প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label ফররুখ আহমদ. Show all posts
Showing posts with label ফররুখ আহমদ. Show all posts

Sunday, July 8, 2012

বৃষ্টির ছড়া | ফররুখ আহমদ


বিষটি এল কাশ বনে
জাগল সাড়া ঘাস বনে,
বকের সারি কোথা রে
লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে।
নদীতে নাই খেয়া যে,
ডাকল দূরে দেয়া যে,
কোন সে বনের আড়ালে
ফুটল আবার কেয়া যে।
গাঁয়ের নামটি হাটখোলা,
বিষটি বাদল দেয় দোলা,
রাখাল ছেলে মেঘ দেখে,
যায় দাঁড়িয়ে পথ-ভোলা।
মেঘের আঁধার মন টানে,
যায় সে ছুটে কোন খানে,
আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে
আমন ধানের দেশ পানে।

Saturday, July 7, 2012

পাঞ্জেরি | ফররুখ আহমদ




রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
দীঘল রাতের শ্রান্তসফর শেষে
কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা পড়েছি এসে?
এ কী ঘন-সিয়া জিন্দেগানীর বা’ব
তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব
অস্ফুট হয়ে ক্রমে ডুবে যায় জীবনের জয়ভেরী।
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
সম্মুখে শুধু অসীম কুয়াশা হেরি।

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
বন্দরে বসে যাত্রীরা দিন গোনে,
বুঝি মৌসুমী হাওয়ায় মোদের জাহাজের ধ্বনি শোনে,
বুঝি কুয়াশায়, জোছনা- মায়ায় জাহাজের পাল দেখে।
আহা, পেরেশান মুসাফির দল।
দরিয়া কিনারে জাগে তক্দিরে
নিরাশায় ছবি এঁকে!
পথহারা এই দরিয়া- সোঁতারা ঘুরে
চলেছি কোথায়? কোন সীমাহীন দূরে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
একাকী রাতের ম্লান জুলমাত হেরি!

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
শুধু গাফলতে শুধু খেয়ালের ভুলে,
দরিয়া- অথই ভ্রান্তি- নিয়াছি ভুলে,
আমাদেরি ভুলে পানির কিনারে মুসাফির দল বসি
দেখেছে সভয়ে অস্ত গিয়াছে তাদের সেতারা, শশী।
মোদের খেলায় ধুলায় লুটায়ে পড়ি।
কেটেছে তাদের দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ শর্বরী।
সওদাগরের দল মাঝে মোরা ওঠায়েছি আহাজারি,
ঘরে ঘরে ওঠে ক্রন্দনধ্বনি আওয়াজ শুনছি তারি।
ওকি বাতাসের হাহাকার,- ও কি
রোনাজারি ক্ষুধিতের!
ও কি দরিয়ার গর্জন,- ও কি বেদনা মজলুমের!
ও কি ধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী।

পাঞ্জেরি!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি,
জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি!
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!

কবিদেরও কবি ফররুখ আহমদ | ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

বাঘের খালা বিল্লী
আস্লো ঘুরে দিল্লী
তুলতুলে চার বাচ্চা,
বল্ছি আমি সাচ্চা,
পায়ের নিচে মখমল;
চোখ জ্বলে তার জ্বলজ্বল ॥
এমন সুন্দর পঙ্ক্তি কার হতে পারে, জানা আছে? হ্যাঁ, যার চেহারায় মায়াবী আভা, যিনি শুভ্রতার প্রলেপে মোড়ানো চারিত্রিক গুণাবলিতে পরিপূর্ণ মানুষ, ডিমের মতো বিশাল চোখের চাহনিতে যার বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্য ঝলছে উঠতো প্রতিনিয়ত, কথা-কাজের ভারসাম্য যাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতো, যিনি দূর থেকে শুধু কবিতা পড়ে তাঁকে ভালবাসতেন তিনি কোনোভাবে তাঁর সাক্ষাৎ পেলে জীবনকে ধন্য করে নিতেন। এমন আকর্ষণীয় চরিত্রের সুন্দর মানুষটি আর কেউ নন; পবিত্র রমজান মাসে জন্মেছিলেন বলে দাদীমা তাঁকে আদর করে রমজান বলে ডাকতেন। তিনিই আমাদের প্রিয়কবি ফররুখ আহমদ।
সংস্কৃতির উৎসভূমি বৃহত্তর যশোর। সেখানকার অন্যতম পাদপীঠ বর্তমান মাগুরা জেলার মধুমতি পাড়ের পাখির কলকাকলিতে মুখরিত মাঝআইল গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে অর্থাৎ ১৯১৮ সালের ১০ জুন ব্রিটিশ আমলের সাবরেজিস্ট্রার অফিসের প্রভাবশালী কর্মকর্তা সৈয়দ আব্বাস আলীর পুত্র পুলিশ ইন্সপেক্টর সৈয়দ হাতেম আলীর ঔরসে জন্মগ্রহণ করলেন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়সে মা রওশন আখতার মারা গেলে জমিদারকন্যা দাদীমা তাঁকে লালন পালন করেন। পুণ্যবতী সুশিক্ষিতা দাদীমার কাছেই তাঁর কাব্যমানস তৈরি হয়েছিল। দাদীমা তাঁকে শুনিয়েছেন দাতা হাতেমতায়ী, দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসীন, সত্যসাধক বাদশা আলমগীরের মজার মজার কাহিনী। এ ছাড়া তাযকিরাতুল আউলিয়া, কাসাসুল আম্বিয়াসহ আরব্য উপন্যাসের সিন্দবাদ এবং আলী বাবার গল্পও শুনেছিলেন দাদীমার কাছেই।
দাদীমার তত্ত্বাবধানে নিজ বাড়িতেই শিক্ষার হাতেখড়ি তাঁর। অতঃপর কলকাতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। তবে পিতার কর্মস্থল বদলির কারণে খুলনা জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। স্কুলজীবনের এ উচ্ছলতাময় সময়ে সংস্পর্শ পান কবি গোলাম মোস্তফা, কবি আবুল হাশিম ও সাহিত্যিক আবুল ফজলের এবং সখ্য গড়ে ওঠে সত্যজিৎ রায়, আবু রুশদ, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন প্রমুখের সাথে। কলকাতা রিপন কলেজ এবং স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কবি বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশীর মতো বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখকদেরকে শিক্ষক হিসেবে এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও ফতেহ লোহানীকে পান বন্ধু হিসেবে। শিক্ষক ও বন্ধুদের প্রেরণায় কবিতার অঙ্গন তার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে পড়ে। চিন্তার অস্থিমজ্জায় শুধু কবিতা আর কবিতা। দাম্পত্য ও কর্মজীবনের ঝামেলা তাঁকে এ অঙ্গন থেকে ক্ষণিকের জন্যও বিরত রাখতে পারেনি। তাইতো তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে, বেঁচে থাকবেন সগৌরবে।
মানুষকে খুব আপন করে দেখতেন ফররুখ। পোশাক পরিচ্ছদ খাওয়া দাওয়া চলাফেরা এমনকি চিন্তার দিক থেকেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম করে ফেলতেন। সকল মতের কবিবন্ধুদের সাথেই ছিল তার সখ্য। সকল মানুষকেই তিনি সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন, এমনকি যথাসাধ্য সাহায্যও করতেন। তিনি সমস্ত মানুষকে আত্মার আত্মীয় বলে মনে করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘মানুষকে জন্মাতে হয় বলেই ভিন্ন ভিন্ন মায়ের পেটে জন্মে। কেউ কাউকে পর ভাবা ঠিক নয়। যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক তারা রক্তীয়, আর যাদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক- আত্মার সম্পর্ক তারাই আত্মীয়, পরম আত্মীয়।’
তিনি ছিলেন মানবতাবাদী কবিপুরুষ। ইসলামের সুমহান আদর্শ অবলম্বনে মহানবীর (সা) দেখানো মানবতাবাদকে সরাসরি স্পর্শ করেছেন তিনি। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন যে, পরদেশী ব্রিটিশের শাসন ও শোষণের ভয়াবহ ছোবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মুজাহিদদের ইতিহাস দেখেছেন। সেই সাথে হযরত শাহসুফী আবুবকর সিদ্দিকীর তাসাউফী অন্তর, মুনসী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ও ইসমাইল হোসেন শিরাজীর প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং মহাকবি আল্লামা ইকবাল ও কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদী বিদ্রোহী চেতনাকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যান। আদর্শবাদিতা, রোমান্টিসিজম এবং মেধা ও মননের প্রখরতায় গড়ে তোলা তীক্ষè কাব্যশক্তিকে তিনি মানবতার জন্য উৎস্বর্গ করেছিলেন। তাইতো তাঁর সাহসী উচ্চারণÑ
জীবন আমার  করে যেন
দুস্থজনে সমর্থন
দুঃখী এবং বৃদ্ধ জয়িফ
যেন আমার হয় আপন।
নীতিগত দিক থেকে কবি ছিলেন আলিফের মতো খাড়া। তিনি সকল মানুষের সাথেই একাত্ম হয়েছিলেন বটে, কিন্তু আদর্শকে বিকিয়ে দিয়ে নয়। মাখানো ময়দার মধ্য থেকে চুলকে যেভাবে বের করা হয়, ঠিক সেভাবেই তিনি ঐ সমাজ থেকে নিজের আদর্শকে পঙ্কিলতা মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বার্থান্ধতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। স্বভাবে, অভাবে, সুখে দুঃখে কোনো সময়ই তিনি চাটুকারিতার আশ্রয় নিতে যাননি। দুনিয়ার তথাকথিত বৈভব সাফল্য তার কাছে লোভনীয় ছিল না। তাঁর মূল সুর ছিল-
‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া
তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।’
এমনকি যারা স্বার্থ হাসিলের জন্য নীতি বিসর্জন দেয়, তাদের জন্য তিনি শিশুতোষ কাব্য নাটিকায় বাদুরের সাথে তুলনা করেন এবং শেষ পঙ্ক্তিতে প্রমাণ করেছেন- ‘সুযোগ মতো যারা ও ভাই মতটা বদল করে/অতি চালাক বাদুরগুলোর মতই তারা মরে।’ নৈতিক অবস্থানকে মজবুত রাখতে শিশু-কিশোরদেরকেও নির্যাতিত অভাবী ও দুস্থজনের পার্শ্বে দাঁড়ানোর ছবক দিতেন কবি ফররুখ। তিনি বলেনÑ
খোকন যাবে কার বাড়ি?
খোকন যাবে তার বাড়ি
নাই জামা যার নাই গাড়ি।
পাকিস্তানের সমর্থক আখ্যা দিয়ে ফররুখ আহমদকে কেউ কেউ ভিন্ন চোখে দেখার চেষ্টা করেন। সত্যিকার অর্থে তিনি পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন না বরং একজন মানবতাবাদী হিসেবে তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। ব্রিটিশের কবল থেকে মুক্ত হবার জন্য তার স্বাধীনচেতা অন্তর সব সময় অস্থির ছিল। মুসলমানদের হাতে দেশের ক্ষমতা এলে মানবতা বিকশিত হবে এটা তাঁর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী জাতিকে হতাশ করেছে। এমনকি এ হতাশাব্যঞ্জক আচরণের কারণে তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কোনো মোসাহেবি তো দূরের কথা সংস্কারমূলক সমালোচনা ছাড়া তাদের পছন্দসই কোনো কথাই বলেননি। কবি কামরুল হাসানের ভাষায় ‘আপন বিবেকের দিকে দৃষ্টি রেখে বলতেই হবে, আপত্তি সত্ত্বেও পাকিস্তান আমলের বহু কিছু আমরা মেনে নিয়েছিলাম। আমরা যারা ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলাম, তাদের বহু সংখ্যক মহারথীই পশ্চিম পাকিস্তানে বহুবার পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে ঘুরে এসেছিলাম। কিন্তু নীতির যুদ্ধে যে লোকটিকে আমরা চিরকাল শত্র“ শিবিরের লোক বলেই চিহ্নিত করে এলাম, সেই ফররুখ ভাইকে গত তেইশ বছরের পাকিস্তান সরকার একটি দিনের জন্যও পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেতে পারেনি। এটা আপনাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব ঘটনা এবং পর্বত-শিখরের মতই এমনি নিজের একান্ত মতবাদে অটল ছিলেন ফররুখ ভাই। এমনকি পাকিস্তানি শাসকদের অনভিপ্রেত কার্যাবলির প্রেক্ষিতে তিনি ‘রাজ রাজরা’ নামক ব্যঙ্গ নাটকের মাধ্যমে তাদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন।’
মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়েই কবির পথ চলা। মানুষের অধিকার যার হাতে ক্ষুণœ হয় সে তাঁর বন্ধু হলেও তিনি তার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরই যখন তিনি বাংলা ভাষার ক্রান্তিকালের আভাস পেলেন তখনই তিনি ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবি। প্রবন্ধের সূচনাই তিনি করেছিলেন এভাবেÑ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে এ নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা হয়েছে। জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’ ভাষা আন্দোলন শুরুর আগেই তার এ প্রবন্ধ ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এ প্রবন্ধে তিনি গণতান্ত্রিক ধারাকে মুক্তির মোহনায় এনে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন গণতান্ত্রিক ও মানবতাবাদী মানুষ।
সত্যিকারার্থে মানবতার মুক্তির জন্য চাই হযরত উমর (রা)-এর মতো দরাজ দিলের মানুষ। এ প্রত্যাশায় কবি বলেনÑ
লুণ্ঠিত হলে মানবতা তুমি
জাগো অনাচার বাধন টুঁটি
প্রবল লাথিতে ভেঙে ফেলে ছেঁড়ো
সব জালিমের পাপের ঝুটি।
পূর্বসূরি তীতুমীরের আন্দোলন সম্পর্কেও কবির মূল্যায়ন;
তীতুমীরের স্বপ্ন সফল হবে
যেদিন ধরায় জুলুম নাহি রবে।
কবি প্রভুর দরবারে চলে গেলেন ১৯৭৪ সালের ১৯ জুন সন্ধ্যাবেলায়। জীবনব্যাপী জালিমের নিষ্টুরতা, নির্মমতা, অমানবিকতা ও অসহায়দের চিত্রিত করতে কবি ফররুখ যেমন নির্মাণ করেছেন বিরান মড়কের গান, তুলে এনেছেন অসহায় মানুষের ‘আউলাদ, পথে পথে দেখেছেন মানবতার ‘লাশ’ আর মুক্তিকামী মানুষের জন্য খুঁজে ফিরেছেন ‘উমর দরাজ দিল’, সাত সাগরের মাঝি হয়ে সফর করেছেন ‘বার দরিয়ায়’, পরখ করেছেন ‘দরিয়ার শেষ রাত্রি’, সিন্দবাদকে ডেকে হাতেম তায়ীকে সঙ্গী করে হেরার রাজ তোরণে’ পৌঁছতে চেয়েছেন সগৌরবে। তেমনি শিশুদের দেশজ চেতনাকে শাণিত করার জন্য তিনি লিখেছেন, পাখির বাসা, নতুন লেখা, হরফের ছড়া, ছড়ার আসর, চিড়িয়াখানা, কিসসা ও কাহিনী, ফুলের জলসা, মজার ছড়া, ছড়া ছবির দেশে, আলোকলতা প্রভৃতি মজার মজার কাব্যসম্ভার।
সরলতা ও সহবোধ্যতা তাঁর শিশুতোষ কবিতাকে সুখপাঠ্য করে তুলেছে। অন্যদিকে প্রতীকীর ব্যবহার, দূরদর্শী চিত্রকল্প ও বুদ্ধিদীপ্ত উপমা তাঁর ভাবময় কবিতাকেও পাঠক হৃদয়কে আঁকড়ে রেখেছে মায়াবী বাঁধনে। তাঁর কোনো কবিতাই পাঠককে দূরে ঠেলে দেয় না। এখানেই কবি ফররুখের বড় সফলতা। বাংলাদেশ, বাংলাভাষা এবং ফররুখ আহমদ একই সূত্রে গাঁথা।
আপন গুণেই তিনি পাঠক হৃদয়ে জাগরুক থাকবেন চিরদিন। কেননা তিনি যেমন গণমানুষের কবি তেমনি দেশপ্রেমিক কবিদেরও কবি।

আধুনিক মহাকবি ফররুখ আহমদ | আহমদ বাসির

ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ আধুনিক মহাকবি। সাধারণ অর্থে মহাকাব্যের যিনি রচয়িতা, তিনিই মহাকবি। ব্যাপক অর্থে মহাজীবনকে যিনি কাব্যকর্মে ধারণ করতে পারেন, তিনিই মহাকবি। এই দুই অর্থেই ফররুখ মহাকবি। বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ মহাকাব্য ‘হাতেম তা’য়ী’ রচনা করে তিনি এই মর্যাদার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যদিকে, তিনি তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। কাব্য সাধনার বাইরে ফররুখের জীবনসাধনাও এক মহাকাব্যিক মর্যাদায় উদ্ভাসিত। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের পর ফররুখ আহমদই যে বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, এ ব্যাপারে এখন আর কারও মধ্যে তেমন সংশয় নেই। মৃত্যুর ৩৬ বছর পরও তিনি নতুনভাবে উদ্ভাসিত হচ্ছেন আমাদের সামনে। আজও প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর অসামান্য, অপ্রকাশিত কবিতা ও রচনা। বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সমালোচক ও গবেষক হিসেবে স্বীকৃত, সদ্য পরলোকগত কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ফররুখ সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য-উপাত্ত ও নতুন নতুন বিবেচনা হাজির করার প্রাণান্ত সাধনা চালিয়েছেন। ফররুখ আহমদের কাব্য ও জীবনের ঐশ্বর্যই তাঁকে ব্যাপৃত রেখেছিল এই সাধনায়।
১৯৬৬ সালে যখন ফররুখের মহাকাব্য ‘হাতেম তা’য়ী’ প্রকাশ পায়, তখনই সাহিত্যাঙ্গনে এক তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সাহিত্য সমালোচকদের একটি বড় অংশ ‘হাতেম তা’য়ী’কে ফররুখের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম বলে স্বীকৃতি দেন। ‘সাত সাগরের মাঝি’র কবি, ‘সিরাজাম মুনীরা’র কবি, ‘নৌফেল ও হাতেম’-এর কবি, ‘মুহূর্তের কবিতা’র কবি, ফররুখ আহমদের এই মহাকাব্য ওই বিতর্ককে আজও চলমান রেখেছে। কেউ বলছেন ‘সাত সাগরের মাঝি’ তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি, কেউ বলছেন ‘সিরাজাম মুনীরা’। ‘মুহূর্তের কবিতা’কে কেউ কেউ স্বীকৃতি দিচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সনেট গ্রন্থ হিসেবে, ‘নৌফেল ও হাতেম’ স্থান পেয়েছে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ক’টি কাব্যনাটকের তালিকায়। এ থেকেই বোঝা যায়, ফররুখের এসব গ্রন্থের কোনোটি কোনোটির থেকে কম নয়।
ফররুখ যখন ‘হাতেম তা’য়ী’ লিখেছেন, তখন কেউ ভাবতেই পারেনি যে এ যুগেও কেউ মহাকাব্য লিখতে পারে। কেননা, রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল কোনো মহাকাব্য রচনা করেননি। ফলে মহাকাব্য রচনা ধারার অবসান হয়েছে বলেই বিশ্বাস ছিল সবার। এ অবস্থায় ফররুখের মতো কবি যখন মহাকাব্য রচনা করলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই হতচকিত হয়ে উঠেছিল বাংলা সাহিত্যের অঙ্গন। এ কাব্যের পক্ষে-বিপক্ষে, ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা কথাই লেখা হয়েছিল সে সময়। কিন্তু এই আধুনিককালেও মহাকাব্য পাঠের স্বাদ আস্বাদন করতে পাঠককুলের কোনো বেগ পেতে হয়নি। তার প্রমাণ রয়ে গেছে রথী-মহারথী সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচকদের কথায়, লেখায় ও মন্তব্যে।
ফররুখ আহমদের জীবন ও কাব্যকর্মের প্রকৃত প্রণোদনা ছিল ইসলাম, আধুনিকতাবাদের চরম বিকাশের যুগে ইসলামের দর্শনকে এত গভীরভাবে আত্মস্থ করা কবির সংখ্যা গোটা পৃথিবীতেই হাতে গোনা। ভারতীয় উপমহাদেশে কেবল ইকবাল ও নজরুলই তা পেরেছিলেন; যদিও নজরুল কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন। পৃথিবীর অন্যত্র এমন আর কোনো কবির কথা আমাদের জানা নেই। ইসলামের দর্শনকে আত্মস্থ করে ফররুখ তাঁর কবিতাকে কোন উচ্চতায়, কোন গভীরতায় উপস্থাপন করেছেন? বলা যায় সেটা হিমালয়সম উচ্চতা, সমুদ্রসম গভীরতা। সমালোচকরা বলছেন, জেমস এলেবি ফ্লেকার যে ‘স্বর্ণখচিত পথ ধরে সমরখন্দ ভূখ ের উদ্দেশে রওয়ানা করেছেন’ তার সেই অভিযাত্রার তুলনায় ফররুখের সাত-সাগরের মাঝির সমুদ্রযাত্রা অনেক বেশি অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ। তদুপরি ফ্লেকারের অভিযাত্রা কেবলই রোমাঞ্চকর। কিন্তু ফররুখের অভিযাত্রা আরও দূর, অনন্ত, অন্তহীন পথে এবং সে যাত্রা অনেক বেশি সংহত ও লক্ষ্যাভিসারী এবং সে অভিযাত্রা গভীরতর মানবিক উদ্দেশ্যপূর্ণ। ফররুখ অতি অনায়াসে ছাড়িয়ে যান বিশ্ববিশ্রুত রোম্যান্টিক কবিদের। ফররুখের ‘ডাহুক’ কবিতার সঙ্গে সমালোচকরা শেলীর ‘স্কাইলার্ক’ কিংবা কীটসের ‘ওড টু নাইটিঙ্গেল’কে মেলাবার বহু চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন তারা। কেননা স্কাইলার্ক কিংবা নাইটিঙ্গেলকে ছাড়িয়ে অতি উচ্চ এক মাত্রা যুক্ত হয়েছে ‘ডাহুক’ কবিতায়। শুধু পশ্চিমা শিল্পচেতনা কিংবা সমাজবাদী শিল্পবোধ দ্বারা ফররুখকে কখনও মাপা যায়নি, যাবেও না।
ফররুখ এমন এক জীবন যাপন করেছেন, যে জীবন অব্যাহত সাধনা ছাড়া যাপন করা যায় না। তাঁর জীবনই বাংলা সাহিত্যের আরেকটি ট্র্যাজিক মহাকাব্যের বিন্যাস। বাংলা সাহিত্যে ফররুখের সবচেয়ে প্রিয় কবি ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মাইকেলের সঙ্গে ফররুখের জীবনের রয়েছে বিস্তর মিল। মাইকেলের জীবনও এক মহাকাব্যেরই অনুষঙ্গ। মাইকেল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক আধুনিক মহাকবি, আর ফররুখ বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ সার্থক আধুনিক মহাকবি।
ফররুখের কবিতাকে আজ গোটা পৃথিবীর সর্বত্রই ছড়িয়ে দেয়ার সময়। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের অভিশাপে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া মানুষের মানবিক জীবনযাপনের স্বপ্নের ক্যানভাসটি আবার নতুন করে গড়ে তোলার জন্য ফররুখ বিশ্বময় এক অনিবার্য কবিসত্তা।

ফররুখ আহমদ

পুলিশ ইন্সপেক্টর সৈয়দ হাতেম আলী আই.এ. পাশ করেই চাকরিতে যোগ দেন। খুলনা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলা ছিল তাঁর কাজের এলাকা। তবে আই.জি. পুলিশ অফিসে রিপোর্ট দাখিল করার জন্য তিনি মাঝে মাঝে কলকাতায় যেতেন। সৎ মানুষ হিসেবে সুনাম ছিল তাঁর। তিনি মজলিশি ছিলেন এবং 'খান সাহেব' উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর দুই স্ত্রী। প্রথম পক্ষের স্ত্রী ১৯২৪ সালে মারা যাবার পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন।
প্রথম স্ত্রীর ঘরে পর পর তিনটি মেয়ে জন্মের পর ফররুখ আহমদের জন্ম হয়। রমজানের সময় ফররুখের জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর দাদি তাঁকে আদর করে রমজান বলে ডাকতেন। ছয় বছর বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন ফররুখ। দীর্ঘজীবী দাদিই তাঁকে লালন পালন করেন। শৈশবে দাদির কাছে ফররুখ শুনতেন পুঁথির কাহিনী, তাজকিরাতুল আউলিয়া এবং কাসাসুল আম্বিয়া। দাদীর অতি আদরের এই নাতিটি ছোটবেলায় ছিলেন খুব দুরন্ত। তবে সেই বয়সের দুরন্ত এই ছেলেটিকেই আবার ভাবুকতা ও উদাসীনতা পেয়ে বসত প্রায়ই । ধু ধু মাঠে কিংবা মধুমতী নদী তীরে একা একা ঘুরে বেড়াতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। জ্যোৎস্না রাতে বাঁশঝাড়ের পাশে গিয়ে ডাহুকের ডাক শুনতেন চুপ করে। আর এসবই হয়তো তাঁর মধ্যে কবিতা লেখার প্রেরণা জুগিয়েছিল। যার ফলে তিনি স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন এবং এদেশের বিশিষ্ট ও প্রধান সারির কবিদের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে।
যশোর জেলার মাগুরা থানার মাঝআইল গ্রামে ১৯১৮ সালের ১০ জুন ফররুখ আহমদ জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর মার নাম রওশন আখতার। ফররুখ ছিলেন সচ্ছল পরিবারের সন্তান। তাঁদের পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত। ১৯৪৩ সালে ফররুখের বাবা ইন্তেকাল করেন। তাঁর দাদিও ঐ বছর মারা যান।
মাঝআইল গ্রামের পাঠশালায় ফররুখ কিছুদিন পড়েছিলেন। ফারসি-জানা এক মহিলা বাড়িতে এসে তাঁকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। তারপর কলকাতায় গিয়ে মডেল এম.ই.স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এরপর কিছুদিন পড়েন বালিগঞ্জ হাই স্কুলে। বালিগঞ্জ হাই স্কুলে কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর শিক্ষক ছিলেন। বালিগঞ্জ স্কুলে পড়ার সময় তিনি দিলকুশা স্ট্রিটে থাকতেন এবং রোজ সন্ধ্যার পর দিলকুশা পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়তে যেতেন। সমবয়সী, পরবর্তীকালের বিখ্যাত কথাশিল্পী আবু রুশদও ঐ লাইব্রেরিতে প্রায় প্রতিদিন যেতেন। কখনো লাইব্রেরিতে বসে, কখনো পার্ক সার্কাস ময়দানের কোনো নিরালা কোনায়, কখনোবা হেঁটে গড়িয়াহাট লেক পর্যন্ত যেতে যেতে তাঁরা দু'জনে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। সেইসময় তিনি নিরালায় দরাজ গলায় আবৃত্তি করতেন শেলি, কীটস, নজরুলের কবিতা।
এর পর ফররুখ ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। এই স্কুলে তাঁর শিক্ষক ছিলেন সাহিত্যিক আবুল ফজল ও কবি আবুল হাশেম। এই স্কুলের ম্যাগাজিনে ফররুখ আহমদের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এই স্কুল থেকেই ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। কলকাতায় এসে রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে রিপন কলেজ থেকে তৃতীয় বিভাগে আই.এ. পাশ করার পর ঐ বছরই কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ.-তে ভর্তি হন। এরপর ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। তাঁর অধ্যাপকমণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। স্কুল-কলেজে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিকার সত্যজিৎ রায়, অভিনেতা ফতেহ লোহানী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তবে যে-কোনো কারণেই হোক, শেষ পর্যন্ত বি.এ. পরীক্ষা দেননি তিনি।
কলকাতায় থাকাকালীন ফররুখ আহমদ অনেকগুলি চাকরি করেছেন। কিন্তু সবগুলিই ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে, ১৯৪৫ সালে মাসিক 'মোহাম্মদী'-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি।
তবে এসব কোনো চাকরিই বেশি দিন করেননি তিনি। কারণ শুধুমাত্র 'মোহাম্মদী' ছাড়া অন্যগুলির কোনটিই তাঁর কবিমনের সঙ্গে খাপ খায়নি। ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে ফররুখ আহমদ 'মোহাম্মদী'-তে চাকরি নেন । আর লেখক হিসেবে অনেক আগে থেকেই 'মোহাম্মদী'-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর একটি কবিতা সেই সময়কার 'মোহাম্মদী' ও 'আজাদ' সম্পাদক নিজের নামে ছাপানোর কারণে তিনি ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে 'মোহাম্মদী'-র চাকরি ছেড়ে দেন।
ঢাকা বেতারেই ফররুখ আহমদ দীর্ঘদিন চাকরি করেন। ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট বা নিজস্ব শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকেন এবং আমৃত্যু ঢাকা বেতারে ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ফররুখ আহমদ দীর্ঘকাল 'কিশোর মজলিশ' পরিচালনা করেছেন। বেতারের প্রয়োজনে অসংখ্য গান, কথিকা, নাটিকা, শিশুতোষ রচনা, গীতিনাট্য, গীতিবিচিত্রা ইত্যাদি লিখেছেন। নিজের ও অন্যদের কবিতা আবৃত্তি করেছেন। পুঁথি পাঠও করেছেন মাঝে মাঝে। বিশেষ অনুষ্ঠানসমূহ প্রযোজনা করেছেন। বেতারে তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন কবি শাহাদাৎ হোসেন, কবি সৈয়দ আলী আহসান, কবি আবুল হোসেন, কবি সিকান্দার আবু জাফর, কবি শামসুর রাহমান, কবি হেমায়েত হোসেন, গীতিকার নাজির আহমদ, কথাশিল্পী আশরাফ-উজ-জামান খান, কথাশিল্পী নাজমুল আলম প্রমুখ।
১৯৩৭ সালে ফররুখ আহমদ প্রথম সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। কারণ এবছরই 'বুলবুল' ও 'মোহাম্মদী'-তে তাঁর প্রথম রচনাবলি প্রকাশিত হয়। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মনে হয়, 'বুলবুল'-এ প্রকাশিত 'রাত্রি' সনেটটিই তাঁর প্রথম মুদ্রিত কবিতা (শ্রাবণ ১৩৪৪)। এরপর প্রায় এক হাজারেরও বেশী সনেট তিনি রচনা করেছেন।
প্রথম দিকে ফররুখ গল্পও লিখতেন। যেমন 'মৃত বসুধা' ('সওগাত', কার্তিক ১৩৪৪), 'যে পুতুল ডলির মা' ('বুলবুল', বৈশাখ ১৩৪৫), 'প্রচ্ছন্ন নায়িকা' ('মোহাম্মদী', কার্তিক ১৩৪৬) ইত্যাদি। এমনকি 'সিকান্দার শা-র ঘোড়া' নামে 'মৃত্তিকা' পত্রিকায় একটি উপন্যাসও শুরু করেছিলেন (শ্রাবণ ১৩৫৩)- কিন্তু তা শেষ করেননি। ফররুখের কথাসাহিত্য বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। কিন্তু অঝোরে কবিতা লিখতে থাকেন তিনি এবং তা নিয়মিত প্রকাশিতও হতে থাকে। সেকালে কলকাতার প্রথম শ্রেণীর বহু পত্র-পত্রিকায় তিনি লিখেছেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায়, অজিত দত্ত সম্পাদিত 'দিগন্ত' বার্ষিকীতে; মুসলমান সম্পাদিত 'সওগাত', 'মোহাম্মদী', 'বুলবুল', 'মৃত্তিকা' প্রভৃতি পত্রিকায়; 'বাম বলয়ের অরণি', 'পরিচয়' প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি লিখেছেন।
১৯৪৪ সালে 'সাত সাগরের মাঝি' প্রকাশিত হলে 'সওগাত', 'মোহাম্মদী' প্রভৃতি পত্রিকায় তার দীর্ঘ আলোচনা ছাপা হয়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ফররুখ আহমদ যেমন 'লাশ', 'আউলাদ' প্রভৃতি কবিতা লিখেছেন, ১৯৪৬ সালে তেমনি হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় আর্ত কবি লিখেছিলেন 'বন্ধু' (স্বাধীনতা, ২৩শে নভেম্বর ১৯৪৬), 'নিজের রক্ত' (২৭শে অক্টোবর ১৯৪৬) প্রভৃতি কবিতা। 'নিজের রক্ত' কবিতাটি অল ইন্ডিয়া রেডিও-র কলকাতা কেন্দ্র থেকে কবিকণ্ঠে প্রচারিত হয়। কলকাতা-জীবনে ফররুখ আহমদের দুটি মাত্র কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল- 'সাত সাগরের মাঝি' (১৯৪৪) ও 'আজাদ করো পাকিস্তান' (১৯৪৬)। কিন্তু কলকাতা জীবনে রচিত কবিতার সংখ্যা অজস্র।
১৯৪৮ সালে ফররুখ ঢাকায় চলে আসার পর মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঢাকাই ছিল তাঁর সাহিত্যক্ষেত্র। ১৯৪৮-৭৪ এই প্রায় তিন দশক তিনি অবিরত সাহিত্য চর্চা করেছেন। এই বছরগুলোতে তাঁর চারটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, চারটি শিশুকিশোরতোষ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো পাণ্ডুলিপির পরিকল্পনাও প্রস্তুত করেছেন, যার কয়েকটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রাকশিত হয়েছে। শিশু-সাহিত্যেও তাঁর দান রয়েছে অসীম।
বিভাগ পরবর্তীকালে তিনি মূলত লিখেছেন 'সওগাত', 'আজাদ', 'মোহাম্মদী', 'মাহে-নও', 'দিলরুবা', 'সৈনিক', 'আজ', 'মদিনা', 'তাহজীব' ইত্যাদি পত্রিকায়, অসংখ্য ছোট পত্রিকায় ও সংকলনে। ফররুখ কয়েকটি গদ্য ও কাব্যনাট্য লিখেছিলেন। এর মধ্যে 'দরিয়ায় শেষ রাত্রি' (সাত সাগরের মাঝি গ্রন্থভুক্ত), 'তৈমুর' ও 'নৌফেল ও হাতেম' রেডিও-তে প্রচারিত হয়েছে। ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমীর উদযাপিত নাট্য-সপ্তাহে 'নৌফেল ও হাতেম' মঞ্চস্থ হয়েছে।
ফররুখ আহমদ আরেকটি একাঙ্ক কাব্যনাট্য লিখেছিলেন। 'নয়া জিন্দেগী' নামে এটি 'মোহাম্মদী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়, পুনর্লিখিত হয়ে 'ইবলিস ও বনিআদম' (কাফেলা গ্রন্থভুক্ত) নামে 'পৃথিবী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
ঢাকা বেতারে যুক্ত হওয়ায় ফররুখ লেখেন অনেক আধুনিক, দেশপ্রেমিক, ইসলামি ও উদ্দীপনামূলক গান, গজল, হামদ ও নাত। এর সূচনা হয়েছিল অবশ্য কলকাতাতেই। ফররুখ আহমদের প্রথম প্রকাশিত গান 'আহমদ আবদুল্লাহ' ছদ্মনামে 'কথা' শীর্ষে মাসিক 'মোহাম্মদী'-র আষাঢ় ১৩৫২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ফররুখের কোনো কোনো গান ও গানের স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে, তবে এখানো তাঁর কোনো গীতিগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। ফররুখের গানে যাঁরা সুর দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে আছেন আবদুল হালিম চৌধুরী, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ, সমর দাস, মোশাররফ হোসেন ফরিদ।
১৯৫২'র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ফররুখ আহমদকে যথার্থই উদ্দীপ্ত করেছিল। ভাষা বিষয়ে তাঁর সচেতনতা অনেক আগেই দেখা গিয়েছিল। 'উর্দু বনাম বাংলা' নামক ব্যঙ্গকবিতায় (মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৫২) ১৯৪৫ সালেই তিনি তীব্র বিদ্রূপ হেনে লিখেছিলেন, 'দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন/বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকেই করিয়াছি নিকা'। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশিত তাঁর 'পকিস্তান' : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্যে' ('সওগাত', আশ্বিন ১৩৫৪) তিনি দ্বিধাহীন জানিয়েছিলেন :
'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ চলছে। আর সবচাইতে আশার কথা এই যে, আলোচনা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছে। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তাই হয়, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।'
ফররুখ আহমদের কবিতা লেখার সূচনা বিভাগপূর্ব কালেই, কলকাতা পর্যায়ে। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, সমাজের সর্বত্র ও রাজনীতিতে যে চতুর ধূর্ত ব্যক্তিদের তিনি দেখেছিলেন, অজস্র ব্যঙ্গকবিতায় তিনি তাদের ছবি ধরে রেখেছেন। এ এক বিশাল আশ্চর্য চরিত্রচিত্রশালা। জীবদ্দশায় তাঁর কোনো ব্যঙ্গকবিতা-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু তাঁর অনেক ব্যঙ্গকবিতার পঙক্তি সাহিত্যমোদিদের মুখে আজো শোনা যায়, তসবিরনামা, নসিহতনামা, ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য-এর উল্লেখ অনেকেই করেছেন। ব্যঙ্গকবিতা লিখতে পত্রিকায় ফররুখ অনেকগুলো ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন-হায়াত দারাজ খান পাকিস্তানী, ইয়ারবাজ খান, মুনশী তেলেসমাত, কোরবান বয়াতী, গদাই পেটা হাজারী, আবদুল্লা বয়াতী, জাহেদ আলী ঘরামী, মানিক পীর, শাহ বেয়াড়া বাউল, ঘুঘুবাজ খান, সরফরাজ খান, মোহাম্মদ আবদুল জলিল, আহমদ আবদুল্লা, মাহবুব আবদুল্লা প্রভৃতি। ১৯৫৭ সালে তাঁর ব্যঙ্গকবিতা নিয়ে সরকারি উপর-মহলে একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, এমনকি তাঁকে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়েছে কিছুদিন, এজন্যে তিনি কয়েকদিন নিজ বাসা ছেড়ে কমলাপুরে মামার বাসায় ছিলেন।
বাঙালি-মুসলমানের ঐতিহ্যের সন্ধানেই চল্লিশের দশকে পুঁথিসাহিত্যের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন একদল শিক্ষিত লেখক ও কবি। ফররুখ আহমদ পুঁথিসাহিত্যের পুননির্মাণে মনোনিবেশ করেন। একদিক থেকে তিনি একটি ব্যাপক প্রভাবও সৃষ্টি করেন।
১৯৭১ সালের শেষে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ফররুখ আহমদ একান্ত গৃহবাসী হয়ে পড়েন। কিন্তু তখনো নিভৃতে সাহিত্যচর্চা করেছেন। কোরআন-শরিফের পূর্বকৃত তরজমা পরিমার্জনা করেছেন; হাম্‌দ্‌ ও নাত্‌ লিখেছেন ও প্রাক্তন লেখা পরিমার্জনা করেছেন; গাদ্দাফি প্রাসঙ্গিক একগুচ্ছ কবিতা লিখেছেন; 'নজরে আকিদাত' নামে একটি উর্দু দীর্ঘ কবিতার তরজমা করেছেন ইস্কাটন মসজিদের ইমামের সহযোগিতায়; হিটলারের সঙ্গে সংলাপ-এমন একটি বিষয় নিয়ে পেন্সিলে একটি গদ্যরচনা লিখেছেন; আর লিখেছেন মৃত্যুর দু'মাস আগে অসামান্য একটি সনেট।
১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখের বিবাহ হয়। তৈয়বা খাতুনের বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ নূরুল হুদা। বিবাহের উদ্যোক্তা ছিলেন ফররুখ ও তৈয়বা খাতুনের নানা মোহাম্মদ হুরমাতুল্লাহ। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ 'উপহার' নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি 'সওগাত' পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।
ফররুখ আহমদের ছেলে-মেয়ে ১১ জন। তাঁরা হলেন- সৈয়দা শামারুখ বানু, সৈয়দা লালারুখ বানু, সৈয়দ আবদুল্লাহল মাহমুদ, সৈয়দ আবদুল্লাহেল মাসুদ, সৈয়দ মনজুরে এলাহি, সৈয়দা ইয়াসমিন বানু, সৈয়দ মুহম্মদ আখতারুজ্জামান [আহমদ আখতার], সৈয়দ মুহম্মদ ওয়হিদুজ্জামান, সৈয়দ মুখলিসুর রহমান, সৈয়দ খলিলুর রহমান ও সৈয়দ মুহম্মদ আবদুহু।
তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। জ্ঞান থাকা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে কখনও নামায কাযা করেননি তিনি। শরীর ভীষণ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিরিশ রোজাই রেখেছেন। তিনি ধার্মিক ছিলেন। কিন্তু গোঁড়া ও সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে দুটো পায়জামা, দুটো পাঞ্জাবি, একটি গেঞ্জি, একটি শেরওয়ানি, এক জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল, একজোড়া জুতো, শীতের সময় একটি পুলোভার এবং একটি আলোয়ানই যথেষ্ট ছিল তাঁর। নবীজীর সুন্নতকে ভালবাসতেন বলে তিনি কাপড়ে তালি দিয়ে পরতেন।
ব্যক্তিজীবনে ধার্মিক কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন ইসলামী রেনেসাঁর প্রবক্তা। কাজী নজরুল ইসলামের পর মুসলিম কবি হিসাবে ফররুখ আহমদই শ্রেষ্ঠ প্রতিভার দাবীদার। তিনি ইসলামিক ভাবধারার অনুসারী হলেও তাঁর মতাদর্শ কখনই তাঁর কবিসত্তাকে সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করতে পারেনি।
ফররুখ আহমদ জীবিত অবস্থায় চারটি পুরস্কারে ভূষিত হন। সেগুলি হল- প্রেসিডেন্ট পুরস্কার, 'প্রাইড অব পারফরমেন্স' (১৯৬০); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০); 'হাতেম তায়ী' গ্রন্থের জন্য আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬); 'পাখীর বাসা' গ্রন্থের জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬)।
১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সরকার ফররুখ আহমদকে 'সিতারা-ই-ইমতিয়াজ' খেতাবে ভূষিত করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মৃত্যুর পর ফররুখ আহমদকে তিনটি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৮৪)।
১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, সন্ধেবেলা ঢাকায় ইস্কাটন গার্ডেনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সংক্ষিপ্ত জীবনী:
জন্ম: যশোর জেলার মাগুরা থানার মাঝআইল গ্রামে ১৯১৮ সালের ১০ জুন ফররুখ আহমদ জন্ম গ্রহণ করেন।
মা-বাবা: বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর সৈয়দ হাতেম আলী। তাঁর মার নাম রওশন আখতার। মার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি । তাঁরা তিন ভাই, দুই বোন।
পড়াশুনা: মাঝআইল গ্রামের পাঠশালায় ফররুখ কিছুদিন পড়েছিলেন। ফারসি-জানা এক মহিলা বাড়িতে এসে তাঁকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। তারপর কলকাতায় গিয়ে মডেল এম.ই.স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এরপর কিছুদিন পড়েন বালিগঞ্জ হাই স্কুলে। বালিগঞ্জ হাই স্কুলে কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর শিক্ষক ছিলেন। এর পর ফররুখ ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। এই স্কুলে তাঁর শিক্ষক ছিলেন সাহিত্যিক আবুল ফজল ও কবি আবুল হাশেম। এই স্কুলের ম্যাগাজিনে ফররুখ আহমদের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এই স্কুল থেকেই ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। কলকাতায় এসে রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে রিপন কলেজ থেকে তৃতীয় বিভাগে আই.এ. পাশ করার পর ঐ বছরই কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ.-তে ভর্তি হন। এরপর ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। তাঁর অধ্যাপকমণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। স্কুল-কলেজে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিকার সত্যজিৎ রায়, অভিনেতা ফতেহ লোহানী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তবে যে-কোনো কারণেই হোক, শেষ পর্যন্ত বি.এ. পরীক্ষা দেননি তিনি।
কর্মজীবন: কলকাতায় থাকাকালীন ফররুখ আহমদ অনেকগুলি চাকরি করেছেন। কিন্তু সবগুলিই ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে, ১৯৪৫ সালে মাসিক 'মোহাম্মদী'-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি।
ঢাকা বেতারেই ফররুখ আহমদ দীর্ঘদিন চাকরি করেন। ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট বা নিজস্ব শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকেন এবং আমৃত্যু ঢাকা বেতারে ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বিয়ে ও ছেলে-মেয়ে: ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখের বিবাহ হয়। তৈয়বা খাতুনের বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ নূরুল হুদা। বিবাহের উদ্যোক্তা ছিলেন ফররুখ ও তৈয়বা খাতুনের নানা মোহাম্মদ হুরমাতুল্লাহ। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ 'উপহার' নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি 'সওগাত' পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়। ফররুখ আহমদের ছেলে-মেয়ে ১১ জন।
মৃত্যু: ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, সন্ধেবেলা ঢাকায় ইস্কাটন গার্ডেনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তথ্যসূত্র: ফররুখ আহমদ: জীবন ও সাহিত্য, লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক: সাঈদ বারী, প্রকাশনী: সূচীপত্র, প্রথম প্রকাশ: ২০০৯

লেখক : মৌরী তানিয়া
প্রকাশিত : গুণীজন 

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ