প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label সাক্ষাৎকার. Show all posts
Showing posts with label সাক্ষাৎকার. Show all posts

Tuesday, July 31, 2012

বাংলাভাষা বাংলাদেশেরই আত্মা, কলকাতায় সব হিন্দি আর ইংরেজি : আল মাহমুদ (সাক্ষাৎকার)

# ৭৭-এ পা দিচ্ছেন, কেমন বাংলাদেশ আপনি দেখতে চান?
— স্বাধীন, সার্বভৌম, শান্তিময় বাংলাদেশ দেখতে চাই, সুখী বাংলাদেশ।
# আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবের বাংলাদেশের মধ্যে ফারাকটা কতখানি?
— বেশ ফারাক আছে। কারণ কবি যে কল্পনা করে, আমরা একটু বেশি আশা করি, সে রকম তো আর হয় না, আমরা যা আশা করি। তবু পায়ের নিচের মাটিটা তো বাংলাদেশ। তাই না? এক ভালোবাসার টান।
# একটা রক্তের প্লাবনের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আপনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলেন আমরা জানি। সে সময়কার অনুভূতি সম্পর্কে কিছু বলেন।
— স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমরা প্রকাশ্যে ছিলাম না, কিন্তু আশপাশে ছিলাম, তাদের সঙ্গেই।
# এবং তারও আগে থেকেই বাংলাদেশের সত্তা যখন গঠিত হচ্ছিল, আপনার বিভিন্ন লেখার মধ্যে এসেছে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এসেছে, ভাষা আন্দোলন এসেছে। বাংলাদেশের মাটিকে, এদেশের জলকে, হাওয়াকে, লোকজ জীবনকে তুলে এনেছেন—এসবের পেছনে আপনার কী দর্শনটা কাজ করেছিল?
— বাংলার মাটি! একটা কথা আছে না—‘বাংলার মাটি বাংলার জল/পুণ্য হউক পুণ্য হউক...’ এই।
# কবিতা ও নারী—কে বেশি রহস্যময়ী?
— সন্দেহ নেই, এ দু’জনের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্ব নেই, কারণ কবিরা যেখানে শুতে যায় সেই জায়গাটার একদিকে নারী, আরেক দিকে বই থাকে। এই দুটোকে সরিয়ে কবিকে বিশ্রাম নিতে হয়। আশা করি কথাটা বুঝেছ।
# আপনি তো একজন ঘোরতর আস্তিক মানুষ। এই বিশ্বাস, এই রহস্যময়তা আপনার বিপুল রচনাসম্ভারে নানা মাত্রিকতায়, নানা অবয়বে প্রতিফলিত। এই মরমিয়াবাদ সম্পর্কে পাঠকদের কিছু বলুন।
— আমি বিশ্বাসী। বিশ্বাসী মানুষ কী করে? বিশ্বাসী মানুষ সবসময় একটা কাজ করে। সেটা কী করে? সে সেজদা করে অদৃশ্যের দিকে এবং সে প্রার্থনা করে, অ্যান্ড হি প্রেজ, প্রার্থনা করতে থাকে। এটা আমার একটা ধারণা। ধারণা কী? এটা সত্য।
# আপনার লেখালেখির শুরুটা কেমন করে হয়েছে?
— আমি মফস্বল শহরে থাকতাম। খুব পড়তাম আমি। পড়তে পড়তে একদিন মনে হলো—আচ্ছা, আমিও তো এরকম লিখতে পারি। লেখা শুরু করলাম। আশ্চর্য যে, আমার লেখা তখন এদেশের শ্রেষ্ঠ কাগজগুলো খুবই অনায়াসে ছেপে দিল।
# সেটা তো বিস্ময়কর!
— আমার কাছেও বিস্ময়কর!
# এখনও?
— এখনও লাগে।
# আপনার জীবনে এমন কোনো স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা আছে কী, যেটা এখনও পূর্ণ হয়নি?
— এটা তো তুমি একটা খুব জটিল প্রশ্ন করলে। আমি তো পূর্ণতা এবং অপূর্ণতার মধ্যে বাস করি। কিছু পাই, কিছু পাই না। এই হাতড়ে বেড়াই। এটা হলো জীবন।
# ‘লোক লোকান্তর’ থেকে ‘পাখির কথায় পাখা মেললাম’ এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আপনার যে বাঁকবদলগুলো হয়েছে, তার পেছনে কোন ফ্যাক্টরগুলো কাজ করেছে বলে আপনি মনে করেন?
— আমার জীবনই একটা আশ্চর্য জীবন। কত ঘাটে ভিড়তে হয়েছে। কত কিছু দেখলাম, জানলাম। সবকিছুর মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে, দেশে যা কিছু ঘটেছে। আমি তো এদেশ থেকে পালিয়ে যাইনি। আমি দেশে থেকে দেশের সব কিছুতে অংশগ্রহণ করেছি, দেখেছি, মুভ করেছি এবং আরেকটা কী ব্যাপার—কেঁদেছি। আই ওয়েপ্ট।
# নানা ধরনের লেখা আপনি লেখেন। কথাশিল্প, কলাম, কবিতা, আত্মজৈবনিক—কোন শাখায় লিখতে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কেন?
— আসলে ওই অতীত নিয়ে লিখতে ভালোই লাগে। কিন্তু অতীত বেশিদিন দেখা যায় না। আমি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে লিখতে চেষ্টা করি। কিন্তু বর্তমানটা যে এতই বাস্তব এবং এতই রূঢ় যে, এর মধ্যে বসবাস করতে হলে সাহস, শক্তি এবং কাব্যগুণ লাগে। সেটা মনে হয় আমারও কম-বিস্তর আছে।
# কেউ কেউ বলে, অদূর ভবিষ্যতে ‘বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হবে ঢাকা’।
— এটা কেউ কেউ নয়, আমিই বলেছি প্রথম।
# এ কথার বাস্তব ভিত্তি কতটা মজবুত হয়েছে?
— বাংলা ভাষাই বাংলাদেশের আত্মা। এই ভাষার সঙ্গে অন্য কিছুকে বাংলাদেশ মিশ্রিত করে না। এক দিগ্বিজয়ী ভাষা। শব্দের তরঙ্গ বাংলাদেশেই বইছে। বাংলাদেশ ছাড়া এটা আর কোথাও সম্ভবপর হয়নি। কলকাতা গেলে তুমি দেখবে, সব হিন্দি আর ইংরেজি।
# সেখানে বাংলা ভাষা মরে যাচ্ছে, ওরা টিকিয়ে রাখতে পারছে না।
— না, পারছে না।
# গদ্য কিংবা কবিতা লেখার পরবর্তী যে অনুভব কিংবা সাফল্যের শিহরণ—দুয়ের মধ্যে মৌল কোনো পার্থক্য আছে কি?
— আমি সব সময় ভাবি যে, আমার খাপে তো দুইটা তরবারি আছে—একটা গদ্যের, একটা পদ্যের। যখন যেটা আমার প্রয়োজন, সেটা ব্যবহার করেছি।
# তরুণ কবিদের জন্য আপনার কোনো উপদেশ আছে কি?
— কথা হলো যে, উপদেশ দেয়া আমার জন্য ঠিক না। তরুণরা ইচ্ছানুযায়ী চলবে—এটাই আমরা চাই। তবে একটা কথা বলব। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। জ্ঞান না হলে কিছুই হয় না। বলা হয় না, জ্ঞানবৃক্ষের ফল না খেলে সে তো কিছুই জানে না? জ্ঞানবৃক্ষের ফল একবার যে খেয়েছে, তাকে পৃথিবীতে আসতে হয়েছে স্বর্গ ছেড়ে। স্বর্গ থেকে তাকে বের করে দেয়া হবে, সে পৃথিবীতেই চলে আসবে। পৃথিবীতে এসে নিজের পরিশ্রমের অন্ন নিজে খাবে।
# দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পাতা প্রকৃত সাহিত্যচর্চায় কতটা অবদান রাখতে পারছে?
— আমাদের দেশে দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পৃষ্ঠা আমাদের সাহিত্যের জন্য সাহায্যকারী হয়েছে। অন্য দেশে এটা হয়নি, আমাদের দেশে হয়েছে।
# মানসম্পন্ন সাহিত্য কাগজের অভাবের কারণে হয়েছে?
— তাই, তাই তো দেখতে হবে। নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা নেই। লিটলম্যাগ আছে।
# বাংলা কবিতার ভবিষ্যত্ কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
— এটা বলা উচিত না। কারণ, আধুনিক বাংলা কবিতা হলো আধুনিক জাতীয় জীবনের একটা দৃষ্টান্ত। আধুনিক বাংলা কবিতা এতই পরিপকস্ফ এবং এতই ডালপালা মেলে দিয়েছে, যদিও গদ্যকে আমরা আধুনিক বলি, এটা অন্য কোনো সাহিত্যে ঘটেনি যে, কবিতাই বিজয়ী হয়েছে।
# সাধারণভাবে বলা হয়, বাংলাদেশে কবিতার পাঠক ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর কারণটা কী?
— আশ্চর্য কথা—বাংলাদেশে কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে। দল বেঁধে কেউ কবিতা
(৭-এর পৃষ্ঠার পর)
পড়ত নাকি? কোনো সময় পড়েনি। দলবদ্ধভাবে কাব্যচর্চা করেছে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কেউ কেউ করেছে—এরাই তো বাঁচিয়ে রাখে সব।
# আমাদের সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা বিশ্বমানের বিচারে কোন অবস্থায় আছে?
— আধুনিকতার দিক দিয়ে প্রায় জগতের সাহিত্যের সমকক্ষ। আমাদের কবিতা যদি ব্যাপক অনুবাদ হয় তাহলে বোঝা যাবে, কী আশ্চর্য কাজ হয়েছে বাংলা ভাষায়!
# স্বাধীনতার চল্লিশ বছর হয়ে গেল, অনুবাদের ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য কিন্তু সেভাবে আসেনি।
— না, অনুবাদ করার মতো লোক আসেনি। এটা ঠিকই কথা।
# বাংলা একাডেমীর একটা ভূমিকা, দায়িত্ব কি এক্ষেত্রে ছিল না?
— কার কার ভূমিকা বা দায়িত্ব ছিল এটা বলে কোনো লাভ নেই। এটা ইন্ডিভিজুয়াল কাজ। একজন লোক যদি থাকে, তাহলে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দেয়।
# কেউ যদি বলে, আপনার ইদানীং কালের লেখায় আগেকার সেই লাবণ্য ও মাধুর্য কিছুটা গরহাজির—এ অভিযোগের বিপরীতে আপনার বক্তব্য কী হবে?
— আমার পক্ষ থেকে এর কোনো জবাব নেই। তবে কী কারণে বলে, তা কিন্তু উল্লেখ করা হয় না। তারা ভ্রান্ত কিনা, নাকি আমি ভুল করছি সেটা বোঝার মতো ব্যাখ্যা হয়নি এখনও।
# বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে সমকালীন কাব্যধারা কিংবা প্রবণতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলো কী কী?
— আমি পশ্চিমবঙ্গের কবিতা সম্পর্কে কম জানি। আমার পড়া হয়ে উঠছে না। এ ব্যাপারে জ্ঞান অপেক্ষাকৃত কম আমার। কে লিখছে, কী লিখছে এটা আমি জানি না, তখন একটা আন্দাজি মন্তব্য আমি করতে পারি না। তবে একথা বলতে পারি যে, বাংলাদেশের কাব্যের শক্তি এবং ঐশ্বর্য অনেক বেশি। বিশেষ করে এর যে লোকজ গ্রাউন্ড, সেটা অনেক উর্বর বলে আমি মনে করি।
# আপনার মায়াবি কলমে শিশু-কিশোরদের জন্য বেশকিছু মূল্যবান ফসল ফলেছে। কারও কারও অভিযোগ, আপনি এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত মনোযোগ ও সময় দেননি। আত্মপক্ষ সমর্থনে আপনার বক্তব্য কী হবে?
— হয়তোবা। যারা আমার এ খুঁতটা ধরতে পেরেছে তারা আমার অনুরাগী। তাদের উচিত ছিল একটা পরামর্শ দেয়া, কিন্তু তারা তো সেটা করেননি। করা উচিত ছিল। এটা তারা যদি বলে দিতেন, তাহলে আমি সেভাবে চলতাম।
# বলা হয়, আমাদের কবিতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ কখনও নেয়া হয়নি। এই ক্ষতির জন্য কে বা কারা দায়ী?
— কেউ দায়ী নয়। ভালো ট্রান্সলেটরের অভাব— যে একই সঙ্গে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী হবে। তাদের আবির্ভাব হয়নি। এটা একটা দুর্ভাগ্য বলা যেতে পারে।
# একজন খাঁটি কবি হওয়ার ক্ষেত্রে আস্তিকতা বা নাস্তিকতা কতটা জরুরি?
— আমি আস্তিকতাকে খুব মূল্য দিই। কারণ, বিশ্বাস হলো একটা হাতল। এটা ধরতে হয়। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর। বিতণ্ডা করে কোনো লাভ নেই।
# মহাকালের বিচারে আপনার কবিতা কতটা টিকে থাকবে বলে আপনার ধারণা?
— আমি তো ভবিষ্যত্ বক্তা নই। যে কারণে বলতে পারব না। মহাকালের বিচারে টিকে থাকে না অনেক কিছুই। তুমি চর্যাপদ দেখ, চর্যাচর্যাবিনিশ্চয়। এটা কীভাবে আছে?
‘শাশুড়ী নিদ গাএ বউড়ি জাগত্র
কানেট চোরে নিল কাগই মাগত্র’
# প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলী আকবর খান একবার বলেছিলেন যে, নিবিড় সঙ্গীত সাধনার এক পর্যায়ে মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য অনুভব করা যায়। কবিতা রচনার কোনো পর্যায়ে এমন ধরনের কোনো ঐশী বোধ কি কখনও আপনাকে আচ্ছন্ন করেছে?
— তিনি তো বলেছেন সঙ্গীত সম্পর্কে; কিন্তু আমি যে জিনিস চর্চা করি এটার নাম হলো আধুনিক কবিতা। কবিতার মধ্যেও সঙ্গীত আছে। আমি লিরিকটা পছন্দ করি। আমি একটু লিরিক্যাল লোক এবং লিরিক হলো সবকিছু পাওয়ার একটা পথ। এটাই অনুসন্ধান করতে হবে।
# বিভিন্ন সাহিত্যানুষ্ঠানে আপনি প্রায়ই বলতেন, চিত্রকল্পই কবিতা। ত্রিশের দশকের খ্যাতিমান এক কবি বলে গেছেন, উপমাই কবিতা। এ ব্যাপারে বিশদ বলবেন কি?
— আমি কেন যে চিত্রকল্পকেই কবিতা বলেছিলাম, সেটা একটু ভেবে দেখতে হবে। আমার কবিতায় তো আমি এটা ত্যাগ করিনি। চিত্রকল্প তো প্রায় কবিতারই সমার্থক। কবিতায় একটা চিত্রকল্প লাগে।
# আমরা জানি, কবিতা পড়তে গিয়ে ভালো লাগার ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপর আসে উপমা, চিত্রকল্প, উেপ্রক্ষা, প্রতীকের দক্ষ শৈল্পিক প্রয়োগের প্রসঙ্গ। পাশাপাশি ছন্দের ব্যাপারটিও জরুরি, তাই নয় কি?
— সবচেয়ে বড় কথা হলো ছন্দ। একজন কবিকে জানতে হয়—মিলটা কীভাবে সংঘটিত হয়। অনুপ্রাস জানতে হবে। এটা জানলেই তার মনে দারুণ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এটা না জানলে কিন্তু অনেক অসুবিধা।
# দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় আপনার সৃজিত কবিতাগুচ্ছে বিধৃত হয়েছে সমকাল, বাংলাদেশের লোকজীবন, দেশ, সমাজ, জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য, অহং, ঐতিহ্য ইত্যাদি। সফল সাহিত্য সৃষ্টির প্রশ্নে এসবের প্রতিফলন অত্যন্ত জরুরি। এগুলো কেন জরুরি বলবেন কি?
— তুমি নিজেই তো বললে জরুরি। জরুরি এজন্য যে, একটাকে বাদ দিলে খুঁত থেকে যায়। এই খুঁত ভরাট করার আর কে আছে, কিছু তো নেই। কবিতার জায়গাটা কবিতা দিয়েই ভরাট করা দরকার, অন্য কিছু দিয়ে হয় না।
# উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
— এটা হলো—দার্শনিকরা যেটা ঘাড় থেকে ফেলে দিয়েছে, সেটা ঘাড়ে তুলে নেয়া।
# উত্তর আধুনিকতা বলতে পশ্চিমে আধুনিকতা-পরবর্তী কালটাকে বোঝানো হয়। কিন্তু ভারতে বা বাংলাদেশে এটাকে প্রাচীন ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়া বোঝাচ্ছে—এ ব্যাপারটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
— আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশটা প্রাচীন ঐতিহ্য ছাড়া ঘটেনি। কবিতা কিন্তু মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এ কারণেই, যেখানে পায়ের তলায় মাটি আছে সেখানে সবসময় প্রাচীন ঐতিহ্য আসা-যাওয়া করছে। কিন্তু পুরনো ঐতিহ্য নিয়ে তো থাকা যায় না। মানুষকে সামনের দিকে এগোতে হয়। পুরনো ঐতিহ্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু কবিতা হয়ে উঠতে হলে আধুনিকতা দরকার।
# এবার একটু ম্যাজিক রিয়েলিজম সম্পর্কে আলাপ করতে চাই। রিয়েলিজম ও ড্রিমের মধ্যে সেতু তৈরি করাকেই আমরা ম্যাজিক রিয়েলিজম বলে বুঝি। এ নিয়ে লাতিন ও ক্যারিবিয়ান কথাশিল্পীরাই বেশি কাজ করে থাকেন। পরে এই জাদুবাস্তবতার ধারণা বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। কবিতায়ও এর প্রতিফলন ঘটে। আপনার কবিতায়ও আমরা এর লক্ষণ দেখছি। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতার বইতে এই বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই আছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
— এটার মধ্যে যা বক্তব্য সেটা ঠিক খোলাসা করা যায় না। তবে এটুকু বলতে পারি—সবগুলো জটিলতার জট খুলে যায় যখন মিল বোঝে কবি—ছন্দের দোলায় যখন পৌঁছে। ছন্দ, গন্ধ এবং স্পর্শের যে আনন্দ; এটা একজন কবিকে সামনে ঠেলে দেয়। ভবিষ্যতের দিকে দারুণভাবে ঠেলে দেয়। ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায়।
# আপনার কাব্য-সহযাত্রী কবি শামসুর রাহমান এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন—সেটাই কবিতা যা প্রথম পাঠে ভালো লাগে। এ বক্তব্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
— তিনি কী বলেছিলেন সেটা আমি বলতে পারব না। তবে প্রথম পাঠে অনেক কিছুই ভালো লাগে। এটা কি যুক্তিসঙ্গত কথা হলো? প্রথম পাঠে অনেক অকবিতাও ভালো লাগে, তাই না? প্রথম পাঠে আমার ভালো লাগে গদ্য। কারণ গদ্য আধুনিক। এটা তো বলা যায় না—আমার প্রথম পাঠে যেটা ভালো লাগে সেটাই কবিতা। এর সঙ্গে ঠিক আমি একমত হতে পারি না।
# আপনি কি বলতে চাচ্ছেন—একটা কবিতা প্রথম পাঠে ভালো লাগল, কিন্তু আপনি যখন কয়েকবার পাঠ করলেন তখন মনে হলো—না, ভালো লাগার আসলে কারণ নেই।
— হ্যাঁ, কোনো কারণ নেই দেখা যাচ্ছে।
# আনন্দ ও বেদনা—কবিতার কাছে আপনি কোনটা বেশি পেয়েছেন?
— আমার মনে হয়, আনন্দ-বেদনা—এই দুইটাই সমভাবে আমাকে অভিভূত করেছে।
# একজন লেখকের বিকাশের জন্য সংঘ বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
— কোনো কোনো ক্ষেত্রে আছে। কিন্তু দল বেঁধে কাব্য হয় না।
# এই যে জাতীয় কবিতা পরিষদ হয়েছে, কেউ বলেন এটা এখন খুব স্তিমিত হয়ে আছে—এগুলো কি চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সাহিত্যের কোনো উপকার করেছে?
— কবিতার যে কোনো সংগঠন বা কবিতার জন্য যারা কাজ করে, তারা কিছু না কিছু কাজ তো করেই—এটুকু শুধু বলতে পারি।
# মৃত্যুচিন্তা কি আপনাকে কখনও আচ্ছন্ন করে? এ অনুভূতিটা কেমন?
— যেহেতু আমি জন্মেছি, মৃত্যু হবেই। এটা যখন আমি নিশ্চিতভাবে জানি, তখন মৃত্যুর ভয়টা হয়তো ঈষত্ কমে আছে—কিন্তু মৃত্যুর যে ভয়, বিস্ময়, মৃত্যুর যে একটা স্বাদ আছে এটা আমি কখনও গ্রহণ করিনি। এটা একবারই মানুষ গ্রহণ করে, যখন সে মরে যায়। ফিরে এসে আর কিছু বলতেও পারে না।
# বিশ্ব সমাজে সমাজতন্ত্র যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, এটা আপনাকে ব্যথিত করে কি?
— সমাজতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে, এটা কিন্তু বলা যাবে না। আসলে সমাজতন্ত্রের কথা আজকাল আর কেউ বলে না। কারণ, পুঁজিবাদ এত প্রবল ও পরাক্রান্ত হয়েছে যে, সমাজতন্ত্রীরা মুখ খুলতে পারছে না। পুঁজিবাদ যতই বৃহদাকার ধারণ করুক—পুঁজিরও একটা পরিসমাপ্তি আছে।
# আপনার রাজনৈতিক চিন্তায় আমরা ব্যাপক পরিবর্তন দেখি। বামধারা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় আপনি আস্থাশীল হয়েছেন সময়ের পরিক্রমায়। এই পরিবর্তনের অনিবার্যতা কী ছিল? আপনার সাহিত্যচিন্তা ও লেখালেখিতে এর কেমন প্রভাব পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?
— আমি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। বাম ঘরানা, যতই বলে না কেন, মানুষের বিশেষ করে কবির স্বাধীনতা হরণ করে।
# বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত লেখালেখিকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যপারে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।
— এ কথাটা আংশিক সত্য। কিন্তু আমি তো লিখেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছি—আয়-রোজগার যাই বলো, এই লেখা থেকেই।
# আপনি তো অন্যান্য চাকরিও করেছেন। সেগুলো যদি করতে না হতো...
— সেটা করেছি, কিন্তু লেখালেখি থেকেই আমাকে আয়-রোজগার বেশি করতে হয়েছে। তবে একটা কথা বলি—যেটা ঘটে না, সেটা ঘটবে না বলেই ঘটে না। এটা সত্য।
# কবিরা সত্যদ্রষ্টা হয়ে থাকেন বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। বাংলাদেশে বর্তমান কবিদের কবিতায় তার কেমন প্রতিফলন আছে?
— সব কবি সত্যদ্রষ্টা কিনা জানি না। তবে আমি বলি—কবিরা দ্রষ্টা। সে দেখে।
# আপনি এক সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা বৃত্তি কতটা উপকারী কিংবা অপকারী বলে আপনার মনে হয়েছে?
— এটা নিজের ওপর নির্ভর করে। আমি সাংবাদিকতা করেছি। কেন করেছি? আমার পেটের জন্য করেছি। বেঁচে থাকার জন্য করেছি। সেটাও প্রয়োজন ছিল।
# কবিতার কাছে আপনার ঋণ কতখানি?
— যা কিছু নিয়েছি, কাব্যের কাছ থেকেই নিয়েছি। তবে দিয়েছিও, শোধ করার চেষ্টাও আমি করেছি।
# কেউ কেউ বলে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে শক্তিমান লেখক আর আসছেন না। আপনি কি এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত?
— আমি ঠিক একমত নই। তবে সব সময়ই দেখা যায় যে, প্রকৃত লেখক যারা, তারা বেশ একটু বিরতি দিয়ে দিয়ে আসেন, প্রতিদিন তো আর আসেন না।
# আপনার প্রথম প্রেমের অনুভূতি, রোমাঞ্চ—নারী প্রেম অর্থে, এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
— আমারও এমন একটা মুহূর্ত এসেছিল। কৈশোর উত্তীর্ণ সময় যেটা, যেটাকে আমরা যৌবন বলি, তার প্রারম্ভে। এ সম্পর্কে আর কিছু বলার নেই, বলা উচিতও নয়।
# কবিদের মধ্যে ক্ষুদ্র দলাদলির ব্যাপারটি কি আপনাকে পীড়িত করে? একজন খাঁটি কবি দলভুক্ত না হলে ন্যূনতম স্বীকৃতিও পান না। এ ব্যাপারে কী বলবেন আপনি?
— এটা আমি ঠিক মানি না, কারণ কবিতা একটি ইন্ডিভিজুয়াল কাজ। কবিতা নীরবে লিখতে হয় এবং কবি একা, কবি নীরব সব সময়।
# কিন্তু দল না করলে পুরস্কার পাওয়া যায় না। বাংলা একাডেমী পুরস্কার নিয়েও এটা হয়ে থাকে।
— এগুলো বাস্তবতা। এগুলো আমি অস্বীকার করে চলে এসেছি।
# ইদানীংকালে আপনার দিনগুলো কেমন করে কাটছে?
— আমি তো চোখে-টোখে দেখি না। দৃষ্টি তো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। মোটামুটি বসে থাকি। পড়তে খুব ইচ্ছা করে। আমার পড়ে শোনানোর লোকও আছে। নাতি-নাতনিরা আছে। তারা জরুরি বিষয় যেটা সেটা পড়ে শোনায়। পত্রিকা শোনায়। আমি মাঝে মাঝে গান শুনতে ভালোবাসি।
# আপনার প্রিয় শিল্পী কে? প্রিয় গান সম্পর্কে বলুন।
— আমি তো এদেশের শ্রেষ্ঠ যারা গায়ক-গায়িকা, তাদের সবারই গান শুনি।
# আপনি তো সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লিখেছেনও। শিল্পকলা একাডেমী থেকে আপনার বইও হয়েছে।
— আছে। আব্বাসউদ্দীনকে নিয়েও আমি একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছি।
# আপনার প্রিয় গান কোনটা—রবীন্দ্র, নজরুল?
— ক্লাসিক্যাল মিউজিক আমার প্রিয়। এছাড়া আমার একটা স্বতন্ত্র পড়াশোনা ছিল পশ্চিমা মিউজিকের ওপর। এটা খুবই আমার কাছে লেগেছিল। আমি এদেশীয় সঙ্গীত বুঝতে পেরেছি। যাকে বলে পশ্চিমা সঙ্গীত, সেটারও ধ্বনি তরঙ্গ আমি অনুভব করতে পারি। এর ওপর আমার কিছু বক্তৃতাও ছিল। আমি মাঝে মাঝে এ সম্পর্কে বলতাম। আমি প্রায়ই একটা কথা বলে থাকি—যদি আমি কবি না হতাম, তাহলে আমি অবশ্যই সঙ্গীতজ্ঞ হতাম।
# দেশে এবং বিদেশে আপনার প্রিয় লেখক কারা?
— অনেক নামই তাহলে বলতে হয়। আমাদের দেশে আমার প্রিয় লেখক কাকে বলব—সুধীন্দ্রনাথ দত্ত একজন, রবীন্দ্রনাথ...
# রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তো আপনার অনেক লেখা আছে— গদ্য, পদ্য...
— আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিশাল ভাণ্ডার। সেখান থেকে অনেক কিছু নেয়ার আছে। আর নজরুলকে আমি অনেক ভালোবাসি। তার কারণ হলো—তিনি নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন, বিদ্রোহ করেছিলেন এবং একটিমাত্র কবিতা তার আছে—‘বল বীর/ চির উন্নত মম শির’—যার সমতুল্য কাব্য বাংলা ভাষায় আর নেই।
# জীবনানন্দ দাশকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
— জীবনানন্দ তো নির্জনতার কবি। তাঁর একটা কবিতায় আছে—উটের গ্রীবার মতো কোন এক নিস্তব্ধতা এসে—এটাই জীবনানন্দ সম্পর্কে আমি বলি।
# সাম্প্রতিককালে কী লিখছেন?
— কলাম-টলাম তো লিখছি। দু’একটা কবিতা হয়তো লিখছি। আরও কিছু লিখতে পারলে হয়তো ভালো হতো। আমার তো বয়স হয়ে গেছে আসলে আশি। এ বয়সে মানুষ আর লেখে না, ছেড়ে দেয়, কিন্তু আমি তো এখনও ছাড়িনি।
# বাংলাদেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক অবস্থা, এটা নিয়ে কি আপনি আশাবাদী? দেশটা কি সত্যিকার একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উপনীত হবে?
— আমি অবশ্য আমাদের জনগণকে অধিক মূল্য দান করি। আমি শুধু বলব যে, আমাদের জনগণ নির্বোধ নয়। তারা সবই বুঝতে পারে।
# আপনার প্রিয় সুগন্ধি কী? আপনি তো সুগন্ধি ভালোবাসেন। আপনার গল্পও আছে—সৌরভের কাছে পরাজিত।
— আতর আমার প্রিয় সুগন্ধি। সবচেয়ে ভালো লাগে গোলাপি আতর। অসাধারণ। মানুষ আসল গোলাপি আতর পায় না। কিন্তু আসল গোলাপি আতর এক ধরনের পানির মধ্যে ভেসে ওঠা তেলের মতো। খুবই মধুর। একদিন লাগালে দু’তিন দিন থাকে।
# আপনার সংগ্রহে আছে?
— ছিল, এখন আর নেই।
# আপনার প্রিয় খাবার কী?
— আমার প্রিয় খাবার সাধারণত কোর্মা-পোলাও। এখনও এটা আমি ভালোবাসি, খেতেও পারি।
# আপনি একটা কথা বলেছেন, সমাজতন্ত্রের কথা এখন আর কেউ বলে না কারণ সাম্রাজ্যবাদের পরাক্রম বেড়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানে যে আরব বিশ্বে ইসলামী গণজাগরণের ঢেউ উঠেছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
— এটা আমি একবার বলেছিলাম কিন্তু। একটা বিষয় আসছে, পৃথিবীতে যেটা সম্পূর্ণ নতুন এবং তার কোনো কামান-বন্দুক নেই। সে অস্ত্রশূন্য হাতে একটি পুস্তক নিয়ে আসছে—তার নাম হচ্ছে ইসলাম। এর হাতে হলো পবিত্র কোরআন শরীফ। এটা পুঁজিবাদের সঙ্গেও মিলে না, সমাজতন্ত্রের সঙ্গেও না। এটা হলো আধুনিক জগতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ব্যাপার। এটা ব্যবসাকে হালাল করে, সুদকে হারাম করে দেয়। যে সমাজে সুদ আছে সে সমাজে সুখ নেই। সুদের সঙ্গে সুখের কোনো সম্পর্ক নেই। সুদ তো হারাম করে দিয়েছে। আমার মতে যারা সুদ খায়—আমাদের বইপত্রে আছে যে, যারা সুদ খায় তারা উঠে দাঁড়াতে পারে না।
# লেখালেখির ব্যাপারে আপনার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?
— এক সময় তো আমার স্ত্রীই ছিলেন এবং আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম। এখন এই যে নিঃসঙ্গ আমি, এই ক্ষতি তো আর পূরণ হবে না, হয়ও না।
# এক সময় তো কবি হওয়ার জন্য লেখালেখি শুরু করেছেন। এখন কেন লিখছেন—এটা কি কোনো দায়বোধ?
— আমরা তো কোথাও পৌঁছতে চাই। ঠিক কোথায় পৌঁছতে চাই, সেটা আমি এখন বলছি না। তবে একটা কথা হচ্ছে—ইসলাম আসছে। ভবিষ্যত্ হলো ইসলামের হাতে।
# এখন যদি আপনার হাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা দেয়া হয়, আপনার প্রথম কাজ কী হবে?
— প্রথম কথা হলো—এ দায়িত্ব আমি নিতে চাই না।
# আপনি চান না, কিন্তু যদি কোনোভাবে এমনটা হয়?
— তাহলে তো প্রথমে জনগণের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এটাই আমি করব।
# আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞতা জানাই সময় দেয়ার জন্য।

‘কবি ছাড়া আমি আর কিছুই নই’— এ কথা কবি আল মাহমুদের। যদিও তিনি ছোটগল্প, উপন্যাস, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্য রচনায় বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, সাংবাদিক হিসেবে পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা, তথাপি তাঁর কবি পরিচয়ই তাকে বর্ণময় ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত করেছে। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যর সমৃদ্ধিসাধনে তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন অগুনতি পাঠকের কাছ থেকে। হাজার বছরের বাংলা কাব্যধারায় অবগাহন করে আল মাহমুদ বাংলাভাষী পাঠককে উপহার দিয়েছেন প্রায় তিনডজন কাব্যগ্রন্থ। কবিতায় তিনি বাঁকের পর বাঁক বদল করে ক্রমাগত ছুটেছেন সমুদ্রের দিকে। তাঁর অতৃপ্ত কবিপ্রাণ এখনও ধাবমান।
বয়স আশির কাছাকাছি হলেও প্রাণে তার তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। কবিতায় তিনি ধারণ করেছেন এই বাংলাদেশের আত্মা। ‘আজানের শব্দে কুপির শিখার পাশে অবগুণ্ঠিত কিষাণীর মুখ’ তিনি দেখেছেন। গ্রাম বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যে জারিত লোকজজীবনের অনুষঙ্গ তার কবিতাকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা, বিশেষ মহিমা। লোক লোকান্তর, সোনালি কাবিন, কালের কলস, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, প্রহরান্তের পাশফেরা, বখতিয়ারের ঘোড়া, একচক্ষু হরিণ, আমি দূরগামী, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙন, বিরামপুরের যাত্রী, উড়ালকাব্য, বরুদগন্ধী মানুষের দেশ কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, ডাহুকী, পুরুষ সুন্দর, যে পারো ভুলিয়ে দাও, কবি ও কোলাহল, আগুনের মেয়ে, চেহারার চতুরঙ্গ তার আলোচিত উপন্যাস।
ছোট্টগল্প লিখেও চমকে দিয়েছেন তিনি পাঠকদের। পানকৌড়ির রক্ত, গন্ধবণিক, সৌরভের কাছে পরাজিত, ময়ূরীর মুখ, নদীর সতীন ইত্যাদি তার ছোট্টগল্প গ্রন্থ। যেভাবে বেড়ে উঠি, বিচূর্ণ আয়নার কবির মুখ—তার আত্মজৈবনিক উপন্যাস। শিশু-কিশোরদের জন্যও লিখেছেন বেশ ক’টি গ্রন্থ। লিখেছেন ভ্রমণ কাহিনী, সাহিত্য-সংস্কৃতি-ধর্ম বিষয়ক এবং আত্মগত অসংখ্য প্রবন্ধ ও কলাম।
গত ১১ জুলাই ছিল এই মহান কবির জন্মদিন। এ উপলক্ষে গত ১০ জুলাই সন্ধ্যায় কবির বাসায় হাজির হয়েছিলাম আমরা। মগবাজারের আয়শা-গোমতী ভিলায় কবির ফ্ল্যাটে যখন আমরা পৌঁছি তখন তিনি একটি পত্রিকার প্রতিনিধিকে সাক্ষাত্কার দিচ্ছিলেন। আমাদের ডাকলেন তাঁর শোয়ার ঘরে। কবিকে মনে হলো বেশ চঞ্চল ও উত্ফুল্ল। সাক্ষাত্কার দিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। কথা বললেন বিভিন্ন বিষয়ে। তার এই সাক্ষাত্কারটি এখানে পত্রস্থ হলো।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে : হাসান হাফিজ / আহমদ বাসির
সূত্র : আমার দেশ

Tuesday, July 26, 2011

 এ দেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যানেল নেই - কৃষ্ণকলি ইসলাম

কৃষ্ণকলি ইসলাম। সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০০৯-এ শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে তিরষ্কৃত হয়েছেন। মনপুরা ছবিতে ‘সোনার পালঙ্কের ঘরে’ গানটির জন্যই তার এ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তথাপি জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পরও চলচ্চিত্রে তার গান গাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই বলে তিনি জানিয়েছেন। তার বর্তমান ভাবনা নিয়ে সোনালি-রুপালির মুখোমুখি হয়েছেন কৃষ্ণকালি। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আর এ সুজন
বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
বর্তমানে পারিবারিকভাবে একটু বেশিই ব্যস্ত। তার মধ্য থেকে আমার পরবর্তী অ্যালবামের কাজ করছি। এ ছাড়া জাতীয় তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা কমিটির হয়ে কাজ করছি।
ঈদে শ্রোতাদের কী দিচ্ছেন?
শুধুই শুভেচ্ছা দিচ্ছি।
এই ঈদে কোনো অ্যালবাম তাহলে শ্রোতারা পাচ্ছে না আপনার কাছ থেকে?
এই ঈদে কেন, কোনো ঈদেই আমি অ্যালবাম বের করিনি, করবও না। আসলে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোনো ঈদ, পূজা কিংবা ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি দিন উপলক্ষে কোনো অ্যালবাম রিলিজ করব না। এমনকি এসব দিনে আমি ইলেকট্রনিক চ্যানেলগুলোতেও পারফর্ম করা থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করব। তবে ঋতুভিত্তিক কোনো কিছু উপলক্ষে করেই আমি আমার অ্যালবাম বের করে থাকি। যেমন পহেলা বৈশাখ হতে পারে।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০০৯ এ প্রথমবারের মতো আপনি সেরা গায়িকা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
ভালো লাগছে, এতটুকুই বলব। এর বেশি কিছুই বলার নেই।
আপনাকে মনপুরাতে গান করতে দেখা গেছে, তারপর আর কোনো সিনেমাতে গান করতে দেখা যায়নি, কেন?
আসলে আমি ‘মনপুরাতে’ আমার ব্যক্তিগত একটি কারণে গান করেছি। সিনেমাতে আমার গান করা বা গাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই এখন পর্যন্ত। তবে কখনও যদি ভালো লাগে তখন সিনেমাতে গাইতেও পারি।
সিনেমার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন, অথচ সিনেমাতে গান না করার সম্ভাবনার কথা বলছেন। এটা আপনার দায়িত্ববোধ থেকে সরে আসা নয় কি?
এখানে দায়িত্ববোধের প্রশ্ন আসে কেন!
আমি ভালো গান করেছি, তাই পুরস্কৃত হয়েছি। এর মানে তো আমাকে চলচ্চিত্রে গান করতে হবে এটা বুঝায় না। এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই আমি মনে করি।
আমাদের দেশে শিল্পীরা অনেক চ্যারিটিমূলক অনুষ্ঠান করে থাকেন, কিন্তু এর অনেক ক্ষেত্রেই আপনাকে দেখা যায় না, কেন?
দেখা যায় না বললে সম্পূর্ণভাবে ভুল হবে। এটা বলতে পারেন এটাকে হাইলাইট করা হয় না। এই দেখুন, আমরা যে কয়েক দিন আগে ‘জাতীয় কমিটি’ লংমার্চ করলাম, এখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীসহ আরও অনেক লোকজন সম্পৃক্ত হয়েছেন এটাও তো একটা চ্যারিটিমূলক ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু এটা নিয়ে পত্রিকায় কতটুকু লিখেছে? আর আমি ওই দলের সদস্য নই, যে দলে বাংলাদেশের কথিত সঙ্গীতশিল্পীরা দেশের বাইরে সঙ্গীতমূলক প্রোগ্রাম করে সংগৃহীত টাকা লুটপাট করে খায়।
আপনি তো একাধারে নিজের গানের কথা ও সুর সাজান এবং তাতে আপনি নিজে কণ্ঠ দেন। এত কিছু একসঙ্গে কীভাবে সম্ভব?
সম্ভব করলেই সম্ভব হয়। ইচ্ছে শক্তিই মানুষের সব সফলতার উত্স। আর আমি তো শুধু গানই করছি না। এর বাইরে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত আছি। বিভিন্ন সমাজসেবামূলক আন্দোলনে নিজেকে সংশ্লিষ্ট রাখার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া পরিবার তো আছেই। আর এগুলো সবই সম্ভব হয়েছে ইচ্ছাশক্তি থেকেই।
বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে ‘শিল্পী বাছাই’ অনুষ্ঠান করতে দেখা যায় নিয়মিতভাবে। এর থেকে সঙ্গীতাঙ্গন কী পাচ্ছে?
আসলে সঙ্গীতাঙ্গন কী পাচ্ছে তা বলার আগে বলব এসব অনুষ্ঠানে ‘শিল্পী বাছাই’ অনুষ্ঠান হলেও তার মাধ্যমে শিল্পী বাছাই হচ্ছে না। এসব অনুষ্ঠানে যেহেতু বিভিন্ন স্পন্সর থাকে, তাই তাদের বিজ্ঞাপনগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্যই তারা অসদুপায় অবলম্বন করছে। আর আমাদের চ্যানেলগুলো টাকা পাওয়ার জন্য তা করে যাচ্ছে। আসলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরুলেও বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়া এখনও পরিপকস্ফ হয়নি। সে জন্য আমি বলব, বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যানেল নেই। আর আমরা সেখান থেকে কীভাবে শিল্পী আশা করতে পারি। তাই এক কথায় বলব, বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গন এর থেকে ভালো কিছু পাচ্ছে না। এগুলোর মাধ্যমে চ্যানেলগুলো শুধুই ব্যবসা করছে।
যদি এর থেকে সঙ্গীত জগত্ সত্যিকারের শিল্পী না পেয়ে থাকে, তাহলে আপনারা এসব অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন না কেন?
প্রতিবাদ করছি না বললে ভুল হবে। আমি প্রতিনিয়তই এর বিরুদ্ধে কথা বলছি। কিন্তু বললে কী হবে, তা তো সাংবাদিকরা ছাপছে না। এই দেখুন, আমরা জাতীয় তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা কমিটি যে আন্দোলনগুলো করছি তা কি ছাপা হচ্ছে? তাই আমি বলি, আমাদের পত্রিকা, চ্যানেলগুলো যেহেতু ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, তাই এরা শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে না। এরা নিরপেক্ষ হলেই আমাদের প্রতিবাদগুলো কাজে লাগবে।
আপনাদের তো একটা গানের দল আছে, তার সম্পর্কে কিছু বলুন।
আমরা সব সময়ই গান নিয়ে গবেষণা করছি। বাংলা গানের শিকড়গুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া আমাদের একটা গানের পাঠশালাও আছে, এতে কাজ করছি। সবকিছু মিলিয়ে বলতে পারেন, আমাদের গানের দল গানের মধ্যে ডুবেই ব্যস্ত সময় পার করছে।
আমার সর্বশেষ প্রশ্ন, বর্তমানকালের সঙ্গীতাঙ্গন যে অবস্থায় চলছে তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে বললে আপনি কী বলবেন?
আমাদের সঙ্গীতাঙ্গন এখন কালো মেঘে ঢেকে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটা হতাশার দিক হলেও আমি এর মধ্যেই আশা খুঁজে পাই। কারণ দিনে দিনে আমাদের জনগণ শিক্ষিত হয়ে উঠবে, বেশি পড়াশোনা করবে এবং ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা লাভ করবে। তাহলেই দেখবেন, একদিন আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনের কালো মেঘে ঝড় উঠবে, বৃষ্টি নামবে, সবুজ প্রাণে নামবে আলোর ঝলকানি।
 সূত্র : আমার দেশ

Friday, July 15, 2011

সাক্ষাৎকার : কাব্যনাটক লেখা সারা জীবনের স্বপ্ন — আল মাহমুদ

 সাক্ষাতকার নিয়েছেন : আহমদ বাসির

ষ ৭৬-এ পা দিতে যাচ্ছেন। লিখতে লিখতেই কাটিয়ে দিলেন ষাট বছর। জীবনের এই দীর্ঘ সফর কেমন কেটেছে বলে মনে হয় এখন।
—(হাসলেন) আমার কাছে ক্লান্তিকর মনে হয়নি।
ষ বাকি জীবনটা কীভাবে কাটাতে চান?
—হায়াত। এটা হলো আল্লাহর দান। কতদিন, কীভাবে লেখা আছে জানি না। যেভাবে কাটানোর রীতি রয়েছে, সেভাবেই কাটাব।
ষ আধুনিক বাংলাভাষায় কাব্যে এবং গদ্যে আপনার নিজের আবদান সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে বলি, কী বলবেন?
—আধুনিক বাংলা ভাষা তো একটা বিরাট ব্যাপার। সেখানে যত্সামান্য কাজ আমারও আছে। এটাই আমার মনে হয়।
ষ আপনি বহুবার আপনার একটি প্রবল ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। সে ইচ্ছাটি ছিল, একটি কাব্যনাটক রচনার। ইচ্ছাটি তো এখনও পূর্ণ হয়নি।
—সব তো আর হয়ে ওঠে না। চেয়েছি তো অনেক কিছু। নানারকম লেখা লিখেছি। যেগুলো লিখতে পারিনি, সেগুলো তো পারিনি। কিন্তু লেখা আমি লিখে গেছি। লেখায় ক্ষ্যান্ত দিইনি। পরিপূর্ণ না হোক, অনেক দীর্ঘ জীবন তো কাটিয়েছি লেখার সঙ্গে। নাটক ছাড়া সবকিছুই লিখেছি। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল কাব্যনাটক লেখার। এমন না যে, কাব্যনাটক লেখার টেকনিক আমি জানতাম না। জানতাম, কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠেনি।
ষ এ ব্যাপারে কি আপনার আফসোস থেকে যাচ্ছে?
—এখন আর আফসোস করে কী হবে!
ষ আপনি তো ‘কাবা শরীফ’ নিয়েও একটি দীর্ঘ কবিতা লেখার পরিকল্পনার কথা বলতেন। সে কবিতাটিও তো সম্ভবত লিখতে পারেননি।
—আমার ঠিক মনে নেই। অনেক পরিকল্পনাই তো করেছি, অনেক পরিকল্পনাই ভুলে গেছি। মনে থাকেনি।
ষ এ বছর বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে পালিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের দেড়শতম জন্মবর্ষ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আপনার বেশ কয়েকটি কবিতা আছে। সম্ভবত ‘আমি, দূরগামী’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় আপনি জমিদার রবীন্দ্রনাথকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন— ওই দাড়িঅলা সন্তের ছবি আমার ঘরে টানিয়েছে আমারই ছেলেমেয়েরা/ আহা, তারা কী করে জানবে— ওই ছবিই আমাকে অনাদায়ী খাজনার/ সর্বশেষ নোটিশের কথাই বার বার মনে পড়িয়ে দ্যায় (পঙিক্ত কটি পাঠ করার সময় আল মাহমুদ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পাঠ শেষ হলেও বেশ কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন)—কবি রবীন্দ্রনাথ ও জমিদার রবীন্দ্রনাথের এই যে পার্থক্য—এটা আপনি এখন কীভাবে অনুভব করেন?
—যেভাবেই বল না কেন, রবীন্দ্রনাথকে একটা অসাম্প্রদায়িক ভাবনা-চিন্তার আকর হিসেবে দেখা হয়েছে। বাংলার বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র রবীন্দ্রনাথে তেমন একটা নেই— এটা যেমন সত্য, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের যে একটা আন্তরিকতা ছিল, এটাও সত্য।
ষ নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর উপলক্ষে দেশে নানা আয়োজন হচ্ছে। দু’দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলনও হয়ে গেল। এ কবিতাটি সম্পর্কে আমদের কিছু বলুন।
—এটা বেশ ভালো ব্যাপার। বাংলা ভাষায় তো ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো আর কোনো কবিতা লেখা হয়নি। এটাকে একটা আকস্মিক উদঘট্টন (আলোড়ন) বলা যায়।
ষ আপনার ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘প্রকৃতি’র কথা মনে পড়ছে। ‘কতদূর এগুলো মানুষ/ কিন্তু আমি ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে/ আজও উবু হয়ে আছি...।’
—এ কবিতাটি সবাই পছন্দ করে। কবিতাটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ কবিতার জন্য আমি অনেক প্রশংসা পেয়েছি। কবিতাটি আমারও প্রিয়।
ষ ‘কাক ও কোকিল’ কবিতায় আপনি কোকিলের যে হৃদয়বেদনা তুলে ধরেছেন—একবার এক শহুরে কাকের দলে/ মিশে গিয়েছিল গানের কোকিল পাখি... (কবিতাটি শুনতে শুনতে আবেগে আবারও কেঁদে উঠলেন আল মাহমুদ) এ কবিতাটি পড়ে মনে হয় আধুনিক বিশ্বের কোনো নগরীতেই প্রকৃত শিল্পী-হৃদয়ের ঠাঁই মেলে না...
—তাই তো, কোথায় মেলে। কোকিল যদি নগরেই থাকতে চায়, তাহলে তাকে নানান কম্প্রোমাইজ করতে হয়।
ষ এবার আপনার ছোটগল্প প্রসঙ্গে...। আমাদের কাছে তো এখনও বিস্ময়কর মনে হয় পানকৌড়ির রক্ত, জলবেশ্যা, কালো নৌকা এমনকি পরবর্তীকালের নিশি বিড়ালীর আর্তস্বর ধরনের আরও কোনো কোনো গল্প। এরকম সব ছোটগল্প রচনার প্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?
—বয়স কম ছিল তো তখন, প্রেরণার কোনো অভাব হতো না। (কিছুক্ষণ থেমে) দুই খণ্ডে আমার সব ছোটগল্প বের হয়েছে। দেখেছো নাকি?
ষ দেখেছি, বাসায় ঢুকেই ও দুটোর ওপর চোখ পড়েছে কিন্তু গ্লাসের বাইরে থেকে। হাতে নিয়ে দেখতে পারিনি। সংগ্রহ করব।
—ওরা বেশ সুন্দর করে বের করেছে, অনন্যা।
ষ সম্ভবত ২০০০ সালে বেরিয়েছে দুই খণ্ডে আপনার উপন্যাস সমগ্র। এরপরও অনেকগুলো উপন্যাস লিখেছেন। আপনার উপন্যাসগুলোর মধ্যে কোনটি কিংবা কোনগুলো আপনার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
—উপন্যাস তো কম লিখিনি। এ মুহূর্তে ঠিক সেভাবে বলতে পারব না। তবে কাবিলের বোন, উপমহাদেশ এগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এবং সে সময়ের বাস্তবতা যতদূর সম্ভব এ দু’টি উপন্যাসে পাওয়া যাবে। ‘আগুনের মেয়ে’ কিংবা এরকম আরও কিছু উপন্যাস আমি লিখেছি সেগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ষ আপনার অনবদ্য সব ছড়া নিয়ে কিছু বলুন। আপনি তো ছড়াকে কবিতা থেকে কখনও আলাদা করে দেখেননি।
—না, দেখিনি। ছড়া তো কবিতাই। আমার একটা ছড়াসমগ্রও বের হয়েছে। সব মিলিয়ে ছড়াও আমি কম লিখিনি।
ষ এবার আপনার যাপিত জীবন সম্পর্কে একটু বলুন। জীবনে কোন সময়টা বেশ সুখে কাটিয়েছেন।
—নিরবচ্ছিন্ন সুখ বলে কোনো সময় কিছু ছিল না। সারা জীবন পরিশ্রম করতে হয়েছে।
ষ আপনার জীবনে তো বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছিল...
—বিশ্বাসের পরিবর্তন কথাটা ঠিক নয়। এটার নানা বিবর্তন ঘটেছে। এক সময় প্রগতিবাদে খুব আকৃষ্ট হয়েছিলাম।
ষ সে সময় আপনার কোনো কোনো কাব্য পঙিক্ততে অবিশ্বাসের ছায়াপাতও ঘটেছিল মনে হয়। সোনালি কাবিনের একটি সনেটে লিখেছিলেন—‘মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস’।
—অবিশ্বাসের ছায়াপাত ঘটেছিল—কথাটা প্রায় তাই। কথাটা সত্যি। তখনকার বয়স কম ছিল তো। চিন্তা এতটা সুগঠিত ছিল না। (হাসলেন) তবে যাকে বলে ‘কাট নাস্তিক’—এটা আমি কোনো কালেই ছিলাম না।
ষ আপনি তো কয়েকটি ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন। কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাতসমুদ্র, কবি-শিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস।
—হ্যাঁ, পৃথিবীর অনেক দেশে আল্লাহর রহমতে আমর ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে কবিতার দেশ বলে যেসব দেশ পরিচিত, সেসব দেশ আমি ভ্রমণ করেছি। সেগুলোরই কিছু কিছু লিখেছি।
ষ আপনার সমসাময়িকদের অনেকের নামই এক সময় আপনার চেয়ে বেশি উচ্চারিত হতো। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল অনেকেই হারিয়ে গেছেন। আপনিও অনেক সময় তাদের অনেকের লেখনী-ক্ষমতার কথা বলেছেন। এমনটা কেন হলো?
—মানুষ ভাগ্যে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এখানে ভাগ্যকে মানতে হয়। একটা কথা আছে না—‘জীবন থাকলে পরাজিত হতে হয়’ এটা আমরা মানিনি। মানিনি বলেই হয়তো এতদূর এসেছি।
ষ আপনি তো সঙ্গীতের শহরে বেড়ে উঠেছেন। আপনার সাঙ্গীতিক অভিজ্ঞতা কিছু ঘটেছিল?
—আসলে মানুষ হিসেবে আমার বেড়ে ওঠা সঙ্গীতে। আমাদের শহরটা শুধু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্য না, ওই ঘরানার প্রায় সবাই ছিলেন বাদ্যযন্ত্রবিদ। এঁরা বাজাতেন, তৈরি করতেন, বিক্রি করতেন, সাপ্লাই করতেন। এ উপমহাদেশে এ ধরনের ঘটনা খুবই কম। আমার আসা-যাওয়ার রাস্তায় পড়ত আলাউদ্দিন খাঁর বাড়ি। ওই পরিবারের রাজা হোসেন খান ছিল আমার ক্লাসের বন্ধু। ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানকে খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি। এত বড় ওস্তাদ উপমহাদেশে খুব কমই দেখা গেছে।
ষ আপনার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র কোনটি?
—সারাজীবন সেতারই আমার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ছিল।
ষ তো, এই সঙ্গীতের পরিবেশ থেকে সাহিত্যে এলেন কীভাবে?
—অল্প বয়সে বিস্তর সাহিত্য পড়েছি তো। সাহিত্যের প্রভাবটাই আমার মধ্যে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কবি হতে চেয়েছি, কবিই হয়েছি।
ষ সারাজীবন তো কলমের সঙ্গে কাটালেন। বেশ কিছু দিন ধরে কলম হাতে আর লিখতে পারছেন না। কবিতার পঙিক্ত নিশ্চয়ই এখনও বিদ্যুত্ তরঙ্গের মতো জেগে ওঠে আপনার মধ্যে। তখন কী করেন?
—একটা বিশেষ সময় আসে সব লেখকেরই। তিনি আর লিখতে পারেন না। আমি হাতে লিখতে না পারলেও নিয়মিতভাবে আমার সংবাদপত্রের কলামগুলো ডিকটেশন দিয়ে লিখে যাচ্ছি। যতদিন পারি, এভাবেই লিখে যাব। (কথা বলতে বলতে মনে হলো কবি ক্লান্তি অনুভব করছেন। আমরা ক্ষ্যান্ত দেয়ার কথা ভাবলাম।)
ষ এই বয়সে বর্তমান নাজুক শারীরিক অবস্থায়ও আপনি যে আমাদের এত সময় দিলেন, এ জন্য আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
—ধন্যবাদ তোমাদেরও। 

সূত্র : আমার দেশ

Saturday, December 18, 2010

আমার মনের ভেতর একটা ট্রেন আছে : আল মাহমুদ

al-mahmod কোনো এক সময় আমি হয়তো এই সুরভী দাশকে দেখেছি। নামটা হয়ত সঠিক না। চরিত্রটা হয়তো ঠিক। পুরো ব্যাপারটাই এক রহস্যময় অভিজ্ঞতা। নারী চরিত্রগুলো নাম দিয়ে পরিচিত হয় না। সম্পর্ক দিয়ে হয়। আমিও নাম ব্যবহার করেছি কাছাকাছি

প্রশ্ন: ‘পিপাসার বালুচরে’ কাব্যগ্রন্থের পুরোটাইতো একটা দীর্ঘ কবিতা। বইয়ের ভূমিকা থেকে জানতে পারি এটা এক বছর সময় নিয়ে লিখা। চোখের সমস্যার কারণে আপনি তো এখন কবিতা সাধারণত ডিকটেশন দিয়ে লেখান। এরকম একটা দীর্ঘ কবিতা একটু একটু করে ডিকটেশন দিয়ে লেখা কীভাবে সম্ভব হলো?
আল মাহমুদ: দীর্ঘ কবিতা হলো দীর্ঘ প্রসেস। এক ধরনের কৌশল। দীর্ঘ কবিতার জন্য একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকার প্রয়োজন হয়। অনেকে মনে করেন, আমার বোধ হয় পুরো কবিতাটা একটু একটু করে আসে। বিষয়টা কিন্তু তা নয়। পুরা কবিতাটাই আমার এক সাথে আসে। পুরো কবিতাটা আমার মনে তৈরি হয়ে থাকে, পুরো কবিতাটাই আমার মধ্যে এক সঙ্গে কাজ করে। আগে আমি এভাবে লিখতে পারতাম না। এখন পারি, যেহেতু অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবে এটা যেহেতু একটা দীর্ঘ কবিতা, এর বিষয় আলাদা। এ আমার মধ্যে একটু একটু করেই এসেছে। তবে লেখার সময় কিছু কিছু জায়গা আলাদাভাবে লিখিত হলেও, বলা চলে পুরোটা একসঙ্গেই লেখা হয়েছে। এই কবিতাটা লিখতে আমাকে সহায়তা করেছে রাফিক হারিরি। এভাবে দীর্ঘ কবিতার পারম্পর্য রক্ষা করার কায়দাটা আমার নতুন শেখা। আমার অন্ধত্বই আমাকে এই অভ্যস্ততা দিয়েছে, এই শিক্ষা দিয়েছে।

প্রশ্ন: ‘পিপাসার বালুচরে’র মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা গল্প আছে। আজকাল কেউ কেউ কবিতার মধ্যকার ওই গল্প বলার বিষয়টাকে সরিয়ে ফেলার কথা বলছেন। বিষয়টা কি আদৌ সম্ভব বলে আপনি করেন?

আল মাহমুদ: হয়তো বা সম্ভব। কিন্তু আমি করিনি কখনও। আমার কবিতার মধ্যে এক ধরনের গল্প থাকেই। এমনকি আমার দীর্ঘ কবিতায় যদি কোনো নারী চরিত্র থাকে, তার একটা বিবিধ বর্ণনা আমার থাকে, সেটা আমি পারি। এই কবিতাতেও এরকম বর্ণনা আছে।

প্রশ্ন: এই কবিতার কোনো কোনো জায়গায় দেখি দার্শনিকের মতো জীবনকে দেখা পঙ্ক্তি। এক্ষেত্রে কাহলিল জিবরানের দীর্ঘ কবিতাগুলোর কথা অনেক সময় মনে পড়ে যায়। কবিতায় দার্শনিকতাটাকে আপনি কীভাবে দেখেন।

আল মাহমুদ: কবিতায় দর্শন উঁকি দিলে কবিতার স্বাদ গ্রহণ করা খুব মুশকিল হয়। কিন্তু একেবারেই দর্শন ছাড়া কোনো কবিতা হয় না। আমি জিবরানের কবিতা পড়েছি, বেশ ভালোভাবেই পড়েছি। কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি দর্শনকে এনেছেন। দার্শনিকতা করার জন্য তিনি কোনো কবিতা লিখেননি। কিন্তু যেহেতু তার মধ্যে কবিত্বের পাশাপাশি দার্শনিক একটা মন ছিল, তার মধ্যে দর্শনটা এসেছে। তবে তার কবিতা পড়তে ভালো লাগে। সব কিছু ছাপিয়ে কবিতাটা পড়তে ভালো লাগলেই তো হলো। সে হিসেবে আমার কবিতা যদি পড়তে ভালো লাগে তাহলেই আমি মনে করি সফল।

প্রশ্ন: আপনার কবিতার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ওখানে নাটকের আত্মসংলাপ বলার মতো করে অনর্গল কথা বলে যাওয়ার প্রবণতা। ‘পিপাসার বালুচরে’ কবিতাটিও যেন এর ব্যতিক্রম নয়। কবিতার মধ্যের এই যে নাটকের মত করে সংলাপ বলার ভঙ্গি, এটা কি আপনি সচেতনভাবেই করেন?

আল মাহমুদ: কবিতা কি, আমার ধারণা কবিতা হলো প্রচ্ছন্ন নাটক। নাটকে যেমন দৃশ্যান্তর থাকে। কবিতায় থাকে স্পেস। এই স্পেসে কিন্তু কথা থাকে, দূরত্ব থাকে। কালের ব্যবধানে তৈরি হয়। এই কারণে আমার কবিতাতে এই বিষয়টা থাকে। ‘পিপাসার বালুচরে’ কবিতাটিও এর বাইরে নয়। আমি আসলে এভাবেই লিখতে অভ্যস্ত।

প্রশ্ন: দীর্ঘ এই কবিতাটা পাঠ শেষে আমরা যে পিপাসার দেখা পাই, তাকে কিন্তু বলা যায় যৌন পিপাসা বা যৌন আকাঙক্ষা। এই বিষয়ে কিছু বলুন।

আল মাহমুদ: সব আকাঙক্ষাই কিন্তু যৌন আকাঙক্ষারই রূপান্তর। যিনি প্রকৃত কবি তিনি যৌনতাকে আড়াল করে কাজ করতে চান। আমি অস্বীকার করি না যে এই কবিতাতে যৌনতার বিষয়টা আছে। কিন্তু এটা তো ঠিক সে বিষয়টা প্রধান হয়ে ওঠেনি।

প্রশ্ন: কবিতার এক জায়গায় আপনি লিখেছেন ‘আমি বলতে চাই শেফালি/ আর মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে সুরভী দাশ’। এই চরিত্র দুটি কারা? বাস্তবেরই কি কেউ?

আল মাহমুদ: ওরা আমার পরিচিত। স্পর্শকাতর জায়গা এটা। হয়ত হঠাৎ মনে হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু কোনো এক সময় আমি হয়তো এই সুরভী দাশকে দেখেছি। নামটা হয়ত সঠিক না। চরিত্রটা হয়তো ঠিক। পুরো ব্যাপারটাই এক রহস্যময় অভিজ্ঞতা। নারী চরিত্রগুলো নাম দিয়ে পরিচিত হয় না। সম্পর্ক দিয়ে হয়। আমিও নাম ব্যবহার করেছি কাছাকাছি।

প্রশ্ন: পুরো কবিতাটাই একটা রেলভ্রমণকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। কবিতাটিতে এই রেলের প্রসঙ্গটা আসার কারন কী?

আল মাহমুদ: আমার বাড়ি রেলস্টেশনের পাশে। সব সময়ই শুনতাম হুইসেলের শব্দ। এখনও ট্রেনের হুইসেল শুনলে আমার বাড়ির কথা, শৈশবের কথা মনে পড়ে। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যভরা ট্রেন যাচ্ছে আর ভিখিরিরা বখশিস বখশিস বলে চিৎকার করছে ট্রেনের পাশে। এই স্মৃতি থেকেই হয়ত আমার কবিতায় ট্রেনের প্রসঙ্গ আসা। কিংবা বলতে পারো, এটা একটা চলমান বাস্তবতা। আজীবন আমি ট্রেনের পাশে ছিলাম। আমার মনের ভেতর একটা ট্রেন আছে।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ