প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label আল মাহমুদ. Show all posts
Showing posts with label আল মাহমুদ. Show all posts

Tuesday, July 31, 2012

কালের ডানায় সোনালি রোদ্দুর | মোহাম্মদ নূরুল হক

আধুনিক কবি কালের ঘটনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নন; কিঞ্চিত্ প্রভাবিত। সমকালের বিভিন্ন প্রপঞ্চ আধুনিক মন ও মননকে বিমোহিত করে সত্য; কিন্তু তাতেই শৃঙ্খলিত করে না। বিশেষত কবি ঘটনার ফল নন; ঘটনার দ্রষ্টামাত্র। শব্দের অর্থ কবির হাতে পড়ে বিভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। মানবমন বস্তুনিরপেক্ষ নয়। ফলে নিষ্প্রাণ বস্তুরাশিও সময়ে প্রাণবন্ত ও সজীব হয়ে ওঠে। সচেতন প্রয়াসেই কবি তার প্রতিবেশ নির্মাণ করতে গিয়ে ব্যক্তিমানুষের ক্ষোভ, প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা, ব্যক্তির মনস্তত্ত্বের বহুরৈখিক রূপ অঙ্কন করেন। আধুনিক কবি সমাজ নয়; ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা, মনোবিকার ও তাত্ক্ষণিক অনুভূতির বহুমাত্রিক চিত্র আঁকার চেষ্টা করেন গভীর মনোনিবেশে। হাজার বছরের বাংলা কবিতার ইতিহাসে আধুনিক বাংলা কবিতা উত্কর্ষে ও প্রাচুর্যে অনন্য।
নিসর্গ চেতনা ও মানবজাতির হার্দিক টানাপড়েন, যৌনচেতনা, ক্ষুধা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ আল মাহমুদের কবিতার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। প্রকৃতি ও নারী আল মাহমুদের চেতনায় একই প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে। সেখান থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন না। অথবা সরিয়ে নেয়ার জন্য ব্যর্থ চেষ্টাও করেন না। পৃথিবীব্যাপী সমাজতন্ত্রের পুনর্জীবনের কোনো সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও সাম্যবাদের বিকিরণ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষের প্রাত্যহিক কর্মযজ্ঞ, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজাতির জ্ঞানকাণ্ডে সিঞ্চনের জন্য শীতল জলের যে আধার তা কতটা নির্বিঘ্ন এবং নিরাপদ, তার যৌক্তিক স্বপ্নকল্প নির্মাণ করার দায় একা কবির? তা হলে সে দায় এবং স্বাপ্নিক বিরোধে তর্কলিপ্ত হতে তার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিঃশঙ্ক। জীবনানন্দ দাশে দেখি ইতিহাস চেতনা, ভৌগোলিক ধারণার সঙ্গে মানুষের মনোবিকার একই সমতলে অঙ্কন করতে। জীবনানন্দ দাশ চিত্রকল্প নির্মাণে নৈসর্গিক আবহকে প্রাধান্য দিয়েছেন; ফলে তার কবিতা চিত্রকল্পপ্রধান এবং গ্রামীণ অনুষঙ্গে বিভাসিত হতে দেখা যায়। তবে তার কণ্ঠে জটিল সারল্য ছিল। এক ধরনের কমনীয়তাও লক্ষ করা যায় দাশকাব্যে।
অন্যদিকে একেবারেই গ্রামীণ জীবনে উচ্চারিত শব্দ সমবায়ে গ্রামীণ মানুষের জীবনধারার চিত্র অঙ্কন করেছেন জসীমউদ্দীন। জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দ দাশ দু’জনই আধুনিক চিত্রকলার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। জসীমউদ্দীনকে অনুপ্রাণিত করেছে আবহমান বাংলার জীবনযাত্রা নিয়ে অঙ্কিত চিত্রকর্ম আর জীবনানন্দ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন আধুনিক চিত্রকলার ইঙ্গিতময়তার দ্বারা। আর তাদের দু’জনের মিশ্র প্রভাব লক্ষ করি আল মাহমুদে। মাত্র উপমা নির্মাণ কিংবা চিত্রকল্প নির্মাণের নৈপুণ্যই কবিতা নয়, তা হলে কলাকৈবল্যবাদীরাই কবি অভিধায় অভিষিক্ত হতেন। বাকিরা থাকতেন চির উপেক্ষিত। তবু কবিমাত্রই ছন্দে সিদ্ধহস্ত। ছন্দমাত্রাজ্ঞানহীন ব্যক্তির পক্ষে আর যাই হোক, কবিতা লেখা সম্ভব নয়। প্রকৃত কবিতার শরীরের কোষে কোষে ছুটে চলা রক্তকণিকার মতো ছন্দের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি বিদ্যমান। সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছ কবি শুরু করেছেন শঙ্কাহীন পৌরুষ এবং শর্তহীন আত্মনিবেদনের ভাবাবেগ দ্বারা।
আত্মনিবেদনের এমন বিলোড়িত ও শৈল্পিক ভঙ্গি এর আগে বাংলা কবিতার পাঠক প্রত্যক্ষ করেছেন মর্মে কোনো সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। নতজানু পুরুষ তার চিরকাঙ্ক্ষিত রমণীর সামনে, এরকম দৃশ্য আর কেউ আঁকেননি। এখানে রমণীর কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্যের কোনোরূপ উল্লেখ করা হয়নি। তবু কবি কী কারণে কাঙ্ক্ষিত রমণীর কোনো বিশেষ গুণটির জন্য নিজেকে এভাবে সমর্পণ করলেন, তার সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। তা হলে রমণীর কোনো রূপ জ্ঞান কিংবা সৌন্দর্য ব্যতিরেকেও অন্য কোনো অনুল্লেখ্য সাধারণ কিংবা অব্যাখ্যেয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিও কবিপুরুষ বিমোহিত হন কখনও-কখনও?
সোনার দিনার নেই দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি।
[১নং সনেট]
কবিতা জ্ঞানের বস্তু নয়; অনুভবের এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গমাত্র। কবিতা ইতিহাস নয়; ইতিহাসের নির্যাস কবিতায় প্রচ্ছন্ন। আল মাহমুদ সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছে শব্দকে এসব অভিজ্ঞতার স্মারক হিসেবে গ্রহণ করে শব্দ ব্যবহারের একটি স্বতঃসিদ্ধ প্রকরণের প্রচলন করেছেন। এটি তার নিজস্ব ঢং, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার শব্দ নির্বাচন, নতুন শব্দ গঠন এবং উপমা প্রয়োগে যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য পরিশ্রমের স্বাক্ষর মেলে। ভাবালুতা-সর্বস্ব চিত্রকল্প কিংবা তরল বাক্য বিন্যাসের বিলসিত আকাঙ্ক্ষার প্রমাণ সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছে মেলে না। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের আটপৌরে শব্দরাজির সঙ্গে আধুনিক মননজাত শব্দ সমবায়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্বয়সাধন তার কবিতাকে বিশিষ্ট করেছে, জীবনানন্দ দাশের ইউরোপীয় আধুনিক চেতনা এবং জসীমউদ্দীনের পল্লীর সাদামাঠা ভাবালুতাময় শব্দ থেকে। সম্ভবত এ কারণে আধুনিক বাংলা কবিতার পাঠক আল মাহমুদকে গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠকালে জসীমউদ্দীন পল্লীর সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিয়ে এবং জীবনানন্দ দাশ তার অন্তহীন বিগলিত ইউরোপীয় আধুনিকতার তাত্পর্যময় অনন্ত বিষণ্নতাসহ উপস্থিত হন।
আবহমান বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, প্রথাগত ধারণাকে গভীরভাবে আত্মস্থ করে আধুনিক জীবনের, যুগযন্ত্রণার অভিজ্ঞতাকে নির্মম বাস্তবতার আলোকে স্বীকার করেছেন। কামহীন প্রেমকে কবি সন্দেহের চোখে দেখেছেন এবং প্রেমহীন কামকে কবি ঘৃণার্হ করে তুলেছেন শব্দের পর শব্দ নির্বাচন, গঠন ও প্রয়োগের মাধ্যমে।
তার পর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী
ক্ষেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ
[১০নং সনেট]
মিথ এবং উপকথার প্রতি কবির অমোঘ আকর্ষণ লক্ষণীয়। পুরাণের বিভিন্ন চরিত্র এবং ঘটনা, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কালখণ্ড তার মন ও মননে গভীর রেখাপাত করেছে; নয়তো পুরুষ তার নারীকে প্রলুব্ধ করার জন্য বিভিন্ন চরিত্রের উদাহরণ টেনে আনবেন কেন! তার কাছে শাস্ত্রীয় ধর্মের চেয়ে মানবধর্ম বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মানুষের ধর্ম মানেই ফসলের সুষম বণ্টন হবে—এই প্রত্যয় নিয়ে কবি তার দয়িতাকে আলিঙ্গনে আহ্বান করেন। কোনো সংঘ কবির আরাধ্য নয়। কারণ কবিমাত্রই বাঁধনহারা, দৃঢ়চেতা এবং সত্ সাহসী। কবিরা কোনো সংঘের শরণ নেয়ার চেয়ে দরিদ্র বাউলের বাউণ্ডুলেপনাকে শ্রেয় বোধে লালন করেন।
পূর্বপুরুষরা কবে ছিল কোন সম্রাটের দাস
বিবেক বিক্রয় করে বানাতেন বাক্যের খোঁয়াড়
সেই অপবাদে আজও ফুঁসে উঠে বঙ্গের বাতাস
মুখ ঢাকে আলাউল রোসাঙ্গের অশ্বের সোয়ার
এর চেয়ে ভাল নয় হয়ে যাওয়া দরিদ্র বাউল?
[৬নং সনেট]
শব্দকে একটি শান্ত ও গম্ভীর প্রবহমান নদীর মতো প্রয়োগ করতে পারার মধ্যে শিল্পীর নান্দনিক ও তাত্পর্যময় ভূমিকা রয়েছে, যার মাধ্যমে কবি নিজের ব্যক্তিত্ব, মনন ও রুচিকে সংক্রমিত করেন তার পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যেও। সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছে শব্দের যুক্তিগ্রাহ্য ও নান্দনিক চিত্ররূপ আঁকতে গিয়ে পুরাণ ও মিথকে আশ্রয় করেছেন। এই প্রবণতা তাকে বিশিষ্ট এবং বিশ্লিষ্ট করেছে তার পূর্ববর্তী এবং সমসাময়িক অন্য কবিদের কাব্যভাষা থেকে। ফলে তার কণ্ঠস্বরটি স্বতন্ত্র মর্যাদা পেয়েছে—যথার্থ ও অনিবার্য কারণেই।
ছন্দ নির্বাচনে কবি আঠারো মাত্রার সমিল অক্ষরবৃত্তকে বেছে নিয়েছেন—বোধ হয় এই ছন্দের প্রবল গাম্ভীর্যময় চারিত্র্যের জন্যই। নিরূপিত ছন্দোপযোগী শব্দ নির্বাচনে আধুনিক কবির স্বাধীনতা সামান্যতম হলেও ক্ষুণ্ন হয় বলে মনে করি। কারণ যথেচ্ছ শব্দ নির্বাচন ও গঠনের সুযোগ নিরূপিত ছন্দে নেই বললেই চলে। এর কারণ বাক্যস্থিত শব্দ সমবায়ের বিন্যাস হতে হয়—অবশ্যম্ভাবী ও অনিবার্য পরম্পরায়। এর ব্যতিক্রমে ছন্দপতন ও বিষয়ের বোধগম্যতায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফলত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
প্রস্তর যুগের এই সর্বশেষ উলাসের মাঝে
কোথায় পালাবে বলো কোন ঝোপে লুকাবে বিহ্বলা?
স্বাধীন মৃগের বর্ণ তোমারও যে শরীরে বিরাজে
আমাদের কলা কেন্দ্রে আমাদের সর্ব কারুকাজে
অস্তিবাদী জিরাফেরা বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত গলা।
[১১নং সনেট]
এই অস্তিবাদী জিরাফেরা তাদের ব্যক্তিগত গলা অহরহ বাড়ায়। আজকের অশান্ত বিশ্বের প্রতিটি অশুভ কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে এই অস্তিবাদী জিরাফেরা। এই যে বিষয়ের সঙ্গে ছন্দোপযোগী শব্দ ও পর্ববিন্যাস এবং উপমার যে অভিনবত্ব দেখি, তা অনস্বীকার্যভাবে উজ্জ্বল। বাংলার কৃষকসমাজের উত্থান-পতন যেমন জসীমউদ্দীন এঁকেছেন তার স্বভাব সারল্যে; আবহমান বাংলার মানুষের মনস্তত্ত্বের জটিল রূপ যেমন এঁকেছেন জীবনানন্দ দাশ তার দীর্ঘ বিষণ্নতার ঘোর রহস্যময় সম্মোহনে; তেমনি আল মাহমুদ এঁকেছেন তার মননশীলতার সঙ্গে হৃদয়বৃত্তির অন্বয়সাধনের মাধ্যমে। সোনালি কাবিন বিষয় নির্বাচন, শব্দ প্রয়োগ, উপমা-চিত্রকল্প নির্মাণ, ছন্দের প্রয়োগ, পদবিন্যাসের স্বতন্ত্র কৌশলের কারণে বিশিষ্ট। সুলুক সন্ধানী পাঠকমাত্রই আবিষ্কার করবেন এই সনেটগুচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষের এক ঘোর রহস্যময় সারল্যের ভাষাচিত্র। স্বাপ্নিক বিরোধ সোনালি কাবিন সনেটগুচ্ছে নেই সত্য; কিন্তু অন্তহীন রহস্যময় দিগন্তরেখার মোহনীয় উদ্ভাস লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। দুর্বোধ্যতা ভর করেনি, সারল্যও নেই; আছে বিমূর্ত আবহের চেতনা।
আধুনিক বাংলা কবিতা অনুভবের জন্য শিক্ষিত পাঠকমন প্রয়োজন। কবিতা শুধু বুদ্ধিপ্রধান বাক্যবন্ধের সমষ্টি নয়; ভাবালুতাসর্বস্ব তরল শব্দ সমবায়ে রচিত বাক্যাবলিও কবিতা নয়। কবিতা যদি মানবজীবনের যাপিত অংশের শৈল্পিক ধারাভাষ্য কিংবা নান্দনিক প্রতিচ্ছবি না হয়, তাহলে পাঠক সেটাকে গ্রহণ করে না। আবার গতানুগতিক বিষয়ের প্রথাগত বুননও কবিকণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যের পথে প্রতিবন্ধক বলে মনে করি। কাব্য-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কবির দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অর্জিত জ্ঞান, মনীষা, আত্মোপলব্ধিজাত অন্তর্নিহিত তাত্পর্যময় চিত্রকল্প, উপমা, উেপ্রক্ষা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কালই শেষ পর্যন্ত কবিতার শ্রেষ্ঠ পাঠক ও বিচারক। বাংলা কবিতার ইতিহাসে সোনালি কাবিন একাধারে বুর্জোয়া, ধনতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ। সোনালি কাবিনে ব্যবহৃত শব্দরাজি বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিদিন উচ্চারিত শব্দরাজি থেকে আহরিত। সোনালি কাবিন নিখিল নাস্তির দলিল নয়; নয় প্রবল বিশ্বাসের খতিয়ানও।

সূত্র : আমার দেশ

বাংলাভাষা বাংলাদেশেরই আত্মা, কলকাতায় সব হিন্দি আর ইংরেজি : আল মাহমুদ (সাক্ষাৎকার)

# ৭৭-এ পা দিচ্ছেন, কেমন বাংলাদেশ আপনি দেখতে চান?
— স্বাধীন, সার্বভৌম, শান্তিময় বাংলাদেশ দেখতে চাই, সুখী বাংলাদেশ।
# আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবের বাংলাদেশের মধ্যে ফারাকটা কতখানি?
— বেশ ফারাক আছে। কারণ কবি যে কল্পনা করে, আমরা একটু বেশি আশা করি, সে রকম তো আর হয় না, আমরা যা আশা করি। তবু পায়ের নিচের মাটিটা তো বাংলাদেশ। তাই না? এক ভালোবাসার টান।
# একটা রক্তের প্লাবনের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আপনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলেন আমরা জানি। সে সময়কার অনুভূতি সম্পর্কে কিছু বলেন।
— স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমরা প্রকাশ্যে ছিলাম না, কিন্তু আশপাশে ছিলাম, তাদের সঙ্গেই।
# এবং তারও আগে থেকেই বাংলাদেশের সত্তা যখন গঠিত হচ্ছিল, আপনার বিভিন্ন লেখার মধ্যে এসেছে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এসেছে, ভাষা আন্দোলন এসেছে। বাংলাদেশের মাটিকে, এদেশের জলকে, হাওয়াকে, লোকজ জীবনকে তুলে এনেছেন—এসবের পেছনে আপনার কী দর্শনটা কাজ করেছিল?
— বাংলার মাটি! একটা কথা আছে না—‘বাংলার মাটি বাংলার জল/পুণ্য হউক পুণ্য হউক...’ এই।
# কবিতা ও নারী—কে বেশি রহস্যময়ী?
— সন্দেহ নেই, এ দু’জনের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্ব নেই, কারণ কবিরা যেখানে শুতে যায় সেই জায়গাটার একদিকে নারী, আরেক দিকে বই থাকে। এই দুটোকে সরিয়ে কবিকে বিশ্রাম নিতে হয়। আশা করি কথাটা বুঝেছ।
# আপনি তো একজন ঘোরতর আস্তিক মানুষ। এই বিশ্বাস, এই রহস্যময়তা আপনার বিপুল রচনাসম্ভারে নানা মাত্রিকতায়, নানা অবয়বে প্রতিফলিত। এই মরমিয়াবাদ সম্পর্কে পাঠকদের কিছু বলুন।
— আমি বিশ্বাসী। বিশ্বাসী মানুষ কী করে? বিশ্বাসী মানুষ সবসময় একটা কাজ করে। সেটা কী করে? সে সেজদা করে অদৃশ্যের দিকে এবং সে প্রার্থনা করে, অ্যান্ড হি প্রেজ, প্রার্থনা করতে থাকে। এটা আমার একটা ধারণা। ধারণা কী? এটা সত্য।
# আপনার লেখালেখির শুরুটা কেমন করে হয়েছে?
— আমি মফস্বল শহরে থাকতাম। খুব পড়তাম আমি। পড়তে পড়তে একদিন মনে হলো—আচ্ছা, আমিও তো এরকম লিখতে পারি। লেখা শুরু করলাম। আশ্চর্য যে, আমার লেখা তখন এদেশের শ্রেষ্ঠ কাগজগুলো খুবই অনায়াসে ছেপে দিল।
# সেটা তো বিস্ময়কর!
— আমার কাছেও বিস্ময়কর!
# এখনও?
— এখনও লাগে।
# আপনার জীবনে এমন কোনো স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা আছে কী, যেটা এখনও পূর্ণ হয়নি?
— এটা তো তুমি একটা খুব জটিল প্রশ্ন করলে। আমি তো পূর্ণতা এবং অপূর্ণতার মধ্যে বাস করি। কিছু পাই, কিছু পাই না। এই হাতড়ে বেড়াই। এটা হলো জীবন।
# ‘লোক লোকান্তর’ থেকে ‘পাখির কথায় পাখা মেললাম’ এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আপনার যে বাঁকবদলগুলো হয়েছে, তার পেছনে কোন ফ্যাক্টরগুলো কাজ করেছে বলে আপনি মনে করেন?
— আমার জীবনই একটা আশ্চর্য জীবন। কত ঘাটে ভিড়তে হয়েছে। কত কিছু দেখলাম, জানলাম। সবকিছুর মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে, দেশে যা কিছু ঘটেছে। আমি তো এদেশ থেকে পালিয়ে যাইনি। আমি দেশে থেকে দেশের সব কিছুতে অংশগ্রহণ করেছি, দেখেছি, মুভ করেছি এবং আরেকটা কী ব্যাপার—কেঁদেছি। আই ওয়েপ্ট।
# নানা ধরনের লেখা আপনি লেখেন। কথাশিল্প, কলাম, কবিতা, আত্মজৈবনিক—কোন শাখায় লিখতে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কেন?
— আসলে ওই অতীত নিয়ে লিখতে ভালোই লাগে। কিন্তু অতীত বেশিদিন দেখা যায় না। আমি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে লিখতে চেষ্টা করি। কিন্তু বর্তমানটা যে এতই বাস্তব এবং এতই রূঢ় যে, এর মধ্যে বসবাস করতে হলে সাহস, শক্তি এবং কাব্যগুণ লাগে। সেটা মনে হয় আমারও কম-বিস্তর আছে।
# কেউ কেউ বলে, অদূর ভবিষ্যতে ‘বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হবে ঢাকা’।
— এটা কেউ কেউ নয়, আমিই বলেছি প্রথম।
# এ কথার বাস্তব ভিত্তি কতটা মজবুত হয়েছে?
— বাংলা ভাষাই বাংলাদেশের আত্মা। এই ভাষার সঙ্গে অন্য কিছুকে বাংলাদেশ মিশ্রিত করে না। এক দিগ্বিজয়ী ভাষা। শব্দের তরঙ্গ বাংলাদেশেই বইছে। বাংলাদেশ ছাড়া এটা আর কোথাও সম্ভবপর হয়নি। কলকাতা গেলে তুমি দেখবে, সব হিন্দি আর ইংরেজি।
# সেখানে বাংলা ভাষা মরে যাচ্ছে, ওরা টিকিয়ে রাখতে পারছে না।
— না, পারছে না।
# গদ্য কিংবা কবিতা লেখার পরবর্তী যে অনুভব কিংবা সাফল্যের শিহরণ—দুয়ের মধ্যে মৌল কোনো পার্থক্য আছে কি?
— আমি সব সময় ভাবি যে, আমার খাপে তো দুইটা তরবারি আছে—একটা গদ্যের, একটা পদ্যের। যখন যেটা আমার প্রয়োজন, সেটা ব্যবহার করেছি।
# তরুণ কবিদের জন্য আপনার কোনো উপদেশ আছে কি?
— কথা হলো যে, উপদেশ দেয়া আমার জন্য ঠিক না। তরুণরা ইচ্ছানুযায়ী চলবে—এটাই আমরা চাই। তবে একটা কথা বলব। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। জ্ঞান না হলে কিছুই হয় না। বলা হয় না, জ্ঞানবৃক্ষের ফল না খেলে সে তো কিছুই জানে না? জ্ঞানবৃক্ষের ফল একবার যে খেয়েছে, তাকে পৃথিবীতে আসতে হয়েছে স্বর্গ ছেড়ে। স্বর্গ থেকে তাকে বের করে দেয়া হবে, সে পৃথিবীতেই চলে আসবে। পৃথিবীতে এসে নিজের পরিশ্রমের অন্ন নিজে খাবে।
# দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পাতা প্রকৃত সাহিত্যচর্চায় কতটা অবদান রাখতে পারছে?
— আমাদের দেশে দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পৃষ্ঠা আমাদের সাহিত্যের জন্য সাহায্যকারী হয়েছে। অন্য দেশে এটা হয়নি, আমাদের দেশে হয়েছে।
# মানসম্পন্ন সাহিত্য কাগজের অভাবের কারণে হয়েছে?
— তাই, তাই তো দেখতে হবে। নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা নেই। লিটলম্যাগ আছে।
# বাংলা কবিতার ভবিষ্যত্ কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
— এটা বলা উচিত না। কারণ, আধুনিক বাংলা কবিতা হলো আধুনিক জাতীয় জীবনের একটা দৃষ্টান্ত। আধুনিক বাংলা কবিতা এতই পরিপকস্ফ এবং এতই ডালপালা মেলে দিয়েছে, যদিও গদ্যকে আমরা আধুনিক বলি, এটা অন্য কোনো সাহিত্যে ঘটেনি যে, কবিতাই বিজয়ী হয়েছে।
# সাধারণভাবে বলা হয়, বাংলাদেশে কবিতার পাঠক ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর কারণটা কী?
— আশ্চর্য কথা—বাংলাদেশে কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে। দল বেঁধে কেউ কবিতা
(৭-এর পৃষ্ঠার পর)
পড়ত নাকি? কোনো সময় পড়েনি। দলবদ্ধভাবে কাব্যচর্চা করেছে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কেউ কেউ করেছে—এরাই তো বাঁচিয়ে রাখে সব।
# আমাদের সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা বিশ্বমানের বিচারে কোন অবস্থায় আছে?
— আধুনিকতার দিক দিয়ে প্রায় জগতের সাহিত্যের সমকক্ষ। আমাদের কবিতা যদি ব্যাপক অনুবাদ হয় তাহলে বোঝা যাবে, কী আশ্চর্য কাজ হয়েছে বাংলা ভাষায়!
# স্বাধীনতার চল্লিশ বছর হয়ে গেল, অনুবাদের ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য কিন্তু সেভাবে আসেনি।
— না, অনুবাদ করার মতো লোক আসেনি। এটা ঠিকই কথা।
# বাংলা একাডেমীর একটা ভূমিকা, দায়িত্ব কি এক্ষেত্রে ছিল না?
— কার কার ভূমিকা বা দায়িত্ব ছিল এটা বলে কোনো লাভ নেই। এটা ইন্ডিভিজুয়াল কাজ। একজন লোক যদি থাকে, তাহলে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দেয়।
# কেউ যদি বলে, আপনার ইদানীং কালের লেখায় আগেকার সেই লাবণ্য ও মাধুর্য কিছুটা গরহাজির—এ অভিযোগের বিপরীতে আপনার বক্তব্য কী হবে?
— আমার পক্ষ থেকে এর কোনো জবাব নেই। তবে কী কারণে বলে, তা কিন্তু উল্লেখ করা হয় না। তারা ভ্রান্ত কিনা, নাকি আমি ভুল করছি সেটা বোঝার মতো ব্যাখ্যা হয়নি এখনও।
# বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে সমকালীন কাব্যধারা কিংবা প্রবণতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলো কী কী?
— আমি পশ্চিমবঙ্গের কবিতা সম্পর্কে কম জানি। আমার পড়া হয়ে উঠছে না। এ ব্যাপারে জ্ঞান অপেক্ষাকৃত কম আমার। কে লিখছে, কী লিখছে এটা আমি জানি না, তখন একটা আন্দাজি মন্তব্য আমি করতে পারি না। তবে একথা বলতে পারি যে, বাংলাদেশের কাব্যের শক্তি এবং ঐশ্বর্য অনেক বেশি। বিশেষ করে এর যে লোকজ গ্রাউন্ড, সেটা অনেক উর্বর বলে আমি মনে করি।
# আপনার মায়াবি কলমে শিশু-কিশোরদের জন্য বেশকিছু মূল্যবান ফসল ফলেছে। কারও কারও অভিযোগ, আপনি এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত মনোযোগ ও সময় দেননি। আত্মপক্ষ সমর্থনে আপনার বক্তব্য কী হবে?
— হয়তোবা। যারা আমার এ খুঁতটা ধরতে পেরেছে তারা আমার অনুরাগী। তাদের উচিত ছিল একটা পরামর্শ দেয়া, কিন্তু তারা তো সেটা করেননি। করা উচিত ছিল। এটা তারা যদি বলে দিতেন, তাহলে আমি সেভাবে চলতাম।
# বলা হয়, আমাদের কবিতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ কখনও নেয়া হয়নি। এই ক্ষতির জন্য কে বা কারা দায়ী?
— কেউ দায়ী নয়। ভালো ট্রান্সলেটরের অভাব— যে একই সঙ্গে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী হবে। তাদের আবির্ভাব হয়নি। এটা একটা দুর্ভাগ্য বলা যেতে পারে।
# একজন খাঁটি কবি হওয়ার ক্ষেত্রে আস্তিকতা বা নাস্তিকতা কতটা জরুরি?
— আমি আস্তিকতাকে খুব মূল্য দিই। কারণ, বিশ্বাস হলো একটা হাতল। এটা ধরতে হয়। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর। বিতণ্ডা করে কোনো লাভ নেই।
# মহাকালের বিচারে আপনার কবিতা কতটা টিকে থাকবে বলে আপনার ধারণা?
— আমি তো ভবিষ্যত্ বক্তা নই। যে কারণে বলতে পারব না। মহাকালের বিচারে টিকে থাকে না অনেক কিছুই। তুমি চর্যাপদ দেখ, চর্যাচর্যাবিনিশ্চয়। এটা কীভাবে আছে?
‘শাশুড়ী নিদ গাএ বউড়ি জাগত্র
কানেট চোরে নিল কাগই মাগত্র’
# প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলী আকবর খান একবার বলেছিলেন যে, নিবিড় সঙ্গীত সাধনার এক পর্যায়ে মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য অনুভব করা যায়। কবিতা রচনার কোনো পর্যায়ে এমন ধরনের কোনো ঐশী বোধ কি কখনও আপনাকে আচ্ছন্ন করেছে?
— তিনি তো বলেছেন সঙ্গীত সম্পর্কে; কিন্তু আমি যে জিনিস চর্চা করি এটার নাম হলো আধুনিক কবিতা। কবিতার মধ্যেও সঙ্গীত আছে। আমি লিরিকটা পছন্দ করি। আমি একটু লিরিক্যাল লোক এবং লিরিক হলো সবকিছু পাওয়ার একটা পথ। এটাই অনুসন্ধান করতে হবে।
# বিভিন্ন সাহিত্যানুষ্ঠানে আপনি প্রায়ই বলতেন, চিত্রকল্পই কবিতা। ত্রিশের দশকের খ্যাতিমান এক কবি বলে গেছেন, উপমাই কবিতা। এ ব্যাপারে বিশদ বলবেন কি?
— আমি কেন যে চিত্রকল্পকেই কবিতা বলেছিলাম, সেটা একটু ভেবে দেখতে হবে। আমার কবিতায় তো আমি এটা ত্যাগ করিনি। চিত্রকল্প তো প্রায় কবিতারই সমার্থক। কবিতায় একটা চিত্রকল্প লাগে।
# আমরা জানি, কবিতা পড়তে গিয়ে ভালো লাগার ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপর আসে উপমা, চিত্রকল্প, উেপ্রক্ষা, প্রতীকের দক্ষ শৈল্পিক প্রয়োগের প্রসঙ্গ। পাশাপাশি ছন্দের ব্যাপারটিও জরুরি, তাই নয় কি?
— সবচেয়ে বড় কথা হলো ছন্দ। একজন কবিকে জানতে হয়—মিলটা কীভাবে সংঘটিত হয়। অনুপ্রাস জানতে হবে। এটা জানলেই তার মনে দারুণ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এটা না জানলে কিন্তু অনেক অসুবিধা।
# দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় আপনার সৃজিত কবিতাগুচ্ছে বিধৃত হয়েছে সমকাল, বাংলাদেশের লোকজীবন, দেশ, সমাজ, জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য, অহং, ঐতিহ্য ইত্যাদি। সফল সাহিত্য সৃষ্টির প্রশ্নে এসবের প্রতিফলন অত্যন্ত জরুরি। এগুলো কেন জরুরি বলবেন কি?
— তুমি নিজেই তো বললে জরুরি। জরুরি এজন্য যে, একটাকে বাদ দিলে খুঁত থেকে যায়। এই খুঁত ভরাট করার আর কে আছে, কিছু তো নেই। কবিতার জায়গাটা কবিতা দিয়েই ভরাট করা দরকার, অন্য কিছু দিয়ে হয় না।
# উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
— এটা হলো—দার্শনিকরা যেটা ঘাড় থেকে ফেলে দিয়েছে, সেটা ঘাড়ে তুলে নেয়া।
# উত্তর আধুনিকতা বলতে পশ্চিমে আধুনিকতা-পরবর্তী কালটাকে বোঝানো হয়। কিন্তু ভারতে বা বাংলাদেশে এটাকে প্রাচীন ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়া বোঝাচ্ছে—এ ব্যাপারটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
— আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশটা প্রাচীন ঐতিহ্য ছাড়া ঘটেনি। কবিতা কিন্তু মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এ কারণেই, যেখানে পায়ের তলায় মাটি আছে সেখানে সবসময় প্রাচীন ঐতিহ্য আসা-যাওয়া করছে। কিন্তু পুরনো ঐতিহ্য নিয়ে তো থাকা যায় না। মানুষকে সামনের দিকে এগোতে হয়। পুরনো ঐতিহ্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু কবিতা হয়ে উঠতে হলে আধুনিকতা দরকার।
# এবার একটু ম্যাজিক রিয়েলিজম সম্পর্কে আলাপ করতে চাই। রিয়েলিজম ও ড্রিমের মধ্যে সেতু তৈরি করাকেই আমরা ম্যাজিক রিয়েলিজম বলে বুঝি। এ নিয়ে লাতিন ও ক্যারিবিয়ান কথাশিল্পীরাই বেশি কাজ করে থাকেন। পরে এই জাদুবাস্তবতার ধারণা বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। কবিতায়ও এর প্রতিফলন ঘটে। আপনার কবিতায়ও আমরা এর লক্ষণ দেখছি। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতার বইতে এই বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই আছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
— এটার মধ্যে যা বক্তব্য সেটা ঠিক খোলাসা করা যায় না। তবে এটুকু বলতে পারি—সবগুলো জটিলতার জট খুলে যায় যখন মিল বোঝে কবি—ছন্দের দোলায় যখন পৌঁছে। ছন্দ, গন্ধ এবং স্পর্শের যে আনন্দ; এটা একজন কবিকে সামনে ঠেলে দেয়। ভবিষ্যতের দিকে দারুণভাবে ঠেলে দেয়। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায়।
# আপনার কাব্য-সহযাত্রী কবি শামসুর রাহমান এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন—সেটাই কবিতা যা প্রথম পাঠে ভালো লাগে। এ বক্তব্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
— তিনি কী বলেছিলেন সেটা আমি বলতে পারব না। তবে প্রথম পাঠে অনেক কিছুই ভালো লাগে। এটা কি যুক্তিসঙ্গত কথা হলো? প্রথম পাঠে অনেক অকবিতাও ভালো লাগে, তাই না? প্রথম পাঠে আমার ভালো লাগে গদ্য। কারণ গদ্য আধুনিক। এটা তো বলা যায় না—আমার প্রথম পাঠে যেটা ভালো লাগে সেটাই কবিতা। এর সঙ্গে ঠিক আমি একমত হতে পারি না।
# আপনি কি বলতে চাচ্ছেন—একটা কবিতা প্রথম পাঠে ভালো লাগল, কিন্তু আপনি যখন কয়েকবার পাঠ করলেন তখন মনে হলো—না, ভালো লাগার আসলে কারণ নেই।
— হ্যাঁ, কোনো কারণ নেই দেখা যাচ্ছে।
# আনন্দ ও বেদনা—কবিতার কাছে আপনি কোনটা বেশি পেয়েছেন?
— আমার মনে হয়, আনন্দ-বেদনা—এই দুইটাই সমভাবে আমাকে অভিভূত করেছে।
# একজন লেখকের বিকাশের জন্য সংঘ বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
— কোনো কোনো ক্ষেত্রে আছে। কিন্তু দল বেঁধে কাব্য হয় না।
# এই যে জাতীয় কবিতা পরিষদ হয়েছে, কেউ বলেন এটা এখন খুব স্তিমিত হয়ে আছে—এগুলো কি চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সাহিত্যের কোনো উপকার করেছে?
— কবিতার যে কোনো সংগঠন বা কবিতার জন্য যারা কাজ করে, তারা কিছু না কিছু কাজ তো করেই—এটুকু শুধু বলতে পারি।
# মৃত্যুচিন্তা কি আপনাকে কখনও আচ্ছন্ন করে? এ অনুভূতিটা কেমন?
— যেহেতু আমি জন্মেছি, মৃত্যু হবেই। এটা যখন আমি নিশ্চিতভাবে জানি, তখন মৃত্যুর ভয়টা হয়তো ঈষত্ কমে আছে—কিন্তু মৃত্যুর যে ভয়, বিস্ময়, মৃত্যুর যে একটা স্বাদ আছে এটা আমি কখনও গ্রহণ করিনি। এটা একবারই মানুষ গ্রহণ করে, যখন সে মরে যায়। ফিরে এসে আর কিছু বলতেও পারে না।
# বিশ্ব সমাজে সমাজতন্ত্র যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, এটা আপনাকে ব্যথিত করে কি?
— সমাজতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে, এটা কিন্তু বলা যাবে না। আসলে সমাজতন্ত্রের কথা আজকাল আর কেউ বলে না। কারণ, পুঁজিবাদ এত প্রবল ও পরাক্রান্ত হয়েছে যে, সমাজতন্ত্রীরা মুখ খুলতে পারছে না। পুঁজিবাদ যতই বৃহদাকার ধারণ করুক—পুঁজিরও একটা পরিসমাপ্তি আছে।
# আপনার রাজনৈতিক চিন্তায় আমরা ব্যাপক পরিবর্তন দেখি। বামধারা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় আপনি আস্থাশীল হয়েছেন সময়ের পরিক্রমায়। এই পরিবর্তনের অনিবার্যতা কী ছিল? আপনার সাহিত্যচিন্তা ও লেখালেখিতে এর কেমন প্রভাব পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?
— আমি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। বাম ঘরানা, যতই বলে না কেন, মানুষের বিশেষ করে কবির স্বাধীনতা হরণ করে।
# বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত লেখালেখিকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যপারে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।
— এ কথাটা আংশিক সত্য। কিন্তু আমি তো লিখেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছি—আয়-রোজগার যাই বলো, এই লেখা থেকেই।
# আপনি তো অন্যান্য চাকরিও করেছেন। সেগুলো যদি করতে না হতো...
— সেটা করেছি, কিন্তু লেখালেখি থেকেই আমাকে আয়-রোজগার বেশি করতে হয়েছে। তবে একটা কথা বলি—যেটা ঘটে না, সেটা ঘটবে না বলেই ঘটে না। এটা সত্য।
# কবিরা সত্যদ্রষ্টা হয়ে থাকেন বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। বাংলাদেশে বর্তমান কবিদের কবিতায় তার কেমন প্রতিফলন আছে?
— সব কবি সত্যদ্রষ্টা কিনা জানি না। তবে আমি বলি—কবিরা দ্রষ্টা। সে দেখে।
# আপনি এক সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা বৃত্তি কতটা উপকারী কিংবা অপকারী বলে আপনার মনে হয়েছে?
— এটা নিজের ওপর নির্ভর করে। আমি সাংবাদিকতা করেছি। কেন করেছি? আমার পেটের জন্য করেছি। বেঁচে থাকার জন্য করেছি। সেটাও প্রয়োজন ছিল।
# কবিতার কাছে আপনার ঋণ কতখানি?
— যা কিছু নিয়েছি, কাব্যের কাছ থেকেই নিয়েছি। তবে দিয়েছিও, শোধ করার চেষ্টাও আমি করেছি।
# কেউ কেউ বলে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে শক্তিমান লেখক আর আসছেন না। আপনি কি এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত?
— আমি ঠিক একমত নই। তবে সব সময়ই দেখা যায় যে, প্রকৃত লেখক যারা, তারা বেশ একটু বিরতি দিয়ে দিয়ে আসেন, প্রতিদিন তো আর আসেন না।
# আপনার প্রথম প্রেমের অনুভূতি, রোমাঞ্চ—নারী প্রেম অর্থে, এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
— আমারও এমন একটা মুহূর্ত এসেছিল। কৈশোর উত্তীর্ণ সময় যেটা, যেটাকে আমরা যৌবন বলি, তার প্রারম্ভে। এ সম্পর্কে আর কিছু বলার নেই, বলা উচিতও নয়।
# কবিদের মধ্যে ক্ষুদ্র দলাদলির ব্যাপারটি কি আপনাকে পীড়িত করে? একজন খাঁটি কবি দলভুক্ত না হলে ন্যূনতম স্বীকৃতিও পান না। এ ব্যাপারে কী বলবেন আপনি?
— এটা আমি ঠিক মানি না, কারণ কবিতা একটি ইন্ডিভিজুয়াল কাজ। কবিতা নীরবে লিখতে হয় এবং কবি একা, কবি নীরব সব সময়।
# কিন্তু দল না করলে পুরস্কার পাওয়া যায় না। বাংলা একাডেমী পুরস্কার নিয়েও এটা হয়ে থাকে।
— এগুলো বাস্তবতা। এগুলো আমি অস্বীকার করে চলে এসেছি।
# ইদানীংকালে আপনার দিনগুলো কেমন করে কাটছে?
— আমি তো চোখে-টোখে দেখি না। দৃষ্টি তো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। মোটামুটি বসে থাকি। পড়তে খুব ইচ্ছা করে। আমার পড়ে শোনানোর লোকও আছে। নাতি-নাতনিরা আছে। তারা জরুরি বিষয় যেটা সেটা পড়ে শোনায়। পত্রিকা শোনায়। আমি মাঝে মাঝে গান শুনতে ভালোবাসি।
# আপনার প্রিয় শিল্পী কে? প্রিয় গান সম্পর্কে বলুন।
— আমি তো এদেশের শ্রেষ্ঠ যারা গায়ক-গায়িকা, তাদের সবারই গান শুনি।
# আপনি তো সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লিখেছেনও। শিল্পকলা একাডেমী থেকে আপনার বইও হয়েছে।
— আছে। আব্বাসউদ্দীনকে নিয়েও আমি একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছি।
# আপনার প্রিয় গান কোনটা—রবীন্দ্র, নজরুল?
— ক্লাসিক্যাল মিউজিক আমার প্রিয়। এছাড়া আমার একটা স্বতন্ত্র পড়াশোনা ছিল পশ্চিমা মিউজিকের ওপর। এটা খুবই আমার কাছে লেগেছিল। আমি এদেশীয় সঙ্গীত বুঝতে পেরেছি। যাকে বলে পশ্চিমা সঙ্গীত, সেটারও ধ্বনি তরঙ্গ আমি অনুভব করতে পারি। এর ওপর আমার কিছু বক্তৃতাও ছিল। আমি মাঝে মাঝে এ সম্পর্কে বলতাম। আমি প্রায়ই একটা কথা বলে থাকি—যদি আমি কবি না হতাম, তাহলে আমি অবশ্যই সঙ্গীতজ্ঞ হতাম।
# দেশে এবং বিদেশে আপনার প্রিয় লেখক কারা?
— অনেক নামই তাহলে বলতে হয়। আমাদের দেশে আমার প্রিয় লেখক কাকে বলব—সুধীন্দ্রনাথ দত্ত একজন, রবীন্দ্রনাথ...
# রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তো আপনার অনেক লেখা আছে— গদ্য, পদ্য...
— আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিশাল ভাণ্ডার। সেখান থেকে অনেক কিছু নেয়ার আছে। আর নজরুলকে আমি অনেক ভালোবাসি। তার কারণ হলো—তিনি নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন, বিদ্রোহ করেছিলেন এবং একটিমাত্র কবিতা তার আছে—‘বল বীর/ চির উন্নত মম শির’—যার সমতুল্য কাব্য বাংলা ভাষায় আর নেই।
# জীবনানন্দ দাশকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
— জীবনানন্দ তো নির্জনতার কবি। তাঁর একটা কবিতায় আছে—উটের গ্রীবার মতো কোন এক নিস্তব্ধতা এসে—এটাই জীবনানন্দ সম্পর্কে আমি বলি।
# সাম্প্রতিককালে কী লিখছেন?
— কলাম-টলাম তো লিখছি। দু’একটা কবিতা হয়তো লিখছি। আরও কিছু লিখতে পারলে হয়তো ভালো হতো। আমার তো বয়স হয়ে গেছে আসলে আশি। এ বয়সে মানুষ আর লেখে না, ছেড়ে দেয়, কিন্তু আমি তো এখনও ছাড়িনি।
# বাংলাদেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক অবস্থা, এটা নিয়ে কি আপনি আশাবাদী? দেশটা কি সত্যিকার একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উপনীত হবে?
— আমি অবশ্য আমাদের জনগণকে অধিক মূল্য দান করি। আমি শুধু বলব যে, আমাদের জনগণ নির্বোধ নয়। তারা সবই বুঝতে পারে।
# আপনার প্রিয় সুগন্ধি কী? আপনি তো সুগন্ধি ভালোবাসেন। আপনার গল্পও আছে—সৌরভের কাছে পরাজিত।
— আতর আমার প্রিয় সুগন্ধি। সবচেয়ে ভালো লাগে গোলাপি আতর। অসাধারণ। মানুষ আসল গোলাপি আতর পায় না। কিন্তু আসল গোলাপি আতর এক ধরনের পানির মধ্যে ভেসে ওঠা তেলের মতো। খুবই মধুর। একদিন লাগালে দু’তিন দিন থাকে।
# আপনার সংগ্রহে আছে?
— ছিল, এখন আর নেই।
# আপনার প্রিয় খাবার কী?
— আমার প্রিয় খাবার সাধারণত কোর্মা-পোলাও। এখনও এটা আমি ভালোবাসি, খেতেও পারি।
# আপনি একটা কথা বলেছেন, সমাজতন্ত্রের কথা এখন আর কেউ বলে না কারণ সাম্রাজ্যবাদের পরাক্রম বেড়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানে যে আরব বিশ্বে ইসলামী গণজাগরণের ঢেউ উঠেছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
— এটা আমি একবার বলেছিলাম কিন্তু। একটা বিষয় আসছে, পৃথিবীতে যেটা সম্পূর্ণ নতুন এবং তার কোনো কামান-বন্দুক নেই। সে অস্ত্রশূন্য হাতে একটি পুস্তক নিয়ে আসছে—তার নাম হচ্ছে ইসলাম। এর হাতে হলো পবিত্র কোরআন শরীফ। এটা পুঁজিবাদের সঙ্গেও মিলে না, সমাজতন্ত্রের সঙ্গেও না। এটা হলো আধুনিক জগতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ব্যাপার। এটা ব্যবসাকে হালাল করে, সুদকে হারাম করে দেয়। যে সমাজে সুদ আছে সে সমাজে সুখ নেই। সুদের সঙ্গে সুখের কোনো সম্পর্ক নেই। সুদ তো হারাম করে দিয়েছে। আমার মতে যারা সুদ খায়—আমাদের বইপত্রে আছে যে, যারা সুদ খায় তারা উঠে দাঁড়াতে পারে না।
# লেখালেখির ব্যাপারে আপনার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?
— এক সময় তো আমার স্ত্রীই ছিলেন এবং আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম। এখন এই যে নিঃসঙ্গ আমি, এই ক্ষতি তো আর পূরণ হবে না, হয়ও না।
# এক সময় তো কবি হওয়ার জন্য লেখালেখি শুরু করেছেন। এখন কেন লিখছেন—এটা কি কোনো দায়বোধ?
— আমরা তো কোথাও পৌঁছতে চাই। ঠিক কোথায় পৌঁছতে চাই, সেটা আমি এখন বলছি না। তবে একটা কথা হচ্ছে—ইসলাম আসছে। ভবিষ্যত্ হলো ইসলামের হাতে।
# এখন যদি আপনার হাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা দেয়া হয়, আপনার প্রথম কাজ কী হবে?
— প্রথম কথা হলো—এ দায়িত্ব আমি নিতে চাই না।
# আপনি চান না, কিন্তু যদি কোনোভাবে এমনটা হয়?
— তাহলে তো প্রথমে জনগণের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এটাই আমি করব।
# আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞতা জানাই সময় দেয়ার জন্য।

‘কবি ছাড়া আমি আর কিছুই নই’— এ কথা কবি আল মাহমুদের। যদিও তিনি ছোটগল্প, উপন্যাস, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্য রচনায় বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, সাংবাদিক হিসেবে পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা, তথাপি তাঁর কবি পরিচয়ই তাকে বর্ণময় ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত করেছে। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যর সমৃদ্ধিসাধনে তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন অগুনতি পাঠকের কাছ থেকে। হাজার বছরের বাংলা কাব্যধারায় অবগাহন করে আল মাহমুদ বাংলাভাষী পাঠককে উপহার দিয়েছেন প্রায় তিনডজন কাব্যগ্রন্থ। কবিতায় তিনি বাঁকের পর বাঁক বদল করে ক্রমাগত ছুটেছেন সমুদ্রের দিকে। তাঁর অতৃপ্ত কবিপ্রাণ এখনও ধাবমান।
বয়স আশির কাছাকাছি হলেও প্রাণে তার তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। কবিতায় তিনি ধারণ করেছেন এই বাংলাদেশের আত্মা। ‘আজানের শব্দে কুপির শিখার পাশে অবগুণ্ঠিত কিষাণীর মুখ’ তিনি দেখেছেন। গ্রাম বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যে জারিত লোকজজীবনের অনুষঙ্গ তার কবিতাকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা, বিশেষ মহিমা। লোক লোকান্তর, সোনালি কাবিন, কালের কলস, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, প্রহরান্তের পাশফেরা, বখতিয়ারের ঘোড়া, একচক্ষু হরিণ, আমি দূরগামী, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙন, বিরামপুরের যাত্রী, উড়ালকাব্য, বরুদগন্ধী মানুষের দেশ কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, ডাহুকী, পুরুষ সুন্দর, যে পারো ভুলিয়ে দাও, কবি ও কোলাহল, আগুনের মেয়ে, চেহারার চতুরঙ্গ তার আলোচিত উপন্যাস।
ছোট্টগল্প লিখেও চমকে দিয়েছেন তিনি পাঠকদের। পানকৌড়ির রক্ত, গন্ধবণিক, সৌরভের কাছে পরাজিত, ময়ূরীর মুখ, নদীর সতীন ইত্যাদি তার ছোট্টগল্প গ্রন্থ। যেভাবে বেড়ে উঠি, বিচূর্ণ আয়নার কবির মুখ—তার আত্মজৈবনিক উপন্যাস। শিশু-কিশোরদের জন্যও লিখেছেন বেশ ক’টি গ্রন্থ। লিখেছেন ভ্রমণ কাহিনী, সাহিত্য-সংস্কৃতি-ধর্ম বিষয়ক এবং আত্মগত অসংখ্য প্রবন্ধ ও কলাম।
গত ১১ জুলাই ছিল এই মহান কবির জন্মদিন। এ উপলক্ষে গত ১০ জুলাই সন্ধ্যায় কবির বাসায় হাজির হয়েছিলাম আমরা। মগবাজারের আয়শা-গোমতী ভিলায় কবির ফ্ল্যাটে যখন আমরা পৌঁছি তখন তিনি একটি পত্রিকার প্রতিনিধিকে সাক্ষাত্কার দিচ্ছিলেন। আমাদের ডাকলেন তাঁর শোয়ার ঘরে। কবিকে মনে হলো বেশ চঞ্চল ও উত্ফুল্ল। সাক্ষাত্কার দিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। কথা বললেন বিভিন্ন বিষয়ে। তার এই সাক্ষাত্কারটি এখানে পত্রস্থ হলো।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে : হাসান হাফিজ / আহমদ বাসির
সূত্র : আমার দেশ

Friday, June 1, 2012

পাখির মত | আল মাহমুদ

আম্মা বলেন, পড় রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে ;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।

আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
নদীর কাছে থাকতে
বকুলডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে।

সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্ণফুলীর কূলটায়
দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি
ফেরেস্তারা উল্টায়।

তখন কেবল ভাবতে থাকি
কেমন করে উড়বো
কেমন করে শহর ছেড়ে
সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো।

তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হব
পাখির মত বন্য।

প্রকাশ কৃতজ্ঞতা : যাযাবর-নামা/ফারজানা মাহবুবা

Wednesday, May 9, 2012

রবীন্দ্র প্রতিভা ও সভ্যতার আকাঙ্ক্ষা | আল মাহমুদ

যারা সাহিত্য সম্পর্কে অনুসন্ধিত্সু, তারা রবীন্দ্র প্রতিভা নিয়ে আর আগের মতো কোলাহলমুখর নয়। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদির ব্যাপারে কথা বলতে চান। অথচ এই বিষয়গুলো বর্তমান বিশ্বে কারও মনোযোগ আকর্ষণ করে না। একটা পুরনো বিষয় হিসেবেই এর খানিকটা মূল্যায়ন করে মাত্র। এখন জগতে আধুনিকতম বিষয় হলো ‘ইসলাম’। কারণ, ইসলাম কারও মুখাপেক্ষী নয়। সে নিজের গৌরবে গরীয়ান এবং ধর্মের প্রশ্নে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
জগত ও জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে আমার মনে হয় রবীন্দ্র আকাঙ্ক্ষা খানিকটা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার অবস্থায় ছিল। কিন্তু বিশ্ব, এমনকি ভারতীয় সভ্যতা অনুসন্ধিত্সু এবং আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়ে আছে। কোনো উপনিষদীয় জ্ঞান এই আকাঙ্ক্ষাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে না। আমি অবশ্য এখানে ধর্মের প্রসঙ্গ আনতে ইচ্ছুক নই; কিন্তু মর্মের প্রসঙ্গ অবশ্যই উত্থাপিত হতে পারে। মানুষের মন পুরনো, প্রাচীন এবং অতীতে তলিয়ে যাওয়া কোনো জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন বা মননশীল সাহিত্যের দিকে আগ্রহহীন নয়। জগত ঘুরছে। একটা কথা আছে না—‘গান্ধীজী যদি মরে যান/ জগত্ হবে না খান খান/ পৃথিবী ঘুরবে’। আমরা অনুভব করছি, পৃথিবী ঘুরেই চলেছে। আর পৃথিবীর গতি সঠিকভাবে নির্ণয় করতে গেলে সব রহস্যের উত্তর দিতে পারে এমন কোনো ধর্মীয় আদর্শের কাছেই মানব জাতিকে আশ্রয়ের আশায় ভিড় জমাতে হবে।
শোনা যায়, ‘বাবেল’ বলে একটি স্থান থেকে মানুষের বিচ্ছেদ ঘটেছিল। সেই বিচ্ছেদের কাহিনী হলো ‘বাইবেল’। ‘বাবেল’ থেকে ‘বাইবেল’। যাই হোক, বাবেল থেকেই মানুষের ভাষাও আলাদা হয়ে গেছে। এক গোত্রের ভাষা অন্য গোত্রের ভাষা থেকে একেবারে স্বতন্ত্র। কীভাবে সেটা ঘটেছিল, আজ আর সে কথা মানবজাতির মনে নেই। তবে মানুষের আকাঙ্ক্ষা হলো সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে সিজদায় যাওয়া; এবং সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য এক গোপন ও নিগূঢ় আকাঙ্ক্ষা কাজ করে চলেছে।
এই আকাঙ্ক্ষার পরিণতি কোনো উপনিষদীয় জ্ঞানে আমরা খুঁজে পাই না। এটা খুঁজে পাওয়া যায় ইসলামের মধ্যে। কারণ, ইসলাম সর্বত্রগামী। ধর্মীয় এবং জাতিগত পার্থক্য বিদ্যমান থাকার পরও ইসলাম মানবজাতির ঐক্যের নির্দেশনা দিতে পারে। আর এই নির্দেশনার কথা আমরা শুনতে পাই কাজীর কবিতায়—“জাতিতে জাতিতে মানুষে মানুষে/ অন্ধকারের এ ভেদ-জ্ঞান/ অ-ভেদ ‘আহাদ’ মন্ত্রে টুটিবে/ সকলে হইবে এক সমান।” সব মানুষকে এক করার এই মন্ত্র রবীন্দ্রনাথ আয়ত্ত করতে পারেননি। তিনি ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির উত্তরসূরি হলেও ভারতীয় মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতির দিগন্তে তাঁর বিচরণ খুবই সীমাবদ্ধ।
রবীন্দ্র প্রতিভার এটা এক রহস্যময় ব্যাপার যে, তিনি মূল ভাষায় গ্যাটের ‘ফাউস্ট’ পাঠ করার তাড়না থেকে আশি বছর বয়সে জর্মন ভাষা শেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন; কিন্তু তার জমিদারি এস্টেটের অধিকাংশ প্রজার ধর্মীয় গ্রন্থটি অনুধাবন করার চেষ্টা কখনও করেননি। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ এই গূঢ় রহস্যের কারণেই সর্বত্রগামী হতে পারেননি। যদিও তিনি লিখেছিলেন—‘দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু/ দেখা হয় নাই দু’চোখ মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দু’পা ফেলিয়া/ একটি ঘাসের শীষের ওপর/ একটি শিশির বিন্দু।’ রবীন্দ্রনাথের পরিবারে ফার্সি সাহিত্য এবং সেই সুবাদে হাদিস শাস্ত্র নিয়েও কিছুটা চর্চা ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। অথচ এর উত্তরাধিকারিত্ব তিনি গ্রহণ করেননি। তার সৃজনে এর প্রভাব থাকলেও মননে ছিল না। যে ভাষায় তিনি আজীবন লিখে গেছেন, সে ভাষার অধিকাংশ মানুষের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা কেন যে তাঁকে ছুঁতে পারেনি, সেটা এক রহস্যময় ব্যাপারই বটে। এ কারণেই একদা আমি আমার একটি কবিতায় লিখেছিলাম—
‘কে তুমি পড়িছ বসে আমার কবিতাখানি কৌতূহল ভরে?’
না, আমার কোনো কৌতূহল নেই।
আমার নাম, মাহমুদ। পিতা, আবদুর রব। জাতি মুসলমান। পেশা কৃষিকার্য।
ভবিষ্যতের জন্যে রেখে যাওয়া সর্বপ্রকাশ আনন্দ ও বিনোদে আমি উত্তরাধিকার খুঁজে নিরাশ।
কেউ আমার জন্যে রেখে যাননি কোনো অমৃত, কোনো আশা ও উদয়।
আমি দেখেছি কেবল অস্তগমনের জন্য প্রতীক্ষারত কিষাণ,
বলদ ও জোয়াল
কর্ষণের ঘাম শুষে নেয়ার জন্য একই সাথে গোধূলির দিকে
ফুরফুরে হাওয়ার প্রতীক্ষা।
আজানের শব্দে কুপির শিখার পাশে অবগুণ্ঠিত কিষাণীর মুখ।
রুপোর পৈচিবাঁধা কর্মঠ নারীর নগ্ন বাহু।
শাড়ি ও শরীরে মাড়াইয়ের গন্ধ।
ধানভানা গতরে নৃত্যরত দু’টি বুকের আহ্বান।
ঐ দাড়িঅলা সন্তের ছবি আমার ঘরে টাঙিয়েছে আমারই ছেলেমেয়েরা!
আহা, তারা কি করে জানবে ঐ ছবি আমার কাছে
অনাদায়ী খাজনার সর্বশেষ নোটিশের কথাই বারবার মনে পড়িয়ে দ্যায়?

সূত্র : আমার দেশ

Monday, December 19, 2011

আমিও ছিলাম, আমিও থাকব || আল মাহমুদ

বিজয়ের চল্লিশ বছর অতিক্রম করছি। এর মধ্যে কত ঘটনাই ছবির মতো চোখের সামনে এসেই মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি অবশ্য অতীত নিয়ে চর্চা করতে অভ্যস্ত নই। কারণ অতীত প্রকৃতপক্ষে কবির মনে একপলক স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। একাকী বসে থাকলে মানুষ স্বভাবতই একটু অতীতাশ্রয়ী হয়ে পড়ে। আর আমি যেহেতু একজন কবি এবং কবি ছাড়া আর কিছুই নই, সে কারণে কবিতা নির্মাণের অনেক স্মৃতি, বিস্তৃতি এবং বিবরণ আমার মনে উদিত হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। যদিও আমি কবিতা ছাড়াও গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ লিখেছি অনেক, তবুও আমার সামান্য খ্যাতি ও প্রতিপত্তি কাব্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠা আমাকে মনে মনে পুলকিত করে।
জীবন কাটিয়েছি লিখে, যদিও শুধু কবিতা লিখে একজন কবির জীবন অতিবাহিত হয় না। গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধাদিও আমি লিখে গেছি। বর্তমানে আমার দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। কাছের মানুষকেও আর চিনতে পারি না। কিন্তু কী করে ভুলি যে আমার যৌবনে আমি কবিতাকেই উচ্চকিত করে তুলেছিলাম। কত স্বপ্ন দেখেছি। বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাতে, কঠোর বাস্তবে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয়েছে। আমাদের দেশের মাটি আমার সর্বাঙ্গে শিহরণ তোলে, লেগে আছে, আমি সেটা অনুভব করি। দেশ ও জাতির প্রতি যদিও আমার কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, তবু অলিখিত অনেক প্রতিশ্রুতি কবির থেকেই যায়। তবে একথা আমি বলতে পারি, আমি যা কিছু লিখেছি তা আমার দেশের মানুষ, মাটি, প্রকৃতি এবং পরিবেশের কাহিনীতে কলরবমুখর হয়ে আছে।
যখন ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, তখন আপনা থেকেই মনে অনুভব করি একটি সুন্দর, সুস্থ ও শান্ত বাংলাদেশ। সৃষ্টির আয়োজন আপনা থেকেই অনিবার্য হয়ে ধরা দেবে। দেশপ্রেম কবিদের হৃদয়ে একটি সাধারণ সত্য হিসেবে অনুভূত হয়। আমি আমার দেশ ও জাতির জন্য যৌবনে অবিশ্রান্তভাবে লিখে গেছি। আমার লেখার পরিমাণ একেবারে সামান্য নয়। তবে সব কথা, কল্পনা এবং স্বপ্নকে ভাষায় রূপ দিতে হয়তো ঠিকমত পারিনি। কিন্তু আমার সযত্ন প্রয়াস সব বিষয়ের ওপর ছড়িয়ে আছে। আজ দেখতে পাচ্ছি, বৃহদাকারের কাব্যসমগ্র, গল্পসমগ্র, এবং উপন্যাস ইত্যাদি তাকে উপচে পড়ছে। দেখি আর ভাবি আমি কখন, কীভাবে এত কাজ করতে সমর্থ হয়েছিলাম।
মানুষের যৌবন একটা পরিশ্রমের সময়। আমি সেটা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে করেছিলাম বলেই কত মানুষের
সঙ্গে আমার হৃদ্যতা, বন্ধুত্ব এবং সৌহার্দ্য স্থাপিত হয়েছিল। আমি এজন্য মনে মনে অত্যন্ত পুলক অনুভব করি। আমি লিখেছি আমার সাধ্যমত। জমে উঠেছে ক্রমে ক্রমে। বেড়ে গেছে লেখার পরিধি। আগেই বলেছি তাক উপচে পড়ছে। অনেক জিনিস আছে, যা ভাঁজ করে রাখা যায় না। তার মধ্যে কাব্যই সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমি মনে মনে অনুভব করি আমি কবি ছাড়া আর কীই-বা হতে পারতাম, না, কিছুই হতাম না।
দুই চোখ বন্ধ করলেই স্বপ্নের এক চলচ্চিত্র যেন চলতে থাকে। বাংলাদেশে লিখে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ নয়। কারণ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যারা কাজ করেছেন, তাদের কাজের পরিধি এবং মান আকাশকে স্পর্শ করে আছে। সহজে এসেই কেউ এই মেঘস্পর্শী কৃতিত্বের পাশে নতুন কোনো স্তম্ভ নির্মাণ করে সার্থকতার অর্জন করে, এটা সহজ কাজ নয়। অনাদিকাল থেকেই সেই চর্যাপদের সময় থেকেই বাঙালি কবিরা সৃষ্টির সূচনা করেছিলেন, তা একেবারে সামান্য নয়। এক কথায় আমি অবশ্যই বলব যে, এক সামান্য উচ্চতায় বাংলা ভাষা ও কাব্যকে তারা নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে আমি একজন সামান্য কবি। আমারও অতি সামান্য কিছু অবদান আছে বলে মনে করি। হয়তো এ কথার সহজ স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমার পরিশ্রম নিয়ে যদি আমি পরাক্রম প্রকাশ করি, তাতে দোষ বর্তায় না। কারণ আমি তো কবি, স্বপ্নচারী এবং সৃষ্টিশীল মানুষ। কোনো সময়ই আমার কোনো ক্লান্তি আমাকে বশে রাখতে পারেনি। ক্রমাগত লিখেছি। অবশ্য কাব্যচর্চা সব সময় স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারেনি।
দেশের নানা দুর্যোগ, দুর্ঘটনায়, বিপ্লবে, অন্তর্বিপ্লবে যেহেতু আমি কবি, আমিও শিহরিত হয়েছি। এবং আমার এতে অংশগ্রহণ আছে। আজ যখন দেখি, বৃহদাকার অনেক পুস্তক আমারই নামাঙ্কিত হয়ে শোভা পাচ্ছে, তখন হৃদয়ে এক ধরনের শান্তি অনুভব করি। আর সাহসের সঙ্গে বলতে চাই যে, আধুনিক বাংলা সাহিত্য বহু কীর্তিমান কবি, লেখকদের অবদানে অনতিক্রম্য উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। আমিও আমার সামান্য শক্তি নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করেছি। চর্যাপদ থেকে শুধু ধরলে এই সাম্প্রতিককালের বাংলা কবিতা পর্যন্ত একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা নির্মিত হয়েছে। কত কবির অশ্রু, হাসি, ক্রন্দন, আনন্দ, কলরব এর মধ্যেই মিশ্রিত হয়েছে। আমার আনন্দ হলো আমি আছি, আমিও ছিলাম, আমিও থাকব। এর জন্যে কারও কোনো স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। হ

শ্রুতিলিখন : আহমদ বাসির
সূত্র : আমার দেশ

Friday, December 16, 2011

স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে || আল মাহমুদ

আপনাদের কাছে এ বিজয় দিবসের তাত্পর্য অনেক বেশি, অনেক মূল্যবান; কিন্তু আমি যেহেতু অংশীদার, এ দিবস যারা সৃষ্টি করেছেন তাদের একজন আমি, সে কারণে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যায়, যা ব্যক্ত করা যায় না। অনেক ভালোবাসা, মানবিক বিনিময় এর সঙ্গে জড়িত। অনেক মানুষ এসব ভুলে যেতে পারে; কিন্তু কবিরা বিস্মরণপ্রিয় নয়, তারা ভোলে না।
আমার মনে পড়ছে, আজ তো ষোলো তারিখ; এই ষোলো কিংবা পনেরো, হয়তো ষোলোই হবে, দুপুরে খেতে বসেছি। আমার ভাগ্নি আমাকে বলছে—মামা, আমাদের বোধহয় আর দেশে যাওয়া হবে না। আমি ওকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়ার জন্য বলেছি যে, কী যে বলিস না তুই! খুব উচ্চহাস্য করলাম আমি। বললাম, দেখিস, আমরা খুব তাড়াতাড়ি জয়ী হয়ে ঢাকায় ফিরে যাব। আমি তো একটি কথার কথা বলেছি ভাগ্নিকে; কিন্তু দৈবক্রমে সত্যিই বিজয় দিবস এসে গেল। আমাদের যিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন, জেনারেল এমএজি ওসমানী, তিনি আমার ভগ্নিপতির হাতে একটা স্লিপ দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমি সেটা পড়ে দেখলাম, এই মুহূর্তে আপনি ঢাকায় চলে যান। কী আশ্চর্য, আমি স্লিপ নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছি আমার ভগ্নিপতির মুখের দিকে। বললেন, কীভাবে যাবেন সেটা তো? সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনি প্লেনেই যাবেন। একটা এয়ার ক্যারিয়ারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তো উঠলাম গিয়ে ব্যবস্থামত প্লেনে। একটা মিলিটারি আদান-প্রদানের এয়ার ক্যারিয়ার। সেখানে যাদের দেখলাম তারা সবাই আমার পরিচিত; কিন্তু তাদের মধ্যে দু’জনের নামই আমার মনে পড়ে। একজন হলেন সিকান্দার আবু জাফর ভাই, আরেকজন হলেন কবি আবিদুর রহমান।
ঢাকায় এসে নামলাম তেজগাঁও বিমানবন্দরে। সবাই নেমেই যার যার রাস্তায় চলে গেল। আমি একা। আর আমার স্যুটকেসটা ভারী। অনেক বই-টই নিয়ে এসেছিলাম তো! এখন কী করি? আমি কাঁধে তুলে নিয়ে অনেক কষ্টে গেটে এসে দাঁড়ালাম। এসব স্মৃতি মনে পড়ছে। অনেক স্কুটার আমার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমাকে দেখে ফেলে চলে যাচ্ছে। আমি হা করে তাকিয়ে আছি। কিন্তু এক বৃদ্ধ স্কুটারওয়ালা, আমাকে দেখে চলে গেলেন, অনেক দূর গিয়ে বোধহয় তার হৃদয়ে মমতা জাগায় আবার ফিরে এলেন, ‘উঠুন’। কোথায় যাব সেটা না, উঠুন। আমি স্যুটকেসটা কোনোমতে তুলে নিয়ে উঠে পড়লাম। তারপর বললাম, আমি খিলগাঁও বাগিচায় যাব। তিনি স্টার্ট করে চলে যাচ্ছেন। খিলগাঁও বাগিচায় নামলাম। আমার বাড়ির সামনে—বাড়িতে তো কেউ নেই, আমি জানি। আমি স্কুটারওয়ালাকে টাকা দিতে গেলাম। আমার পকেটে ভারতীয় টাকা। তিনি বললেন, যা খুশি দেন। আমি তাকে টাকা দিলাম। তিনি হেসে নিলেন। বললেন, যান যান ভেতরে যান, গিয়ে দেখেন কেউ আছে কি-না। আমি স্যুটকেসটা টানতে টানতে ভেতরে গিয়ে দেখি দরজা খাঁ খাঁ করছে। তালা ছিল। কোনো কিছু নেই। ঘর খালি। শূন্য খাঁ খাঁ করছে। এই-ই বিজয় দিবস আমার কাছে।
কতগুলো জিনিসের কখনও ক্ষতিপূরণ হয় না। আমারও কোনো ক্ষতিপূরণের কথা আমি বলছি না। আমরা শুধু একটা দিন পেয়েছি। সেটা হলো বিজয় দিবস। আর কোনো কিছু না, আর কিছু না। অনেক হৃদয়বিদারক স্মৃতি অতিক্রম করে এসেছি। আপনাদের কাছে এ বিজয় দিবস একরকম, আমার কাছে অন্যরকম। আমার কাছে অনেক স্মৃতি আছে, যা মেলতে গেলে ডালপালা ছড়িয়ে পড়বে। সেগুলো তো বলা যায় না, বলা যাবে না। আর কেইবা সেগুলো মনে রাখবে! কিছু তো লিখেছি। সব কথা তো লেখা যায় না। সব কথা কি লেখা যায়, সব? না, না, সব কথা লেখা যায় না। অনেক বিস্মৃতি, স্মৃতি এই দিবসের সঙ্গে জড়িত। শুধু একটা কথা মনে রাখবেন, এমনিই এদিনটি আসেনি। এ দিনটির জন্য অনেকের অনেক ত্যাগ আছে। আমার জন্য আমার মামার বাড়িটা কামান দেগে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারা ধনী লোক ছিলেন। আমার মামার বাড়িতে আমি লজ্জায় আর যেতাম না; কিন্তু আমার মামারা ব্যবসায়ী মানুষ। তারা আবার সব বিল্ডিং-টিল্ডিং করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমি যাই না। আমার মামিরা খবর দিয়ে, লোক পাঠিয়ে আমাকে নিয়েছেন। কী রে, তুই আসিস না কেন? আমি বললাম, আমার জন্য এত ক্ষতি হলো! বললেন, এজন্যই তুই আসিস না? দেখ, আবার বিল্ডিং-টিল্ডিং হয়ে যাচ্ছে। তোর মামারা তো ব্যবসায়ী মানুষ, ওরা কি ওসবের তোয়াক্কা করে? খুব আদর করে মামিরা খাওয়ালেন আমাকে। কিন্তু আমি খুব শরম পেয়েছিলাম যে, আমার জন্য এসব মানুষের এত ক্ষতি হলো! এসবের জন্য কে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে? কেউ দেয়নি। যা-ই হোক, আমি এজন্য বলছি যে, বিজয় দিবস আপনাদের কাছে একরকম, আমার কাছে আরেকরকম। আমার কাছে অনেক হৃদয়বিদারক স্মৃতি আছে, অনেক স্মৃতি। এমন অনেক মানুষ আমাকে টেনে টেনে ঘরে নিয়ে গেছে। নিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে রেখেছে। তাদের চেহারাগুলো মনে পড়ছে। হ্যাঁ, যে ক’জনের কথা খুবই মনে পড়ে, তারা জীবিত নেই। এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা বড় অসহনীয়, অনেক কষ্ট আছে বিজয় দিবসের পেছনে।
আপনাদের কাছে একটা কথা বলি, এই যে বিজয় দিবস পালন করছেন, এটা বলা যায় স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে না পারলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তা ঠেকানো মুশকিল হবে। আপনারা শুধু বাংলাদেশকে দেখেন একটা মানচিত্র। তা নয়, এর একটা অন্তর্বর্তী, একটা অদৃশ্য মানচিত্র আছে। সে মানচিত্র কী? এর পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আকরিক লোহা, কয়লা। লোহা আর কয়লা পাশাপাশি থাকলে সেটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার। এটা বাংলাদেশে আছে। বাংলাদেশে গ্যাস আছে। স্তরের পর স্তর গ্যাস আছে। এর পরের স্তরেই আছে পেট্রল। আপনারা জানেন না; কিন্তু পৃথিবীর সব লোভী শকুন, বিদেশি—যারা এখানে আসে তারা জানে এর পেটের মধ্যে কী আছে। এই যে বাংলাদেশের পেটের ভেতরে কী আছে, আমরা জানি না—এটা একটা অপরাধ। আমাদের জানতে হবে, আমাদের দেশের মাটির নিচে কী আছে, উপরে কী আছে, সমতলভূমিতে কী আছে, টিলা-টক্করে কী আছে; সব জানতে হবে। এটা না জানলে দেশপ্রেম যাকে বলে সেটা গড়ে ওঠে না।
এ হলো বিজয় দিবসের কথা। দেশ সম্পর্কে সবসময় বেশি জানতে হবে। আমি এদেশের নদী-নালা, নারী-প্রকৃতি এর মধ্য দিয়ে এসেছি। আমি বাস করেছি। আমি ভালোবেসেছি। সেজন্য আমার কবিতায় তার চিহ্নগুলো ফুটে উঠেছে। এ কবিতাই যেহেতু আমার কর্ম, কবিতাই যেহেতু আমার ভাষা আর যেহেতু কবিতাই হলো মানবজাতির মাতৃভাষা, সেজন্য কাব্যের পেছনেই থাকি। কবি ছাড়া আর তো কিছু নই। কী আমি? কিছু নই। কবি ছাড়া কিছু নই। এই কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করতে হবে। নিজের দেশের, জাতির ভাষা ও কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই যারা করে, তারাই হলো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এটা স্মরণ রাখবেন আপনারা।
অনুলিখন : আহমদ বাসির

Monday, October 3, 2011

প্রকৃতি ও পুরুষ || আল মাহমুদ

এখন কোথায় তুমি? নামে জল, হে স্পষ্টভাষিণী
হাওয়া তার কথা রাখে, শপথ ভাঙে না কোনো ঋতু;
ঝিঁঝির ঝঙ্কার বলে, বলো দেখি, আমি কি আসিনি?
কেয়ার কাটার ফাঁকে ফোটে ফুল : তুমি ভীতু, তুমি শুধু ভীতু।

স্মৃতির চিরুনিখানি পড়ে আছে পুরুষের দর্পণের পাশে
তাতে কোনো চিহ্ন লাগে? ছিন্ন কেশ, দেখো কার কেশ?
প্রজাপতি ভেঙে গিয়ে জলো, হিংস্র, দর্পিত বাতাসে
উড়ে আসে; আর তুমি, তুমি ভাঙো তোমারি আদেশ?

গন্ধ ও জলের দাগে ভরে আছো কী করে দেয়াল?
প্রশ্ন করে চেয়ে দেখি ভাঙা সেই আতরের শিশি।
এখনও টেবিলে আছে। গন্ধ তবে বর্ণময়? নাকি গাঢ় লাল?

তুমি কি বাঙালি নও, ভূগোল অচেনা এক দিশী?
প্রকৃতি আমাকে শোষে মেদমাংসে, আমি তো কাদিনি,
রক্ত হয় বারিধারা, মজ্জা ঘাস, লো মিথ্যাবাদিনী।

Sunday, September 18, 2011

আল মাহমুদ

১৯৫৪ সালের এক শীতের সকাল৷ ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ ১৮ বছরের এক যুবক৷ পরনে তাঁর খদ্দরের জামা ও পাজামা, পায়ে রাবারের স্যান্ডেল আর বগলের নিচে ভাঙা টিনের একটা সুটকেস, যার গায়ে গোলাপ ফুল আঁকা৷ এক ঝলক তাকালেই বুঝা যায় নিতান্তই মফস্বলের এক যুবক কোন এক দুর্বিপাকের তাড়া খেয়ে এখানে এসে উঠেছে৷ তাঁর মুখের রেখায় ফুটে উঠেছে শ্রান্তির চিহ্ন কিন্তু চোখ জোড়া সাক্ষ্য দিচ্ছে যুবকের পেছনে কোন সেনাবাহিনী থাকলে তাঁর নির্ভীক দৃষ্টিই ঘোষণা করত বিজয় বার্তা৷
 
তখন ৫২'র ভাষা আন্দোলনের উত্তুঙ্গ সময়৷ এ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলো আপামর বাংলা ভাষাভাষী বিশেষ করে বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি৷ তবে ছাত্ররাই ছিলো এ আন্দোলনের পুরোধা৷ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে যাঁরা জড়িয়ে পড়েছে, পাকিস্তান সরকারের পুলিশ তাঁদেরকে দমিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে, বিভিন্নভাবে মামলা দিয়ে তাঁদেরকে হয়রানি করার চেষ্টা করছে৷ যুবক তাঁদেরই একজন৷ যুবকের অপরাধ তিনি একজন কবি এবং ৫২'র ভাষা আন্দোলনের ঢেউ মফস্বল শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছড়ে পড়লে যুবক এতে নিজেকে জড়িয়ে নেন৷ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও গঠিত হয়েছিলো ভাষা কমিটি এবং ভাষা কমিটির একটি লিফলেটে তাঁর চার লাইন কবিতা উদ্ধৃত করা হয়৷ আর সেই অপরাধে মীর আব্দুশ শাকুর আল মাহমুদের ফেরার হয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ঢাকায় আগমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি৷

ঢাকায় এসে আল মাহমুদ তাঁর এক পূর্ব পরিচিত'র মাধ্যমে পরিচিত হন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের সাথে৷ তারও পূর্বে ঢাকা এবং কলকাতার পত্র পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি কবিতা প্রকাশ হলে তিনি লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন৷ আল মাহমুদের যখন জীবিকার প্রয়োজনে একটি চাকুরি অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে দাদাভাই তখন আল মাহমুদকে ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাত'র প্রুফ সেকশনে প্রুফ রিডারের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেন৷ পরবর্তীতে তিনি নিজের চেষ্টায় সাপ্তাহিক কাফেলায় সহসম্পাদক পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ এরপর দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন৷ স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে মফস্বল বিভাগে বিভাগীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন৷ এর পর আসে ১৯৭১ সাল৷ বাংলাদেশের জন্ম যন্ত্রণার বছর৷ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে, যে স্বল্প সংখ্যক কবি রণাঙ্গণের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, আল মাহমুদ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ ১৯৭১ সালে তিনি শরণার্থী হয়ে কলকাতায় যান৷ সেখানেই তিনি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন৷ তারপর একদিন এই কবি তাঁর চির পরিচিত সুহৃদ কলমকে ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নেন রাইফেল৷ দেশে ফিরে তিনি মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার আশায় রণাঙ্গণের সশস্ত্রযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন৷ দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আসে স্বাধীনতা৷ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন ঢাকায়৷ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে দৈনিক গণকন্ঠ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন৷ ৭১'র পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতি, দুর্ভিক্ষ, সর্বহারা আন্দোলন ও রক্ষীবাহিনী ইত্যাকার পরিস্থিতিতে দেশ যখন বিপর্যস্ত তখন গণকন্ঠের নিঃশঙ্ক সাংবাদিকতা এ দেশের পাঠক সমাজের কাছে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়৷ বিশেষ করে আল মাহমুদের সংবাদ প্রকাশের স্টাইল ও সাহসী সম্পাদকীয় দেশবাসীর হৃদয় স্পর্শ করে৷ বিপরীত দিকে পত্রিকাটি পরিণত হয় শাসক গোষ্ঠীর চক্ষুশূলে৷ ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সালে তিনি কারাবরণ করেন৷ তাঁর আটকাবস্থায় সরকার দৈনিকটিও বন্ধ করে দেয়৷ ১৯৭৫ এ তিনি মুক্তি পান৷ তাঁর কবি খ্যাতি ততদিনে পৌঁছে গিয়েছিলো রাষ্ট্রপতির বাসভবন পর্যন্ত৷ কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে ডেকে শিল্পকলা একাডেমীর প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেন৷ ১৯৯৩ সালে তিনি ওই বিভাগের পরিচালকরূপে অবসর নেন৷ চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে তিনি আবার ফিরে যান সাংবাদিকতা পেশায়৷ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক কর্ণফুলি'র সম্পাদক হিসেবে বেশ কিছুদিন কর্মরত ছিলেন৷ বার্ধক্যে উপনীত কবি বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন৷

আল মাহমুদ জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই এক বর্ষণমুখর রাতে৷ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামের মাতুলালয় মোল্লা বাড়িতে৷ আল মাহমুদের পূর্বপুরুষগণ ১৫০০ খৃষ্টাব্দের দিকে একটি ইসলাম প্রচারক দলের সাথে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাইতলায় আসেন৷ বৃটিশ আমলে কাইতলার মীরবাড়ির মীর মুনশী নোয়াব আলী পরিবারের অসম্মতিতে পিতৃপুরুষের প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি ও খানকার বাইরে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন এবং পড়াশোনা শেষ করে স্থানীয় আদালতে একটি চাকুরী গ্রহণ করেন৷ ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর তাঁর কর্মস্থল অর্থাত্‍ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন হওয়ায় মীর মুনশী নোয়াব আলী স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী মাক্কু মোল্লার এক কন্যাকে বিয়ে করেন৷ যদিও এই বিয়ে প্রাচীন পিতৃপরিবারের সাথে তাঁর বিচ্ছিন্নতাকে চিরস্থায়ী করে দেয়৷ মাত্র পঁচিশ তিরিশ মাইলের ব্যবধানে থেকেও তিনি কাইতলার মীর বাড়ির সাথে, তাঁর পিতৃপুরুষদের সাথে আর সম্পর্ক রাখতে পারেন নি৷ মুনশী নোয়াব আলী তার পিতার মৃত্যুশয্যায় পিতাকে শেষবারের মত দেখতে কাইতলার মীরবাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন৷ কিন্তু অবাধ্য সন্তানের উপর নারাজ পিতা মীর আব্দুল গনি ইংরেজি শিক্ষিত পুত্রের হাতে এক চামচ পানিও গ্রহণে অসম্মতি জানিয়ে মৃত্যুবরণ করেন৷ মুনশী নোয়াব আলী আর কাইতলায় ফিরে যাননি৷ স্ত্রী, পুত্র নিয়ে শ্বশুর বাড়িতেই অবস্থান করেন৷ আর দয়ালু শ্বশুর, কন্যা এবং জামাতাকে তাঁর অন্যান্য পুত্রদের সমান মর্যাদা এবং তাঁর বিপুল সম্পত্তির অংশ দিয়ে মোল্লাবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেন৷ এই হলো আল মাহমুদের প্রপিতামহ মুনশী নোয়াব আলীর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল মোল্লাবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের ইতিহাস৷

পিতা আব্দুর রব মীরের ছিল কাপড়ের ব্যবসা৷ পরবর্তীতে বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসের অফিসার৷ মা রৌশন আরা বেগম ছিলেন গৃহিনী৷ একদিকে ধর্মীয় চেতনার কারণে ইংরেজি ভাষার প্রতি বিদ্বেষ অন্যদিকে পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোকে কবিতার প্রতি অসাধারণ অনুরাগ- এমনি এক দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশে আল মাহমুদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা৷ আল মাহমুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি তাঁর ছেলেবেলার গৃহশিক্ষক শফিউদ্দিন আহমদের হাতে৷ প্রকৃত অর্থে এই শফিউদ্দিন আহমদই তাঁকে নিয়ে যান পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অনাস্বাদিত এক গ্রন্থভূবনে৷ সেই খুব ছোটবেলায় যখন তিনি স্কুলের চৌকাঠ মাড়াননি, এমনকি ঠিকমতো পড়তেও পারেন না, বানান করে করে সবেমাত্র পড়তে শিখছেন, তখনই শফিউদ্দিন আহমদ তাঁকে রাত জেগে জেগে পড়ে শোনাতেন ঠাকুরমার ঝুলি৷ আর আল মাহমুদ ছোটবেলাতেই আস্তে আস্তে উপলব্ধি করেন বাল্যশিক্ষার জঞ্জালের বাইরেও বইয়ের একটি বিশাল জগত্‍ রয়েছে৷ এই উপলব্ধিই পরবর্তীতে তাঁকে বানিয়েছে কবি, ভাবুক, পাখির মতো বন্য৷ ফলে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই শিখে ফেলেছিলেন স্কুল পালানো৷ স্কুল পালিয়ে লোকনাথ পার্কের বিশাল কড়ই গাছের নিচে শুয়ে শুয়ে দেখতেন পাখিদের খুনসুটি, নীলিমার নীল, বৃষ্টির পতন৷ জর্জ হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর অবশ্য তাঁর স্কুল পালিয়ে সময় কাটানোর জায়গা পরিবর্তন হয়ে যায়৷ একদিন তাঁর পাঠতৃষ্ণা তাঁকে পায়ে পায়ে নিয়ে যায় লালমোহন পাঠাগারে৷ এর পেছনেও রয়েছে এক মজাদার ঘটনা৷ আল মাহমুদের বাড়িটি ছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশন লাগোয়া৷ স্টেশনে গভীর রাত অব্দি ট্রেন চলাচল করত৷ আর বালক আল মাহমুদ বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের বেলায় কী এক আকর্ষণে পায়ে পায়ে চলে আসত স্টেশনে৷ রাতের স্টেশনের চাঞ্চল্য, বিচিত্র সব মানুষের আনাগোনা তাঁর মনে এক ধরণের রোমাঞ্চের সঞ্চার করত৷ স্টেশনের চায়ের দোকানে বসে বড়দের মত গম্ভীর ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিতেন৷ একদিন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন দু'জন মহিলা৷ মহিলাদের বেশভূষা আর আচরণ আভিজাত্যের স্বাক্ষ্য দিচ্ছে৷ কিন্তু তাঁদের চোখেমুখে এক ধরণের উত্‍কন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ তাঁদের গন্তব্য স্টেশন থেকে অনেক দূরে এবং সেখানে যাওয়ার জন্য কোন উপযুক্ত বাহনও মিলছে না৷ এখন তাঁরা যাবে কোথায়? এমত উদ্বেগ উত্‍কন্ঠার সময় আল মাহমুদ কিছু না বুঝেই তাঁদেরকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান৷ এই সহোদর দুই মহিলা প্রকৃতপক্ষে ছিলেন তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য৷ তাঁদেরকে থাকতে দেয়া হয়েছিলো আল মাহমুদের শোবার ঘরে৷ আল মাহমুদের ঘরের তাকে রক্ষিত ছিলো ছোটদের অনেক বই৷ তাঁর বইয়ের প্রতি এই আকাঙ্ক্ষা দেখে সহোদরার ছোট বোন শুভা আল মাহমুদকে লালমোহন পাঠাগারের খোঁজ দেন৷ এই পাঠাগারটি আল মাহমুদের জীবনের সত্যিকার শিক্ষা, গবেষণা ও অনুসন্ধিত্‍সা স্বভাব এবং রুচি নির্মাণে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিলো৷ লালমোহন পাঠাগারটি ছিলো মূলত তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির একটি পাঠকেন্দ্র৷ শহরের প্রগতিশীল চিন্তাধারার লোকেরা এই পাঠাগারে এসে ভাব বিনিময় করত৷ আবার মার্কসবাদী আন্দোলনও পরিচালিত হত এখান থেকেই৷ এই পাঠাগারেই আল মাহমুদ কিশোর বয়সেই পড়েন ছোটদের রাজনীতি, ছোটদের অর্থনীতি, ইতিহাসের ধারা ও ডারউইনের বিবর্তনবাদ বিষয়ক বইগুলি৷ এই লাইব্রেরিই আল মাহমুদকে সচেতনভাবে রাজনীতি তথা মার্কসবাদের দিকে নিয়ে যায়৷ ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা রক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে ভাষা কমিটি গঠিত হয়েছিল সেই কমিটির অনেকেই ছিলেন লালমোহন পাঠাগারের সদস্য৷ আর সেই সূত্র ধরেই ভাষা কমিটির লিফলেটে তাঁর চার লাইন কবিতা উদ্ধৃত হয়েছিল৷

তিরিশোত্তর বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন৷ ১৯৫৪ সালে ঢাকা আগমনের পূর্বেই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো কলকাতার সাহিত্য, চতুষ্কোণ, চতুরঙ্গ, ময়ুখ ও কৃত্তিবাসে৷ সেই সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে৷ কবি আল মাহমুদের কবিজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে একটি চিঠি৷ কলকাতার রাসবিহারী এভিন্যুর কবিতাভবনের স্মৃতিচিহ্ন আঁকা শাদা পোস্টকার্ডটির প্রেরক ছিলেন কবিতা পত্রিকার সম্পাদক কবি বুদ্ধদেব বসু৷ কবিতা পত্রিকার জন্য আল মাহমুদ তিনটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন তারই প্রাপ্তি সংবাদ জানিয়েছিলেন বুদ্ধদেব এভাবে- "প্রীতিভাজনেষু, তোমার একটি বা দু'টি কবিতা ছাপা যাবে বলে মনে হচ্ছে৷" একটি মাত্র বাক্য৷ কিন্তু ১৯৫৫ সালে বাংলাভাষার একজন নবীন কবির জন্য এটি ছিলো অসাধারণ প্রেরণা ও স্বীকৃতির বিষয়৷ যেন এক দৈববাণী৷ পরবর্তীতে চৈত্র সংখ্যায় আল মাহমুদের তিনটি কবিতাই ছাপা হয়েছিলো৷ একই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিলো শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, ওমর আলী, শহীদ কাদরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ, পঞ্চাশের শক্তিমান কবিদের কবিতা৷ এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আল মাহমুদকে৷ বাংলা কবিতার ভাঁড়ারে আল মাহমুদ একের পর এক যুক্ত করে গেছেন, যাচ্ছেন অজস্র সোনালি শস্য, সাফল্যের পালক৷ আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি তিরিশ দশকীয় প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীন দৃশ্যপট, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের কর্মমুখর জীবন চাঞ্চল্য ও নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহের বিষয়কে অলম্বন করেন৷ আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের সুন্দর প্রয়োগে আল মাহমুদ কাব্যরসিকদের মধ্যে নতুন পুলক সৃষ্টি করেন৷ সমালোচকগন তাঁকে জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দ দাশ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রধারার এক নতুন কবিপ্রতিভা বলে উল্লেখ করতে থাকেন৷ ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর এবং ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্য কালের কলস৷ এ দু'টি কাব্যের ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ নিজেকে প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ মৌলিক ও নিজস্ব ঘরানার কবি হিসেবে৷ তাঁর কবি জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে- তাঁর প্রথম গ্রন্থ লোক লোকান্তরের প্রকাশ৷ এদেশের প্রকাশকরা সেই সময় তরুণ কবিদের কবিতার বই প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন৷ তখন কয়েকজন তরুণ কবি ও সাংবাদিক নিজেদের পকেট থেকে চাঁদা দিয়ে কপোতাক্ষ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে তাঁর প্রথম গ্রন্থ লোক লোকান্তর প্রকাশ করেছিলেন৷ এটি ছিল একজন কবির জীবনে অনেক বড় প্রাপ্তি৷ তাঁর তৃতীয় কাব্য সোনালী কাবিন প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে৷ সমগ্র বাংলা কবিতার ইতিহাসে সোনালী কাবিন একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে৷ সোনালী কাবিন কাব্যে আল মাহমুদ লোকজ ও আঞ্চলিক শব্দের সমন্বয়ে উদ্ভাবন করেন এক ধরণের শব্দ জাদুময়তার৷ আমার ঘরের পাশে ফেটেছে কি কার্পাশের ফল?/ গলায় গৃঞ্জার মালা পরো বালা, প্রাণের শবরী,/ কোথায় রেখেছো বলো মহুয়ার মাটির বোতল/ নিয়ে এসো চন্দ্রালোকে তৃপ্ত হয়ে আচমন করি৷/ ব্যাধের আদিম সাজে কে বলে যে তোমাকে চিনবো না/ নিষাদ কি কোনদিন পক্ষিণীর গোত্র ভুল করে? এই শব্দ জাদুময়তার ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ তাঁর পাঠকদেরকে চমকিত করে যাচ্ছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে৷ সোনালী কাবিন আল মাহমুদকে এনে দিয়েছে তুমুল কবি খ্যাতি৷ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে পৃথিবীর সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর হৃদয়ে এই কাব্যটি সোনালি হরফে খোদাই করা আছে৷ তাঁর কবি জীবনের সফল উত্তোরণও এই কাব্য দিয়ে৷ এরপর আল মাহমুদের কবিতা একটি ভিন্ন বাঁক নেয় মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো'র ভেতর দিয়ে৷ মূলত আল মাহমুদের আদর্শগত চেতনারও পরিবর্তন হয় এসময়৷ মায়াবি পর্দা দুলে ওঠোতে তিনি মোহামেডানিজম বা ইসলামের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়েন৷ সেই চেতনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই কাব্যে৷ পরবর্তীতে প্রহরান্তের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া প্রভৃতি কাব্যেও তিনি এই চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটান৷ তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাব্য দ্বিতীয় ভাঙন৷ এই কাব্যে কবি আরো একবার নিজেকে পরিবর্তন করেছেন, ভেঙেছেন৷ এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা বিশের অধিক৷

কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব এ দেশের গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়৷ অবশ্য তাঁর সাহিত্য জীবন শুরুই হয়েছিলো গল্প দিয়ে৷ ১৯৫৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক 'সত্যযুগ' পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়৷ তারপর দীর্ঘদিন গল্প লেখায় বিরতি৷ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তীকালে দৈনিক 'গণকন্ঠ' সম্পাদনার সময় তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছিলেন৷ গল্পগুলো প্রকাশিত হলে সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেন তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ কবিই নন, অন্যতম গল্পকারও৷ এ সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর পানকৌড়ির রক্ত, কালোনৌকা, জলবেশ্যা প্রভৃতি গল্পগুলি প্রকাশ পায়৷ ১৯৭৫-এ তাঁর প্রথম ছোটগল্পের সংকলন পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয় এবং বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়৷ আল মাহমুদ গল্প লিখেছেন ধীরে সুস্থে৷ খ্যাতি ও প্রশংসা গল্প রচনার ক্ষেত্রে তাঁকে টলাতে পারে নি৷ তিনি এ পর্যন্ত যে কয়টি গল্প লিখেছেন সবই পরিকল্পিত ও সুচিন্তিত৷ গল্প হিসেবে সার্থকও বটে৷ পানকৌড়ির রক্ত'র পর তিনি সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, মযূরীর মুখ সহ প্রায় দশটি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন৷ শুধু গল্প নয়, তাঁর স্বাদু গদ্যের ভেতর দিয়ে তিনি আমাদেরকে বেশ কিছু উপন্যাসও উপহার দিয়েছেন৷ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা তাঁর উপন্যাস কাবিলের বোন ও উপমহাদেশ উপন্যাস দু'টি বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে শুধু ঋদ্ধই করেনি সংযোজনও করেছে ভিন্নমাত্রা৷ এছাড়া আল মাহমুদ তাঁর উপন্যাসের ভেতর দিয়ে ফ্রয়েডিয় যৌন চেতনাকে দিয়েছেন শিল্পরূপ৷ আল মাহমুদের উপন্যাসের সংখ্যাও বিশের অধিক৷

কবিতার ডালপালায় চড়ে বেড়াতে ভালোবাসেন আল মাহমুদ৷ কবিতার শব্দরাজি আহরণের জন্য তিনি ডুব সাঁতার দিয়েছেন বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোতে৷ শব্দের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন লোক থেকে লোকান্তরে৷ তেমনি অন্য ভাষার রূপ রস গন্ধ নিতে উড়োজাহাজের বিস্তৃত ডানায় ভর করে উড়ে বেড়িয়েছেন ফ্রান্সের ভার্সাই, প্যারিস, আমেরিকার ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, বেডফোর্ড, ওল্ডহাম, ইরানের তেহরান, ইস্পাহান, মাশহাদ, আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, বনিয়াস, সৌদি আরবের মক্কা, মদিনা, জেদ্দা ভারতসহ আরো নাম না জানা কত কত ক্ষুদ্র নগর জনপদ৷ এই ভ্রমণ, অর্জন, মনন, অভিজ্ঞতা, এইসবের সমন্বয়ে আল মাহমুদ বাংলা কবিতাকে পূর্ণ করে তুলেছেন কানায় কানায়৷

১৯৫৪ সালে যে যুবকটি রাবারের স্যান্ডেল পায়ে ঢাকায় পদার্পণ করেছিলেন কেবল কবিতাকে অবলম্বন করে, সে আজ বার্ধক্যে নুয়ে পড়া এক জ্ঞানবৃদ্ধ৷ জীবনের কত কিছুকে তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন, কত কিছু তাঁকে ফেলে রেখে চলে গেছে৷ কিন্তু কবিতাকে তিনি যেমন ফেলে দেননি তেমনি কবিতাও তাঁকে ফেলে দেয়নি৷ আল মাহমুদ আর কবিতা একই সংসারে বাস করছেন আজ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে ৷ আর সেই সংসারে আরও আছেন কবির স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগম৷ কবি দম্পতির পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা৷ বর্তমানে গুলশানে নিজ বাড়িতে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন৷

এক নজরে আল মাহমুদ

জন্ম : ১১ জুলাই, ১৯৩৬, মোল্লাবাড়ি, মৌড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া৷
পিতা : আব্দুর রব মীর৷
মা : রৌশন আরা বেগম৷
স্ত্রী : সৈয়দা নাদিরা বেগম৷
পুত্রকন্যা : পাঁচ পুত্র, তিন কন্যা৷
পেশা : অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী৷

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :
কবিতা : লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতরে নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, না কোন শূন্যতা মানি না প্রভৃতি৷
ছোটগল্প : পান কৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ুরীর মুখ প্রভৃতি৷
উপন্যাস : কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, পুরুষ সুন্দর, চেহারার চতুরঙ্গ, আগুনের মেয়ে, নিশিন্দা নারী প্রভৃতি৷
শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের কাছে৷
প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন., আল মাহমুদের প্রবন্ধ সমগ্র৷
ভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র প্রভৃতি৷
এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদ রচনাবলী৷

পুরস্কার :
বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরষ্কার (১৯৭৪), সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৭),নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক- ২০০৪ প্রভৃতি৷

লেখক : এহসান হাবীব
সূত্র : গুণীজন

Saturday, September 17, 2011

চলবার আহ্বান || আল মাহমুদ

কোথায় যে যাই কোথায় হারাই
দাঁড়াবার নেই ঠাঁই।
হাতখানি দাও একটু দাঁড়াও
স্পর্শে জাগুক প্রাণ
পথে লেগে আছে তোমার গন্ধ
শরীরের সুঘ্রাণ
ছন্দে জেগেছি গন্ধে মাতাল
চলবার আহ্বান।

Thursday, July 21, 2011

পাখির কথায় পাখা মেললাম ।। আল মাহমুদ

ভয়ের ডানায় বাতাস লেগেছে মুখে
শীতল সবুজ থরথর করে বুকে
কাঁপছে আত্মা, আত্মার পাখি এক
‘ঝাপটানি তুলে নিজের কথাই লেখ’

পাখির কথায় পাখা মেললাম নীলে
নীল এসে বুঝি আমাকেই ফেলে গিলে
নীল ছাড়া দেখি চারিদিকে কিছু নেই
তুমি ছাড়া, তুমি-তুমি পুরাতন সেই।

চির পুরাতন কিন্তু নতুন তোমার চোখের তারা
আমাকে কেবল ইশারায় করে প্রান্তরে দিশেহারা
তবুও তো আমি এখনো তোমার ছায়া
খুঁজে ফিরি আর ভাবি অলৌকিক মায়া

মুক্তির গান গাইবে এমন কবি কই এই দেশে?
কবিতার পরে কবিতাই থাকে স্বপ্নকে ভালোবেসে।

Friday, July 15, 2011

সাক্ষাৎকার : কাব্যনাটক লেখা সারা জীবনের স্বপ্ন — আল মাহমুদ

 সাক্ষাতকার নিয়েছেন : আহমদ বাসির

ষ ৭৬-এ পা দিতে যাচ্ছেন। লিখতে লিখতেই কাটিয়ে দিলেন ষাট বছর। জীবনের এই দীর্ঘ সফর কেমন কেটেছে বলে মনে হয় এখন।
—(হাসলেন) আমার কাছে ক্লান্তিকর মনে হয়নি।
ষ বাকি জীবনটা কীভাবে কাটাতে চান?
—হায়াত। এটা হলো আল্লাহর দান। কতদিন, কীভাবে লেখা আছে জানি না। যেভাবে কাটানোর রীতি রয়েছে, সেভাবেই কাটাব।
ষ আধুনিক বাংলাভাষায় কাব্যে এবং গদ্যে আপনার নিজের আবদান সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে বলি, কী বলবেন?
—আধুনিক বাংলা ভাষা তো একটা বিরাট ব্যাপার। সেখানে যত্সামান্য কাজ আমারও আছে। এটাই আমার মনে হয়।
ষ আপনি বহুবার আপনার একটি প্রবল ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। সে ইচ্ছাটি ছিল, একটি কাব্যনাটক রচনার। ইচ্ছাটি তো এখনও পূর্ণ হয়নি।
—সব তো আর হয়ে ওঠে না। চেয়েছি তো অনেক কিছু। নানারকম লেখা লিখেছি। যেগুলো লিখতে পারিনি, সেগুলো তো পারিনি। কিন্তু লেখা আমি লিখে গেছি। লেখায় ক্ষ্যান্ত দিইনি। পরিপূর্ণ না হোক, অনেক দীর্ঘ জীবন তো কাটিয়েছি লেখার সঙ্গে। নাটক ছাড়া সবকিছুই লিখেছি। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল কাব্যনাটক লেখার। এমন না যে, কাব্যনাটক লেখার টেকনিক আমি জানতাম না। জানতাম, কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠেনি।
ষ এ ব্যাপারে কি আপনার আফসোস থেকে যাচ্ছে?
—এখন আর আফসোস করে কী হবে!
ষ আপনি তো ‘কাবা শরীফ’ নিয়েও একটি দীর্ঘ কবিতা লেখার পরিকল্পনার কথা বলতেন। সে কবিতাটিও তো সম্ভবত লিখতে পারেননি।
—আমার ঠিক মনে নেই। অনেক পরিকল্পনাই তো করেছি, অনেক পরিকল্পনাই ভুলে গেছি। মনে থাকেনি।
ষ এ বছর বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে পালিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের দেড়শতম জন্মবর্ষ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আপনার বেশ কয়েকটি কবিতা আছে। সম্ভবত ‘আমি, দূরগামী’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় আপনি জমিদার রবীন্দ্রনাথকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন— ওই দাড়িঅলা সন্তের ছবি আমার ঘরে টানিয়েছে আমারই ছেলেমেয়েরা/ আহা, তারা কী করে জানবে— ওই ছবিই আমাকে অনাদায়ী খাজনার/ সর্বশেষ নোটিশের কথাই বার বার মনে পড়িয়ে দ্যায় (পঙিক্ত কটি পাঠ করার সময় আল মাহমুদ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পাঠ শেষ হলেও বেশ কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন)—কবি রবীন্দ্রনাথ ও জমিদার রবীন্দ্রনাথের এই যে পার্থক্য—এটা আপনি এখন কীভাবে অনুভব করেন?
—যেভাবেই বল না কেন, রবীন্দ্রনাথকে একটা অসাম্প্রদায়িক ভাবনা-চিন্তার আকর হিসেবে দেখা হয়েছে। বাংলার বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র রবীন্দ্রনাথে তেমন একটা নেই— এটা যেমন সত্য, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের যে একটা আন্তরিকতা ছিল, এটাও সত্য।
ষ নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর উপলক্ষে দেশে নানা আয়োজন হচ্ছে। দু’দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলনও হয়ে গেল। এ কবিতাটি সম্পর্কে আমদের কিছু বলুন।
—এটা বেশ ভালো ব্যাপার। বাংলা ভাষায় তো ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো আর কোনো কবিতা লেখা হয়নি। এটাকে একটা আকস্মিক উদঘট্টন (আলোড়ন) বলা যায়।
ষ আপনার ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘প্রকৃতি’র কথা মনে পড়ছে। ‘কতদূর এগুলো মানুষ/ কিন্তু আমি ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে/ আজও উবু হয়ে আছি...।’
—এ কবিতাটি সবাই পছন্দ করে। কবিতাটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ কবিতার জন্য আমি অনেক প্রশংসা পেয়েছি। কবিতাটি আমারও প্রিয়।
ষ ‘কাক ও কোকিল’ কবিতায় আপনি কোকিলের যে হৃদয়বেদনা তুলে ধরেছেন—একবার এক শহুরে কাকের দলে/ মিশে গিয়েছিল গানের কোকিল পাখি... (কবিতাটি শুনতে শুনতে আবেগে আবারও কেঁদে উঠলেন আল মাহমুদ) এ কবিতাটি পড়ে মনে হয় আধুনিক বিশ্বের কোনো নগরীতেই প্রকৃত শিল্পী-হৃদয়ের ঠাঁই মেলে না...
—তাই তো, কোথায় মেলে। কোকিল যদি নগরেই থাকতে চায়, তাহলে তাকে নানান কম্প্রোমাইজ করতে হয়।
ষ এবার আপনার ছোটগল্প প্রসঙ্গে...। আমাদের কাছে তো এখনও বিস্ময়কর মনে হয় পানকৌড়ির রক্ত, জলবেশ্যা, কালো নৌকা এমনকি পরবর্তীকালের নিশি বিড়ালীর আর্তস্বর ধরনের আরও কোনো কোনো গল্প। এরকম সব ছোটগল্প রচনার প্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?
—বয়স কম ছিল তো তখন, প্রেরণার কোনো অভাব হতো না। (কিছুক্ষণ থেমে) দুই খণ্ডে আমার সব ছোটগল্প বের হয়েছে। দেখেছো নাকি?
ষ দেখেছি, বাসায় ঢুকেই ও দুটোর ওপর চোখ পড়েছে কিন্তু গ্লাসের বাইরে থেকে। হাতে নিয়ে দেখতে পারিনি। সংগ্রহ করব।
—ওরা বেশ সুন্দর করে বের করেছে, অনন্যা।
ষ সম্ভবত ২০০০ সালে বেরিয়েছে দুই খণ্ডে আপনার উপন্যাস সমগ্র। এরপরও অনেকগুলো উপন্যাস লিখেছেন। আপনার উপন্যাসগুলোর মধ্যে কোনটি কিংবা কোনগুলো আপনার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
—উপন্যাস তো কম লিখিনি। এ মুহূর্তে ঠিক সেভাবে বলতে পারব না। তবে কাবিলের বোন, উপমহাদেশ এগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এবং সে সময়ের বাস্তবতা যতদূর সম্ভব এ দু’টি উপন্যাসে পাওয়া যাবে। ‘আগুনের মেয়ে’ কিংবা এরকম আরও কিছু উপন্যাস আমি লিখেছি সেগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ষ আপনার অনবদ্য সব ছড়া নিয়ে কিছু বলুন। আপনি তো ছড়াকে কবিতা থেকে কখনও আলাদা করে দেখেননি।
—না, দেখিনি। ছড়া তো কবিতাই। আমার একটা ছড়াসমগ্রও বের হয়েছে। সব মিলিয়ে ছড়াও আমি কম লিখিনি।
ষ এবার আপনার যাপিত জীবন সম্পর্কে একটু বলুন। জীবনে কোন সময়টা বেশ সুখে কাটিয়েছেন।
—নিরবচ্ছিন্ন সুখ বলে কোনো সময় কিছু ছিল না। সারা জীবন পরিশ্রম করতে হয়েছে।
ষ আপনার জীবনে তো বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছিল...
—বিশ্বাসের পরিবর্তন কথাটা ঠিক নয়। এটার নানা বিবর্তন ঘটেছে। এক সময় প্রগতিবাদে খুব আকৃষ্ট হয়েছিলাম।
ষ সে সময় আপনার কোনো কোনো কাব্য পঙিক্ততে অবিশ্বাসের ছায়াপাতও ঘটেছিল মনে হয়। সোনালি কাবিনের একটি সনেটে লিখেছিলেন—‘মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস’।
—অবিশ্বাসের ছায়াপাত ঘটেছিল—কথাটা প্রায় তাই। কথাটা সত্যি। তখনকার বয়স কম ছিল তো। চিন্তা এতটা সুগঠিত ছিল না। (হাসলেন) তবে যাকে বলে ‘কাট নাস্তিক’—এটা আমি কোনো কালেই ছিলাম না।
ষ আপনি তো কয়েকটি ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন। কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাতসমুদ্র, কবি-শিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস।
—হ্যাঁ, পৃথিবীর অনেক দেশে আল্লাহর রহমতে আমর ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে কবিতার দেশ বলে যেসব দেশ পরিচিত, সেসব দেশ আমি ভ্রমণ করেছি। সেগুলোরই কিছু কিছু লিখেছি।
ষ আপনার সমসাময়িকদের অনেকের নামই এক সময় আপনার চেয়ে বেশি উচ্চারিত হতো। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল অনেকেই হারিয়ে গেছেন। আপনিও অনেক সময় তাদের অনেকের লেখনী-ক্ষমতার কথা বলেছেন। এমনটা কেন হলো?
—মানুষ ভাগ্যে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এখানে ভাগ্যকে মানতে হয়। একটা কথা আছে না—‘জীবন থাকলে পরাজিত হতে হয়’ এটা আমরা মানিনি। মানিনি বলেই হয়তো এতদূর এসেছি।
ষ আপনি তো সঙ্গীতের শহরে বেড়ে উঠেছেন। আপনার সাঙ্গীতিক অভিজ্ঞতা কিছু ঘটেছিল?
—আসলে মানুষ হিসেবে আমার বেড়ে ওঠা সঙ্গীতে। আমাদের শহরটা শুধু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্য না, ওই ঘরানার প্রায় সবাই ছিলেন বাদ্যযন্ত্রবিদ। এঁরা বাজাতেন, তৈরি করতেন, বিক্রি করতেন, সাপ্লাই করতেন। এ উপমহাদেশে এ ধরনের ঘটনা খুবই কম। আমার আসা-যাওয়ার রাস্তায় পড়ত আলাউদ্দিন খাঁর বাড়ি। ওই পরিবারের রাজা হোসেন খান ছিল আমার ক্লাসের বন্ধু। ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানকে খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি। এত বড় ওস্তাদ উপমহাদেশে খুব কমই দেখা গেছে।
ষ আপনার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র কোনটি?
—সারাজীবন সেতারই আমার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ছিল।
ষ তো, এই সঙ্গীতের পরিবেশ থেকে সাহিত্যে এলেন কীভাবে?
—অল্প বয়সে বিস্তর সাহিত্য পড়েছি তো। সাহিত্যের প্রভাবটাই আমার মধ্যে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কবি হতে চেয়েছি, কবিই হয়েছি।
ষ সারাজীবন তো কলমের সঙ্গে কাটালেন। বেশ কিছু দিন ধরে কলম হাতে আর লিখতে পারছেন না। কবিতার পঙিক্ত নিশ্চয়ই এখনও বিদ্যুত্ তরঙ্গের মতো জেগে ওঠে আপনার মধ্যে। তখন কী করেন?
—একটা বিশেষ সময় আসে সব লেখকেরই। তিনি আর লিখতে পারেন না। আমি হাতে লিখতে না পারলেও নিয়মিতভাবে আমার সংবাদপত্রের কলামগুলো ডিকটেশন দিয়ে লিখে যাচ্ছি। যতদিন পারি, এভাবেই লিখে যাব। (কথা বলতে বলতে মনে হলো কবি ক্লান্তি অনুভব করছেন। আমরা ক্ষ্যান্ত দেয়ার কথা ভাবলাম।)
ষ এই বয়সে বর্তমান নাজুক শারীরিক অবস্থায়ও আপনি যে আমাদের এত সময় দিলেন, এ জন্য আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
—ধন্যবাদ তোমাদেরও। 

সূত্র : আমার দেশ

আল মাহমুদের কবিতায় রঙ ।। ড. ফজলুল হক সৈকত

রঙ নিয়ে খেলা শিল্পীর কাজ। ক্যানভাসে নানান রঙে তিনি আঁকেন জীবনের বলা-না বলা গল্প আর কল্পনায় ভিড় করা সমূহ যন্ত্রণা ও আনন্দবোধ। রঙে আঁকা ছবিতে কখনও কখনও আশ্রয় নেয় কবিতার সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্য। আবার কোনো কোনো কবিতাও ধারণ করে রঙ-ছাপা বিপুল পরিসর। আর এভাবেই আমরা কবিকেও খুঁজতে থাকি রঙতুলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পীর আদলে। বাংলাদেশের, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের (জন্ম ১১ জুলাই, ১৯৩৬) কবিতা পড়তে পড়তে এমনই এক শিল্পীর চেহারা পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন পর্দার বুকজুড়ে।
আল মাহমুদের কবিতার রঙচঙ কিংবা রঙচঙে কবিতা আমাদের নতুন করে যেন পাঠকের কাতারে সারিবদ্ধ করে। আমরা মুগ্ধচোখে দেখতে থাকি ‘সূর্যের আহ্নিক রঙে পাঠকের কাতারে সারিবদ্ধ করে,’ আমরা মুগ্ধচোখে দেখতে থাকি ‘সূর্যের আহ্নিক রঙে প্রতিদিন জ্বলে তার চুল,’ জমাট চুলের রঙ।
তিনি যখন সাজাতে থাকেন শব্দের কথামালা, তখন বারবার তাঁর ভাবনার পাথর ভেঙে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে রঙ-বেরঙ চিন্তাসুতো। কখনও কখনও নির্জন পটের মধ্যে রঙের বেশ ধরে প্রবেশ করে অচেনা কোনো ভয়ঙ্কর পোকামাকড়। মাহমুদের কবিতা—শাড়ি-পরা কোনো রমণীয় কবিতা গায়ে রঙ মাখে, কাটা সুপারির রঙ, পা সবুজ, নখ তীব্র লাল / যেন তার তন্ত্রে-মন্ত্রে ভরে আছে চন্দনের ডাল।’ তিনি কবিতার চোখ দিয়ে দেখেন ‘বর্ণালী মাকড়,’ ‘কালো ভুরুর টান,’ ‘ঘোলাটে রঙের জিভ,’ কিংবা ‘চৈনিক কালির মতো উপচানো/ পিচ্ছিল আঁধার।’ বর্ণহীন নির্বিরোধ কবি আল মাহমুদ, কতক সময় বুঝতেই যেন পারেন না, কী করে রঙিন হলো—রঙিন পোশাক, রঙিন বাসনা, ‘প্রাণের রঙের মতো পরাজিত প্রেমের কেতন’, ‘কৃষ্ণে ধবলে সবল দু’খানি পাখা’ আল মাহমুদের কবিতায় ঢালতে থাকে মৃদু গাঢ় বাতাস। আর রাত্রির গভীর অন্ধকারে সন্ত্রস্ত ‘কোনো নারী কোনোদিন তার তরে মাখেনি কাজল’। স্থির কালো টানা চোখের আভায় ‘কুকুর-বিড়াল কালো ছাগ’, ‘কালো ভুরুর টান’ চিবুকের পাশে ঠেসে-থাকা ‘কালো তিল’ ‘চৈনিক কালির’ পিচ্ছিল আঁধার, ‘কালো করুণ কাফন ঢাকা’ চোখে গভীর ‘সুর্মা’ আর ‘কালো মাটির’ অতলতা তাঁর কবিতায় লেপতে থাকে কালোর কঠিন মমতা। আর শক্ত হতে থাকে তাঁর কবিতার নরম মেটেল ভিত। অসহ্য গরমে ‘গাত্রবর্ণ কালো’ হওয়া কবি আল মাহমুদ ‘কাজল ভিজিয়ে’ নামেন ‘কালিময় নয়নের’ নদীতে। ‘ভুরুর নিচে জমানো ঝুলকালি’র হালকা জমিনে বুনতে থাকেন ‘গভীর কালো চোখের’ ‘কিছু কালো চিহ্ন’—
তুমি আমার একটি থোকা কালো আঙুর
সারা শরীর জড়িয়ে আছি লতা গাছি,
তোমার দেহে মনে আমার বেহায়া সুর
আমি ভ্রমর আমি তোমার কালো মাছি।

তুমি আমার তিতাস, কালো জলের ধারা
পানকৌড়ি আমি, আমি পানির ফেনা,
ডুব-সাঁতারে নিত্যকালের এই চেহারা
তুমি আমার কালো শালুক, চিরচেনা।

কালো মাটির কালো পুতুল তুমি আমার
সোঁদা মাটির গন্ধ হয়ে লুকোই গায়ে
আমি তোমার নীলাম্বরী শাড়ির দু’পাড়
বক্ষ ঘিরে জড়িয়ে থাকি লুটোই পায়ে।
তুমি আমার রাত্রি, আমার অমানিশা
আমি তোমার ছোট্ট কালো জোনাক পোকা,
এই তো আলো, এই তো কালো, নেই যে দিশা
আমি তোমার রুদ্ধদ্বারে একটি টোকা
(বেহায়া সুর : কালের কলস)

কবির সজাগ কালো দৃষ্টিতে ভেসে-ওঠা ‘কালো চুলের ঢেউ’ ‘রহস্যের ময়লা কালো জলে’ কিংবা খেতের আড়ালে ভিড়-করা ‘কালো মানুষের ধারা’য় অদৃশ্য হয় ক্রমাগত। কবি তখন ‘মহাকালের কালোর চেয়ে কালো’ ‘কালো লেখা’ লিখে কালো বুকের পশমে সাহস সঞ্চয় করতে থাকেন নতুন কোনো কালো ক্যানভাস দেখার প্রবল প্রত্যাশায়। এ প্রত্যাশা কিংবা প্রতীক্ষা কার জন্যে? আল মাহমুদের প্রতীক্ষার পথে দাঁড়িয়ে থাকা এক কালো বিড়ালের ছবি ‘সান্ত্রির সজাগ চোখ, তাক করা বন্দুকের মাছি / পার হয়ে চলে আসে এক বিড়ালিনী রোজ;/ দু’চোখ ঘুরিয়ে দেখে, আমি তারি প্রতীক্ষায় আছি।’ (কবি ও কালো বিড়ালিনী—১ : মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো) ‘কালো রোমের পালিশে’ কবি যেন খুঁজতে থাকেন আরও গভীর কোনো কালোশিল্প—

কবরের কাছে একটা কালো গাছের দিকে চোখ পড়তেই
আমার স্মৃতির ওপর বিদ্যুত্ বইল।
হ্যাঁ, পঁচাত্তরের এক চিত্র প্রদর্শনীতে এই শেয়ালটাকে
আমি দেখেছিলাম,
কামরুলের কালোশিল্পের মধ্যে এই ধূর্ত লেজ উঁচিয়েছিল;
সেই কুটিল চোখ আর লোভাতুর মুখচ্ছবি আমার চেনা।
আমি ফররুখের কবর পেছনে রেখে,
একটা কালো শেয়ালকে তাড়াতে তাড়াতে
বাংলাদেশের মানচিত্রের উপর দিয়ে
আমার কাফন নিয়ে দৌড়াতে লাগলাম।
(ফররুখের কবরে কালো শেয়াল; ওই)

‘আকাশের রঙ’ বিশালতা আর উদারতা প্রতীকী আমেজে ও উত্সাহে পাখা মেলে কবিদের ভাবনা সুতোয়। আর তখন কবিতার শরীরে লাগতে থাকে আকাশ-আকাশ বাতাস। আকাশের রঙ কি নীল না আকাশী? এ প্রশ্নও বোধ হয় কতকটা প্রাসঙ্গিক। যেমন কেউ বলেন নীল আকাশ। আবার কেউ বলেন আসমানি রঙ। হালকা নীলকে কি আকাশী বলে? যাই হোক, আমরা অন্তত নীল আর আকাশীকে আলাদা করে না দেখে এক প্লাটফরমে রেখে দেখার চেষ্টা করি। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় আকাশের প্রসন্নতাকে ধারণ করেন নীলের তাত্পর্যে। লেখেন, ‘তুমি এসো, কোমরে পেঁচিয়ে নীল শাড়ি / দুঃখের ঘরকে করো শোকোত্তীর্ণ প্রাণের বাগান।’ কষ্টের ‘নীল তরল আঙুল’ কাঁপতে থাকা, কিংবা লাউয়ের মাচায় ঝুলতে থাকা ‘সিক্তনীল শাড়ির নিশেন’ তাঁর কবিতাকে নিয়ে যায় চেতনার নিবিড় অন্তর্লোকে। ব্যক্তিক উল্লাস আর পাখির স্বাধীনতার নীল নীল অনুভূতি, উদ্ভিদহীন-পত্রহীন, হাহাকারে ভরা দগ্ধদেশে, গরম বাতাসের অন্তরালে ‘ভীষণ নীল’ জেগে থাকা, আর কোনো কবির মাতৃভূমিকে নীল পোশাকে মুড়িয়ে রাখার দারুণ আবেগ আল মাহমুদের কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় গভীর মমতায়।
বিবর্ণতা, বিষণ্নতার রঙ হলুদ। ঝরে পড়া কিংবা দিনশেষের গন্ধ মেখে এ রঙ হাজির থাকে মানুষের চিন্তায়, বাস্তবতার অলিগলিতে আর কবির প্রিয় খাতায়। যেন ‘রাতের হলদে পাতা ঝরে যায় শীতের গতিতে!’ এইভাবে আল মাহমুদ তাঁর কবিতাযাত্রায় সঙ্গী করেন হলুদ রঙকে। হলুদ লাল ফুলের মিশ্র চেতনা যেমন তাঁর কবিতাবুননে প্রেরণা জোগায়, তেমনি হলুদ পাতা আশা জাগায় পুরনোর বিদায়ের স্রোতে নতুনের আগমনের এমন সব দারুণ চিন্তা আর আবেগের হাত ধরে হাঁটতে থাকে আল মাহমুদের রঙের কবিতা কিংবা দাগ কাটতে থাকে কবিতায় রঙ। রঙের ফারাক তিনি বোঝেন। রঙের আবেগ আনন্দ বেদনা জাগানোর শক্তি তিনি জানেন। ‘হাওয়ায় হলুদ পাতা বৃষ্টিহীন মাটিতে প্রান্তরে / শব্দ করে ঝরে’ যাওয়ার অর্থ তাঁর কানে বাজে প্রতিনিয়ত। পিঠার মতো হলুদমাখা চাঁদ, প্রাতরাশের হলদেটে টাটকিনি মাছ, নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখি সারি সারি দাঁড়াতে থাকে কবির কবিতায়। আর তিনি দেখতে থাকেন মুগ্ধের মতো চারদিকে জেগে থাকা প্রবল হলুদ চোখ—

দামি কার্পেটে পা ডুবিয়ে আমি ঘরের আসবাবপত্র দেখতে থাকলাম।
দারুশিল্পের এক অতীত জগতে এসে পড়েছি। আমার চারদিকে
মেহগনির আসনের ওপর রেশমের গদি। দেয়ালের একটি বিশাল দারুচিত্রে
নগরনটী কমলা অভয়মুদ্রায় নৃত্যপরা। দেয়ালের অন্য পাশে
হরিণের চারটি মাথা।
মৃত হরিণেরা তাদের চারজোড়া পোখরাজের হলুদ চোখে
আমাকে দেখছে।
(চক্রবতী রাজার অট্টহাসি : মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)

লাল বেদনার প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক। সংগ্রাম, যুদ্ধ আর ভয়াবহতাও আশ্রয় করে লাল রঙকে। লালে আছে প্রত্যয় আর নতুন আবাহনের হাতছানি। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় ‘হৃদয় নিংড়ে লাল তরল’ ঢেলে দিয়েছেন উজাড় করে। ‘যখন জীবনে শুধু অর্থহীন লাল হরতন’ খেলা করে কিংবা ‘নখ তীব্র লাল’ হয়ে ওঠে তখন আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় যোগ করেন ধেয়ে চলার প্রেরণা। তিনি লিখতে থাকেন—

মোড়টা পেরিয়ে গিয়ে তুলে দেয়া হবে লাল পাল
ঢেউ ছিঁড়ে ছুটে যাব, নৌকা হবে গতিতে মাতাল;
বাতাসে ঘুমের গন্ধে চোখ দুটি যদি ভরে আসে
তখন মাঝির গানে কে কাঁদবে তরল তিতাসে!
(নৌকোয় : লোক-লোকান্তর)

যাপিত জীবনের ভয়াবহতা, অনগ্রসরতা, প্রতিবন্ধকতা আর যন্ত্রণার দগদগে দাগ কবি যখন প্রকাশ করতে চান শব্দের মৃদু মোড়কে, তখন তিনি ‘অতি লাল পিণ্ডের প্রসাদ’ চোখের সামনে ভাসতে দেখেন। তাঁর শিরায়-ধমনীতে কাঁপতে থাকে রক্তের প্রবল স্রোত। ভাবতে থাকেন—লেপ্টানো মাংস আর বিবর্ণ কলজের কাতারে টাঙানো থাকবে এই দীপ্ত লাল হালাল বিষয় ‘লালচক্ষু’ গায়ক পাখির জন্য কবির আর্তনাদ ভাসে বাতাসে বাতাসে। নদীর অচল পানি যেন ‘আলতা রঙে’ লালে লাল হয়ে ওঠে। প্রেয়সীর ‘কপালে লাল’ টিপ আঁকেন তিনি। স্বপ্ন বুনতে থাকেন বুকের গভীরে। প্রত্যাশা আর স্বপ্নে শিহরিত হন কবি—

লাল সূর্য উঠে আসবে। পরাজিতের মতো আমার মুখের ওপর রোদ
নামবে, সামনে দেখবো পরিচিত নদী। ছড়ানো ছিটানো
ঘরবাড়ি, গ্রাম। জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। তারপর
দারুণ ভয়ের মতো বসে উঠবে আমাদের আটচালা।
কলার ছোট বাগান।
(প্রত্যাবর্তনের লজ্জা : সোনালি কাবিন)

‘পা সবুজ’ ‘রূপোলি নদীর জলে’ ভিজাতে ভিজাতে আর ‘সোনালি দোলকের মতো’ আশায় ভোলাতে ভোলাতে আল মাহমুদ কবিতা পাঠকের মগজ দরোজায় নির্মাণ করেন ‘সবুজে বিস্তীর্ণ দুঃখের সাম্রাজ্য’। হয়তো তাঁর কবিতার বিষয়-আশয় চিন্তার চিকন সুতো মানবতা মানবতা খেলার ছুতোয় ‘সবুজ পাহাড়ে একদিন ফিরে আসে’ কিন্তু পেছনে পড়ে থাকে ‘সবুজ জলের নূপুর’ আর মহত্ কোনো কারুশিল্পীর আঁকা ‘সবুজ সকাল’। কষ্টে থাকা একজন মানুষ, অসুখে আক্রান্ত সুখ-প্রত্যাশী কোনো কবিতা কারিগর হয়তো কখনও কখনও সম্ভ্রম ভাবনায় থাকেন ব্যাকুল। আল মাহমুদ তাঁর সেই চেতনাকে সাজান কবিতার গল্পে। তুলে আনেন সেই বেদনা কাতর মানুষটির ভেতরের বেদনার বহুধা বিস্তীর্ণ পোশাক-আশাক। আর আমাদের দাঁড় করান শিল্প-আদালতের নতুন কোনো কাঠগড়ায়—
কণ্ঠ উঁচু হয়ে আছে, গালে গর্ত, চোখ দুটি স্থির।
এক পক্ষকাল ধরে বার বার ব্যথায় ওষুধে
জানতে যে চেয়েছিলো আত্মহত্যা কী কারণে পাপ।
এইতো আশ্বিন আজ। একটুখানি আলো কিংবা বাতাস পেয়েই
সবুজ সম্ভ্রমটুকু টেনে ধরলো বুকের ওপর।
(অসুখে একজন : কালের কলস)

‘সবুজ পাতায়’ পেতে-রাখা অবুঝ কোনো ভালোলাগা পর্ব, আর মালার মতো জড়িয়ে পড়া ‘সবুজ শাড়ির জীর্ণতা’ অথবা পাগলের খুঁজতে থাকা ‘সবুজের অন্তরাল’ কবি আল মাহমুদকে ভাবিয়ে রাখে অনুক্ষণ। তিনি কৃষ্ণচূড়ার পাতায় মাথা গুঁজে শুষতে থাকেন জীবনের না-পাওয়া সব অর্থ, ‘সবুজ কুঁড়ি’র বেড়ে-ওঠা তাঁকে মোহিত করে, আচ্ছন্ন করে। কখনও কখনও যেন তাঁর চোখের পাতায় ‘আতঙ্কে লাফিয়ে উঠছে সবুজ ফড়িং’। পাখির ডাকের মতো অন্তর্হিত হয়ে যাওয়া অমলিন গভীর সবুজে আড়াল পড়া ‘ধানের সবুজ’ কবিকে ফের বাঁচতে শেখায়। শস্যের সবুজ থেকে ক্রমাগত উঠে এসে গোস্যার গোঙানি তাঁর চেতন-শরীরে নির্মম চাবুক মারে। তিনি তাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন— ‘প্রেমকেও ভেদ করে সর্বভেদী সবুজের মূল’। আর সবুজ সবুজ রাজপথ, সবুজ সবুজ দারুণ জমিন শকুন-চোখের অন্তরালে বানাতে থাকে নিবিড় নিবাস। আল মাহমুদের চিন্তার সবুজতা—
চঞ্চুর সবুজ লতা রাজপথে হারিয়ে এসেছো।
অথচ পাওনি কিছু না ছায়া না পল্লবের ঘ্রাণ
কেবল দেখেছো শুধু কোকিলের ছদ্মবেশে সেজে
পাতার প্রতীক আঁকা কাইয়ুমের প্রচ্ছদের নিচে
নোংরা পালক ফেলে পৌর-ভাগাড়ে ওড়ে নগর শকুন।
(খড়ের গম্বুজ : সোনালি কাবিন)
আপাতভাবে মনে হবে, রঙ নিয়ে খেলা কবির কাজ নয়, চিত্রশিল্পীর কাজ। কিন্তু কবিতায় যখন কবি তৈরি করেন নানান রকম ছবি আর গল্পের ক্যানভাস, তখন রঙ-প্রয়োগে কবির সামর্থ্যের বিষয়-আশয় সামনে এসে পড়ে। কবিতায় থাকে ছবি, ছবিতে থাকে রঙ, আবার ছবিতেও থাকে কবিতার কত না বলা কথা— এভাবেই অনিবার্যরূপে কবিতা আর চিত্রের মধ্যে নির্মিত হয় এক অকৃত্রিম নিবিড় সেতু। আল মাহমুদের কবিতা পড়তে পড়তে তাঁর রঙ-প্রয়োগচাতুর্য আমাদের নজরে আসে। তখন তাঁর কবিতা ছবির মতো দুলতে থাকে আমাদের চোখের সামনে। আর আমরা পেতে থাকি দৃষ্টি-তৃপ্তির আনন্দ।

Tuesday, March 1, 2011

পাখির কথায় পাখা মেললাম :: আল মাহমুদ

ভয়ের ডানায় বাতাস লেগেছে মুখে
শীতল সবুজ থরথর করে বুকে
কাঁপছে আত্মা, আত্মার পাখি এক
‘ঝাপটানি তুলে নিজের কথাই লেখ’

পাখির কথায় পাখা মেললাম নীলে
নীল এসে বুঝি আমাকেই ফেলে গিলে
নীল ছাড়া দেখি চারিদিকে কিছু নেই
তুমি ছাড়া, তুমি-তুমি পুরাতন সেই। চির পুরাতন কিন্তু নতুন তোমার চোখের তারা
আমাকে কেবল ইশারায় করে প্রান্তরে দিশেহারা
তবুও তো আমি এখনো তোমার ছায়া
খুঁজে ফিরি আর ভাবি অলৌকিক মায়া

মুক্তির গান গাইবে এমন কবি কই এই দেশে?
কবিতার পরে কবিতাই থাকে স্বপ্নকে ভালোবেসে।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ