হল না কেন, তুমি সাজো না কেন, আরেকটু পরিপাটি থাকো না কেন তাই নিয়ে হইচই করে। অভির মধ্যে মুনিরাকে নিয়ে কখনো কোন অভিযোগ ছিল না। মুনিরা সবসময় সাদামাটা থাকে, খূব একটা সাজে না বা কোন কৃত্রিমতা পছন্দ করেনা। আর অভি তাতেই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আজকাল কি ভীষণ বদলে গেছে!

শুধু অভিযোগ, শুধু অভিযোগ। মুনিরা বুঝে না ওর দোষটা কোথায়? শুধু কষ্ট পায়। আজকে কি যে হল, মুনিরা আম্মার সাথে কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে তাই বলছিল। আর অভি কি একটা ধমক লাগাল, ‘রাখো তো তোমার এইসব ফালতু কথা।’ মুনিরা বুঝে না ফালতু কিসে হল। ফোন রেখে দিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল একাই। আগে হলে অভি আবার ফোন করতো, স্যরি বলতো, আদর করে দিতো। কিন্তু আজকে অভি ফোনই করল না। মুনিরা বুঝে না কি এমন হল যে অভি এতটা দূরে সরে গেল। শুধু কষ্ট পায়, প্রচন্ড কষ্টে ছটফট করে।

*********

গভীর রাত। ঘুমিয়ে পড়েছে পুরো শহর। রাস্তার বাতিগুলোও ঝিমিয়ে পড়েছে। শুধু জেগে আছে তিনটি মানুষ। একই শহরের তিনপ্রান্তে নির্ঘুম তিনজোড়া চোখ। সম্পর্কের টানাপোড়েনে বিভ্রান্ত, অসহায়।







সাম্প্রতিক.কম এর ১৪ই এপ্রিল সংখ্যায় পূর্ব প্রকাশিত

Wednesday, February 9, 2011

সমীকরণ

প্রফেসর রফিকুজ্জামান অংকে পিএইচডি করে ডক্টর হয়েছেন।
তিনি প্রতিটা কাজের ফলাফল অংক কষে বের করে ফেলেন। সে এক এলাহী কাণ্ড! যে কাউকে দেখে তিনি অংক কষে বলতে পারেন এ ব্যক্তি আজ দিনে কী কী কাজ করেছে, দিনের বাকী সময় কী করবে, কী করা উচিত সঅব!
তিনি ঘোর নাস্তিক। ইদানিং তিনি স্রষ্টা যে নেই তা অংক কষে বের করার চেষ্টা করছেন।
তার ধারনা খুব শিঘ্রই সফল হবেন তিনি।
ইতোমধ্যে তিনি তার স্বপে একটা সমীকরণ দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। সমীকরনের ফলাফল ‘শূন্য’ হলে বুঝতে হবে স্রষ্টা আছে। আর যদি ‘এক’ হয় তাহলে স্রষ্টা নেই।
তিনি রাত-দিন সমীকরণ নিয়ে পড়ে থাকেন। এবং মনে প্রাণে চাচ্ছেন সমীকরণের ফলাফল হোক ‘এক’।
কিন্তু চাইলেই তো হবে না। সমীকরণ মিলতে হবে। সঠিক সমাধান হতে হবে। আর তাহলেই কেল্লাফতে! তিনি যুগান্তকারী আবিষ্কারক হয়ে যাবেন। ড. রফিকুজ্জামান তার ল্যাবরেটরীতে বসে তার ‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণ নিয়ে কাজ করছেন।
হঠাৎ কাজ থামিয়ে গলা ছেড়ে ডাকলেন- টুণ্ডুপ! অ্যাই টুণ্ডুপ!!
ডাক শুনে হাজির হলো প্রফেসর সাহেবের চাকর।
‘তুমি এতোক্ষণ দাঁড়িয়েছিলে, না বসেছিলে?’
‘জ্বি, দাঁড়াই ছিলাম।’
‘এখানে যেভাবে দাঁড়িয়ে আছো সেভাবে, না অন্যভাবে?’
টুণ্ডুপ কিভাবে এতোক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো সে ভঙ্গি দেখালো।
প্রফেসর সাহেব টুণ্ডুপকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে খাতা কলম টেনে নিলেন। তারপর খাতায় একটা সমীকরণ লিখে সমীকরণ সমাধান করার লক্ষে লিখে যেতে লাগলেন লাইনের পর লাইন।
পুরো সাতাশ মিনিট লাগলো সমীকরণের সমাধান টানতে। সমাধান করে প্রফেসর সাহেব টুণ্ডুপের দিকে তাকালেন হাসি হাসি মুখে।
‘তুমি এতোক্ষণ চা করছিলে। আর ভাবছিলে, স্যার চায়ের জন্যে কখন আমায় ডাকবেন। ঠিক?’
‘জ্বে, ঠিক অইছে।’
‘তাহলে যাও, চা নিয়ে আসো।’
টুণ্ডুপ এখন আর এসব কথায় আশ্চর্য বা অভিভূত হয় না। আর এ অল্প কথায় আশ্চর্য হবারই বা কী আছে? স্যার এরচে’ আরো কতো কঠিন কঠিন ব্যাপার সহজ করে বলে যান!
এই তো সেদিন সকালের কথাই ধরা যাক-
টুণ্ডুপ বাগানের বেঞ্চিতে বসে আছে চুপচাপ, আনমনে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে সামনে ফিরে দেখে প্রফেসর স্যার তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে।
টুণ্ডুপ স্যারের দিকে তাকাতেই তিনি কাছে চলে এলেন। বললেন, ‘টুণ্ডুপ, তুমি আমার চোখের আড়ালে গিয়ে একশ’ কদম হাঁটবে। সেই সাথে তোমার মনে যা আসে তা-ই ভাববে। ঠিক আছে?’
জ্বে, ঠিক আছে।’
‘আমি তোমার জন্যে এখানে বসে আছি। একশ’ কদম হাঁটা শেষ হলে আমার কাছে চলে আসবে। আর যা ভাববে তা মনে রেখো। যাও।’
টুণ্ডুপ কিছু না ভেবে হাঁটতে চলে গেলো। এবং একটু পর ফিরে এলো।
‘স্যার…।’
টুণ্ডুপকে কথা বলতে না দিয়ে তার সারা দেহ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। পুরো দশ মিনিট টুণ্ডুপকে কাছে থেকে, দূরে গিয়ে, সামনে-পেছনে থেকে দেখে, মুখের পেশী হাত-পা লক্ষ্য করে বিদায় করলেন।
তারপর প্রফেসর সাহেব তার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে খাতা কলম নিয়ে বসলেন।
একটানা পরদিন বিকেল পর্যন্ত তিনি অংক কষে গেলেন। দিস্তা দিস্তা খাতা আর ডজন ডজন কলমের কালি শেষ হলো। তিনি অনেকগুলো সমীকরণের সফল সমাধান করেছেন। বেশির ভাগ সমীকরণের ফলাফল হয়েছে ‘শূন্য’ আর ‘এক’ কিছু হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালার শেষ তিনটি অক্ষর। কিছু হয়েছে নিরেট কতগুলো সংখ্যা।
শূন্য, এক, অক্ষর, সংখ্যা বিশ্লেষণ করে প্রফেসর সাহেব বিরাট তথ্যভাণ্ডার পেয়ে গেলেন। চাকর টুণ্ডুপকে ডেকে বললেন, ‘কাল তুমি হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলে… ভাবছিলে, একটা মেয়ের কথা।’
প্রফেসরের কথা শুনে টুণ্ডুপের হৃদপিণ্ড ধক করে উঠলো। টুণ্ডুপ সত্যি সত্যি গতকাল হাঁটার সময় একটা মেয়ের কথা ভাবছিলো। সে যখন হাঁটতে রাস্তায় যায় তখন সেখানে একটা সুন্দরী মেয়ে তার চোখে পড়ে। সে মেয়েটাকে নিয়ে অনেক কিছু ভেবেছিলো। ভেবেছিলো, এই মেয়েটার সাথে তার বিয়ে হতে পারতো। এবং বিয়ে হলে সে মেয়েটার সাথে কীরকম ব্যবহার করবে, মেয়েটা তাকে কী বলবে, এমন কি বাসর রাতের দৃশ্যও ভেবেছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে টুণ্ডুপের গায়ে কালো ঘাম দেখা দিলো। তার গলা শুকিয়ে গেলো। স্যার কি সত্যি সত্যি অংক কষে সব জেনে গেছেন? কী সব্বোনাশ!
টুণ্ডুপ কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকালো। প্রফেসর সাহেব হাসি হাসি মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
‘তুমি ভেবেছিলে, ইস! আমি যদি মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারতাম। আরো ভেবেছিলে, তুমি মেয়েটির সাথে কী করতে চাও। আমি কি ঠিক বলেছি টুণ্ডুপ?’
টুণ্ডুপ বিস্ফারিত চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইলো।
‘শোনো টুণ্ডুপ, বিয়ে মোটেও ভালো জিনিস না। মেয়েরা হলো নরকের কীট, আবর্জনার নোংরা। টিকটিকির ল্যাজ, সর্বভূক আরশোলা, আর আর… আর বোকা! বুঝতে পারছো?’
টুণ্ডুপ মাথা নাড়লো।
‘তাহলে শোনো, বিয়ে তারচেয়েও নোংরা। আর বিয়ের পর তুমি যা করবে বলে কল্পনা করেছো ওসবতো যাচ্ছেতাই। খবিস! বুঝতে পারছো? হ্যাঁ, বুঝতে পারলে এবার যাও। এসব আর ভাববে না।’
টুণ্ডুপ মাথা নেড়ে রুম থেকে বের হলো। মেয়েরা ভালো নয়, এরা টিকটিকির ল্যাজ, নরকের কীট এসব তার বিশ্বাস হয় না।
একটু পরে প্রফেসর সাহেব আবার ডাকলেন টুণ্ডুপকে। টুণ্ডুপ ল্যাবে ঢুকতেই প্রফেসর স্যার বললেন,
‘তুমি মেয়েদের সম্পর্কে আমার ধারনার কথা বিশ্বাস করনি। সেটা আমি অংক কষে এই মাত্র বের করলাম।’
টুণ্ডুপ একথা শুনে আশ্চর্য হলো না। সে এরকম হবে বলেই ভেবেছিলো। স্যারের কথায় সে জীবনে একবারই আশ্চর্য হয়েছে। এখন তার অনুভূতি শূন্য। ব্যাপারটা সে সহজভাবে নিয়েছে। হয়তো ভাবছে, স্যারের অংক কষে বের করাটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এটা যে সায়েন্টিস্ট কিংবা সুধীমহলের কাছে যুগান্তকারী আবিস্কার সে কথা তো আর টুণ্ডুপ জানে না।
তাই আজকে যখন টুণ্ডুপকে সব কিছু জিজ্ঞেস করে স্যার বললো, সে এতোক্ষণ চা করছিলো আর স্যারের চা লাগবে কি না ভাবছিলো তখন এটা সে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। এখন বরং সে স্যারকে একাজে সহায়তা করে।
যেমন সে কখন কী করছে তা মনে রাখার চেষ্টা করে যেনো স্যার জিজ্ঞেস করলে ঠিক ঠিক বলতে পার। টুণ্ডুপ স্যারকে খুব ভালোবাসে। স্যারের জন্যে সে জীবনও দিয়ে দিতে পারে।

এই টুণ্ডুপ-ই একদিন তার চরিত্র পাল্টে ফেললো। যেদিন জানতে পারলো ‘স্রষ্টা নেই’ এটা প্রমাণ করার জন্যে স্যার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সেদিন থেকেই স্যার তার চোখের বিষ হয়ে গেলো।
একবার ভাবলো, স্যারকে এসব কাজ করা থেকে বারণ করবে সে। পরক্ষণে এ সিদ্ধান্ত বাদ দিলো। স্যার তার বারণ শুনবে তো না-ই উল্টো হয়তো রেগে তাকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বেরও করে দিতে পারে।
তাই টুণ্ডুপ চিন্তা করতে লাগলো কিভাবে স্যারকে এই পাপের কাজ থেকে বিরত রাখা যায়!
হ্যাঁ, এটাতো অবশ্যই পাপের কাজ। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁকে অস্বীকার করাতো অবশ্যই পাপ। টুণ্ডুপ পাপী হতে চায় না।
একবার ভাবলো স্যারের ল্যাবে আগুন লাগিয়ে দেবে। তাহলে সব কিছুর সাথে ‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণও পুড় যাবে। এই চিন্তাও বাদ দিলো। স্যারকে সে চেনে। আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে গেলেও স্যার দমবার পাত্র নয়। তিনি নতুনভাবে আবার শুরু করবেন। তাছাড়া এতো সুন্দর একটা ল্যাবরেটরি পুড়ে ফেলতেও টুণ্ডুপের মন সায় দিচ্ছিলো না।
সে অন্য চিন্তা করতে লাগলো। চিন্তায় চিন্তায় সে অস্থির। ভয়েও অস্থির। যদি তার চিন্তার কথা স্যার অংক কষে বের করে ফেলেন!
তবে ভাগ্যের ব্যাপার, স্যার এখন ‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণ নিয়ে এতোই ব্যস্ত যে, অন্যান্য সমীকরণ নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না।
টুণ্ডুপ সারাদিন বাসার কাজ-কর্ম করে আর স্যারের ল্যাবের আশেপাশে ঘুরঘুর করে সুযোগের অপেক্ষায়। একদিন সত্যি সত্যি সুযোগ এসে যায় টুণ্ডুপের হাতের নাগালে।

দুই.
কী একটা কাজে প্রফেসর স্যার তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলে টুণ্ডুপ গিয়ে ঢুকলো স্যারের ল্যাবে। লেখার টেবিলে খাতার স্তুপ।
এতোক্ষণ স্যার যে খাতাটার মধ্যে লিখছিলো ওটাই টেনে নিলো টুণ্ডুপ। কী সব হিবিজিবি লেখা! টুণ্ডুপের মাথায় সেসব ঢুকে না। সে শুধু চিনলো ইংরেজি বর্ণমালার কিছু অক্ষর আর সংখ্যাগুলো। এছাড়া আরো অনেক সাংকেতিক চিহ্নতে ভর্তি খাতা।
টুণ্ডুপ সমীকরণের শেষ লাইনটি কিছু পরিবর্তন করে দিলো। যেমন- ‘ওয়ান’-এর পেট কেটে বানিয়ে দিলো ‘সেভেন’। ‘ওয়াই’-এর সাথে একটা ‘এক্স’ বসিয়ে দিলো।
এরকম আরো বেশ কয়েকটি পরিবর্তন করে ল্যাব থেকে সরে গেলো টুণ্ডুপ। ভাবলো, দেখা যাক এবার সমীকরণের ফলাফল কী দাঁড়ায়!


তিন.
প্রফেসর রফিকুজ্জামান সমীকরণের সমাধান দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। আজকে তিনি ‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণের সমাধান করেছেন। তার হিসেব অনুযায়ী সমাধান হওয়া উচিত ছিলো ‘শূন্য’ অথবা ‘এক’।
কিন্তু এ কী! তিনি সমীকরণের সমাধান যা পেয়েছেন সে অনুযায়ী প্রজেক্ট দাঁড় করালে তো মারাত্মক কিছু ঘটে যাবে!
ভাবতে ভাবতে প্রফেসরের দেহে রাম ঘাম দেখা দিলো। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না। পরদিন থেকে তিনি তার ল্যাবরেটরীতে সমীকরণের সমাধান অনুযায়ী প্রাকটিক্যাল করার জন্যে প্রজেক্ট দাঁড়া করানো শুরু করলেন।
দিন-রাত তিনি এখন কেমিক্যাল আর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে পড়ে থাকেন। ছোট-ছোট সমীকরণের সমাধান টানেন। সে অনুযায়ী খুশি মনে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করেন। সফল হলে আনন্দিত হন। বিফল হলে প্রথম থেকে আবার শুরু করেন।

চার.
একমাস পর।
‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণ থেকে যে সমাধান ড. রফিকুজ্জামান পেয়েছেন সে অনুযায়ী কাজ করে তিনি যেটা আবিষ্কার করেছেন- ‘থিওরি অব মাইন্ড’ সূত্র। থিওরি অব মাইন্ড ব্যবহার করে মানুষ মনের গতিতে যেখানে খুশি যেতে পারবে। কেউ যদি ভাবে সে এখন মঙ্গল গ্রহে আছে তাহলে সে মঙ্গল গ্রহেই থাকবে।
ব্যাপারটা অনেকটা কর্পূরের মতো। কর্পূর যেমন বাতাসে খোলা অবস্থায় রাখলে উবে যায়। মানুষও সে রকম উবে যায়, তারপর যেখানে ইচ্ছে সেখানে মিলিত হয় তার দেহের ফ্লেভার আর কোয়ার্কগুলো।
দেহের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুগুলো বিশ্লেষণ করলে যে কণা পাওয়া যায় তাকে বলে পরমাণু। পরমাণুর তিনটি স্থায়ী মৌলিক কণিকা (ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন) এবং অস্থায়ী মৌলিক কণিকাকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় কোয়ার্ক। কোয়ার্ককে বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায় তাহলো বিভিন্ন ফ্লেভার ও কালার।
বৈজ্ঞানিকরা জানে না, ফ্লেভার ও কালারকে বিশ্লেষণ করলে কী পাওয়া যায়!
এই অজানা তথ্যই বের হয়ে এসেছে ড. রফিকুজ্জামানের ‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণের সমাধানে। এবং তা থেকেই ড. রফিকুজ্জামান আবিষ্কার করেছেন ‘থিওরি অব মাইন্ড’ সূত্র।

ব্যাপারটা এতোই অবিশ্বাস্য যে, ড. রফিকুজ্জামান নিজেই বিশ্বাস করতে পারেন না। কিন্তু সমীকরণের তত্ত্বও মিথ্যা নয়। তিনি সূত্র ব্যবহার করে ইতোমধ্যে চাঁদ থেকে ঘুরেও এসেছেন।
একদিন প্রফেসর সাহেবের ল্যাবে আগুন লেগে সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।
‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণ থেকে শুরু করে ‘থিওরি অব মাইন্ড’ সূত্রসহ সব যন্ত্রপাতি- সব পুড়ে গেলো।
এরপর প্রফেসর আরো বেশ কয়েকবার ‘থিওরি অব মাইন্ড’ সূত্রটি সমীকরণ করে বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সমীকরণ সমাধান শেষে দেখেন সূত্র নেই!
তিনি হতাশ হন না। আবার প্রথম থেকে শুরু করেন। আবার। এবং আবার।

পাঁচ.
শেষ পর্যন্ত তিনি হাতশ হলেন। কিংবা বলা যায় হাল ছেড়ে দিলেন।
তিনি এখন ‘স্রষ্টা সন্ধান’ সমীকরণটির সমাধান করার চেষ্টা শুরু করেছেন পুনরায়। সমাধান ‘শূন্য’ হলে স্রষ্টা আছে আর ‘এক’ হলে স্রষ্টা নেই।
সমাধান কি আদৌ ‘এক’ অথবা ‘শূন্য’ হবে? নাকি ভুল করে আবার কোনো যুগান্তকারী সূত্র আবিষ্কার হবে? নাকি………?! 

সূত্র : অনলাইন

Friday, January 7, 2011

পুনরুত্থান by অয়ন খান

যতদূর চোখ যায় - মানুষ আর সাদা চাদর, সাদা চাদর আর মানুষ। উত্তর দিকে, দক্ষিণ দিকে, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দিগন্ত পর্যন্ত খোলা প্রায়ান্ধকার মাঠে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মানুষ শুয়ে আছে - সার বেঁধে শুয়ে আছে। এগুলো কি লাশ! না, কারণ মাঝে মধ্যেই নড়ে উঠছে এরা, কারো কারো মুখে হঠাৎ করে ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে হাসি - ঘুমের মধ্যেই।
এসবের মধ্যেই আস্তে আস্তে আড়মোড়া ভেংগে জেগে উঠল রাফিজ ইমতিয়াজ। অবাক হয়ে তাকালো সে চারদিকে। অসংখ্য নগ্ন মানুষের ঘুমন্ত সারির মধ্যে সে একাই জেগে উঠেছে। সে নিজেও নগ্ন, শরীরটাকে অনুভব করতে পারছেনা যদিও।

শরীরের অসাড় ভাবটা যখন কেবল দূর হয়ে এসেছে, তখন সে অনুভব করল - কেউ একজন তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চমকে ফিরে তাকাল সে - যদিও একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে অস্পষ্ট একটা অবয়ব ছাড়া কিছুই সে ওখানে দেখতে পেলনা। অবশ্য এ অবয়বটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট আর উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। রাফিজ সেটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

এটা কোন অদ্ভুত হাসপাতাল নয়তো! যদ্দূর ওর মনে পড়ে, সে মোটর সাইকেল করে আসছিল আর অন্যদিক থেকে একটা বাস অন্য একটা বাসকে ওভারটেক করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এতো লোক কি একটা বাসে থাকে! আর একদিনে কি এতোগুলো দুর্ঘটনা ঘটা সম্ভব একটা এলাকায়!

আপনার যাবার সময় হয়েছে। - পাশ থেকে কেউ বলে উঠল। অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এতোক্ষণে। রাফিজ লক্ষ্য করল, আপাদমস্তক সাদা পোশাকে মোড়া ওটা।

আপনি কি চিকিৎসক? - রাফিজ জানতে চাইল।

অবয়বটা কোন উত্তর দিল না। শুধু ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল - নিঃশব্দে।

আমি কি জীবিত? - হঠাৎ জেগে ওঠা সন্দেহ নিয়ে রাফিজ জিজ্ঞেস করে অবয়বটিকে।

জীবিতরা ঘুমন্ত, একমাত্র মৃত্যুই জাগাতে পারে মানুষকে। - এই প্রথম অবয়বের গম্ভীর কন্ঠস্বরটি শুনতে পেল রাফিজ।

ঘুমন্তরা কি জীবিত? - সে উল্টো প্রশ্ন করে।

অবয়বকে নিরুত্তর দেখে সে একসাথে আরো কয়েকটি প্রশ্ন করে - আমি কি ঘুমন্ত ছিলাম? এখন কি আমি জেগে উঠেছি? আর আপনিই বা কে?

তখন অবয়বটির মুখ দেখতে পেল রাফিজ। খুব সুশ্রী মুখমন্ডল ওটার - মেয়েদের মত কোমল, শিশুদের মত পবিত্র, এবং একজন পুরুষের মতই প্রখর।

আমি আপনার জন্য নিযুক্ত একজন ফেরেশতা, আর আপনি এইমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন - মৃত্যুর মাধ্যমে।

রাফিজ তখন বুঝতে পারল, সে একটা স্বপ্ন দেখছে। তাহলে কি কোন অ্যািডেন্ট করে এখন কোমায় চলে গেছে সে! নাকি অ্যািডেন্টের চিন্তাও স্বপ্নের মধ্যেই ঘটেছে!

এরা সবাই তাহলে জীবিত, আর শুধু আমিই মৃত? - রাফিজ তীর্যকভাবে প্রশ্ন করল।

সবসময়ই কেউ না কেউ জেগে উঠছে, আমরা তাকে কেয়ামতের মাঠে নিয়ে যাই - মৃতকে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়াই আমার মত সৃষ্টির কাজ।

জীবিতরা এখানে কি করে? তাদের তো পৃথিবীতে ঘুরে-ফিরে বেড়ানোর কথা।

তারা পৃথিবীতেই ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে।

কিভাবে?

স্বপ্নে - তাদের সম্মিলিত স্বপ্নে।

এরা সবাই স্বপ্ন দেখছে? - রাফিজ অবাক হয়।

জগৎটা তো একটা স্বপ্ন, যেখানে এরা একজন আরেকজনের সাথে দেখা করে। - ফেরেশতাবেশী উত্তর দেয়।

রাফিজ উত্তর শুনে চুপ হয়ে যায়।

ওরা দু’জন হাটতে হাটতে একসময় লাখো কোটি ঘুমন্ত মানুষকে পার হয়ে আসে। দুই বিশাল পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে গেছে এক সরু পায়ে হাটা পথ। তার ওপাশে যেতেই চোখে পড়ে বিশাল আরেকটি মাঠ। এ মাঠেরও কোন শেষ দেখা যায় না, আর সারা মাঠ জুড়ে গো-ধূলির বিষন্ন একটা আলো। সেই মাঠের মাঝামাঝি ওরা গিয়ে দাঁড়াল - রাফিজ, আর তার ডানপাশে ফেরেশতা। তারপর তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, অনেকক্ষণ - যেন হাজার বছর। শেষে রাফিজ অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল - এখন আমরা কি করব?

সৃষ্টি করুন। - বলল ফেরেশতা।

রাফিজ কিছুই বুঝতে পারল না।

কি সৃষ্টি করব? - প্রশ্ন করে সে।

জগৎ।

আমি জগৎ সৃষ্টি করব কিভাবে? আমি তো স্রষ্টা নই।

আপনি যা চান, এখানে তাই হবে - আপনি যা ভাববেন, তাই এখানে সত্য।

কিভাবে এটা সম্ভব?

ফেরেশতা হাসল - এটা পৃথিবীর মত অন্যের তৈরী করা কোন স্বপ্ন নয়, ঐ স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এটা প্রকৃত বাস্তবতা। এখানে আপনার স্বপ্ন আপনি নিজেই তৈরী করে নেবেন, এবং সেই স্বপ্নের জগতে বাস করতে থাকবেন - অনন্তকাল।

মৃত্যু আপনাকে পৃথিবী থেকে মুক্ত করে দিয়েছে, স্বপ্নের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন আপনি - এখন শুধু সৃষ্টি আর সৃষ্টি।

রাফিজ হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ এভাবে, তারপর সে একটু মাথা খাটাতে শুরু করল। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হয়তো এ রহস্যের কোন কিনারা করা যাবে।

যদি আমি স্বর্গ তৈরী করতে চাই, তাহলে আমাকে কি করতে হবে?

যারা বিশ্বাস করে তারাই কেবল স্বর্গ তৈরি করতে পারে। - ফেরেশতা বলে।

পৃথিবীকে যারা সুন্দরভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল, এইখানে তাদের স্বপ্ন তারা বাস্তবায়িত করার সুযোগ পাবে।

আর যারা পৃথিবীতে কুৎসিৎ চিন্তা করেছে আর মানুষের ক্ষতি করেছে?

তারা চাইলেও স্বর্গ তৈরী করতে পারবে না। - বলে ফেরেশতাবেশী।

তারা পার্থিব জীবন কাটিয়েছে বিকৃতির ধ্যানে - এখানেও তারা যন্ত্রণাময় কুৎসিৎ একটা জগৎ ছাড়া আর কিছুই তৈরি করতে পারবে না। কারণ সুন্দর ভাবে চিন্তা করতে এমনকি স্বপ্ন দেখতেও তারা অভ্যস্ত নয়। এবং তাদের তৈরী করা যন্ত্রণাময় জগতে তারা থাকবে - চিরকাল।

আমি তো এদের কারো দলেই পড়ি না।

কিভাবে? - ফেরেশতা অবাক হয়, সম্ভবতঃ তার অপার্থিব জীবনে এই প্রথম।

আমি ছিলাম অবিশ্বাসী, স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস ছিল না আমার, বিশ্বাস ছিল শুধু নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিতে। আমার বুদ্ধিতে যা আসে নি, তা বিশ্বাস করতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না কোনদিন।

অর্থাৎ আপনি কোন স্বপ্নই দেখেন নি - না সুন্দর, না কুৎসিৎ!

পৃথিবীতে আমি বাস্তববাদী ছিলাম।

কিন্তু এটাই তো বাস্তব, আর পৃথিবীটাই তো স্বপ্ন।

তখন তো সেটা জানতাম না।

তাহলে তো আপনি কোন জগৎই তৈরি করতে পারবেন না। - ফেরেশতা তার আশংকা প্রকাশ করল।

কারণ কোন জগতের স্বপ্ন আপনি দেখেনই নি কোনদিন।

রাফিজ চুপ হয়ে গিয়ে আবার চিন্তা করতে লাগল। এভাবে কেটে গেল আরো এক হাজার বছর। রাফিজ লক্ষ্য করল, ওর আশে-পাশে কেউ নেই। ওকে এখানে পৌঁছে দেয়া পর্যন্তই ছিল ফেরেশতার দায়িত্ব। এখন সে নিজেই তার নিজের একমাত্র সহায়।

রাফিজ আবার খুব মন দিয়ে চেষ্টা করতে লাগল একটি জগৎ তৈরী করতে। কিন্তু সে যতবারই চেষ্টা করতে যায় - তার মনে হয়, এটা একটা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না - যা একটু পরই শেষ হয়ে যাবে। সে যতবারই চেষ্টা করে - তার মনে হয়, মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্বই সম্ভব নয়।

সুতরাং প্রতিবারই সে ব্যর্থ হল একটি স্বপ্ন তৈরী করতে - যেন ব্যর্থ হতে থাকবে অনন্তকাল। আর ওর মনে হল, এভাবে হাজার হাজার বছর ধরে তার চারপাশে বিরাজ করতে থাকবে অদ্ভুত এই শূণ্যতা - সীমাহীন।


ডিউটি ডাক্তার ভিসিটিং প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করল - কোমায় আর কতক্ষণ থাকবে বলে মনে হয়, স্যার?

প্রফেসর মলিন হাসলেন - এ অবস্থায় কি কোন মন্তব্য করা সম্ভব?

ডিউটি ডাক্তার এক্সীডেন্টে অজ্ঞান হয়ে থাকা রোগীটির রুটিন চার্ট পূরণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

কিন্তু সে জানে, এধরণের কেসগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেষ ফলাফল মস্তিষ্কের মৃত্যুই হয়ে থাকে - আর সেক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং একেবারেই ফলাফলশূণ্য একটি প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

লেখকঃ তরুন কথাশিল্পী, গবেষক, প্রকৌশলী

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ