প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করুন

Showing posts with label স্মৃতিচারণমূলক. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিচারণমূলক. Show all posts

Thursday, August 2, 2012

প্রিয় কবি মতিউর রহমান মল্লিক | শরীফ আবদুল গোফরান

তোমরা কবি মতিউর রহমান মল্লিকের নাম অবশ্যই শুনেছ। আর শুনবেই না কেন! তিনি তো তোমাদের এই পাতাবাহারেরই পরিচালক ছিলেন। ছিলেন তোমাদের মতো ছোট্ট কুঁড়িদের প্রিয় বন্ধু। তিনি তোমাদেরকে কতই না ভালোবাসতেন। তাছাড়া পত্রিকার পাতায় পাতায় ছন্দে ছন্দে তোমাদের জন্য কতো গান-কবিতাই না লিখেছেন। শিশু সাহিত্যের বাঁকে বাঁকে ছিলো তাঁর বিচরণ। তিনি তাঁর লেখায় ছোট্ট কুঁড়িদের কি বলেছেন একবার দেখোই নাÑ

‘ফুলকুঁড়িদের মাঝে আমার
থাকতে লাগে ভালো
ফুলকুঁড়িরাই জ্বালছে দেশে
জ্ঞান-গরীমার আলো।

তারাতো নয় কাগজের ফুল
মেকী ফুলের কুঁড়ি
আসল ফুলের মেলা বসায়
সারাটা দেশ জুড়ি।’

তাহলে বুঝতেই পারছ তিনি তোমাদেরকে কতো ভালোবাসতেন। কতোই না কাছের বন্ধু ছিলেন। সেই প্রিয় মানুষটির কথাই তোমাদেরকে বলছিলাম।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন জানো? বলছি শোন। ১৯৫৬ সালের ১লা মার্চ বাগেরহাট জেলার রায়পাড়ার বারোইপাড়া গ্রামে কবি মতিউর রহমান মল্লিক জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইন্তেকাল করেছেন ১২ আগস্ট ২০১০ সালের ১ রমজান। তাঁর পিতার নাম মুন্সী কায়েস উদ্দীন মল্লিক আর মা আছিয়া খাতুন। গ্রামের পাঠশালা থেকেই কবি মল্লিকের প্রাথমিক শিক্ষা  শুরু হয়। তিনি মাদরাসা থেকে ফাজিল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ (সাবসিডিয়ারি) পাস করেন।

কর্মজীবনে  কবি মল্লিক সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, মাসিক কলম পত্রিকার সম্পাদক এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রের  সদস্য সচিব ছিলেন। তাছাড়া তিনি একাধারে ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ, গান লিখে বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন করেছেন।

কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন একজন হাস্যরসিক। তাঁর মন ছিলো নরম। গাল্পিক মন। তিনি সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলতেন। শিশু মনের অধিকারী এই কবি ছোট্ট বন্ধুদের হাসির জগতে আকর্ষণ করেছেন। তিনি কখনো নির্মল আনন্দ বিতরণ করেছেন, কখনো বা নীতি উপদেশপূর্ণ ভালো ভালো কথা-গীতি কাব্যের মাধ্যমে তুলে ধরে তোমাদের মতো ছোট্ট বন্ধুদের তৃপ্ত করেছেন।

যেমন ধরো-
‘এইতো সেদিন রাত বারোটায় দেখি
হায়! হায়! হায়! চৌরাস্তায় একি
পিচ্চি ম্যালা, পনরো ষোল আর
যুবকতো নয় নাঙ্গা তলোওয়ার
সমান তালে মারছে রঙের গোলা
ঠাঁয় দাঁড়িয়ে হাসছে ক’জন ভোলা।’

অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী কবি মতিউর রহমান মল্লিক বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম গীতি কবি। তাঁর কবিতায় গানে রয়েছে ছন্দ, শিল্প, সুষমা, ভাবের সুঠাম বিন্যাস আর নিখুঁত কারুকাজ। তাঁর রচিত প্রতিটি লেখায় ধ্বনিত হয় একটি ম্যাসেজ যা বড় মাপের একজন কবির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেÑ তিনি ছোট্ট শিশু-কিশোরদের কতো আনন্দ দিয়েছেন। তিনি নতুন নতুন শব্দ ও ভাষার ঝংকারে রস-রচনা লিখেছেন অনেক। মন ও মেজাজে চঞ্চল এই লেখক সমাজ বা জাতির জন্য মূলত লেখনি ধারণ করলেও তাঁর শিশুতোষ রচনাবলী স্পন্দিত হয়েছে। শিশু সাহিত্যে তিনি ছিলেন আলোর অভিসারী, রঙিন সকাল প্রত্যাশী মানবতাবাদী। যেমন কবি ফররুখ আহমদকে নিয়ে তাঁর শিশুতোষ একটি লেখা-
‘বুকে তার সাহস ছিল বাঘের মত
প্রাণে তার ফুটতো গোলাপ ডাগর ডাগর
মনে তার লক্ষনিযুত তারা জ্বলতো
চোখে তার স্বপ্ন ছিল সাগর সাগর।’
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন অপূর্ব প্রাণশক্তির প্রতীক। তিনি ছিলেন প্রেমের কবি। সে প্রেম প্রকৃতির জন্যে, মানুষের জন্যে, দেশের জন্যে, দেশবাসীর জন্যে, মানবতার জন্যে। তাঁর লেখায় ছিলো আল্লাহর প্রেম, রাসূল (সা.) এর প্রেম। তিনি ছোট বড় সবাইকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে লড়ে যেতে উৎসাহিত করতেন। বলেন-
‘নামবে আঁধার তাই বলে কি
আলোর আশা করবো না?
বিপদ-বাধায় পড়বো বলে
ন্যায়ের পথে লড়বো না?’
শিশু রচনায় কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদ এবং শিশু বন্ধু। তিনি শিশুদের পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলতেন-
‘পড় এবং পড়, যে পড়ে সে বড়ো
লেখার জন্য পড়ো, শেখার জন্য পড়ো।’
কবি মতিউর রহমান মল্লিক গ্রামেই লালিত পালিত এবং গ্রাম্য সৌন্দর্যময়ী প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ কবি আত্মার অধিকারী করেছে। বাংলার প্রাকৃতিক রূপ, গাঁয়ের সরল মানুষের প্রেম-প্রীতি, ঝগড়া-বিসংবাদ, আনন্দ-বিলাপ, স্ফূর্তি সবকিছুকে তিনি মমতার দৃষ্টি নিয়ে বাংলাসাহিত্যে চুষ্মান করেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এই ঐতিহ্য ধারার অনুসারী। কবি মতিউর রহমানের শিশুতোষ রচনায় তিনি এসব অনুসরণ-অনুকরণ করলেও স্বীয় কর্মের প্রভাবে তিনি উত্তরসুরী হয়েও এ পথে এক নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শিশু সাহিত্য সাধনায় তিনি লোকজীবনের উপাদান ও ঐতিহ্যের যথার্থ প্রয়োগে ছিলেন কুশলী। পল্লীর প্রচলিত গান, গজল ও লোক সাহিত্য সংগ্রহ করতে করতে তিনি অলক্ষ্যে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ধারার গান, কবিতা ইত্যাদি সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। তাঁর লেখা ছড়া-কবিতা যেমনি তোমাদেরকে আনন্দ দেয় তেমনি তাঁর লেখা অসংখ্য হামদ, নাত এবং আধুনিক ইসলামী গান শ্রোতাদের মন জয় করেছে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক বাংলা সাহিত্যে ইসলামী সঙ্গীতকে আধুনিক ভাবধারায় উজ্জীবিত করেছেন। যেমনÑ

‘পাখি তুই কখন এসে বলে গেলি
মোহাম্মদের নাম
যে নাম শুনে পৃথিবীকে
ভালো বাসিলাম।’

কবি মতিউর রহমান মল্লিখ ছোট-বড় সবার প্রিয় কবি। তিনি সবার জন্য লিখেছেন। অনেক অনেক লেখা তাঁর। সে তুলনায় প্রকাশিত হয়েছে মাত্র সামান্য কিছু গান, কবিতা। তাঁর অসংখ্য লেখা এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে। তাঁর লেখা প্রকাশিত কয়েকটি গ্রন্থের সাথে তোমাদের পরিচয় করে দিচ্ছি।

কাব্য : আবর্তিত তৃণলতা (১৯৮৭), অনবরত বৃক্ষের গান (২০০১), তোমাদের ভাষায় তিè ছায়া, চিত্রল প্রজাপতি, কিশোর কবিতা : রঙিন মেঘের পালকি (২০০২)। গান : ঝংকার (১৯৭৮), যত গান গেয়েছি ও নির্বাচিত প্রবন্ধ।

কবি মতিউর রহমান মল্লিক অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন সবুজ মিতালী সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় সাহিত্য সংসদ স্বর্ণপদক, কলম সেনা সাহিত্য পদক, লক্ষ্মীপুর সংসদ সাহিত্য পদক, রাঙ্গামাটি পরিষদ সাহিত্য পদক, খানজাহান আলী শিল্পী গোষ্ঠী সাহিত্য পদক, সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ সাহিত্য পুরস্কার (বাগেরহাট), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সাহিত্য পুরস্কার (বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, প্যারিস, ফ্রান্স), বায়তুশ শরফ সাহিত্য পুরস্কার (চট্টগ্রাম), বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ পুরস্কার, কিশোর কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলা সাহিত্য পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

এই বড় মানুষটি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি আমাদের ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছেন। তিনি তাঁর গানে কী বলেছেন জানো?
‘পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়
মরণ একদিন মুছে দেবে সকল রঙিন পরিচয়।’
তাই হলো! তিনি আর এই পৃথিবীতে নেই। তাঁকে শুধু মনে পড়ে। চলো না বন্ধুরা আমরা সবাই আল্লাহকে বলি ‘প্রভু তুমি প্রিয় কবি মল্লিককে বড় জান্নাতটায় প্রবেশের সুযোগ করে দাও। তিনি যেন ইসলামের কবিদের সাথে এক হয়ে তোমার জান্নাতের দিনগুলো উপভোগ করতে পারেন।’

Friday, July 27, 2012

হুমায়ূন আহমেদ, স্মৃতিতে সতত | সাযযাদ কাদির

হুমায়ূন আহমেদ গুরুতর অসুস্থ—ন’মাস আগে এ খবর পাওয়ার পর থেকে ১৯শে জুলাই রাত ১১-৩০টার পরে ফেসবুকে তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগ পর্যন্ত—একবারও আমার মনে হয় নি যে সেরে উঠবেন না তিনি। নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে তাঁর চিকিত্সা চলছে জেনে আরও নিশ্চিত ছিলাম এ ব্যাপারে। কিন্তু সবাইকে শোকস্তব্ধ করে অকালে অকস্মাত্ বিদায় নিলেন তিনি, এই বিমূঢ় স্তব্ধতা সহসা ঘুচবে না কারও।
হুমায়ূন আহমেদকে চিনি ১৯৭০ সাল থেকে। সেটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের শেষ বছর। থাকতাম মুহসিন হলে। সেখানেই দেখেছি তাঁকে। ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সখ্য ছিল মাহফুজউল্লাহর সঙ্গে। আহমদ ছফার সঙ্গে একবার এসেছিলেন আমার ২১১ নম্বর রুমে। তেমন কোনও কথা হয় নি তখন, লেখালেখি নিয়েও না। ছফা ভাইয়ের সঙ্গে কোনও না কোনও অনুরাগী থাকতেন সব সময়, ভেবেছি তাদেরই একজন। স্বাধীনতার পর এক দিন তাঁকে দেখি আহমদ ছফার সঙ্গে। এবার জানা গেল হুমায়ূনের লেখালেখির খবর। ছফা ভাই বললেন, ও দারুণ উপন্যাস লিখেছে একটা। প্রকাশক পাচ্ছি না। শরীফ স্যরের কাছে যাচ্ছি...যদি একটা ভূমিকা লিখে দেন।
পরে উপন্যাস পড়ে আহমদ শরীফ স্যর ভূমিকা লিখে দেন ওই উপন্যাসের। এরপর রাজি হন প্রকাশক। ছাপা হয় ‘নন্দিত নরকে’। প্রকাশের পর-পরই নানাভাবে আলোচিত হয় উপন্যাসটি, পাঠকপ্রিয়ও হয়। ওই সময় লেখক শিবির ও বহুবচন নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত আমি। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। লেখক শিবির উপন্যাসটিকে পুরস্কৃত করে ১৯৭৩ সালে, ১৯৭৫ সালে বহুবচন মঞ্চস্থ এর নাট্যরূপ। বহুবচন ১৯৯০ সালে তাঁর ‘দেবী’ নাটকটিও মঞ্চস্থ করে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, কৃষ্ণনগর ও চাকদহ-এও এ নাটকের প্রদর্শনী করেছেন তাঁরা। ‘নন্দিত নরকে’র পর হুমায়ূন লেখেন ‘শঙ্খনীল কারাগার’। এ উপন্যাসটিও পাঠকপ্রিয় হয় ‘নন্দিত নরকে’র মতোই।
লেখালেখিতে হুমায়ূনের ছেদ পড়ে যখন তিনি পিএইচডি গবেষণার জন্য যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভারসিটিতে। সেখানে দু’ বছর তিনি পড়াশোনা করেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি নিয়ে, পরে পিএইচডি করেন পলিমার কেমিস্ট্রিতে। ফাঁকে-ফাঁকে অবশ্য কিছু লেখালেখি করেছেন তিনি। মনে আছে, প্রবাস-জীবনের টুকরো-টুকরো নানা কিছু লিখে পাঠাতেন ‘বিচিত্রা’য়, সেগুলো একসঙ্গে ছাপতাম ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে’ শিরোনামের একটি বিভাগে।
দেশে ফিরে দৈনিক বাংলা-বিচিত্রা বলয় ঘিরে পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে হুমায়ূনের গল্প-উপন্যাস। ওই বলয়ে প্রধান ছিলেন সালেহ চৌধুরী, আলমগীর রহমান ও হাসান হাফিজ। আলমগীর তাঁর বই প্রকাশনায় (অবসর প্রকাশনীর মাধ্যমে), সালেহ চৌধুরী ও হাসান হাফিজ তাঁকে নিয়ে লেখালেখিতে রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা (বিশেষ করে দৈনিক বাংলা-বিচিত্রা’য়)। কাজী আনোয়ার হোসেনের সেবা প্রকাশনীর জন্যও লিখেছেন হুমায়ূন। তবে উইলিয়াম পিটার ব্লেটি’র ‘দি এক্সরসিস্ট’ (১৯৭১) অনুবাদ নিয়ে মতান্তর ঘটার পর আর লেখেন নি সেখানে। ওই অনুবাদ সম্পাদনার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিস্তর খাটতে হয় আমাকে। দেখে কাজী আনোয়ার হোসেন খুশি হন, অন্যান্য বই সম্পাদনা করে যত সম্মানী পেয়েছি, তার দ্বিগুণ বরাদ্দ করেন সেবার। কিন্তু সেই সম্পাদিত পাণ্ডুলিপি দেখে হুমায়ূন ক্ষুব্ধ হন খুব। এত কাটাকুটি? রাগ আর সামলাতে পারেন না তিনি। তখন তাঁকে শান্ত করতে কোথায় কেন কি পরিবর্তন-পরিমার্জন-পুনর্লিখন করতে হয়েছে তা বোঝাবার চেষ্টা করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। জানিয়ে দেন, সম্পাদিত রূপটিই শুধু ছাপতে রাজি আছেন তিনি। কিন্তু মানতে পারেন না হুমায়ূন, রাগে দুঃখে ক্ষেপে গিয়ে চলে যান পাণ্ডুলিপি নিয়ে। পরে অবশ্য ফিরে আসেন, বলেন, খুব রেগে গিয়েছিলাম। মাথা ঠিক ছিল না। আপনি সংশোধিত রূপটিই ছাপুন।
পরে সেই সম্পাদিত রূপেই ছাপা হয় ‘এক্সরসিস্ট’। পরে এ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখি নি তাঁর। দেখা হলে কখনও বুঝতে দেন নি সেই রেগে যাওয়ার বিষয়টি। তাঁর এই মেনে নেয়ার ক্ষমতার উচ্চ মূল্যায়ন করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। গত ১৯শে জুলাই ছিল তাঁর ৭৬তম জন্মদিন। সেদিন সকালে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করি আমরা। রাতে হুমায়ূনের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে পরদিন সকালে আবারও ফোনে কথা বলি কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তখন কথায়-কথায় ওঠে ‘এক্সরসিস্ট’-এর অনুবাদ ও সম্পাদনার সেই প্রসঙ্গ। বললেন, হুমায়ূন বড় মাপের মানুষ ছিলেন। ওই বইয়ের ঘটনা তো বটেই, অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যবহারে বুঝেছি তা।
দুঃখ করে বললেন, আমার জন্মদিনের তারিখটা তাঁর মৃত্যুদিনের তারিখ হয়ে গেল!
মনে পড়ে, ওই ঘটনার কয়েক বছর পর হুমায়ূন আমাকে উপহার দেন তাঁর ‘সৌরভ’ নামের উপন্যাসটি, লেখেন ‘সাযযাদ কাদির প্রিয়বরেষু...’। সেদিন ছিল ২০শে জুলাই, ১৯৮৫। কাকতালীয়, কিন্তু কি বিচিত্র!
আসলেই অত্যন্ত সহৃদয় মানুষ ছিলেন হুমায়ূন, মনটা ছিল বড়। এক সময় তাঁর কড়া সমালোচনা করতেন হুমায়ুন আজাদ। তাঁর উপন্যাসকে বলতেন ‘অপন্যাস’, টিভি নাটককে বলতেন ‘ওয়ান-টাইমার’। কিন্তু এ নিয়ে কখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখান নি হুমায়ূন আহমেদ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দু’জনের অন্তরঙ্গতাই লক্ষ্য করেছি বেশি।
একবার ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিভাগে। সেখান থেকে তিনি নিয়ে যান তাঁর বাসায়। টিভি নাটক নিয়ে কথা হয় অনেকক্ষণ। বলি, তাঁর নাটকে ব্ল্যাক হিউমারের লক্ষণ আছে। এ কথায় উত্সুক হন তিনি। পরে ‘বহুব্রীহি’র পাণ্ডুলিপি দিয়ে বলেন, ঈদ সংখ্যায় ছাপুন। কোনও সম্মানী দিতে হবে না।
তখন আমি ‘তারকালোকে’র সম্পাদক।
ওই সময় হুমায়ূনের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে নানা বিড়ম্বনায় পড়ছিলাম এখানে সেখানে। বইমেলায় তাঁর ভক্ত, টিভির শিল্পী, এমনকি তাঁর ছাত্র-ছাত্রী পর্যন্ত ভুল করে বসতো মাঝেমধ্যে। সেদিন এ নিয়ে বেশ হাসাহাসি করি আমরা। হুমায়ূন স্ত্রীকে ডেকে বলেন, আছে কোনও মিল সাযযাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার? তিনি একবার তাকিয়েই বলেন, না।
পরে দু’জনে হাঁটতে-হাঁটতে আসি এলিফ্যান্ট রোডে। পথে জিজ্ঞেস করেন, আপনার লেখা দেখি না। আর গল্প লেখেন না? আপনাদের লেখা পড়ে-পড়ে আমরা লিখতে শুরু করলাম...
আমার অনূদিত ‘লাভ স্টোরি’ সম্পর্কে বললেন, ওটা পড়ার পর থেকে বেস্টসেলার লিখতে চাইছি। তবে হাতের লেখা নিয়ে সমস্যা। বানান, দাড়ি কমা ড্যাশ...! বাক্য অসমাপ্ত থাকে। আমার দরকার ভাল একজন কমপোজার (ওয়ার্ড প্রসেসর), আর ভাল একজন প্রুফ রিডার।
পরে শুনেছি অমন দু’একজন পেয়েছেন তিনি।
তখন ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘অয়োময়’ টিভি সিরিজ। ওই প্রসঙ্গে হুমায়ূন বলেন প্রযোজক নওয়াজিশ আলি খান ও মুস্তাফিজুর রহমান এবং শিল্পী-কলাকুশলীদের কৃতিত্ব ও অবদানের কথা। বলেন, ওদের ইমপ্রোভাইজেশন দারুণ। একটা সাজেশন থেকে দারুণ কিছু করে ফেলতে পারেন তাঁরা।
তবে হুমায়ূনের ‘কোথাও কেউ নেই’ ও ‘নক্ষত্রের রাত’ সিরিয়াল দু’টি বেশি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে আগের সিরিয়াল তিনটির চেয়ে। চলচ্চিত্রে অবশ্য অত সাফল্য আসে নি তাঁর। পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমানের অনুরোধে, ইসকাটনের মহিলা সমিতিতে গিয়ে, তাঁর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ছবির ছোট্ট একটি দৃশ্যে অভিনয়ের মতো কিছু একটা করতে হয়েছিল আমার। পরে সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে ছবিটি যখন দেখি, তখন খেয়াল করি সে দৃশ্যটি নেই ছবিতে।
বলেছিলাম, হাঁটতে-হাঁটতে এলিফ্যান্ট রোডে আসার কথা। সেদিন হুমায়ূন আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন জিগজ্যাগ ভিডিওতে। গিয়ে বলেন, আমাকে কিছু ইংরেজি সিচুয়েশন কমেডি (সিটকম) বেছে দিন তো!
জানালেন সারা রাত ছবি দেখেন তিনি। দেখে-দেখে আইডিয়া পান নানা রকম। হুমায়ূন সেদিন নিয়ে যান ১৮টি ক্যাসেট। দোকানের মালিক জানান, কিছু দিন পর-পর এসে তিনি ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে যান ২০-২২টি করে।
টিভি’র মাধ্যমে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার পর বইমেলায় বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পান হুমায়ূন। এ উদাহরণ কাজে লাগাতে চেয়েছেন অনেকে। এটা হচ্ছে অগস্ট-সেপটেম্বর থেকে টিভিতে একটা সিরিজ শুরু করে জানুয়ারি পর্যন্ত চালিয়ে গিয়ে ফেবরুয়ারির বইমেলায় ভিড় সৃষ্টি করার ফরমুলা। এ ফন্দি বা ধান্দা করে অবশ্য কিছুটা সাফল্য পেয়েছেন কেউ-কেউ। অন্যেরা পান নি সেই স্বর্গের সিঁড়ি।
হুমায়ূনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা ইসকাটনের এক ডুপ্লেক্স কমপ্লেক্সের চত্বরে, এক শুক্রবার দুপুরে। আমি গিয়েছিলাম সেখানকার বাসিন্দা জামিল আখতার বীনু আপার কাছে। হঠাত্ ঝড়ো বেগে ঝকঝকে নতুন একটি গাড়ি ঢুকে দু’জন নারীকে নামিয়ে দিয়েই আবার বেরিয়ে যায় সাঁত্ করে। ওই দু’জনকে মা ও মেয়ে মনে হয় আমার। আসা ও যাওয়ার দু’বারই আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয় গাড়ির অপর আরোহী হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। তিনি বোধহয় চিনতে পারেন না আমাকে, অথবা চিনলেও হয়তো বুঝে উঠতে পারেন নি—ওই সময় আমি কেন ওখানে থাকবো!
কিছু দিন পর হুমায়ূনের সঙ্গে গুলতেকিনের বিচ্ছেদ এবং শাওনকে বিয়ের খবর আসে পত্রিকায়। তখন বুঝতে পারি, ওই দুই নারীর একজন ছিলেন কিশোরী শাওন।
হুমায়ূনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে অনেক বিতর্ক। এর আগে, টিভিতে ‘অয়োময়’ সিরিজ চলাকালে, এক বন্ধুর কিশোরী কন্যার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে নানা কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি ছাপা হয়েছিল পত্রপত্রিকায়। এসব ঘটনায় আমার মনে পড়েছিল বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার চারলি চ্যাপলিন-এর কথা। ৫৪ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার ইউজিন ও’নিল-এর অষ্টাদশী কন্যা উনা-কে। ভদ্মাদিমির নবোকভ-এর ‘লোলিটা’ উপন্যাসটির কথাও মনে পড়েছে। ওই উপন্যাসের প্রৌঢ় প্রফেসর হামবার্ট হামবার্ট আকৃষ্ট হন ১২ বছরের এক বালিকার প্রতি।
হুমায়ূনের এ ব্যাপারটি নিয়ে চর্চা শেষ হয় নি এখনও। তাঁর মৃত্যুর পরও তা প্রকাশ পেয়েছে দুঃখজনক রূপে। এ নিয়ে অন্তত একটি সাড়াজাগানো উপন্যাস লেখা হয়েছে বলে জানি। ‘তালাক’ নামের সে উপন্যাসটি লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক-সাহিত্যিক মিলান ফারাবী।
প্রশ্ন জাগে, নিজের জীবনকে নিজের মতো করে কি সাজিয়ে নিতে পারে না কেউ?
অবশ্য ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের ঘটনা-রটনা হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের কাটতিতে প্রভাব ফেলে নি কোনও। যারা কট্টর সমালোচক, ঘোরতর নিন্দুক তাদেরও দেখেছি বইমেলায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁর বই কিনতে। এটা নিঃসন্দেহে এক জাদু-ক্ষমতা।
নব্বই দশকের শেষ দিকে হুমায়ূনের সাহিত্যিক কৃতিত্ব সম্পর্কে আমাকে লিখতে বলা হয়েছিল পাক্ষিক ‘শৈলী’র পক্ষ থেকে। তাঁর তিনটি বড় সাফল্য নিয়ে তখন আলোচনা করেছিলাম সে লেখায়। প্রথমত, বাংলা বেস্টসেলারে কলকাতার প্রাধান্যকে ছাড়িয়ে তিনি ঢাকার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম। এর আগে নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন থেকে আকবর হোসেন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ থাকলেও বিশেষ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন একমাত্র কাজী আনোয়ার হোসেন। তবে হুমায়ূন অবদান রেখেছেন সামগ্রিক পরিসরে। দ্বিতীয়ত, বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানকে স্থায়ী আসন দিয়েছেন তিনি। এর আগের ১৫০ বছরের উপন্যাস পড়ে তেমন করে বোঝা যায় না যে বাঙালিদের ৬০ ভাগ মুসলমান। তৃতীয়ত, উপন্যাসের কাটতি বাড়াতে তিনি সেক্স বা ভায়োলেন্সের আশ্রয় নেন নি কখনও।
এর পর কেটেছে প্রায় দুই দশক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম বেস্টসেলার লেখক বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁকে ছাড়িয়ে যান শরত্চন্দ্র। সেকালের জনসংখ্যা ও শিক্ষার হারের কথা মনে রেখেও বলা যায়, কাটতিতে হুমায়ূন ছাড়িয়ে গিয়েছেন তাঁকেও। হয়তো বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সেরা বেস্টসেলার লেখক তিনিই। অবশ্য গুণ, মান ও শৈলীর বিচার আসছে না এখানে। সে বিচারের জন্য কিছু দিন দেরি করতে হবে আমাদের।
হুমায়ূন সাফল্য দেখিয়েছেন আরও নানা ক্ষেত্রে। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ‘দেশ’-এর পূজা সংখ্যায় তিনি করে নিয়েছেন স্থায়ী আসন। বাংলাদেশের কোনও লেখকের জন্য এ এক বিরল প্রতিষ্ঠা। এতে এই আশা জেগেছিল আমাদের, বাংলাদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের বাজারেও হয়তো বেস্টসেলার হবে তাঁর বই। সে হওয়াটা অসম্ভব কিছু ছিল না, কিন্তু তার আগেই আমরা হারালাম তাঁকে। ফলে এই বিশাল সম্ভাবনা এখন সুদূরপরাহত হয়ে রইলো আমাদের কাছে। কারণ তাঁর শূন্য স্থান আর পূরণ হবে না সহজে।

জননন্দিত হুমায়ূন আহমেদ | মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ্

জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ইন্তেকালে আমি গভীরভাবে শোকাহত। সমগ্র জাতির শোকের সঙ্গে আমার শোক ও অশ্রু মিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যের এক অনন্যসাধারণ দক্ষ রূপকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন গভীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। দুর্ভাগ্য আমার, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় এবং আমার দৃষ্টিশক্তি ও চলত্শক্তি প্রায় রহিত হওয়ায় আমি আমার পরম প্রিয় হুমায়ূন আহমেদের তাঁর শেষ বিদায়ের সময় শোকযাত্রা ও জানাজায় শামিল হতে পারিনি। বাধ্য হয়েই আমাকে গৃহবন্দি অবস্থায় রোগশয্যায় বসে টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁর শেষ যাত্রার দৃশ্যাদি দেখতে এবং শোকাশ্রু বিসর্জন করতে হয়েছে। এদিক থেকে আমি একজন হতভাগ্য ব্যক্তি।
এই শোকবিধুর পরিবেশেও আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠেছে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এবং তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ পাঠ করে আমার অভিভূত হওয়ার এবং গ্রন্থটিকে ‘হৃদয় দিয়ে লেখা’ বলে অভিহিত করার কথা। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রতিভার স্পর্শে এবং সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বহু গ্রন্থের প্রণেতা হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের মনোহরণ করেছেন এবং হৃদয় জয় করেছেন। তিনি হয়েছেন সাহিত্য-শিল্পের একজন অসাধারণ স্রষ্টা; জনপ্রিয় ও জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর এই জনপ্রিয়তা এবং অভাবনীয় সাফল্যের বিষয়ে তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই বোদ্ধা সাহিত্য পাঠক, চলচ্চিত্র দর্শক অনেক কথা বলেছেন। তারা বিভিন্নভাবে হুমায়ূন আহমেদের মূল্যায়ন করেছেন। আমার বিশ্বাস, তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও মূল্যায়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমার পক্ষে হুমায়ূনের সার্বিক মূল্যায়ন বর্তমানে সম্ভব নয়।
আমার কেবলই মনে হচ্ছে, তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘নন্দিত নরকে’র বিষয়ে আমার মূল্যায়নের কথা। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত গ্রন্থটির আলোচনায় আমি শিরোনাম দিয়েছিলাম ‘নন্দিত নরকে হৃদয় দিয়ে লেখা’। আজ মনে হচ্ছে শুধু নন্দিত নরকেই নয়, তিনি তাঁর সব উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটক হৃদয় দিয়েই লিখেছেন। এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি ঢেলে দিয়েছেন তাঁর হৃদয়। লেখা যত কঠিন, হৃদয় দিয়ে লেখা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। তিনি হৃদয় দিয়ে লিখেছেন বলেই পাঠক-দর্শক এবং শ্রোতার হৃদয় হরণ করতে পেরেছেন। কথায় বলে, ‘কলম, কাগজ, মন লেখে তিনজন’ কিন্তু শুধু মন দিয়ে লিখলেই হয় না, হৃদয় দিয়েও লিখতে হয়। হুমায়ূন আহমেদ এ ব্যাপারে অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। ‘নন্দিত নরকে’ গ্রন্থটির আলোচনায় আমি যা লিখেছিলাম তার কিছু এখানে উদ্ধৃত করছি, ‘উপন্যাসের আরেকটি আকর্ষণীয় গুণ এখানে যে মনোবিশ্লেষণের নামে, কিংবা আত্ম-অন্তর্মুখীনতার অজুহাতে বর্ণনায় অতিরেক ঘটিয়ে কাহিনীকে বোরিং করে তোলা হয়নি। সহজ, সাবলীল অথচ প্রাণময় ভাষায় তিনি যথার্থ দ্রষ্টা এবং স্রষ্টার মতো নির্লিপ্ত চেতনায় কাহিনী বিন্যাস করে গেছেন। তাঁর রচনায় এবং কাহিনী বিন্যাসে এমন একটি অন্তর্গত আকর্ষণ আছে, যা মনকে কখনও ক্লান্ত করে না, বরং একাধিক পাঠেও অপরিসীম আনন্দ দেয়। এই হৃদয়বান দক্ষ কথাশিল্পীকে আমরা স্বাগত জানাই।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছি এবং কেবলই মনে পড়ছে হুমায়ূন আহমেদের রচনার কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা। তিনি শুধু একজন সৃষ্টিধর্মী লেখকই নন, বিশেষ করে কথাসাহিত্যে ও নাটকে জনমনের এবং সমগ্র জাতির হৃদয় স্পর্শ করতে হলে কী ধরনের জিনিস রচনায় দেয়া দরকার, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রূপায়ণ ঘটানো অপরিহার্য, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন এবং জাগ্রত সত্তা। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, সাধারণভাবে মানুষ এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের মানুষ স্বদেশপ্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী ও সঙ্গীতপ্রেমী এবং পারলৌকিক জীবন ও সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে অভ্যস্ত। তারা যেমন বর্তমান জীবন সম্পর্কে ভাবেন, তেমনি পরকালের জীবন তথা পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে ভাবতেও অভ্যস্ত। এর পরিচয় প্রায়ই আমরা পাই লোকসাহিত্যে, লোকসঙ্গীতে এবং বিশেষ করে মরমী গানে। হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের সঙ্গে যারা পরিচিত তারা লক্ষ্য করেছেন, এই অসাধারণ কথাশিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার যেমন তাঁর উপন্যাসে নাটকের কাহিনী ও চরিত্রসৃজনের মাধ্যমে পাঠকের মনোহরণ করেছেন, তেমনি তিনি লোকসঙ্গীত, মরমী গান সৃষ্টিকর্মে ব্যবহার করেছেন অনন্যসাধারণ দক্ষতায়। তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচারিত নাটক এবং চলচ্চিত্র, যেগুলো আমি রোগশয্যায় বসে দেখেছি, সেগুলোর জীবনবাস্তবতা এবং সৃষ্টিধর্মিতা যেমন আমাকে কাঁদিয়েছে, তেমনি কাঁদিয়েছে সিনেমায়, নাটকে ব্যবহৃত লোকসঙ্গীত বিশেষ করে মরমী সঙ্গীত। আরেকটি কথা অনেকেই বলেছেন, কিন্তু আমি বিশেষভাবে বলতে চাই যে, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অসাধারণ দক্ষতায় এবং সৃষ্টিধর্মী প্রেরণায় মিডিয়াকে বিশেষ করে টেলিভিশনকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর নাটক ও টেলিফিল্ম প্রচারে প্রায় বাধ্য করে অসাধারণ সাফল্যের পরিচিতি দিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিধর্মিতা যেমন তাঁকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে, তেমনি তাঁর বিশাল জনপ্রিয়তার পেছনে কাজ করেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ব্যবহারের ক্ষমতা। শুধু শিক্ষিত লোকেরাই নয়, শিক্ষাবঞ্চিত লোকেরাও যে তাঁর সৃষ্টিকর্মে মুগ্ধ হয়েছেন, তার একটা বড় কারণ ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অর্থাত্ টেলিভিশন ও সিনেমার মাধ্যমে প্রচারিত তাঁর গল্প-উপন্যাসের কাহিনী।
শিক্ষার অভাবে অর্থাত্ পড়তে না জানার কারণে যারা তাঁর গল্প, উপন্যাস কিংবা নাটক পড়তে পারেননি, তারা টেলিভিশনে এবং চলচ্চিত্রে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং বাস্তবজীবনের রূপায়ণ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ শুধু তাঁর লেখায় দক্ষতার পরিচয় দিয়ে পাঠকের হৃদয় হরণ করেননি, তিনি তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্ম দিয়ে পাঠকহৃদয় হরণ করেছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক তথ্যে জানলাম, তার গ্রন্থসংখ্যা ৩২২টি, বলাবাহুল্য এর বেশিরভাগই উপন্যাস ও নাটক। এই সংখ্যা থেকে তাঁর সৃষ্টিধর্মিতা এবং লেখার সাবলীল ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি সহজেই অনুমেয়। তিনি যে লেখাকে সমগ্র হৃদয় দিয়ে ধারণ করেছিলেন এবং সেই ধারণক্ষমতাকে রচনার মাধ্যমে উত্সারিত করেছেন, তার পরিচয় এই সংখ্যতত্ত্বেও পাওয়া যায়। ৩২২টি গ্রন্থ রচনা এক অসাধারণ সৃজনক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে।
অনেকে বলেন, যারা বেশি লেখেন, তারা খারাপ লেখেন। এ কথা হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি বেশি লিখলেও একটি মান বজায় রেখেছেন। বেশি লেখা, কম লেখা সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি-প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, অনেকের ধারণা, যারা বেশি লেখেন তারা খারাপ লেখেন, কিন্তু আমি বলতে চাই, আমরা যে প্রতিভা নিয়ে জন্মাই তাতে বেশি লিখি বলেই আমরা সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করি। তিনি প্রশ্ন করেছেন—রবীন্দ্রনাথ কি বেশি লেখেননি? তার রচনাবলি তো ২৭ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর এই বক্তব্য স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত। বাংলাসাহিত্যে বহু প্রতিভাবান লেখক আছেন, যারা বেশি লিখেছেন এবং সৃষ্টিক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু সবাই কি হুমায়ূন আহমেদের মতো তিন শতাধিক বই লিখেছেন? এই প্রশ্নের জবাব সাহিত্য সমালোচকরাই দিতে পারেন।
এসব কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিপটে ভেসে উঠল হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুসংবাদের পরবর্তী একটি ঘটনা। সেদিন রাতে দিগন্ত টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছিল মিউজিক আওয়ার নামে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান। তাতে লালনসঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন। সেই সময় এলো হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুসংবাদ। অনুষ্ঠানটি থামিয়ে দিয়ে এর উপস্থাপক মৃত্যুসংবাদটি প্রচার করলেন। কিন্তু তিনি আবেগে এবং শোকে কথা ভালোভাবে সাজিয়ে বলতে পারছিলেন না। তিনি ফরিদা পারভীনকে একটি সঙ্গীত পরিবেশনের অনুরোধ জানালেন। ফরিদা পারভীন লালনসঙ্গীতের একজন প্রখ্যাত গায়িকা। তিনি শোকাহত কণ্ঠে পরিবেশন করলেন জীবন-মৃত্যু সম্পর্কিত একটি লালনসঙ্গীত। শ্রোতাদের তরফ থেকে অনুরোধ এলো একটি বিশেষ লালনসঙ্গীত পরিবেশনের জন্য। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদা গাইলেন লালনের সেই বিখ্যাত গান—খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ‘কমনে আসে-যায়/ ধরতে পারলে মনও বেড়ি দিতাম পাখির পায়। গানটি শুনে আমিও শোকাহত হয়ে গেলাম। আমার দুই চোখ হয়ে উঠল অশ্রুসিক্ত। বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর ভাবনাই তো আমার নিত্যদিনের ভাবনা। কোন দিন আমার জীবনখাঁচার পাখি উড়াল দিয়ে চলে যাবে, তা কি আমি জানি?
ওই দিনের একটি অনুষ্ঠানে জনৈক অধ্যাপককে (দুঃখের বিষয় তার নামটি আমি শুনতে পাইনি) প্রশ্ন করা হয়েছিল—অনেকেই বলেন, হুমায়ূন আহমেদের রচনা কালজয়ী হবে না। আপনি স্যার কী বলেন? অধ্যাপক মহোদয় একটি চমত্কার উত্তর দিলেন—হুমায়ূন আহমেদ কালজয়ী হবেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখন কী করে দেব। এখনও তো হুময়ূনের কাল অতিক্রান্ত হয়নি। আমি তার উত্তরে মুগ্ধ হলাম। তিনি আরও বলেছিলেন, হুমায়ূনের কাল অতিক্রান্ত হলে তবেই বোঝা যাবে, তিনি কালজয়ী কিনা। এখন এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবান্তর।
আমি স্মৃতি থেকে কথাগুলো বললাম। এতে হয়তো সামান্য হেরফের ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু অধ্যাপক মহোদয়ের মূল কথা ছিল এই। হুমায়ূনের জন্যে টেলিভিশনে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে নাটক ও সিনেমার কোনো কোনো শিল্পী বলেছেন, বর্তমানে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘হুমায়ূনের যুগ’ চলছে। কেউ কেউ বলেছেন যেমন রবীন্দ্রযুগ, তেমনি বর্তমান কালটি হুমায়ূনের যুগ।
তাঁর মৃত্যুর পর অগণিত শিক্ষিত ও নিরক্ষর লোক শোকমিছিলে এবং জানাজায় শরিক হয়েছেন। এর পেছনে তাঁর রচনা ও চলচ্চিত্রের স্বাতন্ত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যই কাজ করেছে। হুমায়ূন আহমেদ যে জনপ্রিয় ও জননন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। বলা আবশ্যক যে, জনপ্রিয় লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা আর জননন্দিত লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে অনেক জনপ্রিয় শিল্পী-সাহিত্যিক আছেন, কিন্তু তারা সবাই জননন্দিত নন। জননন্দিত সেই শিল্পী-সাহিত্যিকই হন, যিনি সর্বস্তরের জনসাধারণের হৃদয় হরণ করেন। নিরক্ষর লোকেরাও যার রচনার দ্বারা মুগ্ধ ও আবিষ্ট হন। এটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের ম্যাজিক। কথাশিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ যেন এই ম্যাজিক করায়ত্ত করেছিলেন। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।
শ্রুতিলিখন : আহমদ বাসির
সূত্র : আমার দেশ

নির্বাচিত বিষয়গুলো দেখুন

Labels

মাসের পঠিত শীর্ষ দশ

 

জোনাকী | অনলাইন লাইব্রেরী © ২০১১ || টেমপ্লেট তৈরি করেছেন জোনাকী টিম || ডিজাইন ও অনলাইন সম্পাদক জহির রহমান || জোনাকী সম্পর্কে পড়ুন || জোনাকীতে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ