প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Tuesday, July 31, 2012

ভাষাতাত্ত্বিক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ | ড. কাজী দীন মুহম্মদ

১
বিংশ শতাব্দী বাংলার মুসলমানের রেনেসাঁর যুগ। একালে যে সকল মনীষী মুসলিম জাগরণের জন্য নানাভাবে সাধনা করে গেছেন তাঁদের মধ্যে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ অন্যতম অগ্রগণ্য। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সে কালে মুসলিম রক্ষণশীল ও সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পড়তে গিয়ে তিনি অসুবিধায় পড়েন। সংস্কৃতের এমএ পাঠক্রমে বেদ-শাস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বেদ পড়াতেন বিখ্যাত বৈদিক পণ্ডিত সত্যব্রত শামশ্রমী। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান প্রাচীনপন্থী গোঁড়া পণ্ডিত ছিলেন। মুসলমান মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ছাত্র হবেন এবং তিনি তাঁকে বেদ পড়াবেন—এ হয় না। এ সম্বন্ধে তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন যে, ‘বিধর্মী’কে তিনি বেদ পড়াবেন না। ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধেও তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন না; বরং তিনি পদত্যাগের হুমকি দিলেন। এ ব্যাপারে সে সময় কলকাতায় বিশেষ আন্দোলন হয়। বিশেষ করে তখনকার দিনের বিখ্যাত মুসলিম নেতা মুহম্মদ আলী, যিনি সে সময় উপমহাদেশের মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্য তাঁর সুপরিচিত ইংরেজি পত্রিকা কমরেড (ঈড়সত্ধফব) প্রকাশ করতেন, তিনি ঞযব ঝযধযরফঁষষধয অভভধরত্ শীর্ষক কতকগুলো জোরালো প্রবন্ধ লেখেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এভাবে লোকের চোখের সামনে এসে পড়েন। এ নিয়ে দেশব্যাপী প্রচার, বিলেতে গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা ইত্যাদি কারণে তরুণ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নাম বাংলার ঘরে ঘরে শিক্ষিত মহলে বহুল আলোচিত হওয়ার সুযোগ পায়। ভাইস চ্যান্সেলর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এ ব্যাপারে বিব্রতবোধ করেন এবং মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে ডেকে পাঠান। তিনি তাঁকে ঈড়সঢ়ধত্ধঃরাব চযরষড়ষড়মু বা তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে এমএ পড়ার পরামর্শ দেন। তখন বিভাগটি সবেমাত্র খোলা হয়েছে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তার পরামর্শ মেনে নেন। তিনি ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে যথারীতি এমএ পাস করেন। এ সঙ্গে তিনি আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেন এবং ১৯১৪ সালে তিনি আইন পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। এরও প্রায় এক যুগ পরে তিনি ফ্রান্সের প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি ডি-লিট এবং ধ্বনি-বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা ডিপ্লোফোন লাভ করেন।
এরপর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাতক্ষীরায় ওকালতি আরম্ভ করেন। কিন্তু তাঁর মন ছিল বিদ্যাচর্চার দিকে, পঠন-পাঠন ও গবেষণার দিকে। ওকালতিতে তিনি মন বসাতে পারেননি। স্যার আশুতোষ তাঁর গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে নিজের হিতৈষী গুরুর মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মান্য করতেন। স্যার আশুতোষ তাঁকে আইন ব্যবসা ছেড়ে বিদ্যার সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে উপদেশ দেন। মূলত তাঁরই উত্সাহে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লক্ষ্মীর রত্নভাণ্ডার ত্যাগ করে সরস্বতীর পুষ্পোদ্যানে স্থান লাভ করেন এবং তাঁর কালে বাংলা তথা ভারতবাসী হিন্দু-মুসলমানের মানসিক উত্কর্ষের পক্ষে বিশেষ লাভ ও উপকার হয়। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঐঁসধহরঃরবং বা ‘মানবিকী’ বিদ্যায়, অর্থাত্ ভাষা-সাহিত্য-ইতিহাস-সমাজনীতি-অর্থনীতি-রাজনীতি-ধর্ম-দর্শন-আধ্যাত্মিকতার সাধন এবং রস অর্থাত্ শাশ্বত সত্তার মধ্যে নিহিত যে আনন্দের অনুভূতি—এসব বিষয়ে তিনি একজন ‘সর্বন্ধর’ আচার্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিলেন।
২
পণ্ডিতমহলে অনেকেই বলে থাকেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন গড়ারহম ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ—চলন্ত বিশ্বকোষ বা জীবন্ত অভিধান। অনেকের ধারণা যে, তিনি প্রায় দুই কুড়ি ভাষা জানতেন। একবার কারো কোনো লেখায় ‘মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঊনচল্লিশটি ভাষা জানেন’ বলে উল্লিখিত হয়। আমরা কয়েকজন এদিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন : তারা অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলেন। আসলে তিনি খুব ভালো করে পড়তে, লিখতে ও বলতে পারতেন বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, ল্যাটিন, গ্রিক, হিব্রু, পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট, উর্দু, হিন্দি, সিংহলি, কাশ্মীরি, নেপালি, অহমিয়া, ওড়িয়া, পোশতু এবং আরো কয়েকটি ভাষা। আর পড়তে ও বুঝতে পারতেন আরো দু’ডজনের মতো ভাষা। এক কথায় বলা যায়, তিনি ছিলেন ইংরেজিতে যাকে বলে চড়ষুমষড়ঃ—বহুভাষিক। ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় ও ভাষা বিশ্লেষণে বিভিন্ন ভাষার জ্ঞান, বিশেষ করে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার তাত্পর্য ব্যাখ্যায় তাঁর তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞান সমৃদ্ধ করেছিল—যা তাঁর তাত্ত্বিকতার মূল্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বস্তুত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞানপরিধির বিস্তার আমাদের পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবে এ কথা নিশ্চিত বলতে পারি, এ এলাকায় যে ক’জন ভাষাতত্ত্বের অনুশীলনে নিয়োজিত হয়েছেন, তাদের সবাই কোনো না কোনোভাবে তাঁর কাছে ঋণী। তাঁরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রেরণায় তারা ভাষাতত্ত্ব আলোচনায় আত্মনিয়োগে সমর্থ হয়েছেন। আমার নিজেরও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র উত্সাহ ও প্রেরণায়ই হয়েছে।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমাদের দেশ-জাতি-ধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতি-ভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন। গবেষণা ছাড়া সৃষ্টিশীল সাহিত্য ও ধর্ম বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধ দেশে ও বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মে তাঁর অগাধ জ্ঞান, কোরআন, হাদিস ও ফিকহ বিষয়ক তাঁর সুবিজ্ঞ আলোচনা সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। তিনি ফরাসি, ইংরেজি, ফারসি, উর্দু, বাংলা ইত্যাদি নানা ভাষায় বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রণয়ন করেছেন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক আলোচনায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অবদান সম্বন্ধে আলোকপাত করতে প্রয়াস পাব।
৩
ভাষাতত্ত্বমূলক আলোচনা আমাদের দেশে নতুন নয়। খ্রিস্টপূর্ব তিন-চার শতকে যাস্ক, পাণিনি প্রভৃতি ভাষাবিজ্ঞানী বিবৃতিমূলক ভাষাতত্ত্বের প্রথম সূত্রপাত করেন। পাণিনি ছিলেন পাকিস্তানি। পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরে কালাতুর গ্রামে তিনি বাস করতেন। তিনি ও তাঁর সহকর্মী ও উত্তরসূরিরা সে অঞ্চলে প্রচলিত প্রাচীন কথা আর্য ও সংস্কৃত ভাষার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাদের আলোচনার পদ্ধতি ও ধারা আজও বিবৃতিমূলক ভাষাবিজ্ঞানের আদর্শস্থানীয় হয়ে রয়েছে। বর্তমানের ইউরোপ ও আমেরিকার আধুনিক ভাষাতত্ত্বেও আলোচনা তাঁরই আদর্শ অনুসরণ করে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ যুগেও পাশ্চাত্য দেশে পাণিনির ব্যাকরণকে মানুষের জ্ঞানের চরম নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়ে থাকে।
পাণিনির পরেও অনেক দিন পর্যন্ত পাক-ভারতে এই ধারায় ভাষা-বিষয়ের আলোচনা অব্যাহত ছিল। পাণিনির মতো পতঞ্জলি প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানী এই উপমহাদেশে বর্ণনাভিত্তিক ভাষাতত্ত্বের আলোচনার যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেন। এরপর কিছুকাল আমরা আমাদের নিজেদের ভুলে গিয়েছিলাম। তাই বোধকরি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতোই ভাষাতত্ত্বের আলোচনায়ও ভাটা পড়ে। ইউরোপ তথা পশ্চিম গোলার্ধ ভাষাতত্ত্বের এই শাখার অনুশীলনীতে হাত দেয় আরো অনেক পরে। পশ্চিমের চোখে যাস্ক, পাণিনি, পতঞ্জলির আবিষ্কার এক মহাবিস্ময়। আধুনিক ভাষাতত্ত্বের মূল সূত্রটি এখান থেকেই নিয়ে তারা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিজেদের ভাষার বিশ্লেষণ শুরু করলেন।
কিন্তু কিছুদিন আগ পর্যন্তও ভাষাকে তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই দেখা হতো। সংস্কৃত, গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষার শব্দসম্ভারে সামঞ্জস্য-অসামঞ্জস্য, মিল-গরমিল বিশ্লেষণ করে অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের ভাষাগুলোর স্বরূপ নির্ণয়ই ছিল তখনকার দিনের মোটামুটি ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা।
আজ আবার পুরনো ধারার নবজাগৃতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের দিকেই আবার সবার নজর ফিরেছে। ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় দেশি ও বিদেশি মনীষীর অবদানের ইতিহাস বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের আওতার বাইরে। কিন্তু তাদের বিচার-বিশ্লেষণের স্বরূপ বোঝার জন্য তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিঞ্চিত্ আলোচনার অবতারণা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কেননা ভাষাতাত্ত্বিক মুহম্মদ শহীদুল্লাহেক বুঝতে হলেও এদের সামগ্রিক
আলোচনার একটি মোটামুটি আভাস জানা থাকা একান্ত প্রয়োজন। এর আগে ভাষাতত্ত্ব সম্বন্ধে দু-একটি কথা বলে নিলে আমাদের আলোচনার সুবিধা হবে।
ভাষাতত্ত্বে তিন ধারার ভাষা সম্বন্ধে আলোচনা করা চলে—প্রথমত, বর্ণনামূলক ধারা। একে ‘আধুনিক ভাষাতত্ত্ব’ও বলা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব।
বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বে ভাষাতাত্ত্বিক কোনো বিশেষ ভাষার বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আলোচনার সুবিধার জন্য এই কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করে থাকেন : ১. ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics) ২. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) ৩. রূপতত্ত্ব (Morphology) ৪. পদক্রম বা বাক্যরীতি (ঝুহঃধী) ৫. বাগর্থ বিজ্ঞান (Semantics) এবং ৬. অভিধান বিজ্ঞান (Lexicography)|
বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের মূল কথা হলো, যে কোনো একটি ভাষার বিশেষ কালের বিশেষ রূপের বর্ণনা করা। তা করতে হলে সেই বিশেষ ভাষাভাষী লোকের মধ্য থেকে নির্বাচিত যে কোনো একজনের মুখের ভাষাই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। এভাবে একেকটি উপভাষার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের সাহায্যে সেই ভাষার সামগ্রিক বর্ণনা সম্ভব হয়। মানুষের মুখের ভাষা যেমন ব্যবহৃত হয়, তারই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে সূত্র নির্ণয় করতে হয়। এই ধরনের বর্ণনায় ভাষার কোন নিয়ম আছে আর কোন নিয়ম নেই, তারই উল্লেখ থাকে; ভাষায় কী হওয়া উচিত আর কী হওয়া উচিত নয়, সে ধরনের বিধি-নিষেধের স্থান সেখানে নেই। এমনকি কেন এমন হয়, কেন এমন হয় না, তারও বিশ্লেষণ সেখানে অসঙ্গত। ভাষায় ব্যবহৃত নানা উপাদানকে একটা বিশেষ সংজ্ঞার মাধ্যমে একটা পদ্ধতির বন্ধনে আবদ্ধ করে যে বিশ্লেষণ শাস্ত্র গড়ে ওঠে, তাকেই তখন বলা হয় সেই ভাষার ব্যাকরণ।
এভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য ভাষাবিজ্ঞানী তার আলোচনাকে উল্লিখিত কয়েক ভাগে ভাগ করে থাকেন। ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics) শাখায় ভাষার ধ্বনিগুলোর উচ্চারণ পদ্ধতি, তাদের ব্যবহার ও স্থানভেদে তাদের উচ্চারণে তারতম্য, উচ্চারণের ব্যবহার-সঙ্গতি, সন্ধি ও বণ্টন, যতি ও ছন্দোবিন্যাস, এমনকি লিখনপদ্ধতিতে তাদের রূপায়ণ ইত্যাদির যথাযথ আলোচনা হয়। উচ্চারণের স্থান ও রকম, এমনকি তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও বিশদ আলোচনা সাধারণ ধ্বনিতত্ত্বের পর্যায়ভুক্ত।
ধ্বনিবিজ্ঞানের আলোচনায় বিশ্লিষ্ট বর্ণনাকে যখন গাণিতিক সংকেতে আবদ্ধ করা হয়, তখনই একে ধ্বনিতত্ত্ব নাম দেয়া হয়। অর্থাত্ ধ্বনিবিজ্ঞানে যা ছিল বস্তুসম্পৃক্ত (পড়হপত্বঃব), ধ্বনিতত্ত্বে তা হয়ে ওঠে নির্বস্তুক (ধনংঃত্ধপঃ)। বিজ্ঞানের আলোচনায় এই জগতের নানা পদার্থেরই স্বভাব, গতি, শক্তি ও গুণ নানা সংকেতে ধরা যায়। যেমন অংকশাস্ত্রে—১ (এক), ২ (দুই) অথবা (বর্গমূলক), . (দশমিক বিন্দু), + (যোগ চিহ্ন), - (বিয়োগ চিহ্ন), – (পূরণ চিহ্ন), % (ভাগ চিহ্ন) ইত্যাদি মাধ্যমে অনেক কিছু বোঝানো হয়। ধ্বনিবিজ্ঞানের (Phonetics) বিশিষ্ট রূপও সেইরূপ নানা সংকেত ও চিহ্নের সাহায্যের ধ্বনিতত্ত্বে (Phonology) বিধৃত হয়। এক কথায় ধ্বনিবিজ্ঞানে (Phonetics), যার বিশ্লেষণ, ধ্বনিতত্ত্বে (Phonology) তারই গাণিতিক প্রকাশ। তাই ধ্বনিবিজ্ঞানে যাকে নানা কথায় বিশ্লেষণ করা হয়, ধ্বনিতত্ত্বে তাই হয় সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত কতকগুলো সংকেত বা সূত্রের (Formula) সমষ্টি। বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের এই দুটি শাখাকে একই বিভাগের দুটি স্তর বা পর্যায় মনে করা যেতে পারে।
রূপতত্ত্ব (Morhphology) বিভাগে পদ ও শব্দসাধন পদ্ধতি অর্থাত্ পদ ও শব্দগঠন সম্পর্কিত নিয়মাবলি আলোচিত হয়। এতে সাধিত শব্দ বা পদের ধাতু, প্রত্যয়, অনুসর্গ, বিভক্তি প্রভৃতি ক্ষুদ্রতম অংশ নির্ণীত হয়। সমাস, অব্যয়, নিপাত ইত্যাদির আলোচনাও রূপতত্ত্বের প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্র। পদক্রম ও বাক্যরীতি (Syntax) বিভাগে আলোচিত হয় বাক্যের মধ্যে ব্যবহৃত শব্দ ও পদগুলোর ক্রম আর বাক্য-বিশ্লেষণ পদ্ধতি।
মূলত রূপতত্ত্ব (Morphology) ও পদক্রম (Syntax) একই বিভাগের দু’টি স্তর বা পর্যায়। কেননা, শব্দ ও পদের অংশ নিরূপণ বাক্য মধ্যে শব্দের অবস্থান ও কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে। তাই কেউ কেউ এই দু’টি শাখাকে মিলিতভাবে ব্যাকরণও বলে থাকেন। কিন্তু ব্যাকরণের কার্যবিধির ধারায় ধ্বনিবিজ্ঞান, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব এবং পদক্রম—এই সমুদয়ের পর্যায়ক্রমে পৃথক পৃথক ও সম্মিলিত এবং সামগ্রিক আলোচনা ও বিশ্লেষণই বাঞ্ছনীয়; তাই একটিকে ছেড়ে অপরটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। চারটি বিভাগের বিশ্লেষণই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারো কারো ধারণা এই যে, যেহেতু ধ্বনিবিজ্ঞান, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব এবং পদক্রম যথাক্রমে পরপর আলোচিত হয়, তাই এদের আলোচনার ধারাক্রমে এদের স্থান নির্ণীত হবে; যেমন ধ্বনিবিজ্ঞান নিম্নস্তরের, ধ্বনিতত্ত্ব তার পরের, রূপতত্ত্ব তারও পরের এবং পদক্রম সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু এরূপ ধারণা ভুল। আসলে এটি আলোচনার সুবিধার্থে এক ধরনের বিভাগ মাত্র, এতে স্তরের উচ্চতা-নিম্নতার প্রশ্ন নেই।
বাগর্থ বা শব্দার্থ-বিজ্ঞানে (Semantics) বাক্যমধ্যে ব্যবহৃত শব্দ, শব্দসমষ্টি, বাক্যাংশের ও বাক্যের অর্থ নির্ধারণ ও তার প্রক্রিয়া নিরূপণ করা হয়। কালের ও স্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শব্দার্থ কীরূপ বিকৃত, পরিবর্তিত ও অভিযোজিত হয়, তার বিস্তারিত আলোচনাও এর অন্তর্ভুক্ত।
অভিধান-বিজ্ঞান বা অভিধানতত্ত্ব (Lexicography) বিভাগে বিশেষ ভাষার শব্দসম্ভার আর তার বিভিন্ন রূপ ও আকৃতি অনুযায়ী শৃঙ্খলা ও তার সঙ্গে অর্থের বিভিন্নতা ও প্রয়োগবিধি ইত্যাদি আলোচিত হয়। দেশি ও বিদেশি শব্দবিভাগ এবং কথায় ও সাহিত্যে এদের ব্যবহারবিধি—এসব এ বিভাগের আলোচ্য। দ্বিভাষিক বা ত্রিভাষিক অভিধানে শব্দ ও বাক্যাংশের প্রতিশব্দ ও অনুবাদ উল্লিখিত হয়।
কেউ কেউ মনে করে, ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics) হলো ভাষা বিশ্লেষণের পূর্ববর্তী স্তর (Prelinguistics) আর বাগর্থ-বিজ্ঞান (Semantics)-এর পরবর্তী স্তর। তাদের মতে যে কোনো ভাষা বিশ্লেষণে ধ্বনিতত্ত্বও বাগর্থ-বিজ্ঞান ভাষা বিশ্লেষণের স্তরবহির্ভূত। কিন্তু এসব আলোচনার স্থান এটি নয়।
যে কোনো ভাষার বর্ণনামূলক আলোচনায় এই নিয়মে বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়। এই আলোচনায় বিভিন্ন ভাষার আকৃতি ও প্রকৃতি এমন নিখুঁতভাবে বিবৃত হয় যে, প্রত্যেকটি ভাষার স্বাতন্ত্র্য কেবল ভাষাবিজ্ঞানী কেন, সাধারণের কাছেও স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়। ভাষার এই আশ্চর্য ক্ষমতা ও সমাজ-জীবনে তার অদ্ভুত প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণই ভাষাতত্ত্বের এই শাখার অন্যতম উদ্দেশ্য।
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে একই ভাষার বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন কালের ধ্বনি, উচ্চারণ, শব্দরূপ, পদক্রম, শব্দসম্ভার ও অর্থ কী ধারায় পরিবর্তিত হয়েছে, তার বর্ণনা থাকে। একই ভাষার বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাষার একই সময়ে অথবা বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন সময়ে যে মিল-গরমিল ধরা পড়ে, তারও বিশদ বর্ণনা তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত। আগে গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃতের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে তুলনা করাই ছিল ভাষাবিদদের কাজ। এখন একই ভাষার বিভিন্ন উপভাষাও তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষিত হতে দেখা যায়।
ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের মাধ্যমে বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের সহায়তায় বিশেষ কোনো ভাষার উচ্চারণ, ধ্বনি, শব্দ, পদক্রম ও বাক্যের ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব—এ দুই শাখার আলোচনা বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের ওপর নির্ভর করে। আর যেহেতু প্রাচীন ভাষাগুলোর ধ্বনি হুবহু রক্ষিত হয়নি, তাই সেসব ভাষার আলোচনাও বেশিরভাগই অনুমানভিত্তিক, কাজেই দুর্বল। সেই কারণে অধুনা বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের ওপর সবার নজর পড়েছে।
আগেই উল্লেখ করেছি যে যাস্ক, পাণিনি, পতঞ্জলি—এদের পরও কিছুদিন পর্যন্ত ভাষাতত্ত্বের আলোচনা এ উপমহাদেশে অব্যাহত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাস প্রায় শূন্য। বিংশ শতাব্দীতে বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় ইউরোপ ও আমেরিকা উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করে। এতে বিজ্ঞানভিত্তিক ভাষা আলোচনা সেখানে দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। আমাদের দেশেও বিগত শতাব্দীতে কিছু ভাষাবিদ ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের প্রায় সব আলোচনাই প্রধানত তুলনামূলক ও ইতিহাসভিত্তিক। এদের মধ্যে বিমসের তত্ত্বের ÔComparative Grammar of Modern Indian Language’, রামকৃষ্ণ গোপাল ভাণ্ডারকারের ÔWilson Phonological Lectures’, nibwji ÔComparative Grammar of the Indian Languages’, গ্রিয়ারসনের ‘Linguistic Survey of India’, কেলগের ‘Hindi Dialects’, Ges ট্রামপের ‘Sindhi Grammer’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষা সম্বন্ধে যেসব কাজ হয়েছে তার মধ্যে বিজয় চন্দ্র মজুমদারের The History of the Bengali Language, ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের Origin and Development of Bengali Language (vol. I & II)Õ, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ এবং ডক্টর সুকুমার সেনের ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ই প্রধান। এছাড়া দেশি ও বিদেশি নানা পত্র-পত্রিকায় এদের এবং আরো অনেকের আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে। এদের প্রায় সব আলোচনাই ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আওতায় পড়ে।
আমাদের দেশের আধুনিক বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলোচনার সূচনা হয় এই শতাব্দীতে গ্রিয়ারসন সাহেবের খরহমঁরংঃরপ ঝঁত্াবু ড়ভ ওহফরধ-এর াড়ষ. ঠ-এ ‘শব্দকথা’ (১৭১০ খ্রি.), প্রবন্ধ সংগ্রহে সংকলিত এবং সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় (১০০৭-১৯০৭ খ্রি.) প্রকাশিত ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’, ‘বাঙ্গালা কৃত্ ও তদ্ধিত্’, ‘না’, ‘কারক প্রকরণ’ এবং ‘ধ্বনি বিচার’—এই বিষয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য আলোচনা। এরপর ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের 'Bengali Phonetic Reader' (1928) Ges 'A Brief Sketch of Bengali Phonetics (1928), W. Sutton Page-Gi 'Introduction of Colloquial Bengali' (1934) প্রকাশিত হয়। এসবই বাংলা ভাষা সংক্রান্ত বর্ণনাত্মক আলোচনার এক রকম দিকদর্শন। আমরা মূল আলোচনা থেকে একটু দূরে চলে এসেছি। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় কী কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা-ই আমাদের দ্রষ্টব্য। কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে ভাষাতত্ত্বের মূলতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় যেসব মনীষী আত্মনিয়োগ করেছেন তাদের কথা এসে পড়েছে। হ (সংক্ষেপিত)

Monday, February 20, 2012

২১ ফেব্রুয়ারীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 
[বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এদেশের ছাত্রসমাজ যে এত বড় বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছে ঐতিহাসিকদের মতে সেই ছাত্র রাজনীতির সূত্রপাত ১৮৩০ সালে। রাজনীতির উত্থান-পতনের রেখা ধরেই অদ্যবধি প্রবহমান ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৫২ সাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা নাম, যা নিজ মহিমায় এতই উজ্জ্বল যে বুদ্ধিজীবীদের মতে ২১ ফেব্রুয়ারী আমাদের অঘোষিত স্বাধীনতা দিবস। ২১ ফেব্রুয়ারীর ‘ভাষা আন্দোলন’ এর আবেদন এতই ব্যাপক যে এখনও প্রতিক্রিয়াশীলগোষ্ঠী সোচ্চার এর বিরুদ্ধে। আর আমরা বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা যারা ঘুমিয়ে আছি এই অন্ধকার সময়ের ভিতর কিংবা যারা অর্ধসচেতন বা সচেতনভবে খুঁজে ফিরি মুক্তির পথ তাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে ভাষা আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক গৌরবগাঁথা। ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণে প্রয়োজন সঠিক ইতিহাস জানা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তথা যে কোন আন্দোলনের ইতিহাস জানার জন্য অবশ্যই জানার প্রয়োজন পড়ে আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতি, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং সমসাময়িক অন্যান্য রাজনীতি যা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয। তথাপি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানার মাধ্যমে আমরা জানার চেষ্টা করবো ভাষা আন্দোলনের বিশাল ইতিহাসকে; সে লক্ষ্যেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থানের চেষ্টা। ]

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাতঃ
পাকিস্তানের জন্মের তিন মাস পর করাচীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা গণ্য করার এক সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সংবাদ পরদিন ঢাকার ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তীব্র বিক্ষোভ সঞ্চারিত হয়। ঐদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সাধারণ ছাত্রসভা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আশেপাশের অন্যান্য কলেজের ছাত্রছাত্রী। সমাবেশের পর এক বিরাট মিছিল সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ববাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা বিষয়ে একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন সেখানে বলা হয় উর্দু ও ইংরেজীর সঙ্গে বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হোক। ২৫ ফেব্রুয়ারী আলোচনা শেষে গণপরিষদের মুসলিম লীগের বাঙালি সদস্যরা বাংলাকে পরিষদের রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ভোট দেয়। সেই খবরে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ২৬ ফেব্র“য়ারী ঢাকায় ধর্মঘট পালন হয়। ২ মার্চ ঢাকায় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভায় গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। পরিষদের ডাকে ১১ মার্চ হরতাল পালন হয?। ১১ মার্চে ছাত্র জনতার উপর প্রশাসনিক গুন্ডা বাহিনীর নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদের ১২ মার্চ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ এবং ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন হয়। ১৪ মার্চ সারা পূর্বপাকিস্তানে ধর্মঘট পালন হয়। ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে নাজিম উদ্দীন ৮ দফা চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন।

ঢাকার বাইরে প্রতিক্রিয়াঃ
২৬ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় ধর্মঘট পালনের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সারা দেশে ভাষা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র ফেডারেশন, মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র এসোসিয়েশন, ছাত্র সংঘ, যুবলীগ প্রভৃতি সংগঠনের উদ্যোগে জেলায় জেলায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হতে লাগল।

* ২৮ তারিখ পাবনায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা রাস্তায় মিছিল করে এবং পুলিশের বেয়নেট চার্জে প্রথমবারের মত রঞ্জিত হয় পাবনার রাজপথ।
* ২ মার্চ যশোরে ধর্মঘট পালিত হয়। ১০ মার্চ শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। ১১ মার্চ যশোরে বিশাল মিছিল হয়। ১২ মার্চ কলেজ ছাত্র ধর্মঘট, ১৩ তারিখে মিছিলে পুলিশ প্রথমে লাঠি চার্জ ও পরে গুলি বর্ষণ করে। ঘটনার প্রতিবাদে ১৪ মার্চ আবার হরতাল পালন করা হয়।
* রাজশাহীর নওগাঁতে ২৭ ফেব্রুয়ারী ব্যাপক ছাত্র সমাবেশ ঘটে। কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১১ মার্চ বিক্ষোভ চলাকালে মিছিলের উপর হামলা হয়।
* চাঁদপুরে ধর্মঘট ডাকা না হলেও স্বতস্ফূর্তভাবে পালিত হয়।
* মুন্সিগঞ্জে২৮ ফেব্রুয়ারী বিক্ষোভ মিছিল হয়।
* ১১ মার্চ বগুড়ায় বগুড়ায় কলেজ থেকে মিছিল বের হয়।
* খুলনায় ২৮ ফেব্রুয়ারী বি.এল কলেজে প্রতিবাদ সভা হয়। ১১ মার্চ আন্দোলন তীব্র আকার ধারন করে।
* ২৭ ফেব্রুয়ারী বরিশালে বিশাল জনসভা হয়।

জিন্নাহর ঢাকা আগমনঃ
১৬ মার্চ ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জিন্নাহর আগমনে ছাত্র জনতার ভিতর স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। তারা আশা করেছিল জিন্নাহ হয়তোবা পূর্ববাংলার সাম্প্রতিক ঘটনায় জনগণের পক্ষেই থাকবে। ১৯ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ ঘোষণা করেলেন-
“..কিন্তু না আপনাদের পরিষ্কার ভাবে বলে দেয়া দরকার পাকিস্তানের রাষ্টভাষা হবে উর্দু, অন্যকোনো ভাষা নয় । এ ব্যাপারে কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে সে হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু।”
এই বক্তৃতা তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও বিক্ষোভ হয় বিচ্ছিন্নভাবে। এরপর ২৪ মার্চ সকালে জিন্নাহর সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সমাবর্তনে জিন্নাহ যখন আবার বলেন “উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”; তখন মিলনায়তনে উপস্থিত বেশ কিছু ছাত্র একসঙ্গে না, না বলে উঠে। এই দিনে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি দলের সাথে জিন্নাহর নির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাকে অপমান করা হয় এবং আলোচনা আর এগোয়নি।
আরবী হরফে বাংলা লেখার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হলেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডে এক সভায় বলেন-
“সহজ ও দ্রুত যে হরফের মারফত ভাষা পড়া যায় সেই হরফই সবচাইতে ভাল। সুতরাং দ্রুত লিখন ও পঠনের পক্ষে সুবিধাজনক বলিয়া আরবীকেই পাকিস্তানের হরফ করা উচিত।”
এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় প্রথম প্রতিবাদ ওঠে। ১২ মার্চ পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপনা পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় অধিবেশন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবী হরফ চাই না’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত ছাত্র মিছিল পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সেখানে গ্র্রেপ্তার হয় বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা।
১৯৫০ সালের ১১ মার্চ দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সমর্থক প্রতিটি সংগঠন থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সাদামাটা অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্যভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ‘আরবী হরফে বাংলা ভাষা’ নিয়ে বিতর্ক, প্রতিবাদ চলতে থাকে অথচ সরকার তা উপেক্ষা করে ১৮ এপ্রিল ১৯৫০ সাল থেকে পূর্ববাংলার বিভিন্ন জেলায় ২০ টি কেন্দ্রে আরবী হরফে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়ষ্কদের প্রাথমিক শিক্ষার কাজ শুরু করে দেয়। একদিকে শিক্ষাখাতে পূর্বপাকিস্তান ছিল বিশাল বৈষম্যের শিকার অন্যদিকে চলে ভাষা ও বর্ণমালা বিলুপ্তকরণ প্রক্রিয়া।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই পালন করা হয় ১১ মার্চ ও ১২ মার্চ তারিখটি।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারী পল্টনে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, -” পাকিস্তানের ‘একমাত্র’ রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু”.
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ৩০ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এ প্রতিবাদ ধর্মঘটের আয়োজন করে। ৩১ জানয়ারী বিকেলে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সমাবেশে সর্বসম্মতভাবে গঠিত হয় “সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ”। ৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট, শোভাযাত্রা এবং জনসভার আয়োজন এবং অর্থ সংগ্রহের জন্য ১১ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে প্রায় ৪ হাজার ছাত্রছাত্রীর একটি দীর্ঘ বিক্ষোভ মিছিল। ২১ ফেব্রুয়ারী সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালনের ঘোষনা দিয়ে শেষ হয় মিছিল পরবর্তী জনসভা।
১১ ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস পালন হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করা হয়। বের করা হয় দুটি পুস্তিকা, ‘আমাদের ভাষার লড়াই’-বদরুদ্দিন উমর এবং ‘রাষ্ট্রভাষা কি এবং কেন?”-আনিসুজ্জামন।
২১ ফেব্রুয়ারী হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। আর সরকার ২০ তারিখ সন্ধ্যা ৬টায় ক্রমাগত একমাসের জন্য ঢাকায় সকল প্রকার সভা, সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ তারিখ ছিল পূর্ববাংলা সরকারের বাজেট অধিবেশন।
সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে সর্বদলীং সংগ্রাম পরিষদ বৈঠকে মিলিত হয় সভায় তুমুল বাক-বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটে। অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেন এই কারণে যে, এর ফলে সরকার জরুরী অবস্থার অজুহাতে সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্তের জন্য ভোট দেন। মাত্র তিন জন বাদে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সকল সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে ভোট দেয়। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ আরো সিদ্ধান্ত নেয় যে, পরিষদের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার যৌক্তিকতা বুঝানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু ছাত্ররা যদি মেনে না নেয় তবে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি তখন থেকেই বিলুপ্ত হবে।
২১ ফেব্রুয়ারী সকালে ১৪৪ ধারা ও পুলিশের মহড়া উপেক্ষা করে দলে দলে শহরের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে থাকে। ছাত্ররা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে বিক্ষুদ্ধ হয়ে নানা রূপ ধ্বনি দিয়ে শামসুল হককে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্তে ৪ জন, ৭জন, ১০ জন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে জমায়েত হলো মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণে। কমপক্ষে ১০ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী গ্রেপ্তার, লাঠচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ইত্যাদির মধ্যদিয়ে পরিষদ ভবন ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে জমায়েত হয় মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে; বেলা ৩ টায় পরিষদ ভবনের অধিবেশনের পূর্বেই ছাত্র পুলিশ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকবার ছাত্রদের উপর কাঁদুনে গ্যাস ছেড়ে তাড়া করতে করতে পুলিশ মেডিকেল কলেজে ছাত্রাবাসের ভিতর ঢুকে পড়ে। প্রতিরোধকল্পে ছাত্ররাও ইটপাটকেল সমেত ঝটিকা আক্রমন করে। আক্রমনের প্রচণ্ডতায় দিশেহারা হয়ে আনুমানিক বেলা চারটার দিকে পুলিশ মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে গুলি চালায়। এই গুলি জব্বার ও রফিকের প্রাণ কেড়ে নেয়। এই গুলির আওয়াজ শুনে মেডিকেল কলেজ ছাত্রবাসের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন বরকত, একটি বুলেট তার ঊরুদেশ বিদ্ধ করে প্রচুর রক্তপাতের পর রাত আটটায় বরকত মারা যায়।

২১ ফেব্রুয়ারী যাঁরা শহীদ হলেন-
* সালাউদ্দীন (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)
* আব্দুর রাজ্জাক (বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)
* আবুল বরকত(বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)
* রফিক উদ্দীন (বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র)

ইতোমধ্যে গুলি চালানোর খবর শহরের আনাচে কানাচে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অফিস আদালত সচিবালয় এমনকি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের কর্মচারীরা পর্যন্ত অফিস বর্জন করে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। ১৪৪ ধারার লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া গেল না। আইন পরিষদের অধিবেশনে ঝড় ওঠে। আন্দোলনের নেতৃত্বে চলে আসে মেডিকেল কলেজ। ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ পুনঃগঠিত হয?। ২২ তারিখ হরতাল ও গায়েবানা জানাযার কর্মসূচী ঘোষিত হয়।
মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ভিতরে গায়েবি জানাযা পড়া হয়। সমস্ত শহর থেকে পুলিশ উঠিয়ে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। রেল কর্মচারীরা ধর্মঘট করে, সচিবালয়ের কর্মচারীরা দলে দলে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে আসে। জানাযা শেষে সর্বস্তরের মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নিলে সেনাবাহিনী বাধা দেয়। বাধা ডিঙ্গিয়ে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হাইকোটের সামনে আবার গুলি হয়। এতে মিছিলে অংশগ্রহনকারী সরকারি কর্মচারী শফিকুর রহমান নিহত হন (তিনি আইনেরও ছাত্র ছিলেন)। জনতা বংশালের দিকে অগ্রসর হলে আবারও গুলি চালানো হয়; এতে একজন নিরীহ রিক্সাওয়ালা নিহত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারী সংবাদ পত্রে ৫জন নিহত, ১২৫ জন আহত, ৩০ জন গ্রেফতার সহ লাশ গায়েব করার নিন্দা করা হয় ঐদিনই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় ২৫ ফেব্রুয়ারী প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
২৫ ফেব্রুয়ারী সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করে। সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য হয়।
১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ২১৪ নং অনুচ্ছেদ ছিল-
২১৪-(১) the state language of Pakistan shall be Urdu and Bengali.


যাঁদের কাছে কৃতজ্ঞঃ
ডঃ মোহাম্মদ হাননান-বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ।
আসাদুজ্জামান আসাদ-স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি।
জহির রায়হান-একুশে ফেব্রুয়ারী।
পোস্ট আকারে সাজিয়েছেনঃ
ইশতিয়াক।
পোস্টটি সাহিত্য.কম এ প্রকাশিত।

Friday, January 13, 2012

দেশের ক্ষুদ্রতম মসজিদ || নাজমুল ইমন

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগের ঘটনা। এমন একটি মসজিদ তৈরি হবে যেখানে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারবে। জানালা থাকবে না, দরজা থাকবে তবে ছোট আকৃতির। দেশের সবচেয়ে ছোট মসজিদ হবে সেটি।
বগুড়া জেলার প্রাচীনতম শহর সান্তাহার। সেই সান্তাহার থেকে ৩ কিলোমিটার ভেতরে একটি গ্রাম, তারাপুর। সকাল সকাল আমরা বের হলাম সেই গ্রামের উদ্দেশে। আঁকাবাঁকা রাস্তার দুই ধারে প্রচুর গাছ। গ্রামে ঢুকতেই কেমন জানি মনটা ভরে গেল। মাটির বাড়ি সারিসারি এক তলা, দুই তলা। বেশ কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে পেঁৗছে গেলাম একটা প্রাইমারি স্কুলে। সেখানে সবাইকে এ মসজিদের কথা বলতেই আমাদের এর ঠিকানা বলে দিলেন। শুরু হলো মাটির রাস্তা। গ্রামের যে এত সৌন্দর্য তা তারাপুর গ্রাম দেখলেই বোঝা যাবে। আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যে পেঁৗছে গেলাম আমাদের লক্ষ্যস্থান সেই ক্ষুদ্র মসজিদের কাছে।
সুনসান জায়গা। দেড়শ' বছরের অধিক সময় ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে আছে। কারা, কেন এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এ নিয়ে বর্তমান গ্রামবাসীর মধ্যে অনেক মতবিরোধ আছে। আমরা সবার কথার গুরুত্ব দেই। সেখানে যেহেতু এই মসজিদের কোনো ইতিহাস নেই, সেহেতু এ মসজিদটির যে দুই-চারটে কথিত ইতিহাস আছে হয়তো এর মধ্যেই একটি ইতিহাস আছে যেটি সত্য। তাই আমরা আশপাশে থাকা বয়স্ক, যুবক, তরুণ সব ধরনের মানুষের কাছ থেকেই মসজিদ সম্পর্কে জানতে চাই।
তরুণ আরিফুল ইসলাম জনি বললেন, সান্তাহারের ছাতিয়ান গ্রাম ইউনিয়নের রানী ভবানীর বাবার বাড়ি। সান্তাহারের আশপাশসহ আমাদের তারাপুরও রানী ভবানীর বাবার রাজ্যত্ব ছিল। তারই অংশ হিসেবে রানী ভবানীর আসা-যাওয়া ছিল এ গ্রামে। একজন মুসলমান মহিলা এই গ্রামে ছিলেন, যিনি পরহেজগার। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে ওই মহিলার নামাজ পড়ার অনেক অসুবিধা হতো। রানী ভবানী এমন কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই এই গ্রামে চলে আসেন আর সেই মহিলাকে যেন কেউ তার নামাজ পড়াতে অসুবিধা না করতে পারে, সে জন্য তার পেয়াদারদের হুকুম দেন_ তার জন্য রাজকীয় নকশায় একটি মসজিদ তৈরি করে দেওয়া হোক। এভাবেই এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তবে এটাও তার দাদার মুখ থেকে শোনা। দাদা আবার শুনেছেন তার দাদার কাছে।
এক পর্যায়ে আমরা এ মসজিদটি মেপে দেখি। লম্বায় এই মসজিদের উচ্চতা ১৫ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। মসজিদের দরজার উচ্চতা ৪ ফুট আর চওড়া দেড় ফুট। একটি মানুষ অনায়াসে সেখানে ঢুকতে বা বের হতে পারবে। একটি গম্বুজ আছে যেটা অনেকটাই উঁচুতে। আর দেয়ালের পুরুত্ব দেড় ফুট। এ ছাড়া দেয়ালটি ইটের তৈরি। যে ইটগুলো মসজিদের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর সবটার অর্ধেক ভাঙা। মসজিদের দরজায় দুটি রাজকীয় নির্দেশনার আদলে নির্মিত খিলান আছে। মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সংবলিত মিনার, দরজার খিলান এবং মেহরাবই মসজিদটির প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে।
আসলে এটি এত পুরনো আর সংস্করণের অভাবে এটির যে অবস্থা, মসজিদটি দেখার পরও তেমনভাবে বিশেষ চিহ্ন বা নিদর্শন চোখে পড়ে না। এমন একটি নিদর্শন আমাদের সংরক্ষণ করা এখনই দরকার।

সূত্র : সমকাল

Sunday, January 1, 2012

৭১ এর সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডার | মরুভূমির জলদস্যু

মানচিত্রে ১১টি সেক্টর ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাতে বলা হয়ঃ সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হল যে প্রধান সেনাপতি অফিসারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। সেনা কমান্ডকে সমন্বিত করে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। বাংলাদেশ বাহিনীতে প্রশিক্ষণার্থীদের বাছাইপর্বে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পরবর্তীতে ১১ই জুলাই মুজিবনগরে কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডকে ১১টি যুদ্ধক্ষেত্র বা সেক্টরে ভাগ করা হয়। । প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। নিচে সেক্টর নং, সেক্টর আওতা, সেক্টর কমান্ডার ও আরো কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হলো। সর্বাধিনায়ক ও প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী উপ প্রধান সেনাপতি ও বিমানবাহিনী প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার উপ প্রধান সেনাপতি ও সেনাবাহিনী প্রধান (ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি।) লে.কর্নেল আবদুর রব ১নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার : মেজর জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) (এপ্রিল- জুন) সেক্টর কমান্ডার : মেজর রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম) (জুন - ডিসেম্বর) এলাকা : চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার অংশ বিশেষ (মুহুরী নদীর পূর্বপাড় পর্যন্ত)। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২১০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২০,০০০। ২নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর এ.টি.এম হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) এলাকা : কুমিল্লা জেলার অংশ, ঢাকা জেলা ও ফরিদপুর জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৪,০০০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৩০,০০০। ৩নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ (বীর উত্তম) (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর), সেক্টর কমান্ডার মেজর এ.এন.এম নুরুজ্জামান (বীর উত্তম) (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) এলাকা : কুমিল্লা জেলার অংশ, ময়মনসিংহ জেলার অংশ, ঢাকা ও সিলেট জেলার অংশ। সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৬৬৯৩ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। ৪নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর জে: চিত্তরঞ্জন দত্ত (বীর উত্তম) এলাকা : সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট-ডাউকি সড়ক পর্যন্ত। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৯৭৫ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০। ৫নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী (বীর উত্তম) এলাকা : সিলেট-ডাউকি সড়ক থেকে সিলেট জেলার সমগ্র উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল ও ময়মনসিংহ জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ১৯৩৬ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৯,০০০। ৬নং সেক্টর উইং কান্ডার খাদেমুল বাশার এলাকা : সমগ্র রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১১,০০০। ৭নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক ( অগাস্ট পর্যন্ত ) সেক্টর কমান্ডার মেজর কাজী নুরুজ্জামান (বীর উত্তম) এলাকা : রংপুর জেলার অংশ, রাজশাহী জেলার অংশ, পাবনা জেলার অংশ ও দিনাজপুর জেলার অংশ, বগুড়া জেলা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল নয়টি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ১২,৫০০। ৮নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী (এপ্রিল- আগস্ট), সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মুঞ্জুর (বীর উত্তম) (আগস্ট-ডিসেম্বর) এলাকা : যশোর জেলা, ফরিদপুর জেলা, কুষ্টিয়া জেলা, খুলনা ও বরিশাল জেলার অংশ। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ৯নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল মিঞা (এপ্রিল-ডিসেম্বর প্রথমার্ধ), সেক্টর কমান্ডার মেজর জয়নুল আবেদীন ( ডিসেম্বর এর অবশিষ্ট দিন) (ছবি সংগ্রহ করতে পারিনি।) এলাকা : দৌলতপুর-সাতক্ষীরা সড়ক থেকে খুলনার দক্ষিনাঞ্চল এবং সমগ্র বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল তিনটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ৩৩১১ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ৮,০০০। ১০নং সেক্টর কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী (সর্বাধিনায়ক ও প্রধান সেনাপতি মুক্তিবাহিনী) এলাকা : প্রধান সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে (নৌ সেক্টর) সমগ্র বাংলাদেশ। এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল নৌ-কমান্ডোদের দিয়ে। বিভিন্ন নদী বন্দর ও শক্র পক্ষের নৌ-যানগুলোতে অভিযান চালানোর জন্য এঁদের বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হতো। যে সেক্টর এলাকায় কমান্ডো অভিযান চালানো হতো, কমান্ডোরা সেই সেক্টর কমান্ডারের অধীনে কাজ করত। নৌ-অভিযান শেষে তারা আবার তাদের মূল সেক্টর- ১০ নম্বর সেক্টরের আওতায় চলে আসত। নৌ-কমান্ডোর সংখ্যা ছিল ৫১৫ জন। ১১নং সেক্টর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের (বীর উত্তম) (আগস্ট-নভেম্বর), সেক্টর কমান্ডার স্কেয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ (নভেম্বর-ডিসেম্বর) এলাকা : কিশোরগঞ্জ মহকুমা বাদে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা এবং নগরবাড়ি-আরিচা থকে ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত যমুনা নদী ও তীর অঞ্চল। এই সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপস্ ছিল ২৩১০ সৈন্য এবং গেরিলা ছিল ২৫,০০০। টাংগাইল সেক্টর কাদের সিদ্দিকী। এলাকা : সমগ্র টাংগাইল জেলা ছাড়াও ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার অংশ আকাশ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার এলাকা: বাংলাদেশের সমগ্র আকাশসীমা তথ্য সূত্র : সেক্টর কমান্ডারর্স ফোরাম গুণীজন উইকি গুগল এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের ঝিঁঝি পোকার বাগানে নিমন্ত্রণ।

Friday, November 25, 2011

মুসলমানদের হাতেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে || হাসান শান্তনু

উনিশ শতকের নবজাগরণে বাঙালি মুসলমানের অংশগ্রহণ অনেকটা বিলম্বিত ও বিঘ্নিত হলেও বিশ শতকের প্রথম তিন দশকে অতি দ্রুত তারা এ সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সমর্থ হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও রুশ বিপ্লবের রক্তিম অভিজ্ঞতার ছোঁয়া তাদের নবজাগরণের তারুণ্যদীপ্ত উদ্দীপনার সঙ্গে সাম্যবাদী রাজনীতির গণমুখী চেতনা যুক্ত করে দেয়। অধঃপতন থেকে উত্তরণের জন্য উনিশ শতকের শেষ চতুর্থাংশে শুরু হয় নানা কর্মপ্রচেষ্টা। মুক্তির উপায় হিসেবে যেসব পথ তখন বিবেচিত হয়, মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ওই সময়ে গুরুত্ব দেয়া হয় মুসলমানের ধর্মজীবন, তার ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীরত্বগাথা ইত্যাদি চর্চার ওপর।
বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য ইতিহাসবিদ নারায়ণ দত্তের আলোচিত একটি উক্তি ধার করা যায়। তিনি বলে গেছেন, ‘জন্মের সেই পরম লগ্নেই কলকাতার অস্বাস্থ্যকর জলাভূমির মানুষ এক অসুস্থ খেলায় মেতেছিল। তাতে স্বার্থবুদ্ধিই একমাত্র বুদ্ধি, দুর্নীতিই একমাত্র নীতি, ষড়যন্ত্রের চাপা ফিসফিসানিই একমাত্র আলাপের ভাষা।’ মুসলমানদের আত্মপ্রতিষ্ঠা তাই সেই সময়ে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। চিন্তাশীল ব্যক্তিরা অনুধাবন করেন আত্মজাগরণ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সংঘ-সমিতি প্রতিষ্ঠা আর পত্রিকা, বই প্রকাশের কথা। তারাই মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য ও মুসলমানদের অবমাননাকর অবস্থা থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উদ্ধার করেন। পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও জীবন তাদের সাহিত্যে আপন হয়ে ওঠার ফলে আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলমানদের চেহারা ফুটে উঠতে শুরু করে। যা কলকাতার হিন্দু সাহিত্যিকরা পারেননি। মুসলমান লেখকদের আবির্ভাবের মধ্য দিয়েই মূলত বাংলা সাহিত্যের চেহারাটা পুরোপুরি বদলে যায়। সাহিত্যের প্রকৃত রূপটিও তখন নির্মিত হয়। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হয়ে ওঠার পেছনে অবদান ওই লেখকদেরই। মুসলমানদের অবদানের ফলেই পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্য বিকশিত হয়।
অতীতে ত্রয়োদশ শতক থেকে মুসলমান সুলতানগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। ওই সময় আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র আমলে নতুনভাবে বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হয়। এক সময় বাংলা ভাষাকে বলা হতো ‘পক্ষী ভাষা’ অর্থাত্ পাখিদের ভাষা। কথাটি অবজ্ঞা ভরে বলতেন বর্ণহিন্দুরা। এই ভাষা সম্পর্কে একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে— অষ্টাদশ পুরাণানী রামস্যচরিতানিচ/ভাষায়ং শ্রত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেত্। অর্থত্ এই ভাষায় অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ন যারা পাঠ করবেন তারা রৌরব নরকে জ্বলবেন। এ অবস্থা থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করেন মুসলমান সুলতানগণ।
মুসলমান লেখকরা কলকাতায় ও ঢাকায় কিছু কিছু সংগঠন গড়ে তোলেন। অবশ্য যথার্থ ও শক্তিশালী সাহিত্য সংগঠনের জন্য বাঙালি মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হয় বেশ কয়েক বছর। ১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি মুসলমানের প্রথম উল্লেখযোগ্য সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’।
বাঙালি মুসলিম সমাজে এ সমিতির ভূমিকার মূল্যায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার এএফ রহমান ১৯৪৩ সালের মে মাসে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অনুষ্ঠিত সমিতির শেষ সাহিত্য-সম্মেলনে বলেন, ‘নবীন মুসলমান সাহিত্যিকদের উত্সাহ দেয়ার জন্য, তাঁদের রচিত জিনিসগুলো জনসাধারণের সম্মুখে ফুটিয়ে তোলার জন্য মুসলিম সাহিত্য সমিতির প্রয়োজন হয়। এই সমিতি অনেকটা সফলতা লাভ করেছে। নবীন সাহিত্যিকরা আজ বঙ্গসাহিত্যে উচ্চ স্থান অধিকার করে সমাজের মুখোজ্জ্বল করেছেন, সেটা এই সমিতির অক্লান্ত পরিশ্রম, চেষ্টা ও একনিষ্ঠ সেবার ফল। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সমিতির গঠন, তা সফল হয়েছে। এর অক্লান্ত কর্মীদের কাছে আমাদের সমাজের ও বঙ্গ-সাহিত্যের ঋণ অপূরণীয়’।
কয়েকজন মুসলিম তরুণের প্রবল উত্সাহে প্রতিষ্ঠিত হয় ওই সাহিত্য-সমিতি। এর অন্তত ১৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গেও মুসলমান লেখকদের কেউ কেউ যুক্ত ছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ‘মুসলমান সাহিত্যিকদের সেখানে দারিদ্র্যের দরুন বড় লোকের ঘরে গরিব আত্মীয়ের মতন মন-মরা হয়ে যোগদান করতে হতো।’
নবীন লেখকদের সংগঠিত করে উত্সাহ-উদ্দীপনা জোগানো আর সাহিত্যের মাধ্যমে মুসলমান সমাজ-জীবনের বিভিন্ন দিকের প্রতিফলন ঘটানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া তাই ঐতিহাসিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেজন্য দরকার ছিল নিজেদের একটি সংগঠন।
ওই সাহিত্য সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবদুল করিম, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, কাজী ইমদাদুল হক, কমরেড মুজাফফর আহমদ, কাজী আবদুল ওদুদ, প্রকাশক আফজাল উল হক, এয়াকুব আলী চৌধুরী, গোলাম মোস্তফা, হবিবুল্লাহ বাহার, আইনুল হক খান, আবুল মনসুর আহমদসহ আরও অনেকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংরেজ শাসনের সমকালে বাংলায় হিন্দুর চেয়ে মুসলমানের সংখ্যা কম ছিল না। তবু কলকাতাশাসিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তাদের জীবন আদৌ কোনো উপস্থিতি ছিল কিনা, এ প্রশ্নও রাখা যায়।
১৮৭০ সাল অব্দি মুসলমানরা সাহিত্যকর্মে হাত না দেয়া পর্যন্ত তাদের জীবনও সাহিত্যে ঠাঁই পায়নি। জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা লেখার আগে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কবর আর কায়কোবাদের ‘আজান’ কবিতা লেখার আগে আজান কোনোরকম বিশেষত্ব পায়নি। গুটিকয় কবি-সাহিত্যিকের আকস্মিক আবির্ভাব না হলে মুসলমান বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন আধুনিক বাংলা সাহিত্য পাঠকের মনে কোনো ধরনের আগ্রহেরই উদ্রেক করত না। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, বেগম রোকেয়া, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দীনেশচন্দ্র সেন, কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীম উদ্দীন।
বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার জন্য ভারতের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মন্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান সমাজ ও চরিত্র’ শিরোনামে পিএইচডি থিসিস প্রণয়ন করেন। এতে তিনি রবীন্দ্র-সাহিত্যে মুসলিম সমাজ ও চরিত্র সম্পর্কে বলেন, ‘সমগ্র রবীন্দ্র-সাহিত্যে মুসলমান সমাজ-জীবন ও চরিত্র তুলনামূলকভাবে কম হলেও একথা স্বীকার করেত হবে, রবীন্দ্রনাথই ভারতবর্ষীয় তথা বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সুবিচার করেছেন।’ মুসলমানরা যে কলকাতার সাহিত্যে উপেক্ষিত ছিল, তা ওই শিক্ষকের মন্তব্য থেকেও ফুটে ওঠে। কেননা, শরত্চন্দ্রকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ‘স্বীকার’ করেন, মুসলমানদের ঘরের কথা তিনি তেমন জানেন না।
শুধু রবীন্দ্রনাথই নয়, মাইকেল মধুসূদন, ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল, মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণদের সাহিত্যেও মুসলমানরা উপেক্ষিত ছিলেন। অন্যদিকে মশাররফ, কায়কোবাদ, নজরুলসহ মুসলিম সমাজের অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিকের কবিতা ও সাহিত্যে সেই অভেদ শিল্প-সংস্কৃতির রূপরেখা অকপটে ফুটে ওঠে। তারা মুসলমানদের প্রাণের কথাকে নিজেদের প্রাণের কথা হিসেবে যেমন গুরুত্ব দেন, হিন্দুর প্রাণের কথাকেও তাদের প্রাণের কথা হিসেবে তেমন গুরুত্ব দেন। হ
(তথ্যসূত্র : ড. মুনতাসীর মামুন, রফিকউল্লাহ খান, হাবীব রহমানের প্রবন্ধ)

Wednesday, September 7, 2011

ব্রিটিশ বিরোধী আন্শাদোলনের অন্যতম বীর যোদ্দা তিতুমীর

তিতুমীর (১৭৮২-১৮৩১)চব্বিশ পরগনা জেলার হায়দরপুর গ্রামে ১৭৮২ সালে মীর নিসার আলি ওরফে তিতুমীরের জন্ম। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বা ১১৭৬ বঙ্গাব্দে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিড়্গ হয়, তা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে খ্যাত। সে দুর্ভিড়্গে এ দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ...্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সে সময়ে দেশে ছিল চরম অরাজক অবস্থা। সে সঙ্গে চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের অত্যাচার ও জবরদস্তি।

দেশের সাধারণ মানুষের নির্যাতিত অবস্থা তিতুমীরের সহ্য হয়নি। তিনি মুষ্টিযুদ্ধ, অসি চালনা, লাঠিখেলা, তীরছোড়া শিক্ষা করেন। উদ্দেশ্য অত্যাচারী জমিদার ও চোর-ডাকাতের হাত থেকে স্থানীয় জনসাধারণকে রক্ষা করা।

১৮২১ সালে তিতুমীর হজ উপলক্ষে মক্কা শরিফে যান। সেখানে ওয়াহারী আদর্শের প্রবক্তা সৈয়দ আহমদের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মক্কা শরিফ থেকে ফিরে তিতুমীর নারিকেলবাড়িয়ার কাছাকাছি হায়দরপুরে বসবাস শুরম্ন করে ধর্ম সংস্কারক হিসেবে তার কাজ আরম্ভ করেন। তার গুরম্নর ওয়াহাবী আন্দোলনের মতাদর্শ প্রচার শুরম্ন করার স্বল্পকালের মধ্যেই তিনি তিন চারশ শিষ্য সংগ্রহ করেন। ক্রমেই তার বিচড়্গণতা এবং পারদর্শিতা সবার দৃষ্টি কাড়ে। শুধু ধর্মসংস্কারই নয়, হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার থেকে নিম্নবিত্ত মুসলমান জনসাধারণকে মুক্তি দেয়ার লড়্গ্যেও তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্বীয় ধর্মের অত্যাচারিত মানুষ তার নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। তার এই অসাধারণ সাফল্যে হিন্দু জমিদাররা ভয় পেয়ে যায়। তিতুমীরের কার্যকলাপে রম্নষ্ট হয়ে ওঠেন পুড়ার জমিদার ও নীলকররা।

এর আগে তিতুমীর চাঁদপুর-হৃদয়পুরের এক সভায় বক্তৃতা করেন। বক্তৃতার বিষয় ছিল ইসলামে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন, রাসূলুলস্নাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন, হিন্দু-মুসলিম কৃষক সম্প্রদায়ের একতাবদ্ধ হওয়া, নীলকরদের অত্যাচার দমন এবং দেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়ন। ফলে বিভিন্ন জমিদার-নীলকর সবাই মিলে তিতুমীরকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

শুরু হয় ওয়াহাবীদের ওপর জমিদারের অত্যাচার, এমনকি তাদের দাড়ির ওপর খাজনা আদায় শুরম্ন হয়। ফলে তিতুমীর জমিদারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এই সময় ফকির মিসকিন শাহ তার শিষ্যদের নিয়ে তিতুর সঙ্গে যোগ দেন।

স্থানীয় জমিদারদের সঙ্গে কয়েকটি সংঘর্ষে তিতুমীর জয়লাভ করেন। তার দলে অনেকে এসে যোগ দেয়। তিতুর নির্দেশে হিন্দু-মুসলমান প্রজারা জমিদারের খাজনা বন্ধ করে দেয়।

জমিদার ও নীলকরদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৮৩০ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারকে পাঠানো হয় তিতুমীরকে দমন করার জন্য কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট ও তার সিপাহি- বাহিনী তিতুমীরের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্তô হয়। তিতুমীর এরপর কয়েকটি নীলকুঠিও লুণ্ঠন করেন।

ইতিমধ্যে তিতুমীর নিজেকে স্বাধীন বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সম্ভাব্য আক্রমণের মোকাবেলায় নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে একটি সুদৃঢ় বাঁশের কেলস্না তৈরি করেন। তিতুমীরের বাহিনী বাঘারেয়ার নীলকুঠির প্রাঙ্গণের এক যুদ্ধে নদীয়ার কালেক্টর এবং নদীয়া ও গোবরডাঙ্গার জমিদারের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়।

অবশেষে বাঁশের কেলস্না আক্রমণের জন্য ইংরেজ সরকারের পাঠানো পদাতিক ঘোড়সওয়ার ও গোলন্দাজ বাহিনীর সঙ্গে তিতুমীরের তীর-বল্লমসজ্জিত বাহিনীর যুদ্ধ হয় ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর। এই অসম যুদ্ধে তিতুমীরসহ বহুসংখ্যক যোদ্ধা শহীদ হন। কামানের গোলায় বাঁশের কেলস্না উড়িয়ে দেয়া হয়।

এই বিদ্রোহ জমিদার, মহাজন, নীলকর ও ইংরেজ শাসকের বিরম্নদ্ধে পরিচালিত হলেও যুগের প্রভাবে ধর্মীয় ধ্বনিও তাতে প্রাধান্য পেয়েছিল এবং তার ফলে তা হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে মিলিত করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও দেশীয় সামন্ত শক্তি এবং বিদেশি শাসকশক্তির বিরম্নদ্ধে সম্প্রসারিত এই বিদ্রোহ ভবিষ্যতে সংগ্রামের ভিত তৈরি করেছিল।

Wednesday, July 6, 2011

বরগুনার বিবিচিনি শাহী মসজিদ

বরগুনার বেতাগী উপজেলার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে বিবিচিনি শাহী মসজিদ অন্যতম। সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩৩ ফুট, প্রস্থ ৩৩ ফুট। দেয়ালগুলো ৬ ফুট চওড়া। দক্ষিণ এবং উত্তর দিকে তিনটি দরজা রয়েছে। এগুলো খিলানের সাহায্যে নির্মিত হয়। মসজিদের ইটগুলো বর্তমানের আধুনিক যুগের ইটের মতো নয়। এগুলো মুঘল আমলের তৈরি ইটের মাপের মতো। ইটের দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০ ইঞ্চি এবং চওড়া। সমতল ভূমি মসজিদ নির্মিত স্থানটি আনুমানিক কমপক্ষে ৩০ ফুট সুউচ্চ টিলার ওপর অবস্থিত। তার ওপর প্রায় ২৫ ফুট মসজিদ গৃহ। শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি নামজাদা কলুষমুক্ত পীর বলে পরিচিত ছিলেন। এই প্রিয় ব্যক্তিত্বের অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। জানা যায়, ওই সময় বিষখালী নদীর পানি ছিল লবণাক্ত। পানের উপযোগী ছিল না। সুপেয় পানির অভাবে জনগণ বহু কষ্ট পেত। নেয়ামত শাহ্ মানুষের এই কষ্টের কথা অনুভব করে তার সাধকতার আশ্চর্য তসবিহটি বিষখালী নদীতে ধুয়ে দিলে পানি হয়ে যায় সুপেয়। আজও সেই পানি একই অবস্থায় রয়েছে। তা ছাড়া সে যুগে সুন্দরবনসংলগ্ন বিষখালী নদীতে অসংখ্য কুমির ছিল। তার অলৌকিক প্রচেষ্টায় বিবিচিনিসংলগ্ন বিষখালী নদী এলাকায় কোনো কুমির আসত না। এসব কাহিনী এখনো এ এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। এ দর্শনীয় শোভা বর্ধনকারী মসজিদটি ঘিরে রয়েছে নানা ধরনের ঘটনা, যা মানুষের মনে কৌতূহল সৃষ্টি করে। শোনা যায়, আগেকার সময় স্বপ্নেপ্রাপ্ত দূরবর্তী অনেক লোক এ মসজিদ থেকে গুপ্তধন নিয়ে যেত। প্রতিদিন এখানে অগণিত নারী-পুরুষ এসে নামাজ আদায় করত নেক মকসুদ পূরণের আশায়। এ ছাড়া টাকা-পয়সা ও অন্যান্য মানতের মালামাল রেখে যেত মসজিদ প্রান্তে। প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য মানুষ এসে সারাক্ষণ ইবাদত-বন্দেগি করে কাটায়। যে যে ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে এখানে আসে তার অধিকাংশ আশাই পূর্ণ হয় বলে অসংখ্য মানুষের কাছে শোনা যায়। মসজিদের পাশেই রয়েছে তিনটি ব্যতিক্রর্মী কবর। এগুলো সাধারণ কবরের মতো হলেও লম্বায় ১৪-১৫ হাত। মসজিদের পশ্চিম ও উত্তর পাশে অবস্থিত কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সাধক শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ এবং সহোদর চিনিবিবি ও ইছাবিবি। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে নেয়ামত শাহের ইহকাল ত্যাগের পর তাকে এ স্থানে সমাহিত করা হয়। বিবিচিনির ইতিহাস সমৃদ্ধ মসজিদটি সংরক্ষণ করা জরুরি।

* মনোতোষ হাওলাদার, বরগুনা 
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

বাংলাদেশের কিছু প্রসিদ্ধ খাবারের তালিকা ।। আহাম্মেদ খালিদ

খাবার খেতে আমরা সবাই ভালবাসি, আর সেই খাবারটা যদি হয় প্রসিদ্ধ তাহলেতো কথাই নেই। আমরা বাংলাদেশীরা প্রচন্ড রসনা বিলাসি, আমরা খাবারের পিছনে যত খরচ করে থাকি তত খরচ মনে হয় দুনিয়ার অন্য কোন দেশের মানুষ করেনা। আমরা খেতে যেমন ভালবাসি তেমন মানুষকে খাওয়াতেও ভালবাসি। আমাদের দেশের এক এক জায়গা এক এক খাবারের জন্য বিখ্যাত, আজ আমি আপনাদের তেমনি কিছু খাবারের নাম বলব যেখানে হয়ত আপনার প্রিয় খাবারটাও আছে। তাহলে চলুন দেখে নিই আমাদের দেশের ভিবিন্ন খাবারের তালিকা।

১। বগুড়ার দই
২। টাঙ্গাইলের চমচম
৩। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালের বড়া
৪। বাঘাবাড়ির ঘি
৫। নওগাঁর প্যারা সন্দেশ
৬। নাটোরের কাচাগোল্লা
৭। মুক্তাগাছার মণ্ডা
৮। মাদারীপুরের গুড়
৯। কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি
১০। ময়মনসিংহের আমিরতি
১১। কুমিল্লার রসমালাই
১২। নোয়াখালীর নারকেল নাড়– ও ম্যাড়া পিঠা
১৩। সিলেটের পাঁচলেয়ার চা
১৪। সিলেটের চুঙ্গাপুড়া
১৫। সাতক্ষীরার সন্দেশ
১৬। যশোরের জামতলার মিষ্টি
১৭। যশোরের খেজুরের নোলন গুড়ের প্যারা সন্দেশ
১৮। যশোরের খেজুর রসের ভিজা পিঠা
১৯। মাদারীপুরের রসগোল্লাতো
২০। রাজশাহীর তিলের খাজা
২১। শেরপুরের (জামালপুর) ছানার পায়েস, ছানার পোলাও
২২। চিটাগাং এর মিষ্টি পান
২৩। সিলেটের সাতকড়ার আচার
২৪। সিরাজদিখানের পাতক্ষীরা
২৫। রাজবাড়ির শংকরের ক্ষীরের চমচম
২৬। নওগাঁর রসমালাই
২৭। পাবনার প্যারাডাইসের প্যারা সন্দেশ
২৮। পাবনার শ্যামলের দই
২৯। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পানিতোয়া
৩০।পুরান ঢাকার বাকেরখনি
৩১। চট্রগ্রামের মেজবানের মাংস
৩২। কুষ্টিয়ায় মহিষের দুধের দই।
৩৩। মেহেরপুরের সাবিত্রী নামে একটা মিষ্টান্ন
৩৪। পুরান ঢাকার হাজীর বিরিয়ানী।
৩৫। বেইলি রোডের ফকরুদ্দিনের কাচ্চি।
৩৬। ধানমন্ডির মামা হালিম।
৩৭। ঘরোয়ার খিঁচুড়ী-মতিঝিল।
৩৮। শওকতের কাবাব-মিরপুর বেনারশী পল্লী।
৩৯। কিংস বেকারীর- মালাই রোল-গুলশান-১।
৪০। নোয়াখালী হোটেলের-গরুর গোস্ত ভূনা-পল্টন।
৪১। আবুলের-মালাই চা- বায়তুল মোকারম/পল্টন ওভারব্রীজের নীচে।
৪২।নন্দন রেস্তোরার- কপি মিক্সড চা- মহাখালী।
৪৩। ধানসিঁড়ির-মুরগীর রাব-বি-কিউ টিকিয়া-গুলশান-২।
৪৪। কুষ্টিয়ার তিলে খাজা
৪৫। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখি!
৪৬। মানিকপুর-- চকরিয়ার মহিষের দই
৪৭। রাঙ্গামাটির জুম রেস্তোরার বাঁশের ভেতর তৈরী খাবার।
৪৮। জামানের চা (আন্দর কিল্লা)
৪৯। ইকবালের সন্দেশ(দেওয়ান বাজার)
৫০। বোম্বাইয়াওয়ালার ক্ষীর(এনায়েত বাজার)
৫১। চন্দনাইশের গুরা আলু
৫২। ফরিদপুরের খেঁজুরের গুড়।
৫৩। মিসকিন শাহ মাজার এর সামনে চট্রগ্রাম বিহারী হোটেল ( চট্টগ্রাম কলেজের সামনে)মাংস রান্না ভুনা
৫৪। পুরান ঢাকার নান্নার বিরিয়ানী
৫৫। মহাস্থানের কটকটি
৫৬। হোটেল নিরবের ব্রেন ভুনা
৫৭। হাতিরপুলের শর্মা হাউসে শর্মা
৫৮। স্টারের শিক কাবাব
৫৯। ঠাটারী বাজার স্টারের বিরিয়ানী
৬০। আম্বরখানার হোটেল মারজিয়ার গরু ভুনা
৬১। কুষ্টিয়ার স্পেশাল চমচম
৬২। নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি
৬৩। ঢাকার চকবাজারের নুরানী লাস্সী
৬৪। ঢাকার বংগবন্ধু আভিনিউ এর পূর্ণিমার জিলাপী
৬৫। গুলশান এর সমরখন্দ এর রেশমী জিলাপী
৬৬। মতিঝিলের ঘরোয়ার খিচুরী
৬৭। পল্টন এর কস্তুরীর বাংলা খাবার
৬৮। মহেশখালীর মোষের দই
৬৯। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কলাইএর রুটি
৭০। রাজশাহীর রসকদম
৭১। চাপাই নবাব গঞ্জের শিবগঞ্জের চমচম
৭২। হ্যালভেশিয়ার(রাইফেলস স্কয়ার) চিকেন ব্রোস্ট।
৭৩। কিমা খিচুরি- "কৈ-পাবদা রেস্টুরেন্ট", মিরপুর-১।
৭৪। স্পিনাচ(ধানমন্ডি ৯/১০এ) এর ভেজিটেরিয়ান ডিশ
৭৫। ষ্টারের ফালুদা (ঠাঠারি বাজার)
৭৬। শিবগঞ্জের (চাঁপাই নবাবগঞ্জ) চমচম, প‌্যারা সন্দেশ।
৭৭। কাফে কর্ণারের (বাংলাবাজার, ঢাকা), ক্রাম চপ (মাংশের কাটলেট)
৭৮। বিরেন দা'র সিঙ্গারা (অলকার মোড়, রাজশাহী)
৭৯। চকবাজার ১০ নং গলির ঝালমুড়ি।
৮০। প্রমিনেন্টের (ঢাকার অভিজাত মিষ্টান্ন শপ) মালাই চপ, শন পাপড়ি।
৮১। পুরান ঢাকার হাজির বিরানী।
৮২। শেরপুরের (জামালপুর) ছানার পায়েস, ছানার পোলাও।
৮৩। আম্বালা ও ঢাকা ক্লাবের কাচ্চি বিরানী।
৮৪। সিলেটে উন্দাল এর স্পেশাল ভেজিটেবল
৮৫। খুলনার চুই-রাজ হাঁসের মাংস ( ব্লগার মহলদারের সৌজন্যে)
৮৬। গোয়ালন্দ ঘাটের ইলিশ এবং অন্য মাছ রান্না ,
৮৭। কিশোরগঞ্জের তালরসের পিঠা ( চিনির শিরায় ভেজানো)
৮৮। ভৈরবের নকশী পিঠা ,
৮৯। দিনাজপুরের শীদল,
৯০। চট্টগ্রাম, জিইসি মোড়ে ক্যান্ডির জিলাপি।
৯১। যশোরের ছানার মালপোয়া
৯২। মিরপুর-১ প্রিন্স হোটেলের হালিম, সিংগারা।
৯৩। মিরপুর এর শওকাত কাবাব
৯৪। পুরান ঢাকার "নান্নার বিরিয়ানি", "বিসমিল্লাহ কাবাব", "রয়েলের লাবান"

এটার মধ্যে যদো কোনটা বাদ পড়ে থাকে তাহলে জানাবেন।
( খাবারের লিস্ট টা মুকুট নামে একভাইয়ার থেকে সংগ্রহিত )

Monday, July 4, 2011

স্মৃতিসৌধের স্থপতি মাইনুল হোসেন

জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ মে। জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে। তার বাবা মুজিবুল হক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। ছেলেবেলায় মাইনুল চেয়েছিল প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে। ঢাকায় তখন গণঅভ্যুত্থানের ডামাডোল চলছে। ওই সময় মাইনুলকে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসে সিট পেলেও সেখানে তার মন টিকত না। সুযোগ পেলেই চলে যেতেন ধানমন্ডির খালার বাসায়। ১৯৭১ সালে দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায় বুয়েটে। মাইনুল তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেন। খুব কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বরের পর সৈয়দ মাইনুল হোসেন ফিরে যান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসে। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক হন। ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে EAH Consultant Ltd-এ জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগ দেন। কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে ওই বছরের আগস্টে যোগ দেন 'বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড'-এ। তার কর্মজীবন বেশ বৈচিত্র্যময়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর নকশা আহ্বান করা হয়। তখন ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি মাইনুল স্মৃতিসৌধের নকশা জমা দেন। প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি প্রথম হয়ে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার পান। আর তার করা নকশা অনুসারে ঢাকার অদূরে সাভারে নির্মিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এরপর তিনি স্থপতি সংসদ লিমিটেড, শহীদুল্যাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড এবং কুয়েতের আল ট্রুট লিমিটেডে কাজ করেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সৈয়দ মাইনুল হোসেন ৩৮টি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেন। এর মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, IRDP ভবন কাওরানবাজার, ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন, চট্টগ্রাম ইপিজেড, বাংলাদেশ চামড়াজাত প্রযুক্তির কর্মশালা ভবন, উত্তরা মডেল টাউন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাদ্য গুদামের নকশা, কফিল উদ্দিন প্লাজা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের নকশা করেছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি বেশ অসুস্থ ও অবসর জীবনযাপন করছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মহান এই স্থপতি একুশে পদক লাভ করেন।

জগদীশ দাশ 
সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

Saturday, July 2, 2011

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের তালিকা ।। সারোয়ার সোহেন


বাংলাদের প্রথম রাষ্ট্রপতির নাম কি? কেউ বলবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।, আবার কেউ হয়তো বলবেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

এই দুই দলের বক্তব্যই সঠিক। তাহলে প্রশ্ন আছে একই সময় একই সাথে ভিন্ন দুইজন ব্যাক্তি কি করে প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়?

আসলে মূল বিষয়টি হচ্ছে সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম শপত নেন। যদিও প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচন করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ততকালিন পাকিস্থানে কারাবন্দি থাকার দরুন সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থিয়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপত নেন।

এবার বিচার করার দায়িত্ব পাঠকের, কে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি?

আমি এখানে বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রপতিদের নাম, তাদের মেয়াদকাল এবং কোন দল থেকে সমর্থীত হয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তার একটা তালিকা তৈরি করেছি। আর হে, সেই সাথে সকল রাষ্ট্রপতিদের ছবিও জুড়ে দিচ্ছি।

১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সময়কাল : ১১ই এপ্রিল ১৯৭১ইং হতে ১২ই জানুয়ারী ১৯৭২ ইং পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


২। সৈয়দ নজরুল ইসলাম। (অস্থায়ী)

সময়কাল: ১১ই এপ্রিল ১৯৭১ইং হতে ১০ই জানুয়ারী ১৯৭২ ইং পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


৩। বিচারপতি : আবু সাইদ চৌধুরী।

সময়কাল: ১২ই জানুয়ারী ১৯৭২ইং হতে ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭৩ ইং পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


৪। মোহম্মদ মোহম্মদউল্লাহ।

সময়কাল: ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭৩ ইং হতে ২৫শে জানুয়ারী ১৯৭৫ইং পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


৫। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সময়কাল: ২৫শে জানুয়ারী ১৯৭৫ ইং হতে ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ইং পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


৬। খন্দকার মোশতাক আহাম্মেদ।

সময়কাল: ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ইং হতে ৬ই নভেম্বর ১৯৭৫ইং পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


৭। বিচারপতি : আবু সাদাত মোহম্মদ সায়েম।

সময়কাল: ৬ই নভেম্বর ১৯৭৫ইং হতে ২১শে এপ্রিল ১৯৭৭ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)


৮। মেজর জেনারেল : জিয়াউর রহমান।

সময়কাল: ২১শে এপ্রিল ১৯৭৭ইং হতে ৩০শে মে ১৯৮১ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)


৯। বিচারপতি : আব্দুস সাত্তার। (অস্থায়ী)

সময়কাল: ৩০শে মে ১৯৮১ইং হতে ২৪শে মার্চ ১৯৮২ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)


১০। হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ।

সময়কাল: ২৪শে মার্চ ১৯৮২ইং হতে ২৭শে মার্চ ১৯৮২ইং পর্যন্ত।
জাতীয় পার্টি


১১। বিচারপতি : এ.এফ.এম আহসান উদ্দিন চৌধুরী।

সময়কাল: ২৭শে মার্চ ১৯৮২ইং হতে ১১ই ডিসেম্বর ১৯৮৩ইং পর্যন্ত।
জাতীয় পার্টি


১২। হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ।

সময়কাল: ১১ই ডিসেম্বর ১৯৮৩ইং হতে ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০ইং পর্যন্ত।
জাতীয় পার্টি


১৩। বিচারপতি : শাহাবুদ্দিন আহম্মদ। (অন্থায়ী)

সময়কাল: ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০ইং হতে ১০ই অক্টোবর ১৯৯১ইং পর্যন্ত।
নির্দলীয়


১৪। বিচারপতি : আবদুর রহমান বিশ্বাস।

সময়কাল: ১০ই অক্টোবর ১৯৯১ইং হতে ৯ই অক্টোবর ১৯৯৬ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)


১৫। বিচারপতি : শাহাবুদ্দিন আহম্মদ।

সময়কাল: ৯ই অক্টোবর ১৯৯৬ইং হতে ১৪ই নভেম্বর ২০০১ইং পর্যন্ত।
নির্দলীয়


১৬। অধ্যাপক : এ. কিউ. এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

সময়কাল: ১৪ই নভেম্বর ২০০১ইং হতে ২১শে জুন ২০০২ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল


১৭। ব্যারিষ্টার : জমির উদ্দিন সরকার।

সময়কাল: ২১শে জুন ২০০২ইং হতে ৬ই সেপ্টেম্বর ২০০২ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল


১৮। অধ্যাপক : ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ।

সময়কাল: ৬ই সেপ্টেম্বর ২০০২ইং হতে ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯ইং পর্যন্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল


১৯। অ্যাডভোকেট : জিল্লুর রহমান।

সময়কাল: ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯ইং হতে বর্তমান পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগ।


সূত্রঃ উইকি
ছবিঃ গুগল

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের ঝিঁঝি পোকার বাগানে নিমন্ত্রণ।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ