প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label শিশু সাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label শিশু সাহিত্য. Show all posts

Friday, September 14, 2012

আমার যতো ইচ্ছে | মালিহা

কিছুই ভালো লাগে না, মনে হয় লেখাপড়ার নামে সবাই আমাকে বন্দি করে রেখেছে। মা বলেন, ‘জন্মের পর ১২ বছর কেটেছে তোমার হাসতে খেলতে আনন্দ করতে করতে। সামনের ১২টা বছর তোমাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। ভালো ভালো রেজাল্ট আনতে হবে। ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হবে। ভালো পদবিতে চাকরি করতে হবে।’ আমার শুধু ইচ্ছে করে একটা মাঠে একা একা দৌড়াতে—ঘাসে ভরা সবুজ মাঠে। চারপাশে গাছ আর গাছ। মাঠের প্রান্তজুড়ে থাকবে সবুজ আর অরণ্য। আর মাঠের মাঝখানে ছনের বাড়ি। বাড়িটা ঘিরে ফুলের বাগান। বাগানের পাশে একটা পাকা দোতলা বাড়ি থাকবে। সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে থাকবে আলমারি বোঝাই বই, বই আর বই। আমি যখন ইচ্ছে তখনই পড়ব। কেউ আমায় বাঁকা চোখে দেখবে না। কেউ ধমক দিয়ে আমার হাত থেকে বই কেড়ে নেবে না। রেগে রেগে কেউ আমায় বলবে না—যাও, স্কুলের পড়া পড়তে বসো।
বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়বে, আমি বৃষ্টির পানিতে ভিজবো। কিছুক্ষণ একা একা বৃষ্টির গান গাইবো আর ভিজবো। পরে অন্যদেরও সঙ্গে নেবো। ভালো হয় আমার সঙ্গে অনেকগুলো ছোট ছোট বাচ্চা ভিজতে এলে। সবাই আমায় মালিহাপু বলে ডাকবে। ওদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা খেলা খেলবো। মাঝেমধ্যে ওরা সবাই আমায় দূর থেকে পানি ছিটিয়ে দেবে, আমি আনন্দ পাবো। পশু-পাখি পুষতে খুব ইচ্ছা করে, যেমন—ব্লাড হাউন্ড, অ্যালসেশিয়ান, পুডল কুকুর, অনেক লোমে ভরা সাদা বড় বিড়াল আর ছোট কালো, নীল বিড়াল, যত রকম পাখি আছে—সব আমি চাই। সবগুলো থাকবে জোড়ায় জোড়ায়। আরেকটা পাখি চাই, যার কোনো জোড়া নেই। সেটা হলো ফিনিক্স।
বাগানে থাকবে অনেক প্রজাপতি। ফুল আর বাগানটা প্রজাপতিদের জন্য। পাশে থাকবে একটা বড় দীঘি আর সেই দীঘিতে রক্তকমল আর সাদা শাপলা ফুটবে। দীঘির পাড় ঘিরে থাকবে গাছের সারি। আমি পাড়ে বসবো আর চারপাশ দেখবো। দোতলা বাড়িটার একটা বড় রুমে থাকবে গিটার, বাঁশি, হারমোনিয়াম, ড্রাম, সেতার আর সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র। যারা বাজাতে চায় তারা আসবে এখানে। ওরা বাজাবে আমি শুনবো। আমি গিটার বাজাব। বাঁশি বাজানো শিখবো। একটা ঘরে আমার প্রিয়-অপ্রিয় গানের সিডি, ক্যাসেট, সিডি প্লেয়ার ওয়াকম্যান ইত্যাদি থাকবে। একটা ঘরে থাকবে অনেক রকম পুতুল, ছোট-বড় সাদা লাল কালো—সব রকমের পুতুল।
ছাদের ওপরে আর বাংলো বাড়ির সামনে দোলনা থাকবে। সেখানে বসে গান শুনবো, বই পড়বো। আর বৃষ্টির সময় ছাদে বসে বৃষ্টির রুমঝুম শব্দ শুনবো। মাঝেমধ্যে মনে হয়, দীঘির ওপর যদি একটা ঝুলন্ত দোলনা থাকত। দোল খেতে খেতে যদি দোলনা উল্টে যায় তাহলে তো পানিতে পড়ে যাবো। আমি তো সাঁতার জানি না। সাঁতার শিখতে হবে আমায়। শীতের সময় ছাড়া সব সময় দীঘিতে নেমে গোসল করবো। কী মজা! এত বড় জায়গায় আমি একা থাকবো।
বৃষ্টির সময় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আসবে ভিজতে। বইপ্রিয় মানুষরা আসবে বই পড়তে আর গানপ্রিয় মানুষ আসবে গান গাইতে। সবাই থাকবে দোতলা বাড়িটাতে আর আমি থাকবো ছনের ঘরে। আমার কারও সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে না। রবিনসন ক্রুসো নামে এক নাবিক একাকী কাটিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে আমারও ইচ্ছে করে সেই রবিনসন ক্রুসো হয়ে যেতে ।
গল্প করতে ভালো লাগে। গল্প নিশ্চই একা করবো না। থাক না, মানুষের সব ইচ্ছা পূরণের দরকার নেই। আমার গান গাইতে নাচ করতে ইচ্ছে করে, ছবি আঁকতে মন চায়। কিছুই করতে পারি না। তখন নিজেকে অলস মনে হয়। মা অনেক বই কিনে দেন। ভালো লাগে লাবণ্যের বাসায় গেলে, দোলনায় চড়তে পারি। আমি কার্টুন আঁকতে পারি। এগুলো সব ভালো লাগে। যদিও তাল ঠিক থাকে না, তবুও সারাক্ষণ নাচতে থাকি।
আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোই লাগে। আমরা মারামারি করি। ওদের নিয়ে গল্প লিখি। ওরা পড়ে ভুল পেলে আমায় ধরে উত্তমমধ্যম দেয়। এটাও ভালো লাগে। স্কুলের ক্যাম্পের কথা খুব মনে পড়ে। তখন সবাই মিলে তাঁবু বানিয়েছি, কী যে মজা হয়েছিল। অনেক রাত পর্যন্ত টিচাররাসহ গল্প করেছি।
একবার লাবণ্য আর আমি লিফটে আটকে পড়েছিলাম। খুব ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। ভূতের ভয় হয়েছিল। লাবণ্য হাসতে হাসতে কাঁধের ওপর ঢলে পড়েছিল। তখন ওকে মিসেস ড্রাকুলা মনে হচ্ছিল। ছোট বোন ফারিহার সঙ্গে অনেক দুষ্টামি করি। বিদ্যুত্ চলে গেলে অন্ধ ঘরে ওর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা খেলি। খুব ভালো লাগে। এই সব ছেড়ে কোথায় যাব? লাবণ্য, আদিবা, তাসনুবা, নাতাসা, সুস্মিতা, যূথি, মিলা, ঋত,ু মৌমি ওদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। ফারিহাটা বোন হয়েছে বলে অনেক খুশি হয়েছি। এখন কীভাবে ওকে ছেড়ে চলে যাব? তবুও বুঝি লেখাপড়া করতেই হবে। আমার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে লেখাপড়া করতেই হবে। স্বপ্নগুলো মনের মাঝে আছে। এগুলো পরে পূরণ করবো।

সূত্র: আমার দেশ/এক্কাদোক্কা

Tuesday, October 18, 2011

জলহস্তী ও কচ্ছপ || সুহৃদ সরকার

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক জলহস্তীর নাম ছিলো পবন ঠাকুর। স্থলরাজ্যের বেশ বড়-সড় প্রাণী। হাতির পরেই ছিলো তার স্থান। তবে সে নিজেকে প্রাণীদের রাজা বলে ঘোষণা করেছিলো। তো রাজা জলহস্তীর ছিলো সাত সাতটি রানী। যখন তখন সে বড় বড় ভোজসভার আয়োজন করতো। রাজ্যের সবাইকে সে ভোজসভায় ডাকা হতো। মজার ব্যাপার ছিলো, জলহস্তীর সাত স্ত্রী ছাড়া কেউ তার আসল নামটি জানতো না। এক ভোজসভায় সব অতিথি ভোজনের জন্য তৈরি। ঠিক সেই সময় রাজা জলহস্তী বললো, যদি তোমরা আমার নাম না বলতে পারো তবে তোমরা সবাই ভোজন না করেই চলে যাও।
কেউ যেহেতু তার নাম জানতো না তাই তারা খাওয়া-দাওয়া না করেই ভোজসভা ত্যাগ করলো। স্থান ত্যাগ করার আগে একটি কচ্ছপ মাথা উঁচু করে বললো, আগামী ভোজসভায় যদি আমি আপনার নাম বলতে পারি তখন কী উপহার দেবেন?
আমার নাম যদি কেউ বলতে পারে, তবে তখনই আমি আমার পুরো পরিবারসহ এই রাজ্য ছেড়ে চলে যাবো। আর সারাজীবন জলের মধ্যে বাস করবো।
প্রতিদিন সকালে জলহস্তী ও তার সাত রাণী নদীতে যেতো গোসল আর জলপানের জন্য। এই অভ্যাস ছিলো কচ্ছপেরও। জলহস্তী দ্রুত চলতো। পিছে পিছে যেতো সাত রানী। একদিন নদীতে গোসল করতে নেমেছে তারা সবাই। রাস্তার ওপর ছোট একটি গর্ত খুঁড়লো কচ্ছপ। তারপর বসে বসে অপেক্ষা করছে কচ্ছপটি। গোসল সেরে তারা ফিরে আসছে প্রাসাদে। দুই রানী বেশ খানিকটা পেছনে পড়ে গেলো। কচ্ছপটি তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে এবং গর্তের মধ্যে অর্ধেকটা শরীর ঢুকিয়ে রাখলো। সে তার পিঠের খোলসের বেশি অংশ বাইরে রাখলো।
জলহস্তীর দুই রানীর একজনের পা পড়লো কচ্ছপের খোলসের ওপর। ভয়ে সে রাজাকে চিৎকার করে বললো, শোনো পবন ঠাকুর, শোনো। ও আমার স্বামী। আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি গো ...।
জলহস্তীর নাম জানতে পেরে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেলো কচ্ছপটি।
পরদিন আবার ভোজসভার আয়োজন করা হলো। আবার একই শর্ত জুড়ে দিলো জলহস্তী।
কচ্ছপ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, প্রতিজ্ঞা করুন, আমি আপনার নাম বলতে পারলে আমাকে মারবেন না।
জলহস্তী প্রতিজ্ঞা করলো।
কচ্ছপ চিৎকার করে বললো, আপনার নাম পবন ঠাকুর।
উপস্থিত সবাই তখন কচ্ছপের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে ভোজসভায় যোগ দিলো।
ভোজ শেষ হওয়ার পর প্রতিজ্ঞামতো জলহস্তী ও তার সাত রানী নদীতে চলে গেলো। আর কচ্ছপকে দিলো সারা রাজ্যময় ঘুরে বেড়ানোর অধিকার। সেই থেকে জলহস্তী ও তার স্ত্রীরা আজও নদীর মধ্যেই বাস করছে। রাতের বেলায় তারা ডাঙায় এলেও দিনে তাদের কখনও ডাঙায় দেখা যায় না। তারা হয়ে গেলো জলবাসী।
সূত্র : সমকাল

Saturday, October 15, 2011

আঙুর ফল টক || আবু সাঈদ জুবেরী

ঈশপের গল্প পড়েছো তোমরা। পড়ে কারো ভালো লেগেছে কারো লাগে নি। গত সংখ্যার মতো এই সংখ্যায়ও তোমাদের জন্য হাজির করা হলো ঈশপের গল্প পড়ে লেখা আরেকটি গল্প। গল্পটা পড়ে দেখো কেমন লাগে...
বিলেতে দুই যুগ কাটিয়ে লতিফ মিয়া ফিরল বাড়িতে। পুরনো ঘরদোর ভেঙে নতুন দালান উঠল। জমিজমা চাষবাস করতে এলো একখানা ট্রাক্টর। পুকুর সংস্কার হলো এবং তাতে মাছের পোনা পড়ল। ফলের পুরনো গাছগুলো ফেলা হলো কেটে।
যারা লতিফ-দাদুর সমবয়েসী তারা হা-হা করে উঠল, 'আহা-হা করো কী? ফলবতী গাছ কাটতে নেই। তোমার তো অনেক জমি, নতুন গাছ ওখানে লাগাও।'
ব্যাজার হয়ে গেল তার মুখ, 'কী সব আবোল-তাবোল বকছো তোমরা! আম-জাম-কাঁঠালের মতো বাজে গাছ রেখে লাভ কী?'
'বাজে গাছ!' সমবয়েসীরা হতবাক, 'তোমাদের বাগানে আরও কত রকমের ফল গাছ_ আমড়া, ডেফল, চালতা, জাম্বুরা, বড়ই, আমলকী_ সব কেটে ফেলবে?'
লতিফ দাদুর কপাল কুঁচকে গেল, 'এসব রাখার মানে কী? তোমরা খাও না, বিক্রি হয়। বাজার থেকে তো আঙুর, আপেল, নাশপাতি হরদম আগুনে-দামে কিনছো। ... আমাকে কেন উপদেশ দিচ্ছো আম-জাম-জাম্বুরা গাছ রেখে দিতে?'
সমবয়সী একজন বলল, 'আফটার অল লতিফ, দেশি ফলের বাগান-কেটে ফেলা বোধহয় ঠিক হবে না।'
সে পরামর্শ তিনি শুনলেন না।
গড়ে উঠল আঙুর-আপেলের বাগান।
দিনের পর দিন যায়, মাসের পর মাস, তারপর বছর। গাছ বাড়ে, ফুলই হয় না, ফল তো দূরের কথা। দিন আরও গড়ায়। পাড়ি দেয় মাস হয়ে বছরে। সব চুল-দাঁড়ি শাদা হয়ে যায়।
একদিন ফুল আসে। ঝরে যায় কিছুদিন যেতে না যেতেই। পরের বছর আবার ফুল আসে। শাদা চুল ও দাড়িঅলার হাতে লাঠি ভর করে ঠুকঠুক শব্দ শোনা যায় আঙুর লতার ঝোপের আশপাশে।
কিছুদিন যেতে না যেতেই আঙুরলতার ঝোপ থেকে চিৎকার ভেসে আসে কারও- 'ধরছে, ধরছে।'
তখন বিকেল। ঘর থেকে সবে বেরিয়েছি মাত্র, মনে হলো ভাগ্য সদয়। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না, লতিফ দাদুর বাগানে আঙুর ধরেছে। মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। সাধে কী আর আমাকে পণ্ডিত বলে?
পায়ে পায়ে কাছে গেলাম বাগানের। ধারণা সত্যি। থোকা থোকা পাকা আঙুর ঝুলছে। যেদিক চোখ যায়, সেদিকে আঙুর। আমার জিবে জল এসে গেল। এরকম পাকা ফল দেখলে কার না লোভ হবে বলো?
লাফ দিয়ে নাগালে পাওয়া গেল এক থোকা।
মুখে দিতেই শরীরের লোম শিরশিরিয়ে উঠল।
এত টক?
মন খারাপ হলো আমার। বেচারা লতিফ দাদু, অযথাই সময় নাশ! দেশি ফল হলে দু'তিন বছরে কত খেতে পারতে তুমি। এখন মিষ্টি বানাতে যাবে আরও সময়। সেই আঙুর ফলকে টক বলবে না, মিষ্টি বলবে কউ?
সুত্র : সমকাল

মিমির স্বপ্ন || তাসনুবা নূসরাত ন্যান্সী

ছোট্ট মেয়ে মিমি। ছোটবেলায়ই তার মা-বাবা মারা গেছে। প্রতিবেশী দাদির কাছে সে থাকে। পড়ালেখার প্রতি তার অনেক আগ্রহ। একদিন সকালে তার বন্ধুরা তাকে ডাকতে এলো_ 'মিমি স্কুলে যাবি না?' সে তাড়াহুড়া করে হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা করে স্কুলে গেলো। ক্লাসে পড়ালেখায় সে সবার চেয়ে ভালো। শিক্ষকরা সবাই তাকে আদর করেন, ভালোবাসেন। মিমি নামে সবাই তাকে চেনে। হঠাৎ করে তার কানে শব্দ এলো_ 'মিমি ওঠ, বেলা অনেক হলো। কাজগুলো শেষ করে নে, রিশাদকে স্কুলে দিয়ে আয়।' মিমি চোখ খুলে চারদিকে তাকায়। কোথায় তার স্কুল, কোথায় তার বন্ধুরা আর কোথায়বা তার শিক্ষক? একি শুধুই আমার স্বপ্ন? যদি স্বপ্নই হয়, তবে কি কখনও সত্যি হবে? এসব ভাবে মিমি। কারণ সে যে কাজের মেয়ে, অন্যের বাসায় কাজ করে। কাজের মেয়েদের স্বপ্ন কি কখনও সত্যি হয়? সে স্কুলে যাবে, পড়ালেখা করবে। এই ছোট্ট স্বপ্ন মিমির দু'চোখ ভরে আছে।
ছবি: রজত
সূত্র : সমকাল

Monday, October 3, 2011

ভূতকথার গল্প || মোমিন মেহেদী

ভূতকথার সাথে আমার পরিচয় খুব ছোট থেকেই। শুনেছি গল্প না শুনালে আমাকে খাওয়ানো যেত না ছোটবেলায়। আমাকে প্রথম ভূতকথা শুনিয়েছিলেন আমার আপি। ছোটবেলায় আমার সাত ফুপি, একমাত্র বড় আপি, কারো কাছেই গল্প শোনা থেকে বিরত থাকিনি। ভূতকথা শব্দটিই অনেক অনেক বেশি কাছে টানতো আমাকে। আজো টানে। ছোটবেলায় মনে দাগ কেটে যাওয়া একটি ভূতকথা তোমাদের জন্য শুরু করছি। বলেই ভূতকথা বলা শুরু করেন ৮০ বছরের অন্যরকম মানুষ 'মৃদঙ্গ চক্রবর্তী'। গল্পটা সত্যিই অদ্ভূত। শীতের এক সকালে সবাই আনন্দসহকারে গল্পটা শুনেছিল। ভূতপিঠার গাছ নিয়ে এটা এক মজার গল্প। ভূতং গ্রামের এক রাখালভূত পিঠা খাচ্ছিল। হঠাৎ সে কি মনে করে একটা পিঠা মাটিতে বুনে দিল। যেদিন বুনে দিয়েছিল সেদিনের পর প্রায় প্রতিদিন সে এক গ্লাস দুধ ঢেলে দেয় সেখানে। সাথে দেয় সার হিসেবে কিসমিস, নাড়কেলও। হঠাৎ একদিন রাখালভূত দেখল, যেখানে সে তার প্রিয় পিঠাটি বুনে দিয়েছিল, সেখানে একটা গাছ হয়েছে। শুধু তাই নয়, দুধ রঙের এই গাছটির মগডালে ঝুলে আছে শাদা শাদা পিঠা। আরাম করে পিঠা খায় রাখালভূত। পিঠা খায় আর ভাবে, আরো পিঠা বুনে দেয়ার কথা। অন্যদিকে আস্তে আস্তে পিঠার গাছ বড় হয়। রাখাল পিঠার গাছে উঠে পিঠা খায়। রাখালভূতের ছিল বেশ কিছু বন্ধু। এরা কিন্তু ভূত ছিল না। ছিল তোমার আমার মতো মানুষ। রাখালভূত সারাদিন ভূতং রাজার ঘোড়াভূতগুলোকে লালন-পালন করার সাথে সাথে পিঠাগাছের যত্ন নেয়। এমন যত্ন করে যে, কিছুদিনের মধ্যেই বড় হয়ে যায় গাছটি। রাখালভূত নিচে খায় আর বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দেয়। তার মনে আনন্দ আর ধরে না। পিঠা খেয়ে খেয়ে আর বিলিয়ে বিলিয়ে তার সময় ভালোই চলছিল। হঠাৎ একদিন এক ভূতবুড়ি নামক এক দুষ্টবড়ি এলো গ্রামে। সে রাখালভূতের কাছে একটা পিঠার আবদার করল। কিন্তু রাখালভূত তাকে কোনো পিঠা দিল না। কেননা, এই বুড়ি মন্ত্র জানে, পাছে আবার পিঠাগাছের কোনো ক্ষতি করে; সেই ভয়ে। কিন্তু বুড়ি? তারতো অনেক রাগ হলো। সেই রাগে বুড়ি মন্ত্র পড়ে রাখালভূতকেই পিঠা বানিয়ে ফেললো। ভূতবুড়ি পিঠা বানানোর পর তাকে যেমনি খেয়ে ফেলতে উদ্ধত হয়, অমনি পিঠা লাফ দেয়। এভাবে একবার বুড়ি খেতে চাইলে পিঠা সাতবার লাফ দেয়। লাফিয়ে লাফিয়ে কোনোমতে ভূতবুড়ির হাত থেকে নিজেকে বাঁচায়। বুড়ির হাত থেকে অনেক দূরে চলে আসে সে। কিন্তু এখন উপায়? উপায় খুঁজতে খুঁজতে সে তার মানুষ বন্ধুদের কাছে ছুটে গেল। কিন্তু কেউই চিনল না। শেষে এক লাফে এদিক যায়, আরেক লাফে ওদিক যায়। লাফিয়ে লাফিয়ে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে সে তাদের রাখালভূত বন্ধুটি। কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না। বরং লাফিয়ে লাফিয়ে বন্ধুদের সামনে পিঠার এই হাঁটাহাঁটি দেখে পিঠাটি ধরার চেষ্টা করে সবাই। কিন্তু কেউই ধরতে পারে না। অবশেষে পিঠা নিজেই তানশার কাছে আসে। তানশা যেমন বুদ্ধিমান তেমন নম্র স্বভাবের। সবাই তাকে ভালোবাসে, আদর করে। তানশা বুঝতে পারে পিঠা কিছু একটা বলতে চায়। সে পিঠাটি হাতে নিয়ে বলে
-কি নাম তোমার?
-আমার নাম রাখালভূত। যতটা সম্ভব জোড়ে বলে রাখালভূত। কিন্তু তানশা শুনতে পায় না। আবার জানতে চায়,
-কি বললে, কি নাম তোমার?
-রাখালভূত, রাখালভূত।
-রাখালভূত! আশ্চর্য হয়ে যায় তানশা।
-হ্যাঁ, রাখালভূত।
-কিন্তু তুমিতো একটা পিঠা...
তানশার কথা শেষ হওয়ার আগেই চঞ্চল ছোঁ মেরে পিঠাটি নিয়ে যায়। খেয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে মুখে দিতে যাবে এমন সময় চঞ্চল শুনতে পায় আমাকে খেওনা, আমি তোমার রাখালভূত বন্ধু...
আর মুখে দেয় না চঞ্চল। এবার আরো জোড়ে চিৎকার করে রাখালভূত বলে
-আমাকে তানশার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমি ওর সাথে কথা বলবো। চঞ্চল পিঠারুপী রাখালভূতকে তুলে দেয় তানশার হাতে। অন্যরা কেবল েেচয়ে থাকে আর ভাবে এই আশ্চর্য ঘটনার কথা।
তানশা হাতে নেয় পিঠাটি। রাখাল ভূত এবার বলতে শুরু করে, আমি একদিন আমার মায়ের বানানো পিঠা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ কি মনে করে একটা পিঠা মাটিতে বুনে দিলাম। যেদিন বুনে দিয়েছিলাম সেদিনের পর প্রায় প্রতিদিন সে এক গ্লাস দুধ ঢেলে দিতাম সেখানে। সাথে সার হিসেবে কিসমিস, নাড়কেলও দিয়েছি। হঠাৎ একদিন দেখলাম, যেখানে আমি আমার মায়ের হাতে বানানো প্রিয় পিঠাটি বুনে দিয়েছিলাম, সেখানে একটা গাছ হয়েছে। শুধু তাই নয় দুধ রঙের এই গাছটির মগ ডালে ঝুলে ছিল শাদা শাদা পিঠা। আরাম করে পিঠা খেয়েছিলাম সেদিন। বলে একটু থামে পিঠাটি। তারপর আবার বলতে শুরু করে, পিঠা খাই আর ভাবি, আরো পিঠা বুনে দেয়ার কথা। অন্যদিকে আস্তে আস্তে পিঠার গাছ বড় হয়। আমি পিঠার গাছে উঠে পিঠা খাই। তোমাদের ওতো দিয়েছি, তাই না? প্রশ্ন করে আবার থামে রাখালভূত। তাকে থামতে দেখে সবাই সমস্বরে সবাই একসাথে জানতে চায় তারপর?
একটা দীর্ঘশ্বাসের রঙধনু তুলে পিঠা আবার বলতে শুরু করে তার কষ্টগাথা কথা
-তারপর আমি সারাদিন ভূতং রাজার ঘোড়াভূতগুলোকে লালন-পালন করার পাশাপাশি পিঠাগাছের যত্ন নেই। এমন যত্ন করি যে, কিছুদিনের মধ্যেই বড় হয়ে যায় গাছটি। আমার মনে আনন্দ আর ধরে না। পিঠা খেয়ে খেয়ে আর বিলিয়ে বিলিয়ে আমার সময় ভালোই চলছিল। হঠাৎ একদিন এক ভূতবুড়ি নামক এক দুষ্টবুড়ি এলো গ্রামে। সে আমার কাছে একটা পিঠার আবদার করল। কিন্তু আমি তাকে কোনো পিঠা দিইনি। কেননা, এই বুড়ি মন্ত্র জানে, পাছে আবার পিঠাগাছের কোনো ক্ষতি করে; সেই ভয়ে। কিন্তু বুড়ি? তারতো অনেক রাগ হলো। সেই রাগে ভূতবুড়ি মন্ত্র পড়ে আমাকেই পিঠা বানিয়ে ফেললো। এবং খাওয়ার চেষ্টা করল। আমি কোনোমতে পালিয়ে এসেছি। আমাকে তোমরা বাঁচাও।
-তোমরাতো ভূত। আমরা তোমাদের কিভাবে বাঁচাতে পারি? তানশা জানতে চায়। এবার পিঠা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, তারপর বলে,
-আমরা ভূত, কিন্তু তোমরা মানুষ। ভূতের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি বুদ্ধিমান আর সাহসী-শক্তিশালী। আমি তোমাদের যেভাবে বলবো, সেভাবে তোমরা কাজ করলেই আমি বেঁচে যেতে পারি ভূতবুড়ির রোষানল থেকে।
- আচ্ছা বলো, আমরা চেষ্টা করে দেখবো। আর আমাদের নেতত্ব দিয়ে এগিয়ে নেবে তানশা। দৃঢ়তার সাথে কথাটি বলে, চঞ্চল।
চঞ্চলের কথা থামতেই পিঠারুপী রাখালভূত আবার বলা শুরু করে
-ভূতবুড়ির একটা ঝোলা আছে। সেই ঝোলার মধ্যেই বুড়ির প্রাণ...
-মানে? কৌতুহল দমাতে না পেরে পিঠার কথার মাঝখানেই সবাই সমস্বরে জানতে চায়
-মানে হলো, ওই ঝোলার মধ্যেই অনেকগুলো সন্দেশ আছে। সবচেয়ে যে সন্দেশটি সুন্দর, সেই সন্দেশটিই হলো ভূতবুড়ির প্রাণ। তোমরা আমাকে বাঁচাতে চাইলে ওই ঝোলাটা আগে তোমাদের কাছে নিয়ে এসো। কিন্তু সাবধান, ভূতবুড়ির গায়ে যেন ছোঁয়া না লাগে।
-লাগলে কি হবে? ফারহানার প্রশ্ন। ফারহানা হলো তানশার ছোট বোন, যেমন ভিতু তেমন-ই বুদ্ধিমান।
-ছোঁয়া লাগলেই মৃত্যু নিশ্চিত।
সবাই মিলে রওনা হলো ভূতবুড়ির উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখে বুড়ি গাছের মগডালে বসে আরাম করে পিঠা খাচ্ছে। ঝোলাটা নিচেই বলা যায়। শেকড় থেকে একটু উপরে। কিন্তু নিয়ে আসা যাবে এমন জায়গায় রেখেই ভূতবুড়ি পিঠাগাছে উঠেছিল।
এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে তানশারা। ঝোলাটা নিয়েই দৌড় দৌড়। আজও দৌড় কালও দৌড়।
ভূতবুড়ি পিঠা খাওয়ায় মগ্ন থাকার কারণে প্রথমে খেয়াল না করলেও পড়ে গাছ থেকে নেমে পিছে পিছে ধাওয়া করে। ভূতবুড়ির যেই লম্বা লম্বা পা। কয়েক পা বাড়াতেই ধরে ফেলতে উদ্ধত হয়। ততক্ষণে তানশা সন্দেশগুলো বের করে সুন্দর সন্দেশটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলে। অমনি বুড়ি দাঁড়িয়ে যায়। এক চুলও নড়ে না। নড়বে কিভাবে? নড়ার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। কারণ, তার প্রাণ এখন মনুষ্য সন্তান তানশার হাতে। তানশা এবার ঘুরে দাঁড়ায়। দৌড় বন্ধ করে সবাই। ঘুরে দাঁড়ায় চঞ্চল, ফারহানা, সামিসহ অন্যরা।
-আমার প্রাণ রক্ষা করো। আমাকে মেরো না। কাঁদতে কাঁদতে বলে ভূতবুড়ি।
তানশারাওকম যায় না। তারা একসাথে সাহস নিয়ে ভূতবুড়ির উদ্দেশ্যে বলে
-তাহলে আমাদের আমাদের বন্ধু রাখালভূতকে তুমি পিঠার জীবন থেকে ফিরিয়ে নাও। একথা শুনে বুড়ি তার হাতির কানের মত দু'পাশে ঝুলে থাকা চোখ নেড়ে নেড়ে বলে
-না, তা আমি পারবো না। ও আমার সাথে বেয়াদবী করেছে। তানশা একটা মুচকী হাসি দিয়ে বলে,
- ছোটদের কারো কাছে বড়রা কিছু চাইলে, তা যদি ছোটরা দিতে না চায়, তাতে বেয়াদবী হয় না। বরং তুমি তাকে পিঠা বানিয়ে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করে অন্যায় করেছো। ভূতবুড়ি কেবল বড় বড় চোখ নেড়ে তাকায় আর কিছুই করতে পারে না। কারন, জানটা তার তানশার হাতের মুঠোয়। যদি তানশা সন্দেশটি খেয়ে ফেলে, তাহলে বুড়ির জীবন শেষ।
ভয়ে ভয়ে বুড়ি বলে,
-আমার প্রাণ বাঁচাও আমিও ওকে পিঠা থেকে রাখালভূত করে দেব।
-সত্যি? জানতে চায় তানশাসহ অন্যরা। ভূতবুড়ি সব রাগকে বিসর্জন দিয়ে বলে
-সত্যি। তানশারা এবার আরো সাহসীকতার সাথে বলে,
-তিন সত্যি বলো। বুড়ি এবার আরো নরম হয়ে বলে,
-এক সত্যি, দুইসত্যি, তিনসত্যি...
আর সত্যি করতে হবে না। আমাকে রাখালভূত বানাও রাখাল ভূত। বলে কেঁদে ওঠে পিঠারুপী রাখালভূত। অবশেষে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভূতবুড়ি মন্ত্র বলে পিঠার জীবন থেকে মুক্তি দেয় রাখালভূতকে। আগের জীবন ফিরে পেয়ে সে কি খুশিটাই না হয়েছিল, তোমরা তা না দেখলে বুঝতেই পারবে না। বলেই আনন্দিত হয়ে ওঠেন চক্রবর্তী দাদা। আর অন্যরা সবাই মিলে বলে
-ওঠে দাদা, দাদা তারপর?. তারপর আর কি; রাখালভূত তার প্রিয় বন্ধু তানশাসহ সবাইকে বারোমাসই পিঠা ভাগ করে দিতে থাকলো। আর ভূতবুড়ি ভয়ের চোটে ভূতং গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে আবাস গড়ল। পাছে আবার তার প্রাণটা দস্যি মেয়ে তানশার হাতের মুঠোয় চলে যায়...
সূত্র : যায় যায় দিন

Thursday, February 10, 2011

সবজান্তা দাদা :: সুকুমার রায়

"এই দ্যাখ্‌‌ টেঁপি, দ্যাখ্‌‌ কি রকম করে হাউই ছাড়তে হয়। বড় যে রাজুমামাকে ডাকতে চাচ্ছিলি? কেন, রাজুমামা না হলে বুঝি হাউই ছোটানো যায় না? এই দ্যাখ্‌‌।"
দাদার বয়স প্রায় বছর দশেক হবে, টেঁপির বয়স মোটে আট, অন্য অন্য ভাইবোনেরা আরো ছোট। সুতরাং দাদার দাদাগিরির অন্ত নেই। দাদাকে হাউই ছাড়তে দেখে টেঁপির বেশ একটু ভয় হয়েছিল, পাছে দাদা হাউইয়ের তেজে উড়ে যায়, কি পুড়ে যায়, কিম্বা সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটে যায়। কিন্তু দাদার ভরসা দেখে তারও একটু ভরসা হল।
দাদা হাউইটিকে হাতে নিয়ে, একটুখানি বাঁকিয়ে ধরে বিজ্ঞের মতো বলতে লাগল, "এই সল্‌‌তের মতো দেখছিস্‌‌ এইখানে আগুন ধরাতে হয়। সল্‌‌তেটা জ্বলতে জ্বলতে যেই হাউই ভস্‌‌ করে ওঠে অমনি ঠিক সময়টি বুঝে— এই এম্নি করে হাউইটিকে ছেড়ে দিতে হয়। এইখানেই হচ্ছে আসল বাহাদুরি। কাল দেখলি তো, প্রকাশটা কি রকম আনাড়ীর মতো করেছিল। হাউই জ্বলতে না জ্বলতে ফস করে ছেড়ে দিচ্ছিল। সেইজন্য‌‌ই হাউইগুলো আকাশের দিকে না উঠে নিচু হতে এদিক ওদিক বেঁকে যাচ্ছিল।"
ফ্যাঁস—ফোঁস্‌‌—ছররর! এত শিগ্‌‌গির হাউইয়ে আগুন ধরে যায় সেটা দাদার খেয়ালেই ছিল না, দাদা তখনো ঘাড় বাঁকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে নিজের বাহাদুরির কথা ভাবছেন। কিন্তু হাসিটি না ফুরাতেই হাউই যখন ফ্যাঁস্‌‌ করে উঠল তখন সেই সঙ্গে দাদার মুখ থেকেও হাঁউ-মাউ গোছের একটা বিকট শব্দ আপনা থেকেই বেরিয়ে এল। আর তার পরেই দাদা যে একটা লম্ফ দিলেন, তার ফলে দেখা গেল মাঝখানে চিৎ‌পাত হয়ে অত্যন্ত আনাড়ীর মতো তিনি হাত পা ছুঁড়ছেন। কিন্তু তা দেখবার অবসর টেঁপিদের হয়নি। কারণ দাদার চিৎ‌কার আর লম্ফভঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গে তারাও কান্নার সুর চড়িয়ে বাড়ির ভিতরদিকে রওনা হয়েছিল।
কান্না-টান্না থামলে পর রাজুমামা যখন দাদার কান ধরে তাকে ভিতরে নিয়ে এলেন, তখন দেখা গেল যে, দাদার হাতের কাছে ফোস্‌‌কা পড়ে গেছে আর গায়ের দু-তিন জায়গায় পোড়ার দাগ লেগেছে। কিন্তু তার জন্য দাদার দুঃখ নেই, তার আসল দুঃখ এই যে টেঁপির কাছে তার বিদ্যেটা এমন ভাবে ফাঁস হয়ে গেল। রাজুমামা চলে যেতেই সে হাতে মলম মাখতে মাখতে বলতে লাগল, কোথাকার কোন দোকান থেকে হাউই কিনে এনেছে— ভালো কতে মশলা মেশাতেও জানে না। বিষ্টু পাঠকের দোকান থেকে হাউই আনলেই হত। বার বার বলেছি— রাজু মামা হাউই চেনে না, তবু তাকেই দেবে হাউই কিনতে।
তারপর সে টেঁপিকে আর ভোলা, ময়না আর খুক্‌‌নুকে বেশ করে বুঝিয়ে দিল যে, সে যে চেঁচিয়েছিল আর লাফ দিয়েছিল, সেটা ভয়ে নয়, হঠাৎ‌ ফুর্তির চোটে।

যতীনের জুতো :: সুকুমার রায়

তীনের নতুন জুতো কিনে এনে তার বাবা বললেন, "এবার যদি অমন করে জুতো নষ্ট কর তবে ওই ছেঁড়া জুতোই পরে থাকবে।"
যতীনের চটি লাগে প্রতিমাশে একজোড়া। ধুতি তার দুদিন যেতে না যেতেই ছিঁড়ে যায়। কোনো জিনিসে তার যত্ন নেই। ব‌‌ইগুলো সব মলাট ছেঁড়া, কোণ দুমড়ান, শ্লেটটা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ফাটা। শ্লেটের পেন্‌‌সিলগুলি সর্বদাই তার হাত থেকে পড়ে যায়, কাজেই ছোট ছোট টুক্‌‌রো টুক্‌‌রো। আরেকটা তার মন্দ অভ্যাস ছিল লেড্‌‌পেন্‌‌সিলের গোড়া চিবানো। চিবিয়ে চিবিয়ে তার পেন্‌‌সিলের কাঠটা বাদামের খোলার মতো খেয়ে গিয়েছিল। তাই দেখে ক্লাশের মাস্টারমশাই বলতেন, "তুমি কি বাড়িতে ভাত খেতে পাওনা?"
নতুন চটি পায়ে দিয়ে প্রথম দিন যতীন খুব সাবধানে র‌‌ইল, পাছে ছিঁড়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নামে, চৌকাঠ ডিঙ্গোবার সময় সাবধানে থাকে, যাতে না ঠোক্কর খায়। কিন্তু এই পর্যন্ত‌‌ই। দুদিন পর আবার যেই কে সেই। চটির মায়া ছেড়ে দুড়্‌‌ দুড়্‌‌ করে সিঁড়ি দিয়ে নামা, যেতে যেতে দশবার হোঁচট খাওয়া, সব আরম্ভ হল। কাজেই একমাস যেতে না যেতে চটির একটা পাশ একটু হাঁ করল। মা বললেন, "ওরে, এই বেলা মুচি ডেকে সেলাই করা, না হলে একেবারে যাবে।" কিন্তু মুচি ডাকা হয় না। চটির হাঁ বেড়ে চলে।
একটা জিনিসের যতীন খুব যত্ন করত। সেটি হচ্ছে তার ঘুড়ি। যে ঘুড়িটা তার মনে লাগত সেটিকে সে সযত্নে জোড়াতাড়া দিয়ে যতদিন সম্ভব টিকিয়ে রাখত। খেলার সময়টা সে প্রায় ঘুড়ি উড়িয়েই কাটিয়ে দিত। এই ঘুড়ির জন্য কত সময়ে তাকে তাড়া খেতে হত। ঘুড়ি ছিঁড়ে গেলে সে রান্নাঘরে গিয়ে উৎ‌পাত করত তার আঠা চাই বলে। ঘুড়ির লেজ লাগাতে কিংবা সুতো কাটতে কাঁচি দরকার হলে সে মায়ের সেলাইয়ের বাক্স ঘেঁটে রেখে দিত। ঘুড়ি উড়াতে আরম্ভ করলে তার খাওয়া-দাওয়া মনে থাকত না। সেদিন যতীন ইস্কুল থেকে বাড়িতে ফিরছে ভয়ে ভয়ে। গাছে চড়তে গিয়ে তার নতুন কাপড়খানা অনেকখানি ছিঁড়ে গেছে। ব‌‌ই রেখে চটি পায়ে দিতে গিয়ে দেখে, চটিটা এত ছিঁড়ে গেছে যে আর পরাই মুশকিল। কিন্তু সিঁড়ি নামবার সময় তার সে কথা মনে র‌‌ইল না, সে দু-তিন সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে নামতে লাগল। শেষকালে চটির হাঁ বেড়ে বেড়ে, সমস্ত দাঁত বের করে ভেংচাতে লাগল ! যেমনি সে শেষ তিনটা সিঁড়ি গেল, আর ছেঁড়া চটি তাকে নিয়ে সাঁই সাঁই করে শূন্যের উপর দিয়ে কোথায় যে নিয়ে চলল তার ঠিকঠিকানা নেই।
ছুটতে ছুটতে ছুটতে ছুটতে চটি যখন থামল, তখন যতীন দেখল সে কোন অচেনা দেশে এসে পড়েছে। সেখানে চরদিকে অনেক মুচি বসে আছে। তারা যতীনকে দেখে কাছে এল, তারপর তার পা থেকে ছেঁড়া চটিজোড়া খুলে নিয়ে সেগুলোকে যত্ন করে ঝাড়তে লাগল। তাদের মধ্যে একজন মাতব্বর গোছের, সে যতীনকে বলল, "তুমি দেখছি ভারি দুষ্টু। জুতোজোড়ার এমন দশা করেছ? দেখ দেখি, আর একটু হলে বেচারিদের প্রাণ বেরিয়ে যেত।" যতীনের ততক্ষণে একটু সাহস হয়েছে। সে বলল, "জুতোর আবার প্রাণ থাকে নাকি?" মুচিরা বলল, "তা না তো কি? তোমরা বুঝি মনে কর, তোমরা যখন জুতো পায়ে দিয়ে জোরে ছোটো তখন ওদের লাগে না? খুব লাগে। লাগে বলেই তো ওরা মচ্‌‌মচ্‌‌ করে। যখন তুমি চটি পায়ে দিয়ে দুড়্‌‌দুড়্‌‌ করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করেছিলে আর তোমার পায়ের চাপে ওর পাশ কেটে গিয়েছিল, তখন কি ওর লাগেনি? খুব লেগেছিল। সেইজন্যেই ও তোমাকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে। যত রাজ্যের ছেলেদের জিনিসপত্রের ভার আমাদের উপর। তারা সে সবের অযত্ন করলে আমরা তাদের শিক্ষা দেই।" মুচি যতীনের হাতে ছেঁড়া চটি দিয়ে বলল, "নাও, সেলাই কর।" যতীন রেগে বলল, "আমি জুতো সেলাই করি না, মুচিরা করে।" মুচি একটু হেসে বলল, "একি তোমাদের দেশ পেয়েছ যে করব না বললেই হল? এই ছুঁচ সুতো নাও, সেলাই কর।" যতীনের রাগ তখন কমে এসেছে, তার মনে ভয় হয়েছে। সে বলল, "আমি জুতো সেলাই করতে জানি না।" মুচি বলল, "আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, সেলাই তোমাকে করতেই হবে।" যতীন ভয়ে ভয়ে জুতো সেলাই করতে বসল। তার হাতে ছুঁচ ফুটে গেল, ঘাড় নিচু করে থেকে থেকে ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেল, অনেক কষ্টে সারাদিনে একপাটি চটি সেলাই হল। তখন সে মুচিকে বলল, "কাল অন্যটা করব। এখন ক্ষিদে পেয়েছে।" মুচি বলল, "সে কি ! সব কাজ শেষ না করে তুমি খেতেও পাবে না, ঘুমোতেও পাবে না। একপাটি চটি এখনও বাকি আছে। তারপর তোমাকে আস্তে আস্তে চলতে শিখতে হবে, যেন আর কোনো জুতোর উপর অত্যাচার না কর। তারপর দরজীর কাছে গিয়ে ছেঁড়া কাপড় সেলাই করতে হবে। তরপর আর কি কি জিনিস নষ্ট কর দেখা যাবে।"
যতীনের তখন চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে কাঁদতে কাঁদতে কোনো রকমে অন্য চটিটা সেলাই করল। ভাগ্যে এ পাটি বেশি ছেঁড়া ছিল না। তখন মুচিরা তাকে একটা পাঁচতলা উঁচু বাড়ির কাছে নিয়ে গেল। সে বাড়িতে সিঁড়ি বরাবর একতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে গেছে। তারা যতীনকে সিঁড়ির নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, "যাও, একেবারে পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে যাও, আবার নেমে এস। যতীন পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে গিয়ে লেমে এল। সে নিচে আসলে মুচিরা বলল, "হয়নি। তুমি তনবার দুটো করে সিঁড়ি এক সঙ্গে উঠেছ, পাঁচবার লাফিয়েছ, দুবার তিনটে করে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়েছ। আবার ওঠ। মনে থাকে যেন, একটুও লাফাবে না, একটাও সিঁড়ি ডিঙ্গোবে না।" এতটা সিঁড়ি উঠে নেমে যতীন বেচারীর পা টনটন করছিল। সে এবার আস্তে আস্তে উপরে উঠল, আস্তে আস্তে নেমে এল। তারা বলল, আচ্ছা, এবার মন্দ হয়নি। তাহলে চল দরজীর কাছে।"
এই বলে তারা তাকে আর একটা মাঠে নিয়ে এল, সেখানে খালি দরজীরা বসে বসে সেলাই করছে। যতীনকে দেখেই তারা জিগ্‌‌গেস করল, "কি? কি ছিঁড়েছে?" মুচিরা উত্তর দিল, "নতুন ধুতিটা, দেখ কতটা ছিঁড়ে ফেলেছে।" দরজীরা মাথা নেড়ে বলল, "বড় অন্যায়, বড় অন্যায় ! শিগ্‌‌গির সেলাই কর।" যতীনের আর 'না' বলবার সাহস হল না। সে ছুঁচ-সুতো নিয়ে ছেঁড়া কাপড় জুড়তে বসে গেল। সবে মাত্র দুফোঁড় দিয়েছে অমনি দরজীরা চেঁচিয়ে উঠল, "ওকে কি সেলাই বলে? খোল, খোল।" অমনি করে, বেচরি যতবার সেলাই করে, ততবার তারা বলে," খোল খোল !" শেষে সে একেবারে কেঁদে ফেলে বলল, আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।" তাতে দরজীরা হাসতে হাসতে বলল, "খিদে পেয়েছে? তা তোমার খাবার জিনিস তো আমাদের কাছে ঢের আছে" , এই বলে তারা তাদের কাপড়ে দাগ দেবার পেন্‌‌সিল কতগুলো এনে দিল। "তুমি তো পেন্‌‌সিল চিবোতে ভালোবাস, এইগুলো চিবিয়ে খাও, আর কিছু আমাদের কাছে নেই।"
এই বলে তারা যার যার কাজে চলে গেল। শ্রন্ত ক্লান্ত হয়ে যতীন কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে শুয়ে পরল। এমন সময় আকাশে বোঁ বোঁ করে কিসের শব্দ হল, আর যতীনের তালি-দেওয়া সাধের ঘুড়িটা গোঁৎ‌ খেয়ে এসে তার কোলের উপর পড়ল। ঘুড়িটা ফিস্‌‌ফিস্‌‌ করে বলল, "তুমি আমাকে যত্ন করেছ, তাই আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি। শিগ্‌‌গির আমার লেজটা ধর।" যতীন তাড়াতাড়ী ঘুড়ির লেজটা ধরল। ঘুড়িটা অমনি তাকে নিয়ে সোঁ করে আকাশে উঠে গেল। সেই শব্দ শুনে দরজীরা বড় বড় কাঁচি নিয়ে ছুটে এল ঘুড়ির সুতোটা কেটে দিতে। হঠাৎ‌ ঘুড়ি আর যতীন জড়াজড়ি করে নিচের দিকে পড়তে লাগল। পড়তে পড়তে যেই মাটিটা ধাঁই করে যতীনের মাথায় লাগল, অমনি সে চমকে উঠল। ঘুড়িটা কি হল কে জানে ! যতীন দেখল সে সিঁড়ির নিচে শুয়ে আছে, আর তার মাথায় ভয়ানক বেদনা হয়েছে।
কিছুদিন ভুগে যতীন সেরে উঠল। তার মা বলতেন, "আহা , সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে, এই ভোগানিতে বাছা আমার বড় দুর্বল হয়ে গেছে। সে স্ফুর্তি নেই, সে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চলা নেই, কিছুই নেই। তা ন‌‌ইলে এক জোড়া জুতো চার মাস যায়?"
আসল কথা— যতীন এখনও সেই মুচিদের আর দরজীদের কথা ভুলতে পারেনি।

ডিটেক্‌‌টিভ :: সুকুমার রায়

জলধরের মামা পুলিশের চাকরি করেন, আর তার পিশেমশাই লেখেন ডিটেক্‌‌টিভ উপন্যাস। সেইজন্য জলধরের বিশ্বাস যে, চোর-ডাকাত জাল-জুয়াচোর জব্দ করবার সব রকম সঙ্কেত সে যেমন জানে এমনি তার মামা আর পিশেমশাই ছাড়া কেউ জানে না। কারও বাড়িতে চুরি-টুরি হলে জলধর সকলের আগে সেখানে হাজির হয়। আর, কে চুরি করল, কি করে চুরি হল, সে থাকলে এমন অবস্থায় কি করত, এ-সব বিষয়ে খুব বিজ্ঞের মত কথা বলতে থাকে। যোগেশবাবুর বাড়িতে যখন বাসন চুরি হল, তখন জলধর তাদের বললে, "আপনার একটু সবধান হতে জানেন না, চুরি তো হবেই। দেখুন তো ভাঁড়ার ঘরের পাশেই অন্ধকার গলি। তার উপর জানালার গরাদ নেই।
একটু সেয়ানা লোক হলে এখান দিয়ে বাসন নিয়ে পালাতে কতক্ষণ? আমাদের বাড়িতে ওসব হবার জো নেই। আমি রামদিনকে ব'লে রেখেছি, জানলার গায়ে এমনভাবে বাসনগুলো ঠেকিয়ে রাখবে যে জানালা খুলতে গেলেই বাসনপত্র সব ঝন্‌‌ঝন্‌‌ করে মাটিতে পড়বে। চোর জব্দ করতে ও-সব কায়দা জানতে হয়।" সে সময়ে আমরা সকলেই জলধরের বুদ্ধির খুব প্রশংসা করেছিলাম, কিন্তু পরের দিন যখন শুনলাম সেই রাত্রে জলধরের বাড়িতে মস্ত চুরি হয়ে গেছে, তখন মনে হল, আগের দিন অতটা প্রশংসা করা উচিত হয়নি। জলধর কিন্তু তাতেও কিছুমাত্র দমেনি। বলল, "ঐ আহাম্মক রামদিনটার বোকামিতে সব মাটি হয়ে গেল। যাক্‌‌, আমার জিনিস চুরি করে তাকে আর হজম করতে হবে না। দিন দুচার যেতে দাও না।"
দু মাস গেল, চার মাস গেল, চোর কিন্তু ধরাই পড়ল না। চোরের উপদ্রবের কথা আমরা সবাই ভুলে গেছি, এমন সময় হঠাৎ‌ আমাদের ইস্কুলে আবার চুরির হাঙ্গামা শুরু হল। ছেলেরা অনেকে টিফিন নিয়ে আসে, তা থেকে খাবার চুরি যেতে লাগল। প্রথম দিন রামপদর খাবার চুরি যায়। সে বেঞ্চির উপর খানিকটা রাবড়ি আর লুচি রেখে হাত ধুয়ে আসতে গেছে— এর মধ্যে কে এসে লুচিটুচি বেমালুম খেয়ে গিয়েছে। তারপর ক্রমে ক্রমে আরো দু-চারটি ছেলের খাবার চুরি হল। তখন আমরা জলধরকে বললাম, "কি হে ডিটেক্‌‌টিভ! এই বেলা যে তোমার চোর-ধরা বুদ্ধি খোলে না, তার মানেটা কি বল দেখি?" জলধার বলল, "আমি কি আর বুদ্ধি খাটাচ্ছি না? সবুর কর না।" তখন সে খুব সাবধানে আমাদের কানে কানে এ কথা জানিয়ে দিল যে, ইস্কুলের যে নতুন ছোকরা বেয়ারা এসেছে তাকেই সে চোর বলে সন্দেহ করে। কারণ, সে আসবার পর থেকে চুরি আরম্ভ হয়েছে। আমরা সবাই সেদিন থেকে তার উপর চোখ রাখতে শুরু করলাম। কিন্তু দুদিন না যেতেই আবার চুরি ! পাগলা দাশু বেচারা বাড়ি থেকে মাংসের চপ এনে টিফিন ঘরের বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে রেখেছিল, কে এসে তার আধখানা খেয়ে বাকিটুকু ধুলোয় ফেলে নষ্ট করে দিয়েছে। পাগলা তখন রাগের চোটে চীৎ‌কার করে গাল দিয়ে ইস্কুল বাড়ি মাথায় করে তুলল। আমরা সবাই বললাম, "আরে চুপ্‌‌ চুপ্‌‌, অত চেঁচাসনে। তা হলে চোর ধরা পড়বে কি করে?" কিন্তু পাগলা কি সে-কথা শোনে? তখন তাকে জলধর বুঝিয়ে বলল, "আর দুদিন সবুর কর, ঐ নতুন ছোকরাটাকে আমি হাতে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছি— এ সমস্ত ওর‌‌ই কারসাজি।" শুনে দাশু বলল, "তোমার যেমন বুদ্ধি ! ওরা হল পশ্চিমা ব্রাহ্মণ, ওরা আবার মাংস খায় নাকি? দারোয়ানজীকে জিগ্‌‌গেস কর তো?" সত্যি‌‌ই আমাদের তো সে খেয়াল হয়নি ! ছোকরা তো কতদিন রুটি পাকিয়ে খায়, ক‌‌ই একদিনও তো ওকে মাছ-মাংস খেতে দেখি না। দাশু পাগলা হোক আর যাই হোক, তার কথাটা সবাইকে মানতে হল। জলধার কিন্তু অপ্রস্তুত হবার ছেলেই নয়। সে এক গাল হেসে বলল, আমি ইচ্ছে করে তোদের ভুল বুঝিয়েছিলাম। আরে, চোরকে না ধরা পর্যন্ত কি কিছু বলতে আছে, কোনো পাকা ডিটেক্‌‌টিভ ও-রকম করে না। আমি মনে মনে যাকে চোর বলে ধরেছি, সে আমি‌‌ই জানি।"
তারপর কদিন আমরা খুব হুঁশিয়ার ছিলাম, আট-দশদিন আর চুরি হয়নি। তখন জলধর বললে, "তোমরা গোলমাল করেই তো সব মাটি করলে। চোরটা টের পেয়ে গেল যে আমি তার পেছনে লেগেছি। আর কি সে চুরি করতে সাহস পায়? তবু ভাগ্যিস তোমাদের কাছে আসল নামটা ফাঁস করিনি।" কিন্তু সেই দিন‌‌ই আবার শোনা গেল, স্বয়ং হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘর থেকে তার টিফিন খাবার চুরি হয়ে গেছে। আমরা বললাম, "ক‌‌ই হে? চোর না তোমার ভয়ে চুরি করতে পারছিল না? তার ভয় ঘুচে গেল দেখছি।"
তারপর দুদিন ধরে জলধরের মুখে আর হাসি দেখা গেল না। চোরের ভাবনা ভেবে ভেবে তার পড়াশুনা এম্নি ঘুলিয়ে গেল যে পণ্ডিত মহাশয়ের ক্লাশে সে আরেকটু হলেই মার খেত আর কি ! দুদিন পর সে আমাদের সকলকে ডেকে একত্র করল, আর বলল, তার চোর ধরবার বন্দোবস্ত ঠিক হয়েছে। টিফিনের সময় সে একটা ঠোঙায় করে সরভাজা, লুচি আর আলুর দম রেখে চলে আসবে। তারপর কেউ যেন সেদিকে না যায়। ইস্কুলের বাইরে থেকে লুকিয়ে টিফিনের ঘরটা দেখা যায়। আমরা কয়েকজন বাড়ি যাবার ভান করে সেখানে থাকব। আর কয়েকজন থাকবে উঠোনের পশ্চিম কোণের ছোট ঘরটাতে। সুতরাং, চোর যেদিক থেকেই আসুক, টিফিন ঘরে ঢুকতে গেলেই তাকে দেখা যাবে।
সেদিন টিফিনের ছুটি পর্যন্ত কারও আর পড়ায় মন বসে না। সবাই ভাবছে কতক্ষণে ছুটি হবে, আর চোর কতক্ষণে ধরা পড়বে। চোর ধরা পড়লে তাকে নিয়ে কি করা যাবে, সে বিষয়েও কথাবার্তা হতে লাগল। মাস্টারমশাই বিরক্ত হয়ে ধমকাতে লাগলেন, পরেশ আর বিশ্বনাথকে বেঞ্চির উপর দাঁড়াতে হল- কিন্তু সময়টা যেন কাটতেই চায় না। টিফিনের ছুটি হতেই জলধর তার খাবারের ঠোঙাটা টিফিন-ঘরে রেখে এলো। জলধর, আমি আর দশ-বারোজন উঠোনের কোণের ঘরটাতে র‌‌ইলাম, আর একদল ছেলে বাইরে জিমনাস্টিকের ঘরে লুকিয়ে থাকল। জলধর বলল, "দেখ চোরটা যে রকম সেয়ানা দেখছি, আর তার যে রকম সাহস, তাকে মারধর করা ঠিক হবে না। লোকটা নিশ্চয় খুব ষণ্ডা হবে। আমি বলি, সে যদি এদিকে আসে তাহলে সবাই মিলে তার গায়ে কালি ছিটিয়ে দেব আর চেঁচিয়ে উঠব। তাহলে দারোয়ান-টারোয়ান সব ছুটে আসবে। আর, লোকটা পালাতে গেলেও ঐ কালির চিহ্ন দেখে ঠিক ধরা যাবে।" আমাদের রামপদ ব'লে উঠল, "কেন? সে যে খুব ষণ্ডা হবে তার মানে কি? সে কিছু রাক্ষসের মতো খায় বলে তো মনে হয় না। যা চুরি করে নিচ্ছে সে তো কোনোদিন‌‌ই খুব বেশি নয়।" জলধর বলল, "তুমিও যেমন পণ্ডিত। রাক্ষসের মতো খানিকটা খেলেই বুঝি ষণ্ডা হয়? তাহলে তো আমাদের শ্যামাদাসকেই সকলের চেয়ে ষণ্ডা বলতে হয়। সেদিন ঘোষেদের নেমন্তন্নে ওর খাওয়া দেখেছিলে তো ! বাপু হে, আমি যা বলেছি তার উপর ফোড়ন দিতে যেও না। আর তোমার যদি নেহাৎ‌ বেশি সাহস থাকে, তুমি গিয়ে চোরের সঙ্গে লড়াই কর। আমরা কেউ তাতে আপত্তি করব না। আমি জানি, এ-সমস্ত নেহাৎ‌ যেমন-তেমন চোরের সাধ্য নয়। আমর খুব বিশ্বাস, যে লোকটা আমাদের বাড়িতে চুরি করেছিল— এ-সব তার‌‌ই কাণ্ড!"
এমন সময় হঠাৎ‌ টিফিন-ঘরের বাঁ দিকের জানলাটা খানিকটা ফাঁক হয়ে গেল, যেন কেউ ভিতর থেকে ঠেলছে। তার পরেই শাদা মতন কি একটা ঝুপ করে উঠোনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল। আমরা চেয়ে দেখলাম, একটা মোটা হুলো বেড়াল— তার মুখে জলধরের সরভাজা ! তখন যদি জলধরের মুখখানা দেখতে, সে এক বিঘৎ‌ উঁচু হাঁ করে উঠোনের দিকে তাকিয়ে র‌‌ইল। আমরা জিগ্‌‌গেস করলাম, "কেমন হে ডিটেক্‌‌টিভ ! ঐ ষণ্ডা চোরটাই তো তোমার বাড়িতে চুরি করেছিল? তাহলে এখন ওকেই পুলিশে দি‌‌ই?"

আজব সাজা :: সুকুমার রায়

"পণ্ডিতমশাই, ভোলা আমায় ভ্যাংচাচ্ছে।" "না পণ্ডিতমশাই, আমি কান চুলকাচ্ছিলাম, তাই মুখ বাঁকা দেখাচ্ছিল !" পণ্ডিতমশাই চোখ না খুলিয়াই অত্যন্ত নিশ্চিন্ত ভাবে বলিলেন, "আঃ ! কেবল বাঁদরামি ! দাঁড়িয়ে থাক।" আধমিনিট পর্যন্ত সব চুপচাপ। তারপর আবার শোনা গেল, "দাঁড়াচ্ছিস না যে ?" "আমি দাঁড়াব কেন ?" "তোকেই তো দাঁড়াতে হবে।" "যাঃ আমায় বলেছে না আর কিছু ! গণশাকে জিগ্‌‌গেস কর ? কিরে গণশা, ওকে দাঁড়াতে বলেছে না ?" গণেশের বুদ্ধি কিছুটা মোটা, সে আস্তে আস্তে উঠিয়া গিয়া পণ্ডিতমশাইকে ডাকিতে লাগিল, "পণ্ডিতমশাই ! ও পণ্ডিতমশাই !"
পণ্ডিতমশাই বিরক্ত হ‌‌ইয়া বলিলেন, "কি বলছিস বল্‌‌ না।" গণেশচন্দ্র অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করিল, "কাকে দাঁড়াতে বলেছেন, পণ্ডিতমশাই ?" পণ্ডিতমশাই কট্‌‌মটে চোখ মেলিয়াই সাংঘাতিক ধমক দিয়া বলিলেন, "তোকে বলেছি, দাঁড়া।" বলিয়াই আবার চোখা বুজিলেন।
গণেশচন্দ্র দাঁড়াইয়া রহিল। আবার মিনিটখানেক সব চুপচাপ। হঠাৎ‌ ভোলা বলিল, "ওকে এক পায়ে দাঁড়াতে বলেছিল না ভাই ?" গণেশ বলিল, "কক্ষনো না, খালি দাঁড়াতে বলেছে।" বিশু বলিল, "এক আঙুল তুলে দেখিয়েছিল, তার মানেই এক পায়ে দাঁড়া।" পণ্ডিতমশাই যে ধমক দিবার সময় তর্জনী তুলিয়াছিলেন, এ কথা গণেশ অস্বীকার করিতে পারিল না। বিশু আর ভোলা জেদ করিতে লাগিল, "শিগগির এক পায়ে দাঁড়া বলছি, তা না হলে এক্ষুণি বলে দিচ্ছি।"
গণেশ বেচারা ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি এক পা তুলিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অমনি ভোলা আর বিশুর মধ্যে তুমুল তর্ক বাঁধিয়া গেল। এ বলে ডান পায়ে দাঁড়ানো উচিত, ও বলে, না, আগে বাঁ পা। গণেশ বেচারার মহা মুশকিল ! সে আবার পণ্ডিতমশাইকে জিজ্ঞাসা করিতে গেল, "পণ্ডিতমশাই, কোন্‌‌ পা ?"
পণ্ডিতমশাই তখন কি যেন একটা স্বপ্ন দেখিয়া অবাক হ‌‌ইয়া নাক ডাকাইতেছিলেন। গণেশের ডাকে হঠাৎ‌ তন্দ্রা ছুটিয়া যাওয়ায় তিনি সাংঘাতিক রকম বিষম খাইয়া ফেলিলেন। গণেশ বেচারা তার প্রশ্নের এ রকম জবাব একেবারেই কল্পনা করে নাই, সে ভয় পাইয়া বলিল, "ঐ যা কি হবে ?" ভোলা বলিল, "দৌড়ে জল নিয়ে আয়।" বিশু বলিল, "শিগ্‌‌গির মাথায় জল দে।" গণেশ এক দৌড়ে কোথা হ‌‌ইতে একটা কুঁজা আনিয়া ঢক্‌‌ঢক্‌‌ করিয়া পণ্ডিতমশায়ের টাকের উপর জল ঢালিতে লাগিল। পণ্ডিতমশায়ের বিষম খাওয়া খুব চট্‌‌পট্‌‌ থামিয়া গেল, কিন্তু তাঁহার মুখ দেখিয়া গণেশের হাতে জলের কুঁজা ঠক্‌‌ঠক্‌‌ করিয়া কাঁপিতে লাগিল।
ভয়ে সকলেই খুব গম্ভীর হ‌‌ইয়া রহিল, খালি শ্যামলাল বেচারার মুখটাই কেমন যেন আহ্লাদি গোছের হাসি হাসি মতো, সে কিছুতেই গম্ভীর হ‌‌ইতে পারিল না। পণ্ডিতমশায়ের রাগ হঠাৎ‌ তার উপরেই ঠিক্‌‌রাইয়া পড়িল। তিনি বাঘের মতো গুম্‌‌গুমে গলায় বলিলেন, "উঠে আয় !" শ্যামলাল ভয়ে কাঁদ কাঁদ হ‌‌ইয়া বলিল, "আমি কি করলাম? গণশা জল ঢাল্‌‌ল, তা আমার দোষ কি?" পণ্ডিতমশাই মানুষ ভালো, তিনি শ্যামলালকে ছাড়িয়া গণ্‌‌শার দিকে তাকাইয়া দেখেন তাহার হাতে তখনও জলের কুঁজা। গণেশ কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা না করিয়াই বলিয়া ফেলিল, "ভোলা আমাকে বলেছিল।" ভোলা বলিল, "আমি তো খালি জল আনতে বলেছিলম। বিশু বলেছিল, মাথায় ঢেলে দে।" বিশু বলিল, "আমি কি পণ্ডিতমশায়ের মাথায় দিতে বলেছি? ওর নিজের মাথায় দেওয়া উচিত ছিল, তাহলে বুদ্ধিটা ঠাণ্ডা হত।"
পণ্ডিতমশাই খানিকক্ষণ কটমট করিয়া সকলের দিকে তাকাইয়া তারপর বলিলেন, "যা ! তোরা ছেলেমানুষ তাই কিছু বললাম না। খবরদার আর অমন করিসনে।" সকলে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, কিন্তু পণ্ডিতমশাই কেন যে হঠাৎ‌ নরম হ‌‌ইয়া গেলেন কেহ তাহা বুঝিল না। পণ্ডিতমশায়ের মনে হঠাৎ‌ যে তাঁর নিজের ছেলেবেলার কোন দুষ্টুমির কথা মনে পড়িয়া গেল, তাহা কেবল তিনি‌‌ই জানেন।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ