প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label জসীম উদ্দীন. Show all posts
Showing posts with label জসীম উদ্দীন. Show all posts

Friday, March 9, 2012

সোনালি আলোর ভুবন, কবি জসীম উদ্দীন | আসমা আব্বাসী

এই খানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে
এতোটুকু তারে ঘরে এনেছিনু পরীর মতোন মুখ
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেলো বলে কেঁদে ভাসাইতো বুক

সেই ডালিম গাছের রক্তিম ফুলগুলো পাপড়ি ছড়ায় আজও সবুজ দূর্বাদলের ওপর শান্তিতে নিদ্রারত কবির কবরে। আমার অতি প্রিয়জন কবি জসীম উদ্দীন, যাঁকে আমি ডাকি চাচা বলে। আব্বাসউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বন্ধুর, ভাইয়ের, অতি নিকট আত্মীয়ের।
সিলেটে হজরত শাহজালাল রাহমতুল্লাহ আলাইহির দরগায় টিলার সবুজ ঘাসে শুয়ে আছেন আমার আব্বা, খেজুর গাছ থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে কমলা রঙের খেজুর, ঝরে পড়ে তার পাতা। কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, ছবিতেও দেখিনি তাঁকে। দরগার সম্মান রক্ষার্থে মহিলারা কবরের পাশে যেতে পারেন না। সাদা প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে যখন দূর থেকে দেখি আব্বার কবর, মোনাজাতের হাত তুলি, তখন অম্বিকাপুরের ডালিম গাছের নিচের কবরগুলোর ছবি মনে ভেসে ওঠে।
উনিশশ’ তেষট্টি সালে বিয়ে হয়ে এসেছি পুরানা পল্টনে ‘হিরামন মঞ্জিলে’, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমার নবীন সঙ্গী আব্বাসীর সঙ্গে ঘুরতে বেরুতাম কখনও শান্তিনগর, কখনও কমলাপুর, কখনও নয়াপল্টন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি জসীম উদ্দীন, শিল্পী কামরুল হাসান, শিল্পী কলিম শরাফী, কবি মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা—এঁদের বাড়িগুলোতে আমাদের নিত্য আনাগোনা। গোসল নাস্তা পর্ব শেষে একটি রিকশাতে চড়ে দু’জনে দশ মিনিটেই পৌঁছে যেতাম গন্তব্যে। এই গুণীজনেরা যেন সোনার মানুষ। এত সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁদের সান্নিধ্য উপভোগ করতাম, বাড়িতে ফেরার তাগিদ থাকত না।
সবচেয়ে বেশি যাওয়া হতো কমলাপুরে জসীম উদ্দীন ও মমতাজ জসীম উদ্দীনের বাড়িতে। আমাদের দু’জনারই অতি প্রিয় এই চাচা ও চাচি, কবিতা ও সুখাদ্য, আকর্ষণ তো কম নয়। কী যে আনন্দের খনিতে অবগাহন! অতি সহজ সরল পরিবেশ, একতলা বাড়ির চারপাশে সুপুরি নারকেল কলা আম জাম কাঁঠালের গাছ ছায়া বিস্তার করে আছে, এক পাশে বেলী চামেলী গন্ধরাজ কামিনী মাধবীলতা জুঁইয়ের সুগন্ধি ঝাড়।
কবি জসীম উদ্দীন চাচা ও চাচি মমতাজ (যাঁকে আদর করে ডাকেন মণিমালা) স্নেহের চাদর বিছিয়ে ডেকে নিতেন কাছে। শীতের সকালে রোদ্দুরে পাটি পেতে বসে চাচি পরিবেশন করতেন নকশি পিঠা, মুড়ির মোয়া, নারকেলের নাড়ু, ঘন দুধের ক্ষীর। কত যে সুস্বাদু খাদ্য তাঁর ভাণ্ডারে, রাঁধতে ভীষণ ভালোবাসতেন, আরও ভালোবাসতেন লোকজনকে ডেকে খাওয়াতে। কবি চাচা তাঁর নতুন লেখা কবিতা পড়ে শোনাতেন মৃদু স্বরে, মুগ্ধ হয়ে শুনতাম আমরা। অনেক সময় আমরাই প্রথম শ্রোতা অথবা প্রথম পাঠক।
কবিতাপ্রীতি তো আমার জন্মসূত্রে পাওয়া উত্তরাধিকার। যখন শৈশবে পিতাকে হারিয়ে মায়ের হাত ধরে এসেছি মনু নদীর তীরে মৌলভীবাজার শহরে, যেখানে প্রকৃতি ও সাহিত্য এক হয়ে গেছে আমাদের জীবনে। হুরু মামু সৈয়দ মুজতবা আলীর ছোট বোন সৈয়দা হিফজুন্নেসা খানম গৌর বর্ণের রূপসী মহিলা আমার আম্মা। সবসময়ই সাদা রঙের শাড়িতে তাঁকে দেখেছি, রঙের কোনো ছিটেফোঁটা নেই, তবু কী অপরূপ, বিধাতা যেন তাঁর সৌন্দর্যের ভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছেন আমার মায়ের চেহারায় ও চরিত্রে।

তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়
মায়ামমতায় জড়াজড়ি করি মোর গৃহখানি রহিয়াছে ভরি
মায়ের আদরে ভাইয়ের স্নেহে বোনের মায়ার ছায়
যাবে তুমি ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়
তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে তোমারে সঙ্গে করি
নদীর ওপারে চলে যাব তবে লইয়া ঘাটের তরী

মায়ের মুখে শুনতাম কবিতাগুলো বিছানায় ঘুমুতে যাওয়ার ক্ষণে। আরও কত কবিতা, যেন স্বপ্নের জগতে চলে যাওয়া।

আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই
মামার বাড়ি পুণ্যিপুকুর
গলায় গলায় জল
এপার হতে ওপার গিয়ে
নাচে ঢেউয়ের দল
দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে
লাল শালুকের ফুল
রাতের বেলা চাঁদের সনে
হেসে না পায় কূল
আম কাঁঠালের বনের ধারে
মামা বাড়ির ঘর
আকাশ হতে জ্যোত্স্না কুসুম
ঝরে মাথার পর

রাখাল ছেলে রাখাল ছেলে বারেক ফিরে চাও,
বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?
ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ,
কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা,
সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,
সাঁঝ-আকাশের ছড়িয়ে-পড়া আবীর-রঙে নাওয়া;
সেই ঘরেতে এক্লা বসে ডাকছে আমার মা—
সেথায় যাব, ও ভাই এবার আমায় ছাড় না।

রাখাল ছেলে রাখাল ছেলে আবার কোথা ধাও,
পুব আকাশে ছাড়ল সবে রঙিন মেঘের নাও।

ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-ঝরা ঘাসে,
সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।
আমার সাথে করতে খেলা প্রভাত হাওয়া, ভাই,
সরষে ফুলের পাপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই।
চলতে পথে মটরশুঁটি জড়িয়ে দু’খান পা,
বলছে ডেকে, ‘গাঁয়ের রাখাল একটু খেলে যা’।
সারা মাঠের ডাক এসেছে, খেলতে হবে ভাই।
সাঁঝের বেলা কইব কথা এখন তবে যাই।

‘নীল নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ, কলার পাতা দোলায় চাপা শিশির ধোয়ায় পা’—এমন শ্যামলিমা ভরা গাঁ পৃথিবীর আর কোনো দেশে বোধ করি অবস্থান করে না। বাংলাদেশ এই হাজার হাজার গ্রামের প্রতিচ্ছবি ও প্রতিবিম্ব। মনে বড় সাধ জাগে এমন শ্যামল উদ্ভিদ লতাপাতা গুল্মময় গ্রামে ঘুরে বেড়াতে। আমার জন্মভূমিতে অনায়াসেই খুঁজে পাই কবির সেই ভালোবাসার গ্রাম। আমার অন্তরে তারা স্থায়ী ছবি এঁকে নেয় তাঁদের মাধুরিমায়।
যখন বড় হয়ে নিজে নিজে পড়তে শিখলাম ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’—কী বিস্ময় কী বিস্ময়। এত সহজ ছন্দে সহজ বাক্যে কবি সৃষ্টি করলেন অসাধারণ কাব্য।
আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো কবির অপূর্ব সৃষ্টি।

নদীর কূল নাই কিনার নাই রে
আমি কোন্ কূল হতে কোন্ কূলে যাব কাহারে শুধাই রে \

ও পারে মেঘের ঘটা
কণক বিজলি ছটা
মাঝে নদী বহে শাঁই শাঁই রে।
আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি আবার দেখি নাই রে \
বিষম নদীর পানি
ঢেউ করে হানাহানি
ভাঙ্গা এ তরণী তবু বাই রে।
আমার অকূলের কূল দয়াল বন্ধুর যদি দেখা পাই রে \

আমার গহীন গাঙ্গের নাইয়া
তুমি অপর বেলায় নাও বায়া যাও রে
ও দরদী কার বা পানে চাইয়া \

ভাটির দ্যাশের কাজল মায়ায়
পরাণডা মোর কাইন্দা বেড়ায় রে
ওরে আবছা মেঘে হাতছানি দেয়
কে জানি মোর সয়া-রে \

ঐ না গাঙ্গের আগের বাঁকে
আমার বন্ধুর দ্যাশ
কলাবনের বাউরি বাতাস দোলায় মাথার ক্যাশ;
কইও খবর তাহার লাইগা
কাইন্দা মরে এই অভাইগা রে
ও তার ব্যথার দেওয়া থাইক্যা থাইক্যা
ঝরে নয়ন বায়া রে \

জসীম উদ্দীন ও আব্বাসউদ্দীন যেন এক বৃন্তের দু’টি কুসুম। তাঁদের সেই অমর সৃষ্টি আজও স্পন্দিত হয় বাংলার লোকে-লোকান্তরে।
জসীম উদ্দীনের বাড়ির আবহে গ্রামবাংলার ছবি কী সুন্দর মমতায় চিত্রিত। বাঁশ ঝাড় কলাগাছ লাউয়ের মাচার ঐশ্বর্য, গোয়াল ঘরে গরু, আরও আছে হাঁস মুরগি ছাগল কবুতর। পাখিদের কিচিরমিচির তার সঙ্গে যুক্ত হয় কাকের কা-কা রব। কবি নিজ হাতে গাছপালার যত্ন করতেন। গাছের গোড়ায় পানি দেয়া, মাটি দেয়া, শুকনো ডাল কেটে ফেলা, পোকামাকড় সাফ করা সব নিজ হাতে করতেন। ফুল ও পাখি দুটোই ছিল তাঁর প্রিয়। কবিপত্নী শরত্কালের ভোরে উঠে প্রথমে শিউলি ফুল কুড়াতেন, তারপর সংসারের নানা কাজ। একবার কবি বাজার থেকে পঞ্চাশটি মাটির কলসী কিনে আনলেন, কবিপত্নী অবাক হয়ে দেখছেন, কবি বললেন, বাড়িতে অনেক গাছ আছে পাখিদের বাসার খোঁজে যাতে ঘুরাঘুরি করতে না হয়, তাই কলসীগুলো কিনে এনেছি। এগুলো রশি দিয়ে গাছে গাছে ঝুলিয়ে দেব। কলসীগুলোর গলার কাছে ফুটো করে আম গাছ জাম গাছ বেল গাছ কাঁঠাল গাছ চালতা গাছ সব গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। বাগানের দক্ষিণ কোণে ঝড়ে ভাঙা একটি সফেদা গাছ ও বকফুল গাছ ছিল। এই দুই গাছে নারকেল পাতা খড়বিচালী ঝুলিয়ে দেয়া হলো শালিক ও বুলবুলির জন্য, তারা বাসা বাঁধল সেখানে। আস্তে আস্তে কলসীগুলোতেও নীড় বাঁধল পাখিরা, যেন এক পক্ষীসাম্রাজ্য।

যে কবি এত ভালোবাসেন ফুল পাখি লতাপাতা, তিনি নিজ হাতে পাখিদের জন্য খৈ মুড়ি গুড় মেখে গাছের তলায় ছড়িয়ে দিতেন আর ঘুরে ঘুরে গান গাইতেন। পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে এসে বসত কবির পাশে, তিনি উজাড় করে স্নেহ বিলিয়েছেন তাদের, যেমন তাঁর নয়নের মণি কন্যা হাসনা ও আসমা, পুত্র হাসু, বাসু, রাসু—তেমনি তাঁর স্নেহের পরশ পেয়েছে কত না শিশু।
আমাদের শিক্ষা জীবনে নতুন করে পেয়েছি কবি জসীম উদ্দীনকে, তাঁর কবিতা পাঠ্যবইতে ছিল, ছিল অনার্স ক্লাসে। তখন থেকেই শ্যামল বরণ মায়াবী চেহারা কোমল হৃদয় কবিকে আপন ভাবতে শিখেছি। আমার মতো ক্লাসের সব শিক্ষার্থীর মনেই ছিল তাঁর জন্য গভীর মমতা। এত সহজে যে কবিতা মনের তারে তারে সেতারের সুর জাগিয়ে তোলে, তিনি আমাদের বাংলা সাহিত্যের গৌরব। কবিদের শ্রেণীভাগ করা যায় না, কাব্যের যে ক্ষেত্রেই তাদের সৃজন হোক না কেন, তাঁদের একমাত্র পরিচয় তাঁরা কবি। গীতিকবি, পল্লীকবি, মহাকাব্য কবি, বিদ্রোহী কবি, বিশ্বকবি যে নামেই ডাকা হোক না কেন তাঁরা হলেন সর্বজনীন, প্রত্যেকেই নিজস্ব ক্ষেত্রে প্রতিভার দীপ্তিতে ভাস্বর। রূপ রস বর্ণ গন্ধহীন বিবর্ণ পৃথিবীকে অপরূপ করে তোলাই তাঁদের কাজ। কবি জসীম উদদ্ীনের কাছে জাতির ঋণ সবসময়ই থাকবে, আমরা তাঁরই কাব্যচর্চার মধ্য দিয়ে নিবেদন করব আমাদের নিঃশর্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নৈবেদ্য।
সূত্র : আমার দেশ

আমার কবি | বেগম মমতাজ জসীম উদ্দীন

আমাদের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মার্দান শহরের অধিবাসী ছিলেন। ছোটবেলায় বাবার মুখে শুনছিলাম আমার দাদা মোহাম্মদ আমিনউদ্দীন খান; তার পিতা মোহাম্মদ মেহের খান এবং তার ভাই মোহাম্মদ লাল খান ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশবিরোধী সিপাহী বিদ্রোহে সরাসরি অংশগ্রহণ করছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহের পরাজয়ের পর তারা দুই ভাই পালাইয়া কলকাতা হইয়া বরিশালে আসেন এবং এখান থেইকা ফরিদপুরের বাহাদুরপুরের পাশে নলগড়া গ্রামে বসবাস করেন। ফারায়জী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহর এলাকা বাহাদুরপুর নানা কারণে তখন নিরাপদ ছিল। তাছাড়া ওই এলাকায় ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ও কম ছিল। ব্রিটিশদের এই দেশ থেকে তাড়াবার জন্য হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশধররা ছিলেন সক্রিয়।
আমার জন্মের আগে বাবা মোহাম্মদ মোহসেন উদ্দীন খান বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ১৯২০ সালে বিএ পাস করার পর বরিশালে স্কুল মাস্টারি শুরু করেন। আমার নানা মৌলভী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া বিক্রমপুরের অধিবাসী ছিলেন। পরে ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতিরে নারায়ণগঞ্জে বাড়ি-ঘর করেন। আমার মা আঞ্জুমান আরা তার একমাত্র মেয়ে। মায়ের বড় ভাই ছিল। উনি মারা যাওয়ার পর নানা মাকে শ্বশুর বাড়ি যেতে দেয়নি। আমি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার বাড়িতে ইংরেজি ১৯২৩ সালের ৩রা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করি। আমার নানার ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানির সাথে চুক্তি ছিল। তার ব্যবসা ছিল। নারায়ণগঞ্জ ডক ইয়ার্ড থেইকা তার মালামাল জাহাজে গোয়ালন্দ ঘাটে যাইত। নারায়ণগঞ্জে তার একটা বড় জুতার দোকান ছিল।...
আমার বড় মামা আবুল ফজল মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেলে নানা একেবারে ভাইঙ্গা পড়েন। তিনি একমাত্র মেয়ে মাকে বাবার কাছে যাইতে দিতে চাইতেন না। তাছাড়া বাবা সরকারি স্কুল মাস্টার, বদলির চাকরি ছিল। নানা ইদ্রিস মিয়ার সাথে আমার ভালো ভাব ছিল। শিশুকালে নানার হাত ধইরা রোজ সকাল বিকাল ঘুরতে বাইরাইতাম। জিমখানার মাঠে সাহেবরা গলফ খেলত। ব্রিটিশ আমলতো। সাইজা গুইজা নানার সাথে সকাল বিকাল সেই মাঠে যাইতাম। হাতে একটা ছরা বা লাঠি নিতাম। নানার যারা বন্ধু-বান্ধব, তারা আমারে দেইখা কত ঠাট্টা করত। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে বেড়াইতাম। নানার যেখানে ব্যবসা, সেই স্টিমার ঘাটেও মাঝে মধ্যে যাইতাম। তারপর যাইতাম নানার সঙ্গে সিনেমায়। আট বছর বয়সে প্রথম সিনেমা দেখি হংস থিয়েটারে নানার সঙ্গে। টারজান দা এ্যাপ ম্যান। সিনেমাটা কয়েকবার দেখছি। সিনেমা হলটা এখনও আছে।
নারায়ণগঞ্জের মর্গান গার্লস স্কুলে সাত বছর বয়সে ভর্তি হই ক্লাস ওয়ানে। বিক্রমপুরের আরব আলী নামে একটা লোক ছিল কাজের, সে স্কুলে নিয়া যাইত ও নিয়া আসত। নানার পূর্বপুরুষরা বিক্রমপুরের, তবে নোয়াখালীর সুধারাম তাদের আদি নিবাস এবং ব্যবসার জন্য নানা নারায়ণগঞ্জে বসবাস করছিলেন। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় আমার নানা ১৯২৯ সালে যে দালান তৈরি করছিলেন তার নাম মৌলভী বাড়ি, সেখানেই আমার বিয়া হয়। পুকুর ঘাট অলা বিরাট বাড়ি। ভাগাভাগি হওয়ার পরেও মূল বাড়িটা এখনও জ্যান্ত আছে। জসীম উদ্দীনের কবিতা পড়ছি ক্লাস নাইনে উইঠা। কি কবিতা ছিল? নাইনে থাকতে ম্যাট্রিক সিলেবাসে ছিল রাখাল ছেলে। দুই চার লাইন মনে আছে? রাখাল ছেলে, রাখাল ছেলে বারেক ফিরে চাও, বাঁকা গাঁয়ের পথটি ধরে কোথায় চলে যাও...। আমার মুখস্থ ছিল, এখন মনে নাই। আমি যখন ক্লাস টেনে, তখন মা ফরিদপুরে। বাবা ফরিদপুর জিলা হাই স্কুলের মাস্টার। আমার ছোট ভাই মিন্টু বাবা-মায়ের সাথে টেপাখোলার বাড়িতে থাকে। স্কুলের ছুটিতে আমি ফরিদপুরে যাই, ওরাও আসে। আদরে আদরে দিনগুলি কাটতেছিল। তখন মনে হইত এইভাবেই বুঝি সারাজীবন কাটতে থাকবে।
আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। দেখতেও বেশ ভালো ছিলাম। সবাই আদর করত। সোনা ভাই সোনা মা (নানী) একটু চোখের আড়াল হইলেই অস্থির হইয়া পড়ত। আমার নানীর বাবা হাজী ইব্রাহীম নারায়ণগঞ্জের প্রথম হাজী। শফিউল্লাহ সাহেবের সাথে আমার খালার আত্মীয়তা ছিল। উনি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইকোনমিক্সের লেকচারার। তার সঙ্গে কবি সাহেব আসলেন আমাদের বাড়িতে। জসীম উদ্দীন সেই সময় ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাংলার লেকচারার। শফিউল্লাহ সাহেব একদিন আমার নানা ভাইকে বললেন, আপনার বাড়িতে আগামীকাল একজন গুণী মানুষ আনব। যদি অনুমতি দেন। সোনা ভাই বললেন, লোকটি কে? উনি বললেন, ভদ্রলোক একজন কবি। সোনা ভাই খুব খুশি হইছিলেন। তিনি তো নিজেও কবিতার প্রতি দুর্বল ছিলেন। ফার্সি ও বাংলায় খুব সুন্দর আবৃত্তি করতে পারতেন আমার নানা। গুণী মানুষ পাইলে আপ্যায়ন করতেন নিজে। তিনি অনুমতি দিলেন। পরের দিন কবি সাহেব আসলেন পাইকপাড়ায় আমার নানার বাড়িতে। সোনা ভাই কবির জন্য সম্মানজনক মেহমানদারীর ব্যবস্থা করলেন।
ঐদিন কবি জসীম উদ্দীনকে ঝাপসা দেখছি। আমার ঘরের সামনে দিয়া তো সোনাভাইয়ের ঘরে যাইতে হয়। আমি ঘরের ভিতর থেইকা জানালা দিয়া দেখলাম—শফিউল্লাহ আর কবি সাহেব ছিলেন লম্বা। এক ঝলক দেখলাম একজন নতুন লম্বা মেহমান আমার ঘরের সামনে দিয়া হাইটা গেলেন। আমি তখন আলাদা রুমে থাকতাম। একপাশে আমার বিছানা আরেক পাশে নানীর বিছানা থাকত।
পনের ষোলদিন পরে শফিউল্লাহ সাহেবকে নিয়ে কবি আবার আসছিল। আমাকে জানানো হয়নি। পড়ার টেবিলে বইসা আছি। কিছুক্ষণ আগে আমার স্কুলের মাস্টার কুমুদরঞ্জন বাবু পড়াইয়া গেলেন। আমি খাতা টাতা গুছাই এদিক ওদিক তাকাই, এমন সময় দেখি এক ভদ্রলোক ওই ঘরের সামনে দিয়া আমার দিকে চাইতে চাইতে বারান্দা পার হইল। আমিও চাইয়া রইলাম। দেখলাম ভদ্রলোক গলায় চাদর প্যাঁচানো, মানে সাহেবি পোশাক না। ধুতি পরা পাঞ্জাবি পরা সাদা চাদর গলায়। চশমা ছিল না। জসীম উদ্দীন তখন মাঝে মধ্যে ধুতি পরতেন। তিনি আমার নানা ভাইয়ের ঘরে গেলেন। সন্ধ্যার একটু আগে। কিছুক্ষণ থাকার পর উনি চইলা গেলেন। যাওয়ার সময় আমি দেখি নাই। তারপরে কতদিন পরে আমাদের বাড়িতে আসছিলেন আমার ঠিক মনে নাই। প্রায় একমাস কি বিশ পঁচিশ দিন হবে। ঐ শফিউল্লাহ সাহেবের সাথেই আবার আসলেন। আসার সাথে সাথেই দেখলাম একটা চঞ্চল অবস্থা। খুব খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। আমি কিন্তু আগে থেইকা কিছুই জানি না।
আমি কি যেন একটা খাতা নাড়াচাড়া করতেছিলাম। হঠাত্ দেখি সেই ভদ্রলোক টপ কইরা আমার পড়ার টেবিলের সামনে যে চেয়ারে আমার মাস্টার মশাই বসেন সামনাসামনি, সেই চেয়ারটায় একাই বইসা পড়লেন। আমি একটু অবাকই হইয়া পড়লাম। হঠাত্ কোন জানান না দিয়া আমার ঘরের ভিতরে অচেনা মানুষ! আত্মীয়-স্বজন না। আশ্চর্য ব্যাপার। আমার একটা খাতা টান দিয়া নিয়া বলল, খুকী তুমি এই খাতাটা আমাকে দিবা, আমি তোমাকে একটা কবিতা লেইখা দেই? আমি মাথা ঝুলাইলাম। কিছুক্ষণ বেশ কাটাকুটি কইরা এক পৃষ্ঠায় কবিতা আর এক পৃষ্ঠায় গান লিখলেন। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন খুকী তুমি কবিতা ভালোবাস? আমি একটু ঠাট্টাচ্ছলে বললাম, না। কথাটা বলার পর আমি একটু হাইসা দিছি। তারপর আর কোন কথা হয় নাই। তখন তো আমি জানি যে কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা আমাদের সিলেবাসে আছে। রাখাল ছেলেটা। আমার খাতায় লেখা কবিতাটা ছিল—
আমারে করিও ক্ষমা
সুন্দরী অনুপমা
তোমার শান্ত নিভৃত আলয়ে
হয়তো তোমার খেলার বাসরে
অপরাধ রবে জমা
আমারে করিও ক্ষমা।
নারায়ণগঞ্জের মর্গান স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। ওটা শুধু মেয়েদের স্কুল ছিল, প্রাইভেট স্কুল। এখনও গেলে দেখি সেই গেইট, সেই ভবন। ও এখন মনে পড়ছে। ভদ্রলোকের সামনে আরও কিছু সময় ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, খুকী তুমি কি গান গাইতে পার? আমি বললাম, না। আসলে গান জানতাম।
ভদ্রলোক তো আমারে দেখার পর নানা দিক থেইকা আমার নানা ভাইরে হাত করার জন্য লাইগা গেল। অনেককে দিয়া সুপারিশ করতে লাগল। ওই যে আমারে দেখল, আমার রূপ তার মনে ধইরা নিল, কবি তো!
কবি সাহেব আরেকদিন যখন আসলো, আমাকে গান গাওয়ার জন্য পনের বিশ মিনিটের মত অনুরোধ। আমি আর হারমোনিয়ামে হাত দেই না। আমার নানী ধমক দিল খুব জোরে। নামকরা লোকের সাথে বেয়াদবি করতেছ। গান শিখছ তো মানুষরে শুনানোর জন্যই। শুনাও। তারপর আমি তখন গাইছিলাম নিশীথে যাইও ফুলবনে...। এটা জসীম উদ্দীনের লেখা গান। কিন্তু আমি তখন জানতাম না। আমার গানের মাস্টার শিখাইছিল রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের গান এবং এই গানও। তারপরও আরও গান গাইতে খুব অনুরোধ করছিল। আমি আর গাই নাই।
কবি সাহেব আমাকে প্রথম দেখার পর তলে তলে অনেক ঘটনা ঘটতেছিল। আমি কিছুই জানি না। আমার মনে হইতে লাগল ভদ্রলোক যে ঘন ঘন এই বাড়িতে আসতেছে ব্যাপারটা কি! তারপরে আমার খালারা হাসি মস্করা কানা-ঘুষা তাতে একটা আলামত পাওয়া গেল। একদিন আমার এক আত্মীয় ঠাস কইরা বইলা ফালাইল, তোমাদের বাড়িতে যে কবি জসীম উদ্দীন আসে তার সাথে তোমার বিয়া ঠিক করতে চায় তোমার নানা। তুমি রাজি আছ কি না? তিনি আমার মাধ্যমে জানতে চান। আমি ছেলেমানুষী ছলে বইলা ফালাইলাম, আমার মত আছে। তারপর দৌড় দিয়া দিদির সামনে থেইকা পালাইয়া গেলাম। আমার আনন্দ হইতে লাগল যে একটা বিয়া হইতে যাইতেছে। হৈচৈ কত মজা হবে। কিন্তু ব্যাপারটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তখন তা বুঝি নাই।
তারপর তো আর কি চাই! নাতিন বিয়ায় রাজি হইয়া গেছে। সোনা মা মনে করছিল রাজি হব না। কবি হিসেবে তাকে তো জানতামই। তখন মনে হয় নাই একটা কালো লম্বা মানুষ, আবার কবি, তার সাথে আমার বিয়া হইতে যাইতেছে। আমার মা অবশ্য বিয়া দিতে চায় নাই। কালো, এ জন্য আমার কোন অসুবিধা ছিল না। তারে দেইখা আমারও পছন্দ হইছিল। বয়সটাও আমার কাছে কোন বাধা মনে হয় নাই। সবচেয়ে পছন্দ হইছিল কি—তিনি হাইসা যখন কথা বলছিলেন একদিন দেখলাম সোনার দুইটা দাঁত চকচক কইরা উঠল। তাঁর সোনার বান্ধানো দাঁত ছিল দুইটা সামনের দিকে। সোনার দাঁত দেখার জন্য তার দিকে বারে বারে চাইছি। সোনার দাঁত পরে ছিল না। প্লাস্টিকের দাঁত লাগাইছিল।
কবি সাহেব যখন বিয়ার প্রস্তাব দিল, তখন প্রথম দিকে আমার নানা-নানী রাজি হয় নাই। ওরা দুই বছর ঘোরাঘুরির পর নানা-নানী নরম হইছে। নানান কারণে তারা রাজি হয় নাই। হয়তো তাদের ধারণা ছিল, বয়সের এতো তফাত্, অ্যাডজাস্ট হইব কি না। এত আদর আহ্লাদ কইরা অচেনা অজানা এক ছেলের সাথে...। তারপর বাবার কাছে নানা চিঠি দিলেন। বাবা তখন ফরিদপুরে জিলা হাই স্কুলের মাস্টার। অনেক ছাত্র তার। শহরে নাম-ধাম আছে। বাবা তো সেই চিঠি পাইয়া সাত পৃষ্ঠা চিঠি দিলেন নানার কাছে। বাবা লিখছিলেন, আপনি কি পাগল হইয়া গেলেন। এই লোকটা পাগল। চরে চরে ঘুইরা বেড়ায়। গান গাইয়া বেড়ায়। ভাবের গান, আধ্যাত্মিক গান, মুর্শীদি গান। গানের মজলিসে সারারাত কাইন্দা কাইটা মাটিতে গড়াগড়ি খায়। এইরকম ছেলের কাছে বিয়া দিবেন? তার চাইতে আপনি নাতিনরে পদ্মায় ফালাইয়া দেন।
নানা তো চিঠি পাইয়া হতভম্ব হইয়া গেল। একটু রাগও হইল। নানাভাই বলল, ছেলেটাকে আমি প্রায় দুই বছর যাবত্ দেখতাছি। ভালোই তো। সোনাভাই তখন মহসিন হলে যাইতেন এবং পরে কবি সাহেব থাকতেন নিউ মার্কেট এলাকায়, মানে ঠিক উত্তরে ঢাকা কলেজের কাছে হইলদা রঙের একতলা বাড়ি, বাড়িটা নাকি এখনও ঐরকমই আছে। সোনাভাই না বইলা খুব সকালে যাইয়া উঠলেন। দেখার জন্য, আসলে ছেলেটা কেমন। একদিন একটা মজার ঘটনা সেই বাড়িতে হইছিল। আমার সোনাভাই ভোরে যাইয়া কবি সাহেবকে উঠাইয়া বিদায় নিতেছিল। কবি তাকে নাস্তা খাওয়াইয়া খাতির কইরা তারপর রুমে আটকাইছে। কবি সাহেব বলছিলেন, আমার কাছে নাতিন বিয়া দিবেন কি না কথা দিয়া যাইতে হইব। নইলে আইজকা আপনারে ছাড়মু না। নানা ভাইতো মুস্কিলে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত কথা দিয়া ছাড়া পাইতে হইছিল।
আমার কাছে ব্যাপারটা এখনও বিস্ময়। এত বড় কবির সাথে বিয়া হইতে যাইতেছে, তখন যার কবিতা পাঠ্য বইয়ের অন্তর্গত। খুব একটা অন্যরকম ভাব আমার আসছিল। মানে স্বপ্নের মতো অবস্থা। আমি তখন বিয়ার কথা চিন্তা করতাম না। ছিলাম স্কুলের ছাত্রী। সোনা মা আমারে সাধারণত কারো সাথে মিশতে দিত না। আমি ছিলাম খুব একা। মাঝে মধ্যে ছুটির সময় আমার ছোট ভাই মিন্টু আসতো। ওর সাথে খেলা করতে করতে মনে হইত আমি বুঝি বন্দি অবস্থা থেইকা মুক্তি পাইলাম।
আমার বিয়ার কথাবার্তা চলতেছে। তারিখ-টারিখও ঠিক হইল। ৩ মাস পরে বিয়া হবে ইউনিভার্সিটির গ্রীষ্মের ছুটিতে। নানা ঠিক করলেন ছেলের বাড়ি দেখতে হয় তিনি ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে তার এক ভাইগ্না এবং মিলনদাকে পাঠাইলেন। মিলনদা আমার খালাতো ভাই।
ঐ দুই যুবক সব খোঁজ খবর নিয়া আসলেন। কবি সাহেব তিনদিন তাদের এমন আপ্যায়ন করলেন যে, তারা মহা খুশিতে নারায়ণগঞ্জে ফিরা আসলেন। ওদের যখন বাড়িঘর দেইখা পছন্দ হইছেন তখন নানাও খুশি। তিনি বিয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। সোনাভাই আমার বিয়ার ঠিক আগের দিনগুলোতে রাতে কানতেন। এত আদর কইরা নাতিন পালছেন, তারে বিদায় দিতে তার কষ্ট হইতেছিল। তার মুখে হাসি, কিন্তু চোখ দেখলে বুঝা যাইত অন্তর কানতেছে। বিয়ার জিনিসপত্র কেনাকাটা শুরু হইল। কলকাতা গেল বিয়ার মার্কেটিং করতে। সাথে মিলনদাও গেছিল। তাকে নেয়া হইছিল আধুনিক জিনিসপত্র চিনবার জন্য, কারণ নানাভাই আগের দিনের মানুষ। তারা বহু জিনিসপত্র আনলো—খুব সুন্দর বেনারসী, আকাশী নীল রঙের। আমি মনে মনে ভাবলাম আমারে লাল শাড়ি দিল না কেন। সে সময় শাড়িটার দাম ছিল একশ’ সত্তর টাকা। আর বরের জন্য কলকাতা থেইকা খুব দামি সেলোয়ারের কাপড়, তারপর শেরওয়ানী, টুপি ও পাগড়ি এবং কাপড় আনছিল। কাপড় নিয়া অম্বিকাপুর পাঠানো হইছিল। সেগুলি নারায়ণগঞ্জের ভালো টেইলারিং থেইকা বানানো হইল। কবি সাহেব তখন গ্রীষ্মের ছুটিতে অম্বিকাপুরে।
ঘটনাটা ১৯৩৯ সালের। গায়ে হলুদ যখন হইছিল, তখন আমি ঘরের জানালা দিয়া উঁকি মাইরা দেখলাম অনেক জিনিসপত্র, ডালা-ডুলা আর সাত-আটটা ঘোড়ার গাড়ি বাড়ির সামনে। প্রত্যেকটা ঘোড়া নানা রঙের ফুল দিয়া সাজানো হইছে। ঐভাবে গায়ে হলুদের জিনিস দিয়া সারা শহর ঘুইরা আইছে সবাই। খুব ফুর্তি হইছিল। গায়ে হলুদেই লোক হইছিল এক হাজারের মতো। আমার মা-বাবা’র বিয়াতে মত ছিল না। তারা ক্ষুব্ধ। তাই বিয়ার কোন অনুষ্ঠানে তারা আসেন নাই। শুধু ফরিদপুর থেইকা অনেক কান্নাকাটি করার পর মিন্টুরে পাঠাইছিল।
হলুদের মালপত্র নিয়া আমাদের ঘাটে যাওয়া হয়, যেখানে ফরিদপুরের স্টিমার আসে। ওই ঘাটে কবিকে সমস্ত কাপড়-চোপড় পরাইয়া আনা হইল নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায়। বরযাত্রী পঁচিশ ত্রিশজন, এর বেশি হবে না। সাথে ছিল তার বড় ভাই, বোনের জামাই, চাচাতো ভাইরাও ছিল। বিয়াতে গেইট ধরা হইছিল। শালীদের সঙ্গে এক ঘণ্টা যুদ্ধ। খালাতো বোনদের সাথে কথা কাটাকাটি হইল। এক টাকাও দেয় নাই। আমার বোনরা বলছিল, যাইতে দিব না। কবি বলছিল, ঠিক আছে দাঁড়াইয়া থাক। তারপর সময় নষ্ট হইতেছে দেইখা আমার নানা সবাইকে গেইট ছাইড়া দিতে বললেন। বিয়ার তারিখটা ছিল, আমার ইংরেজি মনে নাই, বাংলা মনে আছে— ১০ই আষাঢ়, ১৯৩৯ সাল। মনে হয় পঁচিশ তারিখ ছিল। তখন কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ শুরু হইয়া গেছে।
বিয়ার দিনের ঘটনা আমি তো সবকিছু নিজে দেখি নাই। পরে শুনছি। আমারে খুব সাজাইছিল। ঢাকা থেইকা ফুল কিনছিল কয়েক মণ। বিয়ার দিনে আমার মন খারাপ ছিল না। যখন আমারে বিদায় দেয়, সবাই কানতেছিল। দেখলাম সোনা মা হাইসা বাঁচে না। কি যেন আমার মনে হইছে। আমি তো চইলা যাইতেছি না। আমার মনে হইতেছিল বেড়াইতে যাইতেছি, আবার বাড়িতে চইলা আসমু। সেই সবকিছু বুঝবার মতো বুদ্ধি হয় নাই আমার তখন।
আমরা পরের দিন নারায়ণগঞ্জ ছাড়ছিলাম। বিয়ার আসরে নামকরা অনেক লোক আসছিল। আমার স্পষ্ট সবার নাম মনে নাই। অনেক চিঠিপত্র আসছিল কলকাতা থেইকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ হাতে শুভেচ্ছা জানাইয়া চিঠি দিছিল। আর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, খুব বড় শিল্পী, তিনি খুব সুন্দর একটা চিঠি এবং তার হাতে আঁকা একটা ছবি পাঠাইছিলেন দুইজনের নামে। ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন শুভেচ্ছা জানাইছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিটায় ছিল সুন্দর গোলাপী রঙের দুইটা কবুতর একটা ডালে বসা। ছবিটা এখনও আমার কাছে আছে। দীনেশচন্দ্র সেন লিখছিলেন, তিন পৃষ্ঠার এক চিঠি। চিঠিটা এখনও পড়ি। জীবনের যে এত ধাপ তার প্রত্যেকটির বিবরণসহ উপদেশ দিয়ে চিঠিটা লেখা। কে যেন ডাকযোগে কলকাতা থেইকা লাল টকটকা একটা মটকা শাড়ি পাঠাইছিল। যে মৌলভী বিয়া পড়াইতে আসছিল, সে বিয়ার আসরে একটু আপত্তি জানাইছিল। বিয়ার আসরে হুজুর নানা ভাইয়ের কাছে আপত্তি কইরা বলল, আপনার নাতিনরে তো নাচ শিখাইছেন, গান শিখাইছেন, হিন্দু খ্রিস্টানগো মতোন চালচলন শিখাইছেন। এখন ওর কলেমা পড়া লাগব। আমার নানা মহা ক্ষেইপা গিয়া হুজুররে বাদ দিয়া নিজেই দোয়া পড়লেন।
আমি কিন্তু বিয়ার আগে তিনবার কোরআন শরীফ খতম করছি। স্কুলে নাচ, গান, নাটক সবই করছি। কিন্তু সুন্দর জীবনযাপন করছি। ভদ্রভাবে চলার চেষ্টা করছি। বিয়াতে কবি জসীম উদ্দীন কোন যৌতুক নেন নাই। তবে আমার নানাভাই ঘরের প্রায় সমস্ত ফার্নিচার বানাইয়া দিছিল কবিকে।
বিয়ার সময় তিন দিন আলোকসজ্জা করা হইছিল এবং ব্যান্ড পার্টি বাদ্যযন্ত্র বাজাইছে। বাসর ঘর কাঠ গোলাপ, রজনীগন্ধা এবং চামেলী ফুল দিয়া অপরূপ কইরা সাজানো হইছিল। এরোন ফকিরের গল্পটা বলা হইল না। ফরিদপুরের সেই আমলের বিখ্যাত গায়েন এরোন ফকির কবি সাহেবের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি আসছিলেন বিয়াতে। আমি তো ঘোমটা দিয়া বইসা আছি। অনেকেই ঘোমটা উঠাইয়া নতুন বউয়ের মুখ দেইখা যায়। তখন হঠাত্ সামনে তাকাইয়া দেখি দাড়িঅলা এক বয়স্ক লোক। অদ্ভুত পোশাক, সবার চাইতে আলাদা। আমার মুখের দিকে তাকাইয়া আছেন। আমি দেখলাম স্ফটিকের মালা গলায় বাউল গোছের লোক, ফকিরী পোশাক। আমাকে দোয়া-টোয়া করল। এরোন ফকিরের বাড়ি চর ভদ্রাসনে।
বিয়ার আসরে খুব হাসাহাসি ধাক্কাধাক্কি চলছিল। আমার খালাতো ও চাচাতো বোনরা কবি সাহেবকে জব্দ করতে চাইলে তিনি সমানে ওদের সাথে তর্ক করতে লাগল। নতুন জামাইয়ের মতো চুপ থাকে নাই। ওরা তো কবির কাছে হার মাইনা গেল। অনেক রাইত পর্যন্ত বিয়ার অনুষ্ঠান চলল। প্রায় ভোর রাতের দিকে সব অনুষ্ঠান শেষে আমাদেরকে বাসর ঘরে আনা হয়। আমি খুব ক্লান্ত হইয়া পড়লে আমার নানী পাঙ্খা দিয়া বাতাস করতেছিল। তখন কবি সাহেব বললেন, সোনামা, আপনি চইলা যান। আমি ঘুমাবো। আমি তো ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ছি। সোনামা চইলা গেলে কবি সাহেব বলেন, আসো আমরা একটু নামাজ পড়ি। আমি মনে মনে বলি ঘুমের মধ্যে কিসের নামাজ-টামাজ। আমি কথা কমু কি, উনি লজ্জা ভাইঙ্গা নিজেই কথা কইতে থাকলেন। তারপর গণকের মতো আমার হাতটা দেখল। তারপর আমি তো ঘুমাইয়া গেছি।
পরের দিন স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ ঘাট থেইকা চাঁদপুর হইয়া গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছাই। তখন দুপুর। সেখান থেইকা ট্রেনে অম্বিকাপুর রেল স্টেশন। স্টেশন থেইকা ঘোড়ার গাড়িতে কবি সাহেবের বাড়িতে আসি। আমার জন্য একটা ভিন্ন প্রকৃতি, নতুন পরিবেশ। সবার সহযোগিতায় মানায় নিছিলাম। ফরিদপুরে আসার পরেও আমার মা রাগে ছিলেন। তিনি চাইছিলেন জামাই হবে টুকটুকা রাজপুত্রের মতো, কবি-টবি না। পরে অবশ্য কবি তার ব্যবহার দিয়া সবার মন জয় করছিলেন।
আমি নিজেও এখন জীবন সায়াহ্নে। জীবিত কালেই আমার প্রথম সন্তান হাসু মৃত্যুবরণ করছে। আমার নাতি আসিফের অকাল মৃত্যু, সবই আমাকে দেখতে হইছে। অনেক স্মৃতি আছে লিখতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু শরীর বাধা হইয়া দাঁড়ায়। দেশের মানুষ কবিকে এত ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন দেইখা আমার মনটা ভইরা যায়। তখন আমার মনে হয়, উনি মরেন নাই। আমার কবি এখনও জীবিত আছেন। নাসির আলী মামুন সম্পাদিত ‘শতবর্ষে জসীম উদ্দীন’ (প্রকাশক ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ) গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত।

সৌজন্যঃ দৈনিক আমার দেশ

Friday, January 28, 2011

আজ আমার মনে ত না মানেরে by জসীম উদ্দিন

আজ আমার মনে ত না মানেরে
সোনার চান,
বাতাসে পাতিয়া বুকরে
শুনি আকাশের গান।
আজ নদীতে উঠিয়া ঢেউ আমার কূলে আইসা লাগে,
রাতের তারার সাথে ঘরের প্রদীপ জাগেরে।
চান্দের উপর বসাইয়ারে যেবা গড়ছে চান্দের বাসা,
আজ দীঘিতে শাপলা ফুটে তারির লয়ে আশারে।
উড়িয়া যায় হংসরে পঙ্খী, যায়রে বহুত দূর,
আজ তরলা বাঁশের বাঁশী টানে সেই সুররে।
আজ কাঙ্খের কলসী ধইরারে কান্দে যমুনার জল,
শিমূলের তুলা লয়ে বাতাস পাগলরে।

সার্থক রজনী by জসীম উদ্দিন

আজকে রাতরে যাইতে দেব না, শুধু শুধু কথা কয়ে,
তারা ফুটাইব, হাসি ছড়াইব আঁধারের লোকালয়ে।
গোলাপী ঠোঁটের কৌটায় করে রাখিব রাতেরে ভরি,
তোমার দু-খানি রঙিন বাহুর বাঁধনে তাহারে ধরি।
আজকের রাত শুধু আজকের-যত ভাল ভাল কথা,
কয়ে আর কয়ে ফুটাইব তাতে যত স্বপনের লতা!
আজকের রাত, মেরু কুহেলির এক ফোঁটা সরু চাঁদ,
আজের রাত-শত নিরাশার একটি পূরিত সাধ।
আজের রাতেরে জড়ায়ে রাখিব তোমার সোনার গায়,
আজকের রাতেরে দোলায় দোলাব তবনিশ্বাস বায়।
আজকের রাতে কথা কব আমি-যত ভাল ভাল কথা,
কথার ফুলেতে সাজাইয়া দেব তোমার দেহের লতা!
কথায় কথায় উড়ে যাব আমি, ছড়াইয়া যাব আর,
মরে যাব আমি নিঃশেষ হয়ে বিস্মৃতি পারাবার।
দিবসে যা হয় হইবে তখন, রাতের পেয়ালা ভরি,
দেহ-মদিরার সোনালী পানীয় উথলি যাইবে পড়ি।
আজকের রাতে বল, ভালবাসি বল বল তুমি মোর,
না হয় ভুলিও যখন হইবে তোমার রজনী ভোর-
আমার রজনী ভোর হবেনাক, এ রাত জহর-জাম,
পান করে আমি শেষ-নাহি-হওয়া নিদ্রা যে লভিলাম।

রূপ by জসীম উদ্দিন

রূপেরে কহিনু ডাকি
হায় রূপ! তুমি কেন চলে যাও,
তুমি কেন একখানে
স্থির হয়ে রহিতে না পাও!
তুমি কি জান না রূপ,
আঁখিতে কাজল-লতা একেঁ,
তরুণীরা তোমারে ধরিতে পাতে ফাঁদ-
দশন মুকুতা মালা দিয়ে
জড়ায়ে হাসির রাঙা চাঁদ
তুমি কি জান না রূপ, বাহুর বিজলী লতা দুটি,
বাহুরে ছাড়িয়া যদি যায়;
লহর পহর জাগে বসি
শাড়ীর সুনীল দরিয়ায়।
তুমি কি জান না রূপ,
দেহের ধূপের পাত্র ভরি,
তোমা লাগি হোম-মন্ত্র
ধ্বনিছে দিবস বিভাবরী;
কত যে হইল প্রাণবলি
কত যে হইল তনুক্ষয়,
হায় রূপ! চিরচঞ্চল রূপ!….
তবু তুমি কাহারো ত হলে নয়।
তোমার তনুর হাওয়া লাগি
প্রেম-ফুল ফুটিয়া টুটিয়া মরে যায়,
কথার কাকলি ওড়ে পথে
সোহাগে আগরে মূরছায়।
রূপ! তুমি রূপ! কারো লাগি থামিলে না কোন পথ বাঁকে
একটি আশিষ-কণা, একটু করুণা-বারি,
দয়া করে নাহি দিলে কাকে।
রূপেরে কহিনু ডাকি,
শোন রূপ, আমাদের কলূষ অন্তর,
তোমারে ছুঁইতে যেয়ে হায়
আমাদের ধরণীর ধূলিরে মাখাই তব গায়;
শিশুরা সরল মন,
চোখে মুখে স্বরগের চুমু লেগে আছে,
তুমি কি পার না রূপ! কিছুদিন রহিবারে
খেলাঘরে তাহাদের কাছে?
ফুলেরা তাদেরও চেয়ে ভাল,
হাসিমুখে চেয়ে থাকে খালি, কথা নাহি জানে,
পাখিরা বনের পাখি
ডালে ডালে মধুর কাকলি করে ফেরে;
তুমি কি তাদের মাঝে
কিছুদিন রহিতে পার না রূপ!
তোমার চলার পথ ছেড়ে?
রূপেরে কহিনু ডেকে আরো,
হায় রূপ! চিরচঞ্চল রূপ,
দেহ হতে দেহ পানে ধাও,
তোমা হেরি এত কথা জাগে মোর মনে;
তোমার কি কোন কথা নাই?
আমরা তোমারে চাহি, তুমি কি কারেও নাহি চাও!
আরো কহিলাম তারে, রূপ! তুমি
তনুতে তনুতে বাসা বাঁধি,
রজনী প্রভাতে চলে যাও;
তোমার নাহিক তৃপ্তি-
কি চেয়ে কি যেন নাহি পাও।
তোমার হাতের বর-মালা
নিশীথে পরায়ে কারো গলে
প্রভাতে খুলিয়া লয়ে যাও;
কারে যে বেসেছ ভাল
তুমি তা জান না বলে রূপ,
কেবলি সমুখ পানে ধাও।
বড় যে অভাগা রূপ,
বড় যে অবলা রূপ,
জানে না কি করে কথা বলে।

গৌরী গিরির মেয়ে by জসীম উদ্দিন

হিমালয় হতে আসিলে নামিয়া তুষার বসন ত্যাজি,
হিমের স্বপন অঙ্গে মাখিয়া সাঁঝের বসনে সাজি।
হে গিরি দুহিতা তোমার নয়নে অলকার মেঘগুলি,
প্রতি সন্ধ্যায় পরাইয়া যেত মায়া-কাজলের তুলি।
তুহিন তুষারে অঙ্গ মাজিতে দুগ্ধধবল কায়,
রবির কিরণ পিছলি পিছলি লুটাত হিমানী বায়!
রাঙা মাটি পথে চলিতে চলিতে পথ যেন মমতায়,
আলতা রেকায় রঙিন হইয়া জড়াইত দুটি পায়।
অলকে তোমার পাহাড়ী পবন ফুলের দেউল লুটি,
গন্ধের বাসা রচনা করিত সারা রাত ছুটি ছুটি।
গহিন গুহার কুহরে কুহরে কলকল্লোলে ঘুরি,
ঝরণা তোমার চরণ বিছাত মণি-মানিকের নুড়ি!
পাষাণের ভাষা শুনিতে যে তুমি ঝরণায় পাতি কান,
শুনিতে শুনিতে কোন অজানায় ভেসে যেত তব প্রাণ!
ঝরণার স্রোতে ভাসিয়া আসিত অলস সোনার ঘুম,
তোমার মায়াবী নয়নে বিছাত দূর স্বপনের চুম।
শিথিল দেহটি এলাইয়া দিয়া ঘন তুষারের গায়,
ঘুমায়ে ঘুমায়ে ঘুমেরে যে ঘুম পাড়াইতে নিরালায়।
তোমার দেহের বিম্ব আঁকিয়া আপন বুকের পরে,
পরতের পর পরত বিছাত তুষার রজনী ভরে।
তোমার ছাষায় যত সে লুকাত, চাঁদের কুমার তত
তুষার পরত ভেদিয়া সেথায় একেলা উদয় হ।
দূর গগনের সাত-ভাই তারা শিয়রে বিছায়ে ছায়া,
পারুল বোনের নিশীথ শয়নে জ্বালতে আলোর মায়া।
দিন রজনীর মোহনার সোঁতে শুক-তারকার তরী,
চলিতে চলিতে পথ ভুলে যেন ঘাটের বাঁধন স্মরি।
পূর্ব তোরণে দাঁড়ায়ে প্রভাত ছুঁড়িত আবীর ধূলি,
তোমার নয়ন হইতে ফেলিত ঘুমের কাজল তুলি।
কিশোর কুমার, প্রথম হেরিয়া তোমার কিশোরী কায়া,
মেঘে আর মেঘে বরণে বরণে মাখাত রঙের মায়া।
কি কুহকে ভুলে ওগো গিরিসুতা! এসেছ মরতে নামি,
কে তোমার লাগি পূজার দেউল সাজায়েছে দিবা-যামি।
হেথয় প্রখর মরীচি-মালীর জ্বলে হুতাশন জ্বালা,
দহনে তোমার শুকাবে নিমেষে বুকে মন্দার মালা।
মরতের জীব বৈকুন্ঠের নাহি জানে সন্ধান,
ফুলের নেশায় ফুলেরে ছিঁড়িয়া ভেঙে করে শতখান।
রূপের পূজারী রূপেরে লইয়া জ্বালায় ভোগের চিতা,
প্রেমেরে করিয়া সেবাদাসী এরা রচে যে প্রেমের গীতা।
হাত বাড়ালেই হেথা পাওয়া যায়, তৃষ্ণারে বড় করি,
তপ-কৃষ তনু গৈরিকবাসে জাগেনাক বিভাবরী।
হেথা সমতল, জোয়ারের পানি একধার হতে ভাসি,
আরধারে এসে গড়াইয়া পড়ে ছল-কল-ধারে হাসি।
হেথায় কাম সহজ লভ্য, পরিয়া যোগীর বাস,
গহন গুহায় যোগাসনে কেউ করে না কাহারো আশ।
হেথাকার লোক খোলা চিঠি পড়ে, বন-রহস্য আঁকি,
বন্ধুর পথে চলে না তটিনী কারো নাম ডাকি ডাকি।
তুমি ফিরে যাও হে গিরি-দুহিতা, তোমার পাষাণ পুরে,
তোমারে খুঁজিয়া কাঁদিছে ঝরণা কুহরে কুহরে ঘুরে।
তব মহাদেব যুগ যুগ ধরি ভস্ম লেপিয়া গায়,
গহন গুহায় তোমার লাগিয়া রয়েছে তপস্যায়।
অলকার মেয়ে! ফিরে যাও তুমি, তোমার ভবন-দ্বারে,
চিত্রকূটের লেখন বহিয়া ফেরে মেঘ জলধারে।
তোমার লাগিয়া বিরহী যক্ষ গিরি-দরী পথ-কোণে,
পাষাণর গায়ে আপন ব্যথারে মদ্দিছে আনমনে;
শোকে কৃশতনু, বিহবল মন, মৃণাল বাহুরে ছাড়ি,
বার বার করে ভ্রষ্ট হইছে স্বর্ণ-বলয় তারি।
বাণীর কুঞ্জে ময়ূর ময়ূরী ভিড়ায়েছে পাখা তরী,
দর্ভ-কুমারী, নিবারের বনে তৃণ আছে বিস্মরি।
তুমি ফিরে যাও তব আলকায়, গৌরী গিরির শিরে,
চরণে চরণে তুষার ভাঙিও মন্দাকিনীর তীরে।
কন্ঠে পরিও কিংশুকমালা, পাটল-পুষ্প কানে,
নীপ-কেশরের রচিও কবরী নব আষাঢ়ের গানে।
তীর্থ পথিক বহু পথ বাহি শ্রান্ত ক্লান্ত কায়,
কোন এক প্রাতে যেয়ে পৌছিব শিঞ্চল গিরি ছায়।
দিগ জোড়া ঘন কুয়াশার লোল অঞ্চলখানি,
বায়ুরথে বসি কিরণ কুমার ফিরিবে সুদূরে টানি।
আমরা হাজার নব নারী হেথা রহিব প্রতীক্ষায়,
কোন শুভখনে গিরি-কন্যার ছায়া যদি দেখা যায়।
দিবসের পর দিবস কাটিবে, মহাশূন্যের পথে,
বরণের পর বরণ ঢালিবে উতল মেঘের রথে।
কুহকী প্রকৃতি মেঘের গুচ্ছে বাঁধিয়া বাদল ঝড়,
ঘন ঘোর রাতে মহাউল্লাসে নাচিবে মাথার পর।
ভয়-বিহবল দিবস লুকাবে কপিল মেঘের বনে,
খর বিদ্যুৎ অট্ট হাসিবে গগনের প্রাঙ্গণে।
তীর্থ-পথিক তুব ফিরিবে না, কোন শুভদিন ধরি,
বহুদূর পথে দাঁড়াবে আসিয়া গৌরী গিরির পরী।
সোনার অঙ্গে জড়ায়ে জড়ায়ে বিজলীর লতাগুলি,
ফুল ফোটাইবে, হাসি ছড়াইবে অধর দোলায় দুলি।
কেউ বা দেখিবে, কেউ দেখিবে না, অনন্ত মেঘ পরে,
আলোক প্রদীপ ভাসিয়া যাইবে শুধু ক্ষণিকের তরে।
তারপর সেথা ঘন কুয়াশার অনন্ত আঁধিয়ার,
আকাশ-ধরনী, বন-প্রান্তর করে দেবে একাকার।
আমরা মানুষ-ধরার মানুষ এই আমাদের মন,
যদি কোনদিন পরিতে না চাহে কুটীরের বন্ধন;
যদি কোনদিন সুদূর হইতে আলেয়ার আলো-পরী,
বেঘুম শয়ন করে চঞ্চল ডাকি মোর নাম ধরি।
হয়ত সেদিন বাহির হইব, গৃহের তুলসী তলে,
যে প্রদীপ জ্বলে তাহারে সেদিন নিবায়ে যাইব চলে।
অঙ্গে পরিব গৈরিক বাস, গলায় অক্ষহার,
নয়নে পরিব উদাস চাহনী মায়া মেঘ বলাকার।
কাশীশ্বরের চরণ ছুঁইয়া পূতপবিত্র কায়,
জীবনের যত পাপ মুছে যাব প্রয়াগের পথ গায়।
হরিদ্বারের রঙিন ধূলায় ঘুমায়ে শ্রান্ত কায়,
ত্রিগঙ্গা জলে সিনান করিয়া জুড়াইব আপনায়।
কমন্ডলুতে ভরিয়া লইব তীর্থ নদীর বারি,
লছমন ঝোলা পার হয়ে যাব পূজা-গান উচ্চারি।
তাপসীজনের অঙ্গের বায়ে পবিত্র পথ ছায়ে,
বিশ্রাম লভি সমুকের পানে ছুটে যাব পায়ে পায়ে।
বিশ্রাম লভি সমুখের পানে ছুটে যাব পায়ে পায়ে।
দেউলে দেউলে রাখিব প্রণাম, তীর্থ নদীর জলে
পূজার প্রসূন ভাসাইয়া দিব মোর দেবতারে বলে।
মাস-বৎসর কাটিয়া যাইবে, কেদার বদরী ছাড়ি,
ঘন বন্ধুর পথে চলিয়াছে সন্যাসী সারি সারি,
কঠোর তাপেতে ক্ষীন্ন শরীর শ্রান্তক্লান্ত কায়,
সমুখের পানে ছুটে চলে কোন দুরন্ত তৃষ্ণায়।
সহসা একদা মানস সরের বেড়িয়া কণক তীর,
হোমের আগুন জ্বলিয়া উঠিবে হাজার সন্ন্যাসীর।
শিখায় শিখায় লিখন লিখিয়া পাঠাবে শূন্যপানে,
মন্ত্রে মন্ত্রে ছড়াবে কামনা মহা-ওঙ্কার গানে।
তারি ঝঙ্কারে স্বর্গ হইতে বাহিয়া কণক রথ,
হৈমবতীগো, নামিয়া আসিও ধরি মর্ত্ত্যের পথ।
নীল কুবলয় হসে- ধরিও দাঁড়ায়ে সরসী নীরে,
মরাল মরালী পাখার আড়াল রচিবে তোমার শিরে।
প্রথম উদীতা-ঊষসী-জবার কুসুম মূরতি ধরি,
গলিত হিরণ কিরণে নাহিও, হে গিরি দুহিতা পরি।
অধর ডলিয়া রক্ত মৃণালে মুছিও বলাকা পাখে,
অঙ্গ ঘেরিয়া লাবণ্য যেন লীলাতরঙ্গ আঁকে।
চারিধার হতে ভকত কন্ঠে উঠিবে পূজার গান,
তার সিঁড়ি বেয়ে স্বরগের পথে করো তুমি অভিযান।
তীর্থ-পথিক, ফিরিয়া আসিব আবার মাটির ঘরে,
গিরি গৌরীর বাহিনী আনিব কমন্ডলুতে ভরে।
দেউলে দেউলে গড়িব প্রতিমা, পূজার প্রসূন করে,
জনমে জনমে দেখা যেন পাই প্রণমিব ইহা স্মরে।

কল্যাণী by জসীশ উদ্দিন

শোন, শোন মেয়ে, কার ঘর তু িজড়ায়েছ জোছনায়,
রাঙা অনুরাগ ছড়ায়েছ তুমি কার মেহেদির ছায়!
কার আঙিনার ধূলি রাঙা হল চুমি ওই পদতল,
কারে দিলে তুমি সুশীতল ছায়া প্রসারিয়া অঞ্চল!

তুমি আকাশের চাঁদ হয়েছিলে, কাহার ফুলের শরে,
বিদ্ধ হইয়া হে নভচারিনী নেমেছ মাটির ঘরে!
কোন্ সে তমাল মেঘের মায়ায় ওগো বিদ্যুৎলতা!
ভুলিলে আজিকে বিরামবিহীন গতির চঞ্চলতা।
চির সুদূরিকা! কহ কহ তুমি, কাহার বাঁশীর সুরে
গ্রহতারকার অনাহত বাণী আনিয়াছ দেহপুরে।
সে কি জানিয়াছে যুগান্তপারে মহামন্থর শেষে,
নীলাম্বুদির তরঙ্গ পরে লক্ষ্মী দাঁড়াল এসে!
সে কি জানিয়াছে, মানস-সরের রাঙা মরালীর বায়,
সন্ধ্যা-সকাল এক দেহ ধরি দাঁড়ায়েছে নিরালায়!
ওগো কল্যাণী! কহ কহ মোরে, সে কি জানিয়াছে হায়!
ও ইন্দ্রধনু তনুখানি তব জড়াতে শ্যামল গায়,
তপস্যা-রত জল-ভরা মেঘ গগনে গগনে ঘোরে,
কামনা-যজ্ঞে লেলিহা বহ্নি মহাবিদ্যুতে পোড়ে!
সে কি জানিয়াছে, বাণীর ভ্রমরী ও অধর ফুল হতে
উড়িয়া আসিয়া হিয়ারে যে বেড়ে চিরজনমের ক্ষতে!
সে কি শিখিয়াছে, বাসক শয়নে ওই তনুদীপ জ্বালি
পতঙ্গ সম প্রতি পলে পলে আপনারে দিতে ঢালি!
ও অধর ভরা লাল পেয়ালার দ্রাক্ষারসের তরে,
জায়নামাজের বেচিয়াছে পাটি সুরা-বিক্রেতা ঘরে!
সে কি জপিয়ায়ে ওই নাম তব তবসী-মালার সনে,
সে কি ও নামের কোরান লিখিয়া পড়িয়াছে মনে মনে!
ওগো কল্যাণী! কহ কহ তুমি কেবা দরবেশ,
তোমার লাগিয়া মন-মোমবাতি পুড়ায়ে করিল শেষ!
কত বড় তার প্রসারিত বুক, আকাশে যে নাহি ধরে,
সেই বিদ্যুৎ বিহ্নরে আনি লুকাল বুকের ঘরে!

অনুরোধ by জসীম উদ্দিন

তুমি কি আমার গানের সুরের
পূবালী বাতাস হবে,
তুমি কি আমার মনের বনের
বাঁশীটি হইয়া রবে!
রাঙা অধরের রামধনুটিরে,
ছড়াবে কি তুমি মোর মেঘ-নীড়ে,
আমি কি তোমার কবি হব রাণী,
তুমি কি কবিতা হবে;
তুমি কি আমার মনের বনের
বাঁশীটি হইয়া রবে!
তুমি কি আমার মালার ফুলের
ফিরিবে গন্ধ বয়ে,
হাসিবে কি তুমি মোর কপালের
চন্দন ফোঁটা হয়ে!
তুমি কি আমার নীলাকাশ পরে,
ফুটাবে কুসুম সারারাত ভরে,
সাঁঝ-সকালের রাঙা মেঘ ধরে
অঙ্গে জড়ায়ে লবে;
তুমি কি আমার মনের বনের
বাঁশীটি হইয়া রবে!

কৈশর যৌবন দুহু মেলি গেল by জসীম উদ্দিন

এখনো গন্ধ বন্ধ কোরকে, দুএকটি রাঙা দল,
উকি ঝুঁকি দিয়ে পান করিতেছে ভোরের শিশির জল।
রঙিন অধরে সরল হাসিটি, বিহান বেলার আগে,
মেঘগুলি যেন রঙে ডুগুডুগু ঊষসীর অনুরাগে।
এ হাসি এখনি কৌতুক হয়ে নাচিবে নানান ঢঙে,
মেঘের আড়ালে কভু লুকোচুরি খেলিবে কতা রঙে।

আঁখি দুটি আজো স্বচ্ছ-সরল কাজল দীঘির মত,
কারো কলসীর আঘাতে এখনো হয় নাই ঢেউ-ক্ষত।
সব কিছু এর মুকুরে এখনো উজ্জ্বল হয়ে ভাসে,
যে আসে নিকটে তাহারেই সে যে আদরিয়া ভালবাসে।
আরো কিছুদিন পরে এই আঁখি বিদ্যুদ্দাম হয়ে,
নৃত্য চপল খেলিয়া বেড়াবে মেঘ হতে মেঘে বয়ে।
ওই ভুরু-ধনু আরো বাঁকাইয়া চাহনীর তীরগুলি,
কত হতভাগা মৃগেরে বধিবে কাজলের বিষগুলি।
ওই বাহু দুটি যুগল মমতা, যে হয় নিকটতর,
তাহারি গলায় পরাইয়া দেয় জানে না আপন পর।
কিছুদিন পরে ও বাহু লতায় ফুটিবে মোহের ফুল,
আকর্ষণের মন্ত্র পড়িয়া ছড়াবে রঙের ভুল।
তাহারি বাঁধনে বন্দী হইতে চির জনমের তরে,
আসিবে কুমার রূপ-গানে তার অধর বাঁশরী ভরে।
বক্ষের পরে আধ-মুকুলিত যুগল কমল দুটি,
এখনো সুবাসে ভরে নাই দিক পল্লব দলে ফুটি।
কিছুদিন পরে ওই মন্দিরে অনঙ্গ নিজে পশি,
ভালবাসিবার মন্ত্র রচিবে ধ্যানের আসনে বসি।
মন্ত্র-সিদ্ধ একদন তার ফুল ধনু করি থির,
ফিরাবে ঘুরাবে স্বেচ্চায় সেথা স্থাপি এ যুগল তীর।
এখনো অফুট কুসুমিত দেহ, জবা কুসুমের দ্যুতি,
আনত ঊষার নব-মেঘদলে রাঙিছে রূপের সত্ততি।
নিহারে ভূসিথ কুসুম কমল আধেক মুদিত আঁখি,
সরসী নাচিছে হরষিত দোলে আরশীতে তারে রাখি।
বিহান বেলার আধ ঘুমে পাওয়া আধ স্বপনের স্মৃতি,
দূরাগত কোন সুখদ বাঁশীর আবছা মধুর গীতি।
সে যেন ঊষার হসিত কপোলে শ্বেত চন্দন ফোঁটা,
সে যেন পূজার নিবেদিত ফুল দেবতা চরণে লোটা।
আরো ক্ষণকাল দাঁড়াও গো মেয়ে! তোমার সোনার হাসি,
আরো ক্ষণকাল দেখে চলে যাই আমি কবি পরবাসী।
আরো ক্ষণকাল করগো বেলম, ভোরের শিশির কণা,
তাই দিয়ে যদি হয় কভু কোন অমরতা-গীতি বোনা।
আমি ক্ষণিকের অতিথি তোমার, তব অনাগত দিনে,
জানি জানি এই পথিক সখারে লইতে পাবে না চিনে।
ওই দেহ বীণা বাজিবে সেদিন, হাত চোখ মুখ কান,
শত তার হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়াবে কুহক গান।
তারি ঝঙ্কারে রণিবে ধরণী, ফুলের স্তবক হয়ে,
আসিবে পূজারী স্তব-গান গেয়ে ওদেহের দেবালয়ে।
তাহাদের তরে রাখিয়া গেলাম আমার আশীর্বাদ,
যেন তারা পায় তোমার মাঝারে মোর অপূরিত সাধ।

ফুল নেয়া ভাল নয় by জসীম উদ্দিন

ফুল নেয়া ভাল নয় মেয়ে।
ফুল নিলে ফুল দিতে হয়, -
ফুলের মতন প্রাণ দিতে হয়।
যারা ফুল নিয়ে যায়,
যারা ফুল দিয়ে যায়,
তারা ভুল দিয়ে যায়,
তারা কুল নিয়ে যায়।
তুমি ফুল, মেয়ে! বাতাসে ভাঙিয়া পড়
বাতাসের ভরে দলগুলি নড়নড়।
ফুলের ভার যে পাহাড় বহিতে নারে
দখিনা বাতাস নড়ে উঠে বারে বারে।
ফুলের ভারে যে ধরণী দুলিয়া ওঠে,
ভোমর পাখার আঘাতে মাটিতে লোটে।
সেই ফুল তুমি কেমনে বহিবে তারে,
ফুল তো কখনো ফুলেরে বহিতে নারে।

হলুদ বাঁটিছে মেয়ে by জসীশ উদ্দিন

হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,
হলুদের পাটা হাসিয়া গড়ায় রাঙা অনুরাগে নেয়ে।
দুই হাতে ধরি কঠিন পুতারে ঘসিছে পাটার পরে,
কাঁচের চুড়ী যে রিনিক ঝিনিকি নাচিছে খুশীর ভরে।
দুইটি জঙ্ঘা দুইধারে মেলা কাঠ-গড়া কামনার,
তাহার উপর উঠিতে নামিতে সোনার দেহটি তার;
মর্দ্দিত দুটি যুগল সারসী শাড়ী সরসীর নীরে,
ডুবিতে ভাসিতে পুষ্প ধনুরে স্মরিতেছে ঘুরে ফিরে।
হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,
রঙিন ঊষার আবছা হাসিতে আকাশ ফেলিল ছেয়ে।
মিহি-সুরী গান গুন গুন করে ঘুরিছে হাসিল ঠোঁটে,
খুশীর ভোমরী উড়িয়া শ্রীমুখ-পদ্মের দল লোটে।
বিগত রাতের বভস-সুখের মদিরা জড়িত স্মৃতি,
সারাটি পাটারে হলুদে জড়ায়ে গড়ায়ে রঙিছে ক্ষিতি।
গাছের ডালে যে বুলবুলী বসি ভরিয়া দুখানা পাখ,
লিখিয়া হইতে তারি একটুকু মেলিছে সুরেলা ডাক।
হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,
হলুদে লিখিত রঙিন কাহিনী গড়াইছে পাটা বেয়ে।
ডোল-ভরা ধান, কোল ভরা শিশু, বুক-ভরা মিঠে গান,
কোকিল ডাকান আম্র ছায়ায় পাতার কুটীর খান;
চাঁদিনী রাতের জোছনা আসিয়া গড়ায় বেড়ার ফাঁকে
কৃষাণ কন্ঠে বাঁশীটি বাজিয়া আকাশেতে প্রীতি আঁকে।
অর্দ্ধেক রাত নক্সী-কাঁথাটি মেলন করিয়া ধরি,
অতি সযতনে আঁকে ফুল-লতা মনের মমতা ভরি।
সুখ যেন আসি গড়াইয়া পড়ে, সূতার লতালী ফাঁদে,
মাটির ধরায় টেনে নিয়ে আসে গগন বিহারী চাঁদে।

রাখালের রাজগী by জসীশ উদ্দিন

রাখালের রাজা! আমাদের ফেলি কোথা গেলে ভাই চলে,
বুক হতে খুলি সোনা লতাগুলি কেন পায়ে দলে?
জানিতেই যদি পথের কুসুম পথেই হইবে বাসি,
কেন তারে ভাই! গলে পরেছিলে এতখানি ভালবাসি?
আমাদের দিন কেটে যাবে যদি গলেতে কাজের ফাঁসি
কেন শিখাইলে ধেনু চরাইতে বাজায়ে বাঁশের বাঁশী?
খেলিবার মাঠ লাঙল বাজায়ে চষিতেই যদি হবে,
গাঁয়ের রাখাল ডাকিয়া সেথায় রাজা হলে কেন তবে?
তুমি চলে গেছ, শুধু কি আমরা তোমারি কাঙাল ভাই!
হারায়েছি গান, গোচরণ মাঠ, বাঁশের বাঁশরী তাই।
সোজাসুজি আজ উধাও চলিতে কোথা সে উধাও মাঠ,
গোখুর ধূলোয় চাঁদোয়া-টাঙানো কোথা সে গাঁয়ের বাট?
চরণ ফেলিতে চরণ চলে না শস্য-খেতের মানা,
খেলিবার মাঠে বড় জমকালো মিলেছে পাটের থানা।
গেঁয়ো শাখী আজ লুটায়ে পড়িছে কাঁচা পাকা ফল-ভারে,
তলে তলে তার মাঠের রাখাল হাট মিলাইতে নারে।
চষা মাঠে আজ লাঙল চলিতে জাগে না ভাটীর গান
সারা দিন খেটে অন্ন কুড়াই, তবু তাতে অকুলান।
ধানের গোলার গর্বেতে আজি ভরে না চাষীর বুক,
টিনের ঘরের আট-চালা বেঁধে রোদে জ্বলে পায় সুখ।
বাছের নায়েতে ছই দিয়ে চাষী পাটের বেপার করে,
দাবাড়ের গরু হালের খেতে যে জোয়াল বহিয়া মরে।
হেমন্ত নদী ঢেউ খেলেনাক সারীর গানের সুরে,
গরু-দৌড়ের মাঠখানি চাষী লাঙলেতে দেছে ফুঁড়ে।
মনে পড়ে ঘর ছোনের ছাউনি, বেড়িয়া চালের বাতা,
কৃষাণ বধূর বুকখানি যেন লাউ এর লতায় পাতা।
তারি পাশে পাশে প্রতি সন্ধ্যায় মাটির প্রদীপ ধরি
কুমারী মেয়েরা আশিস মাগিত গ্রাম-দেবতারে স্মরি।
আজকে সেখানে জ্বলে না প্রদীপ, বাজে না মাঠের গান,
ঘুমলী রাতের প্রহর গণিয়া জাগে না বিরহী প্রাণ।
শূনো বাড়িগুলো রয়েছে দাঁড়ায়ে, ফাটলে ফাটলে তার,
বুনো লতাগুলো জড়ায়ে জড়ায়ে গেঁথেছে বিরহ-হার।
উকুন যাহার গায়ে মারা যায়- থন থন করে তাজা,
এমন গরুরে পালিয়া কৃষাণ নিজেরে বনে না রাজা!
ধানের গোলার গর্ব ভুলেছে, ভুলেছে গায়ের বল,
চক্ষু বুজিয়া খুঁজিছে কোথায় টাকা বানানোর কল।
সারাদিন ভরি শুধু কাজ কাজ আরও চাই আরও-আরও-
ক্ষুধিত মানুষ ছুটিছে উধাও, তৃষ্ণা মেটে না কারও।
পেটে নাই ভাত, মুখে নাই হাসি, রোগে হাড়খানা সার,
প্রেত-পুরি যেন নামিয়া এসেছে বাহিয়া নরক-দ্বার।
হাজার কৃষাণ কাঁদিছে অঝোরে কোথা তুমি মহারাজ?
ব্রজের আকাশ ফাড়িয়া ফাড়িয়া হাঁকিছে বিরহ-বাজ।
আমরা তোমারে রাজা করেছিনু পাতার মুকুট গড়ে,
ছিঁড়ে ফেলে তাহা মণির মুকুট পরিলে কেমন করে?
বাঁশরী বাজায়ে শাসন করেছ মানুষ-পশুর দল,
সুর শুনে তার উজান বহিত কালো যমুনার জল।
কোন প্রাণে সেই বাঁশের বাঁশরী ভেঙে এলি গেঁয়ো বাটে?
কার লোভে তুই রাজা হলি ভাই! মথুরার রাজপাটে?
বাঁশীর শাসন হেলায় সয়েছি, বুনো ফলে দিছি কর,
অসির শাসন কি দিয়ে সহিব, বেচিয়াছি বাড়ি ঘর;
হালের গরুরে নিলামে দিয়েও মিটাতে পারিনি ভুখ,
আধখানা ফলে পেট ভরে যেত- ভেবে ভেবে হয় দুখ;
এত পেয়ে তোর সাধমেটেনাক, দুনিয়া জুড়িয়া ক্ষুধা,
আমরা রাখাল মাঠের কাঙাল যোগাইব তারি সুধা!
শোনরে কানাই! পষ্ট কহিছি, সহিব না মোরা আর,
সীমার বাহিরে সীমা আছে যদি, ধৈর্যেরো আছে বার।
ভাবিয়াছ ওই অসির শাসনে মোরা হয়ে জড়সড়,
নিজের ক্ষুধার অন্ন আনিয়া চরণে করিব জড়?
বাঁশীর শাসন মেনেছি বলিয়া অসিও মানিতে হবে!
শুরু দেয়া-ডাকে কাজরী গেয়েছি, ঝড়েও গাহিব তবে?
বাঁশীর শাসন বুকে যেয়ে লাগে, নত হয়ে আসে শির,
অসির শাসনে মরাদেরো মাঝে জেগে ওঠে শত বীর।
ভাবিয়াছ, মোরা গাঁয়ের রাখাল, নাই কোন হাতিয়ার,
যে লাঙল পারে মাটিরে ফাড়িতে, ভাঙিতেও পারে ঘাড়।
ঝড়ের সঙ্গে লড়িয়াছি মোরা, বাদলের সাথে যুঝি,
বর্ষার সাথে মিতালী পাতায়ে সোনা ধান করি পুঁজি।
* * *
তবুও সেখানে প্রদীপ জ্বালাই ঘন আঁধারের কোলে,
আঁকড়িয়া আছি পল্লীর মাটি কোন্ ক্ষমতার বলে!
জনমিয়া যারা দুখের নদীতে শিখিয়াছে দিতে পাড়ি,
অসির শাসন তরিবে তাহারা যাক না দুদিন চারি।
পষ্ট করিয়া কহিছি কানাই, এখন সময় আছে,
গাঁয়ে ফিরে চল, নতুবা তোমায় কাঁদিতে হইবে পাছে।
জনম-দুখিনী পল্লী-যশোদা আশায় রয়েচে বাঁচি,
পাতায় পাতায় লতায় লতায় লতিয়ে স্নেহের সাজি।
হিয়াখানি তার হানা-বাড়ি সম ফাটলে ফাটলে কাঁদি
বক্ষে লয়েছে তোমারি বিরহ বনের লতায় বাঁধি।
আঁধা পুকুরের পচা কালো জলে মুরছে কমল- রাধা,
কৃষাণ বধূরা সিনান করিতে শুনে যায় তারি কাঁদা।
বেনুবনে তুমি কবে বেঁধেছিলে তোমার বাঁশের বাঁশী,
দখিনা বাতাস আজিও তাহারে বাজাইয়া যায় আসি!
কোমল লতায় দোলনা বাঁধিয়া শাখীরা ডাকিছে সুরে,
আর কত কাল ভুলে রবি ভাই, পাষাণ মথুরা-পুরে?
আমরা ত ভাই! ভেবে পাইনাক তোরি বা কেমন রীত,
একলা বসিয়া কেতাব লিখিস ভুলিয়া মাঠের গীত।
পুঁথিগুলো সব পোড়াইয়া ফ্যাল, দেখে গাও করে জ্বালা,
কেমনে কাটাস সারাদিন তুই লইয়া ইহার পালা?
ওরাই তো তোরে যাদু করিয়াছে, মোরা যদি হইতাম,
ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া বানাইয়া ঘুড়ির আকাশে উড়াইতাম!
রাজধানী যেরে পরদেশ তোর-ইট কাঠ দিয়ে ঘেরা,
ইট-কাঠ তাই আঁটঘাট বেঁধে মনেও কি দিলি বেড়া?
এত ডাক ডাকি শুনে ন শুনিস, এমনি কঠিন হিয়া-
আমরা রাখাল ভাবিয়া না পাই- গলাইব কিবা দিয়া?
একেলা আমরা মাঠে মাঠে ফিরি, পথে পথে কেঁদে মরি,
আমাদের গান শোনে নারে কেউ, লয়নাক হাত ধরি।
* * *
চল গাঁয়ে যাই, আঁকাবাঁকা পথ ধূলার দোলায় দোলে,
দুধারের খেত কাড়াকাড়ি করে তাহারে লইতে কোলে।
কদম্ব রেণু শিহরিয়া উঠে নতুন পাটল মেঘে,
তমালের বনে বিরহী রাধার ব্যথা-দেয়া যায় ডেকে।

পুরান পুকুর by জসীশ উদ্দিন

পুরান পুকুর, তব তীরে বসি ভাবিয়া উদাস হই,
খেজুরের গোড়ে বাঁধা ছোট ঘাট, করে জল থই থই;
রাত না পোহাতে গাঁয়ের বধুরা কলসীর কলরবে,
ঘুম হতে তোমা জাগাইয়া দিত প্রভাতের উৎসবে।
সারাদিন ধরি ঘড়ায় ঘড়ায় তব অমৃতরাশি,
বধুদের কাঁখে ঢলিয়া ঢলিয়া ঘরে ঘরে যেত হাসি।
‘বদনায়’ভরা একটুকু, তারি ভরসায় গেঁয়ো-চাষী,
চৈত্র-রোদের করুণ করিয়া বাজাত গানের বাঁশী।
মাঠ হতে তারা জ্বলিয়া পুড়িয়া আসিত তোমার তীরে,
খেজুর পাতায় সোনালী চামর দোলাতে তাদের শিরে।
শান্ত হইয়া গামছা ভিজায়ে তোমার কাজল-জলে,
নাহিয়া নাহিয়া সাধ মিটিত না-আবার নাহিবে বলে।
এইখানে বসি পল্লী-বধূরা আধেক ঘোমটা খুলি,
তোমার মুকুরে মুখখানি হেরে জল-ভরা যেত ভুলি।
সখিতে সখিতে কাঁধে কাঁধ ধরি খেলিত যে জল-খেলা,
সারাটি গাঁয়ের যত রূপ আছে তব বুকে হত মেলা,
পুকুরের জল উথলি পাথালি ভাসিত তাদের হাসি, -
ফুলে ফুল লাগি ফুলেরা যেমন ভেঙে হয় রাশি রাশি।
আজি মনে পড়ে, পুরান পুকুর, মায়ের আঁচল ধরে,
একটি ছেলের ঝাঁপাঝাঁপি খেলা তোমার বুকের পরে।
ওই এত জলে সাঁপলার ফুল, -তারি ছিল এত লোভ,
তাই তুলিবারে জলে ডুবিলেও মনে নাহি ছিল ক্ষোভ।
আজিকে তোমার কোথায় সে জল? কোথা সেই বাঁধা ঘাট,
গেঁয়ো বধূদের খাড়ুতে মুখর কোথা সে পুকুর বাট?
চারিধারে তব বন-জঙ্গল পাতায় পাতায় ঢাকা,
নিকষ-রাতের আঁধার যেন গো তুলিতে রয়েছে আঁকা।
ডুকরিয়া কাঁদে ডাহুক ডাহুকী তরু-মর্ম্মর স্বনে,
তারি সাথে বুঝি উঠিছে শিহরি যত ব্যথা তব মনে!
হিজল গাছের মালা হতে আজি খসিয়া রঙিন ফুল,
সাঁঝের মতন দিতেছে ব্যথিয়া তোমার চরণমূল।
সন্ধ্যা-সকালে আসিত যাহারা কলসী লইয়া ঘাটে,
তারা সবে আজি বিদায় নিয়েছে মরণ পারের হাটে।
বক্ষ-মুকুরে সোনা মুখখানি দেখিবারে কেহ নাই,
কুচুরী পানায় আধ বুকখানি ঢাকিয়া রেখেছ তাই!
ঘুচাও ঘুচাও মৌন তড়াগ, বুকের আরসীখানি,
মোর বাল্যের যত ভুলো-কথা সারা গায়ে দাও টানি।
সেই ছেলেবেলা স্বপ্নের মত কত স্নেহ ভরা মুখ,
এনে দাও, শুধু বারেক দেখিয়া ভরে লই সারা বুক।
এনে দাও সেই তব তীরে বসি মেঠো রাখালের বাঁশী
স্বপনের ভেলা দুলায়ে দুলায়ে আকাশেতে যাক্ ভাসি।
হায়রে, সেদিন আসে না ফিরিয়া! শুধু ভিজে আঁখি পাতা,
পুরানো স্বপন কুড়ায়ে কুড়ায়ে আকাশেতে জাল পাতা!
তুমিও সজনি, আমারি মতন না জানি কাঁদিছ কত,
ছোট ঢেউগুলি নাড়িয়া নাড়িয়া পাড়েরে করিছ ক্ষত।
বনদেবী আজ সমবেদনায় আঁচল বিছায়ে জলে,
ব্যথাতুরা তব সারা বুকখানি ঢেকেছে কলমী দলে।

যাব আমি তোমার দেশে by জসীশ উদ্দিন

পল্লী-দুলাল, যাব আমি-যাব আমি তোমার দেশে,
আকাশ যাহার বনের শীষে দিক-হারা মাঠ চরণ ঘেঁষে।
দূর দেশীয়া মেঘ-কনেরা মাথায় লয়ে জলের ঝারি,
দাঁড়ায় যাহার কোলটি ঘেঁষে বিজলী-পেড়ে আঁচল নাড়ি।
বেতস কেয়ার মাথায় যেথায় ডাহুক ডাকে বনের ছায়ায়,
পল্লী-দুলাল ভাইগো আমার, যাব আমি যাব সেথায়।
তোমার দেশে যাব আমি, দিঘল বাঁকা পন্থখানি,
ধান কাউনের খেতের ভেতর সরু সূতোর আঁচল টানি;
গিয়াছে হে হাবা মেয়ের এলোমাথার সিঁথীর মত
কোথাও সিধে, কোথায় বাঁকা, গরুর পায়ের রেখায় ক্ষত;
গাজনতলির মাঠ পেরিয়ে, শিমূলতলীর বনের বাঁয়ে,
কোথাও গায়ে রোদ মাখিয়া, ঘুম-ঘুমায়ে গাছের ছায়ে।
তাহার পরে মুঠি মুঠি ছড়িয়ে দিয়ে কদম-কলি,
কোথাও মেলে বনের লতা গ্রাম্য মেয়ে যায় যে চলি;
সে পথ দিয়ে যাব আমি পল্লী-দুলাল তোমার দেশে,
নাম-না জানা ফুলের সুবাস বাতাসেতে আসবে ভেসে।
তোমার দেশে যাব আমি, পাড়ার যত দস্যি ছেলে,
তাদের সাথে দল বাঁধিয়া হেথায় সেথায় ফিরব খেলে।
থল-দীঘিতে সাঁতার কেটে আনব তুলে রক্ত-কমল,
শাপলা লতায় জড়িয়ে চরণ ঢেউ এর সাথে খাব যে দোল।
হিজল ঝরা জলের সাথে গায়ের বরণ রঙিন হবে,
দীঘির জলে খেলবে লহর মোদের লীলাকালোসবে।
তোমার দেশে যাব আমি পল্লী-দুলাল ভাইগো সোনার,
সেথায় পথে ফেলতে চরণ লাগবে পরশ এই মাটি-মার!
ডাকব সেথা পাখির ডাকে, ভাব করিব শাখীর সনে,
অজান ফুলের রূপ দেখিয়া মানব তারে বিয়ের কনে;
চলতে পথে ময়না কাঁটায় উত্তরীয় জড়িয়ে যাবে,
অঢেল মাটির হোঁচট লেগে আঁচল হতে ফুল ছড়াবে।
পল্লী-দুলাল, যাব আমি-যাব আমি তোমার দেশে,
তোমার কাঁধে হাত রাখিয়া-ফিরবো মোরা উদাস বেশে।
বনের পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখব মোরা সাঁঝ বাগানে,
ফুল ফুটেছে হাজার রঙের মেঘ তুলিকার নিখুঁত টানে।
গাছের শাখা দুলিয়ে আমি পাড়ব সে ফুল মনের আশে,
উত্তরীয় ছড়িয়ে তুমি দাঁড়িয়ে থেকো বনের পাশে।
যে ঘাটেতে ভরবে কলস গাঁয়ের বিভোল পল্লীবালা,
সেই ঘাটেরি এক ধারেতে আসবো রেখে ফুলের মালা;
দীঘির জলে ঘট বুড়াতে পথে পাওয়া মালাখানি,
কুড়িয়ে নিয়ে ভাববে ইহা রাখিয়া গেছে কেউ না জানি।
চেনে না তার হাতের মালা হয়তবা সে পরবে গলে,
আমরা দুজন থাকব বসে ঢেউ দোলা সেই দীঘির কোলে।
চার পাশেতে বনের সারি এলিয়ে শাখার কুন্তল-ভার,
দীঘির জলে ঢেউ গণিবে ফুল শুঁকিবে পদ্ম-পাতার।
বনের মাঝে ডাকবে ডাহুক, ফিরবে ঘুুঘু আপন বাসে,
দিনের পিদিম ঢুলবে ঘুমে রাত-জাগা কোন্ ফুলের বাসে।
চার ধারেতে বন জুড়িয়া রাতের আঁধার বাঁধবে বেড়া,
সেই কুহেলীর কালো কারায় দীঘির জলও পড়বে ঘেরা।
সেই আঁধারে পাখায় ধরে চামচিকারা উচ্চে উঠি,
দিকে দিকে দিগনে-রে ছড়িয়ে দেবে মুঠি মুঠি।
তখন সেথা থাকবে না কেউ, সুদূর বনের গহন কোণে,
কানাকুয়া ডাকবে শুধু পহরের পর পহর গণে।
সেই নিরালার বুকটি চিরে পল্লী দুলাল আমরা দুজন,
পল্লীমায়ের রূপটি যে কি, করব মোরা তার অন্বেষণ।

পল্লী বর্ষা by জসীম উদ্দিন

আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি,
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি!
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে!
কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, -
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।
গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, -
গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!
কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধে কসি কসি।
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।
লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও,
বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে,
নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে!
যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি,
সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি।
বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে,
মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।

ধানক্ষেত by জসীশ উদ্দিন

পথের কেনারে পাতা দোলাইয়া করে সদা সঙ্কেত,
সবুজে হদুদে সোহাগ ঢুলায়ে আমার ধানের খেত।
ছড়ায় ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে,
ঝাঁকে আর ঝাঁকে টিয়ে পাখিগুলে শুয়েছে মাঠের পরে।
কৃষাণ কনের বিয়ে হবে, তার হলদি কোটার শাড়ী,
হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কটি রোদ রেখা নাড়ি।
কলমী লতার গহনা তাহার গড়ার প্রতীক্ষায়,
ভিনদেশী বর আসা যাওয়া করে প্রভাত সাঁঝের নায়।
পথের কেনারে মোর ধান খেত, সবুজ পাতার পরে,
সোনার ছড়ায় হেমন্তরাণী সোনা হাসিখানি ধরে।
শরৎ সে কবে চরে গেছে তার সোনালী মেঘের ছটা,
আজো উড়িতেছে মোর এই খেতে ধরিয়া ধানের জটা।
মাঝে মাঝে এর পকিয়াছে ধান, কোনখানে পাকে নাই,
সকুজ শাড়ীর অঞ্চলে যেন ছোপ লাগিয়াছে তাই।
আজান গাঁয়ের কৃষাণকুমারী এইখান দিয়ে যেতে,
সোনার পায়ের চিহ্নগুলিরে গেছে এর বুকে পেতে।
মোর ধানক্ষেত, এইখানে এসে দাঁড়ালে উচচ শিরে,
মাথা যেন মোর ছুঁইবারে পারে সুদূর আকাশটিরে!
এইকানে এসে বুক ফুলাইয়া জোরে ডাক দিতে পারি,
হেথা আমি করি যা খুশী তাহাই, কারো নাহি ধার ধারি।
হেথায় নাহিক সমাজ-শাসন, নাহি প্রজা আর সাজা,
মোর খেত ভরি ফসলেরা নাচে, আমি তাহাদের রাজা।
এইখানে এসে দুঃখের কথা কহি তাহাদের সনে,
চৈত্র দিনের ভীষণ খরায় আষাঢ়ের বরিষণে।
কৃষাণী কনের কাঁকনের ঘায়ে ছিঁড়িয়া বুকের চাম,
এই ধানখেত নয়নের জলে ভাসিয়েছি অবিরাম।
এইখানে বসে রাতের বেলায় বাঁশের বাঁশীর সুরে,
মোর ব্যথাখানি ছড়ায়েছি তার সুদূর কৃষাণ-পুরে।
এই ধানখেত লুকাইয়া তার গোপন স্মৃতির চিন্,
দেখিয়া দেখিয়া কাটিয়া গিয়াছে কত না দীর্ঘদিন।
পথের কেনারে দাঁড়ায়ে রয়েছে আমার ধানের খেত,
আমার বুকের আশা-নিরাশার বেদনার সঙ্গেত।
বকের মেয়েরা গাঁথিয়া যতনে শ্বেত পালকের মালা,
চারিধারে এর ঘুরিয়া ঘুরিয়া সাজায় সোনার ডালা।
তাল বৃক্ষের উচু বাসা ছাড়ি বাবুই পাখির দল,
কিসের মায়ায় সারা খেত ভরি ফিরিতেছে চঞ্চল।
মাঝে মাঝে তারে জালে জড়াইয়া টেনে নিয়ে যেতে, চায়,
সকাল-সাঁঝের আলো-ছায়া-ঘেরা সোনালী তটের ছায়!
শিশির তাহারে মতির মালায় সাজায় সারাটি রাতি,
জোনাকীরা তার পাতায় পাতায় দোলায় তারার বাতি।

কৃষাণী দুই মেয়ে by জসীশ উদ্দিন

কৃষাণী দুই মেয়ে
পথের কোণে দাঁড়িয়ে হাসে আমার পানে চেয়ে।
ওরা যেন হাসি খুশীর দুইটি রাঙা বোন,
হাসি-খুশীর বেসাত ওরা করছে সারাখন।
ঝাকড়া মাথায় কোঁকড়া চুলে, লেগেছে খড়কুটো,
তাহার নীচে মুখ দুখানি যেন তরমুজফালি দুটো।
সেই মুখেতে কে দুখানি তরমুজেরি ফালি,
একটি মেয়ে লাজুক বড়, মুখর আরেক জন,
লজ্জাবতীর লতা যেন জড়িয়ে গোলাপ বন।
একটি হাসে, আর সে হাসি লুকায় আঁচল কোণে,
রাঙা মুখের খুশী মিলায় রাঙা শাড়ীর সনে।
পউষ-রবির হাসির মত আরেক জনের হাসি,
কুয়াশাহীন আকাশ ভরে টুকরো-মেঘে ভাসি।
চাষীদের ওই দুইটি মেয়ে ঈদের দুটি চাঁদ,
যেই দেখেছি, পেরিয়ে গেল নয়নপুরীর ফাঁদ।

তরুণ কিশোর by জসীম উদ্দিন

তরুণ কিশোর ! তোমার জীবনে সবে এ ভোরের বেলা,
ভোরের বাতাস ভোরের কুসুমে জুড়েছে রঙের খেলা।
রঙের কুহেলী তলে,
তোমার জীবন ঊষার আকাশে শিশু রবি সম জ্বলে।
এখনো পাখিরা উঠেনি জাগিয়া, শিশির রয়েছে ঘুমে,
কলঙ্কী চাঁদ পশ্চিমে হেলি কৌমুদী-লতা চুমে।
বঁধুর কোলেতে বধুয়া ঘুমায়, খোলেনি বাহুর বাঁধ,
দীঘির জলেতে নাহিয়া নাহিয়া মেটেনি তারার সাধ।
এখনো আসেনি অলি,
মধুর লোভেতে কোমল কুসুম দুপায়েতে দলি দলি।
এখনো গোপন আঁধারের তলে আলোকের শতদল,
মেঘে মেঘে লেগে বরণে বরণে করিতেছে টলমল।
এখনো বসিয়া সেঁউতীর মালা গাঁথিছে ভোরের তারা,
ঊষার রঙিন শাড়ীখানি তার বুনান হয়নি সারা।
হায়রে করুণ হায়,
এখনি যে সবে জাগিয়া উঠিবে প্রভাতের কিনারায়।
এখন হইবে লোক জানাজানি, মুখ চেনাচেনি আর,
হিসাব নিকাশ হইবে এখন কতটুকু আছে কার।
বিহগ ছাড়িয়া ভোরের ভজন আহারের সন্ধ্যানে,
বাতাসে বাঁধিয়া পাখা-সেতু-বাঁধ ছুটিবে সুদুর-পানে।
শূন্য হাওয়ার শূন্য ভরিতে বুকখানি করি শুনো,
ফুলের দেউল হবে না উজাড় আজিকে প্রভাতে পুন।
তরুণ কিশোর ছেলে,
আমরা আজিকে ভাবিয়া না পাই তুমি হেথা কেন এলে?
তুমি ভাই সেই ব্রজের রাখাল, পাতার মুকুট পরি,
তোমাদের রাজা আজো নাকি খেলে গেঁয়ো মাঠখানি ভরি।
আজো নাকি সেই বাঁশীর রাজাটি তমাল-লতার ফাঁদে,
চরণ জড়ায়ে নূপুর হারায়ে পথের ধূলায় কাঁদে
কে এলে তবে ভাই,
সোনার গোকুল আঁধার করিয়া এই মথুরার ঠাই।
হেথা যৌবন মেলিয়া ধরিয়া জমা-খরচের খাতা,
লাভ লেকাসান নিতেছে বুঝিয়া খুলিয়া পাতায় পাতা।
ওপারে কিশোর, এপারে যুবক, রাজার দেউল বাড়ি,
পাষাণের দেশে কেন এলে ভাই। রাখালের দেশ ছাড়ি?
তুমি যে কিশোর তোমার দেশেতে হিসাব নিকাশ নাই,
যে আসে নিকটে তাহারেই লও আপন বলিয়া তাই।
আজিও নিজেরে বিকাইতে পার ফুলের মালার দামে,
রূপকথা শুনি তোমাদের দেশে রূপকথা-দেয়া নামে।
আজো কানে গোঁজ শিরীষ কুসুম কিংশুক-মঞ্জরী,
অলকে বাঁধিয়া পাটল ফুলেতে ভরে লও উত্তরী!
আজিও চেননি সোনার আদর, চেননি মুক্তাহার,
হাসি মুখে তাই সোনা ঝরে পড়ে তোমাদের যারতার।
সখালী পাতাও সখাদের সাথে, বিনামূলে দাও প্রাণ,
এপারে মোদের মথুরার মত নাই দান-প্রতিদান।
হেথা যৌবন যত কিছু এর খাতায় লিখিয়া লয়,
পান হতে চুন খসেনাক-এমনি হিসাবময়।
হাসিটি হেথায় বাজারে বিকায় গানের বেসাত করি,
হেথাকার লোক সুরের পরাণ ধরে মানে লয় ভরি।
হায়রে কিশোর হায়!
ফুলের পরাণ বিকাতে এসেছ এই পাপ-মথুরায়
কালিন্দী লতা গলায় জড়ায়ে সোনার গোকুল কাঁদে
ব্রজের দুলাল বাঁধা নাহি পড়ে যেন মথুরার ফাঁদে।
মাধবীলতার দোলনা বাঁধিয়া কদম্ব-শাখে শাখে,
কিশোর! তোমার কিশোর সখারা তোমারে যে ওই ডাকে।
ডাকে কেয়াবনে ফুল-মঞ্জরি ঘন-দেয়া সম্পাতে,
মাটির বুকেতে তমাল তাহার ফুল-বাহুখানি পাতে।
ঘরে ফিরে যাও সোনার কিশোর! এ পাপমথুরাপুরী,
তোমার সোনার অঙ্গেতে দেবে বিষবান ছুঁড়ি ছুঁড়ি।
তোমার গোকুল আজো শেখে নাই ভালবাসা বলে কারে,
ভালবেসে তাই বুকে বেঁধে লয় আদরিয়া যারে তারে।
সেথায় তোমার কিশোরী বধূটি মাটির প্রদীপ ধরি,
তুলসীর মূলে প্রণাম যে আঁকে হয়ত তোমারে স্মরি।
হয়ত তাহাও জানে না সে মেয়ে জানে না কুসুম-হার,
এত যে আদরে গাঁথিছে সে তাহা গলায় দোলাবে কার?
তুমিও হয়ত জান না কিশোর, সেই কিশোরীর লাগি,
মনে মনে কত দেউল গেঁথেছে কত না রজনী জাগি।
হয়ত তাহারি অলকে বাঁধিতে মাঠের কুসুম ফুল,
কতদূর পথ ঘুরিয়া মরিছ কত পথ করি ভুল।
কারে ভালবাস, কারে যে বাস না তোমরা শেখনি তাহা,
আমাদের মত কামনার ফাঁদে চেননি উহু ও আহা!
মোদের মথুরা টরমল করে পাপ-লালসার ভারে,
ভোগের সমিধ জ্বালিয়া আমরা পুড়িতেছি বারে বারে।
তোমাদের প্রেম নিকষিত হেম কামনা নাহিক তায়
যুগে যুগে কবি গড়িয়াছে ছবি কত ব্রজের গাঁয়!
তোমাদের সেই ব্রজের ধূলায় প্রেমের বেলাতি হয়,
সেথা কেউ তার মূল্য জানে না, এই বড় বিস্ময়।
সেই ব্রজধূলি আজো ত মুছেনি তোমার সোনার গায়,
কেন তবে ভাই, চরণ বাড়ালে যৌবন মথুরায়!
হায়রে প্রলাপী কবি!
কেউ কভু পারে মুছিয়া লইতে ললাটেরলেখা সবি।
মথুরার রাজা টানিছে যে ভাই! কালের রজ্জু ধরে,
তরুণ কিশোর! কেউ পারিবে না ধরিয়া রাখিতে তোরে।
ওপারে গোকুল এপারে মথুরা মাঝে যমুনার জল,
নীল নয়নেতে তোর ব্যথা বুঝি বয়ে যায় অবিরল।
তবু যে তোমারে যেতে হবে ভাই, সে পাষাণ মথুরায়,
ফুলের বসতি ভাঙিয়া এখন যাইবি ফলের গাঁয়।
এমনি করিয়া ভাঙা বরষায় ফুলের ভূষণ খুলি,
কদম্ব-বধূ শিহরীয়া উঠে শরৎ হাওয়ায় দুলি।
এমনি করিয়া ভোরের শিশির ফুরায় ভোরের ঘাসে,
মাধবী হারায় বুকের সুরভি নিদাঘের নিম্বাস।
তোরে যেতে হবে চলে
এই গোকুলের ফুলের বাঁধন দুপায়েতে দলে দলে।
তবু ফিরে চাও সোনার কিশোর বিদায় পথের ধার,
কি ভূষণ তুমি ফেলে গেলে ব্রজে দেখে লই একবার।
ওই সোনামুখে আজো লেগে আছে জননীর শত চুমো,
দুটি কালো আঁখি আজো হতে পারে ঘুম-গানে ঘুম্ ঘুমো।
বরণ তাদের আর পেলবতা লিখে গেছে নির্ভূল।
কচি শিশু লয়ে ধরার মায়েরা যে আদর করিয়াছে,
সোনা ভাইদের সোনা মুখে বোন যত চুমা রাখিয়াছে;
সে সব আজিকে তোর ওই দেহে করিতেছে টলমল,
নিখিল নারীর স্নেহের সলিলে তুই শিশু শতদল।
রে কিশোর! এই মথুরার পথে সহসা দেখিয়া তোরে,
মনে হয় যেন ওমনি কাহারে দেখেছিনু এক ভোরে।
সে আমার এই কৈশোর-হিয়া, জীবনের একতীরে,
কোথা হতে যেন সোনার পাখিটি উড়ে এসেছিল ধীরে।
পাখায় তাহার বেঁধে এনেছিল দূর গগনের লেখা,
আর এনেছিল রঙিন ঊষার একটু সিঁদুর-রেখা।
সে পাখি কখন উড়িয়া গিয়াছে মোর বালুচর ছাড়ি,
আজিও তাহারে ডাকিয়া ডাকিয়া শূন্যে দুহাত নাড়ি।
সোনার কিশোর ভাই,
তোর মুখ হেরী মনে হয় যেন কোথায় ভাসিয়া যাই।
এত কাছে তুই, তবু মনে হয় আমাদের গেঁয়ো নদী,
রোদ-মাখা সাদা বালু-চরখানি শুকাইছে নিরবধি;
সেইখানে তুই দুটি রাঙা পায়ে আঁকিয়া পায়ের রেখা,
চলেছিস একা বালুকার বুকে পড়িয়া টেউএর লেখা।
সে চরে এখনো মাঠের কৃষাণ বাঁধে নাই ছোট ঘর,
কৃষাণের বউ জাঙলা বাঁধেনি তাহার বুকের পর।
লাঙল সেথায় মাটিরে ফুঁড়িয়া গাহেনি ধানের গান,
জলের উপর ভাসিতেছে যেন মাটির ও মেটো-থান।
বর্ষার নদী এঁকেছিল বুকে ঢেউ দিয়ে আলপনা,
বর্ষা গিয়াছে, ওই বালুচর আজো তাহা মুছিল না।
সেইখান দিয়ে চলেজ উধাও, চখা-চখি উড়ে আগ,
কোমল পাখার বাতাস তোমার কমল মুখেতে লাগে।
এপারে মোদের ভরের‘গেরাম’আমরা দোকানদার,
বাটখারা লয়ে মাপিতে শিখেছি কতটা ওজন কার।
তবুরে কিশোর, ওই পারে যবে ফিরাই নয়নখানি,
এই কালো চোখে আজো এঁকে যায় অমরার হাতছানি।
ওপারেতে চর এ পারেতে ভর মাঝে বহে গেঁয়ো নদী।
কিশোর কুমার, দেখিতাম তোরে ফিরিয়া দাঁড়াতি যদি।
তোর সোনা মুখে উড়িতেছে আজো নতুন চরের বালি,
রাঙা দুটি পাও চলিয়া চলিয়া রাঙা ছবি আঁকে খালি।
তুই আমাদের নদীটির মত দুপারে দুইটি তট,
দুই মেয়ে যেন দুইধারে টানে বুড়াতে কাঁখের ঘট।
ওপারে ডাকিছে নয়া বালুচর কিশোর কালের সাথী,
এপারেতে ভর ভরা যৌবন কামনা-ব্যথায় ব্যথী।
তুই হেথা ভাই ঘুমাইয়া থাক গেঁয়ো নদীটির মত,
এপার ওপার দুটি পাও ধরে কাঁদুক বাসনা যত।

রাখালী by জসীশ উদ্দিন

এই গাঁয়েতে একটি মেয়ে চুলগুলি তার কালো কালো,
মাঝে সোনার মুখটি হাসে আঁধারেতে চাঁদের আলো।
রানতে বসে জল আনতে সকল কাজেই হাসি যে তার,
এই নিয়ে সে অনেক বারই মায়ের কাছে খেয়েছে মার।
সান করিয়া ভিজে চুলে কাঁখে ভরা ঘড়ার ভারে
মুখের হাসি দ্বিগুণ ছোটে কোনমতেই থামতে নারে।
এই মেয়েটি এমনি ছিল, যাহার সাথেই হত দেখা,
তাহার মুখেই এক নিমেষে ছড়িয়ে যেত হাসির রেখা
মা বলিত, বড়ুরে তুই, মিছেমিছি হাসিস্ বড়,
এ শুনেও সারা গা তার হাসির চোটে নড় নড়!
মুখখানি তার কাঁচা কাঁচা, না সে সোনার, না সে আবীর,
না সে ঈষৎ ঊষার ঠোঁটে আধ-আলো রঙিন রবির!
কেমন যেন গাল দুখানি মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার,
মাঠে ফোটা কলমি ফুলে কতকটা তার খেলে বাহার।
গালটি তাহার এমন পাতল ফুঁয়েই যেন যাবে উড়ে
দু একটি চুল এলিয়ে পড়ে মাথার সাথে রাখছে ধরে।
সাঁঝ-সকালে এ ঘর ও ঘর ফিরত যখন হেসে-খেলে;
মনে হত ঢেউয়ের জ্বলে ফুলটিরে কে গেছে ফেলে!
এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে ও পথ দিয়ে চলতে ধীরে
ওই মেয়েটির রূপের গাঙে হারিয়ে গেল কলসটিরে।
দোষ কি তাহার? ওই মেয়েটি মিছেমিছি এমনি হাসে,
গাঁয়ের রাখাল! অমন রূপে কেমনে রাকে পরাণটা সে!
এ পথ দিয়ে চলতে তাহার কোঁচার হুড়ুম যায় যে পড়ে,
ওই মেয়েটি কাছে এলে আচঁলে তার দে সে ভরে।
মাঠের হেলের নাস্তা নিতে হুকোর আগুন নিবে যে যায়,
পথ ভুলে কি যায় সে নিতে, ওই মেয়েটি রানছে যেথায়?
নিড়ের ক্ষেতে বারে বারে তেষ্টাতে প্রাণ যায় যে ছাড়ি,
ভর-দুপুরে আসে কেবল জল খেতে তাই ওদের বাড়ি!
ফেরার পথে ভুলেই সে যে আমের আঁটির বাশীটিরে,
ওদের গরের দাওয়ায় ফেলে মাঠের পানে যায় সে ফিরে।
ওই মেয়েটি বাজিয়ে তারে ফুটিয়ে তোলে গানের ব্যাথা,
রাঙা মুখের চুমোয় চুমোয় বাজে সুখের মুখর কথা!
এমনি করে দিনে দিনে লোক- লোচনের আড়াল দিয়া,
গেঁয়ো স্নেহের নানান ছলে পড়ল বাঁধা দুইটি হিয়া!
সাঁঝের বেলা ওই মেয়েটি চলত যখন গাঙের ঘাটে
ওই ছেলেটির ঘাসের বোঝা লাগত ভারি ওদের বাটে।
মাথার বোঝা নামিয়ে ফেলে গামছা দিয়ে লইত বাতাস,
ওই মেয়েটির জল-ভরনে ভাসতে ঢেউয়ে রূপের উছাস।
চেয়ে চেয়ে তাহার পানে বলত যেন মনে মনে,
জল ভর লো সোনার মেয়ে! হবে আমার বিয়ের কনে?
কলমী ফুলের নোলক দেব, হিজল ফুলের দেব মালা,
মেঠো বাঁশী বাজিয়ে তোমায় ঘুম পাড়াব, গাঁয়ের বালা!
বাঁশের কচি পাতা দিয়ে গড়িয়ে দেব নথটি নাকের,
সোনা লতায় গড়ব বালা তোমার দুখান সোনা হাতের।
ওই না গাঁয়ের একটি পাশে ছোট্র বেঁধে কুটিরখানি,
মেঝের তাহার ছড়িয়ে দেব সরষে ফুলের পাঁপড়ি আনি।
কাজলতলার হাটে গিয়ে আনব কিনে পাটের শাড়ী,
ওগো বালা! গাঁয়ের বালা! যাবে তুমি আমার বাড়ি?”
এই রুপেতে কত কথাই আসত তাহার ছোট্র মনে,
ওই মেয়েটি কলসী ভরে ফিরত ঘরে ততক্ষণে।
রুপের ভার আর বইতে নারে কাঁখখানি তার এলিয়ে পড়ে,
কোনোরুপে চলছে ধীরে মাটির ঘড়া জড়িয়ে ধরে।
রাখাল ভাবে, কলসখানি না থাকলে তার সরু কাঁখে,
রুপের ভারেই হয়ত বালা পড়ত ভেঙে পথের বাঁকে।
গাঙোন জল ছল-ছল বাহুর বাঁধন সে কি মানে,
কলস ঘিরি উঠছে দুলি’ গেঁয়ো-বালার রুপের টানে।
মনে মনে রাখাল ভাবে, “গাঁয়ের মেয়ে! সোনার মেয়ে।
তোমার কালো কেশের মত রাতের আঁধার এল ছেয়ে।
তুমি যদি বল আমায়, এগিয়ে দিয়ে আসতে পারি
কলাপাতার আঁধার-ঘেরা ওই যে ছোট তোমার বাড়ি।
রাঙা দু’খান পা ফেলে যাও এই যে তুমি কঠিন পথে,
পথের কাঁটা কত কিছু ফুটতে পারে কোনমতে।
এই যে বাতাস-উতল বাতাস, উড়িয়ে নিলে বুকের বসন,
কতখন আর রুপের লহর তোমার মাঝে রইবে গোপন।
যদি তোমার পায়ের খাডু যায় বা খুলে পথের মাঝে,
অমর রুপের মোহন গানে সাঁঝের আকাশ সাজবে না যে।
আহা ! আহা ! সোনার মেয়ে ! একা একা পথে চল,
ব্যথায় ব্যথায় আমার চোখে জল যে ঝরে ছল ছল।”
এমনিতর কত কথায় সাঁঝের আকাশ হত রাঙা,
কখন হলুদ, আধ-হলুদ, আধ-আবীর মেঘ ভাঙা।
তার পরেতে আসত আঁধার ধানের ক্ষেতে, বনের বুকে,
ঘাসের বোঝা মাথায় লয়ে ফিরত রাখাল ঘরের মুখে।
সেদিন রাখাল শুনল, পথে সেই মেয়েটির হবে বিয়ে,
আসবে কালি ‘নওশা’তাহার ফুল-পাগড়ী মাথায় দিয়ে।
আজকে তাহার ‘হলদি-ফোটা’ বিয়ের গানে ভরা বাড়ি,
মেয়ে-গলার করুণ গানে কে দেয় তাহার পরাণ ফাড়ি’।
সারা গায়ে হলুদ মেখে সেই মেয়েটি করছিল সান,
কাঁচা সোনা ঢেলে যেন রাঙিয়ে দেছে তাহার গা’খানা।
চেয়ে তাহার মুখের পানে রাখাল ছেলের বুক ভেঙে যায়।
আহা ! আহা ! সোনার মেয়ে ! কেমন করে ভুললে আমায় ?
সারা বাড়ি খুশীর তুফান-কেউ ভাবে না তাহার লাগি,
মুখটি তাহার সাদা যেন খুনী মকর্দ্দমার দাগী।
অপরাধীর মতন সে যে পালিয়ে এল আপন ঘরে,
সারাটা রাত মরল ঝুরে কি ব্যথা সে বক্ষে ধরে।
বিয়ের ক’নে ছলছে আজি শ্বশুর-বাড়ি পালকী চড়ে
চলছে সাথে গাঁয়ের মোড়ল বন্ধু ভাই-এর কাঁধটি ধ’রে ।
সারাটা দিন বিয়ে বাড়ির ছিল যত কল-কোলাহল
গাঁয়ের পথে মূর্ত্তি ধরে তারাই যেন চলছে সকল।
কেউ বলিছে, মেয়ের বাপে খাওয়াল আজ কেমন কেমন,
ছেলের বাপের বিত্তি বেসাৎ আছে কি ভাই তেমন তেমন?
মেয়ে-জামাই মিলছে যেন চাঁদে চাঁদে মেলা,
সুর্য যেমন বইছে পাটে ফাগ-ছড়ান সাঁঝের বেলা!
এমনি করে কত কথাই কত জনের মনে আসে,
আশ্বিনেতে যেমনি তর পানার বহর গাঙে ভাসে।
হায়রে আজি এই আনন্দ, যাবে লয়ে এই যে হাসি,
দেখল না কেউ সেই মেয়েটির চোখদুটি যায় ব্যথায় ভাসি।
খুঁজল না কেউ গাঁয়ের রাখাল একলা কাঁদে কাহার লাগি
বিজন রাতের প্রহর থাকে তাহার সাথে ব্যথায় জাগি।
সেই মেয়েটির চলা-পথে সেই মেয়েটির গাঙের ঘাটে
একলা রাখাল বাজায় বাঁশী ব্যথার ভরা গাঁয়ের বাটে।
গভীর রাতে ভাটীর সুরে বাঁশী তাহার ফেরে উদাস
তারি সাথে কেঁপে কেঁপে কাঁদে রাতের কালো বাতাস।
করুণ করুণ-অতি করুণ বুকখানি তার উতল করে,
ফেরে বাঁশীর সুরটি ধীরে ধীরে ঘুমো গাঁয়ের ঘরে ঘরে।
“কোথায় জাগো বিরহিণী ! ত্যজি বিরল কুটিরখানি,
বাঁশীর ভরে এস এস ব্যথায় ব্যথায় পরাণ হানি।
শোন শোন দশা আমার, গহন রাতের গলা ধরি’
তোমার তরে ও নিদয়া, একা একা কেঁদে মরি।
এই যে জমাট রাতের আঁধার, আমার বাঁশী কাটি তারে,
কোথায় তুমি, কোথায় তুমি, কেঁদে মরে বারে বারে।”
ডাকছাড়া তার কান্না শুনি একলা নিশা সইতে নারে,
আঁধার দিয়ে জড়ায় তারে, হাওয়ায় দোলায় ব্যথার ভারে।

রাখাল ছেলে by জসীম উদ্দিন

“রাখাল ছেলে ! রাখাল ছেলে ! বারেক ফিরে চাও,
বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?”
ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ,
কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা,
সেথায় আছে ছোট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,
সাঁঝ-আকাশের ছড়িয়ে-পড়া আবীর রঙে নাওয়া,
সেই ঘরেতে একলা বসে ডাকছে আমার মা-
সেথায় যাব, ও ভাই এবার আমায় ছাড় না।”
“রাখাল ছেলে ! রাখাল ছেলে ! আবার কোথা ধাও,
পুব আকাশে ছাড়ল সবে রঙিন মেঘের নাও।”
“ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-ঝরা ঘাসে,
সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।
আমার সাথে করতো খেলা প্রভাত হাওয়া, ভাই,
সরষে ফুলের পাঁপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই।
চলতে পথে মটরশুঁটি জড়িয়ে দুখান পা,
বলছে ডেকে, ‘গাঁয়ের রাখাল একটু খেলে যা।’
সারা মাঠের ডাক এসেছে, খেলতে হবে ভাই।
সাঁঝের বেলা কইব কথা এখন তবে যাই।’
“রাখাল ছেলে ! রাখাল ছেলে ! সারাটা দিন খেলা,
এ যে বড় বাড়াবাড়ি, কাজ আছে যে মেলা।”
কাজের কথা জানিনে ভাই, লাঙল দিয়ে খেলি
নিড়িয়ে দেই ধানের ক্ষেতের সবুজ রঙের চেলী।
রিষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হওয়ার সুখে।
টির বোনের ঘোমটা খুলে চুমু দিয়ে যায় মুখে।
ঝাউয়ের ঝাড়ে বাজায় বাঁশী পউষ-পাগল বুড়ী,
আমরা সেথা চষতে লাঙল মুশীদা-গান জুড়ি।
খেলা মোদের গান গাওয়া ভাই, খেলা-লাঙল-চষা,
সারাটা দিন খেলতে জানি, জানিই নেক বসা’।

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ